📄 ইতিহাসের আলোকে “হাকিম একমাত্র আল্লাহ”
[সিফফীন যুদ্ধের পর আলী ও মুআবিয়া-এর] সালিসী চুক্তির পর আশআছ ইবনে কাইস তামীম গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছে চুক্তিনামাটি পড়ে শুনান। সেখানে ছিল রাবী'আ ইবনে হানজালাহ বংশের সন্তান উরওয়াহ ইবনে উযায়না (উযায়না মাতার নাম, পিতার নাম জারীর)। সে আবূ বিলাল ইবনে মিরদাস ইবনে জারীর-এর ভাই। সে দাঁড়িয়ে বলল: তোমরা কি আল্লাহ'র দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে হাকিম (বিচারক) নিয়োগ করছো? এ কথা বলেই সে আশআছ ইবনে কাইসের বাহনের পশ্চাৎভাগে তরবারি দিয়ে আঘাত হানলো। এতে আশআছ ও তার কুওমের লোকেরা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়।
ফলে আহনাফ ইবনে কাইস ও তাদের গোত্রের নেতৃস্থানীয় একটি দল এসে আশআছ ইবনে কাইসের কাছে এ ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনা করে। খারিজী সম্প্রদায়ের ধারণা মতে যিনি সর্ব প্রথম তাদের নেতৃত্ব দেন তিনি হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব রাসিবী। গ্রন্থকারের মতে প্রথমটিই সঠিক। আলীর পক্ষের কিছুসংখ্যক লোক যারা কুররা নামে পরিচিত ছিল তারা ঐ ব্যক্তির মতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং ঘোষণা দেয় (আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো হুকুম নেই)। একারণে এ দলকে 'মাহকামিয়্যা' নামে অভিহিত করা হয়। তারপর লোকজন যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে নিজ নিজ এলাকার দিকে রওয়ানা হয়ে যায়। মু'আবিয়া তাঁর সৈন্য-সামন্ত নিয়ে দামেশকে যায়। আর আলী কুফার উদ্দেশ্যে হীত-এর পথ ধরে অগ্রসর হন। তিনি যখন কুফায় পৌঁছেন, তখন শুনতে পান এক ব্যক্তি বলছে, আলী গিয়েছিলো। কিন্তু শূন্য হাতে ফিরে এসেছে। এ কথা শুনে আলী বললেন, যাদের আমরা ছেড়ে এসেছি তারা অবশ্যই ওদের তুলনায় উত্তম।.....
এরপর আলী আল্লাহর স্মরণ করতে করতে কূফায় প্রবেশ করেন। তিনি যখন কুফা নগরীর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেন, তখন তাঁর বাহিনীর প্রায় বার হাজার লোক তাঁর থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরাই ইতিহাসে খারিজী নামে বিখ্যাত। তারা আলীর সাথে একই শহরে বসবাস করতে অস্বীকার করে এবং হারুরা নামক স্থানে গিয়ে অবস্থান করে। তাদের মতে আলী কয়েকটি অন্যায় কাজে জড়িত হয়ে পড়েছেন যার দরুন তারা আর তাঁকে মেনে নিতে পারছে না। আলী তাদের সাথে কথা বলার জন্যে 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'আব্বাসকে প্রেরণ করেন। ইবনে আব্বাস তাদের কাছে গিয়ে তাদের অভিযোগ শোনেন ও জওয়াব দেন। ফলে তাদের অধিকাংশ লোক মত পরিবর্তন করে ফিরে আসে, আর অবশিষ্টরা আপন মতে অনড় থাকে। আলী তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। ৮২ অন্য বর্ণনানুযায়ী, আলী যখন মু'আবিয়াকে চুক্তিপত্র লিখে দেন এবং সালিস নিযুক্ত করেন, তখন তাঁর দল থেকে আট হাজার ক্বারী বেরিয়ে যায় এবং কূফা নগরীর উপকণ্ঠে হারুরা নামক স্থানে গিয়ে সমবেত হয়। তারা আলীর উপরে দোষারোপ ও তাঁকে তিরস্কার করে বলতে থাকে: انْسَلَخَتَ مِنْ قَمِيصِ أَلْبَسَكَهُ اللهُ، وَاسْمُ سَمَّاكَ بِهِ اللهُ ثُمَّ انْطَلَقَتُ فَحَكَمْتَ فِي دِينِ اللَّهِ وَلَا حُكْمَ إِلَّا اللَّهُ "মহান আল্লাহ আপনাকে যে জামা (খিলাফত) পরিধান করিয়েছিলেন, আপনি সে জামা খুলে ফেলেছেন। যে উপাধিতে মহান আল্লাহ আপনাকে ভূষিত করেছিলেন আপনি সে উপাধি প্রত্যাহার করেছেন। এরপর আপনি আরো অগ্রসর হয়ে মহান আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে হাকিম নিযুক্ত করেছেন। অথচ মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কোন হাকিম নেই।"
আলীর কাছে যখন তাদের এসব অভিযোগের কথা পৌছালো এবং তিনি জানতে পারলেন যে, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তারা তাঁর থেকে পৃথক হয়ে গেছে। তিনি এক ঘোষণাকারীর মাধ্যমে নির্দেশ জারি করলেন যে, আমীরুল মু'মিনীনের দরবারে যেন কেবল ঐসব লোক প্রবেশ করে যারা পবিত্র কুরআন বহন করে (হাফিযে কুরআন)।
আমীরুল মু'মিনীনের দরবার যখন ক্বারীদের সমাগমে পরিপূর্ণ হয়ে গেল, তখন তিনি পবিত্র কুরআনের একটি কপি এনে সবার সম্মুখে রাখলেন। এরপর তিনি হাতের আংগুল দ্বারা পবিত্র কুরআনে উপর জোরে টোকা মেরে বললেন, "হে কুরআন! তুমি লোকদের তোমার কথা জানাও।” উপস্থিত লোকজন আলীকে বললো, “হে আমীরুল মু'মিনীন। আপনি পবিত্র কুরআনের কপির কাছে এ কি জিজ্ঞেস করছেন? ও তো কাগজ আর কালি ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা তো ওর মধ্যে যা দেখি তা নিয়ে কথা বলছি। তাহলে এরূপ করায় আপনার উদ্দেশ্য কী?” তিনি জওয়াবে বললেন: তোমাদের ঐসব সাথি যারা আমার থেকে পৃথক হয়ে অবস্থান নিয়েছে, তাদের ও আমার মাঝে মহান আল্লাহর কিতাব রয়েছে। মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে একজন পুরুষ (স্বামী) ও একজন নারীর (স্ত্রীর) ব্যাপারে বলেছেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا
"তাদের (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ের মধ্যে বিরোধের আশংকা হলে, তোমরা তার (স্বামীর) পরিবার হতে একজন ও তার (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন হাকিম নিযুক্ত করবে; তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন।"৮৩
দ্বিতীয় অভিযোগের জবাবে আলী বললেন: তারা আমার উপর আরো অভিযোগ এনেছে যে, আমি মু'আবিয়াকে যে চুক্তিপত্র লিখে দিয়েছি, তাতে (আমীরুল মু'মিনীনের বদলে) আলী ইবনে আবূ তালিব লিখেছি। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হলো: হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল ইবনে আমর আসলে রসূলুল্লাহ যখন নিজ কুওমের সাথে সন্ধিপত্র লেখেন, তখন আমরা সেখানে উপস্থিত ছিলাম। রসূলুল্লাহ প্রথমে লিখলেন 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম'। সুহাইল আপত্তি জানিয়ে বললো: আমি 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম' লিখতে রাজি নই। রসূলুল্লাহ বললেন, তাহলে কিভাবে লিখব? সুহাইল বললেন: লিখব 'বিইসমিকা আল্লাহুম্মা।' রসূলুল্লাহ বললেন, তা-ই লিখ। রসূলুল্লাহ বললেন, এখন লিখ- 'এই সন্ধিপত্র, যা মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সম্পাদন করলেন। সুহাইল বলল: আমি যদি জানতাম যে, আপনি আল্লাহর রসূল, তাহলে তো আপনার সাথে আমার কোন বিরোধই থাকতো না। অবশেষে লেখা হলো: এই সন্ধিপত্র যা আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ কুরাইশদের সাথে সম্পাদন করলেন। মহান আল্লাহ আপন কিতাবে বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ
"তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে ভয় করে তাদের জন্যে রসূলুল্লাহ এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। ৮৪ এরপর আলী তাদের কাছে 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'আব্বাস-কে প্রেরণ করেন।..... 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'আব্বাস তিন দিন পর্যন্ত সেখানে তাদের সাথে আলোচনা ও মতবিনিময় করেন। অবশেষে তাদের মধ্যে থেকে চার হাজার লোক তাওবা করে ফিরে আসে। ইবনুল কাওয়াও তাদের অন্তর্ভুক্ত। ইবনে 'আব্বাস এদের আলী-এর কাছে কুফায় নিয়ে আসেন। অবশিষ্ট লোকদের কাছে আলী বার্তা পাঠিয়ে জানান যে, উম্মাতে মুহাম্মাদীর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হোক। আর তোমাদের ও আমাদের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত থাকলো যে, তোমরা অন্যায়ভাবে কারো রক্তপাত ঘটাবে না। ডাকাতি, রাহাজানি করবে না এবং যিম্মীদের উপর অত্যাচার চালাবে না। যদি এর কোনটিতে লিপ্ত হয়ে পড় তবে তোমাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠিন যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। (কেননা, আল্লাহ বলেন:( إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْخَائئنين "আল্লাহ খিয়ানতকারীদের পছন্দ করেন না। ৮৫
বর্ণনাকারী বলেন: আল্লাহর কসম! ওদের বিরুদ্ধে আলী পক্ষ থেকে তখনই অভিযান পাঠানো হয়েছে, যখন ওরা ডাকাতি, রাহাজানি শুরু করেছে, খুন-খারাবী ছড়িয়ে দিয়েছে এবং যিম্মীদের উপর অত্যাচার করে তাদের সবকিছু নিজেদের জন্যে হালাল করে নিয়েছে। ৮৬ অন্য বর্ণনায় আছে: আলী-কে তাদের সমালোচনার কারণ ছিল এই যে-
১. তিনি মানুষকে হাকিম (ফায়সালাকারী) নিযুক্ত করেছিলেন।
২. শাসকের পদবীকে মুছে দিয়েছিলেন।
৩. উষ্ট্রের যুদ্ধে তিনি অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করেছেন; অথচ শত্রুদের থেকে প্রাপ্ত সম্পদ ও বন্দী সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করেন নি।
প্রথম দু'টি অভিযোগের (হাকিম নির্ধারণ ও পদবী মুছে ফেলার) জওয়াবে তিনি যা বলেন, ইতোপূর্বে তা আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগের জওয়াবে তিনি বলেন: “বন্দীদের মধ্যে উম্মুল মু'মিনীনও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এখন যদি তোমরা দাবি করো যে, তোমাদের কোন উম্মুল মু'মিনীন নেই, তবে তা হবে তোমাদের জন্য কুফরী কাজ। আবার যদি উম্মুল মু'মিনীনকে বন্দী রাখা বৈধ মনে করো, তাও হবে কুফরী কাজ।" বর্ণনাকারী বলেন: এবার তাদের মধ্য থেকে দু' হাজার লোক বেরিয়ে আসে বাকি সবাই বিদ্রোহ করে। এরপর তাদের সাথে যুদ্ধ হয়। ৮৭
ইবনে জারীর লিখেছেন: খারিজীদের অবশিষ্ট লোকদের কাছে আলী স্বয়ং গমন করেন। তিনি তাদের সাথে আলোচনা অব্যাহত চালিয়ে যান। অবশেষে তারা সকলেই তাঁর সাথে কুফায় চলে আসে। সে দিনটি ছিল ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহার দিন। এরপর তারা আলী-এর কথাবার্তায় বাধা সৃষ্টি করতে থাকে। তাঁকে গালমন্দ করে এবং তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করতে থাকে।
ইমাম শাফে'য়ী বলেন: আলী একদিন সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় তাঁকে লক্ষ্য করে জনৈক খারিজী এ আয়াতটি পড়ে: لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ "তুমি আল্লাহ'র শরীক স্থির করলে তোমার কর্ম তো নিষ্ফল হবে এবং অবশ্য তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্ত। "৮৮ জওয়াবে আলী নিচের আয়াতটি পড়লেন:
فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَا يَسْتَخِفَّنَّكَ الَّذِينَ لَا يُوقِنُونَ
"কাজেই, তুমি সবর কর। নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। যারা দৃঢ় বিশ্বাসী নয়, তারা যেন তোমাকে বিচলিত করতে না পারে।"৮৯
ইবনে জারীর বলেন: এ ঘটনা হয়েছিল তখন যখন আলী খুতবা পাঠ করছিলেন। ইবনে জারীর আরো একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তা হলো:
"আলী একদিন খুতবা দিচ্ছিলেন। এ সময় এক খারিজী দাঁড়িয়ে বললো, হে আলী! আপনি মহান আল্লাহর দ্বীনে মানুষকে শরীক করেছেন (অর্থাৎ শির্ক করেছেন)। অথচ আল্লাহ ব্যতীত হুকুম দেয়ার অধিকার আর কারো নেই। এ সময় চারদিক থেকে একই আওয়াজ উঠলো- لَا حُكْمَ إِلَّا اللَّهُ - لَا حُكْمَ إِلَّا اللَّهُ “আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম নেই, আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম নেই।” তখন আলী বললেন: هَذِهِ كَلِمَةٌ حَقٌّ يُرَادُ بِهَا بَطِلُ "কথাটি সত্য, কিন্তু উদ্দেশ্য খারাপ।" তারপর তিনি বললেন: "যতদিন তোমাদের দায়িত্ব আমাদের উপরে ছিল ততদিন আমরা তোমাদের গনীমত দেয়া বন্ধ করি নি এবং আল্লাহর মাসজিদে সালাত আদায় করতে বাধা দেই নি। এখন তোমাদের উপর আমরা আগেই হামলা করবো না। যদি তোমরা প্রথমে হামলা না করো।" এরপর তারা সবাই কৃষ্ণা থেকে বেরিয়ে গিয়ে নাহরাওয়ান নামক স্থানে সমবেত হয়। ৯০
উপরোক্ত ঐতিহাসিক আলোচনাটি আরো সুস্পষ্ট হবে আমাদের পরবর্তী তাহক্বীকুটি বিস্তারিতভাবে পাঠ করলে। এটাও সুস্পষ্ট হবে, খারিজী এবং বর্তমান যামানার বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী যারা একই ধরনের শ্লোগান ব্যবহার করছে এবং যত্রতত্র কুফরী ফাতওয়া প্রদান করে বিভিন্ন দেশ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে- তাদের সংস্কার ও সংশোধন করা অতীব জরুরী।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রকৃত হিদায়াত দান করুন। আমিন!!
