📄 ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব (রহ)
হযরত ইয়াযীদের (রহ) ডাকনাম আবূ রাজা'। কুরায়শ গোত্রের বানু 'আমির ইবন লুওয়াই শাখার দাস ছিলেন। ইবন লাহী'আ বলেন, তাঁর পিতা আবু হাবীব আসওয়াদ ছিলেন "নাওবী' সম্প্রদায়ের লোক। ইয়াযীদ বলতেন: ‘আমার পিতা ছিলেন "দামকালা"র অধিবাসী এবং আমি মিসরে বেড়ে উঠি। দামকালাবাসীরা 'আলাবী তথা শী'আ। আমি তাদেরকে 'উছমানিয়্যা বা 'উছমানের (রা) অনুসারীতে পরিবর্তন করি।’
একটি ভিন্ন মতে তাঁর পিতা ছিলেন বানু হিসল-এর এক মহিলার দাস এবং মাও ছিলেন দাসী। ইয়াযীদ হিজরী ৫৩ সনে জন্ম গ্রহণ করেন।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান ও মনীষায় তিনি তাবি'ঈ ইমামদের মধ্যে ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে "আল-ইমাম আল-কাবীর" বা শ্রেষ্ঠ ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন। মিশরে তাঁর মাধ্যমেই সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা শুরু হয়। আবূ সা'ঈদ ইবন ইউনুস বলেন:
"তিনি ছিলেন মিসরবাসীদের মুফতী। অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম মিসরে জ্ঞান, বিভিন্ন মাসয়ালা ও হালাল-হারাম চর্চার সূচনা করেন। তাঁর পূর্বে মিসরবাসীদের জ্ঞান চর্চা মূলতঃ উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রদান, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা বিষয়ে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।"
হাদীছ
তিনি মিসরের একজন বিশিষ্ট হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে একজন নির্ভরযোগ্য ও বহু হাদীছের বর্ণনাকারী বলেছেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) বলেন : "তিনি ছিলেন হাদীছের হুজ্জাত (প্রমাণ) ও হাফিজ।"
তিনি 'আবদুল্লাহ ইবন আল-হারিছ আয-যুবায়দী, আবুত তুফায়ল, আসলাম ইবন ইয়াযীদ, আবূ 'ইমরান, ইবরাহীম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন হুনায়ন, খায়র ইবন নু'আইম, হাদরামী, সুওয়াইদ ইবন কায়স, 'আবদুর রহমান ইবন শাম্মাসা মিহরী, 'আবদুল 'আযীয ইবন আরিস সা'বা, 'আতা' ইবন আবী রাবাহ, 'আররাক ইবন মালিক, ইমাম আয-যুহরী (রহ) এবং আরো বহু মনীষীর নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন এবং তাঁদের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেন। আর তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শোনেন তাঁদের মধ্যে সুলায়মান আত-তায়মী, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, যায়দ ইবন আবী উনায়সা, 'আমর ইবন আল-হারিছ, 'আবদুল হামিদ ইবন জা'ফার, ইবন লাহী'আ, লায়ছ ইবন সা'দ (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
ফিক্হ
ফিক্হ বিষয়েও তিনি ভীষণ পারদর্শী ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। খলীফা হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) মিসরে যে তিন ব্যক্তিকে ইফতার পদে নিয়োগ দেন, তাঁদের একজন হলেন এই ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব। বলা চলে তাঁরই চেষ্টায় সেখানে ফিক্হ চর্চার সূচনা হয়।
সমকালীন 'আলিমদের মূল্যায়ন
লায়ছ ইবন সা'দ বলতেন :"ইয়াযীদ আমাদের 'আলিম ও আমাদের নেতা।" তিনি আরো বলতেন, ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব ও 'আবদুল্লাহ ইবন আবী জা'ফার উভয়ে দেশের দু'টি রত্ন। জনৈক ব্যক্তি 'আমর ইবন আল-হারিছকে প্রশ্ন করে : ইয়াযীদ ও 'আবদুল্লাহ-এ দু'জনের মধ্যে উত্তম কে? জবাবে তিনি বলেন : যদি দু'জনকে দু'পাল্লায় বসানো হয় তাহলে কোন পাল্লাই ঝুঁকবে না।
সাবধানতা
হাদীছ বর্ণনায় সতর্ক তাবি'ঈদের মত তিনিও সতর্কতা অবলম্বন করতেন। যখন তাঁর নিকট প্রশ্নকারীদের সংখ্যা বেড়ে যায় তখন তিনি গৃহ অভ্যন্তরে নির্জনতা অবলম্বন করেন।
জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা
তাঁর মধ্যে জ্ঞানের প্রতি প্রবল সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল। এ কারণে কোন শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তির নিকট যাওয়া মোটেই পছন্দ করতেন না। কারো প্রয়োজন হলে তাঁকে নিজের কাছে ডেকে আনতেন। একবার যাব্বান ইবন 'আবদিল 'আযীয লোক মারফত তাঁকে বলে পাঠালেন যে, আপনি একটু আমার নিকট আসুন, আপনার নিকট কিছু বিষয় আমার জানার আছে। তিনি জবাবে বলে পাঠালেন, আপনিই আমার এখানে আসুন। আমার নিকট আসা আপনার জন্য শোভন হবে, পক্ষান্তরে আপনার নিকট আমার যাওয়া হবে আপনার জন্য অশোভন।
স্পষ্টবাদিতা
সত্য উচ্চারণে ছিলেন নির্ভীক। যত ক্ষমতাশালীই হোন না কেন কাউকে পরোয়া করতেন না। মুখের উপর তাদের দোষ-ত্রুটি বলে দিতেন। একবার তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যা নিলেন। মিসরের তৎকালীন আমীর আল-হাওছারা ইবন সুহায়ল সাক্ষাৎ করতে আসলেন। তিনি ইয়াযীদের নিকট জানতে চাইলেন: যে কাপড়ে মশার রক্ত লেগেছে, সেই কাপড়ে নামায আদায় হবে কি? প্রশ্ন শুনে তিনি আল-হাওছারার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাঁর সাথে কোন কথাই বললেন না। আল-হাওছারা উঠতে যাবেন তখন তিনি তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেন, প্রতিদিন মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছেন, আর আমার নিকট মশার রক্তের কথা জিজ্ঞেস করছেন?"
ওফাত
হিজরী ১২৮ সনে তিনি ইনতিকাল করেন, একথা ইবন সা'দ বলেছেন। ৭৫ বছরের অধিক জীবন লাভ করেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর রিজাল-২০/২৯৭
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৯
৩. তাহযীব আল-কামাল-২০/২৯৫
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/২৭৯
৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৯
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-২০/২৯৭
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩০
৮. তাহযীব আল-কামাল-২০/২৯৮
৯. প্রাগুক্ত-২০/২৯৫, ২৯৭; তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩১৮
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৯
১১. প্রাগুক্ত
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/২৭৯; তাহযীব আল-কামাল-২০/২৯৮; টীকা-১
১৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৯
১৪. প্রাগুক্ত
১৫. প্রাগুক্ত-১/১৩০
১৬. তাহযীব আল-কামাল-২০/২৯৭
📄 আবূ ওয়াইল শাকীক ইবন সালামা (রহ)
হযরত শাকীকের (রহ) ডাকনাম আবু ওয়াইল এবং এ নামেই তিনি বেশি প্রসিদ্ধ। পিতার নাম সালামা। তিনি আরবের আসাদ ইবন খুযায়মা গোত্রের সন্তান। ইবন হিব্বান তাঁকে কৃষ্ণায় বসবাসকারী, তথাকার একজন 'আবিদ এবং হিজরী ০১ সনে তাঁর জন্ম বলে উল্লেখ করেছেন।
রিসালাত যুগে
হযরত আবু ওয়াইল (রহ) হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবনকালের কিছু অংশ লাভ করেন। তবে খুবই অল্প বয়স্ক ছিলেন। 'উমার ইবন মারওয়ান বলেন, একবার আমি আবূ ওয়াইলকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সময়কাল পেয়েছিলেন? বললেন, হাঁ, তাঁকে দেখেছিলাম। তবে তখন আমি একজন অল্প বয়স্ক বালক। সঠিক বর্ণনা মতে তিনি একজন তাবি'ঈ ছিলেন। রাসূলে কারীমের (সা) দর্শন ও সাক্ষাতের সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি।
