📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 হাকিম ও হুকুম সম্পর্কীত আয়াতের বিশ্লেষণ

📄 হাকিম ও হুকুম সম্পর্কীত আয়াতের বিশ্লেষণ


যারা ইসলাম অনুযায়ী শাসন পরিচালনা না করার জন্য শাসক বলতেই কাফির বলে ফতোয়া দিচ্ছে তাদের দলিল হলো কুরআনের ঐ সমস্ত আয়াত, যেখানে আল্লাহ তাঁর নিজের ও তাঁর রসূলের হুকুম অমান্যকারীকে 'মু'মিন নয়' বলে সম্বোধন করেছেন। এ বিষয়টি পূর্বে আলোচিত মুনাফিকু ও খারেজীদের আলোচনায় প্রমাণিত হয়েছে যে, তাদের ঈমান ও আক্বীদা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কাছে অগ্রহণযোগ্য হলেও, ইসলামী রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না- যতক্ষণ তাদের ইসলামবিরোধি আক্বীদাগুলো আমল হিসাবে বাস্তবরূপ লাভ করে। এখন এ সম্পর্কীত অন্যান্য আয়াতগুলো নবী -এর যামানার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হল।
প্রথম আয়াত: আল্লাহ বলেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
"কিন্তু না, আপনার রবের কুসম! তারা মু'মিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিরোধে আপনাকে হাকিম না বানায়, এরপর আপনার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে না নেয়।" [সূরা নিসা- ৬৫ আয়াত]
দৃষ্টান্ত: উরওয়া থেকে বর্ণিত; হাররা বা মদীনার কঙ্করময় ভূমিতে একটি পানির নালা নিয়ে যুবায়ের এর সাথে একজন আনসার ঝগড়া করেছিলেন। নবী বললেন: 'হে যুবায়ের! প্রথমত, তুমি তোমার জমিতে পানি দাও, তারপর তুমি প্রতিবেশীর জমিতে পানি ছেড়ে দেবে।' আনসার বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! সে আপনার ফুফাত ভাই, তাই এই ফায়সালা দিলেন। এতে অসন্তুষ্টিবশত রসূল এর চেহারা রক্তিম হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন: 'হে যুবায়ের! তুমি পানি চালাবে তারপর আইল পর্যন্ত ফিরে না আসা পর্যন্ত তা আটকে রাখবে তারপর প্রতিবেশীর জমির দিকে ছাড়বে।' আনসারী যখন রসূল ﷺ কে রাগিয়ে তুললেন তখন তিনি তার হক পুরোপুরি যুবায়ের কে প্রদানের স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন। তাদেরকে প্রথমে নবী এমন একটি নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে উদারতা ছিল। فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ : মুয়্যায বলেন: আয়াতটি এ উপলক্ষে নাযিল হয়েছে বলে আমার ধারণা। [সহীহ বুখারী- কিতাবুত তাফসীর।
আলোচ্য আয়াত থেকে প্রমাণিত হলো, নবীকে বিচারক অমান্যকারী আক্বীদাগতভাবে কাফির। কিন্তু নবী কর্তৃক এ ধরণের বিচার অমান্যকারীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং পূর্বে মুনাফিকু ও খারেজীদের উদ্ভব সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে আমরা প্রমাণ পেয়েছি, নবী তাঁর বিচারের রায় অমান্যকারীকে لَمَّلَهُ أَنْ يَكُونَ يُصَلِّي “সম্ভবত সে সালাত আদায় করে” বাক্যের মাধ্যমে ছাড় দিয়েছেন ও তাদের ভবিষ্যৎ ফিতনার প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার দিকে সাহাবীদের নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থাৎ আক্বীদাগত কুফর যতক্ষণ পর্যন্ত আমলী কুফরে পরিণত হয়ে প্রকাশিত না হয় এবং সমগ্র মুসলিম ও ইসলামের জন্য ফিতনাতে পরিণত না হচ্ছে- ততক্ষণ পর্যন্ত এমন লোকদের ছাড় দিতে নবী নির্দেশ দিয়েছেন।
এই আয়াতটির শানে-নুযূল হিসাবে অপর একটি বর্ণনা হলো, একজন ইয়াহুদী ও মুনাফিকু মুসলিমের সাথে সংঘটিত ঘটনা। যেখানে নবী ইয়াহুদী ব্যক্তিটির পক্ষে রায় দিলে মুনাফিকু মুসলিমটি তা অমান্য করে, শেষাবধি উমার -এর কাছে বিচার পেশ করে। উমার নবী এর ফায়সালা অমান্য করার কথা শুনে মুনাফিকু ব্যক্তিটিকে হত্যা করেন। কিন্তু এই হাদীসটি গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম ইবনে কাসির বলেছেন: হাদীসটি গরীব, মুরসাল (সূত্রছিন্ন), তাছাড়া এর অন্যতম রাবী আব্দুল্লাহ ইবনে লাহইয়া (তাফসীরে ইবনে কাসির, সূরা নিসা: ৬৫ নং আয়াত দ্রঃ)। এছাড়া হাদীসটির শেষে বর্ণিত হয়েছে: অতঃপর নবী উমার -কে উক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করার দণ্ড হতে মুক্তি দিলেন। তবে পরবর্তীকালে এটা প্রথা হয়ে দাঁড়ানোকে আল্লাহ অপছন্দ করলেন এবং পরবর্তী (নিসা- ৬৬) আয়াতটি নাযিল হল।
তাছাড়া হাদীসটি পূর্বে বর্ণিত খারেজীদের উদ্ভব সংক্রান্ত সহীহ বুখারীর হাদীসটির বিরোধি। সেখানে খালিদ বিন ওয়ালিদ রসূলুল্লাহ -এর কাছে তাঁর বিচার অমান্যকারীকে হত্যা করার অনুমতি চাইলে তিনি তা নিষেধ করেন। সুতরাং হাদীসটি সহীহ হাদীসের বিরোধি হওয়ায় বাতিল। তাছাড়া নিচের সহীহ হাদীসটিও আমাদের বক্তব্যকে সমর্থন করে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদ বলেন: যখন নবী হুনায়নের গনীমত বন্টন করে দিলেন, তখন আনসারদের এক ব্যক্তি বলে ফেলল, এই বণ্টনের ব্যাপারে তিনি আল্লাহ'র সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখেন নি। কথাটি শুনে আমি নবী-এর কাছে আসলাম এবং তাঁকে কথাটি জানিয়ে দিলাম। তখন তাঁর চেহারার রঙ পরিবর্তিত হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন: رَحْمَةُ الله عَلى مُوسَى لَقَدْ اُوْذِيَ بِأَكْثَرَ مِنْ هَذَا فَصَبَرَ “আল্লাহ, মূসা -এর উপর রহমত বর্ষণ করুন। তাঁকে এর চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সবর করেছিলেন।” [সহীহ বুখারী- কিতাবুল মাগাযী- بَابُ غَزْوَةِ الطَّائِفِ; সহীহ মুসলিম- কিতাবুয যাকাত م بَابُ اعْطَاءِ الْمُوَلَفَةِ قُلُوْهُمْ শব্দগুলো সহীহ বুখারীর।
সুতরাং সবক্ষেত্রে আমলগত কুফর ইসলামী রাষ্ট্রের ঘোষিত চূড়ান্ত মুরতাদ হিসাবে গণ্য হবে না। বরং এখানে كُفَرُ دُونَ كُفْرٍ )চূড়ান্ত কুফরের চেয়ে কম কুফর) নীতি প্রযোজ্য। নবী -এর নিজস্ব এই আমলটিই ইবনে আব্বাস-এর এই তাফসীরের প্রত্যক্ষ সমর্থক।
দ্বিতীয় আয়াতঃ আল্লাহ বলেন: وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا
"আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন বিষয়ের ফায়সালা দিলে কোন মু'মিন পুরুষ কিংবা মু'মিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার নেই। আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়।” [সূরা আহযাব- ৩৬ আয়াত]
আলোচ্য আয়াতটি যয়নাব বিনতে জাহাশের সঙ্গে যায়দ বিন হারিসের বিয়ে সম্পর্কে নাযিল হয়। প্রথমে যয়নাব এই বিয়েতে রাজী ছিলেন না। তখন আয়াতটি নাযিল হলে তিনি বিয়েতে রাজী হন। (সূরা আহযাবের ৩৬ নং আয়াতের বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থ অবলম্বনে)
عَنْ قَتَادَةَ قَالَ: خَطَبَ النَّبِيُّ ﷺ زَيْنَبَ وَهِيَ بِنْتُ عَمَّتِهِ وَهُوَ يُرِيدُهَا لِزَيْدٍ فَظَنَّتْ أَنَّهُ يُرِيدُهَا لِنَفْسِهِ فَلَمَّا عَلِمَتْ أَنَّهُ يُرِيدُهَا لِزَيْدٍ أَبَتَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: ﴿وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ﴾ فَرَضِيتْ وَسَلَّمَتْ رَوَاهُ الطَّبْرَانِيُّ بِأَسَانِيدَ وَرِجَالُ بَعْضُهَا رِجَالُ الصَّحِيح . ص ۲۰۹ (মুজমু'আয়ে যাওয়ায়েদ ৮/২০৮ পৃঃ)
এরপরেও তাদের বিয়ে টিকল না এবং শেষাবধি নবী -এর সাথে যয়নাব বিনতে জাহাশের বিয়ে হয় এবং সে সম্পর্কে পরবর্তী আয়াতটি নাযিল হয়।
আল্লাহ বলেন:
وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَاهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا
"স্মরণ করুন! আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলেছিলেন যে, 'তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর।' আপনি মনে মনে যা গোপন করেছেন আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিয়েছেন। আপনি লোক ভয় করছিলেন অথচ আল্লাহকেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত। এরপর যায়দ যখন তার স্ত্রী (যয়নাব)'র সাথে বিয়ে ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিয়ে দিলাম। যাতে মু'মিনদের পালকপুত্রদের নিজ স্ত্রীদের সাথে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করলে সে সব নারীকে বিয়ে করায় মু'মিনদের কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।" [সূরা আহযাব- ৩৭ আয়াত]
মূলত আয়াতটি দাবি হল:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ "নবী মু'মিনদের কাছে তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর।" [সূরা আহযাব: ৬ আয়াত]
অথচ মুনাফিকুগণ কখনই এই দাবি পূরণ করে না। তারপরেও রাষ্ট্রে বা সমাজে ফিতনা বিস্তার না করা পর্যন্ত তাদেরকে ছাড় দেয়া হয়েছে। অনুরূপ খারেজীদের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য।
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসের বর্ণিত শানে নুযূল আক্বীদাগত কুফরের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী আলোচনাতে প্রমাণিত হয়েছে, নবী-এর যামানাতে কেবল সামগ্রিকভাবে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধি ফিতনাবাজদের বিরুদ্ধেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ এসেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে রসূল তাদের ব্যাপারে সবরের নীতি অবলম্বন করেছিলেন। আবু বকরের যুগে যারা বিদ্রোহ করেছিল তা গোটা উম্মাতের বিরুদ্ধে ছিল। তা-ই তিনি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেন। উসমান-এর বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করেছিল তাদেরকে তিনি গোটা উম্মাতের সাথে গণ্য না করে কেবল নিজের সাথেই সংশ্লিষ্ট করেন। ফলে তিনি আদম-এর নেককার পুত্র, মূসা ও নবী-এর ন্যায় সবরের নীতি অনুসরণ করেন। তিনি মুসলিমদের মধ্যে রক্তপাত ঘটানোর পরিবর্তে নিজের মযলুম অবস্থায় শহীদ হওয়াকে বেছে নেন।
এ সম্পর্কে আরো যেসব আয়াত দলিল হিসাবে উল্লেখ করা হয়, তার সবই ‘ইবাদত ও আক্বীদাগত কুফরের সাথে সংশ্লিষ্ট।” যার জবাব পূর্বের ন্যায়। নবী কর্তৃক তাঁর যামানার আমল ও উম্মাতের প্রতি তার নির্দেশ থেকে বিষয়টি আমাদের কাছে সুস্পষ্ট।
দ্রষ্টব্য: পরিশিষ্টাংশ- ২।

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 আয়াতে তাহকীম (সূরা মায়িদাহ- আয়াত ৪৪-৪৭) এবং প্রসিদ্ধ তাফসীরগ্রন্থ

📄 আয়াতে তাহকীম (সূরা মায়িদাহ- আয়াত ৪৪-৪৭) এবং প্রসিদ্ধ তাফসীরগ্রন্থ


-সঙ্কলক: কামাল আহমাদ
