📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 ঈমান, কুফর, ইরজা’ ও মুরজিয়া

📄 ঈমান, কুফর, ইরজা’ ও মুরজিয়া


শায়েখ ইবনে বাযের এই প্রশ্নোত্তরটি নেওয়া হয়েছে, حِوَارُ حَوْلَ مَسَائِلِ التَّكْفِيرِ (প্রকাশক: মাকতাবাহ আল-ইমাম যাহাবী, কুয়েত, ১৪২০ হি:/২০০০ 'ঈসায়ী) থেকে। -অনুবাদক]

প্রশ্ন-১৫ অনেকে বলেন: সালাফদের থেকে এই উক্তি রয়েছে যে, তারা বলেছেন: "আমরা এই মিল্লাতের (ইসলামের) কাউকেই তার পাপের জন্য কাফির ঘোষণা করতে পারব না, যদি না সে তা (পাপটি) হালাল মনে করে" -তারা বলেন, এটা হল মুরজিয়াদের উক্তি।

শায়েখ ইবনে বায : এটা ভুল কথা। মূলত এটাই আহলে সুন্নাতেরই উক্তি (নীতি): "কাউকে পাপের জন্য কাফির বলা যাবে না, যতক্ষণ সে তা হালাল গণ্য করে।" একজন যিনাকারী কাফির নয়, একজন মদপানকারী কাফির নয় বরং সে অবাধ্য, যদি না সে তার কাজটি হালাল গণ্য করে। খারেজীদের মোকাবেলায় এটাই আহলে সুন্নাতের উক্তি। খারেজীরা পাপের কারণে কাফির গণ্য করে থাকে। পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাত বলে থাকে: সে অবাধ্যদের একজন। তার ওপর হদ (শাস্তি) প্রয়োগ করা ওয়াজিব, তেমনি তার জন্য তাওবা করাও ওয়াজিব, কিন্তু সে কাফির নয়- যদি না পাপকে সে হালাল গণ্য করে। যদি সে যিনা করে, কিন্তু তাকে হালাল গণ্য না করে। তেমনি মদপান করে, কিন্তু তাকে হালাল গণ্য না করে। তেমনি অন্যান্য বিষয়েও। যেমন: সুদ খায় কিন্তু তা হালাল গণ্য করে না, তাহলে সে কাফির নয়। বরং সে পাপী- যা ঈমানের ত্রুটি, ঈমানের দুর্বলতা। এটা খারেজী ও মু'তাযিলাদের বিপরীতে আহলে সুন্নাতের বক্তব্য। আর যদি হালাল গণ্য করে বলে: যিনা হালাল, তবে সে কাফির। কিংবা বলে: মদ হালাল, তবে সে কাফির- এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের সবাই একমত। কিংবা যদি কেউ বলে: সুদ হালাল, সে কাফির। কিংবা বলে: পিতামাতার অবাধ্যতা করা হালাল, তবে সে কাফির। কিন্তু যদি তার আমলটি উক্ত আক্বীদা রাখা ব্যতিরেকে হয় এবং সে জ্ঞাত যে এটা হারাম। যেমন: পিতামাতার অবাধ্যতা করে, অথচ জানে তা হারাম। সে যিনা করে, কিন্তু জানে সেটা হারাম। মদপান করে, অথচ জানে সেটা হারাম। তবে এটা গোনাহ, ঈমানের ত্রুটি, ঈমানের দুর্বলতা। আহলে সুন্নাতের নিকট সে কাফির নয়। তার উপর যিনার হদ, মদপান করার হদ প্রযোজ্য। তেমনি পিতামাতার অবাধ্যতার জন্য ও সুদ গ্রহণের জন্য তার ব্যাপারে 'সংশোধনমূলক (শাস্তির) ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে। নিঃসন্দেহে এটা উত্তম।

প্রশ্ন-২। যে সমস্ত আলেমরা বলেন, "তারা কাফির নয়- যারা সমস্ত আমলসমূহের শাখা-প্রশাখাগুলো ত্যাগ করে, সাথে সাথে দু'টি শাহাদাতের (কালেমায়ে শাহাদাতের) উচ্চারণ ঠিক রাখে এবং তাদের অন্তরে নীতিগতভাবে ঈমানের অস্তিত্ব রয়েছে"-তারা কি মুরজিয়া নন?

শায়েখ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ : এই উক্তিটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত থেকেই এসেছে, যারা বলেছেন: কুফর সংঘটিত হয় না সিয়াম, যাকাত ও হজ্জ তরক করার জন্যে। এ জন্যে সে কাফির নয়। কিন্তু সে ভয়ানক কবীরা গুনাহে লিপ্ত। কিছু আলেমের কাছে এরাও কাফির। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা কুফরে আকবার নয়। কিন্তু কেউ যদি সালাত তরক করে, সেক্ষেত্রে প্রাধান্যপ্রাপ্ত (اَلرَّاجِحُ) সিদ্ধান্ত হল, সেটা কুফরে আকবার- যখন সে স্বেচ্ছায় তা ত্যাগ করে। আর যদি সে সিয়াম, যাকাত ও হজ্জ তরক করে, তবে সেটা كُفْرُ دُونَ كُفْرٍ (কুফরের থেকে কম কুফর), সেটা পাপ এবং কবীরা গুনাহগুলোর সর্বোচ্চ গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। এর দলিল হল, নবী যাকাত আদায় না করা সম্পর্কে বলেছেন: يُؤْتَى بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُعَذِّبُ بِمَالِهِ "সে তার সম্পদসহ আসবে, তাকে তার মাল দ্বারাই আযাব দেয়া হবে।”৭৩ তেমনিভাবে কুরআনে দলিল আছে, আল্লাহ বলেন: يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَرْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنتُمْ تَكْثِرُونَ "সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা (যাকাতের সম্পদ) উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে (সেদিন বলা হবে), এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর (তার) যা তোমরা জমা রেখেছিলে।"৭৪ নবী জানিয়েছেন, তাদের 'আযাব দেয়া হবে তাদের মাল দ্বারা, উট দ্বারা, গরু দ্বারা, ভেড়া দ্বারা, সোনা ও রুপা দ্বারা। অতঃপর তাকে জান্নাত বা জাহান্নামের পথ দেখান হবে।" এটাই (হাদীসটি) প্রমাণ যে, সে কাফির নয়। (এরপর) হতে পারে সে দেখবে জান্নাত কিংবা জাহান্নাম। এটা প্রমাণ করে, তাকে ভয়াবহভাবে ভীতসন্ত্রস্ত করা হবে। তাকে হয়তো জাহান্নামে দাখিল করা হবে। কিংবা হয়তো কেবল বরযখে 'আযাব দেয়া হবে এবং জাহান্নামে দাখিল করা হবে না। কিংবা হতে পারে তাকে বারযাখে 'আযাব দেয়ার পর জান্নাতে দাখিল করা হবে।

প্রশ্ন-৩০ (হে) আমাদের শায়েখ! প্রথম প্রশ্নের জবাব প্রসঙ্গে বলছি, কিছু লোক আপনার বক্তব্যের মর্মটি থেকে বুঝেছে' যে, "যখন কেউ দু'টি শাহাদাতের (কালেমা শাহাদাতের) উচ্চারণ করে, কিন্তু আমল করে না, সেক্ষেত্রে তার ঈমানটি ত্রুটিযুক্ত" -এই বুঝটি কি সহীহ?

