📄 মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে জিহাদের ধরণ
ক. বিদ্রোহ করলে (হত্যা/ ক্বিতাল/ দেশান্তর): এক্ষেত্রে বিদ্রোহ করার শাস্তি প্রযোজ্য। আল্লাহ বলেন: إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ - إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ -
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্যে নির্দিষ্ট শাস্তি হত্যা কিংবা শূলে চড়ান অথবা তাদের হাত ও পা বিপরীতভাবে কেটে ফেলা, কিংবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা। এ লাঞ্ছনা ও অপমান হবে এ দুনিয়ায়; কিন্তু পরকালে তাদের জন্যে এটা অপেক্ষাও কঠিনতম আযাব নির্দিষ্ট আছে। কিন্তু যারা তাওবা করবে, তাদের উপর তোমাদের আধিপত্য স্থাপিত হওয়ার পূর্বে। তোমাদের জেনে রাখা দরকার যে, আল্লাহই হচ্ছেন ক্ষমাকারী ও অনুগ্রহশীল।" [সূরা মায়িদা- ৩৩-৩৪ আয়াত]
সুস্পষ্ট হলো মুনাফিকু/ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের উপর মুসলিমদের প্রভাব থাকলেও তারা মুসলিমদের সাথে বিদ্রোহমূলক আচরণ না করলে তাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ-ই ছাড় দিয়েছেন। অথচ তাদের আক্বীদা ও আমল কোনটিই আল্লাহ-র কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
খ. সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি করলে (হত্যা): আল্লাহ বলেন: لَئِنْ لَّمْ يَنْتَهِ الْمُنَافِقُوْنَ وَالَّذِيْنَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ وَالْمُرْجِفُوْنَ فِي الْمَدِينَةِ لَنُغْرِيَنَّكَ بِهِمْ ثُمَّ لَا يُجَاوِرُونَكَ فِيهَا إِلَّا قَلِيْلًا - مَّلْعُوْنِيْنَ جِ أَيْنَمَا ثُقِفُوْا أُخِذُوا وَقُتُلُوْا تَقْتِيلاً -
"মুনাফিকুরা এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে এবং যারা নগরে গুজব রটনা করে, তারা বিরত না হলে আমি নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে আপনাকে প্রবল করব। এরপর এ নগরীতে আপনার প্রতিবেশীরূপে তারা অল্প সময়ই থাকবে- অভিশপ্ত হয়ে। তাদের যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই ধরা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে।” [সূরা আহযাব- ৬০-৬১ আয়াত]
গ. সমাজে শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপন করলে (শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ পাবে): পূর্বোক্ত আয়াতে لَئِنْ لَّمْ يَنْتَهُ الْمُنَافِقُوْنَ "মুনাফিকুরা যদি বিরত না হয়" কথাটি রয়েছে। যা থেকে সুস্পষ্ট হয়, তারা অশান্তি সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকলে বা না করলে তাদের ব্যাপারে কঠিন হওয়া যাবে না। তাদের সংস্কারের ক্ষেত্রে ফাসেক/ বিদ'আতী প্রমুখের ন্যায় হাত/ মুখ/ অন্তরের জিহাদ পরিস্থিতি অনুযায়ী অব্যাহত থাকবে। ইবনে কাসির মুনাফিক্বদের শাস্তির বিধান সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষীর ভিন্ন ভিন্ন উদ্ধৃতি দেয়ার পর লিখেছেন: إِنَّهُ لَا مُنَافَاةَ بَيْنَ هَذِهِ الْأَقْوَالِ، لأَنَّهُ تَارَةً يُؤَاخِذُهُمْ بِهَذَا، وَتَارَةً بِهَذَا بِحَسْبِ الْأَحْوَالِ.