[এই পুস্তকের শুরুতে শায়েখ নাসিরুদ্দীন আলবানী কর্তৃক ইমাম ইবনে জারীর তাবারীর 'তাফসীরে তাবারী' থেকে এ সম্পর্কীত বিশ্লেষণের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। এখন আলোচ্য আয়াতটির ব্যাপারে আরো কয়েকটি প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেয়া হলো। যেন এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের মুফাসসিরদের আক্বীদাগত উপস্থাপনার ব্যাপারে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ না থাকে। - সঙ্কলক]
১. তাফসীরে কুরতুবী: ইমাম কুরতুবী তাঁর বিখ্যাত "আল-জামে'উ লি-আহকামিল কুরআন"-এ আলোচ্য আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন:
قوْله تَعَالَى: ﴿وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ وَ الظَّالِمُونَ وَ الْفَاسِقُوْنَ نَزَلَتْ كُلُّهَا فِي الْكُفَّارِ ثَبَتَ ذَلِكَ فِي صَحِيحِ مُسْلِم مِنْ حَدِيْثِ الْبَرَاءِ وَقَدْ تَقَدَّمَ وَعَلَى هُذَا الْمُعْظَمِ فَأَمَّا الْمُسْلِمُ فَلَا يَكْفُرُ وَإِنِ ارْتَكَبَ كَثِيرَةٌ وَقِيلَ : فِيْهِ إِضْمَارُ أَي وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ رَدًّا لِلْقُرْآنِ وَجَحْدًا لِقَوْلِ الرَّسُوْلِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ فَهُوَ كَافِرُ قَالَهُ ابْنُ عَبَّاسٍ وَمُجَاهِدٌ فَالْآيَةُ عَامَّةٌ عَلَى هُذَا قَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ وَالْحَسَنُ : هِي عَامَّةٌ فِي كُلِّ مَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ الْمُسْلِمِينَ وَالْيَهُودُ وَالْكُفَّارُ أَيْ مُعْتَقِدًا ذَلِكَ وَمُسْتَحِلَّا لَهُ فَأَمَّا مَنْ فَعَلَ ذَلِكَ وَهُوَ مُعْتَقِدُ أَنَّهُ رَاكِبٌ مُحِرِّمُ فَهُوَ مِنْ فَسَّاقِ الْمُسْلِمِينَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى إِنْ شَاءَ عَذَبَهُ وَإِن شَاءَ غَفَرَ لَهُ وَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ فِي رِوَايَةٍ : وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَقَدْ فَعَلَ فِعلاً يُضَاهِي أَفْعَالُ الْكُفَّارِ وَقِيلَ : أَيْ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِجَمِيعِ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَهُوَ كَافِرُ فَأَمَّا مَنْ حَكَمَ بِالتَّوْحِيدِ وَلَمْ يَحْكُمْ بِبَعْضِ الشَّرَائِعِ فَلَا يَدْخُلُ فِي هَذِهِ الْآيَةِ وَالصَّحِيحُ الْأَوَّلُ إِلَّا أَنَّ الشَّعْيِي قَالَ : هِيَ فِي الْيَهُودِ خَاصَّةً وَاخْتَارَهُ النَّحَاسُ قَالَ : وَيَدُلُّ عَلَى ذَلِكَ ثَلَاثَةُ أَشْيَاء مِنْهَا أَنَّ الْيَهُودَ قَدْ ذَكَرُوا قَبْلَ هُذَا فِي قَوْلِهِ لِلَّذِينَ هَادُوا فَعَادَ الضَّمِيرُ عَلَيْهِمْ وَمِنْهَا أَنَّ سِيَاقَ الكَلَامِ يَدُلُّ عَلَى ذَلِكَ أَلَا تَرَى أَنَّ بَعْدَهُ وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فَهُذَا الضَّمِيرُ لِلْيَهُودِ بِإِجْمَاعِ وَأَيْضًا فَإِنَّ الْيَهُودَ هُمُ الَّذِيْنَ أَنكُرُوا الرَّجْمَ وَالْقَصَاصَ فَإِنْ قَالَ قَائِلُ : مَنْ إِذَا كَانَتْ لِلْمُجَازَاةِ فَهِيَ عَامَةُ إِلَّا أَنْ يَقَعَ دَلِيلٌ عَلَى تَخْصِيصِهَا قِيلَ لَهُ : مَنْ هُنَا بِمَعْنَى الَّذِي مَعَ مَا ذَكَرْنَاهُ مِنَ الْأَدِلَّةِ وَالتَّقْدِيرِ : وَالْيَهُودُ الَّذِيْنَ لَمْ يَحْكُمُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ فَهَذَا مِنْ أَحْسَنِ مَا قِيلَ فِي هَذَا وَيَرْوِى أَنَّ حُذَيْفَةَ سُئِلَ عَنْ هَذِهِ الْآيَاتِ أَهِيَ فِي بَنِي إِسْرَائِيلَ قَالَ : نَعَمْ هِيَ فِيهِمْ وَلَتَسْلُكْنَ سَبْيْلَهُمْ حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ وَقِيلَ : الْكَافِرُونَ لِلْمُسْلِمِينَ وَ الظَّالِمُونَ لِلْيَهُودِ وَ الْفَاسِقُونَ لِلنَّصَارَى وَهَذَا اخْتِيَارُ أَبِي بَكْرِ بْنِ الْعَرَبِيّ قَالَ : لِأَنَّهُ ظَاهِرُ الآيَاتِ وَهُوَ اخْتِيَارُ بْنِ عَبَّاسٍ وَجَابِرُ بْنُ زَيْدٍ وَابْنُ أَبِي زَائِدَةَ وَابْنُ شَبَرَمَةَ وَالشَّعْنِي أَيْضًا قَالَ طَاوُسُ وَغَيْرُهُ : لَيْسَ بِكُفْرِ يَنْقُلُ عَنِ الْمَلَةِ وَلَكِنَّهُ كُفْرَ دُونَ كُفْرٍ وَهَذَا يَخْتَلِفُ إِنْ حَكَمَ بِمَا عِندَهُ عَلَى أَنَّهُ مِنْ عِندِ اللَّهِ فَهُوَ تَبْدِيلُ لَهُ يُوْجِبُ الكُفْرَ وَإِنْ حَكَمَ بِهِ هَوى وَمَعْصِيَةً فَهُوَ ذَنْبُ تُدْرِكْهُ الْمَغْفِرَةُ عَلَى أَصْلِ أَهْلِ السُّنَّةِ فِي الْغُفْرَانِ لِلْمُذْنِبِينَ قَالَ المُشْرِي : وَمَذْهَبُ الْخَوَارِجِ أَنَّ مَنِ ارْتَشَى وَحَكَمَ بِغَيْرِ حُكْمِ اللهِ فَهُوَ كَافِرُ وَعَزِي هَذَا إِلَى الْحَسَنِ وَالسُّدِّي وَقَالَ الْحَسَنُ أَيْضًا : أَخَذَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى الْحُكَامِ ثَلَاثَةُ أَشْيَاء : أَلَّا يَتَّبِعُوا الْهَوَى وَأَلَّا يَخْشَوا النَّاسَ وَيَخْشَوْهُ وَأَلَّا يَشْتَرُوا بِآيَاتِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا
"আল্লাহ'র বাণী: "যারা হুকুম করে না আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দ্বারা, তারাই কাফির ... যালিম .... ফাসিকু”। আয়াতগুলো সম্পূর্ণরূপে কাফিরদের ব্যাপারে নাযিল হয়, যা সহীহ মুসলিমের বারা বিন 'আযিব থেকে পূর্বে বর্ণিত হয়েছে- আর এটাই প্রাধান্যপ্রাপ্ত। আর মুসলিমের ক্ষেত্রে কুফর হওয়া প্রযোজ্য নয়, আর যদি সে তা করে তবে কবীরাহ গোনাহগার হবে। বলা হয়, এখানে কিছু (বিষয়) উহ্য আছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত কুরআনকে রদ (বাতিল গণ্য) করে, রসূলের (হাদীসের) বিরোধিতা করে - সে কাফির। ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদ আয়াতটির 'আম দাবীর ভিত্তিতে এমনটি বলেছেন। ইবনে মাস'উদ ও হাসান বলেছেন: 'আমভাবে এটা তথা "আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম না করা" -মুসলিম, ইয়াহুদী, কাফির সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; অর্থাৎ যদি তারা 'আক্বীদাগতভাবে সেটিকে (বিধান জারি না করাকে) হালাল বা বৈধ গণ্য করে। আর যদি আমলগতভাবে তা করে অথচ আক্বীদা রাখে যে, হারাম কাজ করছে তবে সে মুসলিমদের মধ্যে ফাসিক বলে গণ্য হবে। তার ব্যাপারটি আল্লাহ উপর ন্যস্ত। ইচ্ছা করলে তিনি আযাব দিবেন, ইচ্ছা করলে মাফ করবেন। ইবনে 'আব্বাস বর্ণনা করেছেন: যদি কেউ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হুকুম না করে- তবে তা কাফিরদের আমলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আরো বলা হয়: যদি কেউ সামগ্রিকভাবে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হুকুম না করে- তবে সে কাফির।
আর যা তাওহীদের হুকুমের অন্তর্গত এবং শরী'আতের কোন কোন হুকুমের ক্ষেত্রে হলে, তবে সেটা এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে প্রথম উক্তিটিই সহীহ। অবশ্য শা'বী বলেছেন: এখানে ইয়াহুদীদের খাস (সুনির্দিষ্ট) করা হয়েছে। নুহাস এটি গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন: “এর দলিল হিসেবে তিনটি বিষয় রয়েছে। (প্রথমত:) এখানে ইয়াহুদীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেভাবে আল্লাহ বলেছেন: "للَّذِينَ هَادُوا", যার যমীর (সর্বনাম) তাদের সাথে সম্পৃক্ত। এ সম্পর্কীত (পূর্বাপর) বর্ণনা প্রসঙ্গও এর দলিল হিসাবে সাব্যস্ত হয়। (দ্বিতীয়ত:) বিশেষভাবে লক্ষণীয় পরবর্তী শব্দ "للَّذِينَ هَادُوا"-যার যমীর (সর্বনাম) ইয়াহুদীদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ব্যাপারে ইজমা' হয়েছে। (তৃতীয়ত:) অনুরূপভাবে ইয়াহুদীরা রজম ও কিসাসকে অস্বীকার করেছিল।
যদি কেউ বলে: এখানে '' শব্দটি যখন ফলাফল হিসাবে আসে তখন এর দাবি 'আম (ব্যাপক), তবে যদি কোন দলিল দ্বারা খাস করা যায়। তাদেরকে বলা যায়: এখানে '' শব্দটির অর্থ الذى যা দলিল দ্বারা সাব্যস্ত হয়। এটি ইয়াহুদীদের মধ্যে যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে না তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট। এটিই সর্বোত্তম উক্তি। বর্ণিত আছে, হুযায়ফা কে আয়াতটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, এখানে কি বনী ইসরাঈল সম্পর্কে ওহি করা হয়েছে? তিনি বললেন: “হাঁ! এটা তাদেরই সম্পর্কে। তোমরা তাদের পথে রয়েছ, প্রতি পদে পদে।”
অনেকে বলেছেন: মুসলিমদের ক্ষেত্রে "الكافرون", ইয়াহুদীদের ক্ষেত্রে "الظالمون", নাসারাদের ক্ষেত্রে "الفاسقون" প্রযোজ্য। আবূ বকর ইবনুল আরাবী আয়াতের প্রকাশ্য ভাব দ্বারা এই অর্থ নিয়েছেন। এই মত ইবনে আব্বাস, জাবির বিন যায়েদ, ইবনে আবী যায়েদাহ, ইবনে শিবরামাহ প্রমুখ গ্রহণ করেছেন। তাউস ও অন্যান্যরা বলেছেন: "এটা এমন কুফর নয় যা মিল্লাত থেকে বহিষ্কার করে, বরং এটি কুফরের থেকে কম কুফর।"
এ ব্যাপারে ইখতিলাফ আছে, যদি তারা হুকুম দেয় তাদের নিকট আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানকে বিকৃত করে, তবে সেক্ষেত্রে কুফর হওয়াটা নিশ্চিত। আর যদি হুকুম করে স্বেচ্ছাচারীতা ও অন্যায়ের মধ্যে দিয়ে তবে তা হবে ক্ষমাযোগ্য পাপ। যা আহলে সুন্নাতের 'পাপীদের জন্য ক্ষমা' নীতির অন্তর্ভুক্ত।
কুশায়রী বলেন: খারেজী মাযহাব হলো, যদি ঘুষ নেয় বা আল্লাহর বিধানের বিরোধি হুকুম দেয় তবে সে কাফির। হাসান ও সুদ্দীর মত এটাই।²⁰ আর এ ব্যাপারে হাসান আরো বলেছেন: আল্লাহ তিন শ্রেণির হাকিমকে পাকড়াও করবেন- যারা নিজের স্বেচ্ছাচারীতার অনুসরণ করেন, যারা লোকদের ভয় করে ও লোকেরা তাদের ভয় করে, যারা সামান্য বিনিময়ে আল্লাহর আয়াত বিক্রি করে। (তাফসীরে কুরতুবী সূরা ৫ মায়িদাহ- ৪৪ আয়াত এর তাফসীর দ্র:।
২. তাফসীরে ইবনে কাসির: ইমাম ইবনে কাসির তাঁর তাফসীরে আয়াতটি তাফসীর প্রসঙ্গে লিখেছেন: وَقَوْلُهُ: ﴿ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزِلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ قَالَ الْبَرَاءُ بْنُ عَازِبٍ، وَحُذَيْفَةُ بْنُ الْيَمَانِ، وَابْنُ عَبَّاسٍ، وَأَبُو مجلز، وأبو رجاء العطاردي، وعكرمة، وَعُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، وَالْحَسَنُ الْبَصَرِي، وَغَيْرُهُمْ: نَزَلَتْ فِي أَهْلِ الْكِتَابِ زَادَ الْحَسَنُ الْبَصْرِيُّ: وَهِيَ عَلَيْنَا وَاحِبَةُ، وَقَالَ عَبْدُ الرَّزَّاقِ عَنْ سُفْيَانِ الثَّوْرِنِي، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ قَالَ: نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَاتُ فِي بَنِي إِسْرَائِيلَ، وَرَضِي اللهُ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ بِهَا. رَوَاهُ ابْنُ جَرِيرٍ.
