📄 মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদির (রহ)
কুরায়শ বংশের বানু তায়ম শাখার সন্তান মুহাম্মাদ (রহ)। তাঁর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। পিতা আল-মুনকাদির ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন আল-হুযায়র। তাঁর অপর দু'ভাই আবূ বাকর ইবন আল-মুনকাদির ও 'উমার ইবন আল-মুনকাদির।
আল-মুনকাদির ছিলেন উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশার (রা) মামা। একদিন তিনি 'আয়িশার (রা) কাছে গিয়ে নিজের প্রয়োজনের কথা বলে কিছু অর্থ সাহায্য চাইলেন। তিনি বললেন, আমার হাতে কিছু অর্থ আসার কথা আছে, আসলে পাঠিয়ে দেব। এরপর দশ হাজার দিরহাম 'আয়িশার (রা) হাতে আসে এবং তিনি সাথে সাথে তা আল-মুনকাদিরের নিকট পাঠিয়ে দেন। মুনকাদির সেই অর্থ দিয়ে একটি দাসী কেনেন। সেই দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে তাঁর তিন ছেলে: মুহাম্মাদ, আবূ বাকর ও 'উমার।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় তিনি অতি উঁচু স্তরের মানুষ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে আল-ইমাম ও শায়খুল ইসলাম (ইসলামের জ্ঞান-বৃদ্ধ ব্যক্তি) বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন: "তাঁর বিশ্বস্ততা এবং 'ইলম ও 'আমলে অগ্রবর্তিতার ব্যাপারে সকলের ঐক্যমত আছে। তিনি 'আতা'র স্তরের মানুষ, তবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে দেরীতে।" ইবন হাজার আল-আসকিলানী (রহ) তাঁকে শীর্ষস্থানীয় ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন।
কিরাআত
আল-কুরআনের একজন বিশিষ্ট কারী ছিলেন। ইমাম মালিক (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন কারীদের নেতা।"
হাদীছ
হাদীছের একজন বিখ্যাত হাফিজ ছিলেন। আল-হুমায়দী বলেন: "ইবন আল-মুনকাদির একজন হাফিজ।" তিনি সাহাবা ও তাবি'ঈন কিরামের বড় একটি দলের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ আইউব আল- আনসারী, আনাস ইবন মালিক, জাবির, আবূ উমামা ইবন সাহল, রাবী'আ ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, আবু কাতাদা, সাফীনা, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', 'উরওয়া ইবন যুবায়র, মু'আয ইবন 'আবদির রহমান আত-তায়মী, সা'ঈদ ইবন 'আবদির রহমান ইয়ারবূ', আবূ বাকর ইবন সুলায়মান (রহ) প্রমুখের সূত্রে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাঁর কিছু মুরসাল হাদীছ আছে। কিন্তু হাদীছের 'আলিমগণ মনে করেন, তাঁর মুরসাল হাদীছ অন্য অনেকের মারফ্' হাদীছের চেয়েও নির্ভরযোগ্য। ইবন 'উয়ায়না বলেন: "তিনি ছিলেন সত্য ও সততার খনিসদৃশ। সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ তাঁর কাছে সমবেত হতেন।" তিনি আরো বলেন, কেউ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আর সকলে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিয়েছেন, একমাত্র তিনি ছাড়া এমন আর কাউকে আমি দেখিনি। ইবরাহীম বলতেন, তিনি মুখস্থ শক্তি, দৃঢ়তা ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাবের চূড়ান্ত পর্যায়ের মানুষ ছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন ইল্মে হাদীছে "হুজ্জাত” (দলিল-প্রমাণ) স্তরের ব্যক্তি।
ছাত্রবৃন্দ
তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন: তাঁর পুত্র ইউসুফ ও আল-মুনকাদির, ভাতিজা ইবরাহীম ও 'আবদুর রহমান এবং অন্যদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, ইমাম যুহরী, আইউব, আনাস ইবন 'উবায়দ, সালামা ইবন দীনার, জা'ফার ইবন মুহাম্মাদ সাদিক, মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি', সা'দ ইবন ইবরাহীম, সুহায়ল ইবন আবী সালিহ, ইবন জুরায়জ, 'আলী ইবন যায়দ, মূসা ইবন 'উকবা, হিশাম ইবন 'উরওয়া, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ
তিনি ফিক্হ ও ফাতওয়ায় পারদর্শী ছিলেন। মদীনার তাবি'ঈ মুফতীগণের মধ্যে তাঁকে গণ্য করা হতো।
তাকওয়া-পরহিযগারী
তাঁর মধ্যে তাকওয়া-পরহিযগারী ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য তিনি অত্যন্ত কঠিন অনুশীলন করতেন। একাধারে চল্লিশ বছর নানাভাবে নক্সের পরিশুদ্ধির কাজ করেন। তিনি নিজেই বলেন: "আমি চল্লিশ বছর যাবত আমার নফসকে কষ্ট দিয়েছি, অতঃপর সে সোজা হয়।" ইমাম মালিক বলতেন, তিনি উঁচু স্তরের 'আবিদ ও যাহিদ (দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ত) মানুষ ছিলেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী বলেন, তাঁর বাড়ীটি ছিল সত্যনিষ্ঠ ও 'আবিদ (সাধক) ব্যক্তিদের ঠিকানা।
খাওফে খোদা বা আল্লাহর ভয় তাঁর অন্তরের গভীরে শিকড় গেঁড়েছিল। কুরআনের বিশেষ বিশেষ আয়াত যখন তিলাওয়াত করতেন তখন তাঁর চোখ থেকে অশ্রু ধারা জারি হয়ে যেত। এক রাতে তাহাজ্জুদ নামাযে ব্যাকুল হয়ে কাঁদলেন। সকালে ভাইয়েরা তাঁর এমন কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন: এ আয়াতটি পাঠের পর আমার এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়: "এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট হতে এমন কিছু প্রকাশিত হবে যা তারা কল্পনাও করেনি।" (আয-যুমার : ৪৭)
তাঁর মরণ সময় ঘনিয়ে এলে তিনি ভীষণ ভীত-শংকিত হয়ে পড়েন। বলেন, 'আমি এ আয়াতকে ভয় পাচ্ছি। আমি ভয় পাচ্ছি, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার সামনে এমন কিছু প্রকাশ হয়ে পড়বে যার কল্পনাও আমি কখনো করিনি। হাদীছের ব্যাপারেও তাঁর অবস্থা এমন ছিল। ইমাম মালিক বলেন: যখন কেউ তাঁর কাছে কোন হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো তখন তিনি কেঁদে ফেলতেন।
হজ্জ আদায়ের ব্যাপারে দারুণ উৎসাহী ও আবেগপ্রবণ ছিলেন। ঋণগ্রস্ত হয়েও হজ্জ করতেন। একবার কেউ একজন প্রতিবাদের সুরে বলে, আপনি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় হজ্জ আদায় করেন কেন? বললেন, হজ্জই ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে বড় উপায় ও সহায়ক। হজ্জে একাকী যেতেন না। স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে সকলকে নিয়ে যেতেন। বলতেন, তাদেরকে আল্লাহর সামনে উপস্থাপনের জন্য নিয়ে যাই। তাকে দেখলে অন্যের নক্সও পরিশুদ্ধ হতো। ইমাম মালিক বলেন, আমি যখন আমার অন্তরে কাঠিণ্য অনুভব করতাম তখন গিয়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদিরকে দেখতাম। এর প্রভাব এই হতো যে, কয়েকদিন পর্যন্ত নক্স আমার নিকট খুব অপ্রিয় থাকতো।
জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আপনার নিকট সবচেয়ে ভালো কাজ কি? বললেন, মুসলমানদেরকে সন্তুষ্ট করা। আবার জিজ্ঞেস করে, সবচেয়ে প্রিয় জগত কোনটি? বললেন : বন্ধুদের সাথে আদান-প্রদান করা।
আল-ওয়াকিদী বলেন : তিনি হিজরী ১৩০ সনে ইনতিকাল করেন। একথা মুহাম্মাদ ইবন সা'দও বলেছেন। তবে হারুন ইবন মুহাম্মাদ আল-ফারবীর সূত্রে ইমাম আল-বুখারী হিজরী ১৩১ সনের কথা বলেছেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না বলেন, তিনি সত্তর (৭০) বছরের উপরে জীবন লাভ করেন। শেষ জীবনে মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাই মেহেদীর খিজাব লাগতেন।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/১২৭
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩
৭. তাবি'ঈন-৪৬৩
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৫
১০. প্রাগুক্ত-৯/৪৭৪; তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৪-২৬৫
১১. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি'ঈন-১/২৬
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৩. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৮
১৭. তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৬
কুরায়শ বংশের বানু তায়ম শাখার সন্তান মুহাম্মাদ (রহ)। তাঁর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। পিতা আল-মুনকাদির ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন আল-হুযায়র। তাঁর অপর দু'ভাই আবূ বাকর ইবন আল-মুনকাদির ও 'উমার ইবন আল-মুনকাদির।
আল-মুনকাদির ছিলেন উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশার (রা) মামা। একদিন তিনি 'আয়িশার (রা) কাছে গিয়ে নিজের প্রয়োজনের কথা বলে কিছু অর্থ সাহায্য চাইলেন। তিনি বললেন, আমার হাতে কিছু অর্থ আসার কথা আছে, আসলে পাঠিয়ে দেব। এরপর দশ হাজার দিরহাম 'আয়িশার (রা) হাতে আসে এবং তিনি সাথে সাথে তা আল-মুনকাদিরের নিকট পাঠিয়ে দেন। মুনকাদির সেই অর্থ দিয়ে একটি দাসী কেনেন। সেই দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে তাঁর তিন ছেলে: মুহাম্মাদ, আবূ বাকর ও 'উমার।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় তিনি অতি উঁচু স্তরের মানুষ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে আল-ইমাম ও শায়খুল ইসলাম (ইসলামের জ্ঞান-বৃদ্ধ ব্যক্তি) বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন: "মুজমাউন আলা ছিক্বাতিহি ওয়া তাক্বাদ্দুমিহি ফিল ইলমি ওয়াল আমালি ওয়া হুয়া মিন ত্ববাক্বাতি আত্বাইন লা-কিননাহু তা-আখখারা মাওতুহু. - তাঁর বিশ্বস্ততা এবং 'ইল্ম ও 'আমলে অগ্রবর্তিতার ব্যাপারে সকলের ঐক্যমত আছে। তিনি 'আতা'র স্তরের মানুষ, তবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে দেরীতে।" ইবন হাজার আল-আসকিলানী (রহ) তাঁকে শীর্ষস্থানীয় ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন।
