📘 তাগুত বিষয়ে বিস্তারিত > 📄 অনুবাদকের কথা

📄 অনুবাদকের কথা


'তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুতকে পরিহার করো'- একটি মহান নির্দেশ, সকল নবি-রসুলের দাওয়াত (সুরা নাহল: ৩৬)। এ থেকেই উপলব্ধ হয় এ নির্দেশের কী গাম্ভীর্য, কী মহত্ত্ব। উপরন্তু তাগুতকে পরিহার না করলে ব্যক্তির ইসলামই সাব্যস্ত হয় না (সুরা বাকারা: ২৫৬)। এ থেকে প্রতিভাত হয়, তাগুতকে পরিহার করা মুমিনের জীবনে কত গুরুত্ব রাখে। তাগুতকে বর্জন করা আমাদের প্রধান কর্তব্য। এজন্য তাগুতের পরিচয় জানাও অবশ্যপালনীয় ফরজ। কারণ তাগুত বলতে কী বোঝায়, তা না জানলে আমরা তাগুতকে পরিহার করব কীভাবে?
এ বিষয়ে যুগে যুগে তাওহিদপন্থি উলামারা আলোচনা করেছেন। আমরাও এ বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় লেখার সিদ্ধান্ত নিই। এরই ভিত্তিতে আমরা আল্লামাহ সুলাইমান আর-রুহাইলী বিরচিত শারহু সালাসাতিল উসুল (তিনটি মূলনীতির ব্যাখ্যা)' গ্রন্থ থেকে তাগুত বিষয়ক একটি চমৎকার আলোচনা অনুবাদ করেছি। সালাফী কমিউনিটিতে শাইখ খুবই পরিচিত আলিম। তবুও বলে রাখি, তিনি মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উসুলুল ফিকহ ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র প্রফেসর, মসজিদে নববীর মুদারিস এবং মসজিদে কুবার সম্মাননীয় ইমাম ও খতিব। আকীদাহ বিষয়েও তিনি যথেষ্ট অভিজ্ঞ এবং আক্বীদাহর ক্ষেত্রে তাঁর খেদমতও প্রশংসনীয়
শাইখুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর 'সালাসাতুল উসুল (তিনটি মূলনীতি)' গ্রন্থে তাগুত নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমরা তাঁর কথাগুলো 'মূলপাঠ' উপশিরোনামে উল্লেখ করেছি। আর শাইখ রুহাইলীর কথাগুলো 'ব্যাখ্যা' উপশিরোনামে উল্লেখ করেছি। পাঠক মহোদয় কী বিষয়ের আলোচনা পড়তে যাচ্ছেন, তা যেন আগাম বুঝতে পারেন, সেজন্য আমরা তৃতীয় বন্ধনীযোগে আলোচনার বিষয়বস্তু শিরোনাম আকারে উল্লেখ করেছি।¹
আরেকটি কথা না বললেই নয়, শাইখ (হাফিযাহুল্লাহ) মসজিদে নববীতে এই ব্যাখ্যা করেছেন। পুরো ব্যাখ্যা ট্রান্সক্রাইব করেছেন আরব সালাফী বোনদের একটি গ্রুপ, আল্লাহ তাঁদের উত্তম পারিতোষিক দিন। সবশেষে দোয়া করি, আল্লাহ যেন মূল রচয়িতা, ভাষ্যকার, অনুলেখক, অনুবাদক, প্রকাশক-সহ নিবন্ধ সংশ্লিষ্ট সবাইকে তাঁর রহমতের বারিধারায় সিঞ্চিত করেন এবং পাঠকদেরকেও এ নিবন্ধ থেকে উপকৃত করেন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

📘 তাগুত বিষয়ে বিস্তারিত > 📄 সবচেয়ে বড়ো ফরজঃ তাগুতকে অস্বীকার করা

📄 সবচেয়ে বড়ো ফরজঃ তাগুতকে অস্বীকার করা


মূলপাঠ: শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, "সকল জাতির কাছে নুহ থেকে নিয়ে মুহাম্মাদ তা অবধি যত রাসুলকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন, তাদের সবাইকে এক আল্লাহর ইবাদত করার আদেশ দিয়েছেন এবং তাগুতের ইবাদত থেকে নিষেধ করেছেন। এর দলিল-মহান আল্লাহর বাণী, 'আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছেই রাসুল প্রেরণ করেছি (এই ঘোষণা দিয়ে যে), তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুতকে পরিহার করো (অথবা তা থেকে বেঁচে থাক)।' (সুরা নাহল: ৩৬) আল্লাহ সকল বান্দার ওপর তাগুতকে অস্বীকার করা এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনা ফরজ করেছেন।"
ব্যাখ্যা: শাইখ সুলাইমান আর-রুহাইলী (হাফিযাহুল্লাহ) বলেছেন, এ বিষয়ে নবিগণের মাঝে কোনো ভিন্নতা নেই, ভিন্নতা নেই বিভিন্ন শরিয়তেও। প্রত্যেক নবিকেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাগুতকে অস্বীকার করতে এবং মহান আল্লাহর প্রতি ইমান আনতে। 'মহান আল্লাহ বান্দাদের ওপর ফরজ করেছেন।' অর্থাৎ সকল বান্দার ওপর ফরজ করেছেন। এখানে আল-ইবাদ ( العباد )' শব্দের 'আলিফ-লাম (১)' জাতিবাচক অর্থ জ্ঞাপন করে, যা শামিল করে সকল বান্দাকে; মহান আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করার সময় থেকে নিয়ে আল্লাহ কর্তৃক পৃথিবী ও ভূপৃষ্ঠের ওপরে অবস্থিত সবকিছুর উত্তরাধিকারী হওয়া পর্যন্ত (অর্থাৎ কেয়ামত পর্যন্ত আসতে থাকা সকল বান্দা এই মহান নির্দেশের আওতাভুক্ত)। কোনো একজন বান্দাও এর বাইরে নয়। তিনি সকল বান্দার ওপর তাগুতকে অস্বীকার করা এবং মহান আল্লাহর প্রতি ইমান আনা ফরজ করেছেন।
তোমরা দেখেছ, লেখক আল্লাহর প্রতি ইমান আনা' কথাটির পূর্বে তাগুতকে অস্বীকার করা' দিয়ে শুরু করেছেন। তিনি এটা করেছেন শরিয়তের দলিল ও প্রজ্ঞার সাথে সামঞ্জস্য রাখার জন্য। দলিল: মহান আল্লাহ বলেছেন
لا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ۚ فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
"দ্বীনের মধ্যে জোরজবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হেদায়েত সুস্পষ্ট হয়ে গেছে গোমরাহি হতে। সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনল, সে অবশ্যই দৃঢ়তর রজ্জু ধারণ করল, যা ছিন্ন হওয়ার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। [সুরা বাকারা: ২৫৬]
মহান আল্লাহ বলছেন, 'সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল।' তিনি 'তাগুতকে অস্বীকার করা' দিয়ে শুরু করলেন। এরপর বললেন, 'এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনল।' শাইখও অনুরূপ কাজ করেছেন। তিনি 'আল্লাহর প্রতি ইমান' কথাটির আগে 'তাগুতকে অস্বীকার করা' দিয়ে শুরু করেছেন।
প্রজ্ঞা: তাগুতকে অস্বীকার করলে অন্তরকে খালি করা হয়, যাবতীয় মন্দ বিষয়ের কালিমা (কলঙ্ক) থেকে নিষ্কলুষ করা হয়। আর আল্লাহর প্রতি ইমান আনলে অন্তরকে সজ্জিত করা হয়। শাইخ সজ্জিতকরণের পূর্বে (অন্তরকে) মুক্তকরণ দিয়ে আরম্ভ করেছেন। আর এ বিষয়টি সুবিদিত যে, তাগুতকে অস্বীকার না করলে আল্লাহর প্রতি আনিত ইমান সঠিক হয় না। যখন যাবতীয় শির্কের কালিমা থেকে অন্তর পরিষ্কার ও নিষ্কলুষ হবে, তখন তাওহীদ সঠিক হবে।
সুতরাং শাইখ এই মহান বিষয়ে শরিয়তের দলিল ও প্রজ্ঞার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই আল্লাহর প্রতি ইমান আনার' পূর্বে 'তাগুতকে অস্বীকার করা' দিয়ে শুরু করেছেন। সকল শরিয়ত যে বিষয়ের ওপর অভিন্ন ছিল, সে বিবরণ দেওয়ার জন্য শাইখ এই আলোচনা উল্লেখ করেছেন। এরপর শাইখ তাগুতের অর্থ বর্ণনা করেছেন, যাকে অস্বীকার করা ওয়াজিব।

টিকাঃ
¹ পিডিএফ আকারে সংকলনের কারনে তৃতীয় বন্ধনীগুলোর পরিবর্তে বোল্ড ও ফন্ট সাইজ পরিবর্তন করা হয়েছে। সংকলক

📘 তাগুত বিষয়ে বিস্তারিত > 📄 তাগুত বলতে কী বোঝায়?

📄 তাগুত বলতে কী বোঝায়?


মূলপাঠ: ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'যে উপাস্য, বা অনুসৃত নেতা, বা মান্যবর কারও মাধ্যমে বান্দা নিজের সীমানা লঙ্ঘন করে, তাকেই তাগুত বলা হয়।'
ব্যাখ্যা: যেন শাইখ জিজ্ঞাসিত হয়েছেন, "বুঝলাম, আমার ওপর তাগুতকে অস্বীকার করা ফরজ। কিন্তু তাগুত বলতে কী বোঝায়?" তখন শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত বক্তব্য দিয়ে তাগুতের অর্থ উল্লেখ করেছেন,
যা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বর্ণনা করেছেন তদীয় ই'লামুল মুওয়াকক্লি'ঈন গ্রন্থে।
আরবি ভাষায় তাগুত শব্দটি 'তুগইয়ান' থেকে গৃহীত হয়েছে। তুগইয়ান মানে সীমা অতিক্রম করা। যখন কোনোকিছু তদীয় সীমা অতিক্রম করে, তখন বলা হয়, 'ত্বাগা, অর্থাৎ সে বেশি বা অতিরিক্ত করেছে (طغى أي : زاد (। তাগুতের মৌলিক অর্থ হলো কতিপয় উলামা তাগুতকে দুটি ওয়া' দিয়ে তাগূত পড়েছেন- কথকের এমন বলা যে, 'অমুক ব্যক্তি তুগইয়ান করেছে,' যখন কোনো ব্যক্তি তদীয় ক্ষমতা অতিক্রম করে সীমালঙ্ঘন করে, তখন এরূপ বলা হয়
طغى فلان يطغوا إذا عدا قدره فتجاوز حده
এ বিষয়টি ইমাম ইবনু জারীর আত-তাবারী তদীয় তাফসীরে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং আভিধানিক অর্থে তাণ্ডত শব্দটি 'তুগইয়ান' থেকে এসেছে, যার অর্থ সীমালঙ্ঘন করা।
পক্ষান্তরে শরয়ী অর্থে, তাগুত বলতে কী বোঝায়? তাগুত বলতে আসলে কী বোঝায়, সে ব্যাপারে আমাদের উলামা তথা আহলুস সুন্নাহর উলামাদের বক্তব্যে বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সমস্ত বক্তব্যকে ধারণ করে, এমন সংজ্ঞা অনুযায়ী যেকোনো ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয়, সে-ই তাগুতা' ইমাম মুজাহিদ ইবনু জাবর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, "তাগুত মানে মানুষের সুরতে বিদ্যমান শয়তান, যার কাছে লোকেরা বিচার-ফায়সালা করার জন্য যায়, আর সে হয় তাদের নেতা।" মুজাহিদ বলছেন, শয়তান মানুষের কাছে আসে মানবীয় আকৃতিতে, এসে হিকমাহ (প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বা কাজ) প্রকাশ করে; তখন মানুষ মহান আল্লাহর শরিয়ত বাদ দিয়ে তার কাছে যায় বিচার-ফায়সালার জন্য।
ইবনুল আরাবী আল-মালিকী তদীয় আহকামুল কুরআন' গ্রন্থে বলেছেন, "মালিক- অর্থাৎ ইমাম চতুষ্টয়ের একজন, ইমামু দারিল হিজরাহ তথা মদিনার ইমাম বলেছেন, মূর্তি, বা গণক, বা জাদুকর প্রভৃতি যারই ইবাদত করা হয় আল্লাহ ব্যতীত, সেটাই তাগুত; কিংবা যে অবস্থাতেই হোক, যার মাঝে শির্ক কাজ করে সেটাই তাগুতা" [ইবনুল আরাবী কৃত আহকামুল কুরআন, ১/৫৭৮] ইমাম মালিকের বক্তব্যটি গভীরভাবে লক্ষ করুন। তিনি বলেছেন, 'যারই ইবাদত করা হয় আল্লাহ ব্যতীত।' এটা জাতিবাচক (ব্যাপক) অর্থ প্রকাশ করে।
তিনি মূর্তির উদাহরণ দিয়েছেন। মূর্তির ইবাদত করা হয় এবং তার কাছে নৈকট্য কামনা করা হয়।
'অথবা গণক': গণক অদৃশ্যের যে জ্ঞান দাবি করে, সেক্ষেত্রে মানুষ তাকে সত্যায়ন করে। যদিও তারা তার ইবাদত করে না, যেমনভাবে তারা প্রতিমার ইবাদত করে থাকে। কিন্তু তারা অদৃশ্যের জ্ঞান দাবিকরণের ক্ষেত্রে তাকে সত্যায়ন করে। যারা (সরাসরি) তার ইবাদত করে, তারা এক্ষেত্রে এদের মতোই। 'কিংবা জাদুকর': জাদুকর কাফির। তার কুফরির দরুন জিনেরা তার কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে, কতিপয় মানুষও তার কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে।
তিনি বলেছেন, 'কিংবা যে অবস্থাতেই হোক, যার মাঝে শির্ক কাজ করে সেটাই তাগুতা' ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) এটা বলেছেন এ বিষয় জানানোর জন্য যে, শির্ক স্রেফ এ তিনটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। ইমাম ইবনু জারীর আত-তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, "মুফাসসিরগণ তাগুতের অর্থ নিয়ে মতভিন্নতা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, তাগুত মানে শয়তান। কেউ বলেছেন, জাদুকরই তাগুতা' [তাফসীরে তাবারী, ৪/৫৫৫]
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাগুতের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, "তাগুত একটি জাতিবাচক বিশেষ্য। আল্লাহকে বাদ দিয়ে যতকিছুর ইবাদত করা হয়, তারা সবাই তাগুত। শয়তান, প্রতিমা, গণক, দিরহাম, দিনার সবকিছুই তাগুতের আওতাভুক্ত হবে।” [মাজমূ'উ ফাতাওয়া, ১৬/৫৬৬] তোমরা জান, বিভিন্ন ধরনের ইবাদতের হুকুম বিভিন্ন রকম হবে: যেমনটি শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বিরচিত মহান ফলপ্রসূ গ্রন্থ 'কিতাবুত তাওহীদে' সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ইমাম আব্দুল্লাহ আবা বুতাইন বলেছেন, "আল্লাহ ব্যতীত যতকিছুর ইবাদত করা হয়, সবই তাগুত²। ভ্রষ্টতার যত নেতা আছে, যারা বাতিলের দিকে মানুষকে আহ্বান করে এবং বাতিলকে সুশোভিত করে, তারা সবাই তাগুত।" তদ্রুপ মানুষ নিজেদের মধ্যে আল্লাহ ও তদীয় রসুলের বিধান-বিরোধী যেসব জাহেলি বিধিবিধান স্থাপন করে, সেগুলোর সবই তাগুত। অনুরূপভাবে গণক, জাদুকর এবং মূর্তির রক্ষীবাহিনীর সবাই তাগুতা' [মাজমূ'আতুত তাওহীদ, পৃষ্ঠা: ৫০০]
সুতরাং আল্লাহ ব্যতীত যতকিছুর ইবাদত করা হয়, তার সবই তাগুত। আর যে বক্তব্য উক্ত বিষয়কে সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করেছে, তা শাইখুল ইসলাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ)'র বক্তব্য; যা শাইখ উল্লেখ করেছেন। 'যার মাধ্যমে বান্দা নিজের সীমানা লঙ্ঘন করে।' এ কথা কোথা থেকে গৃহীত হয়েছে? আভিধানিক অর্থ থেকে। যে উপাস্য, বা অনুসৃত নেতা, বা মান্যবর কারও মাধ্যমে বান্দা নিজের সীমানা লঙ্ঘন করে, তাকেই তাগুত বলা হয়।' সংজ্ঞায় উল্লিখিত যার মাধ্যমে বান্দা নিজের সীমানা লঙ্ঘন করে'- এর মানে, শরিয়ত কারও জন্য যে সীমা নির্ধারণ করেছে এবং তাকে যে মর্যাদা দিয়েছে, সেক্ষেত্রে বান্দা সীমালঙ্ঘন করে (অর্থাৎ যার ক্ষেত্রে এরূপ সীমালঙ্ঘন হয় সে তাগুত)। মহান আল্লাহ বান্দাদের জন্য অবস্থান বা মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন, তাদের জন্য সীমানা নির্ধারিত করেছেন। যে ব্যক্তি উক্ত সীমা অতিক্রম ও লঙ্ঘন করেছে, সে তাগুত। যেমন আল্লাহ সবাইকে বান্দা বানিয়েছেন, মাবুদ বা উপাস্য বানাননি। সকল মাখলুককে বান্দা বানিয়েছেন, উপাস্য বানাননি। সুতরাং যে ব্যক্তি উক্ত সীমানা লঙ্ঘন করে নিজেকে মাবুদ বানিয়ে নেয়, সে তাগুত।
তদ্রুপ আল্লাহ সকল মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের অনুসারী বানিয়েছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর দ্বীনের অনুসারী থেকে আল্লাহর দ্বীনকেই তার অনুগামী বানিয়ে নেয়, সে আসলে নিজেকে তাগুত বানিয়ে নেয়। অর্থাৎ যে দ্বীনের অনুসারী থাকে, তার ব্যাপারে আল্লাহর দ্বীন দিয়ে ফায়সালা করা হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি এ অবস্থান থেকে নিজেকে এমন অবস্থানে পরিবর্তন করে নেয় যে, আল্লাহর দ্বীনই তার অনুগামী হবে, তাহলে সে তাগুত। কেননা সে তদীয় সীমা অতিক্রম করেছে।
সংজ্ঞায় উল্লিখিত মাবুদ মানে, "যার জন্য কোনো একটি ইবাদত ধার্য করা হয়েছে, আর সে ব্যাপারটি জেনেছে এবং এতে সম্মত হয়েছে; যদি আসলেই জানা ও সম্মত হওয়ার সামর্থ্য তার থাকে তবেই।'
আমি বিষয়টি ব্যাখ্যা করছি। তোমরা ভালোভাবে খেয়াল করো। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিঃশর্তভাবে আল্লাহ ব্যতীত যার ইবাদত করা হয়, সে-ই তাগুত নয়। বরং তাগুত সে, আল্লাহ ব্যতীত যার ইবাদত করা হয়, আর সে ব্যাপারটি জানে এবং এতে সম্মত হয়; যদি আসলেই জানা ও সম্মত হওয়ার সামর্থ্য তার থাকে তবেই। অর্থাৎ সে যদি জানা ও সন্তোষ প্রকাশের ক্ষমতাসম্পন্ন হয় তবেই। সুতরাং যার জন্য কোনো একটি ইবাদত ধার্য করা হয়। উদাহরণস্বরূপ কারও কাছে প্রার্থনা করা হলো, কিংবা কারও উদ্দেশ্যে জবেহ করা হলো, আর সে বিষয়টি জানে, এতে সন্তুষ্টও থাকে, এবং তার পক্ষে সন্তুষ্ট হওয়া সম্ভব, তাহলে সে তাগুত বিবেচিত হবে। সুতরাং মুসলিম দেশগুলোতে যেসব শাইখরা বিস্তার লাভ করেছে, যাদের উদ্দেশ্যে জবেহ করা হয়, যাদের মাধ্যমে বরকত লাভ করা হয়, যাদের কাছে কুরবানি পেশ করা হয়, আর এতে তারা খুশি হয়; অনুরূপভাবে তাদের কাছে ফরিয়াদ করা হয়, আর তারা এতে উৎসাহ দেয়, তারা সবাই তাগুত। কেননা তাদের জ্ঞাতসারে ও সন্তোষে আল্লাহকে ব্যতীত তাদের ইবাদত করা হয়েছে।
