📘 তাগুত বিষয়ে বিস্তারিত > 📄 কীভাবে সম্পন্ন হবে তাগুতের প্রতি অস্বীকার?

📄 কীভাবে সম্পন্ন হবে তাগুতের প্রতি অস্বীকার?


(এ আলোচনা অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত)
আমরা তাগুতের পরিচয় জানলাম। এখন আমাদের জানা দরকার, তাগুতকে অস্বীকার করার পদ্ধতি কী। আমরা ঠিক কীভাবে তাগুতকে অস্বীকার করব? শাইখুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) এ বিষয়ে বলেছেন, "তাগুতকে অস্বীকারের স্বরূপ হলো- তুমি গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের) ইবাদত করাকে বাতিল হিসেবে বিশ্বাস করবে, গাইরুল্লাহর ইবাদতকে বর্জন ও ঘৃণা করবে, গাইরুল্লাহর ইবাদতকারী মুশরিকদের কাফির বলবে এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখবে (অর্থাৎ তাদেরকে শত্রু গণ্য করবে)।
পক্ষান্তরে আল্লাহর প্রতি ইমান আনয়নের অর্থ-তুমি বিশ্বাস রাখবে, কেবল এক আল্লাহই সত্য উপাস্য। সকল ইবাদতকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করবে এবং আল্লাহ ব্যতীত সমুদয় উপাস্যের ইবাদতকে নাকচ করবে (অর্থাৎ গাইরুল্লাহর ইবাদত করবে না)। একনিষ্ঠ তাওহিদবাদীদের ভালোবাসবে এবং তাদের সাথে মিত্রতা রাখবে। আর মুশরিকদের ঘৃণা করবে এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখবে।" [শাইখ সালিহ আল-ফাওযান কৃত শারহু মা'নাত তাগুত, পৃষ্ঠা: ১৬-২০; দারুল ইমাম আহমাদ (কায়রো) কর্তৃক প্রকাশিত: সন: ১৪২৭ হি/২০০৬ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
ইমাম সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেছেন, "অবশ্যই এ বিষয়গুলো থাকতে হবে। প্রথমত, তুমি জেনে নিবে, তাগুত বলতে কী বোঝায়। কারণ এটা তোমার জানা না থাকলে তাগুতকে বর্জন করা তোমার পক্ষে সম্ভব হবে না। একটি অজ্ঞাত-অজানা বিষয়কে তুমি কীভাবে বর্জন করবে?! দ্বিতীয়ত, তুমি যখন তাগুতের পরিচয় জেনে নিবে, তখন তাগুতকে বর্জন করা তোমার জন্য সহজ হয়ে যাবে (অর্থাৎ এ পর্যায়ে তাগুতকে বর্জন করতে হবে)। তৃতীয়ত, তুমি যখন তাকে বর্জন করবে, তখন অবশ্যই তার সাথে তোমাকে বৈরিতা রাখতে হবে, তাকে ও তার অনুসারীদেরকে ঘৃণা করতে হবে এবং আল্লাহর জন্য তাদের সাথে শত্রুতা রাখতে হবে।' [শারহু মা-নাত তাগুত, পৃষ্ঠা: ১৭]
ইমাম ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) আরও বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহকে এক বলে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাগুতকে অস্বীকার করেছে, তাকে অবশ্যই আল্লাহর মিত্রদের প্রতি তথা তাওহিদবাদীদের প্রতি ভালোবাসা রাখতে হবে এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। অপরপক্ষে মুশরিকদের ঘৃণা করতে হবে এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখতে হবে। কেননা আল্লাহ তাদের ঘৃণা করেন। আল্লাহ যাকে ঘৃণা করেন, তুমিও তাদের ঘৃণা করবে। কিন্তু যে বলে, আমার কেবল নিজের ওপরই অধিকার আছে। আমি কোনো মানুষের সাথে বৈরিতা রাখব না, কাউকে ঘৃণা করব না, কাউকে কাফিরও বলব না। আমরা তাকে বলব, তুমি তাগুতকে অস্বীকার করোনি। কারণ তাগুতকে অস্বীকার করলে আল্লাহর শত্রুদের ঘৃণা করা এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখা অপরিহার্য। (সুরা মুজাদালাহ: ২২)... সুতরাং যার কাছে সকল মানুষ সমান, সে তাগুতকে অস্বীকার করেনি। তাগুতকে কেবল সে-ই অস্বীকার করেছে, যে বৈরিতা ও মিত্রতা করেছে আল্লাহর জন্য, আবার ভালোবাসা ও ঘৃণাও করেছে আল্লাহর জন্য।' [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২০-২১।