📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 অনুবাদক/সঙ্কলকের কথা

📄 অনুবাদক/সঙ্কলকের কথা


نَحْمَدُهُ وَنُصَلِّي عَلَى رَسُولِهِ الْكَرِيمِ أَمَّا بَعْدُ -
মহান রব্বুল 'আলামীনের দরবারে লাখো, কোটি শুকরিয়া যে, কুরআন, সহীহ হাদীস ও সালফে-সালেহীনদের বিশ্লেষণের আলোকে আমরা "তাফসীরঃ হুকুম বি-গয়রি মা-আনঝালাল্লাহ" বইটি প্রকাশ করতে পেরেছি। এ গ্রন্থটি মূলত অনুবাদ ও সঙ্কলন। গ্রন্থটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, যেসব মুসলিম শাসক নিজ নিজ দেশে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করছে না, তারা কি কেবল এ কারণেই সুস্পষ্টভাবে মুরতাদ-কাফির? নাকি তাদের এই কার্যক্রমের কারণে পরিস্থিতি বিশেষে তারা কবীরা গোনাহে লিপ্ত পাপী মুসলিম (সালাত কায়েমের শর্তে)? আবার পরিস্থিতি বিশেষে (দ্বীনের ছোট বা বড় বিষয়কে অবজ্ঞা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কিংবা বিরোধিতার কারণে) সুস্পষ্ট মুরতাদ-কাফির? এ পর্যায়ে মুসলিম দেশগুলোর শাসকদের ব্যাপারে ঢালাওভাবে কোন কোন মহল সুস্পষ্ট কাফির ও তাদের রক্ত হালাল হওয়ার ফাতওয়া জারি করে ক্ষমতা দখল ও দেশবিরোধি নানাবিধ তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। এ ফাতওয়া জারি হওয়ার মূলে রয়েছে, কুরআনের শাব্দিক অর্থকে ব্যবহার। পক্ষান্তরে এর প্রয়োগিক অর্থ সাহাবীগণ এবং পরবর্তী ইমাম ও মুহাদ্দিসগণ (সালাফে-সালেহীন) কিভাবে নিয়েছিলেন তা থেকে দূরে থাকা। যারা কুরআন ও হাদীসের দাবি উপস্থাপনে এই পথ থেকে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছেন, তাদেরই এখানে খারেজী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমরা শায়েখ নাসিরুদ্দীন আলবানী-কে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে দেখি। আমরা তাঁর দু'টি গবেষণালব্ধ লেখনী এখানে সংযুক্ত করেছি। যা এই বইটির প্রধান আকর্ষণ। প্রথমটি হলো তাঁর তাহক্বীকুকৃত "সিলসিলাতুল আহাদীসুস সহীহাহ"-এর ষষ্ঠ খণ্ডের হাদীস নং ২৫৫২, ২৭০৪ এর উপস্থাপনা। দ্বিতীয়টি হলো, তাঁরই "ফিতনাতুত তাকফীর" (শায়েখ উসায়মীন-এর টীকাসহ) পুস্তিকাটি। এর ফলে তিনি ব্যাপক সমালোচনার শিকার হন। তাঁর সমালোচনাকারীদের অন্যতম যুক্তি হলো:
১. লেখকের স্বপক্ষের দলিলগুলো সমালোচনামুক্ত নয়।
২. কুরআনের সুস্পষ্ট দলিলের বিরোধি।
এ পর্যায়ে আমি লক্ষ করেছি- উভয় পক্ষই নিজ নিজ সমর্থনে কুরআনের আয়াত ও পছন্দমত সালাফদের বক্তব্য তুলে ধরেন। এমনকি এ বিষয়ে উভয় পক্ষেরই পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যাপক পুস্তক/পুস্তিকাও রয়েছে। এই বিতর্কের প্রকৃত সমাধান রয়েছে নবী ﷺ ও সাহাবীগণ কর্তৃক তৎকালীন প্রেক্ষাপটে কুরআনের আয়াতগুলোর কি বাস্তব দাবি প্রয়োগ করেছিলেন তার উপর। যা আমি স্বতন্ত্রভাবে "আক্বীদাগত ও আমলগত কুফরের দৃষ্টান্ত"¹ ও "হাকিম ও হুকুম সম্পর্কীত আয়াতের বিশ্লেষণ”² অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছি। এছাড়া সাক্ষ্যমূলক প্রমাণ হিসাবে "আয়াতে তাহকীম ও প্রসিদ্ধ তাফসীর"³, "আয়াতে তাহকীম ও সালাফে সালেহীন"⁴ প্রভৃতি শিরোনাম উল্লেখ করে এই বইয়ে নিজের পক্ষ থেকে সংযোজন করেছি। তাছাড়া শায়েখ ইবনে বায -এর "ঈমান, কুফর, ইরজা' ও মুরজিয়া”, সফিউর রহমান মুবারকপুরী লিখিত 'ইবাদত ও ইতা'আত' প্রবন্ধটি অনুবাদ করে স্বতন্ত্র শিরোনামসহ এই পুস্তকে সংযোজন করেছি। সবশেষে সংযোজন করেছি "তাহক্বীকুকৃত আমাদের হাকিম কেবলই একজন" -যা পাঠকদের এই বিতর্ক সমাধানে সহযোগিতা করবে, ইনশাআল্লাহ।
কেবল অনুবাদ নয়, যেন সাধারণ মানুষ সেগুলো বাংলায় অনূদিত হাদীস ও অন্যান্য গ্রন্থে সহজেই খুঁজে পান সেজন্য প্রয়োজনীয় সূত্রও উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। তবে সংগত কারণেই হাদীসের তাহক্বীকুগুলো মূল আরবি গ্রন্থ থেকেই নিতে হয়েছে। আলোচনার স্বপক্ষে অন্যান্য দলিল থাকলে তা-ও আমার পক্ষ থেকে টীকাতে উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। এ পর্যায়ে মানুষ হিসেবে ভুল-ভ্রান্তি হয়ে যাওয়াটা অকপটে স্বীকার করছি।
সম্মানিত পাঠক ও গবেষকদের সুচিন্তিত পরামর্শে পরবর্তীতে সেগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার, সংশোধন ও সংযোজন করব, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহর কাছে এই দু'আই করছি, তিনি যেন কুরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত ইলম অর্জন ও তার প্রচার-প্রসারের ব্যাপারে উন্মুক্ত চিন্তা দান করেন, সাথে সাথে সত্য গ্রহণ সব ধরনের মানসিক সংকীর্ণতা দূর করে দেন। আমিন!!
নিবেদক কামাল আহমাদ পুরাতন কসবা, কাজীপাড়া, যশোর-৭৪০০। ই-মেইল: kahmed_islam05@yahoo.com

টিকাঃ
১. 'আক্বীদাগত ও আমলগত কুফরের দৃষ্টান্ত': এই অংশে (১) মুনাফিক্ব, (২) খারেজী, ও (৩) গোমরাহ শাসকদের প্রতি মুসলিমদের আচরণ, দায়িত্ব-কর্তব্য ও তার সীমারেখা কেবল কুরআন ও সহীh হাদীসের বিতর্কমুক্ত সূত্রের আলোকে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রমাণ করা হয়েছে, তাদের ঈমান ও আমল আল্লাহ্ ﷺ ও তাঁর রসূলের ﷺ কাছে অগ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যা মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)'র উপস্থাপিত দলিলগুলোর দাবিকেই প্রতিষ্ঠিত করে (যদিও তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) নিজ প্রমাণের স্বপক্ষে সাহাবী ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর তাফসীরটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। যা তাঁর প্রতিপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় নি)। পক্ষান্তরে যারা তাঁর বিরোধিতা করেছেন, তারা যে নবী ﷺ ও সাহাবাদের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তৎকালীন প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ না করে কেবল শাব্দিক তরজমা দ্বারা দলিল উপস্থাপন করেছেন তা সুস্পষ্ট।
২. 'হাকিম ও হুকুম সম্পর্কীত আয়াতের বিশ্লেষণ': এই অংশে কুরআনে উল্লিখিত হাকিম ও হুকুম সংক্রান্ত আয়াতগুলো দ্বারা যে তাকফীরের ফিতনাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, ঐ আয়াতগুলো নবী ﷺ'র ওপর নাযিল হওয়া সত্ত্বেও তাঁর এ ধরণের কোন তৎপরতার প্রমাণ পাওয়া যায় না। আক্বীদাগত ভাবে তাদের ঈমানহানির কথা কুরআন ঘোষণা করা সত্ত্বেও নবী ﷺ কর্তৃক ঐ সব আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে কোন কঠিন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় নি। যার উদাহরণ পূর্বোক্ত টীকারই অনুরূপ।
৩. 'আয়াতে তাহকীম ও প্রসিদ্ধ তাফসীর': এই অংশে পূর্ববর্তী প্রসিদ্ধ ও উপমহাদেশের সর্বমোট দশজন মুফাসসির থেকে আয়াতটির প্রকৃত তাফসীর উল্লেখ করা হয়েছে। যার ফলে সুস্পষ্ট হয়েছে, মুফাসসিরগণ উক্ত তাফসীরের ব্যাপারে একই পথের অনুসরণ করেছেন।
'আয়াতে তাহকীম ও সালাফে সালেহীন': এই অংশে সর্বজনস্বীকৃত ইমাম ও মুহাদ্দিসদের 'আয়াতে তাহক্বীম' সম্পর্কে মতামত উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য অনেক আধুনিক ও পূর্ববর্তী শায়েখ এবং ইমামদের অনেক স্ব-বিরোধি বক্তব্য থাকায়- বিরোধি পক্ষ বিতর্কটি দীর্ঘস্থায়ী রাখার সুযোগ পেয়েছে। এর সমাধান হলো, বিতর্ক দেখা দিলে আমরা কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যাব (সূরা নিসা- ৫৯ আয়াত)। তবে বিরোধিপক্ষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সালাফদের বক্তব্যের প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় আনে নি।
এ প্রবন্ধটির মাধ্যমে 'ঈমান, কুফর, ইরজা' ও মুরজিয়া' সম্পর্কে দ্বিধা-দ্বন্দ দূর হবে ইনশাআল্লাহ।
এই প্রবন্ধটির মাধ্যমে শায়েখ সফিউর রহমান মুবারকপুরী 'ইবাদত ও ইতাআত'- এর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকার বিষয়টি প্রমাণ করেছেন। যারা মনে করেন রাষ্ট্রের ইতা'আত প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের 'ইবাদত করা তথা শিরক- তাদের ভুলগুলো তিনি শুধরিয়ে দিয়েছেন।
"তাহক্বীকুকৃত আমাদের হাকিম কেবলই একজন": এটি একটি স্বতন্ত্র পুস্তিকা। যা "জাম'আতুল মুসলিমীন" (পাকিস্তান)-এর "আমাদের হাকিম কেবলই একজন- আল্লাহ"- এর তাহক্বীকু। এই বইটির উপস্থাপনাও কুরআনের শাব্দিক আয়াতের আলোকে করা হয়েছে। এই তাহক্বীত্বের মাধ্যমে সেগুলোর সংশোধন করা হয়েছে। যা পাঠ করলে সম্মানিত পাঠক 'হাকিম ও হুকুম' সংক্রান্ত প্রায় সবগুলো আয়াতের প্রকৃত দাবি বুঝতে পারবেন। তাছাড়া এর ভূমিকাতে সংযুক্ত হয়েছে খারেজীদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 আয়াতে তাহকীম বি-গয়রি মা-আনযালাল্লাহ (সূরা মায়িদা- ৪৪-৪৭ আয়াত) এর পর্যালোচনা

📄 আয়াতে তাহকীম বি-গয়রি মা-আনযালাল্লাহ (সূরা মায়িদা- ৪৪-৪৭ আয়াত) এর পর্যালোচনা


আল্লাহ বলেন: إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ بِمَا اسْتَحْفَظُوا من كتاب اللَّهِ وَكَانُوا عَلَيْهِ شُهَدَاءَ فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيْلًا وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ .... فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُوْنَ ..... فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
"আমি তাওরাত নাযিল করেছিলাম, তাতে হিদায়াত ও নূর ছিল। নবীগণ- যারা ছিলেন অনুগত (মুসলিম) তদনুযায়ী এই ইয়াহুদীদের বিধান দিত, আর রব্বানী (সূফী/দরবেশ) ও আহবার (পণ্ডিত/আলেম/চিন্তাবিদ)- রাও। কেননা তাদের আল্লাহর কিতাবের হেফযাতকারী করা হয়েছিল এবং তারা ছিল এর সাক্ষী। অতএব, তোমরা লোকদের ভয় করো না, আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াতকে সামান্য ও নগণ্য বিনিময়ে বিক্রি করো না। যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।.... তারাই যালিম।..... তারাই ফাসিকু।" (সূরা মায়িদা- ৪৪-৪৭ আয়াত)

আয়াতের শানে নুযূল
ইবনে আব্বাস বলেন: এই (সূরা মায়িদা, ৪৪-৪৭ নং) আয়াতগুলো ইয়াহুদীদের দু'টি গোত্র সম্পর্কে নাযিল হয়। একটি গোত্র ছিল বিজয়ী এবং অপরটি ছিল পরাজিত। তারা পরস্পর এ ব্যাপারে সন্ধি করে যে, বিজয়ী সম্মানিত গোত্রের কোন ব্যক্তি যদি পরাজিত অপমানিত গোত্রের কাউকে হত্যা করে, সেক্ষেত্রে পঞ্চাশ ওয়াসাক দিয়াত (রক্তমূল্য) দেবে। আর পরাজিত অপমানিত গোত্রের কেউ বিজয়ী গোত্রের কাউকে হত্যা করলে একশ' ওয়াসাক দিয়াত দেবে। এই প্রথাই চলে আসছিল। যখন রসূলুল্লাহ মদীনাতে আসলেন, তখন গোত্র দু'টি রসূলুল্লাহ'র সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সেটা প্রকাশ করে নি, এমনকি সমাধানেরও চেষ্টা করে নি। এরপর এমন একটি ঘটনা ঘটে, যেখানে পরাজিত ইয়াহুদীদের একজন বিজয়ী ইয়াহুদীদের কাউকে হত্যা করে। তখন এদের (বিজয়ীদের) পক্ষ থেকে একশ' ওয়াসাক আদায়ের জন্য (পরাজিতদের কাছে) একজনকে পাঠান হলো। পরাজিতপক্ষ তখন বলল, এটা সুস্পষ্ট বেইনসাফী। কেননা আমরা উভয়েই একই জাতি, একই দ্বীন, একই বংশ, একই শহরের অধিবাসী। তাহলে একপক্ষের দিয়াত কিভাবে অপরপক্ষের অর্ধেক হয়? আমরা যদিও এতকাল তোমাদের চাপের মুখে ছিলাম, এই বেইনসাফী আইন পরিবর্তন না করে তা লাঞ্ছিত অবস্থায় মেনে এসেছি। কিন্তু এখন মুহাম্মাদ এখানে এসেছেন (যিনি ন্যায়বিচারক)। সুতরাং আমরা তোমাদের তা দিব না।
