📄 আবুল ‘আলিয়া রিয়াহী (রহ)
হযরত আবুল 'আলিয়ার (রহ) আসল নাম রাফী' এবং ডাকনাম আবুল 'আলিয়া। এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। পিতার নাম মাহরান। আবুল 'আলিয়া বানু রিয়াহ ইবন ইয়ারবূ' গোত্রের এক মহিলার দাস ছিলেন। এ কারণে তাদের সাথে সম্পৃক্ত করে তাঁকে রিয়াহী বলা হয়। বানু রিয়াহ হলো বানু তামীমের একটি শাখা গোত্র। আসলে পারস্যে তাঁর জন্ম। মুসলিম মুজাহিদদের হাতে বন্দী হয়ে বসরায় আসেন এবং দাসত্বের শৃঙ্খলে জড়িয়ে পড়েন।
ইসলাম গ্রহণ
তিনি জাহিলী ও ইসলামী উভয় যুগ লাভ করেন, তাই তিনি একজন 'মুখাদরাম' মানুষ। তবে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ইসলাম গ্রহণের গৌরব থেকে বঞ্চিত থেকে যান। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের দু'বছর পর ইসলাম গ্রহণ করেন। আবূ খালদা বলেন, একবার আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি রাসূলকে (সা) দেখেছেন? বললেন: আমি তাঁর ওফাতের দু'বছরের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছি।
দাসত্ব থেকে মুক্তি
বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ইসলাম গ্রহণের পর বেশ কিছুকাল দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। অতঃপর তাঁর মনিবা তাঁকে মুক্ত করে দেয়। দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভের ঘটনাটি তিনি নিজে বর্ণনা করেছেন এভাবে: আমি এক মহিলার দাস ছিলম। তিনি যখন আমাকে মুক্তি দানের সিদ্ধান্ত নিলেন তখন তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা তাঁকে এই বলে বিরত রাখার চেষ্টা করে যে, যদি তুমি তাকে মুক্তি দাও তাহলে সে কৃফায় গিয়ে যোগাযোগ ছিন্ন করে দেবে। কিন্তু তিনি মুক্তি দানের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, এ কারণে এক জুম'আর দিন আমার কাছে আসেন এবং আমার কাছে জিজ্ঞেস করে জামি' মসজিদের দিকে চলা শুরু করেন। আমিও তাঁর সাথে চললাম। মসজিদে পৌঁছার পর ইমাম সাহেব আমাকে মিম্বরের উপর দাঁড় করিয়ে দিলেন। মহিলাটি আমার একটি হাত ধরে এই বাক্যগুলো উচ্চারণের মাধ্যমে আমার মুক্তি ঘোষণা করেন: "হে আল্লাহ! আমি আমার আখিরাতের জন্য তাকে তোমার কাছে জমা রাখলাম। মসজিদে উপস্থিত লোকেরা! সাক্ষী থাকুন। এই দাসকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুক্ত করলাম। ভবিষ্যতে তার উপর কারো কোন অধিকার নেই।" এরপর তিনি আমাকে মসজিদে রেখে চলে যান এবং আর কখনো আমাকে দেখা দেননি।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি বিশিষ্ট তাবি'ঈদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে ছিলেন। আবুল কাসিম আত-তাবারী বলেন, তাঁর বিশ্বস্ততা ও দৃঢ়তার ব্যাপারে সকলে একমত।
কুরআন
তাঁর অতি প্রিয় ও বিশেষ অধীত বিষয়টি ছিল কিতাবুল্লাহ। আল-কুরআনের শিক্ষা তিনি লাভ করেন কুরআনের বিখ্যাত 'আলিম রাসূলুল্লাহর (সা) বিশিষ্ট সাহাবী হযরত উবায় ইবন কা'বের (রা) নিকট থেকে। এ শিক্ষার শুরু হয় তাঁর দাসত্বের জীবন থেকেই। তিনি নিজেই বলেন, আমি একজন দাস ছিলাম, মনিব পরিবারের সেবা করতাম। আর সেই সাথে কুরআন ও আরবী বই-পুস্তক পড়া শিখতাম। তবে নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষার শুরু হয় বেশ বয়স হলে, ইসলাম গ্রহণের সাত-আট বছর পরে। তিনি বলতেন, আমি তোমাদের নবীর ওফাতের দশ বছর পরে কুরআন পড়েছি।
এত বেশি আগ্রহ, উদ্দীপনা ও অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে তিনি জ্ঞান অর্জন করেন যে, তাবি'ঈদের মধ্যে কুরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিমে পরিণত হন। আবু বাকর ইবন আবী দাউদ বলেন, সাহাবায়ে কিরামের পরে আবুল 'আলিয়ার চেয়ে বড় কুরআনের কোন 'আলিম ছিলেন না। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী (রহ) তাঁকে মুফাস্সির বলে উল্লেখ করেছেন।
হাদীছ
ইবন সা'দ তাঁকে বহু হাদীছের ধারক-বাহক বলেছেন। হযরত 'আলী, 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, আবু আইউব আল- আনসারী, উবায় ইবন কা'ব, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা, ছাওবান, হুযায়ফা, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, রাফি' ইবন খাদীজ, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, আবু হুরায়রা, আনাস ইবন মালিক, আবু যার আল-গিফারী (রা) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ সাহাবায়ে কিরামের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।
হাদীছ গ্রহণে তাঁর সতর্কতা
হাদীছ গ্রহণের ব্যাপারে তিনি দারুণ সতর্ক ছিলেন। যতক্ষণ প্রথম মূল রাবীর (বর্ণনাকারী) মুখ দিয়ে না শুনতেন, ততক্ষণ মধ্যবর্তী রাবীর বর্ণনা গ্রহণ করতেন না। তিনি বলতেন, বসরায় আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের বর্ণনা শুনতাম, কিন্তু ততক্ষণ তাঁর উপর নির্ভর করতাম না যতক্ষণ না নিজে মদীনায় গিয়ে বর্ণনাটির প্রথম সূত্রের মুখ থেকে শুনতাম।
ছাত্র-শিষ্য
তাঁর থেকে যাঁরা জ্ঞানগত ফায়দা হাসিল করেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন: খালিদ আল-হায্যা’, দাউদ ইবন আবী হিন্দ, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, ইউসুফ ইবন 'আবদিল্লাহ, রুবায়' ইবন আনাস, বাকর আল-মুযানী, ছাবিত আন-নাবানী, হুমায়দ ইবন হিলাল, কাতাদা, মানসূর, 'আওফ আল-আ'রাবী, আবু 'আমর ইবন আল-আলা' (রহ) ও আরো অনেকে। ফিতেও তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। বসরার ফকীহদের মধ্যে তাঁকেও গণ্য করা হতো। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে ফকীহ বলে উল্লেখ করেছেন।
সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে তাঁর মর্যাদা
হযরত আবুল 'আলিয়া যদিও একজন দাস ছিলেন, তবে তাঁর অগাধ জ্ঞান ও ব্যাপক মনীষার কারণে অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) এতখানি সম্মান করতেন যে, আবুল 'আলিয়া যখন তাঁর কাছে যেতেন তখন তিনি তাঁকে একটি উঁচু স্থানে নিয়ে বসাতেন। তখন কুরায়শ বংশের অতি সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ তাঁর নীচে বসা থাকতেন। সম্মানের সাথে উচ্চ আসনে বসানোর পর বলতেন, জ্ঞান এভাবে মর্যাদাবান ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেয় এবং দাসকে সিংহাসনে বসায়।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) যখন বসরার ওয়ালী তখন একবার আবুল 'আলিয়া তাঁর নিকট যান। ইবন 'আব্বাস তাঁর হাত ধরে নিজের পাশে বসান। তাঁর প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন দেখে তামীম গোত্রের জনৈক ব্যক্তি ধৈর্যহারা হয়ে বলে ওঠে: এতো একজন দাস।
ইবাদত-বন্দেগী
হযরত আবুল 'আলিয়ার যে পরিমাণ জ্ঞান ছিল তাঁর মধ্যে সেই পরিমাণ 'আমলও ছিল। তিনি একজন 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। রাত জেগে 'ইবাদত-বন্দেগী ও কুরআন তিলাওয়াত করার প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও রুচি। জীবনের একটি সময়ে তিনি সারা রাত নামায পড়তেন এবং এক রাতে কুরআন খতম করতেন। কিন্তু এত কঠোর 'ইবাদত সারা জীবন চালিয়ে যেতে পারেননি। তিনি নিজেই বলেন, আমরা কয়েকজন দাস ছিলাম। তাদের কয়েকজন তাদের উপর ধার্যকৃত ট্যাক্স আদায় করতো, আর কয়েকজন করতো মনিবের সেবা। তবে আমরা সকলে সারা রাত জেগে এক রাতে পুরো কুরআন খতম করতাম। কিন্তু একাজ যখন ভীষণ কষ্টকর হয়ে দাঁড়ালো তখন দু'রাতে খতম করতে লাগলাম। কিন্তু এটাও যখন সম্ভব হলো না তখন তিন রাতে করতে লাগলাম। কিন্তু তাও সম্ভব না হওয়ায় আমরা একে অপরকে দোষারোপ করতে আরম্ভ করলাম। অতঃপর আমরা হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সাহাবীদের কাছে গেলাম। তাঁরা বললেন, এক সপ্তাহে খতম কর। তাঁদের দিক নির্দেশনার পর আমরা রাতে নামায পড়ার সাথে সাথে ঘুমাতেও লাগলাম। তখন এই ক্লান্তিকর বোঝা হালকা হতে থাকে। তিনি কুরআন হিফজ (মুখস্থ) করা সম্পর্কে বলতেন: তোমরা পাঁচটি করে আয়াত মুখস্থ করবে। তাতে তোমাদের মাথায় চাপ কম পড়বে এবং বুঝতেও সহজ হবে। জিবরীল (আ) নবীর (সা) নিকট পাঁচটি করে আয়াত নিয়ে আসতেন।
বৈরাগ্যবাদ পরিহার
প্রচুর 'ইবাদত-বন্দেগী করতেন সত্য, তবে রুহানিয়াত বা বৈরাগ্যবাদের সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। এমনকি রাহিব তথা বৈরাগীদের লেবাস-পোশাক পর্যন্ত পছন্দ করতেন না। একবার আবূ উমাইয়্যা আবদুল কারীম পশমী কাপড়ের পোশাক পরে তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য আসেন। তাঁকে দেখে আবুল 'আলিয়া বলেন, এতো রাহিব তথা বৈরাগীদের পোশাক ও পদ্ধতি। মুসলিমগণ যখন পরস্পর পরস্পরের সাথে সাক্ষাতের জন্য যায় তখন ভালো পোশাক পরে যায়। তারপর তিনি আবদুল করীমকে লক্ষ্য করে বলেন: তুমি নিজে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ কর এবং যে এমন কাজ করে তাকে ভালোবাস। আর পাপ কাজ থেকে দূরে থাক। আল্লাহ ইচ্ছা করলে পাপীকে শাস্তি দিতে পারেন, ইচ্ছা করলে মাফও করতে পারেন।
রিয়া তথা আত্মপ্রদর্শনী ভাব থেকে দূরে থাকা
ভালো কাজের প্রকাশকে তিনি দারুণ খারাপ মনে করতেন, কেউ এমন করলে তাকে রিয়াকার বলতেন। আবূ মাখলাদ বলেন, আবুল 'আলিয়া বলতেন, যখন তোমরা কোন ব্যক্তিকে একথা বলতে শুনবে যে, আমি আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা করি, তখন তোমরা তার অনুসরণ করবে না। সুফইয়ান ইবন উয়ায়না বলেন, আবুল 'আলিয়ার নিকট চারজনের বেশি মানুষ সমবেত হলে তিনি তাদেরকে রেখে উঠে চলে যেতেন।
আল্লাহর পথে ব্যয় করা
আল্লাহর পথে ব্যয় করার ব্যাপারে উদার ছিলেন। তিনি নিজের সকল সম্পদ অথবা তার বড় একটা অংশ ভালো কাজের জন্য আল্লাহর পথে ব্যয় করেন। ইবন সা'দের একটি বর্ণনা বাক্য এ রকম: ‘আবুল 'আলিয়া তাঁর সকল সম্পদ (আল্লাহর রাস্তায় খরচের জন্য) অসীয়াত করে যান।’
অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, আবুল 'আলিয়া বলেন, আমি সোনা-রূপো যা কিছু রেখে যাচ্ছি তার এক-তৃতীয়াংশ আল্লাহর পথে ব্যয়ের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবার-পরিজনদের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ মুসলমান ফকীর-মিসকীনদের জন্য। অবশ্য এর মধ্য থেকে আমার বেগম সাহেবার অংশ তোমরা দেবে।
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা
হযরত রাসূলে কারীম (সা) ছিলেন পৃথিবীর সবকিছু থেকে তাঁর সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি। এই প্রিয়তম ব্যক্তির সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত থাকার দুঃখ আজীবন বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন। রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিমাণ অনুমান করা যায় একটি ঘটনা দ্বারা। একদিন রাসূলে কারীমের (সা) খাদিম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) একটি আপেল হাতে নিয়ে আবুল 'আলিয়ার হাতে তুলে দেন। তিনি আপেলটি হাতে নিয়ে ক্রমাগত চুমু দিতে লাগলেন, আর বলতে থাকলেন: যে বরকতময় হাত রাসূলুল্লাহর (সা) হাত স্পর্শ করেছে, সেই হাত এই আপেলটি স্পর্শ করেছে; এই আপেল সেই হাত স্পর্শ করেছে যে হাত রাসূলুল্লাহর (সা) হাত স্পর্শ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছে।