একটি বর্ণনায় এসেছে, আবূ ওয়াইল বলতেন, আমি জাহিলী যুগের দশ মতান্তরে সাত বছর পেয়েছি। রাসূল (সা) যখন নবুওয়াত লাভ করেন তখন আমি মরুদ্যানে আমার পরিবারের উট-ছাগল চরাতাম। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে অতি সম্মানিত মুখাদরাম ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য যে, যাঁরা জাহিলী ও ইসলামী যুগ লাভ করেছেন তাঁদেরকে বলা হয় 'মুখাদরাম'। তবে এ বর্ণনা তেমন নির্ভরযোগ্য বিবেচিত হয়নি।
ইসলাম গ্রহণ
একটি বর্ণনা মতে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ইসলাম গ্রহণ করেন। মুগীরা বলেন, আবু ওয়াইল বলতেন, আমাদের গোত্রে রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষ থেকে যাকাত-সাদাকা আদায়কারী আসেন। তিনি আমাদের থেকে পঞ্চাশটি উটের একটি উট নিলেন। আমার একটি ভেড়া ছিল। আমি সেটা তাঁর সামনে উপস্থিত করে বললাম, এর সাদাকা নিন। তিনি বললেন, এতে সাদাকা নেই।
হযরত আবু বাকরের খিলাফতকালে
হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফতকালে আরবের যে সকল গোত্র যাকাত আদায় করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল আবু ওয়াইলের গোত্রও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আবূ ওয়াইলও সেই দলে ছিলেন। সুলায়মান আল-আ'মাশ বলেন, শাকীক আমাকে বলতেন, আহা, যদি এমন হতো! তোমরা বুযাখার রণক্ষেত্রে আমাদেরকে খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং সেখান থেকে পালাতে দেখতে! সেদিন আমি উটের পিঠ থেকে ছিটকে পড়ি এবং আমার ঘাড় ভাংতে ভাংতে বেঁচে যায়। সেদিন যদি আমি মারা যেতাম তাহলে আমার জন্য জাহান্নাম নিশ্চিত ছিল। সে সময় আমি ছিলাম দশ বছরের বালক। উল্লেখ্য যে, বুযাখার এ যুদ্ধটি হয় হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফতকালে বানু আসাদ ও খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদের মধ্যে। এ যুদ্ধের পর তাঁর গোত্র যাকাত আদায় করে আত্মসমর্পণ করে।
হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে
খলীফা হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) খিলাফতকালে তিনি তাঁর পূর্ববর্তী ভুলের পূর্ণ কাফ্ফারা আদায় করেন। ইরাক অভিযানে তিনি একজন মুজাহিদ হিসেবে যোগ দেন। কাদেসিয়ার সেই বিখ্যাত যুদ্ধে তিনি অংশ গ্রহণ করেন। শাম অভিযানেও তাঁর অংশ গ্রহণের তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর নিজের একটি বর্ণনা এ রকম: আমি উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) সাথে শাম অভিযানে অংশ গ্রহণ করি। সম্ভবতঃ এ দ্বারা তিনি হযরত 'উমারের (রা) শাম সফরের সময় তাঁর সঙ্গে থাকার কথা বলতে চেয়েছেন।
ইসলাম ও মুসলমানদের বড় রকমের সেবার কারণে হযরত 'উমার (রা) তাঁকে যথেষ্ট সমাদর করতেন। তিনি বলেন, 'উমার (রা) নিজ হাতে আমাকে চারটি উপহার দান করেন এবং বলেন, একবার 'আল্লাহু আকবর' বলা দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তার থেকে উত্তম।
সিফ্ফীন যুদ্ধ
এ ছিল মুসলমানদের একটি রক্তক্ষয়ী গৃহ-যুদ্ধ। হযরত 'আলীর (রা) খিলাফতকালে আমীরুল মুমিনীন 'আলী (রা) ও হযরত মু'আবিয়ার (রা) মধ্যে সিফ্ফীনে এ যুদ্ধটি হয়। এ যুদ্ধে আবু ওয়াইল হযরত 'আলীর (রা) পক্ষে যোগ দেন; কিন্তু পরে এ জন্য ভীষণ অনুতপ্ত হন। আ'মাশ বলেন, জনৈক ব্যক্তি আবূ ওয়াইলকে জিজ্ঞেস করে, আপনি সিফ্ফীন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন? জবাব দেন, হাঁ, অংশ গ্রহণ করেছিলাম। 'আসিম ইবন বাহ্দালা বলেন, শাকীক বলতেন, 'আলীর চেয়ে 'উছমান আমার বেশি প্রিয়।
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ও আবূ ওয়াইল
উমাইয়্যা শাসনামলে আবূ ওয়াইল ছিলেন অতি সম্মান ও প্রতিপত্তির অধিকারী মানুষ। হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ছিলেন তাঁর ভীষণ গুণমুগ্ধ ব্যক্তি। তিনি আবূ ওয়াইলের সামনে কয়েকটি বড় বড় পদ উপস্থাপন করে তা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। এ বিষয়ে তিনি নিজেই বলেন, হাজ্জাজ যখন কুফা আসেন তখন আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন: আপনার নাম কি? বললাম: নাম আপনার জানাই আছে, নইলে আমাকে ডেকে পাঠালেন কিভাবে? জিজ্ঞেস করলেন: এ শহরে এসেছেন কবে? বললাম: সেই সময় যখন এই শহরের সকল অধিবাসী এসেছে। জিজ্ঞেস করলেন: আপনার কতটুকু কুরআন মুখস্থ আছে? বললাম: এতটুকু যে, যদি আমি তা অনুসরণ করি তাহলে তা যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। উপরোক্ত প্রশ্নগুলো করার পর বললেন, আপনাকে এ জন্য ডেকেছি যে, আমি আপনাকে একটি পদ দিতে চাই। জানতে চাইলাম: কোন ধরনের পদ। বললেন: সিলসিলা অর্থাৎ বেড়ী পরিয়ে শাস্তি দানের পদ। বললামঃ এ পদ তো সেই সকল লোকদের জন্য উপযুক্ত যারা অত্যন্ত দায়িত্ব ও দক্ষতার সাথে এ কাজ করতে পারবে। যদি আপনি আমার সাহায্য নিতে চান তাহলে সেটা হবে একজন নির্বোধ ব্যক্তির কাছ থেকে সাহায্য নেয়া। এ কারণে, যদি আপনি আমাকে এ পদ গ্রহণ থেকে রেহাই দেন তাহলে তা আমার জন্য উত্তম হবে। আপনি চাপাচাপি করলে এই বিপজ্জনক পদটি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত আছি। তবে একথাও বলতে চাই যে, যখন আমি আপনার কর্মচারী নই তখন রাতের বেলা আপনার কথা স্মরণ করতে করতে ঘুম এসে যায়। তাহলে যখন আপনার কর্মচারী হবো তখন আমার অবস্থা কেমন হবে? মানুষ আপনার ভয়ে এত ভীত যে, অতীতের কোন আমীরের ভয়ে ততটা হয়নি। আমার এ বক্তব্য তাঁর পছন্দ হয় এবং তিনি বলেন, এর কারণ হলো, কোন ব্যক্তি রক্তপাতের ব্যাপারে আমার মত এত দুঃসাহসী নয়। আমি এতসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেছি যার ধারে কাছে যেতেও মানুষ ভয় পায়। আমার এমন কঠোরতার কারণে আমার সকল সঙ্কট সহজ হয়ে গেছে। আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন! আপনি এখন যান।
যদি অন্য কোন উপযুক্ত মানুষ পেয়ে যাই তাহলে আপনাকে কষ্ট দেব না। অন্যথায় আপনাকেই এ দায়িত্ব নিতে হবে। এভাবে মুক্তি পাওয়ার পর আবু ওয়াইল ফিরে আসেন এবং আর কখনো হাজ্জাজের ধারে কাছে যাননি। উমাইয়্যা যুগের শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাঁর মোটেই সুধারণা ছিল না। একবার তিনি তাঁর ছাত্র আল-আ'মাশকে বলেন: 'সুলায়মান! আমাদের এ সময়ের আমীর-উমারাদের দু'টি বৈশিষ্ট্যের একটিও নেই। তাদের না আছে ইসলামী যুগের মানুষের তাকওয়া, আর না আছে জাহিলী যুগের মানুষের বুদ্ধিমত্তা।'
তাহসীলদারের পদ
