📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মাকহূল আদ-দিমাশক্বী (রহ)

📄 মাকহূল আদ-দিমাশক্বী (রহ)


হযরত মাকহুলের (রহ) কুনিয়াত তথা ডাকনাম দু'টি : আবূ 'আবদিল্লাহ ও আবূ আইউব। তাঁর বংশ ও জন্মভূমি সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবন সা'দ তাঁকে কাবুলের অধিবাসী বলে উল্লেখ করেছেন। ইবন হাজার কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যার একাংশের দ্বারা জানা যায় তিনি একজন অনারব বংশোদ্ভূত এবং তাঁর পিতার নাম সোহরাব। আর ইবন হাজারের বর্ণনার কিছু অংশের দ্বারা প্রমাণিত হয়, তিনি মিসরীয় ছিলেন, আর কিছু বর্ণনা দ্বারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তিনি একজন আরব এবং হুযালী গোত্রের মানুষ।

তবে শেষের দু'টি বর্ণনা অর্থাৎ হুযালী ও মিসরীয় হওয়া অবশ্যই সঠিক নয়। কারণ তাঁর অনারব বংশোদ্ভূত হওয়া সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। তাঁর হুযালী ও মিসরীয় হওয়া এজন্য প্রসিদ্ধ যে, তিনি তাঁর জীবনের কিছু দিন হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির দাসত্বে ছিলেন এবং কিছুকাল মিসরে অবস্থান করেন।

এ ব্যাপারে ইমাম নাওবীর (রহ) বর্ণনাটি অধিক যুক্তিভিত্তিক ও সঠিক বলে প্রতিভাত হয়। তিনি তাঁকে অনারব বংশোদ্ভূত ও কাবুলের লোক বলেছেন। সুতরাং তার বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মাকহুলের (রহ) উর্ধ্বতন বংশধারা এ রকম :
মাকহুল বিন যিদ যা ইব্‌ন আবি মুসলিম শুহরাব বিন শায্‌ল বিন সান্‌দ বিন শাযদান বিন য়ুরদুক বিন ইয়াগুছ বিন কাস্‌রি কাবুলী ওয়া দামেশকী

এ বর্ণনা দ্বারা বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে যে সমন্বয়টি পাওয়া যায় তা হলো- তিনি অনারব বংশোদ্ভূত, জন্মভূমি কাবুল এবং দিমাশকে বসবাসকারী ছিলেন। আল-মিযী বলেন : দিমাশকের 'আল-আহাদ' বাজারের পাশে তাঁর বাড়ি ছিল।

তাঁর জীবনের প্রথম পর্বের ইতিহাস হলো, তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলেন। 'আমর তাঁকে হুযালী গোত্রের এক মহিলাকে দান করেন। এই দ্বিতীয়জনের দাসত্বের কারণে তাঁর সম্পর্ক আরোপের ক্ষেত্রে দু'টি বর্ণনা হয়ে গেছে। একটি হলো তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদের দাস ছিলেন, আর দ্বিতীয়টি হলো, তিনি ছিলেন হুযালী গোত্রের দাস। দু'টি বর্ণনাই সঠিক। তিনি নিজেই তাঁর দাসত্ব জীবনের সূচনা সম্পর্কে বলেছেন, "আমি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলাম। পরে তিনি আমাকে হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন।" কথাটি যুক্তিভিত্তিক এজন্য যে, 'আমরের পিতা সা'ঈদ হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে কাবুলের সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে জয় করেন। এটাই যুক্তিসিদ্ধ যে, এই অভিযানের সময় মাকহুল যুদ্ধবন্দী হিসেবে সা'ঈদের অধিকারে আসেন। আর একথার সমর্থন পাওয়া যায় খোদ মাকহুলের একটি বর্ণনাতে। তিনি বলেন, আমি এক সময় সা'ঈদের দাস ছিলাম। পরে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি তাঁর পুত্র 'আমরের অধিকারে এসে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক।

মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনযির শাক্কার বলেন: মাকতূলের মূল হলো হারাতের। তাঁর পিতার নাম আবূ মুসলিম শোহ্রাব ইবন শাযিল। দাদা শাযিল হারাতের অধিবাসী ছিলেন। তিনি কাবুলের এক রাজার মেয়ে বিয়ে করেন। স্ত্রীকে সন্তান সম্ভাবা অবস্থায় রেখে তিনি মারা যান এবং স্ত্রী পিতৃগৃহে চলে যান। সেখানে শোহরাবের জন্ম হয়। শোহরাব কাবুলে বেড়ে ওঠেন এবং সেখানে বিয়ে করেন। অতঃপর সেখানে মাকহুলের জন্ম হয়। একটু বড় হলে তিনি মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং সা'ঈদ ইবন আল- 'আসের হাতে অর্পিত হন। এভাবে তিনি দাসত্বের জালে জড়িয়ে পড়েন। সা'ঈদ ইবন আল-'আস আবার তাঁকে হুযাইল গোত্রের এক মহিলার হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেন। পরে এই মহিলা মাকহুলকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।

জ্ঞান অর্জনের জন্য ইসলামী বিশ্ব ভ্রমণ
মুসলমানরা যে দাসদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দাসত্বের নিকৃষ্ট জীবন থেকে বের করে পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দিত, মাকহুল তাঁর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন শুরু হয়েছে দাসত্বের মাধ্যমে এবং অবশেষে তিনি শামের জ্ঞানের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হন। জ্ঞান অন্বেষণে তাঁর স্বভাবগত আগ্রহ ছিল। এ কারণে দাসত্বের জীবনেই তিনি জ্ঞান অর্জনে মনোযোগী হন। পরে দাসত্ব থেকে মুক্তির পর তৎকালীন গোটা ইসলামী বিশ্বের সকল শ্রেষ্ঠ জ্ঞান কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি বলেন, যখন আমি দাসত্ব থেকে মুক্ত হই তখন মিসরের সকল জ্ঞান আত্মস্থ করে ফেলি। আর যতক্ষণ না আমার মধ্যে এ প্রত্যয় জন্মেছে যে, এখানকার সকল জ্ঞান আমি ধারণ করে ফেলেছি ততক্ষণ সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াইনি।

মিসরের জ্ঞান ভাণ্ডার শূন্য করার পর তিনি মদীনায় যান এবং সেখান থেকে যান ইরাকে। এ দু'স্থানের জ্ঞানের সকল ঝর্ণাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হওয়ার পর যান শামে। তথাকার জ্ঞানী-গুণীদের নিকট থেকে স্বীয় জ্ঞানভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করেন। মোটকথা, তিনি জ্ঞান অন্বেষণে ইসলামী দুনিয়ার প্রতিটি কোণে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি নিজেই বলেন: তফতু আল আরদ্বা কুল্লাহ ফি ত্বলাবিল ইল্ম - আমি জ্ঞানের অন্বেষণে গোটা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছি।

জ্ঞান অর্জনে তাঁর প্রবল আগ্রহ ও চেষ্টা-সাধনা তাঁকে জ্ঞানের জগতের এমন শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয় যেখানে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তিই পৌঁছাতে পেরেছিলেন। ইমাম যুহরী (রহ) বলতেন; 'আলিম তো মাত্র চারজন। তাঁদের মধ্যে একজন মাকহুল। অন্য তিনজন হলেন: মদীনার সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কূফার 'আমির আশ-শা'বী এবং বসরার হাসান আল-বাসরী। ইবন ইউনুস বলেন, মাকহুল একজন ফকীহ ও 'আলিম ছিলেন। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবন 'আম্মার বলতেন, তিনি শামের অধিবাসীদের ইমাম ছিলেন। হাদীছ ও ফিক্হ উভয় শাস্ত্রে তিনি ইমাম মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।

সুলায়মান ইবন মূসা বলতেন আমাদের কাছে 'ইলম যখন হিজাযের যুহরী থেকে, 'ইরাকের হাসান আল-বাসরী থেকে, আল-জাযীরার মায়মূন ইবন মিহরান থেকে এবং শামের মাকহুল থেকে আসলো, আমরা তা গ্রহণ করলাম। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, হিশামের খিলাফাতকালে এ চারজনই ছিলেন মানুষের 'আলিম।

হাদীছ
তিনি হিজায, ইরাক, মিসর, শামসহ জ্ঞান চর্চার সকল কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তথাকার মুহাদ্দিছগণের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। স্মৃতি শক্তি এত প্রখর ছিল যে, যা কিছু শোনেন সবই বক্ষে ধারণ ও সংরক্ষণ করেন। এ কারণে তিনি তাঁর সময়ের একজন বড় হাফিজে হাদীছে পরিণত হন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে তাবি'ঈদের তৃতীয় স্তরের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ বলে উল্লেখ করেছেন।

তাঁর শিক্ষকবৃন্দ
তিনি তাঁর সময়ের প্রায় সকল বড় 'আলিমের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। এ কারণে তাঁর শিক্ষকদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কোন দেশ তা থেকে বাদ পড়েনি। সেই তাল (রা) প্রতি শ্রদ্ধাবোধ
নিজের পূর্বপুরুষ ও অন্যান্য মহান ব্যক্তিবর্গের মত হযরত আবু বকর ও 'উমারের (রা) প্রতিও ছিল তাঁর প্রগাঢ় ভক্তি ও শ্রদ্ধাবোধ। জাবির বলেন, একবার আমি মুহাম্মাদ ইবন 'আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বংশের কেউ কি আবু বকর ও 'উমারকে (রা) গালি দিতেন? বললেন, না। আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং তাঁদের মাগফিরাতের দু'আ করি। 'ঈসা ইবন দীনার আল-মুয়ায্যিনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি তাঁকেও এরূপ জবাব দেন এবং তাঁদের দু'জনকে ভালোবাসতে ও তাঁদের জন্য দু'আ করতে বলেন। সালিম ইবন আবী হাফসা বলেন, আমি ইমাম আল-বাকির ও তাঁর পুত্র জা'ফার আস- সাদিকের নিকট আবূ বকর ও 'উমারের (রা) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি, তিনি বলেন, সালিম! আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং তাঁদের দুশমনদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তাঁরা দু'জন ছিলেন পথপ্রদর্শক ইমাম। আমাদের পরিবারের সকলকে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে দেখেছি।

বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা
কিছু দল-উপদল এমন সব ভ্রান্ত 'আকীদা-বিশ্বাস ঐ সকল মহান ব্যক্তিবর্গের প্রতি আরোপ করেছে যার সাথে তাঁদের বিন্দু মাত্র সম্পৃক্ততা ছিল না। দীনী বিষয়ে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন ইসলামী আকীদা ছাড়া আর কোন রকম নতুন আকীদা তাঁরা পোষণ করতেন না। জাবির বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন 'আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের আহলি বায়তের মধ্যে কেউ কি এমন ধারণা পোষণ করতেন যে, কোন পাপ শিরক? বললেন, না। আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলাম; তাদের কেউ কি পুনর্জীবনের প্রবক্তা ছিলেন? বললেন, না।