কিরাআত
আল-কুরআনের একজন বিশিষ্ট কারী ছিলেন। ইমাম মালিক (রহ) বলেন: ক্যানা সাইয়্যিদুল কুররা - তিনি ছিলেন কারীদের নেতা।
হাদীছ
হাদীছের একজন বিখ্যাত হাফিজ ছিলেন। আল-হুমায়দী বলেন: ইবনুল মুনকাদিন হাফিজান - ইবন আল-মুনকাদির একজন হাফিজ। তিনি সাহাবা ও তাবি'ঈন কিরামের বড় একটি দলের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ আইউব আল- আনসারী, আনাস ইবন মালিক, জাবির, আবূ উমামা ইবন সাহল, রাবী'আ ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, আবু কাতাদা, সাফীনা, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', 'উরওয়া ইবন যুবায়র, মু'আয ইবন 'আবদির রহমান আত-তায়মী, সা'ঈদ ইবন 'আবদির রহমান ইয়ারবূ', আবূ বাকর ইবন সুলায়মান (রহ) প্রমুখের সূত্রে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাঁর কিছু মুরসাল হাদীছ আছে। কিন্তু হাদীছের 'আলিমগণ মনে করেন, তাঁর মুরসাল হাদীছ অন্য অনেকের মারফ্' হাদীছের চেয়েও নির্ভরযোগ্য। ইবন 'উয়ায়না বলেন: "তিনি ছিলেন সত্য ও সততার খনিসদৃশ। সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ তাঁর কাছে সমবেত হতেন।” তিনি আরো বলেন, কেউ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন বলেছেন, আর সকলে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিয়েছেন, একমাত্র তিনি ছাড়া এমন আর কাউকে আমি দেখিনি। ইবরাহীম বলতেন, তিনি মুখস্থ শক্তি, দৃঢ়তা ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাবের চূড়ান্ত পর্যায়ের মানুষ ছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন ইল্মে হাদীছে "হুজ্জাত” (দলিল-প্রমাণ) স্তরের ব্যক্তি।
ছাত্রবৃন্দ
তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন: তাঁর পুত্র ইউসুফ ও আল-মুনকাদির, ভাতিজা ইবরাহীম ও 'আবদুর রহমান এবং অন্যদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, ইমাম যুহরী, আইউব, আনাস ইবন 'উবায়দ, সালামা ইবন দীনার, জা'ফার ইবন মুহাম্মাদ সাদিক, মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি', সা'দ ইবন ইবরাহীম, সুহায়ল ইবন আবী সালিহ, ইবন জুরায়জ, 'আলী ইবন যায়দ, মূসা ইবন 'উকবা, হিশাম ইবন 'উরওয়া, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ
তিনি ফিক্হ ও ফাতওয়ায় পারদর্শী ছিলেন। মদীনার তাবি'ঈ মুফতীগণের মধ্যে তাঁকে গণ্য করা হতো।
তাকওয়া-পরহিযগারী
তাঁর মধ্যে তাকওয়া-পরহিযগারী ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য তিনি অত্যন্ত কঠিন অনুশীলন করতেন। একাধারে চল্লিশ বছর নানাভাবে নক্সের পরিশুদ্ধির কাজ করেন। তিনি নিজেই বলেন: আর্বাইনা সানাতান কা-বাদতু নাফসী হাত্তা ইসতাক্ব-মাত - "আমি চল্লিশ বছর যাবত আমার নক্সকে কষ্ট দিয়েছি, অতঃপর সে সোজা হয়।" ইমাম মালিক বলতেন, তিনি উঁচু স্তরের 'আবিদ ও যাহিদ (দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ত) মানুষ ছিলেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী বলেন, তাঁর বাড়ীটি ছিল সত্যনিষ্ঠ ও 'আবিদ (সাধক) ব্যক্তিদের ঠিকানা।
খাওফে খোদা বা আল্লাহর ভয় তাঁর অন্তরের গভীরে শিকড় গেঁড়েছিল। কুরআনের বিশেষ বিশেষ আয়াত যখন তিলাওয়াত করতেন তখন তাঁর চোখ থেকে অশ্রু ধারা জারি হয়ে যেত। এক রাতে তাহাজ্জুদ নামাযে ব্যাকুল হয়ে কাঁদলেন। সকালে ভাইয়েরা তাঁর এমন কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন: এ আয়াতটি পাঠের পর আমার এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়: "এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট হতে এমন কিছু প্রকাশিত হবে যা তারা কল্পনাও করেনি। (যুমার: ৪৭)" তাঁর মরণ সময় ঘনিয়ে এলে তিনি ভীষণ ভীত-শংকিত হয়ে পড়েন। বলেন, 'আমি এ আয়াতকে ভয় পাচ্ছি। আমি ভয় পাচ্ছি, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার সামনে এমন কিছু প্রকাশ হয়ে পড়বে যার কল্পনাও আমি কখনো করিনি। হাদীছের ব্যাপারেও তাঁর অবস্থা এমন ছিল। ইমাম মালিক বলেন: যখন কেউ তাঁর কাছে কোন হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো তখন তিনি কেঁদে ফেলতেন।
হজ্জ আদায়ের ব্যাপারে দারুণ উৎসাহী ও আবেগপ্রবণ ছিলেন। ঋণগ্রস্ত হয়েও হজ্জ করতেন। একবার কেউ একজন প্রতিবাদের সুরে বলে, আপনি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় হজ্জ আদায় করেন কেন? বললেন, হজ্জই ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে বড় উপায় ও সহায়ক। হজ্জে একাকী যেতেন না। স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে সকলকে নিয়ে যেতেন। বলতেন, তাদেরকে আল্লাহর সামনে উপস্থাপনের জন্য নিয়ে যাই। তাকে দেখলে অন্যের নক্সও পরিশুদ্ধ হতো। ইমাম মালিক বলেন, আমি যখন আমার অন্তরে কাঠিণ্য অনুভব করতাম তখন গিয়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদিরকে দেখতাম। এর প্রভাব এই হতো যে, কয়েকদিন পর্যন্ত নক্স আমার নিকট খুব অপ্রিয় থাকতো।
জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আপনার নিকট সবচেয়ে ভালো কাজ কি? বললেন, মুসলমানদেরকে সন্তুষ্ট করা। আবার জিজ্ঞেস করে, সবচেয়ে প্রিয় জগত কোনটি? বললেন : বন্ধুদের সাথে আদান-প্রদান করা।
আল-ওয়াকিদী বলেন : তিনি হিজরী ১৩০ সনে ইনতিকাল করেন। একথা মুহাম্মাদ ইবন সা'দও বলেছেন। তবে হারুন ইবন মুহাম্মাদ আল-ফারবীর সূত্রে ইমাম আল-বুখারী হিজরী ১৩১ সনের কথা বলেছেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না বলেন, তিনি সত্তর (৭০) বছরের উপরে জীবন লাভ করেন। শেষ জীবনে মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাই মেহেদীর খিজাব লাগতেন।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/১২৭
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩
৭. তাবি'ঈন-৪৬৩
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৫
১০. প্রাগুক্ত-৯/৪৭৪; তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৪-২৬৫
১১. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি'ঈন-১/২৬
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৩. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৮
১৭. তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৬
📄 মুসলিম ইবন ইয়াসার (রহ)
ইসলাম সাম্য ও সমতার ধর্ম। এতে উঁচু-নীচু, দাস-মনিবের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। এখানে সম্মান ও আভিজাত্যের মাপকাঠি হলো তাকওয়া ও 'আমল। এর নজীর ইসলামের ইতিহাসে সর্বত্র পাওয়া যায়। তেমনই একটি দৃষ্টান্ত মুসলিম ইবন ইয়াসার। তাঁর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। তিনি প্রখ্যাত সাহাবী হযরত তালহা ইবন 'উবায়দিল্লাহ, মতান্তরে 'উছমান ইবন 'আফফানের (রা) দাস ছিলেন।
জ্ঞান ও মনীষা
হযরত তালহা (রা) ছিলেন "আশারা মুবাশারা" অর্থাৎ জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন মানুষের একজন। তাঁর ব্যক্তি সত্তাটি ছিল 'ইল্ম ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের দুই সাগরের সঙ্গম স্থলের মত। তাঁর দাসত্বের কল্যাণে এবং রাসূলুল্লাহর (সা) শহর মদীনায় অবস্থানের সুযোগে মুসলিমও 'ইল্ম ও 'আমলের ঐশ্বর্যের অধিকারী হন। ইবন সা'দ বলেন: "মুসলিম ছিলেন বিশ্বস্ত, জ্ঞানী, তাপস ও আল্লাহভীরু।" ইবন আওন বলেন, সেই সময়ে মুসলিমের উপরে কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হতো না।
হাদীছ
মদীনায় অবস্থানের কারণে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস ও 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) মত উম্মাতের শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং আবুল আশ'আছ সান'আনী, হামরান ইবন আবান (রহ) প্রমুখের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। আর ছাবিত আল-বানানী, ইয়া'লা ইবন হাকীম, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, আইউব সাখতিয়ানী, আবূ নাদরা ইবন কাতাদা, সালিহ, আবুল খায়ল, মুহাম্মাদ ইবন আল- ওয়াসি', 'আমর ইবন দীনার, আবান ইবন আবী' 'আয়্যাম (রহ) প্রমুখ মুহাদ্দিছগণ তাঁর সুযোগ্য ছাত্র ছিলেন।
ফিক্হ শাস্ত্রেও তিনি অতি উঁচু স্থানের অধিকারী ছিলেন। খলীফা ইবন খায়্যাত বলেন: তিনি বসরার সেই পাঁচজন ফকীর মধ্যে গণ্য ছিলেন যাঁদেরকে তাঁদের যুগের ফকীহ বলে মানা হতো।
নৈতিক গুণাবলী
'ইলমের তুলনায় তাঁর 'আমল ছিল বেশী। ইবন সা'দ তো তাঁকে একজন 'আবিদ ও আল্লাহ ভীরু বলেছেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি বসরার ইবাদতকারী মহান ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। তিনি মনে করতেন, আল্লাহর প্রতি ঈমানের জন্য অপরিহার্য হলো তাঁর অপছন্দের সকল কথা-কাজ পরিহার করা। তিনি বলতেন, আমার বুঝে আসে না যে, বান্দা যদি আল্লাহর অপছন্দের সবকিছু ছেড়ে না দেয় তাহলে তার ঈমান কোন কাজে আসবে?