জিহাদ
জিহাদের ময়দানেও আবুল 'আলিয়াকে দেখা যায়। তাঁর একজন সঙ্গী বলেন: আবুল 'আলিয়া হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি 'মা ওয়ারা' আন-নাহ্' অঞ্চলে আযান দেন। তিনি পারসিক ও রোমানদের ভূমিতে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং সেই সকল স্থানে সর্বপ্রথম আযান দেন। উল্লেখ্য যে, মধ্য এশিয়ার জায়হুন ও সায়হুন নদীর অপর তীরের অঞ্চলসমূহকে 'মাওয়ারা' 'আন-নাহ্' বলে।
শিক্ষাদানের বিনিময়ে কোন প্রতিদান গ্রহণ না করা
তিনি ছাত্রদের যে জ্ঞানদান করতেন তার বিনিময়ে কোন কিছু গ্রহণ করা সঙ্গত মনে করতেন না। একবার একটি মজলিসে তিনি ছাত্রদেরকে হাদীছ ও উপদেশ শোনালেন। মজলিস শেষে একজন ছাত্র বিনিময়ে কিছু অর্থ দিতে চাইলেন। আবুল 'আলিয়া তাকে আল্লাহর এই বাণীটি শোনালেন : ‘এবং আমার আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করো না।’ তারপর ছাত্রটির দিকে তাকিয়ে বললেন : ছেলে! আমি তোমাকে যা কিছু শিখিয়েছি তার বিনিময়ে তুমি কোন কিছু কখনো গ্রহণ করবে না। কারণ, জ্ঞানী ও বিজ্ঞ মানুষদের প্রতিদান তো আল্লাহর কাছে রয়েছে। তাওরাতে লিখিত আছে : ওহে আদমের সন্তান! যেভাবে তোমাকে মুক্ত জ্ঞান দান করা হয়েছে সেভাবে তুমিও মানুষকে মুক্ত জ্ঞান দান কর।
ছাত্রটি তার এমন প্রস্তাব ও শিক্ষকের এমন জবাবে ভীষণ লজ্জা পেল। লজ্জায় সে ঘেমে গেল এবং কপালের ঘাম মুছতে লাগলো। আবুল 'আলিয়া ছাত্রের এমন বিব্রতকর অবস্থা লক্ষ্য করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন : ছেলে! লাজুক ও অহঙ্কারী এই দু'শ্রেণীর মানুষ জ্ঞান লাভ করতে পারে না। আমাকে মুহাম্মাদ (সা) এর সাহাবীরা বলেছেন : আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে কোন কিছু করবে না। তাহলে যার উদ্দেশ্যে তুমি কাজটি করলে তার কাছেই তোমাকে সোপর্দ করা হবে।
তারপর তিনি বলেন, আমরা পঞ্চাশ বছর ধরে একথা বলছি যে, মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে আল্লাহ নির্দেশ দেন : তোমরা আমার এই অসুস্থ বান্দার আমলনামায় সেসব কাজ লিখতে থাক যা সে সুস্থ অবস্থায় করতো, যতক্ষণ না আমি তার জান কবজ করি অথবা তার পথ ছেড়ে দিই। আমরা একথাও পঞ্চাশ বছর ধরে বলে আসছি যে, মানুষের সব কর্মই আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করা হয়। যেসব কর্ম কেবল আল্লাহর জন্য করা হয়, সেগুলো দেখে তিনি বলেন : এগুলো আমার এবং আমিই এর প্রতিদান দিব। আর যেগুলো গায়রুল্লাহর জন্য করা হয়, সেগুলো দেখে বলেন : এগুলোর প্রতিদান তার কাছেই চাওয়ার জন্য তোমরা তা করেছো।
তারপর অত্যন্ত আবেগভরা কণ্ঠে নিম্নের কথাগুলো বলে তিনি মজলিস শেষ করেন:
'তোমরা ইসলাম শেখ ও শেখার পর তা আর প্রত্যাখ্যান করো না। সরল-সোজা পথে চলো। আর সেই পথ হলো ইসলাম। এই সরল-সোজা পথ ছেড়ে ডানে-বাঁয়ে যেয়ো না। তোমরা তোমাদের নবী (সা) ও তাঁর সাহাবীদের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরে থাক এবং বিভিন্ন ধরনের মত-পথ থেকে দূরে থাক। বিভিন্ন ধরনের মত-পথ তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন যে আমাকে ইসলামের হিদায়াত দান করেছেন অথবা প্রবৃত্তির অনুসারী মত-পথ থেকে রক্ষা করেছেন- এ দু'টি অনুগ্রহের মধ্যে কোন্টি যে উত্তম তা আমার জানা নেই।
দাসমুক্তি
একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি দাসদের মুক্তি দিতেন। একবার একটি দাসকে তিনি মুক্তি দেন। তার সেই মুক্তির সনদে নিম্নের কথাটি লেখা ছিল: 'একজন মুসলিম একজন নওজোয়ান দাসকে মুক্ত-স্বাধীনভাবে চরে বেড়ানো পশুর মত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুক্তি দিচ্ছে। তার থেকে ভালো কাজ করিয়ে নেয়া ছাড়া তার উপর কারো কোন অধিকার নেই।
যাকাত-সাদাকা
অত্যন্ত নিয়মানুবর্তিতার সাথে যাকাত আদায় করতেন এবং তা বণ্টনের জন্য মদীনায় পাঠিয়ে দিতেন। আবু খালদা বলেন, আবুল 'আলিয়া তাঁর সম্পদের যাকাত নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করার জন্য মদীনায় আহলি-বায়ত তথা নবী-পরিবারের নিকট পাঠিয়ে দিতেন।
গৃহ-যুদ্ধ থেকে দূরে অবস্থান
আবুল 'আলিয়া একজন বীর এবং যুদ্ধে পারদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই বীরত্ব মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রদর্শিত হয়নি। তাঁর সময়ে সিফফীনসহ আরো কতগুলো গৃহ-যুদ্ধ হয় এবং তা থেকে খুব অল্পসংখ্যক মুসলমান নিজেদেরকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়। তিনিও খুব আবেগ-উদ্দীপনার সাথে ঘর থেকে বের হন, কিন্তু পরে রণক্ষেত্র থেকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফিরে আসেন। আবূ খালদা বলেন, আবুল 'আলিয়া বলতেন, 'আলী ও মু'আবিয়ার (রা) মধ্যে যে যুদ্ধ হয়, আমি তখন যুবক। যুদ্ধ তো আমার কাছে উপাদেয় খাবারের চেয়েও বেশি প্রিয় ছিল। এ কারণে আমিও পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে রণাঙ্গনে উপস্থিত হই। এমন বিশাল বাহিনী দেখলাম যার প্রান্তসীমা কোথায় তা দেখা যাচ্ছিল না। একদল তাকবীর ধ্বনি দিলে অন্য দলও তাকবীর দিচ্ছিল। আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, কোন দলকে আমি মু'মিন বলবো এবং কোন দলকে বলবো কাফির এবং কোন দলের সঙ্গেই বা থাকবো। কেউ তো আমাকে যুদ্ধ করতে চাপ প্রয়োগ করেনি। এসব কথা চিন্তার পর সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বেই আমি ফিরে আসি।