শায়েখ ইবনে বায হ্যাঁ, যে আল্লাহকে একক গণ্য করে এবং ইখলাসের সাথে তাঁর 'ইবাদত করে, আর রসূলুল্লাহ-কে সত্যায়ন করে; যদিওবা সে যাকাত আদায় না করে, বা সিয়াম পালন না করে, কিংবা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হজ্জ করে না- তাহলে সে গোনাহগার হবে, ফলে সে ভয়ানক কবীরা গুনাহে লিপ্ত হয়। তার জন্য জাহান্নামের ওয়াদা (ভয়ঙ্কর শাস্তি) রয়েছে। এতদ্বসত্ত্বেও সহীহ কথা হল, সে কাফির নয়। তবে যদি স্বেচ্ছায় সালাত তরক করে, সেক্ষেত্রে তাকে কাফির গণ্য করাটাই সহীহ সিদ্ধান্ত।

প্রশ্ন-৪। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন! এটা কি সম্ভব- কুফরে আমলী যা বিভিন্ন দেশে (الأحوال الطبيعية বৈশিষ্ট্যগতভাবে) প্রকাশ পেয়েছে, তাকি মিল্লাত থেকে খারিজ করে দেয়?

শায়েখ ইবনে বায : যে সমস্ত কুফর 'আমালী মিল্লাত (দ্বীন) থেকে খারিজ করে দেয় তার মেসাল (উদাহরণ) হল, গায়রুল্লাহকে সিজদা করা, গায়রুল্লাহর জন্যে যবেহ করা প্রভৃতি কুফরে আমালী মিল্লাত থেকে খারিজ করে দেয়। সুতরাং মূর্তির জন্য যবেহ করা, কিংবা তারকার জন্য বা জিনের জন্য প্রভৃতি কুফরে- 'আমালী-আকবার (আমলগত বড় কুফর)। এগুলোর মাধ্যমে যেন তাদের জন্য সালাত আদায় (ইবাদত) করা হয়, তাদেরকে সিজদা করা হয়। সে তখন কাফির হয়, বড় কুফরে 'আমালীর মাধ্যমে- এবং এর মাধ্যমে সে আল্লাহর থেকে বিতাড়িত। অনুরূপভাবে, যদি কেউ দ্বীন (ইসলাম)-কে গালাগালি দেয়, রসূলের নিন্দা করে, আল্লাহ বা রসূলের ব্যাপারে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে- তবে সেটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের সবার নিকট বড় কুফরে 'আমালী।

প্রশ্ন-৫। মাননীয় শায়েখ! ঐ সমস্ত কুফরে 'আমালীর অর্থ কী, যা বিভিন্ন রাষ্ট্র (الْأَحْوَالُ الطَّبيعية - বৈশিষ্ট্যগতভাবে) রয়েছে, এর আন্তরিক অবস্থা কি (ঈমানের) ত্রুটি নয়?

শায়েখ ইবনে বায : যেমন- গায়রুল্লাহকে সিজদা করা, গায়রুল্লাহর জন্য যবেহ করা কুফরে 'আমালী। আরো যেমন- দ্বীন (ইসলামকে) তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কিংবা দ্বীন নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করাটা কুফরে 'আমালী। আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি- এগুলো কুফরে আকবার।

প্রশ্ন-৬০ (গায়রুল্লাহর জন্য) সিজদা বা যবেহ করা যদি অজ্ঞতার জন্য হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে অজ্ঞতা ও স্বেচ্ছায় আমলটি সংঘটিত হওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি?

শায়েখ ইবনে বায : এর মধ্যে অজ্ঞতার কোন বিষয় নেই ...। এটা এমন একটা বিষয় যে ব্যাপারে মুসলিমদের মধ্যে কোন অজ্ঞতা নেই...। সে গায়রুল্লাহর জন্যে যবেহ করলে সেক্ষেত্রে কাফির হবে এবং তার উপর তাওবা করা জরুরী। যদি সে সত্যিকারভাবে তাওবা করে, তবে তার তাওবা আল্লাহ কবুল করবেন। মুশরিকরা তাওবা করেছিল, তারা মক্কা বিজয়ের দিন আল্লাহর কাছে তাওবা করেছিল। তাদের কুফর ও গোমরাহীর বিষয় প্রসিদ্ধ ছিল। যখন মক্কা বিজয়ের দিনে তারা দ্বীনের মধ্যে দাখিল হল, আল্লাহ তাদের থেকে তাওবা কবুল করেন।

প্রশ্ন-৭৷ তবে হে শায়েখ, কেবল আমলের ক্ষেত্রে! যেমন মা'য়ায কর্তৃক নবী-কে সিজদা করা কি কেবল 'আমল হিসাবে গণ্য?

শায়েখ ইবনে বায : এটা ছিল একটি মুতা'ওয়িল (ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাখ্যাকৃত সিদ্ধান্ত), যা তার অজ্ঞতা হিসাবে গণ্য। তাকে নবী ব্যাখ্যা করেছিলেন। অতঃপর শরী'য়াত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এটাই বিধান হয়েছে যে, সিজদা কেবল আল্লাহ-র জন্য। (ঘোষিত হয়েছে:) ( فَاسْجُدُوا لِلَّهِ وَاعْبُدُوا “সুতরাং কেবল আল্লাহর সিজদা কর ও তাঁরই ইবাদত কর।"৭৭ এভাবে শরী'য়াতী নির্দেশনা সমাপ্ত হয়েছে। মু'আয ছিলেন এ ব্যাপারে অজ্ঞ, এ কারণে রসূলুল্লাহ তাকে 'ইলম (শিক্ষা) দিয়েছিলেন। এখন শরী'য়াত প্রতিষ্ঠিত। আর এটা জ্ঞাত যে, সিজদা করতে হবে কেবল আল্লাহ'র। (কেননা আল্লাহর নির্দেশ:( فَاسْجُدُوا اللَّهِ وَاعْبُدُوا “সুতরাং কেবল আল্লাহর সিজদা কর ও তাঁরই ইবাদত কর।"৭৮ তেমনি যবেহ কেবলই আল্লাহর জন্যে। (ঘোষিত হয়েছে:( قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَائِنِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ “নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ- সমস্ত কিছু আল্লাহ রব্বুল 'আলামীনের জন্য, আর তাঁর কোন শরীক নেই।"৭৯ সুতরাং মুসলিমদের মধ্যে যে গায়রুল্লাহকে সিজদা করে সে কাফির, তার ওপর তাওবা করা জরুরী।

প্রশ্ন-৮। তাহলে (ইসলামী) আইনের পরিবর্তন কি কুফর, যা মিল্লাত (ইসলাম) থেকে খারিজ করে দেয়?

শায়েখ ইবনে বাযঃ যখন সে এটাকে বৈধ মনে করে। যদি সে ভিন্ন বিধান দ্বারা হুকুম জারি করাকে জায়েয মনে করে, তবে সে কাফির হবে। এটা কুফরে আকবার যখন সে তা বৈধ মনে করে। আর যখন সে সুনির্দিষ্ট কারণে তা করে, তাহলে সেটা আল্লাহর বিরুদ্ধাচারণ হবে। যেমন ঘুষের কারণে, বা ব্যক্তি বিশেষকে খুশি করার কারণে- কিন্তু সে জানে যে এটা হারাম। তখন এটা হবে كُفْرٌ دُونَ كُفْرِ (ছোট কুফর)। আর যদি সে এটা হালাল গণ্য করে, তবে সেটা হবে কুফরে আকবার (বড় কুফর)। যেভাবে ইবনে আব্বাস আল্লাহ'র বাণী: "যারা আল্লাহর নাফিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম জারি করে না তারা কাফির, .... যালিম, .... ফাসিকু"-(সূরা মায়িদা- ৪৪-৪৭ আয়াত) সম্পর্কে বলেছেন: এটি আল্লাহর প্রতি কুফর করার মত নয়, বরং كُفْرُ دُونَ كُفْرٍ (ছোট কুফর)। অর্থাৎ যখন সে ঘোষণা করে তার জারিকৃত বিধানটি হালাল, কিংবা অনুরূপ অন্যান্য বিধানও (হালাল), কিংবা শরী'আত বিরোধি বিধান (হালাল হিসাবে) জারি করে- তবে সে কাফির। আর যখন সে ঘুষের জন্য করে, বা তার ও বিচারপ্রার্থীর মধ্যকার শত্রুতার জন্য করে, কোন গোষ্ঠীর সন্তুষ্টির জন্য করে, বা এধরনের আরো কোন কারণে- তবে সেক্ষেত্রে কুফরটি হবে كُفْرٌ دُوْنَ كُفْرٍ (ছোট কুফর)।

প্রশ্ন-৯। হুকুমের তাবদীল (পরিবর্তন) ও কোন একটি বিচারের (বিকৃত) হুকুম জারির মধ্যে কি পার্থক্য আছে? অর্থাৎ কোন একটি (মূল) হুকুমের পরিবর্তন৮০ কি কোন একটি বিচারের হুকুম পরিবর্তনের মত- হে শায়েখ?

