📄 মিস‘আর ইবন কিদাম (রহ)
হযরত মিস'আরের (রহ) ডাকনাম আবূ সালামা। পিতা কিদাম ইবন জুহাইর। কুরায়শ গোত্রের আল-'আমিরী শাখার সন্তান এবং কৃষ্ণার অধিবাসী।
জ্ঞান ও মনীষা
তিনি জ্ঞান ও ধর্মচর্চা উভয় দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে ছিলেন। ইয়া'লা বলেন: "মিস'আর জ্ঞান ও ধার্মিকতার সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন।" ইরাকে তাঁর সমকক্ষ 'আলিম খুব কমই ছিলেন। হিশাম ইবন 'উরওয়া (রহ) বলেন, মিস'আর ও আইউবের চেয়ে উত্তম কেউ আমাদের এখানে আসেনি। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত।
হাদীছ
তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে একজন হাফিজ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম বলেছেন। মুহাম্মাদ ইবন বিশর বলেন : মিস'আরের নিকট প্রায় এক হাজার হাদীছ ছিল। আমি দশটি ছাড়া সবই লিখেছি। তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ নাখা'ঈ, আবু ইসহাক আস-সুবায়'ঈ, সা'ঈদ ইবন ইবরাহীম, ছাবিত ইবন 'উবায়দুল্লাহ আল-আনসারী, 'আবদুল মালিক ইবন নুমাইর, হিলাল ইবন জানাব, হাবীব ইবন আবী ছাবিত, 'আলকামা ইবন মারছাদ, কাতাদা, মা'আন ইবন 'আবদির রহমান, মিকদাম ইবন শুরায়হ, আল- আ'মাশ, 'আদী ইবন ছাবিত, আল-হাকাম ইবন 'উতায়বা (রহ) সহ বিশাল সংখ্যক মুহাদ্দিছের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।
তাঁর বর্ণিত হাদীছের মান
তাঁর বর্ণনাসমূহের বিশুদ্ধতার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, হযরত শু'বার মত বিখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ বলেন: "তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মপ্রত্যয়ের কারণে আমরা মিস'আরকে মাসহাফ বলতাম।" তাঁর ব্যক্তি সত্তা ছিল হাদীছ যাচাই-বাছাইয়ের মাপকাঠি। এ কারণে তাঁর উপাধি হয়ে যায় "মীযান" বা পাল্লা। আল-খুরায়বী বলেন: "খুব কম মুহাদ্দিছ এমন পাওয়া যাবে যাঁদের বর্ণনাসমূহ কোন না কোনভাবে সমালোচিত হয়নি। তবে মিস'আর এর ব্যতিক্রম।" হাদীছের ইমামগণ সন্দেহ ও মত পার্থক্যের স্থানে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন। সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলেন, যখন হাদীছের কোন বিষয়ে আমাদের মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন আমরা মিস'আরকে জিজ্ঞেস করতাম। ইবরাহীম ইবন সা'দ বলতেন, যখন কারো ব্যাপারে সুফইয়ান ও শু'বার মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন তাঁরা মীযান মিস'আরের নিকট যেতেন।
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর এত জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনায় খুব বেশী সাবধানতা অবলম্বন করতেন। তিনি এ দায়িত্ব পালনে এত ভয় পেতেন যেন তাঁর মাথার উপর কাঁচের বোঝা রয়েছে। একটু অসতর্ক হলেই তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে। ইবন 'উয়ায়না বলেন, আমি মিস'আরকে একথা বলতে শুনেছি: "আমি চেয়েছি, হাদীছ যদি আমার উপর কাঁচের বোঝার মত হতো, যা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যায়।" অর্থাৎ কারো মাথায় কাঁচের বোঝা থাকলে সে যেমন তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকে, তাই সব সময় সাবধানতা অবলম্বন করে। তেমনি তিনি হাদীছকে কাঁচ মনে করেছেন এবং সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। তাঁর এমন মাত্রাতিরিক্ত সাবধানতা সন্দেহের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আবূ নু'আইম বলেন, মিস'আর তাঁর হাদীছসমূহের ব্যাপারে বড় সন্দেহপরায়ণ ছিলেন। তবে তিনি কোন ভুল করতেন না। আল-আ'মাশ বলতেন, মিস'আরের শয়তান তাঁকে দুর্বল করে তাঁর মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে থাকে।
তাঁর এই সন্দেহ তাঁর হাদীছসমূহের মান এত বাড়িয়ে দেয় যে, হাদীছ বিশারদগণ তাঁর সন্দেহকে দৃঢ় প্রত্যয়ের মর্যাদা দিতেন। লোকেরা আ'মাশকে বললো, মিস'আর তো তাঁর নিজের বর্ণিত হাদীছসমূহে সন্দেহ পোষণ করেন। তিনি তাদেরকে বলেন : শিনাক্কুহু কাইয়্যাক্বিন - “তার সন্দেহ অন্যদের দৃঢ় প্রত্যয়ের মত।" এমন কথা ইমাম আল-ওয়াকী'ও বলেছেন। তবে ইয়াহইয়া আল-কাত্তান বলেন : "আমি মিস'আরের চেয়ে বেশী বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল আর কাউকে দেখিনি।”
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে তিনি যদিও কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না, তবুও কুফার মুফতীগণের মধ্যে গণ্য ছিলেন।
দারসের আসর
মসজিদে তাঁর দারসের আসর ছিল। সালাত আদায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী মসজিদে বসে যেতেন এবং হাদীছ শুনতে আগ্রহী লোকেরা বৃত্তাকারে তাঁর চার পাশে বসে যেতেন। তাঁর সূত্রে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, মুহাম্মাদ ইবন বিশর, ইয়াহইয়া ইবন আদম, আবু নু'আইম, খাল্লাদ ইবন ইয়াহইয়া, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক, ইয়াযীদ ইবন হারুন, শু'বা আল-হাজ্জাজ, মালিক ইবন মিগওয়াল, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, মুহাম্মাদ ইবন বিশর (রহ) ও আরো অনেকে।
'ইবাদত-বন্দেগী
তাঁর মা ছিলেন একজন উঁচুস্তরের 'আবিদা। তাঁর পুণ্যময় তত্ত্বাবধানের গভীর প্রভাব পড়ে ছেলের উপর। মা সব সময় মসজিদে সালাত আদায় করতেন। মা ও ছেলে দু'জন অধিকাংশ সময় এক সাথে মসজিদে যেতেন। একটা পশমী চাদর মিস'আর হাতে করে নিতেন এবং মসজিদে পৌঁছে সেটা মা'র বসার জন্য বিছিয়ে দিতেন। তার ওপর দাঁড়িয়ে মা সালাত আদায় করতেন। আর মিস'আর সামনের সারিতে চলে যেতেন এবং সালাত শেষ করে একটি স্থানে বসে যেতেন। তাঁকে ঘিরে হাদীছের জ্ঞান অর্জনে উৎসাহী ছাত্ররা বসে যেত। তিনি তাঁদেরকে হাদীছ শোনাতেন। এর মধ্যে তাঁর মা 'ইবাদত ও যিক্স- আযকার শেষ করতেন। আর মিস'আর তাঁর দারস (পাঠদান) শেষ করে মা'র কাছে এসে তাঁর চাদরটি উঠিয়ে মাকে সংগে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। তাঁর মাত্র দু'টি ঠিকানাই ছিল; ঘর অথবা মসজিদ। অতিরিক্ত 'ইবাদতের কারণে কপালে দাগ হয়ে গিয়েছিল। খালিদ ইবন 'আমর বলেন: "আমি মিস'আরকে দেখেছি, অতিরিক্ত সিজদার কারণে তাঁর কপাল ছাগলের হাঁটুর মত হয়ে গেছে।"
প্রতিদিন অর্ধেক কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁর ছেলে মুহাম্মাদ বলেন: "আমার আব্বা অর্ধেক কুরআন পাঠ না করে ঘুমোতেন না।" তিনি কোন একটি স্তরে পৌঁছে থেমে যেতেন না। তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার ধাপ সর্বদাই উন্নত থেকে উন্নততর হতে থাকতো। মা'আন বলেন: "আমি মিস'আরকে প্রতি দিনই শুভ ও কল্যাণে কেবল উন্নতিই করতে দেখেছি।" তিনি 'ইবাদত-বন্দেগী, আধ্যাত্মিক সাধনা ও নৈতিক গুণাবলীতে এমন উচ্চতর পর্যায়ে পৌছে যান যে, তাঁর জান্নাতী হওয়ার ব্যাপারে মানুষের কোন সন্দেহ ছিল না। যেমন আল- হাসান ইবন 'আম্মারা বলেন: "যদি মিস'আরের মত মানুষ জান্নাতে না যান তাহলে তো জান্নাতবাসীদের সংখ্যা অতি অল্পই হবে।"
প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক (রহ) অথবা তাঁর মত অন্য কেউ হযরত মিস'আরের (রহ) আদত-অভ্যাস ও নৈতিক গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে একটি কবিতায় তা তুলে ধরেন। তার দু'টি চরণ নিম্নরূপ:
"কেউ যদি সৎ সঙ্গী সন্ধান করে, সে যেন মিস'আর ইবন কিদামের আসরে আসে। সেখানে আছে প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য এবং এর সদস্যরা হলো পূতঃপবিত্র এবং জাতির উঁচু স্তরের মানুষ।"
পার্থিব ধন-ঐশ্বর্যের প্রতি উদাসীনতা
দুনিয়া ও এর শান-শওকতের প্রতি একেবারেই উদাসীন ও বেপরোয়া ছিলেন। রাষ্ট্রীয় কোন পদের প্রতি কখনো চোখ তুলে তাকাননি। একবার তারা প্রতাপশালী 'আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল-মানসূর তাঁকে কোন একটি অঞ্চলের ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান। তিনি বলেন, আমার পরিবারের লোকেরা তো আমাকে দুই দিরহামের বাজার করারও যোগ্য মনে করে না। তারা বলে, আমরা তোমার দুই দিরহামের কিছু ক্রয় করাও পছন্দ করিনে। আর আপনি আমাকে ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান? আল্লাহ আপনাকে ঠিক কাজ করার শক্তি দিন। আপনার সংগে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, তাই আমি কিছু বলতে পারছি। খলীফা আবূ জা'ফার তাঁর এই আপত্তি মেনে নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
তিনি অত্যন্ত প্রফুল্ল স্বভাবের মানুষ ছিলেন। অন্যের আবেগ-আগ্রহের প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখাতেন। কেউ যখন তাঁকে একটি হাদীছ শোনাতো যা তাঁর আগেই জানা থাকতো তখন কেবল সেই লোকটির সন্তুষ্টি ও হাদীছের মর্যাদার খাতিরে চুপ করে শুনে যেতেন, যেন হাদীছটি তিনি পূর্বে কখনো শোনেননি।
ওফাত
তিনি হিজরী ১৫৫ মতান্তরে ১৫৩ সনে কৃষ্ণায় ইনতিকাল করেন। মুস'আব ইবন আল-মিকদাম বলেন: আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) স্বপ্নে দেখলাম। সুফইয়ান রাসূলের (সা) একটি হাত ধরে আছেন এবং এ অবস্থায় দু'জন কা'বা তাওয়াফ করছেন। সুফইয়ান রাসূলকে (সা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! মিস'আর কি মৃত্যু বরণ করেছেন? বললেন: হাঁ, তাঁর মৃত্যুতে আসমানবাসীরা সুসংবাদ লাভ করেছে।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৪. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৯. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
১০. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
১২. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
১৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
১৪. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি 'ঈন-১/২৮
১৫. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
১৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫২
১৭. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩-২৫৪
১৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
十九. প্রাগুক্ত-১/১৮৯; তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৯
二十一. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
二十二. প্রাগুক্ত-১/১৮৯-১৯০
二十三. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪; প্রাগুক্ত-১/১৮৯
二十四. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
