📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আবূ বুরদা ইবন আবী মূসা আল-আশ‘আরী (রা)

📄 আবূ বুরদা ইবন আবী মূসা আল-আশ‘আরী (রা)


আবূ বুরদা ডাকনাম, আসল নাম 'আমির মতান্তরে আল-হারিছ। ডাক নামেই তিনি প্রসিদ্ধ। বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ মূসা আল-আশ'আরীর (রা) পুত্র। কুফার একজন বিখ্যাত ফকীহ্ তাবি'ঈ। তথাকার কাজীও ছিলেন। আল-মাদায়িনী বলেন, তাঁর পিতা আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) 'উমার অথবা 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে যখন বসরার আমীর ছিলেন তখন আবূ বুরদার জন্ম হয়।

তাঁর মহান পিতা হযরত আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) ছিলেন একজন উঁচুমানের সাহাবী। তিনি তাঁর এই পুত্রকে শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে বিখ্যাত সাহাবী হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন সালামের (রা) নিকট পাঠিয়ে দেন। উল্লেখ্য যে, ইসলাম পূর্ব জীবনে এই 'আবদুল্লাহ ইবন সালাম ছিলেন মদীনায় ইহুদীদের একজন বড় 'আলিম। তাঁর নিকট যাওয়ার ঘটনাটি আবূ বুরদা বর্ণনা করেছেন এভাবে আমার মুহতারাম পিতা আমাকে জ্ঞান অর্জনের জন্য 'আবদুল্লাহ ইবন সালামের (রা) নিকট পাঠান। আমি যখন তাঁর কাছে গেলাম, তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, ভাতিজা! তোমরা এক ব্যবসা কেন্দ্রে বসবাস কর। এ কারণে এদিকে দৃষ্টি রাখবে যে, যখন কারো উপর তোমাদের কিছু অর্থ-সম্পদ পরিশোধ করা ওয়াজিব হয় তখন যদি সে তোমাদেরকে খুশী করার জন্য অতিরিক্ত এক আটি ঘাসও দেয় তাহলে তা গ্রহণ করবে না। কারণ তা সুদ হবে।

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, আমি যখন মদীনায় গেলাম এবং 'আবদুল্লাহ ইবন সালামের (রা) সাথে সাক্ষাৎ করলাম তখন তিনি বললেন, চলো, যে ঘরে রাসূল (সা) প্রবেশ করে সালাত আদায় করেন তুমিও সেখানে গিয়ে সালাত আদায় করবে। তোমাকে খেজুর ও ছাতু খাওয়াবো। তারপর বলেন: ভাতিজা! তোমরা এমন এক স্থানে বসবাস কর যেখানে সুদ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তোমরা এমন মানুষ যে, যখন তোমাদের ওখানে কেউ কোন ব্যক্তিকে করজ (ঋণ) দেয় এবং তা পরিশোধের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায় তখন মাকরূজ (ঋণ গ্রহীতা) খাদ্য-খাবারের একটি পুটলি এবং ঘাসের একটি বোঝা সংগে নিয়ে হাজির হয়। এটা সুদ হবে।

জ্ঞান ও মনীষা
হযরত আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) ও 'আবদুল্লাহ ইবন সালামের (রা) শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে এবং অন্য সব মহান ব্যক্তির সাহচর্যের কল্যাণে আবূ বুরদা অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন:
আবূ মূসা আল-আশ'আরীর (রা) পুত্র আবূ বুরদা একজন ফকীহ্ ও দৃঢ়পদ ইমামদের একজন।
ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর বিশ্বস্ততা ও মহত্ত্বের ব্যাপারে সকলে একমত।

হাদীছ
তিনি ছিলেন হাদীছের বিশিষ্ট হাফিজদের মধ্যে একজন। ইবন সা'দ বলেন : তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, বহু হাদীছের ধারক-বাহক। এ বিষয়ে তিনি আবূ মূসা আল-আশ'আরী, 'আলী ইবন আবী তালিব, হুযায়ফা ইবন আল-ইয়ামান, 'আবদুল্লাহ ইবন সালাম, আ'য়ায আল-মুযানী, মুগীরা ইবন শু'বা, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'উরওয়া ইবন যুবায়র, আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ আত-তায়মী (রা) প্রমুখ সাহাবী ও তাবি'ঈর নিকট থেকে ফায়দা হাসিল করেন।

তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: তাঁর পুত্র সা'ঈদ ও বিলাল, পৌত্র ইয়াযীদ এবং অন্যদের মধ্যে ইমাম শা'বী, ছাবিত আন-নাবানী, হুমায়দ ইবন হিলাল, 'আবদুল মালিক ইবন নুমায়র, কাতাদা, আবু ইসহাক সুবায়'ঈ (রহ) প্রমুখ।

