📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 কয়েকটি উপমাদেশীয় প্রসিদ্ধ তাফসীর

📄 কয়েকটি উপমাদেশীয় প্রসিদ্ধ তাফসীর


এ পর্যায়ে আমরা এখন উপমহাদেশের কয়েকটি প্রসিদ্ধ তাফসীর থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি।
৬. তাফসীরে মাযহারী: কাযী মুহাম্মাদ সানাউল্লাহ পানিপথী তাঁর “তাফসীরে মাযহারী”-তে সূরা মায়িদার ৪৪ নং আয়াতের শেষাংশ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُوْنَ এর তাফসীরে লিখেছেন: “যদি সে আল্লাহর বিধান তুচ্ছ জ্ঞান করে অন্যরূপ বিধান দেয়। কেউ বলেছেন, এখানে কাফির হওয়ার অর্থ ফাসিকু হওয়া। কুফরের অর্থ সত্য গোপন করা হতে পারে। ইবনে আব্বাস ও তাউস বলেন, এটা এমন কুফরী কাজ নয়, যার দ্বারা মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ হয়ে যাবে, যেমন খারিজ হয়ে যায় আল্লাহ ও পরকালকে অস্বীকার করলে, বরং এরূপ করলে সে সত্যকেই গোপন করবে।”²⁶ অতঃপর তিনি فَأَوَلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ-এর তাফসীরে লিখেছেন: “আল্লাহর বিধান কার্যকরী না করার কারণে।”²⁷ অতঃপর তিনি فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ-এর তাফসীরে লিখেছেন: "এখানে ফাসিকুন এর দু' রকম অর্থ হতে পারে- ক. আল্লাহর বিধানের আনুগত্য থেকে তারা খারিজ; খ. আল্লাহর বিধানকে তুচ্ছ জানার কারণে ঈমান থেকে খারিজ। ²⁸
৭. তাফহীমুল কুরআন: সাইয়েদ আবু আ'লা মওদূদী তাঁর "তাফহীমুল কুরআন"-এ আলোচ্য আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে লিখেছেন:
"যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে না তাদের সম্পর্কে আল্লাহ এখানে তিনটি বিধান দিয়েছেন। ক. তারা কাফের। খ. তারা যালেম। গ. তারা ফাসেকু।
এর পরিষ্কার অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম ও তাঁর নাযিল করা আইন ত্যাগ করে নিজের বা অন্য মানুষের মনগড়া আইনের ভিত্তিতে ফায়সালা করে সে আসলে বড় ধরনের অপরাধ করে। প্রথমত তার এ কাজটি আল্লাহর হুকুম অস্বীকার করার শামিল, কাজেই এটি কুফরী। দ্বিতীয়ত, তার এ কাজটি ইনসাফ ও ভারসাম্যনীতির বিরোধি। কারণ, আল্লাহ যথার্থ ইনসাফ ও ভারসাম্যনীতি অনুযায়ীই হুকুম দিয়েছিলেন। কাজেই আল্লাহর হুকুম থেকে সরে এসে যখন সে ফায়সালা করলো তখন সে আসলে যুলুম করলো। তৃতীয়ত, বান্দা হওয়া সত্ত্বেও যখনই সে নিজের প্রভুর আইন অমান্য করে নিজের বা অন্যের মনগড়া আইন প্রবর্তন করলো তখনই সে আসলে বন্দেগী ও আনুগত্যের গণ্ডীর বাইরে পা রাখলো।²⁹ আর এটি অবাধ্যতা বা ফাসেকী। এ কুফরী, যুলুম ও ফাসেক্বী তার নিজের ধরন ও প্রকৃতির দিকে দিয়ে অনিবার্যভাবেই পুরোপুরি আল্লাহর হুকুম অমান্যেরই বাস্তব রূপ। যেখানে আল্লাহর হুকুম অমান্য করা হবে সেখানে এ তিনটি বিষয় থাকবে না, এটা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তবে আল্লাহর হুকুম অমান্য করার যেমন পর্যায়ভেদ আছে তেমনি এ তিনটি বিষয়েরও পর্যায়ভেদ আছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমকে ভুল এবং নিজের বা অন্য কোন মানুষের হুকুমকে সঠিক মনে করে আল্লাহর হুকুম বিরোধি ফায়সালা করে সে পুরোপুরি কাফির, যালেম ও ফাসেকু। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমকে সত্য বলে বিশ্বাস করে কিন্তু কার্যত তার বিরুদ্ধে ফায়সালা করে সে ইসলামী মিল্লাত বহির্ভূত না হলেও নিজের ঈমানকে কুফুরী, যুলুম ও ফাসেকীর সাথে মিশিয়ে ফেলেছে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে সে সকল ব্যাপারেই কাফির, ফাসেকু ও যালেম। আর যে ব্যক্তি কিছু ব্যাপারে অনুগত এবং কিছু ব্যাপারে অবাধ্য তার জীবনে ঈমান ও ইসলাম এবং কুফরী, যুলুম ও ফাসেক্বীর মিশ্রণ ঠিক তেমনি হারে অবস্থান করছে যেহারে সে আনুগত্য ও অবাধ্যতাকে এক সাথে মিশিয়ে রেখেছে। কোন কোন তাফসীরকার এ আয়াতগুলোকে আহলে কিতাবদের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কীত বলে গণ্য করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আল্লাহর কালামের শব্দের মধ্যে এ ধরনের ব্যাখ্যা করার কোন অবকাশ নেই। হুযাইফা -এর বক্তব্যই এ ধরনের ব্যাখ্যার সঠিক ও সর্বোত্তম জবাব। তাঁকে একজন বলেছিল, এ আয়াত তিনটি তো বনী ইসরাঈলের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। সে বুঝাতে চাচ্ছিল যে, ইহুদীদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিল করা হুকুমের বিরুদ্ধে ফায়সালা করে সে-ই কাফির, যালেম ও ফাসেকু। একথা শুনে হুযাইফা বলেন: نِعْمَ الْإِخْوَةِ لَكُمْ بَنُو إِسْرَائِيلَ، إِنْ كَانَتْ لَهُمْ كُلَّ مُرَّةَ، وَلَكُمْ كُلِّ حُلْوَةٍ كَلَّا وَاللَّهِ، لَتَسْلُكْنَ طَرِيقَهُمْ قَدَرَ الشَّرَاكِ
"এ বনী ইসরাঈল গোষ্ঠী তোমাদের কেমন চমৎকার ভাই, তিতোগুলো সব তাদের জন্য আর মিঠাগুলো সব তোমাদের জন্য। কখনো নয়, আল্লাহর কসম তাদেরই পথে তোমরা কদম মিলিয়ে চলবে।" [তাফহীমুল কুরআন (ঢাকা, আধুনিক প্রকাশনী, ১৪২১/২০০০, আলোচ্য আয়াতের তাফসীর, টীকা ৭৭ দ্রষ্টব্য]
৮. তাফসীরে উসমানী: শিব্বির আহমাদ উসমানী তাঁর "তাফসীরে উসমানী'-তে সূরা মায়িদাহ'র ৪৪ নং আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন: مَا اَنْزَلَ اللهُ کے موافق حکم نہ کرنے سے غالبا यह مراد ہے کہ منصوص حکم کے وجود ہی سے انکار کردے اور اسکی جگہ دوسرے احکام اپنی راۓ اور خواہش سے تصنیف کرے ۔ جیسا کہ یہود نے رجم کے متعلق کیا تھا۔ تو ایسے لوگوں کے کافر ہونے میں کیا شبہ ہو سکتا ہے اور اگر यह ہو کہ مَا اَنْزَلَ اللهُ كو عقيدة ثابت مان کر پھر فیصلہ عملا اسکے خلاف کرے تو کافر سے مراد عملی کافر ہوگا۔ یعنی اسکی عملی حالت کافروں جیسی ہی