টিকাঃ
৮২. আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইফা) ৭/৫০৩-৫০৫ (সংক্ষেপিত)।
৮৩. সূরা নিসাঃ ৩৫ আয়াত।
৮৪. সূরা আহযাব- ২১ আয়াত।
৮৫. সূরা আনফাল- ৫৮ আয়াত।
৮৬. ইবনে কাসীর বলেছেন: আহমাদ এ হাদীস মুফরাদ বর্ণনা করেছেন। তবে এর সনদ সহীহ। জিয়া একে পছন্দ করেছেন। [আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইফা) ৭/৫০৬-৫০৯] তাছাড়া ইমাম হাকিম এ বর্ণনাটিকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তাধীনে সহীহ বলেছেন, তবে উভয়ে তা বর্ণনা করেন নি। [তাহক্বীকুকৃত আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (মিশর) ৭/২২৯ পৃঃ]
৮৭. আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইফা) ৭/৫০৯ পৃঃ।
৮৮. সূরা যুমার- ৬৫ আয়াত।
৮৯. সূরা রূম- ৬০ আয়াত।
৯০. আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইফা) ৭/৫১০ পৃঃ।'
📄 তাহকীকৃতঃ আমাদের হাকিম কেবলই একজন— আল্লাহ তাআলা: কয়েকটি পরিভাষাঃ ‘ইবাদাত, ইতা’আত, মু’আমালাত ও ইতি’আনাত
[এই বইটির তাহক্বীক্ব বা বিশ্লেষণ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে গেলে উক্ত শব্দগুলোর সাথে পরিচয় থাকা জরুরী। অন্যথায় এক্ষেত্রে বিভ্রান্তি আসাটাই স্বাভাবিক। এ কারণে শুরুতে এ পরিভাষাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।]
আল্লাহ বলেন: اِيَّاكَ نَعْبُدُ وَاِيَّاكَ نَسْتَعِينُ অর্থ: আমরা একমাত্র আপনারই 'ইবাদাত করি এবং কেবল আপনারই সাহায্য চাই। [সূরা ফাতিহা- ৪ আয়াত]
বিশ্লেষণ: এটা আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী কর্ম (مفعول) এবং এটার স্থান ক্রিয়া (فعل) ও কর্তার (فاعل) পরে হলেও এখানে মর্যাদা এবং গুরুত্ব প্রকাশ ও حصر (সীমাবদ্ধতা)-এর অর্থ গ্রহণের জন্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণভাবে বলা হয় যে, نَعْبُدُكَ وَنَسْتَعينُكَ "আমরা তোমার 'ইবাদাত করি এবং তোমার সাহায্য চাই।” কিন্তু এখানে আল্লাহ কর্মকে (مفعول) ক্রিয়ার (فعل) পূর্বে ব্যবহার করে বলেছেন: اِيَّاكَ نَعْبُدُ وَاِيَّاكَ نَسْتَعينُ -যা দ্বারা ইখতিসাস (সুনির্দিষ্টকরণ) করা হয়েছে। অর্থাৎ “আমরা একমাত্র আপনারই 'ইবাদাত করি এবং কেবল আপনারই সাহায্য চাই। "৯২
অর্থাৎ 'ইবাদাত আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্যই বৈধ নয়। কুরআন ও সহীহ হাদীসে ইসলাম অনুমোদিত 'ইবাদাত শব্দটির পারিভাষিক প্রয়োগ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
'ইবাদাত এর অর্থ: কারো সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা, অক্ষমতা ও পূর্ণাঙ্গ বিনয় (খুশু) প্রকাশ করা। ইবনে কাসির -এর মতে- "ইবাদাত হলো শরি'য়াতের ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ মুহাব্বাত, বিনয় ও ভয়ের সমষ্টির নাম।” অর্থাৎ যে সত্তার সাথে মুহাব্বাত হয়েছে তাঁর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করা এবং তাঁর কাছে গ্রেফতার হবার ভয় থাকা।
[আভিধানিকভাবে 'ইবাদাত শব্দের ব্যবহার: ১. عَبَدَ ، يَعْبُدُ ، عِبَادَةٌ ، عُبُوْدِيَّةٌ : তাওহীদ (একক মানা), বন্দেগী করা, পূজা করা, খিদমাত করা, ক্ষুদ্রতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করা, ইতা'আত বা আনুগত্য করা।
২. عَبْدُ اللهِ - عِبَادَةً وَعُبُوْدِيَّةً: আল্লাহ আনুগত্য ও বন্দেগী করা, 'ইবাদাত করা, আদাবে বন্দেগী পালন করা, ক্ষুদ্রতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করা, কেবল আল্লাহকেই মালিক ও খালিক (সৃষ্টিকর্তা) এবং ওয়াজিবুল ইতা'আত (তাঁর আনুগত্য অত্যাবশ্যক) মনে করা।
৩. 'ইবাদাত শব্দটি আরবি ভাষায় তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ক. পূজা ও উপাসনা করা, খ. আনুগত্য ও হুকুম মেনে চলা এবং গ. বন্দেগী ও দাসত্ব করা। এখানে (আলোচ্য আয়াতে) একই সাথে এই তিনটি অর্থই প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ আমরা তোমার পূজা-উপাসনা করি, তোমার আনুগত্য করি এবং তোমার বন্দেগী ও দাসত্বও করি।
'ইবাদাত ও ইতা'আত: 'ইবাদাত কেবল আল্লাহরই হয়। কিন্তু ইতা'আত বা আনুগত্য আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সৃষ্টিজীবেরও হয়। যেমন- আল্লাহ নিজের ও তাঁর রসূলের ইতা'আত সম্পর্কে বলেছেন: يَأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُوْلَ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ইতা'আত কর এবং রসূলের ইতা'আত কর।" অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ইতা'আতের সাথে সাথে আমীরের ইতা'আতের কথা উল্লেখ করে বলেছেন:
مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ اَطَاعَ اللَّهُ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهُ وَمَنْ يُطِعِ الْأَمِيرِ فَقَدْ أَطَاعَنِي وَمَنْ يَعْصِ الْأَمِيرِ فَقَدْ عَصَانِي
“যে ব্যক্তি আমার ইতা'আত করল, সে যেন আল্লাহর ইতা'আত করল। আর যে ব্যক্তি আমার নাফমানি করল, বস্তুত সে আল্লাহর নাফরমানী করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের ইতা'আত করল, সে যেন আমারই ইতা'আত করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের নাফরমানী করল, সে যেন আমারই নাফরমানী করল।"৯৮
তবে আল্লাহ ও রসূলের ইতা'আত বা আনুগত্য শর্তহীন। কিন্তু সৃষ্টিজীবের আনুগত্য শর্তযুক্ত। এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ বলেছেন: لَاطَاعَةَ في مَعْصيَةِ إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ "নাফরমানীর ব্যাপারে ইতা'আত নেই। ইতা'আত কেবল ন্যায়সঙ্গত কাজে।"৯৯ অন্যত্র তিনি বলেন: لاَطَعَةَ a a cola " لمَخْلُوقَ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ ইতা'আত নেই। "১০০
উক্ত আলোচনার মাধ্যমে সুস্পষ্ট হলো, 'ইবাদাত কেবল আল্লাহরই করা যায়। 'ইবাদাতের অন্যতম অর্থ ইতা'আত হলেও সব ইতা'আত 'ইবাদাত নয়। কেননা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমীর, পিতা-মাতা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বয়োজ্যেষ্ঠ, উর্ধ্বতন বা দায়িত্বশীল প্রমুখের ইতা'আত করার প্রয়োজন হয়। তারা সেক্ষেত্রেই হুকুম করতে পারেন যেক্ষেত্রে আল্লাহর নাফরমানী হবে না, কিংবা যেসব ক্ষেত্রে আল্লাহ স্বাধীনতা দিয়েছেন। এ স্বাধীনতা সম্পর্কে রসূলুল্লাহ বলেছেন:
دَعُوْنِي مَا تَرَكْتُكُمْ
"আমি যেসব বিষয় বর্ণনা না করে তোমাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছি, সেসব ব্যাপারে আমাকে ছেড়ে দাও। "১০১ তিনি অন্যত্র বলেছেন:
اِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ اِذَا اَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ اَمْرِ دِيْنِكُمْ فَخُذُوْا بِهِ وَاِذَا اَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ رَّائِيْ فَاِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ
“আমি একজন মানুষ। আমি যখন তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে কোন নির্দেশ দেই, তখন তা গ্রহণ করবে। আর আমি যখন (দ্বীন বহির্ভূত বিষয়ে) আমার রায় (ব্যক্তিগত মত) অনুসারে নির্দেশ প্রদান করি, তখন আমিও একজন মানুষ।”১০২
সুতরাং প্রমাণিত হলো, জীবনের সবক্ষেত্রে আমলে সলেহ বা নেককাজ করা আল্লাহর হুকুম। কিন্তু কিছু হুকুম কেবলই আল্লাহর জন্য খাস (সুনির্দিষ্ট) এবং তাতে আর কেউই শরীক নয়- এটাই পারিভাষিক 'ইবাদাত। আর কিছু হুকুম স্বয়ং আল্লাহ মানুষের পারস্পরিক লেনদেন ও জীবন-যাপন পদ্ধতির জন্যে নির্দিষ্ট করেছেন। যা শাব্দিকভাবে 'ইবাদাতের মধ্যে গণ্য হলেও পারিভাষিকভাবে ইতা'আত। কেননা এ হুকুমগুলো আল্লাহ নিজের জন্যে খাস করেন নি, বরং এর মধ্যে মাখলুককেও শরীক করেছেন। যেমন- আমীরের আনুগত্য, পিতা-মাতার আনুগত্য, স্বামীর আনুগত্য, আল্লাহর বান্দাদের (মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর) হক্ক প্রভৃতি। আর যে কাজের মধ্যে অন্যদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে তা নিষ্কলুষ 'ইবাদাত না, বরং তাকে ইতা'আত বলাই বাঞ্ছনীয়। স্বয়ং আল্লাহ -ও নিজের জন্য সুনির্দিষ্ট হকু তথা 'ইবাদাত এবং বান্দার হক্ক তথা সদাচারণকে স্বতন্ত্র শব্দে প্রকাশ করেছেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে:
وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتمي وَالْمَسْكَيْنَ وَالْجَارِذِي الْقُرْنِي وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيْلِ لا وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ -
“আর তোমরা আল্লাহর 'ইবাদাত কর, আর তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। পিতা-মাতার সাথে ইহসান (সদাচরণ) কর এবং নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও।”১০৩
'ইবাদাত ও মু'আমালাত: লক্ষণীয়, উক্ত আয়াতে আল্লাহ নিজের হকের ক্ষেত্রে 'ইবাদাত শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং তাতে কাউকে শরীক করতে নিষেধ করেছেন। পক্ষান্তরে বান্দার হক্কের ক্ষেত্রে ইহসান বা সদাচারণ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এ পর্যায়ে প্রথমটি আল্লাহর 'ইবাদাত এবং দ্বিতীয়টি আল্লাহর ইতা'আত। এ ধরনের ইতা'আতকেই ফিক্বহী পরিভাষায় মু'আমালাত (লেনদেন, আচার-ব্যবহার) বলা হয়। 'ইবাদাতের ক্ষেত্রে (নীতিমালা) হলো, এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সহীহ দলিল-প্রমাণ না পাওয়া গেলে মনগড়া 'আমল করাটাই বিদ'আত।
এ সম্পকে নবী ﷺ বলেছেন: مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ "যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করল, যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই তবে তা বাতিল। "১০৪
তিনি অন্যত্র বলেন: مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدُّ “যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীন সম্পর্কে কোন নতুন কথা সৃষ্টি করেছে যা এতে নেই, তবে তা রদ বা প্রত্যাখ্যাত। "১০৫
অন্যত্র বলেন: وَشَرَّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ "সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে যা দ্বীন সম্পর্কে নতুন সৃষ্টি করা হয়েছে এবং প্রত্যেক বিদ'আতই (নূতন সৃষ্টি) গোমরাহী। "১০৬
পক্ষান্তরে মু'আমালাতের (লেনদেন, আচার-ব্যবহার) ক্ষেত্রে উসূল (নীতি) হলো, হারাম বা নিষিদ্ধতার দলিল-প্রমাণ না পাওয়া গেলেই তা বৈধ। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا "তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরই জন্য জমিনের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। "১০৭
এ আয়াতটি দ্বারা এই দলিল ও উসূল (নীতি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মানুষের জন্য আল্লাহর সৃষ্টি সব কিছুই তার আসল অবস্থাতেই হালাল। কোন জিনিস হারাম করতে হলে দলিল )نص( দ্বারা প্রমাণ করতে হবে।'
এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ বলেছেন: ১০৮ مَا أَحَلَّ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ فَهُوَ حَلَالٌ وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَافِيَةٌ فَاقْبَلُوا مِنَ اللَّهِ الْعَافِيَتَهُ فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُنْ نَسِيًّا ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ : وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسيا "আল্লাহ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তাই হালাল এবং যা হারাম করেছেন তাই হারাম এবং যা থেকে নীরব থেকেছেন তা মাফযোগ্য। সুতরাং যা মাফযোগ্য তা তোমরা আল্লাহ'র পক্ষ থেকে গ্রহণ কর। কেননা, নিশ্চয় আল্লাহ কিছু ভুলেন না।” অতঃপর তিলাওয়াত করলেন: “তোমাদের রব ভুলেন না। [সূরা মারইয়াম- ৬৪]-১০৯
অন্যত্র স্বয়ং আল্লাহ'ই তাঁর 'ইবাদাত ও দুনিয়াবী বস্তুসামগ্রী ও উপায়-উপকরণকে পৃথক করে বর্ণনা করেছেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ – مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِّنْ رِّزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُون -
"আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার 'ইবাদাতের জন্যে সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের কাছে রিযিক চাই না এবং তাদের কাছে খাদ্য- খাবারও চাই না। "১১০
আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা 'ইবাদত থেকে রিযিক ও খাদ্য-খাবারকে পৃথক করে দেখিয়েছেন। অথচ দু'টির ক্ষেত্রেই মানুষকে আল্লাহর হুকুম স্বতন্ত্রভাবে পালন করতে হবে। কিন্তু ইবাদত কেবল স্বয়ং আল্লাহর জন্যই করতে হয়, পক্ষান্তরে রুযী রোযগার, খাদ্য-খাবার প্রভৃতি দুনিয়াবী বিষয় মানুষ আল্লাহর হুকুমে নিজের প্রয়োজন ও শৃঙ্খলা আনার জন্য পালন করে থাকে। সুতরাং প্রমাণিত হলো 'ইবাদাত ও মু'আমালাত স্বতন্ত্র বিষয়। কিন্তু উভয়টির মূল দাবি আল্লাহর হুকুম মেনে চলা, যা এক কথায় 'আল্লাহর হুকুম' কিংবা 'আমলে সলেহ' নামে আখ্যায়িত। মোটকথা শাব্দিকভাবে 'ইবাদাত ও ইতা'আত পরিপূরক হলেও পারিভাষিক ও প্রায়োগিক অর্থে ভিন্নতা আছে।
সুতরাং যেহেতু 'ইবাদাতের ব্যাপারে সরাসরি শক্তিশালী দলিল-প্রমাণ ছাড়া নতুন কিছুর উপর 'আমল করা নিষিদ্ধ এ জন্য বিদ'আত শব্দটি এক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। পক্ষান্তরে মু'আমালাত বা বৈষয়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে শরি'য়াত থেকে নিষেধাজ্ঞা না পাওয়া পর্যন্ত তা সাধারণভাবে বৈধ। এ ক্ষেত্রে যুগোপযোগী ও নিত্যনতুন বিষয়াদির সংযোগ চলতে থাকবে। এ কারণে বৈষয়িক লেনদেনের ব্যাপারে বিদ'আত শব্দটি প্রযোজ্য নয়। বরং "যা নিষিদ্ধ নয় তা-ই বৈধ।"
টিকাঃ
৯১. তাফসীরে মাযহারী (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ১/১৫ পৃঃ।
৯২. সালাহুদ্দীন ইউসুফ, কুরআনে কারীম মা'আ উর্দু তরজমা ও তাফসীর (মাদীনা মুনাওওয়ারা: বাদশাহ ফাহদ কুরআনে কারীম প্রিন্টিং কমপ্লেক্স) পৃঃ ৪।
৯৩. সালাহুদ্দীন ইউসুফ, কুরআনে কারীম মা'আ উর্দু তরজমা ও তাফসীর পৃঃ ৪।
৯৪. মাস'উদ আহমাদ, তাফসীরে কুরআনে 'আযীয [করাচী] পৃ: ৬০।
