📄 কুফরে আমালী ও কুফরে ই’তিক্বাদী
মুসলিম কর্তৃক মুসলিমের সাথে ক্বিতাল করা বর্বরতা, চরমপন্থা, ফিসকু ও কুফর। কিন্তু এই ব্যাখ্যাসহ যে, কখনো তা কুফরে আমালী (আমলগত কুফর) আবার কখনো কুফরে ই'তিক্বাদী (আক্বীদা/বিশ্বাসগত কুফর)। এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু উক্ত সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ দু'টির মধ্যেই রয়েছে। যার ব্যাখ্যা (ইবনে আব্বাস - এর পরে) সত্যিকারের ইমাম শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ এবং তাঁর একনিষ্ঠ ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-যাওজি করেছেন। কেননা তারা কুরআনের অর্থে কুফরের এই দু' ধরনের বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ ও তাঁর ছাত্র হাফেয ইবনে কাইয়েম তাঁদের আলোচনার মধ্যে সব সময় 'কুফরী আমালী' ও 'কুফরে ইতি'ক্বাদী'-এর বিবরণ দিয়েছেন। কেননা, যদি এই পার্থক্যের দিকে লক্ষ্য রাখা না হয়, তবে মুসলিমরা অজ্ঞতাবশতঃ মুসলিম জামা'আত থেকে খারিজ হয়ে ঐ ফিতনার মধ্যে নিমজ্জিত হবে যার মধ্যে প্রাচীন যামানাতে খারেজীরা পতিত হয়েছিল। অতঃপর বর্তমান যামানাতেও কিছু লোক এ ফিতনার মধ্যে পড়েছে।
সুতরাং প্রকৃতপক্ষে 'قتاله کفر' এর অর্থ দ্বীন ইসলাম থেকে খারিজ হওয়া নয়। এ মর্মে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে যা একত্রিত করলে একটি অত্যন্ত উপকারী কিতাব হত। কিন্তু এটা তাদের কাছে দলিল হিসাবে গ্রহণযোগ্য হবে না যারা আলোচ্য আয়াতের তাফসীরটি কেবল 'কুফরে ই'তিক্বাদী' অর্থে গ্রহণ করে থাকে। অথচ প্রকৃত সত্য হল, এর স্বপক্ষে এত অধিক সংখ্যক দলিল রয়েছে যেখানে 'لكفر.' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এর দাবি কখনই এটা নয় যে, সম্পূর্ণ ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়া। এই মুহূর্তে আমাদের এই দলিলটিই খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট যে, এক মুসলিম অপর মুসলিমকে হত্যা করা 'কুফরে আমালী' এবং কখনই এটা 'কুফরে ই'তিক্বাদী' (আক্বীদাগত কুফর) নয়। ⁵⁵
টিকাঃ
৫৫. এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ থেকে সুস্পষ্ট হাদীসও আছে। উবাদা ইবনে সামিত বলেছেন
كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي مَجْلِسٍ فَقَالَ تُبَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا تَزْنُوا وَلَا تَسْرِقُوا وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ وَمَنْ أَصَابَ شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ فَعُوقِبَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ أَصَابَ شَيْئًا مِنْ ذلكَ فَسَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ إِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ وَإِنْ شَاءَ عَذْبَهُ.