আমরা বলেছি, 'আর সে ব্যাপারটি জেনেছে।' যাতে করে সেই ব্যক্তিকে তাগুতের সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া যায়, যার জন্য কোনো একটি ইবাদত ধার্য করা হয়েছে, অথচ সে তা জানে না। যেমন আল্লাহর নবি ঈসা (আলাইহিস সালাম)। ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর তিরোধানের পর খ্রিষ্টানরা তার জন্য নানা ধরনের ইবাদত সাব্যস্ত করেছিল এবং তাঁকে আল্লাহর পুত্র' আখ্যা দিয়েছিল। তারা যা বলে, তা থেকে আল্লাহ বহু উর্ধ্বে রয়েছেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) জানতে পারেননি। তিনি যখন তাদের সাথে ছিলেন, তখন তিনি তাদেরকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করতেন এবং শির্ক থেকে নিষেধ করতেন। যখন আল্লাহ তাঁকে উঠিয়ে নিলেন, খ্রিষ্টানরা তাঁকে উপাস্য নির্ধারণ করল। তাঁর জন্য ধার্য করল ইবাদত। শেষযুগে তিনি যখন (দুনিয়ায়) অবতরণ করবেন, তখন তিনি এতে সন্তুষ্ট হবেন না। তিনি এ বিষয়ে জানতে পারেননি, এবং (পরবর্তীতে) এতে সন্তুষ্টও হবেন না। এজন্য তিনি যখন অবতরণ করবেন, তখন ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন এবং মুহাম্মাদ এর শরিয়ত দিয়ে ফায়সালা করবেন।
তাহলে কিছু তালিবুল ইলম যেমন বুঝেছে, তদনুযায়ী ঈসা (আলাইহিস সালাম) কে কি তাগুত বলা শুদ্ধ হবে? আমরা বলব, না; ঈসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর নবি। হ্যাঁ, তাঁর জন্য কিছু ইবাদত ধার্য করা হয়েছে বটে। কিন্তু এ বিষয়টি তিনি জানতে পারেননি এবং তিনি এতে সন্তুষ্টও নন।
আমরা বলেছি, 'এবং এতে সম্মত হয়েছে।' যাতে করে সেই ব্যক্তিকে তাগুতের সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া যায়, যে বিষয়টি জেনেছে, কিন্তু তাতে সম্মত হয়নি। সে মানুষের মাধ্যমে পরীক্ষায় পতিত হয়েছে। মানুষ তার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছে, বিভিন্ন ইবাদত তার জন্য ধার্য করেছে, কিন্তু সে এতে সম্মত বা সন্তুষ্ট হয়নি। এ ব্যক্তিকে তাগুত বলা হবে না। যেমন একটি সম্প্রদায় আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)'র যুগে তাঁর ব্যাপারে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছিল, তাঁকে রব নির্ধারণ করেছিল এবং তাঁর জন্য ইবাদত ধার্য করেছিল। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন, তাঁকে সন্তুষ্ট করুন এবং জান্নাতে তাঁর মর্যাদা উন্নত করুন। তিনি যখন বিষয়টি জানতে পারেন, এতে সন্তুষ্ট হননি। বরং তিনি ক্রোধান্বিত হয়েছেন এবং তাদের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'যখন আমি এহেন অন্যায় কাজ দেখলাম, তখন আগুন প্রজ্বলিত করলাম এবং কুনবুরকে ডাকলাম।' [যাহাবী কৃত আল-আরশ, ১/১২৩]
কুনবুর ছিল তাঁর গোলাম; কুনবুর বা কানবার দুভাবেই পড়া যায়। তিনি বলেছেন, 'যখন আমি এরূপ অন্যায় কর্ম দেখলাম।' কারণ তারা তাঁর জন্য ইবাদত ধার্য করেছিল। তিনি বলেছেন, 'আমি আগুন প্রজ্বলিত করলাম।" যাতে করে তিনি তাদেরকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে পারেন। 'এবং কুনবুরকে ডাকলাম।' যাতে সে আগুন প্রজ্বলিত করে এবং ওইসব ভ্রষ্টদের ধরে নিয়ে আসে। কিন্তু তিনি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এ কাজ করেননি। কারণ আগুনের রব ব্যতীত অন্য কেউ আগুন দিয়ে শাস্তি দিতে পারে না।³ আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এতে সম্মত হননি।
অনুরূপভাবে বর্তমান সময়েও কতিপয় ভ্রষ্ট আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর সম্মাননীয় পরিবারের জন্য ইবাদত ধার্য করে। কিন্তু আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর পরিবার তা জানেন না। তাহলে আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কে কি তাগুত বলা যাবে? কক্ষনো না, বরং তিনি আল্লাহর রসুল ﷺ এর একজন মহান সাহাবী, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীদের অন্যতম। সুতরাং আমরা বলব, 'যে বিষয়টি জেনেছে এবং তাতে সম্মত হয়েছে।'
আমরা বলেছি, 'যদি আসলেই জানা ও সম্মত হওয়ার সামর্থ্য তার থাকে তবেই।' এর মানে কী? এর মানে, তার পক্ষে জানা ও সম্মত হওয়া সম্ভবপর হতে হবে। এটা একটা শর্ত। যদি কারও জানা ও সম্মত হওয়ার মতো সামর্থ্য না থাকে (তাহলে তাকে তাগুত বলা হবে), যেমন মূর্তি বা প্রতিমা। মূর্তির জন্য জানা ও তাতে সম্মত হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে আমরা কি বলব, মূর্তি তাগুত নয়, কারণ সে জানে না? উত্তর: না; বরং মূর্তিও তাগুত।
সুতরাং আমরা যখন বলব, 'সে বিষয়টি জানে এবং এতে সম্মত হয়,' তখন সেটাকে এ কথার সাথে সীমাবদ্ধ করে দিতে হবে যে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত করা হয়, এবং তার পক্ষে বিষয়টি জানা ও সম্মত হওয়া সম্ভব থাকে। পক্ষান্তরে যার পক্ষে বিষয়টি জানা সম্ভব নয় যেমন মূর্তি বা প্রতিমা এবং সন্তুষ্ট হওয়াও সম্ভব নয়, সে তাগুত। এরকম শর্ত আরোপ করা হবে না যে, অবশ্যই জানতে হবে এবং এতে সম্মত হতে হবে। যেমন কেউ অগ্নির উপাসনা করল। আগুন তার উপাসকদের উপাসনা সম্পর্কে কিছুই জানে না, আবার সে এতে সম্মতও নয়। এক্ষেত্রে আমরা কি বলব, আগুনকে তাগুত বলা যাবে না? আমরা বলব, না; বরং আগুনকে তাগুত বলা হবে। কেননা আমাদের জানামতে আগুনের পক্ষে জানা এবং সম্মত হওয়া সম্ভব নয়।
তদ্রুপ কিছু মানুষ গাছের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ইবাদত ধার্য করে। কিছু মুসলিম দেশে মুসলিমরা কতিপয় গাছকে পবিত্র মনে করে। বলে, এটা বরকতময় গাছ। তারা এসব গাছে ফিতা, বস্ত্র ইত্যাদি বেঁধে রাখে। কোনো মহিলার যদি সন্তানলাভের ইচ্ছা করে, তাহলে সে এরকম গাছের নিচে এসে ঘুমিয়ে নেয়, কিংবা গাছের নিচে কোনোকিছু সম্পাদন করে। এ জাতীয় কাজ সেসব গাছের উদ্দেশ্যে ইবাদত ধার্য করার নামান্তর। তাহলে আমরা কি বলব, এসব গাছকে তাগুত বলা যাবে না, কারণ এরা জানে না? আমরা বলব, না; বরং এগুলোকে তাগুত বলা হবে। সুতরাং আমরা এটা বুঝব এবং এভাবে অর্থ করব।
শাইখুল ইসলাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) তাগুতের সংজ্ঞায় বলেছেন, 'কিংবা অনুসৃত নেতা।' অর্থাৎ কুফর ও ভ্রষ্টতার ক্ষেত্রে যার অনুসরণ করা হয়। যেমন মন্দ উলামা, যারা মানুষকে কুফরের দিকে আহ্বান করে, শির্কি কর্মকাণ্ডের দিকে ডাকে। মানুষকে বলে, 'তোমরা ওলি-আউলিয়াদের উদ্দেশ্যে জবেহ করো, এটা তোমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করবে। ওয়াহাবীদের বর্জন করো, এরা ওলি-আউলিয়াদের ঘৃণা করে।' তারা জুম্মার খুতবা দেয়, আর লোকদেরকে আল্লাহর প্রতি কুফর করতে উৎসাহিত করে। তারা একটি মহান সালাত-সালাতুল জুমু'আহ-আদায় করে, আর এর মধ্যে সন্নিবেশিত করে শির্ক-কুফরের নির্দেশনা। যারা তাওহীদের আদেশ দেয়, তাদের নিন্দা-সমালোচনা করে। এরা তাগুত, জনমানুষ তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, "তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পণ্ডিত ও সন্ন্যাসীদের রব বানিয়ে নিয়েছে।" [সুরা তাওবাহ: ৩১]
'কিংবা মান্যবর কেউ': মান্যবর বলতে তাকে বোঝায়, ইচ্ছাকৃতভাবে হারামকে হালাল করা কিংবা হারামকে হালাল করার ক্ষেত্রে, যার আনুগত্য করা হয়। তোমরা ভালোভাবে খেয়াল করো। যারা হারামকে হালাল করে, আর হালালকে হারাম করে, তারা দু ধরনের হয়ে থাকে। যথা:
এক. সে জানে, এটা হারাম। কিন্তু সে এটাকে হালাল করে। জানে, এটা হারাম। কিন্তু মানুষকে বলে, এটা হালাল। যেমন কিছু লোক আছে, যারা জানে, মীলাদ পালন করা বিদ'আত, হারাম। কিন্তু তারা মানুষকে বলে,এটা হালাল। কেননা তারা (কথকেরা) মীলাদের পরিবেশেই বসবাস করে। থাকে ধনী-ফকিরদের মাঝে, যারা কিনা মুসলিম দরিদ্রদের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। মীলাদের দিন তারা শাইখের উদ্দেশ্যে সম্পদ পেশ করে, আর সে লোকদের বলে, এটা হালাল। অথচ সে বিশ্বাস করে এবং জানে, এটা হারাম।
দুই. হালালকে হারাম করে এবং বলে, এটা হারাম। অথচ সে জানে এবং বিশ্বাস করে, এটা হালাল। এ ব্যক্তি তাগুত।
কিন্তু সাবধান! উলামাগণ বলেন, তাগুত মানেই কেউ কাফির নয়। কাউকে তাগুত বলার মানেও এ নয় যে, সে কাফির। বরং তার অবস্থাভেদে যুক্ত হবে তার হুকুম। এ বিষয়ে ভালোভাবে খেয়াল রাখা আবশ্যক। তার অবস্থা অনুসারে তাকে হুকুম দেওয়া হবে।
**কীভাবে সম্পন্ন হবে তাগুতের প্রতি অস্বীকার?**
(এ আলোচনা অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত)
আমরা তাগুতের পরিচয় জানলাম। এখন আমাদের জানা দরকার, তাগুতকে অস্বীকার করার পদ্ধতি কী। আমরা ঠিক কীভাবে তাগুতকে অস্বীকার করব? শাইখুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) এ বিষয়ে বলেছেন, "তাগুতকে অস্বীকারের স্বরূপ হলো- তুমি গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের) ইবাদত করাকে বাতিল হিসেবে বিশ্বাস করবে, গাইরুল্লাহর ইবাদতকে বর্জন ও ঘৃণা করবে, গাইরুল্লাহর ইবাদতকারী মুশরিকদের কাফির বলবে এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখবে (অর্থাৎ তাদেরকে শত্রু গণ্য করবে)।
পক্ষান্তরে আল্লাহর প্রতি ইমান আনয়নের অর্থ-তুমি বিশ্বাস রাখবে, কেবল এক আল্লাহই সত্য উপাস্য। সকল ইবাদতকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করবে এবং আল্লাহ ব্যতীত সমুদয় উপাস্যের ইবাদতকে নাকচ করবে (অর্থাৎ গাইরুল্লাহর ইবাদত করবে না)। একনিষ্ঠ তাওহিদবাদীদের ভালোবাসবে এবং তাদের সাথে মিত্রতা রাখবে। আর মুশরিকদের ঘৃণা করবে এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখবে।" [শাইখ সালিহ আল-ফাওযান কৃত শারহু মা'নাত তাগুত, পৃষ্ঠা: ১৬-২০; দারুল ইমাম আহমাদ (কায়রো) কর্তৃক প্রকাশিত: সন: ১৪২৭ হি/২০০৬ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
ইমাম সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেছেন, "অবশ্যই এ বিষয়গুলো থাকতে হবে। প্রথমত, তুমি জেনে নিবে, তাগুত বলতে কী বোঝায়। কারণ এটা তোমার জানা না থাকলে তাগুতকে বর্জন করা তোমার পক্ষে সম্ভব হবে না। একটি অজ্ঞাত-অজানা বিষয়কে তুমি কীভাবে বর্জন করবে?! দ্বিতীয়ত, তুমি যখন তাগুতের পরিচয় জেনে নিবে, তখন তাগুতকে বর্জন করা তোমার জন্য সহজ হয়ে যাবে (অর্থাৎ এ পর্যায়ে তাগুতকে বর্জন করতে হবে)। তৃতীয়ত, তুমি যখন তাকে বর্জন করবে, তখন অবশ্যই তার সাথে তোমাকে বৈরিতা রাখতে হবে, তাকে ও তার অনুসারীদেরকে ঘৃণা করতে হবে এবং আল্লাহর জন্য তাদের সাথে শত্রুতা রাখতে হবে।' [শারহু মা-নাত তাগুত, পৃষ্ঠা: ১৭]
ইমাম ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) আরও বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহকে এক বলে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাগুতকে অস্বীকার করেছে, তাকে অবশ্যই আল্লাহর মিত্রদের প্রতি তথা তাওহিদবাদীদের প্রতি ভালোবাসা রাখতে হবে এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। অপরপক্ষে মুশরিকদের ঘৃণা করতে হবে এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখতে হবে। কেননা আল্লাহ তাদের ঘৃণা করেন। আল্লাহ যাকে ঘৃণা করেন, তুমিও তাদের ঘৃণা করবে। কিন্তু যে বলে, আমার কেবল নিজের ওপরই অধিকার আছে। আমি কোনো মানুষের সাথে বৈরিতা রাখব না, কাউকে ঘৃণা করব না, কাউকে কাফিরও বলব না। আমরা তাকে বলব, তুমি তাগুতকে অস্বীকার করোনি। কারণ তাগুতকে অস্বীকার করলে আল্লাহর শত্রুদের ঘৃণা করা এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখা অপরিহার্য। (সুরা মুজাদালাহ: ২২)... সুতরাং যার কাছে সকল মানুষ সমান, সে তাগুতকে অস্বীকার করেনি। তাগুতকে কেবল সে-ই অস্বীকার করেছে, যে বৈরিতা ও মিত্রতা করেছে আল্লাহর জন্য, আবার ভালোবাসা ও ঘৃণাও করেছে আল্লাহর জন্য।' [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২০-২১।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, তাগুতকে অস্বীকার করতে হলে তাগুতের কর্মকে বাতিল বলে বিশ্বাস করতে হবে, তাগুতকে ঘৃণা করতে হবে এবং তাগুতের অনুসারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে হবে। আর তাগুতের অনুসারীরা যদি কাফির হয়, তাহলে তাদেরকে কাফির বলতে হবে। পক্ষান্তরে যারা কাফির নয়, তাদেরকেও ঘৃণা করতে হবে, তাদের বিরোধিতা করতে হবে; যদিও ইমানি ভ্রাতৃত্বের দরুন তাদের প্রতি অবশিষ্ট থাকবে আমাদের ভালোবাসাও। স্মর্তব্য যে, সকল তাগুত কাফির নয়, তদ্রুপ তাগুতের অনুসারী মাত্রই সে কাফির নয়। এ সম্পর্কে তাগুতের পরিচিতি-বিষয়ক আলোচনায় আমরা কিঞ্চিৎ জেনেছি। সামনে শাইখ সুলাইমানের আলোচনায় আরও জানব, ইনশাআল্লাহ।
প্রয়োজনীয় বিবেচনায় মুসলিমের ভালোবাসা ও ঘৃণা বিষয়ে একটি মৌলিক আলোচনা এখানে তুলে ধরছি।
একজন মুসলিম মানুষের সাথে কীভাবে বৈরিতা ও মিত্রতা পোষণ করবে, তার বর্ণনা কুরআন সুন্নাহয় এসেছে। বৈরিতা ও মিত্রতার ক্ষেত্রে মানুষ তিনভাগে বিভক্ত। যথা:
১ম ভাগ: যাদেরকে খাঁটি ও নিষ্কলুষভাবে ভালোবাসতে হবে, যাদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখা যাবে না। তাঁরা হলেন খাঁটি মুমিন সম্প্রদায়। যেমন: নবিগণ, সিদ্দিকগণ, শহিদগণ ও সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ। আল্লাহ বলেছেন, "যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ও আমাদের যেসব ভাই ইমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; আর যারা ইমান এনেছিল তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না: হে আমাদের প্রতিপালক, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।" (সুরা হাশর: ১০)
২য় ভাগ: যাদের প্রতি খাঁটিভাবে ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করতে হবে, যাদের প্রতি কোনো ভালোবাসা ও মিত্রতা পোষণ করা যাবে না। তারা হলো খাঁটি কাফির সম্প্রদায়। যেমন: কাফির, মুশরিক, মুনাফেক, মুরতাদ, নাস্তিক ও বিধর্মী সম্প্রদায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, "তুমি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী কোনো জাতিকে এরূপ পাবে না যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরোধিতা করে এমন ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্ব করে, যদিও তারা তাদের পিতা, বা পুত্র, কিংবা ভাই, বা জাতি-গোষ্ঠী হয়। এরাই তারা, যাদের অন্তরে আল্লাহ ইমান লিখে দিয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ (আল্লাহপ্রদত্ত সাহায্য) দ্বারা তাদের শক্তিশালী করেছেন। তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতসমূহে, যেগুলোর তলদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও সন্তুষ্ট হয়েছে আল্লাহর প্রতি। এরাই আল্লাহর দল। জেনে রেখ, নিশ্চয় আল্লাহর দলই সফলকাম।' (সুরা মুজাদালাহ: ২২)
৩য় ভাগ: যাদেরকে একদিক থেকে ভালোবাসতে হবে, আবার একদিক থেকে ঘৃণা করতে হবে, যাদের ব্যাপারে অন্তরে ভালোবাসা-ঘৃণা দুটিই একত্রিত হবে। তারা হলো পাপাচারী মুমিন ব্যক্তিবর্গ। তাদেরকে ভালোবাসতে হবে, তাদের ইমানের কারণে। আর তাদেরকে ঘৃণা করতে হবে, শির্ক-কুফরের চেয়ে নিম্নপর্যায়ের পাপাচারিতায় লিপ্ত হওয়ার কারণে। অধিকন্তু তাদের প্রতি ভালোবাসার দাবি হচ্ছে তাদেরকে নসিহত করা এবং মন্দকর্মে তাদের বিরোধিতা করা। বিধি মোতাবেক তাদের মন্দকর্মের বিরোধিতা করা ওয়াজিব। [ইমাম সালিহ আল-ফাওযান কৃত আল-ইরশাদ ইলা সাহীহিল ই'তিক্বাদ; খণ্ড: ২: পৃষ্ঠা: ২৮৯-২৯০]
অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত আলোচনা এখানেই সমাপ্ত।
**তাগুতের প্রকারভেদ; সবচেয়ে বড়ো তাগুত ইবলিস**
মূলপাঠ: তাগুতের সংখ্যা অনেক। তন্মধ্যে প্রধান তাগুত পাঁচটি। যথা: (১) ইবলিস, আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে বিতাড়িত করুন।
ব্যাখ্যা: শাইখ বলেছেন, তাগুতের সংখ্যা অনেক। হ্যাঁ, অসংখ্য। আমরা তাগুতের পরিচিতিবিষয়ক আলোচনায় শুনেছি, যার জন্যই কোনো একটি ইবাদত ধার্য করা হয়, আর সে বিষয়টি জানে, এতে সম্মত থাকে এবং জানা ও সম্মত থাকা তার জন্য সম্ভব হয়, তাহলে সে তাগুত। কিন্তু তাগুতদের কয়েকটি মৌলিক ক্ষেত্র আছে। কতিপয় ইমাম বলেছেন, তাগুত তিন প্রকার: (১) ফায়সালার ক্ষেত্রে তাগুত (২) ইবাদতের ক্ষেত্রে তাগুত (৩) আনুগত্য ও অনুসরণের ক্ষেত্রে তাgুত। যত তাগুত আছে, সবগুলোই এ তিন শ্রেণির কোনো একটির আওতাভুক্ত হবে। হয় ফায়সালার ক্ষেত্রে তাগুত, কিংবা ইবাদতের ক্ষেত্রে তাগুত, অথবা আনুগত্য ও অনুসরণের ক্ষেত্রে তাগুত।
ইমাম ইবনু জারীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, "মুফাসসিরগণ তাগুতের অর্থের ক্ষেত্রে মতভিন্নতা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, তাগুত মানে শয়তান। কেউ বলেছেন, জাদুকরই তাগুতা' [তাফসীরে তাবারী, ৪/৫৫৫] এ উদ্ধৃতি কিছুপূর্বে আলোচিত হয়েছে।
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, "আমার কাছে তাগুতের সঠিক অর্থ আল্লাহর ব্যাপারে যে বাড়াবাড়ি ধারণ করে, ফলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তার ইবাদত করা হয়; হতে পারে সে তাদের প্রতি জোর করে, যারা তার ইবাদত করে। অথবা যারা তার ইবাদত করে, তাদের পক্ষ থেকে সে আনুগত্য লাভ করে। এরূপ মাবুদ তথা উপাস্য মানুষ হোক, কিংবা শয়তান, বা মূর্তি, বা প্রতিমা, অথবা আর যা কিছুই হোক না কেন, সে-ই তাগুতা" [তাফসীরে তাবারী, ৫/৪১৯]
শাইখ বলেছেন, তন্মধ্যে প্রধান তাগুত পাঁচটি।... প্রধান ও শীর্ষস্থানীয় তাগুত পাঁচটি। অনুসন্ধান ও গবেষণার ফলে প্রতীয়মান হয়েছে, তাগুত পাঁচটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, কুরআন-সুন্নাহর এমন কোনো দলিল নেই, যা থেকে প্রতীয়মান হয়, তাগুত পাঁচটি। কিন্তু অনুসন্ধান ও গবেষণা থেকে প্রতিভাত হয়েছে, এদের সংখ্যা পাঁচ। পাঁচ তাগুতের প্রধান আবার ইবলিস। প্রধান তাগুত পাঁচটি। আর পাঁচ তাগুতের প্রধান, শীর্ষনেতা, তাগুতদের পতাকাধারী, সমস্ত তাগুতের অনুসৃত গুরু হলো ইবলিস। ইবলিস সকল তাগুতের ইমাম, নেতা। সকল তাগুত তার অনুসরণ করে। ইবলিস যাবতীয় অনিষ্টের মূল এবং সকল বিপর্যয়ের উৎস। সে অনিষ্টের দিক থেকে সবচেয়ে বড়ো তাগুত, বিপজ্জনকতার দিক থেকেও সবচেয়ে বড়ো তাগুত, এবং সীমালঙ্ঘনের দিক থেকেও সবচেয়ে ভয়াবহ তাগুত।
যখন সে আল্লাহর নির্দেশ পালন করল না, তখন আল্লাহর কাছে অবকাশ চাইল। এজন্য নয় যে, সে তওবা করবে এবং দুনিয়াতে তার সর্বশেষ অবস্থান হবে আল্লাহর আনুগত্য। বরং সে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য। قَالَ أَنظِرْنِي إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ ‎﴿١٤﴾‏ قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ ‎﴿١٥﴾‏ 'সে বলল তাহলে पुनरुत्थान দিবস পর্যন্ত আমাকে সময় দিন।' তিনি বললেন, অবশ্যই তুই অবকাশপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত (তোকে অবকাশ দেওয়া হলো)।" [সুরা আরাফ: ১৪-১৫] আল্লাহ তাকে অবকাশ দিলেন।
তখন সে বলল (যা কুরআনে এসেছে
قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ‎﴿١٦﴾‏ ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ ۖ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ ‎﴿١٧﴾‏
সে বলল যেহেতু আপনি আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন, সেহেতু আমি অবশ্যই আপনার সরল পথে মানুষদের জন্য বসে থাকব। তারপর আমি তাদের সামনে দিয়ে, তাদের পেছন দিয়ে, তাদের ডান দিয়ে, তাদের বাম দিয়ে, অবশ্যই আসব তাদের কাছে, আপনি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবেন না।" [সুরা আরাফ: ১৬-১৭]
এই ইবলিস তাগুত মহান আল্লাহর সামনে বলেছে, আপনি পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত যতদিন অবকাশ দিয়েছেন, আমি অবশ্যই বনু আদমের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব, তাদেরকে এ পথ থেকে বিচ্যুত করব। এরপর আমি তাদের সামনে দিয়ে, তাদের পেছন দিয়ে, তাদের ডান দিয়ে, তাদের বাম দিয়ে, তাদের কাছে অবশ্যই আসব। ছোটোবড়ো যে কাজই আমি করতে সক্ষম, তা আমি ছেড়ে দিব না। আপনি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবেন না। সে তাগুতদের প্রধান। তাকে তাগুত বলার দলিল- মহান আল্লাহ বলেছেন, فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ “সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনল।" [সুরা বাকারা: ২৫৬]
সাহাবী-সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণের কতিপয় বলেছেন, তাগুত মানে শয়তান। তদ্রুপ আল্লাহ বলেছেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ
যারা কিতাবের জ্ঞানের একাংশ প্রদত্ত হয়েছে, সেই লোকদের প্রতি তুমি কি লক্ষ করনি, তারা জাদু ও তাগুতের প্রতি বিশ্বাস করে?" [সুরা নিসা: ৫১] একদল মুফাসসিরের মতে আয়াতে উল্লিখিত তাগুত হলো শয়তান। মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ "আর যারা কাফির, তারা তাগুতের পথে যুদ্ধ করে।" [সুরা নিসা: ৭৬] একদল উলামার মতে এখানে উদ্ধৃত তাগুত হলো শয়তান।
**দ্বিতীয় প্রধান তাগুতঃ যার ইবাদত করা হয়, আর সে এতে সম্মত থাকে**
মূলপাঠ: (২) যার ইবাদত করা হয়, আর সে এতে সম্মত থাকে।
ব্যাখ্যা: দ্বিতীয় প্রধান তাগুত-'যার ইবাদত করা হয়, আর সে এতে সম্মত থাকে।' অর্থাৎ সে বিষয়টি জানে এবং এতে সম্মত থাকে। এ বিষয়ক আলোচনা গত হয়েছে। যখন তার ইবাদত করা হয় এবং সে এতে সম্মত হয়, তখন সে যেন ব্যক্ত করে, সে ইলাহ (উপাস্য)। সে কিন্তু নিজের ইবাদতের দিকে মানুষকে ডাকেনি।
ভালোভাবে খেয়াল করো। সে মানুষকে নিজের ইবাদত করতে বলেনি। কিন্তু যখন তার জন্য ইবাদত ধার্য করা হয়েছে, তখন সে তাতে সন্তুষ্ট হয়েছে। তার অবস্থা যেন বলছে, তোমরা আমার ইবাদত করো। সে তদীয় অবস্থার জবানে নিজের ইবাদতের দিকে মানুষকে আহ্বান করেছে (তার অবস্থা যেন বলছে, সে তার ইবাদত করতে ডাকছে)। কারণ যারা তাদের ইবাদত করতে ডাকে, তারা হয় অবস্থার মাধ্যমে ডাকে, কিংবা সরাসরি কথার মাধ্যমে ডাকে। এই দ্বিতীয় শ্রেণি যে অবস্থার জবানে মানুষকে নিজের ইবাদতের দিকে ডাকে- তাগুতদের অন্তর্ভুক্ত।
পূর্বে উদ্ধৃত যত দলিলে তাগুত' শব্দের উল্লেখ আছে, তা আলোচ্য শ্রেণিকেও শামিল করে। বুখারি-মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন, লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, কেয়ামতের দিন আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব?' একটি মহান জিজ্ঞাসা। রাসুলুল্লাহ বললেন, 'পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখতে কি তোমাদের কষ্ট হয়?' তারা বলল, 'হে আল্লাহর রসুল, না (কোনো কষ্ট হয় না)।' তিনি বললেন, 'মেঘবিহীন আকাশের সূর্য দেখতে কি তোমাদের কোনো কষ্ট হয়?' তারা বলল, 'হে আল্লাহর রসুল, না (কোনো কষ্ট হয় না)।'
তিনি বললেন, 'তোমরা অনুরূপভাবে আল্লাহকে দেখতে পাবে। কেয়ামতের দিন আল্লাহ মানবজাতিকে একত্রিত করবেন। বলবেন, যে যার ইবাদত করত, সে তারই অনুসরণ করবে। যে সূর্যের ইবাদত করত, সে সূর্যের অনুসরণ করবে। যে চন্দ্রের ইবাদত করত, সে চন্দ্রের অনুসরণ করবে। যে তাগুতদের ইবাদত করত, সে তাণ্ডতদের অনুসরণ করবে।' অর্থাৎ আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত করা হয়, আর সে এতে সম্মত থাকে। 'এরপর এই উম্মত অবশিষ্ট থাকবে, যাদের মাঝে থাকবে উম্মতের মুনাফেক সম্প্রদায়।' [সহিহ মুসলিম, ইমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: আল্লাহকে দর্শনের স্বরূপ, হা/১৮২]
এখানে (দ্বিতীয় শ্রেণির তাগুতের ব্যাপারে) দলিলগ্রহণের দিকটি হলো, নবি বলেছেন, 'যে তাণ্ডতদের ইবাদত করত, সে তাণ্ডতদের অনুসরণ করবে।' অর্থাৎ আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত করা হয়, আর সে এতে সম্মত থাকে।
**তৃতীয় প্রধান তাগুতঃ যে তার ইবাদত করতে মানুষকে আহ্বান করে**
মূলপাঠ: (৩) যে তার ইবাদত করতে মানুষকে আহ্বান করে।
ব্যাখ্যা: তৃতীয় প্রধান তাগুত'যে তার ইবাদত করতে মানুষকে আহ্বান করে।' অর্থাৎ সরাসরি কথা বলে আহ্বান করে। হয় সে নিজে করে, কিংবা অনুসারীদের মাধ্যমে করে। কিছু মানুষ আছে, যারা তাদের ইবাদত করতে মানুষকে আহ্বান করে। সে এসে বলে, আমি রসুল কে স্বপ্নে দেখেছি। তিনি আমাকে বললেন, তুমি আমার উম্মতের ওলি। সুতরাং তুমি রুগ্ন ব্যক্তিকে সুস্থ করো, আর সন্তানহীনকে সন্তান দাও। ফলে মানুষেরা তার কাছে এসে এসব প্রার্থনা করে। এ জাতীয় লোক সরাসরি নিজে কথা বলে তার ইবাদত করতে আহ্বান করে।
আবার কেউ কেউ অনুসারী বানিয়ে নেয়। যেসব অনুসারীরা তার ইবাদত করতে মানুষকে আহ্বান করে। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বলে বেড়ায়, অমুক গ্রামে একজন শাইখ' আছে, যার কাছে এক মহিলা সন্তান চেয়ে দশজন সন্তান লাভ করেছে। তার কাছে অমুক এসেছে, আর তার এসব এসব হাসিল হয়েছে। তো এই লোক তার অনুসারীদের মাধ্যমে এরকম কথা প্রচার করে। এ সরাসরি কথা বলে তার ইবাদত করতে মানুষকে আহ্বান করে। এ লোক তাগুত; কারণ সে কথা বলে মানুষকে ডেকেছে তার ইবাদত করতে।
**চতুর্থ প্রধান তাগুত-যে ইলমুল গায়েব জানার দাবি করে**
মূলপাঠ: (৪) যে ইলমুল গায়েব (অদৃশ্যের জ্ঞান) জানার দাবি করে।
ব্যাখ্যা: আমাদের অদৃশ্যে যা আছে, সেটাই ইলমুল গায়েব। উলামাদের নিকট গায়েবি ইলম দু প্রকার। যথা: ১ম প্রকার: নিরঙ্কুশ গায়েব, ২য় প্রকার: আপেক্ষিক গায়েব।
১ম প্রকার: তথা নিরঙ্কুশ গায়েব সেটা, যে বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহ একান্তই নিজের করে রেখেছেন, ফলে তা না জানতে পারে কোনো প্রেরিত রসুল, আর না জানতে পারে কোনো নৈকট্যশীল ফেরেশতা। আল্লাহ এ বিষয়ের জ্ঞান নিজের করে নিয়েছেন। গায়েবের পাঁচ চাবিকাঠিতে এ গায়েবের সন্নিবেশ ঘটেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন
إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
"কেয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই আছে, তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, মাতৃজঠরে কী আছে তা তিনিই জানেন। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে, কেউ জানে না কোন জায়গায় সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।" [সুরা লুকমান: ৩৪]
এগুলো গায়েবের চাবিকাঠি, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। যে তা জানার দাবি করে, সে তাগুত। এ পাঁচ চাবিকাঠির জ্ঞান যে জানার দাবি করে, সে তাগুত। তদ্রুপ যা মাখলুকের অদৃশ্যে রয়েছে, আর আল্লাহ তা নিজের করে রেখেছেন, এবং তা জানার কোনো নির্দেশক দলিলও আল্লাহ নির্ধারণ করেননি। অর্থাৎ কোনো শরয়ী বা সৃষ্টিগত দলিল নির্ধারণ করেননি। এ ধরনের জ্ঞানও নিরঙ্কুশ গায়েবের অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত দলিল ব্যতিরেকে কোনো ঘাটিতব্য বিষয় জানার দাবি করে, সে তাগুত। যেমন গণকরা গায়েব জানার দাবি করে। গণক কোনো নির্দেশক দলিল ব্যতিরেকেই বলে, তুমি সন্তানপ্রাপ্ত হবে, তুমি সন্তানপ্রাপ্ত হবে না, তোমার এই হবে, ওই হবে। কিংবা বলে, অমুক জায়গায় তোমার যে উট হারিয়ে গেছে, অথবা তোমার যে সম্পদ হারিয়েছে, তা অমুক জায়গায় আছে।
এগুলো সবই গায়েবের অন্তর্ভুক্ত, যার জ্ঞান মহান আল্লাহ নিজের করে রেখেছেন। হয় তা গায়েবের চাবিকাঠির অন্তর্গত হবে, অন্যথায় তা ওই জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হবে যা মাখলুকের অদৃশ্যে রয়েছে এবং তা জানার কোনো নির্দেশক দলিল আল্লাহ নির্ধারণ করেননি। শাইখ এ ধরনের গায়েব সম্পর্কেই আলোচনা করেছেন。
২য় প্রকার: আপেক্ষিক গায়েব। এ বিষয়টি বুঝে নেওয়া জরুরি। আপেক্ষিক গায়েব দু ধরনের:
এক. যা আমাদের অদৃশ্যে রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা জানার দলিল ও মাধ্যম নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি মাধ্যমগুলো জানতে পেরেছে, সে জেনেছে, এটা সংঘটিত হবে। এটা গায়েব জানার দাবি নয়। তথাপি কখনো কখনো এর ফলাফল সঠিক নাও হতে পারে। যেমন বর্তমান সময়ে এক বা দুই বছর আগেই আমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অমুক দিন সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগহণ হবে। এটা গায়েবি জ্ঞান জানার দাবি নয়। কেননা আল্লাহ সৃষ্টিগত দলিল ও নিদর্শন স্থাপন করেছেন, যার মাধ্যমে বান্দা এরকম বিষয় জানতে পারে। যে ব্যক্তি নিদর্শনের মাধ্যমে এ জাতীয় কথা বলে, সে গায়েব জানার দাবি করেনি। কিন্তু আমরা জানি, এর ফলাফল কখনো কখনো মাধ্যমমাফিক নাও হতে পারে।
দুই. যা দুর্বলতার কারণে মাখলুকের অদৃশ্যে থাকে। এটা আপেক্ষিক। হয়তো বিষয়টি আমি জানি না, কিন্তু জায়েদ ঠিকই জানে। যেমন খালেদ নামের কোনো ব্যক্তির অসুখ করেছে। আমি তা জানি না। কেননা আমার দুর্বলতার কারণে বিষয়টি আমি অবগত হতে পারিনি। কিন্তু খালেদের প্রতিবেশী জানে, সে অসুস্থ। এটা আমার কাছে গায়েব (কিন্তু ওই প্রতিবেশীর কাছে তা গায়েব নয়)।
সুতরাং আপেক্ষিক গায়েব দু ধরনের। তন্মধ্যে এক ধরনের গায়েব মাখলুকের অদৃশ্যে থাকে। তথাপি আল্লাহ তা জানার জ্ঞাতব্য মাধ্যম নির্ধারণ করেছেন। যে সেসব মাধ্যম জানতে পারে এবং বলে, এসব সুবিদিত মাধ্যম অনুযায়ী অমুক বিষয় সংঘটিত হবে, সে গায়েব জানার দাবি করেনি। পক্ষান্তরে মাধ্যম না জেনেই যে বিভিন্ন বিষয় ঘটার দাবি করে, সে মূলত গায়েব জানার দাবি করে।
যে দাবি করে, সে গায়েব জানে, সে তাগুত। মানুষ যা জানতে পারে না, এমনকিছু জানার দাবি যে করে, সে তাগুত। কেননা সে অবাধ্য হয়েছে এবং সীমালঙ্ঘন করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ
"তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়।" [সুরা নিসা: ৬০] কতিপয় সালাফ আয়াতে উদ্ধৃত 'ভাগুতের' ব্যাখ্যা করেছেন-গণক, জ্যোতিষী।
বর্তমানে দেখা যায়, চুরি-জাতীয় কোনো বিষয় নিয়ে কিছু মানুষ মতবিরোধ করে। বলে, 'তুমি আমার সম্পদ চুরি করেছ।' অভিযুক্ত ব্যক্তি বলে, 'না, আমি চুরি করিনি।' তখন বাদী বলে, 'তাহলে চলো, আমরা অমুক শাইখের কাছে যাব, কিংবা অমুক ওলির কাছে যাব।' তারা ওদেরকে জ্যোতিষী বলে না, জাদুকর বা ভেলকিবাজও বলে না। তারা ওদেরকে শাইখ' বলে ডাকে। হয়তো ওদের শাইখের কাছে থাকে বিরাট লম্বা তসবিমালা, যা দিয়ে সে খেলা করে। কিংবা সে কুরআনের কোনো অংশবিশেষ পাঠ করে। তো তারা বলে, 'আমরা শাইখের কাছে যাব, তিনি আমাদের মাঝে ফায়সালা করবেন।' শাইখ, এ কি আমার সম্পদ চুরি করেছে?' সে যদি বলে, 'হ্যাঁ, চুরি করেছে,' তাহলে তারা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চোর সাব্যস্ত করে। সে যদি বলে, 'না, চুরি করেনি,' তাহলে তারা চুরির অভিযোগ তুলে নেয়।