সন্দেহ-সংশয় থেকে দূরে অবস্থান
সন্দেহ-সংশয়পূর্ণ জিনিস থেকে এতখানি সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, যাদের আয়- উপার্জনের মধ্যে সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ থাকতো তাদের দেয়া পানিও পান করতেন না। এ কারণে মুদ্রা ব্যবসায়ী এবং ভূমিতে উৎপাদিত ফসলের 'উশর আদায়কারীর দেয়া কোন খাবার খাওয়া তো দূরের কথা তাদের পানিও পান করতেন না। আবূ খালদা বলেন, একবার আমি আবুল 'আলিয়ার নিকট গেলাম। তিনি খাবার আনলেন। কিছু সবজির তরকারিও ছিল। সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এ তেমন তরকারি নয় যাতে হারামের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা আছে। এ তরকারি আমার ভাই আনাস ইবন মালিক (রা) তাঁর খামার থেকে পাঠিয়েছেন। বললাম, তরকারিতে এমন কি থাকে যে খাওয়া যায় না। বললেন, সবজি সব সময় নোংরা ও ময়লা আবর্জনার স্থানে ভালো জন্মায়, যেখানে পেশাব-পায়খানা করা হয়।
তিনি অত্যন্ত সরল-সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কোন লোক- লৌকিকতা ও আচার-অনুষ্ঠানের পরোয়া করতেন না। এ কারণে তাঁকে কেন্দ্র করে কোন রকম তোড়জোড় ও বিশেষ ব্যবস্থাপনা মোটেই পছন্দ করতেন না। কোথাও গেলে গৃহকর্তাকে আগেই বলে দিতেন, ঘরে যা কিছু আছে তাই খাওয়াবে, বাজার থেকে কোন কিছু কেনাকাটা যেন তার জন্য করা না হয়।
ওফাত
সঠিক বর্ণনা মতে হিজরী ৯৩ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে ভিন্ন একটি বর্ণনা মতে হিজরী ৯০ সনের শাওয়াল মাসে মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যু হয়। হিজরী ১০৬ ও ১১১ সনেও তাঁর মৃত্যুর কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে ইবন হিব্বান ও বুখারী হিজরী ৯৩ সনের উপর জোর দিয়েছেন। মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্ব থেকে তিনি প্রতি মাসে একবার করে নিজের জন্য প্রস্তুতকৃত কাফনের কাপড় পরে আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের সাথে সাক্ষাতের অনুশীলন করতেন।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬১; তাহযীব আল-কামাল-৬/২২০
২. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯২
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২২৫
৪. তাহযীব আল-কামাল-৬/২২১
৫. আত-তাবাকাত-৭/৮১; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৩
৬. তাহযীব আল-আসমা'-১/২২৫
৭. আত-তাবাকাত-৭/৮২
৮. তাহযীব আল-কামাল-৬/২২১
৯. প্রাগুক্ত-৬/২২২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬১
১০. শাযারাত আয-যাহাব-১/১০২
১১. আত-তাবাকাত-৭/৮৫
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/৩৮৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬১
১৩. আত-তাবাকাত-৭/৮২; তাবি'ঈন-৫৩৮
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/৩৮৪
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬১
১৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-৬/২২২
17. আত-তাবাকাত-৭/৮২; তাহযীব আল-কামাল-৬/২২২
১৮. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৩
১৯. প্রাগুক্ত-৩৯৭; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/২১৯
২০. আত-তাবাকাত-৭/৮৩; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৬
২১. আত-তাবাকাত-৭/৮১
২২. তাহযীব আল-কামাল-৬/২২২
২৩. আত-তাবাকাত-৭/৮১
২৪. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৮
২৫. প্রাগুক্ত
২৬. সূরা আল-বাকারা-৪১
২৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া-২২০
২৮. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৬
২৯. প্রাগুক্ত-৩৯৭; হিলইয়াতুল আওলিয়া-২/২১৯
৩০. প্রাগুক্ত
৩১. আত-তাবাকাত-৭/৮৪
৩২. প্রাগুক্ত
৩৩. প্রাগুক্ত
৩৪. প্রাগুক্ত
৩৫. প্রাগুক্ত
৩৬. শাযারাত আয-যাহাব-১/১০২; তাবি'ঈন-৫৪১
৩৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬২; তাহযীব আল-কামাল-৬/২২৩
৩৮. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৪৭
৩৯. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৮
📄 আবূ ইদরীস আল-খাওলানী (রহ)
হযরত আবূ ইদরীসের (রহ) আসল নাম 'আয়িযুল্লাহ, আবূ ইদরীস তাঁর ডাকনাম এবং এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধ। পিতার নাম 'আবদুল্লাহ। তাঁর বংশধারা সম্পর্কে দু'রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি এ রকম: 'আয়িযুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'আমর এবং অন্যটিতে নাম 'আবদুল্লাহ বলা হয়েছে। সেটা হলো: 'আবদুল্লাহ ইবন ইদরীস ইবন 'আয়িয ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন গায়লান আল-খাওলানী। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায় হিজরী অষ্টম সনে হুনায়ন যুদ্ধের বছর তিনি জন্ম গ্রহণ করেন।
জ্ঞান ও মনীষা
তিনি একজন 'ইলম ও 'আমলের অধিকারী তাবি'ঈ ছিলেন। শামের বিশিষ্ট 'আলিমদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: আবূ ইদরীস আল-খাওলানী আদ-দিমাক্বী ছিলেন শামের একজন 'আলিম, ফকীহ এবং যাঁদের মধ্যে 'ইল্ম ও 'আমলের সমন্বয় ঘটেছিল তাঁদের একজন।