"আমরা কোন বৈঠকে রসূলুল্লাহ এর সঙ্গে বসেছিলাম। তখন তিনি বললেন: তোমরা আমার কাছে এ বলে বায়য়াত গ্রহণ কর যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবেনা, যিনা করবে, চুরি করবে না এবং কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। কিন্তু ন্যায়সঙ্গতভাবে (অর্থাৎ কিসাসের কারণে)। অতএব, তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ তা পূর্ণ করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাবে। আর যদি কেউ উক্ত অপরাধের কোন একটিতে পতিত হয়ে শাস্তি ভোগ করে, তবে তাই তার জন্য কাফফারা হয়ে যাবে। আর যদি কোন ব্যক্তি উল্লিখিত অপরাধের কোন একটিতে পতিত হয় অতঃপর আল্লাহ তা গোপন রাখেন, তবে বিষয়টি মহান আল্লাহ'র এখতিয়ারে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তিও দিতে পারেন।" [সহীহ মুসলিম- কিতাবুল হুদুদ إِبَابُ الْخُدُودِ كَفَّارَاتُ لِأَهْلِهَا অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে: উবাদা বলেন: আমরা এ সকল কথার উপর তাঁর হাতে বায়য়াত করলাম।" [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ১/১৭ নং] [-বাংলা অনুবাদক]
📄 হাকিম ও মাহকূম (প্রজা/শাসিত)-এর প্রতি তাকফীর
এখন আমি জামা'আতুত তাকফীর ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তথা শাসক, অধীনস্থ সাধারণ জনগণ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পর্কে আলোচনা করব যারা ঐ হুকুমাতের অধীনে কাজ ও চাকরি করার কারণে তাকফীরের শিকার হচ্ছেন। ⁵⁶ অর্থাৎ তাদের অধীনতার পাপের কারণে কাফির বলা হচ্ছে। ⁵⁷
আমি আলোচ্য কথাগুলো আমার কাছে প্রশ্নকারী ভাইদের কাছ থেকে পেয়েছি যারা পূর্বে জামা'আতুত তাকফীরের অন্তর্ভূক্ত ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাদের হিদায়াত দিয়েছেন। আমি তাদের কাছে জানতে চাই, আপনারা অনেক হাকিম (শাসক)-কে কাফির গণ্য করেন। কিন্তু আপনারা ইমাম, খতীব, মুয়াজ্জিন ও মাসজিদের খাদেমদেরকেও তাকফীর কেন করেন? এমনকি আপনারা ইলমে শরী'আতের উস্তাদ যারা বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান করছেন তাদের প্রতিও তাকফীর করেন!!
তারা উত্তরে এটাই বলেন যে, কেননা এই লোকেরা ঐ হাকিম (শাসক) ও তাদের শাসনতন্ত্রের প্রতি রাযী, অথচ তা আল্লাহ'র নাযিলকৃত শরী'আতের বিরোধি।
আমি তাদের বলি: যদি এই রাযী বা সন্তুষ্টি আন্তরিকভাবে হয়ে থাকে তবে তো এই আমালী কুফর প্রকৃতপক্ষে ই'তিক্বাদী কুফরে পরিণত হয়। সুতরাং যদি কোন হাকিম (শাসক/বিচারক) আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক ফায়সালা না করে এবং এটা মনে করে যে, এই হুকুম বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশি উপযোগী। পক্ষান্তরে কুরআন ও সুন্নাতের বিধি-বিধান বর্তমান যামানার জন্য উপযোগী নয়, তবে নিঃসন্দেহে তার এই কুফর- কুফরে ই'তিক্বাদী এবং কখনই তা কুফরে 'আমালী নয়। আর কেউ যদি এই ধারণার প্রতি রাযী বা সন্তুষ্ট থাকে তবে সে কাফির।⁵⁸
