📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি‘ আল-আয্দী (রহ)

📄 মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি‘ আল-আয্দী (রহ)


মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি' আল-আযদী (রহ) একজন মহান তাবি'ঈ। ডাকনাম আবূ বাকর, মতান্তরে আবূ 'আবদিল্লাহ। তিনি ছিলেন হযরত রাসূলে কারীমের (সা) মহান খাদিম ও সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক আল-আনসারীর (রা) ছাত্র। এ কারণে তিনি "যায়নুল ফুকাহা” (ফকীহদের শোভা) উপাধি লাভ করেন। তবে তিনি "আবিদুল বাসরা" বা বসরার তাপস উপাধিতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

বসরায় তাঁর জন্ম এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। মদীনায় জ্ঞান অর্জন করেন। বিশেষতঃ ফিক্হ বিষয়ে পারদর্শিতা লাভ করেন। জ্ঞানের জগতে সুউচ্চ আসনের অধিকারী হন। মালিক ইবন দীনার (রহ) তাঁর সম্পর্কে বলেন:
'কারী বা আল-কুরআনের পাঠক তিন প্রকার : দয়াময় (আল্লাহর) কারী, দীনার- দিরহামের কারী এবং রাজা-বাদশাদের কারী। ওহে তোমরা শুনে রাখ, আমার জানা মতে মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি' আল-আযদী হলেন দয়াময় আল্লাহর কারী।'

যুহদ ও তাকওয়া
তিনি একজন অতি সম্মানীত 'আলিম ও একজন উঁচু পর্যায়ের উপদেশ দানকারী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর মজলিস সব সময় আল্লাহ ভীতি (তাকওয়া) ও সত্যের আলোচনায় মুখর থাকতো। এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ মজলিসে একদিন তিনি তাঁর এক ছাত্রকে বলেন: 'বান্দা যখন সর্বান্তকরণে আল্লাহর দিকে এগিয়ে যায় তখন আল্লাহ মু'মিনদের অন্তকরণসহ তার দিকে এগিয়ে যান।'

একদিন বসরার মসজিদে ছাত্রদের দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় তিনি বসে আছেন, এমন সময় একজন ছাত্র উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে বললো : আবূ 'আবদিল্লাহ, আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করুন! আমাকে কিছু উপদেশ দিন। বললেন: আমি তোমাকে উপদেশ দিই, তুমি দুনিয়া ও আখিরাতের বাদশাহ হও।
বিস্ময়ের সাথে ছাত্র বললো: আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন। এটা আমার জন্য কেমন করে সম্ভব? বললেন: দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব পরিহার কর, তাহলে মানুষের কর্তৃত্বে যা কিছু আছে তার প্রতি অভাববোধ না করে এখানে বাদশাহ হতে পারবে। আর আখিরাতেও আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম প্রতিদান লাভের মাধ্যমে বাদশাহ হতে পারবে।
ছাত্র বললো : আবূ আবদিল্লাহ! আমি আপনাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসবো। তিনি বললেন : যে উদ্দেশ্যে তুমি আমাকে ভালোবাসছো, আল্লাহ তোমার সে উদ্দেশ্য পূরণ করুন। তারপর বহু দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অস্ফুট স্বরে বললেন:
'হে আল্লাহ! তোমার সন্তুষ্টির জন্য মানুষ আমাকে ভালোবাসুক, আর তুমি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট থাক- এ থেকে আমি তোমার পানাহ্ চাই।'

একদিন এক ছাত্র ভরা মজলিসে উঠে দাঁড়ালো এবং তাঁর নীতি-নৈতিকতা ও আল্লাহ-ভীতি সম্পর্কে কয়েকটি প্রশংসামূলক বাক্য উচ্চারণ করলো। তিনি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে এমনটি আর কখনো না করার কথা সাফ জানিয়ে দিয়ে বললেন:
'ওরে বেটা, পাপের যদি ছড়িয়ে পড়ার মত কোন দুর্গন্ধ থাকতো, তাহলে তোমাদের কেউই আমার কাছে আসতে পারত না।' তিনি আরো বলেন: 'বেটা, আল-কুরআন হলো মু'মিনের উদ্যানস্বরূপ। এর যেখানেই সে অবতরণ করবে, তৃণভূমি পাবে।'

একবার তিনি তাঁর এক অতি স্থূলকায় ছাত্রের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সে নামাযে দাঁড়িয়ে; কিন্তু এমন শব্দ করছে যেন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাকে লক্ষ্য করে বললেন : বেটা, যার আহার কমে গেছে সে নিজে বুঝেছে ও অপরকে বুঝাতে পেরেছে। তার অন্ত:করণ পরিশুদ্ধ ও কোমল হয়েছে। আর বেশি আহার মানুষের অনেক ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে কঠিন করে দেয়।

একদিন এক ব্যক্তি একটু দেরীতে মজলিস ভেঙ্গে যাওয়ার পর এসে সালাম করে জিজ্ঞেস করলো : আবূ আবদিল্লাহ, কেমন আছেন? তিনি জবাব দিলেন: আমি আমার মৃত্যুর কাছাকাছি, আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকে বহু দূরে এবং কর্মের খুব খারাপ অবস্থায় আছি। সেই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা যে প্রতিদিন আখিরাতের দিকে একটি পর্যায় অতিক্রম করে?

তিনি ছিলেন তাঁর ছাত্র-শিষ্য, সঙ্গী-সাথী ও ভক্ত-অনুসারীদের জন্য একটি উত্তম আদর্শ। তাঁর জনৈক সঙ্গী তাঁর সম্পর্কে বলেন : একবার আমি মক্কা থেকে বসরা পর্যন্ত মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি'র সফর সঙ্গী ছিলম। তিনি সারা রাত নামায পড়তেন। বাহনের পিঠে মাথা ঝুঁকিয়ে ইশারায় বসে বসে রুকু-সিজদা করতেন। পিছনে বসা চালককে উচ্চস্বরে উট চালাতে বলতেন। মাঝে মাঝে নামাযের মধ্যে তাঁর রাত কেটে যেত। প্রত্যুষে একজন একজন করে সঙ্গীদের জাগাতেন। তাদের কাছে গিয়ে বলতেন: আস-সালাত, আস- সালাত : নামায! নামায! তারা সবাই জেগে গেলে বলতেন: নিকটেই পানি আছে, তোমরা ওযু করে নাও। যদি পানি বেশি দূরে হয় এবং সঙ্গে থাকা পানি যদি অল্প হয় তাহলে পাক মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নাও। সঙ্গের পানিটুকু পান করার জন্য রেখে দাও।

বসরার ওয়ালী বিলাল ইবন আবূ বুরদা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখেন, তিনি মোটা পশমী কাপড়ের জুব্বা পরে আছেন। বিলাল তাঁকে বললেন: আবূ 'আবদিল্লাহ! আপনি এমন মোটা খসখসে কাপড় পরেন কেন? তিনি কোন উত্তর দিলেন না। বিলাল বললেন: আবূ 'আবদিল্লাহ! আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না কেন?

