📄 ভূমিকা
মহান রব্বুল 'আলামীনের দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া যে, মুসলিম ভাইদের সংস্কারের স্বার্থে এই "তাহক্বীকুকৃত আমাদের হাকিম কেবলই একজন- আল্লাহ তা'আলা" লিখতে পেরেছি। আমরা এমন গুণীজন, সুধীজন, দল বা জামা'আত ইদানীং লক্ষ্য করছি, যারা অনেকেই হজ্বের দা'ওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এ সমস্ত জামা'আতের মধ্যে সূক্ষ্ম ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। কখনো এটা আক্বীদার ক্ষেত্রে আবার কখনো বা 'আমলের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি জামা'আতকে কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক সংস্কারের প্রস্তাব দেয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের নিজ নিজ অবস্থানে দৃঢ় থাকতে দেখা যায়। এরকম অনেক হকু ও সংস্কারের অন্যতম বাহকদের একটি মূল শ্লোগান সমৃদ্ধ পুস্তিকা "আমাদের হাকিম কেবলই একজন- আল্লাহ তা'আলা"-এর সংস্কার জরুরী মনে করছি। মূলত "হাকিম একমাত্র আল্লাহ” এই শ্লোগানটি ছিল মুসলিমদের থেকে পৃথক প্রথম সৃষ্ট ফিরকা খারেজীদের। যাদের সংস্কারের উদ্দেশ্যে এই তাহক্বীকু বা বিশ্লেষণটি লেখা হয়েছে তাদেরও সেই ইতিহাস স্মরণ করানো দরকার মনে করছি।
এই ইতিহাসটি জানানোর ক্ষেত্রে আমরা যে গ্রন্থটিকে মূল সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছি তা হলো, ইমাম ইবনে কাসির-এর "আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭ম খণ্ড (মিশর: মাকতাবাতুস সাফা পৃঃ ২২৬-২৫৫, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন পৃ: ৫০৩-৫৫৬)"। গ্রন্থটি মূলত হাদীসের আলোকেই সঙ্কলিত। এরপরও আমরা সাধ্যমত এর সূত্রগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। যদি কেউ এর অনুল্লিখিত সূত্র সম্পর্কে আমাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন তবে পরবর্তীতে এর প্রয়োজনীয় সংস্কার করার উদ্যোগ নেব এবং তার বা তাদের প্রতি চির কৃতজ্ঞ থাকব। অবশ্য আমরা এখানে কেবল সংক্ষেপে প্রয়োজনীয় অংশগুলোই উল্লেখ করব।
📄 ইতিহাসের আলোকে “হাকিম একমাত্র আল্লাহ”
[সিফফীন যুদ্ধের পর আলী ও মুআবিয়া-এর] সালিসী চুক্তির পর আশআছ ইবনে কাইস তামীম গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছে চুক্তিনামাটি পড়ে শুনান। সেখানে ছিল রাবী'আ ইবনে হানজালাহ বংশের সন্তান উরওয়াহ ইবনে উযায়না (উযায়না মাতার নাম, পিতার নাম জারীর)। সে আবূ বিলাল ইবনে মিরদাস ইবনে জারীর-এর ভাই। সে দাঁড়িয়ে বলল: তোমরা কি আল্লাহ'র দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে হাকিম (বিচারক) নিয়োগ করছো? এ কথা বলেই সে আশআছ ইবনে কাইসের বাহনের পশ্চাৎভাগে তরবারি দিয়ে আঘাত হানলো। এতে আশআছ ও তার কুওমের লোকেরা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়।
ফলে আহনাফ ইবনে কাইস ও তাদের গোত্রের নেতৃস্থানীয় একটি দল এসে আশআছ ইবনে কাইসের কাছে এ ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনা করে। খারিজী সম্প্রদায়ের ধারণা মতে যিনি সর্ব প্রথম তাদের নেতৃত্ব দেন তিনি হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব রাসিবী। গ্রন্থকারের মতে প্রথমটিই সঠিক। আলীর পক্ষের কিছুসংখ্যক লোক যারা কুররা নামে পরিচিত ছিল তারা ঐ ব্যক্তির মতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং ঘোষণা দেয় (আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো হুকুম নেই)। একারণে এ দলকে 'মাহকামিয়্যা' নামে অভিহিত করা হয়। তারপর লোকজন যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে নিজ নিজ এলাকার দিকে রওয়ানা হয়ে যায়। মু'আবিয়া তাঁর সৈন্য-সামন্ত নিয়ে দামেশকে যায়। আর আলী কুফার উদ্দেশ্যে হীত-এর পথ ধরে অগ্রসর হন। তিনি যখন কুফায় পৌঁছেন, তখন শুনতে পান এক ব্যক্তি বলছে, আলী গিয়েছিলো। কিন্তু শূন্য হাতে ফিরে এসেছে। এ কথা শুনে আলী বললেন, যাদের আমরা ছেড়ে এসেছি তারা অবশ্যই ওদের তুলনায় উত্তম।.....