二十五. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
二十六. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৪
হযরত মিস'আরের (রহ) ডাকনাম আবূ সালামা। পিতা কিদাম ইবন জুহাইর। কুরায়শ গোত্রের আল-'আমিরী শাখার সন্তান এবং কৃষ্ণার অধিবাসী।
জ্ঞান ও মনীষা
তিনি জ্ঞান ও ধর্মচর্চা উভয় দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে ছিলেন। ইয়া'লা বলেন: "মিস'আর জ্ঞান ও ধার্মিকতার সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন।" ইরাকে তাঁর সমকক্ষ 'আলিম খুব কমই ছিলেন। হিশাম ইবন 'উরওয়া (রহ) বলেন, মিস'আর ও আইউবের চেয়ে উত্তম কেউ আমাদের এখানে আসেনি। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত।
হাদীছ
তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে একজন হাফিজ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম বলেছেন। মুহাম্মাদ ইবন বিশর বলেন : মিস'আরের নিকট প্রায় এক হাজার হাদীছ ছিল। আমি দশটি ছাড়া সবই লিখেছি। তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ নাখা'ঈ, আবু ইসহাক আস-সুবায়'ঈ, সা'ঈদ ইবন ইবরাহীম, ছাবিত ইবন 'উবায়দুল্লাহ আল-আনসারী, 'আবদুল মালিক ইবন নুমাইর, হিলাল ইবন জানাব, হাবীব ইবন আবী ছাবিত, 'আলকামা ইবন মারছাদ, কাতাদা, মা'আন ইবন 'আবদির রহমান, মিকদাম ইবন শুরায়হ, আল- আ'মাশ, 'আদী ইবন ছাবিত, আল-হাকাম ইবন 'উতায়বা (রহ) সহ বিশাল সংখ্যক মুহাদ্দিছের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।
তাঁর বর্ণিত হাদীছের মান
তাঁর বর্ণনাসমূহের বিশুদ্ধতার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, হযরত শু'বার মত বিখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ বলেন: "তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মপ্রত্যয়ের কারণে আমরা মিস'আরকে মাসহাফ বলতাম।" তাঁর ব্যক্তি সত্তা ছিল হাদীছ যাচাই-বাছাইয়ের মাপকাঠি। এ কারণে তাঁর উপাধি হয়ে যায় "মীযান" বা পাল্লা। আল-খুরায়বী বলেন: "খুব কম মুহাদ্দিছ এমন পাওয়া যাবে যাঁদের বর্ণনাসমূহ কোন না কোনভাবে সমালোচিত হয়নি। তবে মিস'আর এর ব্যতিক্রম।" হাদীছের ইমামগণ সন্দেহ ও মত পার্থক্যের স্থানে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন। সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলেন, যখন হাদীছের কোন বিষয়ে আমাদের মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন আমরা মিস'আরকে জিজ্ঞেস করতাম। ইবরাহীম ইবন সা'দ বলতেন, যখন কারো ব্যাপারে সুফইয়ান ও শু'বার মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন তাঁরা মীযান মিস'আরের নিকট যেতেন।
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর এত জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনায় খুব বেশী সাবধানতা অবলম্বন করতেন। তিনি এ দায়িত্ব পালনে এত ভয় পেতেন যেন তাঁর মাথার উপর কাঁচের বোঝা রয়েছে। একটু অসতর্ক হলেই তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে। ইবন 'উয়ায়না বলেন, আমি মিস'আরকে একথা বলতে শুনেছি:
"আমি চেয়েছি, হাদীছ যদি আমার উপর কাঁচের বোঝার মত হতো, যা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যায়।" অর্থাৎ কারো মাথায় কাঁচের বোঝা থাকলে সে যেমন তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকে, তাই সব সময় সাবধানতা অবলম্বন করে। তেমনি তিনি হাদীছকে কাঁচ মনে করেছেন এবং সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। তাঁর এমন মাত্রাতিরিক্ত সাবধানতা সন্দেহের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আবূ নু'আইম বলেন, মিস'আর তাঁর হাদীছসমূহের ব্যাপারে বড় সন্দেহপরায়ণ ছিলেন। তবে তিনি কোন ভুল করতেন না। আল-আ'মাশ বলতেন, মিস'আরের শয়তান তাঁকে দুর্বল করে তাঁর মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে থাকে।
তাঁর এই সন্দেহ তাঁর হাদীছসমূহের মান এত বাড়িয়ে দেয় যে, হাদীছ বিশারদগণ তাঁর সন্দেহকে দৃঢ় প্রত্যয়ের মর্যাদা দিতেন। লোকেরা আ'মাশকে বললো, মিস'আর তো তাঁর নিজের বর্ণিত হাদীছসমূহে সন্দেহ পোষণ করেন। তিনি তাদেরকে বলেন : শুককুহু কায়াক্বীনিহি - "তার সন্দেহ অন্যদের দৃঢ় প্রত্যয়ের মত।" এমন কথা ইমাম আল-ওয়াকী'ও বলেছেন। তবে ইয়াহইয়া আল-কাত্তান বলেন : "আমি মিস'আরের চেয়ে বেশী বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল আর কাউকে দেখিনি।”
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে তিনি যদিও কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না, তবুও কুফার মুফতীগণের মধ্যে গণ্য ছিলেন।
দারসের আসর
মসজিদে তাঁর দারসের আসর ছিল। সালাত আদায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী মসজিদে বসে যেতেন এবং হাদীছ শুনতে আগ্রহী লোকেরা বৃত্তাকারে তাঁর চার পাশে বসে যেতেন। তাঁর সূত্রে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, মুহাম্মাদ ইবন বিশর, ইয়াহইয়া ইবন আদম, আবু নু'আইম, খাল্লাদ ইবন ইয়াহইয়া, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক, ইয়াযীদ ইবন হারুন, শু'বা আল-হাজ্জাজ, মালিক ইবন মিগওয়াল, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, মুহাম্মাদ ইবন বিশর (রহ) ও আরো অনেকে।
'ইবাদত-বন্দেগী
তাঁর মা ছিলেন একজন উঁচুস্তরের 'আবিদা। তাঁর পুণ্যময় তত্ত্বাবধানের গভীর প্রভাব পড়ে ছেলের উপর। মা সব সময় মসজিদে সালাত আদায় করতেন। মা ও ছেলে দু'জন অধিকাংশ সময় এক সাথে মসজিদে যেতেন। একটা পশমী চাদর মিস'আর হাতে করে নিতেন এবং মসজিদে পৌঁছে সেটা মা'র বসার জন্য বিছিয়ে দিতেন। তার ওপর দাঁড়িয়ে মা সালাত আদায় করতেন। আর মিস'আর সামনের সারিতে চলে যেতেন এবং সালাত শেষ করে একটি স্থানে বসে যেতেন। তাঁকে ঘিরে হাদীছের জ্ঞান অর্জনে উৎসাহী ছাত্ররা বসে যেত। তিনি তাঁদেরকে হাদীছ শোনাতেন। এর মধ্যে তাঁর মা 'ইবাদত ও যিক্স- আযকার শেষ করতেন। আর মিস'আর তাঁর দারস (পাঠদান) শেষ করে মা'র কাছে এসে তাঁর চাদরটি উঠিয়ে মাকে সংগে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। তাঁর মাত্র দু'টি ঠিকানাই ছিল; ঘর অথবা মসজিদ। অতিরিক্ত 'ইবাদতের কারণে কপালে দাগ হয়ে গিয়েছিল। খালিদ ইবন 'আমর বলেন: "আমি মিস'আরকে দেখেছি, অতিরিক্ত সিজদার কারণে তাঁর কপাল ছাগলের হাঁটুর মত হয়ে গেছে।"
প্রতিদিন অর্ধেক কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁর ছেলে মুহাম্মাদ বলেন: "আমার আব্বা অর্ধেক কুরআন পাঠ না করে ঘুমোতেন না।"
তিনি কোন একটি স্তরে পৌঁছে থেমে যেতেন না। তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার ধাপ সর্বদাই উন্নত থেকে উন্নততর হতে থাকতো। মা'আন বলেন: "আমি মিস'আরকে প্রতি দিনই শুভ ও কল্যাণে কেবল উন্নতিই করতে দেখেছি।" তিনি 'ইবাদত-বন্দেগী, আধ্যাত্মিক সাধনা ও নৈতিক গুণাবলীতে এমন উচ্চতর পর্যায়ে পৌছে যান যে, তাঁর জান্নাতী হওয়ার ব্যাপারে মানুষের কোন সন্দেহ ছিল না। যেমন আল- হাসান ইবন 'আম্মারা বলেন: "যদি মিস'আরের মত মানুষ জান্নাতে না যান তাহলে তো জান্নাতবাসীদের সংখ্যা অতি অল্পই হবে।"
প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক (রহ) অথবা তাঁর মত অন্য কেউ হযরত মিস'আরের (রহ) আদত-অভ্যাস ও নৈতিক গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে একটি কবিতায় তা তুলে ধরেন। তার দু'টি চরণ নিম্নরূপ:
"কেউ যদি সৎ সঙ্গী সন্ধান করে, সে যেন মিস'আর ইবন কিদামের আসরে আসে। সেখানে আছে প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য এবং এর সদস্যরা হলো পূতঃপবিত্র এবং জাতির উঁচু স্তরের মানুষ।"
পার্থিব ধন-ঐশ্বর্যের প্রতি উদাসীনতা
দুনিয়া ও এর শান-শওকতের প্রতি একেবারেই উদাসীন ও বেপরোয়া ছিলেন। রাষ্ট্রীয় কোন পদের প্রতি কখনো চোখ তুলে তাকাননি। একবার মহা প্রতাপশালী আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল-মানসূর তাঁকে কোন একটি অঞ্চলের ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান। তিনি বলেন, আমার পরিবারের লোকেরা তো আমাকে দুই দিরহামের বাজার করারও যোগ্য মনে করে না। তারা বলে, আমরা তোমার দুই দিরহামের কিছু ক্রয় করাও পছন্দ করিনে। আর আপনি আমাকে ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান? আল্লাহ আপনাকে ঠিক কাজ করার শক্তি দিন। আপনার সংগে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, তাই আমি কিছু বলতে পারছি। খলীফা আবূ জা'ফার তাঁর এই আপত্তি মেনে নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
তিনি অত্যন্ত প্রফুল্ল স্বভাবের মানুষ ছিলেন। অন্যের আবেগ-আগ্রহের প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখাতেন। কেউ যখন তাঁকে একটি হাদীছ শোনাতো যা তাঁর আগেই জানা থাকতো তখন কেবল সেই লোকটির সন্তুষ্টি ও হাদীছের মর্যাদার খাতিরে চুপ করে শুনে যেতেন, যেন হাদীছটি তিনি পূর্বে কখনো শোনেননি।
ওফাত
তিনি হিজরী ১৫৫ মতান্তরে ১৫৩ সনে কৃষ্ণায় ইনতিকাল করেন।
মুস'আব ইবন আল-মিকদাম বলেন: আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) স্বপ্নে দেখলাম। সুফইয়ান রাসূলের (সা) একটি হাত ধরে আছেন এবং এ অবস্থায় দু'জন কা'বা তাওয়াফ করছেন। সুফইয়ান রাসূলকে (সা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! মিস'আর কি মৃত্যু বরণ করেছেন? বললেন: হাঁ, তাঁর মৃত্যুতে আসমানবাসীরা সুসংবাদ লাভ করেছে।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৪. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৯. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
১০. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
১২. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
১৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
১৪. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি 'ঈন-১/২৮
১৫. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
১৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫২
十七. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩-২৫৪
十八. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
十九. প্রাগুক্ত-১/১৮৯; তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৯
二十一. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
二十二. প্রাগুক্ত-১/১৮৯-১৯০
二十三. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪; প্রাগুক্ত-১/১৮৯