ওফাত
তিনি হামিয়্যা নামক স্থানে ইনতিকাল করেন এবং লাশ মদীনায় এনে জান্নাতুল বাকী'তে দাফন করা হয়। মৃত্যুর সন নিয়ে মত পার্থক্য আছে। হিজরী ১১৪, ১১৫, ১১৭ ও ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে। কত বছর জীবন লাভ করেন সে সম্পর্কে দু'টি বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা মতে ৫৮ বছর এবং অন্যটি মতে ৭৩ বছর। তবে দ্বিতীয়টি যে সত্য নয় তা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ হিজরী ৫৭ সনে যে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সে ব্যাপারে সকলে একমত। সেই হিসাবে প্রথম বর্ণনাটি অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ তখন তাঁর বয়স ৫৮ থেকে ৬১ বছরের মধ্যে হয় এবং কোনভাবেই ৭৩ বছর হয় না।

সন্তানাদি
ইমাম আল-বাকির (রহ) অনেকগুলো সন্তান রেখে যান। জা'ফার ও 'আবদুল্লাহ ছিলেন হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) দৌহিত্রী উম্মু ফারওয়ার (রহ) গর্ভজাত; ইবরাহীম ছিলেন উম্মু হাকীম বিনত উসায়দের গর্ভজাত; 'আলী ও যায়নাব ছিলেন এক দাসীর গর্ভজাত এবং উম্মু সালামা আরেক দাসীর গর্ভজাত ছিলেন। তাঁদের সকলের মধ্যে জা'ফার, যিনি আস-সাদিক উপাধি প্রাপ্ত, সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং তিনি তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। ইমাম আল-বাকির সুন্দর বেশ-ভূষা পছন্দ করতেন। 'খুয' নামক এক প্রকার রেশমের মূল্যবান কাপড় ব্যবহার করতেন। সাদা ও রঙ্গীন দু'ধরনের পোশাকই ব্যবহার করতেন। পশমী বুটিদার কাপড়ও পরতেন। চুল ও দাড়িতে খিজাব লাগাতেন।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৩
২. ওয়াফইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৫০
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৭
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫০
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৭. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৭
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৯. আত-তাবাকাত-৫/২২৮; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৪
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫০; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৭৩
১১. প্রাগুক্ত
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৪
১৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
১৫. আত-তাবাকাত-৫/২৩৬
১৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৫
১৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫১; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৪
১৮. আত-তাবাকাত-৫/২৩৬
১৯. ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৫০; আত-তাবাকাত-৫/২৩৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
২০. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫১; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৫
২১. আত-তাবাকাত-৫/২৩৮
২২. প্রাগুক্ত; তাবি'ঈন-৪৫১

হযরত মাকহুলের (রহ) কুনিয়াত তথা ডাকনাম দু'টি : আবূ 'আবদিল্লাহ ও আবূ আইউব। তাঁর বংশ ও জন্মভূমি সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবন সা'দ তাঁকে কাবুলের অধিবাসী বলে উল্লেখ করেছেন। ইবন হাজার কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যার একাংশের দ্বারা জানা যায় তিনি একজন অনারব বংশোদ্ভূত এবং তাঁর পিতার নাম সোহরাব। আর ইবন হাজারের বর্ণনার কিছু অংশের দ্বারা প্রমাণিত হয়, তিনি মিসরীয় ছিলেন, আর কিছু বর্ণনা দ্বারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তিনি একজন আরব এবং হুযালী গোত্রের মানুষ।

তবে শেষের দু'টি বর্ণনা অর্থাৎ হুযালী ও মিসরীয় হওয়া অবশ্যই সঠিক নয়। কারণ তাঁর অনারব বংশোদ্ভূত হওয়া সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। তাঁর হুযালী ও মিসরীয় হওয়া এজন্য প্রসিদ্ধ যে, তিনি তাঁর জীবনের কিছু দিন হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির দাসত্বে ছিলেন এবং কিছুকাল মিসরে অবস্থান করেন।

এ ব্যাপারে ইমাম নাওবীর (রহ) বর্ণনাটি অধিক যুক্তিভিত্তিক ও সঠিক বলে প্রতিভাত হয়। তিনি তাঁকে অনারব বংশোদ্ভূত ও কাবুলের লোক বলেছেন। সুতরাং তার বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মাকহুলের (রহ) উর্ধ্বতন বংশধারা এ রকম :
মাকহুল বিন যিদ যা ইব্‌ন আবি মুসলিম শুহরাব বিন শায্‌ল বিন সান্‌দ বিন শাযদান বিন য়ুরদুক বিন ইয়াগুছ বিন কাস্‌রি কাবুলী ওয়া দামেশকী
এ বর্ণনা দ্বারা বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে যে সমন্বয়টি পাওয়া যায় তা হলো- তিনি অনারব বংশোদ্ভূত, জন্মভূমি কাবুল এবং দিমাশকে বসবাসকারী ছিলেন। আল-মিযী বলেন : দিমাশকের 'আল-আহাদ' বাজারের পাশে তাঁর বাড়ি ছিল।

তাঁর জীবনের প্রথম পর্বের ইতিহাস হলো, তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলেন। 'আমর তাঁকে হুযালী গোত্রের এক মহিলাকে দান করেন। এই দ্বিতীয়জনের দাসত্বের কারণে তাঁর সম্পর্ক আরোপের ক্ষেত্রে দু'টি বর্ণনা হয়ে গেছে। একটি হলো তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদের দাস ছিলেন, আর দ্বিতীয়টি হলো, তিনি ছিলেন হুযালী গোত্রের দাস। দু'টি বর্ণনাই সঠিক। তিনি নিজেই তাঁর দাসত্ব জীবনের সূচনা সম্পর্কে বলেছেন, "আমি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলাম। পরে তিনি আমাকে হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন।" কথাটি যুক্তিভিত্তিক এজন্য যে, 'আমরের পিতা সা'ঈদ হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে কাবুলের সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে জয় করেন। এটাই যুক্তিসিদ্ধ যে, এই অভিযানের সময় মাকহুল যুদ্ধবন্দী হিসেবে সা'ঈদের অধিকারে আসেন। আর একথার সমর্থন পাওয়া যায় খোদ মাকহুলের একটি বর্ণনাতে। তিনি বলেন, আমি এক সময় সা'ঈদের দাস ছিলাম। পরে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি তাঁর পুত্র 'আমরের অধিকারে এসে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক।

মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনযির শাক্কার বলেন: মাকহুলের মূল হলো হারাতের। তাঁর পিতার নাম আবূ মুসলিম শোহ্রাব ইবন শাযিল। দাদা শাযিল হারাতের অধিবাসী ছিলেন। তিনি কাবুলের এক রাজার মেয়ে বিয়ে করেন। স্ত্রীকে সন্তান সম্ভাবা অবস্থায় রেখে তিনি মারা যান এবং স্ত্রী পিতৃগৃহে চলে যান। সেখানে শোহরাবের জন্ম হয়। শোহরাব কাবুলে বেড়ে ওঠেন এবং সেখানে বিয়ে করেন। অতঃপর সেখানে মাকহুলের জন্ম হয়। একটু বড় হলে তিনি মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং সা'ঈদ ইবন আল- 'আসের হাতে অর্পিত হন। এভাবে তিনি দাসত্বের জালে জড়িয়ে পড়েন। সা'ঈদ ইবন আল-'আস আবার তাঁকে হুযাইল গোত্রের এক মহিলার হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেন। পরে এই মহিলা মাকহুলকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।

জ্ঞান অর্জনের জন্য ইসলামী বিশ্ব ভ্রমণ
মুসলমানরা যে দাসদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দাসত্বের নিকৃষ্ট জীবন থেকে বের করে পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দিত, মাকহুল তাঁর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন শুরু হয়েছে দাসত্বের মাধ্যমে এবং অবশেষে তিনি শামের জ্ঞানের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হন। জ্ঞান অন্বেষণে তাঁর স্বভাবগত আগ্রহ ছিল। এ কারণে দাসত্বের জীবনেই তিনি জ্ঞান অর্জনে মনোযোগী হন। পরে দাসত্ব থেকে মুক্তির পর তৎকালীন গোটা ইসলামী বিশ্বের সকল শ্রেষ্ঠ জ্ঞান কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি বলেন, যখন আমি দাসত্ব থেকে মুক্ত হই তখন মিসরের সকল জ্ঞান আত্মস্থ করে ফেলি। আর যতক্ষণ না আমার মধ্যে এ প্রত্যয় জন্মেছে যে, এখানকার সকল জ্ঞান আমি ধারণ করে ফেলেছি ততক্ষণ সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াইনি।

মিসরের জ্ঞান ভাণ্ডার শূন্য করার পর তিনি মদীনায় যান এবং সেখান থেকে যান ইরাকে। এ দু'স্থানের জ্ঞানের সকল ঝর্ণাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হওয়ার পর যান শামে। তথাকার জ্ঞানী-গুণীদের নিকট থেকে স্বীয় জ্ঞানভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করেন। মোটকথা, তিনি জ্ঞান অন্বেষণে ইসলামী দুনিয়ার প্রতিটি কোণে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি নিজেই বলেন: "ত্বাফতুল আরদ্বা কুল্লাহাফি ত্বলবিল ইল্মি" - আমি জ্ঞানের অন্বেষণে গোটা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছি।

জ্ঞান অর্জনে তাঁর প্রবল আগ্রহ ও চেষ্টা-সাধনা তাঁকে জ্ঞানের জগতের এমন শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয় যেখানে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তিই পৌঁছাতে পেরেছিলেন। ইমাম যুহরী (রহ) বলতেন; 'আলিম তো মাত্র চারজন। তাঁদের মধ্যে একজন মাকহুল। অন্য তিনজন হলেন: মদীনার সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কূফার 'আমির আশ-শা'বী এবং বসরার হাসান আল-বাসরী। ইবন ইউনুস বলেন, মাকহুল একজন ফকীহ ও 'আলিম ছিলেন। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবন 'আম্মার বলতেন, তিনি শামের অধিবাসীদের ইমাম ছিলেন। হাদীছ ও ফিক্হ উভয় শাস্ত্রে তিনি ইমাম মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।

সুলায়মান ইবন মূসা বলতেন আমাদের কাছে 'ইলম যখন হিজাযের যুহরী থেকে, 'ইরাকের হাসান আল-বাসরী থেকে, আল-জাযীরার মায়মূন ইবন মিহরান থেকে এবং শামের মাকহুল থেকে আসলো, আমরা তা গ্রহণ করলাম। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, হিশামের খিলাফাতকালে এ চারজনই ছিলেন মানুষের 'আলিম।