"উপরোক্ত (বিভিন্ন) উদ্ধৃতির মধ্যে কোনরূপ বৈপরিত্য নেই। বস্তুত মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অবস্থায় পূর্বোক্ত বিভিন্ন পন্থায় জিহাদ করাই বিধেয়।" [তাফসীরে ইবনে কাসির, সূরা তাওবাহ- ৭৩-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর দ্রঃ। এই আয়াতটির তাফসীরে মুনাফিকুগণ কর্তৃক নবী -কে হত্যার ষড়যন্ত্র, বিদ্রূপ এবং পরবর্তীতে নবী -এর সামনে তা অস্বীকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সুতরাং নবী'র উপস্থিতিতে যারা তাঁকে হত্যার ও ইসলামকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করেছে, নবী-কে হাকিম/শাসক/বিচারক হিসাবে গ্রহণ করে নি- তাদের ব্যাপারে ইসলাম ক্ষমতাসীন থাকার মুহূর্তে যখন পূর্বোক্ত বিধানগুলো প্রযোজ্য। তখন মুসলিমদের দুর্বলতার সময় করণীয় বিষয়গুলো খুবই সুস্পষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে হাকিম/শাসকদের তাকফির করে হত্যা করা ঘোষণা দেয়ার চেয়ে তাসফিয়্যাহ ও তারবিয়্যাহ-ই যে সবচে জরুরি এতে কোন সন্দেহ নেই।
📄 হাকিম ও হুকুম সম্পর্কীত আয়াতের বিশ্লেষণ
যারা ইসলাম অনুযায়ী শাসন পরিচালনা না করার জন্য শাসক বলতেই কাফির বলে ফতোয়া দিচ্ছে তাদের দলিল হলো কুরআনের ঐ সমস্ত আয়াত, যেখানে আল্লাহ তাঁর নিজের ও তাঁর রসূলের হুকুম অমান্যকারীকে 'মু'মিন নয়' বলে সম্বোধন করেছেন। এ বিষয়টি পূর্বে আলোচিত মুনাফিকু ও খারেজীদের আলোচনায় প্রমাণিত হয়েছে যে, তাদের ঈমান ও আক্বীদা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কাছে অগ্রহণযোগ্য হলেও, ইসলামী রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না- যতক্ষণ তাদের ইসলামবিরোধি আক্বীদাগুলো আমল হিসাবে বাস্তবরূপ লাভ করে। এখন এ সম্পর্কীত অন্যান্য আয়াতগুলো নবী -এর যামানার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হল।
প্রথম আয়াত: আল্লাহ বলেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
"কিন্তু না, আপনার রবের কুসম! তারা মু'মিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিরোধে আপনাকে হাকিম না বানায়, এরপর আপনার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে না নেয়।" [সূরা নিসা- ৬৫ আয়াত]
দৃষ্টান্ত: উরওয়া থেকে বর্ণিত; হাররা বা মদীনার কঙ্করময় ভূমিতে একটি পানির নালা নিয়ে যুবায়ের এর সাথে একজন আনসার ঝগড়া করেছিলেন। নবী বললেন: 'হে যুবায়ের! প্রথমত, তুমি তোমার জমিতে পানি দাও, তারপর তুমি প্রতিবেশীর জমিতে পানি ছেড়ে দেবে।' আনসার বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! সে আপনার ফুফাত ভাই, তাই এই ফায়সালা দিলেন। এতে অসন্তুষ্টিবশত রসূল এর চেহারা রক্তিম হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন: 'হে যুবায়ের! তুমি পানি চালাবে তারপর আইল পর্যন্ত ফিরে না আসা পর্যন্ত তা আটকে রাখবে তারপর প্রতিবেশীর জমির দিকে ছাড়বে।' আনসারী যখন রসূল ﷺ কে রাগিয়ে তুললেন তখন তিনি তার হক পুরোপুরি যুবায়ের কে প্রদানের স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন। তাদেরকে প্রথমে নবী এমন একটি নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে উদারতা ছিল। فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ : মুয়্যায বলেন: আয়াতটি এ উপলক্ষে নাযিল হয়েছে বলে আমার ধারণা। [সহীহ বুখারী- কিতাবুত তাফসীর।
আলোচ্য আয়াত থেকে প্রমাণিত হলো, নবীকে বিচারক অমান্যকারী আক্বীদাগতভাবে কাফির। কিন্তু নবী কর্তৃক এ ধরণের বিচার অমান্যকারীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং পূর্বে মুনাফিকু ও খারেজীদের উদ্ভব সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে আমরা প্রমাণ পেয়েছি, নবী তাঁর বিচারের রায় অমান্যকারীকে لَمَّلَهُ أَنْ يَكُونَ يُصَلِّي “সম্ভবত সে সালাত আদায় করে” বাক্যের মাধ্যমে ছাড় দিয়েছেন ও তাদের ভবিষ্যৎ ফিতনার প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার দিকে সাহাবীদের নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থাৎ আক্বীদাগত কুফর যতক্ষণ পর্যন্ত আমলী কুফরে পরিণত হয়ে প্রকাশিত না হয় এবং সমগ্র মুসলিম ও ইসলামের জন্য ফিতনাতে পরিণত না হচ্ছে- ততক্ষণ পর্যন্ত এমন লোকদের ছাড় দিতে নবী নির্দেশ দিয়েছেন।