কিন্তু আপনারা যে সমস্ত শাসক পশ্চিমা আইন দ্বারা কম বা বেশি বিধান জারি করছে- তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা কখনই এটা বলবে না যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আইন দ্বারা শাসন চালানো জরুরী এবং ইসলাম অনুযায়ী শাসন চালান জায়েয নয়। বরং তারা এভাবেও বলবে না যে, আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী শাসন চালানোর সম্ভব হচ্ছে না। কেননা এটা বললে তারা নিঃসন্দেহে কাফির হয়ে যাবে।
এখন আমি যদি শাসিত প্রজাসাধারণ- যার মধ্যে উলামা ও নেককার ব্যক্তিগণ রয়েছেন তাদের প্রসঙ্গে আসি, সেক্ষেত্রেও বলব যে, আপনারা কেন তাদের প্রতি তাকফির করছেন? সম্ভবত এই কারণে যে, তারা ঐ হুকুমাতের অধীনে জীবন-যাপন করছে। অথচ ঐ হুকুমাতের অধীনে জীবন-যাপনের ব্যাপারে আপনারাও (জামা'আতুত তাকফীর) হুবহু তাদেরই মত। পার্থক্য এতটুকু যে, আপনারা শাসকদের কাফির ঘোষণা করছেন। পক্ষান্তরে আলেমগণ এটা বলছেন না যে, তারা দ্বীনের থেকে মুরতাদ হয়ে গেছে। বরং তারা বলেন: আল্লাহ'র নাযিলকৃত শরী'আত দ্বারা শাসন চালান ওয়াজিব এবং আমলগত কারণে কোনটির বিরোধিতার জন্য এটা জরুরী নয় যে, সেই আলেম বা হাকিম/শাসক দ্বীন ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হবে।
সংশয়: একবার বা কয়েকবার আল্লাহ শু'র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম জারি না করলে কাফির হয় না। কিন্তু বারবার বা সবসময় আল্লাহ'র বিধানের বিরোধি হুকুম জারি করলে কাফির হয়ে যায়।
বিতর্ককারীদের মধ্যে যাদের গোমরাহী ও ভুল-ত্রুটিগুলো সুস্পষ্ট হয়েছে, আমি তাদের একটি পক্ষকে জিজ্ঞাসা করি : আমরা কখন একজন কালেমায়ে শাহাদাতের (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ الله ) দাবীদার যারা সালাতও আদায় করে তাদের দ্বীন থেকে মুরতাদ হিসাবে গণ্য করব?
মূলতঃ এ ব্যাপারে তাদের দৃষ্টি একটি দিকে থাকবে। আর তা হল- আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা না করাই দ্বীন থেকে মুরতাদ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। যদিও এই তাকফীরকারীরা নিজের মুখ থেকে এই জবাব দিবে না- তবে মূলত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এটাই।
এই প্রশ্ন তাদের সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয় এবং তাদের থেকে কোন জবাব পাওয়া যায় না। তখন আমি তাদের নিম্নোক্ত উদাহরণটি উপস্থাপন করি যা তাদের নির্বাক করে দেয়। যেমন আমি তাদের বলেছি- "একজন হাকিম (শাসক/বিচারক) তিনি শরী'আত মোতাবেক ফায়সালা করবেন এবং এটাই তার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কোন একটি ফায়সালাতে তিনি বিচ্যুত হয়ে শরী'আত বিরোধি ফায়সালা দেন- অর্থাৎ কোন যালিমকে হকু দিয়ে দিলেন এবং মাযলুমকে বঞ্চিত করলেন। বলুন তো- এটা কি ‘হুকুম বিগয়রি মা-আনঝালাল্লাহ’ নয়?
আপনারা কি বলবেন সে কুফর তথা মুরতাদ হওয়ার কুফর করেছে?”
তারা জবাব দিল: না।
আমি বললাম: কেন না, সে তো আল্লাহ’র শরী’আতের বিরোধিতা করেছে।
তারা জবাব দিল: এটা তো কেবল একবার সংঘটিত হয়েছে।
আমি বললাম: খুব ভাল। যদি এই হাকিম দ্বারা দ্বিতীয়বার শরী’আতের বিরোধিতা হয়, কিংবা ভিন্ন কোন ব্যাপারে সংঘটিত হয় যা শরী’আতের বিরোধি- তাহলে সে কি কাফির হবে?