তাদের মধ্যে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হলো। শেষাবধি তারা বলল, চল এই দ্বন্দের ফায়সালা মুহাম্মাদ-ই করবেন। কিন্তু বিজয়ী গোত্রের লোকেরা যখন নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করল তখন তারা বলল, দেখ আল্লাহ'র কসম! মুহাম্মাদ কখনই তোমরা যা (পরাজিতদের কাছ থেকে) পেতে, তাতে তোমাদের দ্বিগুণ দিবেন না। আর তিনি সত্য কথা বলেন। তারা কখনই আমাদের এটা দেবে, যতক্ষণ না এই বিচারের রায় আমাদের পক্ষে হয়- এই জন্যে যে আমরা তাদের উপর বিজয়ী। সুতরাং রসূলুল্লাহ-এর কাছে গোপনে লোক পাঠাও। সে এটা বুঝে আসুক তিনি কি ফায়সালা করবেন। যদি তা আমাদের পক্ষে হয় তবে তো খুব ভাল- তখন আমরা তাঁর ফায়সালা মেনে নেব। আর যদি আমাদের বিপক্ষে যায় সেক্ষেত্রে দূরে থাকাই ভাল এবং তার ফায়সালা মানব না। তখন মুনাফিক্বদের মধ্যে থেকে কাউকে গোয়েন্দা বানিয়ে নবী-এর কাছে পাঠালো। সে যখন প্রথমে গেল তখন আল্লাহ নিচের আয়াত নাযিল করে তাদের ষড়যন্ত্র নবী-কে জানিয়ে দিলেন।
আয়াতগুলো হলো:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنُكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِنْ قُلُوبُهُمْ وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِنْ بَعْدِ مَوَاضِعِهِ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ وَإِنْ لَمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا وَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ فِتْنَتَهُ فَلَنْ تَمْلِكَ لَهُ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا أُولَئِكَ الَّذِينَ لَمْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمْ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ -
“হে রসূল! সেই সব লোক যেন আপনার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ না হয় যারা দ্রুতগতিতে কুফরীর পথে অগ্রসর হচ্ছে। তারা সেই লোক, যারা মুখে বলে- আমরা ঈমান এনেছি, কিন্তু তাদের অন্তর ঈমান গ্রহণ করে নি। এবং তারা সেই লোক যারা ইয়াহুদী হয়েছে, তাদের অবস্থা এই যে, মিথ্যা শোনার জন্য তারা কান পেতে থাকে এবং এমন এক শ্রেণীর লোকের থেকে তারা কথা টুকিয়ে (কুড়িয়ে) বেড়ায় যারা কখনো তোমার নিকট আসে নি। তারা আল্লাহর কিতাবের শব্দগুলোকে তার স্থান থেকে পরিবর্তন করে এবং বলে যে, তোমাদের এ আদেশ দেয়া হলে মানবে অন্যথায় মানবে না। বস্তুত আল্লাহই যাকে ফিতনায় নিক্ষেপ করতে ইচ্ছা করেছেন, তাকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে উদ্ধার করার জন্য তুমি কিছু করতে পার না। এরা সেই লোক যাদের মন-হৃদয়কে আল্লাহ পবিত্র করতে চান নি। তাদের জন্যে রয়েছে দুনিয়ার লাঞ্ছনা এবং পরকালে কঠিন শাস্তি।” [সূরা মায়িদা- ৪১ আয়াত]
سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ أَكَالُونَ لِلسُّحْتِ فَإِنْ جَاءُوكَ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ أَوْ أَعْرِضْ عَنْهُمْ وَإِنْ تُعْرِضْ عَنْهُمْ فَلَنْ يَضُرُّوكَ شَيْئًا وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِالْقِسْطِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ (٤٢)
“এরা মিথ্যা শ্রবণে ও হারাম মাল ভক্ষণে অভ্যস্ত। কাজেই এরা যদি তোমার নিকট (নিজেদের মোকদ্দমা নিয়ে) আসে তবে তোমার ইখতিয়ার রয়েছে, ইচ্ছা করলে তাদের বিচার কর, অন্যথায় অস্বীকার কর। অস্বীকার করলে এরা তোমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আর বিচার ফায়সালা করলে ঠিক ইনসাফ মুতাবিকই করবে, কেননা আল্লাহ ইনসাফকারী লোকদের পছন্দ করেন।” [সূরা মায়িদা- ৪২ আয়াত]
وَكَيْفَ يُحَكِّمُونَكَ وَعِنْدَهُمُ التَّوْرَاةُ فِيهَا حُكْمُ اللَّهِ ثُمَّ يَتَوَلَّوْنَ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَمَا أُولَئِكَ بِالْمُؤْمِنِينَ (٤٣) إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُوا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ وَكَانُوا عَلَيْهِ شُهَدَاءَ فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنَ وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ (٤٤) وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ (٤٥) وَقَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَأَتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِلْمُتَّقِينَ (٤٦) وَلْيَحْكُمْ أَهْلُ الْإِنْجِيلِ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِيهِ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (٤٧)
"এরা তোমাকে কিরূপে বিচারক মানে, যখন তাদের নিকট তাওরাত বর্তমান রয়েছে, তাতেই আল্লাহর আইন ও বিধান লিখিত আছে। কিন্তু এরা তা থেকে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। আসল কথা এই যে, এরা ঈমানদার লোকই নয়। আমরা তাওরাত নাযিল করেছিলাম, তাতে হিদায়াত ও নূর ছিল। নবীগণ- যারা ছিলেন অনুগত (মুসলিম) তদনুযায়ী এই ইয়াহুদীদের বিধান দিত, আর রব্বানী (সূফী/দরবেশ) ও আহবার (পণ্ডিত/আলেম/চিন্তাবিদগণও)। কেননা তাদের আল্লাহর কিতাবের হিফযাতকারী করা হয়েছিল এবং তারা ছিল এর সাক্ষী।
অতএব, তোমরা লোকদের ভয় করো না, আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াতকে সামান্য ও নগণ্য বিনিময়ে বিক্রি করো না। যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।
তাওরাতে আমরা ইয়াহুদীদের প্রতি এ হুকুমই লিখে দিয়েছিলাম যে, জানের বদলে জান, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং সব রকমের যখমের বদলা নির্দিষ্ট। অবশ্য কেউ কিসাস সাদাক্বা করে দিলে তা তার জন্যে কাফফারা হয়ে যাবে। আর যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই যালিম। তাদের পরে ঈসা ইবনে মারইয়ামকে প্রেরণ করেছি। তাওরাতের যা-কিছু তার সম্মুখে ছিল, সে ছিল তারই সত্যতা প্রমাণকারী। আমরা তাঁকে ইঞ্জিল দান করেছি, যার মধ্যে ছিল হিদায়াত ও আলো এবং তা-ও তাওরাতের যা কিছু তার সম্মুখে ছিল তারই সত্যতা প্রমাণকারী এবং মুত্তাকীদের জন্যে পূর্ণাঙ্গ হিদায়াত ও নসীহত ছিল। আমাদের নির্দেশ ছিল যে, ইঞ্জিল বিশ্বাসীগণ তাতে আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করবে। আর যারাই আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করবে না তারাই ফাসিকু।” (সূরা মায়িদা- ৪১-৪৭ আয়াত)
আলবানী বলেন: হাদীসটি আহমাদ ১/২৪৬, তাবারানী-মু'জামুল কাবীর ৩/৯৫/১-এ আব্দুর রহমান বিন আবূ যিনাদ তাঁর পিতা থেকে, তিনি উবায়দুল্লাহ বিন আব্দুল্লাহ বিন উতবাহ বিন মাসউদ থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন। ইমাম সুয়ূতী এটাকে সমর্থন করেছেন (আদ-দুররুল মানসুর ২/২৮১)। আবূ দাউদ, ইবনে জারীর, ইবনে মুনযির, আবু শায়খ, ইবনে মারদুবিয়াহ-ও ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনে জারীর নিজের তাফসীরে (১০/৩২৫/১২০৩৭) এভাবেই বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তিনি ইবনে আব্বাসের নাম উল্লেখ করেন নি। আবু দাউদের বর্ণনাতে উক্ত ঘটনাটি সুনির্দিষ্টভাবে ইয়াহুদী গোত্র বনূ কুরায়যা ও বনূ নাযির গোত্র সম্পর্কে উল্লিখিত হয়েছে। অথচ ইবনে কাসির আহমাদ থেকে (পূর্বোক্ত) দীর্ঘ রেওয়ায়াতটি বর্ণনার পর লিখেছেন: "আবূ দাউদ আবূ যিনাদ তাঁর পিতা থেকে এভাবে বর্ণনা করেছেন" অথচ এখানে একটি সন্দেহের সৃষ্টি হয় (৬/১৬০)।
"আর-রাওদুল বাসিম ফি আযযাহবিস সুন্নাহ আবীল ক্বাসিম" গ্রন্থের সম্মানিত লেখক ইমাম ইবনে কাসির থেকে বর্ণনা করেছেন- তিনি এর সনদকে হাসান বলেছেন। আমি (নাসিরুদ্দীন আলবানী) ইমাম ইবনে কাসিরের 'তাফসীরে' এটা পাই নি। সম্ভবত তিনি তাঁর অন্য কোন কিতাবে তা উল্লেখ করেছেন।
উলূমুল হাদীসের আলোকে হাদীসটি অতি উত্তম। কেননা হাদীসটির ভিত্তি হল আবূ যিনাদ। তাঁর সম্পর্কে হাফিয বলেছেন: صِدْقُ ، تَغَيَّرَ حِفْظُهُ لَمَّا قَدِمَ بَغْدَادَ ، وَكَانَ فَقِيهُ "সত্যবাদী, কিন্তু বাগদাদে যাওয়ার পর তার স্মৃতিশক্তিতে বিভ্রম হয়। তিনি একজন ফক্বীহ ছিলেন।" হায়সামী বলেছেন: رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالطَّبْرَانِي بِنَحْوِهِ وَفِيهِ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي الزَّنَادِ وَهُوَ ضَعِيفُ وَقَدْ وَثَقَ وَبَقِيَّةٌ رِجَالٍ أَحْمَدُ ثِقَاتُ "আহমাদ, তাবারানী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এতে আব্দুর রহমান বিন আবী যিনাদ যয়ীফ বর্ণনাকারী আছেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে তাকে সিক্বাহ গণ্য করা হয়। অন্যান্যরা আহমাদের সিক্বাহ বর্ণনাকারী। (৭/১৬) আমি (আলবানী) বলছি: হায়সামী'র উক্তি: ضَعِيفَ وَقد وَلَقَ “যয়ীফ, তবে তাকে সিক্বাহও গণ্য করা হয়" -সংগত নয়। কেননা তিনি তাঁকে যয়ীফ গণ্যকারীদের সিক্বাহ গণ্যকারীদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, তিনি মাঝামাঝি। অর্থাৎ তিনি 'হাসান' স্তরের, যদি না তাঁর থেকে অন্যদের (সিক্বাহ বর্ণনাকারীদের) বিপরীত কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু পূর্বোক্ত (হায়সামীর) উক্তিটি এই মর্যাদা দেয় না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। [মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-বানী, সিলসিলাতুল আহাদীসুস সহীহাহ ৬/২৫৫২ নং হাদীস)
বিশেষ জ্ঞাতব্য: (অতঃপর ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী বলেন) যখন আপনি এটা বুঝতে পারলেন ["যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।.... তারাই যালিম। ...... তারাই ফাসিকু।” (সূরা মায়িদার- ৪৪, ৪৫ ও ৪৭)] আয়াত তিনটি ইয়াহুদীদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, আর তারা রসূলুল্লাহ এর হুকুম সম্পর্কে বলেছিল: إِنَّ أَعْطَاكُمْ مَا تُرِيدُونَ حَكَمْتُمُوهُ وَ إِنْ لَمْ يَعْطِكُمْ حَذَرْتُمْ فَلَمْ تُحْكِمُوْهُ
