📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আবূ ‘উছমান আন-নাহ্দী (রহ)

📄 আবূ ‘উছমান আন-নাহ্দী (রহ)


হযরত 'আবদুর রহমানের (রহ) ডাকনাম আবূ 'উছমান এবং এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। তিনি ছিলেন একজন "মুখাদরাম" ব্যক্তি অর্থাৎ জাহিলী ও ইসলামী উভয় যুগ লাভ করেন। জাহিলী যুগে সাধারণ আরববাসীর মত মূর্তিপূজক ছিলেন। ইসলামের অভ্যুদয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) দর্শন ও সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত থেকে যান। কিন্তু যাকাত-সাদাকা সব সময় রাসূলুল্লাহর (সা) তাহসীলদারের হাতে তুলে দিতেন। আবূ 'উছমানের পিতার নাম মালু ইবন 'আমর। আবূ 'উছমান কৃফার অধিবাসী ছিলেন।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) আবির্ভাবের খবর প্রথম যে ভাবে লাভ করেন সে সম্পর্কে তিনি পরবর্তীকালে বলতেন: আমি তখন ১৭ বছরের এক তরুণ। একদিন আমি একটি উপত্যকায় আমাদের উট চরাচ্ছিলাম, তখন সেই পথে আমার পাশ দিয়ে তিহামার একজন লোক যাচ্ছিলেন। আমি তাকে বললাম, শুনেছি আপনাদের মাঝে নাকি একজন 'সাবী' বা ধর্মত্যাগীর আবির্ভাব হয়েছে? ব্যাপারটা কী একটু বলুন তো? তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! একজন লোকের আবির্ভাব হয়েছে, যে মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান জানায়। সে নিজেদের পারস্পারিক সম্পর্ক বিনষ্ট করে ফেলেছে।

প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফতকালে তাঁর অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) খিলাফতকালে প্রথম মদীনায় আসেন এবং ইরাকের অধিকাংশ অভিযান যথা: কাদেসিয়া, জাল্লা, তুসতার, নিহাওয়ান্দ, সারওয়ান্দ, ইয়ারমুক প্রভৃতিতে অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করেন।

জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞানের জগতে তেমন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন না। তবে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সালমান আল-ফারেসীর (রা) সাহচর্যে বারো বছর ছিলেন। এই মোবারক সাহচর্যের কল্যাণে তিনি এত পর্যাপ্ত জ্ঞানের অধিকারী হন যে, তাঁকে বড় বড় 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করা হতে থাকে।

হাদীছ
হযরত 'উমার, 'আলী, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, তালহা, সালমান আল-ফারেসী, আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ, হুযায়ফা, আবূ যার আল-গিফারী, উবায় ইবন কা'ব, উসামা ইবন যায়দ, বিলাল, হানজালা আল-কাতিব, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ সাহাবায়ে কিরামের সূত্রে বর্ণিত তাঁর হাদীছ পাওয়া যায়।

ছাবিত আল-বানানী, কাতাদা, আসিম আল-আহওয়াল, সুলায়মান আত-তায়মী, খালিদ আল-হায্যা', আইউব আস-সাখতিয়ানী, হুমায়দ আত-তাবীল (রহ) প্রমুখের মত বিশিষ্ট 'আলিম তাবি'ঈগণ তাঁর নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।

'ইবাদত-বন্দেগী
'ইবাদত-বন্দেগী ও তাকওয়া-পরহেযগারী ছিল হযরত আবু 'উছমানের বিশেষ গুণ। এ ক্ষেত্রে তিনি সমকালীনদের মধ্যে বিশিষ্ট বলে গণ্য হতেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন, তিনি ছিলেন একজন 'আলিম, কায়িমুল লায়ল ও সায়িমুন নাহার- অর্থাৎ জ্ঞানী, রাতে সালাত আদায়কারী ও দিনে সাওম পালনকারী। এত বেশি সালাত আদায় করতেন যে, মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়তেন।

সকল প্রকার পাপ থেকে সব সময় দূরে থাকতেন। তাঁর ছাত্র সুলায়মান আত-তায়মী বলেন, তাঁর এমন অবস্থা দেখে আমার ধারণা হয়, তাঁর দ্বারা কখনো কোন পাপ কাজ সংঘটিত হয়নি।

আল্লাহর যিক্র
তিনি বলতেন, আমি জানি, আল্লাহ আমাকে কখন স্মরণ করেন। জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করেন : কিভাবে? বললেন: আল্লাহ বলেছেন: "ফাযকুরূনী আযকুরকুম" - 'তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করবো।' এ কারণে আমি যখন তাকে স্মরণ করি তিনিও আমাকে স্মরণ করেন এবং যখন আমরা তাঁর নিকট দু'আ করি তখন তিনি তা কবুল করেন। কারণ, তিনি বলেছেন :
"তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।"

আহলি বায়ত বা নবী-বংশের সাথে সম্পর্ক
আহলি বায়তের প্রতি ছিল তাঁর প্রচণ্ড ভক্তি ও ভালোবাসা। তিনি কৃষ্ণায় বসবাস করতেন। কিন্তু কারবালায় ইমাম হুসায়নের (রা) শাহাদাতের দুঃখজনক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর তিনি চিরদিনের জন্য কৃষ্ণা ছেড়ে বসরায় আবাসন গড়ে তোলেন। কারণ হিসেবে বলতেন, আমি এমন শহরে অবস্থান করতে পারিনে যেখানে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) দৌহিত্র শাহাদাত বরণ করেছেন।

ওফাত
মৃত্যু সন নিয়ে মতপার্থক্য আছে। সঠিক বর্ণনা মতে হিজরী ১০০ সন অথবা এর কাছাকাছি সময়ে ইনতিকাল করেন। প্রায় এক শো তিরিশ বছর জীবন লাভ করেন। হিজরী ৯৫ সনের কথাও বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
১. তাহযীব আত-তাহযীব-৬/২৭৭
২. খাতীব আল-বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ-১০/২০৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৫
৩. তাহযীব আল-কামাল-১১/৩৮৪
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৬/২৭৮
৫. তারীখু বাগদাদ-১০/২০৪
৬. শাজারাত আয-যাহাব-১/১১৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৬
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৬/২৭৮; তাহযীব আল-কামাল-১১/৩৮৩-৩৮৪
৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৬; তাহযীব আল-কামাল-১১/৩৮৪
৯. প্রাগুক্ত
১০. সূরা আল-বাকারা-১৫২
১১. সূরা গাফির-৬০
১২. আত-তাবাকাত-৭/৬৯; তাহযীব আল-কামাল-১১/৩৮৫
১৩. প্রাগুক্ত
১৪. তারীখু বাগদাদ-১০/২০৫; তাহযীব আল-কামাল-১১/৩৮৫