وَقَالَ ابْنُ جَرِيرٍ أَيْضًا: حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ، حَدَّثَنَا هُشَيْمُ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ الْمَلِكِ بْنُ أَبِي سُلَيْمَانَ، عَنْ سَلَمَةَ بْنِ كُهَيْلٍ، عَنْ عَلْقَمَةَ وَمَسْرُوقِ أَنَّهُمَا سَأَلَا ابْنَ مَسْعُودٍ عَنِ الرَّشْوَةِ فَقَالَ: مَنِ السُّحْتُ: قَالَ: فَقَالَا وَفِي الْحَكَمِ؟ قَالَ: ذَاكَ الْكُفْرا ثُمَّ تَلَا ﴿ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أُنزِلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾
وَقَالَ السُّدِّي: ﴿ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ يَقُولُ: وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلْتُ فَتَرَكَهُ عَمَدًا ، أَوْ جَارَ وَهُوَ يَعْلَمُ، فَهُوَ مِنَ الْكَافِرِينَ [به] وَقَالَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَلْحَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَوْلُهُ: ﴿وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أُنزِلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ قَالَ : مَنْ جَحَدَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَقَدْ كَفَرَ وَمَنْ أَقْرٌ بِهِ وَلَمْ يَحْكُمْ فَهُوَ ظَالِمُ فَاسِقٌ. رَوَاهُ ابْنُ جَرْيرٍ ثُمَّ اخْتَارَ أَنَّ الْآيَةَ الْمُرَادَ بِهَا أَهْلُ الْكِتَابِ، أَوْ مَنْ جَحَدَ حَكَمَ اللهُ الْمَنْزِلِ فِي الْكِتَابِ.
وَقَالَ عَبْدُ الرَّزَّاقِ، عَنِ التَّوْرِي، عَنْ زَكَرِيَّا، عَنِ الشَّعْبِي: ﴿وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ﴾ قَالَ: لِلْمُسْلِمِيْنَ. وَقَالَ ابْنُ جَرِيرٍ : حَدَّثَنَا ابْنُ الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنِ ابْنِ أَبي السَّفَرِ، عَنِ الشَّعِي: ﴿وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أُنزِلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ قَالَ: هُذَا فِي الْمُسْلِمِينَ، ﴿ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴾ قَالَ: هُذَا فِي الْيَهُودِ، ﴿ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴾ قَالَ : هَذَا فِي النَّصَارَى وَكَذَا رَوَاهُ هُشَيْمِ وَالتَّوْرِيُّ، عَنْ زَكَرِيَّا بْن أَبِي زَائِدَةَ، عَنِ الشَّعْي.
وَقَالَ عَبْدُ الرَّزَّاقِ أَيْضًا أَخْبَرَنَا مَعْمَرٍ، عَنْ ابْنِ طَاوُسَ عَنْ أَبَيْهِ قَالَ: سُئِلَ ابْنُ عَبَّاسٍ عَنْ قَوْلِهِ : ﴿وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ قَالَ: هِيَ بِهِ كُفْرُ قَالَ ابْنُ طَاوُسُ : وَلَيْسَ كَمَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتِبُهِ وَرُسُلِهِ.
وَقَالَ الثَّوْرِيُّ، عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ عَنْ عَطَاءٍ أَنَّهُ قَالَ: كُفْرُ دُونَ كُفْرٍ، وَظُلْمُ دُونَ ظُلْمٍ، وَفِسْقٌ دُوْنَ فِسْقِ. رَوَاهُ ابْنُ جَرِيرٍ. وَقَالَ وَكِيعٌ عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ سَعِيدِ الْمَكِّي، عَنْ طاوس: ﴿ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ قَالَ: لَيْسَ بِكُفْرِ يَنقُلُ عَنِ الْمَلَةِ.
وَقَالَ ابْنُ أَبِي حَاتِمٍ: حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ يَزِيدِ الْمَقْرِيِّ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ، عَنْ هِشَامِ بْنِ حُجَيرٍ، عَنْ طَاوُسٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ فِي قَوْلِهِ: ﴿وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أُنزِلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ قَالَ: لَيْسَ بِالْكُفْرِ الَّذِي يَذْهَبُونَ إِلَيْهِ. وَرَوَاهُ الْحَاكِمُ فِي مُسْتَدْرِكِهِ، عَنْ حَدِيثِ سُفْيَانَ بْنِ عُيَيْنَةَ، وَقَالَ: صَحِيحُ عَلَى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ وَلَمْ يَخْرُجَاهُ.
“আল্লাহ'র বাণী: "যা আল্লাহ নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যে বিধান জারি করে না সে কাফির।" বারা ইবনে আযিব, হুযাইফা ইবনে ইয়ামান, ইবনে আব্বাস, আবূ মাজলায, আবূ রিযা আল-আতারিদী, ইকরামা, উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ও হাসান বসরী প্রমুখ বলেছেন: এই আয়াতাংশটি আহলে কিতাবদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। হাসান বসরী বলেন: তবে এর হুকুম আমাদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।”²¹ 'আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তিনি সুফিয়ান সওরী, মানসুর থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবরাহীম বলেন: এই আয়াতাংশটি বনী ইসরাঈলের উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে বটে, কিন্তু এই উম্মাতের জন্যও এই হুকুম বলবৎ ও কার্যকর। (ইবনে জারীর)
ইবনে জারীর বলেন: আমাদেরকে হাদীস বলেছেন ইয়াকুব, (তিনি বলেন) আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করেছেন হুশায়ম, (তিনি বলেন) আমাদেরকে খবর দিয়েছেন আব্দুল মালিক বিন আবূ সুলায়মান, তিনি সালামা বিন কুহাইল থেকে, তিনি 'আলক্বামাহ ও মাশরুক থেকে। তাঁরা উভয়ে ইবনে মাস'উদকে ঘুষ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন: এটা অপবিত্র উপার্জন। তারা আবার জিজ্ঞাসা করেন: ঘুষ গ্রহণ করার ব্যাপারে হুকুম কী? তিনি বলেন, এটা কুফর। অতঃপর তিনি পাঠ করেন: "যা আল্লাহ নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যে বিধান জারি করে না সে কাফির। "²²
সুদ্দী এই আয়াতটি সম্পর্কে বলেন: “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত অথবা জবরদস্তিমূলক আল্লাহর বিধানের বিপরীত হুকুম দেয়, অথচ সে আল্লাহর বিধানের সুফল সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত, সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত।” 'আলী বিন আবী তালহা ইবনে আব্বাস থেকে এই আয়াতটি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান অস্বীকার করে সে কাফির। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান স্বীকার করে বটে, কিন্তু আল্লাহর বিধান অনুসারে হুকুম করে না, সে যালিম ও ফাসিকু (ইবনে জারীর)। আরো বলা হয়েছে, এই আয়াতাংশের লক্ষ্য হলো আহলে কিতাবরা এবং তারা যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অস্বীকার করে।
'আব্দুর রাজ্জাক বলেন: তিনি সাওরী থেকে, তিনি যাকারিয়া থেকে, তিনি শা'বী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এই আয়াতটির সম্পর্ক মুসলিমদের সাথে।
ইবনে জারীর বলেন: আমাদেরকে ইবনে মাসনা হাদীস বর্ণনা করেছেন, (তিনি বলেন) আমাদেরকে আব্দুস সামাদ হাদীস বর্ণনা করেছেন, (তিনি বলেন) আমাদেরকে শু'বাহ হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি ইবনে আবূ সাফর থেকে, তিনি শু'বা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: “যা আল্লাহ নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যে বিধান জারি করে না সে কাফির" -এই আয়াতটি মুসলিমদের জন্য। "যা আল্লাহ নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যে বিধান জারি করে না সে যালিম"-এই আয়াতটি ইয়াহুদীদের উদ্দেশ্যে। "যা আল্লাহ নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যে বিধান জারি করে না সে ফাসিকু" -এই আয়াতটি নাসারাদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। অনুরূপ হুশাইম ও সাওরী থেকে, তাঁরা যাকারিয়া বিন আবী যায়েদাহ থেকে, তিনি শু'বা থেকে বর্ণনা রয়েছে।
'আব্দুর রাজ্জাক বলেন: আমাদের খবর দিয়েছেন মু'আম্মার, তিনি ইবনে তাউস থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ইবনে আব্বাস কে আল্লাহর বাণী- "যা আল্লাহ নাযিল করেছেন 'সে অনুযায়ী যে বিধান জারি করে না সে কাফির" সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বললেন: به کفر এটা কুফর। তাউস বলেন: এটা আল্লাহ, মালাইকা, আসমানী কিতাব ও রসূলকে অস্বীকার করার মতো কুফর নয়।²⁰ সাওরী বলেন: তিনি জুরাইজ থেকে, তিনি 'আতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: কুফরের মধ্যে কম-বেশি আছে, যুলুমের মধ্যে কম বেশি আছে, তেমনি ফিসকের মধ্যেও কম-বেশী আছে-(ইবনে জারীর)। তিনি বলেন, ওয়াকী সুফিয়ান থেকে, তিনি সাঈদ আল- মাক্কী থেকে, তিনি তাউস থেকে বর্ণনা করেছেন: “যা আল্লাহ নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যে বিধান জারি করে না সে কাফির" আয়াতটি সম্পর্কে তিনি বলেন: এ ধরণের কুফরের জন্য কেউ মিল্লাতে ইসলাম থেকে খারিজ হয় না।
আবূ হাতিম বলেন: আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ বিন 'আব্দুল্লাহ বিন ইয়াযীদ মুকিরী, (তিনি বলেন) আমাদের সুফিয়ান বিন উয়ায়না হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি হিশাম বিন হুজায়ের থেকে, তিনি তাউস থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। তিনি আল্লাহর বাণী: “যা আল্লাহ নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যে বিধান জারি করে না সে কাফির" সম্পর্কে বলেন: আয়াতটিতে সেই কুফরের কথা বলা হয়নি, যার দিকে এরা গিয়েছে। হাকিম তার মুস্তাদরাকে এটি বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাকারী বলে, এটা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তে সহীহ, কিন্তু তারা উদ্ধৃত করেন নি।
৩. তাফসীরে খাযেন: ইমাম আবুল হাসান (খাযেন) তাঁর বিখ্যাত লুবাবুত তা'বীল ফী মা'আнит তানযীল এ বলেন: ﴿ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ يَمْعَنَى : أَنَّ الْيَهُودَ لَمَّا أَنْكَرُوا حُكْمَ اللهِ تَعَالَى الْمَنْصُوصَ عَلَيْهِ فِي التَّوْرَاةِ وَقَالُوا إِنَّهُ غَيْرُ وَاجِبِ عَلَيْهِمْ ، فَهُمْ كَافِرُونَ عَلَى الْإِطْلَاقِ بِمُوسَى وَالتَّوْرَاةِ وَبِمُحَمَّدٍ وَالْقُرْآنِ وَاخْتَلَفَ الْعُلَمَاءُ فِيمَنْ نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَاتُ الثَّلَاثُ وَهِيَ قَوْلُهُ : ﴿ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ، وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ، وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴾ فَقَالَ جَمَاعَةُ مِنَ الْمُفَسِّرِينَ : الْآيَاتُ الثَّلَاثُ نَزَلَتْ فِي الْكُفَّارِ وَمَنْ غَيْرَ حُكْمَ اللَّهِ مِنَ الْيَهُودِ ، لِأَنَّ الْمُسْلِمَ وَإِنِ ارْتَكَبَ كَثِيرَةٌ ، لَا يُقَالُ إِنَّهُ كَافِرُ وَهُذَا قَوْلُ ابْنِ عَبَّاسٍ وَقَتَادَةَ وَالضَّحَاكِ ، وَيَدُلُّ عَلَى صِحَةِ هُذَا الْقَوْلِ مَا رُوِيَ عَنِ البَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ أَنْزَلَ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى : ﴿ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ، وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ، وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴾ فِي الْكُفَّارِ لِكُلِّهَا أَخْرَجَهُ مُسْلِمُ وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ ﴿ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ إِلَى قَوْلِهِ هُمُ الْفَاسِقُونَ هَذِهِ الْآيَاتُ الثَّلَاثُ فِي الْيَهُودِ خَاصَّةٌ قُرَيْظَةُ وَالنَّظِيرُ أَخْرَجَهُ أَبُو دَاوُدَ . وَقَالَ مُجَاهِدٌ : فِي هَذِهِ الْآيَاتِ الثَّلَاثِ مَنْ تَرَكَ الْحُكْمَ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ رَدّاً لِكِتَابِ اللَّهِ فَهُوَ كَافِرُ ظَالِمُ فَاسِقٌ .