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, তাগুতকে অস্বীকার করতে হলে তাগুতের কর্মকে বাতিল বলে বিশ্বাস করতে হবে, তাগুতকে ঘৃণা করতে হবে এবং তাগুতের অনুসারীদের प्रति বিদ্বেষ পোষণ করতে হবে। আর তাগুতের অনুসারীরা যদি কাফির হয়, তাহলে তাদেরকে কাফির বলতে হবে। পক্ষান্তরে যারা কাফির নয়, তাদেরকেও ঘৃণা করতে হবে, তাদের বিরোধিতা করতে হবে; যদিও ইমানি ভ্রাতৃত্বের দরুন তাদের প্রতি অবশিষ্ট থাকবে আমাদের ভালোবাসাও। স্মর্তব্য যে, সকল তাগুত কাফির নয়, তদ্রুপ তাগুতের অনুসারী মাত্রই সে কাফির নয়। এ সম্পর্কে তাগুতের পরিচিতি-বিষয়ক আলোচনায় আমরা কিঞ্চিৎ জেনেছি। সামনে শাইখ সুলাইমানের আলোচনায় আরও জানব, ইনশাআল্লাহ।
প্রয়োজনীয় বিবেচনায় মুসলিমের ভালোবাসা ও ঘৃণা বিষয়ে একটি মৌলিক আলোচনা এখানে তুলে ধরছি।
একজন মুসলিম মানুষের সাথে কীভাবে বৈরিতা ও মিত্রতা পোষণ করবে, তার বর্ণনা কুরআন সুন্নাহয় এসেছে। বৈরিতা ও মিত্রতার ক্ষেত্রে মানুষ তিনভাগে বিভক্ত। যথা:
১ম ভাগ: যাদেরকে খাঁটি ও নিষ্কলুষভাবে ভালোবাসতে হবে, যাদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখা যাবে না। তাঁরা হলেন খাঁটি মুমিন সম্প্রদায়। যেমন: নবিগণ, সিদ্দিকগণ, শহিদগণ ও সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ। আল্লাহ বলেছেন, "যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ও আমাদের যেসব ভাই ইমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; আর যারা ইমান এনেছিল তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না: হে আমাদের প্রতিপালক, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।" (সুরা হাশর: ১০)
২য় ভাগ: যাদের প্রতি খাঁটিভাবে ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করতে হবে, যাদের প্রতি কোনো ভালোবাসা ও মিত্রতা পোষণ করা যাবে না। তারা হলো খাঁটি কাফির সম্প্রদায়। যেমন: কাফির, মুশরিক, মুনাফেক, মুরতাদ, নাস্তিক ও বিধর্মী সম্প্রদায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, "তুমি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী কোনো জাতিকে এরূপ পাবে না যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরোধিতা করে এমন ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্ব করে, যদিও তারা তাদের পিতা, বা পুত্র, কিংবা ভাই, বা জাতি-গোষ্ঠী হয়। এরাই তারা, যাদের অন্তরে আল্লাহ ইমান লিখে দিয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ (আল্লাহপ্রদত্ত সাহায্য) দ্বারা তাদের শক্তিশালী করেছেন। তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতসমূহে, যেগুলোর তলদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও সন্তুষ্ট হয়েছে আল্লাহর প্রতি। এরাই আল্লাহর দল। জেনে রেখ, নিশ্চয় আল্লাহর দলই সফলকাম।' (সুরা মুজাদালাহ: ২২)
৩য় ভাগ: যাদেরকে একদিক থেকে ভালোবাসতে হবে, আবার একদিক থেকে ঘৃণা করতে হবে, যাদের ব্যাপারে অন্তরে ভালোবাসা-ঘৃণা দুটিই একত্রিত হবে। তারা হলো পাপাচারী মুমিন ব্যক্তিবর্গ। তাদেরকে ভালোবাসতে হবে, তাদের ইমানের কারণে। আর তাদেরকে ঘৃণা করতে হবে, শির্ক-কুফরের চেয়ে নিম্নপর্যায়ের পাপাচারিতায় লিপ্ত হওয়ার কারণে। অধিকন্তু তাদের প্রতি ভালোবাসার দাবি হচ্ছে তাদেরকে নসিহত করা এবং মন্দকর্মে তাদের বিরোধিতা করা। বিধি মোতাবেক তাদের মন্দকর্মের বিরোধিতা করা ওয়াজিব। [ইমাম সালিহ আল-ফাওযান কৃত আল-ইরশাদ ইলা সাহীহিল ই'তিক্বাদ; খণ্ড: ২: পৃষ্ঠা: ২৮৯-২৯০]
অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত আলোচনা এখানেই সমাপ্ত।