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ইউনুস ইবন ‘উবায়দ (রহ)

📄 ইউনুস ইবন ‘উবায়দ (রহ)


হযরত ইউনুসের (রহ) ডাকনাম আবূ ‘উবায়দ মতান্তরে আবূ ‘আবদিল্লাহ। তিনি বানু ‘আবদিল কায়সের দাস ও বসরার অধিবাসী ছিলেন।

জ্ঞান ও মনীষা
যদিও দাসত্ত্বের বেড়ী তাঁর কণ্ঠে ঝোলানো ছিল, কিন্তু তা জ্ঞানের আলো থেকে তাঁকে দূরে রাখতে পারেনি। তিনি তাবি‘ঈকূল শিরোমণি হযরত হাসান আল-বাসরীর (রহ) খাস সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে ছিলেন। আর এই সাহচর্য ও এক সাথে উঠাবসা তাঁকে জ্ঞান ও কর্মে ঐশ্বর্যবান করে তোলে। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে ইমাম, হুজ্জাত (প্রমাণ) ও অনুসরণীয় নেতা বলেছেন। ইমাম নাওবী (রহ) তাঁর বিশ্বস্ততা, দৃঢ়তা ও মহত্ত্বের ব্যাপারে সকলের ঐকমত্যের কথা বলেছেন। তিনি একথাও বলেছেন যে, ইউনুস ছিলেন একজন উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন তাবি‘ঈ। ইবন হিব্বান বলেছেন, তিনি জ্ঞান, মনীষা, স্মৃতিতে ধারণশক্তি, দৃঢ়তা, সুন্নাহর অনুসরণ, বিদ‘আতীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষণ, দিব্যদৃষ্টি, দীনী বিষয়ে গভীর অনুধাবন শক্তি এবং বহু হাদীছ স্মৃতিতে ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর যুগের নেতৃস্থানীয়দের অন্যতম ছিলেন।

হাদীছ
তিনি তাঁর যুগের হাদীছের বিশিষ্ট হাফিজদের মধ্যে ছিলেন। ইবন সা‘দ বলেন: ‘তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, বহু হাদীছের ধারক-বাহক।’ তিনি তাঁকে বসরাবাসী মুহাদ্দিছগণের চতুর্থ তবকায় স্থান দিয়েছেন।

সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে তিনি হযরত আনাস ইবন মালিকের দর্শন ও সাক্ষাৎ লাভ করেন, তবে তাঁর থেকে কোন হাদীছ শোনার সৌভাগ্য হয়নি। তিনি হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে সবচেয়ে বেশি অর্জন করেছেন। তারপর মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, ছাবিত আন-নাবানী, ‘আবদুর রহমান ইবন আবী বাকরা, হাকীম ইবন ‘আন-আ’রাজ, নাফি‘ মাওলা ইবন ‘উমার (রা), হুমায়দ ইবন বিলাল, ‘আতা’ ইবন আবী রাবাহ (রহ) প্রমুখের নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন।

হাদীছ চর্চার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর অধিকাংশ সমকালীনের শীর্ষে ছিলেন। সা‘ঈদ ইবন ‘আমির বলেন, আমি ইউনুস ইবন ‘উবায়দের চেয়ে উত্তম কাউকে পাইনি। সকল বসরাবাসীর এই মত। আবু হাতিম বলতেন, তিনি সুলায়মান আত-তায়মীর চেয়েও উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তায়মী তাঁর স্থানে পৌছাতে পারতেন না। সালামা ইবন ‘আলকামা বলেন, ‘আমি ইউনুসের মজলিসে বসেছি, কিন্তু তাঁর একটি কথাও ভুল ধরতে পারিনি।’

এত জ্ঞান ও যোগ্যতা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনায় দারুণ সতর্ক ছিলেন। হাদীছ বর্ণনার পর সব সময় তিনবার “আস্তাগফিরুল্লাহ” পাঠ করতেন। আর এই সতর্কতার কারণেই হাদীছ লিখতেন না। তিনি বলতেন, আমি কখনো কিছু লিখিনি।

ছাত্রবৃন্দ
তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ছাত্র হলেন: তাঁর পুত্র ‘আবদুল্লাহ, শু‘বা, ছাওরী, উহাইর, হাম্মাদ, ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘ঈসা, খায্যায, খারিজা ইবন মুস‘আব ও আরো অনেকে।

জ্ঞান অর্জনে তাঁর অকপটতা ও নিষ্ঠা
তাঁর জ্ঞান অর্জন ও চর্চা খ্যাতি ও নাম-কামের জন্য ছিল না; বরং কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ছিল। হিশাম ইবন হুসাম বলেন, আমি ইউনুস ইবন ‘উবায়দ ছাড়া এমন কাউকে পাইনি যার জ্ঞান চর্চা ছিল শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

নৈতিক গুণাবলী
অগাধ জ্ঞানের সাথে ‘আমলও (কর্ম) সেই পর্যায় ও মানের ছিল। ‘আকীদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে ছিলেন ভীষণ কঠোর এবং মত পথের ব্যাপারে ছিলেন দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি ছিলেন সুন্নাহর বড় পাবন্দ, বিদ‘আতের প্রতি দারুণ ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণকারী এবং দিব্য জ্ঞানের অধিকারী একজন মানুষ। ‘আকীদার ব্যাপারে এত কঠোর ছিলেন যে, নতুন কোন চিন্তা-বিশ্বাসকে কাবীরা গুনাহর চেয়েও মারাত্মক মনে করতেন। একবার তিনি তাঁর পুত্রকে বলেন, আমি তোমাকে সুদ, চুরি, মদপান ইত্যাদি কাজ থেকে বিরত থাকতে বলি। কিন্তু ‘আমর ইবন ‘উবায়দ ও তার সাথীদের চিন্তা-বিশ্বাসকে গ্রহণ করে তাঁদের সাথে মিলিত হওয়ার চেয়ে উপরোক্ত পাপে লিপ্ত হয়ে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়াকে আমি বেশি পছন্দ করি। উল্লেখ্য যে, ‘আমর ইবন ‘উবায়দ ছিলেন ‘একজন বুদ্ধিবাদী মু‘তাযিলা।’

বিদ‘আতীদের ‘ইবাদত-বন্দেগীকেও তিনি কোন ছাওয়াবের কাজ বলে মনে করতেন না। একবার জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আমার একজন মু‘তাযিলা প্রতিবেশী অসুস্থ আছে, আমি তাঁকে দেখতে যেতে চাই। বললেন, ছাওয়াবের নিয়্যাতে যাবে না।

