📄 হাকিম ও মাহকূম (প্রজা/শাসিত)-এর প্রতি তাকফীর
এখন আমি জামা'আতুত তাকফীর ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তথা শাসক, অধীনস্থ সাধারণ জনগণ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পর্কে আলোচনা করব যারা ঐ হুকুমাতের অধীনে কাজ ও চাকরি করার কারণে তাকফীরের শিকার হচ্ছেন। ⁵⁶ অর্থাৎ তাদের অধীনতার পাপের কারণে কাফির বলা হচ্ছে। ⁵⁷
আমি আলোচ্য কথাগুলো আমার কাছে প্রশ্নকারী ভাইদের কাছ থেকে পেয়েছি যারা পূর্বে জামা'আতুত তাকফীরের অন্তর্ভূক্ত ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাদের হিদায়াত দিয়েছেন। আমি তাদের কাছে জানতে চাই, আপনারা অনেক হাকিম (শাসক)-কে কাফির গণ্য করেন। কিন্তু আপনারা ইমাম, খতীব, মুয়াজ্জিন ও মাসজিদের খাদেমদেরকেও তাকফীর কেন করেন? এমনকি আপনারা ইলমে শরী'আতের উস্তাদ যারা বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান করছেন তাদের প্রতিও তাকফীর করেন!!
তারা উত্তরে এটাই বলেন যে, কেননা এই লোকেরা ঐ হাকিম (শাসক) ও তাদের শাসনতন্ত্রের প্রতি রাযী, অথচ তা আল্লাহ'র নাযিলকৃত শরী'আতের বিরোধি।
আমি তাদের বলি: যদি এই রাযী বা সন্তুষ্টি আন্তরিকভাবে হয়ে থাকে তবে তো এই আমালী কুফর প্রকৃতপক্ষে ই'তিক্বাদী কুফরে পরিণত হয়। সুতরাং যদি কোন হাকিম (শাসক/বিচারক) আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক ফায়সালা না করে এবং এটা মনে করে যে, এই হুকুম বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশি উপযোগী। পক্ষান্তরে কুরআন ও সুন্নাতের বিধি-বিধান বর্তমান যামানার জন্য উপযোগী নয়, তবে নিঃসন্দেহে তার এই কুফর- কুফরে ই'তিক্বাদী এবং কখনই তা কুফরে 'আমালী নয়। আর কেউ যদি এই ধারণার প্রতি রাযী বা সন্তুষ্ট থাকে তবে সে কাফির।⁵⁸
কিন্তু আপনারা যে সমস্ত শাসক পশ্চিমা আইন দ্বারা কম বা বেশি বিধান জারি করছে- তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা কখনই এটা বলবে না যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আইন দ্বারা শাসন চালানো জরুরী এবং ইসলাম অনুযায়ী শাসন চালান জায়েয নয়। বরং তারা এভাবেও বলবে না যে, আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী শাসন চালানোর সম্ভব হচ্ছে না। কেননা এটা বললে তারা নিঃসন্দেহে কাফির হয়ে যাবে।
এখন আমি যদি শাসিত প্রজাসাধারণ- যার মধ্যে উলামা ও নেককার ব্যক্তিগণ রয়েছেন তাদের প্রসঙ্গে আসি, সেক্ষেত্রেও বলব যে, আপনারা কেন তাদের প্রতি তাকফির করছেন? সম্ভবত এই কারণে যে, তারা ঐ হুকুমাতের অধীনে জীবন-যাপন করছে। অথচ ঐ হুকুমাতের অধীনে জীবন-যাপনের ব্যাপারে আপনারাও (জামা'আতুত তাকফীর) হুবহু তাদেরই মত। পার্থক্য এতটুকু যে, আপনারা শাসকদের কাফির ঘোষণা করছেন। পক্ষান্তরে আলেমগণ এটা বলছেন না যে, তারা দ্বীনের থেকে মুরতাদ হয়ে গেছে। বরং তারা বলেন: আল্লাহ'র নাযিলকৃত শরী'আত দ্বারা শাসন চালান ওয়াজিব এবং আমলগত কারণে কোনটির বিরোধিতার জন্য এটা জরুরী নয় যে, সেই আলেম বা হাকিম/শাসক দ্বীন ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হবে।
সংশয়: একবার বা কয়েকবার আল্লাহ শু'র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম জারি না করলে কাফির হয় না। কিন্তু বারবার বা সবসময় আল্লাহ'র বিধানের বিরোধি হুকুম জারি করলে কাফির হয়ে যায়।
বিতর্ককারীদের মধ্যে যাদের গোমরাহী ও ভুল-ত্রুটিগুলো সুস্পষ্ট হয়েছে, আমি তাদের একটি পক্ষকে জিজ্ঞাসা করি : আমরা কখন একজন কালেমায়ে শাহাদাতের (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ الله ) দাবীদার যারা সালাতও আদায় করে তাদের দ্বীন থেকে মুরতাদ হিসাবে গণ্য করব?
মূলতঃ এ ব্যাপারে তাদের দৃষ্টি একটি দিকে থাকবে। আর তা হল- আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা না করাই দ্বীন থেকে মুরতাদ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। যদিও এই তাকফীরকারীরা নিজের মুখ থেকে এই জবাব দিবে না- তবে মূলত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এটাই।
এই প্রশ্ন তাদের সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয় এবং তাদের থেকে কোন জবাব পাওয়া যায় না। তখন আমি তাদের নিম্নোক্ত উদাহরণটি উপস্থাপন করি যা তাদের নির্বাক করে দেয়। যেমন আমি তাদের বলেছি- "একজন হাকিম (শাসক/বিচারক) তিনি শরী'আত মোতাবেক ফায়সালা করবেন এবং এটাই তার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কোন একটি ফায়সালাতে তিনি বিচ্যুত হয়ে শরী'আত বিরোধি ফায়সালা দেন- অর্থাৎ কোন যালিমকে হকু দিয়ে দিলেন এবং মাযলুমকে বঞ্চিত করলেন। বলুন তো- এটা কি ‘হুকুম বিগয়রি মা-আনঝালাল্লাহ’ নয়?
