📄 মুজাহিদ ইবন জাবর (রহ)
হযরত মুজাহিদ (রহ)-এর ডাকনাম আবুল হাজ্জাজ। তিনি কায়স ইবন আস-সায়িব আল-মাখযূমীর আযাদকৃত দাস ছিলেন। তাঁর পিতার নাম জাবর ও জুবায়র দু'রকম বর্ণিত হয়েছে। তিনি একজন দাস হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞানের জগতের সম্রাট ছিলেন। জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন ইমাম পদ মর্যাদার অধিকারী। ইবন সা'দ লিখেছেন: 'তিনি ছিলেন একজন ফকীহ, 'আলিম, বিশ্বস্ত ও বহু হাদীছের ধারক-বাহক।' ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে জ্ঞানের ভাণ্ডার বলেছেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মহত্ত্ব ও ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য আছে। তাফসীর, হাদীছ, ফিকহসহ সকল ইসলামী জ্ঞানে তিনি ইমাম পদ মর্যাদা লাভ করেন।
'ইলমুল কিরাআত ও তাফসীর
আল-কুরআনের পঠন-পাঠনও একটি শাস্ত্র, যাকে ইলমুল কিরাআত বা কিরাআত শাস্ত্র বলা হয়। এটা উলূম আল-কুরআনের একটি শাখা। এ শাস্ত্রে কুরআন পাঠের যাবতীয় নিময়- পদ্ধতি পঠিত হয়। তিনি এই 'ইল্মুল কিরাআত ও তাফসীর শাস্ত্রের সে যুগের একজন খ্যাতিমান 'আলিম ছিলেন। তাফসীরর জ্ঞান তিনি অর্জন করেন মুসলিম উম্মাহ্র জ্ঞানের সাগর হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে। পূর্ণ তিরিশ বার তিনি তাঁকে কুরআন শোনান ও তাফসীর শোনেন। এত মনোযোগ ও অধ্যবসায় সহকারে এ কাজ করতেন যে, প্রত্যেক সূরা পাঠ করে থেমে যেতেন, তারপর সূরা ও বিভিন্ন আয়াতের শানে নুযূলসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন করে জেনে নিতেন। তাঁর এমন মনোযোগ, অধ্যবসায় ও 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) মত মহান মুফাস্সিরে কুরআনের (কুরআন ভাষ্যকার) নিকট শিক্ষার কল্যাণে তিনি একজন উঁচু স্তরের মুফাস্সিরে পরিণত হন। খাসীফ বলেন, মুজাহিদ তাফসীরের সবচেয়ে বড় 'আলিম ছিলেন। হযরত কাতাদা (রহ) বলতেন, সেই সময়ের জীবিত সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে মুজাহিদ সবচেয়ে বড় ‘আলিম। পবিত্র কুরআনের একজন বিখ্যাত কারীও ছিলেন তিনি। সুফইয়ান আছ- ছাওরী বলতেন, তোমরা মুজাহিদ, সা'ঈদ ইবন জুবায়র, 'ইকরিমা ও আদ-দাহ্হাক ইবন মুযাহিম- এই চারজনের নিকট থেকে কুরআনের তাফসীর গ্রহণ করবে।
হাদীছ
তিনি হাদীছের একজন অতি প্রসিদ্ধ 'আলিম ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে মুফাস্সির ও হাদীছের হাফিজ, ইবন সা'দ – বহু হাদীছের ধারক-বাহক এবং ইমাম নাওবী (রহ) হাদীছের ইমাম বলেছেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) তাঁর স্মৃতি শক্তির দারুণ প্রশংসা করতেন। বলতেন, হায়, নাফি'র মুখস্থ শক্তি যদি তোমার মত হতো!