ফিক্হ শাস্ত্রে তিনি বিশেষ স্থানের অধিকারী ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে ইমাম ও ফকীহ বলেছেন। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞানের কারণে কাজী শুরায়হ-এর পরে তিনি কুফার কাজীর পদে অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হন। পরে তাঁর পুত্র বিলাল তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

নৈতিক গুণাবলী
নৈতিক গুণাবলীর তিনি বাস্তব রূপ ছিলেন। তাঁর ব্যক্তি সত্তায় সকল নৈতিক গুণ ও সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটেছিল। ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব যখন খুরাসানের ওয়ালী ছিলেন তখন তাঁর বহু গুণ বিশিষ্ট একজন লোকের প্রয়োজন পড়ে। তিনি লোকদের বললেন, আমাকে এমন একজন লোক দাও যার মধ্যে উত্তম বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে। লোকেরা আবূ বুরদার নাম বলে। ইয়াযীদ তাঁকে ডেকে এনে কথা বলেন এবং তাঁকে উত্তম ব্যক্তি রূপে দেখতে পান। আবূ বুরদার কথায় তিনি দারুণ মুগ্ধ হন। পরীক্ষার পর তিনি তাঁকে বলেন, আমি আপনাকে অমুক অমুক পদে নিয়োগ করলাম।

আবূ বুরদা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। ইয়াযীদ তাঁর কথা মানলেন না। তখন আবূ বুরদা নিজের অক্ষমতার সপক্ষে এ দলীল উপস্থাপন করেন যে, আমার মহান পিতা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলতেন, যে ব্যক্তি এমন কোন পদ গ্রহণ করে যে সম্পর্কে নিজেই জানে যে সে তার উপযুক্ত নয়, তাহলে জাহান্নামকে নিজের ঠিকানা বানানোর জন্য তার প্রস্তুত থাকা উচিত হবে। হিজরী ১০৩ অথবা ১০৪ সনে কৃষ্ণায় তাঁর ইনতিকাল হয়। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮০ বছরের উপরে।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল-১৯/৪৮
২. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/২২
৩. আত-তাবাকাত-৫/১৮৭
৪. প্রাগুক্ত
৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯৫
৬. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৭৯
৭. প্রাগুক্ত; আত-তাবাকাত-৫/১৮৭; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৫০
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/১৮
৯. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৫০
১০. আত-তাবাকাত-৫/১৮৭; শাজারাত আয-যাহাব-১/১২৬
১১. আত-তাবাকাত-৫/১৮৭; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৫২; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৫

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 কা‘ব আল-আহবার (রহ)

📄 কা‘ব আল-আহবার (রহ)


হযরত কা'ব-এর (রহ) ডাকনাম আবু ইসহাক, পিতার নাম মাতি' ইবন হানযু'। তিনি ছিলেন ইয়ামনের বিখ্যাত হিময়ার গোত্রের শাখা গোত্র "আলে যী রু'আইন"-এর সন্তান।

ইসলাম গ্রহণ ও মদীনায় আগমন
হযরত কা'ব (রহ) একজন বিখ্যাত তাবি'ঈ। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি একজন ইহুদী 'আলিম ছিলেন। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায়ও তিনি বিদ্যমান ছিলেন, কিন্তু সঠিক বর্ণনা মতে সে সময় ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হন। একটি বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, সে সময়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইমাম আশ-শাতিবী বর্ণনা করেছেন, কা'ব বলেন: হযরত 'আলী (রা) যখন ইয়ামন আসেন তখন আমি তাঁর নিকট যেয়ে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) পরিচয় ও গুণ-বৈশিষ্ট্য জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন। আমি তা শুনে একটু মৃদু হাসি। 'আলী (রা) আমার এ মৃদু হাসির কারণ জিজ্ঞেস করেন। আমি বলি: আমাদের ধর্মে শেষ যামানার নবীর যে সব আলামত বলা হয়েছে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সাথে তার মিল থাকায় হেসেছি। এরপর আমি মুসলমান হয়ে যাই এবং মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে থাকি। তবে ইয়ামনেই থেকে যাই। 'উমারের (রা) খিলাফতকালে হিজরাত করে মদীনায় যাই। আফসোস! আমি যদি সেই পূর্বেই হিজরাত করতাম। আরেকটি বর্ণনা এ রকম এসেছে যে, তিনি হযরত আবূ বাকরের (রা) খিলাফতকালে ইসলাম গ্রহণ করেন।