আপনারা কি বলবেন সে কুফর তথা মুরতাদ হওয়ার কুফর করেছে?”
তারা জবাব দিল: না।
আমি বললাম: কেন না, সে তো আল্লাহ’র শরী’আতের বিরোধিতা করেছে।
তারা জবাব দিল: এটা তো কেবল একবার সংঘটিত হয়েছে।
আমি বললাম: খুব ভাল। যদি এই হাকিম দ্বারা দ্বিতীয়বার শরী’আতের বিরোধিতা হয়, কিংবা ভিন্ন কোন ব্যাপারে সংঘটিত হয় যা শরী’আতের বিরোধি- তাহলে সে কি কাফির হবে?
আমি তিন-চার বার তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, কখন তাকে কাফির বলব? তারা এর কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করতে পারল না যে, কতবার শরী’আতের খেলাফ হলে সে কাফির বলে গণ্য হবে।
যখন আমি উক্ত বক্তব্যটি ভিন্নভাবে বললাম: যদি আপনারা এটা মনে করেন যে, সে একটি শরী’আত বিরোধি হুকুমকে উত্তম হিসাবে অব্যাহত রাখে এবং ইসলামী হুকুমের অবমাননা প্রকাশ করে, সেক্ষেত্রে আপনারা তার প্রতি মুরতাদের হুকুম লাগাতে পারেন। যখন অন্যক্ষেত্রে আপনারা তাকে শরী’আতের বিরোধি ফায়সালা করতে দেখবেন তখন জিজ্ঞাসা করবেন- হে শায়েখ! আপনি কেন আল্লাহ’র নাযিলকৃত বিধানের বিরোধি ফায়সালা করছেন? সে তখন কুসম করে বলবে- “আমি ভয়ে এটা করেছি বা নিজের প্রাণের হুমকি ছিল, কিংবা আমি ঘুষ নিয়েছে প্রভৃতি।” শেষোক্ত অজুহাতটি পূর্বের দু’টি থেকেও নিকৃষ্ট। এরপরেও আপনারা এটা বলতে পারেন না যে, সে কাফির- যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজেই ঘোষণা দেয়। অর্থাৎ নিজের অন্তরের গোপন কুফর প্রকাশ করে, তথা যখন আল্লাহ’র নাযিলকৃত হুকুম মোতাবেক ফায়সালা করা জায়েয নয় বলে মানে- কেবল তখনই আপনারা বলতে পারেন সে মুরতাদ-কাফির।
টিকাঃ
৫৬. সাহাবী আবূ সাঈদ ও আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন لَيَاتِينَ عَلَيْكُمْ أَمْرَاء يُقَرِّبُوْنَ شِرَارَ النَّاسِ وَيُؤَخِّرُونَ الصَّلَاةَ عَنْ مَوَاقِيتِهَا فَمَنْ أَدْرَكَ ذَلِكَ مِنكُمْ فَلَا يَكُونَنَّ عَرْيفًا وَلَا شَرْطِيًّا وَلَا جَابِيًّا وَلَا خَازِنًا
"অদূর ভবিষ্যতে অবশ্যই তোমাদের উপর এমন আমীর (শাসক) হবে, যারা সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট লোকদের নিজের কাছে টেনে নেবে এবং তারা সালাতের ওয়াক্ত গড়িয়ে যাওয়ার পর তা আদায় করবে। এই সময় তোমাদের কেউ জীবিত থাকলে সে যেন তত্ত্বাবধায়ক, পুলিশ, যাকাতের সম্পদ আদায়কারী ও খাজাঞ্চী নিযুক্ত না হয়।" [সহীহ ইবনে হিব্বান, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব (ইফা) ১/৫৫৭ পৃঃ; হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন ইমাম হায়সামী (মুজমু'আয়ায়ে যাওয়ায়েদ ৫/৯২২৫ নং), হুসাইন সালীম আসাদ (তাহক্বীক্বকৃত মুসনাদে আবী ইয়ালা ২/১১১৫ নং) ও মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (আস-সাহীহাহ ১/৩৬০ নং)। [বাংলা অনুবাদক)
৫৭. আমরা আল্লাহর কাছে (মুসলিমদেরকে তাকফির করার ব্যাপারে) ক্ষমা চাচ্ছি - শায়েখ উসায়মীন। [উর্দু অনুবাদক]
৫৮. এই আক্বীদা রাখা সত্ত্বেও লোকেরা আমাকে 'যামানার মুরজিয়া' (মুরজিয়াতুল 'আসর) বলে তুহমাত (অপবাদ) দেয়া শুরু করেছে- শায়েখ আলবানী। (উর্দু অনুবাদক)
📄 ইস্তিহলালে কুলবী ও ইস্তিহলালে ‘আমালী’র পার্থক্য
যাহোক আসল বক্তব্য হল, এ ব্যাপারে স্পষ্টতা অত্যন্ত জরুরী যে, ফিসকু ও যুলুমের ন্যায় কুফরও দুই ভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ দ্বীন ইসলাম থেকে বহিষ্কারকারী কুফর, ফিসকু ও যুলুম তখনই বিবেচ্য হবে যখন ইস্তিহলালে কূলবী (আন্তরিকভাবে হারামকে হালাল জানা) সংঘটিত হবে। পক্ষান্তরে দ্বীন ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে না এমন কুফর, ফিসকু ও যুলুম তখনই বিবেচ্য হবে যখন ইস্তিহলালে 'আমালী (হারাম কাজে লিপ্ত কিন্তু আন্তরিকভাবে কাজটি হারাম হিসাবে বিবেচনা করা) সংঘটিত হবে।