৯৫. আল-ক্বামূসুল ওয়াহীদি [দেওবন্দ: কুতুবখানাহ হুসাইনিয়া, এপ্রিল-২০০৪] ২/১০৩৮ পৃঃ।
৯৬. তাফহীমুল কুরআন, সূরা ফাতিহার ৬ নং টীকা।
৯৭. সুরা নিসা: ৫৯ আয়াত। অনুরূপ আরো দ্রঃ মায়িদাহঃ ৯২, নূর: ৫৪, মুহাম্মাদ: ৩৩, তাগাবুন- ১২।
৯৮. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ৭/৩৪৯২ নং।
৯৯. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ৭/৩৪৯৬ নং।
১০০. সহীহঃ শরহে সুন্নাহ, মিশকাত [এমদা] ৭/৩৫২৭ নং। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন [তাহক্বীকুকৃত মিশকাত ২/১০৬২ পৃঃ]।
১০১. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন (ঢাকা: ইসলামিক সেন্টার] ১/১৫৬ নং।
১০২. সহীহ: সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ১/১৪০ নং।
১০৩. সূরা নিসা- ৩৬ আয়াত।
১০৪. সহীহ: সহীহ মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন [বি. আই. সি] ৪/১৬৪৭ নং।
১০৫. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ১/১৩৩ নং।
১০৬. সহীহ: মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ১/১৩৪ নং।
১০৭. সূরা বাক্বারাহ- ২৯ আয়াত।
১০৮. শওকানীর ফতহুল কাদীর সূত্রে: সালাহ উদ্দীন ইউসুফ, কুরআনে কারীম মা'আ উর্দু তরজমা ও তাফসীর পৃঃ ১৬। কেননা, আল্লাহ যা কিছু হারাম তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন:
وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ "তোমাদের জন্য যেগুলো হারাম তা তিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।" [সূরা আনয়াম: ১১৯ আয়াত) সুতরাং কোন কিছু হারাম বললে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ জরুরী, অন্যথায় সবই হালাল। এই নীতিটি মু'আমালাতের সাথে সম্পৃক্ত। পক্ষান্তরে ইবাদাতের ব্যাপারে যার সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই তা পালন করাই বিদ'আত।
১০৯. সহীহ: হাকিম- কিতাবুত তাফসীর بَابُ سُوْرَةِ مَرْيَمَ। হাকিম এর সনদকে সহীহ বলেছেন। উক্ত মর্মে বাযযার সলেহ সনদে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। (ফতহুল বারী (মাকতাবা মিশর, ১৪২১/২০০১) ১৩/৩৭৮ পৃঃ; নায়লুল আওতার (মিশর: দারুল হাদীস ১৪২১/২০০০)৮/৪২৮ পৃঃ।
১১০. সূরা যারিয়াত- ৫৬-৫৭ আয়াত।
📄 ‘ইবাদত ও সাহায্য চাওয়া আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট
'ইবাদাত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا "আল্লাহর 'ইবাদাত কর এবং তাঁর সাথে কোন কিছুরই শরীক করো না।"১১১ তিনি অন্যত্র বলেন:
إلَهُكُمْ الهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُوْا لِقَاءِ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا "তোমাদের ইলাহ, কেবলই এক ইলাহ। সুতরাং যে নিজের রবের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন নেক 'আমল করে এবং নিজের রবের 'ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে।"১১২ ইস্তি'আনাত বা সাহায্য চাওয়া সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- وَاسْتَعِينُوا بالصَّبْرِ وَالصَّلاة "তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাও।"১১৩ অন্যত্র বলেন:
قَالَ مُوسِي لِقَوْمِهِ اسْتَعِينُوا بِاللَّهِ وَاصْبِرُوا "মূসা তাঁর কুওমকে বলল, আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং সবর কর।"১১৪ সুতরাং 'ইবাদাত ও ইস্তি'আনাত (সাহায্য চাওয়া) উভয়টিই আল্লাহ ছাড়া অপর কারো জন্য 'আমল করা জায়েয নয়। প্রথমোক্ত আয়াতটি দ্বারা শিরকের দুয়ার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু যাদের অন্তরে শিরকের রোগ আছে তারা সাধারণ লোকদের মানুষের আয়ত্বাধীন (مَا تَحْتَ الْأَسْبَابِ) বস্তুর সাথে, মানুষের আয়ত্বাধীন নয় (مَا فَوْقَ الْأَسْبَابِ) এমন বস্তুর মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে সে ব্যাপারে বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত করেছে। তারা বলে যে, "দেখ আমাদের রোগ হলে আমরা ডাক্তারের সাহায্য নিয়ে থাকি, স্ত্রীর নিকট সহযোগিতা চাই, ড্রাইভার ও অন্যান্য লোকদের সাহায্য কামনা করি।" এভাবে তারা এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যদের নিকট সাহায্য চাওয়াও বৈধ। কিন্তু মানুষের আয়ত্বাধীন বস্তুর মাধ্যমে একে অপরের কাছে সাহায্য চাওয়া বৈধ এবং এটা শিরক নয়।
এটাতো আল্লাহর সৃষ্ট ব্যবস্থাপনা মাত্র। যা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ্য বস্তুসমূহ দ্বারা সম্পন্ন করা হয়। এমনকি নবী -গণও এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছে সাহায্য সহযোগিতা চেয়েছেন। ১১৫
ঈসা ডি বলেছিলেন: مَنْ أَنْصَارِي إِلَى الله "আল্লাহ দ্বীনের জন্য কে আমাকে সাহায্য করবে?”১১৬′
আল্লাহ ঈমানদারগণকে সম্বোধন করে বলেছেন: وَتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوى "নেকি ও তাক্বওয়া অর্জনে একে অপরকে সাহায্য কর। "১১৭
সুস্পষ্ট হলো, একে অপরের সাহায্য করা )تَعَاوُن( নিষিদ্ধ বা শিরক নয়। বরং প্রয়োজনীয় ও প্রশংসার কাজ। এর সাথে পারিভাষিক শিরকের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। শিরক হল এমন কোন ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া যে প্রকাশ্য বস্তুজগতের নিয়মানুযায়ী সাহায্য করতে অক্ষম। যেমন- মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য তাকে ডাকা, তাকে 'মুশকিল কুশা' (সমস্যা দূরকারী) এবং 'হাজত রুওয়া' (উদ্দেশ্য পূরণকারী) মনে করা। তাকে উপকার ও ক্ষতি করার ক্ষমতাসম্পন্ন জ্ঞান করা এবং দূরের ও কাছের সকল ফরিয়াদ শুনে তা সমাধান করার অধিকারী মনে করা। এরই নাম হলো আয়ত্বাধীন নয় )مَا فَوْقَ الْأَسْبَابِ( এমন বিষয়ে সাহায্য চাওয়া এবং তাকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করা। আর এটাই শিরক- যা দুর্ভাগ্যবশত 'মুহাব্বাতে আওলিয়া' নামে মুসলিম দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে চালু আছে। ]أَعَاذَنَا اللَّهُ مِنْهُ[ ১১৮ সুতরাং ইস্তিআনাত বা সাহায্য চাওয়ার দু'টি দিক রয়েছে-
১. যে সমস্ত বিষয়ের একক অধিকারী স্বয়ং আল্লাহ এবং যেগুলো কোন বস্তুগত কর্তৃত্ব মানুষকে দেন নি সেক্ষেত্রে কোন মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া, প্রার্থনা বা আবেদন-নিবেদন বা সুপারিশ করা- এ সবই শিরক। কেননা এগুলোর ক্ষেত্রে 'ইবাদাতের ন্যায় আল্লাহ কাউকে নিজের সাথে শরীক করেন নি।
২. পক্ষান্তরে যে সব ব্যাপারে মানুষকে শক্তি, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দান করেছেন, সেসব ক্ষেত্রে মানুষের পরস্পরের মধ্যে সাহায্য চাওয়াটা বৈধ। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, তা অবশ্যই আল্লাহ কর্তৃক নিষেধকৃত বিষয়ে হবে না। অর্থাৎ যেসব ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা নেই সেসব ক্ষেত্রে এটা বৈধ। প্রথমোক্তটি ইবাদাতের এবং পরবর্তীটি মু'আমালাতের অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
১১১. সূরা নিসা- ৩৬ আয়াত।
১১২. সূরা কাহাফ- ১১০ আয়াত।
১১৩. সূরা বাক্বারাহ- ৪৫ আয়াত। অনুরূপ দ্র: সূরা বাক্বারাহ- ১৫৩ আয়াত।
১১৪. সূরা আ'রাফ- ১২৮ আয়াত।
১১৫. সালাহুদ্দীন ইউসুফ, কুরআনে কারীম মা'আ উর্দু তরজমা ও তাফসীর পৃঃ ৪।
১১৬. সূরা সফ- ১৪ আয়াত।
১১৭. সূরা মায়িদাহ- ২ আয়াত।
১১৮. সালাহুদ্দীন ইউসুফ, কুরআনে কারীম মা'আ উর্দু তরজমা ও তাফসীর পৃ: ৪।
📄 তাহকীকৃতঃ আমাদের হাকিম কেবলই একজন— আল্লাহ তাআলা
১. মাসউদ আহমাদ: "হাকিম এর অর্থ- এমন হাকিম যাঁর হুকুমাত বা কর্তৃত্ব অনন্ত ও অসীম, যাঁর ইতা'আত বা আনুগত্য সীমাহীন ও নিঃশর্ত। যিনি আইনদাতা, যাঁর আইন পূর্ণাঙ্গ এবং অপরিবর্তনশীল। যিনি ইতা'আত বা আনুগত্যের একমাত্র দাবীদার (হক্বদার)।"
তাহক্বীক্ব ১: আল্লাহ কুরআন মাজীদে ইলাহ বা মা'বুদ শব্দটির বৈধ প্রয়োগ কেবল নিজের জন্যই সুনির্দিষ্ট করেছেন। এর বিপরীতে বাতিল 'ইলাহ' বা মা'বুদের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু আল্লাহ নিজেকে ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে বৈধ 'ইলাহ' বা মা'বুদ হিসাবে এই শব্দগুলো ব্যবহার করেন নি।
আল্লাহ বলেন: قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ
“হে নবী! এদের বলে দিন, আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার প্রতি অহী আসে যে, একজনই মাত্র তোমাদের ইলাহ। "১১৯ অন্যত্র আল্লাহ বলেন: وَإِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ “তোমাদের ইলাহ তো একক ইলাহ, তিনি ছাড়া রহমান (পরম করুণাময়), রহীম (অসীম দয়ালু) কেউ নেই। "১২০ وَاسْأَلْ مَنْ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رُسُلِنَا أَجَعَلْنَا مِنْ دُونِ الرَّحْمَنِ آلِهَةً يُعْبَدُونَ
"আপনার পূর্বে আমি যেসব রসূল প্রেরণ করেছি, তাদের জিজ্ঞেস করুন, রহমান (আল্লাহ) ছাড়া 'ইবাদতের জন্য আমি কি কোন ইলাহ নির্দিষ্ট করেছিলাম।"১২১
অর্থাৎ সত্যিকারের ইলাহ বা মা'বুদ স্বয়ং আল্লাহই এবং তিনি এই শব্দ'টির প্রয়োগ অন্য কারো জন্য করেন নি। বাতিল ইলাহ বা মা'বুদের ক্ষেত্রে শব্দটির ব্যবহার অন্য কোন ইলাহ থাকার প্রমাণ নয়, বরং তাতো বাতিল। উল্লেখ্য ইলাহ অর্থ মা'বুদ- অর্থাৎ যার 'ইবাদত করা হয়।
পক্ষান্তরে আল্লাহ হাকিম শব্দটি কেবল নিজের জন্যই ব্যবহার করেন নি। তিনি মানুষের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার বৈধ করেছেন। যেমন রসূলুল্লাহ এর ক্ষেত্রে এই হাকিম শব্দটির প্রয়োগ সম্পর্কে কুরআন মাজীদ আছে: فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
"অতএব আপনার রবের কুসম! তারা মু'মিন হবে না, যতক্ষণ না তাদের সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে আপনাকে হাকিম বলে মনে না করে। অতঃপর আপনার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা থাকবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কুকূল করে নেবে।"১২২
সহীহ হাদীসেও হাকিম শব্দটি বিচার-ফায়সালা বা সিদ্ধান্তদাতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ও আবূ হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ وَأَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ وَأَخْطَاً فَلَهُ أَجْرٌ واحدٌ
"যখন কোন হাকিম ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে তখন তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার। পক্ষান্তরে যখন হাকিম ইজতিহাদ করার পরও ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে, তখন তার জন্য একটি পুরস্কার।"১২৩
সুতরাং প্রমাণিত হলো, আল্লাহ ইলাহ হিসাবে একক দাবিদার। কিন্তু হাকিম শব্দটির প্রয়োগ ইলাহ শব্দটির থেকে আলাদা। তবে নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ হাকিম আল্লাহ্। যেমন আল্লাহ্ নিজেই বলেছেন: أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَحْكَمِ الْحَاكِمِينَ
"আল্লাহ কি হাকিমদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতর হাকিম নন।"১২৪ সুস্পষ্ট হলো, ইলাহ বা মা'বুদ-এর মধ্যে বৈশিষ্ট্য বা গুণগতভাবে কেউই শরীক নয়। কিন্তু হাকিম শব্দটির ব্যবহার স্রষ্টার সাথে সাথে সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রয়োগযোগ্য। এ পর্যায়ে ইসলামের মূলনীতি হলো, সৃষ্টি হাকিমের কোন ফায়সালা যদি স্রষ্টা আহকামুল হাকিমীন আল্লাহ্'র বিপরীত হয় তবে তা প্রত্যাখ্যাত। এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ বলেছেন : لَاطَاعَةَ فِي مَعْصِيَة إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ “নাফরমানীর ব্যাপারে ইতা'আত নেই। ইতা'আত কেবল ন্যায়সঙ্গত কাজে।"১২৫ অন্যত্র তিনি বলেন : لَاطَاعَةَ لِمَخْلُوقَ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীর মধ্যে কোন সৃষ্টির ইতা'আত নেই।"১২৬
কিন্তু ইলাহ বা মা'বুদ শব্দটি এ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউই এ শব্দটির হক্বদার নয়। এক্ষেত্রেও প্রমাণিত হলো, ইবাদাতের ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহই হক্বদার, পক্ষান্তরে মু'আমালাতের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ কর্তৃক নিষিদ্ধ নয় এমন বিষয়ে আমীর বা শাসক, পিতা-মাতা, শিক্ষক, বিচারক, স্বামী, অগ্রজ এদের মানা জায়েয, বরং ক্ষেত্রবিশেষ বাধ্যতামূলক। তবে এগুলো একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য ইবাদত নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশিত স্বতন্ত্র হুকুম পালন। যার মধ্যে আল্লাহর হক্ক ও বান্দার হক্ক উভয়ের সমন্বয় রয়েছে। আর 'ইবাদত তো কেবলই আল্লাহর হক্ব।
২. মাস'উদ আহমাদ: "আল্লাহ্ জিন ও মানুষকে নিজের 'ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে- وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
"আমি মানুষ ও জিনকে কেবলই আমার 'ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছি।"১২৭
এখানে 'ইবাদত দ্বারা কেবল সালাত, সাওম, যিকির ও ওয়াযীফা এর অর্থ নেয়া হলে খুবই জটিলতা দেখা দেবে। কেননা, সেক্ষেত্রে এ আমলগুলো ছাড়া জীবনের অন্যান্য আমলগুলো আল্লাহ'র সৃষ্টির উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হবে। তখন ব্যবসা-বাণিজ্য, খাওয়া-পান করা, বিয়ে-শাদী প্রভৃতির অস্তিত্ব থাকবে না। ফলে না দুনিয়াদারী হবে, না 'ইবাদাত বন্দেগী হবে। সর্বোপরি সৃষ্টির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
তাহক্বীকু ২: পাঠক গভীরভাবে আলোচ্য আয়াতটির সাথে এর পরবর্তী আয়াতটিও পাঠ করুন: وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ. مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونِ "আমি মানুষ ও জিনকে কেবলই আমার 'ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের কাছে রিযিক চাই না ও খাদ্য-খাবারও চাই না।"১২৮