এই আয়াতটির শানে-নুযূল হিসাবে অপর একটি বর্ণনা হলো, একজন ইয়াহুদী ও মুনাফিকু মুসলিমের সাথে সংঘটিত ঘটনা। যেখানে নবী ইয়াহুদী ব্যক্তিটির পক্ষে রায় দিলে মুনাফিকু মুসলিমটি তা অমান্য করে, শেষাবধি উমার -এর কাছে বিচার পেশ করে। উমার নবী এর ফায়সালা অমান্য করার কথা শুনে মুনাফিকু ব্যক্তিটিকে হত্যা করেন। কিন্তু এই হাদীসটি গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম ইবনে কাসির বলেছেন: হাদীসটি গরীব, মুরসাল (সূত্রছিন্ন), তাছাড়া এর অন্যতম রাবী আব্দুল্লাহ ইবনে লাহইয়া (তাফসীরে ইবনে কাসির, সূরা নিসা: ৬৫ নং আয়াত দ্রঃ)। এছাড়া হাদীসটির শেষে বর্ণিত হয়েছে: অতঃপর নবী উমার -কে উক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করার দণ্ড হতে মুক্তি দিলেন। তবে পরবর্তীকালে এটা প্রথা হয়ে দাঁড়ানোকে আল্লাহ অপছন্দ করলেন এবং পরবর্তী (নিসা- ৬৬) আয়াতটি নাযিল হল।
তাছাড়া হাদীসটি পূর্বে বর্ণিত খারেজীদের উদ্ভব সংক্রান্ত সহীহ বুখারীর হাদীসটির বিরোধি। সেখানে খালিদ বিন ওয়ালিদ রসূলুল্লাহ -এর কাছে তাঁর বিচার অমান্যকারীকে হত্যা করার অনুমতি চাইলে তিনি তা নিষেধ করেন। সুতরাং হাদীসটি সহীহ হাদীসের বিরোধি হওয়ায় বাতিল। তাছাড়া নিচের সহীহ হাদীসটিও আমাদের বক্তব্যকে সমর্থন করে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদ বলেন: যখন নবী হুনায়নের গনীমত বন্টন করে দিলেন, তখন আনসারদের এক ব্যক্তি বলে ফেলল, এই বণ্টনের ব্যাপারে তিনি আল্লাহ'র সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখেন নি। কথাটি শুনে আমি নবী-এর কাছে আসলাম এবং তাঁকে কথাটি জানিয়ে দিলাম। তখন তাঁর চেহারার রঙ পরিবর্তিত হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন: رَحْمَةُ الله عَلى مُوسَى لَقَدْ اُوْذِيَ بِأَكْثَرَ مِنْ هَذَا فَصَبَرَ “আল্লাহ, মূসা -এর উপর রহমত বর্ষণ করুন। তাঁকে এর চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সবর করেছিলেন।” [সহীহ বুখারী- কিতাবুল মাগাযী- بَابُ غَزْوَةِ الطَّائِفِ; সহীহ মুসলিম- কিতাবুয যাকাত م بَابُ اعْطَاءِ الْمُوَلَفَةِ قُلُوْهُمْ শব্দগুলো সহীহ বুখারীর।
সুতরাং সবক্ষেত্রে আমলগত কুফর ইসলামী রাষ্ট্রের ঘোষিত চূড়ান্ত মুরতাদ হিসাবে গণ্য হবে না। বরং এখানে كُفَرُ دُونَ كُفْرٍ )চূড়ান্ত কুফরের চেয়ে কম কুফর) নীতি প্রযোজ্য। নবী -এর নিজস্ব এই আমলটিই ইবনে আব্বাস-এর এই তাফসীরের প্রত্যক্ষ সমর্থক।
দ্বিতীয় আয়াতঃ আল্লাহ বলেন: وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا
"আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন বিষয়ের ফায়সালা দিলে কোন মু'মিন পুরুষ কিংবা মু'মিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার নেই। আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়।” [সূরা আহযাব- ৩৬ আয়াত]
আলোচ্য আয়াতটি যয়নাব বিনতে জাহাশের সঙ্গে যায়দ বিন হারিসের বিয়ে সম্পর্কে নাযিল হয়। প্রথমে যয়নাব এই বিয়েতে রাজী ছিলেন না। তখন আয়াতটি নাযিল হলে তিনি বিয়েতে রাজী হন। (সূরা আহযাবের ৩৬ নং আয়াতের বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থ অবলম্বনে)
عَنْ قَتَادَةَ قَالَ: خَطَبَ النَّبِيُّ ﷺ زَيْنَبَ وَهِيَ بِنْتُ عَمَّتِهِ وَهُوَ يُرِيدُهَا لِزَيْدٍ فَظَنَّتْ أَنَّهُ يُرِيدُهَا لِنَفْسِهِ فَلَمَّا عَلِمَتْ أَنَّهُ يُرِيدُهَا لِزَيْدٍ أَبَتَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: ﴿وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ﴾ فَرَضِيتْ وَسَلَّمَتْ رَوَاهُ الطَّبْرَانِيُّ بِأَسَانِيدَ وَرِجَالُ بَعْضُهَا رِجَالُ الصَّحِيح . ص ۲۰۹ (মুজমু'আয়ে যাওয়ায়েদ ৮/২০৮ পৃঃ)
এরপরেও তাদের বিয়ে টিকল না এবং শেষাবধি নবী -এর সাথে যয়নাব বিনতে জাহাশের বিয়ে হয় এবং সে সম্পর্কে পরবর্তী আয়াতটি নাযিল হয়।
আল্লাহ বলেন:
وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَاهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا
"স্মরণ করুন! আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলেছিলেন যে, 'তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর।' আপনি মনে মনে যা গোপন করেছেন আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিয়েছেন। আপনি লোক ভয় করছিলেন অথচ আল্লাহকেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত। এরপর যায়দ যখন তার স্ত্রী (যয়নাব)'র সাথে বিয়ে ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিয়ে দিলাম। যাতে মু'মিনদের পালকপুত্রদের নিজ স্ত্রীদের সাথে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করলে সে সব নারীকে বিয়ে করায় মু'মিনদের কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।" [সূরা আহযাব- ৩৭ আয়াত]