"مَا أَنْزَلَ اللهُ এর সম্পর্ক হলো, 'আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম না করা'-এর দ্বারা সম্ভাব্য অর্থ হবে, সুস্পষ্ট দলিলসমৃদ্ধ হুকুম থাকা সত্ত্বেও তা অস্বীকার করা এবং এর পরিবর্তে নিজের রায় ও খায়েশ দ্বারা ভিন্ন বিধান প্রবর্তন করা। যেভাবে ইয়াহুদীরা 'রজমের' হুকুমের ব্যাপারে করেছিল। এ ধরনের লোকেরা কাফির হওয়ার ব্যাপারে আর কি সংশয় থাকতে পারে? আর যদি مَا أَنْزَلَ اللهُ এর দাবি হয়, আক্বীদাগতভাবে স্বীকার করার পর আমলগত ফায়সালার ক্ষেত্রে এর বিপরীত করা- তবে সেক্ষেত্রে কাফিরের অর্থ আমলগত কুফর। অর্থাৎ তাদের আমলটি কাফিরদের মতো।” (তাফসীরে উসমানী, সূরা মায়িদা, ৪৪ নং আয়াতের তাফসীর)
৯. তাফসীরে মাজেদী: আব্দুল মাজেদ দরিয়াবাদী তাঁর "তাফসীরে মাজেদী"-তে আলোচ্য আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে লিখেছেন: “وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ-আর যারা বিধান দেয় না তদনুসারে, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ, বরং তারা শরীআত বিরোধি হুকুম-আহকামকে শরীআতসম্মত বলে মনে করে মানুষের তৈরী বিধানকে আল্লাহর বিধান বলে চালায়।
নেতৃস্থানীয় ইয়াহুদীদের সবচেয়ে বড় অপরাধ এবং গুনাহ এই ছিল যে, তারা তাদের মনগড়া মতবাদকে আল্লাহর কানুন³⁰ বলে চালিয়ে দিত। ফাতওয়া নিজের ইচ্ছামত দিত এবং বলতো: দ্বীনের হুকুম এরূপ। এ ধরণের দুঃসাহসী ব্যক্তিদের কুফরীর ব্যাপারে আর কি সন্দেহ হতে পারে? বিশিষ্ট তাবেঈনদের থেকে আয়াতের তাফসীর এরূপ বর্ণিত হয়েছে। ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার নিজের হাতে লেখা কিতাবের মতানুযায়ী বিধান দেয় এবং আল্লাহর কিতাবকে পরিত্যাগ করে এবং সে মনে করে যে তার কাছে যে কিতাব আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, সে কাফির হয়ে গেল- (ইবনে জারীর)। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অভিমতও অনুরূপ।
وَمَنْ لَم يُحْكُمْ -এ আয়াত مَنْ শব্দটি الَّذِي শব্দের সমার্থজ্ঞাপক এবং আয়াতটি ইয়াহুদীদের শানে নাযিলকৃত। এখানে من শব্দটি الَّذِي শব্দের সমার্থ জ্ঞাপক- (কুরতুবী)। অর্থ হল: ঐ সমস্ত ইয়াহুদী- যারা রজম, কিসাস ও অন্যান্য ইলাহী বিধান³¹ পরিবর্তন করে নিজেদের মনগড়া বিধান আল্লাহ সঙ্গে সম্পৃক্ত করতো, তারা কাফির। কাজেই এখানে এরূপ উক্তি উহ্য আছে: ইয়াহুদীগণ, যারা ফায়সালা করে না সে মতে, যে বিধান নাযিল করেছেন আল্লাহ, তারা কাফির। সুতরাং এ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তন্মধ্যে এটাই উত্তম (কুরতুবী)। খারিজীরা এ আয়াত দিয়ে জোর দাবি করে যে, যে সমস্ত মুসলিম³² ফাসিক, তারাও কাফিরদের হুকুমের মধ্যে শামিল, যখন তারা গায়রুল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে; তখন তারা কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই দলিল (খারেজীদের অন্যান্য দলিলের ন্যায়) পরিত্যাজ্য। কেননা, যে ধরণের ফায়সালার কথা এখানে বলা হয়েছে। তার সম্পর্ক আমলের সাথে নয়, বরং তা আক্বীদা-বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত। আর সে ব্যক্তি অবশ্যই কাফির হয়ে যায়। যে আক্বীদার দিক দিয়ে আল্লাহর কানুন বা বিধানকে ভুল বলে এবং নিজের মতবাদকে সঠিক মনে করে। এখানে অর্থ হলো: জ্বলের সাথে আমল করা এবং তা হলো অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা। আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা যদি কেউ বিশ্বাস না করে, তবে তার কাফির হওয়ার ব্যাপারে কোনরূপ মতানৈক্য নেই- (রূহ)। আয়াতটি সাধারণ নয়, বরং কাফিরদের বিশেষকরে ইয়াহুদীদের সাথে সম্পৃক্ত এবং এ ব্যাপারে তাবেঈনদের মাঝে আবূ সালিহ, ইকরামা, যাহহাক, কাতাদা -এর ও অন্যান্যরা ছাড়াও, সাহাবীদের মাঝে হুযায়ফা ও ইবনে 'আব্বাস একমত। বরং এতদসম্পর্কে নবী পর্যন্ত সনদ মওজুদ আছে। যেমন- বাররা বিন আযিব নবী থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ বাণী: আর যারা ফায়সালা দেয় না সে মতে, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ, তারা তো কাফির; আর যারা ফায়সালা করে না সে মতে, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ, তারা তো ফাসিকু। আয়াতগুলো ফাসিকদের শানে নাযিল হয়েছে (ইবনে জারীর)।
আবূ সালিহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: সূরা মায়িদার মধ্যে যে তিনটি আয়াত আছে: "আর যারা ফায়সালা দেয় না সে মতে, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ, তারা তো কাফির, যালিম এবং ফাসিকু" -আয়াতগুলি ইসলামের অনুসারীদের শানে নাযিল হয় নি, বরং তা কাফিরদের শানে নাযিল হয়েছে- (ইবনে জারীর)। যাহ্হাক থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: উপরোক্ত আয়াত 'আহলে কিতাবদের' শানে নাযিল হয়েছে (ইবনে জারীর)। ইকরামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উপরোক্ত আয়াতগুলি 'আহলি কিতাব' এর শানে নাযিল হয়েছে (ইবনে জারীর)। উবায়দুল্লাহ ইবনে 'আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আয়াতগুলো ইয়াহুদীদের শানে নাযিল হয়েছে আর তাদের গুণাবলি বর্ণনার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে (ইবনে জারীর)। ইবনে 'আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করে- "যারা সে মত ফায়সালা করে না, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ, তারা কাফির, যালিম ও ফাসিকু; আয়াতত্রয় বিশেষভাবে ইয়াহুদীদের শানে নাযিল হয়েছে" (রূহ)।