কিছু বর্ণনার মাধ্যমে জানা যায় যে, তিনি উমাইয়্যা যুগে সাদাকা-যাকাতের তাহসীলদার পদে কাজ করেছেন। মুহাজির আবুল হাসান বলেন, একবার আমি আবূ বুরদা ও শাকীকের নিকট যাকাতের অর্থ নিয়ে যাই। তাঁরা তখন বায়তুল মালে কাজ করতেন। তাঁরা আমার সে অর্থ বায়তুল মালে ঢুকিয়ে নেন। এই বর্ণনার একজন রাবী সা'ঈদ বলেন, আমি দ্বিতীয়বার যাকাতের অর্থ নিয়ে গেলে শুধু আবূ ওয়াইলকে পাই। তিনি বলেন, এ অর্থ ফিরিয়ে নিয়ে যাও এবং নির্ধারিত খাতসমূহে তা ব্যয় কর। বললাম مُؤلَّفَة القلوب (অন্তরসমূহকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্টকরণ)-এর অংশটির কি হবে? বললেনঃ সেটি অন্যদেরকে দিয়ে দাও।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞানের জগতে হযরত আবূ ওয়াইল (রহ) কৃফার একজন বিশিষ্ট 'আলিম ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে কৃফার শায়খ ও 'আলিম বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর বিশ্বস্ততা, নির্ভরযোগ্যতা এবং মহত্ত্বের ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য আছে। ইবন সা'দ বলেছেন : ‘তিনি ছিলেন অতিবিশ্বস্ত বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী।'
কুরআন
তিনি কুরআনের হাফিজ ছিলেন। এত তীক্ষ্ণ মেধাবী ছিলেন যে, মাত্র দু'মাসে কুরআনের শিক্ষা শেষ করেন। তবে কুরআনের তাফসীর বর্ণনার ক্ষেত্রে দারুণ সতর্ক ছিলেন।
হাদীছ
ইলমে হাদীছের ক্ষেত্রে ইবন সা'দ তাঁকে দৃঢ়পদ, বিশ্বস্ত ও বহু হাদীছের ধারক-বাহক বলেছেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে হযরত আবূ বাকর, 'উমার, 'উছমান, 'আলী, মু'আবিয়া ইবন জাবাল, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ, হুযায়ফা ইবন আল-ইয়ামান, খাব্বাব ইবন আরাত, কা'ব ইবন 'আজরা, আবূ মাস'উদ আল-আনসারী, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, আবূ হুরায়রা, 'আয়িশা, উম্মু সালামা (রা) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। বিশেষতঃ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) হাদীছসমূহ তাঁর স্মৃতিতে বেশি সংরক্ষিত ছিল। কৃষ্ণায় ইবন মাস'উদের হাদীছের তাঁর চেয়ে বড় কোন হাফিজ ছিলেন না। একবার আবূ 'উবায়দাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কৃফায় ইবন মাস'উদের হাদীছের সবচেয়ে বড় 'আলিম কে? তিনি জবাব দেন: আবূ ওয়াইল।
ছাত্রবৃন্দ
অনেক বড় বড় তাবি'ঈ তাঁর ছাত্র হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। যেমন: শা'বী, 'আসিম, আ'মাশ এবং সাধারণ মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মানসূর, যুবায়দ-আল ইয়ামামী, হাবীব ইবন আবী ছাবিত, 'আসিম ইবন বাহদালা, 'আবদুহু ইবন লুবাবা, 'আমর ইবন মুররা, জামি' ইবন রাশিদ, আল-হাকাম ইবন 'উতবা, হাম্মাদ ইবন আবী সুলায়মান, যুবায়র ইবন 'আদী, সা'ঈদ ইবন মাসরূক আছ-ছাওরী, 'আতা' ইবন আস-সায়িব, মুসলিম আল-বাতীন, মুহাজির আবুল হাসান (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
'আলিমদের মধ্যে আবু ওয়াইলের স্থান
সেই যুগের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ তাঁকে শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে গণ্য করতেন। আ'মাশ বলেন, ইবরাহীম আমাকে উপদেশ দেন যে, তুমি শাকীকের (আবূ ওয়াইল) নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন কর। 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সাথী ও ছাত্ররা সকলে তাঁকে তাঁদের দলের সেরা বলে গণ্য করতেন।
আল্লাহর ভয়
তাঁর অন্তরে আল্লাহর ভয় এত প্রবল ছিল যে, যখন তাঁর সামনে কোন উপদেশ দেয়া হতো অথবা ভীতিমূলক আলোচনা হতো তখন তার দু'চোখ থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হতো। তিনি বসরার 'আবিদ তাবিঈদের মধ্যে পরিগণিত ছিলেন। 'ইবাদত-বন্দেগী ছিল তাঁর একান্ত কাজ। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি দৃঢ়পদ বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। কৃষ্ণায় স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলেন এবং সেখানকার তাপস ও দুনিয়া বিরাগী মানুষের একজন ছিলেন। তাঁর 'ইবাদত-বন্দেগীর বিশেষ সময় ছিল রাতের অন্ধকার। সিজদায় গিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে অত্যন্ত বিনীতভাবে দু'আ করতেনঃ হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দিন, আমাকে মাফ করে দিন। যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করেন তাহলে ধারাবাহিক পাপসমূহকেও ক্ষমা করে দিবেন। আর যদি শান্তি দেন, তাহলে শান্তি দানের ক্ষেত্রে আপনি জালিম হবেন না।
জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ এবং দুনিয়ার সাথে সম্পর্কহীনতা
দুনিয়ার সাথে নামকা ওয়াস্তে একটা সম্পর্ক ছিল। থাকার জন্য মামুলি ধরনের একটা খড়ের ঝুপড়ি ঘর ছিল, সেখানে তিনি জিহাদের সঙ্গী ঘোড়াটিসহ থাকতেন। যখন জিহাদে বের হতেন তখন ঝুপড়ি ঘরটি উঠিয়ে ফেলতেন। ফিরে এসে আবার বানিয়ে নিতেন।
হালাল উপার্জন
হালাল উপার্জনের ব্যাপারে দারুণ সতর্ক ছিলেন। বিনাশ্রমে অঢেল সম্পদ প্রাপ্তির বিপরীতে হালাল উপায়ে অর্জিত একটি দিরহামকে বেশি পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, ব্যবসার এক দিরহাম আমার বেতনের দশ দিরহাম থেকে বেশি প্রিয়।
তাঁর সত্তাটি ছিল শুভ ও কল্যাণের নিমিত্ত
তাঁর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের কারণে মানুষ তাঁঁকে রহমত ও বরকতের (দয়া- অনুগ্রহ) উপলক্ষ্য মনে করতো। ইবরাহীম বলতেন, প্রত্যেক স্থানে এমন এক সত্তা অবশ্যই বিদ্যমান থাকেন যার কল্যাণে সেই জনপদ বিভিন্ন ধরনের আপদ-বিপদ থেকে নিরাপদ থাকে। আমার বিশ্বাস, শাকীকও সেই সকল লোকের মধ্যে অন্যতম। সাহাবায়ে কিরামও তাঁর নৈতিক উৎকর্ষের কথা স্বীকার করতেন। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের উপর তাঁর নৈতিক প্রভাব এতখানি ছিল যে, তাঁকে দেখা মাত্র বলতেন, এ হলো তায়িব (তাওবাকারী)।
ওফাত
হিজরী ৮২ সনে ইনতিকাল করেন। আল-ওয়াকিদীর বর্ণনা মতে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) খিলাফতকালে তাঁর ইনতিকাল হয়। কিন্তু এ বর্ণনা সঠিক মনে হয় না। কারণ, সে হিসাবে তাঁর বয়স অনেক বেড়ে যায়।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬০
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/৩১৮
৩. আত-তাবাকাত-৬/৬৪
৪. তাহযীব আল-কামাল-৮/৩৮৭
৫. প্রাগুক্ত-৮/৩৮৮
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬০
৭. প্রাগুক্ত
৮. তাহযীব আল-কামাল-৮/৩৮৮
৯. প্রাগুক্ত
১০. আত-তাবাকাত-৬/৬৫
১১. প্রাগুক্ত-৬/৬৪
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬০; তাহযীব আল-কামাল-৮/৩৮৯
১৪. আত-তাবাকাত-৬/৬৬
১৫. তাহযীব আল-কামাল-৮/৩৮৯
১৬. আত-তাবাকাত-৬/৬৫
১৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬০
১৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪৭
১৯. তাহযীব আল-কামাল-৮/৩৮৯; আত-তাবাকাত-৬/৬৫
২০. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬০
২১. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/৩৬১; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬০; তাহযীব আল-কামাল-৮/৩৮৭
২২. তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪৭
২৩. তাহযীব আল-কামাল-৮/৩৮৮
২৪. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৪/৩৬২
২৫. আত-তাবাকাত-৬/৬৭
২৬. প্রাগুক্ত
২৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/৩৬৩
২৮. আত-তাবাকাত-৬/৬৭
২৯. প্রাগুক্ত-৬/৬৮