সুতরাং ঐ সমস্ত গোনাহ যেমন- ইস্তিহলালে 'আমালি রিবা (আমলগতভাবে সুদের হালালকরণ), যা এ যামানায় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে- এ সবই 'আমালী কুফরের উদাহরণ। সুতরাং ঐ গোনাহগারদের কেবল এই পাপ ও ইস্তিহলালে 'আমালী 'র জন্যে কাফির বলা আমাদের জন্য জায়েয নয়। কেননা যা কিছু তাদের অন্তরে লুকায়িত আছে তা আমাদের কাছে এভাবে প্রকাশ পেয়েছে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূল কর্তৃক হারামকৃত বিষয়কে আক্বীদাগত ভাবে হালাল মনে করে না। যদি আমরা জানতে পারি যে, তারা আন্তরিকভাবেই বিরোধিতা করে তখন আমরা তাদের উপর মুরতাদের হুকুম লাগাব। আর যদি তা জানতে না পারি তবে কখনই তাদের প্রতি কুফরের হুকুম লাগানোর হক্কদার নই। কারণ আমরা ভয় করি যে, দুর্ঘটনাক্রমে আমরা যদি নবী *'র নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা দোষী সাব্যস্ত হই। তিনি বলেছেন: إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لأخيه : يَا كَافِرُ ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا ، فَإِنْ كَانَ كَمَا قَالَ وَإِلَّا رَجَعَتْ عَلَيْهِ
"যখন কেউ তার ভাইকে বলে: ইয়া কাফির; তখন যেকোন একজনের উপর অবশ্যই কুফরী পতিত হবে। যাকে কাফির বলা হল যদি সে তা হয়, অন্যথায় এটা সম্বোধনকারীর প্রতিই প্রযোজ্য হয়।"⁵⁹
উক্ত মর্মে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এর পরিপূরক হিসাবে আমি ঐ সাহাবীর ঘটনা উল্লেখ করব, যিনি একটি মুশরিককে পাকড়াও করেন। এমনকি সে ঐ সাহাবীর তলোয়ারের নাগালের মধ্যে চলে আসে। তখন সে মুশরিক চট করে কালেমায়ে শাহাদাত (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَـهَ إِلاَّ اللهُ ) পাঠ করে। ঐ সাহাবী মুশরিকটির কালেমা পাঠের দিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না এবং তাকে কুতল করে দিলেন। যখন ঘটনাটি নবী ﷺ'র কাছে পৌছলো তখন তিনি তাকে কতটা কঠিনভাবে তিরষ্কৃত করলেন তা সবারই জানা আছে। সাহাবী অজুহাত পেশ করলেন যে, সে কেবল প্রাণ বাঁচানোর জন্য কালেমা পড়েছিল। তখন নবী ﷺ বললেন: هَلَا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبه "তুমি কি তার কূলব (অন্তর) চিরে দেখেছিলে?”⁶⁰
সুতরাং কুফরী ই'তিক্বাদী বা আক্বীদাগত কুফরের ভিত্তি কেবল আমলের দ্বারা ঘটে না বরং এর সম্পর্ক অন্তরের সাথে। আর আমি এটা সুস্পষ্টভাবে বলতে পারি না যে, আমরা জানি তারা আন্তরিকভাবেই ফাসেকু, ফাজির বা চোর, সুদখোর প্রভৃতি। যতক্ষণ না তার অন্তরে যা আছে তা মুখ দ্বারা প্রকাশ হয়। যাহোক এর সম্পর্ক আমলের সাথে- যা এটাই সুস্পষ্ট করে যে, সে শরী'আতের আমলগত বিরোধিতা করছে। এ ক্ষেত্রে বলতে পারি, তুমি বিরোধিতা করছ, ফিস্ক-ফুজর করছ। কিন্তু এটা বলা যাবে না, তুমি কাফির হয়ে গেছ বা দ্বীন থেকে মুরতাদ হয়ে গেছ।' কিন্তু তার মধ্যে যদি এমন কিছু আমাদের সামনে প্রকাশ পায় যা আল্লাহ ﷺ'র পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন- তখন মুরতাদের হুকুম প্রযোজ্য হবে।⁶¹ আর তার ব্যাপারে ইসলামের সুস্পষ্ট হুকুম হল যা রসূলুল্লাহ ﷺ'র নিম্নোক্ত হাদীসটিতে এসেছে:
مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ
"যে নিজের দ্বীনকে বদলে ফেলল তাকে হত্যা কর।"⁶²
টিকাঃ
৫৯. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন بَابٌ تَحْرِيمِ قَوْلِهِ لِمُسْلِمٍ : يَا كَافِرُ (ঢাকা: ইসলামিক সেন্টার, অনুচ্ছেদ নং ৩২৬, হাদীস নং ১৭৩২)।
৬০. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) কিতাবুল কিসাস ৭/৩৩০৩ নং। উক্ত মুশরিকের তাৎক্ষণিক উক্ত শাহাদাত ছাড়া অন্য কোন আমল সাহাবীর জানা ছিল না। এরপরও কেবল ঈমানের স্বীকৃতিকেই কেন সাহাবী গ্রহণ করলেন না- এ কারণেই নবী ﷺ তাঁকে তিরস্কৃত করলেন। (বাংলা অনুবাদক)
৬১. শায়েখ আলবানী রহ. বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন: কিছু আমল এমন আছে যা সংঘটিত হলে কুফরে ই'তিক্বাদী'র হুকুম প্রযোজ্য। কেননা তার কুফরটি এতটা সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, তার মৌখিক উপস্থাপনা বিষয়টিকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। যেমন- কুরআন মাজীদ পদদলিত হওয়ার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও এর অপমানের জন্য কাজটি সংঘটিত করা।" -উর্দু অনুবাদক
৬২. সহীহ: সহীহ বুখারী, মিশকাত (এমদা) ৭/৩৩৭৮ নং।
📄 মুরতাদ সম্পর্কীত হুকুমের বাস্তবায়ন
আমি হাকিম/শাসকদের কাফির সম্বোধনকারীদের বলছি, আপনাদের কথানুযায়ী যদি মেনে নিই যে, এই বিচারক/শাসকদের কুফর প্রকৃতপক্ষেই মুরতাদ হওয়ার কুফর। আর এদের উপর আরেকজন উর্ধ্বতন হাকিম/শাসক আছে যার প্রতি ওয়াজিব হল পূর্বোক্ত হাদীসের আলোকে হদ জারি করা। প্রশ্ন হল, আমলী দৃষ্টিতে যদি ধরে নেয়া হয় যে, সমস্ত হাকিম/শাসকরা কাফির মুরতাদ- সেক্ষেত্রে আপনাদের সফলতাটাই বা কি? আপনাদের পক্ষে কি এটা বাস্তবায়ন সম্ভব?