এরপর আলী আল্লাহর স্মরণ করতে করতে কূফায় প্রবেশ করেন। তিনি যখন কুফা নগরীর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেন, তখন তাঁর বাহিনীর প্রায় বার হাজার লোক তাঁর থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরাই ইতিহাসে খারিজী নামে বিখ্যাত। তারা আলীর সাথে একই শহরে বসবাস করতে অস্বীকার করে এবং হারুরা নামক স্থানে গিয়ে অবস্থান করে। তাদের মতে আলী কয়েকটি অন্যায় কাজে জড়িত হয়ে পড়েছেন যার দরুন তারা আর তাঁকে মেনে নিতে পারছে না। আলী তাদের সাথে কথা বলার জন্যে 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'আব্বাসকে প্রেরণ করেন। ইবনে আব্বাস তাদের কাছে গিয়ে তাদের অভিযোগ শোনেন ও জওয়াব দেন। ফলে তাদের অধিকাংশ লোক মত পরিবর্তন করে ফিরে আসে, আর অবশিষ্টরা আপন মতে অনড় থাকে। আলী তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। ৮২ অন্য বর্ণনানুযায়ী, আলী যখন মু'আবিয়াকে চুক্তিপত্র লিখে দেন এবং সালিস নিযুক্ত করেন, তখন তাঁর দল থেকে আট হাজার ক্বারী বেরিয়ে যায় এবং কূফা নগরীর উপকণ্ঠে হারুরা নামক স্থানে গিয়ে সমবেত হয়। তারা আলীর উপরে দোষারোপ ও তাঁকে তিরস্কার করে বলতে থাকে: انْسَلَخَتَ مِنْ قَمِيصِ أَلْبَسَكَهُ اللهُ، وَاسْمُ سَمَّاكَ بِهِ اللهُ ثُمَّ انْطَلَقَتُ فَحَكَمْتَ فِي دِينِ اللَّهِ وَلَا حُكْمَ إِلَّا اللَّهُ "মহান আল্লাহ আপনাকে যে জামা (খিলাফত) পরিধান করিয়েছিলেন, আপনি সে জামা খুলে ফেলেছেন। যে উপাধিতে মহান আল্লাহ আপনাকে ভূষিত করেছিলেন আপনি সে উপাধি প্রত্যাহার করেছেন। এরপর আপনি আরো অগ্রসর হয়ে মহান আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে হাকিম নিযুক্ত করেছেন। অথচ মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কোন হাকিম নেই।"
আলীর কাছে যখন তাদের এসব অভিযোগের কথা পৌছালো এবং তিনি জানতে পারলেন যে, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তারা তাঁর থেকে পৃথক হয়ে গেছে। তিনি এক ঘোষণাকারীর মাধ্যমে নির্দেশ জারি করলেন যে, আমীরুল মু'মিনীনের দরবারে যেন কেবল ঐসব লোক প্রবেশ করে যারা পবিত্র কুরআন বহন করে (হাফিযে কুরআন)।
আমীরুল মু'মিনীনের দরবার যখন ক্বারীদের সমাগমে পরিপূর্ণ হয়ে গেল, তখন তিনি পবিত্র কুরআনের একটি কপি এনে সবার সম্মুখে রাখলেন। এরপর তিনি হাতের আংগুল দ্বারা পবিত্র কুরআনে উপর জোরে টোকা মেরে বললেন, "হে কুরআন! তুমি লোকদের তোমার কথা জানাও।” উপস্থিত লোকজন আলীকে বললো, “হে আমীরুল মু'মিনীন। আপনি পবিত্র কুরআনের কপির কাছে এ কি জিজ্ঞেস করছেন? ও তো কাগজ আর কালি ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা তো ওর মধ্যে যা দেখি তা নিয়ে কথা বলছি। তাহলে এরূপ করায় আপনার উদ্দেশ্য কী?” তিনি জওয়াবে বললেন: তোমাদের ঐসব সাথি যারা আমার থেকে পৃথক হয়ে অবস্থান নিয়েছে, তাদের ও আমার মাঝে মহান আল্লাহর কিতাব রয়েছে। মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে একজন পুরুষ (স্বামী) ও একজন নারীর (স্ত্রীর) ব্যাপারে বলেছেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا
"তাদের (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ের মধ্যে বিরোধের আশংকা হলে, তোমরা তার (স্বামীর) পরিবার হতে একজন ও তার (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন হাকিম নিযুক্ত করবে; তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন।"৮৩
দ্বিতীয় অভিযোগের জবাবে আলী বললেন: তারা আমার উপর আরো অভিযোগ এনেছে যে, আমি মু'আবিয়াকে যে চুক্তিপত্র লিখে দিয়েছি, তাতে (আমীরুল মু'মিনীনের বদলে) আলী ইবনে আবূ তালিব লিখেছি। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হলো: হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল ইবনে আমর আসলে রসূলুল্লাহ যখন নিজ কুওমের সাথে সন্ধিপত্র লেখেন, তখন আমরা সেখানে উপস্থিত ছিলাম। রসূলুল্লাহ প্রথমে লিখলেন 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম'। সুহাইল আপত্তি জানিয়ে বললো: আমি 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম' লিখতে রাজি নই। রসূলুল্লাহ বললেন, তাহলে কিভাবে লিখব? সুহাইল বললেন: লিখব 'বিইসমিকা আল্লাহুম্মা।' রসূলুল্লাহ বললেন, তা-ই লিখ। রসূলুল্লাহ বললেন, এখন লিখ- 'এই সন্ধিপত্র, যা মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সম্পাদন করলেন। সুহাইল বলল: আমি যদি জানতাম যে, আপনি আল্লাহর রসূল, তাহলে তো আপনার সাথে আমার কোন বিরোধই থাকতো না। অবশেষে লেখা হলো: এই সন্ধিপত্র যা আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ কুরাইশদের সাথে সম্পাদন করলেন। মহান আল্লাহ আপন কিতাবে বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ
"তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে ভয় করে তাদের জন্যে রসূলুল্লাহ এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। ৮৪ এরপর আলী তাদের কাছে 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'আব্বাস-কে প্রেরণ করেন।..... 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'আব্বাস তিন দিন পর্যন্ত সেখানে তাদের সাথে আলোচনা ও মতবিনিময় করেন। অবশেষে তাদের মধ্যে থেকে চার হাজার লোক তাওবা করে ফিরে আসে। ইবনুল কাওয়াও তাদের অন্তর্ভুক্ত। ইবনে 'আব্বাস এদের আলী-এর কাছে কুফায় নিয়ে আসেন। অবশিষ্ট লোকদের কাছে আলী বার্তা পাঠিয়ে জানান যে, উম্মাতে মুহাম্মাদীর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হোক। আর তোমাদের ও আমাদের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত থাকলো যে, তোমরা অন্যায়ভাবে কারো রক্তপাত ঘটাবে না। ডাকাতি, রাহাজানি করবে না এবং যিম্মীদের উপর অত্যাচার চালাবে না। যদি এর কোনটিতে লিপ্ত হয়ে পড় তবে তোমাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠিন যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। (কেননা, আল্লাহ বলেন:( إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْخَائئنين "আল্লাহ খিয়ানতকারীদের পছন্দ করেন না। ৮৫
বর্ণনাকারী বলেন: আল্লাহর কসম! ওদের বিরুদ্ধে আলী পক্ষ থেকে তখনই অভিযান পাঠানো হয়েছে, যখন ওরা ডাকাতি, রাহাজানি শুরু করেছে, খুন-খারাবী ছড়িয়ে দিয়েছে এবং যিম্মীদের উপর অত্যাচার করে তাদের সবকিছু নিজেদের জন্যে হালাল করে নিয়েছে। ৮৬ অন্য বর্ণনায় আছে: আলী-কে তাদের সমালোচনার কারণ ছিল এই যে-
১. তিনি মানুষকে হাকিম (ফায়সালাকারী) নিযুক্ত করেছিলেন।
২. শাসকের পদবীকে মুছে দিয়েছিলেন।
৩. উষ্ট্রের যুদ্ধে তিনি অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করেছেন; অথচ শত্রুদের থেকে প্রাপ্ত সম্পদ ও বন্দী সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করেন নি।
প্রথম দু'টি অভিযোগের (হাকিম নির্ধারণ ও পদবী মুছে ফেলার) জওয়াবে তিনি যা বলেন, ইতোপূর্বে তা আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগের জওয়াবে তিনি বলেন: “বন্দীদের মধ্যে উম্মুল মু'মিনীনও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এখন যদি তোমরা দাবি করো যে, তোমাদের কোন উম্মুল মু'মিনীন নেই, তবে তা হবে তোমাদের জন্য কুফরী কাজ। আবার যদি উম্মুল মু'মিনীনকে বন্দী রাখা বৈধ মনে করো, তাও হবে কুফরী কাজ।" বর্ণনাকারী বলেন: এবার তাদের মধ্য থেকে দু' হাজার লোক বেরিয়ে আসে বাকি সবাই বিদ্রোহ করে। এরপর তাদের সাথে যুদ্ধ হয়। ৮৭
ইবনে জারীর লিখেছেন: খারিজীদের অবশিষ্ট লোকদের কাছে আলী স্বয়ং গমন করেন। তিনি তাদের সাথে আলোচনা অব্যাহত চালিয়ে যান। অবশেষে তারা সকলেই তাঁর সাথে কুফায় চলে আসে। সে দিনটি ছিল ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহার দিন। এরপর তারা আলী-এর কথাবার্তায় বাধা সৃষ্টি করতে থাকে। তাঁকে গালমন্দ করে এবং তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করতে থাকে।
ইমাম শাফে'য়ী বলেন: আলী একদিন সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় তাঁকে লক্ষ্য করে জনৈক খারিজী এ আয়াতটি পড়ে: لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ "তুমি আল্লাহ'র শরীক স্থির করলে তোমার কর্ম তো নিষ্ফল হবে এবং অবশ্য তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্ত। "৮৮ জওয়াবে আলী নিচের আয়াতটি পড়লেন:
فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَا يَسْتَخِفَّنَّكَ الَّذِينَ لَا يُوقِنُونَ
"কাজেই, তুমি সবর কর। নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। যারা দৃঢ় বিশ্বাসী নয়, তারা যেন তোমাকে বিচলিত করতে না পারে।"৮৯
ইবনে জারীর বলেন: এ ঘটনা হয়েছিল তখন যখন আলী খুতবা পাঠ করছিলেন। ইবনে জারীর আরো একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তা হলো:
"আলী একদিন খুতবা দিচ্ছিলেন। এ সময় এক খারিজী দাঁড়িয়ে বললো, হে আলী! আপনি মহান আল্লাহর দ্বীনে মানুষকে শরীক করেছেন (অর্থাৎ শির্ক করেছেন)। অথচ আল্লাহ ব্যতীত হুকুম দেয়ার অধিকার আর কারো নেই। এ সময় চারদিক থেকে একই আওয়াজ উঠলো- لَا حُكْمَ إِلَّا اللَّهُ - لَا حُكْمَ إِلَّا اللَّهُ “আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম নেই, আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম নেই।” তখন আলী বললেন: هَذِهِ كَلِمَةٌ حَقٌّ يُرَادُ بِهَا بَطِلُ "কথাটি সত্য, কিন্তু উদ্দেশ্য খারাপ।" তারপর তিনি বললেন: "যতদিন তোমাদের দায়িত্ব আমাদের উপরে ছিল ততদিন আমরা তোমাদের গনীমত দেয়া বন্ধ করি নি এবং আল্লাহর মাসজিদে সালাত আদায় করতে বাধা দেই নি। এখন তোমাদের উপর আমরা আগেই হামলা করবো না। যদি তোমরা প্রথমে হামলা না করো।" এরপর তারা সবাই কৃষ্ণা থেকে বেরিয়ে গিয়ে নাহরাওয়ান নামক স্থানে সমবেত হয়। ৯০
উপরোক্ত ঐতিহাসিক আলোচনাটি আরো সুস্পষ্ট হবে আমাদের পরবর্তী তাহক্বীকুটি বিস্তারিতভাবে পাঠ করলে। এটাও সুস্পষ্ট হবে, খারিজী এবং বর্তমান যামানার বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী যারা একই ধরনের শ্লোগান ব্যবহার করছে এবং যত্রতত্র কুফরী ফাতওয়া প্রদান করে বিভিন্ন দেশ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে- তাদের সংস্কার ও সংশোধন করা অতীব জরুরী।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রকৃত হিদায়াত দান করুন। আমিন!!