উপরের দু'টি বর্ণনাই দুর্বল বলে মুহাদ্দিছগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সঠিক বর্ণনা সেটাই যা ইবন সা'দ কা'বের হালীফ তথা চুক্তিবদ্ধ আশ্রয়দাতা হযরত 'আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনা দ্বারা খোদ কা'বের বক্তব্যেই হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) খিলাফতকালে তাঁর ইসলাম গ্রহণ প্রমাণিত হয়। সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) বর্ণনা করেছেন। হযরত 'আব্বাস (রা) কা'ব ইসলাম গ্রহণের পর তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, আবু বাকরের (রা) সময়ে ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকার এমনকি কারণ ছিল যে, এখন 'উমারের (রা) সময় ইসলাম গ্রহণ করছেন? জবাবে তিনি বলেন: আমার পিতা তাওরাত থেকে কিছু অংশ লিখে আমাকে দেন এবং উপদেশ দেন আমি যেন তার উপর 'আমল করি। তারপর ধর্মীয় সকল গ্রন্থের উপর সীল-মোহর লাগিয়ে আমাকে পিতৃত্বের অধিকারের কসম করিয়ে অঙ্গীকার নেন, আমি যেন এই সীল-মোহর না খুলি। এজন্য আমি তা খুলিনি এবং পিতার দেয়া লেখার উপর 'আমল করতে থাকি। যখন ইসলামের প্রচার-প্রসার ও তার প্রাধান্য পেতে থাকে এবং কোন ভয়-ভীতির অবকাশ থাকলো না তখন আমার মনে হলো, আমার পিতা আমার নিকট কিছু 'ইল্‌ম গোপন করে গেছেন। এখন আমার এই সীল-মোহরকৃত গ্রন্থগুলো খুলে দেখা উচিত। অতঃপর আমি সীল-মোহর ভেঙ্গে গ্রন্থগুলো পাঠ করি। তাতে আমি মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর উম্মাতের পরিচয় ও গুণ-বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই। সেই সময় আমার নিকট প্রকৃত সত্য প্রকাশ পায়। এজন্য আমি এখন এসে ইসলাম গ্রহণ করেছি। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহর (সা) চাচা হযরত 'আব্বাসের (রা) সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে থাকেন।

তাঁর জ্ঞান ও মনীষা
হযরত কা'ব (রহ) ছিলেন ইহুদীদের একজন বিশিষ্ট ও বিখ্যাত 'আলিম। ইহুদী ধর্ম সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল অতি ব্যাপক। ইমাম যাহাবী লিখেছেন, তিনি ছিলেন জ্ঞানের ভাণ্ডার এবং আহলি কিতাবদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম। ইমাম নাওবী লিখেছেন, তাঁর ব্যাপক জ্ঞান ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সকলে একমত। অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার কারণে তাঁকে "কা'ব আল-আহবার" এবং "কা'ব আল-হাবর" বলা হতো। তাঁর গুণ-বৈশিষ্ট্য অনেক। তাঁর জ্ঞানগর্ভ অনেক কথা ও মন্তব্য অতি প্রসিদ্ধ। অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁর গভীর জ্ঞানের কথা স্বীকার করতেন। হযরত আবু দারদা' আল-আনসারী (রা) কা'বের সাথে হিমসে এক সাথে ছিলেন। তিনি বলতেন, ইবন হিময়ারের নিকট বহু জ্ঞান আছে। আমীর মু'আবিয়া (রা) বলতেন, আবুদ দারদা' (রা) হাকীম তথা মহাজ্ঞানীদের অন্তর্গত, আর কা'ব 'আলিমদের অন্তর্গত। তার নিকট সাগরের মত সীমাহীন জ্ঞান ছিল।

যেহেতু তিনি একটি ধর্মের একজন বড় 'আলিম ছিলেন, এ কারণে ইসলামী জ্ঞানের সাথেও তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তিনি কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান লাভ করেন মদীনায় সাহাবায়ে কিরামের (রা) নিকট থেকে এবং অন্যদিকে সাহাবায়ে কিরামও তাঁর নিকট আহলি কিতাবের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন। কুরআন ও সুন্নাহ্র জ্ঞান তিনি লাভ করেন হযরত 'উমার, সুহায়ব ও উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশার (রা) নিকট থেকে। অন্যদিকে তাঁর নিকট ইসরাঈলিয়াত বা বনী ইসরাঈলের জ্ঞান লাভ করেন সাহাবীদের মধ্যে আবূ হুরায়রা, মু'আবিয়া, ইবন 'আব্বাস (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে মালিক ইবন আবী 'আমির আসবাহী, 'আতা ইবন আবী রাবাহ, আবদুল্লাহ ইবন রিয়াহ আনসারী, 'আবদুল্লাহ ইবন হামযা সুলুলী, আবু রাফে' সায়িগ, 'আবদুর রহমান ইবন শু'আয়ব (রহ) সহ বিরাট একটি দল।