এই কাফিররাই (আপনাদের দাবীনুযায়ী) তো অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রের শাসনকর্তা ও ক্ষমতার অধিকারী। আর এর চেয়ে বেশি আফসোসের বিষয় হল, আমাদের এখানে ইয়াহুদীরা ফিলিস্তিন দখল করে আছে। প্রশ্ন হল, আপনারা বা আমি এর কি পরিবর্তন করতে পারছি? আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি যেসব শাসককে কাফির বলে গণ্য করছে- আপনারা কি তাদের বিরোধিতায় কোন কিছু করার সাহস রাখেন?⁶⁰
এ কারণে এটা কতই না ভাল হত, যদি এ বিষয়টি এক দিকে রেখে দেয়া হয় এবং ঐ সমস্ত ব্যাপারে জোর তৎপরতা চালানো দরকার যার মাধ্যমে একটি সত্যিকারের ইসলামী হুকুমাত কায়েম করা সম্ভব হয়। যা সম্পূর্ণরূপে নবী -এর সুন্নাতের অনুসরণে হবে, যার ব্যাপারে তিনি তাঁর সাহাবীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং যার ভিত্তিতে রীতি ও নীতিমালা নির্ধারণ হয়।
টিকাঃ
৬০. শায়েখ উসায়মীন বলেন: এটা শায়েখ আলবানীর খুব সুন্দর বক্তব্য। যে সমস্ত লোকেরা শাসকদের কাফির বলছে, তারা কি এর দ্বারা কোন সহযোগিতা করতে পারছে? তারা কি ঐ শাসকদের থেকে মুক্ত/পৃথক হতে পারছে? না, তারা সে ক্ষমতা রাখে না। কেননা ইয়াহুদীরা বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে ফিলিস্তিন দখল করে আছে, অথচ সমস্ত উম্মাত- আরব কিংবা অনারব তাদের ঐ দখলদারিত্বের কোন অবসান ঘটাতে পারে নি। তাহলে আমরা কিভাবে ঐ সমস্ত শাসকদের বিরুদ্ধে কথা বলব যারা আমাদের উপর হুকুমাত চালাচ্ছে? অথচ আমরা এটা জানি যে, তাদের আমরা উৎখাত করতে সক্ষম নই। তাছাড়া এটাই অনুমিত হয় যে, আমাদের চেয়ে এ ব্যাপারে যারা অগ্রগামী তারা কেবল খুন, ডাকাতি ও সর্বোচ্চ সুনাম-সম্ভ্রম লুট করা ছাড়া অন্য কোন কার্যকরী ফলাফল আশা করতে পারছে না। অনুরূপভাবে আমরা (এই সব শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করলে) এর চেয়ে আর ভাল কিছু করতে পারব না। সুতরাং এতে কি-ই-বা ফায়েদা আছে? অথচ যদি কোন মুসলিম আন্তরিকভাবে এ আক্বীদা রাখে যা তার ও তার রবের মধ্যকার বিষয়ে ঐ শাসকদের মধ্যে কেউ কেউ এমন যাদের কুফর প্রকৃতপক্ষেই দ্বীন ইসলাম থেকে বের করে দেয়। এরপরও এটা ঘোষণা দিয়ে ও প্রচার করে, এর দ্বারা ফিতনার আগুনে হাওয়া দিয়ে আর কি-ই-বা ফায়দা হতে পারে। এ কারণে শায়েখ আলবানী আলোচ্য উক্তি অত্যন্ত উপকারী।
কিন্তু তাঁর সাথে এ মাসআলায় মতপার্থক্যের অবকাশ আছে যে, তিনি (আলবানী) তাদের প্রতি কুফরের হুকুম লাগান না। তবে কেবলমাত্র তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করেন, যারা আন্তরিকভাবে এটা হালাল হবার আক্বীদা রাখে। এ মাসআলার ব্যাপারে আরো কিছু==
==চিন্তা ও গবেষণার প্রয়োজন আছে। কেননা আমাদের এই বক্তব্য "যে ব্যক্তি আল্লাহ'র হুকুম মোতাবেক ফায়সালা করে, কিন্তু সে এই আক্বীদা রাখে যে, গায়রুল্লাহ'র হুকুম বেশী উপযুক্ত তবে সে কাফির। যদিওবা সে আল্লাহ'র হুকুম মোতাবেক ফায়সালা করে। তার এ কুফর তো আক্বীদাগত (প্রকৃত) কুফর।"
শায়েখ আলবানী এ উক্ত বক্তব্যের ব্যাপারে বলেছেন: আমি তাঁর (শায়েখ উসায়মীনের) বক্তব্যে কোনরূপ মতপার্থক্য দেখছি না। কেননা আমরা তো এটাই বলছি যে, যদি কোন ব্যক্তি বা হাকিম এটা মনে করে যে, অইসলামী আইন ইসলামী আইন থেকে উত্তম- যদিওবা সে আমলগতভাবে ইসলামী আইন অনুযায়ী ফায়সালা করুক না কেন, সে কাফির। সুতরাং প্রমাণিত হল, এ ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নেই। কেননা আসল বিষয় তো যা মানুষের অন্তরে রয়েছে- সেটাই ধর্তব্য (যখন তা প্রকাশ পায়)। কিন্তু আমাদের আলোচনা তো আমল সম্পর্কীত। আর আমার ধারণা এটা অসম্ভব যে, কেউ অইসলামী আইন জারি করল যা দ্বারা আল্লাহ'র বান্দাদের মধ্যে সে ফায়সালা করে, তবে যদি সেটাকে ইস্তিহলাল (বৈধ) করে এবং এই আক্বীদা রাখে যে, এটা শরীয়তী আইনের চেয়ে উত্তম। তবে সুস্পষ্ট কথা হল, সে কাফির। অন্যথা কোন্ জিনিস তাকে সে দিকে ধাবিত করল (যার ফলে সে শরীয়াত বিরোধি ফায়সালা করল)। অবশ্য এ দৃষ্টিভঙ্গি সম্ভব যে, যে বিষয়টি তাকে সে দিকে ধাবিত করল তা হলো- সে এমন কোন শক্তিকে ভয় করছে যে তার চেয়ে অনেক বেশী ক্ষমতাসম্পন্ন। আর সে যদি উক্ত শরীয়াত বিরোধি ফায়সালা জারি না করে তবে তারা তার ব্যাপারে প্রভাব বিস্তারের বা চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করবে। এ পর্যায়ে আমি বলব, তার হুকুম অন্যান্য ঐ সব পাপের হুকুমের মত যেসব ব্যাপারে জবরদস্তি বা চাপের মুখে সংঘটিত আমলের হুকুম প্রযোজ্য। যে বিষয়টি আলোচ্য অনুচ্ছেদের সবচে গুরুত্বপূর্ণ তা হল 'মাসআলায়ে তাকফীর'। যা এই আমল তথা ঐ সমস্ত হাকিম/শাসকের বিরোধিতায় প্রয়োগ করা হচ্ছে- আর এটাই আসল সমস্যা। জি হাঁ, যদি মানুষের কাছে এতটা শক্তি সামর্থ্য থাকে যে, সে প্রত্যেক কাফির হাকিম/শাসককে নির্মূল করতে পারে। তবে আমরা এটাকে স্বাগত জানাই। তবে শর্ত হল, তারা হাদীসে উল্লিখিত শর্ত মোতাবেক পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট কুফর দেখে এবং এ ব্যাপারে আল্লাহ 'র পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই মাসআলাটি কোন নতুন নয় এবং এর বাস্তবায়নও সহজসাধ্য নয়- [শায়েখ আলবানী।