ফরয ব্যতীত খুব বেশি নফল নামায-রোযা করতেন না। তবে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের অধিকার ও ফরয আদায়ের ব্যাপারে সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকতেন। সাল্লাম ইবন মুতী‘ বলেন, ইউনুস খুব বেশি নামায-রোযা করতেন না। তবে আল্লাহর কসম! যখন আল্লাহর অধিকারের সময় হতো তখন তিনি তা প্রতিপালনের জন্য বিলম্ব করতেন না।

জিহাদকে সর্বোত্তম ‘ইবাদত বলে বিশ্বাস করতেন। কোন কারণে জিহাদে যোগদান করতে না পারলে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়তেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে অস্থিরতা বিদ্যমান থাকতো। ইসহাক ইবন ইবরাহীম বলেন, ইউনুস অন্তিম রোগ শয্যায় শুয়ে তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদতেন। লোকেরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেন, এ পা আল্লাহর রাস্তায় ধুলিমলিন হয়নি। মুখ থেকে সব সময় কালিমায়ে ইস্তিগফার অর্থাৎ আস্তাগফিরুল্লাহ উচ্চারিত হতো। ‘আবদুল মালিক ইবন মূসা বলেন, আমি তাঁর চেয়ে বেশি আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনাকারী আর দেখিনি।

সততা ও সাধুতা
ব্যবসা ছিল তাঁর পেশা। এর মাধ্যমে তিনি জীবিকা উপার্জন করতেন। রেশমী বস্ত্রের ব্যবসা করতেন। ব্যবসায়িক সততায় এত বাড়াবাড়ি করতেন যে, তাতে ব্যবসা করাই দুঃসাধ্য ছিল। তাঁর ব্যবসায়িক সততা ও সাধুতার বহু ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এখানে কয়েকটি ঘটনা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো।

একবার এক বিশেষ স্থানে রেশমের মূল্য বৃদ্ধি পায়। তিনি তা জানতে পেরে অন্য এক স্থানের রেশম বিক্রেতার নিকট থেকে তিরিশ হাজার দিরহামের রেশম ক্রয় করেন। পরে কি যেন চিন্তা করে বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করেন, অমুক স্থানে রেশমের মূল্য বৃদ্ধির কথা কি তুমি জান? লোকটি বললো, সে কথা যদি জানতাম তাহলে আমার এ মাল কি বিক্রি করতাম? তাঁর এ জবাব শুনে তিনি প্রদত্ত মূল্য নিয়ে মাল ফেরত দেন।

একবার এক মহিলা তাঁর নিকট আসে “খুযের” চাদর বিক্রির জন্য। তিনি জিনিস দেখে দাম জিজ্ঞেস করেন। সে বললো: ষাট দিরহাম। তিনি তাঁর এক প্রতিবেশীকে চাদর দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেন, এর দাম কত হতে পারে? সে বললো: এক শো বিশ পর্যন্ত হতে পারে। দাম যাঁচায়ের পর তিনি মহিলাকে বলেন, বাড়ীর লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করেছি, তারা এর দাম এক শো পঁচিশ বলছে।

আরেকবার এক মহিলা রেশমের একটি জুব্বা বিক্রির জন্য নিয়ে এলো। তিনি দাম জিজ্ঞেস করলেন এবং সে পাঁচশো চাইলো। ইউনুসের দৃষ্টিতে জিনিসটির দাম অনেক বেশি ছিল। এ কারণে তিনি এক হাজার বলেন।

এত সতর্কতা সত্ত্বেও তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারতেন না। ইবন শাওযাব বলেন, একবার ইউনুস ও ইবন ‘আওন হালাল-হারামের ব্যাপারে আলোচনা করছিলেন। এক পর্যায়ে উভয়ে বললেন: আমাদের সম্পদে এক দিরহামও হালাল অর্থ নেই।

ওফাত
হিজরী ১৩৯ সনে ইনতিকাল করেন। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাসের (রা) পৌত্র সুলায়মান ও ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আলী এবং প্রপৌত্র জা‘ফার ও মুহাম্মাদ (রহ) তাঁর লাশের খাটিয়া বহন করেন। তখন তাঁরা বলছিলেন: “আল্লাহর কসম! এ একটি সম্মান ও মর্যাদা।”

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল-২০/৫৪২
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৪৫
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৬৮
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৪৫
৫. আত-তাবাকাত-৭/২৩; তাহযীব আল-কামাল-২০/৫৪৩
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৪৫; তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৪২
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৪৫; তাহযীব আল-কামাল-২০/৫৪৪
৮. প্রাগুক্ত; আত-তাবাকাত-৭/২৩
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/২৪২
১০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৪৬
১১. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৪৪
১২. প্রাগুক্ত
১৩. প্রাগুক্ত
১৪. প্রাগুক্ত
১৫. প্রাগুক্ত
১৬. প্রাগুক্ত-২০/৫৪৯; তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৪৩
১৭. প্রাগুক্ত
১৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৪৫
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৪৪
২০. আত-তাবাকাত ৭/২৪; তাহযীব আল-কামাল-২০/৫৫৩

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 সুলায়মান ইবন ইয়াসার আল-হিলালী (রহ)

📄 সুলায়মান ইবন ইয়াসার আল-হিলালী (রহ)


হযরত সুলায়মানের (রহ) ডাকনাম আবু আইউব, মতান্তরে আবূ আবদির রহমান। উম্মুল মু'মিনীন হযরত মায়মুনার (রা) দাসত্বের সৌভাগ্য অর্জন করেন। হযরত মায়মূনা (রা) তাঁকে মুকাতিব করেন। অর্থাৎ তাঁকে এই শর্তে মুক্তি দানের চুক্তি করেন যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে তিনি দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করবেন। এই দাসত্ব সুলায়মানকে 'ইল্ম ও 'আমলের (জ্ঞান ও কর্ম) ঐশ্বর্যে পূর্ণ করে তোলে। 'আতা', 'আবদুল মালিক ও 'আবদুল্লাহ ইবন ইয়াসার- এ তিনজন ছিলেন তাঁর ভাই।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) অন্দর মহলে যাতায়াত
উম্মুল মু'মিনীন হযরত মায়মুনার (রা) দাসত্বের সুবাদে সুলায়মান হযরত 'আয়িশা (রা) সহ অন্যদের কাছে যাতায়াত করতেন। তিনি তাঁর দাসত্বকালে তাঁদের থেকে পর্দা করতেন না। সুলায়মান নিজেই বলেন, একবার আমি হযরত 'আয়িশার (রা) দরজায় উপস্থিত হয়ে সাক্ষাতের অনুমতি চাইলাম। তিনি আওয়ায শুনে বললেন, তুমি দাসত্ব থেকে মুক্তির ব্যাপারে যে চুক্তি করেছিলে তাকি পূরণ করেছো? আমি বললাম: হাঁ, তবে সামান্য কিছু বাকী আছে। বললেন: তাহলে ভিতরে এসো। তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত দাস যতক্ষণ তোমার চুক্তির শর্ত পূরণে কিছু বাকী থাকবে।

