📄 আয়াতে তাহকীমের সহীহ সালাফী তাফসীর
ঐ সমস্ত গোমরাহ ফিরক্বার মধ্যে একাধারে প্রাচীন ও আধুনিক ফিরক্বা হল খারেজী। তাকফীরের আসল ভিত্তি যা ইদানীং চারদিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তা হল কুরআনুল কারীমের নিম্নোক্ত আয়াত। যা এই লোকেরা সব সময় উপস্থাপন করে আসছে: وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ "যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির। "⁴²
আমরা সবাই জানি যে, এই আয়াতের সাথে সম্পর্কীত আয়াতগুলোতে তিনটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে: وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ "যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির। "⁴³ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ "যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই যালিম। "⁴⁴ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ "যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই ফাসিকু। "⁴⁵
তারা নিজেদের অজ্ঞতার কারণে উক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রথম আয়াতটি দ্বারা দলিল গ্রহণ করছে। অর্থাৎ- وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ "যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির। "⁴⁶
তাদের উচিত ছিল, কমপক্ষে যেসব দলিলে 'কুফর' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোকে কষ্ট করে হলেও একত্রিত করা। পক্ষান্তরে তারা এই একটি আয়াতে বর্ণিত 'কুফর' শব্দ দ্বারাই দ্বীন থেকে খারিজ ঘোষণা করছে। এরফলে, তাদের কাছে কোন মুসলিম যদি এই কুফরে লিপ্ত হয়, তবে ঐ মুসলিমের সাথে মুশরিক, ইয়াহুদী ও নাসারা প্রমুখদের কোন পার্থক্য নেই।
কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহ'র অভিধানে 'কুফর' শব্দটির অর্থ একমাত্র এটাই নয়। অথচ তারা সেটাই দাবি করছে এবং এই ভুল বুঝ দ্বারা অনেক মুসলিমের উপর তাকফীর আরোপ করছে, অথচ তাদের প্রতি তা প্রযোজ্য নয়।
'তাকফীর' শব্দটি সবসময় একই অর্থ তথা দ্বীন থেকে খারিজ হওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বরং এর সম্পর্ক পরবর্তীতে দু'টি আয়াতে ব্যবহৃত শব্দের ন্যায়ও হয়ে থাকে- অর্থাৎ 'ফাসিকু' ও 'যালিম'। সুতরাং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে যালিম বা ফাসিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে- তার জন্য কখনই এটা প্রযোজ্য নয় যে, সে মুরতাদ হয়ে গেছে। তেমনি যদি কারো ক্ষেত্রে বলা হয় যে, সে কুফর করেছে- তার অর্থ এটা নয় যে, সে মুরতাদ হয়ে গেছে।
এর একটি অর্থ আরবি অভিধানে ও আমাদের শরী'আতে তথা আরবিতে নাযিলকৃত কুরআনুল কারীম দ্বারা প্রমাণিত। এ কারণে যে কেউ-ই আল্লাহ'র হুকুমের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়- সে হাকিম/শাসক হোক কিংবা সাধারণ প্রত্যেকেরই কিতাব, সুন্নাত এবং সালফে-সালেহীনের মানহায অনুযায়ী আহরিত ইলমের উপর কায়েম থাকা ওয়াজিব।
আরবি ভাষার স্বকীয়তা সম্পর্কে জানা ছাড়া কুরআন ও এর সম্পর্কীত গভীর জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। আর এই নিয়মও প্রযোজ্য যে, যদি কোন ব্যক্তির আরবি ভাষার ব্যাপারে এতটা শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ দক্ষতা অর্জিত না হয়, তবে সে নিজের পরিকল্পনানুযায়ী যা সে নিজের ভিতরে আকাঙ্ক্ষা করে- সেক্ষেত্রে সে ঐ সমস্ত আলেমদের দিকে নিজেকে সোপর্দ করবে যারা পূর্বে চলে গেছেন। বিশেষভাবে যাদের সাথে কুরুনে সালাসাহ (নেককারদের তিনটি যুগ)-এর সম্পর্ক রয়েছে। যাদের হিদায়াত, কামিয়াবী ও শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য স্বয়ং নবী থেকে প্রমাণিত। তাদের দিকে নিজেকে সোপর্দ করার দাবি হল, তাদের মাধ্যমে পূর্ণ সহযোগিতা লাভ করা। কেননা তাদের মধ্যে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সম্পৃক্তার নিদর্শন পাওয়া যায়।
আসুন আমরা পুণরায় আয়াতটির প্রসঙ্গে আসি। وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ "যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।”⁴⁷ এই আয়াতটির فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ বাক্যটির উদ্দেশ্য কি-
১. সম্পূর্ণভাবে ইসলাম থেকে খারিজ (বহিষ্কার) হয়ে যাওয়া?