৩০. প্রাগুক্ত
৩১. তাহযীব আত-তাহযীব-১/২৪৭
৩২. আত-তাবাকাত-৬/৬৮
৩৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬০; তাহযীব আল-কামাল-৮/৩৮৮
📄 জা‘ফর ইবন মুহাম্মাদ আস-সাদিক (রহ)
তাঁর পূর্ণ নাম আবূ আবদিল্লাহ জা'ফার, আস-সাদিক তাঁর উপাধি। ইতিহাসে তিনি ইমাম জা'ফার আস-সাদিক নামে প্রসিদ্ধ। তাঁর পিতা ইমাম মুহাম্মাদ আল-বাকির (রহ), যিনি শী'য়াদের ইমামিয়া সম্প্রদায়ের ৫ম ইমাম। তাঁর বংশ তালিকা এমন: জা'ফার ইবন মুহাম্মাদ ইবন 'আলী ইবন হুসায়ন ইবন 'আলী ইবন আবী তালিব (রা)। তাঁর মা ফারওয়া ছিলেন হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) প্রপৌত্র কাসিম ইবন মুহাম্মাদের কন্যা। তাঁর মাতৃকুলের বংশ তালিকা এমন : ফারওয়া বিন্ত কাসিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবদির রহমান ইবন আবূ বাকর (রা)। এভাবে হযরত জা'ফার আস-সাদিক-এর শিরা-উপ-শিরায় সিদ্দীকী রক্ত বহমান হয়। হিজরী ৮০ (আশি) সনে তিনি মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেন।
জ্ঞান ও মনীষা
তিনি 'ইল্ম ও 'আমলের এমন এক খান্দানের বংশধর যাদের অতি নগণ্য একজন খাদিমও জ্ঞানের উচ্চ আসন অলঙ্কৃত করেছেন। তাঁর মহান পিতা ইমাম মুহাম্মাদ আল- বাকির (রহ) এমন উঁচু পর্যায়ের আলিম ছিলেন যে, ইমাম আ'জাম আবু হানীফার (রহ) মত উম্মাতের শ্রেষ্ঠ সন্তান তাঁর ছাত্র ছিলেন। এ কারণে জা'ফার আস-সাদিক উত্তরাধিকার সূত্রে জ্ঞান লাভ করেন। জ্ঞান ও মনীষার দিক দিয়ে তিনি তাঁর সময়ের একজন ইমাম ছিলেন। ইমাম যাহাবী তাঁকে ইমাম ও শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা বলে উল্লেখ করেছেন। আহলি বায়তের (নবী-বংশ) মধ্যে জ্ঞানে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। ইবন হিব্বান বলেন, ফিক্হ শাস্ত্র, অন্যান্য জ্ঞান এবং কৃতিত্ব ও মর্যাদায় তিনি আহলি বায়তের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। ইমাম নাওবী লিখেছেন, তাঁর ইমামতি, জালালত ও সিয়াদাত তথা অগ্রগামিতা, মহত্ত্ব ও নেতৃত্বের ব্যাপারে সকলে একমত।
হাদীছ
হাদীছ তো হলো তাঁরই এক ঊর্ধ্বতন মহান পুরুষেরই কথা, কাজ ও সমর্থন। সুতরাং তাঁর চেয়ে আর কে এর অধিক হকদার হতে পারে? সুতরাং তিনি বিখ্যাত হাফিজে হাদীছের একজন ছিলেন। ইবন সা'দ লিখেছেন "তিনি ছিলেন বহু হাদীছের ধারক-বাহক। হাফিজ যাহাবী তাঁকে অন্যতম নেতা ও শীর্ষস্থানীয় হাফিজ বলে উল্লেখ করেছেন। হাদীছের জ্ঞান তিনি লাভ করেন তাঁর মহান পিতা হযরত ইমাম বাকির, মুহাম্মাদ ইবন মুনকাদির, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', যুহরী (রহ) ও আরো অনেকের নিকট থেকে। তাঁর খ্যাতিমান ছাত্র শিষ্যদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন : শু'বা, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, ইবন জুরায়জ, আবূ 'আসিম, ইমাম মালিক, ইমাম আবূ হানীফা, ইয়াহইয়া আল-কাত্তাল, হাতিম-ইবন ইসমা'ঈল (রহ) সহ আরো অনেক ইমাম। তিনি তাঁর ছাত্রদের বলতেন, তোমরা আমার নিকট জিজ্ঞেস কর। কারণ, আমার পরে তোমাদেরকে আর কেউ আমার মত হাদীছ শোনাতে পারবে না।
হাদীছের প্রতি সম্মান
হযরত রাসূলে কারীমের (সা) হাদীছের প্রতি এত শ্রদ্ধা ও ভক্তি ছিল যে, সর্বদা পাক- পবিত্র অবস্থায় হাদীছ বয়ান করতেন। ফিক্হ শাস্ত্রে এতখানি দক্ষতা অর্জন করেন যে, সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহ ও ইমামুল আয়িম্মা হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহ) বলতেন, আমি জা'ফার ইবন মুহাম্মাদের চেয়ে বড় ফকীহ আর দেখিনি। তিনি 'আলিমগণকে অত্যধিক সমীহ ও সম্মান করতেন। বলতেন, 'আলিমগণ হচ্ছেন নবীগণের আমানতদার, যতক্ষণ তাঁরা শাসকবর্গের তোষামোদকারী না হয়।
তাঁর কিছু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বাণী
তাঁর মূল্যবান কথা ও বাণীসমূহ নীতি-নৈতিকতার ভিত্তি; জ্ঞান, মনন, চিন্তা এবং উপদেশ-অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার স্বরূপ। সুফইয়ান আছ-ছাওরীকে (রহ) একবার তিনি বলেন : সুফইয়ান! আল্লাহ যখন তোমাকে কোন কিছু দান করেন এবং যদি তুমি তা সর্বদা বহাল রাখতে চাও তাহলে বেশি বেশি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে। কারণ, আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন তাঁর কিতাবে বলেছেন:
"যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তাহলে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই আরো বেশি করে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।” যখন আল্লাহর কোন অনুগ্রহ অথবা কল্যাণ লাভ করবে তখন বেশি করে আল্লাহর নিকট ইসতিগফার করবে। মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন:
"অতঃপর আমি বলেছি, 'তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো মহা ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন। তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।"
যখন তোমাদের নিকট শাসক অথবা কারো কোন আদেশ পৌঁছে তখন বেশি করে لا حول ولا قوة الا بالله - পাঠ করবে। তিনিই প্রশস্ততার চাবিকাঠি। যে ব্যক্তি নিজের ভাগ্যের অংশটুকুর উপর তুষ্ট থাকে সেই ঐশ্বর্যবান। আর যে অন্যের অর্থ সম্পদের দিকে তাকিয়ে থাকে সেই বিত্তহীন। যে ব্যক্তি আল্লাহর বণ্টনে খুশী হয় না, প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহর ফয়সালার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে। যে ব্যক্তি অন্যের গোপন কথা ফাঁস করে দেয়, আল্লাহ তার ঘরের গোপন অবস্থা প্রকাশ করে দেন। যে বিদ্রোহের জন্য তরবারি কোষমুক্ত করে সে তাতেই নিহত হয়। যে নিজের ভাইয়ের জন্য গর্ত খোঁড়ে সে তাতেই পতিত হয়। যে নির্বোধদের সঙ্গে উঠাবসা করে সে হেয় ও তুচ্ছ হয়ে যায়। যে জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশা করে সে সম্মানিত হয়। যে খারাপ স্থানে যায় তার দুর্নাম হয়ে যায়। সর্বদা সত্যকথা বল, তা তোমার পক্ষে হোক বা বিপক্ষে। মানুষের মূল বস্তু হলো তাঁর বুদ্ধি, আর দীন হল তার আভিজাত্য। তার মহানুভবতা হল তার তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি)। আদমের সাথে সম্পর্কের দিক দিয়ে সব মানুষ সমান। শান্তি ও নিরাপত্তা খুব দুর্লভ জিনিস, এমনকি তা তালাশ করার স্থানও গোপনীয়। যদি কোথাও পাওয়া যায় তাহলে সম্ভবতঃ তা নাম-নিশানাশূন্য বিজনতার এক কোণে পাওয়া যাবে। যদি তুমি সেখানে তালাশ কর এবং না পাও, তাহলে একাকীত্বের মধ্যে পাবে। এ দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। যদি একাকী নির্জনবাসের মধ্যে না পাও তা পাবে সালফে সালেহীন তথা পূর্ববর্তী সত্যনিষ্ঠ মানুষদের কথার মধ্যে।
ইসতিগফার
তিনি বলতেন, তুমি কোন পাপ করে বসলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মাগফিরাত কামনা করবে। মানুষের সৃষ্টির পূর্বেই তার ঘাড়ে ভুলের বেড়ী লেগে গেছে। পাপের উপর জেদ ধরা হলো ধ্বংস হওয়া। তিনি বলতেন, আল্লাহ দুনিয়ার প্রতি প্রত্যাদেশ (وَحْي ) পাঠিয়েছেন, যে ব্যক্তি আমার সেবা করবে তুমি তার সেবা কর, আর যে তোমার সেবা করবে, তুমি তাকে অক্ষম করে দেবে।