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবুদ দারদা' (রা) যিনি শামে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর আবূ ইদরীস (রহ) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। ইউসুফ আল-মিযী তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন: ‘তিনি ছিলেন শামের 'আলিম, 'আবিদ ও কারীদের একজন।
হাদীছ
হযরত আবূ ইদরীস (রহ) উঁচু স্তরের বহু সাহাবীর (রা) নিকট থেকে হাদীছ শোনেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেন। যেমন: হযরত 'উমার, আবুদ দারদা', মু'আয ইবন জাবাল, আবূ যার আল-গিফারী, বিলাল, ছাওবান, হুযায়ফা ইবন আল-ইয়ামান, 'উবাদা ইবন আস-সামিত, 'আওফ ইবন মালিক, মুগীরা ইবন শু'বা, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান, আবূ হুরায়রা, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) ও আরো অনেকে। ইমাম যাহাবী (রহ) হাদীছের শ্রেষ্ঠ হাফিজদের জীবনীর মধ্যে তাঁর জীবনী সন্নিবেশ করেছেন।
তাঁর থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁর সূত্রে বর্ণনাও করেছেন তাঁদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম উপস্থাপন করা হলো: ইমাম যুহরী, রাবী'আ ইবন ইয়াযীদ, বুস্ত্র ইবন 'উবায়দিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ ইবন রাবী'আ ইবন ইয়াযীদ, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, ওয়ালীদ ইবন 'আবদির রহমান, ইউনুস ইবন মায়সারী, আবূ 'আওন আল-আনসারী, ইউনুস ইবন সায়ফ, মাকহুল, শাহ্ ইবন হাওশাব, সালামা ইবন দীনার (রহ) ও আরো অনেকে। তিনি ছিলেন শামের বিখ্যাত ফকীহ। ইমাম যুহরী (রহ) বলেন: ‘আবু ইদরীস ছিলেন শামের ফকীহদের মধ্যে অন্যতম।’ ইমাম আত-তাবারী (রহ) শামের ঐ সকল 'আলিমের সাথে আবূ ইদরীসের জীবনী আলোচনা করেছেন যাঁরা কিস্সা-কাহিনী ও হালাল-হারামের বিধান সম্পর্কে জ্ঞানী ছিলেন।
কাজী ও উপদেশ দানের দায়িত্ব পালন
ফিক্হ বিষয়ে তাঁর যোগ্যতার বড় সনদ এই যে, খলীফা 'আবদুল মালিকের সময়ে তিনি দিমাশকের কাজীর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বিচার-ফায়সালার পাশাপাশি মানুষকে ওয়াজ-নসীহতের মহান দায়িত্বও পালন করতেন। পরে 'আবদুল মালিক ওয়াজ-নসীহতের দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেন। তবে কাজীর পদে বহাল রাখেন। বিচার কাজের চেয়ে ওয়াজ-নসীহতের কাজটি তাঁর বেশি প্রিয় ছিল। এ কারণে তিনি বলতেন: ‘তারা আমার প্রিয় কাজটি থেকে আমাকে অব্যাহতি দিয়েছে এবং যে কাজ করতে আমি ভয় করি সেই কাজে আমাকে বহাল রেখেছে।’ তাঁর সমকালীন 'আলিমগণ তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি দিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। শামের সবচেয়ে বড় 'আলিম মাকহুল (রহ) বলতেন: ‘আমি আবূ ইদরীসের চেয়ে বড় 'আলিম আর কেউ আছে বলে জানিনে।’ আবূ যুর'আ দিমাশকী তাঁকে শামের 'আলিম জুবায়র ইবন নুফাইরের উপর প্রাধান্য দিতেন। তিনি বলতেন: ‘রাসূলুল্লাহর (সা) শ্রেষ্ঠ সাহাবীদের সাথে সাক্ষাতের দিক দিয়ে শামবাসীদের মধ্যে উত্তম হলেন জুবায়র ইবন নুফাইর, আবূ ইদরীস ও কাছীর ইবন মুররা।' একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, এই তিনজনের মধ্যে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য কে? বললেন: আবু ইদরীস আল-খাওলানী।
ইমাম আন-নাসাঈ তাঁকে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইয়াহইয়া মা'ঈন, আল-কাসিম ইবন সাল্লাম ও খলীফা ইবন খায়্যাত বলেছেন: হিজরী ৮০ সনে তিনি ইনতিকাল করেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৭৫; আত-তাবাকাত-৭/১৫৮
২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৬
৩. প্রাগুক্ত-১/৫৭
৪. তাহযীব আল-কামাল-৯/৩৮৪
৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৭
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৮৫; তাহযীব আল-কামাল-৯/৩৮৩
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৭
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৮৭
৯. তাহযীব আল-কামাল-৯/৩৮৫
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৭
১১. প্রাগুক্ত
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৮৫; তাহযীব আল-কামাল-৯/৩৮৫
১৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৭
১৪. তাহযীব আল-কামাল-৯/৩৮৭
📄 আবূ কিলাবা জারমী (রহ)
হযরত 'আবদুল্লাহর (রহ) ডাকনাম আবূ কিলাবা এবং এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। বসরার অধিবাসী ছিলেন। তাঁর বংশধারা এ রকম : 'আবদুল্লাহ ইবন যায়দ ইবন 'উমার ইবন নাতিল ইবন মালিক ইবন 'উবায়দ ইবন 'আলকামা ইবন সা'দ আল-জারমী।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি বসরার বিশিষ্ট তাবি'ঈদের মধ্যে ছিলেন। ইবন হাজার ও ইমাম যাহাবী (রহ) উভয়ে তাঁকে শীর্ষস্থানীয় 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করেছেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী তাঁকে ইমাম এবং 'ইল্ম ও 'আমলে নেতৃস্থানীয় 'আলিম বলেছেন। আল-মিযী তাঁকে শীর্ষস্থানীয় ইমামদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন।
হাদীছ
হাদীছ বিষয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও রুচি ছিল। এ কারণে সব সময় তার অন্বেষণে সময় অতিবাহিত করতেন। মাত্র একটি হাদীছের জন্য কয়েক দিন একই স্থানে অবস্থান করতেন। একবার একটি হাদীছের যাঁচাই বাছাইয়ের জন্য তিন দিন পর্যন্ত মদীনায় অবস্থান করেন। শুধু এ ব্যস্ততা ছাড়া তখন সেখানে আর কোন কাজ ছিল না। তাঁর এমন প্রবল আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসু মনোভাব তাঁকে হাদীছের একজন বিশিষ্ট হাফিজে পরিণত করে। ইবন সা'দ তাঁকে একজন বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য ও বহু হাদীছের ধারক-বাহক বলেছেন। তিনি তাঁকে বসরাবাসী মুহাদ্দিছদের দ্বিতীয় তবকা বা স্তরে স্থান দিয়েছেন।
সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে হযরত ছাবিত ইবন দাহ্হাক আল-আনসারী, সামুরা ইবন জুনদুব, 'আমর ইবন সালামা জারমী, মালিক ইবন হুওয়ায়রিছ, আনাস ইবন মালিক আল-আনসারী, হুযায়ফা ইবন আল-ইয়ামান, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা, আনাস ইবন মালিক কা'বী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, মু'আবিয়া, আবূ হুরায়রা, নু'মান ইবন বাশীর, আবূ ছা'লাবা খুশানী (রা) প্রমুখের সূত্রে বর্ণিত তাঁর হাদীছ পাওয়া যায়। বহু বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ তাবি'ঈর নিকট থেকেও তিনি হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।
ছাত্রবৃন্দ
তাঁর থেকে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে আইউব আস-সাখতিয়ানী, আবূ রাজা', ইয়াহইয়া ইবন আবী কাছীর, আশ'আছ ইবন 'আবদির রহমান জারমী (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
হাদীছ বর্ণনায় সংযত
তাঁর মুখ থেকে হাদীছ শোনার জন্য অনেক বড় বড় 'আলিম আগ্রহ প্রকাশ করতেন। কিন্তু অত্যধিক সতর্কতার কারণে অতি অল্পই বর্ণনা করতেন। আবূ খালিদ বলেন, আমরা হাদীছ শোনার জন্য আবূ কিলাবার নিকট যেতাম। তিনি তিনটি হাদীছ শোনানোর পর বলতেন, যথেষ্ট হয়েছে, আর না। হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) মত বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারীও তাঁকে অনুরোধ করে হাদীছ শুনতেন। 'উমার ইবন মায়মুন বলেন, একবার আবূ কিলাবা গেলেন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) নিকট। তিনি কিছু হাদীছ শোনানোর জন্য অনুরোধ করলেন। জবাবে তিনি বললেন, আমীরুল মু'মিনীন! আমি বেশি হাদীছ বলা এবং একেবারে চুপ থাকা, দু'টোকেই খারাপ মনে করি।
ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। আইউব আস-সাখতিয়ানী বলেন, আল্লাহর কসম! আবূ কিলাবা ছিলেন প্রজ্ঞাবান ফকীহদের একজন।
বিচার ক্ষমতা
ফিক্হ বিষয়ে দক্ষতার কারণে তাঁর মধ্যে বিচার ক্ষমতাও ছিল। আইউব বলেন, আমি বসরায় আবূ কিলাবার চেয়ে বেশি বিচার ক্ষমতাসম্পন্ন আর কাউকে দেখিনি। মুসলিম ইবন ইয়াসার বলতেন, আবূ কিলাবা অনারবদের মধ্যে জন্ম গ্রহণ করলে 'কাজী আল- কুজাত' বা প্রধান বিচারপতি হতেন।
কাজীর পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি
বিচারের যোগ্যতা ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কাজীর পদ গ্রহণ করতে ভীষণ ভয় পেতেন। আইউব বলতেন, আমি তাঁকে বিচার বিষয়ে যত বড় 'আলিম পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি তার থেকে কঠোরভাবে পলায়ণকারীরূপে। তিনি এ কাজকে ভীষণ খারাপ মনে করতেন। কাজীর পদ গ্রহণের জন্য তাঁকে আহ্বান করা হয়। কিন্তু তিনি ভয়ে শামে পালিয়ে যান। দীর্ঘ দিন পর যখন ফিরে আসেন তখন আমি তাঁকে বললাম, যদি আপনি কাজীর পদ গ্রহণ করতেন এবং মানুষের মধ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতেন তাহলে তাতে ছাওয়াব পেতেন। তিনি জবাব দেন, আইউব! মানলাম, এক ব্যক্তি সাঁতার কাটতে পারে; কিন্তু যদি সে সাগরে পড়ে যায় তাহলে কতটুকু সাঁতরাতে পারবে।
গ্রন্থাগার
সেই যুগে গ্রন্থাগারের প্রচলন খুব কম ছিল, বরং ছিল না বলা চলে। তবে আবূ কিলাবা জ্ঞানের প্রতি তীব্র আগ্রহের কারণে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন। অন্তিম রোগ শয্যায় সে সম্পর্কে অসীয়াত করে যান যে, সংগৃহীত গ্রন্থগুলো আইউব সাখতিয়ানীকে দিবে। তিনি জীবিত না থাকলে জ্বালিয়ে দিতে হবে। মালিক বলেন: সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব ও আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ মৃত্যু বরণের সময় কোন গ্রন্থ রেখে যাননি। তবে আমি জেনেছি, আবূ কিলাবা মৃত্যু বরণের সময় এক খচ্চরের বোঝা পরিমাণ গ্রন্থ রেখে যান।
বিদ'আত তথা দীনের মধ্যে নতুন কিছু প্রচলন করার প্রতি ঘৃণা
তিনি 'আকীদা ও 'আমল তথা বিশ্বাস ও কর্মে সালফে সালিহীন বা পূর্ববর্তী সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদেরকে আদর্শ মানতেন এবং এ ব্যাপারে এত কঠোর ছিলেন যে, বিদ'আতীদের বিরুদ্ধে অসি উত্তোলন করাও বৈধ মনে করতেন। বলতেন, যে ব্যক্তি কোন নতুন কথা বা কাজ চালু করে সে অসি উত্তোলনকে বৈধ করে দেয়। এমন লোকদের সাথে মেলা-মেশা ও তর্ক-বিতর্ক করাও তাঁর পছন্দ ছিল না। তাই তিনি নিষেধ করতেন, কেউ যেন বিদ'আতীদের নিকট না বসে, তাদের সাথে বাহাছ-মুনাজিরা না করে। আমার ভয় হয়, না জানি তারা তোমাদেরকে তাদের পথভ্রষ্টতার মধ্যে নিয়ে যায় এবং যে জিনিসকে তোমরা পরিষ্কারভাবে জান তাতে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয়। তিনি মনে করতেন এর প্রতিবিধান শুধুমাত্র তরবারি। আইউব বলেন, আবূ কিলাবা বলতেন, প্রবৃত্তির অনুসরণকারীরা অর্থাৎ বিদ'আতীরা পথভ্রষ্ট। আমার মতে তাদের ঠিকানা নিশ্চিত জাহান্নাম। আমি তাদেরকে ভালো করে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করেছি, তাদের মধ্যে যারা নতুন মত অথবা নতুন কথা প্রকাশ ও প্রচার করে তারা তরবারি ছাড়া তা থেকে বিরত হয় না। নিফাক তথা কপটতার অনেক প্রকার আছে, এটাও তার মধ্যে একটি। অতঃপর নিম্নের এ আয়াতগুলো পাঠ করেন:
১. مِنْهُمْ مَنْ عَاهَدَ اللهَ .