'ইল্ম, 'উলামা ও 'ইল্মের ক্ষয় ও পতন সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য
একবার তিনি প্রখ্যাত সাহাবী হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: কা'ব! প্রকৃত 'আলিম কারা? জবাব দেন যারা 'ইল্ম অনুযায়ী 'আমল করে। ইবন সালাম আবার জিজ্ঞেস করেন 'আলিমদের অন্তর থেকে 'ইল্যু দূর করে দেবে কোন জিনিস? বলেন: লোভ এবং মানুষের সামনে নিজের অভাব ও প্রয়োজনের কথা বলা ও প্রত্যাশা করা। 'আবদুল্লাহ ইবন সালাম বলেন: আপনি সত্য বলেছেন।

শামে অবস্থান
কা'বের পৈত্রিক ধর্ম ছিল ইহুদী। এ কারণে প্রথম থেকেই শামের সাথে তাঁর হৃদয়ের সম্পর্ক ছিল। ইসলামের দৃষ্টিতেও এ ভূমি অতি পবিত্র ও সম্মানিত। এ কারণে কিছুকাল মদীনায় থাকার পর তিনি শামে চলে যান এবং হিমসে আবাসন গড়ে তোলেন।

জনগণকে উপদেশ দান
শামে অবস্থানকালে তাঁর প্রধান কাজ ছিল ইসরাঈলী কিস্সা-কাহিনী ভিত্তিক মানুষকে উপদেশ দান করা। একবার 'আওফ ইবন মালিক (রা) উপদেশ দানরত অবস্থায় তাঁকে বললেন: আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে শুনেছি, আমীর, দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তি ও বয়স্কদের সামনে ছাড়া আর কাউকে কিস্সা-কাহিনী শোনানো উচিত নয়। এরপর তিনি ওয়াজ ছেড়ে দেন। অবশ্য পরে স্থানীয় আমীরের নির্দেশে আবার একাজ আরম্ভ করেন।

ইসলামী বর্ণনার মধ্যে ইসরাঈলী বর্ণনার প্রবেশ
হযরত কা'বের গভীর জ্ঞান ও মনীষার ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ নেই। তিনি ইহুদী ধর্মের একজন খ্যাতিমান 'আলিম ছিলেন। তবে ইহুদীদের জ্ঞানের বেশির ভাগ উৎস ছিল কিস্সা-কাহিনী। হযরত কা'বের জ্ঞানের উৎসও ছিল তাই। এ কারণে একটি বড় ক্ষতি এই হয়েছে যে, অনেক ভিত্তিহীন ইসরাঈলী কাহিনী ইসলামী গ্রন্থাবলীতে ঢুকে গেছে। তাই কোন কোন ইমাম কা'বের বর্ণনাসমূহকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। অবশ্য এ ব্যাপারে আমাদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, আমাদের পূর্ববর্তীকালের পণ্ডিত-মনীষীগণ বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন এবং তাঁরা যথাসময়ে এবং যথাস্থানে তা চিহ্নিতও করে গেছেন।

ওফাত
হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফাতকালে হিজরী ৩২ সনে তিনি হিমসে ইনতিকাল করেন। অপর একটি বর্ণনায় হিজরী ৩৪ সনের কথা এসেছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১০৪ বছর।

কা'ব বলতেন, আমার ওজনের সমপরিমাণ সোনা আমি সাদাকা হিসেবে দান করি- তার চেয়ে আল্লাহর ভয়ে আমি কাঁদি- এ আমার অধিকতর প্রিয়। পার্থিব জীবনে যে দু'টি চোখ আল্লাহর ভয়ে কেঁদে পানি ঝরায় পরকালীন জীবনে সেই দু'টি চোখকে উৎফুল্ল রাখা আল্লাহর দায়িত্ব।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৫/৩৯৯, ৪০০
২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫২
৩. আল-ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাহাবা-৩/৩১৫-৩১৬; তাহযীব আল-কামাল-১৫/৩৯৯
৪. আত-তাবাকাত-৭/১৫৬; তাহযীব আল-কামাল-১৫/৪০০
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫২
৬. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৯
৭. আল-ইসাবা-৩/৩১৫
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৪৩৮; তাহযীব আল-কামাল-১৫/৩৯৯
৯. আল-ইসাবা-৩/৩১৬; তাহযীব আল-কামাল-১৫/৪০১
১০. প্রাগুক্ত; আত-তাবাকাত-৭/১৫৬
১১. আল-ইসাবা-৩/৩১৬; তাবি'ঈন-৩৯২
১২. আত-তাবাকাত-৭/১৫৬; তাহযীব আল-কামাল-১৫/৪০০
১৩. তাহযীব আল-কামাল-১৫/৪০১