এটা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়ার অন্তর্ভুক্ত, গণকের কাছে গমন করার অন্তর্গত। যে ব্যক্তি ভবিষ্যতের গায়েবি বিষয় সম্পর্কে সংবাদ দেয়, সে গণক বা জ্যোতিষী। সুতরাং সুবিদিত মাধ্যম ব্যতিরেকে যে ব্যক্তিই ভবিষ্যতের গায়েবি বিষয় সম্বন্ধে সংবাদ দেয়, সে-ই তাণ্ডত। সুতরাং শাইখের ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব কথার মর্ম হচ্ছে, যে ব্যক্তি এমন গায়েব জানার দাবি করে, যা কেবল আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না, কিংবা যে গায়েবি ইলম আল্লাহর ইচ্ছায় কোনো রসুল কেবল নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে জানতে পারেন; যে লোকই তা জানার দাবি করে, সে আল্লাহকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী তাগুত।
**আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে মাতৃগর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করা কি গায়েব জানার অন্তর্ভুক্ত?**
বর্তমানে একটি বিষয় মানুষের কাছে সংঘটিত হয়েছে। ডাক্তাররা গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ বলে দিচ্ছে। বলে দিচ্ছে, গর্ভস্থ সন্তান ছেলে, না মেয়ে। আমরা বলব, তারা ভ্রুণে রূপান্তরিত হওয়ার পরে এ সংবাদ দেয়। ভ্রুণ গঠিত হওয়ার আগে এ সংবাদ দেওয়ার কোনো পথ নেই। তারা মাধ্যমের সাহায্যে এরকম বলতে পারে। এমন কোনো ডাক্তার নেই, যে কিনা বর্তমানে বিদ্যমান যন্ত্রের মাধ্যমে না দেখেই তা বলে দিতে পারে। আল্লাহ যেসব নিদর্শন নির্ধারণ করেছেন, সেসবের মাধ্যমে কোনো কিছু সংবাদ দেওয়া গায়েব জানার দাবি নয়।
কিছু মুসলিম বিষয়টিকে খারাপ মনে করে। বলে, 'আমি ডাক্তারকে বলব, আমাকে সন্তানের লিঙ্গ কী তা বলবেন না। কারণ এটা গায়েবি ইলম (অদৃশ্যের জ্ঞান)।' আমরা বলব, না, এটা অদৃশ্যের জ্ঞান নয়, যে জ্ঞান আল্লাহ একান্তই নিজের করে রেখেছেন। বরং আল্লাহ বান্দাদের জন্য এ বিষয়টি জানার মাধ্যম নির্ধারণ করেছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য তা জানার মাধ্যম অবশিষ্ট রেখেছেন, ততক্ষণ অবধি তারা তা অনুসরণ করলে সেটা গায়েব জানার আওতাভুক্ত হবে না।
**আগাম মৃত্যুসংবাদ দিলে কি গায়েব জানার দাবি করা হয়?**
আগাম মৃত্যুসংবাদের ব্যাপারটি কী হবে, যেখানে বলা হয়, অমুক ব্যক্তি অমুক দিন মারা যাবে? কিছু মানুষ বলে, তুমি দু মাস পর মারা যাবে, তুমি মারা যাবে এক বছর পরে, ইত্যাদি। এরকম দাবি যদি দৃঢ়তাসূচক হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তা গায়েব জানার দাবি। পক্ষান্তরে ধারণাভিত্তিক হলে তার দুটি অবস্থা রয়েছে:⁴
১ম অবস্থা: ধারণাভিত্তিক দাবি করা হয় মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে। অর্থাৎ মানুষ নিজেদের জ্ঞান অনুযায়ী যা জানে, তার সাহায্য নিয়ে। যেমন ডাক্তাররা বলে, আমাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এ ধরনের রোগী অধিকাংশ ক্ষেত্রে দু বছর বাঁচে। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। এ রোগী দু বছর পূর্ণ করতে পারে, দু বছর নাও পূর্ণ করতে পারে, আবার দু বছরের পরেও অনেকদিন বাঁচতে পারে। কিন্তু মাধ্যমের সাহায্যে ডাক্তাররা জানে, এ ধরনের রোগী এতদিন পর্যন্ত বাঁচে। এটা অদৃশ্যের জ্ঞান নয়।
কিন্তু হাল আমলে একটি নতুন বিষয়ের উদ্ভব হয়েছে। এটা স্বপ্নের বিষয়। কিছু স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী আছে, যারা কিনা স্বপ্নের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গায়েবি জ্ঞানের মধ্যে প্রবেশ করে। এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, তারা আসলে স্বপ্নের ব্যাখ্যা-জানা লোক নয়। কোনো কোনো স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী আছে, যাকে কেউ প্রশ্ন করলে সে বলে, 'তুমি দাজ্জালকে দেখতে পাবে।' এটা গায়েবি জ্ঞান। আবার তাদের কেউ বলে, 'তুমি বিশ বছর পর মারা যাবে, তুমি মারা যাবে চল্লিশ বছর পর, তুমি মারা যাবে জিলহজ মাসের পর।' তারা এসব বলে স্বপ্নের মাধ্যমে। প্রকৃতপ্রস্তাবে এ ধরনের কথা বলা না-জায়েজ। কিন্তু তারা কি তাগুত?
উত্তর: না। কারণ স্বপ্ন বাস্তবিক মাধ্যমের মতো। বাস্তবিক মাধ্যমের সাথে স্বপ্নের মিল রয়েছে। এজন্য তাদেরকে তাগুত বলা হবে না।
অনুবাদক
এগুলো সূক্ষ্ম জ্ঞানগর্ভ ফিকহি বিষয়, যা ভালোভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি। যাতে কেউ মানুষকে হুকুম দিতে ভুল না করে। সুতরাং আমরা বলি, মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না, এমন অদৃশ্যের জ্ঞান যে জানার দাবি করে, সে তাগুত।
সত্যিকারার্থে বিনা দলিলে গায়েবি বিষয়ের কথা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে বেড়ানো থেকে আমরা চরম সতর্ক করি। কেননা এতে করে মানুষকে (এসব বলতে) উৎসাহিত করা হয় এবং তাদেরকে নিপাতিত করা হয় হারাম বিষয়ে। যদিও তা স্বপ্নের মাধ্যমে বলা হয়। অধুনা আমরা দেখি, নানাবিধ ক্যাসেট বিতরণ করা হচ্ছে, ইন্টারনেটেও এসব ছড়ানো হচ্ছে, যাতে আছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা। এতে বলা হচ্ছে, পৃথিবীতে এটা ঘটতে যাচ্ছে ওটা ঘটতে যাচ্ছে, ইত্যাদি। এসব বিষয় বর্জন করা বাঞ্ছনীয়।
**পঞ্চম প্রধান তাগুতঃ যে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান ব্যতিরেকে অন্য বিধান দিয়ে ফায়সালা করে**
মূলপাঠ: (৫) যে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান ব্যতিরেকে অন্য বিধান দিয়ে ফায়সালা করে।
ব্যাখ্যা: আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালা করা মুসলিমদের ওপর সুস্পষ্ট ফরজ। সুতরাং মহান আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালা করা ওয়াজিব-এ মর্মে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা মুসলিমের জন্য আবশ্যক। মুসলিমের এ বিশ্বাস রাখাও কর্তব্য যে, আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে কৃত ফায়সালাই ন্যায় বাস্তবায়ন করে, এছাড়া এমন কোনো বিধান নেই, যা তার সমপর্যায়ে আসা তো দূরের কথা, তার ধারেকাছেও আসতে পারে। এটা শরিয়তের সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন বিষয়, দ্বীনের অতীব জরুরি জ্ঞাতব্য বিষয় (যা জানতে গবেষনার প্রয়োজন হয় না)।
এ বিষয়ে সত্যিকারের আল্লামাহ, ফাক্বীহ, ইমাম, শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)'র মহান উপদেশ রয়েছে। যেখানে তিনি উম্মতকে চমৎকার নসিহত করেছেন। ভাইদের কাছে আমি উক্ত উপদেশ বর্ণনা করতে চাইছি। কেননা এ উপদেশ সেসব মণিমুক্তার অন্তর্গত, যেগুলো মুসলিমদের মাঝে প্রচার করা জরুরি, তালিবুল ইলমদের জন্য যেগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মনোযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয় (অর্থাৎ তালিবুল ইলমরা যেন এ উপদেশ জনসাধারণের কাছে ব্যাখ্যা করে)।
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, "আল্লাহর শরিয়তের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া এবং অন্য বিধানের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া থেকে সতর্ক থাকা আবশ্যক-মর্মে এটি একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা, অপরিহার্য নসিহত। আমি এ বার্তা লিখেছি। কারণ আমি দেখছি, বর্তমান যুগে কিছু মানুষ গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের) বিধানকে বিচারক নির্ধারণ করছে, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসুলের সুন্নাত ব্যতিরেকে অন্যের নিকট বিচারপ্রার্থী হচ্ছে। বিচারপ্রার্থী হচ্ছে গণক, জ্যোতিষী, মরুদেশের গোত্রনেতা, সেক্যুলার আইনের নেতা প্রমুখের নিকট। তাদের মধ্যে কিছু লোক নিজেদের কর্মের বিধান সম্পর্কে না জেনে এমনটি করে। আর অন্যরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরোধিতা ও বিরুদ্ধাচারণ করে এ কাজে লিপ্ত হয়। আমি আশা করছি, আমার এ উপদেশ অজ্ঞদের জন্য জানার উপায় হবে এবং গাফেলদের জন্য হবে সারণিকা। আর হবে সরল পথের ওপর আল্লাহর বান্দাদের অটল থাকার একটি মাধ্যম।' [মাজমূ'উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্কালাতুম মুতানাওয়্যা' আহ, ১/৭২]
শাইখ বলছেন, "ওহে মুসলিম জনতা, আল্লাহ জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য। আল্লাহ বলেছেন, 'আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদত করার জন্য।' (সুরা যারিয়াত: ৫৬) তিনি আরও বলেছেন, 'তোমার রব ফায়সালা করেছেন, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতামাতার সাথে সদাচারণ করবে।' (সুরা ইসরা: ২৩) তিনি আরও বলেছেন, 'তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে কোনো কিছুকেই শরিক কোরো না, আর পিতামাতার সাথে সদাচারণ করো।' (সুরা নিসা: ৩৬)
মুআয বিন জাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, আমি নাবি ﷺ এর পেছনে গাধার পিঠে সওয়ার হয়েছিলাম। তিনি বললেন, 'মুআয, তুমি কি জান, বান্দার ওপর আল্লাহর অধিকার কী, আর আল্লাহর ওপর কী বান্দার অধিকার?' আমি জবাব দিলাম, 'আল্লাহ ও তাঁর রসুলই ভালো জানেন।' তিনি বললেন, 'বান্দার ওপর আল্লাহর অধিকার বান্দা কেবল আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে অন্যকিছুকে শরিক করবে না। আর আল্লাহর ওপর বান্দার অধিকার যে বান্দা তাঁর সাথে শরিক করে না, তাকে তিনি শাস্তি দেবেন না।' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসুল, আমি কি মানুষকে এ সুসংবাদ দেব না?' তিনি বললেন, 'তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ো না, তাহলে তারা এর ওপর নির্ভর করে বসবে (নির্ভর করে আমল ছেড়ে দেবে)।' বুখারি ও মুসলিম এ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
উলামাগণ (রাহিমাহুমুল্লাহ) কাছাকাছি অর্থে ইবাদতের বেশকিছু ব্যাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে সর্বমর্মী ব্যাখ্যা শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়‍্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ)'র। তিনি বলেছেন, আল্লাহ ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন, এমন যাবতীয় প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কথা ও কাজই ইবাদত।' [মাজমূ'উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্কালাতুম মুতানাওয়্যা' আহ, ১/৭৩] এখানে উল্লিখিত সব কথা আলোচ্য পুস্তিকার ভাষ্যে বলা হয়েছে।
শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলছেন, "এ থেকে প্রতীয়মান হয়, আদেশ, নিষেধ, বিশ্বাস, কথা ও কাজ- সবক্ষেত্রে মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য করা ইবাদতের দাবি। আল্লাহর প্রতি ইবাদত আরও দাবি করে, মানুষের জীবন আল্লাহর শরিয়তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ যা হালাল করেছেন, সেও তা হালাল করবে। আল্লাহ যা হারাম করেছেন, সেও তা হারাম করবে। সে তার যাবতীয় আচার-আচরণ ও কাজকর্মে আল্লাহর শরিয়তের প্রতি অনুগত হবে। মুক্ত থাকবে অন্তরের খেয়ালখুশি ও প্রবৃত্তির স্বেচ্ছাচারিতা থেকে। এক্ষেত্রে যেন ব্যক্তি-সমাজ এবং নারী-পুরুষ সবাই সমান হয়। যে ব্যক্তি কিছু ক্ষেত্রে তার রবের প্রতি অনুগত হয়, আর বাকি ক্ষেত্রে মাখলুকের অনুগত হয়, সে আল্লাহর ইবাদতকারী বান্দা হতে পারেনি।
আমাদের উল্লিখিত এ অর্থকে আরও জোরদার করে মহান আল্লাহর এ বাণী, অতএব তোমার রবের কসম, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফায়সালা দেবে সে ব্যাপারে তাদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।' (সুরা নিসা: ৬৫) সুতরাং যে বান্দা আল্লাহর প্রতি ইমান এনে ছোটোবড়ো সবক্ষেত্রে তাঁর হুকুমের প্রতি সন্তুষ্ট হয়নি, সকল ক্ষেত্রে-জান, মাল, সম্ভ্রম সবক্ষেত্রে কেবল তাঁর শরিয়তের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়নি, তার ইমান পরিপূর্ণ হয়নি। এ কাজ না করলে সে সাব্যস্ত হবে অন্যের বান্দা। যেমন আল্লাহ বলেছেন, 'আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছেই রাসুল প্রেরণ করেছি (এই ঘোষণা দিয়ে যে), তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুতকে পরিহার করো।' (সুরা নাহল: ৩৬)
এক আল্লাহর ইবাদত সম্পাদন, তাগুতের ইবাদত থেকে সম্পর্ক ছিন্নকরণ এবং আল্লাহর কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া-দু সাক্ষ্যের দাবি। এ মর্মে সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়, আর মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রসুল। মহান আল্লাহ মানুষের রব (প্রভু) ও ইলাহ (উপাস্য)। তিনিই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই তাদের নির্দেশ দেন, নিষেধ করেন, জীবন দেন, মৃত্যু দেন। তিনিই তাদের হিসাব নেবেন এবং প্রতিদান দেবেন। কেবল তিনিই ইবাদতের হকদার, অন্য কেউ নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, 'জেনে রেখ, সৃষ্টি তাঁর, হুকুমও (চলবে) তাঁর।' (সুরা আরাফ: ৫৪)
আল্লাহ ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কর্ম বর্ণনা করেছেন। তারা আল্লাহকে ব্যতিরেকে তাদের ধর্মীয় পণ্ডিত ও জাযকদের নিজেদের রব বানিয়ে নিয়েছিল, যখন তারা হালালকে হারামকরণ ও হারামকে হালালকরণের ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করেছিল। মহান আল্লাহ বলেছেন, 'তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসারবিরাগীদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়াম তনয় মাসীহকেও। অথচ তারা এক উপাস্যের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তারা যে শরিক স্থাপন করে, তিনি তা থেকে মহাপবিত্র।' (সুরা তওবা: ৩১)
আদী বিন হাতিম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি মনে করেছিলেন, পণ্ডিত ও সন্ন্যাসীদের ইবাদত বলতে কেবল তাদের উদ্দেশ্যে জবেহ, নজর-নেওয়াজ, রুকু-সেজদা প্রভৃতি বোঝানো হয়েছে। এটা তখনকার ঘটনা, যখন তিনি মুসলিম হিসেবে নবি ﷺ এর কাছে আগমন করেছিলেন এবং তাঁকে এ আয়াত পাঠ করতে শুনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রসুল, ﷺ আমরা তো তাদের ইবাদত করি না।' তিনি খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে বলেছেন, যেহেতু তিনি ইসলামগ্রহণের পূর্বে খ্রিষ্টান ছিলেন। নবি ﷺ বলেছিলেন, 'আচ্ছা আল্লাহর হালাল ঘোষিত জিনিসকে তারা হারাম বললে, তোমরা কি তা হারাম হিসেবে গ্রহণ করো না? আবার আল্লাহর হারাম ঘোষিত জিনিসকে তারা হালাল বললে, তোমরা কি তা হালাল হিসেবে গ্রহণ করো না?' তিনি বললেন, জি। তখন তিনি বললেন, 'এটাই তাদের ইবাদত।' (তিরমিজি, হা/৩০৯৫; সনদ: হাসান) আহমাদ ও তিরমিজি এ হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।....