ভালো কাজের শর্তাবলী
তিনি বলতেন, তিনটি জিনিস ছাড়া কোন ভালো কাজ পূর্ণতা লাভ করে না। যখন তুমি কোন কাজ করবে তখন সে কাজকে নগণ্য মনে করবে, গোপনে করবে ও তাড়াতাড়ি করবে। যখন তুমি তা নগণ্য মনে করবে তখন তার মর্যাদা বেড়ে যাবে। তুমি তা গোপন রাখলে তা পূর্ণতা পাবে। আর তা তাড়াতাড়ি করলে তুমি মাধুর্য অনুভব করবে।
সুধারণা
তিনি বলতেন, যখন তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে তোমার ব্যাপারে কোন অপ্রিয় কথা প্রকাশ পায় তখন তার যথার্থতার জন্য এক থেকে সত্তরটি ব্যাখ্যা তালাশ কর। যদি তাতেও যথার্থতা না পাও, তাহলে ধরে নেবে অবশ্যই কোন কারণ এবং কোন ব্যাখ্যা আছে যা তোমার জানা নেই। যদি তুমি কোন মুসলিমের মুখ থেকে কোন কথা শোন তাহলে তা থেকে ভালো থেকে আরো ভালো অর্থ বের করার চেষ্টা করবে। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে নিজেকে তিরস্কার করবে।
শিষ্টাচার ও নৈতিকতা
তিনি বলতেন, চারটি জিনিসে কোন ভদ্রজনের লজ্জা করা উচিত নয়। ১. পিতার সম্মানে নিজ আসন থেকে উঠা, ২. অতিথির সেবা, ৩. নিজের গৃহে একশো চাকর-বাকর থাকলেও নিজে অতিথির বাহন পশুর দেখা-শুনা করা, ৪. নিজ শিক্ষকের সেবা করা।
একটি সূক্ষ্ম কথা
যখন দুনিয়া কারো অনুকূলে যায় তখন অন্যের ভালো কিছুও তাকে দিয়ে দেয়, আর যখন মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন তারই ভালো কিছু ছিনিয়ে নেয়।
নৈতিক উৎকর্ষতা
তাঁর ব্যক্তি সত্তাটি ছিল নৈতিক উৎকর্ষতার বাস্তব প্রতীক। তাঁকে এক নজর দেখাই তাঁর খান্দানী শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্যদানের জন্য যথেষ্ট ছিল। আমর ইবন আল-মিকদাম বলেন, যখন আমি জা'ফার ইবন মুহাম্মাদকে দেখতাম তখন তাঁর প্রতি দৃষ্টি পড়ামাত্র আমি জেনে যেতাম যে, তিনি নবী-খান্দানেরই মানুষ।
'ইবাদত-বন্দেগী
ইবাদত ছিল তাঁর রাত-দিনের বৃত্তি। তাঁর কোন দিন এবং কোন সময় 'ইবাদত থেকে শূন্য ছিল না। ইমাম মালিক বলেন, আমি একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাঁর নিকট আসা- যাওয়া করতাম। সব সময় আমি তাঁকে পেয়েছি হয় নামাযে না হয় রোযা রাখা অবস্থায় অথবা কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে।
আল্লাহর রাস্তায় অর্থ ব্যয়
আল্লাহর রাস্তায় অর্থব্যয়, দানশীলতা এবং অন্যের দোষ উপেক্ষা করা- এ তিনটি বিশেষগুণ আহলি বায়তের সকল সদস্যের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তবে জা'ফার আস-সাদিক-এর সত্তা ছিল এই গুণগুলোর পরিপূর্ণ নমুনা। হায়্যাজ ইবন বুসতাম বলেন, জা'ফার আস-সাদিক (রহ) অনেক সময় বাড়ির সব খাবার অন্যদেরকে খাইয়ে দিতেন এবং নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকতো না।
পোশাক-পরিচ্ছদ
প্রকাশ্যে তিনি দুনিয়াদার লোকদের পোশাকে থাকতেন। কিন্তু অভ্যন্তরে থাকতো দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ মানুষের পোশাক। সুফইয়ান ছাওরী (রহ) বলেন, আমি একবার জা'ফার ইবন মুহাম্মাদের নিকট গেলাম। তখন তাঁর গায়ে ছিল খুযের জুব্বা এবং দাখানী খুযের চাদর। আমি বললাম, আপনার মহান পূর্ব-পুরুষের পোশাক তো এ ছিল না। বললেন, তাঁরা ছিলেন দরিদ্র ও অভাবের সময়ের মানুষ। আর এ যুগে সম্পদের প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে। এ কথা বলে তিনি তাঁর দেহের উপরের কাপড় উঠিয়ে দেখান। তখন দেখা গেল খুযের জুব্বার নীচে রয়েছে পশমী মোটা জোব্বা। বললেন, ছাওরী, এটা আমরা পরেছি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, আর ওটা তোমাদের জন্য। যা আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরেছি তা নীচে গোপন রেখেছি। আর তোমাদের জন্য যা পরেছি তা উপরে রেখেছি।
দীনী বিষয়ে মতপার্থক্য করা থেকে দূরে থাকার উপদেশ
দীনী বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য ও বিবাদ করা মোটেই পছন্দ করতেন না। বলতেন, তোমরা দীনী বিষয়ে বিতণ্ডা করবে না। কারণ, তা অন্তরকে ব্যস্ত রাখে এবং তার মধ্যে নিফাক বা কপটতা সৃষ্টি করে।
তিনি অত্যন্ত সাহসী, নির্ভিক ও নিঃশঙ্কচিত্তের মানুষ ছিলেন। স্বৈরাচারী শাসকদের সামনেও দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছেন, কোন রকম ভয়-ভীতি তাঁর মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারেনি। একবার প্রতাপশালী 'আব্বাসীয় খলীফা মানসূরের গায়ে একটি মাছি এসে বসে। তিনি তাড়িয়ে দেন, কিন্তু আবার এসে বসে। এভাবে তিনি বার বার তাড়াচ্ছেন, আর মাছিটিও বার বার উড়ে এসে বসছে। এর মধ্যে জা'ফার ইবন মুহাম্মাদ (রহ) এসে হাজির হলেন। মানসূর তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, আবূ 'আবদিল্লাহ! মাছি কি জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি জবাব দিলেন, স্বৈরাচারীদেরকে অপমান করার জন্য।
হযরত আবু বাকর (রা) সম্পর্কে বিশ্বাস
যদিও সকল সত্যপন্থী আহলি বায়ত চার খলীফার প্রতি সমান সুধারণা পোষণ করতেন, তবে যেহেতু জা'ফার আস-সাদিকের (রহ) শিরা-উপশিরায় হযরত আবূ বাকরের (রা) রক্ত প্রবাহিত ছিল, এ কারণে তাঁর সাথে তিনি এক বিশেষ সম্পর্ক আছে বলে বিশ্বাস করতেন। তিনি নিজের ঊর্ধ্বতন পুরুষ 'আলীর (রা) মত তাঁর উপরও নিজের অধিকার আছে বলে মনে করতেন। তিনি বলতেন, আমার 'আলীর (রা) নিকট থেকে যে পরিমাণ শাফা'আতের আশা আছে, ঠিক ততটুকু আবূ বাকরের (রা) থেকেও আছে।” হিজরী ১৪৮ সনে তাঁর ওফাত হয়।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৬৬
২. প্রাগুক্ত
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-২/১০৪
৪. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৫০
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-২/১০৪
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৬৬
৭. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-২/১০৩
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-২/১০৫
৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৬৬
১০. সূরা ইবরাহীম-৭
১১. সূরা নূহ-১০-১২
১২. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৫০
১৩. তাহযীব আত-তাহযীব-২/১০৪
১৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৬৬
১৫. 'খুয' হলো পশম ও রেশম সূতোর তৈরি কাপড়
১৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৬৭
১৭. প্রাগুক্ত
১৮. সাফওয়াতুল সাফওয়া-১৩১
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-২/১০৪
২০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৬৭
📄 মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি‘ আল-আয্দী (রহ)
মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি' আল-আযদী (রহ) একজন মহান তাবি'ঈ। ডাকনাম আবূ বাকর, মতান্তরে আবূ 'আবদিল্লাহ। তিনি ছিলেন হযরত রাসূলে কারীমের (সা) মহান খাদিম ও সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক আল-আনসারীর (রা) ছাত্র। এ কারণে তিনি "যায়নুল ফুকাহা” (ফকীহদের শোভা) উপাধি লাভ করেন। তবে তিনি "আবিদুল বাসরা" বা বসরার তাপস উপাধিতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