নামাযে আগ্রহ ও একাগ্রতা
তাঁর নামাযে এক বিশেষ অবস্থা ও তন্ময়ভাবের সৃষ্টি হতো। তিনি যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন এমন মনে হতো যে, তাঁর ওপর আলোকধারা নামছে। ইবন 'আওন বলেন, যখন তিনি নামাযের মধ্যে থাকতেন তখন তাঁকে প্রাণহীন কাঠের মত মনে হতো, শরীর ও কাপড়-চোপড় একটুও নড়াচড়া করতো না। নামাযরত অবস্থায় যত মারাত্মক ও ভয় পাইয়ে দেওয়ার মত অবস্থার সৃষ্টি হোক না কেন সে ব্যাপারে তাঁর কোন প্রতিক্রিয়াই থাকতো না। একবার তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন সময় পাশেই আগুন লাগে এবং অল্পক্ষণ পরে নিভেও যায়; কিন্তু তিনি মোটেও টের পাননি।
অসুস্থতার কারণে মানুষ যখন একেবারেই অপারগ হয়ে যায় সে সময় ছাড়া আর কোন অবস্থায় বসে নামায আদায় করা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার জনৈক ব্যক্তি নৌকায় বসে বসে নামায আদায়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। তিনি বলেন, এ আমার মোটেই পছন্দ নয় যে, কোন রোগ ছাড়া আল্লাহ আমাকে বসা অবস্থায় নামাযে দেখুক। নামাযের দিকে আহ্বানের এত গুরুত্ব দিতেন যে, যদি বহু দূর থেকেও আযানের ধ্বনি কানে ভেসে আসতো, সেই মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করতেন। একবার তিনি কোন এক মসজিদ থেকে ফিরছেন। কিছু দূর যাওয়ার পর আযানের ধ্বনি কানে ভেসে এলো। তিনি আবার সেই মসজিদে ফিরে গেলেন। মুয়াযযিন জিজ্ঞেস করলো, আপনি আবার ফিরে এলেন কেন? বললেন: তুমিই তো ফিরিয়ে আনলে। মসজিদের খিদমত ছিল তাঁর বিশেষ কাজ। মসজিদে তিনি বাতি জ্বালাতেন। এ কারণে লোকেরা তাঁকে আল-মুসব্বিহ (বাতি প্রজ্জ্বলনকারী মুসলিম) বলতো।
সুন্নাহর অনুসরণ
সুন্নাহর অনুসরণের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। অতি মামুলি ধরনের সুন্নাতও ছুটে যেতে পারতো না। শুধু একটি সুন্নাতের অনুসরণ হবে এ চিন্তায় জুতাপরা অবস্থায় নামায আদায় করতেন। তিনি বলতেন, জুতা খোলা আমার জন্য খুবই সহজ কাজ, কিন্তু শুধুমাত্র সুন্নাতের অনুসরণ হবে এ চিন্তায় জুতো পরা অবস্থায় নামায আদায় করি। হযরত রাসূলে কারীম (সা) খোরমা দিয়ে ইফতার করতেন। এ কারণে খোরমা দিয়েই তাঁর ইফতার হতো।
কুরআনের প্রতি সম্মান
আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের প্রতি এত বেশী সম্মান প্রদর্শন করতেন যে, যে হাত দিয়ে কুরআন ধরতেন সে হাত দিয়ে নাজাসাতের স্থান স্পর্শ করতেন না। বলতেন, আমি ডান হাত দিয়ে যৌনাঙ্গ স্পর্শ করা খারাপ কাজ মনে করি। কারণ, ঐ৭/১৬১
২. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৬
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১১৩
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৬
৫. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
৬. ফুতূহ আল-বুলদান-৩২২
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৭
৮. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৮
৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
১০. আত-তাবাকাত-৭/১৬০
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৯
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১১৪
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮
১৭. প্রাগুক্ত-১/১০৭
১৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/১১৩
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯০
২০. তাহযীব আল-আসমা'-১/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৭
২১. প্রাগুক্ত
২২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২৩. প্রাগুক্ত
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
২৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৪৬
২৬. ইবন নাদীম, আল-ফিরিস্ত (মিসর সংস্করণ)-৩১৮; তাবি'ঈন-৪৮৯
২৭. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
২৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
৩০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১৮/৩৬০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
ইসলাম সাম্য ও সমতার ধর্ম। এতে উঁচু-নীচু, দাস-মনিবের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। এখানে সম্মান ও আভিজাত্যের মাপকাঠি হলো তাকওয়া ও 'আমল। এর নজীর ইসলামের ইতিহাসে সর্বত্র পাওয়া যায়। তেমনই একটি দৃষ্টান্ত মুসলিম ইবন ইয়াসার। তাঁর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। তিনি প্রখ্যাত সাহাবী হযরত তালহা ইবন 'উবায়দিল্লাহ, মতান্তরে 'উছমান ইবন 'আফফানের (রা) দাস ছিলেন।
জ্ঞান ও মনীষা
হযরত তালহা (রা) ছিলেন "আশারা মুবাশারা" অর্থাৎ জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন মানুষের একজন। তাঁর ব্যক্তি সত্তাটি হাত দিয়ে আমি কুরআন ধরি। রিয়া তথা প্রদর্শনীমূলক মনোভাবকে তিনি মূর্খতা ও শয়তানের মন্ত্র বলে মনে করতেন। বলতেন, তোমরা আত্মপ্রদর্শনী থেকে দূরে থাক। কারণ, তা একজন 'আলিমকে মূর্খের পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং তার মাধ্যমেই শয়তান ভুল পথে চালিত করে।
তিনি অত্যন্ত ধীর-স্থির ও সহনশীল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। রাগের সময়ও মুখ থেকে অসমীচীন কথা উচ্চারিত হতো না। কখনো কাউকে গালি দেননি। সর্বাধিক উত্তেজিত অবস্থায় তাঁর মুখ থেকে যে কথাটি উচ্চারিত হতো তা হলো: "এখন আমার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে নাও।” একথা উচ্চারিত হলে মানুষ বুঝে যেত তিনি তাঁর রাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গেছেন।
এত ধীর-স্থির ও ধৈর্য-সহনশীল হওয়ার কারণে সকল হৈ-হাঙ্গামা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে তিনি দারুণ অপছন্দ করতেন। সে সময় মুহাম্মাদ ইবন আল-আশ'আছের নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তাতে অনেক উঁচু স্তরের তাবি'ঈ জড়িয়ে পড়েন। অন্যদের মত মুসলিমও তাতে অংশ গ্রহণ করেন। তবে তিনি কারো উপর তরবারি উঠাননি। শুধু এই অংশ গ্রহণের জন্য পরবর্তীতে অনুশোচনায় জর্জরিত হন। আবু কিলাবা বলেন, একবার মক্কার সফরে আমি ও মুসলিম এক সাথে ছিলাম। তখন একদিন তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-আশ'আছের বিদ্রোহের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন : আলহামদু লিল্লাহ, আমি এই বিশৃঙ্খলায় না একটি তীর ছুড়েছি, না তরবারি চালিয়েছি, আর না একটি বর্শা নিক্ষেপ করেছি। আমি বললাম, কিন্তু আপনি বলুন তো, ঐ সকল লোকদের পরিণতি কি হবে যারা আপনাকে সারিতে দাঁড়ানো দেখে বলেছিল, মুসলিম ইবন ইয়াসার এই যুদ্ধে আছেন এবং তিনি কোন অন্যায় কাজে যুক্ত হতে পারেন না এবং এই বিশ্বাসে তারা যুদ্ধ করে মারা গেছে? আমার একথা শুনে তিনি ব্যাকুলভাবে কাঁদতে থাকেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে আমি লজ্জিত হলাম, তাঁকে এমন কথা বলার জন্য।
ওফাত
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) খিলাফতকালে হিজরী ১০০ অথবা ১০১ সনে তিনি ইনতিকাল করেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৮/৯৫; তাবি'ঈন-৪৭৮
২. আত-তাবাকাত-৭/১৩৭; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪০
৪. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৪
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৯৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪১
৭. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
৮. প্রাগুক্ত-৭/১৩৫
৯. প্রাগুক্ত-৭/১৩৬
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
১১. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
১২. প্রাগুক্ত
১৩. প্রাগুক্ত-৭/১৩৭
১৪. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
📄 মিস‘আর ইবন কিদাম (রহ)
হযরত মিস'আরের (রহ) ডাকনাম আবূ সালামা। পিতা কিদাম ইবন জুহাইর। কুরায়শ গোত্রের আল-'আমিরী শাখার সন্তান এবং কৃষ্ণার অধিবাসী।
জ্ঞান ও মনীষা
তিনি জ্ঞান ও ধর্মচর্চা উভয় দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে ছিলেন। ইয়া'লা বলেন: "মিস'আর জ্ঞান ও ধার্মিকতার সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন।" ইরাকে তাঁর সমকক্ষ 'আলিম খুব কমই ছিলেন। হিশাম ইবন 'উরওয়া (রহ) বলেন, মিস'আর ও আইউবের চেয়ে উত্তম কেউ আমাদের এখানে আসেনি। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত।
হাদীছ
তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে একজন হাফিজ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম বলেছেন। মুহাম্মাদ ইবন বিশর বলেন : মিস'আরের নিকট প্রায় এক হাজার হাদীছ ছিল। আমি দশটি ছাড়া সবই লিখেছি। তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ নাখা'ঈ, আবু ইসহাক আস-সুবায়'ঈ, সা'ঈদ ইবন ইবরাহীম, ছাবিত ইবন 'উবায়দুল্লাহ আল-আনসারী, 'আবদুল মালিক ইবন নুমাইর, হিলাল ইবন জানাব, হাবীব ইবন আবী ছাবিত, 'আলকামা ইবন মারছাদ, কাতাদা, মা'আন ইবন 'আবদির রহমান, মিকদাম ইবন শুরায়হ, আল- আ'মাশ, 'আদী ইবন ছাবিত, আল-হাকাম ইবন 'উতায়বা (রহ) সহ বিশাল সংখ্যক মুহাদ্দিছের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।
তাঁর বর্ণিত হাদীছের মান