হযরত 'আলী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-আ'স, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, আবূ হুরায়রা, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, রাফি' ইবন খাদীজ, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা সিদ্দীকা, জুওয়ায়রিয়া বিনত আল-হারীছ, উম্মু হানী (রা) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ সাহাবীদের নিকট থেকে তিনি হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। তাছাড়া তাবি'ঈদের মধ্যে 'আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা, তাউস, 'আবদুল্লাহ ইবন সায়িব, 'আবদুল্লাহ ইবন সানজারা, 'আবদুর রহমান ইবন সাফওয়ান, 'উমার ইবন আসওয়াদ, মুওয়াররিক আল-'আজলী, আবূ 'আয়্যাশ আয-যারকী, আবূ 'উবায়দা ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন মাসউদ (রহ) প্রমুখের নিকট থেকেও তিনি হাদীছ শোনেন।
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডি অনেক প্রশস্ত। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: আইউব আস-সিখতিয়ানী, 'আতা', 'ইকরিমা ইবন 'আওন, 'আমর ইবন দীনার, আবূ ইসহাক সুবায়'ঈ, আবুয যুবায়র মাক্কী, কাতাদা, হাবীব ইবন আবী ছাবিত, হাসান ইবন 'আমর, সালামা ইবন কাহয়াল, সুলায়মান আল-আহওয়াল, সুলায়মান আল-আ'মাশ, মুসলিম, আল-বাতীন, তালহা ইবন মুসরিফ, 'আবদুল্লাহ ইবন কাছীর (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রেও তিনি একজন ইমাম ও মুজতাহিদ পর্যায়ের ব্যক্তি ছিলেন। ইমাম যাহাবী, ইবন হাজার, ইমাম নাওবী (রহ) সকলে তাঁর ফিক্ বিষয়ে পারদর্শিতার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর দক্ষতার জন্য এ সনদই যথেষ্ট যে, সে কালের জ্ঞানের নগরী মক্কার শ্রেষ্ঠ মুফতীদের মধ্যে তিনিও একজন।
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জ্ঞান চর্চা
জ্ঞান চর্চার উদ্দেশ্য পার্থিব উপকার প্রাপ্তির আশা থেকে একেবারে মুক্ত থাকে না। কিন্তু হযরত মুজাহিদের জ্ঞান চর্চা সব রকম চাওয়া-পাওয়ার আশা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। সালামা ইবন কুহায়ল বলেন, 'আতা', তাউস ও মুজাহিদ- এই তিনজন ছাড়া আমি এমন কাউকে পাইনি যার জ্ঞান চর্চা ছিল শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
জ্ঞানের সাথে তাঁর মধ্যে আল্লাহ-ভীতি ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাব পূর্ণমাত্রায় ছিল। ইবন হিব্বান বলেন, মুজাহিদ ছিলেন একজন ফকীহ, আল্লাহ-ভীরু, তাপস ও দুনিয়া বিরাগী মানুষ।
দুনিয়ার সাথে সম্পর্কহীনতা
আজীবন তিনি দুনিয়ার কাছে অপরিচিত ও তার সাথে সম্পর্কহীন থেকে গেছেন। পার্থিব ভোগ-বিলাস বা কোন জিনিসের প্রতি তাঁর মন কখনো আসক্তি বোধ করেনি। সব সময় চিন্তাক্লিষ্ট ও বিষণ্ণ থাকতেন। আ'মাশ বলেন, মুজাহিদকে আমরা যখনই দেখতাম, বিষণ্ণ দেখতাম। জনৈক ব্যক্তি তাঁকে এই বিষণ্ণতার কারণ জিজ্ঞেস করে। তিনি বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) আমার হাত মুট করে ধরে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমার হাত ধরে বলেছেন, 'আবদুল্লাহ! দুনিয়াতে এমনভাবে থাক যেন মনে হয় তুমি কোন মুসাফির অথবা কোন পথিক।'
সরল ও সাদাসিধে জীবন