জ্ঞান ও মনীষা
সুলায়মান প্রথমতঃ ব্যক্তিগত যোগ্যতার দিক দিয়ে অত্যন্ত মেধাবী ও বুদ্ধিমান ছিলেন। দ্বিতীয়তঃ উম্মুল মু'মিনীনের দাস হওয়ার সুবাদে মদীনায় বসবাসকারী সাহাবায়ে কিরামের (রা) সাহচর্যের বাড়তি সুবিধাও লাভ করেন। এতদুভয় কারণে তিনি মদীনার একজন বিশিষ্ট 'আলিমে পরিণত হন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মহত্ত্ব ও জ্ঞানগত উৎকর্ষের ব্যাপারে সকলে একমত।

কুরআন ও হাদীছ
কুরআন মাজীদ, হাদীছ, ফিক্হ তথা সকল ইসলামী জ্ঞানে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। কুরআনের বিশিষ্ট কারী ছিলেন। আর যে গৃহের তিনি সেবক ছিলেন সেটাই তো ছিল হাদীছে নববীর উৎসধারা। এ কারণে স্বাভাবিকভাবে হাদীছের একটা নির্ভরযোগ্য ভাণ্ডার তাঁর অধিকারে চলে আসে। ইবন সা'দ বলেন, তিনি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, ফকীহ ও বহু হাদীছের ধারক-বাহক ছিলেন।

তাঁর অর্জিত হাদীছ ভাণ্ডারের মূল উৎস উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা (রা) ও মায়মুনা (রা)। তাছাড়া আরো অনেক বড় সাহাবীর (রা) নিকট থেকেও তাঁর হাদীছের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেন। যেমন : যায়দ ইবন ছাবিত, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, ফাদল ইবন 'আব্বাস, আবূ হুরায়রা, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, মিকদাদ ইবন আওস, 'আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) ও আরো অনেকে। তাঁর সমকালীন মুহাদ্দিছগণের নিকট থেকেও তিনি হাদীছ শোনেন। যেমন: জা'ফার ইবন 'আমর ইবন উমাইয়্যা আদ- দামরী, 'আবদুল্লাহ 'ইবন আল-হারিছ ইবন নাওফাল, 'আবদুর রহমান ইবন জাবির, 'আররাক ইবন মালিক, মালিক ইবন আবী 'আমির আসবাহী (রহ) প্রমুখ।

ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডি অনেক ব্যাপক। কয়েকজনের নাম এখানে উপস্থাপন করা হলো : 'আমর ইবন দীনার, 'আবদুল্লাহ ইবন দীনার, 'আবদুল্লাহ ইবন ফাদল আল-হাশিমী, আবূ যানাদ, বুকায়র ইবন আল-আশাজ্জ, জা'ফার ইবন 'আবদিল্লাহ, ইবন হাকাম, সালিম, আবুন নাসর, সালিহ ইবন কায়সান, 'আমর ইবন মায়মূন, মুহাম্মাদ ইবন আবী হারমালা, যুহরী, মাকহুল, নাফি', ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, ইয়া'লা ইবন হাকীম, ইউনুস ইবন সায়ফ (রহ) প্রমুখ।

ফিক্হ
ফিক্হ ছিল তাঁর একান্ত ও বিশেষভাবে অধীত বিষয়। এতে তিনি একজন ইমাম ও মুজতাহিদের মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ফকীহ 'আলিম ও ইজতিহাদের যোগ্যতাসম্পন্ন ইমাম ছিলেন। তিনি ছিলেন মদীনার সেই বিখ্যাত সাত ফকীহর অন্যতম যাঁদেরকে সে সময় ফিক্হের ইমাম বলে মানা হতো। বিশেষ করে তালাকের মাসয়ালার তিনি একজন বড় 'আলিম ছিলেন। কাতাদা বলেন, আমি একবার মদীনায় গিয়ে মানুষের নিকট জিজ্ঞেস করলাম, এখানে তালাকের মাসয়ালার সবচেয়ে বড় 'আলিম কে? তারা সুলায়মান ইবন ইয়াসারের নাম বললো। কিছু 'আলিম ফিক্হ বিষয়ে তাঁকে ঐ সকল ইমামদের উপরে, জ্ঞানের জগতে যাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত ছিল, প্রাধান্য দিতেন। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার (রহ) সুযোগ্য পুত্র হাসান (রহ) তাঁকে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিবের (রহ) চেয়েও বেশি বুদ্ধিদীপ্ত মনে করতেন। খোদ সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) তাঁর প্রতি এত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে, অনেক সময় কেউ তাঁর কাছে কোন মাসয়ালার সমাধান জানতে চাইলে তিনি তাকে সুলায়মানের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। বলতেন, জীবিত লোকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বড় 'আলিম।

তাকওয়া-পরহেযগারী
দুনিয়া বিরাগী মনোভাব এবং 'ইবাদত-বন্দেগীর দিক দিয়ে তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। আবূ যার'আ বলেন, সুলায়মান ইবন ইয়াসার ছিলেন মদীনার একজন জ্ঞানী-গুণী ও তাপস মানুষ। আল-'ইজলী তাঁর জ্ঞান-মনীষার সাথে সাথে 'ইবাদত-বন্দেগীরও সাক্ষ্য দিয়েছেন।

তিনি অত্যন্ত পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন স্বভাবের ছিলেন। যদিও তাবি'ঈদের সেই পূতঃপবিত্র দলটির জন্য এ কোন বড় বৈশিষ্ট্য নয়। কারণ, তাঁরা সকলেই ছিলেন নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী, কিন্তু কেউ যদি জীবনের কোন পর্যায়ে কোন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয় এবং সফলভাবে উৎরে যায় তাহলে সেটা তার জন্য বিশেষ সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। সুলায়মান ছিলেন খুবই সুদর্শন ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। একবার এক সুন্দরী মহিলা সুযোগ মত তাঁর ঘরে ঢুকে যায় এবং তাঁকে সম্ভোগের আহ্বান জানায়। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে পালিয়ে যান। এরপর একদিন তিনি ইউসুফকে (আ) স্বপ্নে দেখেন।