২. নাকি এর অর্থ- কখনো ইসলাম থেকে খারিজ হওয়া, আবার কখনো ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়া থেকে কিছু কম?
এ পর্যায়ে আয়াতটি কিছুক্ষণ গভীরভাবে লক্ষ করুন। কেননা আয়াতটির فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ বাক্যটির দ্বারা কখনো ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। আবার কখনো এর উদ্দেশ্য হল, আমলগত দিক থেকে কোন আহকামের ব্যাপারে ইসলাম থেকে খারিজ হওয়া। এর সহীহ তাফসীরের ব্যাপারে আমাদেরকে যা সহযোগিতা করবে তা হল, নবী -এর ঘোষিত মুফাসসির সাহাবী ইবনে আব্বাস -এর বিশ্লেষণ। কেননা, কিছু গোমরাহ ফিরক্বা ছাড়া সবাই একমত যে সাহাবী ইবনে আব্বাস ছিলেন তাফসীরের ব্যাপারে ইমাম। আর এ কারণেই আমার জানা মতে সম্ভবত, সাহাবী ইবনে মাস'উদ তাঁকে 'তরজামানুল কুরআন' উপাধি দিয়েছেন।
টিকাঃ
৪২. সূরা মায়িদা: ৪৪ আয়াত।
৪৩. সূরা মায়িদা: ৪৪ আয়াত।
৪৪. সূরা মায়িদা : ৪৫ আয়াত।
৪৫. সূরা মায়িদা: ৪৭ আয়াত।
৪৬. সূরা মায়িদা: ৪৪ আয়াত।
৪৭. সূরা মায়িদা- ৪৪ আয়াত।
📄 কুফরে দূনা কুফর
এটাই সুস্পষ্ট হয় যে, এই তাফসীর সম্পর্কে ইবনে আব্বাস রা. সে সময় এমন কোন কথা শুনেছিলেন- যা আজকাল আমরা শুনছি। অর্থাৎ তখন এমন কিছু লোক ছিল যারা আয়াতটির যাহেরী (প্রকাশ্য) অর্থ গ্রহণ করত। আর যে ব্যাখ্যার প্রতি আমি এখন ইঙ্গিত করছি তা তারা অস্বীকার করত। অর্থাৎ কখনোই এটা যাহেরী অর্থ (কাফির অর্থ- মুরতাদ হওয়া) হবে না, বরং কখনো কখনো এর থেকে কম স্তরের কুফরও উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। এ জন্যে ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: لَيْسَ الْكُفْرُ الَّذِي تَذَهُبُونَ إِلَيْهِ وَإِنَّهُ لَيْسَ كُفْرًا يَنقُلُ عَنِ الْمِلَّةِ وَهُوَ كُفْرُ دُونَ كَفْرٍ
"এটা ঐ কুফর নয়, যার দিকে এরা (খারেজীরা) গিয়েছে। এটা ঐ কুফর নয়, যা মিল্লাতে ইসলামিয়া থেকে খারিজ করে দেয়। বরং كُفْرُ دُوْنَ كُفْرٍ ("চূড়ান্ত) কুফরের থেকে কম কুফর"।⁴⁸
এই আয়াতটির তাফসীর প্রসঙ্গে এটাই সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত জবাব। এছাড়া অন্যান্য দলিল যেখানে কুফর শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলোও এই মর্মটি ছাড়া অনুধাবন করা সম্ভব নয় যে ব্যাপারে আমি আমার আলোচনার শুরুতেই উল্লেখ করেছি।⁴⁹
কেননা নবী ﷺ এর বাণী: سَبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوْقَ وَ قَتَالُهُ كُفْرٌ "মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেক্বী, আর তাকে হত্যা করা কুফরী।" [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৯/৪৬০৩ নং] এতদ্বসত্ত্বেও মুসলিমদের সাথে ক্বিতাল করা দ্বীন থেকে খারিজ করে না। কেননা আল্লাহ ﷻ বলেন: وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا "মু'মিনদের দুই দল ক্বিতালে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মিমাংসা করে দেবে" (সূরা হুজুরাত- ৯ আয়াত)। এবং আরো বলেনঃ إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ "মু'মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তাদের ভ্রাতৃগণের মধ্যে শান্তি স্থাপন করো" (সূরা হুজুরাত- ১০ আয়াত)। এরপরেও তাকফীরের ফিতনায় নিমজ্জিত ব্যক্তিগণ এই বিষয়টির বিরোধিতা করেন। তারা বলেন: এই আসারটি গায়ের মাকুবুল এবং ইবনে আব্বাস থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। আমি তাদের জবাবে বলছি: এটা কিভাবে সহীহ নয়? যখন উক্ত বড় বড় আলেম, যারা তোমাদের থেকে অনেক বড়, বেশি সম্মানিত ও হাদীসের ব্যাপারে অনেক বেশী বিজ্ঞ! তারা হাদীসটিকে গ্রহণ করেছেন, অথচ তোমরা বলছ হাদীসটি গ্রহণযোগ্য নয়!!