যখন জানা গেল, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রসুল-এ সাক্ষাদ্বয়ের দাবি মোতাবেক কেবল আল্লাহর শরিয়তের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে হবে। সেহেতু তাগুত, নেতা ও জ্যোতিষীর কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া মহান আল্লাহর প্রতি আনিত ইমানের পরিপন্থি। এটা কুফর, জুলুম ও ফাসেকি কাজ। মহান আল্লাহ বলেছেন, 'আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে যারা বিচার-ফায়সালা করে না, তারা কাফির।' (সুরা মাইদাহ: ৪৪) মহান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান ব্যতিরেকে অন্য বিধান দিয়ে কৃত ফায়সালা জাহেলি যুগের লোকদের ফায়সালা। আর তাঁর ফায়সালা থেকে বিমুখ হওয়া তাঁর শাস্তি ও আজাব নেমে আসার একটি মাধ্যম; যে শাস্তি জালেম সম্প্রদায়ের নিকট থেকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে না।
মহান আল্লাহ বলেছেন, 'আর তুমি তাদের মাঝে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালা করো। তুমি তাদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করবে না। আর তাদের থেকে সতর্ক থাকবে; তারা যেন আল্লাহ তোমার প্রতি যা নাজিল করেছেন, তার কোনো কিছু থেকে তোমাকে বিচ্যুত করতে না পারে। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে রেখ, আল্লাহ তাদের কিছু পাপের কারণে তাদেরকে শাস্তি দিতে চান। প্রকৃতপক্ষে মানুষদের অধিকাংশই পাপাচারী। তারা কি জাহেলি যুগের বিচার-ফায়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা দৃঢ় প্রত্যয়ীদের জন্য উত্তম বিচারক আর কে?' (সুরা মাইদাহ: ৪৯-৫০)
এ আয়াতটি যিনি পাঠ করবেন এবং তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবেন, তার কাছে স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে, আল্লাহর বিধানের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়ার বিষয়টি আটটি নির্দেশনার মাধ্যমে জোরদার করা হয়েছে। এক, আল্লাহ তাঁর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালার নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, 'আর তুমি তাদের মাঝে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালা করো।' দুই, কোনো অবস্থাতেই মানুষের খেয়ালখুশি ও চাহিদা যেন তোমাকে এ বিধান দিয়ে ফায়সালা করা থেকে বিরত না রাখে। বলেছেন, 'তুমি তাদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করবে না।' তিন, কমবেশি, ছোটোবড়ো সকল ক্ষেত্রে গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের) বিধানকে বিচারক নির্ধারণ করা থেকে সতর্ক করেছেন। বলেছেন, 'আর তাদের থেকে সতর্ক থাকবে; তারা যেন আল্লাহ তোমার প্রতি যা নাজিল করেছেন, তার কোনো কিছু থেকে তোমাকে বিচ্যুত করতে না পারে।'
চার, আল্লাহর ফায়সালা থেকে বিমুখ হওয়া এবং তাঁর ফায়সালার কোনো অংশ গ্রহণ না করা বড়ো গুনাহ, যা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিকে অপরিহার্য করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, 'যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে রেখ, আল্লাহ তাদের কিছু পাপের কারণে তাদেরকে শাস্তি দিতে চান।' পাঁচ, আল্লাহর বিধান থেকে বিমুখ লোকদের সংখ্যাধিক্য দেখে ধোঁকা খাওয়া থেকে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দার সংখ্যা অল্পই। আল্লাহ বলেছেন, 'প্রকৃতপক্ষে মানুষদের অধিকাংশই পাপাচারী।' ছয়, আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান ব্যতিরেকে অন্য বিধান দিয়ে কৃত ফায়সালা জাহেলি যুগের ফায়সালা। মহান আল্লাহ বলেছেন, 'তারা কি জাহেলি যুগের বিচার-ফায়সালা কামনা করে?'
সাত, সাব্যস্ত করা হয়েছে মহান কথা-আল্লাহর ফায়সালাই সবচেয়ে ভালো ও ন্যায়নিষ্ঠ ফায়সালা। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম বিচারক আর কে?' আট. ইয়াক্বীন তথা দৃঢ় প্রত্যয়ের দাবি- এটা জেনে রাখা যে, আল্লাহর ফায়সালা সর্বোৎকৃষ্ট, সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ, পূর্ণতর ও সবচেয়ে ন্যায়নিষ্ঠ; এবং সন্তোষ ও পূর্ণ স্বীকৃতির সাথে এ ফায়সালার প্রতি অনুগত হওয়া ওয়াজিব। মহান আল্লাহ বলেছেন, 'আল্লাহ অপেক্ষা দৃঢ় প্রত্যয়ীদের জন্য উত্তম বিচারক আর কে?'
এসব অর্থ কুরআনের অসংখ্য আয়াতে বিদ্যমান রয়েছে।.. এর মানে মহান আল্লাহ ও তদীয় রসুলের কথার প্রতি পুরোপুরি অনুগত হওয়া এবং তাঁদের কথাকে অন্য সকলের কথার ওপরে অগ্রাধিকার দেওয়া বান্দার জন্য ওয়াজিব। এটা দ্বীনের অতীব জরুরি জ্ঞাতব্য বিষয় (যা জানতে গবেষণার প্রয়োজন হয় না)। এজন্য আল্লাহর দয়া ও প্রজ্ঞার দাবি মোতাবেক বান্দাদের মাঝে বিচার-ফায়সালা হবে কেবল তাঁরই শরিয়ত ও ওহির মাধ্যমে। কারণ মানুষের যে দুর্বলতা, অপারগতা, খেয়ালখুশির অনুসরণ ও অজ্ঞতা থাকে, তা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত, পবিত্র। তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ, সূক্ষ্মদর্শী, সবিশেষ অবহিত।' [মাজমূ'উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা' আহ, ১/৭৪-৭৮]
শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, "হে মুসলিম, উপরিউক্ত আলোচনা থেকে তোমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, আল্লাহর শরিয়তকে বিচারক নির্ধারণ করা এবং তাঁর শরিয়তের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া আবশ্যক, যা আবশ্যক করেছেন আল্লাহ ও তদীয় রসুল । এটা আল্লাহর ইবাদতের দাবি এবং তাঁর নবি মুহাম্মাদ ﷺ এর রিসালাতের প্রতি সাক্ষ্যপ্রদানের দাবি। এ থেকে বিমুখ হলে কিংবা এর কোনো অংশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে আল্লাহর শাস্তি ও আজাব অপরিহার্য হয়ে যায়। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের প্রতি যে বিধান প্রয়োগ করে, কিংবা সকল যুগে ও স্থানে মুসলিমদের জন্য যা দ্বীন হিসেবে পালন করা জরুরি-এ দুয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ নির্দেশনা সমান।' [মাজমূ'উ ফাতাওয়া, ১/৭৯]
অর্থাৎ শরয়ী বিধানকে ফায়সালাকারী নির্ধারণ করা কেবল শাসকদের সাথে খাস নয়, যারা রাষ্ট্র শাসন করে। বরং এ বিধান শরিয়তের আজ্ঞাপ্রাপ্ত সকল ব্যক্তির জন্য ব্যাপক। শরিয়তের আজ্ঞাপ্রাপ্ত সকল ব্যক্তির ওপর আবশ্যক আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালা করা।
শাইখ তাঁর নসিহত পেশ করে বলছেন, "সুতরাং মুসলিম জনসাধারণ, তাদের শাসকবর্গ, এবং তাদের মধ্যকার নেতৃস্থানীয় ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হবে, মহান আল্লাহকে ভয় করা, তাদের দেশে ও প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর শরিয়তকে ফায়সালাকারী নির্ধারণ করা, দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর আজাব থেকে নিজেদের বাঁচানো এবং অধীন লোকদেরও বাঁচানো। আর যেসব রাষ্ট্র আল্লাহর বিধান থেকে বিমুখ হয়েছে এবং পশ্চিমাদের অনুকরণকারী ও তাদের আদর্শের অনুসারীদের বাহনে ভ্রমণ করেছে (তাদের পথে পথ চলেছে), সেসব দেশে সৃষ্টি হয়েছে মতোবিরোধ, বিভক্তি, ফিতনার বিস্তার, কল্যানের স্বল্পতা, পারস্পরিক হত্যাকাণ্ড; এখনও যা চলছে প্রচণ্ডভাবে। এ থেকে যেন তারা শিক্ষা নেয়, উপদেশ গ্রহণ করে।
তাদের অবস্থার সংশোধন হবে না, তাদের বিরুদ্ধে শত্রুদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যও তুলে নেওয়া হবে না, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর পথে ফিরে আসে এবং তাঁর সরল পথের অনুসরণ করে; যে পথ তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য চয়ন করেছেন, সে পথে চলার নির্দেশ দিয়েছেন, আর এর বিনিময়ে তাদেরকে চিরসুখী জান্নাত প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মহান আল্লাহ সত্যই বলেছেন, 'যে আমার স্মরণ (কুরআন) থেকে বিমুখ হয়, তার জীবন হবে সংকীর্ণময়, আর কেয়ামতের দিন আমি তাকে উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে প্রভু, আপনি আমাকে অন্ধ করে ওঠালেন কেন, অথচ আমি চক্ষুষ্মান ছিলাম? তিনি বলবেন, তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, তুমি তা পরিত্যাগ করেছিলে, অনুরূপভাবে আজ তোমাকেও পরিত্যাগ করা হবে।' (সুরা তহা: ১২৪-১২৬)" [মাজমূ'উ ফাতাওয়া, ১/৭৯]
এরপর শাইখ এ কথা বলে তাঁর বক্তব্য শেষ করেছেন, "আমি আল্লাহর কাছে চাইছি, তিনি যেন আমার এ কথাকে মুসলিম জাতির জন্য উপদেশ এবং নিজেদের অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ফিকির করার মাধ্যমে পরিণত করেন। আমি আশা করব, যার কাছে আমার এ উপদেশ পৌঁছবে, সে যেন (তওবা করে) আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়।" যেসব শাসক, নেতা, মন্ত্রী, দলনেতা, বা সাধারণ মানুষ আল্লাহর বিধানের বিরোধিতা করে এবং ছোটোবড়ো বা সূক্ষ্ম -স্পষ্ট যে কোনো ক্ষেত্রে গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের) বিধান দিয়ে ফায়সালা করে, তাদের সবার জন্য এ উপদেশ।
শাইখ তাদের সবার প্রতি উপদেশ দিয়ে বলছেন, "আমি আশা করব, যার কাছে আমার এ উপদেশ পৌঁছবে, সে যেন (তওবা করে) আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়, এসব হারাম কাজ থেকে বিরত হয়, আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়। আর সে যেন স্বীয় ভ্রাতৃবর্গ ও পাশের মুসলিমদের 'সকল জাহেলি প্রথা, কিংবা আল্লাহর শরিয়তবিরোধী রীতি বাতিল সাব্যস্ত করার উপদেশ দেয়া যদিও সেই প্রথা গোত্র-সমাজের প্রথা হয়, যা মরুবাসীদের নিকট খুবই পরিচিত। তারা বলে, 'এটা এমন মত বা প্রথা যা ত্যাগ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।' অথচ তা আল্লাহর শরিয়তবিরোধী। কিংবা শাইখের কথায় রীতি বলতে উদ্দিষ্ট প্রচলিত বিভিন্ন ইসলামী দলের রীতি। তুমি তাদের কোনো ব্যক্তির কাছে যেয়ে বলবে, 'ভাই, এ কাজ করো। এটা কুরআনে এসেছে, সুন্নাহয় এসেছে।' সে বলবে, 'এটা আমাদের দলের রীতি নয়।
দলের ইমাম বা নেতার বক্তব্য বলছে, এরকম করতে হবে। সুতরাং আমি এটা বাদ দিতে পারব না।' মুসলিমদের জন্য এরকম সকল প্রথা ও রীতি বাতিল করা ওয়াজিব।
তো শাইখ বলছেন, "আর সে যেন স্বীয় ভ্রাতৃবর্গ ও পাশের মুসলিমদের 'সকল জাহেলি প্রথা, কিংবা আল্লাহর শরিয়তবিরোধী রীতি বাতিল সাব্যস্ত করার'-উপদেশ দেয়। কারণ তওবা পূর্বের সকল গুনাহ নিশ্চিহ্ন করে দেয়। পাপ থেকে তওবাকারী নিষ্পাপ ব্যক্তির মতো। ওই সমস্ত মানুষ ও তাদের সমমনাদের ওপর যারা কর্তৃত্ব রাখে, তাদের উচিত হবে, তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া, সত্যের উপদেশ দেওয়া এবং তাদের কাছে সত্যকে প্রকাশ করা।' [মাজমূ'উ ফাতাওয়া, ১/৮০]
এটি মানসকে প্রভাবিতকারী একটি মহান উপদেশ। আমাদের সকলের উচিত এ উপদেশের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হওয়া। আমি, আপনি, ব্যক্তি আমর-আমরা সবাই আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালা করতে আদিষ্ট হয়েছি। অসংখ্য মুসলিম আছে, তারা যখন আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালার কথা শোনে, তখন তার চিন্তা প্রবাহিত হয় শাসকের দিকে। সে নিজের কথা চিন্তা করে না। অথচ দেখা যাবে, সে নিজের ক্ষেত্রে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানকে ফায়সালাকারী বানায়নি। সে নিজের কথা চিন্তা করে না। অথচ দেখা যাবে, সে নিজ পরিবারের মধ্যে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানকে ফায়সালাকারী বানায়নি। সে নিজের কথা চিন্তা করে না। অথচ দেখা যাবে, সে নিজ প্রতিবেশির মধ্যে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানকে ফায়সালাকারী বানায়নি।
সে মনে করে, এ নির্দেশনা কেবল শাসকদের জন্য। শাসকরা যে এ বিধান পালনে আদিষ্ট হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি, আপনি, জায়েদ, আমর-আমরা সবাই আদিষ্ট হয়েছি আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালা করতে, কিতাব ও সুন্নাহর বিবরণ অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদত করতে। আমরা সবাই আদিষ্ট হয়েছি, দলিল বিশুদ্ধ সূত্রে সাব্যস্ত ও প্রমাণিত হলে কোনো মানুষের সে যে-ই হোক না কেন কথায় তা প্রত্যাখ্যান না করতে। কিতাব ও সুন্নাহয় যা সাব্যস্ত হয়েছে, তার ওপর প্রথাগত বিধান কিংবা আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের বক্তব্যকে প্রাধান্য না দিতেও আমরা সবাই আদিষ্ট হয়েছি।
নিঃসন্দেহে গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের) বিধান দিয়ে ফায়সালা করা একটা বিরাট বিপর্যয়। যে গাইরুল্লাহর বিধান দিয়ে ফায়সালা করে, সে তার কর্মের কারণে তাগুত। যেমন আল্লাহ বলেছেন يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إلى الطاغوت 'তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়।' [সুরা নিসা: ৬০] মহান আল্লাহ এ আয়াতে গাইরুল্লাহর বিধানের কাছে ফায়সালা কামনা করাকে তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থনা' হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। এ আয়াত অবতীর্ণের একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে।
মদিনার এক মুনাফেকের সাথে জনৈক ইহুদির বিবাদ সৃষ্টি হয়। ইহুদি বলে, 'আমরা মুহাম্মাদের কাছে বিচারপ্রার্থী হব।' সে মুহাম্মাদ ﷺ এর প্রতি ইমান আনেনি। কিন্তু সে জানে, নবি ﷺ ন্যায়পরায়ণ বিচারক। সে বলল, 'আমরা মুহাম্মাদের কাছে বিচারপ্রার্থী হব।' কেননা সে জানে, নবি ﷺ ন্যায়পরায়ণ বিচারক, তিনি ঘুষ নেন না এবং কোনো পার্থিব স্বার্থে অন্যায় করেন না। কিন্তু মুনাফেক বলল, 'না।' মুনাফেক লোকটি ধারণা করে, মুহাম্মাদের ﷺ প্রতি তার ইমান আছে। এ সত্ত্বেও সে বলল, 'না, আমরা তোমার সম্প্রদায়ের ইহুদিদের কাছে বিচারপ্রার্থী হব। কারণ সে জানে, ইহুদিরা ঘুষ নেয় এবং বিচার-ফায়সালায় অন্যায় কাজ করে।
তখন আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করেন, "তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ করনি, যারা দাবি করে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছিল তার প্রতি তারা ইমান রাখে? অথচ তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও তাদেরকে আদেশ করা হয়েছিল, তারা যেন তাগুতকে অস্বীকার করে।" [সুরা নিসা: ৬০] ইহুদিদের কাছে ফায়সালা কামনা করাকে মহান আল্লাহ 'নবি ﷺ এর বিধান থেকে বিমুখ হওয়া' এবং 'তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থনা' গণ্য করেছেন।