"যা তোমরা চাও যদি সে তা দেয় তবে তাঁকে হাকিম বানাও, আর যদি তোমাদের চাহিদা সে পূরণ না করে তবে তাঁকে হাকিম বানিয়ো না।" কুরআনুল কারীম তাদের এই বক্তব্যের দিকে লক্ষ করে নিম্নোক্ত বক্তব্যটি উপস্থাপন করে: إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ وَإِنْ لَمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا يَقُوْلُوْنَ
"তারা বলে: যদি তোমাদের এটা দেয়া হয় তাহলে মানবে, অন্যথায় মানবে না।” [সূরা মায়িদা- ৪১]
আপনি যখন এটা জানেনই যে, এই আয়াতগুলোর আলোকে ঐসব মুসলিম শাসককে কাফির বলা জায়েয নয়- যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আইনের পরিবর্তে দুনিয়াবী (মতবাদযুক্ত) আইন মোতাবেক বিচার ফায়সালা করে। কেননা সে এক দৃষ্টিতে ইয়াহুদীদের মতই অর্থাৎ (আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধানের বিপরীত) বিচারকার্যের ক্ষেত্রে। অন্য দৃষ্টিতে তাদের বিপরীত অর্থাৎ আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধানের প্রতি ঈমান আনা ও তাঁর সত্যতাকে মানা কাফির ইয়াহুদীদের বিপরীত। কেননা ইয়াহুদীরা নবী-কে অস্বীকার করেছিল, যার স্বপক্ষে প্রথম (সূরা মায়িদা-৪১ নং) আয়াতটি প্রমাণ বহন করে। প্রকৃতপক্ষে তারা মুসলিমই ছিল না।
এর আলোকে যে বিষয়বস্তু সুস্পষ্ট হয় তা হলো কুফর দুই প্রকার। যথা: ১. ই'তিক্বাদী বা আক্বীদাভিত্তিক, ২. 'আমালী বা 'আমলভিত্তিক।
ই'তিক্বাদী হলো, আন্তরিক স্বীকৃতি। পক্ষান্তরে 'আমালী হলো, যা বাহ্যভাবে প্রকাশিত। যার কোন আমল শরী'আতের বিরোধি হওয়ার কারণে কুফর হয় এবং যা তার অন্তরে আছে তাও প্রকাশ্য কুফর মোতাবেক হয়- সেক্ষেত্রে এই কুফরকে ই'তিক্বাদী কুফর বলা হবে। এটা ঐ কুফর যা আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করেন না। আর এর পরিণাম হল, সে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে। আর যদি তার অন্তরে যা আছে তা তার আমলের বিপরীত, অর্থাৎ সে নিজের রবের হুকুমের প্রতি ঈমান আনে, কিন্তু 'আমলের দিক থেকে তার বিপরীত করে- তবে তার কুফর কেবলই 'আমলী কুফর হবে, ই'তিক্বাদী কুফর হবে না। আর সে আল্লাহ'র ইচ্ছার অধীন হবে- তিনি ইচ্ছা করলে তাকে আযাব দেবেন, কিংবা ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করবেন। আর ঐ সমস্ত হাদীস যেখানে অপরাধ বা গোনাহের কারণে মুসলিমের ব্যাপারে কুফর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সন্দেহযুক্ত কুফর হিসাবে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে কয়েকটি উদাহরণ নিচে প্রণিধানযোগ্য:
১. রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا هِمْ كُفْرٌ : الطَّعْنُ فِي السَبِ، وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ "দু'টি বিষয় মানুষের মধ্যে রয়েছে, যা তাদের জন্য কুফর: ক. বংশ নিয়ে খোঁটা দেয়া, খ. মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা।" [সহীহ মুসলিম, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব (ইফা) ৪/৩৫৬ পৃঃ]
২. রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: الْجَدَالُ فِي الْقُرْآنِ كُفْرٌ “কুরআন নিয়ে বিতর্ক করা কুফর।” [মুস্তাদরাকে হাকিম; আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (সহীহুল জামে'উস সগীর ওয়া যিয়াদাতাহু ১/৩১০৬ নং)]
৩. রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: سَبَابُ الْمُسْلِمِ فَسُوْقَ وَ قِتَالُهُ كُفْرٌ "মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেক্বী, আর তাকে হত্যা করা কুফরী।" [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৯/৪৬০৩ নং]
৪. রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: كُفْرٌ بِالله تَبَرُّقَ مِنْ نُسَبِ وَ إِنْ دَقَّ "(সত্যিকারের) বংশকে অস্বীকার করাতে আল্লাহ'র সাথে কুফর করা হয়, যদিও বংশ খুবই নিচু হয়।" (বাযযার, দারেমী, তাবারানীর আওসাত; আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন (সহীহুল জামে' ২/৪৪৮৫ নং)]
৫. রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: التَّحَدُّثُ بنعمة الله شُكْرٌ وَتَرَكُهَا كُفْرٌ "আল্লাহ'র নিয়ামত বর্ণনা করা শোকর এবং তা তরক করা কুফর।" [বায়হাক্বী- শু'আবুল ঈমান; আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন (সহীহুল জামে' ১/৩০১৪ নং)]
৬. রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لا تَرْجِعُنَّ بَعْدِي كُفَّارًا يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رَقَابَ بَعْضٍ "তোমরা আমার পরে পরস্পরের গর্দান উড়িয়ে কাফিরে পরিণত হয়ো না।" [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৭/৩৩৮২ নং]
এ ধরনের আরো অনেক হাদীস আছে, যার সবগুলোর বর্ণনা উল্লেখ করা এখানে নিষ্প্রয়োজন। সুতরাং মুসলিমদের মধ্যে কেউ এই জাতীয় অপরাধ করলে এই কুফর 'আমলী কুফর' হিসাবে গণ্য হবে- অর্থাৎ সে কাফিরদের ন্যায় আমল করল। তবে সে যদি এ অপরাধ করাকে হালাল মনে করে এবং গোনাহ হিসাবে গণ্য না করে, তবে সেক্ষেত্রে সে (এমন) কাফির বলে গণ্য হবে, যার রক্ত (হত্যা করা) হালাল। কেননা তার কুফরী আক্বীদার ক্ষেত্রে সংঘটিত হয়েছে। আর حُكْم بِغَيْرِ مَا أَنْزَلَ اللهُ “আল্লাহ'র নাযিলকৃত হুকুম ছাড়া অন্য কোন হুকুম"-এই নীতি থেকে ভিন্ন কিছু নয়। সালাফদের থেকে এ ধরনের বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায়, যা একে শক্তিশালী করে। এই আয়াতের তাফসীরে তাদের বক্তব্য হল, كُفْرَ دُونَ كُفْر ("মুরতাদ হওয়ার) কুফর থেকে কম কুফর"। এই তাফসীর আব্দুল্লাহ থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর তাঁর থেকে অনেক তাবেয়ী বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে থেকে আমার সাধ্যমত কয়েকটি বর্ণনা জরুরী মনে করছি। আশাকরি, এর ফলে ইদানিং যারা এই মাসয়ালার ব্যাপারে চরমপন্থা গ্রহণে গোমরাহ হয়েছে তাদের সহীহ পথ দেখাবে এবং খারেজীদের পথ ছেড়ে দেবে, তারা মুসলিমদের গোনাহর কারণে তাকফির (সুস্পষ্ট কাফির সম্বোধন) করে- যদিও তারা সালাত আদায় করছে ও সিয়াম পালন করে।
১. ইবনে জারীর তাবারী (১০/৩৫৫/১২০৫৩) ইবনে আব্বাস থেকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন-
وَ مَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ قَالَ : هِيَ بِهِ كُفْرُ ، وَ لَيْسَ كُفْرًا بِاللَّهِ وَ مَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ "(যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম শাসন করে না- তারাই কাফির) ইবনে আব্বাস বলেন: এটা কুফর, কিন্তু এই ব্যক্তির কুফর এমন নয় যেভাবে কেউ আল্লাহ, মালাইকা, কিতাবসমূহ ও রসূলগণের প্রতি কুফর করে।"
২. তিনি ইবনে আব্বাস থেকে অপর একটি বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন:
إِنَّهُ لَيْسَ بِالْكُفْرِ الَّذِي يَذْهَبُوْنَ إِلَيْهِ ، إِنَّهُ لَيَسْ كُفْرًا يَنقُلُ عَن المَلَّةِ، كُفْرُ دُونَ كُفْرٍ
“এটা ঐ কুফর নয়, যার দিকে এরা (খারেজীরা) গিয়েছে। এটা ঐ কুফর নয়, যা মিল্লাতে ইসলামিয়াহ থেকে খারিজ করে দেয়। বরং كُفْرُ دُونَ كُفْرٍ ")চূড়ান্ত) কুফরের থেকে কম কুফর"।
এটা ইমাম হাকিম বর্ণনা করেছেন (২/৩১৩) এবং বলেছেন: 'সহীহুল ইসনাদ'। আর ইমাম যাহাবী চুপ থেকেছেন। আর তাদের দু'জনের সমন্বয়ে হকু প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ তাদের উক্তি: عَلَى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ "সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তানুযায়ী” দ্বারা হাদীসটি উক্ত মর্যাদাই উন্নীত হয়। অতঃপর আমি এটাও দেখলাম যে, হাফিয ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরে (৬/১৬৩) হাকিম থেকে বর্ণনা করার পর বলেছেন: عَلَیٰ شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ "সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তানুযায়ী"। সুতরাং সুস্পষ্টভাবে এটাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, মুস্তাদরাকে হাকিমের কোন কোন সংস্করণে বাক্যটি বাদ পড়েছে।
৩. ইবনে জারীর তাবারী অপর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যা আলী ইবনে আবী তালহা, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: مَنْ جَحَدَ مَا أَنزَلَ اللهُ فَقَدْ كَفَرَ ، وَ مَنْ أَقَرَّ بِهِ وَ لَمْ يَحْكُمْ فَهُوَ ظَالِمُ فَاسِقُ "যে আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিষয়াদি অস্বীকার করে সে কাফির, কিন্তু যে স্বীকার করে অথচ সে মোতাবেক ফায়সালা না করে তবে সে যালিম ও ফাসিকু।" আমি (আলবানী) বলছি: ইবনে আবী তালহা কর্তৃক ইবনে আব্বাস থেকে শোনার কথা প্রমাণিত নয়। এরপরও সাক্ষ্যমূলক হাদীস হিসেবে এটি খুবই উত্তম।
৪. অতঃপর ইবনে জারীর (১২০৪৭-১২০৫১) আতা বিন আবী রিবাহ'র উক্তি উল্লেখ করেছেন: "যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।.... তারাই যালিম।.... তারাই ফাসিকু” (সূরা মায়িদা- ৪৪, ৪৫ ও ৪৭) “তিনটি আয়াত উল্লেখ করে বলেছেন: كُفْرُ دُوْنَ كُفْرٍ ، وَ فِسْقُ دُوْنَ فِسْقٍ ، وَ ظُلْمٌ دُوْنَ ظُلْمٍ )চূড়ান্ত) কুফর থেকে (কম) কুফর, (চূড়ান্ত) ফিস্ক থেকে (কম) ফিস্ক্রু এবং (চূড়ান্ত) যুলুম থেকে (কম) যুলুম।" এর সনদ সহীহ।
৫. অতঃপর (১২০৫২) ইবনে জারীর সাঈদ আলমাক্কী থেকে বর্ণনা করেছেন: "আয়াতটি উল্লেখ করার পর তিনি বলেছেন, لَيَسْ بِكُفْرٍ يَنْقُلُ عَنِ الْمِلَّةِ এটা ঐ কুফর নয় যা মিল্লাত থেকে বের করে দেয়।"
এর সনদ সহীহ। এই সাঈদ হলেন, ইবনে যিয়াদ আশ-শায়বানী আলমাক্কী। যাঁকে ইবনে মুঈন, আল'ইজলী, ইবনে হিব্বান প্রমুখ সিক্বাহ বলেছেন এবং তার থেকে একটি জামা'আত বর্ণনা করেছেন।
৬. অতঃপর ইবনে জারীর তাবারী (১২০২৫-১২০২৬) দু'টি ভিন্নভাবে ইমরান বিন হাদীর থেকে বর্ণনা করেছেন: "আবু মিজলাযের কাছে বনী আমর বিন সাদুসের কিছু লোক এসে (অন্য বর্ণনায়, ইবাযিয়াহ'র একটি গোত্র) বলল: أَرَأَيْتَ قَوْلَ اللَّهِ: وَ مَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ أَحَقُّ هُوَ؟ قَالَ: نَعَمْ . قَالُوا : (وَ مَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ أَحَقُّ هُوَ؟ قَالَ: نَعَمْ . قَالُوا : (وَ مَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ أَحَقُّ هُوَ ؟ قَالَ : نَعَمْ . قَالَ : فَقَالُوا : يَا أَبَا مُجْلَةٍ فَيَحْكُمُ هَؤُلَاءِ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ ؟ قَالَ : هُوَ دِينَهُمُ الَّذِي يَدِينُونَ بِهِ ، وَ بِهِ يَقُولُونَ وَ إِلَيْهِ يَدْعُوْنَ - [ يَعْنِي الْأَمْرَاءُ ] - فَإِنْ هُمْ تَرَكُوا شَيْئًا مِنْهُ عَرَفُوا أَنَّهُمْ أَصَابُوا ذَنْباً . فَقَالُوا : لَا وَاللَّهِ ، وَلَكِنَّكَ تَفَرَّقَ. قَالَ: أَنْتُمْ أَوْلَى بِهَذَا مِنَي لَا أَرَى ، وَ إِنَّكُمْ أَنتُمْ تَرَوْنَ هَذَا وَلَا تَخْرُجُوْنَ ، وَ لَكِنَّهَا أَنزَلَتْ فِي الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى وَ أَهْلِ الشِّرْكِ . أَوْ نَحْوًا مِنْ هَذَا