বাহ্যিক চাকচিক্য ও সাজ-শোভার প্রতি এতই বেপরোয়া ছিলেন যে, প্রথম দৃষ্টিতে তাঁর ও একজন অতি সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা দুঃসাধ্য ছিল। আ'মাশ বলেন, যখন আমি মুজাহিদকে তাঁর বাহ্যিক অবস্থায় দেখতাম তখন তাঁকে একজন অতি তুচ্ছ মানুষ মনে হতো। বাহ্যিক বেশভূষায় কোন সহিস বলে ধারণা হতো। মনে হতো তার গাধা হারিয়ে গেছে এবং সে অস্থির ও উদ্ভ্রান্তের মত তা তালাশ করছে। তবে জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর যে সম্মান ও মর্যাদা ছিল তাতে কোন হেরফের হতো না। তিনি যখন কথা বলতেন তখন তাঁর মুখ থেকে যেন মুক্তো ঝরতো। অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁকে সম্মান ও সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখতেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) মত মহান ব্যক্তি তাঁর বাহনের জিনের আংটা চেপে ধরে তাঁকে উঠা-নামায় সাহায্য করতেন। তিনি বলতেন, আমি 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) সাহচর্য পেয়েছি। আমি চাইতাম তাঁর সেবা করতে, কিন্তু উল্টো তিনিই আমার সেবা করতেন।
হযরত মুজাহিদের (রহ) ভ্রমণ করা ও পৃথিবীর বিস্ময়কর বস্তু ও নিদর্শনসমূহ দেখার দারুণ শখ ছিল। তিনি বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখতেন। তিনি বাবেলে যান কুরআনে বিধৃত হারূত-মারূতের ঘটনাটির স্থান পরিদর্শনের জন্য।
ওফাত
মৃত্যুর সন সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা আছে। হিজরী ১০২ মতান্তরে ১০৩ সনে তাঁর মৃত্যু হয়। নামাযে সিজদা অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি সত্তর (৭০), মতান্তরে আশি (৮০) বছর জীবন লাভ করেন।
টিকাঃ
১. আত-তাবাকাত-৫/৪৬৬
২. আল-ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাহাবা-৩/৪৮৫-৪৮৬ (জীবনী নং ৮৩৬৩); 'আসরুত তাবি'ঈন-৪৫৭
৩. আত-তাবাকাত-৫/৪৬৬
৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯২
৫. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৩
৬. আত-তাবাকাত-৫/৪৬৬
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/৪৩; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯২
৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৩
৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯২
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/৪৪
১১. 'আসরুত তাবি'ঈন-৪৫৬, ৪৫৯
১২. শাজারাত আয-যাহাব-১/১২৫
১৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/৪২
十四. প্রাগুক্ত
十五. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৩
十六. ই'লাম আল-মুওয়ার্কি'ঈন-১/২৬
十七. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৪২; তারীখু ইবন 'আসাকির-১৬/১২৯
十八. প্রাগুক্ত
十九. শাজারাত আয-যাহাব-১/১২৫
二十. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯২; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৪৫৩
二十一. প্রাগুক্ত; তারীখু ইবন 'আসাকির-১৬/১২৯
二十二. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৪৫৫
二十三. আত-তাবাকাত-৫/৪৬৬; 'আসরুত তাবি'ঈন-৪৬৫
📄 মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী ইবন হুসায়ন আল-বাকির (রহ)
হযরত রাসূলে কারীমের (সা) দৌহিত্র হযরত হুসায়নের (রা) পৌত্র মুহাম্মাদের ডাকনাম আবূ জা'ফার এবং উপাধি আল-বাকির। তাঁর পিতা ইমাম যায়নুল 'আবিদীন 'আলী ইবন হুসায়ন (রা) এবং মাতা হযরত ইমাম হাসানের (রা) কন্যা উম্মু 'আবদিল্লাহ। সুতরাং ইমাম হুসায়ন ও ইমাম হাসান (রা) যথাক্রমে তাঁর মহান দাদা ও নানা। পিতৃ ও মাতৃ উভয়কুলের দিক দিয়ে তাঁর ধমনীতে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) পবিত্র রক্ত বহমান ছিল। হিজরী ৫৭ সনের সফর মাসে তিনি মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। এই হিসাবে কারবালায় হযরত ইমাম হুসায়নের (রা) মর্মান্তিকভাবে শাহাদাত বরণের সময় তিনি তিন/চার বছরের শিশু মাত্র।
জ্ঞান ও মনীষা