**মানবরচিত সকল বিধানই কি তাগুতী আইন?**
এখানে আমাদের একটি বিষয় জেনে রাখা জরুরি। মানবরচিত সকল আইনের কাছে বিচারপ্রার্থনা করা- 'তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থনা' হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং মানুষ যেসব আইন প্রণয়ন করে, তা দু ধরনের:
(১) এক ধরনের আইন মানুষের কল্যাণ বাস্তবায়ন করে। তা কোনো শরয়ী বিধানকে উঠিয়ে দেয় না, আবার কিতাব-সুন্নাহর পরিপন্থিও হয় না। এটা ভালো বিষয়। এ কাজ শাসকবর্গের কর্তব্য। যেমন বর্তমান সময়ে রাস্তা পারাপারের আইন, সিগন্যাল বিষয়ক আইন-আপনি রেড সিগন্যাল দেখলে থেমে যাবেন, গ্রিন সিগন্যাল দেখে চলতে শুরু করবেন প্রভৃতি। এসব আইন মানুষ তৈরি করেছে, কিন্তু তা কিতাব ও সুন্নাহর বিরোধী নয়। সুতরাং এ আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া এবং এ আইন অনুযায়ী আমল করা কোনোভাবেই তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থনা' হিসেবে বিবেচিত হবে না।
(২) দ্বিতীয় ধরনের আইন সেটা, যা আল্লাহর শরিয়ত পরিপন্থি। যেমন তারা বলে, 'মহিলা ব্যভিচারে সম্মত থাকলে, তার ব্যভিচার সাব্যস্ত হলেও আমরা তার ওপর ব্যভিচারের দণ্ডবিধি কায়েম করব না। কেননা সে এতে সম্মত। এটা ব্যক্তি-স্বাধীনতা। যে পর্যন্ত না সে রাস্তাঘাটে এ কাজ করছে (সে পর্যন্ত তাকে দণ্ডবিধির শাস্তি দেব না)। কিংবা বলে, 'যে চুরি করে আর তাকে দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তি দেওয়ার শর্তাবলি পূরণ হয়েছে- আমরা তার হাত কাটব না। হাত কাটা তো বর্বরতা, নৃশংসতা। বরং আমরা তার জন্য আইন করব, তাকে একমাস বা দুমাস কারাগারে বন্দী রাখা হবে।' এটাই গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে কৃত ফায়সালা, তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থনা।
**গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালাকারী ব্যক্তির হুকুম কী?**
আমরা জানলাম, কর্মের দিক থেকে গাইরুল্লাহর বিধান দিয়ে ফায়সালা করা- তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থনা'। কিন্তু কর্তার বিধান কী হবে? শাসক হোক, বা সাধারণ মানুষ সে যখন গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করবে, তার বিধান কী হবে? যে লোক সেক্যুলার আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়, কিংবা সেক্যুলার আইন দিয়ে ফায়সালা করে, তার হুকুম কী?
আমি বলি, উলামাদের বক্তব্য অনুসন্ধান করলে প্রতীয়মান হয়, গাইরুল্লাহর বিধান দিয়ে ফায়সালা করার বিধান অবস্থাভেদে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এর বিধান স্রেফ একটি নয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
"আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে যারা বিচার-ফায়সালা করে না, তারা কাফির।' [সুরা মাইদাহ: ৪৪] তিনি আরও বলেছেন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
"আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে যারা বিচার-ফায়সালা করে না, তারাই জালেম।" [সুরা মাইদাহ: ৪৫] তিনি আরও বলেছেন,
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
"আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে যারা বিচার-ফায়সালা করে না, তারাই ফাসেক।' [সুরা মাইদাহ: ৪৭]
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়‍্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, "ইবনু আব্বাস ও তাঁর ছাত্ররা বলেছেন, 'কুফর দুনা কুফর (ছোটো কুফর), যুলম দুনা যুলম (ছোটো জুলুম), ফিসক দুনা ফিসক (ছোটো ফাসেকি)। আহলুস সুন্নাহর লোকেরা এরূপই বলে থাকে। যেমন আহমাদ বিন হাম্বাল প্রমুখ।' [মাজমূ'উ ফাতাওয়া, ৭/৬৭]
তিনি আরও বলেছেন, "মহান আল্লাহর বাণী, আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে যারা বিচার-ফায়সালা করে না, তারা কাফির, তারা জালিম, তারা ফাসিক। (সুরা মাইদাহ: ৪৪, ৪৫ ও ৪৭) এর ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস ও একাধিক সালাফ বলেছেন, 'কুফর দুনা কুফর (ছোটো কুফর), যুলম দুনা যুলম (ছোটো জুলুম), ফিসক দুনা ফিসক (ছোটো ফাসেকি)।' আহমাদ, বুখারি ও অন্যান্যরা এ বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানকে অস্বীকার করে গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা দেয়, সে কাফির। আবার যে ব্যক্তি আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানকে অস্বীকার করে আল্লাহর নাজিলকৃত আইন দিয়ে ফায়সালা দেয়, সেও কাফিরা" [মাজমূ'উ ফাতাওয়া, ৭/৫২২]
ইবনু জারীর আত-তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) এ আয়াত প্রসঙ্গে বলেছেন, "নিশ্চয় আল্লাহ সেই সম্প্রদায় সম্পর্কে ব্যাপক সংবাদ দিয়েছেন, যারা আল্লাহর কিতাবের ফায়সালাকে অস্বীকারকারী। তিনি তাদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন তারা এ ফায়সালা পরিত্যাগ করেছে, তাদের পরিত্যাগ করার পথ্যে।" তারা যে পথে পরিত্যাগ করেছে, সেটা কী? অস্বীকারের পথ। আত-তাবারী বলছেন, "তিনি তাদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন তারা এ ফায়সালা পরিত্যাগ করেছে, তাদের পরিত্যাগ করার পথে: যার দরুন তারা কাফিরা' [তাফসিরে তাবারি, ১০/৩৫৮।
তিনি আরও বলেছেন, "যারা অন্তরে অস্বীকার করে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালা দেয় না, তাদের সবার ব্যাপারে এ কথা প্রযোজ্য যে, তারা কাফির। যেমনটি বলেছেন ইবনু আব্বাস। কেননা আল্লাহ স্বীয় কিতাবে এ বিধান নাজিল করেছেন, তা জানার পরেও যে তাঁর বিধানকে অস্বীকার করে, সে ওই ব্যক্তির মতো, যে আল্লাহর নবিকে চেনার পরেও তাঁর নবুওতকে অস্বীকার করে?" [প্রাগুক্ত]
সুতরাং আল্লাহর বিধান জানার পরে যে তা অস্বীকার করে এবং গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে, সে কাফির। আমরা যে বলছি, সে কাফির, এর দ্বারা উদ্দেশ্য যে বিষয়ে শাইখ ইবনু উসাইমিন সতর্ক করেছেন উক্ত ব্যক্তি কুফরের হকদার হয়েছে। পক্ষান্তরে নির্দিষ্টভাবে তার ব্যাপারে হুকুম দেওয়া প্রসঙ্গে আমরা কাফির বলার নীতিমালায়' আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
আরেক শ্রেণি আছে, যারা আল্লাহর বিধানকে স্বীকৃতি দেয় এবং এ বিধানকে অস্বীকার না করে গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে, কিন্তু তারা মনে করে, গাইরুল্লাহর আইন ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে, আল্লাহর আইন যথার্থ নয়। এর মধ্যে আর প্রথমটির মধ্যে পার্থক্য-এ আল্লাহর আইনে বিশ্বাস করে, কিন্তু মনে করে, তা (বর্তমানে) উপযুক্ত নয়। এ ব্যক্তিও কাফির। এমনকি স্রেফ বিশ্বাসের ফলেই সে কাফির হয়ে যাবে। যদিও সে গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা না করে, কিন্তু বিশ্বাস করে, গাইরুল্লাহর আইন উপযুক্ত, ন্যায়নিষ্ঠ, তাহলেই সে কুফরের হকদার হয়ে যাবে।
যেমন কোনো ব্যক্তি আমাদের সাথে এ দেশে বাস করে। আলহামদুলিল্লাহ, এ দেশে আল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করা হয়। কিন্তু সে ব্যক্তি অন্তরে বিশ্বাস করে, ফরাসি আইন এই আইনের (আল্লাহর আইনের) চেয়ে ভালো, সেক্যুলার আইন এ আইনের চেয়ে ভালো, এ আইনের চেয়ে ন্যায়নিষ্ঠ। এ লোক এখানে গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করছে না। কিন্তু সে বিশ্বাস রাখে, গাইরুল্লাহর আইন আল্লাহর আইনের চেয়ে উপযুক্ত। (যদ্দুষ্ট- অনুবাদক) এই লোক কুফরের হকদার।
তৃতীয় অবস্থা: কোনো ব্যক্তি গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে। আর সে মনে করে, এ আইন আল্লাহর আইনের চেয়ে উত্তম ও উপযুক্ত। এ লোকও কাফির। এর সাথে আগেরটার পার্থক্য কী? আগেরজন মনে করে, আল্লাহর বিধান উপযুক্ত নয়। সে আল্লাহর বিধানকে বিশ্বাস করে, কিন্তু সেটাকে উপযুক্ত মনে করে না। আর এই লোক মনে করে, আল্লাহর আইন উপযুক্ত, তবে গাইরুল্লাহর আইন আরও বেশি উপযুক্ত। উলামাদের সর্বসম্মতিক্রমে এ ব্যক্তিও কাফির।
চতুর্থ অবস্থা: কোনো ব্যক্তি গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে; কারণ (তার কাছে) এ আইন আল্লাহর আইনের সমপর্যায়ভুক্ত। সে বলে, আল্লাহর আইন উপযুক্ত, এই আইনও উপযুক্ত। উভয়ই সমান। উভয় বিধানই ন্যায় বাস্তবায়ন করে। আমরা যদি এ বিধান দিয়ে ফায়সালা করে, তাহলে এটা ন্যায় বাস্তবায়ন করবে। আবার এই বিধান দিয়ে ফায়সালা করলেও তা ন্যায় বাস্তবায়ন করবে। এ লোকও কাফির, তথা কুফরের হকদার। এ পর্যন্ত যেসব বিধান আলোচিত হলো, সবগুলো সর্ববাদিসম্মত, এসব নিয়ে উলামাদের কোনো মতভেদ নেই।
পঞ্চম বিধান: কোনো ব্যক্তি গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে। আর সে বিশ্বাস রাখে, আল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করা অত্যাবশ্যক, এবং আল্লাহর আইনই উপযুক্ত ও ফলদায়ক। তথাপি সে পার্থিব স্বার্থে যে স্বার্থ তাকে পরাভূত করেছে- মসনদের জন্য গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে। দুনিয়াবি স্বার্থ না থাকলে সে আল্লাহর নাজিলকৃত আইন দিয়েই ফায়সালা করত। কিন্তু সে ধারণা করে, আল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করলে দুনিয়া তার হাতছাড়া হয়ে যাবে, পাশাপাশি সে এ বিশ্বাসও রাখে যে, আল্লাহর আইনই উপযুক্ত, তাহলে এ লোক চরম ভয়াবহতাসম্পন্ন, মহা অপরাধী। তবে সে বড়ো কুফর সংঘটনকারী কাফির নয়, যা সম্পাদন করলে ব্যক্তি ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়।
যে পর্যন্ত সে বিশ্বাস রাখে, আল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করা আবশ্যক, আল্লাহর আইনই উপযুক্ত ও ফলদায়ক; কিন্তু সে কেবল দুনিয়াবি স্বার্থে গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে, সে পর্যন্ত সে কাফির হবে না। এ ধরনের ব্যক্তি উলামাদের নিকট দু ধরনের:
এক. যে সাময়িক সময়ের জন্য গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে। সর্বদা নয়, বরং সাময়িক সময়ের জন্য। ব্যাপারটি যেন এমন তাকে ঘুষ দেওয়ার দরুন সে কোনো একটি ক্ষেত্রে গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করেছে। এ লোক ফাসেক, বড়ো গুনাহগার।
দুই. যে নিরবচ্ছিন্নভাবে (অবিরামভাবে) গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে। সাময়িক সময়ের জন্য দু একটি ক্ষেত্রে নয়। বরং সকল ফায়সালায় অব্যাহতরূপে গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে। শাসকের ভয়ে, কিংবা মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এ কাজ করে। সে বিশ্বাস রাখে, আল্লাহর আইন সর্বোত্তম, কিন্তু ফায়সালা করে গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে। এ লোক কাফির হবে না, কিন্তু প্রথমজনের চেয়ে এ গুরুতর অপরাধী, চরম নিকৃষ্ট, বিপজ্জনক পর্যায়ের পাপী, নিজের প্রতি জুলুমকারী এবং অপরের প্রতিও জুলুমকারী। মহান আল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে যারা বিচার-ফায়সালা করে না, তারাই জালেম।" [সুরা মাইদাহ: ৪৫] এ হলো জালেম। তবে এ জুলুমের বিভিন্ন পর্যায় আছে। জুলুমের ক্ষেত্রে জালেমরা বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে।
আমাদের জানামতে এই ব্যাখ্যাপূর্ণ বিবরনই উম্মতের সালাফদের থেকে বর্ণিত হয়েছে। এই ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্যই প্রদান করেছেন শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ), শাইখুল ইসলাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ), আমাদের সামসময়িক উলামাদের মধ্যে শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ), শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)। এ ব্যাপারে সালাফদের বক্তব্য অনুসন্ধান করা হয়েছে। হুকুম প্রদানে এরকম শ্রেণিবিভাগ এবং ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্য আহলুস সুন্নাহর পঞ্চাশোর্ধ্ব আলিম থেকে সুসাব্যস্ত হয়েছে। আমি নিজে আমার সাধ্য অনুযায়ী পূর্ববর্তী উলামাদের এমন বক্তব্য অনুসন্ধান করেছি, যাতে ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্য নেই। কিন্তু এরকম বক্তব্য আমি পাইনি। আমি পূর্ববর্তী উলামাদের বক্তব্যে যা দেখেছি, তা কেবল ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্য, যা আমরা আলোচনা করেছি।
ইবনুল আরাবী আল-মালিকী বলেছেন, "তাউস প্রমুখ বলেন, এটা ইসলাম থেকে খারিজকারী কুফর নয়, বরং তা ছোটো কুফর।" [আল-জুমু'উল বাহিয়্যাহ লিল আক্বীদাতিস সালাফিয়‍্যাহ, ২/৩৮৯] ইবনুল আরাবী আরও বলেছেন, "এর বিধান বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। সে নিজের কোনো বিধান দিয়ে ফায়সালা করে যদি আল্লাহর বিধান বলে চালিয়ে দেয়, তাহলে তা আল্লাহর আইনকে 'তাবদীল' করার অন্তর্ভুক্ত হবে, যা কুফরকে অপরিহার্য করে (অর্থাৎ এ কাজের কাজি কাফির হয়ে যাবে)। কিন্তু সে যদি প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে, অবাধ্যতাবশত গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে, তাহলে তা হবে পাপ। পাপীদের ক্ষমার ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহর মূলনীতি অনুযায়ী উক্ত পাপ ক্ষমার আওতাভুক্ত হবে।"
শাইখ ইবনু বাম (রাহিমাহুল্লাহ) গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে কৃত ফায়সালা প্রসঙ্গে বলেছেন, "এ ব্যাপারে ব্যাখ্যাপূর্ণ আলোচনার অবকাশ রয়েছে। এ বিষয়ে বলা হবে, যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করে, অথচ সে জানে, আল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করা ওয়াজিব, এবং সে নিজে শরিয়তবিরোধী কাজ করেছে: কিন্তু সে এ বিষয়কে বৈধ মনে করে, সে মনে করে, এতে কোনো সমস্যা নেই, গাইরুল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা করা তার জন্য বৈধ, তাহলে সে সকল উলামার নিকটে বড়ো কুফর সংঘটনকারী কাফির।' এরপর তিনি আমার উল্লিখিত ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্য পেশ করেছেন। তারপর তিনি বলেছেন, "এ বক্তব্যই উলামাদের কাছে সুবিদিত।” [মাজমূ'উ ফাতাওয়া লিবনি বাঘ, ৫/৩৫৫]
**ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্য না দিলে যখন ব্যক্তিকে তাকফীরী' বলা হবে**
যদি আমরা এমন কোনো আলিম কিংবা তালিবুল ইলমকে পাই, যে এ বিষয়ে ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্য দেয় না (ব্যাখ্যাবিহীন এজমালি হুকুম দেয়), তাকে কি আমরা 'তাকফীরী (অন্যায়ভাবে কাফির আখ্যাদাতা)' বলব? আমরা কি বলব, এই ব্যক্তি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মত থেকে খারিজ?