"আল্লাহ'র এই নির্দেশের ব্যাপারে আপনি কি বলেন ("যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।") এটা কি হক্ব (সঠিক)? তিনি জবাব দিলেন: হাঁ, অবশ্যই। অতঃপর তারা জিজ্ঞাসা করল, ("যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই যালিম।”) এটা কি হক (সঠিক)? তিনি জবাব দিলেন: হাঁ। অতঃপর তারা জিজ্ঞাসা করল, (যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই ফাসিক।") এটা কি হক্ক (সঠিক)? তিনি জবাব দিলেন: হাঁ। তারা জিজ্ঞাসা করল, এই লোকেরা (হাকিম/বিচারক) কি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক ফায়সালা করে? তিনি বললেন: এটা তাদের দ্বীন, যার উপর তারা চলছে। সে মোতাবেকই করে এবং সে দিকেই ডাকে। তারা এটা জানে যে, এর মধ্যে কোন কিছু থেকে বিচ্যুতি হলে সে গোনাহগার হবে। তারা বলল: এমনটা না, বরং আল্লাহর কসম! আপনি তো এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ পৃথক। তিনি বললেন: "(উম্মাতের মধ্যে পৃথকীকরণের ব্যাপারে) তোমরাই আমার থেকে অগ্রগামী এবং এই অপবাদের অধিকারী। আমি তো এই রায় দিই না, অথচ তোমরা এমন দৃষ্টিভঙ্গিই রাখ এবং এ ব্যাপারে কোন ক্ষতির ভয় রাখ না। অথচ প্রকৃতপক্ষে আয়াতটি ইয়াহুদী, নাসারা, মুশরিকীন ও তাদের গোত্রগুলো সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।" -এর সনদ সহীহ।
আলেমদের ইখতিলাফ রয়েছে, প্রথম আয়াতটির 'কাফির' শব্দটির তাফসীর নিয়ে। এখানে পূর্বোক্ত পাঁচটি উক্তি উল্লেখ করা হয়েছে। যা ইবনে জারীর তাঁর তাফসীরে নিজের সনদসহ উল্লেখ করেছেন (১০/৩৪৬-৩৫৭)। অতঃপর উপসংহারে (১০/৩৫৮) লিখেছেন:
وَ أَوْلَى هَذِهِ الْأَقْوَالِ عِندِي بِالصَّوَابِ قَوْلُ مَنْ قَالَ : نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَاتُ فِي كُفَّارِ أَهْلِ الْكِتَابِ ، لأَنَّ مَا قَبْلَهَا وَ مَا بَعْدَهَا مِنَ الْآيَاتِ فَفِيهِمْ نَزَلَتْ ، وَ هُمْ الْمَعْنِيُونَ بِهَا ، وَهَذِهِ الْآيَاتُ سِيَاقُ الْخَيْرِ عَنْهُمْ ، فَكَوْنَهَا خَيْرًا عَنْهُمْ أَوْلَى . فَإِنْ قَالَ قَائِلُ : فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى ذَكَرَهُ قَدْ عَمَّ بِالْخَيْرِ بِذَلِكَ عَنْ جَمِيعِ مَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ ، فَكَيْفَ جَعَلْتَهُ خَاصَّاً ؟ قِيلَ : إِنَّ اللهَ تَعَالَى عَمَّ بِالْخَيْرِ بِذَلِكَ عَنْ قَوْمٍ كَانُوا بِحُكْمِ اللَّهِ الَّذِي حَكَمَ بِهِ فِي كِتَابِهِ جَاحِدِيْنَ ، فَأَخْبَرَ عَنْهُمْ أَنَّهُمْ بِتَرْكِهِمْ الْحُكْمَ - عَلَى سَبِيلِ مَا تَرَكُوْهُ - كَافِرُونَ . وَكَذَلِكَ الْقَوْلُ فِي كُلِّ مَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ جَاحِدًا بِهِ هُوَ بِاللَّهِ كَافِرُ ، كَمَا قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ ، لِأَنَّهُ يَجُحُودِهِ حَكَمَ اللَّهُ بَعْدَ عِلْمِهِ أَنَّهُ أَنْزَلَهُ فِي كِتَابِهِ ، نَظِيرُ جُحُودِهِ نُبُوةُ نَبِيِّهِ بَعْدَ عِلْمِهِ أَنَّهُ نِبَيٌّ "
"আয়াতে তাহকীমে'র তাফসীরে বর্ণিত উক্তিগুলোর মধ্যে আমার কাছে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য উক্তি হলো, যিনি বলেছেন: এই আয়াত আহলে কিতাবের কাফিরদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। কেননা, আয়াতটির পূর্বাপর সম্পর্ক আহলে কিতাবদের সাথে। এই কারণে তারাই এখানে উদ্দেশ্য। কেননা তাদের সম্পর্কে পূর্বেই খবর বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং তাদের- সম্পর্কে পূর্বের বর্ণনাই এ সম্পর্কীত দলিল। যদি কেউ এটা বলে যে, আল্লাহ এই খবরকে 'আম রেখেছেন, যা সবার জন্যই প্রযোজ্য- যারা আল্লাহ'র নাযিল করা শরী'আত মোতাবেক ফায়সালা করে না। সুতরাং আপনি কিভাবে এগুলো খাস করছেন? তখন তাদের জবাব দেয়া হবে: নিশ্চয়ই আল্লাহ এ খবরকে 'আম রেখেছেন। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে যারা কিতাবুল্লাহ'র নাযিলকৃত আহকামকে অস্বীকার করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের ব্যাপারে এ খবর দিচ্ছেন যে, তাদের হুকুমে ইলাহী তরক করার যে অভ্যাসগত আমল ছিল, সেই হুকুমে ইলাহী তরক করার ক্ষেত্রে ঐ (খাস) আমলের কারণেই তারা কাফির ছিল। আর এই হুকুম ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যারা আমলগতভাবেই অস্বীকৃতির করার কারণে হুকুমে ইলাহী মোতাবেক ফায়সালা করে না। কেননা এ সমস্ত লোকেরা আল্লাহকেই অস্বীকার করে, যেভাবে ইবনে আব্বাস বলেছেন। কেননা হুকুমে ইলাহী অর্থাৎ আল্লাহ'র বিষয়টি তাঁর কিতাবে নাযিল করেছেন জেনে নেয়ার পর, সেটা অস্বীকার করাটা তেমনি, যেমন নবীর নবুওয়াত অস্বীকার করা। অথচ তারা সুস্পষ্টভাবে তা জানে।"
মোটকথা, এই আয়াত আল্লাহ'র আয়াত অস্বীকারকারী ইয়াহুদের সম্পর্কে নাযিল হয়। এখন অস্বীকৃতি ও অবজ্ঞার ক্ষেত্রে যে তাদের সাথে শরীক (মত/সাদৃশ্য) হবে, সে কুফরের মধ্যকার ই'তিক্বাদী (বিশ্বাসগত) কুফরের অধিকারী হবে। কিন্তু যে অস্বীকৃতি ও অবজ্ঞার ক্ষেত্রে তাদের শরীক (মত/সাদৃশ্য) নয়, সে কুফরের মধ্যকার 'আমলী কুফরের অধিকারী হবে। কেননা সে ইয়াহুদীদের ন্যায় আমল করেছে। এ কারণে সে গোনাহগার ও সীমালঙ্ঘনকারী হিসাবে গণ্য হবে। কিন্তু এ কারণে সে মিল্লাতে ইসলামিয়া থেকে খারিজ (বহিষ্কৃত) হবে না। এ সম্পর্কে ইবনে আব্বাসের উক্তি ইতোপূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা ইমাম হাফিয আবু উবায়দ আল-ক্বাসিম বিন সালাম নিজ গ্রন্থ 'কিতাবুল ঈমান'- এ উল্লেখ করেছেন। ] - بَابُ الْخُرُوْجِ مِنَ الْإِيْمَانِ بِالْمَعَاصِي ( ص ٨٤ - ٨٧ ) بتحقيقي সুতরাং যে আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানতে চায় সে যেন (আমার তাহক্বীকুসহ) গ্রন্থটি পাঠ করে।
আমি (আলবানী) এগুলো লেখার পর আমার দৃষ্টি শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া'র 'মজমাউল ফাতাওয়া'র (৩/২৬৮) আয়াতে তাহকীমের দিকে নিবদ্ধ হয়। তিনি বলেছেন: أَي هُوَ الْمُسْتَحَلُّ لِلْحُكْمِ بِغَيْرِ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ.
"এই হুকুম তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান ছাড়া অন্য বিধানকে হালাল মনে করে।"
অতঃপর (৭/২০৪) বলেছেন: ইমাম আহমাদকে আলোচ্য কুফর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়। তিনি বললেন: كُفْرُ لَا يَنْقُلُ عَنِ الْإِيْمَانِ ، مِثْلُ الإِيْمَانِ بَعْضُهُ دُونَ بَعْضٍ ، فَكَذَلِكَ الْكُفْرُ ، حَتَّى يَجِيء مِنْ ذَلِكَ أَمَرَ لَا يَخْتَلِفُ فِيْهِ
"এটা এমন কুফর যা মিল্লাতে ইসলামিয়াহ থেকে খারিজ করে না, যেভাবে ঈমান কারো থেকে কারো কম হয়। তেমনি কুফরও (কমবেশি হয়)। এভাবে ব্যক্তি ঐ কুফরেরও অধিকারী হয় যে ব্যাপারে কোন ইখতিলাফই (ভিন্নমত) নেই।"
অতঃপর ইবনে তাইমিয়াহ (۳۱/۷) বলেছেন। সালাফদের উক্তি: إِنَّ الْإِنْسَانَ يَكُونُ فِيْهِ إِيْمَانَ وَ نِفَاقُ
"একজন মানুষের মধ্যে ঈমান ও নিফাক্ব একত্রিত হতে পারে"। তাঁদের অন্যতম অপর একটি উক্তি: أَنَّهُ يَكُونُ فِيْهِ إِيْمَانُ وَ كُفْرُ، وَلَيْسَ هُوَ الْكُفْرُ الَّذِي يَنْقُلْ عَنِ الْمَلَةِ
"একজন মানুষের মধ্যে ঈমান ও কুফর একত্রিত হতে পারে। তবে এ কুফর মিল্লাতে ইসলামিয়াহ থেকে খারিজ করে না।” যেভাবে ইবনে আব্বাস ও তাঁর সাথীরা আল্লাহ'র বাণী: وَ مَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ الله فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ )সূরা মায়িদা- ৪৪ আয়াত) সম্পর্কে বলেছেন।
তাঁরা বলেছেন: كُفُرُ لَا يَنقُلُ عَنِ الْمِلَّةِ. وَقَدْ إِتَّبَعَهُمْ عَلَى ذَلِكَ أَحْمَدُ وَ غَيْرُهُ مِنْ أَئِمَّةِ السُّنَّةِ
"এটা এমন কুফরের অধিকারী যা মিল্লাতে ইসলামিয়াহ থেকে খারিজ করে না। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও অন্যান্য সালাফগণ এই উক্তির অনুসরণ করেছেন।" [সূত্র: মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী, আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ ৬/২৫৫২ নং হাদীসের আলোচনা দ্রষ্টব্য)
উক্ত গ্রন্থের ৪৫৭ পৃষ্ঠায় (হাদীস নং ২৭০৪) শায়েখ আরো আলোচনা করেছেন: وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ الظَّالِمُونَ ..... فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
"যারা আল্লাহ'র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।.... তারাই যালিম।...... তারাই ফাসিকু।” (সূরা মায়িদা- ৪৪-৪৭)
(রসূলুল্লাহ বলেছেন:) "এই আয়াত কাফিরদের সম্পর্কে নাযিল হয়।"
ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি সনদ হলো: ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন আ'মাশ থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ বিন মারাহ থেকে, তিনি বারা বিন আযিব থেকে যে, রসূলুল্লাহ বলেছেন....। আমি (আলবানী) বলছি: এর সনদ শায়খায়নের (ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের) শর্তে সহীহ।
এই হাদীসটি সুস্পষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে যে, আলোচ্য তিনটি (সূরা মায়িদা ৪৪-৪৭) আয়াতের প্রকৃত দাবি হলো, ইয়াহুদী ও নাসারাদের কাফিরগণ এবং যেসব লোক ইসলামী শরী'আত ও এর আহকামকে অস্বীকার করে। এভাবে তারাও এর মধ্যে শরীক, যাদের প্রতি হুকুমের সাদৃশ্যতা পাওয়া যায়- যদিও সে নিজেকে মুসলিম হিসাবে প্রকাশ করে। কেননা, কোন একটি হুকুম অস্বীকার করলেও সেই প্রকৃত কাফির। কিন্তু যে ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত তা হলো, যদি কেউ কোন ক্ষেত্রে এই ইসলামী বিধানকে অস্বীকার করা ছাড়াই (ইসলাম মোতাবেক) ফায়সালা না করে, তবে তার প্রতি কাফির হুকুম লাগানো জায়েয নয়। এমনকি সে এই মিল্লাত থেকে খারিজও নয়। কেননা সে মু'মিন। বেশির চেয়ে বেশি এটা বলা যাবে যে, তার কুফর আমলী কুফর। এটা এমনই গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা যে ব্যাপারে অধিকাংশ যুবকরাই ভুলের মধ্যে আছে। এ কারণে অধিকাংশ লোকেরা ঐ সমস্ত হাকিমদের (শাসক/বিচারক) ইসলাম থেকে খারিজ গণ্য করে যারা শরী'আতের বিরোধি ফায়সালা দিচ্ছে। যার ফলে অনেক ফিতনার বিস্তৃতি ঘটেছে। এমনকি যাদের তা প্রতিরোধের শক্তি ও ক্ষমতা নেই এমন অনেক নিষ্পাপ প্রাণ থেকে খুন ঝরছে।......