হাদীছ
তিনি হিজায, ইরাক, মিসর, শামসহ জ্ঞান চর্চার সকল কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তথাকার মুহাদ্দিছগণের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। স্মৃতি শক্তি এত প্রখর ছিল যে, যা কিছু শোনেন সবই বক্ষে ধারণ ও সংরক্ষণ করেন। এ কারণে তিনি তাঁর সময়ের একজন বড় হাফিজে হাদীছে পরিণত হন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে তাবি'ঈদের তৃতীয় স্তরের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ বলে উল্লেখ করেছেন।

তাঁর শিক্ষকবৃন্দ
তিনি তাঁর সময়ের প্রায় সকল বড় 'আলিমের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। এ কারণে তাঁর শিক্ষকদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কোন দেশ তা থেকে বাদ পড়েনি। সেই তালিকার মধ্যে বিশাল সংখ্যক সাহাবায়ে কিরামের নামও আছে। তাঁদের মধ্যে আনাস ইবন মালিক, আবূ হিন্দ দারী, ওয়াছিলা ইবন আসকা', আবূ উমামা, 'আবদুর রহমান ইবন গানাম, আবু জান্দাল ইবন সুহায়ল (রা) প্রমুখের নিকট থেকে সরাসরি হাদীছ শুনেছেন। আর উবাই ইবন কা'ব, ছাওবান, 'উবাদা ইবন ছাবিত, আবূ হুরায়রা, আবূ ছা'লাবা খুশানী, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) থেকে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁদের নাম বাদ দিয়ে তিনি নিজেই সরাসরি রাসূল (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

বিশিষ্ট তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, মাসরূক, জুবায়র ইবন নাদীর, কুরায়ব, আবূ মুসলিম, আবূ ইদরীস খাওলানী, 'উরওয়া ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন মুহায়রীয, 'আম্বাসা ইবন আবী সুফইয়ান, ওয়াররাদ কাতিব, মুগীরা, কুছায়িয়র মুররা, উম্মুদ দারদা' (রহ) প্রমুখ থেকে হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন।

তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডি অত্যন্ত প্রশস্ত। বিশিষ্ট কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো: ইমাম যুহরী, হুমায়দ আত-তাবীল, মুহাম্মাদ ইবন 'আজলান, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আলা', সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ মুহারিবী, মূসা ইবন ইয়াসার, ইমাম আওযা'ঈ, সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয, 'আলা' ইবন আল-হারিছ, ছাওর ইবন ইয়াযীদ, আইউব ইবন মূসা, মুহাম্মাদ ইবন রাশিদ মাকহুলী, মুহাম্মাদ ইবন ওয়ালীদ যুবায়দী, বারদ ইবন সিনান, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আওফ, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল- আনসারী, উসামা ইবন যায়দ লায়ছী, নাখীর ইবন সা'দ, সাফওয়ান ইবন 'আমর, ছাবিত ইবন ছাওবান (রহ) ও আরো অনেকে।

ফিক্হ ও ফাতওয়া
হাদীছ স্মৃতিতে ধারণের সাথে সাথে তিনি ফিক্হ শাস্ত্রের একজন ইমাম ও মুজতাহিদ ছিলেন। আবূ হাতিম বলতেন, আমি শামে মাকহুলের চেয়ে বড় কোন ফকীহ দেখিনি। সাঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে ইমাম যুহরীর চেয়েও বড় ফকীহ বলে মনে করতেন। ইফতার ক্ষেত্রে ছিল তাঁর বিশেষ দক্ষতা ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, তাঁর যুগে ইফতার ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বেশী সূক্ষ্ম দৃষ্টি আর কারো ছিল না।

সতর্কতা
তিনি ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। নিজের মতের ভিত্তিতে যদি কোন মাসয়ালার জবাব দিতেন তাহলে স্পষ্টভাবে সে কথা বলে দিতেন যে, এটা আমার মত। সঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর মনীষা ও উৎকর্ষতার বড় প্রমাণ এই যে, সেই যুগে যখন গ্রন্থ রচনার সূচনাও হয়নি তখন তিনি ফিক্হ বিষয়ে দু'টি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থ দু'টির নাম: ১. কিতাবুস সুনান, ২. কিতাবুল মাসায়িল।

আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়
জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের সাথে সাথে নৈতিক উৎকর্ষিকার মধ্যে বিশাল সংখ্যক সাহাবায়ে কিরামের নামও আছে। তাঁদের মধ্যে আনাস ইবন মালিক, আবূ হিন্দ দারী, ওয়াছিলা ইবন আসকা', আবূ উমামা, 'আবদুর রহমান ইবন গানাম, আবু জান্দাল ইবন সুহায়ল (রা) প্রমুখের নিকট থেকে সরাসরি হাদীছ শুনেছেন। আর উবাই ইবন কা'ব, ছাওবান, 'উবাদা ইবন ছাবিত, আবূ হুরায়রা, আবূ ছা'লাবা খুশানী, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) থেকে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁদের নাম বাদ দিয়ে তিনি নিজেই সরাসরি রাসূল (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

বিশিষ্ট তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, মাসরূক, জুবায়র ইবন নাদীর, কুরায়ব, আবূ মুসলিম, আবূ ইদরীস খাওলানী, 'উরওয়া ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন মুহায়রীয, 'আম্বাসা ইবন আবী সুফইয়ান, ওয়াররাদ কাতিব, মুগীরা, কুছায়িয়র মুররা, উম্মুদ দারদা' (রহ) প্রমুখ থেকে হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন।

তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডি অত্যন্ত প্রশস্ত। বিশিষ্ট কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো: ইমাম যুহরী, হুমায়দ আত-তাবীল, মুহাম্মাদ ইবন 'আজলান, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আলা', সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ মুহারিবী, মূসা ইবন ইয়াসার, ইমাম আওযা'ঈ, সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয, 'আলা' ইবন আল-হারিছ, ছাওর ইবন ইয়াযীদ, আইউব ইবন মূসা, মুহাম্মাদ ইবন রাশিদ মাকহুলী, মুহাম্মাদ ইবন ওয়ালীদ যুবায়দী, বারদ ইবন সিনান, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আওফ, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল- আনসারী, উসামা ইবন যায়দ লায়ছী, নাখীর ইবন সা'দ, সাফওয়ান ইবন 'আমর, ছাবিত ইবন ছাওবান (রহ) ও আরো অনেকে।

ফিক্হ ও ফাতওয়া
হাদীছ স্মৃতিতে ধারণের সাথে সাথে তিনি ফিক্হ শাস্ত্রের একজন ইমাম ও মুজতাহিদ ছিলেন। আবূ হাতিম বলতেন, আমি শামে মাকহুলের চেয়ে বড় কোন ফকীহ দেখিনি। সাঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে ইমাম যুহরীর চেয়েও বড় ফকীহ বলে মনে করতেন। ইফতার ক্ষেত্রে ছিল তাঁর বিশেষ দক্ষতা ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, তাঁর যুগে ইফতার ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বেশী সূক্ষ্ম দৃষ্টি আর কারো ছিল না।

সতর্কতা
তিনি ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। নিজের মতের ভিত্তিতে যদি কোন মাসয়ালার জবাব দিতেন তাহলে স্পষ্টভাবে সে কথা বলে দিতেন যে, এটা আমার মত। সঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর মনীষা ও উৎকর্ষতার বড় প্রমাণ এই যে, সেই যুগে যখন গ্রন্থ রচনার সূচনাও হয়নি তখন তিনি ফিক্হ বিষয়ে দু'টি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থ দু'টির নাম: ১. কিতাবুস সুনান, ২. কিতাবুল মাসায়িল।

আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়
জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের সাথে সাথে নৈতিক উৎকর্ষতায়ও বিভূষিত ছিলেন। আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয় ও আল্লাহর পথে জিহাদ করা- এ দু'টি গুণ তাঁর মধ্যে পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করেছিল। যা কিছু তাঁর হাতে আসতো সবই আল্লাহর পথে ব্যয় করতেন। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, মাকহুলের ভাতা নির্ধারিত ছিল। তিনি সেই অর্থ আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে ব্যয় করতেন। একবার দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার বড় অঙ্কের অর্থ তাঁর হাতে আসে। তিনি সেই অর্থও আল্লাহর পথে জিহাদে ব্যয় করেন। তিনি একজন মুজাহিদকে তাঁর একটি ঘোড়ার মূল্য হিসেবে পঞ্চাশ স্বর্ণ মুদ্রা দিতেন।

একটি সন্দেহের নিরসন
হযরত মাকহুল (রহ) সম্পর্কে একটা সাধারণ প্রসিদ্ধি ছিল যে, তিনি 'কাদরিয়া' মতবাদে বিশ্বাসী। এর সমর্থনে কিছু বর্ণনাও পাওয়া যায়। কিন্তু সঠিক বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে জানা যায়, এই ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস থেকে তিনি পরিচ্ছন্ন ছিলেন। ইমাম আওযা'ঈ (রহ) তাঁর একজন বিশিষ্ট ছাত্র বলেন, যতটুকু শোনা যায়, তাবি'ঈদের মধ্যে দুই ব্যক্তি হাসান আল-বাসরী ও মাকহুল (রহ) কাদরিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু আমি ব্যাপক অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার পর জেনেছি এই প্রসিদ্ধি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর আরেকজন ছাত্র সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীযও তাঁর এই ভ্রান্ত মতবাদের বিশ্বাস থেকে মুক্ত থাকার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু সন সম্পর্কে মতভেদ আছে। হিজরী ১১২, ১১৩ এবং ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
১. আত-তাবাকাত-তায়ও বিভূষিত ছিলেন। আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয় ও আল্লাহর পথে জিহাদ করা- এ দু'টি গুণ তাঁর মধ্যে পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করেছিল। যা কিছু তাঁর হাতে আসতো সবই আল্লাহর পথে ব্যয় করতেন। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, মাকহুলের ভাতা নির্ধারিত ছিল। তিনি সেই অর্থ আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে ব্যয় করতেন। একবার দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার বড় অঙ্কের অর্থ তাঁর হাতে আসে। তিনি সেই অর্থও আল্লাহর পথে জিহাদে ব্যয় করেন। তিনি একজন মুজাহিদকে তাঁর একটি ঘোড়ার মূল্য হিসেবে পঞ্চাশ স্বর্ণ মুদ্রা দিতেন।