ওফাত
তাঁর মৃত্যু সন সম্পর্কে একাধিক মত আছে। সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মতে হিজরী ১০৭ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। মোট ৭৩ বছর জীবন লাভ করেন। ইমাম আল-বুখারী বলেন: সুলায়মান ইবন ইয়াসার, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'আলী ইবন আল-হুসায়ন ও আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান একই বছর মৃত্যুবরণ করেন। সেই বছরটি হলো হিজরী ৯৪ সন। এ কারণে এ বছরটিকে বলা হয় سنة الفقهاء - ফকীহদের বছর।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-৮/১১৯
২. আত-তাবাকাত-৫/১৩০
৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯১
৪. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২৩৪
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/২২৯
৬. আত-তাবাকাত-৫/১৩০
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/২২৮; তাহযীব আল-কামাল-৮/১১৯
৮. প্রাগুক্ত
৯. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯১
১০. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-আসমা'-১/২৩৫
১১. ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/২১৩
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯১
১৩. শাযারাত আয-যাহাব-১/১৩৪
১৪. তাহযীব আল-আসমা'-১/২৩৫
১৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/২৩০
১৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯১; তাহযীব আল-কামাল-৮/১২১
১৭. প্রাগুক্ত; আত-তাবাকাত-৫/১৩০

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আবুল ‘আলিয়া রিয়াহী (রহ)

📄 আবুল ‘আলিয়া রিয়াহী (রহ)


হযরত আবুল 'আলিয়ার (রহ) আসল নাম রাফী' এবং ডাকনাম আবুল 'আলিয়া। এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। পিতার নাম মাহরান। আবুল 'আলিয়া বানু রিয়াহ ইবন ইয়ারবূ' গোত্রের এক মহিলার দাস ছিলেন। এ কারণে তাদের সাথে সম্পৃক্ত করে তাঁকে রিয়াহী বলা হয়। বানু রিয়াহ হলো বানু তামীমের একটি শাখা গোত্র। আসলে পারস্যে তাঁর জন্ম। মুসলিম মুজাহিদদের হাতে বন্দী হয়ে বসরায় আসেন এবং দাসত্বের শৃঙ্খলে জড়িয়ে পড়েন।

ইসলাম গ্রহণ
তিনি জাহিলী ও ইসলামী উভয় যুগ লাভ করেন, তাই তিনি একজন 'মুখাদরাম' মানুষ। তবে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ইসলাম গ্রহণের গৌরব থেকে বঞ্চিত থেকে যান। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের দু'বছর পর ইসলাম গ্রহণ করেন। আবূ খালদা বলেন, একবার আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি রাসূলকে (সা) দেখেছেন? বললেন: আমি তাঁর ওফাতের দু'বছরের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছি।

দাসত্ব থেকে মুক্তি
বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ইসলাম গ্রহণের পর বেশ কিছুকাল দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। অতঃপর তাঁর মনিবা তাঁকে মুক্ত করে দেয়। দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভের ঘটনাটি তিনি নিজে বর্ণনা করেছেন এভাবে: আমি এক মহিলার দাস ছিলম। তিনি যখন আমাকে মুক্তি দানের সিদ্ধান্ত নিলেন তখন তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা তাঁকে এই বলে বিরত রাখার চেষ্টা করে যে, যদি তুমি তাকে মুক্তি দাও তাহলে সে কৃফায় গিয়ে যোগাযোগ ছিন্ন করে দেবে। কিন্তু তিনি মুক্তি দানের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, এ কারণে এক জুম'আর দিন আমার কাছে আসেন এবং আমার কাছে জিজ্ঞেস করে জামি' মসজিদের দিকে চলা শুরু করেন। আমিও তাঁর সাথে চললাম। মসজিদে পৌঁছার পর ইমাম সাহেব আমাকে মিম্বরের উপর দাঁড় করিয়ে দিলেন। মহিলাটি আমার একটি হাত ধরে এই বাক্যগুলো উচ্চারণের মাধ্যমে আমার মুক্তি ঘোষণা করেন: "হে আল্লাহ! আমি আমার আখিরাতের জন্য তাকে তোমার কাছে জমা রাখলাম। মসজিদে উপস্থিত লোকেরা! সাক্ষী থাকুন। এই দাসকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুক্ত করলাম। ভবিষ্যতে তার উপর কারো কোন অধিকার নেই।" এরপর তিনি আমাকে মসজিদে রেখে চলে যান এবং আর কখনো আমাকে দেখা দেননি।

জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি বিশিষ্ট তাবি'ঈদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে ছিলেন। আবুল কাসিম আত-তাবারী বলেন, তাঁর বিশ্বস্ততা ও দৃঢ়তার ব্যাপারে সকলে একমত।

কুরআন
তাঁর অতি প্রিয় ও বিশেষ অধীত বিষয়টি ছিল কিতাবুল্লাহ। আল-কুরআনের শিক্ষা তিনি লাভ করেন কুরআনের বিখ্যাত 'আলিম রাসূলুল্লাহর (সা) বিশিষ্ট সাহাবী হযরত উবায় ইবন কা'বের (রা) নিকট থেকে। এ শিক্ষার শুরু হয় তাঁর দাসত্বের জীবন থেকেই। তিনি নিজেই বলেন, আমি একজন দাস ছিলাম, মনিব পরিবারের সেবা করতাম। আর সেই সাথে কুরআন ও আরবী বই-পুস্তক পড়া শিখতাম। তবে নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষার শুরু হয় বেশ বয়স হলে, ইসলাম গ্রহণের সাত-আট বছর পরে। তিনি বলতেন, আমি তোমাদের নবীর ওফাতের দশ বছর পরে কুরআন পড়েছি।

এত বেশি আগ্রহ, উদ্দীপনা ও অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে তিনি জ্ঞান অর্জন করেন যে, তাবি'ঈদের মধ্যে কুরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিমে পরিণত হন। আবু বাকর ইবন আবী দাউদ বলেন, সাহাবায়ে কিরামের পরে আবুল 'আলিয়ার চেয়ে বড় কুরআনের কোন 'আলিম ছিলেন না। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী (রহ) তাঁকে মুফাস্সির বলে উল্লেখ করেছেন।

হাদীছ
ইবন সা'দ তাঁকে বহু হাদীছের ধারক-বাহক বলেছেন। হযরত 'আলী, 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, আবু আইউব আল- আনসারী, উবায় ইবন কা'ব, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা, ছাওবান, হুযায়ফা, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, রাফি' ইবন খাদীজ, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, আবু হুরায়রা, আনাস ইবন মালিক, আবু যার আল-গিফারী (রা) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ সাহাবায়ে কিরামের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।