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আবূ ‘উছমান আন-নাহ্দী (রহ)

📄 আবূ ‘উছমান আন-নাহ্দী (রহ)


হযরত 'আবদুর রহমানের (রহ) ডাকনাম আবূ 'উছমান এবং এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। তিনি ছিলেন একজন "মুখাদরাম" ব্যক্তি অর্থাৎ জাহিলী ও ইসলামী উভয় যুগ লাভ করেন। জাহিলী যুগে সাধারণ আরববাসীর মত মূর্তিপূজক ছিলেন। ইসলামের অভ্যুদয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) দর্শন ও সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত থেকে যান। কিন্তু যাকাত-সাদাকা সব সময় রাসূলুল্লাহর (সা) তাহসীলদারের হাতে তুলে দিতেন। আবূ 'উছমানের পিতার নাম মালু ইবন 'আমর। আবূ 'উছমান কৃফার অধিবাসী ছিলেন।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) আবির্ভাবের খবর প্রথম যে ভাবে লাভ করেন সে সম্পর্কে তিনি পরবর্তীকালে বলতেন: আমি তখন ১৭ বছরের এক তরুণ। একদিন আমি একটি উপত্যকায় আমাদের উট চরাচ্ছিলাম, তখন সেই পথে আমার পাশ দিয়ে তিহামার একজন লোক যাচ্ছিলেন। আমি তাকে বললাম, শুনেছি আপনাদের মাঝে নাকি একজন 'সাবী' বা ধর্মত্যাগীর আবির্ভাব হয়েছে? ব্যাপারটা কী একটু বলুন তো? তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! একজন লোকের আবির্ভাব হয়েছে, যে মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান জানায়। সে নিজেদের পারস্পারিক সম্পর্ক বিনষ্ট করে ফেলেছে।

প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফতকালে তাঁর অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) খিলাফতকালে প্রথম মদীনায় আসেন এবং ইরাকের অধিকাংশ অভিযান যথা: কাদেসিয়া, জাল্লা, তুসতার, নিহাওয়ান্দ, সারওয়ান্দ, ইয়ারমুক প্রভৃতিতে অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করেন।

জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞানের জগতে তেমন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন না। তবে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সালমান আল-ফারেসীর (রা) সাহচর্যে বারো বছর ছিলেন। এই মোবারক সাহচর্যের কল্যাণে তিনি এত পর্যাপ্ত জ্ঞানের অধিকারী হন যে, তাঁকে বড় বড় 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করা হতে থাকে।

হাদীছ
হযরত 'উমার, 'আলী, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, তালহা, সালমান আল-ফারেসী, আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ, হুযায়ফা, আবূ যার আল-গিফারী, উবায় ইবন কা'ব, উসামা ইবন যায়দ, বিলাল, হানজালা আল-কাতিব, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ সাহাবায়ে কিরামের সূত্রে বর্ণিত তাঁর হাদীছ পাওয়া যায়।

ছাবিত আল-বানানী, কাতাদা, আসিম আল-আহওয়াল, সুলায়মান আত-তায়মী, খালিদ আল-হায্যা', আইউব আস-সাখতিয়ানী, হুমায়দ আত-তাবীল (রহ) প্রমুখের মত বিশিষ্ট 'আলিম তাবি'ঈগণ তাঁর নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।

'ইবাদত-বন্দেগী
'ইবাদত-বন্দেগী ও তাকওয়া-পরহেযগারী ছিল হযরত আবু 'উছমানের বিশেষ গুণ। এ ক্ষেত্রে তিনি সমকালীনদের মধ্যে বিশিষ্ট বলে গণ্য হতেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন, তিনি ছিলেন একজন 'আলিম, কায়িমুল লায়ল ও সায়িমুন নাহার- অর্থাৎ জ্ঞানী, রাতে সালাত আদায়কারী ও দিনে সাওম পালনকারী। এত বেশি সালাত আদায় করতেন যে, মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়তেন।

সকল প্রকার পাপ থেকে সব সময় দূরে থাকতেন। তাঁর ছাত্র সুলায়মান আত-তায়মী বলেন, তাঁর এমন অবস্থা দেখে আমার ধারণা হয়, তাঁর দ্বারা কখনো কোন পাপ কাজ সংঘটিত হয়নি।