একটি সন্দেহের নিরসন
হযরত মাকহুল (রহ) সম্পর্কে একটা সাধারণ প্রসিদ্ধি ছিল যে, তিনি 'কাদরিয়া' মতবাদে বিশ্বাসী। এর সমর্থনে কিছু বর্ণনাও পাওয়া যায়। কিন্তু সঠিক বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে জানা যায়, এই ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস থেকে তিনি পরিচ্ছন্ন ছিলেন। ইমাম আওযা'ঈ (রহ) তাঁর একজন বিশিষ্ট ছাত্র বলেন, যতটুকু শোনা যায়, তাবি'ঈদের মধ্যে দুই ব্যক্তি হাসান আল-বাসরী ও মাকহুল (রহ) কাদরিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু আমি ব্যাপক অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার পর জেনেছি এই প্রসিদ্ধি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর আরেকজন ছাত্র সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীযও তাঁর এই ভ্রান্ত মতবাদের বিশ্বাস থেকে মুক্ত থাকার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু সন সম্পর্কে মতভেদ আছে। হিজরী ১১২, ১১৩ এবং ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
১. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
২. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৬
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১১৩
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৬
৫. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
৬. ফুতূহ আল-বুলদান-৩২২
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৭
৮. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৮
৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
১০. আত-তাবাকাত-৭/১৬০
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৯
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১১৪
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮
১৭. প্রাগুক্ত-১/১০৭
১৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/১১৩
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯০
২০. তাহযীব আল-আসমা'-১/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৭
২১. প্রাগুক্ত
২২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২৩. প্রাগুক্ত
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
২৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৪৬
২৬. ইবন নাদীম, আল-ফিরিস্ত (মিসর সংস্করণ)-৩১৮; তাবি'ঈন-৪৮৯
২৭. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
২৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
৩০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১৮/৩৬০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদির (রহ)

📄 মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদির (রহ)


কুরায়শ বংশের বানু তায়ম শাখার সন্তান মুহাম্মাদ (রহ)। তাঁর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। পিতা আল-মুনকাদির ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন আল-হুযায়র। তাঁর অপর দু'ভাই আবূ বাকর ইবন আল-মুনকাদির ও 'উমার ইবন আল-মুনকাদির।

আল-মুনকাদির ছিলেন উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশার (রা) মামা। একদিন তিনি 'আয়িশার (রা) কাছে গিয়ে নিজের প্রয়োজনের কথা বলে কিছু অর্থ সাহায্য চাইলেন। তিনি বললেন, আমার হাতে কিছু অর্থ আসার কথা আছে, আসলে পাঠিয়ে দেব। এরপর দশ হাজার দিরহাম 'আয়িশার (রা) হাতে আসে এবং তিনি সাথে সাথে তা আল-মুনকাদিরের নিকট পাঠিয়ে দেন। মুনকাদির সেই অর্থ দিয়ে একটি দাসী কেনেন। সেই দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে তাঁর তিন ছেলে: মুহাম্মাদ, আবূ বাকর ও 'উমার।

জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় তিনি অতি উঁচু স্তরের মানুষ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে আল-ইমাম ও শায়খুল ইসলাম (ইসলামের জ্ঞান-বৃদ্ধ ব্যক্তি) বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন: "তাঁর বিশ্বস্ততা এবং 'ইলম ও 'আমলে অগ্রবর্তিতার ব্যাপারে সকলের ঐক্যমত আছে। তিনি 'আতা'র স্তরের মানুষ, তবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে দেরীতে।" ইবন হাজার আল-আসকিলানী (রহ) তাঁকে শীর্ষস্থানীয় ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন।

কিরাআত
আল-কুরআনের একজন বিশিষ্ট কারী ছিলেন। ইমাম মালিক (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন কারীদের নেতা।"

হাদীছ
হাদীছের একজন বিখ্যাত হাফিজ ছিলেন। আল-হুমায়দী বলেন: "ইবন আল-মুনকাদির একজন হাফিজ।" তিনি সাহাবা ও তাবি'ঈন কিরামের বড় একটি দলের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ আইউব আল- আনসারী, আনাস ইবন মালিক, জাবির, আবূ উমামা ইবন সাহল, রাবী'আ ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, আবু কাতাদা, সাফীনা, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', 'উরওয়া ইবন যুবায়র, মু'আয ইবন 'আবদির রহমান আত-তায়মী, সা'ঈদ ইবন 'আবদির রহমান ইয়ারবূ', আবূ বাকর ইবন সুলায়মান (রহ) প্রমুখের সূত্রে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাঁর কিছু মুরসাল হাদীছ আছে। কিন্তু হাদীছের 'আলিমগণ মনে করেন, তাঁর মুরসাল হাদীছ অন্য অনেকের মারফ্' হাদীছের চেয়েও নির্ভরযোগ্য। ইবন 'উয়ায়না বলেন: "তিনি ছিলেন সত্য ও সততার খনিসদৃশ। সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ তাঁর কাছে সমবেত হতেন।" তিনি আরো বলেন, কেউ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আর সকলে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিয়েছেন, একমাত্র তিনি ছাড়া এমন আর কাউকে আমি দেখিনি। ইবরাহীম বলতেন, তিনি মুখস্থ শক্তি, দৃঢ়তা ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাবের চূড়ান্ত পর্যায়ের মানুষ ছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন ইল্মে হাদীছে "হুজ্জাত” (দলিল-প্রমাণ) স্তরের ব্যক্তি।

ছাত্রবৃন্দ
তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন: তাঁর পুত্র ইউসুফ ও আল-মুনকাদির, ভাতিজা ইবরাহীম ও 'আবদুর রহমান এবং অন্যদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, ইমাম যুহরী, আইউব, আনাস ইবন 'উবায়দ, সালামা ইবন দীনার, জা'ফার ইবন মুহাম্মাদ সাদিক, মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি', সা'দ ইবন ইবরাহীম, সুহায়ল ইবন আবী সালিহ, ইবন জুরায়জ, 'আলী ইবন যায়দ, মূসা ইবন 'উকবা, হিশাম ইবন 'উরওয়া, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী (রহ) ও আরো অনেকে।

ফিক্হ
তিনি ফিক্হ ও ফাতওয়ায় পারদর্শী ছিলেন। মদীনার তাবি'ঈ মুফতীগণের মধ্যে তাঁকে গণ্য করা হতো।

তাকওয়া-পরহিযগারী
তাঁর মধ্যে তাকওয়া-পরহিযগারী ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য তিনি অত্যন্ত কঠিন অনুশীলন করতেন। একাধারে চল্লিশ বছর নানাভাবে নক্সের পরিশুদ্ধির কাজ করেন। তিনি নিজেই বলেন: "আমি চল্লিশ বছর যাবত আমার নফসকে কষ্ট দিয়েছি, অতঃপর সে সোজা হয়।" ইমাম মালিক বলতেন, তিনি উঁচু স্তরের 'আবিদ ও যাহিদ (দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ত) মানুষ ছিলেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী বলেন, তাঁর বাড়ীটি ছিল সত্যনিষ্ঠ ও 'আবিদ (সাধক) ব্যক্তিদের ঠিকানা।

খাওফে খোদা বা আল্লাহর ভয় তাঁর অন্তরের গভীরে শিকড় গেঁড়েছিল। কুরআনের বিশেষ বিশেষ আয়াত যখন তিলাওয়াত করতেন তখন তাঁর চোখ থেকে অশ্রু ধারা জারি হয়ে যেত। এক রাতে তাহাজ্জুদ নামাযে ব্যাকুল হয়ে কাঁদলেন। সকালে ভাইয়েরা তাঁর এমন কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন: এ আয়াতটি পাঠের পর আমার এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়: "এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট হতে এমন কিছু প্রকাশিত হবে যা তারা কল্পনাও করেনি।" (আয-যুমার : ৪৭)

তাঁর মরণ সময় ঘনিয়ে এলে তিনি ভীষণ ভীত-শংকিত হয়ে পড়েন। বলেন, 'আমি এ আয়াতকে ভয় পাচ্ছি। আমি ভয় পাচ্ছি, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার সামনে এমন কিছু প্রকাশ হয়ে পড়বে যার কল্পনাও আমি কখনো করিনি। হাদীছের ব্যাপারেও তাঁর অবস্থা এমন ছিল। ইমাম মালিক বলেন: যখন কেউ তাঁর কাছে কোন হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো তখন তিনি কেঁদে ফেলতেন।

হজ্জ আদায়ের ব্যাপারে দারুণ উৎসাহী ও আবেগপ্রবণ ছিলেন। ঋণগ্রস্ত হয়েও হজ্জ করতেন। একবার কেউ একজন প্রতিবাদের সুরে বলে, আপনি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় হজ্জ আদায় করেন কেন? বললেন, হজ্জই ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে বড় উপায় ও সহায়ক। হজ্জে একাকী যেতেন না। স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে সকলকে নিয়ে যেতেন। বলতেন, তাদেরকে আল্লাহর সামনে উপস্থাপনের জন্য নিয়ে যাই। তাকে দেখলে অন্যের নক্সও পরিশুদ্ধ হতো। ইমাম মালিক বলেন, আমি যখন আমার অন্তরে কাঠিণ্য অনুভব করতাম তখন গিয়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদিরকে দেখতাম। এর প্রভাব এই হতো যে, কয়েকদিন পর্যন্ত নক্স আমার নিকট খুব অপ্রিয় থাকতো।

জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আপনার নিকট সবচেয়ে ভালো কাজ কি? বললেন, মুসলমানদেরকে সন্তুষ্ট করা। আবার জিজ্ঞেস করে, সবচেয়ে প্রিয় জগত কোনটি? বললেন : বন্ধুদের সাথে আদান-প্রদান করা।

আল-ওয়াকিদী বলেন : তিনি হিজরী ১৩০ সনে ইনতিকাল করেন। একথা মুহাম্মাদ ইবন সা'দও বলেছেন। তবে হারুন ইবন মুহাম্মাদ আল-ফারবীর সূত্রে ইমাম আল-বুখারী হিজরী ১৩১ সনের কথা বলেছেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না বলেন, তিনি সত্তর (৭০) বছরের উপরে জীবন লাভ করেন। শেষ জীবনে মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাই মেহেদীর খিজাব লাগতেন।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/১২৭
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩
৭. তাবি'ঈন-৪৬৩
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৫
১০. প্রাগুক্ত-৯/৪৭৪; তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৪-২৬৫
১১. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি'ঈন-১/২৬
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৩. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৮
১৭. তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৬

কুরায়শ বংশের বানু তায়ম শাখার সন্তান মুহাম্মাদ (রহ)। তাঁর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। পিতা আল-মুনকাদির ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন আল-হুযায়র। তাঁর অপর দু'ভাই আবূ বাকর ইবন আল-মুনকাদির ও 'উমার ইবন আল-মুনকাদির।

আল-মুনকাদির ছিলেন উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশার (রা) মামা। একদিন তিনি 'আয়িশার (রা) কাছে গিয়ে নিজের প্রয়োজনের কথা বলে কিছু অর্থ সাহায্য চাইলেন। তিনি বললেন, আমার হাতে কিছু অর্থ আসার কথা আছে, আসলে পাঠিয়ে দেব। এরপর দশ হাজার দিরহাম 'আয়িশার (রা) হাতে আসে এবং তিনি সাথে সাথে তা আল-মুনকাদিরের নিকট পাঠিয়ে দেন। মুনকাদির সেই অর্থ দিয়ে একটি দাসী কেনেন। সেই দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে তাঁর তিন ছেলে: মুহাম্মাদ, আবূ বাকর ও 'উমার।

জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় তিনি অতি উঁচু স্তরের মানুষ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে আল-ইমাম ও শায়খুল ইসলাম (ইসলামের জ্ঞান-বৃদ্ধ ব্যক্তি) বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন: "মুজমাউন আলা ছিক্বাতিহি ওয়া তাক্বাদ্দুমিহি ফিল ইলমি ওয়াল আমালি ওয়া হুয়া মিন ত্ববাক্বাতি আত্বাইন লা-কিননাহু তা-আখখারা মাওতুহু. - তাঁর বিশ্বস্ততা এবং 'ইল্ম ও 'আমলে অগ্রবর্তিতার ব্যাপারে সকলের ঐক্যমত আছে। তিনি 'আতা'র স্তরের মানুষ, তবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে দেরীতে।" ইবন হাজার আল-আসকিলানী (রহ) তাঁকে শীর্ষস্থানীয় ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন।

কিরাআত
আল-কুরআনের একজন বিশিষ্ট কারী ছিলেন। ইমাম মালিক (রহ) বলেন: ক্যানা সাইয়্যিদুল কুররা - তিনি ছিলেন কারীদের নেতা।

হাদীছ
হাদীছের একজন বিখ্যাত হাফিজ ছিলেন। আল-হুমায়দী বলেন: ইবনুল মুনকাদিন হাফিজান - ইবন আল-মুনকাদির একজন হাফিজ। তিনি সাহাবা ও তাবি'ঈন কিরামের বড় একটি দলের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ আইউব আল- আনসারী, আনাস ইবন মালিক, জাবির, আবূ উমামা ইবন সাহল, রাবী'আ ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, আবু কাতাদা, সাফীনা, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', 'উরওয়া ইবন যুবায়র, মু'আয ইবন 'আবদির রহমান আত-তায়মী, সা'ঈদ ইবন 'আবদির রহমান ইয়ারবূ', আবূ বাকর ইবন সুলায়মান (রহ) প্রমুখের সূত্রে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাঁর কিছু মুরসাল হাদীছ আছে। কিন্তু হাদীছের 'আলিমগণ মনে করেন, তাঁর মুরসাল হাদীছ অন্য অনেকের মারফ্' হাদীছের চেয়েও নির্ভরযোগ্য। ইবন 'উয়ায়না বলেন: "তিনি ছিলেন সত্য ও সততার খনিসদৃশ। সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ তাঁর কাছে সমবেত হতেন।” তিনি আরো বলেন, কেউ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন বলেছেন, আর সকলে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিয়েছেন, একমাত্র তিনি ছাড়া এমন আর কাউকে আমি দেখিনি। ইবরাহীম বলতেন, তিনি মুখস্থ শক্তি, দৃঢ়তা ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাবের চূড়ান্ত পর্যায়ের মানুষ ছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন ইল্মে হাদীছে "হুজ্জাত” (দলিল-প্রমাণ) স্তরের ব্যক্তি।

ছাত্রবৃন্দ
তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন: তাঁর পুত্র ইউসুফ ও আল-মুনকাদির, ভাতিজা ইবরাহীম ও 'আবদুর রহমান এবং অন্যদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, ইমাম যুহরী, আইউব, আনাস ইবন 'উবায়দ, সালামা ইবন দীনার, জা'ফার ইবন মুহাম্মাদ সাদিক, মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি', সা'দ ইবন ইবরাহীম, সুহায়ল ইবন আবী সালিহ, ইবন জুরায়জ, 'আলী ইবন যায়দ, মূসা ইবন 'উকবা, হিশাম ইবন 'উরওয়া, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী (রহ) ও আরো অনেকে।

ফিক্হ
তিনি ফিক্হ ও ফাতওয়ায় পারদর্শী ছিলেন। মদীনার তাবি'ঈ মুফতীগণের মধ্যে তাঁকে গণ্য করা হতো।

তাকওয়া-পরহিযগারী
তাঁর মধ্যে তাকওয়া-পরহিযগারী ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য তিনি অত্যন্ত কঠিন অনুশীলন করতেন। একাধারে চল্লিশ বছর নানাভাবে নক্সের পরিশুদ্ধির কাজ করেন। তিনি নিজেই বলেন: আর্বাইনা সানাতান কা-বাদতু নাফসী হাত্তা ইসতাক্ব-মাত - "আমি চল্লিশ বছর যাবত আমার নক্সকে কষ্ট দিয়েছি, অতঃপর সে সোজা হয়।" ইমাম মালিক বলতেন, তিনি উঁচু স্তরের 'আবিদ ও যাহিদ (দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ত) মানুষ ছিলেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী বলেন, তাঁর বাড়ীটি ছিল সত্যনিষ্ঠ ও 'আবিদ (সাধক) ব্যক্তিদের ঠিকানা।

খাওফে খোদা বা আল্লাহর ভয় তাঁর অন্তরের গভীরে শিকড় গেঁড়েছিল। কুরআনের বিশেষ বিশেষ আয়াত যখন তিলাওয়াত করতেন তখন তাঁর চোখ থেকে অশ্রু ধারা জারি হয়ে যেত। এক রাতে তাহাজ্জুদ নামাযে ব্যাকুল হয়ে কাঁদলেন। সকালে ভাইয়েরা তাঁর এমন কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন: এ আয়াতটি পাঠের পর আমার এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়: "এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট হতে এমন কিছু প্রকাশিত হবে যা তারা কল্পনাও করেনি। (যুমার: ৪৭)" তাঁর মরণ সময় ঘনিয়ে এলে তিনি ভীষণ ভীত-শংকিত হয়ে পড়েন। বলেন, 'আমি এ আয়াতকে ভয় পাচ্ছি। আমি ভয় পাচ্ছি, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার সামনে এমন কিছু প্রকাশ হয়ে পড়বে যার কল্পনাও আমি কখনো করিনি। হাদীছের ব্যাপারেও তাঁর অবস্থা এমন ছিল। ইমাম মালিক বলেন: যখন কেউ তাঁর কাছে কোন হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো তখন তিনি কেঁদে ফেলতেন।

হজ্জ আদায়ের ব্যাপারে দারুণ উৎসাহী ও আবেগপ্রবণ ছিলেন। ঋণগ্রস্ত হয়েও হজ্জ করতেন। একবার কেউ একজন প্রতিবাদের সুরে বলে, আপনি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় হজ্জ আদায় করেন কেন? বললেন, হজ্জই ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে বড় উপায় ও সহায়ক। হজ্জে একাকী যেতেন না। স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে সকলকে নিয়ে যেতেন। বলতেন, তাদেরকে আল্লাহর সামনে উপস্থাপনের জন্য নিয়ে যাই। তাকে দেখলে অন্যের নক্সও পরিশুদ্ধ হতো। ইমাম মালিক বলেন, আমি যখন আমার অন্তরে কাঠিণ্য অনুভব করতাম তখন গিয়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদিরকে দেখতাম। এর প্রভাব এই হতো যে, কয়েকদিন পর্যন্ত নক্স আমার নিকট খুব অপ্রিয় থাকতো।

জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আপনার নিকট সবচেয়ে ভালো কাজ কি? বললেন, মুসলমানদেরকে সন্তুষ্ট করা। আবার জিজ্ঞেস করে, সবচেয়ে প্রিয় জগত কোনটি? বললেন : বন্ধুদের সাথে আদান-প্রদান করা।

আল-ওয়াকিদী বলেন : তিনি হিজরী ১৩০ সনে ইনতিকাল করেন। একথা মুহাম্মাদ ইবন সা'দও বলেছেন। তবে হারুন ইবন মুহাম্মাদ আল-ফারবীর সূত্রে ইমাম আল-বুখারী হিজরী ১৩১ সনের কথা বলেছেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না বলেন, তিনি সত্তর (৭০) বছরের উপরে জীবন লাভ করেন। শেষ জীবনে মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাই মেহেদীর খিজাব লাগতেন।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/১২৭
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩
৭. তাবি'ঈন-৪৬৩
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৫
১০. প্রাগুক্ত-৯/৪৭৪; তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৪-২৬৫
১১. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি'ঈন-১/২৬
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৩. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৮
১৭. তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৬

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মুসলিম ইবন ইয়াসার (রহ)

📄 মুসলিম ইবন ইয়াসার (রহ)


ইসলাম সাম্য ও সমতার ধর্ম। এতে উঁচু-নীচু, দাস-মনিবের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। এখানে সম্মান ও আভিজাত্যের মাপকাঠি হলো তাকওয়া ও 'আমল। এর নজীর ইসলামের ইতিহাসে সর্বত্র পাওয়া যায়। তেমনই একটি দৃষ্টান্ত মুসলিম ইবন ইয়াসার। তাঁর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। তিনি প্রখ্যাত সাহাবী হযরত তালহা ইবন 'উবায়দিল্লাহ, মতান্তরে 'উছমান ইবন 'আফফানের (রা) দাস ছিলেন।

জ্ঞান ও মনীষা
হযরত তালহা (রা) ছিলেন "আশারা মুবাশারা" অর্থাৎ জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন মানুষের একজন। তাঁর ব্যক্তি সত্তাটি ছিল 'ইল্ম ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের দুই সাগরের সঙ্গম স্থলের মত। তাঁর দাসত্বের কল্যাণে এবং রাসূলুল্লাহর (সা) শহর মদীনায় অবস্থানের সুযোগে মুসলিমও 'ইল্ম ও 'আমলের ঐশ্বর্যের অধিকারী হন। ইবন সা'দ বলেন: "মুসলিম ছিলেন বিশ্বস্ত, জ্ঞানী, তাপস ও আল্লাহভীরু।" ইবন আওন বলেন, সেই সময়ে মুসলিমের উপরে কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হতো না।

হাদীছ
মদীনায় অবস্থানের কারণে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস ও 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) মত উম্মাতের শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং আবুল আশ'আছ সান'আনী, হামরান ইবন আবান (রহ) প্রমুখের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। আর ছাবিত আল-বানানী, ইয়া'লা ইবন হাকীম, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, আইউব সাখতিয়ানী, আবূ নাদরা ইবন কাতাদা, সালিহ, আবুল খায়ল, মুহাম্মাদ ইবন আল- ওয়াসি', 'আমর ইবন দীনার, আবান ইবন আবী' 'আয়্যাম (রহ) প্রমুখ মুহাদ্দিছগণ তাঁর সুযোগ্য ছাত্র ছিলেন।

ফিক্হ শাস্ত্রেও তিনি অতি উঁচু স্থানের অধিকারী ছিলেন। খলীফা ইবন খায়্যাত বলেন: তিনি বসরার সেই পাঁচজন ফকীর মধ্যে গণ্য ছিলেন যাঁদেরকে তাঁদের যুগের ফকীহ বলে মানা হতো।

নৈতিক গুণাবলী
'ইলমের তুলনায় তাঁর 'আমল ছিল বেশী। ইবন সা'দ তো তাঁকে একজন 'আবিদ ও আল্লাহ ভীরু বলেছেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি বসরার ইবাদতকারী মহান ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। তিনি মনে করতেন, আল্লাহর প্রতি ঈমানের জন্য অপরিহার্য হলো তাঁর অপছন্দের সকল কথা-কাজ পরিহার করা। তিনি বলতেন, আমার বুঝে আসে না যে, বান্দা যদি আল্লাহর অপছন্দের সবকিছু ছেড়ে না দেয় তাহলে তার ঈমান কোন কাজে আসবে?