二十四. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
二十五. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
二十六. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৪
📄 মুতাররিফ ইবন ‘আবদিল্লাহ ইবন আশ-শিখখীর (রহ)
হযরত আবূ 'আবদিল্লাহ মুতারিরের (রহ) বংশধারা এরূপ : মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ বিন আশ-শিখখীর বিন আউফ বিন কা’ব বিন ওয়াফদান বিন আল-হারীশ বিন কা’ব বিন রাবী’আ বিন আমির বিন সা’সা।
'আবদুল্লাহ তাঁর পিতা ও আশ-শিখীর দাদা। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায় তাঁর জন্ম। কিন্তু অল্প বয়স অথবা দূরে অবস্থানের কারণে মহানবীর সাক্ষাৎ ও সাহচর্যের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থেকে যান। ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখীর ও হানী ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখীর তাঁর দু'ভাই।
জ্ঞান অর্জন
জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর ছিল তীব্র আবেগ ও আগ্রহ। জ্ঞানের গুণ-ফযীলতকে 'ইবাদতের গুণ-ফযীলতের উপর প্রাধান্য দিতেন। এই প্রবল আগ্রহ ও আবেগ তাঁকে জ্ঞানীদের উচ্চাসনে বসায়। খোদাভীতি, ভদ্রতা, শিষ্টাচারিতা তথা যাবতীয় নৈতিক গুণ ও উৎকর্ষে ছিলেন আদর্শ স্থানীয়। ইবন সা'দ বলেন, তাঁর ব্যক্তি সত্তায় খোদাভীতি, মহৎ গুণ, বর্ণনা ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও সাহিত্য প্রতিভা ইত্যাদি গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি তাঁকে বসরার মনীষীদের তৃতীয় তবকায় স্থান দিয়েছেন। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ইল্যু ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের চূড়া সমতুল্য ছিলেন। তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের কারণে মানুষের অন্তরে বিশেষ স্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
হাদীছ
তাঁর সময়ে বিশাল সংখ্যক সাহাবায়ে কিরাম (রা) জীবিত ছিলেন। তিনি তাঁদের জ্ঞানের ঝর্ণাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হন। হযরত 'উছমান, 'আলী, আবু যার, 'আম্মার ইবন ইয়াসির, 'আবদুল্লাহ ইবন মুগাফ্ফাল, 'উছমান ইবন আবিল 'আস, 'ইমরান ইবন হুসাইন, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান (রা) প্রমুখ উঁচু মর্যাদার সাহাবায়ে কিরামের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভে যাঁরা ধন্য হয়েছেন তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন : তাঁর ভাই আবুল 'আলা' ইয়াযীদ, ভাতীজা 'আবদুল্লাহ ইবন হানী এবং হাসান আল-বাসরী, হুমায়দ ইবন হিলাল, আবু নাসর, গায়লান ইবন জারীর, সা'ঈদ ইবন আবী হিন্দ, মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি', আবুত তায়য়াহ, ছাবিত আল-বানানী, 'আবদুল কারীম ইবন রুশাইদ, সা'ঈদ আল-হারীরী, আবূ সালামা, সা'ঈদ ইবন ইয়াযীদ (রহ) ও আরো অনেকে। ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল। তিনি ছিলেন বসরার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফতী।
তাঁর এই জ্ঞান ও মনীষার তুলনায় তাঁর আমল, পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি নির্মোহ ভাব এবং খোদাভীরুতার পাল্লা ভারী ছিল। ইবন সা'দ তাঁকে অত্যধিক আল্লাহ ভীরু লোকদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন। 'আজলী তাঁকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ এবং সত্যনিষ্ঠ মানুষ বলেছেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি ছিলেন বসরার একজন 'আবিদ ও যাহিদ (তাপস ও দুনিয়া বিরাগী) মানুষ।
দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা পরিহার
তাঁর এমন দুনিয়া বিরাগী মনোভাব ও আল্লাহ ভীরুতার কারণে তিনি সব ধরনের হৈ- হাঙ্গামা ও বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলাকে দারুণ ভয় করতেন। এ জাতীয় কাজকে তিনি একটা পরীক্ষা বলে মনে করতেন। বলতেন, ফিতনা-ফাসাদ পথ প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং ঈমানদার ব্যক্তিকে তার নিজের নফসের সংগে সংঘাত-সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়ার জন্য মাথা তুলে দাঁড়ায়। তাঁর জীবনকালে বড় বড় বিপ্লব ও ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু তিনি সবকিছু থেকে নিজেকে সযত্নে দূরে রেখেছেন। সাধারণতঃ ফিতনা-ফাসাদের সময় তিনি সে স্থান ত্যাগ করে কোন অজ্ঞাত স্থানে চলে যেতেন। যদি যাওয়ার সুযোগ না পেতেন তাহলে ঘরে চুপ করে বসে থাকতেন। এমনকি জুম'আ ও জামা'আতের জন্যও বের হতেন না। 'উকরা বলেন, আমি মুতারিফের ভাই ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, ফিতনা বা বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো তখন মুতারিফ কী করতেন? তিনি বললেন, ঘরের অভ্যন্তরে একেবারে নির্জনবাস অবলম্বন করতেন।
আর যতদিন বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলার অগ্নিশিখা প্রশমিত না হতো ততদিন তিনি মানুষের জুম'আ ও জামা'আতে শরীক হতেন না। অন্যদেরকেও তিনি এই ফিতনা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতেন। হযরত কাতাদা (রহ) বলেন, যখন কোন ফিতনা-ফাসাদ দেখা দিত তখন মুতাররিফ মানুষকে তাতে জড়িত হতে বাধা দিতেন এবং নিজে কোথাও পালিয়ে যেতেন। হাসান আল-বাসরীও মানুষকে বাধা দিতেন, তবে তিনি স্থান ত্যাগ করতেন না। এ কারণে মুতাররিফ তাঁর সম্পর্কে বলতেন, হাসান আল-বাসরী সেই ব্যক্তির মত যে মানুষকে প্লাবন থেকে সতর্ক করে, কিন্তু নিজে তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে।
চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্কতার কারণে তিনি সেই সব সংঘাত-সংঘর্ষের অবস্থা সম্পর্কেও কোন কিছু জানতে চাইতেন না। 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়র (রা) ও বানূ উমাইয়্যাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত তাঁর সময়ে হয়। তিনি এই বিরোধের কথা কারো কাছে কিছুই জানতে চাইতেন না। মানুষ যেহেতু তাঁর চিন্তাধারা সম্পর্কে অবহিত ছিল এ কারণে তারাও তাঁর সামনে সে বিষয়ে কিছু আলোচনা করতো না।
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ও 'আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে 'আবদুর রহমান ইবন আল- আশ'আছ যে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উত্তোলন করেন তাতে অনেক বড় সাহাবী অংশ গ্রহণ করেন। মানুষ মুতারিফকেও অংশ গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে, কিন্তু তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন: তোমরা যে জিনিসে অংশ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাচ্ছো তা কি "জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ থেকেও উত্তম হবে?" লোকেরা বললো না। তিনি বললেন, তাহলে আমি ধ্বংসের মধ্যে পতিত হওয়া এবং সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের মধ্যে জুয়া খেলতে চাই না। অর্থাৎ সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ যুদ্ধে জড়াতে চাই না। শান্তি ও নিরাপত্তার জীবন তাঁর পছন্দ ছিল। বলতেন, শান্তি ও নিরাপদ জীবন লাভ করে শুকরিয়া আদায় করা বিপদ- মুসীবতে ধৈর্য ধারণের চেয়ে আমার নিকট বেশী পছন্দের। আল-'ইজলী' বলেন, ইবন আল-আশ'আছের ফিত্না থেকে বসরার মাত্র দু'ব্যক্তি রক্ষা পেয়েছিলেন। তারা হলেন: মুতারিফ ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীন।
'আকীদা-বিশ্বাস
'আকীদার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন এবং তা সংরক্ষণের জন্য ভীষণ যত্নবান ছিলেন। একবার খারিজীদের একটি উপদল তাঁর নিকট আসে এবং তাদের আকীদাসমূহ গ্রহণ করার জন্য তাঁকে আহ্বান জানায়। তিনি তাদেরকে বলেন, যদি আমার দু'টি অন্তর থাকতো তাহলে একটিতে তোমাদের 'আকীদাসমূহ স্থান দিতাম এবং অন্যটি সংরক্ষণ করতাম। তোমরা যা বলছো তা যদি সঠিক হতো তাহলে দ্বিতীয়টি দিয়ে তোমাদের অনুসরণ করতাম। আর যদি ভুল হতো তাহলে একটি ধ্বংস হলেও অন্যটি তো রক্ষা পেত। কিন্তু অন্তর তো মাত্র একটি। এ কারণে আমি তাকে ধোঁকা ও প্রতারণার কাজে লাগাতে পারিনে।
যদিও তিনি একজন বড় দুনিয়া বিরাগী খোদাভীরু মানুষ ছিলেন, তাই বলে অদৃষ্টবাদী ছিলেন না। তিনি ছিলেন কর্মবাদী মানুষ। এ পৃথিবী কার্যকারণ- বিশ্ব বলে জানতেন। তাই বলতেন, এটা বৈধ নয় যে, কোন ব্যক্তি কোন উঁচু স্থান থেকে নিজেকে নীচে ফেলে দিয়ে বলে যে, আল্লাহ আমার তাকদীর এভাবেই নির্ধারণ করেছেন। বরং মানুষের উচিত বেঁচে থাকা এবং চেষ্টা করা। যদি সকল সতর্কতা ও চেষ্টা-সাধনা সত্ত্বেও তার কোন ক্ষতি হয় অথবা তার উপর কোন বিপদ আপতিত হয় তাহলে তাকে আল্লাহর তাকদীর বলে বিশ্বাস করা উচিত। আল্লাহর তাকদীর ছাড়া কোন বিপদ-মুসীবত আপতিত হতে পারে না। এ কারণে তিনি "তাউন” (প্লেগ) জাতীয় কোন মহামারী দেখা দিলে জনসমাগমের স্থান থেকে দূরে সরে যেতেন।
তাঁর এমন কিছু কথা আছে যা গভীর ভাব ও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলতেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে 'আকল তথা বুদ্ধির চেয়ে ভালো আর কোন জিনিষ দেয়া হয়নি। মানুষের বুদ্ধি তাঁর যুগ ও কাল অনুযায়ী হয়। নিজের খাবার এমন ব্যক্তিকে খাওয়াবে না যার খাওয়ার রুচি নেই। অর্থাৎ অহেতুক কোন কিছু বিনষ্ট করবে না।
পার্থিব জাঁকজমক
এ পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষের খাদ্য-খাবারের জন্য যা কিছু দান করেছেন তা ভোগ করা তিনি দোষের কিছু মনে করতেন না। বিশাল ধন-সম্পদ তিনি লাভ করেছিলেন। তাই তিনি বেশ জাঁকজমক ও সম্মানের জীবন যাপন করতেন। ইমাম যাহাবী (রহ) লিখেছেন, মুতারিফ একজন নেতা ও উঁচু মর্যাদার মানুষ ছিলেন। অতি উন্নত মানের পোশাক পরতেন, শাসন-কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিদের দরবারে যাতায়াত করতেন। তবে তাঁর এই বাহ্যিক জাঁকজমক তাঁর নৈতিক মানের উপর কোন রকম প্রভাব ফেলতো না। গায়লান ইবন জারীর বলেন, 'তিনি বারানুস নামক এক প্রকার টুপি ও মাতারিফ নামক এক বিশেষ ধরনের দামী চাদর পরতেন। ঘোড়ায় চড়তেন এবং শাসন-কর্তৃত্বের অধিকারী আমীর-উমারাদের নিকট যেতেন। তবে তাঁর এই শান-শওকতের জীবনধারা সত্ত্বেও তুমি তাঁর নিকট গেলে তোমার অন্তর ও দৃষ্টিতে প্রশান্তির ভাব সৃষ্টি হবে।
ওফাত