-উর্দু অনুবাদক
📄 বিজয় ও ইক্বামাতে দ্বীনের সহীহ পদ্ধতি
আমি এ সম্পর্কে আরো কয়েকটি স্থানে এ ধরনের প্রত্যেকটি জামা'আতের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য বিষয়ে আলোচনা করেছি। কেবল ইসলামী অঞ্চলগুলোতেই নয়, বরং দুনিয়াব্যাপী সর্বত্র ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন: هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ "তিনি রসূলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও দ্বীনে হক্ব সহকারে, যেন তা সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী হয়- যদিও মুশরিকদের কাছে তা অপছন্দনীয়। "⁶⁴
অনুরূপভাবে কিছু সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আগত দিনগুলোতে দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। এখন এই আয়াতের বাস্তবায়নের জন্যে কি মুসলিম হাকিম/শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার দ্বারাই এই আমলটির সূচনা করতে হবে? যাদের ব্যাপারে তাদের ধারণা, এই কুফর 'মুরতাদ হওয়ার কুফর'-এর চেয়ে কম না। যদিও এ ধারণাটি বাতিল, তবুও তারা কাফির সম্বোধন করার পরও কিছুই করতে পারছে না। ⁶⁶
অনেক যুবকের মনে এ ব্যাপারে সংশয় রয়েছে এবং তারা এ আমলটির বিরোধিতায় খুবই তৎপর। তাদের সংশয় হল, যদি এই সমস্ত হাকিম/শাসক আল্লাহ'র নাযিলকৃত শরিয়াতের পরিবর্তে নিজ রচিত আইন প্রতিষ্ঠা করে- তবে তারা তাদের (শাসকদের) প্রতি মুরতাদ-কাফিরের হুকুম প্রয়োগ করে। এরই ভিত্তিতে তারা বলে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা এর উপর কায়েম থাকবে ততক্ষণ তাদের সাথে ক্বিতাল করা ওয়াজিব। এ পর্যায়ে বাড়াবাড়ি হল, এই যুবকেরা নিজেদের দুর্বলতার দিকে লক্ষ্য করে না। কেননা দুর্বলতার সময় যে সমস্ত খাস হুকুম নাযিল হয়েছিল, তারা আয়াতে সাইফ (সূরা তাওবা- ৫ আয়াত) দ্বারা তা মানসুখ হয়েছে বলে উল্লেখ করে। বর্তমান যামানায় মুসলিমদের দুর্বলতার ক্ষেত্রে এ আমলটি লুট করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যা তারা ইসলামের প্রাথমিক অবস্থাতে করেছিল।
সুতরাং কোন পথ ও পদ্ধতি অবলম্বন করে কুরআনের নিম্নোক্ত হকু পূর্ণাঙ্গরূপে আদায় করা যাবে:
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
"তিনি রসূলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও দ্বীনে হক্ব সহকারে, যেন তা সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী হয়- যদিও মুশরিকদের কাছে তা অপছন্দনীয়।"⁶⁷
নিঃসন্দেহে এর একটিই পদ্ধতি- যা রসূলুল্লাহ নিজের সাহাবীদের বলেছিলেন। তিনি নিজের প্রত্যেক খুতবাতেও বলতেন: وَخَيْرَ الْهَدْي هَدْيٌ مُحَمَّدٍ “সর্বোত্তম হিদায়াত (পথ) হল মুহাম্মাদ'র হিদায়াত।"⁶⁸
এ কারণে সমস্ত মুসলিম এবং কেবল মুসলিম রাষ্ট্রেই নয় বরং দুনিয়াব্যাপী ইসলামী হুকুম কায়েমের সহযোগিতা করা ওয়াজিব। সর্বপ্রথম সেখানে দা'ওয়াতকে প্রসারিত ও শক্তিশালী করবে যেভাবে নবী দা'ওয়াত দেয়া শুরু করেছিলেন। যা সংক্ষেপে আমি দু'টি শব্দে উল্লেখ করে থাকি: التَّصْفِيهُ وَالتَّرْبِيَهُ ))ক) তাসফিয়্যাহ (পবিত্রতা/সংস্কার-সংশোধন) ও (খ) তারবিয়্যাহ (শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ)।]
টিকাঃ
৬৪. সূরা তাওবা- ৩৩ আয়াত।
*. মিকুদাদ ইবনে আসওয়াদ বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: لا يَبْقَى عَلَى ظَهْرِ الْأَرْضِ بَيْتُ مَدَرٍ وَلَا وَبَرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ كَلِمَةَ الْإِسْلَامِ بِعِزٌ عَزِيزٍ وَ ذُلِّ ذَلِيْلٍ إِمَّا يُعَرُّهُمُ اللَّهُ فَيَجْعَلُهُمْ مِّنْ أَهْلِهَا أَوْ يُذِلُّهُمْ فَيَدِينُوْنَ لَهَا قُلْتُ فَيَكُوْنُ الدِّينُ كله الله "যমীনের ওপর কোন মাটির ঘর অথবা পশমের ঘর (তাঁবু) বাকী থাকবে না যাতে আল্লাহ ইসলামের বাণী পৌছে দিবেন না- সম্মানীর ঘরে সম্মানের সাথে এবং অপমানিতের ঘরে অপমানের সাথে। আল্লাহ যাদের সম্মানিত করবেন তাদেরকে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণের উপযুক্ত করে দেবেন। পক্ষান্তরে যাদের অপমানিত করবেন, তারা ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হবে। আমি (মিকদাদ তখন) বললাম: তখন তো গোটা দ্বীনই আল্লাহ'র হবে।” [আহমদ, মিশকাত (এমদা) ১/৩৮; আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (তাহক্বীকুকৃত মিশকাত ১/৪২ নং)-(বাংলা অনুবাদক)]
৬৬. শায়েখ উসায়মীন-কে আলোচ্য সংশয়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়: তিনি (উসায়মীন) এই সংশয়টির যথাযথ জবাবে বলেন: "প্রথমে আমাদের এটা জানা দরকার এই হাকিম/শাসকদের প্রতি মুরতাদের হুকুম প্রযোজ্য কি না?"