• বাররা ইবনে 'আযিব, হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান, ইবনে আব্বাস, আবু মাজলায, আবূরাজা আতারদী, ইকরামা; উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ, হাসান বসরী প্রমুখ সুধীগণ বলেন: আয়াতগুলো 'আহলে কিতাবদের' শানে নাযিল হয়েছে। এ উম্মাতের অপরাধ বর্ণনার জন্য নয় (মা'আলিম)।
ইমাম ইবনে জারীর তাবারী স্বীয় স্বভাবসুলভ বর্ণনা ভঙ্গীতে বলেন যে, আয়াতের সম্পর্ক হলো কাফির ও আহলে কিতাবদের সাথে; বর্ণনা ধারায় তাদের কথা উল্লেখ আছে এবং এর আগেও তাদের সম্বন্ধে আলোচনা রয়েছে। অন্যান্য বিশিষ্ট মুফাসসিরীনদের অভিমতও এরূপ। ইবনে জারীর বলেন: আমার নিকট এ অভিমতই অধিক যুক্তিযুক্ত যে, এসব আয়াত আহলে কিতাবের কাফিরদের শানে নাযিল হয়েছে। কেননা, এর পূর্বাপর আয়াতের আলোকে জানা যায় যে, তাদের সম্পর্কে এগুলো নাযিল হয়েছে এবং দোষারোপ তাদেরই করা হয়েছে (ইবনে জারীর)। ইমাম শা'বী বলেন: আয়াতগুলো বিশেষভাবে ইয়াহুদীদের শানে নাযিল হয়েছে এবং নাহ্হাসের অভিমতও এরূপ (কুরতুবী)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন ফায়সালাকে মানতে অস্বীকার করে, অথবা এমন ফায়সালা দেয়, যা আল্লাহর হুকুমের বিপরীত এবং বলে: নিশ্চয় এ হলো আল্লাহর হুকুম, সে ব্যক্তি কাফির। যেমন বনূ ইসরাঈলরা কাফির হয়েছিল, যখন তারা এরূপ করেছিল। (জাসসাস)
আল্লাহবিরোধি কানুন মোতাবেক ফায়সালা করার কারণে যদি কোন মুসলিম অভিযুক্ত হয়; তবে তখন হবে, যখন সে জেনেশুনে সজ্ঞানে শরীআতের প্রকাশ্য ও স্পষ্ট বিধানের খিলাফ কিছু করবে এবং সে তখন অভিযুক্ত হবে না- যখন হুকুমটি গোপন কোন বিষয়ের ইঙ্গিতবহ হবে এবং না জেনে, না শুনে সে তার অপব্যাখ্যা করবে। এ সম্পর্কে উলামাদের অভিমত হলো- যদি কেউ শরীআতের স্পষ্ট দলিলের খিলাফ কিছু করে বা বলে, তবে সে অভিযুক্ত হবে, পক্ষান্তরে শরীআতের গোপনতত্ত্ব যার কাছে স্পষ্ট নয়, সে যদি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভুল করে বসে, তবে সে অভিযুক্ত হবে না (মা'আলিম)। তাবে'য়ী ইকরামা, যার সঙ্গে ইমাম রাযী এর বক্তব্যের মিল আছে বলেন: যতক্ষণ কেউ কোন ইলাহী বিধানকে অন্তর দিয়ে মানবে এবং মুখে তা স্বীকার করবে, সে কিরূপে অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারে। যদি তার কাজ-কর্ম, বিশ্বাস ও স্বীকারোক্তির খিলাফ হয়, তবে তাকে গুনাহগার এবং হুকুম তরককারী বলা যেতে পারে; তাকে অস্বীকারকারী বা কাফির ও বিদ্রোহী বলা যাবে না। ইকরামা বলেন: আল্লাহর কথা- “যে ব্যক্তি ফায়সালা করে না সে মতে, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ- সে কাফির"-এ অভিমত তার উপর প্রযোজ্য, যে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে এবং মুখে অস্বীকার করে এবং 'আল্লাহর হুকুম' হিসাবে যে মুখে তা স্বীকার করে, এরপর খিলাফ কিছু করে, তবে সে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার বিরোধিতাকারী নয়, বরং সে হবে তা তরককারী। সেজন্য এ আয়াতের আওতায় এনে তাকে অভিযুক্ত করা যাবে না। এটাই সহীহ জবাব (কাবীর)।
আমাদের যামানায় খারেজী মাযহাবের প্রচার ও প্রসার ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে। সুন্দর সুন্দর নাম ও উপাধীধারী ব্যক্তিরা এ কাজে নিয়োজিত। তারা এ আয়াত দ্বারা তাদের মতাদর্শ প্রচারে প্রয়াসে। সেজন্য জরুরী মনে করে আয়াতটির ব্যাখ্যা কিছু বিস্তারিতভাবে 'আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের' মাযহাব অনুযায়ী করা হলো।³³
১০. বাদীউত তাফাসীর: ইমাম বাদীউদ্দীন শাহ আর-রাশেদী তাঁর সিন্ধি ভাষায় লিখিত 'বাদীউত তাফাসীরে' আলোচ্য আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে তাফসীরে দুররে মানসুর ও তাফসীরে কুরতুবী থেকে পূর্বোক্ত তাফসীরগুলোর সমার্থক উদ্ধৃতিগুলো দেয়ার পর লিখেছেন: "সম্মানিত পাঠক! আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক ফায়সালা জারি না করা কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। যেভাবে ইমাম যাহাবী তাঁর 'আল-কাবায়ির'-এর ৩১ নং কবীরাহ গুনাহর বর্ণনাতে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কেবল কবীরা গুনাহর কারণে মুসলিম ইসলাম থেকে বহিষ্কার হয় না, যতক্ষণ না সে নিজের কৃত আমলটিকে সহীহ বা হকু হওয়ার আক্বীদা রাখে। বরং যদি তা সে ভুল মনে করে, অথচ কোন বিশেষ (মাজবুরী) পরিস্থিতিতে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফায়সালা না করে- তবে সে অবশ্যই যালিম ও ফাসিকু। কিন্তু তাকে কাফির বা ইসলাম থেকে খারিজ বলা যাবে না। এটাই আহলে সুন্নাতের ইজমা'য়ী মাসআলা যা প্রথম থেকে চলে আসছে। কিন্তু খারেজীরা সব ধরণের কবীরা গোনাহকারীকে কাফির বলে থাকে।.... তারা এই আয়াতটি দ্বারা দলিল নিয়ে থাকে এবং অন্যান্য দলিল-প্রমাণ থেকে নিজেদের চোখ বন্ধ রাখে। যেমনটি বিদ'আতীরা নিজেদের প্রমাণ উপস্থাপনে এমনটি করে থাকে।..." [বাদীউত তাফাসীর (১৯৯৮ ইং) ৭/২৩৮ পৃষ্ঠা)
উদ্ধৃত সমস্ত তাফসীরগুলো থেকে প্রমাণিত হলো, আলোচ্য আয়াত প্রসঙ্গে সুন্নী মুসলিমদের প্রকৃত আক্বীদা ও তাফসীর সেটাই যা শায়েখ নাসিরুদ্দীন আলবানী থেকে আমরা এই বইয়ের শুরুতে উল্লেখ করেছি। উপরোক্ত সমস্ত মুফাসসির এ ব্যাপারে একমত যে, কুফর দু'ধরনের হয়ে থাকে। যথা: ক. কুফরে 'আমালী; খ. কুফরে ইতিক্বাদী।
এই প্রকারভেদ শায়েখ আলবানী একাই করেন নি। তাছাড়া আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান জারি না করাতে কুফরের স্তর বিন্যাসেও তাদের উপস্থাপনায় কোন পার্থক্য নেই। যদি এই কারণে তাকে মুরজিয়া বলা হয়, তবে পূর্বোক্ত সমস্ত তাফসীরকারকগণও একই অভিযোগে অভিযুক্ত। অথচ এক্ষেত্রে তাদের উপস্থাপনায় আমরা ঐকমত্য লক্ষ করি। সুতরাং এর বিপরীত মতই গোমরাহ পথ। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক দিন।