وَقَالَ عِكْرِمَهُ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ جَاحِدًا بِهِ فَقَدْ كَفَرَ وَمَنْ أَقَرَّ بِهِ وَلَمْ يَحْكُمْ بِهِ فَهُوَ ظَالِمُ فَاسِقٌ وَهُذَا قَوْلُ ابْنِ عَبَّاسٍ أَيْضًا وَاخْتَارُ الرَّجَاجُ لِأَنَّهُ قَالَ : مَنْ زَعَمَ أَنْ حُكْماً مِنْ أَحْكَامِ اللَّهِ تَعَالَى الَّتِي أَتَانَا بِهَا الْأَنْبَيَاءُ بَاطِلُ فَهُوَ كَافِرُ. وَقَالَ طَاوُسٌ : قُلْتُ لِابْنِ عَبَّاسٍ أَكَافِرُ مَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ ۚ فَقَالَ : بِهِ كُفْرُ وَلَيْسَ بِكُفْرٍ يَنْقُلُ عَنِ الْمَلَةِ كَمَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَنَحْوُ هُذَا رُوِيَ عَنْ عَطَاءٍ . وَقَالَ : هُوَ كُفْرُ دُوْنَ الْكُفْرِ ، وَقَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ وَالْحَسَنُ وَالنَّخْعي : هَذِهِ الْآيَاتُ الثَّلَاثُ عَامَّةً فِي الْيَهُودِ وَفِي هَذِهِ الْأُمَّةِ فَكُلُّ مَنِ ارْتَشَى وَبَدَّلَ الْحُكْمَ فَحَكَمَ بِغَيْرِ حُكْمِ اللهِ فَقَدْ كَفَرَ وَظَلَمَ وَفَسَقَ وَإِلَيْهِ ذَهَبَ السُّدِّيُّ لِأَنَّهُ ظَاهِرُ الْخِطَابِ . وَقِيلَ : هَذَا فِيْمَنْ عَلِمَ نَضٌ حُكْمِ اللَّهِ ثُمَّ رَدَّهُ عَيَانًا عَمَدًا وَحَكَمَ بِغَيْرِهِ وَأَمَّا مَنْ خَفِي عَلَيْهِ النَّضُ أَوْ أَخْطَا فِي التَّأْوِيلِ فَلَا يَدْخُلُ فِي هَذَا الْوَعِيدِ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمُرَادِهِ .
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ ... আয়াতটির দাবি: নিশ্চয় ইয়াহুদীদের মধ্যে যারা তাওরাতের মাধ্যমে তাদের উপর বিধিবদ্ধকৃত আল্লাহর হুকুমকে অস্বীকার করতো এবং বলতো এটা জারি করা আমাদের জন্য ওয়াজিব নয় (তাদের সাথে সম্পৃক্ত) তাদের কুফর হলো, মূসা আলাইহিস সালাম -এর তাওরাত, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কুরআনকে বর্জন করা। আলেমদের মধ্যে (সূরা মায়িদাহ- ৪৪-৪৭) আয়াত তিনটির নাযিলের প্রেক্ষাপট নিয়ে মতপার্থক্য আছে। একদল মুফাসসিরীন বলেছেন: আয়াত তিনটি ইয়াহুদীদের মধ্যকার কাফিরদের ব্যাপারে নাযিল হয় যারা আল্লাহর হুকুমের বিরোধি বিধান জারি করত। কেননা মুসলিম (যে কুরআন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর প্রতি প্রকাশ্য ঈমান এনেছে, সে) যদি কাজটি করে তবে তা কবীরা গুনাহর অন্তর্ভূক্ত। তাকে কাফির সম্বোধন করা যাবে না- এটা ইবনে 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, ক্বাতাদাহ ও যিহাকের উক্তি। তাঁদের উক্তির বিশুদ্ধতার স্বপক্ষে বারা বিন আযিব এর বর্ণনা আছে। তিনি বলেন: ... কাফির... যালিম.... ফাসিকু (আয়াত তিনটি) কাফিরদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে (সহীহ মুসলিম)। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: "... কাফির ... যালিম.... ফাসিক" আয়াত তিনটি ইয়াহুদী গোত্র কুরায়যা ও বনূ নাযীরের ক্ষেত্রে খাস (আবূ দাউদ)। মুজাহিদ বলেছেন: যারা আল্লাহর নাযিলকৃত হুকুমকে লঙ্ঘন করে আল্লাহর কিতাব হিসাবে রদ (খণ্ডন) করে- তারাই কাফির, যালিম ও ফাসিকু।
ইকরামা বলেন: যারা আল্লাহর হুকুম জারি না করার জন্য চেষ্টারত- তারা কাফির। আর যারা স্বীকার করে কিন্তু সে অনুযায়ী বিধান জারি করে না তারা যালেম ও ফাসেকু। ইবনে আব্বাস-এর মতও অনুরূপ। যাজ্জাজ এটা গ্রহণ করেছেন। কেননা তিনি বলেন: যে মনে করে বিধানের মধ্যে যেগুলো আল্লাহ'র আহকাম, যা আম্বিয়া-গণ এনেছিলেন- সেগুলো বাতিল, তবে সে কাফির। তাউস বলেছেন: ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করলাম, যে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান জারি করে না সে কি বড় কাফির? তিনি বললেন: به کفر এটা কুফর, তবে এ কুফর দ্বারা মিল্লাত (দ্বীন) থেকে বহিষ্কার হয় না; যেভাবে আল্লাহ, তাঁর মালাইকা, তাঁর রসূল, আখিরাত প্রভৃতির কুফর (মিল্লাত থেকে বহিষ্কার করে)। ²⁴ 'আতা থেকেও এমনটি বর্ণিত হয়েছে যে, "তিনি (ইবনে 'আব্বাস) এটাও বলেছেন: هُوَ كَفَرُ دُوْنَ الْكُفْرِ "এটি কুফরের চেয়ে কম কুফর।” ইবনে মাস'উদ, হাসান ও নাখ'য়ী বলেছেন: আয়াত তিনটি 'আমভাবে ইয়াহুদী ও এই উম্মাতের জন্য। তাদের মধ্যে যারা ঘুষ নেয় এবং বিধান বদলে দেয়, ফলে তা আল্লাহর হুকুমের বিরোধি হলে তবে সে কাফির, যালিম ও ফাসিকু। সুদ্দীও আয়াতের বাহ্যিক সম্বোধন দ্বারা এ দিকেই গিয়েছেন। ²⁵ (তবে) দুর্বল মত হল: যার আল্লাহর হুকুমের প্রমাণ জানা আছে, অতঃপর তা জেনে-বুঝে রদ করে এবং বিপরিত হুকুম দেয়; তেমনি যে আল্লাহর দলীল-প্রমাণ গোপন করে অথবা ব্যাখ্যা দ্বারা বিকৃত করে সে উক্ত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লাহই এই হুকুমের প্রকৃত উদ্দেশ্য জ্ঞাত আছেন। (তাফসীরে খাযেন, সূরা মায়িদার ৪৪ নং আয়াতের তাফসীর)
৪. তাফসীরে বগভী: মুহিউস সুন্নাহ ইমাম বগভী তাঁর তাফসীর مَعَالِمُ التَّنْزِيلِ -এ লিখেছেন: قَالَ قَتَادَةُ وَالضَّحَاكَ : نَزَلَتْ هُذِهِ الْآيَاتُ الثَّلَاثُ فِي الْيَهُودِ دُونَ مَنْ أَسَاءَ مِن هَذِهِ الْأُمَّةِ. رُوِيَ عَنِ البَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ ل في قَوْلِهِ: ﴿وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ وَالظَّالِمُوْنَ وَالْفَاسِقُوْنَ كُلُّهَا فِي الْكَافِرِينَ، وَقِيلَ: هِيَ عَلَى النَّاسِ كُلُّهُمْ وَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ وَطَاوُسُ : لَيْسَ بِكُفْرِ يَنْقُلُ عَنِ الْمَلَةِ، بَلْ إِذَا فَعَلَهُ فَهُوَ بِهِ كَافِرُ وَلَيْسَ كَمَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ. قَالَ عَطَاء: هُوَ كُفَرُ دُونَ كُفْرٍ ، وَظُلْمُ دُونَ ظُلْمٍ، وَفِسْقٌ دُونَ فِسْقٍ، وَقَالَ عِكْرَمَةٌ مَعْنَاهُ: وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ جَاحِدًا بِهِ فَقَدْ كَفَرَ، وَمَنْ أَقَرَ بِهِ وَلَمْ يَحْكُمْ بِهِ فَهُوَ ظَالِمُ فَاسِقٌ. وَسُئِلَ عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنِ يَحْيَى الْكَنَانِي عَنْ هَذِهِ الْآيَاتِ، فَقَالَ: إِنَّهَا تَقَعُ عَلَى جَمِيعِ مَا أَنْزَلَ اللهُ لَا عَلَى بَعْضِهِ، فَكُلُّ مَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِجَمِيعِ مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَهُوَ كَافِرُ ظَالِمُ فَاسِقٌ، فَأَمَّا مَنْ حَكَمَ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ التَّوْحِيدِ وَتَرَكَ الشَّرْكَ، ثُمَّ لَمْ يَحْكُمْ بِجَمِيعِ مَا أَنزَلَ اللهُ مِنَ الشَّرَائِعِ لَمْ يُسْتَوْجِبْ حُكْمَ هَذِهِ الآيات.