শায়েখ ইবনে বায যখন তার আন্তরিক ইচ্ছা এটা নয় যে, সে এটাকে বিচারের দ্বারা হালাল করছে, বরং হুকুমটি জারির পিছনে অন্য কোন (পূর্বোক্ত) কারণ আছে, তাহলে তখন এটি হবে كُفْرٌ دُوْنَ كُفْرٍ (ছোট কুফর)। তবে যখন সে বলে: বিচারের ক্ষেত্রে আল্লাহর নাযিলকৃত হুকুম বিরোধি বিধান জারি করলে কোন ক্ষতি নেই। কিংবা যদি সে বলে: শরী'য়াতই উত্তম; কিন্তু সে যখন এটাও বলে: এতে কোন ক্ষতি নেই, মুবাহ (বৈধ) -তাহলে তা এমন কুফর যা কুফরে আকবার (বড় কুফর এর অন্তর্ভুক্ত)। অথচ সে বলে: শরী'য়াতই উত্তম, কিংবা শরী'য়াতেরই মত, কিংবা শরী'য়াতের চেয়ে এটিই উত্তম- এর সবগুলো পর্যায়ই (বড়) কুফর।

প্রশ্ন-১০। অর্থাৎ (পূর্বে ব্যাখ্যাকৃত) এই হুকুম সামগ্রিকভাবে (শরী'য়াতের) পরিবর্তন (তাবদীল) ও অপরিবর্তন ('আদম তাবদীল) সম্পর্কীত, তথা এটা কি সমগ্র বিষয়টিকে ঘিরেই বর্ণিত হয়েছে?

শায়েখ ইবনে বায রহঃ : এটা সামগ্রিক শর্ত, যা সমভাবে সমস্ত শর্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে অবশ্যই তাকে নিষেধ করা ওয়াজিব, এ ব্যাপারে তাকে বাধা দেয়াও ওয়াজিব- আর এটা ( كُفْرُ دُونَ كُفر ) ছোট কুফর)। আর যদি সে বলে: "আমার এটা করার ইচ্ছা ছিল না", কিংবা বলে: "আমি এটিকে হালাল করি নি। আমার ও অমুকের মাঝে শত্রুতা ছিল, কিংবা এতে ঘুষ ছিল।" তবে অবশ্যই তার জন্য এর প্রতিকার করা ওয়াজিব। সর্বোপরি কারো জন্যই আল্লাহর নাযিলকৃত হুকুমের বিরোধি বিধান জারি করা কোন ভাবেই জায়েয নয়। আর যদি সে এমন কারো বিচার করে যার সাথে তার শত্রুতা আছে, কিংবা অন্য কোন কারণ রয়েছে- সেক্ষেত্রে অবশ্যই বিচারকার্যটি স্থগিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে উলুল আমরদের (দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের) প্রতি দায়িত্ব হল, এটা নির্মূল করা এবং শরী'আত অনুযায়ী হুকুম জারি করা।

প্রশ্ন-১১। আপনি তার ব্যাপারে কি বলবেন, যারা আহলে সুন্নাতে অবস্থান করেন, কিন্তু পাপের কারণে কাউকে কাফির বলেন না, তারা কি মুরজিয়া নন?

শায়েখ ইবনে বায : এখানে অজ্ঞতার মিশ্রণ রয়েছে, তার জন্য ইলম অর্জন করা ওয়াজিব। সে অজ্ঞতার অন্ধকারে রয়েছে, এজন্যে তার জন্য ইলম অর্জন করা ওয়াজিব। মুরজিয়া হল তারা, যারা আমল যা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়- (যেমন) সালাত আদায় না করা, যাকাত আদায় না করা, সিয়াম পালন না করা প্রভৃতি সংঘটিত না হওয়ার পরও ঈমান (পূর্ণাঙ্গ) রয়েছে বলে দাবি করে, এরাই মুরজিয়া। পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের বক্তব্য হলো: যদি কেউ যাকাত আদায় না করে তবে তা পাপ, ঈমানের ত্রুটি। যদি সিয়াম পালন না করে, তবে সেটাও ঈমানের ত্রুটি। যদি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ পালন না করে, তবে সেটাও ঈমানের ত্রুটি। তেমনি যিনাকারীর ঈমান ত্রুটিযুক্ত, চোরের ঈমান ত্রুটিযুক্ত- কিন্তু এজন্য তাকে কাফির বলে না, যেভাবে খারেজীরা বলে থাকে। এ জন্যে তারা স্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না- যেভাবে মু'তাযিলারা (স্থায়ী জাহান্নামের হওয়ার কথা) বলে থাকে। কিন্তু সে অত্যন্ত ভয়াবহ আযাব ও বিপদের সম্মুখীন। তাদের অনেকে পাপের জন্যে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর শাফায়াতের মাধ্যমে তাদের মুক্তি হবে। শেষাবধি কাফির যারা শিরক করেছে- তারা ছাড়া কেউই স্থায়ী ভাবে জাহান্নামে থাকবে না এবং তারাও যারা আল্লাহর নাযিলকৃত হারাম বিধানকে হালাল গণ্য করেছে। আর তারাও যারা আল্লাহর ওয়াজিবকৃত বিষয়গুলোর প্রতি ঘৃণা রাখে- তারাই স্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে। যিনাকারীও চিরস্থায়ী জাহান্নামী নয়, যদিও সে যিনারত অবস্থায় মারা যায়। সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী নয়, যদিওবা সেখানে সে প্রবেশ করে। অনুরূপ মদপানকারীও চিরস্থায়ী জাহান্নামী নয়। পিতামাতার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্নকারী যদিওবা জাহান্নামী, কিন্তু সেখানে সে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে না। সুদখোরের যদিওবা স্থায়ী জাহান্নামের ওয়াদা আছে, যেভাবে আল্লাহ চান। অতঃপর তাদেরকে পবিত্র করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে- যেভাবে শাফা'য়াত সংক্রান্ত হাদীসে রসূলুল্লাহ বলেছেন। তাদের আখিরাতে (পাপীদের) মুক্তি পাওয়া সংক্রান্ত হাদীসটি সম্পর্কে সংশয় রয়েছে। যা প্রসিদ্ধ সুন্নাত দ্বারা জানা যায়। সেটা হল, নবী *ব্যাপক সংখ্যক পাপীকে শাফা'য়াত দ্বারা মুক্তি দেবেন। তাদের শাফা'য়াতের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। অতঃপর মু'মিনগণ ও মালাইকাগণ শাফা'য়াত করবে। শেষে অবশিষ্ট পাপীকে জাহান্নাম থেকে আল্লাহ মুক্তি দিবেন কারো শাফা'য়াত ছাড়া- যাদের আগুনে দগ্ধ করা হয়েছে। তারপর তাদের 'হায়াতের নদীতে' ফেলা হবে। তখন তারা গাছের চারা গজানোর মত গজিয়ে উঠবে। অতঃপর আল্লাহ তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিবেন। শেষাবধি কাফির ছাড়া কেউই চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না। পাপীরা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে না। এটা আহলে সুন্নাতের বক্তব্য, মুরজিয়াদের নয়।

সমস্যা হল অজ্ঞতা। অজ্ঞদের থেকে শত্রুরা তা পৌঁছায় না, বরং অজ্ঞরা নিজের থেকেই তা পৌঁছায়।

প্রশ্ন-১২। হে শায়েখ! যারা বলে এটি মুরজিয়াদের মত, আমরা তাদের কি বলতে পারি?