আমি তিন-চার বার তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, কখন তাকে কাফির বলব? তারা এর কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করতে পারল না যে, কতবার শরী’আতের খেলাফ হলে সে কাফির বলে গণ্য হবে।
যখন আমি উক্ত বক্তব্যটি ভিন্নভাবে বললাম: যদি আপনারা এটা মনে করেন যে, সে একটি শরী’আত বিরোধি হুকুমকে উত্তম হিসাবে অব্যাহত রাখে এবং ইসলামী হুকুমের অবমাননা প্রকাশ করে, সেক্ষেত্রে আপনারা তার প্রতি মুরতাদের হুকুম লাগাতে পারেন। যখন অন্যক্ষেত্রে আপনারা তাকে শরী’আতের বিরোধি ফায়সালা করতে দেখবেন তখন জিজ্ঞাসা করবেন- হে শায়েখ! আপনি কেন আল্লাহ’র নাযিলকৃত বিধানের বিরোধি ফায়সালা করছেন? সে তখন কুসম করে বলবে- “আমি ভয়ে এটা করেছি বা নিজের প্রাণের হুমকি ছিল, কিংবা আমি ঘুষ নিয়েছে প্রভৃতি।” শেষোক্ত অজুহাতটি পূর্বের দু’টি থেকেও নিকৃষ্ট। এরপরেও আপনারা এটা বলতে পারেন না যে, সে কাফির- যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজেই ঘোষণা দেয়। অর্থাৎ নিজের অন্তরের গোপন কুফর প্রকাশ করে, তথা যখন আল্লাহ’র নাযিলকৃত হুকুম মোতাবেক ফায়সালা করা জায়েয নয় বলে মানে- কেবল তখনই আপনারা বলতে পারেন সে মুরতাদ-কাফির।
টিকাঃ
৫৬. সাহাবী আবূ সাঈদ ও আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন لَيَاتِينَ عَلَيْكُمْ أَمْرَاء يُقَرِّبُوْنَ شِرَارَ النَّاسِ وَيُؤَخِّرُونَ الصَّلَاةَ عَنْ مَوَاقِيتِهَا فَمَنْ أَدْرَكَ ذَلِكَ مِنكُمْ فَلَا يَكُونَنَّ عَرْيفًا وَلَا شَرْطِيًّا وَلَا جَابِيًّا وَلَا خَازِنًا
"অদূর ভবিষ্যতে অবশ্যই তোমাদের উপর এমন আমীর (শাসক) হবে, যারা সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট লোকদের নিজের কাছে টেনে নেবে এবং তারা সালাতের ওয়াক্ত গড়িয়ে যাওয়ার পর তা আদায় করবে। এই সময় তোমাদের কেউ জীবিত থাকলে সে যেন তত্ত্বাবধায়ক, পুলিশ, যাকাতের সম্পদ আদায়কারী ও খাজাঞ্চী নিযুক্ত না হয়।" [সহীহ ইবনে হিব্বান, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব (ইফা) ১/৫৫৭ পৃঃ; হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন ইমাম হায়সামী (মুজমু'আয়ায়ে যাওয়ায়েদ ৫/৯২২৫ নং), হুসাইন সালীম আসাদ (তাহক্বীক্বকৃত মুসনাদে আবী ইয়ালা ২/১১১৫ নং) ও মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (আস-সাহীহাহ ১/৩৬০ নং)। [বাংলা অনুবাদক)
৫৭. আমরা আল্লাহর কাছে (মুসলিমদেরকে তাকফির করার ব্যাপারে) ক্ষমা চাচ্ছি - শায়েখ উসায়মীন। [উর্দু অনুবাদক]
৫৮. এই আক্বীদা রাখা সত্ত্বেও লোকেরা আমাকে 'যামানার মুরজিয়া' (মুরজিয়াতুল 'আসর) বলে তুহমাত (অপবাদ) দেয়া শুরু করেছে- শায়েখ আলবানী। (উর্দু অনুবাদক)
📄 ইস্তিহলালে কুলবী ও ইস্তিহলালে ‘আমালী’র পার্থক্য