আয়াত দু'টিতে স্বয়ং আল্লাহ তাঁর ইবাদত করা এবং মানুষের দুনিয়াবী লেনদেন, আয়-উপার্জনকে পৃথক করেছেন। যা থেকে সুস্পষ্ট হলো, ইবাদত কেবল আল্লাহ'র জন্য। কিন্তু দুনিয়াবী প্রয়োজনে মানুষকে প্রদত্ত রিযিক, আয়-উপার্জন এগুলো মানুষের জন্য, আর এগুলোতে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। এই আয়াত থেকেই 'ইবাদাত ও মু'আমালাতের দলিল পাওয়া গেল। আল্লাহ 'ইবাদাত বন্দেগীর নির্দেশ প্রদানের সাথে সাথে মানুষের প্রয়োজনীয় দুনিয়াবী লেনদেন, বিচারকাজ প্রভৃতিরও নির্দেশ প্রদান করেছেন। কিন্তু তিনি 'ইবাদাতের ব্যাপারে কোন মানবীয় সিদ্ধান্তকে বরদাশত করেন নি। নবী দ্বীনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত রায় বা মতামত প্রদান সম্পর্কে বলেছেন: مَنْ أُفْتِيَ بِفُتِيَا غَيْرَ ثَبَتٍ فَإِنَّمَا إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ "দলিল-প্রমাণ ব্যতীত কাউকে ফাতাওয়া দেয়া হলে, তার গুনাহর ভার ফাতাওয়াদাতার উপর বর্তাবে।"১২৯
কেননা, দ্বীনের এই অংশটি পরিপূর্ণ এবং এর মধ্যে নতুন করে সংযোজন ও বিয়োজনের প্রয়োজন নেই। সুতরাং "সুস্পষ্ট দলিল নেই তো ফাতাওয়াও নেই।"
যেমন আল্লাহ বলেন: وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ "আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা।"১৩০
مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ "আমি এ কিতাবের মধ্যে কোন কিছুরই বর্ণনা বাদ রাখি নি।"১৩১ অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ "আজ আমি তোমাদের জন্যে দ্বীনকে পূর্ণতা দান করছি।"১৩২ দ্বীন পরিপূর্ণ তাই এর মধ্যে সংযোজন ও বিয়োজন নিষিদ্ধ। এ সর্ম্পকে নবী বলেছেন:
مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ "যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করল, যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই তবে তা বাতিল।"১৩৩ তিনি অন্যত্র বলেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدُّ “যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীন সম্পর্কে কোন নতুন কথা সৃষ্টি করেছে যা এতে নেই, তবে তা রদ বা প্রত্যাখ্যাত। "১৩৪ অন্যত্র বলেন:
وَشَرُّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ ১৭৩ "সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে যা দ্বীন সম্পর্কে নতুন সৃষ্টি করা হয়েছে এবং প্রত্যেক বিদ'আতই (নূতন সৃষ্টি) গোমরাহী।"১৩৫
পক্ষান্তরে দুনিয়াবী লেনদেন, বিচারকাজ প্রভৃতির ক্ষেত্রে মানবীয় সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এক্ষেত্রে নবী বলেন: إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ وَأَصَابَ فَلَهُ اَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ وَأَخْطَاً فَلَهُ أَجْرٌ وَّاحِدٌ "যখন কোন হাকিম ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছাঁয় তখন তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার। পক্ষান্তরে যখন হাকিম ইজতিহাদ করার পরও ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তখন তার জন্য একটি পুরস্কার।"১৩৬ তবে শর্ত হলো, তা আল্লাহর নির্দেশের বা সীমারেখার বিরোধি হতে পারবে না। আল্লাহ বলেন: وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ "আর কাজকর্মে (আমর) তাদের সাথে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন।"১৩৭ অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ "এবং তাদের কাজ-কর্ম (আমর) পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে (সম্পন্ন হয়)।"১৩৮
অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ "তোমাদের জন্য যেগুলো হারাম তা তিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।"১৩৯
এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ বলেছেন: مَا أَحَلَّ اللهُ فِي كِتَابِهِ فَهُوَ حَلاَلٌ وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَافِيَةٌ فَاقْبَلُوْا مِنَ اللهِ الْعَافِيَتَ فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُنْ نَسِيًّا ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ : وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا
"আল্লাহ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তাই হালাল এবং যা হারাম করেছেন তাই হারাম এবং যা থেকে নীরব থেকেছেন তা মাফযোগ্য। সুতরাং যা মাফযোগ্য তা তোমরা আল্লাহ'র পক্ষ থেকে গ্রহণ কর। কেননা, নিশ্চয় আল্লাহ কিছু ভুলেন না।" অতঃপর তিলাওয়াত করলেন: "তোমাদের রব ভুলেন না। [সূরা মারইয়াম- ৬৪]”১৪০
অন্যত্র নবী বলেছেন: إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ أَمْرِ دِيْنِكُمْ فَخُذُوْا بِهِ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّن رَّائِي أَنَا بَشَرٌ
"আমি একজন মানুষ। আমি যখন তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে নির্দেশ দিই, তখন তা তোমরা গ্রহণ করবে, আর আমি যখন আমার রায় অনুসারে তোমাদের কোন বিষয়ে নির্দেশ (আম্র) দিই, তখন আমিও একজন মানুষ। "১৪১
অন্যত্র নবী বলেছেন: دَعُوْنِي مَا تَرَكْتُكُمْ
"আমি যেসব বিষয় বর্ণনা না করে তোমাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছি, সেসব ব্যাপারে আমাকে ছেড়ে দাও।”১৪২
উপরোক্ত দলিল প্রমাণগুলো থেকে সুস্পষ্ট হল:
দ্বীন (ইবাদাত অর্থে)
১. সুস্পষ্টভাবে সবকিছু বর্ণিত হয়েছে, কোন অসম্পূর্ণতা, অপূর্ণতা নেই।
২. যা উল্লেখ্য করা হয় নি এবং নতুন সংযোজন এর সবই বিদআত ও গোমরাহী।
৩. নির্দেশ প্রদানের ক্ষেত্রে أمر শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
৪. না জেনে ব্যক্তিগত রায় বা ফাতাওয়া প্রদান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ভুলের দায়-দায়িত্ব বর্তাবে।
৫. সম্পূর্ণরূপে মানবীয় মতামত মুক্ত।
দ্বীন (মু'আমালাত অর্থে)
১. অনেক বিষয়ে বর্ণনা না করে স্বেচ্ছায় চুপ থেকেছেন বা ছাড় দেয়া হয়েছে।
২. হারাম নয় এমন সবকিছুই বৈধ। এটা ছাড় হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। কোন কিছু হারাম হবে দলিল দ্বারা।
৩. নির্দেশ প্রদানের ক্ষেত্রে أمر শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
৪. সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ভুল হলেও ধর্তব্য নয়। (অনিচ্ছাকৃত ভুলের ক্ষেত্রে)
৫. ছাড়কৃত বা অনুল্লিখিত স্থানে মতামত বৈধ।
অর্থাৎ সবকিছু আল্লাহর হুকুম হওয়া সত্ত্বেও স্বয়ং আল্লাহ উপরোক্ত পন্থায় পার্থক্য করেছেন, যা বিভিন্ন দলিল প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত। উক্ত পৃথকীকরণের জন্যে আল্লাহ'র সৃষ্টির উদ্দেশ্যের মধ্যে কোন সংঘাত বা সংঘর্ষ সৃষ্টি হয় না।
পূর্বে বর্ণিত বিচারের ক্ষেত্রে হাকিমের ইজতিহাদ করার হাদীসটি সম্পর্কে মুহাম্মাদ ইশতিয়াক (আমীর, জামা'আতুল মুসলিমীন) লিখেছেন:
"সম্মানিত পাঠক! উক্ত হাদীসে 'হাকিম' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, 'আলিম' শব্দ নয়। হাদীসটির সম্পর্ক ক্ষমতাসীন বাদশাহ বা খলিফাতুল মুসলিমীন বা কাযীর সাথে। কোন আলিমের সাথে হাদীসটির সম্পৃক্ত করা সংগত নয়। রসূলুল্লাহ কোন হাকিম বা কাযী বা খলিফাতুল মুসলিমীন বা ইমাম প্রমুখ দায়িত্বপ্রাপ্তদের এক ধরনের ছাড় দিয়েছেন। কেননা, তার হুকুমাত বা ইমারতে এমন অনেক মোকাদ্দামা আসে যা সম্পূর্ণ নতুন। এ ধরণের (নিত্য নতুন) মোকাদ্দামা ফায়সালার সময় যদি হাকিম ইজতিহাদ করে, আর যদিওবা তা সঠিক বা ভুল হয় উভয় ক্ষেত্রেই হাকিম সওয়াবের অধিকারী হবে। তার ন্যায়-নীতির কারণে এটি বলা হয়েছে। "১৪৩
"অপর এক দিক গভীরভাবে লক্ষ্য করুন- হাকিমের ফায়সালা, যা তিনি উভয়পক্ষের মধ্যে করে থাকেন সেটাতো কেবলই ফায়সালা, আইন নয়। এই ফায়সালা শরি'য়াতের (আইনের) মর্যাদা অর্জন করে না। বরং এটা তো কেবল ফায়সালা যা তাৎক্ষণিক এবং এটা সুনির্দিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে। অতঃপর এই হাকিমের পরিবর্তে অন্য হাকিম হুকুমাতের অধিকারী হলে তখন সে পূর্বে হুকুমাতে সংঘটিত ফায়সালার অনুগামী হবেন না। বরং তিনি নিজের সিদ্ধান্ত মোতাবেকই ফায়সালা দিবেন এবং তিনি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। "১৪৪ তবে ক্ষেত্র বিশেষে দলিলের ব্যাপকতা বিদ্যমান থাকা সাপেক্ষে ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যেমন: عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ ﷺ يَوْمَ الأَحْزَابِ " لَا يُصَلِّيَنَّ أَحَدٌ الْعَصْرَ إِلَّا فِي بَنِي قُرَيْظَةَ . فَأَدْرَكَ بَعْضُهُمُ الْعَصْرَ فِي الطَّرِيقِ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ لَا تُصَلِّي حَتَّى نَأْتِيَهَا. وَقَالَ بَعْضُهُمْ بَلْ تُصَلِّي، لَمْ يُرِدْ مِنَّا ذَلِكَ، فَذُكِرَ ذَلِكَ ﷺ فَلَمْ يُعَنِّفْ وَاحِدًا مِنْهُمْ .
ইবনে 'উমার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী আহযাব যুদ্ধের দিন (যুদ্ধ শেষে) বললেন: বনু কুরায়যার মহল্লায় না পৌঁছে কেউ যেন আসরের সালাত আদায় না করে। পথিমধ্যে আসরের সালাতের সময় হয়ে গেলে কেউ কেউ বললেন, আমরা সেখানে পৌছার পূর্বে সালাত আদায় করব না। আবার কেউ কেউ বললেন, আমরা এখনই সালাত আদায় করব, কেননা নবী-এর নিষেধাজ্ঞার অর্থ এই নয় যে, রাস্তায় সালাতের সময় হয়ে গেলেও তা আদায় করা যাবে না। বিষয়টি নবী-এর কাছে উত্থাপন করা হলে তিনি তাদের কোন দলের প্রতিই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন নি। "১৪৫
এই হাদীসটি সম্পর্কে মুহাম্মাদ ইশতিয়াক (আমীর, জামা'আতুল মুসলিমীন) লিখেছেন:
"সাহাবীদের উভয় জামা'আতই কুরআন ও হাদীসের ওপর 'আমল করেছেন। একটি পক্ষ কুরআনের আয়াতের ওপর 'আমল করেছেন, অপর পক্ষ হাদীসের ওপর 'আমল করেছেন। অর্থাৎ একটি পক্ষ 'আম হুকুমের উপর 'আমল করেছেন এবং অপর পক্ষ খাস হুকুমের উপর আমল করেছেন।” ('আম হুকুমটির স্বপক্ষে) আল্লাহ কুরআনে বলেছেন:
إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا "নিশ্চয় মু'মিনদের জন্য নির্দিষ্ট ওয়াক্তে সালাত আদায় করা ফরয করা হয়েছে।” [সূরা নিসা- ১০৩ আয়াত] ১৪৬
মাস'উদ আহমাদ লিখেছেন:
"এই হাদীসটি থেকে সুস্পষ্ট হলো, যখন কোন হুকুমে 'আম ও হুকুমে খাসের মধ্যে কোন দ্বন্দ দেখা দেবে, তখন উভয়ের কোন একটি উপর আমল করা যেতে পারে। তখন এই আক্বীদাও রাখতে হবে যে, উভয়ই জায়েয। কেননা রসূলুল্লাহ এর কোনটিকেই নাজায়েয বলেন নি। এটাও বলা যাবে না যে, এই 'আমলটি সহীহ এবং এটি ভুল। কিংবা এটা বলা যাবে না যে, অমুকটি গুরুত্ববহ, আর অমুকটি বেশি প্রাধান্য পাবে। কেননা নবী কোনটিকে এভাবে গুরুত্ববহ বা বেশি প্রাধান্য দেন নি। এই হাদীসটি থেকে এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, কোন হাদীস বুঝার ক্ষেত্রে যদি ইখতিলাফ হয়েই যায় তবে তা ক্ষমাযোগ্য। কিন্তু পরস্পরকে খারাপ কিছু বলা যাবে না। কেননা, রসূলুল্লাহ [পূর্বোক্ত হাদীসে] কোন পক্ষকেই খারাপ বলেন নি। অবশ্য ইখতিলাফের কারণে ফিরকা (দল, উপদল বা গোষ্ঠী) বানানো, কেবল ক্বিয়াসের ভিত্তিতে হাদীসকে না মানা। কিংবা কোন অ-নবী ব্যক্তির রায়কে হাদীসের উপর প্রাধান্য দেয়া- এ সমস্ত বিষয় ইসলাম ও ঈমানের দাবির ভিত্তিতে নিষিদ্ধ, যা শিরকের দিকে ধাবিত করে।"১৪৭
৩. মাস'উদ আহমাদ: "সালাত, সিয়াম প্রভৃতি 'ইবাদাত অবশ্যই জরুরী, কিন্তু সর্বাবস্থায় নয়। যেমন- মাগরিবে তিন রাক'আতের বদলে যদি কেউ চার রাক'আত পড়ে, তাহলে আভিধানিক অর্থে এটা 'ইবাদাত হবে কিন্তু শরি'য়াতের পরিভাষায় এটা আল্লাহ এ'র বিরুদ্ধাচরণ হবে। তার সালাত 'ইবাদাতের মোকাবেলায় অবাধ্যতা বলে গণ্য হবে। ফলে সৃষ্টির উদ্দেশ্যেরই অবসান হবে। এভাবে যদি কেউ ফজরের সালাতের পরে সূর্যোদয়ের পূর্বে নফল সালাত পড়ে, তাহলে সে ইবাদাতকারী তো বটেই কিন্তু আল্লাহর কাছে সে বিদ্রোহী বা বিরুদ্ধাচারী।
এমনিভাবে যদি কেউ 'ঈদের দিন সাওম রাখে, তাহলে তার সাওম 'ইবাদাত হবে না। এভাবে সিয়াম পালনকে সওয়াব বা 'ইবাদত হিসাবে গণ্যকারী কেবল গুনাহগারই নয়, বরং কাফিরে পরিণত হবে।"
তাহক্বীকু ৩: আমরা পূর্বে বলেছি, 'ইবাদাতের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বা হুবহু দলিল প্রমাণ ছাড়া তা বিদ'আত হিসাবে গণ্য হবে যা বাতিল ও গোমরাহীর নামান্তর। কিন্তু এর সাথে সাথে মানুষের দৈনন্দিন জীবন- যাপন, লেনদেন প্রভৃতির ক্ষেত্রে শরি'য়াতের সীমারেখা মেনে চলাটাই হুকুম। অর্থাৎ 'ইবাদাতের ক্ষেত্রটি সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে হতে হবে। পক্ষান্তরে মু'আমালাতের ক্ষেত্রে যা নিষিদ্ধ নয় তা-ই বৈধ। এর উদাহরণ ইবাদাতের মধ্যকার ফরয নির্দেশাবলি তরককারী বা মনগড়া আমলকারী ক্ষেত্র বিশেষে কাফির ও বিদ'আতী, কিন্তু মু'আমালাতের মধ্যকার নির্দেশাবলি অমান্যকারী কাফির নয়। যেমন, আল্লাহর হুকুম অমান্যকারী শাসকের ক্ষেত্রে নবী বলেছেন: يَكُوْنُ عَلَيْكُمْ اُمَرَاءُ تَعْرِفُوْنَ وَتُنْكِرُوْنَ فَمَنْ الْكَرَ فَقَدْ بَرِئَ وَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ قَالُوْا أَفَلَا تُقَاتِلُهُمْ قَالَ لَا مَا صَلَّوْا -
"অচিরেই তোমাদের ওপর এমন সব শাসক নিযুক্ত হবে, যারা ভাল মন্দ উভয় প্রকারের কাজ করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি তাদের মন্দ কাজের প্রতিবাদ করল, সে ব্যক্তি দায়িত্ব হতে মুক্ত হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি মনে মনে উক্ত কাজটিকে খারাপ জানল, সে ব্যক্তিও নিরাপদ হলো। কিন্তু যে ব্যক্তি তাদের কাজের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করল এবং উক্ত শাসকের সে (অন্যায়) কাজে আনুগত্য করল (সে গুনাহর মধ্যে নিমজ্জিত হল)। তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ! এমতাবস্থায় আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে ক্বিতাল করব না? তিনি বললেন: না, যতক্ষণ তারা সালাত পড়ে।"১৪৮ অন্য বর্ণনায় আছে, مَا أَقَامُوا فِيْكُمُ الصَّلَاةَ لَّا যদি ও যতক্ষণ তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম রাখে। "১৪৯ অন্য বর্ণনা আছে, الا أنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا عِنْدَكُمْ مِّنَ اللَّهُ فِيْهِ بُرْهَانَ যতক্ষণ না তোমরা তার মধ্যে প্রকাশ্য কুফর দেখতে পাবে এবং তোমাদের কাছে এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে আল্লাহর সুস্পষ্ট দলিল থাকবে।"১৫০