শায়েখ ইবনে বায আমরা অজ্ঞদের বলব, এরূপ উক্তি আহলে সুন্নাত থেকে শুনি নি। আমরা ইমাম ইবনে তাইমিয়া , ইমাম আশ'আরী -এর 'আল-মাক্বালাত' প্রভৃতি আহলে সুন্নাতের ইমামদের সূত্র উল্লেখ করব। তাছাড়া শায়েখ আব্দুর রহমান বিন হাসানের "ফতহুল মাজীদ”, ইবনে আবীল 'ঈযের 'শরহে তাহাবিয়‍্যাহ', ইবনে খুযায়মাহ ও অন্যান্যদের 'কিতাবুত তাওহীদ' প্রভৃতির সূত্র উল্লেখ করব। ফলে তারা আহলে সুন্নাতের বক্তব্য সম্পর্কে জ্ঞাত হবে। সুতরাং যারা অজ্ঞতায় আচ্ছন্ন আমরা সে সমস্ত মানুষের প্রতি তাদের অজ্ঞতার জন্য হুকুম জারি করব না। আল্লাহর কাছে আমরা দু'আ করব, তিনি যেন তাদের হিদায়াত দেন।

প্রশ্ন-১৩৷৷ আমলের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা কি পূর্ণাঙ্গ ঈমানের শর্ত, নাকি সহীহ ঈমানের শর্ত?

শায়েখ ইবনে বায رحمه الله : আমলে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা (ঈমানের) পূর্ণতার জন্য। আর এ থেকে বিরত থাকা ঈমানের হ্রাস ঘটায়। সুতরাং সিয়াম ঈমানকে পূর্ণ করে, সাদাক্বা ও যাকাত ঈমানকে পূর্ণ করে। আর এগুলো থেকে বিরত থাকা ঈমানের ক্ষতি করে, ঈমানকে দুর্বল করে এবং এটা পাপ। পক্ষান্তরে সালাত তরককারী সহীহ মতে কাফির। এ ব্যাপারে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি- যা কুফরে আকবার। এভাবে যখন মানুষ আমালে সালেহ করতে থাকে, তখন তা থেকে ঈমান পূর্ণ হয়। যেমন- বেশি করে নফল সালাত, সিয়াম ও সাদাক্বাত আদায় করা। এগুলোর দ্বারা ঈমান পূর্ণ হয় এবং এগুলো ঈমানকে শক্তিশালী করে।

প্রশ্ন-১৪। সর্বশেষ নসীহত হিসাবে কি আপনার কিছু বলার আছে?

শায়েখ ইবনে বায : সবার প্রতি আমার নসিহত, দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করুন এবং কুরআনের মর্ম অনুধাবন করুন। বেশি বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করুন এবং অর্থ হৃদয়ঙ্গম করুন। পরস্পরকে উপদেশ দিতে থাকুন- কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উৎসারিত বিষয়ে। আহলে সুন্নাতের কিতাব পড়তে থাকুন, যেমন- ইমাম ইবনে তাইমিয়া , ইমাম ইবনুল ক্বাইয়েম প্রমুখের কিতাবগুলোই সর্বোৎকৃষ্ট। সালাফদের তাফসীর যেমন- তাফসীরে ইবনে জারীর, ইমাম ইবনে খুযায়মাহ'র 'কিতাবুত তাওহীদ', ইমাম বগভীর 'শরহে সুন্নাহ', ইবনে আবীল 'ঈযের 'শরহে তাহাবিয়্যাহ' প্রভৃতি খুবই উপকারী পুস্তক। আল্লাহ -র কাছে সবার জন্য তাওফিকু ও হিদায়াত এবং সহীহ নিয়‍্যাত ও আমলের জন্য দু'আ চাইছি।

পরবর্তী দু'টি প্রশ্নোত্তর শায়েখ ইবনে বাযের এর ৩৬-৪০ পৃষ্ঠা থেকে সংগৃহীত।

প্রশ্ন-১৫৷ একজন বোনের প্রশ্ন, সে জিজ্ঞাসা করেছিল: ক্বলবের ঈমানই কি একজন মানুষের মুসলিম হওয়ার জন্য যথেষ্ট, অথচ সে সালাত, সিয়াম ও যাকাত আদায় থেকে দূরে থাকে?

শায়েখ ইবনে বায (রহঃ) ক্বলবের ঈমান যথেষ্ট নয় সালাত ও অনুরূপ অন্যান্য আমল ছাড়া। বরং ওয়াজিব হল, আন্তরিকভাবে একক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। নিশ্চয় তিনি তাঁর রব ও সৃষ্টিকর্তা। তার জন্য এটাও ওয়াজিব যে, খাসভাবে আল্লাহর 'রই ইবাদত করবে। আর সে রসূলের প্রতি ঈমান আনবে। নিশ্চয় তিনি সত্য রসূল হিসাবে উভয় জাতির (জিন ও মানুষের) কাছে এসেছিলেন। এর প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ। এটাই দ্বীনের মূলনীতি, যা মুকাল্লিফের (দ্বীনের অনুসারীদের) উপর বাধ্যতামূলক। তাদেরকে আল্লাহ ও রসূল এর পক্ষ থেকে আগত খবর যেমন- জান্নাত, জাহান্নাম, পুলসিরাত, মিযান প্রভৃতি কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত বিষয়গুলোর প্রতি ঈমান রাখতে হবে। সুতরাং এটা জরুরী যে, সাক্ষ্য দেবে "আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল।" তেমনিভাবে সালাত ও অন্যান্য আমলগুলোও জরুরী। সুতরাং যখন সে সালাত আদায় করে, তখন সে তার (ঈমানের) দাবি পূর্ণ করে। আর যদি সে সালাত না পড়ে তবে সে কাফির। যেহেতু সালাত তরক করা কুফর।

তাছাড়া যাকাত, সিয়াম, হজ্জ ও অন্যান্য ওয়াজিব আমলও তাকে পালন করতে হবে। যদি সে এগুলোর ব্যাপারে আক্বীদা রাখে যে তা ওয়াজিব, কিন্তু সে অলসতা ও অবহেলা করে- তাহলে সে কাফির নয়, বরং অবাধ্য (পাপাচারী)। এক্ষেত্রে তার ঈমান দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত। কেননা ঈমানের হ্রাস ও বৃদ্ধি হয়। ইতা'আত (আনুগত্য) ও আমলে সালেহ দ্বারা ঈমান বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে অবাধ্যতা দ্বারা ঈমান হ্রাস পায়- আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে।

কেবল সালাত তরক করায় এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম (খাস), যা তরক করা অধিকাংশ আলেমের নিকট কুফর। যদিও-বা সে এর ওয়াজিব হওয়াকে অস্বীকার করে না। এটাই আলেমদের সবচেয়ে সহীহ উক্তি। অবশিষ্টরা বলেন, সালাত তরক করা অন্যান্য 'ইবাদত যেমন- যাকাত, সিয়াম ও হজ্জ তরক করার ন্যায়। কেননা সহীহ মতে এগুলো কেবল তরক করাটাই কুফরে আকবার নয়। বরং তা ঈমানের ত্রুটি, ঈমানের দুর্বলতা ও কবীরা গোনাহগুলোর সর্বোচ্চ গুনাহ। এ কারণে যাকাত তরক করা সর্বোচ্চ কবীরা গোনাহ। সিয়াম তরক করাও সর্বোচ্চ কবীরা গোনাহ। তেমনি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ আদায় না করা সর্বোচ্চ কবীরা গোনাহ। কিন্তু তাতে কুফরে আকবার সংঘটিত হয় না, যতক্ষণ একজন মু'মিন যাকাতকে হকু মানে, সিয়ামকে হকু মানে, সামর্থ্যবানের জন্য হজ্জ আদায় করাকে হকু মানে। সে এগুলোকে মিথ্যা বলে না এবং এর ওয়াজিব হওয়াকে অস্বীকারও করে না। কিন্তু সে আমলের দিকে থেকে অলসতা করে। এ কারণে সহীহ মতে সে কাফির নয়।