টিকাঃ
২৬. তাফসীরে মাযহারী (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৪০৫/১৯৮৮) ৩/৭০০-০১ পৃঃ।
২৭. তাফসীরে মাযহারী ৩/৭০৭ পৃঃ।
২৮. তাফসীরে মাযহারী ৩/৭০৯ পৃঃ।
২৯. সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী ইবাদত ও ইতা'আতকে একই দৃষ্টিতে দেখেছেন। এর ব্যাখ্যা সফিউর রহমান মুবারকপুরী লিখিত 'ইবাদত ও ইতা'আত' অনুচ্ছেদে আসবে ইনশাআল্লাহ।
৩০. বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা অনুবাদে: 'খোদায়ী কানুন' শব্দ আছে। আমরা তা পরিবর্তন করে 'আল্লাহর কানুন' উল্লেখ করলাম।
৩১. বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা অনুবাদে: 'খোদায়ী বিধান' শব্দ আছে। আমরা তা পরিবর্তন করে 'ইলাহী বিধান' উল্লেখ করলাম।
৩২. বাংলা অনুবাদে 'মুসলমান' আছে। আমরা, 'মুসলিম' লিখলাম।
৩৩. আব্দুল মাজেদ দরিয়াবাদী, তাফসীরে মাজেদী (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জুন ১৯৯২) ২/৫৬৬-৬৮ পৃষ্ঠা।