বসরায় তাঁর জন্ম এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। মদীনায় জ্ঞান অর্জন করেন। বিশেষতঃ ফিক্হ বিষয়ে পারদর্শিতা লাভ করেন। জ্ঞানের জগতে সুউচ্চ আসনের অধিকারী হন। মালিক ইবন দীনার (রহ) তাঁর সম্পর্কে বলেন:
'কারী বা আল-কুরআনের পাঠক তিন প্রকার : দয়াময় (আল্লাহর) কারী, দীনার- দিরহামের কারী এবং রাজা-বাদশাদের কারী। ওহে তোমরা শুনে রাখ, আমার জানা মতে মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি' আল-আযদী হলেন দয়াময় আল্লাহর কারী।'
যুহদ ও তাকওয়া
তিনি একজন অতি সম্মানীত 'আলিম ও একজন উঁচু পর্যায়ের উপদেশ দানকারী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর মজলিস সব সময় আল্লাহ ভীতি (তাকওয়া) ও সত্যের আলোচনায় মুখর থাকতো। এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ মজলিসে একদিন তিনি তাঁর এক ছাত্রকে বলেন: 'বান্দা যখন সর্বান্তকরণে আল্লাহর দিকে এগিয়ে যায় তখন আল্লাহ মু'মিনদের অন্তকরণসহ তার দিকে এগিয়ে যান।'
একদিন বসরার মসজিদে ছাত্রদের দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় তিনি বসে আছেন, এমন সময় একজন ছাত্র উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে বললো : আবূ 'আবদিল্লাহ, আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করুন! আমাকে কিছু উপদেশ দিন। বললেন: আমি তোমাকে উপদেশ দিই, তুমি দুনিয়া ও আখিরাতের বাদশাহ হও।
বিস্ময়ের সাথে ছাত্র বললো: আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন। এটা আমার জন্য কেমন করে সম্ভব? বললেন: দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব পরিহার কর, তাহলে মানুষের কর্তৃত্বে যা কিছু আছে তার প্রতি অভাববোধ না করে এখানে বাদশাহ হতে পারবে। আর আখিরাতেও আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম প্রতিদান লাভের মাধ্যমে বাদশাহ হতে পারবে।
ছাত্র বললো : আবূ আবদিল্লাহ! আমি আপনাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসবো। তিনি বললেন : যে উদ্দেশ্যে তুমি আমাকে ভালোবাসছো, আল্লাহ তোমার সে উদ্দেশ্য পূরণ করুন। তারপর বহু দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অস্ফুট স্বরে বললেন:
'হে আল্লাহ! তোমার সন্তুষ্টির জন্য মানুষ আমাকে ভালোবাসুক, আর তুমি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট থাক- এ থেকে আমি তোমার পানাহ্ চাই।'
একদিন এক ছাত্র ভরা মজলিসে উঠে দাঁড়ালো এবং তাঁর নীতি-নৈতিকতা ও আল্লাহ-ভীতি সম্পর্কে কয়েকটি প্রশংসামূলক বাক্য উচ্চারণ করলো। তিনি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে এমনটি আর কখনো না করার কথা সাফ জানিয়ে দিয়ে বললেন:
'ওরে বেটা, পাপের যদি ছড়িয়ে পড়ার মত কোন দুর্গন্ধ থাকতো, তাহলে তোমাদের কেউই আমার কাছে আসতে পারত না।' তিনি আরো বলেন: 'বেটা, আল-কুরআন হলো মু'মিনের উদ্যানস্বরূপ। এর যেখানেই সে অবতরণ করবে, তৃণভূমি পাবে।'
একবার তিনি তাঁর এক অতি স্থূলকায় ছাত্রের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সে নামাযে দাঁড়িয়ে; কিন্তু এমন শব্দ করছে যেন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাকে লক্ষ্য করে বললেন : বেটা, যার আহার কমে গেছে সে নিজে বুঝেছে ও অপরকে বুঝাতে পেরেছে। তার অন্ত:করণ পরিশুদ্ধ ও কোমল হয়েছে। আর বেশি আহার মানুষের অনেক ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে কঠিন করে দেয়।
একদিন এক ব্যক্তি একটু দেরীতে মজলিস ভেঙ্গে যাওয়ার পর এসে সালাম করে জিজ্ঞেস করলো : আবূ আবদিল্লাহ, কেমন আছেন? তিনি জবাব দিলেন: আমি আমার মৃত্যুর কাছাকাছি, আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকে বহু দূরে এবং কর্মের খুব খারাপ অবস্থায় আছি। সেই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা যে প্রতিদিন আখিরাতের দিকে একটি পর্যায় অতিক্রম করে?
তিনি ছিলেন তাঁর ছাত্র-শিষ্য, সঙ্গী-সাথী ও ভক্ত-অনুসারীদের জন্য একটি উত্তম আদর্শ। তাঁর জনৈক সঙ্গী তাঁর সম্পর্কে বলেন : একবার আমি মক্কা থেকে বসরা পর্যন্ত মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি'র সফর সঙ্গী ছিলম। তিনি সারা রাত নামায পড়তেন। বাহনের পিঠে মাথা ঝুঁকিয়ে ইশারায় বসে বসে রুকু-সিজদা করতেন। পিছনে বসা চালককে উচ্চস্বরে উট চালাতে বলতেন। মাঝে মাঝে নামাযের মধ্যে তাঁর রাত কেটে যেত। প্রত্যুষে একজন একজন করে সঙ্গীদের জাগাতেন। তাদের কাছে গিয়ে বলতেন: আস-সালাত, আস- সালাত : নামায! নামায! তারা সবাই জেগে গেলে বলতেন: নিকটেই পানি আছে, তোমরা ওযু করে নাও। যদি পানি বেশি দূরে হয় এবং সঙ্গে থাকা পানি যদি অল্প হয় তাহলে পাক মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নাও। সঙ্গের পানিটুকু পান করার জন্য রেখে দাও।
বসরার ওয়ালী বিলাল ইবন আবূ বুরদা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখেন, তিনি মোটা পশমী কাপড়ের জুব্বা পরে আছেন। বিলাল তাঁকে বললেন: আবূ 'আবদিল্লাহ! আপনি এমন মোটা খসখসে কাপড় পরেন কেন? তিনি কোন উত্তর দিলেন না। বিলাল বললেন: আবূ 'আবদিল্লাহ! আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না কেন?
এবার তিনি বললেন: আমি এটাকে যুহদ তথা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি নির্লিপ্ততা বলতে চাই না। কারণ, তাতে নিজেকে পবিত্র মনে করা হবে। আবার অভাব ও দারিদ্র্যও বলতে চাই না। কারণ, তাতে আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে। আমি এ দু'টোর কোনটাই বলতে চাই না।
বিলাল বললেন: আপনার কোন কিছুর প্রয়োজন আছে কি যা আমি পূরণ করতে পারি? মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি' বললেন: মানুষের নিকট চাইতে হবে আমার নিজের তো এমন কোন প্রয়োজন নেই। তবে একজন মুসলিম ব্যক্তির একটি প্রয়োজনের কথা আপনাকে বলছি। বিলাল বললেন: বলুন, ইনশাআল্লাহ আমি পূরণ করবো।
সব শেষে বিলাল বললেন: আবূ 'আবদিল্লাহ! তাকদীর বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি? জবাবে তিনি বললেন: ওহে আমীর! আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন কিয়ামাতের দিন তাঁর বান্দাদেরকে তাকদীর বিষয়ে জিজ্ঞেস করবেন না। তিনি জানতে চাইবেন তাদের অবস্থা ও আমল সম্পর্কে।
এমন জবাব শুনে ওয়ালী চুপ হয়ে যান এবং ভীষণ লজ্জিত হন। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে নীরবে মজলিস ত্যাগ করেন।
মালিক ইবন দীনার বলতেন: আমি মুহাম্মাদ ইবন সীরীনকে জান্নাতে দেখেছি এবং মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি'কেও জান্নাতে দেখেছি। আল-হারিছ ইবন ওয়াজীহ্ একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: হাসান আল-বাসরী কোথায়? বললেন: হাসান সিদরাতুল মুনতাহা'র নিকটে আছেন।
মনীষা ও জ্ঞান
মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি' (রহ) মাত্র ১৫ (পনেরো) টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি একজন বিশ্বস্ত, সৎ ও তাপস ব্যক্তি ছিলেন। অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীছ বিশারদ দারুকুতনী বলেন:
'মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি যিনি দুর্বল রাবীদের দ্বারা পরীক্ষিত বা বিভ্রান্ত হয়েছেন।'
তাঁর সমকালীন আরেকজন মনীষী দামরা ইবন শাওযাব বলেন: মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' প্রকাশ্য ইবাদতে খুব বেশি নিমগ্ন থাকতেন না। ফাতওয়ার দায়িত্বও অন্যরা পালন করতেন। কিন্তু যখন প্রশ্ন করা হতো বসরার সর্বোত্তম ব্যক্তিটি কে? বলা হতো: মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' আল-আযদী। আমি তাঁর চেয়ে বেশি বিনয়ী লোক কখনো কাউকে দেখিনি। বসরার অধিবাসী অপর এক ব্যক্তি বলেন: আমি যখন আমার অন্তরে কিছুটা কঠোরতার ভাব উপলব্ধি করতাম তখন মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি'র নিকট গিয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ মালিক ইবন দীনার ছিলেন মুহাম্মাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহচর। একদিন মুহাম্মাদ তাঁর বাড়িতে অবস্থানকালে বসরার আমীর মালিকের নিকট কিছু অর্থ পাঠালেন এবং তিনি তা গ্রহণ করলেন। শায়খুল বসরা মুহাম্মাদ তাঁকে বললেন: আপনি তাঁদের অনুদান গ্রহণ করলেন? মালিক বললেন: দু'দিন অপেক্ষা করুন এবং আমার সহচরদের নিকট জিজ্ঞেস করুন। তাঁর কথা মত তিনি তাঁর বন্ধুদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা বললেন: মালিক ইবন দীনার সেই অর্থ দিয়ে কিছু দাস ক্রয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাদের মুক্ত করে দেন। এ কথা শোনার পর মুহাম্মাদ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলেন। অত:পর তিনি যখন মালিকের সাথে মিলিত হলেন তখন মালিক বললেন: আবূ 'আবদিল্লাহ, আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জানতে চাচ্ছি, আপনি কি আমার প্রতি সন্তুষ্ট আছেন? মুহাম্মাদ বললেন: আল্লাহর কসম! না। মালিক বললেন: আমি ভুল করে চলেছি। মুহাম্মাদ ইবন্ আল-ওয়াসি'র মত লোকেরাই আল্লাহর ইবাদত করে থাকে। মালিক তাঁর দিকে তাকিয়ে আরো বলেন: আমি অবশ্য এমন মানুষকে ঈর্ষা করি যার মধ্যে দীনদারী আছে এবং দুনিয়ার কোন কিছু নেই; অথচ তিনি সন্তুষ্ট।
তাঁর ছেলে 'আবদুল্লাহ। একবার জনৈক ব্যক্তির সাথে তার একটু ঝগড়া হয়। লোকটি ছেলের বিরুদ্ধে পিতার নিকট নালিশ করে। তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে ছেলেকে লক্ষ্য করে বলেন: তুমি মানুষের সাথে বাড়াবাড়ি কর, অথচ আমি তোমার পিতা? আল্লাহ যেন মুসলিম সমাজে তোমার মত মানুষের সংখ্যা না বাড়ান।
তিনি সত্য উচ্চারণে তিরস্কার ও অপমান-লাঞ্ছনাকে মোটেও পরোয়া করতেন না। বসরার শাসনকর্তা মালিক ইবন আল-মুনযির মুহাম্মাদকে বসরার কাজী নিয়োগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তিনি এই নিয়োগ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন এই বলে: এই বিচারের সাথে আমার সম্পর্ক কি? মালিক দূত পাঠালেন এই নিয়োগ গ্রহণে তাঁকে রাজী করানোর জন্য। তিনিও একই কথা বলে তাকে ফিরিয়ে দিলেন। মালিক যে ব্যক্তিকে পাঠালেন সে তাঁকে বললো: হয় আপনি কাজীর আসনে বসবেন নয়তো আমি আপনাকে তিন শো চাবুক মারবো। জবাবে তিনি দূতকে বললেন: তুমি মালিককে বল, যদি তিনি এমনটি করেন তাহলে তিনি হবেন একজন অত্যাচারী শাসক। আর দুনিয়ার লাঞ্ছনা আখিরাতের লাঞ্ছনার চেয়ে ভালো।
সে যুগে বসরার নিয়ম ছিল, মানুষ কোন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ঘিরে বসতো এবং তিনি তাদেরকে দীন, ফিক্হ ও মাগাযী তথা রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা শোনাতেন। একবার এমন একটি মজলিসে তিনিও বসা ছিলেন। তিনি উপদেশ দানকারী বক্তাকে বলতে শুনলেন: আমার উপদেশ শুনে কারো অন্তর নরম হচ্ছে না, চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে না এবং গায়ের চামড়া ভয়ে কাঁপছে না- আমি এমন দেখছি কেন? তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন: ওহে, আমার মনে হয় আপনার জন্যই মানুষের এমন অবস্থা হয়েছে। কারণ, উপদেশাবলী যখন অন্তর থেকে বের হয় তখন তা অন্তরের উপরেই পড়ে।
এরকম ঘটনা অন্য একজন আমীরের সাথে তাঁর ঘটে। সেই আমীরের নাম বিলাল ইবন আবী বুরদা। তিনি একবার মুহাম্মাদকে তাঁর গৃহে খাবারের দাওয়াত দিলেন। মুহাম্মাদ সে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলেন। আমীর ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। মুহাম্মাদকে লক্ষ্য করে বললেন: আমি সব সময় দেখি, আপনি আমাদের খাবার ঘৃণা করছেন। মুহাম্মাদ বললেন: মহামান্য আমীর! আপনি এমন কথা বলবেন না। আল্লাহর কসম! আপনাদের মধ্যে যারা ভালো মানুষ তারা আমার সন্তানদের চাইতেও আমার বেশি প্রিয়।
তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা
পারস্যে তখন মুসলিম বাহিনীর সাথে যে যুদ্ধ চলছিল মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' তাতে অংশ গ্রহণের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বিশেষত: জুরজান ও তাবারিস্তানের যুদ্ধে। এ বাহিনীর কমাণ্ডার ছিলেন ইয়াযীদ ইবন আল-মুহাল্লাব ইবন আবী সুফরা। তিনি তখন খুরাসানের ওয়ালী।
মুসলিম বাহিনী দাহিস্তান নামক একটি অঞ্চলে প্রবেশ করলো। যেখানে তুর্কী সম্প্রদায়ের লোকেরা বসবাস করতো। তারা ছিল দারুণ শক্তিশালী, দুঃসাহসী এবং দুর্ভেদ্য দুর্গসমূহের অধিকারী। তাদের এ অবস্থা দেখে মুসলিম বাহিনী অনেকটা ভীত হয়ে পড়লো। তারা মনে করলো তাদেরকে পরাভূত করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার।
মুসলিম বাহিনীর এমন সংকটজনক পরিস্থিতিতে মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' এমনি দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেন যা মুসলিম মুজাহিদদের ভগ্ন মনোবলকে আবারো চাঙ্গা ও সতেজ করে তোলে। তিনি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে আহ্বান জানান : ওহে আল্লাহর অশ্বারোহীগণ! তোমরা নিজ নিজ অশ্বের পিঠে আরোহণ কর!
এ আহ্বানের সাথে সাথে মুসলিম মুজাহিদগণ সমুদ্রের তরঙ্গের গতিতে এমনভাবে ধাবিত হতে থাকে যে, তাদের সামনে দাঁড়াতে কেউ দুঃসাহস করেনি। তাদের হুঙ্কার ও আস্ফালন দেখে প্রতিপক্ষ বাহিনী ভীত-কম্পিত হয়ে পড়ে।
বসরার 'আবিদ-মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি' কেবল সৈনিকদের মনোবল চাঙ্গা করেই ক্ষান্ত হলেন না, বরং তরবারি কোষমুক্ত করে সজোরে এদিক ওদিক চালাতে থাকেন। এর মধ্যে শত্রুবাহিনীর মধ্য থেকে বিশাল দেহের অধিকারী শক্তিমান ও ক্ষিপ্রগতি সম্পন্ন একজন যোদ্ধা বেরিয়ে আসে এবং মুসলিম বুহ্যের মধ্যে ঢুকে যত্রতত্র আঘাত হানতে থাকে। তার প্রচণ্ড আক্রমণে মুসলিম বাহিনীর যোদ্ধারা পিছু হটতে থাকে। তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হয়। সে ঔদ্ধত্যের সাথে মুসলিম যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানায়: কে আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে? কে আমার সাথে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লিপ্ত হবে?
মুসলিম বাহিনীর মধ্য থেকে বসরার এই 'আবিদ চিৎকার করে বলে উঠলেন : আমিই এই বলদর্পী, অহংকারীর আহ্বানে সাড়া দিতে ইচ্ছুক?