এ সম্পর্কে সর্বপ্রথম তাদের দলীলগুলোর অবস্থা জানা জরুরী। যারা বলে থাকে যে- ১. তাদের কথা ও কাজে মুরতাদের হুকুম প্রযোজ্য; ২. কোন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি তা প্রযোজ্য করা, এবং ৩. সর্বোপরি এ দিকে লক্ষ্য রাখা যে, তাদের এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ সংশয় আছে কি না?
অর্থাৎ কোন দলিল দ্বারা প্রমাণ পাওয়া যায় যে, অমৃক কথা বা কাজ কুফর। এর সাথে এমন কোন অর্থ যদি পাওয়া যায় যা উক্ত ব্যক্তির উপর প্রযোজ্য কুফরের সাথে সম্পর্কীত কুফরের অর্থ প্রকাশক। কেননা, অর্থতো বিভিন্নভাবে প্রয়োগ হতে পারে। যেমন- ধারণা, অজ্ঞতা, ভুল বিষয়কে প্রাধান্যদান প্রভৃতি।
যেমন- যদি কোন ব্যক্তি তার পরিবারকে বলে, "আমি যখন মারা যাব তখন আমাকে পুড়িয়ে ফেলবে এবং আমার ছাই ও অবশিষ্টাংশ নদীতে/সমুদ্রে ফেলে দিবে। কেননা যদি আল্লাহ যদি আমাকে পাকড়াও করেন তবে আমাকে এমন আযাব দেবেন, যা দুনিয়ার আর কাউকেই দেবেন না।"[সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম- আবু সাঈদ থেকে বর্ণিত, অনুরূপ আবূ হুরায়রা থেকে মিশকাত (এমদা) ৫/২২৫৯ নং হাদীসটির প্রকাশ্য অর্থ ব্যক্তিটির মধ্যে আল্লাহ'র পরিপূর্ণ কুদরতী ক্ষমতার ব্যাপারে কুফরযুক্ত সন্দেহের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু আল্লাহ যখন তাঁর কুদরতী ক্ষমতায় তাকে সশরীরের জীবিত করে সম্বোধন করলেন, তখন সে ব্যক্তি বলল: مِنْ خَشْيَتِكَ يَا رَبُّ "হে আমরা রব! আমি আপনাকে ভয় পাচ্ছিলাম।" তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। যদিও তার আমলটি বিকৃত চিন্তার ফলাফল ছিল।
অনুরূপ ঐ ব্যক্তির কাহিনিও উল্লেখযোগ্য, যে ব্যক্তি তার হারিয়ে যাওয়া উট পাওয়ার পর মাত্রাতিরিক্ত খুশিতে ভুল করে বলল: اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ "হে আল্লাহ! আপনি আমার বান্দা এবং আমি আপনার রব।" [সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৫/২২২৪ নং নিঃসন্দেহে এটি একটি সুস্পষ্ট আমলী কুফর। কিন্তু এর প্রতি কি চূড়ান্ত তাকফীরের হুকুম প্রযোজ্য? সে তো নিজের বাঁধ ভাঙ্গা খুশিতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে এবং আবেগের মোহে সঠিক বাক্য উচ্চারণের পরিবর্তে ভুল উচ্চারণ করে ফেলে। অর্থাৎ সে তো এটাই বলতে চাচ্ছিল যে, "হে আল্লাহ! আমি তোমার বান্দা এবং তুমি আমার রব।" কিন্তু তার মুখ থেকে ভুলক্রমে বের হল: "হে আল্লাহ! আপনি আমার বান্দা এবং আমি আপনার প্রভু।"
অনুরূপ যে ব্যক্তিকে কুফরের ব্যাপারে বাধ্য করা হয়েছে এবং সে উক্ত জবরদস্তির কারণে কুফরী কালেমা বলে কিংবা কোন কুফরী আমল করে তবে কুরআনের (সূরা নাহাল- ১০৬ আয়াত) দলীলের আলোকে সে কাফির নয়। কেননা তার এ ব্যাপারে আন্তরিক স্বীকৃতি ছিল না।
যাহোক এই সমস্ত হাকিম/শাসক ব্যক্তিগত বিষয় যেমন- বিয়ে, তালাকু, ওয়ারিসী সম্পত্তির ভাগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীস মোতাবেক নিজ নিজ মাযহাবের উপর ফায়সালা করে থাকে। কিন্তু লোকদের মধ্যকার বিভিন্ন লেনদেনের ব্যাপারে যখন ফায়সালা আসে তখন তারা এক্ষেত্রে বিপরীত সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে। কেননা তাদের উলামায়ে সূ' গণ এই বুঝ দিয়েছে যে, নবী বলেছেন: أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِأَمْرِ دُنْيَاكُمْ "তোমরা দুনিয়ার বিষয়ে বেশি জান।" [সহীহ মুসলিম- কিতাবুল ফাযায়েল باب وجوب امتثال : قَالَهُ شَرْعًا دُونَ مَا ذَكَرَهُ - صلى الله عليه وسلم - من معايش الدُّنْيَا عَلَى سَبِيلِ الرَّأْي হা/৬২৭৭, আলবানীর সহীহুল জামে'উস সগীর ওয়া যিয়াদাতাহু ১/১৪৮৮ নং আর এই হুকুমটি 'আম (ব্যাপক) দাবি সম্পন্ন। সুতরাং প্রত্যেক ঐ সমস্ত ব্যাপার যেখানে দুনিয়াবী কর্মকাণ্ড জড়িত সে ব্যাপারে আমরা স্বাধীন। কেননা নবী স্বয়ং বলেছেন: أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِأَمْرِ دُنْيَاكُمْ "তোমরা দুনিয়ার বিষয়ে বেশি জান।"