নামাযে আগ্রহ ও একাগ্রতা
তাঁর নামাযে এক বিশেষ অবস্থা ও তন্ময়ভাবের সৃষ্টি হতো। তিনি যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন এমন মনে হতো যে, তাঁর ওপর আলোকধারা নামছে। ইবন 'আওন বলেন, যখন তিনি নামাযের মধ্যে থাকতেন তখন তাঁকে প্রাণহীন কাঠের মত মনে হতো, শরীর ও কাপড়-চোপড় একটুও নড়াচড়া করতো না। নামাযরত অবস্থায় যত মারাত্মক ও ভয় পাইয়ে দেওয়ার মত অবস্থার সৃষ্টি হোক না কেন সে ব্যাপারে তাঁর কোন প্রতিক্রিয়াই থাকতো না। একবার তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন সময় পাশেই আগুন লাগে এবং অল্পক্ষণ পরে নিভেও যায়; কিন্তু তিনি মোটেও টের পাননি।

অসুস্থতার কারণে মানুষ যখন একেবারেই অপারগ হয়ে যায় সে সময় ছাড়া আর কোন অবস্থায় বসে নামায আদায় করা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার জনৈক ব্যক্তি নৌকায় বসে বসে নামায আদায়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। তিনি বলেন, এ আমার মোটেই পছন্দ নয় যে, কোন রোগ ছাড়া আল্লাহ আমাকে বসা অবস্থায় নামাযে দেখুক। নামাযের দিকে আহ্বানের এত গুরুত্ব দিতেন যে, যদি বহু দূর থেকেও আযানের ধ্বনি কানে ভেসে আসতো, সেই মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করতেন। একবার তিনি কোন এক মসজিদ থেকে ফিরছেন। কিছু দূর যাওয়ার পর আযানের ধ্বনি কানে ভেসে এলো। তিনি আবার সেই মসজিদে ফিরে গেলেন। মুয়াযযিন জিজ্ঞেস করলো, আপনি আবার ফিরে এলেন কেন? বললেন: তুমিই তো ফিরিয়ে আনলে। মসজিদের খিদমত ছিল তাঁর বিশেষ কাজ। মসজিদে তিনি বাতি জ্বালাতেন। এ কারণে লোকেরা তাঁকে আল-মুসব্বিহ (বাতি প্রজ্জ্বলনকারী মুসলিম) বলতো।

সুন্নাহর অনুসরণ
সুন্নাহর অনুসরণের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। অতি মামুলি ধরনের সুন্নাতও ছুটে যেতে পারতো না। শুধু একটি সুন্নাতের অনুসরণ হবে এ চিন্তায় জুতাপরা অবস্থায় নামায আদায় করতেন। তিনি বলতেন, জুতা খোলা আমার জন্য খুবই সহজ কাজ, কিন্তু শুধুমাত্র সুন্নাতের অনুসরণ হবে এ চিন্তায় জুতো পরা অবস্থায় নামায আদায় করি। হযরত রাসূলে কারীম (সা) খোরমা দিয়ে ইফতার করতেন। এ কারণে খোরমা দিয়েই তাঁর ইফতার হতো।

কুরআনের প্রতি সম্মান
আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের প্রতি এত বেশী সম্মান প্রদর্শন করতেন যে, যে হাত দিয়ে কুরআন ধরতেন সে হাত দিয়ে নাজাসাতের স্থান স্পর্শ করতেন না। বলতেন, আমি ডান হাত দিয়ে যৌনাঙ্গ স্পর্শ করা খারাপ কাজ মনে করি। কারণ, ঐ৭/১৬১
২. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৬
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১১৩
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৬
৫. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
৬. ফুতূহ আল-বুলদান-৩২২
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৭
৮. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৮
৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
১০. আত-তাবাকাত-৭/১৬০
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৯
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১১৪
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮
১৭. প্রাগুক্ত-১/১০৭
১৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/১১৩
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯০
২০. তাহযীব আল-আসমা'-১/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৭
২১. প্রাগুক্ত
২২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২৩. প্রাগুক্ত
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
২৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৪৬
২৬. ইবন নাদীম, আল-ফিরিস্ত (মিসর সংস্করণ)-৩১৮; তাবি'ঈন-৪৮৯
২৭. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
২৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
৩০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১৮/৩৬০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০

ইসলাম সাম্য ও সমতার ধর্ম। এতে উঁচু-নীচু, দাস-মনিবের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। এখানে সম্মান ও আভিজাত্যের মাপকাঠি হলো তাকওয়া ও 'আমল। এর নজীর ইসলামের ইতিহাসে সর্বত্র পাওয়া যায়। তেমনই একটি দৃষ্টান্ত মুসলিম ইবন ইয়াসার। তাঁর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। তিনি প্রখ্যাত সাহাবী হযরত তালহা ইবন 'উবায়দিল্লাহ, মতান্তরে 'উছমান ইবন 'আফফানের (রা) দাস ছিলেন।

জ্ঞান ও মনীষা
হযরত তালহা (রা) ছিলেন "আশারা মুবাশারা" অর্থাৎ জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন মানুষের একজন। তাঁর ব্যক্তি সত্তাটি হাত দিয়ে আমি কুরআন ধরি। রিয়া তথা প্রদর্শনীমূলক মনোভাবকে তিনি মূর্খতা ও শয়তানের মন্ত্র বলে মনে করতেন। বলতেন, তোমরা আত্মপ্রদর্শনী থেকে দূরে থাক। কারণ, তা একজন 'আলিমকে মূর্খের পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং তার মাধ্যমেই শয়তান ভুল পথে চালিত করে।

তিনি অত্যন্ত ধীর-স্থির ও সহনশীল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। রাগের সময়ও মুখ থেকে অসমীচীন কথা উচ্চারিত হতো না। কখনো কাউকে গালি দেননি। সর্বাধিক উত্তেজিত অবস্থায় তাঁর মুখ থেকে যে কথাটি উচ্চারিত হতো তা হলো: "এখন আমার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে নাও।” একথা উচ্চারিত হলে মানুষ বুঝে যেত তিনি তাঁর রাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গেছেন।

এত ধীর-স্থির ও ধৈর্য-সহনশীল হওয়ার কারণে সকল হৈ-হাঙ্গামা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে তিনি দারুণ অপছন্দ করতেন। সে সময় মুহাম্মাদ ইবন আল-আশ'আছের নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তাতে অনেক উঁচু স্তরের তাবি'ঈ জড়িয়ে পড়েন। অন্যদের মত মুসলিমও তাতে অংশ গ্রহণ করেন। তবে তিনি কারো উপর তরবারি উঠাননি। শুধু এই অংশ গ্রহণের জন্য পরবর্তীতে অনুশোচনায় জর্জরিত হন। আবু কিলাবা বলেন, একবার মক্কার সফরে আমি ও মুসলিম এক সাথে ছিলাম। তখন একদিন তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-আশ'আছের বিদ্রোহের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন : আলহামদু লিল্লাহ, আমি এই বিশৃঙ্খলায় না একটি তীর ছুড়েছি, না তরবারি চালিয়েছি, আর না একটি বর্শা নিক্ষেপ করেছি। আমি বললাম, কিন্তু আপনি বলুন তো, ঐ সকল লোকদের পরিণতি কি হবে যারা আপনাকে সারিতে দাঁড়ানো দেখে বলেছিল, মুসলিম ইবন ইয়াসার এই যুদ্ধে আছেন এবং তিনি কোন অন্যায় কাজে যুক্ত হতে পারেন না এবং এই বিশ্বাসে তারা যুদ্ধ করে মারা গেছে? আমার একথা শুনে তিনি ব্যাকুলভাবে কাঁদতে থাকেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে আমি লজ্জিত হলাম, তাঁকে এমন কথা বলার জন্য।

ওফাত
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) খিলাফতকালে হিজরী ১০০ অথবা ১০১ সনে তিনি ইনতিকাল করেন।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৮/৯৫; তাবি'ঈন-৪৭৮
২. আত-তাবাকাত-৭/১৩৭; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪০
৪. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৪
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৯৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪১
৭. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
৮. প্রাগুক্ত-৭/১৩৫
৯. প্রাগুক্ত-৭/১৩৬
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১৪০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫
১১. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
১২. প্রাগুক্ত
১৩. প্রাগুক্ত-৭/১৩৭
১৪. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৯৫

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মিস‘আর ইবন কিদাম (রহ)

📄 মিস‘আর ইবন কিদাম (রহ)


হযরত মিস'আরের (রহ) ডাকনাম আবূ সালামা। পিতা কিদাম ইবন জুহাইর। কুরায়শ গোত্রের আল-'আমিরী শাখার সন্তান এবং কৃষ্ণার অধিবাসী।

জ্ঞান ও মনীষা
তিনি জ্ঞান ও ধর্মচর্চা উভয় দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে ছিলেন। ইয়া'লা বলেন: "মিস'আর জ্ঞান ও ধার্মিকতার সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন।" ইরাকে তাঁর সমকক্ষ 'আলিম খুব কমই ছিলেন। হিশাম ইবন 'উরওয়া (রহ) বলেন, মিস'আর ও আইউবের চেয়ে উত্তম কেউ আমাদের এখানে আসেনি। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত।

হাদীছ
তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে একজন হাফিজ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম বলেছেন। মুহাম্মাদ ইবন বিশর বলেন : মিস'আরের নিকট প্রায় এক হাজার হাদীছ ছিল। আমি দশটি ছাড়া সবই লিখেছি। তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ নাখা'ঈ, আবু ইসহাক আস-সুবায়'ঈ, সা'ঈদ ইবন ইবরাহীম, ছাবিত ইবন 'উবায়দুল্লাহ আল-আনসারী, 'আবদুল মালিক ইবন নুমাইর, হিলাল ইবন জানাব, হাবীব ইবন আবী ছাবিত, 'আলকামা ইবন মারছাদ, কাতাদা, মা'আন ইবন 'আবদির রহমান, মিকদাম ইবন শুরায়হ, আল- আ'মাশ, 'আদী ইবন ছাবিত, আল-হাকাম ইবন 'উতায়বা (রহ) সহ বিশাল সংখ্যক মুহাদ্দিছের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।