হিজরী ৯৫ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায় এবং স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। তিনি পুত্রকে ডেকে কুরআনের অসীয়াতের আয়াতটি পাঠ করে শোনান। পুত্র দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে ডাক্তার ডেকে আনে। ডাক্তারকে দেখে বলেন তিনি কে? পুত্র বলে: ডাক্তার। তিনি ডাক্তারকে লক্ষ্য করে বলেন: আমি কঠোরভাবে নিষেধ করছি, আমাকে যেন ঝাড়-ফুঁক করা না হয়, আমার গায়ে যেন তাবীজ-কবজ ঝোলানো না হয়। তারপর পুত্রকে কবর তৈরির নির্দেশ দেন। সে নির্দেশমত কবর তৈরি করে। তারপর তিনি বলেন, আমাকে কবরের নিকট নিয়ে চলো। সেখানে নেয়া হয়। তিনি কবরের পাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করে, আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের দরবারে দু'আ করেন। তারপর ঘরে ফিরে এসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তিনি বলতেন:
'এই মৃত্যু বিত্ত-বৈভবের মালিকদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিনষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং এমন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তালাশ কর যাতে মৃত্যু নেই।'
গায়লান ইবন জারীর বলেন, একবার কোন একটি ব্যাপার নিয়ে এক ব্যক্তির সাথে মুতারিফের কিছু কথা কাটাকাটি হয়। লোকটি মুতারিরফের প্রতি মিথ্যা আরোপ করে। সাথে সাথে তাঁর মুখ থেকে বের হয়ে যায় এই বদ-দু'আ:
"হে আল্লাহ! যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তার মরণ দাও।" লোকটি সেখানেই ঢলে পড়ে এবং মারা যায়। ব্যাপারটি যিয়াদের দরবার পর্যন্ত গড়ালো। যিয়াদ তাঁকে বললেন : আপনি লোকটিকে মেরে ফেললেন? মুতারিফ বললেন : না, আমি মারিনি। তবে আমার দু'আ তার নির্ধারিত সময়ের সাথে মিলে গেছে।
টিকাঃ
১. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৭৪
২. তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৩
৩. আত-তাবাকাত-৭/১০৩
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৩
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৫
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৭২; তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৩
৭. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি 'ঈন-১/৬৭
৮. আত-তাবাকাত-৭/১০৩
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৭৩
১০. আত-তাবাকাত- ছিল 'ইল্ম ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের দুই সাগরের সঙ্গম স্থলের মত। তাঁর দাসত্বের কল্যাণে এবং রাসূলুল্লাহর (সা) শহর মদীনায় অবস্থানের সুযোগে মুসলিমও 'ইল্ম ও 'আমলের ঐশ্বর্যের অধিকারী হন। ইবন সা'দ বলেন: "মুসলিম ছিলেন বিশ্বস্ত, জ্ঞানী, তাপস ও আল্লাহভীরু।” ইবন আওন বলেন, সেই সময়ে মুসলিমের উপরে কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হতো না।
হাদীছ
মদীনায় অবস্থানের কারণে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস ও 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) মত উম্মাতের শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং আবুল আশ'আছ সান'আনী, হামরান ইবন আবান (রহ) প্রমুখের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। আর ছাবিত আল-বানানী, ইয়া'লা ইবন হাকীম, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, আইউব সাখতিয়ানী, আবূ নাদরা ইবন কাতাদা, সালিহ, আবুল খায়ল, মুহাম্মাদ ইবন আল- ওয়াসি', 'আমর ইবন দীনার, আবান ইবন আবী' 'আয়্যাম (রহ) প্রমুখ মুহাদ্দিছগণ তাঁর সুযোগ্য ছাত্র ছিলেন।
ফিক্হ শাস্ত্রেও তিনি অতি উঁচু স্থানের অধিকারী ছিলেন। খলীফা ইবন খায়্যাত বলেন: তিনি বসরার সেই পাঁচজন ফকীর মধ্যে গণ্য ছিলেন যাঁদেরকে তাঁদের যুগের ফকীহ বলে মানা হতো।
নৈতিক গুণাবলী
'ইলমের তুলনায় তাঁর 'আমল ছিল বেশী। ইবন সা'দ তো তাঁকে একজন 'আবিদ ও আল্লাহ ভীরু বলেছেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি বসরার ইবাদতকারী মহান ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। তিনি মনে করতেন, আল্লাহর প্রতি ঈমানের জন্য অপরিহার্য হলো তাঁর অপছন্দের সকল কথা-কাজ পরিহার করা। তিনি বলতেন, আমার বুঝে আসে না যে, বান্দা যদি আল্লাহর অপছন্দের সবকিছু ছেড়ে না দেয় তাহলে তার ঈমান কোন কাজে আসবে?
নামাযে আগ্রহ ও একাগ্রতা
তাঁর নামাযে এক বিশেষ অবস্থা ও তন্ময়ভাবের সৃষ্টি হতো। তিনি যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন এমন মনে হতো যে, তাঁর ওপর আলোকধারা নামছে। ইবন 'আওন বলেন, যখন তিনি নামাযের মধ্যে থাকতেন তখন তাঁকে প্রাণহীন কাঠের মত মনে হতো, শরীর ও কাপড়-চোপড় একটুও নড়াচড়া করতো না। নামাযরত অবস্থায় যত মারাত্মক ও ভয় পাইয়ে দেওয়ার মত অবস্থার সৃষ্টি হোক না কেন সে ব্যাপারে তাঁর কোন প্রতিক্রিয়াই থাকতো না। একবার তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন সময় পাশেই আগুন লাগে এবং অল্পক্ষণ পরে নিভেও যায়; কিন্তু তিনি মোটেও টের পাননি।
অসুস্থতার কারণে মানুষ যখন একেবারেই অপারগ হয়ে যায় সে সময় ছাড়া আর কোন অবস্থায় বসে নামায আদায় করা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার জনৈক ব্যক্তি নৌকায় বসে বসে নামায আদায়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। তিনি বলেন, এ আমার মোটেই পছন্দ নয় যে, কোন রোগ ছাড়া আল্লাহ আমাকে বসা অবস্থায় নামাযে দেখুক। নামাযের দিকে আহ্বানের এত গুরুত্ব দিতেন যে, যদি বহু দূর থেকেও আযানের ধ্বনি কানে ভেসে আসতো, সেই মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করতেন। একবার তিনি কোন এক মসজিদ থেকে ফিরছেন। কিছু দূর যাওয়ার পর আযানের ধ্বনি কানে ভেসে এলো। তিনি আবার সেই মসজিদে ফিরে গেলেন। মুয়াযযিন জিজ্ঞেস করলো, আপনি আবার ফিরে এলেন কেন? বললেন: তুমিই তো ফিরিয়ে আনলে।
মসজিদের খিদমত ছিল তাঁর বিশেষ কাজ। মসজিদে তিনি বাতি জ্বালাতেন। এ কারণে লোকেরা তাঁকে আল-মুসব্বিহু (বাতি প্রজ্জ্বলনকারী মুসলিম) বলতো।
সুন্নাহর অনুসরণ
সুন্নাহর অনুসরণের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। অতি মামুলি ধরনের সুন্নাতও ছুটে যেতে পারতো না। শুধু একটি সুন্নাতের অনুসরণ হবে এ চিন্তায় জুতাপরা অবস্থায় নামায আদায় করতেন। তিনি বলতেন, জুতা খোলা আমার জন্য খুবই সহজ কাজ, কিন্তু শুধুমাত্র সুন্নাতের অনুসরণ হবে এ চিন্তায় জুতো পরা অবস্থায় নামায আদায় করি। হযরত রাসূলে কারীম (সা) খোরমা দিয়ে ইফতার করতেন। এ কারণে খোরমা দিয়েই তাঁর ইফতার হতো।
কুরআনের প্রতি সম্মান
আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের প্রতি এত বেশী সম্মান প্রদর্শন করতেন যে, যে হাত দিয়ে কুরআন ধরতেন সে হাত দিয়ে নাজাসাতের স্থান স্পর্শ করতেন না। বলতেন, আমি ডান হাত দিয়ে যৌনাঙ্গ স্পর্শ করা খারাপ কাজ মনে করি। কারণ, ঐ হাত দিয়ে আমি কুরআন ধরি।
রিয়া তথা প্রদর্শনীমূলক মনোভাবকে তিনি মূর্খতা ও শয়তানের মন্ত্র বলে মনে করতেন। বলতেন, তোমরা আত্মপ্রদর্শনী থেকে দূরে থাক। কারণ, তা একজন 'আলিমকে মূর্খের পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং তার মাধ্যমেই শয়তান ভুল পথে চালিত করে।
তিনি অত্যন্ত ধীর-স্থির ও সহনশীল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। রাগের সময়ও মুখ থেকে অসমীচীন কথা উচ্চারিত হতো না। কখনো কাউকে গালি দেননি। সর্বাধিক উত্তেজিত অবস্থায় তাঁর মুখ থেকে যে কথাটি উচ্চারিত হতো তা হলো: "এখন আমার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে নাও।” একথা উচ্চারিত হলে মানুষ বুঝে যেত তিনি তাঁর রাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গেছেন।
এত ধীর-স্থির ও ধৈর্য-সহনশীল হওয়ার কারণে সকল হৈ-হাঙ্গামা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে তিনি দারুণ অপছন্দ করতেন। সে সময় মুহাম্মাদ ইবন আল-আশ'আছের নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তাতে অনেক উঁচু স্তরের তাবি'ঈ জড়িয়ে পড়েন। অন্যদের মত মুসলিমও তাতে অংশ গ্রহণ করেন। তবে তিনি কারো উপর তরবারি উঠাননি। শুধু এই অংশ গ্রহণের জন্য পরবর্তীতে অনুশোচনায় জর্জরিত হন। আবু কিলাবা বলেন, একবার মক্কার সফরে আমি ও মুসলিম এক সাথে ছিলাম। তখন একদিন তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-আশ'আছের বিদ্রোহের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন : আলহামদু লিল্লাহ, আমি এই বিশৃঙ্খলায় না একটি তীর ছুড়েছি, না তরবারি চালিয়েছি, আর না একটি বর্শা নিক্ষেপ করেছি। আমি বললাম, কিন্তু আপনি বলুন তো, ঐ সকল লোকদের পরিণতি কি হবে যারা আপনাকে সারিতে দাঁড়ানো দেখে বলেছিল, মুসলিম ইবন ইয়াসার এই যুদ্ধে আছেন এবং তিনি কোন অন্যায় কাজে যুক্ত হতে পারেন না এবং এই বিশ্বাসে তারা যুদ্ধ করে মারা গেছে? আমার একথা শুনে তিনি ব্যাকুলভাবে কাঁদতে থাকেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে আমি লজ্জিত হলাম, তাঁকে এমন কথা বলার জন্য।
ওফাত
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) খিলাফতকালে হিজরী ১০০ অথবা ১০১ সনে তিনি ইনতিকাল করেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৮/৯৫; তাবি'ঈন-৪৭৮
২. আত-তাবাকাত-৭/১৩৭; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪০
৪. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৪
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৯৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪১
৭. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
৮. প্রাগুক্ত-৭/১৩৫
৯. প্রাগুক্ত-৭/১৩৬
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
১১. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
১২. প্রাগুক্ত
১৩. প্রাগুক্ত-৭/১৩৭
十四. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
হযরত আবূ 'আবদিল্লাহ মুতারিরফের (রহ) বংশধারা এরূপ : মুতাররিফ ইবন ‘আবদিল্লাহ ইবনুশ শিখখীর ইবন আওফ ইবন কা’ব ইবন ওয়াফদান ইবনুল হারিছ ইবন কা’ব ইবন রাবী‘আ ইবন ‘আমির ইবন সা’সা’আ।
'আবদুল্লাহ তাঁর পিতা ও আশ-শিখীর দাদা। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায় তাঁর জন্ম। কিন্তু অল্প বয়স অথবা দূরে অবস্থানের কারণে মহানবীর সাক্ষাৎ ও সাহচর্যের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থেকে যান। ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখীর ও হানী ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখীর তাঁর দু'ভাই।
জ্ঞান অর্জন
জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর ছিল তীব্র আবেগ ও আগ্রহ। জ্ঞানের গুণ-ফযীলতকে 'ইবাদতের গুণ-ফযীলতের উপর প্রাধান্য দিতেন। এই প্রবল আগ্রহ ও আবেগ তাঁকে জ্ঞানীদের উচ্চাসনে বসায়। খোদাভীতি, ভদ্রতা, শিষ্টাচারিতা তথা যাবতীয় নৈতিক গুণ ও উৎকর্ষে ছিলেন আদর্শ স্থানীয়। ইবন সা'দ বলেন, তাঁর ব্যক্তি সত্তায় খোদাভীতি, মহৎ গুণ, বর্ণনা ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও সাহিত্য প্রতিভা ইত্যাদি গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি তাঁকে বসরার মনীষীদের তৃতীয় তবকায় স্থান দিয়েছেন। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ইল্যু ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের চূড়া সমতুল্য ছিলেন। তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের কারণে মানুষের অন্তরে বিশেষ স্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
হাদীছ
তাঁর সময়ে বিশাল সংখ্যক সাহাবায়ে কিরাম (রা) জীবিত ছিলেন। তিনি তাঁদের জ্ঞানের ঝর্ণাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হন। হযরত 'উছমান, 'আলী, আবু যার, 'আম্মার ইবন ইয়াসির, 'আবদুল্লাহ ইবন মুগাফ্ফাল, 'উছমান ইবন আবিল 'আস, 'ইমরান ইবন হুসাইন, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান (রা) প্রমুখ উঁচু মর্যাদার সাহাবায়ে কিরামের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভে যাঁরা ধন্য হয়েছেন তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন : তাঁর ভাই আবুল 'আলা' ইয়াযীদ, ভাতীজা 'আবদুল্লাহ ইবন হানী এবং হাসান আল-বাসরী, হুমায়দ ইবন হিলাল, আবু নাসর, গায়লান ইবন জারীর, সা'ঈদ ইবন আবী হিন্দ, মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি', আবুত তায়য়াহ, ছাবিত আল-বানানী, 'আবদুল কারীম ইবন রুশাইদ, সা'ঈদ আল-হারীরী, আবূ সালামা, সা'ঈদ ইবন ইয়াযীদ (রহ) ও আরো অনেকে। ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল। তিনি ছিলেন বসরার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফতী।
তাঁর এই জ্ঞান ও মনীষার তুলনায় তাঁর আমল, পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি নির্মোহ ভাব এবং খোদাভীরুতার পাল্লা ভারী ছিল। ইবন সা'দ তাঁকে অত্যধিক আল্লাহ ভীরু লোকদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন। 'আজলী তাঁকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ এবং সত্যনিষ্ঠ মানুষ বলেছেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি ছিলেন বসরার একজন 'আবিদ ও যাহিদ (তাপস ও দুনিয়া বিরাগী) মানুষ।
দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা পরিহার
তাঁর এমন দুনিয়া বিরাগী মনোভাব ও আল্লাহ ভীরুতার কারণে তিনি সব ধরনের হৈ- হাঙ্গামা ও বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলাকে দারুণ ভয় করতেন। এ জাতীয় কাজকে তিনি একটা পরীক্ষা বলে মনে করতেন। বলতেন, ফিতনা-ফাসাদ পথ প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং ঈমানদার ব্যক্তিকে তার নিজের নফসের সংগে সংঘাত-সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়ার জন্য মাথা তুলে দাঁড়ায়। তাঁর জীবনকালে বড় বড় বিপ্লব ও ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু তিনি সবকিছু থেকে নিজেকে সযত্নে দূরে রেখেছেন। সাধারণতঃ ফিতনা-ফাসাদের সময় তিনি সে স্থান ত্যাগ করে কোন অজ্ঞাত স্থানে চলে যেতেন। যদি যাওয়ার সুযোগ না পেতেন তাহলে ঘরে চুপ করে বসে থাকতেন। এমনকি জুম'আ ও জামা'আতের জন্যও বের হতেন না। 'উকরা বলেন, আমি মুতারিফের ভাই ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, ফিতনা বা বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো তখন মুতারিফ কী করতেন? তিনি বললেন, ঘরের অভ্যন্তরে একেবারে নির্জনবাস অবলম্বন করতেন। আর যতদিন বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলার অগ্নিশিখা প্রশমিত না হতো ততদিন তিনি মানুষের জুম'আ ও জামা'আতে শরীক হতেন না। অন্যদেরকেও তিনি এই ফিতনা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতেন। হযরত কাতাদা (রহ) বলেন, যখন কোন ফিতনা-ফাসাদ দেখা দিত তখন মুতাররিফ মানুষকে তাতে জড়িত হতে বাধা দিতেন এবং নিজে কোথাও পালিয়ে যেতেন। হাসান আল-বাসরীও মানুষকে বাধা দিতেন, তবে তিনি স্থান ত্যাগ করতেন না। এ কারণে মুতাররিফ তাঁর সম্পর্কে বলতেন, হাসান আল-বাসরী সেই ব্যক্তির মত যে মানুষকে প্লাবন থেকে সতর্ক করে, কিন্তু নিজে তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে।
চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্কতার কারণে তিনি সেই সব সংঘাত-সংঘর্ষের অবস্থা সম্পর্কেও কোন কিছু জানতে চাইতেননা। 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়র (রা) ও বানূ উমাইয়্যাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত তাঁর সময়ে হয়। তিনি এই বিরোধের কথা কারো কাছে কিছুই জানতে চাইতেন না। মানুষ যেহেতু তাঁর চিন্তাধারা সম্পর্কে অবহিত ছিল এ কারণে তারাও তাঁর সামনে সে বিষয়ে কিছু আলোচনা করতো না।
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ও 'আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে 'আবদুর রহমান ইবন আল- আশ'আছ যে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উত্তোলন করেন তাতে অনেক বড় বড় সাহাবী অংশ গ্রহণ করেন। মানুষ মুতারিফকেও অংশ গ্রহণের জন্য চাপ দিতে থাকে, কিন্তু তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন: তোমরা যে জিনিসে অংশ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাচ্ছো তা কি "জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ থেকেও উত্তম হবে?" লোকেরা বললো না। তিনি বললেন, তাহলে আমি ধ্বংসের মধ্যে পতিত হওয়া এবং সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের মধ্যে জুয়া খেলতে চাই না। অর্থাৎ সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ যুদ্ধে জড়াতে চাই না। শান্তি ও নিরাপত্তার জীবন তাঁর পছন্দ ছিল। বলতেন, শান্তি ও নিরাপদ জীবন লাভ করে শুকরিয়া আদায় করা বিপদ- মুসীবতে ধৈর্য ধারণের চেয়ে আমার নিকট বেশী পছন্দের। আল-'ইজলী' বলেন, ইবন আল-আশ'আছের ফিত্না থেকে বসরার মাত্র দু'ব্যক্তি রক্ষা পেয়েছিলেন। তারা হলেন: মুতারিফ ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীন।
'আকীদা-বিশ্বাস
'আকীদার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন এবং তা সংরক্ষণের জন্য ভীষণ যত্নবান ছিলেন। একবার খারিজীদের একটি উপদল তাঁর নিকট আসে এবং তাদের আকীদাসমূহ গ্রহণ করার জন্য তাঁকে আহ্বান জানায়। তিনি তাদেরকে বলেন, যদি আমার দু'টি অন্তর থাকতো তাহলে একটিতে তোমাদের 'আকীদাসমূহ স্থান দিতাম এবং অন্যটি সংরক্ষণ করতাম। তোমরা যা বলছো তা যদি সঠিক হতো তাহলে দ্বিতীয়টি দিয়ে তোমাদের অনুসরণ করতাম। আর যদি ভুল হতো তাহলে একটি ধ্বংস হলেও অন্যটি তো রক্ষা পেত। কিন্তু অন্তর তো মাত্র একটি। এ কারণে আমি তাকে ধোঁকা ও প্রতারণার কাজে লাগাতে পারিনে।
যদিও তিনি একজন বড় দুনিয়া বিরাগী খোদাভীরু মানুষ ছিলেন, তাই বলে অদৃষ্ট৭/১০৩
১১. প্রাগুক্ত-৭/১০৪
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৩
১৪. আত-তাবাকাত-৭/১০৪; তাবি'ঈন-৪৮৪
১৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৪
১৬. আত-তাবাকাত-৭/১০৫
১৭. প্রাগুক্ত-৭/১০৪
১৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৫
十九. আত-তাবাকাত-৭/১০৫
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৫; তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৪
二十一. আত-তাবাকাত-৭/১০৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৪
二十二. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৫
二十三. প্রাগুক্ত-১/৬৪; তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৫-১৪৬
📄 মায়মূন ইবন মিহরান (রহ)
হযরত মায়মূনের (রহ) ডাকনাম আবু আইউব। পিতা মিহরান ছিলেন বানু নাসর ইবন মু'আবিয়ার মুকাতিব দাস। যে দাস নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ মনিবকে দিয়ে দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবে বলে মনিবের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় তাকে মুকাতিব দাস বলে। মায়মূন হিজরী ৪০ সনে জন্ম গ্রহণ করেন। কৃষ্ণার আব্দ গোত্রের এক মহিলার দাস হিসেবে তাঁর জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে ঐ মহিলা তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। কৃফায় বেড়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে 'রাক্কা' চলে যান। একবার 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) এক প্রশ্নের জবাবে মায়মুন বলেন, আমার মা ছিলেন আব্দ গোত্রের দাসী, আর বাবা ছিলেন বানু নাসর ইবন মু'আবিয়ার মুকাতিব। আমার জন্মের সময়ও তিনি মুকাতিব ছিলেন। কাছীর ইবন হিশাম বলেন, সা'ঈদ ইবন জুবায়রের মেয়ে ছিলেন মায়মূনের স্ত্রী।
জাযীরায় অবস্থান
দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভের পর দীর্ঘদিন কৃষ্ণাতেই অবস্থান করেন। হিজরী ৮০ সনে যখন 'আবদুর রহমান ইবন আল-আশ'আছের বিদ্রোহের কারণে কৃষ্ণায় অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তখন তিনি কৃফা ছেড়ে জাযীরায় চলে যান এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকেন।
বায়তুল মাল রক্ষকের পদে
মুহাম্মাদ ইবনে মারওয়ান যখন খুরাসানের ওয়ালী তখন তিনি তথাকার বায়তুল মালের রক্ষকের পদে মায়মূনকে নিয়োগ করেন।
খারাজের পদে
বায়তুল মালের রক্ষণাবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি যথেষ্ট বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এ কারণে হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) তাঁকে আল-জাযীরার খারাজ (খাজনা-ট্যাক্স) বিষয়ক দফতরের দায়িত্ব দেন এবং তাঁর পুত্র 'উমারকে উক্ত দফতরের হিসাব রক্ষকের পদে নিয়োগ করেন। স্বভাবগতভাবেই মায়মূন সব ধরনের রাষ্ট্রীয় পদ, বিশেষতঃ অর্থ বিষয়ক দায়িত্ব দারুণ অপছন্দ করতেন। তবে সে সময় তিনি তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পারেননি। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যে বিরক্ত হয়ে পদত্যাগ পত্র পেশ করেন। খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) তাঁর পদত্যাগ গ্রহণ করেননি। তিনি মায়মূনকে লেখেন, এই পদের দায়িত্ব তো এতটুকুই যে, বৈধ পন্থায় অর্থ আদায় করবে এবং বৈধ খাতগুলোতে তা ব্যয় করবে। এ কাজে পদ ত্যাগের কি কারণ থাকতে পারে? আর একটু কষ্ট হলেই যদি মানুষ সবকিছু ছেড়ে দেয় তাহলে দীন ও দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা টিকবে কেমন করে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) এ লেখা পেয়ে তিনি পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহার করে নেন এবং তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এ পদে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করেন।