যদিও এটি একটি সংশয়ের সৃষ্টি করে কিন্তু আমরা দেখি তারা ঐ সমস্ত বিষয়ের বৈধতাকেও স্বীকৃতি দেয়। যেমন- হদ কায়েম না করা, মদ পান প্রভৃতি বিষয়ে তারা ইসলামী শরিয়াতের বিপরীতে অবস্থান করে। এখন যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নিই তবে কিছু ব্যাপারে সংশয়ের বাস্তবতা সঠিক হলেও শেষোক্ত আইনগুলোর ব্যাপারে তাদের ব্যাপারে কোন সংশয় থাকে না। আলোচ্য অভিযোগের শেষাংশে বর্ণিত (দুর্বলতার সময় করণীয়) বিষয়ে বলা যায়: যখন আল্লাহ জিহাদ ফরয হওয়ার পরে বললেন: يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى الْقِتَالِ إِنْ يَكُنْ مِنْكُمْ عِشْرُونَ صَابِرُونَ يَغْلَبُوا مِائَتَيْنِ وَإِنْ يَكُنْ مِنْكُمْ مِنَةٌ يَغْلِبُوا أَلْفًا مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَا يَفْقَهُونَ "হে নবী! আপনি মু'মিনদের ক্বিতালের প্রতি উদ্বুদ্ধ করুন। যদি তোমাদের মধ্যে বিশজন সবরকারী হয় তবে তারা দু'শ এর উপর বিজয়ী হবে। আর যদি তোমাদের মধ্যে একশ জন সবরকারী হয় তারা এক হাজার কাফিরের উপর বিজয়ী হবে। কারণ তারা নির্বোধ লোক।" [সূরা আনফাল- ৬৫ আয়াত]
আয়াতটিতে দশজন কাফিরের মোকাবেলায় একজন মু'মিনকে কুবুল করা হয়। অতঃপর আল্লাহ বলেন: الْآنَ خَفْفَ اللَّهُ عَنْكُمْ وَعَلِمَ أَنْ فِيكُمْ ضَعْفًا فَإِنْ يَكُنْ مِنْكُمْ مِئَةٌ صَابِرَةٌ يَغْلِبُوا مِائَتَيْنِ وَإِنْ يَكُنْ مِنْكُمْ أَلْفَ يَغْلِبُوا أَلْفَيْنِ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ "এখন আল্লাহ তোমাদের থেকে বোঝা হালকা করে দিয়েছেন এবং তোমাদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে বলে জেনেছেন। অতএব যদি তোমাদের মধ্যে একশ জন সবরকারী হয় তবে তারা দু'শ জনের উপর জয় লাভ করবে আর এক হাজার হলে দু' হাজারের উপর জয়লাভ করবে। আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন।" [সূরা আনফাল- ৬৬ আয়াত] অনেক আলেম বলেন উক্ত অবস্থা পরিস্থিতি বিশেষে প্রযোজ্য।
[সংযোজন: ইবনে আব্বাস বলেন: যখন إِنْ يَكُنْ مِنْكُمْ عِشْرُونَ صَابِرُونَ يَغْلِبُوا مَائَتَيْنِ আয়াতটি নাযিল হল, তখন দশ জনের বিপরীতে একজনের পলায়নও নিষিদ্ধ করা হল, তখন এটা মুসলিমদের উপর দুঃসাধ্য মনে হলে পরে তা লাঘবের বিধান এলো إِنَّ خَفِّفَ اللهُ عَنْكُمْ وَعَلِمَ أَنَّ فِيكُمْ ضَعْفًا فَإِنْ يَكُنْ مِنْكُمْ مِئَةٌ صَابِرَةٌ يَغْلِبُوا مِائَتَيْنِ فَلَمَّا خَفِّفَ اللهُ عَنْهُمْ مِنَ الْعِدَّةِ نَقْصٌ مِنَ الصَّبْرِ بِقَدْرِ مَا خَفَفَ عَنْهُمْ "আল্লাহ তাদেরকে সংখ্যার দিকে থেকে যখন হাল্কা করে দিলেন তাদের সবরের ত্রুটির কারণে, সেই পরিমাণে তাদের সবরও হ্রাস পেল।" (সহীহ বুখারী- কিতাবুত তাফসীর, সূরা আনফال)
সাওবান বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: يُوشِكُ الْاُمَمُ أَنْ تَدَاعِي عَلَيْكُمْ كَمَا تَدَاعَى الْأَكَلَةُ إِلَى قَصْعَتِهَا، فَقَالَ قَائِلٌ : وَمِنْ قِلَّةٍ نَحْنُ يَوْمَئِذٍ؟ قَالَ بَلْ أَنْتُمْ يَوْمَئِذٍ كَثِيرٌ، وَلَكِنَّكُمْ غُثَاءُ كَغُثَاءِ السَّيْلِ، وَلَيَنْزِعَنَّ اللهُ مِنْ صُدُورِ عَدُوِّكُمُ الْمَهَابَةَ مِنْكُمْ، وَلَيَقْذِفَنَّ فِي قُلُوبِكُمُ الْوَهَنَ. قَالَ قَائِلٌ : يَا رَسُولَ اللهِ! وَمَا الْوَهْنُ؟ قَالَ : حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَاهِيَّةُ الْمَوْتِ –
"অচিরেই বিশ্বের অন্যান্য জাতি তোমাদের ওপর হামলার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে যেমন লোভী পেটুকেরা খাবার পাত্রে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তখন জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে কি এমনটি হবে? তিনি বললেন, না। বরং সে সময় তোমরা সংখ্যায় অধিক সংখ্যক হবে কিন্তু তোমাদের অবস্থা হবে খড়-কুটার মত।। আল্লাহ তোমাদের দুশমনের অন্তর থেকে তোমাদের প্রভাব প্রতিপত্তি দূর করে দিবেন এবং তোমাদের অন্তরে অলসতার সৃষ্টি হয়ে যাবে। তখন জনৈক সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রসূল! অলসতার সৃষ্টি হবে কেন? তিনি বললেন, দুনিয়ার প্রতি মহব্বত আর মৃত্যুকে অপছন্দ (ভয়) করার কারণে।" [আবু দাউদ, মিশকাত ৯/৫১৩৭; আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন- আলবানীর মিশকাত ৩/১৪৭৫ পৃঃ]