উত্তর: না। বিষয়টি নিঃশর্ত নয়। এ ধরনের লোককে হুকুম দেওয়ার ক্ষেত্রেও (তাকফীরী বলার ক্ষেত্রে) ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্যের অবকাশ রয়েছে। কথক যদি তাদের একজন হয়, যারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আদর্শ অনুযায়ী কথা বলে, আহলুস সুন্নাহর দলিলগ্রহণের মতোই দলিলগ্রহণ করে এবং নিঃশর্তভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাফির বলতে এ মত প্রয়োগ না করে, তাহলে সে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত বিবেচিত হবে। যদিও আমরা বিশ্বাস করি, এ বিষয়ে ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্য না দিয়ে সে ভুল করেছে, এবং ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্যই আহলুস সুন্নাহর পূর্ববর্তী উলামাদের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অভিমত (এজমালি মন্তব্য নয়)।
পক্ষান্তরে কথক যদি তাদের কেউ হয়, যারা আহলুস সুন্নাহর মানহাজ অনুসরণের ব্যাপারে পরিচিত নয় এবং সে নিঃশর্তভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাফির বলার জন্য ব্যাখ্যাবিহীন (এজমালি) বক্তব্য দেয়, তাহলে সে আহলুস সুন্নাহর বিরোধী তাকফীরীদের একজন হিসেবেই বিবেচিত হবে। পাথরকুচির স্থলে খেজুর রাখা উচিত নয়। তালিবুল ইলমের উচিত নয়, নুড়িপাথরের জায়গায় খেজুর রেখে দেওয়া। বরং প্রতিটি বস্তু তার উপযুক্ত জায়গাতেই রাখতে হবে।
আমি এরকম বলছি কেন? কারণ আমি কিছু তালিবুল ইলমকে দেখেছি, তারা যখন লক্ষ করে, হক-পরিপন্থি তাকফীরীরা ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্য দেয় না, তখন তারা ব্যাখ্যাপূর্ণ বক্তব্য দেয় না- এমন সবার ওপর জবানদরাজি করে (সবাইকে ঢালাও তাকফীরী আখ্যা দেয়)। যদিও সে আহলুস সুন্নাহর পরিচিত ব্যক্তিদের একজন হয়, এমনকি যদিও তিনি আহলুস সুন্নাহর পরিচিত উলামাদের একজন হন। অপরপক্ষে আমি এমন কিছু তালিবুল ইলমকে দেখেছি, তারা যখন লক্ষ করে, আমাদের সামসময়িক কিছু সুন্নাহপন্থি আলিম ব্যাখ্যাহীন অভিমত পোষণ করেন, তখন তারা এমন কাউকেই আর তাকফীরী বলে না যারা ব্যাখ্যাবিহীন (এজমালি) বক্তব্য দেয়। তারা বলে, এ লোক কিছু গ্রহণযোগ্য উলামার অভিমত অনুযায়ী মত ব্যক্ত করেছে। এটাও ভুল। বরং প্রতিটি বস্তু রাখতে হবে তার উপযুক্ত জায়গাতে।
আমি এই আলোচনা সমাপ্ত করব, এরকম ক্ষেত্রে শাইখ ইবনু বায প্রদত্ত মহান উপদেশ দিয়ে। তিনি বলেছেন, "প্রত্যেক মুসলিমের, বিশেষ করে উলামাদের কর্তব্য হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে এবং নানাবিধ ক্ষেত্রে হুকুম দেওয়ার সময় কিতাব, সুন্নাহ ও সালাফদের মানহাজ অনুযায়ী সুনিশ্চিত হওয়া। আর সেই ক্ষতিকর পথ থেকে সতর্ক থাকা, যে পথে চলেছেন অসংখ্য মানুষ হুকুম লাগানো এবং এজমালি (ব্যাখ্যাহীন) বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে। ব্যাখ্যাপূর্ণ বিবরণ পেশ করে এবং কিতাব-সুন্নাহর দলিল দিয়ে মানুষের কাছে ইসলামকে স্পষ্ট করে মহান আল্লাহর পথে মানুষকে দাওয়াত দিতে সচেষ্ট হওয়া উলামাদের কর্তব্য। ইসলামের ওপর অবিচল থাকতে উৎসাহপ্রদান, পারস্পরিক উপদেশ-নসিহত দেওয়ার পাশাপাশি ইসলামী বিধিবিধানপরিপন্থি সকল বিষয় থেকে সতর্ক করাও তাঁদের কর্তব্য।" (মাজমূ'উ ফাতাওয়া লিবনি বাষ, ৫/৩৫৭]
এটি একটি মহান উপদেশ। প্রত্যেক মুসলিমের উচিত মহান আল্লাহকে ভয় করা, ন্যায়নিষ্ঠ সালাফদের পথ অবলম্বন করা, উলামাদের ব্যক্তীকৃত ব্যাখ্যাপূর্ণ বিবরণ জেনে নেওয়া এবং সেই পথে নিপাতিত না হওয়া, ব্যাখ্যাপূর্ণ কথা বাদ দিয়ে যে পথ অবলম্বন করেছে কতিপয় মানুষ, অথচ সে বিষয়ে ব্যাখ্যাপূর্ণ বিবরণ দেওয়া জরুরি। এটাই ছিল এই মাসআলাহ।
আমাদের সবার অন্তরে একটি প্রশ্নের উদ্রেক হয়। এতসব সম্ভাবনা যদি অবশিষ্ট থাকে, তাহলে আমরা এ কাজের কাজিকে হুকুম দিব কীভাবে? মানে আপনারা তো বলছেন, 'সে যদি এ বিশ্বাস রেখে ফায়সালা করে,' 'সে যদি এই বিশ্বাস রেখে ফায়সালা করে, সে যদি এরকম বিশ্বাস রেখে ফায়সালা করে সবই তো সম্ভাবনা। তাহলে এ কাজের কর্তাকে হুকুম দিব কীভাবে?⁵ এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগামীকালের মজলিসে আমরা এ বিষয়ে মৌলিক আলোচনা করব, যে মজলিসে আমরা খাস করে শুধু কাফির বলার মূলনীতি নিয়েই আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ। যাতে করে এ জাতীয় বিষয়ে একজন মুসলিমের সঠিক অবস্থান কী হবে, তা আমরা জেনে নিতে পারি। সে যাহোক, শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব এ মাসআলাহয় যা বলেছেন, তা আমরা সম্পূর্ণ করে নিই।
**(এ আলোচনা অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত)**
**তাগুতী কোর্টে বিচারপ্রার্থী হওয়ার বিধান**
আল্লাহর শরিয়তবিরোধী আইনই তাগুত। তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া কুফর। কারণ মহান আল্লাহ বলেছেন, "তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ করনি, যারা দাবি করে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তার প্রতি তারা ইমান রাখে? অথচ তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও তাদেরকে আদেশ করা হয়েছিল, তারা যেন তাগুতকে অস্বীকার করে।" [সুরা নিসা: ৬০] এ আয়াতে তাদের ইমানকে নাকচ করা হয়েছে, যারা গাইরুল্লাহর কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও তারা নিজেদের মুমিন বলে ধারণা করে। শাইখুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের পৌত্র ইমাম সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত আয়াত প্রসঙ্গে বলেছেন, "এই আয়াতে এ বিষয়ের দলিল রয়েছে যে, তাগুতের কাছে- তথা কিতাব ও সুন্নাহ ব্যতীত অন্যকিছুর কাছে বিচারপ্রার্থনা না করা ফরজ বিধানগুলোর অন্যতম। তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থনাকারী ব্যক্তি মুমিন নয়, এমনকি মুসলিমও নয়া' [তাইসীরুল আযীযিল হামীদ (তাহকিক: ড. উসামাহ আল-উতাইবী), পৃষ্ঠা: ৯৬৩] ইমাম সুলাইমানের এ বক্তব্যে ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে।
কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর আইনকে অহংকারবশত প্রত্যাখ্যান করে, কিংবা আল্লাহর আইনকে অপছন্দ করে, কিংবা ব্যবসাবাণিজ্য, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি প্রভৃতিতে আল্লাহর আইনের প্রবেশকে অপছন্দ করে এবং এ বিশ্বাস নিয়ে তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়, তাহলে সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর আইনের চেয়ে অন্য আইনকে ভালো মনে করে, কিংবা সমপর্যায়ের মনে করে, কিংবা আল্লাহর আইনের বিপরীত আইন দিয়ে ফায়সালা করা বৈধ মনে করে এবং এসব বিশ্বাসের কোনো একটি নিয়ে তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়, তাহলেও সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। এগুলো সবই ব্যক্তির বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত এবং এগুলোর প্রত্যেকটি সর্ববাদিসম্মত অভিমত, এ বিষয়ে উলামাদের কোনো মতানৈক্য নেই।
কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানের প্রতি সন্তোষ নিয়ে এবং স্বীয় কৃতকর্মের দরুন নিজেকে পাপী হিসেবে বিশ্বাস রেখে তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়, সে ব্যক্তি ফাসেক, বড়ো গুনাহগার, তবে কাফির নয়। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়‍্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) এ ধরনের ব্যক্তিদের ব্যাপারে বলেছেন, "হালালকে হারাম করা ও হারামকে হালাল করার ক্ষেত্রে তাদের ইমান ও আক্বীদাহ সুসাব্যস্ত থাকে। কিন্তু তারা আল্লাহর অবাধ্যতায় তাদের (তাগুতদের) অনুসরণ করে। যেমন একজন মুসলিম এমন পাপকর্ম সম্পাদন করে, যেগুলোকে সে পাপ বলে বিশ্বাস রাখে। সুতরাং এদের বিধান হবে তাদের অনুরূপ গুনাহগারদের মতোই।' [মাজমূ'উ ফাতাওয়া, ৭/৭০]
কিন্তু যে ব্যক্তি তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে বাধ্য হয়, তার কোনো গুনাহ নেই। কারণ সে নিরুপায়। এ বিষয়ে আল্লামাহ সুলাইমান আর-রুহাইলী চমৎকার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, "একটি বিষয় অবশিষ্ট রয়ে গেছে। যে বিষয়ে উলামারা আলোচনা করেছেন, আর মানুষদেরও এরূপ আলোচনার প্রয়োজন আছে। বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করাও জরুরি। সেটা হলো বাধ্য বা নিরুপায় হলে আল্লাহর শরিয়তবিরোধী আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়ার বিধান। মানুষ যখন নিরুপায় হয়; যেমন কোনো মুসলিম ব্যবসায়ী কোনো একজন কাফির ব্যবসায়ীর সাথে ওই কাফিরের দেশে বাণিজ্যিক লেনদেনে লিপ্ত হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের মাঝে বিবাদ দেখা দিয়েছে।
এখন কোনো মুসলিম দেশের শরয়ী কোর্টের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া সেই ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা ঘটনা ঘটেছে কাফির রাষ্ট্রে। এখন সেই মুসলিমের সামনে দুটো পথ হয় সে কাফির রাষ্ট্রের কোর্টে বিচারপ্রার্থী হবে, যেসব কোর্ট আল্লাহর শরিয়তবিরোধী আইন দিয়ে ফায়সালা করবে, আর নাহয় সে নিজের হক জলাঞ্জলি দিবে। তার সামনে এ দু পথের যেকোনো একটি খোলা রয়েছে। কেউ এর চেয়েও নিরুপায় হতে পারে। যদি সেই কাফির ব্যবসায়ী তার দেশের কোর্টে মামলা দায়ের করে, তাহলে এক্ষেত্রে মুসলিম ব্যবসায়ীর কোনো এক্তিয়ার থাকে না-সে মামলা দায়ের করবে, কি করবে না। মামলা দায়ের হয়ে গেছে, সে এখন (কোটে যেতে) বাধ্য।
নিরুপায় হওয়ার আরও একটি দৃষ্টান্ত, যা ইউরোপে বসবাসরত মুসলিমদের মাকে পাওয়া যায়। যেমন কোনো ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীকে পরিত্যাগ করল এবং তাকে তালাক দিতেও অস্বীকার করল। এখন এ মহিলা হয় দীর্ঘজীবন কাটিয়ে দেবে ঝুলন্ত অবস্থায়, যে না বিবাহিত, আর না তালাকপ্রাপ্ত; থাকবে ফিতনা ও মুসিবত নিয়ে। অন্যথায় সে ওই সকল রাষ্ট্রের কোর্টে বিচার দায়ের করবে, যেসব কোর্ট তার পক্ষে ফায়সালা দেবে। সে আছে নিরুপায় অবস্থায়।
এক্ষেত্রে কিছু উলামা বলেন, মুসলিম ব্যক্তি তার হক বিসর্জন দেবে, যে পর্যন্ত না তার নিরুপায় অবস্থা প্রবল আকার ধারণ করছে। তাঁরা বলেন, তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়ার ব্যাপারটি বিপজ্জনক, বিধায় ওই সকল কোটে মামলা উত্থাপন করা না- জায়েজ, যে পর্যন্ত না তার নিরুপায় অবস্থা চরমে পৌঁছে, যখন বিলকুল তার আর কোনো এক্তিয়ার থাকে না। যেমনটি আমি দ্বিতীয় উদাহরণে উল্লেখ করেছি। কাফিরের তরফ থেকে মামলা উঠানো হয়ে গেছে, মামলায় না এসে কোনো উপায় নেই। অন্যথায় সে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হয়তো তার সমুদয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। অথবা আমরা যে মহিলার উদাহরণ দিলাম, সে যদি তরুণী হয় এবং এরকম অবস্থা চলতে থাকলে নিজের দ্বীন ও ইজ্জতের ব্যাপারে সে ক্ষতির আশঙ্কা করে, তাহলে তখন জায়েজ আছে (তাগুতী কোর্টে মামলা দায়ের করা)।
তবে অধিকাংশ উলামার মতে- আর এ মতটিই প্রাধান্যযোগ্য সেসব আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে বৈধ আছে। যথা:
১ম শর্ত: সে এসব আইনকে অপছন্দ করবে, এসবের প্রতি সন্তুষ্ট হবে না। বরং তার অন্তর এ বিষয়ের প্রতি প্রশান্ত থাকবে যে, কেবল আল্লাহর শরিয়তই হক। কিন্তু সে নিরুপায়। সে বাধ্য হয়ে ঘৃণা নিয়ে সেসব আইনের কাছে গমন করছে।
২য় শর্ত: ক্ষতির ব্যাপারটা সুনিশ্চিত হতে হবে, কল্পিত বা সম্ভাব্য হওয়া যাবে না। বরং সুনিশ্চিত ও বাস্তবিক হতে হবে।
৩য় শর্ত: ক্ষতিটা বড়ো ধরনের হতে হবে। ১০ হাজার বা ২০ হাজারের মামলা হলে চলবে না; যার ফলে এরকম অর্থকড়ি হারানোর যে অনিষ্ট, তারচেয়ে ওই সকল আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়ার অনিষ্টই বড়ো হয়ে যায়। বরং ক্ষতি হতে হবে বড়ো ধরনের, যার অনিষ্ট ভয়াবহ।
৪র্থ শর্ত: ওই সমস্ত কোট ছাড়া অন্য কোনো পথ না থাকা। যেমন আমরা যে মহিলার উদাহরণ দিলাম, তার ক্ষেত্রে যদি এমন হয়, সেখানে একটি ইসলামী মারকায আছে, যা শরিয়ত অনুযায়ী বিচার-বিশ্লেষণ করবে এবং তার জন্য এমন ফায়সালা দিবে, যা থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই; তাহলে সেই মহিলার জন্য ওইসব কোটে যাওয়া জায়েজ নয় (বরং সে ওই মারকাযে যাবে)।
৫ম শর্ত: বিচারপ্রার্থী তার শরয়ী অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এরচেয়ে বেশি নিবে না। অর্থাৎ শরয়ী কোর্টে বিচারপ্রার্থী হলে তারা যে ফায়সালা দিত, তদনুযায়ী সে তার প্রাপ্য শরয়ী অধিকারটুকুই গ্রহণ করবে, এরচেয়ে বেশি নিবে না। তার শরয়ী অধিকারের চেয়ে যা অতিরিক্ত থাকে, তা গ্রহণ করা তার জন্য জায়েজ নয়, যদিও সেই কোর্ট তাকে অতিরিক্ত প্রাপ্যের ফায়সালা দিয়েছে। বরং সে তার শরয়ী অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।' [আল্লামাহ সুলাইমান আর-রুহাইলী কৃত শারহু কিতাবিত তাওহীদ, পৃষ্ঠা: ১২৯৬-১২৯৮]
নিরুপায় হলে নিজের অধিকার গ্রহণের জন্য এরূপ কোর্টে বিচারপ্রার্থী হওয়া জায়েজ আছে মর্মে মত ব্যক্ত করেছেন ইমাম ইবনু বায এবং ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুমাল্লাহ)। [মাজমূ'উ ফাতাওয়া লিবনি বাঘ, ২৩/২১৪; আশ-শারহুল মুমতি, ৪/২৪৪]
এখানে আরেকটি বিষয় রয়েছে। গাইরুল্লাহর আইন অনুযায়ী ফায়সালা দেয়, এমন কোটের কোনো আইন যদি শরিয়তের আইনের সাথে মিলে যায়, তখন এটা জেনে উক্ত কোটে বিচারপ্রার্থী হওয়া জায়েজ। অর্থাৎ শুধু ওই আইনের ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থী হওয়া জায়েজ আছে। আল্লামাহ সালিহ বিন আব্দুল আযীয আলুশ শাইখ (হাফিযাহুল্লাহ) এ ব্যাপারে বলেছেন, "সে যদি জানে, এ বিষয়ে শরিয়তে তার হক আছে, তারপর এটা জেনে সে শরিয়তবিরোধী আইনের বিচারপতির কাছে মামলা দায়ের করে; কারণ সে জানে, শরয়ী আইনের সাথে উক্ত আইনের মিল রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি শরিয়তবিরোধী আইনের বিচারপতির কাছে তার বিবাদীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে, যেহেতু সে জানে, শরিয়ত তাকে এক্ষেত্রে প্রাপ্য অধিকার দেবে, আবার শরয়ী আইনের সাথে এই আইনের মিলও রয়েছে; তাহলে আমার মতে বিশুদ্ধ অভিমত হলো-এ কাজ বৈধ।