আমার মতে (এ মুহূর্তে) ওয়াজিব হলো, ইসলামকে ঐ সব বিষয় থেকে পাক-পবিত্র করা যার উদ্যোগ তাদের মধ্যে নেই। তা হলো- বাতিল আক্বীদা, নিরর্থক মাসলা-মাসায়েল (আহকাম), বিকৃত রায়ের মাধ্যমে সুন্নাতের বিরোধিতা। অতঃপর নতুন প্রজন্মকে এই পাক-পবিত্র ও নিষ্কলুষ ইসলামের তারবিয়াত প্রদান। [সূত্র: মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী, সিলসিলাতুস সাহীহাহ ৬/২৭০৪ নং হাদীসের আলোচনা দ্রষ্টব্য)

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 ঐ সমস্ত আলেমদের সাক্ষ্য যারা ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর তাফসীরটিকে সহীহ বলেছেন এবং এর দ্বারা দলিল নিয়েছেন

📄 ঐ সমস্ত আলেমদের সাক্ষ্য যারা ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর তাফসীরটিকে সহীহ বলেছেন এবং এর দ্বারা দলিল নিয়েছেন


[প্রবন্ধটি www.AsliAhleSunnet.com থেকে প্রকাশিত فْتَنَةُ التَّكْفِيرِ أَوْ حُكْمُ بِغَيْرِ مَا انزلَ الله (তাকফির বা কাফির ফাতাওয়া দেয়ার ফিতনা এবং আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধানের বিরোধি বিধান দেয়া) থেকে সঙ্কলিত। -অনুবাদঃ কামাল আহমাদ]
الْحَاكِمُ فِي الْمُسْتَدْرِكِ (۳۹۳/۲)، وَوَافَقَهُ الذَّهَبِيُّ الْحَافِظُ ابْنُ كَثِيرٍ فِي تَفْسِيرِه (٦٤/٢) قَالَ : صَحِيحُ عَلَى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ ، الْإِمَامُ الْقُدْوَةُ مُحَمَّدُ بْنُ نَصْرِ الْمَرُوزِيُّ فِي تَعْظِيمِ قَدْرِ الصَّلَاةِ (٥٢٠/٢) ، اَلْإِمَامُ أَبُو بَكْرِ ابْنِ الْعَرَبِي فِي أَحْكَامِ الْقُرْآنِ (٦٢٤/٢) ، الْإِمَامُ الْقُرْطِيُّ فِي الْجَامِعِ لِأَحْكَامِ الْقُرْآنِ (١٩٠/٦)، الْإِمَامُ الْبَقَاعِيُّ فِي نَظْمِ الدُّرَرِ (٤٦٠/٢) ، الْإِمَامُ الْوَاحِدِيُّ فِي الْوَسِيْطِ (۱۹۱/۲) الْعَلَامَةُ صِدِّيقَ حُسَيْنِ خَانْ فِي نَيْلِ الْمُرَامِ (٤٧٢/٢)، الْعَلَامَةُ مُحَمَّدُ الْأَمِينُ الشَّنْقِيطِي فِي أَضْوَاءِ الْبَيَانِ (۱۰۱/۲) الْعَلَامَةُ أَبُو عُبَيْدِ الْقَسِمِ بْنِ سَلَامٍ فِي الْإِيْمَانِ (ص (٤٥)، الْعَلَامَةُ أَبُو حَيَّانٍ فِي الْبَحْرِ الْمُحِيطِ (٤٩١/٣)، الْإِمَامُ ابْنُ بَطَّةَ فِي الْإِبَانَةِ (۷۲۳/۲)، اَلْإِمَامُ ابْنُ عَبْدِ البَرِّ فِي التَّمْهِيدِ (٢٣٧/٤)، الْعَلَامَةُ الْخَازِنَ فِي تَفْسِيرِه (۳۱۰/۱)، الْعَلَامَةُ السَّعْدِي فِي تَفْسِيرِهِ (٢٩٦/٢)، شَيْخُ الْإِسْلَامِ ابْنِ تَيْمِيَّةَ فِي مُجْمُوعِ الْفَتَاوى (۳۱۲/۷) ، الْعَلَامَةُ ابْنُ الْقَيِّمِ الْجَوْزَيَّةِ فِي مَدَارِج السَّالِكِينَ (٣٣٥/١)، مُحَدِّثُ الْعَصْرِ الْعَلَامَةِ الْأَلْبَانِي فِي الصَّحِيحَةِ (١٠٩/٤)
এ যামানার শ্রেষ্ঠতম ফক্বীহ শায়েখ সালেহ আল-উসায়মীন তাঁর التَّجْذِيرُ مِنْ فِتَنَةِ التَّكْفِيرِ গ্রন্থ (৬৮ পৃষ্ঠা) বলেছেন:
لكِنَّ لَمَّا كَانَ هُذَا الْأَثْرُ لَا يَرْضِي هَؤُلَاءِ الْمَفْتُونِينَ بِالتَّكْفِيْرِ؛ صَارُوا يَقُولُونَ : هذا الأثرُ غَيْرِ مَقْبُولٍ وَلَا يَصِحُ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ فَيُقَالُ لَهُمْ : كَيْفَ لَا يَصِحُ؟
وَقَدْ تَلْقَاهُ مَنْ هُوَ أَكْبَرُ مِنكُمْ، وَأَفْضَلُ، وَأَعْلَمُ بِالْحَدِيثِ؟! وَتَقُولُونَ : لَا نَقْبَلُ فَيَكْفِينَا أَنَّ عَلَمَاءَ جَهَابَدَةً كَشَيْخِ الإِسْلَامِ ابْنِ تَيْمِيَّةَ، وَابْنِ الْقَيِّمِ وَغَيْرِهُمَا - كُلُّهُمْ تَلَقَّوْهُ بِالْقَبُولِ وَيَتَكَلَّمُونَ بِهِ، وَيَنقُلُوْنَهُ فَالْأَثرُ صَحِيحٌ.
"কিন্তু আসারটি (সাহাবা'র উক্তি) তাকফীরের ফিতনাই জড়িত ব্যক্তিদের আকাঙ্ক্ষার বিরোধি হওয়ার তারা বলছে: ইবনে আব্বাস'র আসারটি গ্রহণযোগ্য নয় (!) এবং ইবনে আব্বাস থেকে এটা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয় (!)। আমি তাদের জবাবে বলছি: এটা কিভাবে সহীহ নয়? যখন উক্ত বড় বড় আলেম, যারা তোমাদের থেকে অনেক বড়, বেশি সম্মানিত ও হাদীসের ব্যাপারে অনেক বেশি বিজ্ঞ (তাঁরা সহীহ বলেছেন)! অথচ তোমরা বলছ: আমাদের কাছে এটা গ্রহণযোগ্য নয়.... তাহলে কি এই আলেমরা আমাদের থেকে বেশি যোগ্য নন? যেমন শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়িম প্রমুখ। এদের প্রত্যেকেই এটাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কুবুল করেছেন, এর উপর আলোচনা করেছেন ও এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সুতরাং প্রমাণিত হল, আসারটি সহীহ।"

📘 তাফসীর হুকুম বি গয়রি মা আন্ঝা লাল্লাহ > 📄 আকীদাগত ও আমলগত কুফরের দৃষ্টান্ত

📄 আকীদাগত ও আমলগত কুফরের দৃষ্টান্ত


মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী’র পূর্বোক্ত আলোচনায় আক্বীদাগত কুফর ও আমলগত কুফরের বর্ণনা এসেছে। আমরা এখন এ দু'টি বিষয়ে জড়িতদের সাথে নবী’র যামানাতে কী আচরণ ও নির্দেশ ছিল তা তুলে ধরার চেষ্টা করব। এর ফলে এ সম্পর্কে বাস্তবচিত্র আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হবে এবং মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দীন আলবানী’র উপর মুরজিয়া হওয়ার অপবাদও খণ্ডিত হবে।
কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে আক্বীদাগত কুফর ও আমলগত কুফরের দৃষ্টান্ত যাদের মধ্যে পাওয়া যায় তাদের মধ্যে অন্যতম হলো: ১. মুনাফিক; ২. খারেজী এবং ৩. গোমরাহ শাসক।
কুরআন ও সহীহ হাদীসে এদের সাথে আচরণ ও হুকুমের আলোকে বর্তমান যামানায় যারা আক্বীদা বা আমলগত কিংবা উভয় কুফরের সাথে জড়িত তাদের প্রতি করনীয় বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাব, ইনশাআল্লাহ।
১. মুনাফিক: এতে কোন মতপার্থক্য নেই যে, মুনাফিকুরা আক্বীদাগত দিকে থেকে কুফরী আক্বীদা রাখলেও প্রকাশ্য আমলগতভাবে নিজেদের মুসলিম হিসাবেই প্রকাশ করত। কিন্তু আল্লাহ’র কাছে তাদের আক্বীদা ও আমল উভয়টিই সুস্পষ্টভাবে কুফরীর দোষে দুষ্ট। যেমন আল্লাহ বলেন:
إِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُونَ قَالُوا تَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللَّهِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ - اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَنْ سَبيلِ اللَّهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ - ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ -
"যখন মুনাফিকুরা আপনার নিকট আসে তখন তারা বলে: 'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি- নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রসূল।' আর আল্লাহ জানেন যে, অবশ্যই আপনি তাঁর রসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকুরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। তারা তাদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে, আর তারা আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে। তারা যা করছে, তা কতই না মন্দ। এটা এজন্য যে, তারা ঈমান আনার পর কুফরী করেছে। ফলে, তাদের অন্তরের উপর মোহর মেরে দেয়া হয়েছে; পরিণামে তারা বুঝে না।"¹
আলোচ্য আয়াত থেকে সুস্পষ্ট হলো, আল্লাহ এ’র কাছে মুনাফিক্বদের আক্বীদা ও আমল উভয়টিই প্রত্যাখ্যাত। এরপরও আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ছাড় দিতে বলেছেন যতক্ষণ না তারা মুসলিম ও ইসলামী রাষ্ট্রের বিরোধি তৎপরতায় অংশ নেয়। এ সম্পর্কে সূরা নিসার ১২ নং রুকুর সম্পূর্ণ অংশটিতে তাদের ব্যাপারে নির্দেশ ও নীতিমালা বর্ণিত হয়েছে। উক্ত আয়াতগুলোর ধারাবাহিক বক্তব্যগুলো হলো:
ক. মুনাফিকুরা পথভ্রষ্ট, তারা কখনো পথ পাবে না। আল্লাহ বলেন:
فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللَّهُ أَرْكَسَهُمْ بِمَا كَسَبُوا أَتُرِيدُونَ أَنْ تَهْدُوا مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا
"আর তোমাদের কী হলো যে, তোমরা মুনাফিক্বদের ব্যাপারে দু'দল হয়ে গেলে? যখন আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের জন্য পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। তোমরা কি তাকে সৎপথে পরিচালিত করতে চাও, যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন? আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি তার জন্য কখনো কোন পথ পাবে না।” [সূরা নিসা: ৮৮ আয়াত]
খ. তারা মুসলিমদের কাফির বানাতে চায়। সবকিছু ছেড়ে মুসলিমদের কাছে হিজরত না করলে কাফিরদের ন্যায় তাদের হত্যা করতে হবে এবং তাদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন:
وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاءً فَلَا تَتَّخِذُوا مِنْهُمْ أَوْلِيَاءَ حَتَّى يُهَاجِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَخُذُوهُمْ وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ وَلَا تَتَّخِذُوا مِنْهُمْ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا
“তারা চায় যে, তারা যেরূপ কাফির হয়েছে, তোমরাও সেরূপ কাফির হও, যাতে তোমরা তাদের সমান হয়ে যাও। সুতরাং তাদের মধ্যে হতে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে না, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর পথে হিজরত করে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তাদের যেখানেই পাবে পাকড়াও করবে ও হত্যা করবে এবং তাদের মধ্যে হতে কাউকে বন্ধু ও সাহায্যকারীরূপে গ্রহণ করবে না।” [সূরা নিসা: ৮৯ আয়াত]
আলোচ্য আয়াতটিতে মুনাফিক্বদের কাফির বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
গ. যদি মুনাফিকুরা মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধদের মাঝে থাকে, কিংবা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নিজেদের দুর্বলতার কারণে তারা যুদ্ধ করতে ভয়ে দূরে থাকে এবং শান্তির প্রস্তাব দেয়, অথচ শক্তি থাকলে তারা যুদ্ধ করতো; এদের সাথেও যুদ্ধ নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন:
إِلَّا الَّذِينَ يَصِلُونَ إِلَى قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقَ أَوْ جَاءُوكُمْ حَصِرَتْ صُدُورُهُمْ أَنْ يُقَاتِلُوكُمْ أَوْ يُقَاتِلُوا قَوْمَهُمْ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَسَلْطَهُمْ عَلَيْكُمْ فَلَقَاتَلُوكُمْ فَإِنِ اعْتَزَلُوكُمْ فَلَمْ يُقَاتِلُوكُمْ وَأَلْقَوْا إِلَيْكُمُ السَّلَمَ فَمَا جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ عَلَيْهِمْ سَبِيلًا
"কিন্তু তারা নয়, যারা এমন সম্প্রদায়ের সাথে মিলিত হয়, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ। অথবা যারা তোমাদের নিকট এ অবস্থায় আসে যে, তাদের অন্তর তোমাদের সাথে অথবা তাদের সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করতে অনুৎসাহিত। আর আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তবে তাদের তোমাদের উপর ক্ষমতা দিতেন। ফলে তারা অবশ্যই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতো। সুতরাং তারা যদি তোমাদের নিকট থেকে সরে দাঁড়ায়, তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে এবং তোমাদের নিকট শান্তির প্রস্তাব করে, তবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা অবলম্বনের পথ রাখেন নি।” [সূরা নিসা- ৮৯ আয়াত।
সুস্পষ্ট হল, মুনাফিক্বদের আক্বীদা কুফর হলেও যতক্ষণ তারা ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না বা অন্য কোন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে না, ততক্ষণ তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। অথচ আল্লাহ'র কাছে তাদের আক্বীদা ও আমল কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং প্রমাণিত হলো:
১. আল্লাহ'র কাছে মুনাফিক্বদের ঈমান ও আমল গ্রহণযোগ্য নয়;
২. আল্লাহ রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তাদের ছাড় দিচ্ছেন এবং তাদের ব্যাপারে যুদ্ধ করতে বা কঠোর হতে নিষেধ করছেন; যতক্ষণ না তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চরমপন্থা অবলম্বন করে।
ঘ. যখন মুনাফিকুরা সমাজ ও রাষ্ট্রে ফিতনা সৃষ্টি করবে তখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আল্লাহ বলেন:
سَتَجِدُونَ آخَرِينَ يُرِيدُونَ أَنْ يَأْمَنُوكُمْ وَيَأْمَنُوا قَوْمَهُمْ كُلَّ مَا رُدُّوا إلى الفتنة أَرْكسُوا فِيهَا فَإِنْ لَمْ يَعْتَزِلُوكُمْ وَيُلْقُوا إِلَيْكُمُ السَّلَمَ وَيَكُفُوا أَيْدِيَهُمْ فَخُذُوهُمْ وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَأُولَئِكُمْ جَعَلْنَا لَكُمْ عَلَيْهِمْ سُلْطَانًا مُبِينًا.