এবার তিনি বললেন: আমি এটাকে যুহদ তথা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি নির্লিপ্ততা বলতে চাই না। কারণ, তাতে নিজেকে পবিত্র মনে করা হবে। আবার অভাব ও দারিদ্র্যও বলতে চাই না। কারণ, তাতে আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে। আমি এ দু'টোর কোনটাই বলতে চাই না।
বিলাল বললেন: আপনার কোন কিছুর প্রয়োজন আছে কি যা আমি পূরণ করতে পারি? মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি' বললেন: মানুষের নিকট চাইতে হবে আমার নিজের তো এমন কোন প্রয়োজন নেই। তবে একজন মুসলিম ব্যক্তির একটি প্রয়োজনের কথা আপনাকে বলছি। বিলাল বললেন: বলুন, ইনশাআল্লাহ আমি পূরণ করবো।
সব শেষে বিলাল বললেন: আবূ 'আবদিল্লাহ! তাকদীর বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি? জবাবে তিনি বললেন: ওহে আমীর! আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন কিয়ামাতের দিন তাঁর বান্দাদেরকে তাকদীর বিষয়ে জিজ্ঞেস করবেন না। তিনি জানতে চাইবেন তাদের অবস্থা ও আমল সম্পর্কে।

এমন জবাব শুনে ওয়ালী চুপ হয়ে যান এবং ভীষণ লজ্জিত হন। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে নীরবে মজলিস ত্যাগ করেন।
মালিক ইবন দীনার বলতেন: আমি মুহাম্মাদ ইবন সীরীনকে জান্নাতে দেখেছি এবং মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি'কেও জান্নাতে দেখেছি। আল-হারিছ ইবন ওয়াজীহ্ একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: হাসান আল-বাসরী কোথায়? বললেন: হাসান সিদরাতুল মুনতাহা'র নিকটে আছেন।

মনীষা ও জ্ঞান
মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি' (রহ) মাত্র ১৫ (পনেরো) টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি একজন বিশ্বস্ত, সৎ ও তাপস ব্যক্তি ছিলেন। অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীছ বিশারদ দারুকুতনী বলেন:
'মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি যিনি দুর্বল রাবীদের দ্বারা পরীক্ষিত বা বিভ্রান্ত হয়েছেন।'

তাঁর সমকালীন আরেকজন মনীষী দামরা ইবন শাওযাব বলেন: মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' প্রকাশ্য ইবাদতে খুব বেশি নিমগ্ন থাকতেন না। ফাতওয়ার দায়িত্বও অন্যরা পালন করতেন। কিন্তু যখন প্রশ্ন করা হতো বসরার সর্বোত্তম ব্যক্তিটি কে? বলা হতো: মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' আল-আযদী। আমি তাঁর চেয়ে বেশি বিনয়ী লোক কখনো কাউকে দেখিনি। বসরার অধিবাসী অপর এক ব্যক্তি বলেন: আমি যখন আমার অন্তরে কিছুটা কঠোরতার ভাব উপলব্ধি করতাম তখন মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি'র নিকট গিয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ মালিক ইবন দীনার ছিলেন মুহাম্মাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহচর। একদিন মুহাম্মাদ তাঁর বাড়িতে অবস্থানকালে বসরার আমীর মালিকের নিকট কিছু অর্থ পাঠালেন এবং তিনি তা গ্রহণ করলেন। শায়খুল বসরা মুহাম্মাদ তাঁকে বললেন: আপনি তাঁদের অনুদান গ্রহণ করলেন? মালিক বললেন: দু'দিন অপেক্ষা করুন এবং আমার সহচরদের নিকট জিজ্ঞেস করুন। তাঁর কথা মত তিনি তাঁর বন্ধুদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা বললেন: মালিক ইবন দীনার সেই অর্থ দিয়ে কিছু দাস ক্রয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাদের মুক্ত করে দেন। এ কথা শোনার পর মুহাম্মাদ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলেন। অত:পর তিনি যখন মালিকের সাথে মিলিত হলেন তখন মালিক বললেন: আবূ 'আবদিল্লাহ, আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জানতে চাচ্ছি, আপনি কি আমার প্রতি সন্তুষ্ট আছেন? মুহাম্মাদ বললেন: আল্লাহর কসম! না। মালিক বললেন: আমি ভুল করে চলেছি। মুহাম্মাদ ইবন্ আল-ওয়াসি'র মত লোকেরাই আল্লাহর ইবাদত করে থাকে। মালিক তাঁর দিকে তাকিয়ে আরো বলেন: আমি অবশ্য এমন মানুষকে ঈর্ষা করি যার মধ্যে দীনদারী আছে এবং দুনিয়ার কোন কিছু নেই; অথচ তিনি সন্তুষ্ট।

তাঁর ছেলে 'আবদুল্লাহ। একবার জনৈক ব্যক্তির সাথে তার একটু ঝগড়া হয়। লোকটি ছেলের বিরুদ্ধে পিতার নিকট নালিশ করে। তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে ছেলেকে লক্ষ্য করে বলেন: তুমি মানুষের সাথে বাড়াবাড়ি কর, অথচ আমি তোমার পিতা? আল্লাহ যেন মুসলিম সমাজে তোমার মত মানুষের সংখ্যা না বাড়ান।

তিনি সত্য উচ্চারণে তিরস্কার ও অপমান-লাঞ্ছনাকে মোটেও পরোয়া করতেন না। বসরার শাসনকর্তা মালিক ইবন আল-মুনযির মুহাম্মাদকে বসরার কাজী নিয়োগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তিনি এই নিয়োগ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন এই বলে: এই বিচারের সাথে আমার সম্পর্ক কি? মালিক দূত পাঠালেন এই নিয়োগ গ্রহণে তাঁকে রাজী করানোর জন্য। তিনিও একই কথা বলে তাকে ফিরিয়ে দিলেন। মালিক যে ব্যক্তিকে পাঠালেন সে তাঁকে বললো: হয় আপনি কাজীর আসনে বসবেন নয়তো আমি আপনাকে তিন শো চাবুক মারবো। জবাবে তিনি দূতকে বললেন: তুমি মালিককে বল, যদি তিনি এমনটি করেন তাহলে তিনি হবেন একজন অত্যাচারী শাসক। আর দুনিয়ার লাঞ্ছনা আখিরাতের লাঞ্ছনার চেয়ে ভালো।

সে যুগে বসরার নিয়ম ছিল, মানুষ কোন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ঘিরে বসতো এবং তিনি তাদেরকে দীন, ফিক্হ ও মাগাযী তথা রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা শোনাতেন। একবার এমন একটি মজলিসে তিনিও বসা ছিলেন। তিনি উপদেশ দানকারী বক্তাকে বলতে শুনলেন: আমার উপদেশ শুনে কারো অন্তর নরম হচ্ছে না, চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে না এবং গায়ের চামড়া ভয়ে কাঁপছে না- আমি এমন দেখছি কেন? তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন: ওহে, আমার মনে হয় আপনার জন্যই মানুষের এমন অবস্থা হয়েছে। কারণ, উপদেশাবলী যখন অন্তর থেকে বের হয় তখন তা অন্তরের উপরেই পড়ে।