মূলত আয়াতটি দাবি হল:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ "নবী মু'মিনদের কাছে তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর।" [সূরা আহযাব: ৬ আয়াত]
অথচ মুনাফিকুগণ কখনই এই দাবি পূরণ করে না। তারপরেও রাষ্ট্রে বা সমাজে ফিতনা বিস্তার না করা পর্যন্ত তাদেরকে ছাড় দেয়া হয়েছে। অনুরূপ খারেজীদের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য।
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসের বর্ণিত শানে নুযূল আক্বীদাগত কুফরের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী আলোচনাতে প্রমাণিত হয়েছে, নবী-এর যামানাতে কেবল সামগ্রিকভাবে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধি ফিতনাবাজদের বিরুদ্ধেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ এসেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে রসূল তাদের ব্যাপারে সবরের নীতি অবলম্বন করেছিলেন। আবু বকরের যুগে যারা বিদ্রোহ করেছিল তা গোটা উম্মাতের বিরুদ্ধে ছিল। তা-ই তিনি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেন। উসমান-এর বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করেছিল তাদেরকে তিনি গোটা উম্মাতের সাথে গণ্য না করে কেবল নিজের সাথেই সংশ্লিষ্ট করেন। ফলে তিনি আদম-এর নেককার পুত্র, মূসা ও নবী-এর ন্যায় সবরের নীতি অনুসরণ করেন। তিনি মুসলিমদের মধ্যে রক্তপাত ঘটানোর পরিবর্তে নিজের মযলুম অবস্থায় শহীদ হওয়াকে বেছে নেন।
এ সম্পর্কে আরো যেসব আয়াত দলিল হিসাবে উল্লেখ করা হয়, তার সবই ‘ইবাদত ও আক্বীদাগত কুফরের সাথে সংশ্লিষ্ট।” যার জবাব পূর্বের ন্যায়। নবী কর্তৃক তাঁর যামানার আমল ও উম্মাতের প্রতি তার নির্দেশ থেকে বিষয়টি আমাদের কাছে সুস্পষ্ট।
দ্রষ্টব্য: পরিশিষ্টাংশ- ২।
📄 বিকৃতির সময় সমর্থ্য অনুযায়ী নানান্মুখী জিহাদের কর্মসূচী
নবী বলেছেন:
مَا مِنْ نَّبِيِّ بَعَثَهُ اللهُ فِي أُمَّةٍ قَبْلِي إِلَّا كَانَ لَهُ فِي أُمَّتِهِ حَوَارِيُّوْنَ وَأَصْحَابٌ يَا خُذُوْنَ بِسُنَّتِهِ وَيَقْتَدُوْنَ بِأَمْرِهِ ثُمَّ أَنَّهَا تَخْلُفُ مِنْ بَعْدِهِمْ خُلُوْفٌ يَقُوْلُوْنَ مَا لَا يَفْعَلُوْنَ وَيَفْعُلَوْنَ مَا لاَ يُؤْمَرُوْنَ فَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِيَدِهِ فَهُوَ مَؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَ هُمْ بِقَلْبِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الْإِيْمَانِ حَبَّةُ خَرْدَل -
"আল্লাহ আমার পূর্বে যে সব নবী -কে তাঁর উম্মাতের জন্য পাঠিয়েছিলেন, ঐ উম্মাতের মধ্যে তাঁর জন্য সাহায্যকারী ও সাহাবীগণ ছিলেন। যারা তাঁর সুন্নাতের উপর আমল করতেন ও তাঁর হুকুম মেনে চলতেন। তাদের পরে ঐ সমস্ত খারাপ লোকের উদ্ভব হতো যারা এমন কথা বলত যার উপর 'আমল করত না। আর তাদের যে বিষয়ের নির্দেশ দেয়া হয় নি, তার উপর 'আমল করত। যে ব্যক্তি ঐ সমস্ত লোকদের সাথে হাত দ্বারা জিহাদ করে সে মু'মিন, যে যবান দ্বারা জিহাদ করে সেও মু'মিন, আর যে অন্তর দ্বারা জিহাদ করে সেও মু'মিন। অন্যথায় এর বাইরে তিল دানা পরিমাণ ঈমানের অস্তিত্বও নেই। "¹⁵
এই শেষোক্ত হাদীসটিতেও কূলব তথা অন্তরের কার্যকারীতাকে স্বীকার করে তাকে সর্বশেষ ঈমানের অস্তিত্ব বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। যা আহলে সুন্নাতের আক্বীদাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। পক্ষান্তরে খারেজীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
সংশয়: অনেকে এ ক্ষেত্রে বলতে পারেন, আলোচ্য হাদীসটিতো উপায়হীন অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যখন পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে তখন কেবল অন্তরের কার্যকারিতা গ্রহণযোগ্য নয়।
জবাব: হাদীসটিতে অন্তরের উক্ত কার্যকারিতাকে দুর্বল ঈমান বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ ঈমানের সর্বশেষ অবস্থা। সুতরাং যখন শরী'আত নিজেই তা স্বীকৃতি দেয় তখন তা অস্বীকার করা প্রকারান্তরে "আল্লাহর বিধানকেই অস্বীকার করা"। যা কুফরে ই'তিক্বাদী বা আক্বীদাগত কুফরের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া যারা ঈমানী দুর্বলতা ও অন্যান্য কারণে 'আমলগতভাবে চরম পাপী হিসাবে গণ্য হবে তাদের আখিরাতের পরিস্থিতি সম্পর্কেও হাদীসে সুস্পষ্ট বর্ণনা আছে। যেমন- সমস্ত নবী- রসূলদের শাফায়াতের শেষে আল্লাহ বলবেন:
شَفَعَتِ الْمَلَائِكَةُ وَشَفَعَ النَّبِيُّوْنَ وَشَفَعَ الْمُؤْمِنُوْنَ وَلَمْ يَبْقَ إِلَّا أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ فَيَقْبْضَ قَبْضَةً مِنَ النَّارِ فَيَخْرُجُ مِنْهَا قَوْمًا لَّمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا
"মালাইকাগণ, নবীগণ ও মুমীনগণ সবাই শাফায়ত করেছেন, এখন এক 'আররহমানুর রহিমীন ছাড়া কেউ বাকি নেই। এই বলে তিনি মুষ্টিভরে এমন একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করবেন যারা কখনো কোন নেক কাজ করে নি।"¹⁶ উপরিউক্ত হাদীসগুলো মুরজিয়া ও খারেজী উভয় ফিতনাকে খণ্ডন করে। কেননা-
১. মুরজিয়াদের দাবি হলো কেবল ঈমান থাকাই জান্নাতের যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ শেষোক্ত হাদীসটিতে কেবল ঈমান থাকলেও জাহান্নামী হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে।
২. খারেজীরা আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘনকারীকে কাফিরদের মতো চিরস্থায় জাহান্নামী মনে করে থাকে।
অথচ উক্ত হাদীসে নেক কাজহীন ব্যক্তিদের আল্লাহর অনুগ্রহে অবশেষে জান্নাতে যাওয়াটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। তাছাড়া আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদার পক্ষে নিচের সহীহ হাদীসটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উবাদা ইবনে সামিত বলেন:
كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي مَجْلِسٍ فَقَالَ تُبَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا تَزْنُوا وَلَا تَسْرِقُوا وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللهِ وَمَنْ أَصَابَ شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ فَعُوقِبَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ أَصَابَ شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ فَسَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ إِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ.
"আমরা কোন বৈঠকে রসূলুল্লাহ এর সঙ্গে বসেছিলাম। তখন তিনি বললেন: তোমরা আমার কাছে এ বলে বায়য়াত গ্রহণ কর যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যিনা করবে, চুরি করবে না এবং কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। কিন্তু ন্যায়সঙ্গতভাবে (অর্থাৎ ক্বিসাসের কারণে)। অতএব, তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ তা পূর্ণ করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাবে। আর যদি কেউ উক্ত অপরাধের কোন একটিতে পতিত হয়ে শাস্তি ভোগ করে, তবে তাই তার জন্য কাফফারা হয়ে যাবে। আর যদি কোন ব্যক্তি উল্লিখিত অপরাধের কোন একটিতে পতিত হয় অতঃপর আল্লাহ তা গোপন রাখেন, তবে বিষয়টি মহান আল্লাহ'র এখতিয়ারে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তিও দিতে পারেন।" [সহীহ মুসলিম- কিতাবুল হুদূদ ابَابُ الْحُدُودِ كَفَّارَاتٌ لِأَهْلِها
অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে- উবাদা বলেন: আমরা এ সকল কথার উপর তাঁর হাতে বায়আত করলাম।” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ঢাকা) ১/১৭ নং
এর বিপরীতে মু'তাযিলা ও খারেজীদের দলিল হলো: ক. আল্লাহ হত্যাকারী এবং খ. সুদখোরকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলেছেন।
আল্লাহ বলেন: وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا "আর কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মু'মিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, যেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা'নত করবেন এবং মহাআযাব প্রস্তুত রাখবেন।" [সূরা নিসা- ৯৩ আয়াত]