টিকাঃ
৮২. আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইফা) ৭/৫০৩-৫০৫ (সংক্ষেপিত)।
৮৩. সূরা নিসাঃ ৩৫ আয়াত।
৮৪. সূরা আহযাব- ২১ আয়াত।
৮৫. সূরা আনফাল- ৫৮ আয়াত।
৮৬. ইবনে কাসীর বলেছেন: আহমাদ এ হাদীস মুফরাদ বর্ণনা করেছেন। তবে এর সনদ সহীহ। জিয়া একে পছন্দ করেছেন। [আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইফা) ৭/৫০৬-৫০৯] তাছাড়া ইমাম হাকিম এ বর্ণনাটিকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তাধীনে সহীহ বলেছেন, তবে উভয়ে তা বর্ণনা করেন নি। [তাহক্বীকুকৃত আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (মিশর) ৭/২২৯ পৃঃ]
৮৭. আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইফা) ৭/৫০৯ পৃঃ।
৮৮. সূরা যুমার- ৬৫ আয়াত।
৮৯. সূরা রূম- ৬০ আয়াত।
৯০. আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইফা) ৭/৫১০ পৃঃ।'
📄 তাহকীকৃতঃ আমাদের হাকিম কেবলই একজন— আল্লাহ তাআলা: কয়েকটি পরিভাষাঃ ‘ইবাদাত, ইতা’আত, মু’আমালাত ও ইতি’আনাত
[এই বইটির তাহক্বীক্ব বা বিশ্লেষণ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে গেলে উক্ত শব্দগুলোর সাথে পরিচয় থাকা জরুরী। অন্যথায় এক্ষেত্রে বিভ্রান্তি আসাটাই স্বাভাবিক। এ কারণে শুরুতে এ পরিভাষাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।]
আল্লাহ বলেন: اِيَّاكَ نَعْبُدُ وَاِيَّاكَ نَسْتَعِينُ অর্থ: আমরা একমাত্র আপনারই 'ইবাদাত করি এবং কেবল আপনারই সাহায্য চাই। [সূরা ফাতিহা- ৪ আয়াত]
বিশ্লেষণ: এটা আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী কর্ম (مفعول) এবং এটার স্থান ক্রিয়া (فعل) ও কর্তার (فاعل) পরে হলেও এখানে মর্যাদা এবং গুরুত্ব প্রকাশ ও حصر (সীমাবদ্ধতা)-এর অর্থ গ্রহণের জন্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণভাবে বলা হয় যে, نَعْبُدُكَ وَنَسْتَعينُكَ "আমরা তোমার 'ইবাদাত করি এবং তোমার সাহায্য চাই।” কিন্তু এখানে আল্লাহ কর্মকে (مفعول) ক্রিয়ার (فعل) পূর্বে ব্যবহার করে বলেছেন: اِيَّاكَ نَعْبُدُ وَاِيَّاكَ نَسْتَعينُ -যা দ্বারা ইখতিসাস (সুনির্দিষ্টকরণ) করা হয়েছে। অর্থাৎ “আমরা একমাত্র আপনারই 'ইবাদাত করি এবং কেবল আপনারই সাহায্য চাই। "৯২
অর্থাৎ 'ইবাদাত আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্যই বৈধ নয়। কুরআন ও সহীহ হাদীসে ইসলাম অনুমোদিত 'ইবাদাত শব্দটির পারিভাষিক প্রয়োগ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
'ইবাদাত এর অর্থ: কারো সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা, অক্ষমতা ও পূর্ণাঙ্গ বিনয় (খুশু) প্রকাশ করা। ইবনে কাসির -এর মতে- "ইবাদাত হলো শরি'য়াতের ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ মুহাব্বাত, বিনয় ও ভয়ের সমষ্টির নাম।” অর্থাৎ যে সত্তার সাথে মুহাব্বাত হয়েছে তাঁর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করা এবং তাঁর কাছে গ্রেফতার হবার ভয় থাকা।
[আভিধানিকভাবে 'ইবাদাত শব্দের ব্যবহার: ১. عَبَدَ ، يَعْبُدُ ، عِبَادَةٌ ، عُبُوْدِيَّةٌ : তাওহীদ (একক মানা), বন্দেগী করা, পূজা করা, খিদমাত করা, ক্ষুদ্রতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করা, ইতা'আত বা আনুগত্য করা।
২. عَبْدُ اللهِ - عِبَادَةً وَعُبُوْدِيَّةً: আল্লাহ আনুগত্য ও বন্দেগী করা, 'ইবাদাত করা, আদাবে বন্দেগী পালন করা, ক্ষুদ্রতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করা, কেবল আল্লাহকেই মালিক ও খালিক (সৃষ্টিকর্তা) এবং ওয়াজিবুল ইতা'আত (তাঁর আনুগত্য অত্যাবশ্যক) মনে করা।
৩. 'ইবাদাত শব্দটি আরবি ভাষায় তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ক. পূজা ও উপাসনা করা, খ. আনুগত্য ও হুকুম মেনে চলা এবং গ. বন্দেগী ও দাসত্ব করা। এখানে (আলোচ্য আয়াতে) একই সাথে এই তিনটি অর্থই প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ আমরা তোমার পূজা-উপাসনা করি, তোমার আনুগত্য করি এবং তোমার বন্দেগী ও দাসত্বও করি।