হুযায়ফা বলেন: قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّا كُنَّا بِشَرٌ فَجَاءَ اللهُ بِخَيْرٍ فَنَحْنُ فِيْهِ فَهَلْ مِنْ وَّرَاءِ هَذَا الْخَيْرِ شَرٌّ قَالَ نَعَمْ قُلْتُ هَلْ وَرَاءَ ذَالِكَ الشَّرِّ خَيْرُ قَالَ نَعَمْ قُلْتُ فَهَلْ وَرَاءَ ذَالِكَ الْخَيْرِ شَرُّ قَالَ نَعَمْ قُلْتُ كَيْفَ قَالَ يَكُوْنَ بَعْدِي أَئِمَّةُ لَا يَهْتَدُوْنَ بِهُدَايَ وَلَا يَسْتَنُّوْنَ بِسُنَّتِي وَسَيَقُوْمُ فِيْهِمْ رِجَالُ قُلُوْبُهُمْ قُلُوْبُ الشَّيَاطِينِ فِي جُثْمَانِ النِّ قَالَ قُلْتُ كَيْفَ أَصْنَعُ يَا رَسُوْلَ اللَّهِ إِنْ أَدْرَكْتُ ذَالِكَ قَالَ تَسْمَعُ وَتُطِيعُ لِلْأَمِيْرِ وَإِنْ ضُرِبَ ظَهْرُكَ وَاحْذَمَالُكَ فَاسْمَعْ وَاطِعْ -
"আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ! আমরা ছিলাম অমঙ্গলের মধ্যে তারপর আল্লাহ আমাদের জন্যে মঙ্গল নিয়ে আসলেন। আমরা তাতে অবস্থান করছি। এ মঙ্গলের পরে কি আবার কোন অমঙ্গল আছে? তিনি বললেন: হাঁ। আমি বললাম, এ অমঙ্গলের পরে কি আবার কোন মঙ্গল আছে? তিনি বললেন: হাঁ। আমি বললাম, এ মঙ্গলের পরে কি আবার কোন অমঙ্গল আছে? তিনি বললেন: হাঁ। আমি বললাম, তা কিভাবে? তিনি বললেন, আমার পরে এমন সব নেতার উদ্ভব হবে যারা আমার হিদায়েতে হিদায়েতপ্রাপ্ত হবে না এবং সুন্নাতও তারা অবলম্বন করবে না। অচিরেই তাদের মধ্যে এমন সব লোকের উদ্ভব হবে যাদের অন্তঃকরণ হবে মানব দেহে শয়তানের অন্তঃকরণ; রাবী বলেন, আমি বললাম: তখন আমরা কি করবো, ইয়া রসূলাল্লাহ! যদি আমরা সে পরিস্থিতির সম্মুখীন হই? বললেন: তুমি শুনবে এবং মানবে যদি তোমার পিঠে বেত্রাঘাত করা হয় বা তোমার ধন-সম্পদ কেড়েও নেওয়া হয় তবুও তুমি শুনবে এবং মানবে। "১৫১
সুস্পষ্ট হলো, সালাত তরককারী কাফির, কিন্তু মু'আমালাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ অমান্যকারী সালাতের ন্যায় 'ইবাদাত ত্যাগ না করলে জালিম হলেও কাফির নয়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ নিষিদ্ধ এবং ভাল কাজে তাকে মানতে হবে।
৪. মাস'উদ আহমাদ: "এভাবে শতশত উদাহরণ দেয়া যাবে। ভেবে দেখুন, কেন 'ইবাদাত বিরুদ্ধাচারণে পরিণত হচ্ছে? যদি আপনি স্বল্প পরিমাণ চিন্তাও করেন, তাহলে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন যে, এর কারণ হলো, এ 'ইবাদাতগুলো আল্লাহ'র নির্ধারিত সীমার আওতাভুক্ত ছিল না। এ জন্যেই এগুলো 'ইবাদাত নয়। এ সমস্ত 'ইবাদাতে আল্লাহ'র বিরুদ্ধাচারণ করা হয়েছে, এর মাধ্যমে ইতা'আত বা আনুগত্যের মোকাবেলায় অবাধ্যতা করা হয়েছে। সুতরাং শরি'য়াতি পরিভাষায় এগুলোকে 'ইবাদাত বলা যায় না।"
তাহক্বীক্ব ৪: নিঃসন্দেহে 'ইবাদাত হতে হবে আল্লাহর নির্দেশিত সুস্পষ্ট পন্থায়, অন্যথা এটা বিরুদ্ধাচারণে পরিণত হবে। শাব্দিক অর্থে সবকিছুই 'ইবাদাত ও ইতাআত। কিন্তু পারিভাষিক অর্থে 'ইবাদাত ও ইতা'আতের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে যার স্বপক্ষে আমরা পূর্বে প্রমাণ পেশ করেছি।
৫. মাস'উদ আহমাদ: "পূর্বোক্ত আলোচনার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, 'ইবাদাত প্রকারান্তরে ইতা'আত বা আনুগত্যেরই নাম। নিচের আয়াতটি এ দাবিই সমর্থন করে।
আল্লাহ বলেন: لَا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ "শয়তানের ইবাদাত করো না।"১৫২
লক্ষণীয়, কেউ কি শয়তানকে সাজদা করে? তার নামে কুরবানী করে? তার নামে ওয়াযিফা পড়ে? তার নামে দান-খয়রাত করে? কখনোই না। তাহলে এখানে শয়তানের 'ইবাদাতের উদ্দেশ্যই বা কী? সুস্পষ্ট হলো যে, শয়তানের 'ইবাদাত বলতে এখানে শয়তানের ইতা'আত বা আনুগত্যকে বুঝানো হয়েছে। শয়তানের ইতা'আত বা আনুগত্যের কারণেই লোকেরা কুফর ও শিরক, অন্যায় ও পাপাচার, গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে নিমজ্জিত হয় এবং সিরাতে মুস্তাক্বীম থেকে বিচ্যুত হয়। এ কারণে পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন:
وَأَنِ اعْبُدُونِي هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ "আমার 'ইবাদাত কর, এটাই সিরাতে মুস্তাক্বীম।"১৫৩
এই আয়াতে আল্লাহ শয়তানের 'ইবাদাতের মোকাবেলায় নিজের 'ইবাদাতের কথা উল্লেখ্য করেছেন। কেননা, শয়তানের 'ইবাদাত শয়তানের ইতা'আত। সুতরাং আল্লাহ'র 'ইবাদাত আল্লাহ'র ইতা'আত।"
তাহক্বীকু ৫: শাব্দিক অর্থে 'ইবাদাত ও ইতা'আত পরিপূরক হলেও, আভিধানিক অর্থে এদের মধ্যকার পার্থক্যও সুস্পষ্ট, যা পূর্বে প্রমাণিত হয়েছে। শয়তানের 'ইবাদাত ও ইতা'আত উভয়েরই প্রমাণ পাওয়া যায়। নিচের আয়াতটিতে মূর্তিপূজাকে শয়তানের 'ইবাদাত হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে:
يَا أَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلرَّحْمَنِ عَصِيًّا – يَا أَبَتِ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِنَ الرَّحْمَنِ فَتَكُونَ لِلشَّيْطَانِ وَلِيًّا - قَالَ أَرَاغِبٌ أَنْتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا
[ইবরাহীম বললেন] হে আমার পিতা! আপনি শয়তানের 'ইবাদাত করবেন না। শয়তান তো রহমানের (আল্লাহ'র) অবাধ্য। হে আমার পিতা! আমি আশংকা করছি, আপনাকে রহমানের আযাব স্পর্শ করবে এবং আপনি হবেন শয়তানের বন্ধু। [পিতা] বললো, হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার দেব-দেবী থেকে বিমুখ? যদি বিরত না হও, তবে আমি প্রস্তরাঘাতে অবশ্যই তোমার প্রাণ নাশ করবো; তুমি চিরদিনের জন্য আমার নিকট থেকে দূর হয়ে যাও। "১৫৪
সুতরাং আল্লাহর 'ইবাদাত ছাড়া অন্যদের 'ইবাদাত করাটাই প্রকারান্তরে শয়তানের 'ইবাদাত। এর মধ্যে সাজদা, রুকু, নযর-নেয়ায, দুআ বা আহবান করা, সমস্যা দূরকারী হিসাবে চিহ্নিত করা এ সবই অন্ত র্ভুক্ত। তেমনি 'ইবাদাত ও মু'আমালাত উভয় ক্ষেত্রেও শয়তানী আমল শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ
“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক তির নিকৃষ্ট শয়তানী 'আমল। তাই তোমরা তা বর্জন কর। "১৫৫
সুতরাং সুস্পষ্ট হলো, 'ইবাদাত ও ইতা'আত শাব্দিক অর্থে এক হলেও পারিভাষিক দাবীর ভিত্তিতে এদের মধ্যে স্বতন্ত্রতা আছে। যেমন- ইচ্ছাকৃত সালাত ত্যাগকারী দুনিয়াতে কাফির হিসাবে গণ্য হবে। এ সম্পর্কে নবী বলেছেন:
بَيْنَ الْعَبْدِ وَبَيْنَ الْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ
"বান্দার ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হল সালাত তরক করা। "১৫৬
তিনি অন্যত্র বলেছেন:
بَيْنَ الْعَبْدِ وَبَيْنَ الْكُفْرِ وَالْإِيْمَانِ الصَّلَاةِ ، فَإِذَا تَرَكَهَا فَقَدْ أَشْرَكَ "বান্দার এবং কুফর ও ঈমানের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত বর্জন করা। কাজেই যখন সে সালাত বর্জন করল, সে শিরক করল।"১৫৭
পক্ষান্তরে ইচ্ছাকৃত কোন কবীরা গুনাহ করার কারণে ঐ কাজে ব্যস্ত থাকা পর্যন্ত সে ক্ষণিকের জন্য ঈমান হারা হলেও চূড়ান্তভাবে কাফির হিসাবে চিহ্নিত হয় না। এ সম্পর্কে আবূ যার গিফারী বর্ণনা করেন। আমি একদিন নবী এর কাছে গেলাম, তিনি সাদা কাপড় পরিহিত অবস্থায় ঘুমিয়ে ছিলেন। অতঃপর আবার তাঁর কাছে গেলাম। সে সময় তিনি জেগেছেন। তখন তিনি বললেন:
مَا مِنْ عَبْدٍ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ثُمَّ مَاتَ عَلَى ذَالِكَ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ قُلْتُ وَإِنْ زَلَى وَإِنْ سَرَقَ قَالَ وَإِنْ زَلَى وَإِنْ سَرَقَ "আল্লাহ'র যে বান্দা এ কথা বলবে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং এর উপর থেকে মারা যাবে সে জান্নাতে যাবে। আমি [আবূ যার জিজ্ঞাসা করলাম: যদিও সে যিনা করে ও চুরি করে? নবী বললেন: যদিও সে যিনা করে এবং চুরি করে।"১৫৮
তাছাড়া নবী ঐসব কবীরা গুনাহকারীদের শাফায়াত করবেন যারা শিরক থেকে মুক্ত ছিল। আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ বলেছেন:
لكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَاتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِّأُمَّتِي إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَّاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا "প্রত্যেক নবীকে একটি বিশেষ দু'আর অধিকার দেয়া হয়েছে যা কবুল করা হয়। প্রত্যেক নবী শীঘ্র শীঘ্র দুনিয়াতেই তাঁর দু'আ চেয়েছেন,
আর আমি আমার দু'আ ক্বিয়ামত পর্যন্ত মুলতবী রেখেছি আমার উম্মাতের শাফায়াতরূপে। ইনশাআল্লাহ এটা আমার উম্মাতের প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতি পৌঁছবে, যে আল্লাহর সাথে কিছুকে শরীক না করে মারা গেছে।”১৫৯ অন্যত্র নবী বলেছেন:
شَفَاعَتِيْ لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي
"আমার শাফায়াত হবে আমার উম্মাতের কবীরা গুনাহগারদের জন্য। "১৬০
সুস্পষ্ট হলো, 'ইবাদাত ও মু'আমালাতের বিষয়ে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনেই স্বতন্ত্রতা রয়েছে। কেননা পূর্বে বর্ণিত আয়াতে আমরা দেখেছি যে, দেবদেবীর পূজাকে শয়তানের 'ইবাদাত বলা হয়েছে। আর এতে লিপ্ত ব্যক্তি মুশরিক ও চিরদিনের জন্য জাহান্নামী। পক্ষান্তরে মদ, জুয়া, ব্যভিচার প্রভৃতি হারাম কাজে লিপ্ত ব্যক্তি যদি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে তবে সে কেবল কবীরা গুনাহকারী হিসাবে চিহ্নিত হবে এবং আখিরাতে আযাব ভোগের পর কিংবা নবী -এর শাফায়াতে জান্নাতী হবে। সুতরাং শরি'য়াতের উভয় দিকটির পার্থক্য সুস্পষ্ট। ১৬১
৬. মাস'উদ আহমাদ: "উপরিউক্ত আয়াত ও পর্যালোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয় যে, আল্লাহ মানুষকে ইতা'আত বা আনুগত্যের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং ইতা'আত বা আনুগত্য কেবলই আল্লাহ'র হক্ক। তিনি যতক্ষণ না অন্য কারো ইতা'আত বা আনুগত্যের অনুমতি দিবেন, ততক্ষণ কারো ইতা'আত জায়েয নয়। যদি তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কারো ইতা'আত (আনুগত্য) করে তাহলে তা শিরক ফিল ইতা'আত (আনুগত্যে শিরক) বলে গণ্য হবে। আর শিরকের চেয়ে বড় অন্য আর কোন শিরক নেই, যার দ্বারা জীবনের উদ্দেশ্যই পাল্টে যায়। আল্লাহ বলেন:
فَإِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا
"তোমাদের ইলাহ কেবলই একজন, সুতরাং কেবল তারই অনুগত থাক।"১৬২
এই ইতা'আত বা আনুগত্যের অপর নামই ইসলাম। ইসলাম অর্থ- আল্লাহ'র নিকট সমর্পিত বা অনুগত। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ'র আনুগত্য করে সেই মুসলিম। আর যে আল্লাহ'র ইতা'আত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে অমুসলিম। সে জীবনের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে বেপরোয়া, সে নিজের স্রষ্টার বিরুদ্ধাচারী এবং তাঁর নিকট নিজেকে সমর্পিত করতে বক্রতা অবলম্বনকারী।
তাহক্বীকু ৬: নিঃসন্দেহে মুসলিম হিসাবে আল্লাহ'র সমস্ত নির্দেশই পালন করতে হবে। তা আল্লাহর হক্ব বা 'ইবাদাতের সাথে সংশ্লিষ্টই হোক, কিংবা বান্দার হক্ক বা দুনিয়াবী মু'আমালাতের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ই হোক। উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর সুনির্দিষ্ট হুকুম ও সীমারেখা লংঘনকারী অমুসলিম। ১৬৩ এক্ষেত্রে পার্থক্য হলো, 'ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহ নিজের সাথে কাউকেই শরীক করেন নি। পক্ষান্তরে ইতা'আত শব্দটি আল্লাহ বান্দার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করেছেন, যা নিঃসন্দেহে মু'আমালাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ সম্পর্কে পূর্বেই দলিল প্রমাণ উল্লেখ্য করেছি।
সম্মানিত লেখক লিখেছেন: "ইতা'আত বা আনুগত্য কেবলই আল্লাহ'র হক্ক। তিনি যতক্ষণ না অন্য কারো ইতা'আত বা আনুগত্যের অনুমতি দিবেন, ততক্ষণ কারো ইতা'আত জায়েয নয়। যদি তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কারো ইতা'আত (আনুগত্য) করে তাহলে তা শিরক ফিল ইতা'আত (আনুগত্যে শিরক) বলে গণ্য হবে।" এ পর্যায়ে প্রশ্ন করা চলে, আল্লাহ ইতা'আতের ন্যায় 'ইবাদাতের ব্যাপারেও কি নিজেকে ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাতের অনুমতি দিয়েছেন? এর জবাব হলো, না। সুতরাং 'ইবাদাত ও ইতা'আত এক নয়, কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়ন স্ব স্ব প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করাটাই ইসলাম। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক দিন।
তাছাড়া আমরা পূর্বেই প্রমাণ পেয়েছি যে, 'ইবাদাতে শিরককারীর হুকুম ও দুনিয়াবী ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর বিধি-বিধানকে স্বীকৃতি দেয়া সাপেক্ষে তাঁরই আইন লঙ্ঘনকারীর হুকুম শরিয়াতের দৃষ্টিতেই এক নয়। এ কারণে ইতা'আতের ক্ষেত্রে হুকুম লঙ্ঘনকারী ও 'ইবাদাতের ক্ষেত্রে হুকুম লঙ্ঘনকারীরও হুকুম এক হয় না। অথচ সম্মানিত লেখক উভয়টিকেই এক দৃষ্টিতে দেখেছেন। আর এ দৃষ্টিভঙ্গী নিঃসন্দেহে শরি'য়াতী দৃষ্টিভঙ্গী নয়।
৭. মাস'উদ আহমাদ: "ইসলামই একমাত্র জীবন-বিধান যে বিধান অনুযায়ী জীবন-যাপন করা উচিত। যদি জীবনের সমস্ত কাজকর্ম আল্লাহ'র ইতা'আত অনুযায়ী হয়, তাহলে ঐ সমস্ত কাজকর্মও 'ইবাদাত। যদি সালাত আল্লাহ'র হুকুম মোতাবেক আদায় করা হয়, তাহলে সালাতও 'ইবাদাত। যদি সাওম আল্লাহ'র হুকুম মোতাবেক হয়, তাহলে সাওমও 'ইবাদাত। যদি ব্যবসা- বাণিজ্য আল্লাহ'র হুকুম মোতাবেক হয়, তাহলে এটাও আল্লাহর 'ইবাদাত। এভাবে জীবনের সমস্ত চলাফেরা, শোয়া- ঘুমানো, উঠা-বসা, খাওয়া-পড়া, বিয়ে-শাদী, লেনদেন, তালাক-মুক্তি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হিংসা-শত্রুতা, বন্ধুত্ব-সহমর্মিতা প্রভৃতি যদি আল্লাহ'র হুকুম-আহকাম মোতাবেক হয়ে থাকে; তাহলে এ সবই 'ইবাদাত। এভাবে সমস্ত জীবনের কাজকর্মই 'ইবাদাতে পরিণত হবে।
রসূলুল্লাহ বলেছেন: أَنَّكَ لَا تَنْفَقَ نَفْقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ الله الا أُجِرْتَ عَلَيْهَا حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فَمِ امْرَأَتِكَ
"তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় যা-ই খরচ কর না কেন, তোমাকে তার সওয়াব অবশ্যই দেয়া হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে (খাদ্যের) লোকমা তুলে দাও, তাও।"১৬৪
তাহক্বীকু ৭: আল্লাহর নির্দেশ পালন মাত্রই সওয়াব রয়েছে। তা আল্লাহর হক্ব বা 'ইবাদাতের ক্ষেত্রেই হোক, কিংবা বান্দার হক্ব বা দুনিয়াবী লেনদেনের ক্ষেত্রেই হোক। আর পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, শাব্দিক অর্থে 'ইবাদাত ও 'ইতাআত পরিপূরক হলেও পারিভাষিকভাবে এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। সুতরাং পরিভাষার আলোকে 'ইবাদাত ও 'ইতাআত শব্দগুলোর নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার ব্যাপারে হুঁশিয়ার থাকা উচিৎ। 'ইবাদাত ও ইতা'আত উভয়টিই আল্লাহর হুকুম এবং অবশ্য পালনীয়।
৮. মাস'উদ আহমাদ: "আল্লাহ'র ইতা'আত (আনুগত্য) তাঁর বিধি-বিধান আমল করার মধ্যে নিহিত। এই বিধানদাতাও স্বয়ং আল্লাহ। যেমন বর্ণিত হয়েছে: شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ "আল্লাহ তোমাদের জন্যে দ্বীনি শরি'য়াত (বিধান) দিয়েছেন।"১৬৫ আইন প্রদানের ক্ষেত্রে কেউই আল্লাহ'র শরীক নয়। এ বিধান প্রদানের বিষয়টি কেবলই খালেস (নির্ভেজাল) ভাবে আল্লাহ'র জন্য। যেমন বর্ণিত হয়েছে: أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ "সাবধান! খালেস (নির্ভেজাল) দ্বীন কেবলই আল্লাহর জন্য।"১৬৬ সুতরাং দ্বীনের মধ্যে অন্য কারো অংশ নেই। অন্য কাউকে বিধানদাতা মানা, তার তৈরীকৃত বিধান দ্বীনের মধ্যে সংযোজন, তার ইজতিহাদ-ক্বিয়াস ও ফাতাওয়াকে দ্বীনি বিষয় বিবেচনা করাটাই হল আল্লাহর সাথে শিরক করা। এ মর্মে বর্ণিত হয়েছে: أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ "তারা কি এমন কাউকে (আল্লাহ'র) শরীক স্থির করে, যে তাদের জন্য দ্বীনি বিধান তৈরী করে? অথচ আল্লাহ তাদেরকে এ ব্যাপারে অনুমতি দেন নি।”১৬৭ আল্লাহ আরো বলেছেন: وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا "আল্লাহ হুকুমে কাউকে শরীক করো না।”১৬৮
আল্লাহ কারো অংশীদারীত্ব ছাড়া স্বয়ং একাকী-ই হুকুমদাতা। তাঁর হুকুম-আহকামে কেউ-ই শরীক নেই। এ মর্মে বর্ণিত হয়েছে: إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ “হুকুম কেবলই আল্লাহ 'র, তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত করো না। ১৬৯
তাহক্বীকু ৮: উম্মাতের মধ্যে উপরোক্ত আয়াতগুলো 'ইবাদাত ও মু'আমালাত উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করতে দেখা যায়। কিন্তু আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রমাণিত হবে যে, আয়াতগুলো দাবি 'ইবাদাতের ক্ষেত্রেই বেশী পরিপূরক। নিচে আমরা উপরোক্ত ক্রমানুসারেই এর বিবরণ উল্লেখ করলাম।
১. প্রথমে উল্লিখিত আয়াতটির পূর্ণ বর্ণনা হল: شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ يُنِيبُ "তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনি শরী'য়াত দিয়েছেন। যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে, আর যা আমি অহী করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই বলে যে, তোমরা দ্বীনকে কায়েম কর এবং তাতে ইখতিলাফ (মতভেদ) করো না। আপনি মুশরিকদের যার প্রতি আহ্বান করেছেন তা তাদের নিকট দুর্বল মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং তাঁর অভিমুখী, তাকে দ্বীনের দিকে পরিচালিত করেন। "১৭০
"আপনি মুশরিকদের যার প্রতি আহবান করেছেন" -আয়াতাংশটির ব্যাখ্যা নিম্নোক্ত আয়াতটিতে রয়েছে। আর তা হলো: وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
"আমি প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর 'ইবাদাত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর।"১৭১
সুতরাং সুস্পষ্ট হল, দ্বীন কায়েমের দাবির মধ্যে সর্বাগ্রে যে দাবিটি প্রাধান্য পায়- তা হলো, আল্লাহর 'ইবাদাত ও তাগুতকে বর্জন করা। তবে নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ মু'আমালাতের (রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক, সামাজিক, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক) ক্ষেত্রে যেসব আইন দিয়েছেন তাও দ্বীন কায়েমের দাবির মধ্যে গণ্য। এ মর্মে আল্লাহ্ বলেন:
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ لَا وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكِينَ
"তিনিই তাঁর রসূলকে হিদায়াত ও দ্বীনকে হকুসহ প্রেরণ করেছেন। যেন সব দ্বীনের উপর তা প্রভাবশালী হয়। যদিও মুশরিকদের কাছে তা অপছন্দনীয়।"১৭২
২. দ্বিতীয় আয়াতটির পূর্ণ বর্ণনা লক্ষ্য করুন:
أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ
"সাবধান! খালেস (নির্ভেজাল) দ্বীন কেবলই আল্লাহ'র জন্য। যারা আল্লাহ'র পরিবর্তে অন্যকে অলীরূপে গ্রহণ করে, তারা তো বলে- আমরা তো এগুলোর 'ইবাদাত এজন্যে করি যে, এরা আমাদের আল্লাহ'র সান্নিধ্যে এনে দেবে। তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে ইখতিলাফ (মতভেদ) করছে, আল্লাহ তার ফায়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।”১৭৩
আয়াতটি যে সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর হক তথা 'ইবাদাতের জন্য এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে নিঃসন্দেহে আয়াতটির প্রথমাংশ "সাবধান! খালেস (নির্ভেজাল) দ্বীন কেবলই আল্লাহ'র জন্য" -এর দাবি 'আম বা ব্যাপকার্থক। যা 'ইবাদাত ও মু'আমালাত উভয়টিকেই সম্পৃক্ত করে। কিন্তু এর মধ্যে 'ইবাদাতের দাবিই সর্বাগ্রে। কেননা ইবাদাত কেবলই আল্লাহর জন্যে হয় আর মু'আমালাতের মাঝে আল্লাহ ও বান্দা উভয়েরই হকু রয়েছে।
৩. তৃতীয় আয়াতটি লক্ষ্য করুন: أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ وَلَوْلَا كَلِمَةُ الْفَصْلِ لَقُضِيَ بَيْنَهُمْ وَإِنَّ الظَّالِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"তারা কি এমন কাউকে (আল্লাহ'র) শরীক স্থির করে, যে তাদের জন্য দ্বীনি বিধান তৈরি করে? অথচ আল্লাহ তাদেরকে এ ব্যাপারে অনুমতি দেন নি। ফায়সালার ঘোষণা না থাকলে তাদের বিষয়ে তো সিদ্ধান্ত হয়েই যেত। নিশ্চয়ই যালিমদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ আযাব। "১৭৪
লক্ষণীয় যে, 'ইবাদাতের ক্ষেত্রেই আল্লাহ নিজের সাথে কাউকে শরীক করতে নিষেধ করেছেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে: وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْنِي وَالْيَتمي وَالْمَسْكِيْنَ وَالْجَارِذِي الْقُرْنِي وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيْلِ لا وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ -
"আর তোমরা আল্লাহর 'ইবাদাত কর, আর তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ কর এবং নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম- মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। "১৭৫-
সুস্পষ্ট হলো, 'ইবাদাত কেবলই আল্লাহর জন্য। মানুষের প্রতি সদাচরণ, লেনদেন প্রভৃতি স্বতন্ত্র বিষয়। এটাও আল্লাহর হুকুম এবং এ ক্ষেত্রে ইতা'আত ও মু'আমালাত শব্দটি প্রযোজ্য। কেননা আল্লাহর অনুমতিক্রমে বান্দার ইতা'আত বৈধ। কিন্তু 'ইবাদাত সম্পূর্ণরূপে এর বিপরীত। আল্লাহ কোথাও বান্দার 'ইবাদাতের অনুমতি দেন নি।
৪. চতুর্থ আয়াতটির সম্পূর্ণ বর্ণনা লক্ষ করুন: قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا لَهُ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَبْصِرْ بِهِ وَأَسْمِعْ لَهُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا
"বলুন! তারা (আসহাবে কাহফ) কতকাল অবস্থান করেছে, তা আল্লাহই ভাল জানেন। আসমান ও যমীনের গায়েবী বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে আছে। তিনি কত চমৎকার দেখেন এবং শোনেন। তিনি ব্যতীত তাদের কোন অলী বা সাহায্যকারী নাই। তিনি কাউকে নিজের হুকুমে (কর্তৃত্বে) শরীক করেন না।”১৭৬
এই আয়াতটির শুরুতে আল্লাহ'র কয়েকটি সিফাত (গুণাবলি)-এর বর্ণনা এসেছে যা আক্বীদাগত 'ইবাদাত তথা তাওহীদের সাথে জড়িত। এ সমস্ত বিষয়ে কেউই আল্লাহ'র কর্তৃত্বে শরীক নয়- এটাই আয়াতের দাবি। তবে মু'আমালাতের ক্ষেত্রেও আল্লাহর হুকুমই প্রাধান্য প্রাপ্ত। কেননা আল্লাহ যা হালাল বা হারাম করেছেন, তাকে কেউ হারাম বা হালাল গণ্যকারী নিঃসন্দেহে কাফির ও মুশরিক। তবে আয়াতটির মূল দাবি প্রকৃতিতে আল্লাহ'র ক্ষমতা বা কর্তৃত্বকে প্রকাশ করা, যা তাওহীদ বা আক্বীদাগত 'ইবাদাতের সাথে সম্পৃক্ত।
৫. পঞ্চম আয়াতটির পূর্ণাঙ্গ অংশের দিকে লক্ষ্য করুন: مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَأَبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانِ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِله أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
"তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের 'ইবাদত কর, সেগুলো তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা সাব্যস্ত করে নিয়েছে। আল্লাহ এদের কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেন নি। হুকুম চলবে কেবল আল্লাহ'র। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারো 'ইবাদাত করো না। এটাই দ্বীনুল ক্বাইয়েম। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না। ১৭৭
আয়াতটির পূর্বাপর দাবি থেকে সুস্পষ্ট হয়, এটাও 'ইবাদাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কেননা 'ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড়া কোন আমীর, এমন কি পিতা-মাতার বিরোধি হুকুমও কার্যকরী নয়। কেননা, ইবাদাত করা হয় কেবল আল্লাহর হুকুমে। পক্ষান্তরে ইতা'আতও আল্লাহর হুকুমে করা হলেও 'ইবাদাত কেবল আল্লাহরই হকু। অপরপক্ষে ইতা'আত আল্লাহ ও বান্দা উভয়েরই হকু, আল্লাহরই অনুমতিক্রমে।
সম্মানিত পাঠক! লক্ষ্য করুন, আয়াতগুলোর সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা আয়াতগুলোর মূল শিক্ষা থেকে কি আমাদের বঞ্চিত করছে না? আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক দিন।
সম্মানিত লেখকের পরবর্তী দলিল-প্রমাণ ও বক্তব্যগুলো মু'আমালাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর ইতা'আত বা আনুগত্যের সুন্দর আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে।
৯. মাস'উদ আহমাদ: "হালাল, হারাম করার এখতিয়ার কেবলই আল্লাহ'র। এ মর্মে আল্লাহ বলেন: وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى الله الْكَذِبَ
"তোমাদের মুখ থেকে বেফাঁসভাবে মিথ্যারোপ করে বলো না যে, এটা হালাল, এটা হারাম। এটাতো আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ। ১৭৮
সুতরাং 'উলামাদের ফাতাওয়াতে কোন কিছুই হালাল বা হারাম হয় না। কেননা হালাল কেবল ঐ জিনিস যা আল্লাহ হালাল করেছেন। আর হারাম কেবল ঐ জিনিস যা আল্লাহ হারাম করেছেন।
কাযী বা বিচারকের ফায়সালা দ্বারাও কোন কিছু হালাল বা হারাম হতে পারে না। কাযীর ফায়সালা কেবলই ফায়সালা, এটা কোন বিধান হতে পারে না। যদি তার ফায়সালা সহীহ হয় তবে তা উত্তম বিষয়, আর যদি সহীহ না হয় তবে তা প্রত্যাখ্যাত। যদি ভুলক্রমে তা জারি হয়ে যায়, তাহলে সেটা সাময়িকভাবে হবে। ঐ কাযীই অনুরূপ অন্য একটি বিচারে ভিন্ন ফায়সালা দিতে পারে। কাযীর ফায়সালা চিরস্থায়ী বিধানের মর্যাদা পাবে না। চিরস্থায়ী বিধান কেবল আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান। যে এ বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে সে মুসলিম, যে তার বিপরীত ফায়সালা করে সে অমুসলিম। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন: وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
"যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই কাফির।"১৭৯
তাহক্বীকু ৯: আল্লাহ'র হালালকৃত বিষয়কে হারাম এবং হারামকৃত বিষয়টি হালাল গণ্যকারী কাফির। কেননা সে আল্লাহ'র প্রদত্ত বিধানের বিকৃতি করেছে। পক্ষান্তরে আল্লাহ'র বিধান অনুযায়ী ফায়সালার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব, অবিচার প্রভৃতির ক্ষেত্রে ব্যক্তি জালিম ও ফাসিকে পরিণত হয়, তাকে কাফির বা অমুসলিম বলা যাবে না। যেমন- আল্লাহর বিধান ও রসূলের সুন্নাত অমান্যকারী শাসকের ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ বলেছেন: يَكُوْنَ بَعْدِي أَئِمَّةُ لَا يَهْتَدُوْنَ بِهُدَايَ وَلَا يَسْتَنُّوْنَ بِسُنَّتِي وَسَيَقُوْمُ فِيْهِمْ رِجَالُ قُلُوْبُهُمْ قُلُوْبُ الشَّيَاطِينِ فِي جُثْمَانِ اِنْسِ قَالَ قُلْتُ كَيْفَ أَصْنَعُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ أَدْرَكْتُ ذَالِكَ قَالَ تَسْمَعُ وَتُطِيْعُ لِلْاَمِيْرِ وَإِنْ ضُرِبَ ظَهْرُكَ وَاحْذَمَالُكَ فَاسْمَعْ وَأَطِعْ-
"আমার পরে এমন সব নেতার উদ্ভব হবে যারা আমার হিদায়েতে হিদায়েতপ্রাপ্ত হবে না এবং সুন্নাতও তারা অবলম্বন করবে না। অচিরেই তাদের মধ্যে এমন সব লোকের উদ্ভব হবে যাদের অন্তঃকরণ হবে মানব দেহে শয়তানের অন্তঃকরণ; রাবী বলেন, আমি বললাম: তখন আমরা কি করবো, ইয়া রসূলাল্লাহ! যদি আমরা সে পরিস্থিতির সম্মুখীন হই? বললেন: তুমি শুনবে এবং মানবে যদি তোমার পিঠে বেত্রাঘাত করা হয় বা তোমার ধন-সম্পদ কেড়েও নেয়া হয় তবুও তুমি শুনবে এবং মানবে।”১৮০
লক্ষণীয়, উক্ত মানবিক যুলুম ও হক্ক নষ্ট হওয়ার পরেও হিদায়াত ও সুন্নাত বিমুখ শাসকের আনুগত্য করতে বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে 'ইবাদাতের ক্ষেত্রে হেরফেরকারী শাসকের আনুগত্য করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেন, নবী বলেন: سَيَلِي أُمُورَكُمْ بَعْدِي رِجَالٌ يُطْفِئُونَ السُّنَّةَ وَيَعْمَلُونَ بِالْبِدْعَةِ وَيُؤَخِّرُونَ الصَّلَاةَ عَنْ مَوَاقِيتِهَا فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ أَدْرَكْتُهُمْ كَيْفَ أَفْعَلُ قَالَ تَسْأَلُنِي يَا ابْنَ أُمِّ عَبْدِ كَيْفَ تَفْعَلُ لَا طَاعَةَ لِمَنْ عَصَى اللَّهَ.