আল্লাহ বলেন: الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسُ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلُ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانْتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّه وَمَنْ عَادَ فَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ - يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلِّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ "যারা সুদ খায়, তারা সে ব্যক্তিরই ন্যায় দাঁড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এই জন্য যে, তারা বলে: বেচাকেনা তো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ বেচাকেনাকে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন। যার কাছে তার রবের উপদেশ এসেছে এবং যে বিরত হয়েছে, তবে অতীতে যা হয়েছে তা তারই; এবং তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালবাসেন না।" [সূরা বাক্বারাহ- ২৭৫-৭৬ আয়াত]
এর দ্বারা প্রমাণিত হয় কবীরা গুনাহকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী এবং সে কাফির।
জবাব: পূর্বোক্ত সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসটির মূলনীতির আলোকে বুঝা যায়, সর্বোচ্চ কবীরা গুনাহকারীদের আল্লাহ ইচ্ছা করলে জাহান্নামে দিতে পারেন আবার ইচ্ছা করলে ক্ষমা করতে পারেন। তাছাড়া হাদীসটির মতো কুরআনেও মু'মিনের পাপের কাফফারার কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন-
আল্লাহ বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنثَى بِالْأُنثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَان ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ "হে মু'মিনগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য ক্বিসাসের বিধান দেয়া হয়েছে, স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস এবং নারীর বদলে নারী; তবে যাকে তার ভাইদের পক্ষ থেকে ক্ষমা করে দেয়া হবে, তখন যথাযথ বিধির অনুসরণ করা ও ইহসানের সাথে তা আদায় করা। এ বিধি তোমাদের রবের পক্ষ হতে সহজ ব্যবস্থা ও অনুগ্রহ। এরপরও যে সীমালঙ্ঘন করে তার জন্য রয়েছে ভয়ানক আযাব।" [সূরা বাক্বারাহ- ১৭৮ আয়াত]
আল্লাহ বলেন:
وَالْجُرُوحَ قِصَاصِ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ
“যে ব্যক্তি (ক্বিসাসের) শাস্তি সাদকা করে দেবে তা তার জন্য কাফফারায় পরিণত হবে।" (সূরা মায়িদা- ৪৫ আয়াত)
অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ বলেছেন:
مَنْ جُرِحَ فِي جَسَدِهِ جِرَاحَةً فَتَصَدَّقَ بِهَا كَفْرَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَنْهُ بِمِثْلِ مَا تَصَدَّقَ بِهِ
"যার শরীরে কোন আঘাত করা হয়েছে এবং সে তা সাদকা (মাফ) করে দিয়েছে, এ ক্ষেত্রে আল্লাহ যে পর্যায়ের ক্ষমা হবে ঠিক একই পর্যায়ের গোনাহ মাফ করা হবে।” [মুসনাদে আহমাদ, শুআয়েব আরনাউত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (তাহক্বীকুকৃত মুসনাদে আহমাদ ৫/২২৮৪৪ নং)।]
উক্ত আয়াত ও হাদীসগুলো থেকে মানুষের অধিকার সংক্রান্ত সর্বোচ্চ কবীরা গুনাহ তথা হত্যার ব্যাপারটিই মানুষ দ্বারাও যখন ক্ষমাযোগ্য। তখন অন্যান্য কবীরা গোনাহর ক্ষেত্রেও ঐ নীতিই প্রযোজ্য যা পূর্বে সহীহ মুসলিমের উবাদা ইবনে সামিত এ-এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী যথাযথ শাস্তি ভোগ বা মেয়াদের পর কেবল ঈমানের বদৌলতে জান্নাতী হওয়া সম্পর্কীত হাদীসগুলোও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
[বিস্তারিত জানতে দেখুন: "কবীরা গুনাহাগার মু'মিন কি চিরস্থায়ী জাহান্নামী?" -কামাল আহমাদ; আতিফা পাবলিকেশন্স, ঢাকা]
টিকাঃ
১৫ সহীহ: সহীহ মুসলিম - কিতাবুল ঈমান ا بَابٌ بَيَانِ كَوْنِ النَّهْيِ عَنِ الْمُنْكِرَ
১৬ সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ১০/৫৩৪১ নং।
📄 হাকিম ও হুকুম সম্পর্কীত আয়াতের বিশ্লেষণ
যারা ইসলাম অনুযায়ী শাসন পরিচালনা না করার জন্য শাসক বলতেই কাফির বলে ফতোয়া দিচ্ছে তাদের দলিল হলো কুরআনের ঐ সমস্ত আয়াত, যেখানে আল্লাহ তাঁর নিজের ও তাঁর রসূলের হুকুম অমান্যকারীকে 'মু'মিন নয়' বলে সম্বোধন করেছেন। এ বিষয়টি পূর্বে আলোচিত মুনাফিকু ও খারেজীদের আলোচনায় প্রমাণিত হয়েছে যে, তাদের ঈমান ও আক্বীদা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কাছে অগ্রহণযোগ্য হলেও, ইসলামী রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না- যতক্ষণ তাদের ইসলামবিরোধি আক্বীদাগুলো আমল হিসাবে বাস্তবরূপ লাভ করে। এখন এ সম্পর্কীত অন্যান্য আয়াতগুলো নবী -এর যামানার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হল।
প্রথম আয়াত: আল্লাহ বলেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