এরকম ঘটনা অন্য একজন আমীরের সাথে তাঁর ঘটে। সেই আমীরের নাম বিলাল ইবন আবী বুরদা। তিনি একবার মুহাম্মাদকে তাঁর গৃহে খাবারের দাওয়াত দিলেন। মুহাম্মাদ সে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলেন। আমীর ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। মুহাম্মাদকে লক্ষ্য করে বললেন: আমি সব সময় দেখি, আপনি আমাদের খাবার ঘৃণা করছেন। মুহাম্মাদ বললেন: মহামান্য আমীর! আপনি এমন কথা বলবেন না। আল্লাহর কসম! আপনাদের মধ্যে যারা ভালো মানুষ তারা আমার সন্তানদের চাইতেও আমার বেশি প্রিয়।

তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা
পারস্যে তখন মুসলিম বাহিনীর সাথে যে যুদ্ধ চলছিল মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' তাতে অংশ গ্রহণের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বিশেষত: জুরজান ও তাবারিস্তানের যুদ্ধে। এ বাহিনীর কমাণ্ডার ছিলেন ইয়াযীদ ইবন আল-মুহাল্লাব ইবন আবী সুফরা। তিনি তখন খুরাসানের ওয়ালী।
মুসলিম বাহিনী দাহিস্তান নামক একটি অঞ্চলে প্রবেশ করলো। যেখানে তুর্কী সম্প্রদায়ের লোকেরা বসবাস করতো। তারা ছিল দারুণ শক্তিশালী, দুঃসাহসী এবং দুর্ভেদ্য দুর্গসমূহের অধিকারী। তাদের এ অবস্থা দেখে মুসলিম বাহিনী অনেকটা ভীত হয়ে পড়লো। তারা মনে করলো তাদেরকে পরাভূত করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার।

মুসলিম বাহিনীর এমন সংকটজনক পরিস্থিতিতে মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' এমনি দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেন যা মুসলিম মুজাহিদদের ভগ্ন মনোবলকে আবারো চাঙ্গা ও সতেজ করে তোলে। তিনি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে আহ্বান জানান : ওহে আল্লাহর অশ্বারোহীগণ! তোমরা নিজ নিজ অশ্বের পিঠে আরোহণ কর!
এ আহ্বানের সাথে সাথে মুসলিম মুজাহিদগণ সমুদ্রের তরঙ্গের গতিতে এমনভাবে ধাবিত হতে থাকে যে, তাদের সামনে দাঁড়াতে কেউ দুঃসাহস করেনি। তাদের হুঙ্কার ও আস্ফালন দেখে প্রতিপক্ষ বাহিনী ভীত-কম্পিত হয়ে পড়ে।

বসরার 'আবিদ-মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' কেবল সৈনিকদের মনোবল চাঙ্গা করেই ক্ষান্ত হলেন না, বরং তরবারি কোষমুক্ত করে সজোরে এদিক ওদিক চালাতে থাকেন। এর মধ্যে শত্রুবাহিনীর মধ্য থেকে বিশাল দেহের অধিকারী শক্তিমান ও ক্ষিপ্রগতি সম্পন্ন একজন যোদ্ধা বেরিয়ে আসে এবং মুসলিম বুহ্যের মধ্যে ঢুকে যত্রতত্র আঘাত হানতে থাকে। তার প্রচণ্ড আক্রমণে মুসলিম বাহিনীর যোদ্ধারা পিছু হটতে থাকে। তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হয়। সে ঔদ্ধত্যের সাথে মুসলিম যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানায়: কে আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে? কে আমার সাথে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লিপ্ত হবে?

মুসলিম বাহিনীর মধ্য থেকে বসরার এই 'আবিদ চিৎকার করে বলে উঠলেন : আমিই এই বলদর্পী, অহংকারীর আহ্বানে সাড়া দিতে ইচ্ছুক?
মুসলিম বাহিনীর মধ্যে শোরগোল পড়ে গেল, তারা সমস্বরে বলে উঠলো, না তিনি একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ, তাঁকে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় পাঠানো যাবে না। সবার অনুরোধে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। তবে এক তরুণ মুসলিম সৈনিকের তরবারির খাপ স্পর্শ করে তার সাফল্যের জন্য দু'আ করলেন। এই মহান তাবি'ঈর দু'আর বরকতে সৈনিকটি দুঃসাহসী হয়ে ওঠেন এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সামনে এগিয়ে যান। তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের মাথায় তরবারির এমন আঘাত হানেন যে, তা দু'খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। শত্রু-সৈনিকও তাঁর মাথা তাক করে আঘাত হানে, কিন্তু তাঁর লোহার বর্ম তা ঠেকিয়ে দেয়। বর্মটি দু'খণ্ড হয়ে গেলেও মাথা স্পর্শ করেনি। তিনি যখন ফিরে আসলেন তখন তাঁর তরবারি থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ছিল।

এ দৃশ্য দেখে মুসলিম বাহিনী তাকবীর ধ্বনি দিয়ে দিক-দিগন্ত মুখরিত করে তোলে। তাঁরা এই মহান 'আবিদ-তাবি'ঈকে শ্রদ্ধাভরে তাকিয়ে দেখতে থাকে এবং তাঁর হাতে চুমু খাওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অতঃপর মুসলিম বাহিনী একযোগে আক্রমণ চালিয়ে শত্রুবাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। তারা সন্ধি করে এবং জিযিয়া দানে সম্মত হয়। মুসলিম বাহিনী এ যুদ্ধে অগণিত ধন-সম্পদ গণিমত হিসেবে লাভ করে। তার মধ্যে ছিল লক্ষ লক্ষ দিরহাম, অসংখ্য রূপোর পানপাত্র এবং বিশুদ্ধ স্বর্ণের বহু মুকুট। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন ইয়াযীদ ইবন আল মুহাল্লাব। তিনি সবচেয়ে বড় মুকুটটি হাতে নিয়ে সৈনিকদের উদ্দেশ্যে বললেন: আমার ধারণা, আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, এটা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নয়। সবাই বললো: হাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন।

ইয়াযীদ বললেন: আজ আমি তোমাদেরকে দেখাবো, মুহাম্মাদ (সা)-এর উম্মাতের মধ্যে এখনো এমন ব্যক্তিও আছেন যিনি এটা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নন। তারপর তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি'কে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। বহু খোঁজাখুজির পর তাঁকে হাজির করা হলো। ইয়াযীদ সোনার মুকুটটি হাতে নিয়ে বললেন: ওহে আবূ 'আবদিল্লাহ, মুসলিম সৈনিকরা এই মুকুটটির দাবী ত্যাগ করেছে। এটি আমি আপনাকে দিলাম। মুহাম্মাদ সাথে সাথে বলে উঠলেন : মাননীয় আমীর! আমার এর প্রয়োজন নেই। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। ইয়াযীদ আল্লাহর কসম দিয়ে মুকুটটি গ্রহণের জন্য তাঁকে পীড়াপীড়িলি করলেন। অবশেষে তিনি হাত বাড়িয়ে মুকুটটি নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলেন। সৈনিকরা একটু বিদ্রূপের সুরে বললেন, এই কি ঈছার তথা আত্মত্যাগের নমুনা? তিনি তো মুকুটটি নিয়ে চলে গেলেন।