তাঁর বর্ণনাসমূহের বিশুদ্ধতার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, হযরত শু'বার মত বিখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ বলেন: "তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মপ্রত্যয়ের কারণে আমরা মিস'আরকে মাসহাফ বলতাম।" তাঁর ব্যক্তি সত্তা ছিল হাদীছ যাচাই-বাছাইয়ের মাপকাঠি। এ কারণে তাঁর উপাধি হয়ে যায় "মীযান" বা পাল্লা। আল-খুরায়বী বলেন: "খুব কম মুহাদ্দিছ এমন পাওয়া যাবে যাঁদের বর্ণনাসমূহ কোন না কোনভাবে সমালোচিত হয়নি। তবে মিস'আর এর ব্যতিক্রম।" হাদীছের ইমামগণ সন্দেহ ও মত পার্থক্যের স্থানে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন। সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলেন, যখন হাদীছের কোন বিষয়ে আমাদের মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন আমরা মিস'আরকে জিজ্ঞেস করতাম। ইবরাহীম ইবন সা'দ বলতেন, যখন কারো ব্যাপারে সুফইয়ান ও শু'বার মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন তাঁরা মীযান মিস'আরের নিকট যেতেন।
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর এত জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনায় খুব বেশী সাবধানতা অবলম্বন করতেন। তিনি এ দায়িত্ব পালনে এত ভয় পেতেন যেন তাঁর মাথার উপর কাঁচের বোঝা রয়েছে। একটু অসতর্ক হলেই তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে। ইবন 'উয়ায়না বলেন, আমি মিস'আরকে একথা বলতে শুনেছি: "আমি চেয়েছি, হাদীছ যদি আমার উপর কাঁচের বোঝার মত হতো, যা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যায়।" অর্থাৎ কারো মাথায় কাঁচের বোঝা থাকলে সে যেমন তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকে, তাই সব সময় সাবধানতা অবলম্বন করে। তেমনি তিনি হাদীছকে কাঁচ মনে করেছেন এবং সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। তাঁর এমন মাত্রাতিরিক্ত সাবধানতা সন্দেহের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আবূ নু'আইম বলেন, মিস'আর তাঁর হাদীছসমূহের ব্যাপারে বড় সন্দেহপরায়ণ ছিলেন। তবে তিনি কোন ভুল করতেন না। আল-আ'মাশ বলতেন, মিস'আরের শয়তান তাঁকে দুর্বল করে তাঁর মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে থাকে।
তাঁর এই সন্দেহ তাঁর হাদীছসমূহের মান এত বাড়িয়ে দেয় যে, হাদীছ বিশারদগণ তাঁর সন্দেহকে দৃঢ় প্রত্যয়ের মর্যাদা দিতেন। লোকেরা আ'মাশকে বললো, মিস'আর তো তাঁর নিজের বর্ণিত হাদীছসমূহে সন্দেহ পোষণ করেন। তিনি তাদেরকে বলেন : শিনাক্কুহু কাইয়্যাক্বিন - “তার সন্দেহ অন্যদের দৃঢ় প্রত্যয়ের মত।" এমন কথা ইমাম আল-ওয়াকী'ও বলেছেন। তবে ইয়াহইয়া আল-কাত্তান বলেন : "আমি মিস'আরের চেয়ে বেশী বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল আর কাউকে দেখিনি।”
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে তিনি যদিও কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না, তবুও কুফার মুফতীগণের মধ্যে গণ্য ছিলেন।
দারসের আসর
মসজিদে তাঁর দারসের আসর ছিল। সালাত আদায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী মসজিদে বসে যেতেন এবং হাদীছ শুনতে আগ্রহী লোকেরা বৃত্তাকারে তাঁর চার পাশে বসে যেতেন। তাঁর সূত্রে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, মুহাম্মাদ ইবন বিশর, ইয়াহইয়া ইবন আদম, আবু নু'আইম, খাল্লাদ ইবন ইয়াহইয়া, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক, ইয়াযীদ ইবন হারুন, শু'বা আল-হাজ্জাজ, মালিক ইবন মিগওয়াল, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, মুহাম্মাদ ইবন বিশর (রহ) ও আরো অনেকে।
'ইবাদত-বন্দেগী
তাঁর মা ছিলেন একজন উঁচুস্তরের 'আবিদা। তাঁর পুণ্যময় তত্ত্বাবধানের গভীর প্রভাব পড়ে ছেলের উপর। মা সব সময় মসজিদে সালাত আদায় করতেন। মা ও ছেলে দু'জন অধিকাংশ সময় এক সাথে মসজিদে যেতেন। একটা পশমী চাদর মিস'আর হাতে করে নিতেন এবং মসজিদে পৌঁছে সেটা মা'র বসার জন্য বিছিয়ে দিতেন। তার ওপর দাঁড়িয়ে মা সালাত আদায় করতেন। আর মিস'আর সামনের সারিতে চলে যেতেন এবং সালাত শেষ করে একটি স্থানে বসে যেতেন। তাঁকে ঘিরে হাদীছের জ্ঞান অর্জনে উৎসাহী ছাত্ররা বসে যেত। তিনি তাঁদেরকে হাদীছ শোনাতেন। এর মধ্যে তাঁর মা 'ইবাদত ও যিক্স- আযকার শেষ করতেন। আর মিস'আর তাঁর দারস (পাঠদান) শেষ করে মা'র কাছে এসে তাঁর চাদরটি উঠিয়ে মাকে সংগে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। তাঁর মাত্র দু'টি ঠিকানাই ছিল; ঘর অথবা মসজিদ। অতিরিক্ত 'ইবাদতের কারণে কপালে দাগ হয়ে গিয়েছিল। খালিদ ইবন 'আমর বলেন: "আমি মিস'আরকে দেখেছি, অতিরিক্ত সিজদার কারণে তাঁর কপাল ছাগলের হাঁটুর মত হয়ে গেছে।"
প্রতিদিন অর্ধেক কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁর ছেলে মুহাম্মাদ বলেন: "আমার আব্বা অর্ধেক কুরআন পাঠ না করে ঘুমোতেন না।" তিনি কোন একটি স্তরে পৌঁছে থেমে যেতেন না। তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার ধাপ সর্বদাই উন্নত থেকে উন্নততর হতে থাকতো। মা'আন বলেন: "আমি মিস'আরকে প্রতি দিনই শুভ ও কল্যাণে কেবল উন্নতিই করতে দেখেছি।" তিনি 'ইবাদত-বন্দেগী, আধ্যাত্মিক সাধনা ও নৈতিক গুণাবলীতে এমন উচ্চতর পর্যায়ে পৌছে যান যে, তাঁর জান্নাতী হওয়ার ব্যাপারে মানুষের কোন সন্দেহ ছিল না। যেমন আল- হাসান ইবন 'আম্মারা বলেন: "যদি মিস'আরের মত মানুষ জান্নাতে না যান তাহলে তো জান্নাতবাসীদের সংখ্যা অতি অল্পই হবে।"
প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক (রহ) অথবা তাঁর মত অন্য কেউ হযরত মিস'আরের (রহ) আদত-অভ্যাস ও নৈতিক গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে একটি কবিতায় তা তুলে ধরেন। তার দু'টি চরণ নিম্নরূপ:
"কেউ যদি সৎ সঙ্গী সন্ধান করে, সে যেন মিস'আর ইবন কিদামের আসরে আসে। সেখানে আছে প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য এবং এর সদস্যরা হলো পূতঃপবিত্র এবং জাতির উঁচু স্তরের মানুষ।"
পার্থিব ধন-ঐশ্বর্যের প্রতি উদাসীনতা
দুনিয়া ও এর শান-শওকতের প্রতি একেবারেই উদাসীন ও বেপরোয়া ছিলেন। রাষ্ট্রীয় কোন পদের প্রতি কখনো চোখ তুলে তাকাননি। একবার তারা প্রতাপশালী 'আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল-মানসূর তাঁকে কোন একটি অঞ্চলের ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান। তিনি বলেন, আমার পরিবারের লোকেরা তো আমাকে দুই দিরহামের বাজার করারও যোগ্য মনে করে না। তারা বলে, আমরা তোমার দুই দিরহামের কিছু ক্রয় করাও পছন্দ করিনে। আর আপনি আমাকে ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান? আল্লাহ আপনাকে ঠিক কাজ করার শক্তি দিন। আপনার সংগে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, তাই আমি কিছু বলতে পারছি। খলীফা আবূ জা'ফার তাঁর এই আপত্তি মেনে নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
তিনি অত্যন্ত প্রফুল্ল স্বভাবের মানুষ ছিলেন। অন্যের আবেগ-আগ্রহের প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখাতেন। কেউ যখন তাঁকে একটি হাদীছ শোনাতো যা তাঁর আগেই জানা থাকতো তখন কেবল সেই লোকটির সন্তুষ্টি ও হাদীছের মর্যাদার খাতিরে চুপ করে শুনে যেতেন, যেন হাদীছটি তিনি পূর্বে কখনো শোনেননি।
ওফাত
তিনি হিজরী ১৫৫ মতান্তরে ১৫৩ সনে কৃষ্ণায় ইনতিকাল করেন। মুস'আব ইবন আল-মিকদাম বলেন: আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) স্বপ্নে দেখলাম। সুফইয়ান রাসূলের (সা) একটি হাত ধরে আছেন এবং এ অবস্থায় দু'জন কা'বা তাওয়াফ করছেন। সুফইয়ান রাসূলকে (সা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! মিস'আর কি মৃত্যু বরণ করেছেন? বললেন: হাঁ, তাঁর মৃত্যুতে আসমানবাসীরা সুসংবাদ লাভ করেছে।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৪. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৯. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
১০. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
১২. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
১৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
১৪. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি 'ঈন-১/২৮
১৫. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
১৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫২
১৭. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩-২৫৪
১৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
十九. প্রাগুক্ত-১/১৮৯; তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৯
二十一. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
二十二. প্রাগুক্ত-১/১৮৯-১৯০
二十三. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪; প্রাগুক্ত-১/১৮৯
二十四. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
二十五. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
二十六. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৪
হযরত মিস'আরের (রহ) ডাকনাম আবূ সালামা। পিতা কিদাম ইবন জুহাইর। কুরায়শ গোত্রের আল-'আমিরী শাখার সন্তান এবং কৃষ্ণার অধিবাসী।
জ্ঞান ও মনীষা
তিনি জ্ঞান ও ধর্মচর্চা উভয় দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে ছিলেন। ইয়া'লা বলেন: "মিস'আর জ্ঞান ও ধার্মিকতার সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন।" ইরাকে তাঁর সমকক্ষ 'আলিম খুব কমই ছিলেন। হিশাম ইবন 'উরওয়া (রহ) বলেন, মিস'আর ও আইউবের চেয়ে উত্তম কেউ আমাদের এখানে আসেনি। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত।
হাদীছ
তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে একজন হাফিজ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম বলেছেন। মুহাম্মাদ ইবন বিশর বলেন : মিস'আরের নিকট প্রায় এক হাজার হাদীছ ছিল। আমি দশটি ছাড়া সবই লিখেছি। তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ নাখা'ঈ, আবু ইসহাক আস-সুবায়'ঈ, সা'ঈদ ইবন ইবরাহীম, ছাবিত ইবন 'উবায়দুল্লাহ আল-আনসারী, 'আবদুল মালিক ইবন নুমাইর, হিলাল ইবন জানাব, হাবীব ইবন আবী ছাবিত, 'আলকামা ইবন মারছাদ, কাতাদা, মা'আন ইবন 'আবদির রহমান, মিকদাম ইবন শুরায়হ, আল- আ'মাশ, 'আদী ইবন ছাবিত, আল-হাকাম ইবন 'উতায়বা (রহ) সহ বিশাল সংখ্যক মুহাদ্দিছের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।
তাঁর বর্ণিত হাদীছের মান
তাঁর বর্ণনাসমূহের বিশুদ্ধতার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, হযরত শু'বার মত বিখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ বলেন: "তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মপ্রত্যয়ের কারণে আমরা মিস'আরকে মাসহাফ বলতাম।" তাঁর ব্যক্তি সত্তা ছিল হাদীছ যাচাই-বাছাইয়ের মাপকাঠি। এ কারণে তাঁর উপাধি হয়ে যায় "মীযান" বা পাল্লা। আল-খুরায়বী বলেন: "খুব কম মুহাদ্দিছ এমন পাওয়া যাবে যাঁদের বর্ণনাসমূহ কোন না কোনভাবে সমালোচিত হয়নি। তবে মিস'আর এর ব্যতিক্রম।" হাদীছের ইমামগণ সন্দেহ ও মত পার্থক্যের স্থানে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন। সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলেন, যখন হাদীছের কোন বিষয়ে আমাদের মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন আমরা মিস'আরকে জিজ্ঞেস করতাম। ইবরাহীম ইবন সা'দ বলতেন, যখন কারো ব্যাপারে সুফইয়ান ও শু'বার মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন তাঁরা মীযান মিস'আরের নিকট যেতেন।
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর এত জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনায় খুব বেশী সাবধানতা অবলম্বন করতেন। তিনি এ দায়িত্ব পালনে এত ভয় পেতেন যেন তাঁর মাথার উপর কাঁচের বোঝা রয়েছে। একটু অসতর্ক হলেই তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে। ইবন 'উয়ায়না বলেন, আমি মিস'আরকে একথা বলতে শুনেছি:
"আমি চেয়েছি, হাদীছ যদি আমার উপর কাঁচের বোঝার মত হতো, যা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যায়।" অর্থাৎ কারো মাথায় কাঁচের বোঝা থাকলে সে যেমন তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকে, তাই সব সময় সাবধানতা অবলম্বন করে। তেমনি তিনি হাদীছকে কাঁচ মনে করেছেন এবং সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। তাঁর এমন মাত্রাতিরিক্ত সাবধানতা সন্দেহের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আবূ নু'আইম বলেন, মিস'আর তাঁর হাদীছসমূহের ব্যাপারে বড় সন্দেহপরায়ণ ছিলেন। তবে তিনি কোন ভুল করতেন না। আল-আ'মাশ বলতেন, মিস'আরের শয়তান তাঁকে দুর্বল করে তাঁর মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে থাকে।
তাঁর এই সন্দেহ তাঁর হাদীছসমূহের মান এত বাড়িয়ে দেয় যে, হাদীছ বিশারদগণ তাঁর সন্দেহকে দৃঢ় প্রত্যয়ের মর্যাদা দিতেন। লোকেরা আ'মাশকে বললো, মিস'আর তো তাঁর নিজের বর্ণিত হাদীছসমূহে সন্দেহ পোষণ করেন। তিনি তাদেরকে বলেন : শুককুহু কায়াক্বীনিহি - "তার সন্দেহ অন্যদের দৃঢ় প্রত্যয়ের মত।" এমন কথা ইমাম আল-ওয়াকী'ও বলেছেন। তবে ইয়াহইয়া আল-কাত্তান বলেন : "আমি মিস'আরের চেয়ে বেশী বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল আর কাউকে দেখিনি।”
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে তিনি যদিও কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না, তবুও কুফার মুফতীগণের মধ্যে গণ্য ছিলেন।
দারসের আসর
মসজিদে তাঁর দারসের আসর ছিল। সালাত আদায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী মসজিদে বসে যেতেন এবং হাদীছ শুনতে আগ্রহী লোকেরা বৃত্তাকারে তাঁর চার পাশে বসে যেতেন। তাঁর সূত্রে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, মুহাম্মাদ ইবন বিশর, ইয়াহইয়া ইবন আদম, আবু নু'আইম, খাল্লাদ ইবন ইয়াহইয়া, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক, ইয়াযীদ ইবন হারুন, শু'বা আল-হাজ্জাজ, মালিক ইবন মিগওয়াল, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, মুহাম্মাদ ইবন বিশর (রহ) ও আরো অনেকে।
'ইবাদত-বন্দেগী
তাঁর মা ছিলেন একজন উঁচুস্তরের 'আবিদা। তাঁর পুণ্যময় তত্ত্বাবধানের গভীর প্রভাব পড়ে ছেলের উপর। মা সব সময় মসজিদে সালাত আদায় করতেন। মা ও ছেলে দু'জন অধিকাংশ সময় এক সাথে মসজিদে যেতেন। একটা পশমী চাদর মিস'আর হাতে করে নিতেন এবং মসজিদে পৌঁছে সেটা মা'র বসার জন্য বিছিয়ে দিতেন। তার ওপর দাঁড়িয়ে মা সালাত আদায় করতেন। আর মিস'আর সামনের সারিতে চলে যেতেন এবং সালাত শেষ করে একটি স্থানে বসে যেতেন। তাঁকে ঘিরে হাদীছের জ্ঞান অর্জনে উৎসাহী ছাত্ররা বসে যেত। তিনি তাঁদেরকে হাদীছ শোনাতেন। এর মধ্যে তাঁর মা 'ইবাদত ও যিক্স- আযকার শেষ করতেন। আর মিস'আর তাঁর দারস (পাঠদান) শেষ করে মা'র কাছে এসে তাঁর চাদরটি উঠিয়ে মাকে সংগে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। তাঁর মাত্র দু'টি ঠিকানাই ছিল; ঘর অথবা মসজিদ। অতিরিক্ত 'ইবাদতের কারণে কপালে দাগ হয়ে গিয়েছিল। খালিদ ইবন 'আমর বলেন: "আমি মিস'আরকে দেখেছি, অতিরিক্ত সিজদার কারণে তাঁর কপাল ছাগলের হাঁটুর মত হয়ে গেছে।"
প্রতিদিন অর্ধেক কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁর ছেলে মুহাম্মাদ বলেন: "আমার আব্বা অর্ধেক কুরআন পাঠ না করে ঘুমোতেন না।"
তিনি কোন একটি স্তরে পৌঁছে থেমে যেতেন না। তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার ধাপ সর্বদাই উন্নত থেকে উন্নততর হতে থাকতো। মা'আন বলেন: "আমি মিস'আরকে প্রতি দিনই শুভ ও কল্যাণে কেবল উন্নতিই করতে দেখেছি।" তিনি 'ইবাদত-বন্দেগী, আধ্যাত্মিক সাধনা ও নৈতিক গুণাবলীতে এমন উচ্চতর পর্যায়ে পৌছে যান যে, তাঁর জান্নাতী হওয়ার ব্যাপারে মানুষের কোন সন্দেহ ছিল না। যেমন আল- হাসান ইবন 'আম্মারা বলেন: "যদি মিস'আরের মত মানুষ জান্নাতে না যান তাহলে তো জান্নাতবাসীদের সংখ্যা অতি অল্পই হবে।"
প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক (রহ) অথবা তাঁর মত অন্য কেউ হযরত মিস'আরের (রহ) আদত-অভ্যাস ও নৈতিক গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে একটি কবিতায় তা তুলে ধরেন। তার দু'টি চরণ নিম্নরূপ:
"কেউ যদি সৎ সঙ্গী সন্ধান করে, সে যেন মিস'আর ইবন কিদামের আসরে আসে। সেখানে আছে প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য এবং এর সদস্যরা হলো পূতঃপবিত্র এবং জাতির উঁচু স্তরের মানুষ।"
পার্থিব ধন-ঐশ্বর্যের প্রতি উদাসীনতা
দুনিয়া ও এর শান-শওকতের প্রতি একেবারেই উদাসীন ও বেপরোয়া ছিলেন। রাষ্ট্রীয় কোন পদের প্রতি কখনো চোখ তুলে তাকাননি। একবার মহা প্রতাপশালী আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল-মানসূর তাঁকে কোন একটি অঞ্চলের ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান। তিনি বলেন, আমার পরিবারের লোকেরা তো আমাকে দুই দিরহামের বাজার করারও যোগ্য মনে করে না। তারা বলে, আমরা তোমার দুই দিরহামের কিছু ক্রয় করাও পছন্দ করিনে। আর আপনি আমাকে ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান? আল্লাহ আপনাকে ঠিক কাজ করার শক্তি দিন। আপনার সংগে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, তাই আমি কিছু বলতে পারছি। খলীফা আবূ জা'ফার তাঁর এই আপত্তি মেনে নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
তিনি অত্যন্ত প্রফুল্ল স্বভাবের মানুষ ছিলেন। অন্যের আবেগ-আগ্রহের প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখাতেন। কেউ যখন তাঁকে একটি হাদীছ শোনাতো যা তাঁর আগেই জানা থাকতো তখন কেবল সেই লোকটির সন্তুষ্টি ও হাদীছের মর্যাদার খাতিরে চুপ করে শুনে যেতেন, যেন হাদীছটি তিনি পূর্বে কখনো শোনেননি।
ওফাত
তিনি হিজরী ১৫৫ মতান্তরে ১৫৩ সনে কৃষ্ণায় ইনতিকাল করেন।
মুস'আব ইবন আল-মিকদাম বলেন: আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) স্বপ্নে দেখলাম। সুফইয়ান রাসূলের (সা) একটি হাত ধরে আছেন এবং এ অবস্থায় দু'জন কা'বা তাওয়াফ করছেন। সুফইয়ান রাসূলকে (সা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! মিস'আর কি মৃত্যু বরণ করেছেন? বললেন: হাঁ, তাঁর মৃত্যুতে আসমানবাসীরা সুসংবাদ লাভ করেছে।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৪. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৯. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
১০. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
১২. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
১৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
১৪. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি 'ঈন-১/২৮
১৫. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
১৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫২
十七. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩-২৫৪
十八. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
十九. প্রাগুক্ত-১/১৮৯; তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৯
二十一. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
二十二. প্রাগুক্ত-১/১৮৯-১৯০
二十三. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪; প্রাগুক্ত-১/১৮৯
二十四. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