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) পরবর্তী খলীফা ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিকের খিলাফতকালের প্রথম কিছুদিন তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এ কাজ তাঁর স্বভাবগতভাবেই অপছন্দ ছিল। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পীড়াপীড়িতে তা এই ভিত্তিতে মেনে নেন যে, তাঁর সময়ের রাষ্ট্রীয় সেবা মূলতঃ ইসলামের সেবা ছিল। তবে তাঁর পরে যখন খিলাফতের সকল বিভাগ পার্থিব রাষ্ট্র ব্যবস্থার রূপ ধারণ করে তখন তিনি বিরক্ত হয়ে পদত্যাগ করেন। ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিকের সময়ে যে দিনগুলো এ দায়িত্ব পালন করেন তার জন্য আফসোস করতেন। তিনি বলতেন, আমি অন্ধ হয়ে যেতাম তাও আমার জন্য ভালো ছিল, যদি না আমি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) ও অন্যদের দেয়া পদ গ্রহণ করতাম।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান মনীষায় তিনি শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ ও আল-জাযীরার উচ্চ পর্যায়ের 'আলিমদের মধ্যে ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে ইমাম, নেতা ও আল-জাযীরার 'আলিম বলেছেন। তাঁর সমকালীন 'আলিমদের মধ্যে তাঁর জ্ঞানগত মর্যাদা স্বীকৃত ছিল। আবুল মালীহ বলতেন, আমি মায়মূনের চেয়ে উত্তম কাউকে পাইনি। সুলায়মান ইবন মূসা বলেন, সেই আমলে চারজনকে বড় 'আলিম বলে মানা হতো। মায়মূন ইবন মিহরান তাঁদের একজন। অন্য তিনজন হলেন : মাকহুল, হাসান আল-বাসরী ও আয-যুহরী।
হাদীছ
তিনি হাদীছের হাফিজ ছিলেন। ইবন সা'দ বলেন : ‘তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, অল্প সংখ্যক হাদীছের ধারক-বাহক।’ সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে তিনি হযরত 'আবূ হুরায়রা, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, সা'ঈদ ইবন জুবায়র, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা), উম্মুদ দারদা' (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে হযরত নাফি' মাওলা ইবন 'উমার, মাকসাম মাওলা ইবন 'আব্বাস (রা), ইয়াযীদ ইবন 'আসিম (রহ) প্রমুখের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন।
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
হুমায়দ আত-তাবীল, আইউব আস-সাখতিয়ানী, জা'ফার ইবন বারকান, জা'ফার ইবন ওয়াহশিয়া, হাবীব ইবন শাহীদ, 'আলী ইবন হাকাম আন-নাবানী, হাকাম ইবন 'উতায়বা, আবূ ফারওয়া, ইয়াযীদ ইবন সিনান, হাজ্জাজ ইবন তামীম, সালিম ইবন আবিল মুহাজির, আবুল মালীহ (রহ) প্রমুখ তাঁর কীর্তিমান ছাত্র। আবু 'আরূবা আল-হারানী তাঁকে আল-জাযীরার তাবি'ঈদের ১ম স্তরে স্থান দিয়েছেন।
ফিক্হ
শাস্ত্রে তিনি আল-জাযীরার সকল 'আলিমের মধ্যে বিশেষ স্থানের অধিকারী ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে আল-জাযীরার সকল অধিবাসীদের মধ্যে ফিক্হ ও ফাতওয়ায় শীর্ষ স্থানের অধিকারী বলেছেন। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর দক্ষতার সবচেয়ে বড় সনদ এই যে, হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) মত বিচক্ষণ খলীফা আল-জাযীরার খারাজ বিভাগের দায়িত্বের পাশাপাশি কাজীর দায়িত্বও তাঁর উপর অর্পণ করেন।
জ্ঞানের পাশাপাশি উন্নত নৈতিকতার অধিকারী ছিলেন। শরী'আত নিষিদ্ধ বস্তু ও বিষয় থেকে দূরে থাকার প্রতি দারুণ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর পুত্র বলেন, আব্বা মধ্যপন্থা থেকে বেশি রোযা-নামায করতেন না। তবে আল্লাহর অবাধ্যতাকে ভীষণ অপছন্দ করতেন। মাঝে মাঝে রাত-দিনে হাজার রাক'আত নফল নামাযও আদায় করতেন। একবার সতের দিনে সতের হাজার রাক'আত নফল নামায আদায় করেন। ১৮তম দিনে পেটে কোন ক্ষতের কারণে ইনতিকাল করেন।
বিনয় ও বিনম্রভাব
এত বিনয় ও বিনম্র ছিলেন যে, কোন প্রকার অহমিকা ও আত্মম্ভরিতার ভাব ফুটে ওঠে এমন আচরণ মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার জনৈক ব্যক্তি তাঁকে বলে, আবু আইউব! যতদিন আল্লাহ আপনাকে জীবিত রাখবেন ততদিন মানুষ সুখে থাকবে। এর জবাবে তিনি বলেন, এমন কথা উচ্চারণ করবে না। মানুষ ততদিন পর্যন্ত সুখে থাকবে যতদিন তারা তাদের প্রভুকে (রব) ভয় করতে থাকবে।
হযরত 'আলীর (রা) উপর হযরত 'উছমানকে (রা) প্রাধান্য দান
জীবনের প্রথম পর্বে তিনি হযরত 'উছমানের (রা) বিপরীতে হযরত 'আলীকে (রা) প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) মুখে একটি যুক্তি শোনার পর তিনি হযরত 'উছমানের (রা) শ্রেষ্ঠত্বের প্রবক্তা হয়ে যান। একবার 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি এমন দু'ব্যক্তির মধ্যে কাকে বেশি পছন্দ কর, যাদের একজন অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করেছেন এবং অন্যজন দ্রুততা করেছেন রক্তপাতের ব্যাপারে? প্রশ্নাকারে এ যুক্তি শোনার পর তিনি তাঁর পূর্বের বিশ্বাস থেকে সরে আসেন। হযরত 'উছমানের (রা) বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, তাঁর খিলাফতকালে বায়তুল মালের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়নি, আর হযরত 'আলীর (রা) সময়ে গৃহ যুদ্ধের সূচনা হয়।
মেয়ের বিয়ে
মায়মূন ইবন মিহরান প্রথম যৌবনেই বিয়ে করেন এবং বিয়ের পরেই প্রথমে এক কন্যার পিতা হন। পিতা-মাতা অতি আদরে মেয়েকে গড়ে তোলেন। জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও দীনী পরিবেশে বেড়ে ওঠায় তার মধ্যেও সৎ গুণাবলীর বিকাশ ঘটে। মেয়েটির বিয়ের বয়স হলো। বহু অভিজাত ঘরের বিত্তশালী যুবক বিয়ের পয়গাম পাঠাতে লাগলো। মায়মূন মেয়ের বর হিসেবে আভিজাত্য ও বিত্ত-বৈভবকে মোটেও গুরুত্ব দিলেন না। তিনি গুরুত্ব দিলেন পাত্রের সত্যনিষ্ঠতা ও আল্লাহ ভীতিকে। এমন একজন দরিদ্র পাত্রকেই তিনি মেয়ের জন্য নির্বাচন করেন। একজন বিত্তশালী অভিজাত যুবক বিয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি তাকে পরীক্ষার জন্য বলেন: আমার মেয়ে তো প্রচুর সোনা-রূপো পছন্দ করে। সাথে সাথে সে জবাব দেয়, আমার তা আছে। মায়মূন একটু হেসে বলেন: আমি আমার মেয়ের জন্য এমন পাত্র নির্বাচন করতে পারিনে।
তাঁর একটি তৎক্ষণিক মন্তব্য
তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টবাদী মানুষ। সত্য কথা বলতে কোন রকম ইতস্ততা করতেন না। একদিন তিনি মসজিদে নফল নামায আদায় করছেন। নামায শেষ করতেই এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে বললো: হিশাম ইবন 'আবদিল মালিকের স্ত্রী ইনতিকাল করেছেন। মায়মূন 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন' পাঠ করলেন। লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা একটু উঁচু করে আবার বললো : আপনি কি জানেন মৃত্যুর আগে অসুস্থ অবস্থায় হিশামের স্ত্রী কী করেছেন? মায়মূন বললেন : না। কী করেছেন? লোকটি বললো : তার মালিকানার সকল দাস-দাসী মুক্ত করে দিয়েছেন। মায়মূন বিস্ময়ের সুরে বললেন : সুবহানাল্লাহ! দুইবার আল্লাহর অবাধ্যতা করেছেন। আল্লাহ অর্থ-সম্পদ খরচ করার নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ তিনি সে ব্যাপারে জীবিত অবস্থায় কার্পণ্য করেছেন, আর যখন সে সম্পদ অন্যের হয়ে যাচ্ছে তখন তা খরচের ব্যাপারে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন।
হাসান আল-বাসরীর (রহ) সাথে একটি সাক্ষাৎকার
মায়মূন ইবন মিহরান বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন। চোখ-কানও দুর্বল হয়ে গেছে। এখন আর একাকী চলতে-ফিরতে পারেন না। যেখানেই যান ছেলে 'আমর ইবন মায়মূনকে সংগে নিয়ে যান। একদিন 'আমর পিতাকে নিয়ে বসরার একটি পথে বের হয়েছেন। পথে সরু একটি নালা। বৃদ্ধ পিতা তা ডিঙ্গিয়ে পার হতে পারলেন না। 'আমর আড়াআড়িভাবে নালার উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো, আর পিতা মায়মূন ছেলের পিঠের উপর দিয়ে নালা পার হলেন। তারপর 'আমর উঠে দাঁড়িয়ে আবার পিতার হাত ধরে চলতে লাগলেন।
মায়মূন ছেলেকে হাসান আল-বাসরীর বাড়িতে যাওয়ার জন্য বললেন। তাঁরা হাসানের দরজায় পৌছে তাঁদের উপস্থিতি জানালেন। হাসানের এক দাসী এসে জিজ্ঞেস করলো: এ বৃদ্ধ কে? 'আমর বললো: মায়মূন ইবন মিহরান এসেছেন হাসান আল-বাসরীর সাথে সাক্ষাৎ করতে। দাসী বললো: কোন মায়মূন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কাতিব (সেক্রেটারী)? 'আমর বললো: হাঁ, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সেক্রেটারী। দাসী সাথে সাথে বলে উঠলো: হায় আমার দুর্ভাগ্য! এমন মন্দ সময়েও আপনি বেঁচে আছেন? দাসীর কথা শুনে মায়মূন কেঁদে দিলেন এবং এত বেশি কাঁদলেন যে তাঁর সারা দেহ কাঁপতে থাকলো। দাসী চলে যাওয়ার পর হাসান আল-বাসরী ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং মায়মূনকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করেন। তারপর তাঁরা সকলে ভিতরে প্রবেশ করেন। বসার পর একটু স্থির হয়ে মায়মুন হাসান আল-বাসরীকে লক্ষ্য করে বলেন: আবূ সা'ঈদ! আমি আমার অন্তরে কঠোরতা অনুভব করছি, এর প্রতিকার কিসে হয় তা বলে দিন। মায়মূনের কথা শুনে হাসান সোজা হয়ে বসলেন, তারপর পাঠ করলেন: بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ - أَفَرَعَيْتَ إِنْ মَّتَّعْنَاهُمْ سِنِيْنَ. ثُمَّ جَاءَهُمْ মَّا كَانُوا يُوْعَدُوْنَ مَا أَغْنَى عَنْهُمْ মَّا كَانُوا يُمَتَّعُوْنَ। 'তুমি ভেবে দেখ যদি আমি তাদেরকে দীর্ঘকাল ভোগ-বিলাস করতে দেই এবং পরে তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল তা তাদের নিকট এসে পড়ে, তখন তাঁদের ভোগ-বিলাসের উপকরণ তাদের কোন কাজে আসবে কি?' তিলাওয়াত শেষ করে হাসান দীর্ঘক্ষণ অবচেতন অবস্থায় থাকলেন, তারপর সম্বিত ফিরে পেলেন। তখন দাসীটি এসে বললো: আপনারা এই বৃদ্ধকে কষ্ট দিচ্ছেন, এবার উঠুন, যান!