অধিনায়ক ইয়াযীদ একজন তরুণকে নির্দেশ দিলেন গোপনে তাঁকে অনুসরণ করে মুকুটটি তিনি কি করেন তা দেখার জন্য। ছেলেটি তাঁকে অনুসরণ করে পিছে পিছে গেল। বসরার এই 'আবিদ কিংকর্তব্য বিমূঢ় অবস্থায় পথ চলছেন। ভাবছেন, এই মুকুটটি তিনি কী করবেন? এমন সময় দেখা পেলেন ছেঁড়া-ময়লা পোশাক পরা উসকো-কুসকো চুল ও ধূলি-মলিন চেহারার একজন লোকের। লোকটি তাঁকে বললো: আল্লাহর মাল থেকে আমাকে কিছু দান করুন! তিনি তাঁকে সোনার মুকুটটি দান করলেন। তারপর এমন উৎফুল্ল অবস্থায় দ্রুত চলতে লাগলেন, যেন কোন মারাত্মক বিপদ থেকে মুক্ত হয়েছেন। অনুসরণকারী সৈনিকটি ধূলি-মলিন লোকটিকে মুকুটসহ ধরে সেনা-কমাণ্ডার ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের নিকট নিয়ে গেল। তিনি তাঁর বাহিনীর সদস্যদের সমবেত করে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন: আমি কি তোমাদের বলেছিলাম না যে, এই উম্মাতের মধ্যে এখনো এমন একজন মানুষ আছেন যিনি এই সোনার মুকুট তুচ্ছ মনে করেন? মুকুটের প্রতি তাঁর কোন লোভ নেই?

যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয় হলো। বসরার এই 'আবিদ তাঁর উপর অর্পিত সকল দায়িত্ব শেষ করে হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কার পথে রওয়ানা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনা-কমাণ্ডারের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন : আপনি আপনার খুশীমত যা ইচ্ছা করতে পারেন। বায়তুল্লাহ পর্যন্ত ভ্রমণের জন্য আমি আপনাকে কিছু নগদ অর্থ দিচ্ছে। বসরার 'আবিদ বললেন: সমপরিমাণ অর্থ কি বাহিনীর সকল সৈনিককে দিচ্ছেন? কমাণ্ডার ইয়াযীদ বললেন: না, সকলকে দিচ্ছি না। বসরার 'আবিদ বললেন : যে অর্থ দ্বারা আমাকে অন্যদের থেকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হচ্ছে এমন অর্থের আমার প্রয়োজন নেই। তারপর তিনি 'আস-সালামু 'আলাইকা, ইয়া-আমীরুল জায়শ' (সালাম, ওহে সেনা অধিনায়ক) বলে যাত্রা শুরু করেন।
ইয়াযীদের চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠলো। তিনি মুখে হাসি ফুটিয়ে জোরে বলে উঠলেন: ওয়া 'আলাইকাস সালাম! ওহে 'আবদুল্লাহ, কা'বার চত্বরে বসে আমাদের জন্য দু'আ করবেন।

দুনিয়ার সকল সুখ-সম্পদের প্রতি তিনি সম্পূর্ণ নির্মোহ স্বভাবের ছিলেন। ভোগ-বিলাসিতা তাঁকে মোটেও আকর্ষণ করতে পারেনি। তাই আল্লাহর পথে জিহাদের দায়িত্ব পালন শেষে আল্লাহর আরেকটি ইবাদত সম্পাদনের উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর দিকে যাত্রার সিদ্ধান্ত নেন। সম্ভবত এটা তাঁর ৪র্থ অথবা ৫ম বারের হজ্জ ছিল।

ওফাত
হিজরী ১২৩ সনে তিনি অন্তিম রোগ শয্যায় আশ্রয় নেন। ভক্ত-অনুরাগীদের উপর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভর করে। দর্শনার্থীদের ভীড়ে বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। তিনি তাঁর জীবনের সর্বশেষ যে দু'আটি করেন তা নিম্নরূপ:
“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট মাগফিরাত কামনা করছি, এমন প্রতিটি খারাপ দাঁড়ানোর জায়গা থেকে যেখানে আমি দাঁড়িয়েছি, এমন প্রতিটি খারাপ বসার স্থান থেকে যেখানে আমি বসেছি, এমন প্রতিটি খারাপ প্রবেশ পথ থেকে যে পথে আমি প্রবেশ করেছি, এমন প্রতিটি বের হওয়ার খারাপ পথ থেকে যে পথে আমি বের হয়েছি, এমন প্রতিটি খারাপ কাজ থেকে যা আমি করেছি এবং এমন প্রতিটি খারাপ কথা থেকে যা আমি বলেছি। হে আল্লাহ! আমি এর সবকিছু থেকে তোমার মাগফিরাত কামনা করছি, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমি সবকিছু থেকে তাওবা করছি, তুমি আমার তাওবা কবুল কর!"

তারপর তিনি পাশে বসা তাঁর এক বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললেন:
"আল্লাহর নামে কসম দিয়ে বলছি, তুমি আমাকে বল আগামী কাল যখন আমাকে আমার মাথার সামনের দিকের চুল ও পায়ের গোঁড়ালী ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন উপস্থিত এসকল লোক কি আমার কোন কাজে আসবে?" তারপর তিনি নিম্নের আয়াতটি অনুচ্চ কণ্ঠে পাঠ করতে করতে অনন্তের পথে যাত্রা করেন:
"অপরাধীদের পরিচয় পাওয়া যাবে তাদের লক্ষণ হতে, তাদেরকে পাকড়াও করা হবে মাথার ঝুঁটি ও পা ধরে।"
জা'ফার ইবন সুলায়মান বলেন, এই হিজরী ১২৩ সনে ছাবিত, মালিক ইবন দীনার ও মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি' মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি যে সকল মনীষীর নিকট থেকে হাদীছ শোনেন এবং যাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেন তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবন মালিক (রা) অন্যতম। তাছাড়া খ্যাতিমান তাবি'ঈদের মধ্যে হাসান আল-বাসরী, যাকওয়ান আবী সালিহ আস-সাম্মান, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার, সা'ঈদ ইবন জুবায়র, সুলায়মান আল-আ'মাশ, তাউস ইবন কায়সান, 'আবদুল্লাহ ইবন আস-সামিত, 'আতা' ইবন আবী রাবাহ, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, মুহাম্মাদ ইবন আল মুনকাদির, মুতাররিফ ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখখীর, মু'আবিয়া ইবন কুররা আল-মুযানী, আবূ বুরদা ইবন আবী মূসা আল-আশ'আরী, আবু সালিহ আল হানাফী, আবু নাদরা আল-'আবদী (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