二十五. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
二十六. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৪
📄 মুতাররিফ ইবন ‘আবদিল্লাহ ইবন আশ-শিখখীর (রহ)
হযরত আবূ 'আবদিল্লাহ মুতারিরের (রহ) বংশধারা এরূপ : মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ বিন আশ-শিখখীর বিন আউফ বিন কা’ব বিন ওয়াফদান বিন আল-হারীশ বিন কা’ব বিন রাবী’আ বিন আমির বিন সা’সা।
'আবদুল্লাহ তাঁর পিতা ও আশ-শিখীর দাদা। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায় তাঁর জন্ম। কিন্তু অল্প বয়স অথবা দূরে অবস্থানের কারণে মহানবীর সাক্ষাৎ ও সাহচর্যের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থেকে যান। ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখীর ও হানী ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখীর তাঁর দু'ভাই।
জ্ঞান অর্জন
জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর ছিল তীব্র আবেগ ও আগ্রহ। জ্ঞানের গুণ-ফযীলতকে 'ইবাদতের গুণ-ফযীলতের উপর প্রাধান্য দিতেন। এই প্রবল আগ্রহ ও আবেগ তাঁকে জ্ঞানীদের উচ্চাসনে বসায়। খোদাভীতি, ভদ্রতা, শিষ্টাচারিতা তথা যাবতীয় নৈতিক গুণ ও উৎকর্ষে ছিলেন আদর্শ স্থানীয়। ইবন সা'দ বলেন, তাঁর ব্যক্তি সত্তায় খোদাভীতি, মহৎ গুণ, বর্ণনা ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও সাহিত্য প্রতিভা ইত্যাদি গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি তাঁকে বসরার মনীষীদের তৃতীয় তবকায় স্থান দিয়েছেন। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ইল্যু ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের চূড়া সমতুল্য ছিলেন। তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের কারণে মানুষের অন্তরে বিশেষ স্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
হাদীছ
তাঁর সময়ে বিশাল সংখ্যক সাহাবায়ে কিরাম (রা) জীবিত ছিলেন। তিনি তাঁদের জ্ঞানের ঝর্ণাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হন। হযরত 'উছমান, 'আলী, আবু যার, 'আম্মার ইবন ইয়াসির, 'আবদুল্লাহ ইবন মুগাফ্ফাল, 'উছমান ইবন আবিল 'আস, 'ইমরান ইবন হুসাইন, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান (রা) প্রমুখ উঁচু মর্যাদার সাহাবায়ে কিরামের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভে যাঁরা ধন্য হয়েছেন তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন : তাঁর ভাই আবুল 'আলা' ইয়াযীদ, ভাতীজা 'আবদুল্লাহ ইবন হানী এবং হাসান আল-বাসরী, হুমায়দ ইবন হিলাল, আবু নাসর, গায়লান ইবন জারীর, সা'ঈদ ইবন আবী হিন্দ, মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি', আবুত তায়য়াহ, ছাবিত আল-বানানী, 'আবদুল কারীম ইবন রুশাইদ, সা'ঈদ আল-হারীরী, আবূ সালামা, সা'ঈদ ইবন ইয়াযীদ (রহ) ও আরো অনেকে। ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল। তিনি ছিলেন বসরার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফতী।
তাঁর এই জ্ঞান ও মনীষার তুলনায় তাঁর আমল, পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি নির্মোহ ভাব এবং খোদাভীরুতার পাল্লা ভারী ছিল। ইবন সা'দ তাঁকে অত্যধিক আল্লাহ ভীরু লোকদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন। 'আজলী তাঁকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ এবং সত্যনিষ্ঠ মানুষ বলেছেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি ছিলেন বসরার একজন 'আবিদ ও যাহিদ (তাপস ও দুনিয়া বিরাগী) মানুষ।
দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা পরিহার
তাঁর এমন দুনিয়া বিরাগী মনোভাব ও আল্লাহ ভীরুতার কারণে তিনি সব ধরনের হৈ- হাঙ্গামা ও বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলাকে দারুণ ভয় করতেন। এ জাতীয় কাজকে তিনি একটা পরীক্ষা বলে মনে করতেন। বলতেন, ফিতনা-ফাসাদ পথ প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং ঈমানদার ব্যক্তিকে তার নিজের নফসের সংগে সংঘাত-সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়ার জন্য মাথা তুলে দাঁড়ায়। তাঁর জীবনকালে বড় বড় বিপ্লব ও ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু তিনি সবকিছু থেকে নিজেকে সযত্নে দূরে রেখেছেন। সাধারণতঃ ফিতনা-ফাসাদের সময় তিনি সে স্থান ত্যাগ করে কোন অজ্ঞাত স্থানে চলে যেতেন। যদি যাওয়ার সুযোগ না পেতেন তাহলে ঘরে চুপ করে বসে থাকতেন। এমনকি জুম'আ ও জামা'আতের জন্যও বের হতেন না। 'উকরা বলেন, আমি মুতারিফের ভাই ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, ফিতনা বা বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো তখন মুতারিফ কী করতেন? তিনি বললেন, ঘরের অভ্যন্তরে একেবারে নির্জনবাস অবলম্বন করতেন।
আর যতদিন বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলার অগ্নিশিখা প্রশমিত না হতো ততদিন তিনি মানুষের জুম'আ ও জামা'আতে শরীক হতেন না। অন্যদেরকেও তিনি এই ফিতনা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতেন। হযরত কাতাদা (রহ) বলেন, যখন কোন ফিতনা-ফাসাদ দেখা দিত তখন মুতাররিফ মানুষকে তাতে জড়িত হতে বাধা দিতেন এবং নিজে কোথাও পালিয়ে যেতেন। হাসান আল-বাসরীও মানুষকে বাধা দিতেন, তবে তিনি স্থান ত্যাগ করতেন না। এ কারণে মুতাররিফ তাঁর সম্পর্কে বলতেন, হাসান আল-বাসরী সেই ব্যক্তির মত যে মানুষকে প্লাবন থেকে সতর্ক করে, কিন্তু নিজে তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে।
চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্কতার কারণে তিনি সেই সব সংঘাত-সংঘর্ষের অবস্থা সম্পর্কেও কোন কিছু জানতে চাইতেন না। 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়র (রা) ও বানূ উমাইয়্যাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত তাঁর সময়ে হয়। তিনি এই বিরোধের কথা কারো কাছে কিছুই জানতে চাইতেন না। মানুষ যেহেতু তাঁর চিন্তাধারা সম্পর্কে অবহিত ছিল এ কারণে তারাও তাঁর সামনে সে বিষয়ে কিছু আলোচনা করতো না।
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ও 'আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে 'আবদুর রহমান ইবন আল- আশ'আছ যে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উত্তোলন করেন তাতে অনেক বড় সাহাবী অংশ গ্রহণ করেন। মানুষ মুতারিফকেও অংশ গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে, কিন্তু তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন: তোমরা যে জিনিসে অংশ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাচ্ছো তা কি "জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ থেকেও উত্তম হবে?" লোকেরা বললো না। তিনি বললেন, তাহলে আমি ধ্বংসের মধ্যে পতিত হওয়া এবং সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের মধ্যে জুয়া খেলতে চাই না। অর্থাৎ সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ যুদ্ধে জড়াতে চাই না। শান্তি ও নিরাপত্তার জীবন তাঁর পছন্দ ছিল। বলতেন, শান্তি ও নিরাপদ জীবন লাভ করে শুকরিয়া আদায় করা বিপদ- মুসীবতে ধৈর্য ধারণের চেয়ে আমার নিকট বেশী পছন্দের। আল-'ইজলী' বলেন, ইবন আল-আশ'আছের ফিত্না থেকে বসরার মাত্র দু'ব্যক্তি রক্ষা পেয়েছিলেন। তারা হলেন: মুতারিফ ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীন।
'আকীদা-বিশ্বাস
'আকীদার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন এবং তা সংরক্ষণের জন্য ভীষণ যত্নবান ছিলেন। একবার খারিজীদের একটি উপদল তাঁর নিকট আসে এবং তাদের আকীদাসমূহ গ্রহণ করার জন্য তাঁকে আহ্বান জানায়। তিনি তাদেরকে বলেন, যদি আমার দু'টি অন্তর থাকতো তাহলে একটিতে তোমাদের 'আকীদাসমূহ স্থান দিতাম এবং অন্যটি সংরক্ষণ করতাম। তোমরা যা বলছো তা যদি সঠিক হতো তাহলে দ্বিতীয়টি দিয়ে তোমাদের অনুসরণ করতাম। আর যদি ভুল হতো তাহলে একটি ধ্বংস হলেও অন্যটি তো রক্ষা পেত। কিন্তু অন্তর তো মাত্র একটি। এ কারণে আমি তাকে ধোঁকা ও প্রতারণার কাজে লাগাতে পারিনে।
যদিও তিনি একজন বড় দুনিয়া বিরাগী খোদাভীরু মানুষ ছিলেন, তাই বলে অদৃষ্টবাদী ছিলেন না। তিনি ছিলেন কর্মবাদী মানুষ। এ পৃথিবী কার্যকারণ- বিশ্ব বলে জানতেন। তাই বলতেন, এটা বৈধ নয় যে, কোন ব্যক্তি কোন উঁচু স্থান থেকে নিজেকে নীচে ফেলে দিয়ে বলে যে, আল্লাহ আমার তাকদীর এভাবেই নির্ধারণ করেছেন। বরং মানুষের উচিত বেঁচে থাকা এবং চেষ্টা করা। যদি সকল সতর্কতা ও চেষ্টা-সাধনা সত্ত্বেও তার কোন ক্ষতি হয় অথবা তার উপর কোন বিপদ আপতিত হয় তাহলে তাকে আল্লাহর তাকদীর বলে বিশ্বাস করা উচিত। আল্লাহর তাকদীর ছাড়া কোন বিপদ-মুসীবত আপতিত হতে পারে না। এ কারণে তিনি "তাউন” (প্লেগ) জাতীয় কোন মহামারী দেখা দিলে জনসমাগমের স্থান থেকে দূরে সরে যেতেন।
তাঁর এমন কিছু কথা আছে যা গভীর ভাব ও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলতেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে 'আকল তথা বুদ্ধির চেয়ে ভালো আর কোন জিনিষ দেয়া হয়নি। মানুষের বুদ্ধি তাঁর যুগ ও কাল অনুযায়ী হয়। নিজের খাবার এমন ব্যক্তিকে খাওয়াবে না যার খাওয়ার রুচি নেই। অর্থাৎ অহেতুক কোন কিছু বিনষ্ট করবে না।
পার্থিব জাঁকজমক