"অচিরেই আমার পরে এমন সব লোক তোমাদের আমীর (নেতা) হবে, যারা সুন্নাতকে মিটিয়ে দেবে এবং বিদ'আতের অনুসরণ করবে এবং সালাত নির্দিষ্ট ওয়াক্ত থেকে পিছিয়ে দেবে। আমি তখন বললাম: ইয়া রসূলাল্লাহ! আমি যদি তাদের পাই, তবে কি করবো? তিনি বললেন: হে উম্মু 'আবদের পুত্র! তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছো যে, তুমি কি করবে? যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যচারণ করে, তার আনুগত্য করবে না।"১৮১
অর্থাৎ 'ইবাদাত বিকৃত হলে সেক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। এ ধরনের শাসকদের ব্যাপারে নবী-কে সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! এমতাবস্থায় আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে ক্বিতাল করব না? তিনি বললেন: না, যতক্ষণ তারা সালাত পড়ে।"১৮২ অন্য বর্ণনায় আছে, لَا مَا أَقَامُوا فِيْكُمُ الصَّلَاةَ “না, যতক্ষণ তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম রাখে।"১৮৩ অন্য বর্ণনা আছে, إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا عِنْدَكُمْ مِّنَ اللَّهُ فِيْهِ بُرْهَانَ "যতক্ষণ না তোমরা তার মধ্যে প্রকাশ্য কুফর দেখতে পাবে এবং তোমাদের কাছে এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে আল্লাহর সুস্পষ্ট দলিল থাকবে।"১৮৪
এ পর্যায়ে লক্ষণীয় যে, কেবল কুরআনের আয়াতের আলোকে এ ধরনের শাসককে শাব্দিকভাবে কাফির হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। পক্ষান্তরে কুরআন ও সহীহ হাদীস উভয়টির সমন্বয়ে করলে এই সিদ্ধান্তই পাওয়া যায় যে, আল্লাহ'র তাওহীদ বা 'ইবাদাতে ত্রুটিকারী শাসক কাফির হলেও, মু'আমালাতের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিষিদ্ধ বরং সব নেক কাজে তার ইতা'আত ওয়াজিব। তবে মু'আমালাতের ক্ষেত্রেও আল্লাহ'র হারামকৃত জিনিসকে হালাল বা হালালকৃত জিনিসকে হারাম গণ্যকারী বা ঘোষণাকারী শাসক কাফির। কেননা হালাল ও হারামের অধিকারী কেবলই আল্লাহ। ঐ সব শাসকরা যদি কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী শাসন চালাতো তবে কি নবী তাদেরকে নিকৃষ্ট শাসক হিসাবে চিহ্নিত করতেন? কক্ষণো না। পক্ষান্তরে তাদের সালাত তরক করা কিংবা প্রকাশ্য কুফরী পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ব্যবহারের অনুমতি প্রদান থেকে সুস্পষ্ট হয়- শরি'য়াত এ পর্যায়ে আল্লাহর হক্ক ('ইবাদাত) ও বান্দার হজ্বের (মু'আমালাতের) মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য সৃষ্টি করেছে।
১০. মাস'উদ আহমাদ: "কেবলমাত্র আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান অনুসরণ করতে হবে। এটাই প্রকৃত তাওহীদ। অন্য কিছুর অনুসরণ করা হারাম। এ মর্মে আল্লাহ বলেন:
اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ
"ঐ বিধানের অনুসরণ কর যা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে, এছাড়া কোন আওলিয়াদের অনুসরণ করো না।"১৮৫
আল্লাহ'র বিধান সর্বদাই চূড়ান্ত। কারো ফাতাওয়া বা রায়কে চূড়ান্ত বিধানের মর্যাদা দেয়া শিরক। আহলে কিতাবরাও (ইয়াহুদী, নাসারাও) মুসলিমদের এ আক্বীদার সাথে ঐকমত্য ছিল। এ আক্বীদা থেকে বিচ্যুতির কারণে আল্লাহ তাদের ইসলামের দিকে দা'ওয়াত দিয়েছেন। এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءِ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ
"বলুন, হে আহলে কিতাব! একটি বিষয়ের দিকে আস- যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত করব না, তাঁর সাথে কোন শিরক করব না, এবং নিজেদের মধ্যকার একে অপরকে আল্লাহ'র পরিবর্তে রব হিসাবে গণ্য করব না।”১৮৬
এ আক্বীদাতে একমত হওয়া সত্ত্বেও তারা আমলগত শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত হলো। আল্লাহ ﷻ ছাড়া অন্য কাউকে নিজেদের রব হিসাবে না মানার আক্বীদা রাখা সত্ত্বেও, তারা নিজেদের 'উলামা ও দরবেশদের রব বানিয়ে রেখেছিল।
এ সম্পর্কে আল্লাহ ﷻ বলেন: ٱتَّخَذُوٓا۟ أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَٰنَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ ٱللَّهِ وَٱلْمَسِيحَ ٱبْنَ مَرْيَمَ وَمَآ أُمِرُوٓا۟ إِلَّا لِيَعْبُدُوٓا۟ إِلَٰهًا وَٰحِدًا ۖ لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ سُبْحَٰنَهُۥ عَمَّا يُشْرِكُونَ
"তারা নিজেদের আলেম ও দরবেশদের আল্লাহকে ছেড়ে রব বানিয়ে রেখেছে এবং 'ঈসা ইবনে মারইয়ামকেও। অথচ তিনি তাদের এ হুকুম দিয়েছিলেন যে, ঐ একক সত্তার 'ইবাদাত (অর্থাৎ এক হাকিমের ইতা'আত) কর। তিনি ছাড়া আর কোন হাকিম নেই। (কিন্তু তারা এর উপর দৃঢ় থাকে নি, তারা আলেম ও দরবেশদেরকে হাকিম বানিয়ে শিরক করে।) তিনি তাদের শিরক থেকে পবিত্র।"১৮৭
সার-সংক্ষেপ: হাকিম কেবলই আল্লাহ ﷻ, ইতা'আত (আনুগত্য) কেবলই আল্লাহ'র হকু। চূড়ান্ত বিধান কেবল আল্লাহ'র নির্দেশাবলি। অন্যান্যদের ইতা'আতের হক্বদার মানা, তাদের রায় ও ফাতওয়াকে চূড়ান্ত বিধান গণ্য করাটাই আল্লাহ'র সাথে শিরক করা। এটাকে শিরক ফিল 'ইবাদাত ('ইবাদাতে শিরক)-ও বলা হয়। তাছাড়া শিরক ফিল হুকুম (আদেশ পালনে শিরক) এবং শিরক ফিতাশরি'য়ী (বিধি-বিধানে শিরক)-ও বলা হয়।
তাহক্বীকু ১০: 'ইবাদাত বা মু'আমালাত উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহ'র প্রদত্ত বিধানের মোকাবেলায় যে কোন মানবীয় বিধানকে পরিপূরক বা আন্তরিকভাবে মেনে নেয়াটাও শিরক। পার্থক্য এতটুকুই যে, 'ইবাদাত শব্দটির ক্ষেত্রে স্বয়ং আল্লাহ একক দাবিদার, আর অন্য কেউ-ই। পক্ষান্তরে মু'আমালাতের ক্ষেত্রে ইতা'আত শব্দটির প্রয়োগে আল্লাহ তাঁর নির্দেশের বিরোধি না হলে অন্যদের যেমন- আমির, পিতামাতা, বয়োজৈষ্ঠ, স্বামী প্রমুখের ইতা'আত করতে নির্দেশ প্রদান করেছেন। তেমনি হাকিম শব্দটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইতা'আত শব্দটি প্রযোজ্য। কিন্তু 'ইবাদাত শব্দটি শাব্দিক অর্থে একই হলেও পারিভাষিকভাবে এর দাবি কেবলই আল্লাহর। কোন আমির, পিতামাতা, বয়োজৈষ্ঠ, স্বামী কেউই এর হক্কদার নয়। যেমন নবী বলেছেন:
لَوْ كُنْتُ آمُرُ أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِاحَد لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا "যদি আমি (আল্লাহ ছাড়া) কাউকে সাজদার করার নির্দেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সাজদা করার। "১৮৮
এই হাদীসটিতে সাজদার ন্যায় 'ইবাদাতের কাজটি যে স্বামীর ক্ষেত্রে হারাম তা সুস্পষ্ট হয়েছে। পক্ষান্তরে স্বামীর ক্ষেত্রে ইতা'আত শব্দটি খুব প্রাঞ্জলভাবেই সম্পৃক্ত হয়েছে। এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ বলেছেন:
الْمَرْآةُ إِذَا صَلَّتْ خَمْسَهَا وَصَامَتْ شَهْرَهَا وَأَحْصَنَتْ فَرْجَهَا وَأَطَاعَتْ بَعْلَهَا فَلْتَدْخُلْ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شَاءَتْ -
"স্ত্রীলোক যখন তার প্রতি নির্ধারিত পাঁচ ওয়াক্তের সালাত আদায় করবে, রমাযান মাসের সিয়াম পালন করবে এবং নিজের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে ও স্বামীর ইতা'আত করবে- তখন সে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা চাইবে প্রবেশ করতে পারবে। "১৮৯
সুতরাং সুস্পষ্ট হল, 'ইবাদাত ও ইতা'আত শব্দ দু'টি আভিধানিক অর্থে পরিপূরক হলেও, পারিভাষিকভাবে এদের পার্থক্য সুস্পষ্ট। উভয়টির একচ্ছত্র অধিপতি আল্লাহ। কিন্তু 'ইবাদাত কেবল তাঁরই জন্য এবং ইতা'আত তাঁর অনুমতিতে ও সীমারেখার মধ্যে মানুষেরও করা জায়েয বরং ক্ষেত্র বিশেষে বাধ্যতামূলক। পরবর্তী অংশে এই কথাই উল্লেখ হয়েছে।
১১. মাস'উদ আহমাদ: "আল্লাহ 'ই প্রকৃত হাকিম (হুকুমদাতা)। আল্লাহ'র ইতা'আত (আনুগত্য) চিরন্তন ও চিরস্থায়ী, নিঃশর্ত ও সীমাহীন। আল্লাহ'র ইতা'আত ভাষা ও স্থানের মধ্যে সুনির্দিষ্ট নয়। আল্লাহ'র ইতা'আতেই দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা।
কেননা, আল্লাহ'ই প্রকৃত ইতা'আতের হক্বদার। সুতরাং অন্য কারো ইতা'আত কেবল ঐসব ক্ষেত্রে অবশ্যই করতে হবে, যখন ঐ ইতা'আতের হুকুম স্বয়ং আল্লাহ দেন। আল্লাহ নিজের হুকুম- আহকাম যথাযথ পালনের সুবিধার্থে রসূলদের ইতা'আতও ফরয করেছেন। সুতরাং আল্লাহর হুকুমে রসূলদের ইতা'আতও ফরয।
জামা'আতুল মুসলিমনের দা'ওয়াত: আসুন আমরা সবাই মিলে আল্লাহকে হাকিম মেনে নিই। হাকিমিয়্যাত (সার্বভৌমত্ব) কেবল আল্লাহ শু'র জন্যেই নির্ধারিত। কেবলমাত্র আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান মেনে চলি। আল্লাহ'র বিধান হিসাবে কেবল কুরআন ও হাদীসই সুরক্ষিত। কুরআন ও হাদীস আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। এ দু'টি জিনিসের মধ্যে আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন। এই দু'টি জিনিসকেই আমরা অবশ্যপালনীয় মনে করি। দল বা ফিরক্বা ভিত্তিক মাযহাবকে ত্যাগ করি, ফিরক্বাবন্দীর অবসান করি। আল্লাহ এক। তাঁকে একমাত্র হাকিম বা হুকুমদাতা মেনে নিয়ে এক হয়ে যাই।
জামা'আতুল মুসলিমীনের দা'ওয়াত কবুল করুন এবং এর সহযোগী/সহযোদ্ধা হোন
অহকীক ১১: উক্ত বক্তব্যের প্রয়োজনীয় সংস্কার আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। শেষাবধি আবারও লক্ষ্য করুন, এখানে রসূলের ইতা'আতকে ফরয করা হয়েছে- আর নিঃসন্দেহে তা ফরয। কিন্তু কোনক্রমেই এটা কি বলা যাবে যে, রসূলের 'ইবাদাত করাও ফরয- কখনো না। অর্থাৎ 'ইবাদাত কেবল আল্লাহ'রই হক্ব এবং এর মধ্যে আর কেউ-ই শরীক নয়। কিন্তু ইতা'আত আল্লাহ'র হুকুমে বা অনুমতিতে অন্যদেরও হক্ব। সুতরাং পারিভাষিকভাবে 'ইবাদাত ও ইতা'আতের পার্থক্য সুস্পষ্ট। এই পৃথকীকরণের অস্পষ্টতার কারণে অধিকাংশ মুসলিমদের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চল ও দল ভেদে রূঢ় বা বিদ্রোহী আচরণের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। কেবল শাব্দিকভাবে কুরআনকে প্রাধান্য দান ও হাদীসের দাবিকে সেগুলোর সাথে মিলিয়ে সমন্বয় করার মাধ্যমে উক্ত ভারসাম্যহীন আচরণ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। অন্যথায় কেবল শাব্দিকভাবে কুরআন পাঠ ও এর সাধারণ বুঝ কর্মীদের উপর চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন দল, উপদল।বা ফিরক্বার জন্ম নিচ্ছে, তেমনি সাধারণ জনগণ হচ্ছে বিভ্রান্ত। ইতোপূর্বে মুসলিমদের থেকে যেসব ফিরক্বার জন্ম হয়েছে তাদের প্রত্যেকের পৃথকীকরণের মূলেও ছিল এই একই কারণ। যার উদাহরণ আমাদের এই পুস্তিকার ভূমিকাতে উল্লেখ করেছি।
সুতরাং হজ্বের দা'ওয়াতের পূর্বে নিজেদের পূর্ববতী বিভিন্ন ফিরক্বার উৎস, তাদের ব্যাপারে সাহাবী, মুহাদ্দিস তথা সালাফে-সালেহীনদের ভূমিকাকেও অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে। আমাদের আলোচ্য পুস্তিকাটিতে যদি তাঁদের অবদানগুলোকে সামনে রেখে লেখা হত সেক্ষেত্রে এই শাব্দিক ভুল হবার সম্ভাবনা থাকতো না। নিঃসন্দেহে কুরআন হাদীসই তো মূল। কিন্তু এর প্রকৃত ব্যবহার মুহাদ্দিস ও সালাফে সালেহীনদের প্রদর্শিত পথেই হতে হবে।১৯০ যেমন উসূলে হাদীস ছাড়া হাদীস মূল্যায়ন সম্ভব নয়- আর নিঃসন্দেহে তা মুহাদ্দিসদের প্রদর্শিত পথ। অনুরূপ উসূলে ফিক্বাহ'র বিষয়টিও। পূর্বোক্ত আলোচনায় সালফে সালেহীন প্রদর্শিত উসূলে ফিক্বাহ'র পরিভাষা ও প্রয়োগ থেকে দূরে থাকার কারণেই উক্ত বিচ্যুতি ঘটেছে। তবে নিঃসন্দেহে অনেক মাযহাবভিত্তিক উসূলে ফিক্বাহ সরাসরি কুরআন ও হাদীস বিরোধি। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে সাধারণ বিবেক বিরোধিও বটে। নিঃসন্দেহে এমন উসূলে ফিক্বাহ পরিত্যাজ্য।
সর্বোপরি এটাই উল্লেখ করতে হচেছ যে, সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী ও মুহাদ্দিসদের দেখানো পথেই আমাদের কুরআন ও হাদীসকে বুঝতে হবে। হঠাৎ করে কেবল কুরআনের শাব্দিক অনুবাদ বা হাদীসকে উহ্য রেখে কোন নতুন আভিভূত ব্যাখ্যা থেকে মুক্ত থাকার জন্য এই পথের অনুসরণ জরুরী। এর আলোকেই মুসলিমদের জন্য পূর্ণ কুরআন ও সহীহ হাদীসের সংকলন ও বিভিন্ন ইসলামী সাহিত্য রচিত হতে হবে এবং সেগুলোই গ্রহণযোগ্য হবে। অন্যথায় সালাফে সালেহীনের নির্দেশনাহীন নতুন কোন সাহিত্য বাতিল ফিরক্বার সৃষ্টি বলেই গণ্য হবে। এমনটি হলে সেগুলো থেকে দূরে থাকা জরুরী। আল্লাহ বলেন: وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّnā هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
"আর যারা (মু'মিনরা) দুআতে বলে যে, হে আমাদের রব! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান কর, যারা আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারী হয় এবং আমাদের মুত্তাক্বীদের জন্য ইমাম বা আদর্শ কর।"১৯১
ইমাম বুখারী আয়াতটির শেষাংশ- "আমাদের মুত্তাক্বীদের জন্য ইমাম বা আদর্শ কর"-এর ব্যাখ্যায় উদ্ধৃতি দিয়েছেন: قَالَ أَيمَةً تَقْتَدِى بِمَنْ قَبْلَنَا ، وَيَقْتَدِى بِنَا مِنْ بَعْدِنَا
"কেউ বলেছেন: এরূপ ইমাম যে আমরা আমাদের পূর্ববতীদের (হক্বের ব্যাপারে) অনুসরণ করব, আর আমরাদের পরবর্তীরা আমাদের (হক্কের ব্যাপারে) অনুসরণ করবে।"১৯২
যারা হাদীসের যাচায়-বাছাই পদ্ধতি বা উসূলে হাদীস মানেন তাদেরকে অবশ্যই উক্ত আয়াত ও তার দাবিকে মেনেই চলতে হয়। ১৯৩ সুতরাং আসুন আমরা আল্লাহ'র কাছে প্রার্থনা করি: اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ - صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ - غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
“(হে আল্লাহ!) আপনি আমাদের সিরাতে মুস্তাকীমের পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথে যাদের আপনি নি'য়ামত দিয়েছেন। তাদের পথে নয়, যারা আপনার গযবপ্রাপ্ত হয়েছে ও পথভ্রষ্ট হয়েছে।"১৯৪
টিকাঃ
১১৯. সূরা হা-মীম আস-সাজদাহ- ৬ আয়াত
১২০. সূরা বাক্বারাহ- ১৬৩ আয়াত।
১২১. সূরা যুখরুফ: ৪৫ আয়াত।
১২২. সূরা নিসা: ৬৫ আয়াত।
১২৩. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহী মুসলিম, মিশকাত (ঢাকা: এমদাদিয়া) ৭/৩৬৫২ নং।
১২৪. সূরা তীন- ৮ আয়াত।
১২৫. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ৭/৩৪obe নং।
১২৬. সহীহ: শরহে সুন্নাহ, মিশকাত [এমদা] ৭/৩৫২৭ নং। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (তাহক্বীকুকৃত মিশকাত ২/১০৬২ পৃঃ]।
১২৭. সূরা যারিয়াত- ৫৬ আয়াত।
১২৮. সূরা যারিয়াত- ৫৬-৫৭ আয়াত।