তাঁর সুযোগ্য ছাত্রদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো: আযহার ইবন সি'নান আল-কুরাশী, ইসমা'ঈল ইবন মুসলিম আল- 'আবদী, হাসান ইবন দীনার, হাম্মাদ ইবন যায়দ, 'উছমান ইবন 'আমর (রহ) ও আরো অনেকে।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৩০১
২. আবূ নু'আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৩৪৫; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৩০২
৩. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৫৪
৪. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৬/১২০
৫. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৫৪
৬. প্রাগুক্ত-৩৫৫
৭. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৩৪৬
৮. 'আসরুত তাবি'ঈন-২/৩৪৬, ৩৫৫
৯. প্রাগুক্ত-৩৫৬
১০. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৩০৩
১১. প্রাগুক্ত-১৭/৩০২; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৫৬
১২. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৩০২
১৩. প্রাগুক্ত; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৫৬
১৪. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৬/১২০
১৫. প্রাগুক্ত
১৬. প্রাগুক্ত-৬/১২২; তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৪২
১৭. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৬/১২২
১৮. প্রাগুক্ত; সুওয়ারুন মিনহায়াত আত-তাবি'ঈন-২৪৯
১৯. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৬০-৩৬১; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-২৩১-২৩৮
২০. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৬/১২৩
২১. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৬১
২২. প্রাগুক্ত-৩৬১
২৩. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৬২
২৪. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৩০৩
২৫. প্রাগুক্ত-১৭/৩০১-৩০২

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 হিশাম ইবন ‘উরওয়া (রহ)

📄 হিশাম ইবন ‘উরওয়া (রহ)


হযরত আবূ 'আবদিল্লাহ হিশাম ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত যুবায়র ইবন আল-'আওয়ামের (রা) পৌত্র। তাঁর পিতা হযরত 'উরওয়া (রহ) একজন অতি উঁচু স্তরের তাবি'ঈ এবং মদীনার বিখ্যাত সাতজন ফকীহর অন্যতম। তাঁর ডাকনাম ছিল আবূ 'আবদিল্লাহ, মতান্তরে আবূ আল-মুনযির।

'আবদুল্লাহ ইবন দাউদ আল-খুরায়বী বলেন: তালহা ইবন ইয়াহইয়া, আল-আ'মাশ, হিশাম ইবন 'উরওয়া ও 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁরা সকলে হুসাইন ইবন 'আলীর (রা) শাহাদাতের বছরে জন্মগ্রহণ করেন। আবূ হাম্স বলেন: হুসাইন (রা) শহীদ হন হিজরী ৬১ সনে।

হযরত হিশাম (রহ) শ্রেষ্ঠ সাহাবীদের মধ্যে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারকে (রা) দেখেছিলেন। তিনি বলেছেন, একবার আমার ভাই মুহাম্মাদ ও আমাকে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) নিকট পাঠানো হয়। তিনি আমাদেরকে কোলে বসিয়ে চুমু দিয়েছিলেন। সম্ভবতঃ এই সাক্ষাতে অথবা অন্য কোন সাক্ষাতে ইবন 'উমার (রা) তাঁর মাথার উপর হাত বুলিয়ে দু'আ করেছিলেন। তাছাড়া তিনি আনাস ইবন মালিক, জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ ও সাহল ইবন সা'দের (রা) দর্শনও লাভ করেন।

জ্ঞান ও মনীষা
হিশাম (রহ) যেমন একজন অতি উঁচু স্তরের তাবি'ঈর পুত্র, তেমনি একজন অতি উঁচু স্তরের মহান সাহাবীর পৌত্রও ছিলেন। এজন্য বলা চলে উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁর মধ্যে 'ইল্ম ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের সমাবেশ ঘটেছিল। তাঁকে তাঁর সময়ের 'আলিম তাবি'ঈদের মধ্যে গণ্য করা হতো। ইমাম নাওবী (রহ) লিখেছেন, তাঁর বিশ্বস্ততা, মহত্ত্ব ও ইমামত বা ইমাম হওয়ার ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য আছে।

হাদীছ
হাদীছের একজন বিশিষ্ট হাফিজ ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে নির্ভরযোগ্য, সুদৃঢ় ও বহু হাদীছের ধারক-বাহক বলেছেন। তিনি হুজ্জাত (প্রমাণ) ও ছিলেন।
ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে ইমাম, হাফিজ ও হুজ্জাত বলেছেন। শ্রেষ্ঠ হাদীছ বিশারদগণ তাঁর ব্যাপক জ্ঞানের কথা স্বীকার করেছেন। আবূ হাতিম আর-রাযী তাঁকে হাদীছের ইমাম বলতেন এবং উহায়ব, হাসান আল-বাসরী ও ইবন সীরীনের (রহ) সমমর্যাদা দান করতেন। 'উছমান আদ-দারিমী একবার ইবন মা'ঈন জিজ্ঞেস করেন : হিশাম আপনার বেশি প্রিয় না যুহরী? তিনি বলেন : তাঁরা দু'জনই আমার প্রিয়। তিনি কাউকে প্রাধান্য দেননি।

তাঁর শায়খ বা শিক্ষকগণ
সাহাবীদের মধ্যে তিনি কেবল স্বীয় চাচা হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। তাছাড়া তৎকালীন অন্য 'আলিমদের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উরওয়া, 'আবাদ ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আমর ইবন খুযায়মা, 'আওফ ইবন হারিছ ইবন তুফায়ল, আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান, ইবন মুনকাদির, ওয়াহাব ইবন কায়সান, সালিহ ইবন আবিস সালিহ আস-সাম্মান, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী বাকর, 'আবদুর রহমান ইবন সা'দ, মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম (রহ) প্রমুখের নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন ও তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেন।

তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজন হলেন : ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল- আনসারী, আইউব আস-সাখতিয়ানী, মালিক ইবন আনাস, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার, ইবন জুরায়জ, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, লায়ছ ইবন সা'দ, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-কাত্তান, ওয়াকী' ইবন আল-জাররাহ, আবান ইবন ইয়াযীদ আল-'আত্তার, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, ইউনুস ইবন বুকাইর (রহ) প্রমুখ।

তাঁর মুহতারাম পিতা হযরত 'উরওয়া (রহ) ছিলেন মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীর অন্যতম। পিতার এ শাস্ত্রের জ্ঞানের একটা বিরাট অংশ তিনি লাভ করেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে ফকীহ বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি যেমন ছিলেন অগাধ জ্ঞানের অধিকারী তেমনি ছিলেন 'আমল-আখলাকে উৎকর্ষমণ্ডিত। ইবন হিব্বান তাঁকে একজন বিদ্বান ও খোদাভীরু বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি অত্যন্ত অমায়িক ও ভদ্র মানুষ ছিলেন। মুখ থেকে কখনো কোন অহেতুক কথা বের হতো না। মুনযির ইবন 'আবদিল্লাহ বলেন, আমি হিশামের মুখ থেকে মাত্র একবার ছাড়া আর কখনো কোন খারাপ কথা শুনিনি। অত্যন্ত উদার ও দানশীল ছিলেন। দানশীলতা এত সীমা ছেড়ে যায় যে, এক লাখ দিরহাম ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