তাঁর বর্ণিত হাদীছের মান
তাঁর বর্ণনাসমূহের বিশুদ্ধতার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, হযরত শু'বার মত বিখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ বলেন: "তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মপ্রত্যয়ের কারণে আমরা মিস'আরকে মাসহাফ বলতাম।" তাঁর ব্যক্তি সত্তা ছিল হাদীছ যাচাই-বাছাইয়ের মাপকাঠি। এ কারণে তাঁর উপাধি হয়ে যায় "মীযান" বা পাল্লা। আল-খুরায়বী বলেন: "খুব কম মুহাদ্দিছ এমন পাওয়া যাবে যাঁদের বর্ণনাসমূহ কোন না কোনভাবে সমালোচিত হয়নি। তবে মিস'আর এর ব্যতিক্রম।" হাদীছের ইমামগণ সন্দেহ ও মত পার্থক্যের স্থানে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন। সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলেন, যখন হাদীছের কোন বিষয়ে আমাদের মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন আমরা মিস'আরকে জিজ্ঞেস করতাম। ইবরাহীম ইবন সা'দ বলতেন, যখন কারো ব্যাপারে সুফইয়ান ও শু'বার মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন তাঁরা মীযান মিস'আরের নিকট যেতেন।

হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর এত জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনায় খুব বেশী সাবধানতা অবলম্বন করতেন। তিনি এ দায়িত্ব পালনে এত ভয় পেতেন যেন তাঁর মাথার উপর কাঁচের বোঝা রয়েছে। একটু অসতর্ক হলেই তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে। ইবন 'উয়ায়না বলেন, আমি মিস'আরকে একথা বলতে শুনেছি: "আমি চেয়েছি, হাদীছ যদি আমার উপর কাঁচের বোঝার মত হতো, যা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যায়।" অর্থাৎ কারো মাথায় কাঁচের বোঝা থাকলে সে যেমন তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকে, তাই সব সময় সাবধানতা অবলম্বন করে। তেমনি তিনি হাদীছকে কাঁচ মনে করেছেন এবং সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। তাঁর এমন মাত্রাতিরিক্ত সাবধানতা সন্দেহের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আবূ নু'আইম বলেন, মিস'আর তাঁর হাদীছসমূহের ব্যাপারে বড় সন্দেহপরায়ণ ছিলেন। তবে তিনি কোন ভুল করতেন না। আল-আ'মাশ বলতেন, মিস'আরের শয়তান তাঁকে দুর্বল করে তাঁর মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে থাকে।

তাঁর এই সন্দেহ তাঁর হাদীছসমূহের মান এত বাড়িয়ে দেয় যে, হাদীছ বিশারদগণ তাঁর সন্দেহকে দৃঢ় প্রত্যয়ের মর্যাদা দিতেন। লোকেরা আ'মাশকে বললো, মিস'আর তো তাঁর নিজের বর্ণিত হাদীছসমূহে সন্দেহ পোষণ করেন। তিনি তাদেরকে বলেন : শিনাক্কুহু কাইয়্যাক্বিন - “তার সন্দেহ অন্যদের দৃঢ় প্রত্যয়ের মত।" এমন কথা ইমাম আল-ওয়াকী'ও বলেছেন। তবে ইয়াহইয়া আল-কাত্তান বলেন : "আমি মিস'আরের চেয়ে বেশী বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল আর কাউকে দেখিনি।”

ফিক্‌হ
ফিক্হ শাস্ত্রে তিনি যদিও কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না, তবুও কুফার মুফতীগণের মধ্যে গণ্য ছিলেন।

দারসের আসর
মসজিদে তাঁর দারসের আসর ছিল। সালাত আদায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী মসজিদে বসে যেতেন এবং হাদীছ শুনতে আগ্রহী লোকেরা বৃত্তাকারে তাঁর চার পাশে বসে যেতেন। তাঁর সূত্রে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, মুহাম্মাদ ইবন বিশর, ইয়াহইয়া ইবন আদম, আবু নু'আইম, খাল্লাদ ইবন ইয়াহইয়া, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক, ইয়াযীদ ইবন হারুন, শু'বা আল-হাজ্জাজ, মালিক ইবন মিগওয়াল, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, মুহাম্মাদ ইবন বিশর (রহ) ও আরো অনেকে।

'ইবাদত-বন্দেগী
তাঁর মা ছিলেন একজন উঁচুস্তরের 'আবিদা। তাঁর পুণ্যময় তত্ত্বাবধানের গভীর প্রভাব পড়ে ছেলের উপর। মা সব সময় মসজিদে সালাত আদায় করতেন। মা ও ছেলে দু'জন অধিকাংশ সময় এক সাথে মসজিদে যেতেন। একটা পশমী চাদর মিস'আর হাতে করে নিতেন এবং মসজিদে পৌঁছে সেটা মা'র বসার জন্য বিছিয়ে দিতেন। তার ওপর দাঁড়িয়ে মা সালাত আদায় করতেন। আর মিস'আর সামনের সারিতে চলে যেতেন এবং সালাত শেষ করে একটি স্থানে বসে যেতেন। তাঁকে ঘিরে হাদীছের জ্ঞান অর্জনে উৎসাহী ছাত্ররা বসে যেত। তিনি তাঁদেরকে হাদীছ শোনাতেন। এর মধ্যে তাঁর মা 'ইবাদত ও যিক্স- আযকার শেষ করতেন। আর মিস'আর তাঁর দারস (পাঠদান) শেষ করে মা'র কাছে এসে তাঁর চাদরটি উঠিয়ে মাকে সংগে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। তাঁর মাত্র দু'টি ঠিকানাই ছিল; ঘর অথবা মসজিদ। অতিরিক্ত 'ইবাদতের কারণে কপালে দাগ হয়ে গিয়েছিল। খালিদ ইবন 'আমর বলেন: "আমি মিস'আরকে দেখেছি, অতিরিক্ত সিজদার কারণে তাঁর কপাল ছাগলের হাঁটুর মত হয়ে গেছে।"

প্রতিদিন অর্ধেক কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁর ছেলে মুহাম্মাদ বলেন: "আমার আব্বা অর্ধেক কুরআন পাঠ না করে ঘুমোতেন না।" তিনি কোন একটি স্তরে পৌঁছে থেমে যেতেন না। তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার ধাপ সর্বদাই উন্নত থেকে উন্নততর হতে থাকতো। মা'আন বলেন: "আমি মিস'আরকে প্রতি দিনই শুভ ও কল্যাণে কেবল উন্নতিই করতে দেখেছি।" তিনি 'ইবাদত-বন্দেগী, আধ্যাত্মিক সাধনা ও নৈতিক গুণাবলীতে এমন উচ্চতর পর্যায়ে পৌছে যান যে, তাঁর জান্নাতী হওয়ার ব্যাপারে মানুষের কোন সন্দেহ ছিল না। যেমন আল- হাসান ইবন 'আম্মারা বলেন: "যদি মিস'আরের মত মানুষ জান্নাতে না যান তাহলে তো জান্নাতবাসীদের সংখ্যা অতি অল্পই হবে।"

প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক (রহ) অথবা তাঁর মত অন্য কেউ হযরত মিস'আরের (রহ) আদত-অভ্যাস ও নৈতিক গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে একটি কবিতায় তা তুলে ধরেন। তার দু'টি চরণ নিম্নরূপ:
"কেউ যদি সৎ সঙ্গী সন্ধান করে, সে যেন মিস'আর ইবন কিদামের আসরে আসে। সেখানে আছে প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য এবং এর সদস্যরা হলো পূতঃপবিত্র এবং জাতির উঁচু স্তরের মানুষ।"

পার্থিব ধন-ঐশ্বর্যের প্রতি উদাসীনতা
দুনিয়া ও এর শান-শওকতের প্রতি একেবারেই উদাসীন ও বেপরোয়া ছিলেন। রাষ্ট্রীয় কোন পদের প্রতি কখনো চোখ তুলে তাকাননি। একবার তারা প্রতাপশালী 'আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল-মানসূর তাঁকে কোন একটি অঞ্চলের ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান। তিনি বলেন, আমার পরিবারের লোকেরা তো আমাকে দুই দিরহামের বাজার করারও যোগ্য মনে করে না। তারা বলে, আমরা তোমার দুই দিরহামের কিছু ক্রয় করাও পছন্দ করিনে। আর আপনি আমাকে ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান? আল্লাহ আপনাকে ঠিক কাজ করার শক্তি দিন। আপনার সংগে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, তাই আমি কিছু বলতে পারছি। খলীফা আবূ জা'ফার তাঁর এই আপত্তি মেনে নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

তিনি অত্যন্ত প্রফুল্ল স্বভাবের মানুষ ছিলেন। অন্যের আবেগ-আগ্রহের প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখাতেন। কেউ যখন তাঁকে একটি হাদীছ শোনাতো যা তাঁর আগেই জানা থাকতো তখন কেবল সেই লোকটির সন্তুষ্টি ও হাদীছের মর্যাদার খাতিরে চুপ করে শুনে যেতেন, যেন হাদীছটি তিনি পূর্বে কখনো শোনেননি।

ওফাত
তিনি হিজরী ১৫৫ মতান্তরে ১৫৩ সনে কৃষ্ণায় ইনতিকাল করেন। মুস'আব ইবন আল-মিকদাম বলেন: আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) স্বপ্নে দেখলাম। সুফইয়ান রাসূলের (সা) একটি হাত ধরে আছেন এবং এ অবস্থায় দু'জন কা'বা তাওয়াফ করছেন। সুফইয়ান রাসূলকে (সা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! মিস'আর কি মৃত্যু বরণ করেছেন? বললেন: হাঁ, তাঁর মৃত্যুতে আসমানবাসীরা সুসংবাদ লাভ করেছে।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৪. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৯. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
১০. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
১২. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
১৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
১৪. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি 'ঈন-১/২৮
১৫. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
১৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫২
১৭. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩-২৫৪
১৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
十九. প্রাগুক্ত-১/১৮৯; তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৯
二十一. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
二十二. প্রাগুক্ত-১/১৮৯-১৯০
二十三. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪; প্রাগুক্ত-১/১৮৯
二十四. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
二十五. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
二十六. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৪

হযরত মিস'আরের (রহ) ডাকনাম আবূ সালামা। পিতা কিদাম ইবন জুহাইর। কুরায়শ গোত্রের আল-'আমিরী শাখার সন্তান এবং কৃষ্ণার অধিবাসী।

জ্ঞান ও মনীষা
তিনি জ্ঞান ও ধর্মচর্চা উভয় দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে ছিলেন। ইয়া'লা বলেন: "মিস'আর জ্ঞান ও ধার্মিকতার সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন।" ইরাকে তাঁর সমকক্ষ 'আলিম খুব কমই ছিলেন। হিশাম ইবন 'উরওয়া (রহ) বলেন, মিস'আর ও আইউবের চেয়ে উত্তম কেউ আমাদের এখানে আসেনি। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত।