যাহোক আসল বক্তব্য হল, এ ব্যাপারে স্পষ্টতা অত্যন্ত জরুরী যে, ফিসকু ও যুলুমের ন্যায় কুফরও দুই ভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ দ্বীন ইসলাম থেকে বহিষ্কারকারী কুফর, ফিসকু ও যুলুম তখনই বিবেচ্য হবে যখন ইস্তিহলালে কূলবী (আন্তরিকভাবে হারামকে হালাল জানা) সংঘটিত হবে। পক্ষান্তরে দ্বীন ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে না এমন কুফর, ফিসকু ও যুলুম তখনই বিবেচ্য হবে যখন ইস্তিহলালে 'আমালী (হারাম কাজে লিপ্ত কিন্তু আন্তরিকভাবে কাজটি হারাম হিসাবে বিবেচনা করা) সংঘটিত হবে।
সুতরাং ঐ সমস্ত গোনাহ যেমন- ইস্তিহলালে 'আমালি রিবা (আমলগতভাবে সুদের হালালকরণ), যা এ যামানায় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে- এ সবই 'আমালী কুফরের উদাহরণ। সুতরাং ঐ গোনাহগারদের কেবল এই পাপ ও ইস্তিহলালে 'আমালী 'র জন্যে কাফির বলা আমাদের জন্য জায়েয নয়। কেননা যা কিছু তাদের অন্তরে লুকায়িত আছে তা আমাদের কাছে এভাবে প্রকাশ পেয়েছে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূল কর্তৃক হারামকৃত বিষয়কে আক্বীদাগত ভাবে হালাল মনে করে না। যদি আমরা জানতে পারি যে, তারা আন্তরিকভাবেই বিরোধিতা করে তখন আমরা তাদের উপর মুরতাদের হুকুম লাগাব। আর যদি তা জানতে না পারি তবে কখনই তাদের প্রতি কুফরের হুকুম লাগানোর হক্কদার নই। কারণ আমরা ভয় করি যে, দুর্ঘটনাক্রমে আমরা যদি নবী *'র নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা দোষী সাব্যস্ত হই। তিনি বলেছেন: إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لأخيه : يَا كَافِرُ ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا ، فَإِنْ كَانَ كَمَا قَالَ وَإِلَّا رَجَعَتْ عَلَيْهِ
"যখন কেউ তার ভাইকে বলে: ইয়া কাফির; তখন যেকোন একজনের উপর অবশ্যই কুফরী পতিত হবে। যাকে কাফির বলা হল যদি সে তা হয়, অন্যথায় এটা সম্বোধনকারীর প্রতিই প্রযোজ্য হয়।"⁵⁹
উক্ত মর্মে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এর পরিপূরক হিসাবে আমি ঐ সাহাবীর ঘটনা উল্লেখ করব, যিনি একটি মুশরিককে পাকড়াও করেন। এমনকি সে ঐ সাহাবীর তলোয়ারের নাগালের মধ্যে চলে আসে। তখন সে মুশরিক চট করে কালেমায়ে শাহাদাত (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَـهَ إِلاَّ اللهُ ) পাঠ করে। ঐ সাহাবী মুশরিকটির কালেমা পাঠের দিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না এবং তাকে কুতল করে দিলেন। যখন ঘটনাটি নবী ﷺ'র কাছে পৌছলো তখন তিনি তাকে কতটা কঠিনভাবে তিরষ্কৃত করলেন তা সবারই জানা আছে। সাহাবী অজুহাত পেশ করলেন যে, সে কেবল প্রাণ বাঁচানোর জন্য কালেমা পড়েছিল। তখন নবী ﷺ বললেন: هَلَا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبه "তুমি কি তার কূলব (অন্তর) চিরে দেখেছিলে?”⁶⁰