কতিপয় উলামা বলেন, 'সে এ কাজ করবে না, যদিও এ মামলায় তার অধিকার রয়েছে?' মহান আল্লাহ মুনাফেকদের ব্যাপারে বলেছেন, 'হক তাদের পক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রসুলের কাছে ছুটে আসে।' (সুরা নূর: ৪৯) অতএব যে মনে করে, শরিয়তে তার জন্য অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। সে নিজের জন্য শরিয়ত ব্যতীত অন্যের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া বৈধ মনে করে না। কিন্তু আল্লাহ তার জন্য যা বিধিসম্মত করেছেন, সেরকম কিছু তার কাছে উপনীত হলে সেকথা স্বতন্ত্র। এটা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চাওয়ার আওতাভুক্ত হবে না।" [আল্লামাহ সালিহ আলুশ শাইখ কৃত শারহু ফাতহিল মাজীদ, ৩/২৯]
অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত আলোচনা এখানেই সমাপ্ত।
**তাগুতকে অস্বীকার করা ওয়াজিব হওয়ার দলিল**
মূলপাঠ: এর দলিল-মহান আল্লাহর বাণী, 'দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হেদায়েত সুস্পষ্ট হয়ে গেছে গোমরাহি হতে। সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনল, সে অবশ্যই দৃঢ়তর রজ্জু (ইসলাম) ধারণ করল, যা ছিন্ন হওয়ার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।' (সুরা বাকারা: ২৫৬)
ব্যাখ্যা: তাগুতকে অস্বীকার করা, তাগুতের সকল প্রকার ও শ্রেণিকে অস্বীকার করা এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনা যে ওয়াজিব, তার দলিল মহান আল্লাহর এই বাণী, 'দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।' এই বাক্য ভালোভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি। দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই। এর মানে এই দ্বীন জবরদস্তির প্রয়োজনমুক্ত। কারণ এর নিদর্শনগুলো প্রকাশ্য, সুস্পষ্ট। বিধায় এ দ্বীনে বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন পড়ে না। এর মানে এই নয় যে, মানুষেরা তাদের নিজ নিজ ধর্মে স্বাধীন। যেমনটি বুঝেছে কিছু অজ্ঞ লোক। তারা বলে, 'দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।' এর মানে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্মে স্বাধীন।
আয়াতের অর্থ এটা নয়। বরং আয়াতের মানে, এই দ্বীন বাধ্যবাধকতার প্রয়োজনমুক্ত। কেন? কারণ এর নিদর্শনাবলি সুস্পষ্ট। যার কাছে এই দ্বীন পৌঁছেছে, তার কাছে নিদর্শনাবলি স্পষ্ট হয়ে গেছে। বাধ্যবাধকতার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই দ্বীনের প্রতি আত্মসমর্পণ করা, এই দ্বীনকে মেনে নেওয়া তার জন্য ওয়াজিব। কেননা যে মানুষের কাছেই এ দ্বীন পৌঁছার পর তা পরিত্যক্ত হয়েছে, তা কেবল তার বিমুখতার দরুনই হয়েছে। ইসলাম যার কাছে পৌঁছার পর বর্জিত হয়েছে, তা কেবল বিমুখ হওয়ার দরুনই হয়েছে। 'দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই' -এ কথার অর্থ এটাই।
'নিশ্চয় হেদায়েত সুস্পষ্ট হয়ে গেছে গোমরাহি থেকে'-এ কথাটি পূর্বের বাক্যকে ব্যাখ্যা করছে। এই বাক্যটি যেন কারণ বর্ণনা করছে। 'দ্বীনের মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।' কারণ কী? কারণ 'হেদায়েত সুস্পষ্ট হয়ে গেছে গোমরাহি থেকে।' এ দ্বীনের সরল পথ সুস্পষ্ট, এর বিপরীতে যা কিছু আছে, তার সবই ভ্রষ্টতা। তাই সবার ওপর এ দ্বীনের অনুসরণ করা ওয়াজিব। এটা সুস্পষ্ট দৃঢ়মূল দ্বীন। সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনল।'
এখানে দুটি শর্তের কথা বলা হয়েছে; আয়াতে উদ্ধৃত 'এ' শব্দটি শর্তবাচক। তাহলে শর্ত মোট দুটি। 'যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনল, সে অবশ্যই দৃঢ়তর রজ্জু ধারণ করল।' এর মানে যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করেনি, সে দৃঢ়তর রজ্জু ধারণ করেনি। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ইমান আনেনি, সে দৃঢ়তর রজ্জু ধারণ করেনি। এটাই লা ইলাহা ইল্লাল্লার অর্থ নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিক,⁶ যে বিষয়ে ইতঃপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

টিকাঃ
² যুগশ্রেষ্ঠ নাজদী বিশ্বান ইমাম আবা বুতাইনের বক্তব্য ভালো করে লক্ষ করুন। বাতিলের দিকে আহ্বানকারী যত দাঈ বা লেখক বা বরুণ আছে, তারা সবাই তাজত হিসেবে বিবেচিত হবে, যখন মানুষ বাতিলের ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করবে। সুতরাং যুগে যুগে বাতিলের আহ্বায়ক এবং কুফর ও বিদ'আতের ইমামরাও তাগুত। যদিও তাদের অধিকাংশকেই তাগুত মনে করা হয় না। আল্লাহ আমাদেরকে যাবতীয় তাগুতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদেরকে ও তাদের অনুসারীদেরকে যথাযথ ঘৃণা করার তৌফিক দিন (আমীন) ।- অনুবাদক
³ বিশুদ্ধ মতানুসারে আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাদেরকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছিলেন। যেমন সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, ইকরিমাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একটি সম্প্রদায়কে পুড়িয়েছেন। ইবনু আববাস (রাদিয়াল্লাহ আনহুমা)'র কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বলেন, আমি হলে তাদেরকে পুড়াতাম না। কারণ নবি ﷺ বলেছেন, 'তোমরা আল্লাহর শাস্তি দিয়ে শাস্তি প্রধান কোরো না। তবে অবশ্যই আমি তাদেরকে হত্যা করতাম। যেহেতু নবি বলেছেন, 'যে তার দ্বীন বদলে ফেলে, তোমরা তাকে হত্যা করো। (সহিহ বুখারি, ২০২৮৫৪) - অনুবাদক
⁴ শাইখ সুলাইমান আর-রুহাইলী (হাফিযাহুল্লাহ) দ্বিতীয় অবস্থা উল্লেখ করেননি
⁵ আমরা এ বিষয়ে অনেক আগে "ইস্তিহলালের (হারামকে হালাল করা) সংজ্ঞা এবং তাকর্মীরীদের জাহালাত" শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধে আলোচনা করেছি। ওয়ালিল্লাহিল হামদ। অনুবাদক।
⁶ তাওহীদী কালিমার দুটি অংশ রয়েছে। একটি নেতিবাচক কোনো সত্য ইলাহ নেই (লা ইলাহা), আরেকটি ইতিবাচক কেবল আল্লাহই সত্য ইলাহ (ইল্লাল্লাহ)। সুরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতেও এ দুটি দিকের উল্লেখ রয়েছে। তাগুতকে অস্বীকার করা নেতিবাচক দিক, আর আল্লাহর প্রতি ইমান আনা ইতিবাচক দিক। অনুবাদক।

📘 তাগুত বিষয়ে বিস্তারিত > 📄 কীভাবে সম্পন্ন হবে তাগুতের প্রতি অস্বীকার?

📄 কীভাবে সম্পন্ন হবে তাগুতের প্রতি অস্বীকার?


(এ আলোচনা অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত)
আমরা তাগুতের পরিচয় জানলাম। এখন আমাদের জানা দরকার, তাগুতকে অস্বীকার করার পদ্ধতি কী। আমরা ঠিক কীভাবে তাগুতকে অস্বীকার করব? শাইখুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) এ বিষয়ে বলেছেন, "তাগুতকে অস্বীকারের স্বরূপ হলো- তুমি গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের) ইবাদত করাকে বাতিল হিসেবে বিশ্বাস করবে, গাইরুল্লাহর ইবাদতকে বর্জন ও ঘৃণা করবে, গাইরুল্লাহর ইবাদতকারী মুশরিকদের কাফির বলবে এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখবে (অর্থাৎ তাদেরকে শত্রু গণ্য করবে)।
পক্ষান্তরে আল্লাহর প্রতি ইমান আনয়নের অর্থ-তুমি বিশ্বাস রাখবে, কেবল এক আল্লাহই সত্য উপাস্য। সকল ইবাদতকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করবে এবং আল্লাহ ব্যতীত সমুদয় উপাস্যের ইবাদতকে নাকচ করবে (অর্থাৎ গাইরুল্লাহর ইবাদত করবে না)। একনিষ্ঠ তাওহিদবাদীদের ভালোবাসবে এবং তাদের সাথে মিত্রতা রাখবে। আর মুশরিকদের ঘৃণা করবে এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখবে।" [শাইখ সালিহ আল-ফাওযান কৃত শারহু মা'নাত তাগুত, পৃষ্ঠা: ১৬-২০; দারুল ইমাম আহমাদ (কায়রো) কর্তৃক প্রকাশিত: সন: ১৪২৭ হি/২০০৬ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
ইমাম সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেছেন, "অবশ্যই এ বিষয়গুলো থাকতে হবে। প্রথমত, তুমি জেনে নিবে, তাগুত বলতে কী বোঝায়। কারণ এটা তোমার জানা না থাকলে তাগুতকে বর্জন করা তোমার পক্ষে সম্ভব হবে না। একটি অজ্ঞাত-অজানা বিষয়কে তুমি কীভাবে বর্জন করবে?! দ্বিতীয়ত, তুমি যখন তাগুতের পরিচয় জেনে নিবে, তখন তাগুতকে বর্জন করা তোমার জন্য সহজ হয়ে যাবে (অর্থাৎ এ পর্যায়ে তাগুতকে বর্জন করতে হবে)। তৃতীয়ত, তুমি যখন তাকে বর্জন করবে, তখন অবশ্যই তার সাথে তোমাকে বৈরিতা রাখতে হবে, তাকে ও তার অনুসারীদেরকে ঘৃণা করতে হবে এবং আল্লাহর জন্য তাদের সাথে শত্রুতা রাখতে হবে।' [শারহু মা-নাত তাগুত, পৃষ্ঠা: ১৭]
ইমাম ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) আরও বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহকে এক বলে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাগুতকে অস্বীকার করেছে, তাকে অবশ্যই আল্লাহর মিত্রদের প্রতি তথা তাওহিদবাদীদের প্রতি ভালোবাসা রাখতে হবে এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। অপরপক্ষে মুশরিকদের ঘৃণা করতে হবে এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখতে হবে। কেননা আল্লাহ তাদের ঘৃণা করেন। আল্লাহ যাকে ঘৃণা করেন, তুমিও তাদের ঘৃণা করবে। কিন্তু যে বলে, আমার কেবল নিজের ওপরই অধিকার আছে। আমি কোনো মানুষের সাথে বৈরিতা রাখব না, কাউকে ঘৃণা করব না, কাউকে কাফিরও বলব না। আমরা তাকে বলব, তুমি তাগুতকে অস্বীকার করোনি। কারণ তাগুতকে অস্বীকার করলে আল্লাহর শত্রুদের ঘৃণা করা এবং তাদের সাথে বৈরিতা রাখা অপরিহার্য। (সুরা মুজাদালাহ: ২২)... সুতরাং যার কাছে সকল মানুষ সমান, সে তাগুতকে অস্বীকার করেনি। তাগুতকে কেবল সে-ই অস্বীকার করেছে, যে বৈরিতা ও মিত্রতা করেছে আল্লাহর জন্য, আবার ভালোবাসা ও ঘৃণাও করেছে আল্লাহর জন্য।' [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২০-২১।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, তাগুতকে অস্বীকার করতে হলে তাগুতের কর্মকে বাতিল বলে বিশ্বাস করতে হবে, তাগুতকে ঘৃণা করতে হবে এবং তাগুতের অনুসারীদের प्रति বিদ্বেষ পোষণ করতে হবে। আর তাগুতের অনুসারীরা যদি কাফির হয়, তাহলে তাদেরকে কাফির বলতে হবে। পক্ষান্তরে যারা কাফির নয়, তাদেরকেও ঘৃণা করতে হবে, তাদের বিরোধিতা করতে হবে; যদিও ইমানি ভ্রাতৃত্বের দরুন তাদের প্রতি অবশিষ্ট থাকবে আমাদের ভালোবাসাও। স্মর্তব্য যে, সকল তাগুত কাফির নয়, তদ্রুপ তাগুতের অনুসারী মাত্রই সে কাফির নয়। এ সম্পর্কে তাগুতের পরিচিতি-বিষয়ক আলোচনায় আমরা কিঞ্চিৎ জেনেছি। সামনে শাইখ সুলাইমানের আলোচনায় আরও জানব, ইনশাআল্লাহ।
প্রয়োজনীয় বিবেচনায় মুসলিমের ভালোবাসা ও ঘৃণা বিষয়ে একটি মৌলিক আলোচনা এখানে তুলে ধরছি।
একজন মুসলিম মানুষের সাথে কীভাবে বৈরিতা ও মিত্রতা পোষণ করবে, তার বর্ণনা কুরআন সুন্নাহয় এসেছে। বৈরিতা ও মিত্রতার ক্ষেত্রে মানুষ তিনভাগে বিভক্ত। যথা:
১ম ভাগ: যাদেরকে খাঁটি ও নিষ্কলুষভাবে ভালোবাসতে হবে, যাদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখা যাবে না। তাঁরা হলেন খাঁটি মুমিন সম্প্রদায়। যেমন: নবিগণ, সিদ্দিকগণ, শহিদগণ ও সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ। আল্লাহ বলেছেন, "যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ও আমাদের যেসব ভাই ইমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; আর যারা ইমান এনেছিল তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না: হে আমাদের প্রতিপালক, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।" (সুরা হাশর: ১০)
২য় ভাগ: যাদের প্রতি খাঁটিভাবে ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করতে হবে, যাদের প্রতি কোনো ভালোবাসা ও মিত্রতা পোষণ করা যাবে না। তারা হলো খাঁটি কাফির সম্প্রদায়। যেমন: কাফির, মুশরিক, মুনাফেক, মুরতাদ, নাস্তিক ও বিধর্মী সম্প্রদায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, "তুমি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী কোনো জাতিকে এরূপ পাবে না যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরোধিতা করে এমন ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্ব করে, যদিও তারা তাদের পিতা, বা পুত্র, কিংবা ভাই, বা জাতি-গোষ্ঠী হয়। এরাই তারা, যাদের অন্তরে আল্লাহ ইমান লিখে দিয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ (আল্লাহপ্রদত্ত সাহায্য) দ্বারা তাদের শক্তিশালী করেছেন। তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতসমূহে, যেগুলোর তলদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও সন্তুষ্ট হয়েছে আল্লাহর প্রতি। এরাই আল্লাহর দল। জেনে রেখ, নিশ্চয় আল্লাহর দলই সফলকাম।' (সুরা মুজাদালাহ: ২২)
৩য় ভাগ: যাদেরকে একদিক থেকে ভালোবাসতে হবে, আবার একদিক থেকে ঘৃণা করতে হবে, যাদের ব্যাপারে অন্তরে ভালোবাসা-ঘৃণা দুটিই একত্রিত হবে। তারা হলো পাপাচারী মুমিন ব্যক্তিবর্গ। তাদেরকে ভালোবাসতে হবে, তাদের ইমানের কারণে। আর তাদেরকে ঘৃণা করতে হবে, শির্ক-কুফরের চেয়ে নিম্নপর্যায়ের পাপাচারিতায় লিপ্ত হওয়ার কারণে। অধিকন্তু তাদের প্রতি ভালোবাসার দাবি হচ্ছে তাদেরকে নসিহত করা এবং মন্দকর্মে তাদের বিরোধিতা করা। বিধি মোতাবেক তাদের মন্দকর্মের বিরোধিতা করা ওয়াজিব। [ইমাম সালিহ আল-ফাওযান কৃত আল-ইরশাদ ইলা সাহীহিল ই'তিক্বাদ; খণ্ড: ২: পৃষ্ঠা: ২৮৯-২৯০]
অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত আলোচনা এখানেই সমাপ্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00