'ইবাদাত ও ইতা'আত: 'ইবাদাত কেবল আল্লাহরই হয়। কিন্তু ইতা'আত বা আনুগত্য আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সৃষ্টিজীবেরও হয়। যেমন- আল্লাহ নিজের ও তাঁর রসূলের ইতা'আত সম্পর্কে বলেছেন: يَأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُوْلَ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ইতা'আত কর এবং রসূলের ইতা'আত কর।" অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ইতা'আতের সাথে সাথে আমীরের ইতা'আতের কথা উল্লেখ করে বলেছেন:
مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ اَطَاعَ اللَّهُ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهُ وَمَنْ يُطِعِ الْأَمِيرِ فَقَدْ أَطَاعَنِي وَمَنْ يَعْصِ الْأَمِيرِ فَقَدْ عَصَانِي
“যে ব্যক্তি আমার ইতা'আত করল, সে যেন আল্লাহর ইতা'আত করল। আর যে ব্যক্তি আমার নাফমানি করল, বস্তুত সে আল্লাহর নাফরমানী করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের ইতা'আত করল, সে যেন আমারই ইতা'আত করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের নাফরমানী করল, সে যেন আমারই নাফরমানী করল।"৯৮
তবে আল্লাহ ও রসূলের ইতা'আত বা আনুগত্য শর্তহীন। কিন্তু সৃষ্টিজীবের আনুগত্য শর্তযুক্ত। এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ বলেছেন: لَاطَاعَةَ في مَعْصيَةِ إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ "নাফরমানীর ব্যাপারে ইতা'আত নেই। ইতা'আত কেবল ন্যায়সঙ্গত কাজে।"৯৯ অন্যত্র তিনি বলেন: لاَطَعَةَ a a cola " لمَخْلُوقَ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ ইতা'আত নেই। "১০০
উক্ত আলোচনার মাধ্যমে সুস্পষ্ট হলো, 'ইবাদাত কেবল আল্লাহরই করা যায়। 'ইবাদাতের অন্যতম অর্থ ইতা'আত হলেও সব ইতা'আত 'ইবাদাত নয়। কেননা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমীর, পিতা-মাতা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বয়োজ্যেষ্ঠ, উর্ধ্বতন বা দায়িত্বশীল প্রমুখের ইতা'আত করার প্রয়োজন হয়। তারা সেক্ষেত্রেই হুকুম করতে পারেন যেক্ষেত্রে আল্লাহর নাফরমানী হবে না, কিংবা যেসব ক্ষেত্রে আল্লাহ স্বাধীনতা দিয়েছেন। এ স্বাধীনতা সম্পর্কে রসূলুল্লাহ বলেছেন:
دَعُوْنِي مَا تَرَكْتُكُمْ
"আমি যেসব বিষয় বর্ণনা না করে তোমাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছি, সেসব ব্যাপারে আমাকে ছেড়ে দাও। "১০১ তিনি অন্যত্র বলেছেন:
اِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ اِذَا اَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ اَمْرِ دِيْنِكُمْ فَخُذُوْا بِهِ وَاِذَا اَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ رَّائِيْ فَاِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ
“আমি একজন মানুষ। আমি যখন তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে কোন নির্দেশ দেই, তখন তা গ্রহণ করবে। আর আমি যখন (দ্বীন বহির্ভূত বিষয়ে) আমার রায় (ব্যক্তিগত মত) অনুসারে নির্দেশ প্রদান করি, তখন আমিও একজন মানুষ।”১০২
সুতরাং প্রমাণিত হলো, জীবনের সবক্ষেত্রে আমলে সলেহ বা নেককাজ করা আল্লাহর হুকুম। কিন্তু কিছু হুকুম কেবলই আল্লাহর জন্য খাস (সুনির্দিষ্ট) এবং তাতে আর কেউই শরীক নয়- এটাই পারিভাষিক 'ইবাদাত। আর কিছু হুকুম স্বয়ং আল্লাহ মানুষের পারস্পরিক লেনদেন ও জীবন-যাপন পদ্ধতির জন্যে নির্দিষ্ট করেছেন। যা শাব্দিকভাবে 'ইবাদাতের মধ্যে গণ্য হলেও পারিভাষিকভাবে ইতা'আত। কেননা এ হুকুমগুলো আল্লাহ নিজের জন্যে খাস করেন নি, বরং এর মধ্যে মাখলুককেও শরীক করেছেন। যেমন- আমীরের আনুগত্য, পিতা-মাতার আনুগত্য, স্বামীর আনুগত্য, আল্লাহর বান্দাদের (মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর) হক্ক প্রভৃতি। আর যে কাজের মধ্যে অন্যদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে তা নিষ্কলুষ 'ইবাদাত না, বরং তাকে ইতা'আত বলাই বাঞ্ছনীয়। স্বয়ং আল্লাহ -ও নিজের জন্য সুনির্দিষ্ট হকু তথা 'ইবাদাত এবং বান্দার হক্ক তথা সদাচারণকে স্বতন্ত্র শব্দে প্রকাশ করেছেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে:
وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتمي وَالْمَسْكَيْنَ وَالْجَارِذِي الْقُرْنِي وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيْلِ لا وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ -
“আর তোমরা আল্লাহর 'ইবাদাত কর, আর তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। পিতা-মাতার সাথে ইহসান (সদাচরণ) কর এবং নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও।”১০৩
'ইবাদাত ও মু'আমালাত: লক্ষণীয়, উক্ত আয়াতে আল্লাহ নিজের হকের ক্ষেত্রে 'ইবাদাত শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং তাতে কাউকে শরীক করতে নিষেধ করেছেন। পক্ষান্তরে বান্দার হক্কের ক্ষেত্রে ইহসান বা সদাচারণ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এ পর্যায়ে প্রথমটি আল্লাহর 'ইবাদাত এবং দ্বিতীয়টি আল্লাহর ইতা'আত। এ ধরনের ইতা'আতকেই ফিক্বহী পরিভাষায় মু'আমালাত (লেনদেন, আচার-ব্যবহার) বলা হয়। 'ইবাদাতের ক্ষেত্রে (নীতিমালা) হলো, এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সহীহ দলিল-প্রমাণ না পাওয়া গেলে মনগড়া 'আমল করাটাই বিদ'আত।
এ সম্পকে নবী ﷺ বলেছেন: مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ "যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করল, যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই তবে তা বাতিল। "১০৪
তিনি অন্যত্র বলেন: مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدُّ “যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীন সম্পর্কে কোন নতুন কথা সৃষ্টি করেছে যা এতে নেই, তবে তা রদ বা প্রত্যাখ্যাত। "১০৫
অন্যত্র বলেন: وَشَرَّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ "সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে যা দ্বীন সম্পর্কে নতুন সৃষ্টি করা হয়েছে এবং প্রত্যেক বিদ'আতই (নূতন সৃষ্টি) গোমরাহী। "১০৬
পক্ষান্তরে মু'আমালাতের (লেনদেন, আচার-ব্যবহার) ক্ষেত্রে উসূল (নীতি) হলো, হারাম বা নিষিদ্ধতার দলিল-প্রমাণ না পাওয়া গেলেই তা বৈধ। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا "তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরই জন্য জমিনের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। "১০৭
এ আয়াতটি দ্বারা এই দলিল ও উসূল (নীতি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মানুষের জন্য আল্লাহর সৃষ্টি সব কিছুই তার আসল অবস্থাতেই হালাল। কোন জিনিস হারাম করতে হলে দলিল )نص( দ্বারা প্রমাণ করতে হবে।'
এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ বলেছেন: ১০৮ مَا أَحَلَّ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ فَهُوَ حَلَالٌ وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَافِيَةٌ فَاقْبَلُوا مِنَ اللَّهِ الْعَافِيَتَهُ فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُنْ نَسِيًّا ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ : وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسيا "আল্লাহ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তাই হালাল এবং যা হারাম করেছেন তাই হারাম এবং যা থেকে নীরব থেকেছেন তা মাফযোগ্য। সুতরাং যা মাফযোগ্য তা তোমরা আল্লাহ'র পক্ষ থেকে গ্রহণ কর। কেননা, নিশ্চয় আল্লাহ কিছু ভুলেন না।” অতঃপর তিলাওয়াত করলেন: “তোমাদের রব ভুলেন না। [সূরা মারইয়াম- ৬৪]-১০৯
অন্যত্র স্বয়ং আল্লাহ'ই তাঁর 'ইবাদাত ও দুনিয়াবী বস্তুসামগ্রী ও উপায়-উপকরণকে পৃথক করে বর্ণনা করেছেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ – مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِّنْ رِّزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُون -
"আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার 'ইবাদাতের জন্যে সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের কাছে রিযিক চাই না এবং তাদের কাছে খাদ্য- খাবারও চাই না। "১১০
আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা 'ইবাদত থেকে রিযিক ও খাদ্য-খাবারকে পৃথক করে দেখিয়েছেন। অথচ দু'টির ক্ষেত্রেই মানুষকে আল্লাহর হুকুম স্বতন্ত্রভাবে পালন করতে হবে। কিন্তু ইবাদত কেবল স্বয়ং আল্লাহর জন্যই করতে হয়, পক্ষান্তরে রুযী রোযগার, খাদ্য-খাবার প্রভৃতি দুনিয়াবী বিষয় মানুষ আল্লাহর হুকুমে নিজের প্রয়োজন ও শৃঙ্খলা আনার জন্য পালন করে থাকে। সুতরাং প্রমাণিত হলো 'ইবাদাত ও মু'আমালাত স্বতন্ত্র বিষয়। কিন্তু উভয়টির মূল দাবি আল্লাহর হুকুম মেনে চলা, যা এক কথায় 'আল্লাহর হুকুম' কিংবা 'আমলে সলেহ' নামে আখ্যায়িত। মোটকথা শাব্দিকভাবে 'ইবাদাত ও ইতা'আত পরিপূরক হলেও পারিভাষিক ও প্রায়োগিক অর্থে ভিন্নতা আছে।