আল্লাহর যিক্র
তিনি বলতেন, আমি জানি, আল্লাহ আমাকে কখন স্মরণ করেন। জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করেন : কিভাবে? বললেন: আল্লাহ বলেছেন: "ফাযকুরূনী আযকুরকুম" - 'তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করবো।' এ কারণে আমি যখন তাকে স্মরণ করি তিনিও আমাকে স্মরণ করেন এবং যখন আমরা তাঁর নিকট দু'আ করি তখন তিনি তা কবুল করেন। কারণ, তিনি বলেছেন :
"তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।"

আহলি বায়ত বা নবী-বংশের সাথে সম্পর্ক
আহলি বায়তের প্রতি ছিল তাঁর প্রচণ্ড ভক্তি ও ভালোবাসা। তিনি কৃষ্ণায় বসবাস করতেন। কিন্তু কারবালায় ইমাম হুসায়নের (রা) শাহাদাতের দুঃখজনক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর তিনি চিরদিনের জন্য কৃষ্ণা ছেড়ে বসরায় আবাসন গড়ে তোলেন। কারণ হিসেবে বলতেন, আমি এমন শহরে অবস্থান করতে পারিনে যেখানে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) দৌহিত্র শাহাদাত বরণ করেছেন।

ওফাত
মৃত্যু সন নিয়ে মতপার্থক্য আছে। সঠিক বর্ণনা মতে হিজরী ১০০ সন অথবা এর কাছাকাছি সময়ে ইনতিকাল করেন। প্রায় এক শো তিরিশ বছর জীবন লাভ করেন। হিজরী ৯৫ সনের কথাও বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
১. তাহযীব আত-তাহযীব-৬/২৭৭
২. খাতীব আল-বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ-১০/২০৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৫
৩. তাহযীব আল-কামাল-১১/৩৮৪
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৬/২৭৮
৫. তারীখু বাগদাদ-১০/২০৪
৬. শাজারাত আয-যাহাব-১/১১৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৬
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৬/২৭৮; তাহযীব আল-কামাল-১১/৩৮৩-৩৮৪
৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৬; তাহযীব আল-কামাল-১১/৩৮৪
৯. প্রাগুক্ত
১০. সূরা আল-বাকারা-১৫২
১১. সূরা গাফির-৬০
১২. আত-তাবাকাত-৭/৬৯; তাহযীব আল-কামাল-১১/৩৮৫
১৩. প্রাগুক্ত
১৪. তারীখু বাগদাদ-১০/২০৫; তাহযীব আল-কামাল-১১/৩৮৫

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ইউনুস ইবন ‘উবায়দ (রহ)

📄 ইউনুস ইবন ‘উবায়দ (রহ)


হযরত ইউনুসের (রহ) ডাকনাম আবূ ‘উবায়দ মতান্তরে আবূ ‘আবদিল্লাহ। তিনি বানু ‘আবদিল কায়সের দাস ও বসরার অধিবাসী ছিলেন।

জ্ঞান ও মনীষা
যদিও দাসত্ত্বের বেড়ী তাঁর কণ্ঠে ঝোলানো ছিল, কিন্তু তা জ্ঞানের আলো থেকে তাঁকে দূরে রাখতে পারেনি। তিনি তাবি‘ঈকূল শিরোমণি হযরত হাসান আল-বাসরীর (রহ) খাস সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে ছিলেন। আর এই সাহচর্য ও এক সাথে উঠাবসা তাঁকে জ্ঞান ও কর্মে ঐশ্বর্যবান করে তোলে। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে ইমাম, হুজ্জাত (প্রমাণ) ও অনুসরণীয় নেতা বলেছেন। ইমাম নাওবী (রহ) তাঁর বিশ্বস্ততা, দৃঢ়তা ও মহত্ত্বের ব্যাপারে সকলের ঐকমত্যের কথা বলেছেন। তিনি একথাও বলেছেন যে, ইউনুস ছিলেন একজন উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন তাবি‘ঈ। ইবন হিব্বান বলেছেন, তিনি জ্ঞান, মনীষা, স্মৃতিতে ধারণশক্তি, দৃঢ়তা, সুন্নাহর অনুসরণ, বিদ‘আতীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষণ, দিব্যদৃষ্টি, দীনী বিষয়ে গভীর অনুধাবন শক্তি এবং বহু হাদীছ স্মৃতিতে ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর যুগের নেতৃস্থানীয়দের অন্যতম ছিলেন।

হাদীছ
তিনি তাঁর যুগের হাদীছের বিশিষ্ট হাফিজদের মধ্যে ছিলেন। ইবন সা‘দ বলেন: ‘তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, বহু হাদীছের ধারক-বাহক।’ তিনি তাঁকে বসরাবাসী মুহাদ্দিছগণের চতুর্থ তবকায় স্থান দিয়েছেন।

সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে তিনি হযরত আনাস ইবন মালিকের দর্শন ও সাক্ষাৎ লাভ করেন, তবে তাঁর থেকে কোন হাদীছ শোনার সৌভাগ্য হয়নি। তিনি হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে সবচেয়ে বেশি অর্জন করেছেন। তারপর মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, ছাবিত আন-নাবানী, ‘আবদুর রহমান ইবন আবী বাকরা, হাকীম ইবন ‘আন-আ’রাজ, নাফি‘ মাওলা ইবন ‘উমার (রা), হুমায়দ ইবন বিলাল, ‘আতা’ ইবন আবী রাবাহ (রহ) প্রমুখের নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন।

হাদীছ চর্চার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর অধিকাংশ সমকালীনের শীর্ষে ছিলেন। সা‘ঈদ ইবন ‘আমির বলেন, আমি ইউনুস ইবন ‘উবায়দের চেয়ে উত্তম কাউকে পাইনি। সকল বসরাবাসীর এই মত। আবু হাতিম বলতেন, তিনি সুলায়মান আত-তায়মীর চেয়েও উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তায়মী তাঁর স্থানে পৌছাতে পারতেন না। সালামা ইবন ‘আলকামা বলেন, ‘আমি ইউনুসের মজলিসে বসেছি, কিন্তু তাঁর একটি কথাও ভুল ধরতে পারিনি।’

এত জ্ঞান ও যোগ্যতা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনায় দারুণ সতর্ক ছিলেন। হাদীছ বর্ণনার পর সব সময় তিনবার “আস্তাগফিরুল্লাহ” পাঠ করতেন। আর এই সতর্কতার কারণেই হাদীছ লিখতেন না। তিনি বলতেন, আমি কখনো কিছু লিখিনি।

ছাত্রবৃন্দ
তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ছাত্র হলেন: তাঁর পুত্র ‘আবদুল্লাহ, শু‘বা, ছাওরী, উহাইর, হাম্মাদ, ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘ঈসা, খায্যায, খারিজা ইবন মুস‘আব ও আরো অনেকে।

জ্ঞান অর্জনে তাঁর অকপটতা ও নিষ্ঠা
তাঁর জ্ঞান অর্জন ও চর্চা খ্যাতি ও নাম-কামের জন্য ছিল না; বরং কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ছিল। হিশাম ইবন হুসাম বলেন, আমি ইউনুস ইবন ‘উবায়দ ছাড়া এমন কাউকে পাইনি যার জ্ঞান চর্চা ছিল শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

নৈতিক গুণাবলী
অগাধ জ্ঞানের সাথে ‘আমলও (কর্ম) সেই পর্যায় ও মানের ছিল। ‘আকীদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে ছিলেন ভীষণ কঠোর এবং মত পথের ব্যাপারে ছিলেন দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি ছিলেন সুন্নাহর বড় পাবন্দ, বিদ‘আতের প্রতি দারুণ ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণকারী এবং দিব্য জ্ঞানের অধিকারী একজন মানুষ। ‘আকীদার ব্যাপারে এত কঠোর ছিলেন যে, নতুন কোন চিন্তা-বিশ্বাসকে কাবীরা গুনাহর চেয়েও মারাত্মক মনে করতেন। একবার তিনি তাঁর পুত্রকে বলেন, আমি তোমাকে সুদ, চুরি, মদপান ইত্যাদি কাজ থেকে বিরত থাকতে বলি। কিন্তু ‘আমর ইবন ‘উবায়দ ও তার সাথীদের চিন্তা-বিশ্বাসকে গ্রহণ করে তাঁদের সাথে মিলিত হওয়ার চেয়ে উপরোক্ত পাপে লিপ্ত হয়ে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়াকে আমি বেশি পছন্দ করি। উল্লেখ্য যে, ‘আমর ইবন ‘উবায়দ ছিলেন ‘একজন বুদ্ধিবাদী মু‘তাযিলা।’

বিদ‘আতীদের ‘ইবাদত-বন্দেগীকেও তিনি কোন ছাওয়াবের কাজ বলে মনে করতেন না। একবার জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আমার একজন মু‘তাযিলা প্রতিবেশী অসুস্থ আছে, আমি তাঁকে দেখতে যেতে চাই। বললেন, ছাওয়াবের নিয়্যাতে যাবে না।

ফরয ব্যতীত খুব বেশি নফল নামায-রোযা করতেন না। তবে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের অধিকার ও ফরয আদায়ের ব্যাপারে সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকতেন। সাল্লাম ইবন মুতী‘ বলেন, ইউনুস খুব বেশি নামায-রোযা করতেন না। তবে আল্লাহর কসম! যখন আল্লাহর অধিকারের সময় হতো তখন তিনি তা প্রতিপালনের জন্য বিলম্ব করতেন না।