“ক্বাতাদাহ ও যাহ্হাক বলেছেন: এই তিনটি আয়াত ইয়াহুদীদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, তেমনি এই উম্মাতের পাপীদের সম্পর্কেও। বারা বিন 'আযিব বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর বাণী: 'যারা হুকুম জারি করে না আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী, তারাই কাফির...... যালিম, ......ফাসিকু" -এর সবগুলোই কাফিরদের অন্তর্ভূক্ত। বলা হয়: সমস্ত মানুষ এর অন্তর্ভূক্ত। ইবনে 'আব্বাস ও তাউস বলেছেন: এই কুফর মিল্লাত (দ্বীন) থেকে বের করে দেয় না, বরং যখন কেউ 'আমলটি করে তখন সেটা (কুফর) হয়। তবে এটা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি কুফর করার মত নয়।
'আতা বলেছেন: এটা কুফরের চেয়ে কম কুফর, যুলুমের চেয়ে কম যুলম, ফিসকের চেয়ে কম ফিসক্ব। অনুরূপ অর্থে ইকরামাহ বলেছেন: যে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান জারি করে না, অস্বীকার করে সে কাফির। আর যে স্বীকৃতি দেয় কিন্তু বিধান জারি করে না সে যালিম ও ফাসিকু। 'আব্দুল 'আযীয বিন ইয়াহইয়া আল-কিনানীকে আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: এটি আল্লাহর নাযিলকৃত সমস্ত বিধানের ক্ষেত্রে সংঘটিত হলে প্রযোজ্য, বিশেষ কিছুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ যে সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম জারি করে না সে কাফির, যালিম ও ফাসিকু। সুতরাং যে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী তাওহীদের অন্তর্ভুক্ত ও শিরক ত্যাগকারী এবং (কিছু কিছু ক্ষেত্রে) আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী শরি'আতী বিষয় জারি করে না, তবে তার প্রতি আলোচ্য আয়াতটির প্রয়োগ ওয়াজিব হয় না। [তাফসীরে বগভী, সূরা মায়িদা- ৪৪ নং আয়াতের তাফসীর]
৫. তাফসীরে কাবীর: ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী তাঁর সুবিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ مَفَاتِيحُ الْغَيْبِ -এ আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: قَالَ : ﴿ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ وَفِيهِ مَسْأَلَتَانِ : الْمَسْأَلَةُ الْأُولَى : الْمَقْصُودُ مِنْ هَذَا الْكَلَامِ تَهْدِيدُ الْيَهُودِ فِي إِقْدَامِهِمْ عَلَى تَحْرِيفِ حُكْمِ اللهِ تَعَالَى فِي حَدِ الزَّانِي الْمُحْصِنِ ، يَعْنِي أَنَّهُمْ لَمَّا أَنْكُرُوا حُكْمَ اللَّهِ الْمَنْصُوصَ عَلَيْهِ فِي التَّوْرَاةِ وَقَالُوا : إِنَّهُ غَيْرِ وَاجِبِ ، فَهُمْ كَافِرُونَ عَلَى الْإِطْلَاقِ ، لا يَسْتَحْقُوْنَ اسْمَ الْإِيْمَانِ لَا بُمُوسَى وَالتَّوْرَاةِ وَلَا بِمُحَمَّدٍ وَالْقُرْآنِ . الْمَسْأَلَةُ الثَّانِيَةُ : قَالَتِ الْخَوَارِجُ : كُلُّ مَنْ عَصَى اللَّهُ فَهُوَ كَافِرُ. وَقَالَ جَمْهُورُ الْأَئِمَّةِ : لَيْسَ الْأَمْرُ كَذَلِكَ ، أَمَّا الْخَوَارِجُ فَقَدْ احْتَجُوا بِهَذِهِ الْآيَةِ وَقَالُوا : إِنَّهَا نَصُ فِي أَنَّ كُلَّ مَنْ حَكَمَ بِغَيْرِ مَا أَنْزَلَ اللهُ فَهُوَ كَافِرُ ، وَكُلَّ مَنْ أَذْنَبَ فَقَدْ حَكَمَ بِغَيْرِ مَا أَنزَلَ اللهُ ، فَوَجَبَ أَنْ يَكُونَ كَافِراً ، وَذَكَرَ الْمُتَكَلِّمُونَ وَالْمُفْسِرُونَ أَجُوبَةً عَنْ هَذِهِ الشَّبُهَا الْأَوَّلُ : أَنَّ هَذِهِ الآيَةَ نَزَلَتْ فِي الْيَهُودِ فَتَكُونُ مُخْتَصَّةٌ بِهِمْ ، وَهَذَا ضَعِيفُ لِأَنَّ الْإِعْتِبَارَ بِعُمُومِ اللَّفْظِ لَا بِخُصُوصِ السَّبَبِ ، وَمِنْهُمْ مَنْ حَاوَلَ دَفْعَ هَذَا السُّؤَالِ فَقَالَ : الْمُرَادُ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ مِنْ هُؤُلَاءِ الَّذِينَ سَبَقَ ذِكْرُهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ، وَهُذَا أَيْضاً ضَعِيفٌ لِأَنَّ قَوْلَهُ ﴿ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللهُ كَلَامُ أَدْخَلَ فِيهِ كَلِمَةٌ مِنْ فِي مَعْرِضِ الشَّرْطِ ، فَيَكُونُ لِلْعُمُومِ ، وَقَوْلُ مَنْ يَقُولُ : الْمُرَادُ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ الَّذِينَ سَبَقَ ذِكْرُهُمْ فَهُوَ زِيَادَةٌ فِي النَّصِ وَذَلِكَ غَيْرُ جَائِزِ .
الثاني : قَالَ عَطَاءُ : هُوَ كُفْرُ دُونَ كُفْرٍ ، وَقَالَ طَاوُسُ : لَيْسَ بِكُفْرَ يَنقُلُ عَنِ الْمَلَةِ كَمَنْ يَكْفُرُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ، فَكَأَتَهُمْ حَمَلُوا الْآيَةَ عَلَى كُفْرِ النِّعْمَةِ لَا عَلَى كُفْرِ الدِّيْنِ ، وَهُوَ أَيْضًا ضَعِيفُ ، لِأَنَّ لَفَظَ الْكُفْرِ إِذَا أَطْلَقَ انْصَرَفَ إِلَى الْكُفْرِ في الدين .
والثَّالِثُ : قَالَ ابْنُ الْأَنْبَارِيُّ : يَجُوزُ أَنْ يَكُونَ الْمَعْنَى : وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَقَدْ فَعَلَ فِعْلاً يُضَاهِي أَفَعَالَ الْكُفَّارِ ، وَيَشْبَهُ مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ الْكَافِرِينَ ، وَهُذَا ضَعِيفُ أَيْضاً لِأَنَّهُ عَدُولَ عَنِ الظَّاهِرِ .
وَالرَّابِعُ : قَالَ عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ يَحْيَ الْكَنَانِي : قَوْلُهُ ﴿ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ﴾ صِيغَةً عُمُومٍ ، فَقَوْلُهُ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللهُ ﴾ مَعْنَاهُ مَنْ أَتَى بِضِدْ حُكْمِ اللَّهِ تَعَالَى في كُلِّ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ، وَهَذَا حَقٌّ لِأَنَّ الْكَافِرَ هُوَ الَّذِي أَتَى بضد حُكْمِ اللَّهِ تَعَالَى فِي كُلِّ مَا أَنْزَلَ اللهُ ، أَمَّا الْفَاسِقُ فَإِنَّهُ لَمْ يَأْتِ بِضِدْ حُكْمِ اللَّهِ إِلَّا فِي الْقَلِيلِ ، وَهُوَ الْعَمَلُ ، أَمَّا فِي الْإِعْتِقَادِ وَالْإِقْرَارُ فَهُوَ مُوَافِقُ ، وَهَذَا أَيْضاً ضَعِيفُ لأَنَّهُ لَوْ كَانَتْ هُذِهِ الآيَةٌ وَعِيداً مَخصُوصاً بِمَنْ خَالَفَ حُكُمُ اللَّهُ تَعَالَى فِي كُلِّ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى لَمْ يَتَنَاوَلْ هَذَا الْوَعِيدُ الْيَهُودَ بِسَبَبِ مُخَالَفَتِهِمْ حُكْمَ اللَّهِ فِي الرَّحِمِ ، وَأَجْمَعَ الْمُفَسِّرُونَ عَلَى أَنَّ هَذَا الْوَعِيدَ يَتَنَاوَلُ الْيَهُودَ بِسَبَبٍ مُخَالَفَتِهِمْ حُكْمَ اللَّهِ تَعَالَى فِي وَاقِعَةِ الرَّجْمِ ، فَيَدُلُّ عَلَى سُقُوْطِ هَذَا الْجَوَابِ ، وَالْخَامِسُ : قَالَ عِكْرَمَةٌ : قَوْلُهُ ﴿ وَمَن لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ﴾ إِنَّمَا يَتَنَاوَلُ مَنْ أَنْكَرَ بِقَلْبِهِ وَجَحَدَ بِلِسَانِهِ ، أَمَّا مَنْ عَرَفَ بِقَلْبِهِ كُونُهُ حُكْمَ اللَّهِ وَأَقَرَّ بِلِسَانِهِ كَوْنُهُ حُكْمَ اللَّهِ ، إِلَّا أَنَّهُ أَلَى بِمَا يُضادُّهُ فَهُوَ حَاكِمُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى ، وَلَكِنَّهُ تَارِكُ لَهُ ، فَلَا يَلْزَمُ دُخُولَهُ تَحْتَ هَذِهِ الْآيَةِ ، وَهُذا هُوَ الْجَوَابُ الصَّحِيحُ وَاللَّهُ أَعْلَمُ .