"তোমরা আরো কতক লোক পাবে, যারা তোমাদের সাথে এবং তাদের সম্প্রদায়ের সাথে শান্তিতে থাকতে চায়। যখনই তাদের ফিতনার দিকে ডাকা হয়, তখনই তারা তাদের পূর্বাবস্থায় প্রত্যাবৃত্ত হয়। অতএব, তারা যদি তোমাদের নিকট হতে চলে না যায়, তোমাদের নিকট শান্তি প্রস্তাব না করে এবং তাদের হাত সংবরণ না করে, তবে তাদের যেখানেই পাবে গ্রেফতার করবে এবং হত্যা করবে। আমি তাদের উপর তোমাদের বিরুদ্ধাচারণের স্পষ্ট অধিকার দিয়েছি।" [সূরা নিসা- ৯১ আয়াত]
ঙ. তাগুতের কাছে বিচার উপস্থাপনকারী মুনাফিকু ও এ সম্পর্কীত বিধান। আল্লাহ বলেন: أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلُّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا - وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا -
"আপনি কি তাদের দেখেন নি, যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে, তাতে তারা ঈমান আনে, অথচ তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং শয়তান তাদের ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়? তাদের যখন বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার দিকে এবং রসূলের দিকে এস, তখন মুনাফিক্বদের আপনি আপনার নিকট থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখবেন।" [সূরা নিসা- ৬০-৬১ আয়াত]
আল্লাহ বলেন: يَأَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ
"হে নবী! কাফির ও মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর ও তাদের প্রতি কঠোর হও।” [সূরা তাওবাহ- ৭৩ আয়াত]
এখন আমরা জানব, মুনাফিক্বদের সাথে কখন, কি পরিস্থিতিতে ও কিভাবে জিহাদ করতে হবে এবং কঠোর হতে হবে?
২. খারেজী: খারেজীদের সূত্রপাতও মুনাফিক্বদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আল্লাহ বলেন:
وَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنَّهُمْ لَمِنْكُمْ وَمَا هُمْ مِنْكُمْ وَلَكِنَّهُمْ قَوْمٌ يَفْرَقُونَ - لَوْ يَجِدُونَ مَلْجَأَ أَوْ مَغَارَاتِ أَوْ مُدَّخَلًا لَوَلَّوْا إِلَيْهِ وَهُمْ يَجْمَحُونَ - وَمِنْهُمْ مَنْ يَلْمِزُكَ فِي الصَّدَقَاتِ فَإِنْ أُعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَإِنْ لَمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ - وَلَوْ أَنَّهُمْ رَضُوا مَا أَتَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ سَيُؤْتِينَا اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَرَسُولُهُ إِنَّا إِلَى اللَّهِ رَاغِبُونَ - إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
“তারা আল্লাহ'র নামে শপথ করে যে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, বস্তুত তারা এমন এক সম্প্রদায়, যারা ভয় করে থাকে। তারা কোন আশ্রয়স্থল, কোন গিরিগুহা অথবা কোন প্রবেশস্থল পেয়ে গেলে সে দিকে পলায়ন করবে ক্ষিপ্রগতিতে। তাদের মধ্যে এমনও লোক আছে, যে সাদকা বণ্টনের ব্যাপারে আপনাকে দোষারোপ করে। অতঃপর তার কিছু তাদের দেয়া হলে পরিতুষ্ট হয় এবং তার কিছু না দেয়া হলে তখনই তারা বিক্ষুব্ধ হয়। ভাল হত যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূল তাদের যা দিয়েছেন তাতে রাযী হয়ে যেত এবং বলত আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট; আল্লাহ আমাদের দিবেন নিজ করুণা এবং তাঁর রসূলও। সাদকা তো কেবল ফক্বীর, মিসকীন ও এর (জন্য নিয়োজিত) কর্মচারীদের জন্য এবং (অমুসলিম/দুর্বল মু'মিনদের) অন্তর আকৃষ্ট করার জন্য এবং দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য ও আল্লাহ'র পথে জিহাদরতদের জন্য এবং মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহ'র বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা তাওবা- ৫৮-৬০ আয়াত]
عَنْ أَبِي سَعِيدِ الله قَالَ : بَعَثَ إِلى النَّبِيِّ ﷺ بِشَيْءٍ فَقَسَّمَهُ بَيْنَ أَرْبَعَةِ وَقَالَ: أَتَالَفَهُمْ. فَقَالَ رَجُلٌ مَا عَدَلْتَ فَقَالَ: يَخْرُجُ مِنْ ضَيْضَى هَذَا قَوْمٌ يَمُرْقُونَ مِنَ الدِّينِ
"আবূ সাঈদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী -এর কাছে কিছু জিনিস প্রেরণ করা হল। এরপর তিনি সেগুলো চারজনের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। আর বললেন, তাদের (এর দ্বারা) আকৃষ্ট করছি। তখন এক ব্যক্তি বলল, আপনি সঠিকভাবে দান করেন নি। এতদশ্রবণে তিনি বললেন: এ ব্যক্তির বংশ থেকে এমন সব লোক জন্ম নেবে যারা দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে।” [সহীহ বুখারী- কিতাবুত তাফসীর, সূরা নিসা- ৬০ নং আয়াতের তাফসীর দ্র:)
আবু সাঈদ খুদরী থেকেও বর্ণিত হয়েছে: আলী ইয়ামান থেকে রসূলুল্লাহ-এর কাছে কিছু স্বর্ণ পাঠিয়েছিলেন। তিনি সেগুলো চার জনের মধ্যে বণ্টন করেন। তখন সাহাবীদের একজন বললেন: 'এ স্বর্ণের ব্যাপারে তাদের অপেক্ষা আমরাই অধিক হক্বদার ছিলাম।' কথাটি শোনার পর নবী বললেন: 'তোমরা কি আমার উপর আস্থা রাখ না অথচ আমি আসমানবাসীদের আস্থাভাজন, সকাল-বিকাল আমার কাছে আসমানের সংবাদ আসছে।..... তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল: ইয়া রসূলাল্লাহ! আল্লাহকে ভয় করুন। নবী বললেন: তোমার জন্য আফসোস! আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে দুনিয়াবাসীদের মধ্যে আমি কি বেশি হক্বদার নই? লোকটি চলে গেলে খালিদ বিন ওয়ালিদ বললেন : ইয়া রসূলাল্লাহ! আমি কি লোকটির গর্দান উড়িয়ে দেব না? তিনি বললেন: ) لَا لَعَلَّهُ أَنْ )يَكُوْنَ يُصَلِّي না, হয়ত সে সালাত আদায় করে। খালিদ বললেন: ) وكم من مُصَلِّ يَقُولُ بِلِسَانِهِ مَا لَيْسَ فِي قَلْبِهِ( অনেক মুসল্লী আছে যারা মুখে এমন কথা উচ্চারণ করে যা অন্তরে নেই। রসূলুল্লাহ বললেন: ) إِنِّي لَمْ أُوْمَرْ أَنْ أَنْقُبَ قُلُوْبَ النَّاسِ وَلَا أَشَقٌ بُطُوْنَهُمْ আমাকে মানুষের দিল ছিদ্র করে, পেট ফেঁড়ে (ঈমান) দেখার জন্য বলা হয় নি।.... তিনি বললেন: এ ব্যক্তির বংশ থেকে এমন এক জাতির উদ্ভব হবে যারা শ্রুতিমধুর কন্ঠে আল্লাহ'র কিতাব তিলাওয়াত করবে অথচ আল্লাহর বাণী তাদের গলদেশের নিচে নামবে না। তারা দ্বীন থেকে এভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তীর বের হয়। যদি আমি তাদের পাই তাহলে অবশ্যই আমি তাদের সামুদ জাতির মত হত্যা করব।” [সহীহ বুখারী- কিতাবুল মাগাযী بَابٌ بَعْثِ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ : (সংক্ষেপিত)]
আলী-এর খিলাফতের যামানায় খারেজীদের উদ্ভব হয়। [ফতহুল বারী, আলোচ্য অনুচ্ছেদ দ্র:, আরো বিস্তারিত: তাফসীরে মাযহারী সূরা নিসা- ৫৬-৫৯ আয়াতের তাফসীর।
আলী খারেজীদের বলেছিলেন: “যতদিন তোমাদের দায়িত্ব আমাদের উপরে ছিল ততদিন আমরা তোমাদের গনীমত দেয়া বন্ধ করি নি এবং আল্লাহর মাসজিদে সালাত আদায় করতে বাধা দেই নি। এখন তোমাদের উপর আমরা আগেই হামলা করবো না। যদি তোমরা প্রথমে হামলা না করো।” এরপর তারা সবাই কূফা থেকে বেরিয়ে গিয়ে নাহরাওয়ান নামক স্থানে সমবেত হয়। (আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া (ই.ফা.) ৭/৫১০ পৃষ্ঠা)
পূর্বোক্ত আয়াত ও হাদীসগুলো থেকে প্রমাণিত হলো, মুনাফিকু ও খারেজীরা একই সূত্রে গাঁথা। তাদের প্রতি একই ধরণের আচরণ প্রযোজ্য:
ক. তাদের ঈমান ও 'আমল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
খ. এরপরও রাষ্ট্রীয় আইন এক্ষেত্রে তাদের প্রতি অনেক সহনশীল ও যুক্তিসংগত আচরণ করেছে, যতক্ষণ তারা ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতির কারণ না হয়। অথচ তখন ইসলামী রাষ্ট্র ক্বায়েম ছিল। তাদের ঈমান ও আক্বীদা আল্লাহ'র কাছে অগ্রহণযোগ্য হওয়াটাও সুস্পষ্ট ছিল। রসূল -কেও হাকিম/শাসক/বিচারক হিসাবে স্বীকার করার ব্যাপারে তাদের আপত্তি ছিল। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রদ্রোহী ও সরাসরি ইসলামী বিধানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে নি, ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলামী আইনেই তাদের অবকাশ দেয়া হয়েছে।
৩. গোমরাহ শাসক: শাসকদের ব্যাপারে আমরা নবী থেকে কয়েক ধরণের নিদের্শনা পায়। যথা:
ক. প্রতিষ্ঠিত ইসলামী খিলাফত ও আইনসমূহ বিকৃতকারী শাসক: রসূলুল্লাহ বলেছেন:
خِيَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ يُحِبُّونَهُمْ وَيُحِبُّونَكُمْ وَتُصَلُّوْنَ عَلَيْهِمْ وَيُصَلُّونَ عَلَيْكُمْ وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِي تَبْغِضُونَهُمْ وَيَبْعْضُونَكُمْ وَتَلْعَنُوهُمْ وَيَلْعَنُوكُمْ
قَالَ : قُلْنَا : يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلَا تَنَابَذُهُمْ عِندَ ذَلِكَ ؟ قَالَ : " لَا مَا أَقَامُوا فِيكُمُ الصَّلَاةُ لَا مَا أَقَامُوا فِيكُمُ الصَّلاةَ أَلَا مَنْ وَلِي عَلَيْهِ وَالِ فَرَآهُ يَأْتِي شَيْئًا مِنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ فَلْيَكْرَهُ مَا يَأْتِي مِنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ وَلَا يَتَزَعْنَ يَدًا مِنْ طَاعَةِ
“তোমাদের শাসকদের মধ্যে সেই শাসকই উত্তম যাকে তোমরা ভালবাস, আর যারা তোমাদের ভালবাসে। আর তোমরা তাদের জন্য দু'আ কর এবং তারাও তোমাদের জন্য দু'আ করে। আর তোমাদের সেই শাসকই মন্দ যাদের তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদের ঘৃণা করে। আর তাদের প্রতি তোমরা লানত কর এবং তারা তোমাদের প্রতি লানত করে। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আমরা বললাম: ইয়া রসূলাল্লাহ! এমতাবস্থায় আমরা কি সেই সমস্ত শাসকদের অপসারণ করে তাদের সাথে কৃত বায়য়াত ভঙ্গ করে ফেলব না? তিনি বললেন: না, যতক্ষণ তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম করে। (আবার বললেন) না, যতক্ষণ তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম করে। সাবধান! যে ব্যক্তিকে তোমাদের উপর শাসক নিযুক্ত করা হয়, আর যদি তার মধ্যে আল্লাহর নাফরমানীর কোন কিছু পরিলক্ষিত হয়, তখন তোমরা তার সেই আল্লাহর নাফরমানীর কাজটিকে ঘৃণার সাথে অপছন্দ কর, কিন্তু তার আনুগত্য হতে হাত গুটাতে পারবে না।" [সহীহ মুসলিম, মিশকাত ৭/৩৫০১ নং]