তবে সালাত তরককারীর ব্যাপারে আলেমদের সহীহ উক্তি হলো, সে কাফির, যা কুফরে আকবার। এ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই, যদিও সে সালাত ওয়াজিব হওয়াকে অস্বীকার করে না- যেভাবে পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। কেননা নবী বলেছেন: "(মু'মিন) ব্যক্তি এবং কুফর ও শিরকের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত তরক করা।" (সহীহ মুসলিম) তাছাড়া নবী বলেছেন: “তাদের ও আমাদের মধ্যে চুক্তি হল সালাত। সুতরাং যে সালাত তরক করে সে কুফরী করে।” (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ) এক্ষেত্রে মহিলারা পুরুষদের মতই। আল্লাহ কাছে ক্ষমা ও শান্তি চাচ্ছি। ৮১

প্রশ্ন-১৬৷৷ প্রশ্নকারী জিজ্ঞাসা করল: এ ব্যাপারে লোকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে যে যখন তারা বলে: সালাত ইসলামের ক্ষেত্রে শর্ত, হজ্জ ইসলামের জন্য শর্ত- তাহলেই একজন ব্যক্তি মুসলিম হতে পারবে। যদিও-বা অন্যান্য ক্ষেত্রে ইসলামের রোকনগুলো পালিত না হয়। এ কারণে বিষয়টি আরো বেশি সুস্পষ্ট হওয়া দরকার। আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন।

শায়েখ ইবনে বায : জি হ্যাঁ, দু'টি শাহাদাতের মাধ্যমে মুসলিম হয়। অর্থাৎ মনে প্রাণে এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ একক এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল- তাহলে সে ইসলামে প্রবেশ করল। অতঃপর যদি তাকে সালাত আদায় করতে দেখা যায় তবে তার ইসলাম পূর্ণ হলো। আর যদি সালাত আদায় করতে দেখা না যায় তবে সে মুরতাদ। অনুরূপ যদি সে সালাতকে অস্বীকার করে তবেও মুরতাদ হয়ে যায়। কিংবা সিয়ামকে অস্বীকার করলে মুরতাদ হয়। অথবা বলে যাকাত প্রভৃতি ওয়াজিব নয়, তবেও সে মুরতাদ। কিংবা বলে সামর্থ্য হলেও হজ্জ করা ওয়াজিব নয়, তবে সে মুরতাদ। কিংবা দ্বীন নিয়ে তামাশা করে, কিংবা রসূলকে গালি দেয়- তবেও সে মুরতাদ।

উক্ত সিদ্ধান্তের কারণ হলো, এ বিষয়গুলো সুস্পষ্ট। সুতরাং যখন কেউ ইসলামে দু'টি শাহাদাত দ্বারা প্রবেশ করে তার উপর ইসলামী বিধি- বিধান আবশ্যক হয়। অতঃপর যদি তাকে অন্যান্য নির্দেশগুলোর উপর দেখা যায় এবং সে হক্বভাবে তাতে দৃঢ় হয়- তবে তার ইসলাম পূর্ণ হলো। অতঃপর যদি তার মধ্যে ইসলামের কোন ত্রুটি দেখা যায়। যেমন: দ্বীন নিয়ে কটূক্তি করা, রসূলকে মিথ্যারোপ করা, আল্লাহর ওয়াজিবকৃত বিষয়গুলো যেমন- সালাত, সিয়ামের বিরোধিতা করা, কিংবা আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ের বিরোধিতা করা যেমন- যিনাকে হালাল গণ্য করা; তবে সে ইসলাম থেকে বহিষ্কার হয়। যদিওবা সে সালাত, সিয়াম পালন করে এবং বলে: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, এবং মুহাম্মাদ তাঁর রসূল।

অনুরূপ যদি সে বলে: যিনা হালাল, অথচ সে এর দলিল সম্পর্কে জ্ঞাত- তখন প্রমাণ তার জন্য কার্যকরী হবে। সে আল্লাহর প্রতি কুফরী করেছে, যা কুফরে আকবার- সে আল্লাহর থেকে বহিষ্কৃত। কিংবা যদি সে বলে, মদ পান করা হালাল। অথচ তার কাছে দলীল-প্রমাণ পেশ করা হয় এবং সেটা তার কাছে সুস্পষ্টও হয়, তারপরেও সে বলে: মদ হালাল। তখন এটা কুফরে আকবার। ফলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় এবং আল্লাহর থেকে বহিষ্কৃত হয়। কিংবা সে বলে: পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ত্যাগ হালাল। সেক্ষেত্রে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় এবং আল্লাহর থেকে বহিষ্কৃত হয়। কিংবা বলে: মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া হালাল। সেও ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় যখন তার কাছে ইসলামী শরী'আতের দলিলগুলো বর্ণনা করা হয়।

অনুরূপ যদি সে বলে: সালাত ওয়াজিব নয়, বা যাকাত ওয়াজিব নয়, রমাযানের সিয়াম ওয়াজিব নয়, সামর্থ্য হওয়ার পরেও হজ্জ ওয়াজিব নয়- এর সবগুলো ইসলাম থেকে বিচ্যুতির কারণগুলোর অন্যতম। ফলে সে কাফির হয় এবং আল্লাহর থেকে বহিষ্কৃত হয়।

তবে ব্যতিক্রম হলো, যখন সে বলে: সালাত ওয়াজিব, আমার অলসতা আছে, আমি সালাত আদায় করি না। জমহুর ফক্বীহদের মতে: সে কাফির নয়, সে অবাধ্য ব্যক্তি, তাকে তাওবা করতে হবে। যদি সে তাওবা না করে তবে তাকে হত্যা করতে হবে।

পূর্বোক্ত বিষয়ে আহলে ইলমদের থেকে যাকিছু বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো সাহাবীদের থেকে এসেছে। তারা এ ব্যাপারটি কুফর গণ্য করতেন, যা কুফরে আকবার। সুতরাং সে তাওবা করবে, যদি তাওবা না করে তবে তাকে হত্যা করতে হবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন: "যদি তারা তাওবা করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে- তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও।" (সূরা তাওবা- ৫ আয়াত) এ থেকে দলিল পাওয়া গেল, যদি সালাত আদায় না করে তবে তাদের পথ রোধ করতে হবে। বরং তাদের তাওবা করতে হবে। যদি তাওবা না করে তবে হত্যা করতে হবে। আল্লাহ বলেন: “যদি তাওবা করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে- তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই।” (সূরা তাওবা- ১১ আয়াত) এ থেকে দলিল পাওয়া গেল, যারা সালাত আদায় করে না তারা দ্বীনি ভাই নয়।