হাদীছ গ্রহণে তাঁর সতর্কতা
হাদীছ গ্রহণের ব্যাপারে তিনি দারুণ সতর্ক ছিলেন। যতক্ষণ প্রথম মূল রাবীর (বর্ণনাকারী) মুখ দিয়ে না শুনতেন, ততক্ষণ মধ্যবর্তী রাবীর বর্ণনা গ্রহণ করতেন না। তিনি বলতেন, বসরায় আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের বর্ণনা শুনতাম, কিন্তু ততক্ষণ তাঁর উপর নির্ভর করতাম না যতক্ষণ না নিজে মদীনায় গিয়ে বর্ণনাটির প্রথম সূত্রের মুখ থেকে শুনতাম।

ছাত্র-শিষ্য
তাঁর থেকে যাঁরা জ্ঞানগত ফায়দা হাসিল করেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন: খালিদ আল-হায্যা’, দাউদ ইবন আবী হিন্দ, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, ইউসুফ ইবন 'আবদিল্লাহ, রুবায়' ইবন আনাস, বাকর আল-মুযানী, ছাবিত আন-নাবানী, হুমায়দ ইবন হিলাল, কাতাদা, মানসূর, 'আওফ আল-আ'রাবী, আবু 'আমর ইবন আল-আলা' (রহ) ও আরো অনেকে। ফিতেও তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। বসরার ফকীহদের মধ্যে তাঁকেও গণ্য করা হতো। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে ফকীহ বলে উল্লেখ করেছেন।

সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে তাঁর মর্যাদা
হযরত আবুল 'আলিয়া যদিও একজন দাস ছিলেন, তবে তাঁর অগাধ জ্ঞান ও ব্যাপক মনীষার কারণে অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) এতখানি সম্মান করতেন যে, আবুল 'আলিয়া যখন তাঁর কাছে যেতেন তখন তিনি তাঁকে একটি উঁচু স্থানে নিয়ে বসাতেন। তখন কুরায়শ বংশের অতি সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ তাঁর নীচে বসা থাকতেন। সম্মানের সাথে উচ্চ আসনে বসানোর পর বলতেন, জ্ঞান এভাবে মর্যাদাবান ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেয় এবং দাসকে সিংহাসনে বসায়।

হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) যখন বসরার ওয়ালী তখন একবার আবুল 'আলিয়া তাঁর নিকট যান। ইবন 'আব্বাস তাঁর হাত ধরে নিজের পাশে বসান। তাঁর প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন দেখে তামীম গোত্রের জনৈক ব্যক্তি ধৈর্যহারা হয়ে বলে ওঠে: এতো একজন দাস।

ইবাদত-বন্দেগী
হযরত আবুল 'আলিয়ার যে পরিমাণ জ্ঞান ছিল তাঁর মধ্যে সেই পরিমাণ 'আমলও ছিল। তিনি একজন 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। রাত জেগে 'ইবাদত-বন্দেগী ও কুরআন তিলাওয়াত করার প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও রুচি। জীবনের একটি সময়ে তিনি সারা রাত নামায পড়তেন এবং এক রাতে কুরআন খতম করতেন। কিন্তু এত কঠোর 'ইবাদত সারা জীবন চালিয়ে যেতে পারেননি। তিনি নিজেই বলেন, আমরা কয়েকজন দাস ছিলাম। তাদের কয়েকজন তাদের উপর ধার্যকৃত ট্যাক্স আদায় করতো, আর কয়েকজন করতো মনিবের সেবা। তবে আমরা সকলে সারা রাত জেগে এক রাতে পুরো কুরআন খতম করতাম। কিন্তু একাজ যখন ভীষণ কষ্টকর হয়ে দাঁড়ালো তখন দু'রাতে খতম করতে লাগলাম। কিন্তু এটাও যখন সম্ভব হলো না তখন তিন রাতে করতে লাগলাম। কিন্তু তাও সম্ভব না হওয়ায় আমরা একে অপরকে দোষারোপ করতে আরম্ভ করলাম। অতঃপর আমরা হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সাহাবীদের কাছে গেলাম। তাঁরা বললেন, এক সপ্তাহে খতম কর। তাঁদের দিক নির্দেশনার পর আমরা রাতে নামায পড়ার সাথে সাথে ঘুমাতেও লাগলাম। তখন এই ক্লান্তিকর বোঝা হালকা হতে থাকে। তিনি কুরআন হিফজ (মুখস্থ) করা সম্পর্কে বলতেন: তোমরা পাঁচটি করে আয়াত মুখস্থ করবে। তাতে তোমাদের মাথায় চাপ কম পড়বে এবং বুঝতেও সহজ হবে। জিবরীল (আ) নবীর (সা) নিকট পাঁচটি করে আয়াত নিয়ে আসতেন।

বৈরাগ্যবাদ পরিহার
প্রচুর 'ইবাদত-বন্দেগী করতেন সত্য, তবে রুহানিয়াত বা বৈরাগ্যবাদের সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। এমনকি রাহিব তথা বৈরাগীদের লেবাস-পোশাক পর্যন্ত পছন্দ করতেন না। একবার আবূ উমাইয়্যা আবদুল কারীম পশমী কাপড়ের পোশাক পরে তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য আসেন। তাঁকে দেখে আবুল 'আলিয়া বলেন, এতো রাহিব তথা বৈরাগীদের পোশাক ও পদ্ধতি। মুসলিমগণ যখন পরস্পর পরস্পরের সাথে সাক্ষাতের জন্য যায় তখন ভালো পোশাক পরে যায়। তারপর তিনি আবদুল করীমকে লক্ষ্য করে বলেন: তুমি নিজে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ কর এবং যে এমন কাজ করে তাকে ভালোবাস। আর পাপ কাজ থেকে দূরে থাক। আল্লাহ ইচ্ছা করলে পাপীকে শাস্তি দিতে পারেন, ইচ্ছা করলে মাফও করতে পারেন।

রিয়া তথা আত্মপ্রদর্শনী ভাব থেকে দূরে থাকা
ভালো কাজের প্রকাশকে তিনি দারুণ খারাপ মনে করতেন, কেউ এমন করলে তাকে রিয়াকার বলতেন। আবূ মাখলাদ বলেন, আবুল 'আলিয়া বলতেন, যখন তোমরা কোন ব্যক্তিকে একথা বলতে শুনবে যে, আমি আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা করি, তখন তোমরা তার অনুসরণ করবে না। সুফইয়ান ইবন উয়ায়না বলেন, আবুল 'আলিয়ার নিকট চারজনের বেশি মানুষ সমবেত হলে তিনি তাদেরকে রেখে উঠে চলে যেতেন।