আমাদের জন্যে এটাই যথেস্ট যে, শীর্ষস্থানীয় আলেম যেমন ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ ও ইবনে কাইয়েম ؒ প্রমুখ। এদের প্রত্যেকেই এটাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কবুল করেছেন, এর উপর আলোচনা করেছেন ও এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সুতরাং প্রমাণিত হল, আসারটি সহীহ। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই, ইবনে আব্বাসের আসারটি সহীহ নয় তবুও আমাদের কাছে এমন অনেক সহীহ দলিল রয়েছে যা এর সমর্থন করে যে, কুফর কখনো এমনও হয় যা দ্বীন থেকে খারিজ করে না। যেভাবে পূর্বোক্ত আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। কিংবা রসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী : اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا هُم كُفْرٌ : الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ وَالنَّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ “দু'টি বিষয় মানুষের মধ্যে রয়েছে, যা তাদের জন্য কুফর: ১. বংশ নিয়ে খোঁটা দেওয়া, ২. মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা। [সহীহ মুসলিম, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব (ইফা)৪/৩৫৬ পৃঃ]
নিঃসন্দেহে এই আমল মুসলিমকে ইসলাম থেকে খারিজ করে না। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে এবং সম্মানিত আলেমদের অনুসরণের বদলে অন্য পথের অনুসরণের মধ্যে দিয়ে তা ঘটে থাকে- যেভাবে আলবানী শুরুতে উল্লেখ করেছেন।
এখন আমি অপর একটি বিষয় সুস্পষ্ট করতে চাই। খারাপ নিয়্যাত খারাপ উপলব্ধির প্রতিক্রিয়া। কেননা যখন মানুষ কোন কিছুর নিয়্যাত করে তখন তার উপলব্ধি তার নিয়্যাতের দিকেই বাধ্যতামূলকভাবে ঝুঁকে পড়ে। আর এ কারণে তারা দলিল বিকৃতি করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। কেননা আলেমদের প্রসিদ্ধ নীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হল, তারা বলেছেন: اِسْتَدل ثُمَّ اعْتَقَدْ "দলিল খোঁজ, অতঃপর সে মোতাবেক আক্বীদা বানাও।" অথচ তাদের মধ্যে এটা নেই। বরং তারা যেন এমন: "প্রথমে একটি আক্বীদা পোষণ কর অতঃপর দলিলকে সে দিকে লক্ষ্য করে উপস্থাপন কর। যার ফলাফল হল গোমরাহ হয়ে যাও।" এর কারণ তিনটি: (ক) ইলমের দৈন্যতা, (খ) শরীয়াতের ব্যাপক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে দুর্বল উপলব্ধি, ও (গ) খারাপ উপলব্ধি- যার ফলে খারাপ নিয়্যাত ও উদ্দেশ্যের রচনা হয়। ⁵⁰ 'কুফর' শব্দটি অনেক দলীলেই উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু সেগুলো কুফরে আকবার অর্থে আসে নি। কেননা যে সব আমলের ক্ষেত্রে 'কুফর' শব্দটি ঐ সব দলীলে ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো দ্বীন ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয় না। ঐ সমস্ত দলিলের মধ্যে উদাহরণ স্বরূপ সহীহ বুখারী, ও সহীহ মুসলিমের একটি প্রসিদ্ধ হাদীস উপস্থাপন করা যায়, আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদ বর্ণনা করেন, নবী বলেছেন:
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَ قِتَالُهُ كُفْرٌ "মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকী, আর তাকে হত্যা করা কুফরী।"⁵¹
আমার কাছে ‘كُفْر‘ও বাক্যটি আরবি ভাষার একটি সূক্ষ্ম তত্ত্বগত ব্যাপার। কেননা যদি কেউ বলে: سَبَابُ الْمُسْلِمِ وَ قِتَالُهُ فُسُوْقٌ “মুসলিমকে গালি দেওয়া ও হত্যা করা ফাসেক্বী” -এটিও একটি সঠিক বাক্য। কেননা ফিস্কও আল্লাহ’র নাফরমানী তথা তাঁর ইতা’আত থেকে খারিজ হওয়া। কিন্তু যেহেতু রসূলুল্লাহ আরবি ব্যাকরণের ফাসাহাত ও বালাগাতে সর্বোন্নত ছিলেন।
তাই তিনি বলেছেন: سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوْقٌ وَ قِتَالُهُ كُفْرٌ “মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেক্বী, আর তাকে হত্যা করা কুফরী।”⁵²
লক্ষ করুন, আমরা হাদীসে বর্ণিত ‘فسق’ শব্দটিকে পূর্ববর্তী দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতের তাফসীর হিসাবে ‘فسق’ শব্দটি ব্যবহার করতে পারি। وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ অর্থাৎ “যারা আল্লাহ’র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই ফাসিকু।”⁵³ তাহলে এ পর্যায়ে কুরআনের আয়াত فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ এবং হাদীস سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوْقٌ “মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেক্বী” -এ ব্যবহৃত ‘فسق’ শব্দটির দাবি কি একই হবে?