সুতরাং কুফরী ই'তিক্বাদী বা আক্বীদাগত কুফরের ভিত্তি কেবল আমলের দ্বারা ঘটে না বরং এর সম্পর্ক অন্তরের সাথে। আর আমি এটা সুস্পষ্টভাবে বলতে পারি না যে, আমরা জানি তারা আন্তরিকভাবেই ফাসেকু, ফাজির বা চোর, সুদখোর প্রভৃতি। যতক্ষণ না তার অন্তরে যা আছে তা মুখ দ্বারা প্রকাশ হয়। যাহোক এর সম্পর্ক আমলের সাথে- যা এটাই সুস্পষ্ট করে যে, সে শরী'আতের আমলগত বিরোধিতা করছে। এ ক্ষেত্রে বলতে পারি, তুমি বিরোধিতা করছ, ফিস্ক-ফুজর করছ। কিন্তু এটা বলা যাবে না, তুমি কাফির হয়ে গেছ বা দ্বীন থেকে মুরতাদ হয়ে গেছ।' কিন্তু তার মধ্যে যদি এমন কিছু আমাদের সামনে প্রকাশ পায় যা আল্লাহ ﷺ'র পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন- তখন মুরতাদের হুকুম প্রযোজ্য হবে।⁶¹ আর তার ব্যাপারে ইসলামের সুস্পষ্ট হুকুম হল যা রসূলুল্লাহ ﷺ'র নিম্নোক্ত হাদীসটিতে এসেছে:
مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ
"যে নিজের দ্বীনকে বদলে ফেলল তাকে হত্যা কর।"⁶²
টিকাঃ
৫৯. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন بَابٌ تَحْرِيمِ قَوْلِهِ لِمُسْلِمٍ : يَا كَافِرُ (ঢাকা: ইসলামিক সেন্টার, অনুচ্ছেদ নং ৩২৬, হাদীস নং ১৭৩২)।
৬০. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) কিতাবুল কিসাস ৭/৩৩০৩ নং। উক্ত মুশরিকের তাৎক্ষণিক উক্ত শাহাদাত ছাড়া অন্য কোন আমল সাহাবীর জানা ছিল না। এরপরও কেবল ঈমানের স্বীকৃতিকেই কেন সাহাবী গ্রহণ করলেন না- এ কারণেই নবী ﷺ তাঁকে তিরস্কৃত করলেন। (বাংলা অনুবাদক)
৬১. শায়েখ আলবানী রহ. বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন: কিছু আমল এমন আছে যা সংঘটিত হলে কুফরে ই'তিক্বাদী'র হুকুম প্রযোজ্য। কেননা তার কুফরটি এতটা সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, তার মৌখিক উপস্থাপনা বিষয়টিকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। যেমন- কুরআন মাজীদ পদদলিত হওয়ার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও এর অপমানের জন্য কাজটি সংঘটিত করা।" -উর্দু অনুবাদক
৬২. সহীহ: সহীহ বুখারী, মিশকাত (এমদা) ৭/৩৩৭৮ নং।
📄 মুরতাদ সম্পর্কীত হুকুমের বাস্তবায়ন
আমি হাকিম/শাসকদের কাফির সম্বোধনকারীদের বলছি, আপনাদের কথানুযায়ী যদি মেনে নিই যে, এই বিচারক/শাসকদের কুফর প্রকৃতপক্ষেই মুরতাদ হওয়ার কুফর। আর এদের উপর আরেকজন উর্ধ্বতন হাকিম/শাসক আছে যার প্রতি ওয়াজিব হল পূর্বোক্ত হাদীসের আলোকে হদ জারি করা। প্রশ্ন হল, আমলী দৃষ্টিতে যদি ধরে নেয়া হয় যে, সমস্ত হাকিম/শাসকরা কাফির মুরতাদ- সেক্ষেত্রে আপনাদের সফলতাটাই বা কি? আপনাদের পক্ষে কি এটা বাস্তবায়ন সম্ভব?