📘 তাগুত বিষয়ে বিস্তারিত > 📄 তাগুতকে অস্বীকার করা ওয়াজিব হওয়ার দলিল

📄 তাগুতকে অস্বীকার করা ওয়াজিব হওয়ার দলিল


মূলপাঠ: এর দলিল-মহান আল্লাহর বাণী, 'দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হেদায়েত সুস্পষ্ট হয়ে গেছে গোমরাহি হতে। সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনল, সে অবশ্যই দৃঢ়তর রজ্জু (ইসলাম) ধারণ করল, যা ছিন্ন হওয়ার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।' (সুরা বাকারা: ২৫৬)
ব্যাখ্যা: তাগুতকে অস্বীকার করা, তাগুতের সকল প্রকার ও শ্রেণিকে অস্বীকার করা এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনা যে ওয়াজিব, তার দলিল মহান আল্লাহর এই বাণী, 'দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।' এই বাক্য ভালোভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি। দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই। এর মানে এই দ্বীন জবরদস্তির প্রয়োজনমুক্ত। কারণ এর নিদর্শনগুলো প্রকাশ্য, সুস্পষ্ট। বিধায় এ দ্বীনে বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন পড়ে না। এর মানে এই নয় যে, মানুষেরা তাদের নিজ নিজ ধর্মে স্বাধীন। যেমনটি বুঝেছে কিছু অজ্ঞ লোক। তারা বলে, 'দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।' এর মানে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্মে স্বাধীন।
আয়াতের অর্থ এটা নয়। বরং আয়াতের মানে, এই দ্বীন বাধ্যবাধকতার প্রয়োজনমুক্ত। কেন? কারণ এর নিদর্শনাবলি সুস্পষ্ট। যার কাছে এই দ্বীন পৌঁছেছে, তার কাছে নিদর্শনাবলি স্পষ্ট হয়ে গেছে। বাধ্যবাধকতার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই দ্বীনের প্রতি আত্মসমর্পণ করা, এই দ্বীনকে মেনে নেওয়া তার জন্য ওয়াজিব। কেননা যে মানুষের কাছেই এ দ্বীন পৌঁছার পর তা পরিত্যক্ত হয়েছে, তা কেবল তার বিমুখতার দরুনই হয়েছে। ইসলাম যার কাছে পৌঁছার পর বর্জিত হয়েছে, তা কেবল বিমুখ হওয়ার দরুনই হয়েছে। 'দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই' -এ কথার অর্থ এটাই।
'নিশ্চয় হেদায়েত সুস্পষ্ট হয়ে গেছে গোমরাহি থেকে'-এ কথাটি পূর্বের বাক্যকে ব্যাখ্যা করছে। এই বাক্যটি যেন কারণ বর্ণনা করছে। 'দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।' কারণ কী? কারণ 'হেদায়েত সুস্পষ্ট হয়ে গেছে গোমরাহি থেকে।' এ দ্বীনের সরল পথ সুস্পষ্ট, এর বিপরীতে যা কিছু আছে, তার সবই ভ্রষ্টতা। তাই সবার ওপর এ দ্বীনের অনুসরণ করা ওয়াজিব। এটা সুস্পষ্ট দৃঢ়মূল দ্বীন। সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনল।'
এখানে দুটি শর্তের কথা বলা হয়েছে; আয়াতে উদ্ধৃত 'এ' শব্দটি শর্তবাচক। তাহলে শর্ত মোট দুটি। 'যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনল, সে অবশ্যই দৃঢ়তর রজ্জু ধারণ করল।' এর মানে যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করেনি, সে দৃঢ়তর রজ্জু ধারণ করেনি। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ইমান আনেনি, সে দৃঢ়তর রজ্জু ধারণ করেনি। এটাই লা ইলাহা ইল্লাল্লার অর্থ নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিক,⁶ যে বিষয়ে ইতঃপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

টিকাঃ
⁶ তাওহীদী কালিমার দুটি অংশ রয়েছে। একটি নেতিবাচক কোনো সত্য ইলাহ নেই (লা ইলাহা), আরেকটি ইতিবাচক কেবল আল্লাহই সত্য ইলাহ (ইল্লাল্লাহ)। সুরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতেও এ দুটি দিকের উল্লেখ রয়েছে। তাগুতকে অস্বীকার করা নেতিবাচক দিক, আর আল্লাহর প্রতি ইমান আনা ইতিবাচক দিক। অনুবাদক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00