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 হাকিম বা বিচারককে কখন কাফির গণ্য করা যাবে?

📄 হাকিম বা বিচারককে কখন কাফির গণ্য করা যাবে?


-কামাল আহমাদ
১. মনগড়া বা মানবরচিত বিধানকে আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত বিধান বলার কারণে: আল্লাহ বলেন: وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ "তোমরা আমার আয়াতকে সামান্য ও নগণ্য বিনিময়ে বিক্রি করো না। যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।" (সূরা মায়িদা: ৪৪-৪৭ আয়াত)
আয়াতটির শানে-নুযূলে প্রমাণিত হয়, ইয়াহুদীরা রজমের বিধানকে পরিবর্তন করে ভিন্ন বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বলেছিল। এমর্মে অন্যত্র আল্লাহ বলেন: فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِندِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ "অতএব, তাদের জন্য আফসোস! যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত, যেন এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ উপার্জন করতে পারে। অতএব তাদের জন্য ওয়েল (জাহান্নাম), তাদের কিতাব লেখার জন্য এবং তাদের জন্য ওয়েল (জাহান্নাম) তাদের উপার্জনের জন্য।" (সূরা বাক্বারাহ: ৭৯ আয়াত)
সুতরাং প্রমাণিত হল, যখন কোন আলেম বা হাকিম বা অন্য যে কেউ এমন কোন বিধান বা ফতওয়া দেয় যা আল্লাহ নাযিল করেন নি। অথচ জনগণের মাঝে তা আল্লাহর বিধান হিসাবে প্রচার করে। তখনই কেবল উক্ত আয়াতগুলোর হুকুম প্রযোজ্য। যা বিভিন্ন মাযহাবী ফিক্বহাহ, ফতওয়া ও সূফীদের তরীক্বাতে দেখা যায়। অথচ সেগুলোর পক্ষে আল্লাহ কিছুই নাযিল করেন নি।
২. আল্লাহ শু'র প্রতি মিথ্যারোপ এবং অস্বীকার করার কারণে: পূর্বোক্ত পন্থায় আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করা হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَذَبَ عَلَى اللَّهِ وَكَذَّبَ بِالصِّدْقِ إِذْ جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْكَافِرِينَ
"তার চেয়ে অধিক যালেম কে আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলবে এবং তার কাছে সত্য আগমনের পর তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। কাফিরদের বাসস্থান কি জাহান্নাম নয়? (সূরা যুমার: ২৪ আয়াত)
৩. হারামকৃত বস্তুকে হালাল এবং হালালকৃত বস্তুকে হারাম ঘোষণা করার কারণে:
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ
"তোমাদের মুখ থেকে সাধারণভাবে যেসব মিথ্যা বের হয়ে আসে, তেমনি করে আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করে বলো না যে, এটা হালাল এবং ওটা হারাম। নিশ্চয় যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যারোপ করে তারা সফল হবে না।" (সূরা নাহাল: ১১৬ আয়াত)
৪. বিচারক, আলেম-উলামা, পীর-দরবেশদেরকে হালাল ও হারাম করার হক্কদার গণ্য করার কারণে: আল্লাহ বলেন:
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ "তারা তাদের আহবার (আলেম) ও রুহবান (সূফী)-দের আল্লাহর পরিবর্তে রব হিসাবে গ্রহণ করেছে।” (সূরা তাওবা: ৩১ আয়াত) নবী আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন:
أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُونَهُمْ وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحَلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ وَإِذَا حَرَّمُوا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوهُ
“এমন নয় যে, তারা এদের ইবাদত করত। বরং এরা যদি তাদের জন্য কিছু হালাল করে দিত তখন তারা তা হালাল বলে গ্রহণ করত; এরা যখন কোন কিছু হারাম বলে স্থির করতো তখন তারাও তা হারাম বলে গ্রহণ করতো।” ³⁴
এখানে হালাল বা হারাম নির্ধারণ করে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা নাযিলকৃত বা ইলাহী হুকুম গণ্য করাকে চূড়ান্ত কুফর হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। কাফির হওয়ার বিভিন্ন কারণ ও শর্ত রয়েছে। এখানে আমরা কেবল আল্লাহর বিধান জারি করা ও না করার ক্ষেত্রে কাফির হওয়ার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ উল্লেখ করলাম।

টিকাঃ
৩৪. হাসান: তিরমিযী- তাফসীরুল কুরআন, সূরা তাওবা। আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। (তাহক্বীকুকৃত তিরমিযী হা/৩০৯৫]

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 ফিতনাতুলুত তাকফীর (কাফির বলার ফিতনা)

📄 ফিতনাতুলুত তাকফীর (কাফির বলার ফিতনা)


-মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী
[এই অংশটি www.AsliAhleSunnet.com থেকে সংগৃহীত। যা উর্দু ভাষায় অনূদিত ও সঙ্কলিত 'ফিতনাতু তাকফীর আওর হুকুম বিগয়রি মা আনঝালাল্লাহ' ১৩৯-১৬২ পৃষ্ঠা থেকে বাংলা ভাষায় অনূদিত হল। মূল (আরবী:) মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী , উর্দু অনুবাদ: তারিকু আলী বারভী (উর্দু অনুবাদক মূল আরবির ভাবানুবাদের দিকেই বেশী ঝুঁকেছেন এবং শায়েখ উসায়মীন প্রদত্ত টিকা সংযোজন করেছেন ও শিরোনামগুলো সংযুক্ত করেছেন), বাংলা অনুবাদ: কামাল আহমাদ]
إِنَّ الْحَمْدُ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِي لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أَمَّا بَعْدُ :
খারেজী: এই তাকফীরের মাসআলা কেবল হাকিমের (শাসকের/ বিচারকের) ক্ষেত্রেই নয়, বরং মাহকুমের (শাসিতের/সাধারণ জনগণের) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটি একটি খুবই প্রাচীন ফিতনা, যা ইসলামের মধ্যকার একটি প্রাচীন ফিরক্বা হতে সৃষ্টি হয়েছিল। যারা 'খারেজী' নামে প্রসিদ্ধ।³⁷