এ পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষের খাদ্য-খাবারের জন্য যা কিছু দান করেছেন তা ভোগ করা তিনি দোষের কিছু মনে করতেন না। বিশাল ধন-সম্পদ তিনি লাভ করেছিলেন। তাই তিনি বেশ জাঁকজমক ও সম্মানের জীবন যাপন করতেন। ইমাম যাহাবী (রহ) লিখেছেন, মুতারিফ একজন নেতা ও উঁচু মর্যাদার মানুষ ছিলেন। অতি উন্নত মানের পোশাক পরতেন, শাসন-কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিদের দরবারে যাতায়াত করতেন। তবে তাঁর এই বাহ্যিক জাঁকজমক তাঁর নৈতিক মানের উপর কোন রকম প্রভাব ফেলতো না। গায়লান ইবন জারীর বলেন, 'তিনি বারানুস নামক এক প্রকার টুপি ও মাতারিফ নামক এক বিশেষ ধরনের দামী চাদর পরতেন। ঘোড়ায় চড়তেন এবং শাসন-কর্তৃত্বের অধিকারী আমীর-উমারাদের নিকট যেতেন। তবে তাঁর এই শান-শওকতের জীবনধারা সত্ত্বেও তুমি তাঁর নিকট গেলে তোমার অন্তর ও দৃষ্টিতে প্রশান্তির ভাব সৃষ্টি হবে।
ওফাত
হিজরী ৯৫ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায় এবং স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। তিনি পুত্রকে ডেকে কুরআনের অসীয়াতের আয়াতটি পাঠ করে শোনান। পুত্র দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে ডাক্তার ডেকে আনে। ডাক্তারকে দেখে বলেন তিনি কে? পুত্র বলে: ডাক্তার। তিনি ডাক্তারকে লক্ষ্য করে বলেন: আমি কঠোরভাবে নিষেধ করছি, আমাকে যেন ঝাড়-ফুঁক করা না হয়, আমার গায়ে যেন তাবীজ-কবজ ঝোলানো না হয়। তারপর পুত্রকে কবর তৈরির নির্দেশ দেন। সে নির্দেশমত কবর তৈরি করে। তারপর তিনি বলেন, আমাকে কবরের নিকট নিয়ে চলো। সেখানে নেয়া হয়। তিনি কবরের পাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করে, আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের দরবারে দু'আ করেন। তারপর ঘরে ফিরে এসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তিনি বলতেন:
'এই মৃত্যু বিত্ত-বৈভবের মালিকদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিনষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং এমন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তালাশ কর যাতে মৃত্যু নেই।'
গায়লান ইবন জারীর বলেন, একবার কোন একটি ব্যাপার নিয়ে এক ব্যক্তির সাথে মুতারিফের কিছু কথা কাটাকাটি হয়। লোকটি মুতারিরফের প্রতি মিথ্যা আরোপ করে। সাথে সাথে তাঁর মুখ থেকে বের হয়ে যায় এই বদ-দু'আ:
"হে আল্লাহ! যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তার মরণ দাও।" লোকটি সেখানেই ঢলে পড়ে এবং মারা যায়। ব্যাপারটি যিয়াদের দরবার পর্যন্ত গড়ালো। যিয়াদ তাঁকে বললেন : আপনি লোকটিকে মেরে ফেললেন? মুতারিফ বললেন : না, আমি মারিনি। তবে আমার দু'আ তার নির্ধারিত সময়ের সাথে মিলে গেছে।
টিকাঃ
১. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৭৪
২. তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৩
৩. আত-তাবাকাত-৭/১০৩
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৩
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৫
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৭২; তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৩
৭. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি 'ঈন-১/৬৭
৮. আত-তাবাকাত-৭/১০৩
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৭৩
১০. আত-তাবাকাত- ছিল 'ইল্ম ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের দুই সাগরের সঙ্গম স্থলের মত। তাঁর দাসত্বের কল্যাণে এবং রাসূলুল্লাহর (সা) শহর মদীনায় অবস্থানের সুযোগে মুসলিমও 'ইল্ম ও 'আমলের ঐশ্বর্যের অধিকারী হন। ইবন সা'দ বলেন: "মুসলিম ছিলেন বিশ্বস্ত, জ্ঞানী, তাপস ও আল্লাহভীরু।” ইবন আওন বলেন, সেই সময়ে মুসলিমের উপরে কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হতো না।
হাদীছ
মদীনায় অবস্থানের কারণে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস ও 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) মত উম্মাতের শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং আবুল আশ'আছ সান'আনী, হামরান ইবন আবান (রহ) প্রমুখের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। আর ছাবিত আল-বানানী, ইয়া'লা ইবন হাকীম, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, আইউব সাখতিয়ানী, আবূ নাদরা ইবন কাতাদা, সালিহ, আবুল খায়ল, মুহাম্মাদ ইবন আল- ওয়াসি', 'আমর ইবন দীনার, আবান ইবন আবী' 'আয়্যাম (রহ) প্রমুখ মুহাদ্দিছগণ তাঁর সুযোগ্য ছাত্র ছিলেন।
ফিক্হ শাস্ত্রেও তিনি অতি উঁচু স্থানের অধিকারী ছিলেন। খলীফা ইবন খায়্যাত বলেন: তিনি বসরার সেই পাঁচজন ফকীর মধ্যে গণ্য ছিলেন যাঁদেরকে তাঁদের যুগের ফকীহ বলে মানা হতো।
নৈতিক গুণাবলী
'ইলমের তুলনায় তাঁর 'আমল ছিল বেশী। ইবন সা'দ তো তাঁকে একজন 'আবিদ ও আল্লাহ ভীরু বলেছেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি বসরার ইবাদতকারী মহান ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। তিনি মনে করতেন, আল্লাহর প্রতি ঈমানের জন্য অপরিহার্য হলো তাঁর অপছন্দের সকল কথা-কাজ পরিহার করা। তিনি বলতেন, আমার বুঝে আসে না যে, বান্দা যদি আল্লাহর অপছন্দের সবকিছু ছেড়ে না দেয় তাহলে তার ঈমান কোন কাজে আসবে?
নামাযে আগ্রহ ও একাগ্রতা
তাঁর নামাযে এক বিশেষ অবস্থা ও তন্ময়ভাবের সৃষ্টি হতো। তিনি যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন এমন মনে হতো যে, তাঁর ওপর আলোকধারা নামছে। ইবন 'আওন বলেন, যখন তিনি নামাযের মধ্যে থাকতেন তখন তাঁকে প্রাণহীন কাঠের মত মনে হতো, শরীর ও কাপড়-চোপড় একটুও নড়াচড়া করতো না। নামাযরত অবস্থায় যত মারাত্মক ও ভয় পাইয়ে দেওয়ার মত অবস্থার সৃষ্টি হোক না কেন সে ব্যাপারে তাঁর কোন প্রতিক্রিয়াই থাকতো না। একবার তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন সময় পাশেই আগুন লাগে এবং অল্পক্ষণ পরে নিভেও যায়; কিন্তু তিনি মোটেও টের পাননি।
অসুস্থতার কারণে মানুষ যখন একেবারেই অপারগ হয়ে যায় সে সময় ছাড়া আর কোন অবস্থায় বসে নামায আদায় করা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার জনৈক ব্যক্তি নৌকায় বসে বসে নামায আদায়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। তিনি বলেন, এ আমার মোটেই পছন্দ নয় যে, কোন রোগ ছাড়া আল্লাহ আমাকে বসা অবস্থায় নামাযে দেখুক। নামাযের দিকে আহ্বানের এত গুরুত্ব দিতেন যে, যদি বহু দূর থেকেও আযানের ধ্বনি কানে ভেসে আসতো, সেই মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করতেন। একবার তিনি কোন এক মসজিদ থেকে ফিরছেন। কিছু দূর যাওয়ার পর আযানের ধ্বনি কানে ভেসে এলো। তিনি আবার সেই মসজিদে ফিরে গেলেন। মুয়াযযিন জিজ্ঞেস করলো, আপনি আবার ফিরে এলেন কেন? বললেন: তুমিই তো ফিরিয়ে আনলে।
মসজিদের খিদমত ছিল তাঁর বিশেষ কাজ। মসজিদে তিনি বাতি জ্বালাতেন। এ কারণে লোকেরা তাঁকে আল-মুসব্বিহু (বাতি প্রজ্জ্বলনকারী মুসলিম) বলতো।
সুন্নাহর অনুসরণ
সুন্নাহর অনুসরণের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। অতি মামুলি ধরনের সুন্নাতও ছুটে যেতে পারতো না। শুধু একটি সুন্নাতের অনুসরণ হবে এ চিন্তায় জুতাপরা অবস্থায় নামায আদায় করতেন। তিনি বলতেন, জুতা খোলা আমার জন্য খুবই সহজ কাজ, কিন্তু শুধুমাত্র সুন্নাতের অনুসরণ হবে এ চিন্তায় জুতো পরা অবস্থায় নামায আদায় করি। হযরত রাসূলে কারীম (সা) খোরমা দিয়ে ইফতার করতেন। এ কারণে খোরমা দিয়েই তাঁর ইফতার হতো।
কুরআনের প্রতি সম্মান
আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের প্রতি এত বেশী সম্মান প্রদর্শন করতেন যে, যে হাত দিয়ে কুরআন ধরতেন সে হাত দিয়ে নাজাসাতের স্থান স্পর্শ করতেন না। বলতেন, আমি ডান হাত দিয়ে যৌনাঙ্গ স্পর্শ করা খারাপ কাজ মনে করি। কারণ, ঐ হাত দিয়ে আমি কুরআন ধরি।
রিয়া তথা প্রদর্শনীমূলক মনোভাবকে তিনি মূর্খতা ও শয়তানের মন্ত্র বলে মনে করতেন। বলতেন, তোমরা আত্মপ্রদর্শনী থেকে দূরে থাক। কারণ, তা একজন 'আলিমকে মূর্খের পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং তার মাধ্যমেই শয়তান ভুল পথে চালিত করে।
তিনি অত্যন্ত ধীর-স্থির ও সহনশীল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। রাগের সময়ও মুখ থেকে অসমীচীন কথা উচ্চারিত হতো না। কখনো কাউকে গালি দেননি। সর্বাধিক উত্তেজিত অবস্থায় তাঁর মুখ থেকে যে কথাটি উচ্চারিত হতো তা হলো: "এখন আমার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে নাও।” একথা উচ্চারিত হলে মানুষ বুঝে যেত তিনি তাঁর রাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গেছেন।
এত ধীর-স্থির ও ধৈর্য-সহনশীল হওয়ার কারণে সকল হৈ-হাঙ্গামা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে তিনি দারুণ অপছন্দ করতেন। সে সময় মুহাম্মাদ ইবন আল-আশ'আছের নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তাতে অনেক উঁচু স্তরের তাবি'ঈ জড়িয়ে পড়েন। অন্যদের মত মুসলিমও তাতে অংশ গ্রহণ করেন। তবে তিনি কারো উপর তরবারি উঠাননি। শুধু এই অংশ গ্রহণের জন্য পরবর্তীতে অনুশোচনায় জর্জরিত হন। আবু কিলাবা বলেন, একবার মক্কার সফরে আমি ও মুসলিম এক সাথে ছিলাম। তখন একদিন তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-আশ'আছের বিদ্রোহের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন : আলহামদু লিল্লাহ, আমি এই বিশৃঙ্খলায় না একটি তীর ছুড়েছি, না তরবারি চালিয়েছি, আর না একটি বর্শা নিক্ষেপ করেছি। আমি বললাম, কিন্তু আপনি বলুন তো, ঐ সকল লোকদের পরিণতি কি হবে যারা আপনাকে সারিতে দাঁড়ানো দেখে বলেছিল, মুসলিম ইবন ইয়াসার এই যুদ্ধে আছেন এবং তিনি কোন অন্যায় কাজে যুক্ত হতে পারেন না এবং এই বিশ্বাসে তারা যুদ্ধ করে মারা গেছে? আমার একথা শুনে তিনি ব্যাকুলভাবে কাঁদতে থাকেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে আমি লজ্জিত হলাম, তাঁকে এমন কথা বলার জন্য।