হাদীসটিতে বায়য়াত ভঙ্গের প্রসঙ্গ দ্বারা সুস্পষ্ট হয়, উক্ত শাসকের শাসন ইসলামী হুকুমাতের অন্তর্ভুক্ত। অন্যত্র নবী বলেন: يَكُوْنُ عَلَيْكُمْ أَمَرَاءُ تَعْرِفُوْنَ وَتُنْكِرُوْنَ فَمَنْ الْكَرَ فَقَدْ بَرِئَ وَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ قَالُوْا أَفَلَا تُقَاتِلُهُمْ قَالَ لَا مَا صَلَّوْا "অচিরেই তোমাদের ওপর এমন সব শাসক নিযুক্ত হবে, যারা ভাল-মন্দ উভয় প্রকারের কাজ করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি তাদের মন্দ কাজের প্রতিবাদ করল, সে ব্যক্তি দায়িত্ব হতে মুক্ত হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি মনে মনে উক্ত কাজটিকে খারাপ জানল, সে ব্যক্তিও নিরাপদ হলো। কিন্তু যে ব্যক্তি তাদের কাজের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করল এবং উক্ত শাসকের সে (অন্যায়) কাজে আনুগত্য করল (সে গুনাহর মধ্যে নিমজ্জিত হলো)। তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! এমতাবস্থায় আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে ক্বিতাল করব না? তিনি বললেন: না, যতক্ষণ তারা সালাত পড়ে।"¹
অন্য বর্ণনায় আছে, لَا مَا أَقَامُوا فِيْكُمُ الصَّلَاةَ “না, যতক্ষণ তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম রাখে।”¹⁰ অপর এক বর্ণনায় আছে, إِلا اَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا عِنْدَكُمْ مِّنَ اللَّهُ فِيْهِ بُرْهَانَ “যতক্ষণ না তোমরা তার মধ্যে প্রকাশ্য কুফর দেখতে পাবে এবং তোমাদের কাছে এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে আল্লাহর সুস্পষ্ট দলিল থাকবে।”¹¹
পূর্বোক্ত হাদীসগুলো থেকে বুঝা যায়, পূর্ব থেকেই বায়আত-খিলাফত ও সালাত কায়েম ছিল, এমন শাসক যখন সালাত কায়েম করবে না তখন তাকে হত্যা করা যাবে। তবে নিঃসন্দেহে উক্ত শাসককে অপসারণের বিষয়টি শক্তি-সামর্থ্যের সাথে জড়িত।
খ. সম্পূর্ণ গোমরাহ শাসক: হুযায়ফা বলেন: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا كُنَّا بِشَرِّ فَجَاءَ اللَّهُ بِخَيْرٍ فَنَحْنُ فِيْهِ فَهَلْ مِنْ وَّرَاءِ هَذَا الْخَيْرِ شَرُّ قَالَ نَعَمْ قُلْتُ هَلْ وَرَاءَ ذَالِكَ الشَّرِّ خَيْرُ قَالَ نَعَمْ قُلْتُ فَهَلْ وَرَاءَ ذَالِكَ الْخَيْرِ شَرُّ قَالَ نَعَمْ قُلْتُ كَيْفَ قَالَ يَكُوْنَ بَعْدِي ائِمَّةُ لَا يَهْتَدُوْنَ بِهُدَايَ وَلَا يَسْتَتُوْنَ بِسُنَّتِي وَسَيَقُوْمُ فِيْهِمْ رِجَالُ قُلُوبُهُمْ قُلُوْبُ الشَّيَاطِينِ فِي جُثْمَانِ النسِ قَالَ قُلْتُ كَيْفَ أَصْنَعُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ أَدْرَكْتُ ذَالِكَ قَالَ تَسْمَعُ وَتُطِيعُ لِلْأَمِيرِ وَإِنْ ضُرِبَ ظَهْرُكَ وَأُخِذَ مَالُكَ فَاسْمَعْ وَأَطِعْ -
“আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমরা ছিলাম অমঙ্গলের মধ্যে তারপর আল্লাহ আমাদের জন্যে মঙ্গল নিয়ে আসলেন। আমরা তাতে অবস্থান করছি। এ মঙ্গলের পরে কি আবার কোন অমঙ্গল আছে? তিনি বললেন: হাঁ। আমি বললাম, এ অমঙ্গলের পরে কি আবার কোন মঙ্গল আছে? তিনি বললেন: হাঁ। আমি বললাম, এ মঙ্গলের পরে কি আবার কোন অমঙ্গল আছে? তিনি বললেন: হাঁ। আমি বললাম, তা কিভাবে? তিনি বললেন, আমার পরে এমন সব নেতার উদ্ভব হবে যারা আমার হিদায়েতে হিদায়েত প্রাপ্ত হবে না এবং আমার সুন্নাতও তারা অবলম্বন করবে না। অচিরেই তাদের মধ্যে এমন সব লোকের উদ্ভব হবে যাদের অন্তঃকরণ হবে মানব দেহে শয়তানের অন্তঃকরণ; রাবী বলেন, আমি বললাম: তখন আমরা কী করবো, ইয়া রসূলাল্লাহ! যদি আমরা সে পরিস্থিতির সম্মুখীন হই? বললেন: তুমি শুনবে এবং মানবে যদি তোমার পিঠে বেত্রাঘাত করা হয় বা তোমার ধন-সম্পদ কেড়েও নেয়া হয় তবুও তুমি শুনবে এবং মানবে।" ]সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাত- بَابُ الْأَمْرِ بِلُزُوْمِ الْجَمَاعَةِ عِنْدَ ظُهُورِ الْفَتَنِ وَ تَحْذِيرُ الدُّعَاةِ إِلَى الْكُفْرِ
যারা আল্লাহর বিধান দ্বারা হুকুমাত পরিচালনা করবে তারা কখনই হিদায়াত ও রসূলের সুন্নাত ত্যাগকারী শাসক নয়। তাদের যে বিষয়ে আনুগত্য করতে বলা হয়েছে তা আল্লাহর একক হকু তথা ইবাদাত সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়। এমনকি ইসলামী কোন মৌলিক আক্বীদার বিরোধিতায়ও তাদেরকে মানতে বলা হয়নি। অথচ বান্দার অধিকার যেমন অন্যায়ভাবে বা বিচারে বেত্রাঘাত ও ধন-সম্পদ প্রভৃতি তথা অধিকার কেড়ে নেয়া সম্পর্কে তাদের আনুগত্য করতে বলা হয়েছে। যা সুস্পষ্টভাবে মু'আমালাতের অন্তর্ভুক্ত। অথচ পূর্বের হাদীসগুলো শাসকের শেষ বাহ্যিক কুফর তথা সালাত আদায় পর্যন্ত আনুগত্য করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায়, পরিস্থিতি বিশেষে যখন মুসলিমদের ঈমান ও বৈষয়িক শক্তি-সামর্থ্যের হ্রাস ঘটবে এবং গোমরাহ শাসকদের আবির্ভাব ঘটবে তখনকার করণীয় বিষয় সম্পর্কে হাদীসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিকু দিন। আমিন!!
পূর্বোক্ত আলোচনাতে আক্বীদাভিত্তিক ও আমলভিত্তিক কুফরের বিষয়টি সুস্পষ্ট হল। কেননা রসূলুল্লাহ যখন নিজেই হাকিম তখন তাঁর সাথে দুর্ব্যবহারকারীদের ব্যাপারে যেখানে তার অবস্থান সুস্পষ্ট, অথচ তিনি তখন রাষ্ট্রীয় শক্তি-ক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং যখন মুসলিমরা ঈমানী দুর্বলতায় জর্জরিত হবে, তখন শক্তিশালী গোমরাহ শাসকদের ব্যাপারে তাদের করণীয় তা-ই যা পূর্বোক্ত সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদেরকে পুনরায় নবী -এর দেখানো পথেই সংস্কার করতে হবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন: একবার রসূলুল্লাহ আমাদের বললেন: أَنَّكُمْ سَتَرَوْنَ بَعْدِي أَثْرَةً وَأُمُوْرًا تُنْكِرُوْنَهَا "অচিরেই তোমরা আমার পরে স্বজনপ্রীতি এবং এমন সব কাজ দেখবে, যা তোমরা অপছন্দ করবে।" সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন: فَمَا تَأْمُرُنَا يَا رَسُوْلَ الله "ইয়া রসূলাল্লাহ! তখন আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি বললেন: أَدُّوا إِلَيْهِمْ حَقَّهُمْ وَسَلُوْا اللَّهُ حَقَّكُمْ "তোমরা তাদের হক্ক তাদের পরিশোধ করে দেবে এবং তোমাদের হক্ক আল্লাহ'র কাছে চাবে।"¹²
রসূলুল্লাহ বলেছেন: سَتَكُوْنُ أَحْدَاثٌ وَفِتْنَةٌ وَفُرْقَةٌ وَاخْتِلاف ، فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَكُوْنَ الْمَقْتُولَ لَا الْقَاتِلَ فَافْعَلْ "অচিরেই নিত্য নতুন বিষয়াদি (বিদ'আত), ফিতনা, ফিরক্বা (দলাদলি) ও ইখতিলাফ (মতবিরোধ) দেখা দেবে। তখন যদি তোমার পক্ষে সম্ভব হয় তবে নিহত হও, হত্যাকারী হয়ো না- তবে তা-ই কর।"¹⁰
আবূ মূসা নবী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ فِتَنَّا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا وَيُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا الْقَاعِدُ فِيْهَا خَيْرٌ مِّنَ الْقَائِمِ وَالْمَاشِي فِيْهَا خَيْرٌ مِّنَ السَّاعِي فَكَسِّرُوْا فِيْهَا قِسِيَّكُمْ وَقَطَّعُوْا فِيْهَا أَوْتَارَكُمْ وَاضْرِبُوا سُيُؤْفَكُمْ بِالْحِجَارَةِ فَإِنْ دُخِلَ عَلَى أَحَدٍ مِّنْكُمْ فَلْيَكُنْ كَخَيْرِ ابْنَيْ آدَمَ
“ক্বিয়ামত আসার পূর্বে ঘোর অন্ধকার রাত্রির একাংশের ন্যায় ফিতনা সংঘটিত হতে থাকবে, এতে কোন ব্যক্তি সকালে মু'মিন এবং বিকালে কাফির এবং বিকালে মু'মিন আর সকালে কাফিরে পরিণত হতে থাকবে। এতে বসে থাকা ব্যক্তি দাড়িয়ে থাকা ব্যক্তি হতে উত্তম হবে। আর চলমান ব্যক্তি দ্রুতগামী ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম হবে। তখন তোমরা তোমাদের ধনুকগুলো ভেঙ্গে ফেলবে এবং এর রশিগুলি কেটে ফেলবে। আর তোমাদের তলোয়ার পাথরে আঘাত করে এর ধার নষ্ট করে দেবে। এই সময় কেউ যদি আগ্রাসী হয়ে তোমাদের কাউকেও আক্রমণ করে, তখন সে যেন আদম -এর দুই ছেলের মধ্যে উত্তম ছেলের নীতি অবলম্বন করে।”¹⁴ আদম -এর উক্ত দুই পুত্র সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَاسِطِ يَدِيَ إِلَيْكَ لَأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبِّ الْعَالَمِينَ “(আদম -এর এক পুত্র অপর পুত্রকে বলল) তুমি যদি আমাকে হত্যার জন্য হাত বাড়াও, আমি তোমাকে হত্যার জন্য হাত বাড়াব না। আমি রব্বুল আলামীনকে ভয় করি।” [সূরা মায়িদাহ: ২৮ আয়াত]
ইমাম ইবনে কাসীর লিখেছেন: قَالَ أَيُّوبُ السَّختياني: إِنَّ أَوَّلَ مَنْ أَخَذَ هَذِهِ الْآيَةِ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ: لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَاسِطِ يَدِيَ إِلَيْكَ لَأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ ﴾ لَعُثْمَانِ بْنِ عَفَانِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ رواه ابن أبي حاتم. “আইয়ুব সাখতিয়ানী বলেন: এই উম্মাতের মধ্যে সর্বপ্রথম এই আয়াতের ওপর যিনি আমল করেছিলেন তিনি হলেন উসমান । আবূ হাতিম এটা বর্ণনা করেছেন।”
[তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা মায়িদাহ- ২৮ নং আয়াতের তাফসীর দ্রঃ]
লক্ষণীয় বিদ্রোহীদের মোকাবেলায় ইসলামী রাষ্ট্র তখন শক্তিশালী ছিল। কিন্তু উসমান রাষ্ট্রীয় নীতির আলোকে তাদের মুসলিম গণ্য করায় তাদের রক্ত নেওয়ার চেয়ে নিজের শহীদ হওয়াটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আল্লাহ সত্য বুঝার তাওফিক দিন।
বিকৃতির সময় সামর্থ্য অনুযায়ী নানামুখী জিহাদের কর্মসূচী নবী বলেছেন:
مَا مِنْ نَّبِيِّ بَعَثَهُ اللهُ فِي أُمَّةٍ قَبْلِي إِلَّا كَانَ لَهُ فِي أُمَّتِهِ حَوَارِيُّوْنَ وَأَصْحَابٌ يَا خُذُوْنَ بِسُنَّتِهِ وَيَقْتَدُوْنَ بِأَمْرِهِ ثُمَّ أَنَّهَا تَخْلُفُ مِنْ بَعْدِهِمْ خُلُوْفٌ يَقُوْلُوْنَ مَا لَا يَفْعَلُوْنَ وَيَفْعُلَوْنَ مَا لاَ يُؤْمَرُوْنَ فَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِيَدِهِ فَهُوَ مَؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَ هُمْ بِقَلْبِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الْإِيْمَانِ حَبَّةُ خَرْدَل -
"আল্লাহ আমার পূর্বে যে সব নবী -কে তাঁর উম্মাতের জন্য পাঠিয়েছিলেন, ঐ উম্মাতের মধ্যে তাঁর জন্য সাহায্যকারী ও সাহাবীগণ ছিলেন। যারা তাঁর সুন্নাতের উপর আমল করতেন ও তাঁর হুকুম মেনে চলতেন। তাদের পরে ঐ সমস্ত খারাপ লোকের উদ্ভব হতো যারা এমন কথা বলত যার উপর 'আমল করত না। আর তাদের যে বিষয়ের নির্দেশ দেয়া হয় নি, তার উপর 'আমল করত। যে ব্যক্তি ঐ সমস্ত লোকদের সাথে হাত দ্বারা জিহাদ করে সে মু'মিন, যে যবান দ্বারা জিহাদ করে সেও মু'মিন, আর যে অন্তর দ্বারা জিহাদ করে সেও মু'মিন। অন্যথায় এর বাইরে তিল দানা পরিমাণ ঈমানের অস্তিত্বও নেই। "¹⁵