আল্লাহর পথে ব্যয় করা
আল্লাহর পথে ব্যয় করার ব্যাপারে উদার ছিলেন। তিনি নিজের সকল সম্পদ অথবা তার বড় একটা অংশ ভালো কাজের জন্য আল্লাহর পথে ব্যয় করেন। ইবন সা'দের একটি বর্ণনা বাক্য এ রকম: ‘আবুল 'আলিয়া তাঁর সকল সম্পদ (আল্লাহর রাস্তায় খরচের জন্য) অসীয়াত করে যান।’

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, আবুল 'আলিয়া বলেন, আমি সোনা-রূপো যা কিছু রেখে যাচ্ছি তার এক-তৃতীয়াংশ আল্লাহর পথে ব্যয়ের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবার-পরিজনদের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ মুসলমান ফকীর-মিসকীনদের জন্য। অবশ্য এর মধ্য থেকে আমার বেগম সাহেবার অংশ তোমরা দেবে।

রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা
হযরত রাসূলে কারীম (সা) ছিলেন পৃথিবীর সবকিছু থেকে তাঁর সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি। এই প্রিয়তম ব্যক্তির সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত থাকার দুঃখ আজীবন বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন। রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিমাণ অনুমান করা যায় একটি ঘটনা দ্বারা। একদিন রাসূলে কারীমের (সা) খাদিম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) একটি আপেল হাতে নিয়ে আবুল 'আলিয়ার হাতে তুলে দেন। তিনি আপেলটি হাতে নিয়ে ক্রমাগত চুমু দিতে লাগলেন, আর বলতে থাকলেন: যে বরকতময় হাত রাসূলুল্লাহর (সা) হাত স্পর্শ করেছে, সেই হাত এই আপেলটি স্পর্শ করেছে; এই আপেল সেই হাত স্পর্শ করেছে যে হাত রাসূলুল্লাহর (সা) হাত স্পর্শ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছে।

জিহাদ
জিহাদের ময়দানেও আবুল 'আলিয়াকে দেখা যায়। তাঁর একজন সঙ্গী বলেন: আবুল 'আলিয়া হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি 'মা ওয়ারা' আন-নাহ্' অঞ্চলে আযান দেন। তিনি পারসিক ও রোমানদের ভূমিতে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং সেই সকল স্থানে সর্বপ্রথম আযান দেন। উল্লেখ্য যে, মধ্য এশিয়ার জায়হুন ও সায়হুন নদীর অপর তীরের অঞ্চলসমূহকে 'মাওয়ারা' 'আন-নাহ্' বলে।

শিক্ষাদানের বিনিময়ে কোন প্রতিদান গ্রহণ না করা
তিনি ছাত্রদের যে জ্ঞানদান করতেন তার বিনিময়ে কোন কিছু গ্রহণ করা সঙ্গত মনে করতেন না। একবার একটি মজলিসে তিনি ছাত্রদেরকে হাদীছ ও উপদেশ শোনালেন। মজলিস শেষে একজন ছাত্র বিনিময়ে কিছু অর্থ দিতে চাইলেন। আবুল 'আলিয়া তাকে আল্লাহর এই বাণীটি শোনালেন : ‘এবং আমার আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করো না।’ তারপর ছাত্রটির দিকে তাকিয়ে বললেন : ছেলে! আমি তোমাকে যা কিছু শিখিয়েছি তার বিনিময়ে তুমি কোন কিছু কখনো গ্রহণ করবে না। কারণ, জ্ঞানী ও বিজ্ঞ মানুষদের প্রতিদান তো আল্লাহর কাছে রয়েছে। তাওরাতে লিখিত আছে : ওহে আদমের সন্তান! যেভাবে তোমাকে মুক্ত জ্ঞান দান করা হয়েছে সেভাবে তুমিও মানুষকে মুক্ত জ্ঞান দান কর।

ছাত্রটি তার এমন প্রস্তাব ও শিক্ষকের এমন জবাবে ভীষণ লজ্জা পেল। লজ্জায় সে ঘেমে গেল এবং কপালের ঘাম মুছতে লাগলো। আবুল 'আলিয়া ছাত্রের এমন বিব্রতকর অবস্থা লক্ষ্য করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন : ছেলে! লাজুক ও অহঙ্কারী এই দু'শ্রেণীর মানুষ জ্ঞান লাভ করতে পারে না। আমাকে মুহাম্মাদ (সা) এর সাহাবীরা বলেছেন : আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে কোন কিছু করবে না। তাহলে যার উদ্দেশ্যে তুমি কাজটি করলে তার কাছেই তোমাকে সোপর্দ করা হবে।

তারপর তিনি বলেন, আমরা পঞ্চাশ বছর ধরে একথা বলছি যে, মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে আল্লাহ নির্দেশ দেন : তোমরা আমার এই অসুস্থ বান্দার আমলনামায় সেসব কাজ লিখতে থাক যা সে সুস্থ অবস্থায় করতো, যতক্ষণ না আমি তার জান কবজ করি অথবা তার পথ ছেড়ে দিই। আমরা একথাও পঞ্চাশ বছর ধরে বলে আসছি যে, মানুষের সব কর্মই আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করা হয়। যেসব কর্ম কেবল আল্লাহর জন্য করা হয়, সেগুলো দেখে তিনি বলেন : এগুলো আমার এবং আমিই এর প্রতিদান দিব। আর যেগুলো গায়রুল্লাহর জন্য করা হয়, সেগুলো দেখে বলেন : এগুলোর প্রতিদান তার কাছেই চাওয়ার জন্য তোমরা তা করেছো।

তারপর অত্যন্ত আবেগভরা কণ্ঠে নিম্নের কথাগুলো বলে তিনি মজলিস শেষ করেন:
'তোমরা ইসলাম শেখ ও শেখার পর তা আর প্রত্যাখ্যান করো না। সরল-সোজা পথে চলো। আর সেই পথ হলো ইসলাম। এই সরল-সোজা পথ ছেড়ে ডানে-বাঁয়ে যেয়ো না। তোমরা তোমাদের নবী (সা) ও তাঁর সাহাবীদের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরে থাক এবং বিভিন্ন ধরনের মত-পথ থেকে দূরে থাক। বিভিন্ন ধরনের মত-পথ তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন যে আমাকে ইসলামের হিদায়াত দান করেছেন অথবা প্রবৃত্তির অনুসারী মত-পথ থেকে রক্ষা করেছেন- এ দু'টি অনুগ্রহের মধ্যে কোন্টি যে উত্তম তা আমার জানা নেই।

দাসমুক্তি
একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি দাসদের মুক্তি দিতেন। একবার একটি দাসকে তিনি মুক্তি দেন। তার সেই মুক্তির সনদে নিম্নের কথাটি লেখা ছিল: 'একজন মুসলিম একজন নওজোয়ান দাসকে মুক্ত-স্বাধীনভাবে চরে বেড়ানো পশুর মত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুক্তি দিচ্ছে। তার থেকে ভালো কাজ করিয়ে নেয়া ছাড়া তার উপর কারো কোন অধিকার নেই।