জিহাদকে সর্বোত্তম ‘ইবাদত বলে বিশ্বাস করতেন। কোন কারণে জিহাদে যোগদান করতে না পারলে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়তেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে অস্থিরতা বিদ্যমান থাকতো। ইসহাক ইবন ইবরাহীম বলেন, ইউনুস অন্তিম রোগ শয্যায় শুয়ে তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদতেন। লোকেরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেন, এ পা আল্লাহর রাস্তায় ধুলিমলিন হয়নি। মুখ থেকে সব সময় কালিমায়ে ইস্তিগফার অর্থাৎ আস্তাগফিরুল্লাহ উচ্চারিত হতো। ‘আবদুল মালিক ইবন মূসা বলেন, আমি তাঁর চেয়ে বেশি আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনাকারী আর দেখিনি।

সততা ও সাধুতা
ব্যবসা ছিল তাঁর পেশা। এর মাধ্যমে তিনি জীবিকা উপার্জন করতেন। রেশমী বস্ত্রের ব্যবসা করতেন। ব্যবসায়িক সততায় এত বাড়াবাড়ি করতেন যে, তাতে ব্যবসা করাই দুঃসাধ্য ছিল। তাঁর ব্যবসায়িক সততা ও সাধুতার বহু ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এখানে কয়েকটি ঘটনা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো।

একবার এক বিশেষ স্থানে রেশমের মূল্য বৃদ্ধি পায়। তিনি তা জানতে পেরে অন্য এক স্থানের রেশম বিক্রেতার নিকট থেকে তিরিশ হাজার দিরহামের রেশম ক্রয় করেন। পরে কি যেন চিন্তা করে বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করেন, অমুক স্থানে রেশমের মূল্য বৃদ্ধির কথা কি তুমি জান? লোকটি বললো, সে কথা যদি জানতাম তাহলে আমার এ মাল কি বিক্রি করতাম? তাঁর এ জবাব শুনে তিনি প্রদত্ত মূল্য নিয়ে মাল ফেরত দেন।

একবার এক মহিলা তাঁর নিকট আসে “খুযের” চাদর বিক্রির জন্য। তিনি জিনিস দেখে দাম জিজ্ঞেস করেন। সে বললো: ষাট দিরহাম। তিনি তাঁর এক প্রতিবেশীকে চাদর দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেন, এর দাম কত হতে পারে? সে বললো: এক শো বিশ পর্যন্ত হতে পারে। দাম যাঁচায়ের পর তিনি মহিলাকে বলেন, বাড়ীর লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করেছি, তারা এর দাম এক শো পঁচিশ বলছে।

আরেকবার এক মহিলা রেশমের একটি জুব্বা বিক্রির জন্য নিয়ে এলো। তিনি দাম জিজ্ঞেস করলেন এবং সে পাঁচশো চাইলো। ইউনুসের দৃষ্টিতে জিনিসটির দাম অনেক বেশি ছিল। এ কারণে তিনি এক হাজার বলেন।

এত সতর্কতা সত্ত্বেও তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারতেন না। ইবন শাওযাব বলেন, একবার ইউনুস ও ইবন ‘আওন হালাল-হারামের ব্যাপারে আলোচনা করছিলেন। এক পর্যায়ে উভয়ে বললেন: আমাদের সম্পদে এক দিরহামও হালাল অর্থ নেই।

ওফাত
হিজরী ১৩৯ সনে ইনতিকাল করেন। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাসের (রা) পৌত্র সুলায়মান ও ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আলী এবং প্রপৌত্র জা‘ফার ও মুহাম্মাদ (রহ) তাঁর লাশের খাটিয়া বহন করেন। তখন তাঁরা বলছিলেন: “আল্লাহর কসম! এ একটি সম্মান ও মর্যাদা।”

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল-২০/৫৪২
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৪৫
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৬৮
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৪৫
৫. আত-তাবাকাত-৭/২৩; তাহযীব আল-কামাল-২০/৫৪৩
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৪৫; তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৪২
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৪৫; তাহযীব আল-কামাল-২০/৫৪৪
৮. প্রাগুক্ত; আত-তাবাকাত-৭/২৩
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/২৪২
১০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৪৬
১১. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৪৪
১২. প্রাগুক্ত
১৩. প্রাগুক্ত
১৪. প্রাগুক্ত
১৫. প্রাগুক্ত
১৬. প্রাগুক্ত-২০/৫৪৯; তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৪৩
১৭. প্রাগুক্ত
১৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৪৫
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৪৪৪
২০. আত-তাবাকাত ৭/২৪; তাহযীব আল-কামাল-২০/৫৫৩

ফন্ট সাইজ
15px
17px