"কিন্তু না, আপনার রবের কুসম! তারা মু'মিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিরোধে আপনাকে হাকিম না বানায়, এরপর আপনার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে না নেয়।" [সূরা নিসা- ৬৫ আয়াত]
দৃষ্টান্ত: উরওয়া থেকে বর্ণিত; হাররা বা মদীনার কঙ্করময় ভূমিতে একটি পানির নালা নিয়ে যুবায়ের এর সাথে একজন আনসার ঝগড়া করেছিলেন। নবী বললেন: 'হে যুবায়ের! প্রথমত, তুমি তোমার জমিতে পানি দাও, তারপর তুমি প্রতিবেশীর জমিতে পানি ছেড়ে দেবে।' আনসার বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! সে আপনার ফুফাত ভাই, তাই এই ফায়সালা দিলেন। এতে অসন্তুষ্টিবশত রসূল এর চেহারা রক্তিম হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন: 'হে যুবায়ের! তুমি পানি চালাবে তারপর আইল পর্যন্ত ফিরে না আসা পর্যন্ত তা আটকে রাখবে তারপর প্রতিবেশীর জমির দিকে ছাড়বে।' আনসারী যখন রসূল ﷺ কে রাগিয়ে তুললেন তখন তিনি তার হক পুরোপুরি যুবায়ের কে প্রদানের স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন। তাদেরকে প্রথমে নবী এমন একটি নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে উদারতা ছিল। فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ : মুয়্যায বলেন: আয়াতটি এ উপলক্ষে নাযিল হয়েছে বলে আমার ধারণা। [সহীহ বুখারী- কিতাবুত তাফসীর।
আলোচ্য আয়াত থেকে প্রমাণিত হলো, নবীকে বিচারক অমান্যকারী আক্বীদাগতভাবে কাফির। কিন্তু নবী কর্তৃক এ ধরণের বিচার অমান্যকারীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং পূর্বে মুনাফিকু ও খারেজীদের উদ্ভব সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে আমরা প্রমাণ পেয়েছি, নবী তাঁর বিচারের রায় অমান্যকারীকে لَمَّلَهُ أَنْ يَكُونَ يُصَلِّي “সম্ভবত সে সালাত আদায় করে” বাক্যের মাধ্যমে ছাড় দিয়েছেন ও তাদের ভবিষ্যৎ ফিতনার প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার দিকে সাহাবীদের নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থাৎ আক্বীদাগত কুফর যতক্ষণ পর্যন্ত আমলী কুফরে পরিণত হয়ে প্রকাশিত না হয় এবং সমগ্র মুসলিম ও ইসলামের জন্য ফিতনাতে পরিণত না হচ্ছে- ততক্ষণ পর্যন্ত এমন লোকদের ছাড় দিতে নবী নির্দেশ দিয়েছেন।
এই আয়াতটির শানে-নুযূল হিসাবে অপর একটি বর্ণনা হলো, একজন ইয়াহুদী ও মুনাফিকু মুসলিমের সাথে সংঘটিত ঘটনা। যেখানে নবী ইয়াহুদী ব্যক্তিটির পক্ষে রায় দিলে মুনাফিকু মুসলিমটি তা অমান্য করে, শেষাবধি উমার -এর কাছে বিচার পেশ করে। উমার নবী এর ফায়সালা অমান্য করার কথা শুনে মুনাফিকু ব্যক্তিটিকে হত্যা করেন। কিন্তু এই হাদীসটি গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম ইবনে কাসির বলেছেন: হাদীসটি গরীব, মুরসাল (সূত্রছিন্ন), তাছাড়া এর অন্যতম রাবী আব্দুল্লাহ ইবনে লাহইয়া (তাফসীরে ইবনে কাসির, সূরা নিসা: ৬৫ নং আয়াত দ্রঃ)। এছাড়া হাদীসটির শেষে বর্ণিত হয়েছে: অতঃপর নবী উমার -কে উক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করার দণ্ড হতে মুক্তি দিলেন। তবে পরবর্তীকালে এটা প্রথা হয়ে দাঁড়ানোকে আল্লাহ অপছন্দ করলেন এবং পরবর্তী (নিসা- ৬৬) আয়াতটি নাযিল হল।
তাছাড়া হাদীসটি পূর্বে বর্ণিত খারেজীদের উদ্ভব সংক্রান্ত সহীহ বুখারীর হাদীসটির বিরোধি। সেখানে খালিদ বিন ওয়ালিদ রসূলুল্লাহ -এর কাছে তাঁর বিচার অমান্যকারীকে হত্যা করার অনুমতি চাইলে তিনি তা নিষেধ করেন। সুতরাং হাদীসটি সহীহ হাদীসের বিরোধি হওয়ায় বাতিল। তাছাড়া নিচের সহীহ হাদীসটিও আমাদের বক্তব্যকে সমর্থন করে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদ বলেন: যখন নবী হুনায়নের গনীমত বন্টন করে দিলেন, তখন আনসারদের এক ব্যক্তি বলে ফেলল, এই বণ্টনের ব্যাপারে তিনি আল্লাহ'র সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখেন নি। কথাটি শুনে আমি নবী-এর কাছে আসলাম এবং তাঁকে কথাটি জানিয়ে দিলাম। তখন তাঁর চেহারার রঙ পরিবর্তিত হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন: رَحْمَةُ الله عَلى مُوسَى لَقَدْ اُوْذِيَ بِأَكْثَرَ مِنْ هَذَا فَصَبَرَ “আল্লাহ, মূসা -এর উপর রহমত বর্ষণ করুন। তাঁকে এর চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সবর করেছিলেন।” [সহীহ বুখারী- কিতাবুল মাগাযী- بَابُ غَزْوَةِ الطَّائِفِ; সহীহ মুসলিম- কিতাবুয যাকাত م بَابُ اعْطَاءِ الْمُوَلَفَةِ قُلُوْهُمْ শব্দগুলো সহীহ বুখারীর।