প্রকৃতপক্ষে ‘فسق’ শব্দটি ‘کُفر’ শব্দটির পরিপূরক। যার দাবি হল ‘کُفر’ শব্দটি কখনো ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়, আবার কখনো ‘کُفر’ শব্দটির দাবি হল যা ইসলাম থেকে খারিজ করে না। অর্থাৎ এর দাবি হল, যা পূর্বে তাফসীর প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে (كُفْرُ دُونَ كُفْرٍ )মূল কুফরের থেকে কম কুফর)। আর হাদীসটিও সেই দাবি করছে যে, এর অর্থ কখনো কুফরও হয়ে থাকে।
কেননা আল্লাহ কুরআনুল কারীমে বলেছেন:
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ
"মু'মিনদের দুই দল ক্বিতালে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মিমাংসা করে দেবে। আর তাদের একদল অপর দলের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করলে যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা ক্বিতাল করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে।"⁵⁴
এই আয়াতটিতে আমাদের রব বিদ্রোহী ফিরক্বার বর্ণনা দিয়েছেন যারা ফিরক্বায়ে নাজিয়াহ তথা প্রকৃত মু'মিন দলের সাথে ক্বিতাল করে। কিন্তু তাদের প্রতি কুফরের হুকুম দেন নি। অথচ হাদীসে বলা হয়েছে "মুসলিমকে হত্যা করা কুফর।" সুতরাং প্রমাণিত হল, ক্বিতাল কুফর কিন্তু এটি (دُونَ كُفْر) ছোট কুফর) যা ইবনে আব্বাস-এর পূর্ববর্তী আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে।
টিকাঃ
৪৮. সহীহ: এটা ইমাম হাকিম রহ. বর্ণনা করেছেন (২/৩১৩) এবং বলেছেন: 'সহীহুল ইসনাদ'। আর ইমাম যাহাবী রহ. চুপ থেকেছেন। আর তাদের দু'জনের সমন্বয়ে হক্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ তাদের উক্তি: على شرط الشيخين "সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তানুযায়ী” দ্বারা হাদীসটি উক্ত মর্যাদাই উন্নীত হয়। অতঃপর আমি এটাও দেখলাম যে, হাফিয ইবনে কাসির রহ. তাঁর তাফসিরে (৬/১৬৩) হাকিম থেকে বর্ণনা করার পর বলেছেন: على شرط الشيخين "সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তানুযায়ী"। [সিলসিলাতুল আহাদীসুস সাহীহাহ ৬/২৭০৪ নং হাদীস]
৪৯. উর্দু অনুবাদকের টীকা: শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসায়মীন রহ. ইমাম আলবানী রহ.-এর আলোচ্য উদ্ধৃতির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন: শায়েখ আলবানী রহ. ইবনে আব্বাস রা.-এর এই আসারটি দ্বারা দলিল গ্রহণ করেছেন। এমনকি তিনি ছাড়াও অনেক আলেমে দ্বীনও এর প্রতি গুরুত্বারোপ করে এর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। যদিও হাদীসের সনদটির ব্যাপারে কিছু অভিযোগ আছে, কিন্তু সমস্ত আলেম দলীলটির ব্যাপকতার ভিত্তিতে প্রকৃত মর্মের আলোকে এটির প্রতি গুরুত্বারোপ করে গ্রহণ করেছেন।
৫০. উর্দু অনুবাদকের টিকা: শায়েখ উসামীন একজন প্রশ্নকারীর উত্তরে বলেছিলেন: "খারাপ মর্ম উদ্ধারকারীদের মধ্যে এই কথারও প্রচার রয়েছে যে, তারা শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ এর কথা সম্পৃক্ত করে যে: إِذَا أُطْلِقَ الْكُفْرُ فَإِنَّمَا يُرَادُ بِهِ كُفْرُ। "যদি কুফর সম্পর্কে বর্ণনা করা হয় তবে তা দ্বারা কুফরে আকবারই উদ্দেশ্য হবে।" ফলে তারা এই উক্তির আলোকে বর্ণিত أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ আয়াত দ্বারা তাকফীরের দলিল নিয়ে থাকে। কিন্তু এই আয়াতটির পক্ষে এমন কোন দলিল দ্বারা এটা প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে, এর