হাসান বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ 'র একজন সাহাবী আয়েয ইবনে আমর একবার উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের কাছে গেলেন। তখন তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন, বৎস! আমি রসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি: إِنَّ شَرَّ الرِّعَاءِ الْحُطَمَةَ "কৃষ্টতম রাখাল হচ্ছে অত্যাচারী শাসক।" সুতরাং তুমি তাদের অন্তর্ভূক্ত হওয়া থেকে সাবধান থাকবে। তখন সে বলল: বসে পড়! তুমি হচ্ছ নবী'র সাহাবীদের ভূষি স্বরূপ। জবাবে তিনি বললেন: وَهَلْ كَانَتْ لَهُمْ نُخَالَةٌ إِنَّمَا كَانَتِ النُّخَالَةُ بَعْدَهُمْ وَفِي غَيْرِهِمْ
“তাঁদের মধ্যেও কি ভূষি আছে? ভূষি তো তাদের পরবর্তীদের এবং অন্যান্যদের মধ্যে।” [সহীহ মুসলিম- কিতাবুল ইমারাত بَابُ فَضِيلَةِ الْإِمَامِ الْعَادِلِ وَعُقُوبَةُ الْجَائِرِ : )ইফা( ৬/৪৫৮০ নং।
মিরদাস আসলামী বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: يَذْهَبُ الصَّالِحُوْنَ الْأَوَّلُ فَالْأَوَّلُ وَتَبْقَى حُفَالَةٌ كَحُفَالَةِ الشَّعِيْرِ أَوِ التَّمَرِ لَا يُبَالِيْهِمُ اللَّهُ بالة
“ভাল ও নেককার লোকেরা (পর্যায়েক্রমে) একের পর এক চলে যাবে। অতঃপর অবশিষ্টরা যব অথবা খেজুরের নিকৃষ্ট চিটার ন্যায় থেকে যাবে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ করবেন না।” [সহীহ বুখারী, মিশকাত ৯/৫১৩০]
সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস থেকে বলেন, আমি রসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি: إِنَّ الْأَيْمَانَ بَدَا غَرِيبًا وَسَيَعُوْدُ كَمَا بَدَا فَطُوبَى يَوْمَئِذٍ لِلْغُرَبَاءِ إِذَا فَسَدَ الزَّمَانُ وَالَّذِي نَفْسٌ أَبِي الْقَاسِمُ بَدِهِ لَبَارِزَنَ الْإِيْمَانُ بَيْنَ هَذَيْنِ الْمَسْجِدَيْنِ كَمَا تَازُ الْحَيَّةُ فِي جُحْرِهَا
“নিশ্চয় ঈমান উৎপত্তি লাভ করেছে গরীব (পরবাসী/দুর্বল) অবস্থায় এবং তা অচিরেই প্রত্যাবর্তন করবে সেই অবস্থায়, যে অবস্থায় উৎপত্তি লাভ করেছিল। সুতরাং মোবারকবাদ ঐ দিন সেইসব গরীবদের জন্য, যখন ফাসাদের যামানা হবে। যাঁর হাতে আবুল কাসিমের জীবন! সেই সত্তার কুসম! ঈমান এই দুই মাসজিদের মধ্যবর্তী স্থানে প্রবেশ করবে, সর্প যেমন তার গর্তে প্রবেশ করে থাকে।” [সহীহ মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ (ইফা) ১/৯৯ নং (বাংলা অনুবাদক)]
তাছাড়া আমাদের কাছে এই দুর্বলতার সমর্থনে দলিল মজুদ রয়েছে যা এর সুস্পষ্টতা ও ব্যাপকতা ব্যক্ত করে। যেমন আল্লাহ বলেন: لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا “আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না” (সূরা বাক্বারাহ: ২৮৬ আয়াত)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন : فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ “সুতরাং আল্লাহকে সাধ্যমত ভয় কর” (সূরা তাগাবুন: ১৬ আয়াত)।
যদি আমরা তর্কের খাতিরে মেনে নিই যে, আলেম-উলামাদের বর্ণিত শর্তের আলোকে এই সমস্ত হাকিম/শাসকদের উৎখাত করা ওয়াজিব। তবুও সেক্ষেত্রে এটা আমাদের প্রতি ওয়াজিব হয় না। কেননা তাদের পতন ঘটানোর মত শক্তি-সামর্থ্য আমাদের নেই। বিষয়টি যদিও সুস্পষ্ট, এরপরও মানুষ নাফস অসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) যুক্ত”- শায়েখ উসায়মীন। [উর্দু অনুবাদক]
৬৭. সূরা তাওবা- ৩৩ আয়াত।
৬৮. সহীহ: সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ১/১৩৪ নং।