হযরত বাকির ছিলেন সেই খনির রত্ন ও রাতের বাতি যার কল্যাণে সারা পৃথিবীতে 'ইল্ম ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। তারপর তিনি ইমাম যায়নুল 'আবিদীনের (রহ) মত জ্ঞানের দু'সাগরের মোহনা সমতুল্য পিতার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। বংশীয় ঐতিহ্যের প্রভাব ছাড়াও তাঁর মধ্যে স্বভাবগতভাবে জ্ঞান অর্জনের প্রবল আগ্রহও ছিল। এ সকল কারণ সম্মিলিতভাবে তাঁকে তাঁর যুগের একজন শীর্ষ স্থানীয় 'আলিমে পরিণত করে। তিনি স্বীয় অগাধ জ্ঞানের কারণে "বাকির" অভিধায় ভূষিত হন। আরবী বাকির শব্দটি বাক্কারা থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বিদীর্ণ করা, ফেঁড়ে ফেলা। তিনি 'ইল্ম তথা জ্ঞানকে বিদীর্ণ করে তার মূল ও অভ্যন্তরীণ গোপন রহস্য অবগত হন, তাই তাঁকে বাকির বলা হয়।
অনেক 'আলিম মনে করতেন তাঁর মহান পিতার জ্ঞানের চেয়েও তাঁর জ্ঞান অনেক ব্যাপক ছিল। মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদির বলেন, যতদিন আমি মুহাম্মাদকে না দেখেছি ততদিন মনে করতাম, এমন কোন 'আলিম নেই যাঁকে 'আলী ইবন হুসায়ন যায়নুল 'আবিদীনের (রহ) উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়। তিনি তাঁর সময়ে তাঁর পুরো খান্দানের নেতা ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: "তিনি তাঁর সময়ে বানু হাশিমের নেতা ছিলেন।" ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি একজন অতি সম্মানিত তাবি'ঈ ও শ্রেষ্ঠ ইমাম ছিলেন। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে সকলে একমত। মদীনার ফিক্হ ও ইমামগণের মধ্যে তিনি পরিগণিত। ইমাম যাহাবী তাঁকে শীর্ষস্থানীয় দৃঢ়পদ ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন।
হাদীছ
হাদীছ তো তাঁর নিজ গৃহের সম্পদ। এ কারণে এর সবচেয়ে বেশী অধিকার ছিল তাঁর। ইবন সা'দ বলেছেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, বহু জ্ঞান ও হাদীছের ধারক-বাহক।" এই জ্ঞান তিনি অর্জন করেন পারিবারিক পরিমণ্ডলে নিজ বংশের ঊর্ধ্বতন পুরুষদের নিকট থেকে। যেমন: পিতা ইমাম যায়নুল 'আবিদীন, নানা হাসান, দাদা হুসায়ন ইবন 'আলী, মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা, দাদার চাচাতো ভাই 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস ও উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা ও উম্মু সালামা (রা) প্রমুখ মহান ব্যক্তিবর্গের জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে পরোক্ষভাবে অর্জন করেন। অর্থাৎ তাঁদের সূত্রে তাঁর সকল বর্ণনা "মুরসাল”। নিজ পরিবারের বাইরে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা), সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', হারমালা, 'আতা' ইবন ইয়াসার, ইয়াযীদ ইবন হুরমুয, আবু মুররা (রহ) প্রমুখের নিকট থেকেও ফায়দা হাসিল করেন।
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
সেই সময়ের বড় বড় ইমাম যেমন: আবান ইবন তাগলিব আল-কুফী, জাবির ইবন ইয়াযীদ আল-জু'ফী, হাজ্জাজ ইবন আরতাত, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আতা', আওযা'ঈ, আল-আ'মাশ, ইবন জুরাইজ, ইমাম যুহরী, 'আমর ইবন দীনার, আবু ইসহাক সুবায়'ঈ (রহ) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ এবং তাবি' তাবি'ঈনের বড় একটি দল তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করেন।
ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। ইবন আল-বারকী তাঁকে ফকীহ ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী বলেছেন। মনীষীগণ তাঁকে মদীনার তাবি'ঈ ফকীহ ও ইমামদের মধ্যে গণ্য করেছেন।
'イবাদত-বন্দেগী