এই কাফিররাই (আপনাদের দাবীনুযায়ী) তো অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রের শাসনকর্তা ও ক্ষমতার অধিকারী। আর এর চেয়ে বেশি আফসোসের বিষয় হল, আমাদের এখানে ইয়াহুদীরা ফিলিস্তিন দখল করে আছে। প্রশ্ন হল, আপনারা বা আমি এর কি পরিবর্তন করতে পারছি? আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি যেসব শাসককে কাফির বলে গণ্য করছে- আপনারা কি তাদের বিরোধিতায় কোন কিছু করার সাহস রাখেন?⁶⁰
এ কারণে এটা কতই না ভাল হত, যদি এ বিষয়টি এক দিকে রেখে দেয়া হয় এবং ঐ সমস্ত ব্যাপারে জোর তৎপরতা চালানো দরকার যার মাধ্যমে একটি সত্যিকারের ইসলামী হুকুমাত কায়েম করা সম্ভব হয়। যা সম্পূর্ণরূপে নবী -এর সুন্নাতের অনুসরণে হবে, যার ব্যাপারে তিনি তাঁর সাহাবীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং যার ভিত্তিতে রীতি ও নীতিমালা নির্ধারণ হয়।
টিকাঃ
৬০. শায়েখ উসায়মীন বলেন: এটা শায়েখ আলবানীর খুব সুন্দর বক্তব্য। যে সমস্ত লোকেরা শাসকদের কাফির বলছে, তারা কি এর দ্বারা কোন সহযোগিতা করতে পারছে? তারা কি ঐ শাসকদের থেকে মুক্ত/পৃথক হতে পারছে? না, তারা সে ক্ষমতা রাখে না। কেননা ইয়াহুদীরা বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে ফিলিস্তিন দখল করে আছে, অথচ সমস্ত উম্মাত- আরব কিংবা অনারব তাদের ঐ দখলদারিত্বের কোন অবসান ঘটাতে পারে নি। তাহলে আমরা কিভাবে ঐ সমস্ত শাসকদের বিরুদ্ধে কথা বলব যারা আমাদের উপর হুকুমাত চালাচ্ছে? অথচ আমরা এটা জানি যে, তাদের আমরা উৎখাত করতে সক্ষম নই। তাছাড়া এটাই অনুমিত হয় যে, আমাদের চেয়ে এ ব্যাপারে যারা অগ্রগামী তারা কেবল খুন, ডাকাতি ও সর্বোচ্চ সুনাম-সম্ভ্রম লুট করা ছাড়া অন্য কোন কার্যকরী ফলাফল আশা করতে পারছে না। অনুরূপভাবে আমরা (এই সব শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করলে) এর চেয়ে আর ভাল কিছু করতে পারব না। সুতরাং এতে কি-ই-বা ফায়েদা আছে? অথচ যদি কোন মুসলিম আন্তরিকভাবে এ আক্বীদা রাখে যা তার ও তার রবের মধ্যকার বিষয়ে ঐ শাসকদের মধ্যে কেউ কেউ এমন যাদের কুফর প্রকৃতপক্ষেই দ্বীন ইসলাম থেকে বের করে দেয়। এরপরও এটা ঘোষণা দিয়ে ও প্রচার করে, এর দ্বারা ফিতনার আগুনে হাওয়া দিয়ে আর কি-ই-বা ফায়দা হতে পারে। এ কারণে শায়েখ আলবানী আলোচ্য উক্তি অত্যন্ত উপকারী।
কিন্তু তাঁর সাথে এ মাসআলায় মতপার্থক্যের অবকাশ আছে যে, তিনি (আলবানী) তাদের প্রতি কুফরের হুকুম লাগান না। তবে কেবলমাত্র তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করেন, যারা আন্তরিকভাবে এটা হালাল হবার আক্বীদা রাখে। এ মাসআলার ব্যাপারে আরো কিছু==