দাবি الْكُفْرُ (প্রকৃত / বড় কুফর)। অথচ তাঁর থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত যে, তিনি الكفر শব্দে যে ال-ইসমে মা'রিফাসহ এসেছে তাকে, کفر শব্দ যা ইসমে নাকিরাহ দ্বারা এসেছে তা থেকে পৃথক করেছেন। অতএব বৈশিষ্ট্যের দিকে থেকে আমাদের কাছে هَؤُلاءِ كَافِرُونَ এবং هَؤُلاءِ الْكَافِرُونَ (তারা কাফির) উভয়ই সমান। যার দাবি হল, এ কুফরও হতে পারে যা দ্বারা দ্বীন ইসলাম থেকে খারিজ হয় না। আসল বিষয় হল, ফে'ল (কর্মের) বৈশিষ্ট্যের সাথে, ফায়িল (কর্তার) বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য। এর আলোকে আলোচ্য আয়াতটির যে ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে- حُكْمُ بِغَيْرِ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ "আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান ছাড়া হুকুম/শাসন করা" এমন কুফর নয় যা দ্বীন ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়। কিন্তু এই কুফরটি আমলী কুফর- যা দ্বারা এ ধরণের হুকুমদানকারী সহীহ পথ থেকে খারিজ হয়ে যায়। আর এই দু'টি বিষয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই যে, ঐ সমস্ত মানবরচিত আইন কারো কাছ থেকে গ্রহণ করে তা দ্বারা নিজের দেশে ফায়সালা করা, কিংবা স্বয়ং নিজেই তা আবিষ্কার করে ঐ মানবরচিত (মনগড়া) আইন প্রতিষ্ঠিত করা (উভয়টিই একই)। প্রকৃতপক্ষে যে বিষয়টির দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে তা হল, সেটা কি আল্লাহ'র নাযিলকৃত আসমানী বিধানের বিরোধি হয় কি না?
৫১. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৯/৪৬০৩ নং।
৫২. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৯/৪৬০৩ নং।
৫৩. সূরা মায়িদাহ- ৪৭ আয়াত।
৫৪. সূরা হুজুরাত: ৯ আয়াত।
📄 কুফরে আমালী ও কুফরে ই’তিক্বাদী
মুসলিম কর্তৃক মুসলিমের সাথে ক্বিতাল করা বর্বরতা, চরমপন্থা, ফিসকু ও কুফর। কিন্তু এই ব্যাখ্যাসহ যে, কখনো তা কুফরে আমালী (আমলগত কুফর) আবার কখনো কুফরে ই'তিক্বাদী (আক্বীদা/বিশ্বাসগত কুফর)। এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু উক্ত সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ দু'টির মধ্যেই রয়েছে। যার ব্যাখ্যা (ইবনে আব্বাস - এর পরে) সত্যিকারের ইমাম শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ এবং তাঁর একনিষ্ঠ ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-যাওজি করেছেন। কেননা তারা কুরআনের অর্থে কুফরের এই দু' ধরনের বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ ও তাঁর ছাত্র হাফেয ইবনে কাইয়েম তাঁদের আলোচনার মধ্যে সব সময় 'কুফরী আমালী' ও 'কুফরে ইতি'ক্বাদী'-এর বিবরণ দিয়েছেন। কেননা, যদি এই পার্থক্যের দিকে লক্ষ্য রাখা না হয়, তবে মুসলিমরা অজ্ঞতাবশতঃ মুসলিম জামা'আত থেকে খারিজ হয়ে ঐ ফিতনার মধ্যে নিমজ্জিত হবে যার মধ্যে প্রাচীন যামানাতে খারেজীরা পতিত হয়েছিল। অতঃপর বর্তমান যামানাতেও কিছু লোক এ ফিতনার মধ্যে পড়েছে।