'আমর পিতার হাত ধরে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। চলতে চলতে 'আমর বলে: 'আব্বা! আমার ধারণা ছিল হাসান এর চেয়ে বেশি সবল আছেন। মায়মুন ছেলের বুকে হাত দিয়ে গুঁতো মেরে বলেন: বেটা! তিনি এমন একটি আয়াত আমাদের সামনে পাঠ করেছেন, তুমি যদি তার অর্থ বুঝতে তাহলে তোমার জন্য তার মধ্যে খুব বড় উপদেশ রয়েছে।
তারপর তিনি ছেলেকে লক্ষ্য করে বললেন, এই কুরআন বহু মানুষের অন্তরে অনেক কিছু সৃষ্টি করেছে এবং তারা এর বাইরে হাদীছ তালাশ করেছে। তাদের অনেকে তাদের অর্জিত এই জ্ঞানকে পণ্য বানিয়ে তার বিনিময়ে দুনিয়ার প্রত্যাশী যেমন হয়েছে তেমনি অনেকে চেয়েছে মানুষ তার দিকে আংগুল দিয়ে ইশারা করুক, আবার অনেকে চেয়েছে তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া-বিবাদ করে প্রতিপক্ষের উপর বিজয়ী হতে। তবে সেই ব্যক্তিই ভালো যে জ্ঞান অর্জন করে এবং সেই জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহর আনুগত্য করে। যে কুরআনের অনুসরণ করবে, কুরআন তাকে পথ দেখিয়ে জান্নাত পর্যন্ত নিয়ে যাবে। আর যে কুরআন ত্যাগ করবে, কুরআন তাকে ত্যাগ না করে তার পিছে পিছে চলতে থাকবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। তারপর তিনি ছেলেকে বলেন: আল্লাহকে ভয় কর। কোন লোভ ও ক্রোধ যেন তোমাকে বিকৃত না করে।
তাঁর কিছু ওয়াজ-নসীহত
একদিন 'আমর তার পিতাকে মসজিদে নিয়ে গেল। এক কোণে তাঁর নির্দিষ্ট স্থানটিতে তিনি বসলেন। মানুষের ভীড় জমে গেল এবং তাঁর চারপাশে বৃত্তাকারে বসে গেল। মায়মূন তাঁর অভ্যাস মত আল্লাহর হামদ ও রাসূলের (সা) প্রতি দরূদ ও সালাম পেশের মাধ্যমে বলতে আরম্ভ করলেন: ওহে যুব সম্প্রদায়, তোমাদের শক্তিকে তোমরা তোমাদের যুবকদের মধ্যে পুঞ্জিভূত কর এবং আল্লাহর আনুগত্যের জন্য তোমাদের কর্ম তৎপরতা পরিচালিত কর। ওহে বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিবর্গ! আর কত দিন মরীচিকার পিছনে ছুটবে?
আল্লাহর যিক্র বা স্মরণ দু'প্রকার। মুখে আল্লাহকে স্মরণ করা, আর এক প্রকার স্মরণ হলো, যখন তুমি কোন পাপ কাজের কাছাকাছি যাবে তখন আল্লাহকে স্মরণ করে বিরত থাকা। আর এটাই আল্লাহর সর্বোত্তম যিক্র বা স্মরণ।
তিনটি জিনিসের ব্যাপারে মু'মিন ও কাফির উভয়ে সমান: ক. কেউ কোন কিছু আমানত (গচ্ছিত) রাখলে তা ফেরত দেয়া। খ. মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আল্লাহ বলেন: إِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا। “তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সমকক্ষ দাঁড় করাতে যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তুমি তাদের কথা মানবে না, তবে পৃথিবীতে তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে।’
গ. অঙ্গীকার করলে তা পূরণ করা।
অধীনস্থ দাস-দাসীকে শান্তি দিবে না, মারপিট করবে না। তবে তার অপরাধ মনে রাখবে। যদি সে কখনো আল্লাহর অবাধ্যতা করে তখন তার এই পাপের জন্য সাস্তি দিবে। তখন তাকে তোমার সাথে করা তার অপরাধের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে।
মজলিসের ভিতর থেকে এক যুবক দাঁড়িয়ে বললো : ওহে শায়খ, আল্লাহ আপনাকে সহীহ-সালামাতে রাখুন! আপনি একজন বান্দাহ ও তার পাপ সম্পর্কে কিছু বলুন। মায়মূন মাথা নেড়ে যুবকের কথায় সায় দিলে সে বসে পড়ে। তারপর তিনি বলেন: একজন বান্দাহ যখন কোন পাপ করে তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। যদি তাওবা করে তাহলে দাগটি উঠে যায়। মু'মিন ব্যক্তি তা খায়নায় দেখার মত পরিষ্কার দেখতে পায়। শয়তান যে পাশ দিয়েই আসুক না কেন সে তাকে দেখতে পায়। আর যে ক্রমাগত পাপ করতে থাকে, তার প্রতিটি পাপের জন্য তার অন্তরে একটি করে কালো দাগ পড়তে পড়তে তার গোটা অন্তরটিই কালো হয়ে যায়। তখন সে আর কোন দিক দিয়েই শয়তানকে দেখতে পায় না।
আরেকজন শ্রোতা দাঁড়িয়ে বললো : শায়খ! আমাদেরকে ধন-সম্পদ সম্পর্কে কিছু কথা শোনান। তিনি বললেন : ধন-সম্পদের তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে। যদি কোন ব্যক্তি তিনটির একটি বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্তি পায়, তাহলে তৃতীয়টি থেকে খুব কমই মুক্তি পাবে। অর্থ-সম্পদের জন্য অপরিহার্য হলো পবিত্র হওয়া। আর তা হবে বৈধভাবে উপার্জনের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে সে যদি পরিচ্ছন্ন হয় তাহলে তার উচিত হবে অর্থ-সম্পদের হক বা অধিকারসমূহ আদায় করা। এ ক্ষেত্রেও সে যদি পরিচ্ছন্ন হয় তাহলে তার উচিত হবে তা ব্যয়ের ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। বেশিও করবে না, আবার কৃপণতাও করবে না।
নিমের কথাগুলো বলার মাধ্যমে মায়মূন তাঁর মজলিস শেষ করেন :
এই পৃথিবী অত্যন্ত মিষ্টি-মধুর ও প্রাণবন্ত যা কামনা-বাসনার চাদর দ্বারা আবৃত। আর শয়তানও সর্বক্ষণ উপস্থিত অতি চালাক শত্রু। আখিরাতের বিষয়টি বিলম্বিত এবং দুনিয়ার বিষয়টি তাৎক্ষণিক। কেউ যদি তার পরকালের স্থানটি জানতে চায় সে যেন দুনিয়াতে তার আমলের দিকে দৃষ্টিপাত করে।
ফুরাত ইবন সালমান বলেন, একবার আমরা মায়মূন ইবন মিহরানের সংগে চলতে চলতে একটি গীর্জার কাছে গিয়ে থামলাম। তিনি একজন পাদ্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন: আচ্ছা বলতো, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে যে এই পাদ্রীর সমান 'ইবাদত- বন্দেগী করে? সবাই বললাম: না। তিনি বললেন: মুহাম্মাদের (সা) প্রতি ঈমান না এনে তার এই 'ইবাদতে কি কোন ফল হবে? বললাম: কোন ফল হবে না। তিনি বললেন: তেমনিভাবে 'আমল ব্যতিরেকে শুধু কথায় কোন উপকার হবে না।
আবুল মালীহ আর-রাকী থেকে বর্ণিত হয়েছে, মায়মূন ইবন মিহরান বলতেন: الظَّالِمُ وَالْمُعِينُ عَلَى الظُّلْمِ وَالْمُحِبُّ لَهُ سَوَاءٌ 'অত্যাচারী, অত্যাচারের সহযোগী এবং অত্যাচারকে যে ভালো মনে করে সকলে সমান।' তিনি আল কুরআনের ধারক-বাহকদের লক্ষ্য করে বলতেন, তোমরা তো দুনিয়াতে কিছু লাভের আশায় কুরআনকে পণ্য বানিয়ে নিয়েছো। তোমরা দুনিয়াকে দুনিয়ার দ্বারা এবং আখিরাতকে আখিরাতের দ্বারা সন্ধান কর। একবার তিনি ছেলেকে লিখলেন: তুমি তোমার অর্থ থেকে অমুককে ভালোমত সাহায্য করবে এবং মানুষের কাছে কিছু চাইবে না। কারণ তা লজ্জা দূর করে দেয়। তিনি সকলকে বলতেন: তোমার গৃহে কোন অতিথি আসলে তোমার সাধ্যের বাইরে তার জন্য কোন কৃত্রিম তোড়জোড় করবে না। পরিবারের লোকেরা যা খাবে তাই খেতে দেবে এবং হাসিমুখে তার সাথে কথা বলবে। আর যদি তোমার সাধ্যের অতিরিক্ত তার জন্য কিছু করতে যাও তাহলে তোমার চেহারায় এমন বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠবে যা দেখে সে কষ্ট পাবে। তিনি বলতেন: من أساء سرا فليتب سرا، ومن أساء علانية فليتب علانية، فإن الناس يعيرون ولا يغفرون، والله يغفر ولا يعير. 'কেউ গোপনে কোন পাপ করলে গোপনেই তার তাওবা করা উচিত, আর কেউ প্রকাশ্যে কোন পাপ করলে প্রকাশ্যে তার তাওবা করা উচিত। কারণ, মানুষ হেয় ও অপমান করে, ক্ষমা করে না। আর আল্লাহ ক্ষমা করেন, হেয় ও অপমান করেন না।'
তিনি বলতেন: কেউ যদি কোন প্রয়োজন পূরণের আশায় কোন ক্ষমতাশালী ব্যক্তির দরজায় যায় এবং দ্বার রক্ষী তার সাথে সাক্ষাতে বাধা দেয়, তাহলে তার উচিত আল্লাহর ঘর মসজিদে ফিরে আসা। কারণ আল্লাহর ঘরের দরজা সবার জন্য সর্বক্ষণ খোলা। সেখানে দু'রাক'আত নামায আদায় করে নিজের প্রয়োজনের কথা আল্লাহকে বলবে।
ইউনুস ইবন 'উবায়দ বলেন, একবার মায়মূনের আবাসভূমিতে মহামারি আকারে 'তা'উন' (প্লেগ) দেখা দিল। আমি তাঁর নিজের ও পরিবারের অবস্থা জানতে চেয়ে তাঁকে একটি চিঠি দিলাম। জবাবে তিনি লিখলেন: তোমার চিঠি পৌঁছেছে। তুমি আমার পরিবারের লোকদের সম্পর্কে জানতে চেয়েছো। হাঁ, আমার পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের মধ্য থেকে সতের (১৭) জন মারা গেছে। এই বালা-মুসীবত যখন আসে তখন আমার খুব খারাপ লেগেছিল, কিন্তু এখন তা নেই সে জন্য আমি উৎফুল্লও নই। তোমরা আল্লাহর কিতাব শক্তভাবে আঁকড়ে থাকবে। মানুষ এখন আল্লাহর কিতাব ভুলে মানুষের কথা মানতে শুরু করেছে। দীনের ব্যাপারে তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করবে। না কোন 'আলিমের সংগে ঝগড়া করবে, আর না কোন জাহিলের সংগে। যদি কোন জাহিলের সংগে ঝগড়ায় লিপ্ত হও তাহলে তোমার অন্তর কঠিন হয়ে যাবে, আর সেও তোমার কথা শুনবে না। অন্যদিকে কোন 'আলিমের সংগে ঝগড়া করলে তিনি তাঁর 'ইলম (জ্ঞান) তোমাকে দান করবেন না এবং তোমার কোন কাজে তিনি মনোযোগী হবেন না।
সাওয়ার ইবন 'আবদিল্লাহ আল-আনবারী বলেন, একদিন মায়মূন ইবন মিহরান বসে আছেন। তখন তাঁর পাশে বসা ছিলেন শামের একজন কারী (কুরআন পাঠ বিশেষজ্ঞ)। মায়মূন তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন কিছু ক্ষেত্রে সত্য বলার চেয়ে মিথ্যা বলা উত্তম। শামী লোকটি প্রতিবাদের সুরে বললেন : না, সকল ক্ষেত্রে সত্য বলা উত্তম। মায়মূন বললেন: মনে কর কোন ব্যক্তি তরবারি হাতে নিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে কাউকে তাড়া করলো এবং তাড়িত ব্যক্তি প্রাণ বাঁচাতে তোমার ঘরে এসে আশ্রয় নিল। অতঃপর তাড়াকারী এসে যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করে: লোকটিকে কি আপনি দেখেছেন? তখন তুমি কী বলবে? শামী লোকটি বললেন : আমি বলবো : না, আমি দেখিনি। মায়মূন বললেন: দেখ, এ ক্ষেত্রে তুমি মিথ্যা বলা উত্তম মনে করছো।
ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম দিওয়ান বা বিভিন্ন দফতর প্রতিষ্ঠা করেন দ্বিতীয় খলীফা 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা)। এ দিওয়ান ব্যবস্থাপনা ইসলামী খিলাফতে দারুণ সুফল বয়ে আনে। একটি দিওয়ানে মুসলিম নাগরিকদের নাম ও পরিচয় লেখা থাকতো। এই দিওয়ানে যাদের নাম থাকতো কেবল তারাই রাষ্ট্রের ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা লাভ করতো। মায়মূনের সময়ও এ নিয়ম প্রচলিত ছিল। তখন এই দিওয়ানের প্রধান ছিলেন মুহাম্মাদ ইবন মারওয়ান ইবন আল-হাকাম। তিনি একদিন লক্ষ্য করলেন মায়মূনের মত একজন বিশিষ্ট 'আলিমের নাম দিওয়ানে ওঠেনি। ফলে তিনি ইসলামী ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একদিন মায়মূনকে ডেকে বললেন: আপনি দিওয়ানে নাম লেখাচ্ছেন না কেন? নাম লেখালে ইসলামে আপনার যে অংশ রয়েছে তা লাভ করতেন।
মায়মূন বললেন : আমিও চাই ইসলামে আমার অংশ থাকুক। মুহাম্মাদ বললেন: তা কীভাবে সম্ভব, দিওয়ানে তো আপনার নাম নেই? মায়মূন বললেন: ইসলামে আমার অংশ হলো এ রকম: আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই- একথার সাক্ষ্য দেয়া একটি অংশ, সালাত একটি অংশ, যাকাত একটি অংশ, রমাদান মাসে সিয়াম পালন একটি অংশ এবং বায়তুল্লাহতে হজ্জ আদায় একটি অংশ। মুহাম্মাদ বললেন: আমি ধারণা করতাম, দিওয়ানে যাঁদের নাম আছে ইসলামে কেবল তাঁদের অংশ আছে। মায়মূন বললেন: এই যে আপনার পূর্ব পুরুষ হাকীম ইবন হিযাম (রা) দিওয়ান থেকে কোন দিন কোন কিছুই গ্রহণ করেননি। কারণ, তিনি একবার রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট কোন কিছু সাহায্য চান, রাসূল (সা) তাঁকে বলেন: ওহে হাকীম, এই চাওয়া থেকে বিরত থাকা তোমার জন্য ভালো। হাকীম (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার নিকট চাওয়া থেকেও বিরত থাকবো? বললেন: হাঁ, আমার নিকট চাওয়া থেকেও। হাকীম (রা) বললেন: কোন পরোয়া নেই। আপনার ও অন্য কারো নিকট কখনো কিছু চাইবো না। তবে আপনি আল্লাহর নিকট আমার ব্যবসায় উন্নতির জন্য একটু দু'আ করুন। রাসূল (সা) তাঁর জন্য দু'আ করেন।
এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কোন কিছু না চাওয়া- এই ছিল মায়মূনের নীতি। আর এ ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ ছিলেন হাকীম ইবন হিযাম (রা)। মায়মূনের মৃত্যু সন নিয়ে মত পার্থক্য আছে। হিজরী ১০৬ থেকে ১১২ সনের মধ্যে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৮/৫৪৫-৫৪৬
২. প্রাগুক্ত-১৮/৫৪৬
৩. প্রাগুক্ত-১৮/৫৪৯-৫৫০; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৭৪
৪. আত-তাবাকাত-৭/১৭৭-১৭৮; 'আসরুত তাবি'ঈন-৫২৫
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮
৬. প্রাগুক্ত
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/৩৯১; 'আসরুত তাবি'ঈন-৫২২
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/৩৯০; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৪৫
৯. প্রাগুক্ত
১০. আত-তাবাকাত-৭/১৭৮
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/৩৯১
১৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৫৪
১৪. প্রাগুক্ত
১৫. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/৩৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৪৭
১৬. 'আসরুত তাবি'ঈন-৫২৫-৫২৬; তাবি'ঈন-৪৯৫
১৭. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৭৬
১৮. সূরা আশ-শু'আরা'-২০৫-২০৭
১৯. হিলiyatul আওলিয়া-৪/৮২-৮৩
২০. 'আসরুত তাবি'ঈন-৫২৯-৫৩১
২১. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৫০
২২. সূরা লুকমান-১৫
২৩. হিলয়াতুল আওলিয়া-৮৮-৮৯; আসরুত তাবি'ঈন-৫৩১-৫৩৩
২৪. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৪৯
২৫. প্রাগুক্ত-১৮/৫৫০
২৬. প্রাগুক্ত-১৮/৫৫২
২৭. প্রাগুক্ত-১৮/৫৫২, ৫৫৩
২৮. প্রাগুক্ত
২৯. 'আসরুত তাবি'ঈন-৫২৭-৫২৮
৩০. সাহীহ আল-বুখারী, কিতাব আল-ওয়াসাইয়া, হাদীছ নং-২৭৫০; মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড-৫, হাদীছ নং- ১৫৫৭৪; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৫৩
৩১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৯; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৫৫
📄 খারিজা ইবন যায়দ (রহ)
হযরত খারিজার (রহ) ডাকনাম আবূ যায়দ। বিখ্যাত সাহাবী হযরত যায়দ ইবন ছাবিতের (রা) পুত্র। মদীনার প্রসিদ্ধ খাযরাজ গোত্রের বানু নাজ্জার শাখার সন্তান। তাঁর মা উম্মু সা'দ 'আকাবার দ্বিতীয় শপথে উপস্থিত ও রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক নিয়োগকৃত 'নাকীব' মহান সাহাবী সা'দ ইবন রাবী'র কন্যা।
জ্ঞান ও মনীষা
হযরত খারিজার মহান পিতা হযরত যায়দ ইবন ছাবিত (রা) একজন 'আলিম সাহাবী ছিলেন। যে সকল সাহাবী কুরআনের হাফিজ ছিলেন তিনি তাঁদের মধ্যে বিশেষ স্থানের অধিকারী। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের পর কুরআনের সংগ্রহ ও সংকলন তাঁরই তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। এমন একটা জ্ঞান চর্চার পরিবেশে হযরত খারিজা প্রতিপালিত হন। পিতার নিকট থেকে শিক্ষা প্রাপ্ত হয়ে তিনি তাঁর সমকালের শ্রেষ্ঠ 'আলিমদের মধ্যে পরিগণিত হন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন, তিনি শ্রেষ্ঠ 'আলিমদের মধ্যে ছিলেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, জ্ঞানে তিনি একজন দক্ষ ইমাম ছিলেন এবং তাঁর বিশ্বস্ততা ও শ্রেষ্ঠতার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবন সা'দ মদীনার মনীষীদের দ্বিতীয় স্তরে বা তবকায় তাঁর নাম সন্নিবেশ করেছেন।
হাদীছ
পিতা যায়দ, মা উম্মু সা'দ ইবন সা'দ, চাচা ইয়াযীদ, উসামা ইবন যায়দ, সাহল ইবন সা'দ, 'আবদুর রহমান ইবন আবী 'উমারা উম্মুল 'আলা' (রা) প্রমুখের নিকট থেকে তিনি হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। আর তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শোনেন তাঁদের মধ্যে তাঁর পুত্র সুলায়মান, ভাতিজা সা'ঈদ ইবন সুলায়মান ও কায়স ইবন সা'দ এবং অন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন 'উছমান, মুত্তালিব ইবন 'আবদিল্লাহ, ইয়াযীদ ইবন কাসীত (রহ) বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
ফিক্হ
ফিক্হ ছিল তাঁর বিশেষ অধীত বিষয়। এ শাস্ত্রে তিনি ইমাম ও মুজতাহিদের মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন। মদীনার বিখ্যাত সাতজন ফকীহর মধ্যে তাঁর নামটিও আছে। আবুয যানাদ বলেন:
'মদীনার যে সাত ব্যক্তির নিকট ফাতওয়া জিজ্ঞেস করা হতো এবং যাঁদের কথা চূড়ান্ত বলে গণ্য হতো তাঁরা হলেন:
সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যাব, আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান ইবন আল-হারিছ, 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা, আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, খারিজা ইবন যায়দ ও সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহ)।'
ইসলামী জ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা ফারায়েজ (দায় ভাগ শাস্ত্র)। এ বিষয়ে তাঁর পিতা যায়দ ইবন ছাবিত একজন বড় 'আলিম ছিলেন। এ কারণে উত্তরাধিকার সূত্রে খারিজা এ জ্ঞানের অধিকারী হন। মদীনার 'আলিমদের মধ্যে তিনি এবং তালহা ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'আওফ উত্তরাধিকার (মীরাছ) বণ্টন করতেন এবং বণ্টনের লিখিত সনদ দিতেন। এ বিষয়ে তাঁর কথা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হতো। 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার বলেন, মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের পরে ফিক্হ বিষয়টি যাঁদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তাঁদের একজন হলেন খারিজা ইবন যায়দ।
ওফাত
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) খিলাফতকালে হিজরী ১০০ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি সত্তরটি সিঁড়ি বানানোর পর তাঁর থেকে পড়ে গেছেন। সেই বছর মৃত্যু হয় এবং তখন তাঁর বয়স পূর্ণ সত্তর বছর। তৎকালীন মদীনার ওয়ালী আবূ বাকর ইবন মুহাম্মাদ ইবন হাযম তাঁর জানাযার নামাযের ইমামতি করেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন' পাঠ করেন।
তাঁর দৈহিক অবয়ব সুগঠিত ও সুন্দর ছিল। "খুয” (রেশম ও পশম মিশ্রিত এক প্রকার সূতা)-এর চাদর গায়ে জড়াতেন। মাথায় কালো পাগড়ী এবং বাঁ হাতে আংটি পরতেন। মৃত্যুর সময় অনেকগুলো পুত্র-কন্যা রেখে যান। পুত্ররা হলেন: যায়দ, 'উমার, 'আবদুল্লাহ ও মুহাম্মাদ এবং কন্যারা হলেন হাবীবা, হামীদা, উম্মু ইয়াহইয়া ও উম্মু সুলায়মান। উল্লেখিত সন্তানদের সকলের মা ছিলেন উম্মু 'আমর বিনত হাযম।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-৫/৩১৮
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯১
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৪২
৪. তাহযীব আল-কামাল-৫/৩১৮
৫. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৩/৭৫
৬. প্রাগুক্ত
৭. তাহযীব আল-কামাল-৫/৩১৮
৮. প্রাগুক্ত-৫/৩১৯; তাহযীব আত-তাহযীব-৩/৭৫
৯. তাহযীব আল-কামাল-৫/৩১৯
১০. প্রাগুক্ত-৫/৩২০; আত-তাবাকাত-৫/১৯৪; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৪৪০
১১. আত-তাবাকাত-৫/১৯৪
১২. প্রাগুক্ত