==চিন্তা ও গবেষণার প্রয়োজন আছে। কেননা আমাদের এই বক্তব্য "যে ব্যক্তি আল্লাহ'র হুকুম মোতাবেক ফায়সালা করে, কিন্তু সে এই আক্বীদা রাখে যে, গায়রুল্লাহ'র হুকুম বেশী উপযুক্ত তবে সে কাফির। যদিওবা সে আল্লাহ'র হুকুম মোতাবেক ফায়সালা করে। তার এ কুফর তো আক্বীদাগত (প্রকৃত) কুফর।"
শায়েখ আলবানী এ উক্ত বক্তব্যের ব্যাপারে বলেছেন: আমি তাঁর (শায়েখ উসায়মীনের) বক্তব্যে কোনরূপ মতপার্থক্য দেখছি না। কেননা আমরা তো এটাই বলছি যে, যদি কোন ব্যক্তি বা হাকিম এটা মনে করে যে, অইসলামী আইন ইসলামী আইন থেকে উত্তম- যদিওবা সে আমলগতভাবে ইসলামী আইন অনুযায়ী ফায়সালা করুক না কেন, সে কাফির। সুতরাং প্রমাণিত হল, এ ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নেই। কেননা আসল বিষয় তো যা মানুষের অন্তরে রয়েছে- সেটাই ধর্তব্য (যখন তা প্রকাশ পায়)। কিন্তু আমাদের আলোচনা তো আমল সম্পর্কীত। আর আমার ধারণা এটা অসম্ভব যে, কেউ অইসলামী আইন জারি করল যা দ্বারা আল্লাহ'র বান্দাদের মধ্যে সে ফায়সালা করে, তবে যদি সেটাকে ইস্তিহলাল (বৈধ) করে এবং এই আক্বীদা রাখে যে, এটা শরীয়তী আইনের চেয়ে উত্তম। তবে সুস্পষ্ট কথা হল, সে কাফির। অন্যথা কোন্ জিনিস তাকে সে দিকে ধাবিত করল (যার ফলে সে শরীয়াত বিরোধি ফায়সালা করল)। অবশ্য এ দৃষ্টিভঙ্গি সম্ভব যে, যে বিষয়টি তাকে সে দিকে ধাবিত করল তা হলো- সে এমন কোন শক্তিকে ভয় করছে যে তার চেয়ে অনেক বেশী ক্ষমতাসম্পন্ন। আর সে যদি উক্ত শরীয়াত বিরোধি ফায়সালা জারি না করে তবে তারা তার ব্যাপারে প্রভাব বিস্তারের বা চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করবে। এ পর্যায়ে আমি বলব, তার হুকুম অন্যান্য ঐ সব পাপের হুকুমের মত যেসব ব্যাপারে জবরদস্তি বা চাপের মুখে সংঘটিত আমলের হুকুম প্রযোজ্য। যে বিষয়টি আলোচ্য অনুচ্ছেদের সবচে গুরুত্বপূর্ণ তা হল 'মাসআলায়ে তাকফীর'। যা এই আমল তথা ঐ সমস্ত হাকিম/শাসকের বিরোধিতায় প্রয়োগ করা হচ্ছে- আর এটাই আসল সমস্যা। জি হাঁ, যদি মানুষের কাছে এতটা শক্তি সামর্থ্য থাকে যে, সে প্রত্যেক কাফির হাকিম/শাসককে নির্মূল করতে পারে। তবে আমরা এটাকে স্বাগত জানাই। তবে শর্ত হল, তারা হাদীসে উল্লিখিত শর্ত মোতাবেক পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট কুফর দেখে এবং এ ব্যাপারে আল্লাহ 'র পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই মাসআলাটি কোন নতুন নয় এবং এর বাস্তবায়নও সহজসাধ্য নয়- [শায়েখ আলবানী।
-উর্দু অনুবাদক