তিনি সেই সব মহান ব্যক্তিবর্গের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন যাঁদের জীবনের প্রধান কাজই ছিল 'ইবাদত-বন্দেগী করা, আর যে পরিবেশে তিনি জন্মের পর চোখ মেলে তাকান সেখানে সর্বক্ষণ আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের যিক্র ও তাসবীহ-তাহমীদের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হতে থাকতো। এ কারণে 'ইবাদতের সেই প্রাণশক্তি তাঁর মধ্যেও অনুপ্রবেশ করেছিল। রাত-দিন দেড়শো রাক'আত নফল নামায আদায় করতেন। অতিরিক্ত সিজদার কারণে কপালে স্পষ্ট দাগ পড়ে গিয়েছিল। তবে সেটা তেমন গভীর ছিল না।
হযরত আবু বকর ও 'উমারেরারা থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বিদীর্ণ করা, ফেঁড়ে ফেলা। তিনি 'ইল্ম তথা জ্ঞানকে বিদীর্ণ করে তার মূল ও অভ্যন্তরীণ গোপন রহস্য অবগত হন, তাই তাঁকে বাকির বলা হয়।
অনেক 'আলিম মনে করতেন তাঁর মহান পিতার জ্ঞানের চেয়েও তাঁর জ্ঞান অনেক ব্যাপক ছিল। মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদির বলেন, যতদিন আমি মুহাম্মাদকে না দেখেছি ততদিন মনে করতাম, এমন কোন 'আলিম নেই যাঁকে 'আলী ইবন হুসায়ন যায়নুল 'আবিদীনের (রহ) উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়। তিনি তাঁর সময়ে তাঁর পুরো খান্দানের নেতা ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: তিনি তাঁর সময়ে বানু হাশিমের নেতা ছিলেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি একজন অতি সম্মানিত তাবি'ঈ ও শ্রেষ্ঠ ইমাম ছিলেন। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে সকলে একমত। মদীনার ফিক্হ ও ইমামগণের মধ্যে তিনি পরিগণিত। ইমাম যাহাবী তাঁকে শীর্ষস্থানীয় দৃঢ়পদ ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন।
হাদীছ
হাদীছ তো তাঁর নিজ গৃহের সম্পদ। এ কারণে এর সবচেয়ে বেশী অধিকার ছিল তাঁর। ইবন সা'দ বলেছেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, বহু জ্ঞান ও হাদীছের ধারক-বাহক।" এই জ্ঞান তিনি অর্জন করেন পারিবারিক পরিমণ্ডলে নিজ বংশের ঊর্ধ্বতন পুরুষদের নিকট থেকে। যেমন: পিতা ইমাম যায়নুল 'আবিদীন, নানা হাসান, দাদা হুসায়ন ইবন 'আলী, মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা, দাদার চাচাতো ভাই 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস ও উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা ও উম্মু সালামা (রা) প্রমুখ মহান ব্যক্তিবর্গের জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে পরোক্ষভাবে অর্জন করেন। অর্থাৎ তাঁদের সূত্রে তাঁর সকল বর্ণনা "মুরসাল”। নিজ পরিবারের বাইরে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা), সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', হারমালা, 'আতা' ইবন ইয়াসার, ইয়াযীদ ইবন হুরমুয, আবু মুররা (রহ) প্রমুখের নিকট থেকেও ফায়দা হাসিল করেন।
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
সেই সময়ের বড় বড় ইমাম যেমন: আবান ইবন তাগলিব আল-কুফী, জাবির ইবন ইয়াযীদ আল-জু'ফী, হাজ্জাজ ইবন আরতাত, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আতা', আওযা'ঈ, আল-আ'মাশ, ইবন জুরাইজ, ইমাম যুহরী, 'আমর ইবন দীনার, আবু ইসহাক সুবায়'ঈ (রহ) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ এবং তাবি' তাবি'ঈনের বড় একটি দল তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করেন।
ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। ইবন আল-বারকী তাঁকে ফকীহ ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী বলেছেন। মনীষীগণ তাঁকে মদীনার তাবি'ঈ ফকীহ ও ইমামদের মধ্যে গণ্য করেছেন।
'ইবাদত-বন্দেগী