মহান আল্লাহ বাণী: "যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দ্বারা হুকুম জারি করে না তারাই কাফির"-এ আয়াতে দু'টি মাসআলা আছে:
প্রথম মাসআলা: আলোচ্য বাক্যের উদ্দেশ্য হলো, ইয়াহুদীদের ভীতি প্রদর্শন করা, কেননা বিবাহিত যেনাকারীর হদের (শাস্তির) ব্যাপারে আল্লাহর দেওয়া বিধানকে তারা বিকৃত করে নিজেদের মধ্যে কায়েম রেখেছিল। কেননা তাদের উপর বিধিবদ্ধকৃত তাওরাতের হুকুমকে তারা অস্বীকার করেছিল। তারা বলতো: এটা জারি করা তাদের উপর ওয়াজিব নয়। এই নিকৃষ্ট কাজের জন্য তারা কাফির। তারা প্রকৃত ঈমানের দাবি পূরণ করত না, মূসার -এর তাওরাতের প্রতিও না এবং মুহাম্মাদ ও কুরআনের প্রতিও ঈমান রাখত না।
দ্বিতীয় মাসআলা: খারেজীরা বলে: যে কোন ব্যাপারে আল্লাহর বিরুদ্ধাচারী কাফির। কিন্তু অধিকাংশ ইমামগণ বলেছেন: এমনটি নয়। তবে খারেজীরা আয়াতটি দ্বারা নিজেদের পক্ষে দলিল গ্রহণ করে থাকে। তারা বলে: এ থেকে প্রমাণ পাওয়া গেল, যে কোন বিষয়েই কেউ আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বিরোধি হুকুম দিলে সে কাফির। তেমনি যে ব্যক্তি এমন কোন পাপে জড়িত হয় যা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বিরোধি (বা পাপ হিসাবে স্বীকৃত), তবে তার কাফির হওয়াটা ওয়াজিব (নিশ্চিত)। মুতাকাল্লিম ও মুফাস্সিরগণ এই সংশয়ের যে জবাব দিয়েছেন তা নিম্নরূপ:
প্রথমত: আয়াতটি ইয়াহুদীদের সম্পর্কে নাযিল হয়, এজন্য এর দাবি তাদের সাথে খাস (সুনির্দিষ্ট)। এ মতটি য'য়ীফ, কেননা শব্দের 'আম দাবির ভিত্তিতে এর সবব (কারণটি) সুনির্দিষ্ট হয় না। যারা আলোচ্য বিতর্কটি খণ্ডনের চেষ্টা করেন, তারা বলেন: আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, যারা হুকুম করে না যা তাদের প্রতি পূর্বে (তাওরাত/ইনজিলে) আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে- তারাই কাফির। কেননা আল্লাহ বলেছেন: وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ বাক্যগুলোর মধ্যকার "" শব্দটি মা'রিযে শর্ত (معرض الشرط), যার দাবিই 'আম (ব্যাপকার্থক) নেয়া। আর যারা বলে থাকেন : وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ এর উদ্দেশ্য তারাই যাদের বর্ণনা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি উক্ত দলিলের মধ্যে অতিরিক্ত সংযোজন -যা জায়েয নয়।
দ্বিতীয়ত: 'আতা বলেছেন, এটা كُفر دُونَ كُفْرٍ (কুফরের চেয়ে কম কুফর)। তাউস বলেছেন: এটা এমন কুফর নয় যা মিল্লাত থেকে বহিষ্কার করে, যেভাবে আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি কুফর (বহিষ্কার করে)। কেননা তাদের ব্যাপারে আয়াতটির সম্পৃক্ততা 'কুফরুন নিয়ামাত' (প্রদত্ত বিষয়াদির প্রতি কুফর) ছিল, 'কুফরুদ দ্বীন' (দ্বীনের মধ্যকার কুফর) ছিল না। এই মতটিও য'য়ীফ। কেননা এখানে আল-কুফর শব্দটি দ্বীনের কুফরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত।
তৃতীয়ত: ইবনুল আম্বাবারী বলেন: আয়াতটির জায়েয অর্থ হলো- আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম জারি না করার 'আমলটি কারো দ্বারা বাস্তবায়িত হলে তা কাফিরদের 'আমলের মতো। অর্থাৎ কাফিরদের বাড়াবাড়ির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এটাও দুর্বল উপস্থাপনা। কেননা তাদের বিমুখতা সুস্পষ্ট।
চতুর্থত: 'আব্দুল আযীয বিন ইয়াহইয়া আল-কিনানী বলেন, আল্লাহর বাণী : بِمَا أَنْزَلَ الله সিগায়ে 'আম। সুতরাং আল্লাহর বাণী : وَمَن لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ الله-এর অর্থ হলো, যদি কেউ আল্লাহর 'র নাযিলকৃত সমস্ত হুকুমের বিরোধিতা করে তবে সে কাফিরদের অন্তর্ভূক্ত। আর ফাসিক হল, যে ব্যক্তি 'আমলের ব্যাপারে অল্প কিছু ছাড়া আল্লাহর হুকুমের বিপরীতে যায় না। আর যদি সে আক্বীদা ও স্বীকৃতির ব্যাপারে তেমনটি করে তবেও অনুরূপ (কাফির) হবে। এটাও একটি য'য়ীফ উপস্থাপনা। কেননা যদি আয়াতটির ধমকি এমন ব্যক্তিদের জন্য সুনির্দিষ্ট হতো যারা সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বিরোধিতা করে, তবে আয়াতের ধমকীর সম্পৃক্ততা ইয়াহুদীদের সাথে হতো না- যারা (সুনির্দিষ্টভাবে) রজমের ব্যাপারে আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করেছিল। মুফাসসিরগণের ইজমা' হলো, আলোচ্য ধমকী ইয়াহুদীদের সাথে সম্পৃক্ত- যারা রজম সম্পর্কীত ঘটনাতে আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করেছিল। সুতরাং এই দলিল দ্বারা পূর্বোক্ত জবাবটি খণ্ডিত হয়।
পঞ্চমত: ইকরামাহ বলেছেন, আল্লাহর বাণী: وَمَن لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ الله -এর সম্পৃক্ততা তার সাথে, যে আন্তরিকভাবে অস্বীকার করে এবং মৌখিকভাবেও (বিরোধিতার) চেষ্টা করে। যদি কারো পরিচয় পাওয়া যায়, সে আন্তরিকভাবে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী কাজ করে এবং মৌখিকভাবেও আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী স্বীকৃতি দেয়- তবে যদি তাকে হাকিম হিসাবে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বিপরীতে পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি কেবল (আমলগত আল্লাহর নির্দেশটি) তরককারী। তাকে এ আয়াতটির অন্তর্ভূক্ত করাটা ওয়াজিব হয় না। এটাই (পূর্ণাঙ্গ) সহীহ জবাব, আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
[সংযোজন: পূর্বোক্ত পাঁচটি বক্তব্যের মৌলিক দাবি এক হলেও, খারেজীদের জবাবে শেষোক্ত ইকরামাহ এর উদ্ধৃতিতে পূর্ণাঙ্গতা সুস্পষ্ট। মূলত এটাই ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী -এর বক্তব্যের দাবী। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। -সঙ্কলক]
এছাড়া ইমাম আলুসীর -এর "তাফসীরে রুহুল মা'আনী", ইমাম শওকানীর "তাফসীরে ফতহুল কাদীর” প্রভৃতিতেও উপরোক্ত তাফসীরসমূহের ব্যাখ্যাই অনুসৃত হয়েছে। সুতরাং আমরা এটাই বলতে পারি আহলে সুন্নাতের স্বীকৃত মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ আলোচ্য সূরা মায়েদার ৪৪-৪৭ নং আয়াতের যে তাফসীর করেছিলেন, এ শতাব্দীর মুহাদ্দিস ও মুহাক্কিকু মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী ও সেই পথই অনুসরণ করেছেন।

টিকাঃ
২০. পূর্বে ইমাম কুরতুবী থেকে ইবনে মাস'উদ ও হাসানের রেখাঙ্কিত উদ্ধৃতি থেকে প্রমাণ হয়েছে, তারা খারেজীদের মত পোষণ করতেন না। বরং মুসলিমদের ক্ষেত্রে 'আমালী কুফর গণ্য করতেন। সুতরাং খারেজীদের উদ্ধৃতি দেয়ার পর হাসান ও সুদ্দীর উদ্ধৃতির উল্লেখ স্ববিরোধি হয়। আমরা বলব, খারেজীদের বিশ্বাসের পরে হাসান ও সুদ্দীর বর্ণনার দাবি তাদের থেকে বর্ণিত অন্যান্য দলিল থেকে ব্যাখ্যা নিতে হবে। যা সামনে বর্ণিত হবে ইনশাআল্লাহ। -সঙ্কলক
২১. যখন ইয়াহুদীদের ন্যায় আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করবে। যেমন তারা বলেছিল তাওরাতে রজমের হুকুমটি নেই। কোন মুসলিমও যদি কুরআনে উল্লিখিত কোন বিধান সম্পর্কে বলে কুরআন ও রসূলের হাদীসে নেই- তবে ইয়াহুদীদের মতোই একই কুফরের হুকুম প্রযোজ্য। -সঙ্কলক।
২২. ঘুষ গ্রহণ একটি হারাম কাজ। অর্থাৎ ইবনে মাসউদ আয়াতটি দ্বারা 'আমালী কুফরের' দলিল নিয়েছেন। অনেকে ইবনে মাস'উদ-এর আলোচ্য উদ্ধৃতি থেকে ঘুষ গ্রহণ করে সে অনুযায়ী ফায়সালাকে ইসলাম থেকে খারিজ তবে চূড়ান্ত কাফির বলে গণ্য করেছেন। অথচ ইবনে কাসির আয়াতটির ব্যাখ্যা এখানেই শেষ করেন নি। তার পরবর্তী উদ্ধৃতিগুলো কুফরকে 'আমালী ও আক্বীদা এই দু'ভাগের বিভক্তিকেই সমর্থন করে। -সঙ্কলক।
২০. তাউস থেকে ইবনে আব্বাস ও তাউসের নিজের বর্ণনাটি মূলত একটি বর্ণনা। যা পরবর্তীতে 'তাফসীরে খাযেনের' উদ্ধৃতিতে তাউসের সাথে ইবনে আব্বাস -এর প্রশ্নোত্তরে সুস্পষ্ট হবে। অনেকে উদ্ধৃতিগুলো ভিন্ন ভিন্ন মনে করে বিভ্রান্ত হচ্ছেন, ভুল পথের দাও'য়াত দিচ্ছেন। -সঙ্কলক
২৪. আখবারুল কা'যা গ্রন্থে (১/৪১ পৃষ্ঠা) ইবনে আব্বাসের উক্তিটি হল : گفی به کفره "কুফরের জন্য এটাই যথেষ্ট।" যা নিঃসন্দেহে তাউসের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। পক্ষান্তরে তাউস কর্তৃক 'তাফসীরে খাযেনের' উল্লিখিত বর্ণনাটি পূর্ণাঙ্গ। এ পর্যায়ে বর্ণনাগুলো একটি অপরটির ব্যাখ্যা। তাছাড়া گفی به گفرُه দ্বারাও বড় এবং ছোট উভয় কুফর অর্থ হতে পারে। এ সম্পর্কে "আয়াতে তাহক্বীম ও সালফে সালেহীন" অধ্যায়ে হাফেয ইবনে ক্বাইয়েমের উদ্ধৃতি আসবে ইনশাআল্লাহ। -সঙ্কলক
২৫. এই উক্তির মাধ্যমে 'আমালী ও আক্বীদাগত কুফরের পার্থক্য সুস্পষ্ট হয় না। যার কারণে উভয় পক্ষই এ ধরণের উদ্ধৃতি দ্বারা নিজেদের স্বপক্ষে দলিল গ্রহণ করে থাকে। তবে ঘুষ সম্পর্কীত আমলটি দ্বারা আমরা এভাবে সমন্বয় করতে পারি যে, যখন ঘুষ গ্রহণ কেবল আমলের দিক থেকে হয় তখন তা 'আমালী কুফর' এবং যখন এর সীমা আক্বীদা-বিশ্বাসের দিক থেকেও হয় তখনই কেবল চূড়ান্ত কুফর হয়। যা ইসলাম থেকে তাকে বহিষ্কার করে। -সঙ্কলক

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 কয়েকটি উপমাদেশীয় প্রসিদ্ধ তাফসীর

📄 কয়েকটি উপমাদেশীয় প্রসিদ্ধ তাফসীর


এ পর্যায়ে আমরা এখন উপমহাদেশের কয়েকটি প্রসিদ্ধ তাফসীর থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি।
৬. তাফসীরে মাযহারী: কাযী মুহাম্মাদ সানাউল্লাহ পানিপথী তাঁর “তাফসীরে মাযহারী”-তে সূরা মায়িদার ৪৪ নং আয়াতের শেষাংশ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُوْنَ এর তাফসীরে লিখেছেন: “যদি সে আল্লাহর বিধান তুচ্ছ জ্ঞান করে অন্যরূপ বিধান দেয়। কেউ বলেছেন, এখানে কাফির হওয়ার অর্থ ফাসিকু হওয়া। কুফরের অর্থ সত্য গোপন করা হতে পারে। ইবনে আব্বাস ও তাউস বলেন, এটা এমন কুফরী কাজ নয়, যার দ্বারা মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ হয়ে যাবে, যেমন খারিজ হয়ে যায় আল্লাহ ও পরকালকে অস্বীকার করলে, বরং এরূপ করলে সে সত্যকেই গোপন করবে।”²⁶ অতঃপর তিনি فَأَوَلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ-এর তাফসীরে লিখেছেন: “আল্লাহর বিধান কার্যকরী না করার কারণে।”²⁷ অতঃপর তিনি فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ-এর তাফসীরে লিখেছেন: "এখানে ফাসিকুন এর দু' রকম অর্থ হতে পারে- ক. আল্লাহর বিধানের আনুগত্য থেকে তারা খারিজ; খ. আল্লাহর বিধানকে তুচ্ছ জানার কারণে ঈমান থেকে খারিজ। ²⁸
৭. তাফহীমুল কুরআন: সাইয়েদ আবু আ'লা মওদূদী তাঁর "তাফহীমুল কুরআন"-এ আলোচ্য আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে লিখেছেন:
"যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে না তাদের সম্পর্কে আল্লাহ এখানে তিনটি বিধান দিয়েছেন। ক. তারা কাফের। খ. তারা যালেম। গ. তারা ফাসেকু।
এর পরিষ্কার অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম ও তাঁর নাযিল করা আইন ত্যাগ করে নিজের বা অন্য মানুষের মনগড়া আইনের ভিত্তিতে ফায়সালা করে সে আসলে বড় ধরনের অপরাধ করে। প্রথমত তার এ কাজটি আল্লাহর হুকুম অস্বীকার করার শামিল, কাজেই এটি কুফরী। দ্বিতীয়ত, তার এ কাজটি ইনসাফ ও ভারসাম্যনীতির বিরোধি। কারণ, আল্লাহ যথার্থ ইনসাফ ও ভারসাম্যনীতি অনুযায়ীই হুকুম দিয়েছিলেন। কাজেই আল্লাহর হুকুম থেকে সরে এসে যখন সে ফায়সালা করলো তখন সে আসলে যুলুম করলো। তৃতীয়ত, বান্দা হওয়া সত্ত্বেও যখনই সে নিজের প্রভুর আইন অমান্য করে নিজের বা অন্যের মনগড়া আইন প্রবর্তন করলো তখনই সে আসলে বন্দেগী ও আনুগত্যের গণ্ডীর বাইরে পা রাখলো।²⁹ আর এটি অবাধ্যতা বা ফাসেকী। এ কুফরী, যুলুম ও ফাসেক্বী তার নিজের ধরন ও প্রকৃতির দিকে দিয়ে অনিবার্যভাবেই পুরোপুরি আল্লাহর হুকুম অমান্যেরই বাস্তব রূপ। যেখানে আল্লাহর হুকুম অমান্য করা হবে সেখানে এ তিনটি বিষয় থাকবে না, এটা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তবে আল্লাহর হুকুম অমান্য করার যেমন পর্যায়ভেদ আছে তেমনি এ তিনটি বিষয়েরও পর্যায়ভেদ আছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমকে ভুল এবং নিজের বা অন্য কোন মানুষের হুকুমকে সঠিক মনে করে আল্লাহর হুকুম বিরোধি ফায়সালা করে সে পুরোপুরি কাফির, যালেম ও ফাসেকু। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমকে সত্য বলে বিশ্বাস করে কিন্তু কার্যত তার বিরুদ্ধে ফায়সালা করে সে ইসলামী মিল্লাত বহির্ভূত না হলেও নিজের ঈমানকে কুফুরী, যুলুম ও ফাসেকীর সাথে মিশিয়ে ফেলেছে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে সে সকল ব্যাপারেই কাফির, ফাসেকু ও যালেম। আর যে ব্যক্তি কিছু ব্যাপারে অনুগত এবং কিছু ব্যাপারে অবাধ্য তার জীবনে ঈমান ও ইসলাম এবং কুফরী, যুলুম ও ফাসেক্বীর মিশ্রণ ঠিক তেমনি হারে অবস্থান করছে যেহারে সে আনুগত্য ও অবাধ্যতাকে এক সাথে মিশিয়ে রেখেছে। কোন কোন তাফসীরকার এ আয়াতগুলোকে আহলে কিতাবদের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কীত বলে গণ্য করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আল্লাহর কালামের শব্দের মধ্যে এ ধরনের ব্যাখ্যা করার কোন অবকাশ নেই। হুযাইফা -এর বক্তব্যই এ ধরনের ব্যাখ্যার সঠিক ও সর্বোত্তম জবাব। তাঁকে একজন বলেছিল, এ আয়াত তিনটি তো বনী ইসরাঈলের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। সে বুঝাতে চাচ্ছিল যে, ইহুদীদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিল করা হুকুমের বিরুদ্ধে ফায়সালা করে সে-ই কাফির, যালেম ও ফাসেকু। একথা শুনে হুযাইফা বলেন: نِعْمَ الْإِخْوَةِ لَكُمْ بَنُو إِسْرَائِيلَ، إِنْ كَانَتْ لَهُمْ كُلَّ مُرَّةَ، وَلَكُمْ كُلِّ حُلْوَةٍ كَلَّا وَاللَّهِ، لَتَسْلُكْنَ طَرِيقَهُمْ قَدَرَ الشَّرَاكِ
"এ বনী ইসরাঈল গোষ্ঠী তোমাদের কেমন চমৎকার ভাই, তিতোগুলো সব তাদের জন্য আর মিঠাগুলো সব তোমাদের জন্য। কখনো নয়, আল্লাহর কসম তাদেরই পথে তোমরা কদম মিলিয়ে চলবে।" [তাফহীমুল কুরআন (ঢাকা, আধুনিক প্রকাশনী, ১৪২১/২০০০, আলোচ্য আয়াতের তাফসীর, টীকা ৭৭ দ্রষ্টব্য]
৮. তাফসীরে উসমানী: শিব্বির আহমাদ উসমানী তাঁর "তাফসীরে উসমানী'-তে সূরা মায়িদাহ'র ৪৪ নং আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন: مَا اَنْزَلَ اللهُ کے موافق حکم نہ کرنے سے غالبا यह مراد ہے کہ منصوص حکم کے وجود ہی سے انکار کردے اور اسکی جگہ دوسرے احکام اپنی راۓ اور خواہش سے تصنیف کرے ۔ جیسا کہ یہود نے رجم کے متعلق کیا تھا۔ تو ایسے لوگوں کے کافر ہونے میں کیا شبہ ہو سکتا ہے اور اگر यह ہو کہ مَا اَنْزَلَ اللهُ كو عقيدة ثابت مان کر پھر فیصلہ عملا اسکے خلاف کرے تو کافر سے مراد عملی کافر ہوگا۔ یعنی اسکی عملی حالت کافروں جیسی ہی
"مَا أَنْزَلَ اللهُ এর সম্পর্ক হলো, 'আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম না করা'-এর দ্বারা সম্ভাব্য অর্থ হবে, সুস্পষ্ট দলিলসমৃদ্ধ হুকুম থাকা সত্ত্বেও তা অস্বীকার করা এবং এর পরিবর্তে নিজের রায় ও খায়েশ দ্বারা ভিন্ন বিধান প্রবর্তন করা। যেভাবে ইয়াহুদীরা 'রজমের' হুকুমের ব্যাপারে করেছিল। এ ধরনের লোকেরা কাফির হওয়ার ব্যাপারে আর কি সংশয় থাকতে পারে? আর যদি مَا أَنْزَلَ اللهُ এর দাবি হয়, আক্বীদাগতভাবে স্বীকার করার পর আমলগত ফায়সালার ক্ষেত্রে এর বিপরীত করা- তবে সেক্ষেত্রে কাফিরের অর্থ আমলগত কুফর। অর্থাৎ তাদের আমলটি কাফিরদের মতো।” (তাফসীরে উসমানী, সূরা মায়িদা, ৪৪ নং আয়াতের তাফসীর)
৯. তাফসীরে মাজেদী: আব্দুল মাজেদ দরিয়াবাদী তাঁর "তাফসীরে মাজেদী"-তে আলোচ্য আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে লিখেছেন: “وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ-আর যারা বিধান দেয় না তদনুসারে, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ, বরং তারা শরীআত বিরোধি হুকুম-আহকামকে শরীআতসম্মত বলে মনে করে মানুষের তৈরী বিধানকে আল্লাহর বিধান বলে চালায়।
নেতৃস্থানীয় ইয়াহুদীদের সবচেয়ে বড় অপরাধ এবং গুনাহ এই ছিল যে, তারা তাদের মনগড়া মতবাদকে আল্লাহর কানুন³⁰ বলে চালিয়ে দিত। ফাতওয়া নিজের ইচ্ছামত দিত এবং বলতো: দ্বীনের হুকুম এরূপ। এ ধরণের দুঃসাহসী ব্যক্তিদের কুফরীর ব্যাপারে আর কি সন্দেহ হতে পারে? বিশিষ্ট তাবেঈনদের থেকে আয়াতের তাফসীর এরূপ বর্ণিত হয়েছে। ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার নিজের হাতে লেখা কিতাবের মতানুযায়ী বিধান দেয় এবং আল্লাহর কিতাবকে পরিত্যাগ করে এবং সে মনে করে যে তার কাছে যে কিতাব আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, সে কাফির হয়ে গেল- (ইবনে জারীর)। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অভিমতও অনুরূপ।
وَمَنْ لَم يُحْكُمْ -এ আয়াত مَنْ শব্দটি الَّذِي শব্দের সমার্থজ্ঞাপক এবং আয়াতটি ইয়াহুদীদের শানে নাযিলকৃত। এখানে من শব্দটি الَّذِي শব্দের সমার্থ জ্ঞাপক- (কুরতুবী)। অর্থ হল: ঐ সমস্ত ইয়াহুদী- যারা রজম, কিসাস ও অন্যান্য ইলাহী বিধান³¹ পরিবর্তন করে নিজেদের মনগড়া বিধান আল্লাহ সঙ্গে সম্পৃক্ত করতো, তারা কাফির। কাজেই এখানে এরূপ উক্তি উহ্য আছে: ইয়াহুদীগণ, যারা ফায়সালা করে না সে মতে, যে বিধান নাযিল করেছেন আল্লাহ, তারা কাফির। সুতরাং এ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তন্মধ্যে এটাই উত্তম (কুরতুবী)। খারিজীরা এ আয়াত দিয়ে জোর দাবি করে যে, যে সমস্ত মুসলিম³² ফাসিক, তারাও কাফিরদের হুকুমের মধ্যে শামিল, যখন তারা গায়রুল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে; তখন তারা কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই দলিল (খারেজীদের অন্যান্য দলিলের ন্যায়) পরিত্যাজ্য। কেননা, যে ধরণের ফায়সালার কথা এখানে বলা হয়েছে। তার সম্পর্ক আমলের সাথে নয়, বরং তা আক্বীদা-বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত। আর সে ব্যক্তি অবশ্যই কাফির হয়ে যায়। যে আক্বীদার দিক দিয়ে আল্লাহর কানুন বা বিধানকে ভুল বলে এবং নিজের মতবাদকে সঠিক মনে করে। এখানে অর্থ হলো: জ্বলের সাথে আমল করা এবং তা হলো অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা। আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা যদি কেউ বিশ্বাস না করে, তবে তার কাফির হওয়ার ব্যাপারে কোনরূপ মতানৈক্য নেই- (রূহ)। আয়াতটি সাধারণ নয়, বরং কাফিরদের বিশেষকরে ইয়াহুদীদের সাথে সম্পৃক্ত এবং এ ব্যাপারে তাবেঈনদের মাঝে আবূ সালিহ, ইকরামা, যাহহাক, কাতাদা -এর ও অন্যান্যরা ছাড়াও, সাহাবীদের মাঝে হুযায়ফা ও ইবনে 'আব্বাস একমত। বরং এতদসম্পর্কে নবী পর্যন্ত সনদ মওজুদ আছে। যেমন- বাররা বিন আযিব নবী থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ বাণী: আর যারা ফায়সালা দেয় না সে মতে, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ, তারা তো কাফির; আর যারা ফায়সালা করে না সে মতে, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ, তারা তো ফাসিকু। আয়াতগুলো ফাসিকদের শানে নাযিল হয়েছে (ইবনে জারীর)।
আবূ সালিহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: সূরা মায়িদার মধ্যে যে তিনটি আয়াত আছে: "আর যারা ফায়সালা দেয় না সে মতে, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ, তারা তো কাফির, যালিম এবং ফাসিকু" -আয়াতগুলি ইসলামের অনুসারীদের শানে নাযিল হয় নি, বরং তা কাফিরদের শানে নাযিল হয়েছে- (ইবনে জারীর)। যাহ্হাক থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: উপরোক্ত আয়াত 'আহলে কিতাবদের' শানে নাযিল হয়েছে (ইবনে জারীর)। ইকরামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উপরোক্ত আয়াতগুলি 'আহলি কিতাব' এর শানে নাযিল হয়েছে (ইবনে জারীর)। উবায়দুল্লাহ ইবনে 'আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আয়াতগুলো ইয়াহুদীদের শানে নাযিল হয়েছে আর তাদের গুণাবলি বর্ণনার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে (ইবনে জারীর)। ইবনে 'আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করে- "যারা সে মত ফায়সালা করে না, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ, তারা কাফির, যালিম ও ফাসিকু; আয়াতত্রয় বিশেষভাবে ইয়াহুদীদের শানে নাযিল হয়েছে" (রূহ)।
• বাররা ইবনে 'আযিব, হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান, ইবনে আব্বাস, আবু মাজলায, আবূরাজা আতারদী, ইকরামা; উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ, হাসান বসরী প্রমুখ সুধীগণ বলেন: আয়াতগুলো 'আহলে কিতাবদের' শানে নাযিল হয়েছে। এ উম্মাতের অপরাধ বর্ণনার জন্য নয় (মা'আলিম)।