এই শেষোক্ত হাদীসটিতেও কূলব তথা অন্তরের কার্যকারীতাকে স্বীকার করে তাকে সর্বশেষ ঈমানের অস্তিত্ব বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। যা আহলে সুন্নাতের আক্বীদাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। পক্ষান্তরে খারেজীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
সংশয়: অনেকে এ ক্ষেত্রে বলতে পারেন, আলোচ্য হাদীসটিতো উপায়হীন অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যখন পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে তখন কেবল অন্তরের কার্যকারিতা গ্রহণযোগ্য নয়।
জবাব: হাদীসটিতে অন্তরের উক্ত কার্যকারিতাকে দুর্বল ঈমান বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ ঈমানের সর্বশেষ অবস্থা। সুতরাং যখন শরী'আত নিজেই তা স্বীকৃতি দেয় তখন তা অস্বীকার করা প্রকারান্তরে "আল্লাহর বিধানকেই অস্বীকার করা"। যা কুফরে ই'তিক্বাদী বা আক্বীদাগত কুফরের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া যারা ঈমানী দুর্বলতা ও অন্যান্য কারণে 'আমলগতভাবে চরম পাপী হিসাবে গণ্য হবে তাদের আখিরাতের পরিস্থিতি সম্পর্কেও হাদীসে সুস্পষ্ট বর্ণনা আছে। যেমন- সমস্ত নবী- রসূলদের শাফায়াতের শেষে আল্লাহ বলবেন:
شَفَعَتِ الْمَلَائِكَةُ وَشَفَعَ النَّبِيُّوْنَ وَشَفَعَ الْمُؤْمِنُوْنَ وَلَمْ يَبْقَ إِلَّا أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ فَيَقْبْضَ قَبْضَةً مِنَ النَّارِ فَيَخْرُجُ مِنْهَا قَوْمًا لَّمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا
"মালাইকাগণ, নবীগণ ও মুমীনগণ সবাই শাফায়ত করেছেন, এখন এক 'আররহমানুর রহিমীন ছাড়া কেউ বাকি নেই। এই বলে তিনি মুষ্টিভরে এমন একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করবেন যারা কখনো কোন নেক কাজ করে নি।"¹⁶ উপরিউক্ত হাদীসগুলো মুরজিয়া ও খারেজী উভয় ফিতনাকে খণ্ডন করে। কেননা-
১. মুরজিয়াদের দাবি হলো কেবল ঈমান থাকাই জান্নাতের যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ শেষোক্ত হাদীসটিতে কেবল ঈমান থাকলেও জাহান্নামী হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে।
২. খারেজীরা আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘনকারীকে কাফিরদের মতো চিরস্থায় জাহান্নামী মনে করে থাকে।
অথচ উক্ত হাদীসে নেক কাজহীন ব্যক্তিদের আল্লাহর অনুগ্রহে অবশেষে জান্নাতে যাওয়াটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। তাছাড়া আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদার পক্ষে নিচের সহীহ হাদীসটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উবাদা ইবনে সামিত বলেন:
كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي مَجْلِسٍ فَقَالَ تُبَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا تَزْنُوا وَلَا تَسْرِقُوا وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللهِ وَمَنْ أَصَابَ شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ فَعُوقِبَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ أَصَابَ شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ فَسَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ إِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ.
"আমরা কোন বৈঠকে রসূলুল্লাহ এর সঙ্গে বসেছিলাম। তখন তিনি বললেন: তোমরা আমার কাছে এ বলে বায়য়াত গ্রহণ কর যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যিনা করবে, চুরি করবে না এবং কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। কিন্তু ন্যায়সঙ্গতভাবে (অর্থাৎ ক্বিসাসের কারণে)। অতএব, তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ তা পূর্ণ করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাবে। আর যদি কেউ উক্ত অপরাধের কোন একটিতে পতিত হয়ে শাস্তি ভোগ করে, তবে তাই তার জন্য কাফফারা হয়ে যাবে। আর যদি কোন ব্যক্তি উল্লিখিত অপরাধের কোন একটিতে পতিত হয় অতঃপর আল্লাহ তা গোপন রাখেন, তবে বিষয়টি মহান আল্লাহ'র এখতিয়ারে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তিও দিতে পারেন।" [সহীহ মুসলিম- কিতাবুল হুদূদ ابَابُ الْحُدُودِ كَفَّارَاتٌ لِأَهْلِها
অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে- উবাদা বলেন: আমরা এ সকল কথার উপর তাঁর হাতে বায়আত করলাম।” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ঢাকা) ১/১৭ নং
এর বিপরীতে মু'তাযিলা ও খারেজীদের দলিল হলো: ক. আল্লাহ হত্যাকারী এবং খ. সুদখোরকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলেছেন।
আল্লাহ বলেন: وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا "আর কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মু'মিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, যেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা'নত করবেন এবং মহাআযাব প্রস্তুত রাখবেন।" [সূরা নিসা- ৯৩ আয়াত]
আল্লাহ বলেন: الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسُ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلُ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانْتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّه وَمَنْ عَادَ فَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ - يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلِّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ "যারা সুদ খায়, তারা সে ব্যক্তিরই ন্যায় দাঁড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এই জন্য যে, তারা বলে: বেচাকেনা তো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ বেচাকেনাকে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন। যার কাছে তার রবের উপদেশ এসেছে এবং যে বিরত হয়েছে, তবে অতীতে যা হয়েছে তা তারই; এবং তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালবাসেন না।" [সূরা বাক্বারাহ- ২৭৫-৭৬ আয়াত]
এর দ্বারা প্রমাণিত হয় কবীরা গুনাহকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী এবং সে কাফির।
জবাব: পূর্বোক্ত সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসটির মূলনীতির আলোকে বুঝা যায়, সর্বোচ্চ কবীরা গুনাহকারীদের আল্লাহ ইচ্ছা করলে জাহান্নামে দিতে পারেন আবার ইচ্ছা করলে ক্ষমা করতে পারেন। তাছাড়া হাদীসটির মতো কুরআনেও মু'মিনের পাপের কাফফারার কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন-
আল্লাহ বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنثَى بِالْأُنثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَان ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ "হে মু'মিনগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য ক্বিসাসের বিধান দেয়া হয়েছে, স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস এবং নারীর বদলে নারী; তবে যাকে তার ভাইদের পক্ষ থেকে ক্ষমা করে দেয়া হবে, তখন যথাযথ বিধির অনুসরণ করা ও ইহসানের সাথে তা আদায় করা। এ বিধি তোমাদের রবের পক্ষ হতে সহজ ব্যবস্থা ও অনুগ্রহ। এরপরও যে সীমালঙ্ঘন করে তার জন্য রয়েছে ভয়ানক আযাব।" [সূরা বাক্বারাহ- ১৭৮ আয়াত]
আল্লাহ বলেন:
وَالْجُرُوحَ قِصَاصِ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ
“যে ব্যক্তি (ক্বিসাসের) শাস্তি সাদকা করে দেবে তা তার জন্য কাফফারায় পরিণত হবে।" (সূরা মায়িদা- ৪৫ আয়াত)
অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ বলেছেন:
مَنْ جُرِحَ فِي جَسَدِهِ جِرَاحَةً فَتَصَدَّقَ بِهَا كَفْرَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَنْهُ بِمِثْلِ مَا تَصَدَّقَ بِهِ
"যার শরীরে কোন আঘাত করা হয়েছে এবং সে তা সাদকা (মাফ) করে দিয়েছে, এ ক্ষেত্রে আল্লাহ যে পর্যায়ের ক্ষমা হবে ঠিক একই পর্যায়ের গোনাহ মাফ করা হবে।” [মুসনাদে আহমাদ, শুআয়েব আরনাউত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (তাহক্বীকুকৃত মুসনাদে আহমাদ ৫/২২৮৪৪ নং)।]
উক্ত আয়াত ও হাদীসগুলো থেকে মানুষের অধিকার সংক্রান্ত সর্বোচ্চ কবীরা গুনাহ তথা হত্যার ব্যাপারটিই মানুষ দ্বারাও যখন ক্ষমাযোগ্য। তখন অন্যান্য কবীরা গোনাহর ক্ষেত্রেও ঐ নীতিই প্রযোজ্য যা পূর্বে সহীহ মুসলিমের উবাদা ইবনে সামিত এ-এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী যথাযথ শাস্তি ভোগ বা মেয়াদের পর কেবল ঈমানের বদৌলতে জান্নাতী হওয়া সম্পর্কীত হাদীসগুলোও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
[বিস্তারিত জানতে দেখুন: "কবীরা গুনাহাগার মু'মিন কি চিরস্থায়ী জাহান্নামী?" -কামাল আহমাদ; আতিফা পাবলিকেশন্স, ঢাকা]

টিকাঃ
১. সূরা মুনাফিকুন: ১-৩ আয়াত।
১. সহীহ: মুসলিম, মিশকাত (ঢাকা: এমদাদিয়া লাইব্রেরী, জানু-১৯৯৭) ৭ম খণ্ড হা/৩৫০২।
১০. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) হা/৩৬০১। হাদীসটি বায়য়াত কোন পরিস্থিতিতে ভঙ্গ করা যায় সে সম্পর্কে প্রশ্ন-উত্তর সংশ্লিষ্ট ছিল।
১১. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত ৭ম খন্ড হা/৩৪৯৭। হাদীসটি নিযুক্ত মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হাদীসের শুরুর বাক্যগুলো থেকে তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
১২. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৭/৩৫০৩ নং।
১০. হাসান: মুসনাদে আহমাদ, মুস্তাদরাকে হাকিম। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (সহীহুল জামে' ১/৩৬১৬)। শু'আয়েব আরনাউত হাদীসটির সমালোচনাসহ হাদীসটি হাসান লি-গয়রিহী বলে মন্তব্য করেছেন। (তাহক্বীক্ককৃত মুসনাদে আহমাদ ৫/২২৫৫২)। পরবর্তী সহীহ হাদীসটি এই হাদীসটিকে সমর্থন করে।
১৪. সহীহ: আবূ দাউদ, মিশকাত ১০/৫১৬৬ নং, আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (তাহক্বীকুকৃত মিশকাত ৩/৫৩৯৯, তাহক্বীকুকৃত আবূ দাউদ হা/৪২৫৯)।
১৫ সহীহ: সহীহ মুসলিম - কিতাবুল ঈমান ا بَابٌ بَيَانِ كَوْنِ النَّهْيِ عَنِ الْمُنْكِرَ
১৬ সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ১০/৫৩৪১ নং।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00