২. وَمِنْهُمُ الَّذِينَ يُؤْذَوْنَ النَّبِيِّ.
৩. وَمِنْهُمْ مَنْ يَلْزَمُكَ فِي الصَّدَقَاتِ.
১. তাদের মধ্যে সেই সকল লোকও আছে যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছে। ২. তাদের মধ্যে সেই সকল লোক আছে যারা নবীকে কষ্ট দেয়। ৩. এবং তাদের মধ্যে সেই সকল লোক আছে যারা সাদাকা বণ্টনের ব্যাপারে আপনার প্রতি দোষারোপ করে।
তারপর তিনি বলেন, যদিও তাদের কথা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, তবে সন্দেহ সৃষ্টি ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে সকলে ঐক্যবদ্ধ। এদের সকলে তরবারির উপযুক্ত এবং তাদের সকলের ঠিকানা হবে জাহান্নাম।
বিদ'আতীদেরকে তিনি নিজের কাছে ঘেঁষতে দিতেন না। কেউ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে নিশ্চিত না হয়ে তাঁকে ভিতরে ঢোকার অনুমতি দিতেন না। গায়লান ইবন জারীর বলেন, একবার আমি তাঁর সাথে মক্কায় যাওয়ার ইচ্ছা করলাম। এ জন্য তাঁর বাড়ীতে গিয়ে সাক্ষাতের অনুমতি চাইলাম। তিনি বললেন, হারূরী (খারিজী) না হলে আসতে পার।
একটি মারাত্মক বিদ'আত
আজকাল ইসলাম চর্চার নামে একটা নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তা হলো কিছু লোক হাদীছের বিপরীতে সব সময় কুরআন উপস্থাপনের দাবী করে। মূলতঃ এ এক মারাত্মক বিদ'আত। হযরত আবূ কিলাবার যুগেও এ জাতীয় কিছু লোকের উদ্ভব হয়। তিনি তাদেরকে পথভ্রষ্ট মনে করতেন। তিনি বলতেন, যখন তোমরা কারো নিকট কোন সুন্নাহ বর্ণনা করবে এবং সে তার জবাবে যদি বলে এটা বাদ দিয়ে আল্লাহর কিতাব উপস্থাপন কর তাহলে তাকে পথভ্রষ্ট বলে জানবে।
নিজেকে চেনা
নিজের প্রকৃতি ও রহস্যকে যে চেনে সে মুক্ত এবং যে নিজেকে ভুলে যায় সে ধ্বংসের উপযুক্ত বলে তিনি মনে করতেন। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তিকে অন্যরা তার চেয়ে বেশি জানে সে ধ্বংস এবং সে অন্যদের চেয়ে নিজেকে বেশি জানে সে মুক্তি লাভের উপযুক্ত।
প্রকৃত বিত্তবান ও প্রকৃত 'আলিম
আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের দান-অনুগ্রহের উপর যে তুষ্ট থাকে সেই প্রকৃত বিত্তবান, আর যে অন্যের জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হয় সেই প্রকৃত 'আলিম বলে তিনি মনে করতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, সবচেয়ে বেশি বিত্তবান কে? বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকে। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করে, সবচেয়ে বড় 'আলিম কে? বললেন, যে অন্যের জ্ঞান থেকে নিজের জ্ঞানের সমৃদ্ধি ঘটায়।
বিপদ-মুসীবতে ধৈর্যধারণ
ধৈর্যধারণ, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ এবং সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর স্থান ছিল অনেকে উঁচুতে। অনেক বড় বড় বিপদ-মুসীবতে তিনি মোটেও ধৈর্যহারা হননি। 'আবদুল মু'মিন খালিদ বলেন, শেষ জীবনে আবূ কিলাবার হাত, পা ও চোখ অকেজো হয়ে যায়। এমন মারাত্মক অবস্থায়ও আল্লাহর প্রশংসা ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশমূলক কথা ছাড়া অন্য কিছু তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হতো না।
তাঁর ব্যক্তি সত্তাকে অন্যদের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির উপায় ভাবা হতো। হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) শামের অধিবাসীদেরকে লক্ষ্য করে বলতেন: ততদিন তোমাদের মাঝে আবূ কিলাবা অথবা তাঁর মত মানুষ বিদ্যমান আছেন ততদিন তোমরা কল্যাণের মধ্যে থাকবে: لن تزالوا بخير يا أهل الشام، مادام فيكم هذا، أو مثل هذا.
ওফাত
তিনি যখন অন্তিম রোগ শয্যায় তখন একদিন হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) তাঁকে দেখতে আসেন এবং তাঁকে দৃঢ় ও অটল থাকার উপদেশ দেন। এ রোগেই তিনি হিজরী ১০৪, মতান্তরে ১০৫ সনে ইনতিকাল করেন। হিজরী ১০৬ অথবা ১০৭ সনের কথাও বর্ণিত হয়েছে।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১০/১৫৫
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/২২৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯৪
৩. শাজারাত আয-যাহাব-১/১২৬
৪. তাহযীব আল-কামাল-১০/১৫৫
৫. আত-তাবাকাত-৭/১৩৪
৬. প্রাগুক্ত
৭. তাহযীব আল-কামাল-১০/১৫৭
৮. প্রাগুক্ত-১০/১৫৬; তাহযীব আত-তাহযীব-৫/২২৫
৯. প্রাগুক্ত
১০. আত-তাবাকাত-৭/১৩৪
১১. প্রাগুক্ত-৭/১৩৩; তাহযীব আল-কামাল-১০/১৫৭
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-কামাল-১০/১৫৮
১৪. আত-তাবাকাত-৭/১৩৫; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৪
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১০/১৫৭
১৬. সূরা আত-তাওবা-৭৯
১৭. প্রাগুক্ত-৬১
১৮. প্রাগুক্ত-৫৮
১৯. আত-তাবাকাত-৭/১৩৫
২০. প্রাগুক্ত-৭/১৩৪
২১. প্রাগুক্ত
২২. প্রাগুক্ত-৭/১৩৩
২৩. প্রাগুক্ত
২৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯৪
২৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/২২৫; তাহযীব আল-কামাল-১০/১৫৮
২৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৪; তাহযীব আল-কামাল-১০/১৫৯; আত-তাবাকাত-৭/১৩৫
📄 ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব (রহ)
হযরত ইয়াযীদের (রহ) ডাকনাম আবূ রাজা'। কুরায়শ গোত্রের বানু 'আমির ইবন লুওয়াই শাখার দাস ছিলেন। ইবন লাহী'আ বলেন, তাঁর পিতা আবু হাবীব আসওয়াদ ছিলেন "নাওবী' সম্প্রদায়ের লোক। ইয়াযীদ বলতেন: ‘আমার পিতা ছিলেন "দামকালা"র অধিবাসী এবং আমি মিসরে বেড়ে উঠি। দামকালাবাসীরা 'আলাবী তথা শী'আ। আমি তাদেরকে 'উছমানিয়্যা বা 'উছমানের (রা) অনুসারীতে পরিবর্তন করি।’