ওফাত
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) খিলাফতকালে হিজরী ১০০ অথবা ১০১ সনে তিনি ইনতিকাল করেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৮/৯৫; তাবি'ঈন-৪৭৮
২. আত-তাবাকাত-৭/১৩৭; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪০
৪. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৪
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৯৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪১
৭. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
৮. প্রাগুক্ত-৭/১৩৫
৯. প্রাগুক্ত-৭/১৩৬
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
১১. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
১২. প্রাগুক্ত
১৩. প্রাগুক্ত-৭/১৩৭
十四. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
হযরত আবূ 'আবদিল্লাহ মুতারিরফের (রহ) বংশধারা এরূপ : মুতাররিফ ইবন ‘আবদিল্লাহ ইবনুশ শিখখীর ইবন আওফ ইবন কা’ব ইবন ওয়াফদান ইবনুল হারিছ ইবন কা’ব ইবন রাবী‘আ ইবন ‘আমির ইবন সা’সা’আ।
'আবদুল্লাহ তাঁর পিতা ও আশ-শিখীর দাদা। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায় তাঁর জন্ম। কিন্তু অল্প বয়স অথবা দূরে অবস্থানের কারণে মহানবীর সাক্ষাৎ ও সাহচর্যের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থেকে যান। ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখীর ও হানী ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখীর তাঁর দু'ভাই।
জ্ঞান অর্জন
জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর ছিল তীব্র আবেগ ও আগ্রহ। জ্ঞানের গুণ-ফযীলতকে 'ইবাদতের গুণ-ফযীলতের উপর প্রাধান্য দিতেন। এই প্রবল আগ্রহ ও আবেগ তাঁকে জ্ঞানীদের উচ্চাসনে বসায়। খোদাভীতি, ভদ্রতা, শিষ্টাচারিতা তথা যাবতীয় নৈতিক গুণ ও উৎকর্ষে ছিলেন আদর্শ স্থানীয়। ইবন সা'দ বলেন, তাঁর ব্যক্তি সত্তায় খোদাভীতি, মহৎ গুণ, বর্ণনা ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও সাহিত্য প্রতিভা ইত্যাদি গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি তাঁকে বসরার মনীষীদের তৃতীয় তবকায় স্থান দিয়েছেন। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ইল্যু ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের চূড়া সমতুল্য ছিলেন। তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের কারণে মানুষের অন্তরে বিশেষ স্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
হাদীছ
তাঁর সময়ে বিশাল সংখ্যক সাহাবায়ে কিরাম (রা) জীবিত ছিলেন। তিনি তাঁদের জ্ঞানের ঝর্ণাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হন। হযরত 'উছমান, 'আলী, আবু যার, 'আম্মার ইবন ইয়াসির, 'আবদুল্লাহ ইবন মুগাফ্ফাল, 'উছমান ইবন আবিল 'আস, 'ইমরান ইবন হুসাইন, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান (রা) প্রমুখ উঁচু মর্যাদার সাহাবায়ে কিরামের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভে যাঁরা ধন্য হয়েছেন তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন : তাঁর ভাই আবুল 'আলা' ইয়াযীদ, ভাতীজা 'আবদুল্লাহ ইবন হানী এবং হাসান আল-বাসরী, হুমায়দ ইবন হিলাল, আবু নাসর, গায়লান ইবন জারীর, সা'ঈদ ইবন আবী হিন্দ, মুহাম্মাদ ইবন আল-ওয়াসি', আবুত তায়য়াহ, ছাবিত আল-বানানী, 'আবদুল কারীম ইবন রুশাইদ, সা'ঈদ আল-হারীরী, আবূ সালামা, সা'ঈদ ইবন ইয়াযীদ (রহ) ও আরো অনেকে। ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল। তিনি ছিলেন বসরার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফতী।
তাঁর এই জ্ঞান ও মনীষার তুলনায় তাঁর আমল, পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি নির্মোহ ভাব এবং খোদাভীরুতার পাল্লা ভারী ছিল। ইবন সা'দ তাঁকে অত্যধিক আল্লাহ ভীরু লোকদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন। 'আজলী তাঁকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ এবং সত্যনিষ্ঠ মানুষ বলেছেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি ছিলেন বসরার একজন 'আবিদ ও যাহিদ (তাপস ও দুনিয়া বিরাগী) মানুষ।
দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা পরিহার
তাঁর এমন দুনিয়া বিরাগী মনোভাব ও আল্লাহ ভীরুতার কারণে তিনি সব ধরনের হৈ- হাঙ্গামা ও বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলাকে দারুণ ভয় করতেন। এ জাতীয় কাজকে তিনি একটা পরীক্ষা বলে মনে করতেন। বলতেন, ফিতনা-ফাসাদ পথ প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং ঈমানদার ব্যক্তিকে তার নিজের নফসের সংগে সংঘাত-সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়ার জন্য মাথা তুলে দাঁড়ায়। তাঁর জীবনকালে বড় বড় বিপ্লব ও ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু তিনি সবকিছু থেকে নিজেকে সযত্নে দূরে রেখেছেন। সাধারণতঃ ফিতনা-ফাসাদের সময় তিনি সে স্থান ত্যাগ করে কোন অজ্ঞাত স্থানে চলে যেতেন। যদি যাওয়ার সুযোগ না পেতেন তাহলে ঘরে চুপ করে বসে থাকতেন। এমনকি জুম'আ ও জামা'আতের জন্যও বের হতেন না। 'উকরা বলেন, আমি মুতারিফের ভাই ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, ফিতনা বা বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো তখন মুতারিফ কী করতেন? তিনি বললেন, ঘরের অভ্যন্তরে একেবারে নির্জনবাস অবলম্বন করতেন। আর যতদিন বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলার অগ্নিশিখা প্রশমিত না হতো ততদিন তিনি মানুষের জুম'আ ও জামা'আতে শরীক হতেন না। অন্যদেরকেও তিনি এই ফিতনা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতেন। হযরত কাতাদা (রহ) বলেন, যখন কোন ফিতনা-ফাসাদ দেখা দিত তখন মুতাররিফ মানুষকে তাতে জড়িত হতে বাধা দিতেন এবং নিজে কোথাও পালিয়ে যেতেন। হাসান আল-বাসরীও মানুষকে বাধা দিতেন, তবে তিনি স্থান ত্যাগ করতেন না। এ কারণে মুতাররিফ তাঁর সম্পর্কে বলতেন, হাসান আল-বাসরী সেই ব্যক্তির মত যে মানুষকে প্লাবন থেকে সতর্ক করে, কিন্তু নিজে তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে।
চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্কতার কারণে তিনি সেই সব সংঘাত-সংঘর্ষের অবস্থা সম্পর্কেও কোন কিছু জানতে চাইতেননা। 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়র (রা) ও বানূ উমাইয়্যাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত তাঁর সময়ে হয়। তিনি এই বিরোধের কথা কারো কাছে কিছুই জানতে চাইতেন না। মানুষ যেহেতু তাঁর চিন্তাধারা সম্পর্কে অবহিত ছিল এ কারণে তারাও তাঁর সামনে সে বিষয়ে কিছু আলোচনা করতো না।
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ও 'আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে 'আবদুর রহমান ইবন আল- আশ'আছ যে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উত্তোলন করেন তাতে অনেক বড় বড় সাহাবী অংশ গ্রহণ করেন। মানুষ মুতারিফকেও অংশ গ্রহণের জন্য চাপ দিতে থাকে, কিন্তু তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন: তোমরা যে জিনিসে অংশ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাচ্ছো তা কি "জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ থেকেও উত্তম হবে?" লোকেরা বললো না। তিনি বললেন, তাহলে আমি ধ্বংসের মধ্যে পতিত হওয়া এবং সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের মধ্যে জুয়া খেলতে চাই না। অর্থাৎ সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ যুদ্ধে জড়াতে চাই না। শান্তি ও নিরাপত্তার জীবন তাঁর পছন্দ ছিল। বলতেন, শান্তি ও নিরাপদ জীবন লাভ করে শুকরিয়া আদায় করা বিপদ- মুসীবতে ধৈর্য ধারণের চেয়ে আমার নিকট বেশী পছন্দের। আল-'ইজলী' বলেন, ইবন আল-আশ'আছের ফিত্না থেকে বসরার মাত্র দু'ব্যক্তি রক্ষা পেয়েছিলেন। তারা হলেন: মুতারিফ ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীন।
'আকীদা-বিশ্বাস
'আকীদার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন এবং তা সংরক্ষণের জন্য ভীষণ যত্নবান ছিলেন। একবার খারিজীদের একটি উপদল তাঁর নিকট আসে এবং তাদের আকীদাসমূহ গ্রহণ করার জন্য তাঁকে আহ্বান জানায়। তিনি তাদেরকে বলেন, যদি আমার দু'টি অন্তর থাকতো তাহলে একটিতে তোমাদের 'আকীদাসমূহ স্থান দিতাম এবং অন্যটি সংরক্ষণ করতাম। তোমরা যা বলছো তা যদি সঠিক হতো তাহলে দ্বিতীয়টি দিয়ে তোমাদের অনুসরণ করতাম। আর যদি ভুল হতো তাহলে একটি ধ্বংস হলেও অন্যটি তো রক্ষা পেত। কিন্তু অন্তর তো মাত্র একটি। এ কারণে আমি তাকে ধোঁকা ও প্রতারণার কাজে লাগাতে পারিনে।
যদিও তিনি একজন বড় দুনিয়া বিরাগী খোদাভীরু মানুষ ছিলেন, তাই বলে অদৃষ্ট৭/১০৩
১১. প্রাগুক্ত-৭/১০৪
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৩
১৪. আত-তাবাকাত-৭/১০৪; তাবি'ঈন-৪৮৪
১৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৪
১৬. আত-তাবাকাত-৭/১০৫
১৭. প্রাগুক্ত-৭/১০৪
১৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৫
十九. আত-তাবাকাত-৭/১০৫
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৫; তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৪
二十一. আত-তাবাকাত-৭/১০৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৪
二十二. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৫
二十三. প্রাগুক্ত-১/৬৪; তাহযীব আল-কামাল-১৮/১৪৫-১৪৬