যাকাত-সাদাকা
অত্যন্ত নিয়মানুবর্তিতার সাথে যাকাত আদায় করতেন এবং তা বণ্টনের জন্য মদীনায় পাঠিয়ে দিতেন। আবু খালদা বলেন, আবুল 'আলিয়া তাঁর সম্পদের যাকাত নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করার জন্য মদীনায় আহলি-বায়ত তথা নবী-পরিবারের নিকট পাঠিয়ে দিতেন।

গৃহ-যুদ্ধ থেকে দূরে অবস্থান
আবুল 'আলিয়া একজন বীর এবং যুদ্ধে পারদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই বীরত্ব মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রদর্শিত হয়নি। তাঁর সময়ে সিফফীনসহ আরো কতগুলো গৃহ-যুদ্ধ হয় এবং তা থেকে খুব অল্পসংখ্যক মুসলমান নিজেদেরকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়। তিনিও খুব আবেগ-উদ্দীপনার সাথে ঘর থেকে বের হন, কিন্তু পরে রণক্ষেত্র থেকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফিরে আসেন। আবূ খালদা বলেন, আবুল 'আলিয়া বলতেন, 'আলী ও মু'আবিয়ার (রা) মধ্যে যে যুদ্ধ হয়, আমি তখন যুবক। যুদ্ধ তো আমার কাছে উপাদেয় খাবারের চেয়েও বেশি প্রিয় ছিল। এ কারণে আমিও পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে রণাঙ্গনে উপস্থিত হই। এমন বিশাল বাহিনী দেখলাম যার প্রান্তসীমা কোথায় তা দেখা যাচ্ছিল না। একদল তাকবীর ধ্বনি দিলে অন্য দলও তাকবীর দিচ্ছিল। আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, কোন দলকে আমি মু'মিন বলবো এবং কোন দলকে বলবো কাফির এবং কোন দলের সঙ্গেই বা থাকবো। কেউ তো আমাকে যুদ্ধ করতে চাপ প্রয়োগ করেনি। এসব কথা চিন্তার পর সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বেই আমি ফিরে আসি।

সন্দেহ-সংশয় থেকে দূরে অবস্থান
সন্দেহ-সংশয়পূর্ণ জিনিস থেকে এতখানি সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, যাদের আয়- উপার্জনের মধ্যে সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ থাকতো তাদের দেয়া পানিও পান করতেন না। এ কারণে মুদ্রা ব্যবসায়ী এবং ভূমিতে উৎপাদিত ফসলের 'উশর আদায়কারীর দেয়া কোন খাবার খাওয়া তো দূরের কথা তাদের পানিও পান করতেন না। আবূ খালদা বলেন, একবার আমি আবুল 'আলিয়ার নিকট গেলাম। তিনি খাবার আনলেন। কিছু সবজির তরকারিও ছিল। সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এ তেমন তরকারি নয় যাতে হারামের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা আছে। এ তরকারি আমার ভাই আনাস ইবন মালিক (রা) তাঁর খামার থেকে পাঠিয়েছেন। বললাম, তরকারিতে এমন কি থাকে যে খাওয়া যায় না। বললেন, সবজি সব সময় নোংরা ও ময়লা আবর্জনার স্থানে ভালো জন্মায়, যেখানে পেশাব-পায়খানা করা হয়।

তিনি অত্যন্ত সরল-সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কোন লোক- লৌকিকতা ও আচার-অনুষ্ঠানের পরোয়া করতেন না। এ কারণে তাঁকে কেন্দ্র করে কোন রকম তোড়জোড় ও বিশেষ ব্যবস্থাপনা মোটেই পছন্দ করতেন না। কোথাও গেলে গৃহকর্তাকে আগেই বলে দিতেন, ঘরে যা কিছু আছে তাই খাওয়াবে, বাজার থেকে কোন কিছু কেনাকাটা যেন তার জন্য করা না হয়।

ওফাত
সঠিক বর্ণনা মতে হিজরী ৯৩ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে ভিন্ন একটি বর্ণনা মতে হিজরী ৯০ সনের শাওয়াল মাসে মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যু হয়। হিজরী ১০৬ ও ১১১ সনেও তাঁর মৃত্যুর কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে ইবন হিব্বান ও বুখারী হিজরী ৯৩ সনের উপর জোর দিয়েছেন। মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্ব থেকে তিনি প্রতি মাসে একবার করে নিজের জন্য প্রস্তুতকৃত কাফনের কাপড় পরে আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের সাথে সাক্ষাতের অনুশীলন করতেন।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬১; তাহযীব আল-কামাল-৬/২২০
২. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯২
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২২৫
৪. তাহযীব আল-কামাল-৬/২২১
৫. আত-তাবাকাত-৭/৮১; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৩
৬. তাহযীব আল-আসমা'-১/২২৫
৭. আত-তাবাকাত-৭/৮২
৮. তাহযীব আল-কামাল-৬/২২১
৯. প্রাগুক্ত-৬/২২২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬১
১০. শাযারাত আয-যাহাব-১/১০২
১১. আত-তাবাকাত-৭/৮৫
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/৩৮৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬১
১৩. আত-তাবাকাত-৭/৮২; তাবি'ঈন-৫৩৮
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/৩৮৪
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬১
১৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-৬/২২২
17. আত-তাবাকাত-৭/৮২; তাহযীব আল-কামাল-৬/২২২
১৮. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৩
১৯. প্রাগুক্ত-৩৯৭; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/২১৯
২০. আত-তাবাকাত-৭/৮৩; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৬
২১. আত-তাবাকাত-৭/৮১
২২. তাহযীব আল-কামাল-৬/২২২
২৩. আত-তাবাকাত-৭/৮১
২৪. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৮
২৫. প্রাগুক্ত
২৬. সূরা আল-বাকারা-৪১
২৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া-২২০
২৮. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৬
২৯. প্রাগুক্ত-৩৯৭; হিলইয়াতুল আওলিয়া-২/২১৯
৩০. প্রাগুক্ত
৩১. আত-তাবাকাত-৭/৮৪
৩২. প্রাগুক্ত
৩৩. প্রাগুক্ত
৩৪. প্রাগুক্ত
৩৫. প্রাগুক্ত
৩৬. শাযারাত আয-যাহাব-১/১০২; তাবি'ঈন-৫৪১
৩৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬২; তাহযীব আল-কামাল-৬/২২৩
৩৮. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৪৭
৩৯. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৯৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px