টিকাঃ
৩৭. খারেজীদের সম্পর্কে ফিরক্বাগুলোর পরিচয় সম্পর্কীত কিতাবে লেখা হয়েছে। তাদের মধ্যকার একটি ফিরক্বার অস্তিত্ব আজ পর্যন্ত রয়েছে- তবে ভিন্ন অপর একটি নামে তথা "আবাদ্বিয়াহ"। এই "আবাদ্বিয়াহ” ফিরক্বা নিকটবর্তী অতীতকাল পর্যন্ত (ইসলামী) রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে পৃথক ছিল। তারা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যারা কোনরূপ দা'ওয়াতী কাজের তৎপরতায় নিজেদেরকে জড়িত করে নি। কিন্তু বিগত বেশ কিছু বছর ধরে তারা তাদের তৎপরতা শুরু করেছে। এ সম্পর্কে আমি কিছু পুস্তিকা ও আক্বীদা সম্পর্কীত গ্রন্থ প্রকাশ ও প্রচার করেছি, যা মূলত প্রাচীন খারেজীদের আক্বীদা সম্পর্কীত ছিল। কিন্তু তারা তাদের ঐসব বৈশিষ্ট্যকে শিয়াদের মত তাক্বীয়ার দ্বারা গোপন করার চেষ্টা করছে। তারা বলে আমরা খারেজী নই। যদিও আপনারা এটা জানেন যে, নাম পরিবর্তনে প্রকৃত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয় না। এরা কবীরা গোনাহকারীকে কাফির মনে করার ব্যাপারে খারেজীদের মতন। (টিকা: মূল আরবি 'ফিতনাতুত তাকফীর' (দারু ইবনে খুযায়মাহ, ১৪১৮ হিঃ) পৃ: ১৪। (বাংলা অনু:)

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 দ্বীনি জামা’আত থেকে বিমুখ থাকার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

📄 দ্বীনি জামা’আত থেকে বিমুখ থাকার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দিক