মুসলিম বাহিনীর মধ্যে শোরগোল পড়ে গেল, তারা সমস্বরে বলে উঠলো, না তিনি একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ, তাঁকে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় পাঠানো যাবে না। সবার অনুরোধে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। তবে এক তরুণ মুসলিম সৈনিকের তরবারির খাপ স্পর্শ করে তার সাফল্যের জন্য দু'আ করলেন। এই মহান তাবি'ঈর দু'আর বরকতে সৈনিকটি দুঃসাহসী হয়ে ওঠেন এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সামনে এগিয়ে যান। তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের মাথায় তরবারির এমন আঘাত হানেন যে, তা দু'খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। শত্রু-সৈনিকও তাঁর মাথা তাক করে আঘাত হানে, কিন্তু তাঁর লোহার বর্ম তা ঠেকিয়ে দেয়। বর্মটি দু'খণ্ড হয়ে গেলেও মাথা স্পর্শ করেনি। তিনি যখন ফিরে আসলেন তখন তাঁর তরবারি থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ছিল।
এ দৃশ্য দেখে মুসলিম বাহিনী তাকবীর ধ্বনি দিয়ে দিক-দিগন্ত মুখরিত করে তোলে। তাঁরা এই মহান 'আবিদ-তাবি'ঈকে শ্রদ্ধাভরে তাকিয়ে দেখতে থাকে এবং তাঁর হাতে চুমু খাওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অতঃপর মুসলিম বাহিনী একযোগে আক্রমণ চালিয়ে শত্রুবাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। তারা সন্ধি করে এবং জিযিয়া দানে সম্মত হয়। মুসলিম বাহিনী এ যুদ্ধে অগণিত ধন-সম্পদ গণিমত হিসেবে লাভ করে। তার মধ্যে ছিল লক্ষ লক্ষ দিরহাম, অসংখ্য রূপোর পানপাত্র এবং বিশুদ্ধ স্বর্ণের বহু মুকুট। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন ইয়াযীদ ইবন আল মুহাল্লাব। তিনি সবচেয়ে বড় মুকুটটি হাতে নিয়ে সৈনিকদের উদ্দেশ্যে বললেন: আমার ধারণা, আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, এটা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নয়। সবাই বললো: হাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন।
ইয়াযীদ বললেন: আজ আমি তোমাদেরকে দেখাবো, মুহাম্মাদ (সা)-এর উম্মাতের মধ্যে এখনো এমন ব্যক্তিও আছেন যিনি এটা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নন। তারপর তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি'কে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। বহু খোঁজাখুজির পর তাঁকে হাজির করা হলো। ইয়াযীদ সোনার মুকুটটি হাতে নিয়ে বললেন: ওহে আবূ 'আবদিল্লাহ, মুসলিম সৈনিকরা এই মুকুটটির দাবী ত্যাগ করেছে। এটি আমি আপনাকে দিলাম। মুহাম্মাদ সাথে সাথে বলে উঠলেন : মাননীয় আমীর! আমার এর প্রয়োজন নেই। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। ইয়াযীদ আল্লাহর কসম দিয়ে মুকুটটি গ্রহণের জন্য তাঁকে পীড়াপীড়িলি করলেন। অবশেষে তিনি হাত বাড়িয়ে মুকুটটি নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলেন। সৈনিকরা একটু বিদ্রূপের সুরে বললেন, এই কি ঈছার তথা আত্মত্যাগের নমুনা? তিনি তো মুকুটটি নিয়ে চলে গেলেন।
অধিনায়ক ইয়াযীদ একজন তরুণকে নির্দেশ দিলেন গোপনে তাঁকে অনুসরণ করে মুকুটটি তিনি কি করেন তা দেখার জন্য। ছেলেটি তাঁকে অনুসরণ করে পিছে পিছে গেল। বসরার এই 'আবিদ কিংকর্তব্য বিমূঢ় অবস্থায় পথ চলছেন। ভাবছেন, এই মুকুটটি তিনি কী করবেন? এমন সময় দেখা পেলেন ছেঁড়া-ময়লা পোশাক পরা উসকো-কুসকো চুল ও ধূলি-মলিন চেহারার একজন লোকের। লোকটি তাঁকে বললো: আল্লাহর মাল থেকে আমাকে কিছু দান করুন! তিনি তাঁকে সোনার মুকুটটি দান করলেন। তারপর এমন উৎফুল্ল অবস্থায় দ্রুত চলতে লাগলেন, যেন কোন মারাত্মক বিপদ থেকে মুক্ত হয়েছেন। অনুসরণকারী সৈনিকটি ধূলি-মলিন লোকটিকে মুকুটসহ ধরে সেনা-কমাণ্ডার ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের নিকট নিয়ে গেল। তিনি তাঁর বাহিনীর সদস্যদের সমবেত করে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন: আমি কি তোমাদের বলেছিলাম না যে, এই উম্মাতের মধ্যে এখনো এমন একজন মানুষ আছেন যিনি এই সোনার মুকুট তুচ্ছ মনে করেন? মুকুটের প্রতি তাঁর কোন লোভ নেই?
যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয় হলো। বসরার এই 'আবিদ তাঁর উপর অর্পিত সকল দায়িত্ব শেষ করে হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কার পথে রওয়ানা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনা-কমাণ্ডারের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন : আপনি আপনার খুশীমত যা ইচ্ছা করতে পারেন। বায়তুল্লাহ পর্যন্ত ভ্রমণের জন্য আমি আপনাকে কিছু নগদ অর্থ দিচ্ছে। বসরার 'আবিদ বললেন: সমপরিমাণ অর্থ কি বাহিনীর সকল সৈনিককে দিচ্ছেন? কমাণ্ডার ইয়াযীদ বললেন: না, সকলকে দিচ্ছি না। বসরার 'আবিদ বললেন : যে অর্থ দ্বারা আমাকে অন্যদের থেকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হচ্ছে এমন অর্থের আমার প্রয়োজন নেই। তারপর তিনি 'আস-সালামু 'আলাইকা, ইয়া-আমীরুল জায়শ' (সালাম, ওহে সেনা অধিনায়ক) বলে যাত্রা শুরু করেন।
ইয়াযীদের চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠলো। তিনি মুখে হাসি ফুটিয়ে জোরে বলে উঠলেন: ওয়া 'আলাইকাস সালাম! ওহে 'আবদুল্লাহ, কা'বার চত্বরে বসে আমাদের জন্য দু'আ করবেন।
দুনিয়ার সকল সুখ-সম্পদের প্রতি তিনি সম্পূর্ণ নির্মোহ স্বভাবের ছিলেন। ভোগ-বিলাসিতা তাঁকে মোটেও আকর্ষণ করতে পারেনি। তাই আল্লাহর পথে জিহাদের দায়িত্ব পালন শেষে আল্লাহর আরেকটি ইবাদত সম্পাদনের উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর দিকে যাত্রার সিদ্ধান্ত নেন। সম্ভবত এটা তাঁর ৪র্থ অথবা ৫ম বারের হজ্জ ছিল।
ওফাত
হিজরী ১২৩ সনে তিনি অন্তিম রোগ শয্যায় আশ্রয় নেন। ভক্ত-অনুরাগীদের উপর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভর করে। দর্শনার্থীদের ভীড়ে বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। তিনি তাঁর জীবনের সর্বশেষ যে দু'আটি করেন তা নিম্নরূপ:
“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট মাগফিরাত কামনা করছি, এমন প্রতিটি খারাপ দাঁড়ানোর জায়গা থেকে যেখানে আমি দাঁড়িয়েছি, এমন প্রতিটি খারাপ বসার স্থান থেকে যেখানে আমি বসেছি, এমন প্রতিটি খারাপ প্রবেশ পথ থেকে যে পথে আমি প্রবেশ করেছি, এমন প্রতিটি বের হওয়ার খারাপ পথ থেকে যে পথে আমি বের হয়েছি, এমন প্রতিটি খারাপ কাজ থেকে যা আমি করেছি এবং এমন প্রতিটি খারাপ কথা থেকে যা আমি বলেছি। হে আল্লাহ! আমি এর সবকিছু থেকে তোমার মাগফিরাত কামনা করছি, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমি সবকিছু থেকে তাওবা করছি, তুমি আমার তাওবা কবুল কর!"
তারপর তিনি পাশে বসা তাঁর এক বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললেন:
"আল্লাহর নামে কসম দিয়ে বলছি, তুমি আমাকে বল আগামী কাল যখন আমাকে আমার মাথার সামনের দিকের চুল ও পায়ের গোঁড়ালী ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন উপস্থিত এসকল লোক কি আমার কোন কাজে আসবে?" তারপর তিনি নিম্নের আয়াতটি অনুচ্চ কণ্ঠে পাঠ করতে করতে অনন্তের পথে যাত্রা করেন:
"অপরাধীদের পরিচয় পাওয়া যাবে তাদের লক্ষণ হতে, তাদেরকে পাকড়াও করা হবে মাথার ঝুঁটি ও পা ধরে।"
জা'ফার ইবন সুলায়মান বলেন, এই হিজরী ১২৩ সনে ছাবিত, মালিক ইবন দীনার ও মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি' মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি যে সকল মনীষীর নিকট থেকে হাদীছ শোনেন এবং যাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেন তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবন মালিক (রা) অন্যতম। তাছাড়া খ্যাতিমান তাবি'ঈদের মধ্যে হাসান আল-বাসরী, যাকওয়ান আবী সালিহ আস-সাম্মান, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার, সা'ঈদ ইবন জুবায়র, সুলায়মান আল-আ'মাশ, তাউস ইবন কায়সান, 'আবদুল্লাহ ইবন আস-সামিত, 'আতা' ইবন আবী রাবাহ, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, মুহাম্মাদ ইবন আল মুনকাদির, মুতাররিফ ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখখীর, মু'আবিয়া ইবন কুররা আল-মুযানী, আবূ বুরদা ইবন আবী মূসা আল-আশ'আরী, আবু সালিহ আল হানাফী, আবু নাদরা আল-'আবদী (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
তাঁর সুযোগ্য ছাত্রদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো: আযহার ইবন সি'নান আল-কুরাশী, ইসমা'ঈল ইবন মুসলিম আল- 'আবদী, হাসান ইবন দীনার, হাম্মাদ ইবন যায়দ, 'উছমান ইবন 'আমর (রহ) ও আরো অনেকে।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৩০১
২. আবূ নু'আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৩৪৫; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৩০২
৩. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৫৪
৪. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৬/১২০
৫. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৫৪
৬. প্রাগুক্ত-৩৫৫
৭. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৩৪৬
৮. 'আসরুত তাবি'ঈন-২/৩৪৬, ৩৫৫
৯. প্রাগুক্ত-৩৫৬
১০. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৩০৩
১১. প্রাগুক্ত-১৭/৩০২; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৫৬
১২. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৩০২
১৩. প্রাগুক্ত; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৫৬
১৪. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৬/১২০
১৫. প্রাগুক্ত
১৬. প্রাগুক্ত-৬/১২২; তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৪২
১৭. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৬/১২২
১৮. প্রাগুক্ত; সুওয়ারুন মিনহায়াত আত-তাবি'ঈন-২৪৯
১৯. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৬০-৩৬১; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-২৩১-২৩৮
২০. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৬/১২৩
২১. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৬১
২২. প্রাগুক্ত-৩৬১
২৩. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৬২
২৪. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৩০৩
২৫. প্রাগুক্ত-১৭/৩০১-৩০২