টিকাঃ
৭৩. "যাকাত নাআদায়কারী" সম্পর্কীত হাদীসগুলোর সার-সংক্ষেপ এটাই। বিস্তারিত হাদীসের কিতাবের 'যাকাত' অধ্যায় দ্রষ্টব্য। (অনুবাদক)
৭৪. সূরা তাওবা- ৩৫ আয়াত।
৭৫. যাকাত নাআদায়কারীর হাশরের ময়দানে তার সম্পদ, উট, গরু, ভেড়া দ্বারা শাস্তি লাভের বর্ণনার পর নবী এর বাণী: إِنَّمَا إِلَى النَّارِ وَإِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ سَبِيلُهُ فَيُرَى "অতঃপর সে তার পথ ধরবে হয় জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে।" [সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৪/১৬৮১ নং। অনুবাদাক।
৭৬. আমাদের বিরোধিপক্ষ ইমাম আলবানীর "ফিতনাতুত তাকফীরের" বক্তব্য খণ্ডনে উপরোক্ত 'আমালী কুফরগুলোকে উদাহরণ হিসাবে পেশ করে থাকেন। অথচ উক্ত আমলগুলো আক্বীদা, ইবাদত এবং আল্লাহ ও রসূলের হজ্বের সাথে সম্পর্কীত, যা মু'আমালাত বা লেনদেন তথা মানবীয় হজ্বের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এ কারণে উক্ত আমলগুলো কেবল কুফরে 'আমালীই নয় বরং 'ইবাদত ও আক্বীদাগত কুফর, যা দ্বীন থেকে খারিজ করে দেয় তথা বড় কুফর হিসাবে গণ্য। পক্ষান্তরে বিচার-লেনদেন তথা মু'আমালাতের ক্ষেত্রে যতক্ষণ তা আক্বীদাকে নষ্ট করে না, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়ন না করাটা ঐ সমস্ত 'আমালী কুফরের অন্তর্ভূক্ত যা ছোট কুফর (كفر دون كفر)। কিন্তু এক্ষেত্রেও যদি হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল বলে, বা দ্বীন ইসলামের বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ, গালি-গালাজ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে- তবে সেটা আক্বীদার বিরোধি হওয়ায় বড় কুফরের অন্তর্ভূক্ত হবে। যা দ্বীন ইসলাম থেকে খারিজ করে। এ সম্পর্কীত ধারণা আমরা 'ইবাদত ও ইতা'আতের পার্থক্য" অনুচ্ছেদে আলোচনা করেছি। -অনুবাদক।
৭৭. সূরা নাযম- ৬২ আয়াত।
৭৮. সূরা নাযম- ৬২ আয়াত।
৭৯. সূরা আন'য়াম- ১৬২-১৬৩ আয়াত।
৮০. যেমন হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করা। (অনুবাদক)
৮১. যারা এর বিপরীতে সালাতকে ওয়াজিব/ফরয হিসাবে স্বীকৃতিদাতার সালাত তরক করাকে 'আমলী কুফর বলেন তাদের দলিল নিম্নরূপ: 'উবাদা ইবনে সামিত থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
خَمْسُ صَلَوَاتِ كَتَبَهُنَّ اللَّهُ عَلَى الْعِبَادِ فَمَنْ جَاءَ بِهِنَّ لَمْ يُضَيِّعْ مِنْهُنَّ شَيْئًا اسْتَخْفَافًا بِحَقِّهِنَّ كَانَ لَهُ عِنْدَ الله عَهْدٌ أَنَّ يُدَخِلَهُ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَمْ يَأْتِ بِهِنَّ فَلَيْسَ لَهُ عِنْدَ الله عَهْدٌ إِنْ شَاءَ عَذَبَهُ وَإِنْ شَاءَ أَدْخَلَهُ الْجَنَّةَ
"আমি রসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি: আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। কাজেই যে তা সংরক্ষণ করবে এবং তার হকের কোন অংশ কম করবে না, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর ব্যাপারে আল্লাহর অঙ্গীকার রয়েছে। আর যে ব্যক্তি তা করবে না, তার সাথে আল্লাহর কোন চুক্তি নেই। চাইলে তিনি তাকে শাস্তি দেবেন নতুবা তিনি চাইলে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।" [মুয়াত্তা মালিক, আবু দাউদ, নাসায়ী, সহীহ ইবনে হিব্বان, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব (ইফা) ১/২৬৮ পৃ: হা/২৫; আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (সহীহ আবু দাউদ হা/১২৫৮)। আলবানী বলেন:
وَقَالَ أَيْضًا : " مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ إِلَى غَيْرِ ذلِكَ وَلِهُذَا لَمْ يَزَلِ الْمُسْلِمُوْنَ يَرِثُونَ تَارِكُ الصَّلَاةَ وَيُورَثُونَهُ وَلَوْ كَانَ كَافِرًا لَمْ يُغْفَرْ لَهُ وَلَمْ يَرَتْ وَلَمْ يُورَتْ
"অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে: যে ব্যক্তি এমন অবস্থাতে মারা যায় যে সে 'ইলম রাখে- আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে" [সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ১/৩৩ নং অনুরূপ আরো বর্ণনা রয়েছে। এপ্রেক্ষিতে যদি মুসলিম (কালেমার বিশ্বাসের ক্ষেত্রে) পদস্খলিত না হয়ে সালাত তরককারী হলে উপরোক্ত দাবীর মধ্যে গণ্য হবে, আর যদি কাফির হয়, তবে তার জন্য ক্ষমা নেই, আর তার জন্য ওয়াদা নেই এবং সে উক্ত দাবীর মধ্যেও গণ্য নয়।" (আলবানী, হুকুমে তারকুস সালাত ১৭-১৮ পৃঃ] এই অনুবাদকের নিকট শেষোক্ত দলীলগুলো আখিরাতের আল্লাহর সিদ্ধান্তের সাথে সম্পৃক্ত। পক্ষান্তরে শায়েখ ইবনে বায-এর উল্লিখিত দলীলগুলো দুনিয়াতে মুসলিমের পরিচয় সম্পর্কীত। অর্থাৎ উভয় মতবিরোধের পক্ষের দলীলগুলো নিজ নিজ স্থানে প্রযোজ্য। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 পরিশিষ্ট- ১: ইবাদত ও ইতা’আত

📄 পরিশিষ্ট- ১: ইবাদত ও ইতা’আত


[সফিউর রহমান মুবারকপুরী বিখ্যাত 'আর-রাহীকুল মাখতুম'-নামক সিরাতুন্নবী-এর লেখক। তাছাড়া তাঁর অধীনে সম্পাদিত বোর্ডকর্তৃক তাফসীর ইবনে কাসিরের সংশোধিত সংস্করণটিও খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তিনি বর্তমান যামানার অন্যতম সালাফী আক্বীদার মুহাদ্দিস ও মুফাসসির হিসাবে খ্যাত। এই প্রবন্ধটি www.AsliAhleSunnet.com থেকে যা উর্দু ভাষায় অনূদিত ও সঙ্কলিত 'ফিতনাতুত তাকফীর আওর হুকুম বিগয়রি মা আনঝালাল্লাহ'-এর ৮৪-৮৭ পৃষ্ঠা থেকে সংগৃহীত। তাছাড়া মূল প্রবন্ধটির স্বতন্ত্র উর্দু শিরোনামেও কাহি মমত (মওদুদী সাহেবের দৃষ্টিভঙ্গীর 'তাওহীদে হাকিমিয়্যাত' খণ্ডন) প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদক: কামাল আহমাদ]