১২৯. হাসান: ইবনে মাজাহ- (باب اتباع سنة رسول الله (ص) باب اجتناب الرأى والقياس আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। [তাহক্বীক্বকৃত ইবনে মাজাহ (রিয়াদ) হা/৫৩]
১৩০. সূরা নাহল- ৮৯ আয়াত।
১৩১. সূরা আনয়াম- ৩৮ আয়াত।
১৩২. সূরা আলে-ইমরান- ৩ আয়াত।
১৩০. সহীহ: সহীহ মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন [বি. আই. সি] ৪/১৬৪৭ নং।
১৩৪. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ১/১৩৩ নং।
১৩৫. সহীহ: মুসলিম, মিশকাত (এমদা] ১/১৩৪ নং।
১৩৬. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (ঢাকা: এমদাদিয়া) ৭/৩৬৫২ নং।
১৩৭. সূরা আলে-ইমরান- ১৫৯ আয়াত।
১৩৮. সূরা শূরা- ৩৮ আয়াত।
১৩৯. সূরা আনয়াম- ১১৯ আয়াত
১৪০. সহীহ: হাকিম- কিতাবুত তাফসীর مরম باب سورة مريم। হাকিম এর সনদকে সহীহ বলেছেন। উক্ত মর্মে বাযযার সলেহ সনদে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। (ফতহুল বারী (মাকতাবা মিশর, ১৪২১/২০০১) ১৩/৩৭৮ পৃঃ; নায়লুল আওতার (মিশর: দারুল হাদীস ১৪২১/২০০০)৮/৪২৮ পৃঃ।
১৪১. সহীহ: সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ১/১৪০ নং।
১৪২. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন (ঢাকা: ইসলামিক সেন্টার ১/১৫৬ নং।
১৪৩. মুহাম্মাদ ইশতিয়াক, তাহক্বীকে সালাত বাজাওয়াবে নামাযে মুদাল্লাল (করাচী: জামা'আতুল মুসলিমীন, ১৪২২/২০০১) পৃঃ ২৯।
১৪৪. ঐ পৃ: ২৯-৩০।
১৪৫. সহীহ: সহীহ বুখারী- কিতাবুল মাগাযী باب مرجع النبي صلى الله عليه و سلم من الاحزاب; সহীহ মুসলিম- কিতাবুল জিহাদ باب جواز قتال من نقض العهد
১৪৬. মুহাম্মাদ ইশতিয়াক, তাহক্বীকে সালাত বাজাওয়াবে নামাযে মুদাল্লাল (করাচী : জামা'আতুল মুসলিমীন, ১৪২২/২০০১) পৃঃ ২২-২৩।
১৪৭. মাস'উদ আহমাদ, সহীহ তারিখুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন (করাচী: জামা'আতুল মুসলিমীন ১৯৯৫/১৪১৬) পৃ: ৩৩৪-৩৩৫। এই শর্তের আলোকে বিশ্বব্যাপী একই দিনে ঈদ, সিয়াম ও মুসলিমদের দিন, তারিখ ও মাস গণনা করা যায়। এর স্বপক্ষে 'আম আয়াত নিম্নরূপ: ১. আল্লাহ বলেন: يَسْتَلُونَكَ عَنِ الْأَهْلة قُلْ هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجَّ )সূরা বাক্বারাহ- ১৮৯ আয়াত) "লোকেরা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলুন: এটা মানুষ ও হজ্জের জন্য সুনির্দিষ্ট সময় নির্দেশক।" আয়াতটি দ্বারা সুস্পষ্ট হয়, মানবজাতির জন্য চাঁদের হিসাবে দিন-তারিখ ও হজ্জের সময় নির্ধারণ একই হতে হবে। যেন তারা সবাই চন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী দিন, মাস ও বছর গণনা এবং হজ্জ, সিয়াম, 'ঈদ প্রভৃতি ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো একই সাথে উদযাপন করতে পারে। "এটা মানুষ ও হজ্জের জন্য সুনির্দিষ্ট সময় নির্দেশক" বক্তব্যের দ্বারা কোন বিশৃঙ্খল দিন-তারিখের হিসাব সৃষ্টি করার মোটেই উদ্দেশ্য নেই, বরং সুশৃঙ্খল দিন- তারিখ ও সময় নির্ধারণই উদ্দেশ্য। সুতরাং আয়াতটির আলোকে এটা সম্পূর্ণ বিবেক ও বাস্তবতা বিরোধি যে, কেবল হজ্জ পালনের ক্ষেত্রেই মুসলিমদের তারিখ এক হবে এবং অন্যান্য ধর্মীয় নির্দেশগুলোর ক্ষেত্রে চাঁদ দর্শনের আঞ্চলিকতাই প্রাধান্য পাবে। ২. আল্লাহ অন্যত্র বলেন:
هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاءً وَالْقَمَرَ نُوْرًا وَقَدْرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ * مَا خَلَقَ اللَّهُ ذلكَ إِلَّا بِالْحَقِّ يُفَصِّلُ الْآيَتِ لِقَوْمٍ يُعْلَمُوْنَ "তিনিই (আল্লাহ) সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং এর মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার। আল্লাহ এগুলো নিরর্থক সৃষ্টি করেন নি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন।” [সূরা ইউনুস- ৫ আয়াত]
৩. আল্লাহ অন্যত্র বলেন: وَجَعَلْنَا الَّيْلَ وَالنَّهَارَ آيَتَيْنِ فَمَحُونَا آيَةَ الَّيْلِ وَجَعَلْنَا آيَةَ النَّهَارِ مُبْصِرَةً لِّتَبْتَغُوْا فَضْلاً مِّنْ رَّبِّكُمْ وَلِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابِ "আমি রাত ও দিনকে করেছি দু'টি নিদর্শন; এরপর রাতের নিদর্শনটি করেছি নিষ্প্রভ আর দিনের নিদর্শনকে করেছি আলোকময়, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা বছরের সংখ্যা ও হিসাব স্থির করতে পার।" [সূরা বানী ইসরাঈল- ১২ আয়াত]
তবে এর স্বপক্ষে খাস হাদীসও রয়েছে, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, অন্য এলাকার চাঁদ দেখার খবর বিশ্বস্ত সূত্রে পৌঁছালে সেই অনুযায়ী ঐ এলাকার সাথে 'ঈদ প্রভৃতি উদযাপন করা যাবে। যেমন: عَنْ أَبِي عُمَيْرِ مِنْ أَنَسٍ عَنْ عُمُوْمَةٍ لَهُ مِنَ الصَّحَابَةِ أَنْ رَكْبًا (وفي رواية فَجَاءَ رَكِبٌ مِنْ آخِرِ النَّهَارِ فَشَهِدُوْا أَنَّهُمْ رَأَوُا الْهِلَالَ بِالْأَمْسِ فَأَمَرَهُمُ النَّبِيُّ ﷺ أَنْ يُفْطِرُوا ، وَإِذَا أَصْبَحُوا أَنْ يَعْدُوا إِلَى مَصَلَاهُمْ "আবূ 'উমাইর বিন আনাস তাঁর চাচাদের [সাহাবীদের নিকট থেকে বর্ণনা করেন, একটি কাফেলা (অন্য বর্ণনায়, দিনের শেষভাগে) এসে সাক্ষ্য দিল যে, গতকাল সন্ধ্যায় তারা আকাশে চাঁদ দেখেছে। ফলে নবী তাদের সিয়াম ভঙ্গ (ইফতার) করতে বললেন এবং পরদিন সকালে 'ঈদের ময়দানে যেতে নির্দেশ দিলেন।” [আহমাদ, আবু দাউদ, বুলুগুল মারাম; এর সনদ সহীহ (অনুবাদ: খলিলুর রহমান বিন ফজলুর রহমান) হা/৪৭৪। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (তাহক্বীকে আবু দাউদ হা/১১৫৭]
ইমাম শওকানী (রহ) এই মাসআলাটির বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে লিখেছেন: وَإِذَا رَاهُ أَهْلُ بَلَدٍ لَزِمَ سَائِرَ الْبِلَادِ الْمُوَافَقَةُ. أَمَّا كَوْنُهُ إِذَا رَاهُ أَهْلُ بَلَلَهِ لِزِمَ سَائِرَ الْبَلَادِ الْمُوَافَقَةُ فَوَجَهَهُ الْأَحَادِيثُ الْمُصَرَّحَةُ بِالصِّيَامِ لِرُؤْيَتِهِ وَالإفطارُ لِرُؤْيَتِهِ وَهِيَ خِطَابُ لِجَمِيعِ الْأُمَّةِ فَمَنْ رَاهُ مِنْهُمْ فِي أَي مَكَانٍ كَانَ ذَالِكَ رُؤْيَةٌ لِجَمِيعِهِمْ. "যখন কোন শহর বা দেশে চাঁদ দেখা যাবে তখন সমস্ত মুসলিম বিশ্ব এবং প্রত্যেকটি শহরবাসী এর অনুসরণ করবে। কেননা রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন: صُومُوا لرؤيته وَاقْطَرُوا لَرُّؤْيَتِهِ “চাঁদ দেখে সিয়াম রাখ এবং চাঁদ দেখে সিয়াম খোল। "সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (ঢাকা, এমদাদিয়া) ৪/১৮৭৩ নং।] এই হুকুম সমস্ত শহর ও প্রত্যেক দেশের জন্য 'আম (ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য)। এই হাদীসে কোন শহর বা দেশকে খাস (সুনির্দিষ্ট) করা হয় নি। এ কারণে কোন শহর বা দেশে চাঁদ দেখা সমস্ত মুসলিমদের জন্যই প্রযোজ্য। )الدرارى المضيئة ২/২০-২১ পৃঃ(
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসগুলোর মোকাবেলায় সহীহ মুসলিমে বর্ণিত সাহাবী ইবনে আব্বাস এর সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটির দাবীকে বিরোধি ভাবা যাবে না। যদি কোন এলাকার কাছে এতটা দীর্ঘ সময় পরে চাঁদ দেখার খবর পৌঁছে যেভাবে ইবনে আব্বাসের কাছে রমাযান মাসের শেষে পৌঁছেছিল। তাদের ক্ষেত্রে ইবনে আব্বাসের বর্ণনানুযায়ী নিজ এলাকার চাঁদ দেখার ভিত্তিতেই 'ঈদ, সিয়াম প্রভৃতির আমল নির্ধারিত হবে। পক্ষান্তরে খবরটি যথা সময়ে পৌঁছলে পূর্বোক্ত আয়াত ও হাদীসগুলোর 'আম দাবি অনুযায়ী বিশ্বের যে কোন প্রান্তের বিশ্বস্ত খবর অনুযায়ীই 'ঈদ, সিয়াম, হজ্জ প্রভৃতির উপর আমল করা যাবে। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক দিন। [বিস্তারিত: আতাউল্লাহ ডায়রভী, "ইসলামের নতুন চাঁদের বিধান ও এ সম্পর্কীত বিতর্ক নিরসন", অনুবাদ: কামাল আহমাদ)
১৪৮. সহীহ মুসলিম, মিশকাত [ঢাকা: এমদাদিয়া লাইব্রেরী, জানু-১৯৯৭) ৭ম খণ্ড হা/৩৫০২।
১৪৯. ঐ, হা/৩৫০১।
১৫০. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত ৭ম খণ্ড হা/৩৪৯৭।
১৫১. সহীহ: সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাত- بَابُ الْأَمْرِ بِلْزُوْمِ الْجَمَاعَةِ عِندَ ظُهُورِ الْفِتَنِ وَتَحْذِيرُ الدُّعَاةِ إِلَى الْكُفْرِ
১৫২. সূরা ইয়াসীন- ৬০ আয়াত।
১৫৩. সূরা ইয়াসীন- ৬১ আয়াত।
১৫৪. সূরা মারইয়াম- ৪৪-৪৬ আয়াত।
১৫৫. সূরা মায়িদাহ- ৯০ আয়াত।
১৫৬. সহীহ: সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ২/৫২৩ নং।
১৫৭. সহীহ: হিবতুল্লাহ তাবারী সহীহ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন [আত-তারগীব ওয়াত তারহীব (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশান) ১/৩৭৩ পৃঃ, হা/৫]। মুহাম্মাদ তামির হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীক্বকৃত আত-তারগীব (মিশর: দার ইবনে রজব) ১/৭৯৯ নং।
১৫৮. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ১/২৪ নং।
১৫৯. সহীহ: সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৫/২১১৯ নং।
১৬০. সহীহ: আবূ দাউদ, বাযযার, তাবারানী, সহীহ ইবনে হিব্বান, বায়হাক্বী, আত-তারগীব (ইফা) ৪/৪৭১ পৃঃ, হা/১১০। মুহাম্মাদ তামির হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীক্বকৃত আত-তারগীব (মিশর) ৪/৫৩৩৯ নং, পৃঃ ২২৫]
১৬১. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন মত প্রণীত- "কবীরা গুনাহগার মুমিন কি চিরস্থায়ী জাহান্নামী?" -আতিফা পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
১৬২. সূরা হাজ্জ- ৩৪ আয়াত।
১৬৩. যেমন- 'ইবাদাতে শিরককারী এবং মু'আমালাতে হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম সাব্যস্তকারী অমুসলিম তথা কাফির।
১৬৪. সহীহ: সহীহ বুখারী - কিতাবুল ঈমান باب ما جاء ان الاعمال بالنية والحسبة
১৬৫. সূরা শূরা- ১৩ আয়াত।
১৬৬. সূরা যুমার- ৩ আয়াত।
১৬৭. সূরা শূরা- ২১ আয়াত।
১৬৮. সূরা কাহাফ- ২৬ আয়াত।
১৬৯. সূরা ইউসূফ- ৪০ আয়াত।
১৭০. সূরা শূরা- ১৩ আয়াত।
১৭১. সূরা নাহল- ৩৬ আয়াত।
১৭২. সূরা সফ: ৯ আয়াত।
১৭৩. সূরা যুমার: ৩ আয়াত।
১৭৪. সূরা শূরা: ২১ আয়াত।
১৭৫. সূরা নিসাঃ ৩৬ আয়াত।
১৭৬. সূরা কাহফঃ ২৬ আয়াত।
১৭৭. সূরা ইউসূফ: ৪০ আয়াত।
১৭৮. সূরা নাহল : ১১৬ আয়াত।
১৭৯. সূরা মায়িদা- ৪৪ আয়াত।
১৮০. সহীহ: সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাত- بَابُ الْأَمْرِ بِلْزُوْمِ الْجَمَاعَةِ عِندَ ظُهُورِ الْفَتَنِ وَتَحْذِيرُ الدُّعَاةِ إِلَى الْكُفْرِ
১৮১. সহীহ: ইবনে মাজাহ- কিতাবুল জিহাদ باب لا داعة في معصية الله; আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। (তাহক্বীকুকৃত ইবনে মাজাহ হা/২৮৬৫]
১৮২. সহীহ: মুসলিম, মিশকাত (ঢাকা: এমদাদিয়া লাইব্রেরী, জানু-১৯৯৭) ৭ম খণ্ড হা/৩৫০২
১৮৩. ঐ, হা/৩৫০১।
১৮৪. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত ৭ম খণ্ড হা/৩৪৯৭।
১৮৫. সূরা আ'রাফ- ৩ আয়াত।
১৮৬. সূরা আল-ইমরান- ৬৪ আয়াত।
১৮৭. সূরা তাওবা- ৩১ আয়াত। এই আয়াতের অনুবাদে লেখক ইলাহ বা মা'বুদ এবং হাকিমকে একই অর্থে গ্রহণ করেছেন। অথচ আল্লাহ ﷻ হাকিম শব্দটি মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করলেও ইলাহ বা মা'বুদ শব্দটির সহীহ প্রয়োগ হিসাবে এককভাবে নিজেকেই সম্পৃক্ত করেছেন। সুতরাং পারিভাষিকভাবে ইলাহ ও হাকিমের মধ্যে পার্থক্য থাকায় অনুবাদটি হবে নিম্নরূপ: "তারা নিজেদের আলেম ও দরবেশদেরকে আল্লাহকে ছেড়ে রব বানিয়ে রেখেছে এবং 'ঈসা ইবনে মারইয়ামকেও। অথচ তিনি তাদেরকে এ নির্দেশ (امر) দিয়েছিলেন যে, ঐ একক সত্তার 'ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি তাদের শিরকে থেকে পবিত্র।"
১৮৮. সহীহ: তিরমিযী, মিশকাত (এমদা) ৬/৩১১৬ নং। অনেক সাক্ষ্য থাকায় আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত মিশকাত (বৈরুত) ২/৯৭২ পৃঃ, হা/৩২৫৫]
১৮৯. হাসান: আবূ নু'আইম- হিলইয়া, মিশকাত (এমদা) ৬/৩১১৫। অনেক সাক্ষ্য থাকায় আলবানী হাদীসটিকে হাসান বা সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত মিশকাত (বৈরুত) ২/৯৭২ পৃঃ, হা/৩২৫৪]
১৯০. আল্লাহ বলেন: وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهَدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وتصله جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا .
"আর যে ব্যক্তি রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাঁর নিকট হিদায়াত সুস্পষ্ট হওয়ার পর এবং মু'মিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে সে যেদিকে ফিরে যায়, সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দেবো এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। আর তা কত মন্দ আবাস।" [সূরা নিসা- ১১৫ আয়াত] রসূলুল্লাহ বলেছেন:
خَيْرُ أُمَّتِي قَرْنِي ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ إِنَّ بَعْدَهُمْ قَوْمًا يَشْهَدُوْنَ وَلَا يُسْتَشْهَدُوْنَ وَيَحُولُوْنَ وَلَا يُؤْتَمَنُوْنَ وَيَنْذُرُوْنَ وَلَا يَفُوْنَ وَيَظْهَرُ فِيهِمُ السَّمَنُ وفى رواية وَيَحْلِفُوْنَ وَلَا يُسْتَحْلَفُوْنَ -
"আমার উম্মাতের মধ্যে সর্বোত্তম লোক হল আমার যুগের লোক। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগের লোক। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগের লোক। তাঁদের পর এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা সাক্ষ্য দিবে অথচ তাদের থেকে সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। তারা খিয়ানত করবে, তাদের আমানতদারীর উপর বিশ্বাস করা যাবে না। তারা মান্নত করবে, কিন্তু তা পূরণ করবে না। (ভোগ-বিলাসের কারণে) তাদের মধ্যে স্থূলতা প্রকাশ পাবে।" অপর বর্ণনায় আছে- "তারা (অযথা) কুসম খাবে, অথচ তাদের থেকে কুসম চাওয়া হবে না।"[সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ১১/৫৭৫৭ নং। হাফিয ইবনে হাজার 'আল-ইসাবা'তে (১/১২) এবং সুয়ূতী 'আল-মানায়ী'তে হাদীসটিকে মুতওয়াতির বলেছেন। আল-কিনানী এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন।।
১৯১. সূরা ফুরক্বান- ৭৪ আয়াত।
১৯২. সহীহ বুখারী- কিতাবুল ই'তিসাম বিল কিতাব ওয়া সুন্নাহ باب الاقتداء بسنن رسول الله ....
১৯৩. কেননা এটাই মু'মিনদের পথ (সূরা নিসা- ১১৫ আয়াত)
১৯৪. সূরা ফাতিহা- ৫-৭ আয়াত।