বাগদাদ সফর
বিরাট অংকের ঋণ পরিশোধের দুঃশ্চিন্তায় ছিলেন। তাই তিনি এর একটা উপায় বের করার জন্য বাগদাদে আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল-মানসূরের নিকট যান। তিনি হৃষ্টচিত্তে স্বাগতম জানান। আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি তাঁর ঋণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। খলীফা জানতে চান ঋণের পরিমাণ কত? বললেন: এক লাখ দিরহাম। মানসূর বললেন, আপনি এত বড় বিদ্বান, সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি হয়ে এত মোটা অংকের ঋণ গ্রহণ করেন কেন, যা পরিশোধ করা আপনার সাধ্যের বাইরে? তিনি বললেন আমার বংশের অনেক ছেলে যুবক হয়েছে। শঙ্কিত হলাম এই ভেবে যে, যদি তাদের বিয়ে না দেয়া হয় তাহলে খারাপ পথে চলে যেতে পারে। তাই আমি আল্লাহ ও আমীরুল মু'মিনীনের উপর ভরসা করে তাদের বিয়ে দিলাম এবং তাদের পক্ষ থেকে ওলীমাও করলাম। এসব ঋণ সেই কারণে। আবূ জা'ফার মানসূর বিস্ময়ের সুরে দু'বার উচ্চারণ করেন: এক লাখ! এক লাখ! তারপর তিনি হিশামকে দশ হাজার দিরহাম দানের নির্দেশ দেন। হিশাম বললেন: আমীরুল মু'মিনীন যা কিছু দিচ্ছেন তা কি সন্তুষ্টচিত্তে নাকি একান্ত বাধ্য হয়ে? আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলতেন: যে ব্যক্তি সন্তুষ্টচিত্তে যা কিছু দেয়, তাহলে তাতে দানকারী ও গ্রহণকারী উভয়ের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি হয়। আল-মানসূর বললেন সন্তুষ্টচিত্তে দিচ্ছি।

ওফাত
হিজরী ১৪৬ অথবা ১৪৭ সনে বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনাক্রমে সেই দিন 'আব্বাসীয় খলীফা আল-মানসূরের একজন অতি সম্মানিত ও খ্যাতিমান দাসের মৃত্যু হয়। এ কারণে দু'জনের জানাযা একই সাথে হয়। তবে মানূসর হিশামের মর্যাদার কারণে তাঁর জানাযার নামায প্রথমে পড়ান। তারপর সেই দাসের নামায পড়ান। হিশামের জানাযায় চার তাকবীর এবং দাসের জানাযায় পাঁচ তাকবীর উচ্চারণ করেন। তারপর বলেন, তাঁদের প্রত্যেকে তাকবীরের ব্যাপারে যে যে মত পোষণ করতেন সেই মত অনুযায়ী তাদের জানাযার নামায আদায় করেছি। খলীফা হারুন আর-রশীদের মা খায়যুবানের নামে প্রতিষ্ঠিত কবরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তবে ইমাম যাহাবী ৮০ বছরের কথা বলেছেন।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৯/২৬৬, ২৭০
২. খাতীব আল-বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ-১৪/৩৮
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৮
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৬
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩৮
৬. আত-তাবাকাত-৭/৬৭
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৪৪
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৮; তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৬
৯. প্রাগুক্ত
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৪৪
১১. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৯
১২. তারীখু বাগদাদ-১৪/৩৮
১৩. প্রাগুক্ত-১৪/৩৯
১৪. প্রাগুক্ত-১৪/৪১; আত-তাবাকাত-৭/২৯; তাবি'ঈন-৫০৭-৫০৯
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৭০

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আবূ বাকর ইবন ‘আবদির রহমান (রা)

📄 আবূ বাকর ইবন ‘আবদির রহমান (রা)


ডাকনাম আবূ বাকর- এ নামে তিনি এত প্রসিদ্ধি অর্জন করেন যে, আসল নামটি ঢেকে যায়। তাই অনেকে ধারণা করেছেন তাঁর আসল নাম আবূ বাকর। তবে তাঁর আসল নাম মুহাম্মাদ। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁর ডাকনামটি আসল নাম হওয়ার ব্যাপারে যে কথাটি আছে তাই সর্বাধিক সঠিক বলেছেন। তিনি কুরায়শ বংশের মাখযূমী শাখার সন্তান। তাঁর ঊর্ধ্বতন বংশধারা এ রকম: আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান ইবন আল-হারিছ ইবন হিশাম ইবন আল-মুগীরা আল-কুরাশী আল-মাখযুমী। তাঁর মায়ের নাম ফাস্তা। মাতৃকূলের ঊর্ধ্বতন বংশধারা নিম্নরূপ: ফাস্তা বিন্ত 'উতবা ইবন সুহায়ল ইবন 'আমর ইবন 'আবদি শাম্স। হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) খিলাফতের শেষ দিকে জন্মগ্রহণ করেন। উটের যুদ্ধের সময় বয়স কম হওয়ায় তালহা ও যুবায়রের (রা) বাহিনী থেকে তাঁকে ও 'উরওয়াকে বাদ দেয়া হয়।

জ্ঞান ও মনীষা
তিনি মদীনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। মদীনা ছিল তখন জ্ঞান চর্চা ও 'আলিম-'উলামার নগরী। তাঁর মধ্যে জ্ঞান অর্জনের প্রতি দারুণ উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল। এ কারণে অক্লান্ত পরিশ্রম ও ধৈর্যের সাথে জ্ঞান অর্জন করেন এবং মদীনার বিখ্যাত 'আলিমগণের মধ্যে পরিগণিত হন। ইবন সা'দ বলেন:
"তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য, ফকীহ্, বহু হাদীছের ধারক-বাহক 'আলিম, বুদ্ধিদীপ্ত, উঁচু মর্যাদার অধিকারী ও দানশীল মানুষ।" ইবন খিরাশ তাঁকে 'আলিমদের ইমাম বলে গণ্য করতেন।

হাদীছ
তিনি হাদীছের একজন বড় হাফিজ ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন:
“তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য, হুজ্জাত (প্রমাণ), ফকীহ, ইমাম, বহু হাদীছ বর্ণনাকারী ও দানশীল ব্যক্তি।”
একথা আল-ওয়াকিদীও বলেছেন। সাহাবীদের মধ্যে তাঁর পিতা 'আবদুর রহমান, আবৃ হুরায়রা, 'আম্মার ইবন ইয়াসির, আবু মাস'উদ আল-বাদরী, 'আবদুর রহমান ইবন মুতী', উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা সিদ্দীকা, 'উম্মু সালামা (রা) প্রমুখের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেন।

তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছের জ্ঞান লাভ করেছেন এবং তাঁর সূত্রে বর্ণনাও করেছেন তাঁদের মধ্যে তাঁর পুত্রগণ যথা: 'আবদুল মালিক, 'উমার, আবদুল্লাহ, সালাম; ভাতিজা আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ এবং অন্যদের মধ্যে ইমাম যুহরী, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয, হাকাম ইবন 'উতবা, 'আবদুল ওয়াহিদ ইবন আয়মান (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ফিক্হ
ফিক্হ বিষয়েও তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। তিনি মদীনার বিখ্যাত সাতজন ফকীহ্ মধ্যে ছিলেন। আবুয যানাদ বলতেন, মদীনার যে সকল ফকীহ্ ও 'আলিমের মতের ভিত্তিতে বিভিন্ন মাসয়ালার সমাধান দেয়া হতো তাঁরা ছিলেন ছয়জন। তাঁদের একজন আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান।

'ইবাদত-বন্দেগী
তাঁর মধ্যে তাকওয়া-পরহেযগারী এবং পার্থিব সুখ-ঐশ্বর্যের প্রতি একটা নির্লিপ্ত ভাব অত্যন্ত গভীরভাবে ছিল। মদীনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আবিদ ব্যক্তিগণের অন্যতম ছিলেন। দুনিয়া বিরাগী মনোভাব এবং অতিরিক্ত সালাতে নিমগ্ন থাকার কারণে মানুষ তাঁকে "রাহিবু কুরায়শ” (কুরায়শ বংশের সাধু ব্যক্তি) উপাধি দেয়। ইমাম যাহাবী বলেন:
"তিনি ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ, 'আবিদ ও আল্লাহওয়ালা মানুষ।” তিনি একাধারে কয়েক দিন সাওম পালন করতেন। তাঁর ভাই 'আমর ইবন 'আবদির রহমান বলেন, তিনি সাওমের পর সাওম অর্থাৎ ক্রমাগত পালন করতেন। মাঝে রোযা ভাংতেন না।

বিশ্বস্ততা বা আমনতদারী
আমানতদারী ছিল তাঁর চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ বিষয়ের প্রতি তিনি এত গুরুত্ব দিতেন যে, কেউ তাঁর নিকট কোন কিছু গচ্ছিত রাখলে এবং তাঁর কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেলে মালিক তা মাফ করে দিলেও তিনি ক্ষতিপূরণসহ পুরো আমানত ফেরত দিতেন। 'উছমান ইবন মুহাম্মাদ বলেন, হযরত 'উরওয়া (রহ) আবূ বাকরের নিকট কিছু সম্পদ আমানত রাখেন। সেই সম্পদের কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যায়। 'উরওয়া বলে পাঠলেন, এ ব্যাপারে তোমার কোন দায়িত্ব নেই, তুমি তো একজন আমানতদার মাত্র। আবূ বাকর জবাব দিলেন, আমি জানি যে, আমার উপর কোন ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব নেই। তবে এ আমার মনোপুতঃ নয় যে কুরায়শদের মধ্যে তোমার মুখ থেকে একথা বের হোক যে, আমার আমানত নষ্ট হয়ে গেছে। মোটকথা 'উরওয়ার কথা তিনি মানেননি এবং নিজের সম্পদ বিক্রি করে তাঁর আমানত প্রত্যার্পণ করেন।

তাঁর চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল দানশীলতা। অল্পতে তুষ্ট থাকতেন। ইবন সা'দ বলেন : ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণ হলে তুষ্ট হয়ে যেতেন।

বানু উমাইয়্যাদের নিকট তাঁর স্থান ও মর্যাদা
বানু উমাইয়্যা খলীফাগণ তাঁকে এত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন যে, তাঁর কারণে মদীনার অধিবাসীগণ উমাইয়্যাদের বাড়াবাড়ির হাত থেকে নিরাপদ হয়ে যায়। খলীফা 'আবদুল মালিক বিশেষভাবে তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তিনি বলতেন, বানু উমাইয়্যাদের সাথে মদীনাবাসীদের আচরণের কারণে তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার ইচ্ছা করি, কিন্তু যখন আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমানের কথা স্মরণ হয় তখন লজ্জিত হই এবং আমার ইচ্ছা ত্যাগ করি। 'আবদুল মালিক তাঁর উত্তরাধিকারী ওয়ালীদ ও সুলায়মানকেও আবূ বাকরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য অসীয়াত করে যান।

ওফাত
একদিন 'আসর নামায আদায়ের পর গোসলখানায় যান এবং সেখানে পড়ে যান। সাথে সাথে তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হয় : 'আল্লাহর কসম! আমি আজ দিনের শুরুতে কোন নতুন কথা বলিনি।' সেই দিন সূর্যাস্তের পূর্বে ইনতিকাল করেন। ইবন সা'দ বলেন: "তিনি হিজরী ৯৪ সনে, যেটাকে ফকীহদের বছর বলা হয়, মদীনায় মারা যান।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৩
২. প্রাগুক্ত
৩. আত-তাবাকাত-৬/১৫৩
৪. প্রাগুক্ত
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৯৫
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৩
৭. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-১২/৩০
৮. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি'ঈন-১/২৪; তাবি'ঈন-৫২৮
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/৩১
১০. আত-তাবাকাত-৬/১৫৩
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৪
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/৩১
১৩. আত-তাবাকাত-৬/১৫৪
১৪. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৪
১৫. আত-তাবাকাত-৬/১৫৪
১৬. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৪