সুতরাং প্রকৃতপক্ষে 'قتاله کفر' এর অর্থ দ্বীন ইসলাম থেকে খারিজ হওয়া নয়। এ মর্মে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে যা একত্রিত করলে একটি অত্যন্ত উপকারী কিতাব হত। কিন্তু এটা তাদের কাছে দলিল হিসাবে গ্রহণযোগ্য হবে না যারা আলোচ্য আয়াতের তাফসীরটি কেবল 'কুফরে ই'তিক্বাদী' অর্থে গ্রহণ করে থাকে। অথচ প্রকৃত সত্য হল, এর স্বপক্ষে এত অধিক সংখ্যক দলিল রয়েছে যেখানে 'لكفر.' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এর দাবি কখনই এটা নয় যে, সম্পূর্ণ ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়া। এই মুহূর্তে আমাদের এই দলিলটিই খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট যে, এক মুসলিম অপর মুসলিমকে হত্যা করা 'কুফরে আমালী' এবং কখনই এটা 'কুফরে ই'তিক্বাদী' (আক্বীদাগত কুফর) নয়। ⁵⁵
টিকাঃ
৫৫. এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ থেকে সুস্পষ্ট হাদীসও আছে। উবাদা ইবনে সামিত বলেছেন
كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي مَجْلِسٍ فَقَالَ تُبَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا تَزْنُوا وَلَا تَسْرِقُوا وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ وَمَنْ أَصَابَ شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ فَعُوقِبَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ أَصَابَ شَيْئًا مِنْ ذلكَ فَسَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ إِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ وَإِنْ شَاءَ عَذْبَهُ.
"আমরা কোন বৈঠকে রসূলুল্লাহ এর সঙ্গে বসেছিলাম। তখন তিনি বললেন: তোমরা আমার কাছে এ বলে বায়য়াত গ্রহণ কর যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবেনা, যিনা করবে, চুরি করবে না এবং কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। কিন্তু ন্যায়সঙ্গতভাবে (অর্থাৎ কিসাসের কারণে)। অতএব, তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ তা পূর্ণ করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাবে। আর যদি কেউ উক্ত অপরাধের কোন একটিতে পতিত হয়ে শাস্তি ভোগ করে, তবে তাই তার জন্য কাফফারা হয়ে যাবে। আর যদি কোন ব্যক্তি উল্লিখিত অপরাধের কোন একটিতে পতিত হয় অতঃপর আল্লাহ তা গোপন রাখেন, তবে বিষয়টি মহান আল্লাহ'র এখতিয়ারে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তিও দিতে পারেন।" [সহীহ মুসলিম- কিতাবুল হুদুদ إِبَابُ الْخُدُودِ كَفَّارَاتُ لِأَهْلِهَا অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে: উবাদা বলেন: আমরা এ সকল কথার উপর তাঁর হাতে বায়য়াত করলাম।" [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ১/১৭ নং] [-বাংলা অনুবাদক]
📄 হাকিম ও মাহকূম (প্রজা/শাসিত)-এর প্রতি তাকফীর
এখন আমি জামা'আতুত তাকফীর ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তথা শাসক, অধীনস্থ সাধারণ জনগণ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পর্কে আলোচনা করব যারা ঐ হুকুমাতের অধীনে কাজ ও চাকরি করার কারণে তাকফীরের শিকার হচ্ছেন। ⁵⁶ অর্থাৎ তাদের অধীনতার পাপের কারণে কাফির বলা হচ্ছে। ⁵⁷
আমি আলোচ্য কথাগুলো আমার কাছে প্রশ্নকারী ভাইদের কাছ থেকে পেয়েছি যারা পূর্বে জামা'আতুত তাকফীরের অন্তর্ভূক্ত ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাদের হিদায়াত দিয়েছেন। আমি তাদের কাছে জানতে চাই, আপনারা অনেক হাকিম (শাসক)-কে কাফির গণ্য করেন। কিন্তু আপনারা ইমাম, খতীব, মুয়াজ্জিন ও মাসজিদের খাদেমদেরকেও তাকফীর কেন করেন? এমনকি আপনারা ইলমে শরী'আতের উস্তাদ যারা বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান করছেন তাদের প্রতিও তাকফীর করেন!!