বর্তমানে কিছু জামা'আত কুরআন ও সুন্নাতের দা'ওয়াতের ব্যাপারে হকু জামা'আতের সাথে মিশে রয়েছে। কিন্তু হায় আফসোস! তারা কুরআন ও সুন্নাত থেকে বের হয়ে কুরআন ও সুন্নাতের নামে নতুন পথের সৃষ্টি করেছে। আমার বুঝ ও জ্ঞান মোতাবেক এর দু'টি কারণ রয়েছে:
প্রথমত: ইলমের ঘাটতি।
দ্বিতীয়ত: সবচে বড় দুর্বলতা হল, শরী'আতের আইন-কানুনের ব্যাপারে তাদের গভীর জ্ঞান না থাকা। অথচ আকাঙ্ক্ষা হল সহীহ ইসলামী দা'ওয়াতের। যার থেকে বিমুখ হওয়াকে রসূলুল্লাহ তাঁর অসংখ্য হাদীসে নাজী (মুক্তিপ্রাপ্ত) জামা'আত থেকে বহিষ্কৃত বলে চিহ্নিত করেছেন। বরং আরো একধাপ এগিয়ে বলা যায়, স্বয়ং আল্লাহ সুস্পষ্ট দলিল দ্বারা এই জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্নদের আল্লাহ ও রসূলের বিরুদ্ধাচারণকারী হিসাবে গণ্য করেছেন।
সালাফী মানহায: যেমন আল্লাহ বলেছেন: وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا -
"আর যে ব্যক্তি রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাঁর নিকট হিদায়াত সুস্পষ্ট হওয়ার পর এবং মু'মিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে সে যেদিকে ফিরে যায়, সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দেবো এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। আর তা কত মন্দ আবাস।"³⁸
আলেমগণ এটা জানেন যে, আল্লাহ কেবল এ কথা বলেই ক্ষান্ত হন নি “যে ব্যক্তি রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাঁর নিকট হিদায়াত সুস্পষ্ট হওয়ার পর- তবে সে যেদিকে ফিরে যায়, সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দেবো।” বরং রসূলের বিরুদ্ধাচরণের কথা উল্লেখ করার সাথে সাথে وَيَتَّبع غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ “এবং যে মু'মিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে" -বাক্যটিও উল্লেখ করেছেন।
"মু'মিনদের পথ”-এর অনুসরণ করা বা না করাটা, পক্ষ ও বিপক্ষ উভয় দৃষ্টিতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি "মু'মিনদের পথ”-এর অনুসরণ করবে সে রব্বুল 'আলামীনের দৃষ্টিতে নাজী (মুক্তিপ্রাপ্ত)। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি "মু'মিনদের পথ”-এর বিপরীতে চলবে তার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট, আর তা কতই না মন্দ ঠিকানা।
এটাই সেই মূলকেন্দ্র যে ব্যাপারে প্রাচীন ও আধুনিক জামা'আতগুলো হোঁচট খায়। তারা سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ "মু'মিনীনদের পথে'র অনুসরণ করে না। কুরআন ও সুন্নাতের তাফসীরের ব্যাপারে নিজেদের বিবেকের দারস্থ হয় এবং নিজেদের খাহেশের (প্রবৃত্তির) আনুগত্য করে। আর এ ভুলের কারণে তারা অত্যন্ত বিধ্বংসী কার্যকলাপে লিপ্ত। যার ফলাফল হল, তারা সালফে-সালেহীনের মানহায থেকে খারীজ (বহিষ্কৃত)।
আলোচ্য আয়াতের وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ “এবং যে মু'মিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে" -অংশটির সঠিক ও সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা এবং প্রকৃত গুরুত্ব নবী ﷺ-এর বিভিন্ন সহীহ হাদীসে উল্লেখ করেছেন। যার কয়েকটি আমি বর্ণনা করব। ঐ সমস্ত হাদীস সাধারণ মুসলিমদেরও অজানা নয়। তবে এর মধ্যে তাদের অজানা হল, سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ "মু'মিনদের পথ”-এর অনুসরণের ব্যাপারটি কিতাব ও সুন্নাহ'র দ্বারা ওয়াজিব হওয়ার দলিল প্রতিষ্ঠিত হওয়া ও তার গুরুত্ব অনুধাবন করা। এটা (আক্বীদা বিষয়ক) এমন একটি মৌলিক দিক যা অনেক প্রসিদ্ধ গণ্যমান্য ব্যক্তিরও এর গুরুত্ব বুঝতে ভুল হয়েছে ও আঁকড়ে থাকার ব্যাপারে উদাসীনতা কাজ করেছে। এরা তাকফীরকারী হিসাবে প্রসিদ্ধ। যাদের মধ্যে অনেক জামা'আত রয়েছে- যারা নিজেদের জিহাদের সাথে সম্পৃক্ত রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে তাদের তাকফীর করাটাই খুব বড় ভুল।
এই লোকেরা মনে করছে, তারা নিজেদেরকে নেকী ও ইখলাসের মধ্যে নিয়োজিত রেখেছে। কিন্তু আল্লাহ'র কাছে কারো নাজাত বা সফলতার অর্জনের জন্য কেবল নেকনীতি ও ইখলাসই যথেষ্ট নয়। তবে অবশ্যই একজন মুসলিমের উপর জরুরী হল, সে আল্লাহ'র জন্য নিয়্যাতে ইখলাস রাখবে এবং রসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাত অনুযায়ী সর্বোত্তম আমল করবে।
মোটকথা একজন মুসলিম অবশ্যই ইখলাস ও আন্তরিকতার সাথে নিজে কুরআন ও সুন্নাত অনুযায়ী 'আমল করবে এবং সে দিকেই দা'ওয়াত দিবে। তবে এর সাথে অপর একটি শর্তও জরুরী, তা হল- তাদের মানহায সঠিক ও দৃঢ়তা সম্পন্ন হওয়া। আর এটা কখনোই পূর্ণতা লাভ করে না, যতক্ষণ না সালফে-সালেহীনের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়।
এর স্বপক্ষে কয়েকটি প্রসিদ্ধ হাদীস রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল তিয়াত্তর ফিরক্বার হাদীস যার ইঙ্গিত আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। রসূলুল্লাহ বলেছেন: اِفْتَرَقَتِ الْيَهُودُ عَلَى إِحْدَى وَسَبْعِينَ فِرْقَةً فَوَاحِدَةٌ فِي الْجَنَّةِ وَسَبْعِينَ فِي النَّارِ وَافْتَرَقَتِ النَّصَارَى عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً فَإِحْدَى وَسَبْعُونَ فِي النَّارِ وَوَاحِدَةً فِي الْجَنَّةِ وَسَتَفْتَرِقَ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثَ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً كُلُّهَا فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً قَالُوْا مَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ الْجَمَاعَةِ - وَفِي رِوَايَةٍ : مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
"ইয়াহুদীরা একাত্তর ফিরক্বাতে বিভক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে একটি জান্নাতে যাবে, অন্য সত্তরটি ফিরক্বা জাহান্নামী হবে। নাসারাগণ বাহাত্তর ফিরক্বাতে বিভক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে একটি জান্নাতে যাবে এবং অন্য একাত্তরটি ফিরক্বা জাহান্নামে যাবে। আর আমার উম্মাত তিয়াত্তর ফিরক্বাতে বিভক্ত হবে। এদের মধ্যে একটি ছাড়া সবগুলোই জাহান্নামে যাবে। জিজ্ঞাসা করা হল: ইয়া রসূলাল্লাহ! তারা কারা? তিনি বললেন: (তারা হল) 'আল-জামা'আত'। (অন্য বর্ণনায়) যার ওপর আমি ও আমার সাহাবীগণ আছি।"³⁹
নবী-কে নাজী বা জান্নাতী ফিরক্বা সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে তিনি যা বলেছেন আল্লাহর বাণী: وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ "এবং যে মু'মিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে"-দ্বারা এটা পূর্ণতা লাভ করে। সুতরাং এই আয়াতটিতে যে মু'মিনদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে-তারা হলেন নবী-এর সাহাবীগণ। যা হাদীসে বর্ণিত: مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي "যার ওপর আমি ও আমার সাহাবীগণ আছি" উক্তিটিতে সুস্পষ্ট হয়েছে। নবী কেবল এতটুকুই যথেষ্ট মনে করেন নি। বরং এটা প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তাদের জন্য যথেষ্ট ও পরিপূর্ণ জবাব ছিল- যারা ছিলেন কিতাব ও সুন্নাতের সুস্পষ্ট বুঝের অধিকারী। কিন্তু যদিও নবী নিজে আল্লাহর ঐ দাবির প্রতি আমল করেছিলেন যে ব্যাপারে আল্লাহ স্বয়ং তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمِ "মু'মিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়াময়।"⁴⁰
সুতরাং নবী-এর সমস্ত স্নেহ ও দয়ার দাবি হল, তিনি তাঁর সাহাবা এবং সমস্ত অনুসারীদের জন্য ফিরক্বায়ে নাজীয়াহ বা মুক্তিপ্রাপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ সুস্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। যেন তারা সেগুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে- যার প্রতি তিনি ও পরবর্তীতে তাঁর সাহাবীগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
-পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে, মুসলিমদের জন্য জায়েয নয় কিতাব ও সুন্নাত বুঝার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র ঐ সমস্ত জরুরী ইলমের উপর নির্ভর করবে যেমন- আরবি ভাষা, নাসিখ-মানসুখ এবং বিভিন্ন নিয়ম (উসূল) সম্পর্কীত জ্ঞান। বরং এই সমস্ত নিয়ম ছাড়াও ঐ পদ্ধতিরও অনুসরণ করা জরুরী যার ওপর সাহাবীগণ-ও ছিলেন। কেননা এটা সবার কাছে সুস্পষ্ট যে, তাদের বর্ণনা ও জীবন থেকে বুঝা যায়- সাহাবীগণ আল্লাহর ইবাদাতের ব্যাপারে মুখলেস (নিষ্ঠাবান) ছিলেন। আর কুরআন ও সুন্নাতের ব্যাপারে নিঃসন্দেহে আমাদের থেকে বেশী জ্ঞান রাখতেন। তাছাড়াও তাদের এমন অনেক চারিত্রিক গুণ ছিল যে ব্যাপারে তারা নিজেরাই নিজেদের তুলনা।
আলোচ্য হাদীসটি পূর্বোক্ত আয়াতটির পরিপূর্ণতা দান করে। যখন রসূলুল্লাহ ﷺ একজন মুসলিমকে ফিরক্বায়ে নাজিয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে এ দিকে ইঙ্গিত দিলেন যে, তারা ঐ মানহাযের ওপর থাকবে যার ওপর সাহাবীগণ ছিলেন। এই হাদীসটি 'খুলাফায়ে রাশেদীন' সম্পর্কীত হাদীসটির পরিপূরক যা সুনানগুলোতে ইরবায বিন সারিয়াহ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
وَعَظَنَا مَوْعِظَةً وَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ وَذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ الله كَأَنَّهَا مَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ فَأَوْصِنَا قَالَ : أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ تَأَمُّرَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ وَإِنَّهُ مَنْ يَعِشَ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدَ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
"একবার রসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের উদ্দেশ্যে এমনি মর্মস্পর্শী ওয়ায করলেন যে, তাতে অন্তরসমূহ ভীত ও চোখসমূহ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। আমরা বললাম: ইয়া রসূলাল্লাহ! মনে হচ্ছে এটা যেন বিদায়ী ভাষণ, তাই আপনি আমাদের উপদেশ দিন। তিনি বললেন: আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করার এবং শ্রবণ ও আনুগত্যের উপদেশ দিচ্ছি যদিও কোন গোলাম তোমাদের আমীর নিযুক্ত হয়। কেননা তোমাদের মধ্যে যারা ভবিষ্যতে বেঁচে থাকবে, অচিরেই তারা অসংখ্য ব্যাপারে মতভেদ দেখতে পাবে। কাজেই তোমাদের উচিত হবে আমার ও হিদায়েতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদার আদর্শকে মাড়ির মযবুত দাঁত দ্বারা আঁকড়ে ধরা। আর তোমরা বিদআত হতে অবশ্যই বেঁচে থাকবে। কেননা প্রত্যেক বিদআত সুস্পষ্ট গোমরাহী।"⁴¹
এই হাদীসটি পূর্বোক্ত হাদীসটির শাহেদ (সাক্ষ্য) যেখানে রসূলুল্লাহ সাহাবা তথা নিজের উম্মাতকে কেবল তাঁর সুন্নাতকে আঁকড়ে থাকারই নসিহত করেন নি বরং হিদায়াত অর্জনে খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকেও আঁকড়ে ধরতে বলেন।
সুতরাং আমাদের ওপর জরুরী হল- আক্বীদা, ইবাদত, আখলাক, চাল-চলন প্রভৃতি সবক্ষেত্রেই সালফে-সালেহীনের প্রতি লক্ষ্য রাখা। ফলে একজন মুসলিম ফিরক্বায়ে নাজিয়ার অন্তর্ভূক্ত হিসাবে গণ্য হবে।
এটাই সেই গুরুত্বপূর্ণ দিক যার থেকে গাফেল ও বিমুখ হওয়ার কারণে সমস্ত নতুন ও পুরাতন ফিরক্বা ও জামাআত গোমরাহ হয়েছে। কেননা আলোচ্য (সূরা নিসা- ১১৫) আয়াত এবং ফিরক্বায়ে নাজিয়াহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনকে আঁকড়ে থাকার হাদীস যে মানহাযের (আদর্শিক পথের) দিকে পরিচালিত করে- তারা তা কবুল করে নি। যা ছিল উম্মাতের বিভেদের কারণ। সুতরাং তাদের মৌলিক ও যৌক্তিক বৈশিষ্ট্য হল- তারা কিতাবুল্লাহ, সুন্নাতে নববী এবং সালফে সালেহীনদের থেকে বিমুখ হয়েছে, যেভাবে তাদের পূর্ববর্তীরাও বিমুখ হয়েছিল।