ইমাম ইবনে জারীর তাবারী স্বীয় স্বভাবসুলভ বর্ণনা ভঙ্গীতে বলেন যে, আয়াতের সম্পর্ক হলো কাফির ও আহলে কিতাবদের সাথে; বর্ণনা ধারায় তাদের কথা উল্লেখ আছে এবং এর আগেও তাদের সম্বন্ধে আলোচনা রয়েছে। অন্যান্য বিশিষ্ট মুফাসসিরীনদের অভিমতও এরূপ। ইবনে জারীর বলেন: আমার নিকট এ অভিমতই অধিক যুক্তিযুক্ত যে, এসব আয়াত আহলে কিতাবের কাফিরদের শানে নাযিল হয়েছে। কেননা, এর পূর্বাপর আয়াতের আলোকে জানা যায় যে, তাদের সম্পর্কে এগুলো নাযিল হয়েছে এবং দোষারোপ তাদেরই করা হয়েছে (ইবনে জারীর)। ইমাম শা'বী বলেন: আয়াতগুলো বিশেষভাবে ইয়াহুদীদের শানে নাযিল হয়েছে এবং নাহ্হাসের অভিমতও এরূপ (কুরতুবী)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন ফায়সালাকে মানতে অস্বীকার করে, অথবা এমন ফায়সালা দেয়, যা আল্লাহর হুকুমের বিপরীত এবং বলে: নিশ্চয় এ হলো আল্লাহর হুকুম, সে ব্যক্তি কাফির। যেমন বনূ ইসরাঈলরা কাফির হয়েছিল, যখন তারা এরূপ করেছিল। (জাসসাস)
আল্লাহবিরোধি কানুন মোতাবেক ফায়সালা করার কারণে যদি কোন মুসলিম অভিযুক্ত হয়; তবে তখন হবে, যখন সে জেনেশুনে সজ্ঞানে শরীআতের প্রকাশ্য ও স্পষ্ট বিধানের খিলাফ কিছু করবে এবং সে তখন অভিযুক্ত হবে না- যখন হুকুমটি গোপন কোন বিষয়ের ইঙ্গিতবহ হবে এবং না জেনে, না শুনে সে তার অপব্যাখ্যা করবে। এ সম্পর্কে উলামাদের অভিমত হলো- যদি কেউ শরীআতের স্পষ্ট দলিলের খিলাফ কিছু করে বা বলে, তবে সে অভিযুক্ত হবে, পক্ষান্তরে শরীআতের গোপনতত্ত্ব যার কাছে স্পষ্ট নয়, সে যদি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভুল করে বসে, তবে সে অভিযুক্ত হবে না (মা'আলিম)। তাবে'য়ী ইকরামা, যার সঙ্গে ইমাম রাযী এর বক্তব্যের মিল আছে বলেন: যতক্ষণ কেউ কোন ইলাহী বিধানকে অন্তর দিয়ে মানবে এবং মুখে তা স্বীকার করবে, সে কিরূপে অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারে। যদি তার কাজ-কর্ম, বিশ্বাস ও স্বীকারোক্তির খিলাফ হয়, তবে তাকে গুনাহগার এবং হুকুম তরককারী বলা যেতে পারে; তাকে অস্বীকারকারী বা কাফির ও বিদ্রোহী বলা যাবে না। ইকরামা বলেন: আল্লাহর কথা- “যে ব্যক্তি ফায়সালা করে না সে মতে, যা নাযিল করেছেন আল্লাহ- সে কাফির"-এ অভিমত তার উপর প্রযোজ্য, যে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে এবং মুখে অস্বীকার করে এবং 'আল্লাহর হুকুম' হিসাবে যে মুখে তা স্বীকার করে, এরপর খিলাফ কিছু করে, তবে সে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার বিরোধিতাকারী নয়, বরং সে হবে তা তরককারী। সেজন্য এ আয়াতের আওতায় এনে তাকে অভিযুক্ত করা যাবে না। এটাই সহীহ জবাব (কাবীর)।
আমাদের যামানায় খারেজী মাযহাবের প্রচার ও প্রসার ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে। সুন্দর সুন্দর নাম ও উপাধীধারী ব্যক্তিরা এ কাজে নিয়োজিত। তারা এ আয়াত দ্বারা তাদের মতাদর্শ প্রচারে প্রয়াসে। সেজন্য জরুরী মনে করে আয়াতটির ব্যাখ্যা কিছু বিস্তারিতভাবে 'আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের' মাযহাব অনুযায়ী করা হলো।³³
১০. বাদীউত তাফাসীর: ইমাম বাদীউদ্দীন শাহ আর-রাশেদী তাঁর সিন্ধি ভাষায় লিখিত 'বাদীউত তাফাসীরে' আলোচ্য আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে তাফসীরে দুররে মানসুর ও তাফসীরে কুরতুবী থেকে পূর্বোক্ত তাফসীরগুলোর সমার্থক উদ্ধৃতিগুলো দেয়ার পর লিখেছেন: "সম্মানিত পাঠক! আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক ফায়সালা জারি না করা কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। যেভাবে ইমাম যাহাবী তাঁর 'আল-কাবায়ির'-এর ৩১ নং কবীরাহ গুনাহর বর্ণনাতে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কেবল কবীরা গুনাহর কারণে মুসলিম ইসলাম থেকে বহিষ্কার হয় না, যতক্ষণ না সে নিজের কৃত আমলটিকে সহীহ বা হকু হওয়ার আক্বীদা রাখে। বরং যদি তা সে ভুল মনে করে, অথচ কোন বিশেষ (মাজবুরী) পরিস্থিতিতে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফায়সালা না করে- তবে সে অবশ্যই যালিম ও ফাসিকু। কিন্তু তাকে কাফির বা ইসলাম থেকে খারিজ বলা যাবে না। এটাই আহলে সুন্নাতের ইজমা'য়ী মাসআলা যা প্রথম থেকে চলে আসছে। কিন্তু খারেজীরা সব ধরণের কবীরা গোনাহকারীকে কাফির বলে থাকে।.... তারা এই আয়াতটি দ্বারা দলিল নিয়ে থাকে এবং অন্যান্য দলিল-প্রমাণ থেকে নিজেদের চোখ বন্ধ রাখে। যেমনটি বিদ'আতীরা নিজেদের প্রমাণ উপস্থাপনে এমনটি করে থাকে।..." [বাদীউত তাফাসীর (১৯৯৮ ইং) ৭/২৩৮ পৃষ্ঠা)
উদ্ধৃত সমস্ত তাফসীরগুলো থেকে প্রমাণিত হলো, আলোচ্য আয়াত প্রসঙ্গে সুন্নী মুসলিমদের প্রকৃত আক্বীদা ও তাফসীর সেটাই যা শায়েখ নাসিরুদ্দীন আলবানী থেকে আমরা এই বইয়ের শুরুতে উল্লেখ করেছি। উপরোক্ত সমস্ত মুফাসসির এ ব্যাপারে একমত যে, কুফর দু'ধরনের হয়ে থাকে। যথা: ক. কুফরে 'আমালী; খ. কুফরে ইতিক্বাদী।
এই প্রকারভেদ শায়েখ আলবানী একাই করেন নি। তাছাড়া আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান জারি না করাতে কুফরের স্তর বিন্যাসেও তাদের উপস্থাপনায় কোন পার্থক্য নেই। যদি এই কারণে তাকে মুরজিয়া বলা হয়, তবে পূর্বোক্ত সমস্ত তাফসীরকারকগণও একই অভিযোগে অভিযুক্ত। অথচ এক্ষেত্রে তাদের উপস্থাপনায় আমরা ঐকমত্য লক্ষ করি। সুতরাং এর বিপরীত মতই গোমরাহ পথ। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক দিন।

টিকাঃ
২৬. তাফসীরে মাযহারী (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৪০৫/১৯৮৮) ৩/৭০০-০১ পৃঃ।
২৭. তাফসীরে মাযহারী ৩/৭০৭ পৃঃ।
২৮. তাফসীরে মাযহারী ৩/৭০৯ পৃঃ।
২৯. সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী ইবাদত ও ইতা'আতকে একই দৃষ্টিতে দেখেছেন। এর ব্যাখ্যা সফিউর রহমান মুবারকপুরী লিখিত 'ইবাদত ও ইতা'আত' অনুচ্ছেদে আসবে ইনশাআল্লাহ।
৩০. বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা অনুবাদে: 'খোদায়ী কানুন' শব্দ আছে। আমরা তা পরিবর্তন করে 'আল্লাহর কানুন' উল্লেখ করলাম।
৩১. বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা অনুবাদে: 'খোদায়ী বিধান' শব্দ আছে। আমরা তা পরিবর্তন করে 'ইলাহী বিধান' উল্লেখ করলাম।
৩২. বাংলা অনুবাদে 'মুসলমান' আছে। আমরা, 'মুসলিম' লিখলাম।
৩৩. আব্দুল মাজেদ দরিয়াবাদী, তাফসীরে মাজেদী (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জুন ১৯৯২) ২/৫৬৬-৬৮ পৃষ্ঠা।

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 হাকিম বা বিচারককে কখন কাফির গণ্য করা যাবে?

📄 হাকিম বা বিচারককে কখন কাফির গণ্য করা যাবে?


-কামাল আহমাদ
১. মনগড়া বা মানবরচিত বিধানকে আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত বিধান বলার কারণে: আল্লাহ বলেন: وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ "তোমরা আমার আয়াতকে সামান্য ও নগণ্য বিনিময়ে বিক্রি করো না। যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।" (সূরা মায়িদা: ৪৪-৪৭ আয়াত)
আয়াতটির শানে-নুযূলে প্রমাণিত হয়, ইয়াহুদীরা রজমের বিধানকে পরিবর্তন করে ভিন্ন বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বলেছিল। এমর্মে অন্যত্র আল্লাহ বলেন: فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِندِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ "অতএব, তাদের জন্য আফসোস! যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত, যেন এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ উপার্জন করতে পারে। অতএব তাদের জন্য ওয়েল (জাহান্নাম), তাদের কিতাব লেখার জন্য এবং তাদের জন্য ওয়েল (জাহান্নাম) তাদের উপার্জনের জন্য।" (সূরা বাক্বারাহ: ৭৯ আয়াত)
সুতরাং প্রমাণিত হল, যখন কোন আলেম বা হাকিম বা অন্য যে কেউ এমন কোন বিধান বা ফতওয়া দেয় যা আল্লাহ নাযিল করেন নি। অথচ জনগণের মাঝে তা আল্লাহর বিধান হিসাবে প্রচার করে। তখনই কেবল উক্ত আয়াতগুলোর হুকুম প্রযোজ্য। যা বিভিন্ন মাযহাবী ফিক্বহাহ, ফতওয়া ও সূফীদের তরীক্বাতে দেখা যায়। অথচ সেগুলোর পক্ষে আল্লাহ কিছুই নাযিল করেন নি।
২. আল্লাহ শু'র প্রতি মিথ্যারোপ এবং অস্বীকার করার কারণে: পূর্বোক্ত পন্থায় আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করা হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَذَبَ عَلَى اللَّهِ وَكَذَّبَ بِالصِّدْقِ إِذْ جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْكَافِرِينَ
"তার চেয়ে অধিক যালেম কে আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলবে এবং তার কাছে সত্য আগমনের পর তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। কাফিরদের বাসস্থান কি জাহান্নাম নয়? (সূরা যুমার: ২৪ আয়াত)
৩. হারামকৃত বস্তুকে হালাল এবং হালালকৃত বস্তুকে হারাম ঘোষণা করার কারণে:
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ
"তোমাদের মুখ থেকে সাধারণভাবে যেসব মিথ্যা বের হয়ে আসে, তেমনি করে আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করে বলো না যে, এটা হালাল এবং ওটা হারাম। নিশ্চয় যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যারোপ করে তারা সফল হবে না।" (সূরা নাহাল: ১১৬ আয়াত)
৪. বিচারক, আলেম-উলামা, পীর-দরবেশদেরকে হালাল ও হারাম করার হক্কদার গণ্য করার কারণে: আল্লাহ বলেন:
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ "তারা তাদের আহবার (আলেম) ও রুহবান (সূফী)-দের আল্লাহর পরিবর্তে রব হিসাবে গ্রহণ করেছে।” (সূরা তাওবা: ৩১ আয়াত) নবী আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন:
أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُونَهُمْ وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحَلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ وَإِذَا حَرَّمُوا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوهُ
“এমন নয় যে, তারা এদের ইবাদত করত। বরং এরা যদি তাদের জন্য কিছু হালাল করে দিত তখন তারা তা হালাল বলে গ্রহণ করত; এরা যখন কোন কিছু হারাম বলে স্থির করতো তখন তারাও তা হারাম বলে গ্রহণ করতো।” ³⁴
এখানে হালাল বা হারাম নির্ধারণ করে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা নাযিলকৃত বা ইলাহী হুকুম গণ্য করাকে চূড়ান্ত কুফর হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। কাফির হওয়ার বিভিন্ন কারণ ও শর্ত রয়েছে। এখানে আমরা কেবল আল্লাহর বিধান জারি করা ও না করার ক্ষেত্রে কাফির হওয়ার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ উল্লেখ করলাম।

টিকাঃ
৩৪. হাসান: তিরমিযী- তাফসীরুল কুরআন, সূরা তাওবা। আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। (তাহক্বীকুকৃত তিরমিযী হা/৩০৯৫]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00