তারা উত্তরে এটাই বলেন যে, কেননা এই লোকেরা ঐ হাকিম (শাসক) ও তাদের শাসনতন্ত্রের প্রতি রাযী, অথচ তা আল্লাহ'র নাযিলকৃত শরী'আতের বিরোধি।
আমি তাদের বলি: যদি এই রাযী বা সন্তুষ্টি আন্তরিকভাবে হয়ে থাকে তবে তো এই আমালী কুফর প্রকৃতপক্ষে ই'তিক্বাদী কুফরে পরিণত হয়। সুতরাং যদি কোন হাকিম (শাসক/বিচারক) আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক ফায়সালা না করে এবং এটা মনে করে যে, এই হুকুম বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশি উপযোগী। পক্ষান্তরে কুরআন ও সুন্নাতের বিধি-বিধান বর্তমান যামানার জন্য উপযোগী নয়, তবে নিঃসন্দেহে তার এই কুফর- কুফরে ই'তিক্বাদী এবং কখনই তা কুফরে 'আমালী নয়। আর কেউ যদি এই ধারণার প্রতি রাযী বা সন্তুষ্ট থাকে তবে সে কাফির।⁵⁸
কিন্তু আপনারা যে সমস্ত শাসক পশ্চিমা আইন দ্বারা কম বা বেশি বিধান জারি করছে- তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা কখনই এটা বলবে না যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আইন দ্বারা শাসন চালানো জরুরী এবং ইসলাম অনুযায়ী শাসন চালান জায়েয নয়। বরং তারা এভাবেও বলবে না যে, আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী শাসন চালানোর সম্ভব হচ্ছে না। কেননা এটা বললে তারা নিঃসন্দেহে কাফির হয়ে যাবে।
এখন আমি যদি শাসিত প্রজাসাধারণ- যার মধ্যে উলামা ও নেককার ব্যক্তিগণ রয়েছেন তাদের প্রসঙ্গে আসি, সেক্ষেত্রেও বলব যে, আপনারা কেন তাদের প্রতি তাকফির করছেন? সম্ভবত এই কারণে যে, তারা ঐ হুকুমাতের অধীনে জীবন-যাপন করছে। অথচ ঐ হুকুমাতের অধীনে জীবন-যাপনের ব্যাপারে আপনারাও (জামা'আতুত তাকফীর) হুবহু তাদেরই মত। পার্থক্য এতটুকু যে, আপনারা শাসকদের কাফির ঘোষণা করছেন। পক্ষান্তরে আলেমগণ এটা বলছেন না যে, তারা দ্বীনের থেকে মুরতাদ হয়ে গেছে। বরং তারা বলেন: আল্লাহ'র নাযিলকৃত শরী'আত দ্বারা শাসন চালান ওয়াজিব এবং আমলগত কারণে কোনটির বিরোধিতার জন্য এটা জরুরী নয় যে, সেই আলেম বা হাকিম/শাসক দ্বীন ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হবে।
সংশয়: একবার বা কয়েকবার আল্লাহ শু'র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম জারি না করলে কাফির হয় না। কিন্তু বারবার বা সবসময় আল্লাহ'র বিধানের বিরোধি হুকুম জারি করলে কাফির হয়ে যায়।
বিতর্ককারীদের মধ্যে যাদের গোমরাহী ও ভুল-ত্রুটিগুলো সুস্পষ্ট হয়েছে, আমি তাদের একটি পক্ষকে জিজ্ঞাসা করি : আমরা কখন একজন কালেমায়ে শাহাদাতের (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ الله ) দাবীদার যারা সালাতও আদায় করে তাদের দ্বীন থেকে মুরতাদ হিসাবে গণ্য করব?
মূলতঃ এ ব্যাপারে তাদের দৃষ্টি একটি দিকে থাকবে। আর তা হল- আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা না করাই দ্বীন থেকে মুরতাদ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। যদিও এই তাকফীরকারীরা নিজের মুখ থেকে এই জবাব দিবে না- তবে মূলত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এটাই।
এই প্রশ্ন তাদের সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয় এবং তাদের থেকে কোন জবাব পাওয়া যায় না। তখন আমি তাদের নিম্নোক্ত উদাহরণটি উপস্থাপন করি যা তাদের নির্বাক করে দেয়। যেমন আমি তাদের বলেছি- "একজন হাকিম (শাসক/বিচারক) তিনি শরী'আত মোতাবেক ফায়সালা করবেন এবং এটাই তার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কোন একটি ফায়সালাতে তিনি বিচ্যুত হয়ে শরী'আত বিরোধি ফায়সালা দেন- অর্থাৎ কোন যালিমকে হকু দিয়ে দিলেন এবং মাযলুমকে বঞ্চিত করলেন। বলুন তো- এটা কি ‘হুকুম বিগয়রি মা-আনঝালাল্লাহ’ নয়?
আপনারা কি বলবেন সে কুফর তথা মুরতাদ হওয়ার কুফর করেছে?”