টিকাঃ
৩৮. সূরা নিসা: ১১৫ আয়াত।
৩৯. সহীহ: ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান- بَابُ افْتِرَاقِ الْأمم : হা/৩৯৯২। মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দীন আলবানী اَجْمَاعَةُ 'আল-জামা'আত' শব্দে বর্ণিত হাদীসটিকে 'সহীহ' বলেছেন। অপর পক্ষে তিরমিযীতে আব্দুল্লাহ বিন 'উমর থেকে বর্ণিত- مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَانِي -"যার ওপর আমি এবং আমার সাহাবীরা আছি" -হাদীসটিকে য'য়ীফ বলেছেন। [আল-বানীর তাহক্বীকুকৃত মিশকাত ১ম খন্ড (বৈরুত: আল-মাকতাবুল ইসলামী, ১৪০৫হি:/১৯৯৫ 'ঈসায়ী) পৃ: ৬১] অবশ্য উদ্দেশ্যের দিক থেকে হাদীসগুলো একই অর্থবোধক হওয়ায় ও অনেক সাক্ষ্য থাকায় তিনি অন্যত্র হাদীসটিকে হাসান লি- গয়রিহী বলেছেন (সলাতুল ঈদায়ীন ফিল মুসাল্লা পৃঃ ৪৬)। আলবানী হাদীসটি কিছুটা সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। বাংলা অনুবাদক
৪০. সূরা তওবা: ১২৮ আয়াত।
৪১. সহীহ: আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও ইবনে হিব্বান তাঁর 'সহীহ' গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব ১/৩৭ নং)। মুহাম্মাদ তামিরও হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন [আত-তারগীব ওয়াত তারহীব (মিশর: দার ইবনে রজব) ১/৫৮ নং। আলবানী হাদীসটি কিছুটা সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। (বাংলা অনুবাদক' )

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00