সুতরাং সবক্ষেত্রে আমলগত কুফর ইসলামী রাষ্ট্রের ঘোষিত চূড়ান্ত মুরতাদ হিসাবে গণ্য হবে না। বরং এখানে كُفَرُ دُونَ كُفْرٍ )চূড়ান্ত কুফরের চেয়ে কম কুফর) নীতি প্রযোজ্য। নবী -এর নিজস্ব এই আমলটিই ইবনে আব্বাস-এর এই তাফসীরের প্রত্যক্ষ সমর্থক।
দ্বিতীয় আয়াতঃ আল্লাহ বলেন: وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا
"আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন বিষয়ের ফায়সালা দিলে কোন মু'মিন পুরুষ কিংবা মু'মিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার নেই। আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়।” [সূরা আহযাব- ৩৬ আয়াত]
আলোচ্য আয়াতটি যয়নাব বিনতে জাহাশের সঙ্গে যায়দ বিন হারিসের বিয়ে সম্পর্কে নাযিল হয়। প্রথমে যয়নাব এই বিয়েতে রাজী ছিলেন না। তখন আয়াতটি নাযিল হলে তিনি বিয়েতে রাজী হন। (সূরা আহযাবের ৩৬ নং আয়াতের বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থ অবলম্বনে)
عَنْ قَتَادَةَ قَالَ: خَطَبَ النَّبِيُّ ﷺ زَيْنَبَ وَهِيَ بِنْتُ عَمَّتِهِ وَهُوَ يُرِيدُهَا لِزَيْدٍ فَظَنَّتْ أَنَّهُ يُرِيدُهَا لِنَفْسِهِ فَلَمَّا عَلِمَتْ أَنَّهُ يُرِيدُهَا لِزَيْدٍ أَبَتَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: ﴿وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ﴾ فَرَضِيتْ وَسَلَّمَتْ رَوَاهُ الطَّبْرَانِيُّ بِأَسَانِيدَ وَرِجَالُ بَعْضُهَا رِجَالُ الصَّحِيح . ص ۲۰۹ (মুজমু'আয়ে যাওয়ায়েদ ৮/২০৮ পৃঃ)
এরপরেও তাদের বিয়ে টিকল না এবং শেষাবধি নবী -এর সাথে যয়নাব বিনতে জাহাশের বিয়ে হয় এবং সে সম্পর্কে পরবর্তী আয়াতটি নাযিল হয়।
আল্লাহ বলেন:
وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَاهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا
"স্মরণ করুন! আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলেছিলেন যে, 'তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর।' আপনি মনে মনে যা গোপন করেছেন আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিয়েছেন। আপনি লোক ভয় করছিলেন অথচ আল্লাহকেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত। এরপর যায়দ যখন তার স্ত্রী (যয়নাব)'র সাথে বিয়ে ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিয়ে দিলাম। যাতে মু'মিনদের পালকপুত্রদের নিজ স্ত্রীদের সাথে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করলে সে সব নারীকে বিয়ে করায় মু'মিনদের কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।" [সূরা আহযাব- ৩৭ আয়াত]
মূলত আয়াতটি দাবি হল:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ "নবী মু'মিনদের কাছে তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর।" [সূরা আহযাব: ৬ আয়াত]
অথচ মুনাফিকুগণ কখনই এই দাবি পূরণ করে না। তারপরেও রাষ্ট্রে বা সমাজে ফিতনা বিস্তার না করা পর্যন্ত তাদেরকে ছাড় দেয়া হয়েছে। অনুরূপ খারেজীদের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য।
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসের বর্ণিত শানে নুযূল আক্বীদাগত কুফরের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী আলোচনাতে প্রমাণিত হয়েছে, নবী-এর যামানাতে কেবল সামগ্রিকভাবে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধি ফিতনাবাজদের বিরুদ্ধেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ এসেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে রসূল তাদের ব্যাপারে সবরের নীতি অবলম্বন করেছিলেন। আবু বকরের যুগে যারা বিদ্রোহ করেছিল তা গোটা উম্মাতের বিরুদ্ধে ছিল। তা-ই তিনি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেন। উসমান-এর বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করেছিল তাদেরকে তিনি গোটা উম্মাতের সাথে গণ্য না করে কেবল নিজের সাথেই সংশ্লিষ্ট করেন। ফলে তিনি আদম-এর নেককার পুত্র, মূসা ও নবী-এর ন্যায় সবরের নীতি অনুসরণ করেন। তিনি মুসলিমদের মধ্যে রক্তপাত ঘটানোর পরিবর্তে নিজের মযলুম অবস্থায় শহীদ হওয়াকে বেছে নেন।
এ সম্পর্কে আরো যেসব আয়াত দলিল হিসাবে উল্লেখ করা হয়, তার সবই ‘ইবাদত ও আক্বীদাগত কুফরের সাথে সংশ্লিষ্ট।” যার জবাব পূর্বের ন্যায়। নবী কর্তৃক তাঁর যামানার আমল ও উম্মাতের প্রতি তার নির্দেশ থেকে বিষয়টি আমাদের কাছে সুস্পষ্ট।
দ্রষ্টব্য: পরিশিষ্টাংশ- ২।