মওদুদী সাহেবের চিন্তা হলো, যার প্রতি নিঃশর্ত ইতা'আত করা হয় সেটাই প্রকারান্তরে তার ইবাদত করা। মুসলিমরা আল্লাহ'র নিঃশর্ত ইতা'আত করে। আর নবী এর ইতা'আত এ জন্য করে যে, সেটা আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন। অর্থাৎ নবী এর ইতা'আত হলো, আল্লাহ এ'র ইতা'আতের অধীন। সুতরাং যখন তাঁর ইতা'আত করা হয়, তখন আল্লাহ'রই ইতাআত করা হয়। যা ফলশ্রুতিতে আল্লাহ'র ইবাদতে পরিণত হয়। এর দ্বারা তিনি অপর একটি মাসআলা উদ্ভাবন করেছেন। আর তা হলো- যদি কোন হুকুমাত আল্লাহ'র কানুনের অধীনতা ছাড়াই হুকুমাত পরিচালনা করে, তবে সেই হুকুমাতের ইতা'আত করাই- তার ইবাদত করা, যা প্রকারান্তরে শিরক। আর এভাবেই তিনি শিরক ফিল হাকিমিয়্যাহ'র দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন। এটা অত্যন্ত জোরালোভাবে তিনি উপস্থাপন করেছেন, যার মধ্যে অসংখ্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আপনাদের সামনে আমি এর স্বরূপ উপস্থাপন করব। অনেক সময় একশ', দুশ, চার'শ এমনকি আট'শ পৃষ্ঠার কিতাবে এ ধরণের মাসআলা লেখা হয়। মাসআলা অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করে, এবং অনেক লম্বা লম্বা আলোচনা- বুঝার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে। এ কারণে আমি আপনাদের সামনে কয়েকটি শব্দের ব্যাপারে দুই একটি আলোচনা উপস্থাপন করছি।

ইতা'আত কি 'ইবাদত? নাকি 'ইবাদত এবং ইতা'আত ভিন্ন ভিন্ন জিনিস? আমি এটা আপনাদের বুঝাবো। এটা বুঝানোর জন্য আমি আপনাদের সামনে একটি বা দু'টি উদাহরণ পেশ করছি।

একবার আমার কাছে জামায়াতে ইসলামী'র একজন যুবক আসল। সে আমার সাথে কথা বলতে লাগল, আমিও তার সাথে কথা বলতে থাকলাম। একপর্যায়ে সে তার দা'ওয়াত দিল যে, আমাদের দা'ওয়াত হলো এটা....। আমি বললাম আমি জানি। সে এটাই আশা করছিল যে, আমি যেন তার দা'ওয়াত কবুল করি।

আমি বললাম: দেখ, তোমাদের দা'ওয়াত সহীহ নয়।
যুবক: কেন সহীহ নয়?
আমি: যদি এটাই তোমাদের সত্যিকার দা'ওয়াত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি কোন হুকুমাতের ইতা'আত করে যা আল্লাহ'র কানুনের অধীনস্থ নয়, তাহলে এই ইতা'আত ইবাদতে পরিণত হবে। যদি এটাই তোমাদের দা'ওয়াত হয়, তবে মেহেরবানি করে বাইরে যাও এবং যদি কোন মুসলিমকে বাম পাশে দেখ (ভারতের ট্রাফিক আইনে বাম পাশ থেকেই চলতে হয়), তখন যদি সে রাস্তায় বাম পাশ থেকে সাইকেল চালায় তবে তাকে বল, ভাই তুমি বাম পাশ থেকে চলো না, এই পাশ থেকে সাইকেল চালানো শিরক।

যুবক: (উচ্চৈঃস্বরে বলল) শায়েখ এটা কি বলেন?
আমি: আমি তো তা-ই বলছি, যা তোমরা বলে থাক। তোমাদের বক্তব্যের মূল বিষয়ই আমি জানাচ্ছি।

যুবক: কিভাবে?
আমি: ভারতের হুকুমাত আল্লাহ'র হুকুমাতের বিপরীত, নাকি আল্লাহ'র হুকুমাতের অধীন।

যুবক: না, আল্লাহ'র হুকুমাত গ্রহণ না করে এর বিপরীত পন্থায় চলে।
আমি: এখানে যে আইন আছে এর ইতা'আত করাটি কি শিরক হবে, নাকি শিরক হবে না?

যুবক: কোনটা হবে?
আমি: এই আইনের অন্যতম একটি হল, সাইকেল রাস্তার বাম দিক দিয়ে চলবে। যে ব্যক্তি বাম দিক দিয়ে সাইকেল চালাবে, সে এই হুকুমাতের ইতা'আত করবে। আর এই ইতা'আতকেই 'জামায়াতে ইসলামী' 'ইবাদত বলছে। আর গায়রুল্লাহ'র ইবাদতকে শিরক গণ্য করা হয়। সুতরাং এটা শিরক।

যুবকঃ (পেরেশানীর সাথে বলল) শায়েখ আপনিই বলুন, কোনটা সহীহ আর কোনটা ভুল?

'আমি: দেখ, ইতা'আত ও 'ইবাদত ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। তবে কখনো কখনো একই আমল 'ইবাদত ও ইতা'আত দু'টিই হতে পারে। তেমনই এমনটিও হতে পারে যে, কোন আমল ইতা'আত হলেও তা 'ইবাদত নয়। আবার এটাও হতে পারে যে, কোন আমল 'ইবাদত কিন্তু ইতা'আত নয়। এর সবগুলোই সম্ভব।

যুবক: কিভাবে?

আমি: বলছি, শোন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নিজের কুওমকে জিজ্ঞাসা করলেন:

إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا تَعْبُدُونَ (۷۰) قَالُوا نَعْبُدُ أَصْنَامًا فَنَظَلُّ لَهَا عَاكِفِينَ (۷۱) قَالَ هَلْ يَسْمَعُونَكُمْ إِذْ تَدْعُونَ (۷۲) أَوْ يَنْفَعُونَكُمْ أَوْ يَضُرُّونَ

"(ইবরাহীম আলাইহিস সালাম) যখন তার পিতা ও কুওমকে বললেন: তোমরা কিসের ইবাদত কর? তারা বলল: আমরা প্রতিমার ইবাদত করি এবং এদেরকেই নিষ্ঠার সাথে আঁকড়ে থাকি। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন: তোমরা যখন আহ্বান কর, তখন কি তারা শোনে? অথবা তারা কি তোমাদের কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারে?" (সূরা শু'আরা- ৭০-৭১ আয়াত)

বলতো, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম'র কুওম যে মূর্তির 'ইবাদত করত, তারা কি তার ইতা'আতও করত? মূর্তিতো কখনোই কোন হুকুম দেয়ার বা কোন কিছু বাধা দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং ঐ কুওমের কাজটি 'ইবাদত হলেও ইতা'আত নয়।

যুবক: (তখন সে স্বীকার করল) হাঁ এটা ঠিক যে, ঐ কুওম ইতা'আত নয় বরং মূর্তিদের 'ইবাদত করত।

আমি: তাহলে এবার আমরা আরেকটু সামনে যাব। ঈসায়ীদের সম্পর্কে আল্লাহ কুরআন মাজীদের কয়েকটি স্থানে বর্ণনা করেছেন। ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ ঈসা আলাইহিস সালাম-কে জিজ্ঞাসা করবেন:

وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دون الله.

"যখন আল্লাহ বলবেন: হে ঈসা ইবনে মারইয়াম! তুমি কি লোকদের বলে দিয়েছিলে যে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে ও আমার মাতাকে ইলাহ সাব্যস্ত কর?".... (সূরা মায়িদা- ১১৬ আয়াত)।

তখন ঈসা আলাইহিস সালাম এটা সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করবেন। বলবেন: مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ

"আমি তো তাদের কিছুই বলি নি, তবে কেবল সে কথাই বলেছি যা আপনি নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাহল, আল্লাহ'র ইবাদত কর- যিনি আমার ও তোমাদের রব। আমি তাদের ব্যাপারে সাক্ষ্যদাতা যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম।” (সূরা মায়িদা: ১১৭ আয়াত)

এভাবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করবেন। কুরআনের উল্লিখিত আয়াতের সম্পর্ক ঈসায়ীদের সাথে এবং ঈসা আলাইহিস সালাম-এর 'ইবাদত করা সম্পর্কীত। কিন্তু ঐ লোকেরা যার 'ইবাদত করে সে না তাদের উপকার করতে পারে, আর না পারে তাদের ক্ষতি করতে। সুতরাং সুস্পষ্ট হলো, তারা ঈসা আলাইহিস সালাম-এর 'ইবাদত করত। আর ঈসা আলাইহিস সালাম তাদের কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারতেন না। এখন মাসআলা হলো, তারা ঈসা আলাইহিস সালাম-এর যে 'ইবাদত করত, সেটা কি তাঁর ইতা'আতও ছিল?