হাদীছ
তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে একজন হাফিজ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম বলেছেন। মুহাম্মাদ ইবন বিশর বলেন : মিস'আরের নিকট প্রায় এক হাজার হাদীছ ছিল। আমি দশটি ছাড়া সবই লিখেছি। তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ নাখা'ঈ, আবু ইসহাক আস-সুবায়'ঈ, সা'ঈদ ইবন ইবরাহীম, ছাবিত ইবন 'উবায়দুল্লাহ আল-আনসারী, 'আবদুল মালিক ইবন নুমাইর, হিলাল ইবন জানাব, হাবীব ইবন আবী ছাবিত, 'আলকামা ইবন মারছাদ, কাতাদা, মা'আন ইবন 'আবদির রহমান, মিকদাম ইবন শুরায়হ, আল- আ'মাশ, 'আদী ইবন ছাবিত, আল-হাকাম ইবন 'উতায়বা (রহ) সহ বিশাল সংখ্যক মুহাদ্দিছের নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।

তাঁর বর্ণিত হাদীছের মান
তাঁর বর্ণনাসমূহের বিশুদ্ধতার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, হযরত শু'বার মত বিখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ বলেন: "তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মপ্রত্যয়ের কারণে আমরা মিস'আরকে মাসহাফ বলতাম।" তাঁর ব্যক্তি সত্তা ছিল হাদীছ যাচাই-বাছাইয়ের মাপকাঠি। এ কারণে তাঁর উপাধি হয়ে যায় "মীযান" বা পাল্লা। আল-খুরায়বী বলেন: "খুব কম মুহাদ্দিছ এমন পাওয়া যাবে যাঁদের বর্ণনাসমূহ কোন না কোনভাবে সমালোচিত হয়নি। তবে মিস'আর এর ব্যতিক্রম।" হাদীছের ইমামগণ সন্দেহ ও মত পার্থক্যের স্থানে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন। সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলেন, যখন হাদীছের কোন বিষয়ে আমাদের মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন আমরা মিস'আরকে জিজ্ঞেস করতাম। ইবরাহীম ইবন সা'দ বলতেন, যখন কারো ব্যাপারে সুফইয়ান ও শু'বার মধ্যে মত পার্থক্য হতো তখন তাঁরা মীযান মিস'আরের নিকট যেতেন।

হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর এত জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনায় খুব বেশী সাবধানতা অবলম্বন করতেন। তিনি এ দায়িত্ব পালনে এত ভয় পেতেন যেন তাঁর মাথার উপর কাঁচের বোঝা রয়েছে। একটু অসতর্ক হলেই তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে। ইবন 'উয়ায়না বলেন, আমি মিস'আরকে একথা বলতে শুনেছি:
"আমি চেয়েছি, হাদীছ যদি আমার উপর কাঁচের বোঝার মত হতো, যা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যায়।" অর্থাৎ কারো মাথায় কাঁচের বোঝা থাকলে সে যেমন তা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকে, তাই সব সময় সাবধানতা অবলম্বন করে। তেমনি তিনি হাদীছকে কাঁচ মনে করেছেন এবং সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। তাঁর এমন মাত্রাতিরিক্ত সাবধানতা সন্দেহের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আবূ নু'আইম বলেন, মিস'আর তাঁর হাদীছসমূহের ব্যাপারে বড় সন্দেহপরায়ণ ছিলেন। তবে তিনি কোন ভুল করতেন না। আল-আ'মাশ বলতেন, মিস'আরের শয়তান তাঁকে দুর্বল করে তাঁর মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে থাকে।

তাঁর এই সন্দেহ তাঁর হাদীছসমূহের মান এত বাড়িয়ে দেয় যে, হাদীছ বিশারদগণ তাঁর সন্দেহকে দৃঢ় প্রত্যয়ের মর্যাদা দিতেন। লোকেরা আ'মাশকে বললো, মিস'আর তো তাঁর নিজের বর্ণিত হাদীছসমূহে সন্দেহ পোষণ করেন। তিনি তাদেরকে বলেন : শুককুহু কায়াক্বীনিহি - "তার সন্দেহ অন্যদের দৃঢ় প্রত্যয়ের মত।" এমন কথা ইমাম আল-ওয়াকী'ও বলেছেন। তবে ইয়াহইয়া আল-কাত্তান বলেন : "আমি মিস'আরের চেয়ে বেশী বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল আর কাউকে দেখিনি।”

ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে তিনি যদিও কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না, তবুও কুফার মুফতীগণের মধ্যে গণ্য ছিলেন।

দারসের আসর
মসজিদে তাঁর দারসের আসর ছিল। সালাত আদায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী মসজিদে বসে যেতেন এবং হাদীছ শুনতে আগ্রহী লোকেরা বৃত্তাকারে তাঁর চার পাশে বসে যেতেন। তাঁর সূত্রে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, মুহাম্মাদ ইবন বিশর, ইয়াহইয়া ইবন আদম, আবু নু'আইম, খাল্লাদ ইবন ইয়াহইয়া, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক, ইয়াযীদ ইবন হারুন, শু'বা আল-হাজ্জাজ, মালিক ইবন মিগওয়াল, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, মুহাম্মাদ ইবন বিশর (রহ) ও আরো অনেকে।

'ইবাদত-বন্দেগী
তাঁর মা ছিলেন একজন উঁচুস্তরের 'আবিদা। তাঁর পুণ্যময় তত্ত্বাবধানের গভীর প্রভাব পড়ে ছেলের উপর। মা সব সময় মসজিদে সালাত আদায় করতেন। মা ও ছেলে দু'জন অধিকাংশ সময় এক সাথে মসজিদে যেতেন। একটা পশমী চাদর মিস'আর হাতে করে নিতেন এবং মসজিদে পৌঁছে সেটা মা'র বসার জন্য বিছিয়ে দিতেন। তার ওপর দাঁড়িয়ে মা সালাত আদায় করতেন। আর মিস'আর সামনের সারিতে চলে যেতেন এবং সালাত শেষ করে একটি স্থানে বসে যেতেন। তাঁকে ঘিরে হাদীছের জ্ঞান অর্জনে উৎসাহী ছাত্ররা বসে যেত। তিনি তাঁদেরকে হাদীছ শোনাতেন। এর মধ্যে তাঁর মা 'ইবাদত ও যিক্স- আযকার শেষ করতেন। আর মিস'আর তাঁর দারস (পাঠদান) শেষ করে মা'র কাছে এসে তাঁর চাদরটি উঠিয়ে মাকে সংগে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। তাঁর মাত্র দু'টি ঠিকানাই ছিল; ঘর অথবা মসজিদ। অতিরিক্ত 'ইবাদতের কারণে কপালে দাগ হয়ে গিয়েছিল। খালিদ ইবন 'আমর বলেন: "আমি মিস'আরকে দেখেছি, অতিরিক্ত সিজদার কারণে তাঁর কপাল ছাগলের হাঁটুর মত হয়ে গেছে।"

প্রতিদিন অর্ধেক কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁর ছেলে মুহাম্মাদ বলেন: "আমার আব্বা অর্ধেক কুরআন পাঠ না করে ঘুমোতেন না।"

তিনি কোন একটি স্তরে পৌঁছে থেমে যেতেন না। তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার ধাপ সর্বদাই উন্নত থেকে উন্নততর হতে থাকতো। মা'আন বলেন: "আমি মিস'আরকে প্রতি দিনই শুভ ও কল্যাণে কেবল উন্নতিই করতে দেখেছি।" তিনি 'ইবাদত-বন্দেগী, আধ্যাত্মিক সাধনা ও নৈতিক গুণাবলীতে এমন উচ্চতর পর্যায়ে পৌছে যান যে, তাঁর জান্নাতী হওয়ার ব্যাপারে মানুষের কোন সন্দেহ ছিল না। যেমন আল- হাসান ইবন 'আম্মারা বলেন: "যদি মিস'আরের মত মানুষ জান্নাতে না যান তাহলে তো জান্নাতবাসীদের সংখ্যা অতি অল্পই হবে।"

প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক (রহ) অথবা তাঁর মত অন্য কেউ হযরত মিস'আরের (রহ) আদত-অভ্যাস ও নৈতিক গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে একটি কবিতায় তা তুলে ধরেন। তার দু'টি চরণ নিম্নরূপ:
"কেউ যদি সৎ সঙ্গী সন্ধান করে, সে যেন মিস'আর ইবন কিদামের আসরে আসে। সেখানে আছে প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য এবং এর সদস্যরা হলো পূতঃপবিত্র এবং জাতির উঁচু স্তরের মানুষ।"

পার্থিব ধন-ঐশ্বর্যের প্রতি উদাসীনতা
দুনিয়া ও এর শান-শওকতের প্রতি একেবারেই উদাসীন ও বেপরোয়া ছিলেন। রাষ্ট্রীয় কোন পদের প্রতি কখনো চোখ তুলে তাকাননি। একবার মহা প্রতাপশালী আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল-মানসূর তাঁকে কোন একটি অঞ্চলের ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান। তিনি বলেন, আমার পরিবারের লোকেরা তো আমাকে দুই দিরহামের বাজার করারও যোগ্য মনে করে না। তারা বলে, আমরা তোমার দুই দিরহামের কিছু ক্রয় করাও পছন্দ করিনে। আর আপনি আমাকে ওয়ালীর পদে নিয়োগ দিতে চান? আল্লাহ আপনাকে ঠিক কাজ করার শক্তি দিন। আপনার সংগে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, তাই আমি কিছু বলতে পারছি। খলীফা আবূ জা'ফার তাঁর এই আপত্তি মেনে নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

তিনি অত্যন্ত প্রফুল্ল স্বভাবের মানুষ ছিলেন। অন্যের আবেগ-আগ্রহের প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখাতেন। কেউ যখন তাঁকে একটি হাদীছ শোনাতো যা তাঁর আগেই জানা থাকতো তখন কেবল সেই লোকটির সন্তুষ্টি ও হাদীছের মর্যাদার খাতিরে চুপ করে শুনে যেতেন, যেন হাদীছটি তিনি পূর্বে কখনো শোনেননি।

ওফাত
তিনি হিজরী ১৫৫ মতান্তরে ১৫৩ সনে কৃষ্ণায় ইনতিকাল করেন।

মুস'আব ইবন আল-মিকদাম বলেন: আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) স্বপ্নে দেখলাম। সুফইয়ান রাসূলের (সা) একটি হাত ধরে আছেন এবং এ অবস্থায় দু'জন কা'বা তাওয়াফ করছেন। সুফইয়ান রাসূলকে (সা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! মিস'আর কি মৃত্যু বরণ করেছেন? বললেন: হাঁ, তাঁর মৃত্যুতে আসমানবাসীরা সুসংবাদ লাভ করেছে।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৪. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১১৪
৯. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
১০. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৯
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৯
১২. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
১৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
১৪. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি 'ঈন-১/২৮
১৫. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
১৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫২
十七. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩-২৫৪
十八. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৮
十九. প্রাগুক্ত-১/১৮৯; তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৯
二十一. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৮
二十二. প্রাগুক্ত-১/১৮৯-১৯০
二十三. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/১০৪; প্রাগুক্ত-১/১৮৯
二十四. আত-তাবাকাত-৬/২৫৩
二十五. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫১
二十六. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৫৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px