একটি ভিন্ন মতে তাঁর পিতা ছিলেন বানু হিসল-এর এক মহিলার দাস এবং মাও ছিলেন দাসী। ইয়াযীদ হিজরী ৫৩ সনে জন্ম গ্রহণ করেন।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান ও মনীষায় তিনি তাবি'ঈ ইমামদের মধ্যে ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে "আল-ইমাম আল-কাবীর" বা শ্রেষ্ঠ ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন। মিশরে তাঁর মাধ্যমেই সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা শুরু হয়। আবূ সা'ঈদ ইবন ইউনুস বলেন:
"তিনি ছিলেন মিসরবাসীদের মুফতী। অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম মিসরে জ্ঞান, বিভিন্ন মাসয়ালা ও হালাল-হারাম চর্চার সূচনা করেন। তাঁর পূর্বে মিসরবাসীদের জ্ঞান চর্চা মূলতঃ উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রদান, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা বিষয়ে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।"
হাদীছ
তিনি মিসরের একজন বিশিষ্ট হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে একজন নির্ভরযোগ্য ও বহু হাদীছের বর্ণনাকারী বলেছেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) বলেন : "তিনি ছিলেন হাদীছের হুজ্জাত (প্রমাণ) ও হাফিজ।"
তিনি 'আবদুল্লাহ ইবন আল-হারিছ আয-যুবায়দী, আবুত তুফায়ল, আসলাম ইবন ইয়াযীদ, আবূ 'ইমরান, ইবরাহীম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন হুনায়ন, খায়র ইবন নু'আইম, হাদরামী, সুওয়াইদ ইবন কায়স, 'আবদুর রহমান ইবন শাম্মাসা মিহরী, 'আবদুল 'আযীয ইবন আরিস সা'বা, 'আতা' ইবন আবী রাবাহ, 'আররাক ইবন মালিক, ইমাম আয-যুহরী (রহ) এবং আরো বহু মনীষীর নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন এবং তাঁদের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেন। আর তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শোনেন তাঁদের মধ্যে সুলায়মান আত-তায়মী, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, যায়দ ইবন আবী উনায়সা, 'আমর ইবন আল-হারিছ, 'আবদুল হামিদ ইবন জা'ফার, ইবন লাহী'আ, লায়ছ ইবন সা'দ (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
ফিক্হ
ফিক্হ বিষয়েও তিনি ভীষণ পারদর্শী ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। খলীফা হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) মিসরে যে তিন ব্যক্তিকে ইফতার পদে নিয়োগ দেন, তাঁদের একজন হলেন এই ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব। বলা চলে তাঁরই চেষ্টায় সেখানে ফিক্হ চর্চার সূচনা হয়।
সমকালীন 'আলিমদের মূল্যায়ন
লায়ছ ইবন সা'দ বলতেন :"ইয়াযীদ আমাদের 'আলিম ও আমাদের নেতা।" তিনি আরো বলতেন, ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব ও 'আবদুল্লাহ ইবন আবী জা'ফার উভয়ে দেশের দু'টি রত্ন। জনৈক ব্যক্তি 'আমর ইবন আল-হারিছকে প্রশ্ন করে : ইয়াযীদ ও 'আবদুল্লাহ-এ দু'জনের মধ্যে উত্তম কে? জবাবে তিনি বলেন : যদি দু'জনকে দু'পাল্লায় বসানো হয় তাহলে কোন পাল্লাই ঝুঁকবে না।
সাবধানতা
হাদীছ বর্ণনায় সতর্ক তাবি'ঈদের মত তিনিও সতর্কতা অবলম্বন করতেন। যখন তাঁর নিকট প্রশ্নকারীদের সংখ্যা বেড়ে যায় তখন তিনি গৃহ অভ্যন্তরে নির্জনতা অবলম্বন করেন।
জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা
তাঁর মধ্যে জ্ঞানের প্রতি প্রবল সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল। এ কারণে কোন শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তির নিকট যাওয়া মোটেই পছন্দ করতেন না। কারো প্রয়োজন হলে তাঁকে নিজের কাছে ডেকে আনতেন। একবার যাব্বান ইবন 'আবদিল 'আযীয লোক মারফত তাঁকে বলে পাঠালেন যে, আপনি একটু আমার নিকট আসুন, আপনার নিকট কিছু বিষয় আমার জানার আছে। তিনি জবাবে বলে পাঠালেন, আপনিই আমার এখানে আসুন। আমার নিকট আসা আপনার জন্য শোভন হবে, পক্ষান্তরে আপনার নিকট আমার যাওয়া হবে আপনার জন্য অশোভন।
স্পষ্টবাদিতা
সত্য উচ্চারণে ছিলেন নির্ভীক। যত ক্ষমতাশালীই হোন না কেন কাউকে পরোয়া করতেন না। মুখের উপর তাদের দোষ-ত্রুটি বলে দিতেন। একবার তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যা নিলেন। মিসরের তৎকালীন আমীর আল-হাওছারা ইবন সুহায়ল সাক্ষাৎ করতে আসলেন। তিনি ইয়াযীদের নিকট জানতে চাইলেন: যে কাপড়ে মশার রক্ত লেগেছে, সেই কাপড়ে নামায আদায় হবে কি? প্রশ্ন শুনে তিনি আল-হাওছারার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাঁর সাথে কোন কথাই বললেন না। আল-হাওছারা উঠতে যাবেন তখন তিনি তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেন, প্রতিদিন মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছেন, আর আমার নিকট মশার রক্তের কথা জিজ্ঞেস করছেন?"
ওফাত
হিজরী ১২৮ সনে তিনি ইনতিকাল করেন, একথা ইবন সা'দ বলেছেন। ৭৫ বছরের অধিক জীবন লাভ করেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর রিজাল-২০/২৯৭
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৯
৩. তাহযীব আল-কামাল-২০/২৯৫
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/২৭৯
৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৯
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-২০/২৯৭
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩০
৮. তাহযীব আল-কামাল-২০/২৯৮
৯. প্রাগুক্ত-২০/২৯৫, ২৯৭; তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩১৮
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৯
১১. প্রাগুক্ত
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/২৭৯; তাহযীব আল-কামাল-২০/২৯৮; টীকা-১
১৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৯
১৪. প্রাগুক্ত
১৫. প্রাগুক্ত-১/১৩০
১৬. তাহযীব আল-কামাল-২০/২৯৭