(পুনরায় বললাম) 'ইবাদত করাতো প্রমাণিত হল, কেননা কুরআন এ কাজটিকে 'ঈসা আলাইহিস সালাম-এর 'ইবাদত বলে উল্লেখ করেছে। সুতরাং ঈসায়ীদের মধ্যে যারা তাঁর 'ইবাদত করেছে ও করছে, তারা কি তাঁর ইতা'আতও করছে? তারা কখনোই ইতা'আত করছে না। 'ঈসা আলাইহিস সালাম কখনই তাঁর 'ইবাদত করার হুকুম দেন নাই যে, আমার 'ইবাদত কর। বরং তিনি নিষেধ করেছেন। সুতরাং তারা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছে। ইতা'আতের বদলে নাফরমানী করেছে, আর সেটা 'ইবাদতই ছিল। সুতরাং 'ইবাদত করার জন্য এটা জরুরী নয় যে, যার 'ইবাদত করা হবে তাঁর ইতা'আতও করতে হবে। ইতা'আত ছাড়াও 'ইবাদত হয়, আর নাফরমানির মাধ্যমেও 'ইবাদত করা হয়। একে তাঁর পক্ষ থেকে অনুমোদিত 'ইবাদত বলা হবে না।

সুতরাং মাসআলাটি সুস্পষ্ট হলো। এখন তুমি কী জানতে চাও? কারো কোন হুকুম মানা ও আনুগত্য করা তার ইতা'আত। পক্ষান্তরে, কারো নৈকট্য অর্জনের জন্য তথা সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কোন মাধ্যম ছাড়াই তার সন্তুষ্টি অর্জনের পদ্ধতিমূলক কাজই ইবাদত। ঐ লোকেরা ঈসা টিএর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ঐ আমল করত, এ কারণে তারা তাঁর ইবাদত করত। তারা তাঁর নির্দেশের আনুগত্য করে নি, সুতরাং তারা তাঁর ইতা'আত করত না। আমরা সালাত আদায় করি- এর দ্বারা আল্লাহ'র সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনা করি। অর্থাৎ সালাত একটি ইবাদত। আর আল্লাহ যে হুকুম দিয়েছেন তা পালনও করি, এটাই হল তাঁর ইতা'আত। ইতা'আত ও ইবাদতের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন। সালাত একটি আমল যার মধ্যে দু'টি বিষয়ই রয়েছে অর্থাৎ ইবাদত ও ইতা'আত।

অথচ মওদুদী সাহেব যেহেতু এই দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন যে, কারো নিঃশর্ত ইতা'আত করাটাই তার ইবাদত করা। এ কারণে তিনি বলেছেন, বান্দা যদি আল্লাহ'র ইতা'আতে জীবন অতিবাহিত করে- তবে তার সমস্ত জীবনই ইবাদতে পরিণত হবে। সুতরাং তার দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এগুলো (জীবন-যাপনের সব কিছুই) 'ইবাদত। কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে জীবনের সবকিছুই 'ইবাদত নয়। বরং এর মধ্যে ইতা'আতও রয়েছে। যদি সমস্ত যিন্দেগী আল্লাহ'র হুকুমে পালিত হয়, তবে সেই যিন্দেগীর পুরোটাই তাঁর ইতা'আত। আর এটা সওয়াবের কাজ এবং এর মাধ্যমে সওয়াব অর্জিত হয়। কিন্তু এটা ইবাদত নয়। এটাই সহীহ অর্থ।

[সংযোজন: পূর্বেই আমরা দেখেছি স্বয়ং নবী শাসককে ততক্ষণ পর্যন্ত ছাড় দিতে বলেছেন যতক্ষণ তার থেকে স্পষ্ট কুফর প্রকাশ না পায়, কিংবা সালাত আদায় করে। পক্ষান্তরে যুলুম-অত্যাচার, স্বজনপ্রীতি, হক্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে জনগণকে শাসককে মেনে নিতে বলেছেন। কিন্তু দু'টিই আল্লাহর নির্দেশ। এর প্রথমোক্তটি আক্বীদা ও 'ইবাদত সংক্রান্ত। আর দ্বিতীয়টি ইতা'আত বা মু'আমালাত সম্পর্কীত। অথচ উভয়টির ব্যাপারেই সুস্পষ্ট নির্দেশাবলি আছে। -অনুবাদক]

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 পরিশিষ্ট- ২: তাহকীকৃতঃ আমাদের হাকিম কেবলই একজন— আল্লাহ তা’আলা

📄 পরিশিষ্ট- ২: তাহকীকৃতঃ আমাদের হাকিম কেবলই একজন— আল্লাহ তা’আলা


[পূর্বোক্ত আলোচনার সাথে সাঞ্জস্যতার কারণে এই পুস্তিকাটিও সংযুক্ত করা হলো]

মূল মাস'উদ আহমাদ

অনুবাদ ও তাহক্বীকু কামাল আহমাদ

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


মহান রব্বুল 'আলামীনের দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া যে, মুসলিম ভাইদের সংস্কারের স্বার্থে এই "তাহক্বীকুকৃত আমাদের হাকিম কেবলই একজন- আল্লাহ তা'আলা" লিখতে পেরেছি। আমরা এমন গুণীজন, সুধীজন, দল বা জামা'আত ইদানীং লক্ষ্য করছি, যারা অনেকেই হজ্বের দা'ওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এ সমস্ত জামা'আতের মধ্যে সূক্ষ্ম ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। কখনো এটা আক্বীদার ক্ষেত্রে আবার কখনো বা 'আমলের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি জামা'আতকে কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক সংস্কারের প্রস্তাব দেয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের নিজ নিজ অবস্থানে দৃঢ় থাকতে দেখা যায়। এরকম অনেক হকু ও সংস্কারের অন্যতম বাহকদের একটি মূল শ্লোগান সমৃদ্ধ পুস্তিকা "আমাদের হাকিম কেবলই একজন- আল্লাহ তা'আলা"-এর সংস্কার জরুরী মনে করছি। মূলত "হাকিম একমাত্র আল্লাহ” এই শ্লোগানটি ছিল মুসলিমদের থেকে পৃথক প্রথম সৃষ্ট ফিরকা খারেজীদের। যাদের সংস্কারের উদ্দেশ্যে এই তাহক্বীকু বা বিশ্লেষণটি লেখা হয়েছে তাদেরও সেই ইতিহাস স্মরণ করানো দরকার মনে করছি।

এই ইতিহাসটি জানানোর ক্ষেত্রে আমরা যে গ্রন্থটিকে মূল সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছি তা হলো, ইমাম ইবনে কাসির-এর "আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭ম খণ্ড (মিশর: মাকতাবাতুস সাফা পৃঃ ২২৬-২৫৫, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন পৃ: ৫০৩-৫৫৬)"। গ্রন্থটি মূলত হাদীসের আলোকেই সঙ্কলিত। এরপরও আমরা সাধ্যমত এর সূত্রগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। যদি কেউ এর অনুল্লিখিত সূত্র সম্পর্কে আমাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন তবে পরবর্তীতে এর প্রয়োজনীয় সংস্কার করার উদ্যোগ নেব এবং তার বা তাদের প্রতি চির কৃতজ্ঞ থাকব। অবশ্য আমরা এখানে কেবল সংক্ষেপে প্রয়োজনীয় অংশগুলোই উল্লেখ করব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00