তারা জবাব দিল: না।
আমি বললাম: কেন না, সে তো আল্লাহ’র শরী’আতের বিরোধিতা করেছে।
তারা জবাব দিল: এটা তো কেবল একবার সংঘটিত হয়েছে।
আমি বললাম: খুব ভাল। যদি এই হাকিম দ্বারা দ্বিতীয়বার শরী’আতের বিরোধিতা হয়, কিংবা ভিন্ন কোন ব্যাপারে সংঘটিত হয় যা শরী’আতের বিরোধি- তাহলে সে কি কাফির হবে?
আমি তিন-চার বার তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, কখন তাকে কাফির বলব? তারা এর কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করতে পারল না যে, কতবার শরী’আতের খেলাফ হলে সে কাফির বলে গণ্য হবে।
যখন আমি উক্ত বক্তব্যটি ভিন্নভাবে বললাম: যদি আপনারা এটা মনে করেন যে, সে একটি শরী’আত বিরোধি হুকুমকে উত্তম হিসাবে অব্যাহত রাখে এবং ইসলামী হুকুমের অবমাননা প্রকাশ করে, সেক্ষেত্রে আপনারা তার প্রতি মুরতাদের হুকুম লাগাতে পারেন। যখন অন্যক্ষেত্রে আপনারা তাকে শরী’আতের বিরোধি ফায়সালা করতে দেখবেন তখন জিজ্ঞাসা করবেন- হে শায়েখ! আপনি কেন আল্লাহ’র নাযিলকৃত বিধানের বিরোধি ফায়সালা করছেন? সে তখন কুসম করে বলবে- “আমি ভয়ে এটা করেছি বা নিজের প্রাণের হুমকি ছিল, কিংবা আমি ঘুষ নিয়েছে প্রভৃতি।” শেষোক্ত অজুহাতটি পূর্বের দু’টি থেকেও নিকৃষ্ট। এরপরেও আপনারা এটা বলতে পারেন না যে, সে কাফির- যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজেই ঘোষণা দেয়। অর্থাৎ নিজের অন্তরের গোপন কুফর প্রকাশ করে, তথা যখন আল্লাহ’র নাযিলকৃত হুকুম মোতাবেক ফায়সালা করা জায়েয নয় বলে মানে- কেবল তখনই আপনারা বলতে পারেন সে মুরতাদ-কাফির।
টিকাঃ
৫৬. সাহাবী আবূ সাঈদ ও আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন لَيَاتِينَ عَلَيْكُمْ أَمْرَاء يُقَرِّبُوْنَ شِرَارَ النَّاسِ وَيُؤَخِّرُونَ الصَّلَاةَ عَنْ مَوَاقِيتِهَا فَمَنْ أَدْرَكَ ذَلِكَ مِنكُمْ فَلَا يَكُونَنَّ عَرْيفًا وَلَا شَرْطِيًّا وَلَا جَابِيًّا وَلَا خَازِنًا
"অদূর ভবিষ্যতে অবশ্যই তোমাদের উপর এমন আমীর (শাসক) হবে, যারা সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট লোকদের নিজের কাছে টেনে নেবে এবং তারা সালাতের ওয়াক্ত গড়িয়ে যাওয়ার পর তা আদায় করবে। এই সময় তোমাদের কেউ জীবিত থাকলে সে যেন তত্ত্বাবধায়ক, পুলিশ, যাকাতের সম্পদ আদায়কারী ও খাজাঞ্চী নিযুক্ত না হয়।" [সহীহ ইবনে হিব্বান, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব (ইফা) ১/৫৫৭ পৃঃ; হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন ইমাম হায়সামী (মুজমু'আয়ায়ে যাওয়ায়েদ ৫/৯২২৫ নং), হুসাইন সালীম আসাদ (তাহক্বীক্বকৃত মুসনাদে আবী ইয়ালা ২/১১১৫ নং) ও মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (আস-সাহীহাহ ১/৩৬০ নং)। [বাংলা অনুবাদক)
৫৭. আমরা আল্লাহর কাছে (মুসলিমদেরকে তাকফির করার ব্যাপারে) ক্ষমা চাচ্ছি - শায়েখ উসায়মীন। [উর্দু অনুবাদক]
৫৮. এই আক্বীদা রাখা সত্ত্বেও লোকেরা আমাকে 'যামানার মুরজিয়া' (মুরজিয়াতুল 'আসর) বলে তুহমাত (অপবাদ) দেয়া শুরু করেছে- শায়েখ আলবানী। (উর্দু অনুবাদক)