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 গ্রন্থপঞ্জী

📄 গ্রন্থপঞ্জী


১. আল-কুরআনুল কারীম (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২. আল-ইমাম আয-যাহাবী
৩. (ক) সিয়ারু আ'লাম আল-নুবালা' (বৈরূত: আল-মুওয়াস্ সাসাতুর রিসালা, সংস্করণ-৭, ১৯৯০) (খ) তাযকিরাতুল হুফফাজ (বৈরূত: দারু ইয়াহইয়া আত-তুরাছ আল-ইসলামী) (গ) তারীখ আল-ইসলাম ওয়া তাবাকাত আল-মাশাহীর ওয়াল আ'লাম (কায়রো: মাকতাবা আল-কুদসী, ১৩৬৭ হি.)
৪. ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী, শাযারাত আয-যাহাব (বৈরূত: আল-মাকতাব আত-তিজারী)
৫. ইবনুল জাওযী, সিফাতুল সাফওয়া (হায়দ্রাবাদ: দারিয়াতুল মা'আরিফ, ১৩৫৭ হি.)
৬. ইবন সা'দ, আত-তাবাকাত আল-কুবরা (বৈরূত: দারু সাদির)
৭. ইবন 'আসাকির, আত-তারীখ অল-কাবীর, (শাম : মাতবা'আতুশ শাম, ১৩২৯ হি.)
৮. ইয়াকৃত আল-হামাবী, মু'জাম আল-বুলদান (বৈরূত: দারু ইয়াহইয়া আত-তুরাছ আল-'আরাবী)
৯. ইবন হাযাম, জামহারাতু আনসাব আল-'আরাব (মক্কা: দারু আল-মা'আরিফ, ১৯৬২)
১০. ইবন খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান (মিসর: মাকতাবা আন-নাহদা আল-মিসরিয়্যা, ১৯৪৮)
১১. আল-বালাযুরী: (ক) আনসাব আল-আশরাফ (মিসর: দার আল-মা'আরিফ) (খ) ফুতূহ আল-বুলদান (মিসর: মাতবা'আ আল-মাওসূ'আত, ১৯০১)
১২. আয-যিরিক্লী, আল-আ'লাম (বৈরূত: দারুল 'ইলম লিল মালাঈন, সংস্করণ-৪, ১৯৭৯)
১৩. ইবন হিশাম, আস-সীরাহ্ আন-নাবাবিয়্যা (বৈরূত)
১৪. ইবন সাল্লাম আল-জাহমী, তাবাকাত ফুহুল আশ-শু'আরা' (বৈরূত: দারুল কুতুব আল-'ইলমিয়্যা, ১৯৮০)
১৫. ইবন কুতায়বা, আশ-শি'রু ওয়াশ শু'আরাউ (বৈরূত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, সংস্করণ-১, ১৯৮১)
১৬. আল-জাহিজ: (ক) আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন (বৈরূত: দারুল ফিক্) (খ) কিতাব আল-হায়ওয়ান
১৭. ইবন কায়্যিম আল-জাওযিয়‍্যা, আত-তুরুক আল-হিকামিয়্যা ফী আস-সিয়াসা (কায়রো: দারুল হাদীছ, সংস্করণ-১, ২০০৩)
১৮. ইমাম আন-নাওয়াবী, তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত (বৈরূত: দারুল কুতুব আল-'ইলমিয়্যা)
১৯. ইবন হাজার, তাকরীব আত-তাহযীব (বৈরূত: দারুল মা'রিফা)
২০. ইবন 'আবদি রাব্বিহি আল-আন্দালুসী, আল-ইকদ আল-ফারীদ (কায়রো: মাতবা'আতু লুজনা আত-তা'লীফ ওয়াত তারজমা, সংস্করণ-৩, ১৯৬৯)
২১. আল-মাস'উদী, মুরূজ আয-যাহাব (বৈরূত: দারুল মা'রিফা)
২২. ইবনুল আহীর, আল-কামিল ফিত তারীখ (বৈরূত: দারু সাদির, ১৯৮৬)
২৩. ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (বৈরূত: মাকতাবাহ্ আল-মা'আরিফ; দারুল কুতুব আল-'ইলমিয়্যা, ১৯৮৩)
২৪. জামাল উদ্দীন ইউসুফ আল-মিযী, তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল (বৈরূত: দারুল ফিক্স, ১৯৯৪)
২৫. ড. 'আবদুর রহমান আল-বাশা, সাওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন (কায়রো: দারুল আদাব আল-ইসলামী)
২৬. মুহাম্মাদ আল-খাদারী বেক, তারীখ আল-উমাম আল-ইসলামিয়্যা (মিসর: আল-মাকতাবা আত- তিজারিয়‍্যা আল কুবরা, ১৯৬৯)
২৭. মু'ঈন উদ্দীন নাদবী, তাবি'ঈন (ভারত: মাতবা'আ মা'আরিফ, ১৯৬৫)
২৮. 'আবদুল মুন'ইম আল-হাশিমী, 'আসরুত তাবি'ঈন (বৈরূত: দারু ইবন কাছীর, সংস্করণ-৩, ২০০০)
২৯. ড. 'উমার ফাররূখ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী (বৈরূত: দারুল 'ইলম লিল মালাঈন, ১৯৮৫)
৩০. আন-নাওবাস্তী, আবূ মুহাম্মাদ আল-হাসান, কিতাবু ফিরাক আশ-শী'আ (ইস্তাম্বুল, ১৯৩১)
৩১. আল-বুখারী, আত-তারীখ আল-কাবীর (আল-াকতাবা আশ-শামিলা)
৩২. ড. জাওয়াদ 'আলী, আল-মুফাস্সাল ফী তারীখ আল-'আরাব কাবলাল ইসলাম (বৈরূত: দারুল 'ইলম লিল মালায়ান)
৩৩. ইবন নাদীম, আল-ফিরিস্ত (তাব'আ মিসর)
৩৪. ইবনুল কায়ি‍্যম আল-জাওযিয়‍্যা, ই'লাম আল-মুওয়াক্কি'ঈন, (কায়রো: দারুল হাদীছ, ২০০৪)
৩৫. আদ-দায়নাওয়ারী, আল-আখবার আত-তিওয়াল
৩৬. ইবন কাছীর, আস-সীরাহ্ আন-নাবাবিয়‍্যাহ্ (বৈরূত: দারুল কুতুব আল-'ইলমিয়্যা)
৩৭. ড. হাসান ইবরাহীম, তারীখ আল-ইসলাম (বৈরূত: দারুল আন্দালুস, সংস্করণ-৭, ১৯৬৪)
৩৮. শাহাস্তানী, কিতাব আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১৩১৭ হি.)
৩৯. ইবন হাজার: (ক) তাহযীব আত-তাহযীব (হায়দ্রাবাদ: দায়িরাতুল মা'আরিফ, ১৩২৫ হি.) (খ) মীযান আল-ই'তিদাল (হায়দ্রাবাদ: ১৩৩১ হি.)
৪০. খতীব আল-বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ (বৈরূত)
৪১. জুরজী যায়দান, তারীখ আত-তামাদ্দুন আল-ইসলামী, (বৈরূত : দারু মাকতাবাতিল হায়াত, ১৯৬৭)
৪২. ড. মাহমুদ, আল-হাসান, আরবূ মে তারীখ নিগারী কি নাশূ ও নামা (জার্নাল: ইসলাম আওর 'আসরে জাদীদ, খণ্ড-১, ১৯৬৯)
৪৩. আবূ নু'আইম আল-ইসফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া (বৈরূত: দার আল-কিতাব আল-'আরাবী, সংস্করণ-২, ১৯৬৭)
৪৪. আল-ওয়াকিদী, আল-মাগাযী (বৈরূত: 'আলাম আল-কুতুব)
৪৫. ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ, তাবি'ঈদের জীবনকথা (ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, সংস্করণ-১, খণ্ড-১, ২০০২)
৪৬. দায়িরা-ই মা'আরিফ-ই-ইসলামিয়া (লাহোর)
৪৭. ইসলামী বিশ্বকোষ (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮. ইবন কাছীর, মুখতাসার তাফসীরু ইবন কাছীর (বৈরূত: দারুল কুরআন আল-কারীম, ১৯৮১)
৪৯. ইবন মানজুর, লিসান আল-'আরাব (বৈরূত: দারু লিসান আল-'আরাব, ১৯৭০)

ফন্ট সাইজ
15px
17px