সুতরাং যেহেতু 'ইবাদাতের ব্যাপারে সরাসরি শক্তিশালী দলিল-প্রমাণ ছাড়া নতুন কিছুর উপর 'আমল করা নিষিদ্ধ এ জন্য বিদ'আত শব্দটি এক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। পক্ষান্তরে মু'আমালাত বা বৈষয়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে শরি'য়াত থেকে নিষেধাজ্ঞা না পাওয়া পর্যন্ত তা সাধারণভাবে বৈধ। এ ক্ষেত্রে যুগোপযোগী ও নিত্যনতুন বিষয়াদির সংযোগ চলতে থাকবে। এ কারণে বৈষয়িক লেনদেনের ব্যাপারে বিদ'আত শব্দটি প্রযোজ্য নয়। বরং "যা নিষিদ্ধ নয় তা-ই বৈধ।"
টিকাঃ
৯১. তাফসীরে মাযহারী (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ১/১৫ পৃঃ।
৯২. সালাহুদ্দীন ইউসুফ, কুরআনে কারীম মা'আ উর্দু তরজমা ও তাফসীর (মাদীনা মুনাওওয়ারা: বাদশাহ ফাহদ কুরআনে কারীম প্রিন্টিং কমপ্লেক্স) পৃঃ ৪।
৯৩. সালাহুদ্দীন ইউসুফ, কুরআনে কারীম মা'আ উর্দু তরজমা ও তাফসীর পৃঃ ৪।
৯৪. মাস'উদ আহমাদ, তাফসীরে কুরআনে 'আযীয [করাচী] পৃ: ৬০।
৯৫. আল-ক্বামূসুল ওয়াহীদি [দেওবন্দ: কুতুবখানাহ হুসাইনিয়া, এপ্রিল-২০০৪] ২/১০৩৮ পৃঃ।
৯৬. তাফহীমুল কুরআন, সূরা ফাতিহার ৬ নং টীকা।
৯৭. সুরা নিসা: ৫৯ আয়াত। অনুরূপ আরো দ্রঃ মায়িদাহঃ ৯২, নূর: ৫৪, মুহাম্মাদ: ৩৩, তাগাবুন- ১২।
৯৮. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ৭/৩৪৯২ নং।
৯৯. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ৭/৩৪৯৬ নং।
১০০. সহীহঃ শরহে সুন্নাহ, মিশকাত [এমদা] ৭/৩৫২৭ নং। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন [তাহক্বীকুকৃত মিশকাত ২/১০৬২ পৃঃ]।
১০১. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন (ঢাকা: ইসলামিক সেন্টার] ১/১৫৬ নং।
১০২. সহীহ: সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ১/১৪০ নং।
১০৩. সূরা নিসা- ৩৬ আয়াত।
১০৪. সহীহ: সহীহ মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন [বি. আই. সি] ৪/১৬৪৭ নং।
১০৫. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ১/১৩৩ নং।
১০৬. সহীহ: মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ১/১৩৪ নং।
১০৭. সূরা বাক্বারাহ- ২৯ আয়াত।
১০৮. শওকানীর ফতহুল কাদীর সূত্রে: সালাহ উদ্দীন ইউসুফ, কুরআনে কারীম মা'আ উর্দু তরজমা ও তাফসীর পৃঃ ১৬। কেননা, আল্লাহ যা কিছু হারাম তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন:
وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ "তোমাদের জন্য যেগুলো হারাম তা তিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।" [সূরা আনয়াম: ১১৯ আয়াত) সুতরাং কোন কিছু হারাম বললে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ জরুরী, অন্যথায় সবই হালাল। এই নীতিটি মু'আমালাতের সাথে সম্পৃক্ত। পক্ষান্তরে ইবাদাতের ব্যাপারে যার সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই তা পালন করাই বিদ'আত।
১০৯. সহীহ: হাকিম- কিতাবুত তাফসীর بَابُ سُوْرَةِ مَرْيَمَ। হাকিম এর সনদকে সহীহ বলেছেন। উক্ত মর্মে বাযযার সলেহ সনদে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। (ফতহুল বারী (মাকতাবা মিশর, ১৪২১/২০০১) ১৩/৩৭৮ পৃঃ; নায়লুল আওতার (মিশর: দারুল হাদীস ১৪২১/২০০০)৮/৪২৮ পৃঃ।
১১০. সূরা যারিয়াত- ৫৬-৫৭ আয়াত।
📄 ‘ইবাদত ও সাহায্য চাওয়া আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট
'ইবাদাত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا "আল্লাহর 'ইবাদাত কর এবং তাঁর সাথে কোন কিছুরই শরীক করো না।"১১১ তিনি অন্যত্র বলেন:
إلَهُكُمْ الهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُوْا لِقَاءِ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا "তোমাদের ইলাহ, কেবলই এক ইলাহ। সুতরাং যে নিজের রবের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন নেক 'আমল করে এবং নিজের রবের 'ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে।"১১২ ইস্তি'আনাত বা সাহায্য চাওয়া সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- وَاسْتَعِينُوا بالصَّبْرِ وَالصَّلاة "তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাও।"১১৩ অন্যত্র বলেন:
قَالَ مُوسِي لِقَوْمِهِ اسْتَعِينُوا بِاللَّهِ وَاصْبِرُوا "মূসা তাঁর কুওমকে বলল, আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং সবর কর।"১১৪ সুতরাং 'ইবাদাত ও ইস্তি'আনাত (সাহায্য চাওয়া) উভয়টিই আল্লাহ ছাড়া অপর কারো জন্য 'আমল করা জায়েয নয়। প্রথমোক্ত আয়াতটি দ্বারা শিরকের দুয়ার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু যাদের অন্তরে শিরকের রোগ আছে তারা সাধারণ লোকদের মানুষের আয়ত্বাধীন (مَا تَحْتَ الْأَسْبَابِ) বস্তুর সাথে, মানুষের আয়ত্বাধীন নয় (مَا فَوْقَ الْأَسْبَابِ) এমন বস্তুর মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে সে ব্যাপারে বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত করেছে। তারা বলে যে, "দেখ আমাদের রোগ হলে আমরা ডাক্তারের সাহায্য নিয়ে থাকি, স্ত্রীর নিকট সহযোগিতা চাই, ড্রাইভার ও অন্যান্য লোকদের সাহায্য কামনা করি।" এভাবে তারা এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যদের নিকট সাহায্য চাওয়াও বৈধ। কিন্তু মানুষের আয়ত্বাধীন বস্তুর মাধ্যমে একে অপরের কাছে সাহায্য চাওয়া বৈধ এবং এটা শিরক নয়।
এটাতো আল্লাহর সৃষ্ট ব্যবস্থাপনা মাত্র। যা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ্য বস্তুসমূহ দ্বারা সম্পন্ন করা হয়। এমনকি নবী -গণও এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছে সাহায্য সহযোগিতা চেয়েছেন। ১১৫
ঈসা ডি বলেছিলেন: مَنْ أَنْصَارِي إِلَى الله "আল্লাহ দ্বীনের জন্য কে আমাকে সাহায্য করবে?”১১৬′
আল্লাহ ঈমানদারগণকে সম্বোধন করে বলেছেন: وَتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوى "নেকি ও তাক্বওয়া অর্জনে একে অপরকে সাহায্য কর। "১১৭
সুস্পষ্ট হলো, একে অপরের সাহায্য করা )تَعَاوُن( নিষিদ্ধ বা শিরক নয়। বরং প্রয়োজনীয় ও প্রশংসার কাজ। এর সাথে পারিভাষিক শিরকের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। শিরক হল এমন কোন ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া যে প্রকাশ্য বস্তুজগতের নিয়মানুযায়ী সাহায্য করতে অক্ষম। যেমন- মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য তাকে ডাকা, তাকে 'মুশকিল কুশা' (সমস্যা দূরকারী) এবং 'হাজত রুওয়া' (উদ্দেশ্য পূরণকারী) মনে করা। তাকে উপকার ও ক্ষতি করার ক্ষমতাসম্পন্ন জ্ঞান করা এবং দূরের ও কাছের সকল ফরিয়াদ শুনে তা সমাধান করার অধিকারী মনে করা। এরই নাম হলো আয়ত্বাধীন নয় )مَا فَوْقَ الْأَسْبَابِ( এমন বিষয়ে সাহায্য চাওয়া এবং তাকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করা। আর এটাই শিরক- যা দুর্ভাগ্যবশত 'মুহাব্বাতে আওলিয়া' নামে মুসলিম দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে চালু আছে। ]أَعَاذَنَا اللَّهُ مِنْهُ[ ১১৮ সুতরাং ইস্তিআনাত বা সাহায্য চাওয়ার দু'টি দিক রয়েছে-
১. যে সমস্ত বিষয়ের একক অধিকারী স্বয়ং আল্লাহ এবং যেগুলো কোন বস্তুগত কর্তৃত্ব মানুষকে দেন নি সেক্ষেত্রে কোন মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া, প্রার্থনা বা আবেদন-নিবেদন বা সুপারিশ করা- এ সবই শিরক। কেননা এগুলোর ক্ষেত্রে 'ইবাদাতের ন্যায় আল্লাহ কাউকে নিজের সাথে শরীক করেন নি।
২. পক্ষান্তরে যে সব ব্যাপারে মানুষকে শক্তি, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দান করেছেন, সেসব ক্ষেত্রে মানুষের পরস্পরের মধ্যে সাহায্য চাওয়াটা বৈধ। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, তা অবশ্যই আল্লাহ কর্তৃক নিষেধকৃত বিষয়ে হবে না। অর্থাৎ যেসব ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা নেই সেসব ক্ষেত্রে এটা বৈধ। প্রথমোক্তটি ইবাদাতের এবং পরবর্তীটি মু'আমালাতের অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
১১১. সূরা নিসা- ৩৬ আয়াত।
১১২. সূরা কাহাফ- ১১০ আয়াত।
১১৩. সূরা বাক্বারাহ- ৪৫ আয়াত। অনুরূপ দ্র: সূরা বাক্বারাহ- ১৫৩ আয়াত।
১১৪. সূরা আ'রাফ- ১২৮ আয়াত।
১১৫. সালাহুদ্দীন ইউসুফ, কুরআনে কারীম মা'আ উর্দু তরজমা ও তাফসীর পৃঃ ৪।
১১৬. সূরা সফ- ১৪ আয়াত।
১১৭. সূরা মায়িদাহ- ২ আয়াত।
১১৮. সালাহুদ্দীন ইউসুফ, কুরআনে কারীম মা'আ উর্দু তরজমা ও তাফসীর পৃ: ৪।