তিনি সেই সব মহান ব্যক্তিবর্গের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন। যাঁদের জীবনের প্রধান কাজই ছিল 'ইবাদত-বন্দেগী করা, আর যে পরিবেশে তিনি জন্মের পর চোখ মেলে তাকান সেখানে সর্বক্ষণ আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের যিক্র ও তাসবীহ-তাহমীদের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হতে থাকতো। এ কারণে 'ইবাদতের সেই প্রাণশক্তি তাঁর মধ্যেও অনুপ্রবেশ করেছিল। রাত-দিন দেড়শো রাক'আত নফল নামায আদায় করতেন। অতিরিক্ত সিজদার কারণে কপালে স্পষ্ট দাগ পড়ে গিয়েছিল। তবে সেটা তেমন গভীর ছিল না।
হযরত আবু বকর ও 'উমারের (রা) প্রতি শ্রদ্ধাবোধ
নিজের পূর্বপুরুষ ও অন্যান্য মহান ব্যক্তির মত হযরত আবূ বাকরের (রা) প্রতিও ছিল তাঁর প্রগাঢ় ভক্তি ও শ্রদ্ধাবোধ। জাবির বলেন, একবার আমি মুহাম্মাদ ইবন 'আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বংশের কেউ কি আবু বকর ও 'উমারকে (রা) গালি দিতেন? বললেন, না। আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং তাঁদের মাগফিরাতের দু'আ করি। 'ঈসা ইবন দীনার আল-মুয়ায্যিনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি তাঁকেও এরূপ জবাব দেন এবং তাঁদের দু'জনকে ভালোবাসতে ও তাঁদের জন্য দু'আ করতে বলেন। সালিম ইবন আবী হাফসা বলেন, আমি ইমাম আল-বাকির ও তাঁর পুত্র জা'ফার আস- সাদিকের নিকট আবূ বকর ও 'উমার (রা) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি, তিনি বলেন, সালিম! আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং তাঁদের দুশমনদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তাঁরা দু'জন ছিলেন পথপ্রদর্শক ইমাম। আমাদের পরিবারের সকলকে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে দেখেছি।
বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা
কিছু দল-উপদল এমন সব ভ্রান্ত 'আকীদা-বিশ্বাস ঐ সকল মহান ব্যক্তিবর্গের প্রতি আরোপ করেছে যার সাথে তাঁদের বিন্দু মাত্র সম্পৃক্ততা ছিল না। দীনী বিষয়ে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন ইসলামী আকীদা ছাড়া আর কোন রকম নতুন আকীদা তাঁরা পোষণ করতেননা। জাবির বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন 'আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের আহলি বায়তের মধ্যে কেউ কি এমন ধারণা পোষণ করতেন যে, কোন পাপ শিরক? বললেন, না। আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলাম; তাদের কেউ কি পুনর্জীবনের প্রবক্তা ছিলেন? বললেন, না।
ওফাত
তিনি হামিয়্যা নামক স্থানে ইনতিকাল করেন এবং লাশ মদীনায় এনে জান্নাতুল বাকী'তে দাফন করা হয়। মৃত্যুর সন নিয়ে মত পার্থক্য আছে। হিজরী ১১৪, ১১৫, ১১৭ ও ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে। কত বছর জীবন লাভ করেন সে সম্পর্কে দু'টি বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা মতে ৫৮ বছর এবং অন্যটি মতে ৭৩ বছর। তবে দ্বিতীয়টি যে সত্য নয় তা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ হিজরী ৫৭ সনে যে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সে ব্যাপারে সকলে একমত। সেই হিসাবে প্রথম বর্ণনাটি অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ তখন তাঁর বয়স ৫৮ থেকে ৬১ বছরের মধ্যে হয় এবং কোনভাবেই ৭৩ বছর হয় না।
সন্তানাদি
ইমাম আল-বাকির (রহ) অনেকগুলো সন্তান রেখে যান। জা'ফার ও 'আবদুল্লাহ ছিলেন হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) দৌহিত্রী উম্মু ফারওয়ার (রহ) গর্ভজাত; ইবরাহীম ছিলেন উম্মু হাকীম বিনত উসায়দের গর্ভজাত; 'আলী ও যায়নাব ছিলেন এক দাসীর গর্ভজাত এবং উম্মু সালামা আরেক দাসীর গর্ভজাত ছিলেন। তাঁদের সকলের মধ্যে জা'ফার, যিনি আস-সাদিক উপাধি প্রাপ্ত, সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং তিনি তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত হন।
ইমাম আল-বাকির সুন্দর বেশ-ভূষা পছন্দ করতেন। 'খুয' নামক এক প্রকার রেশমের মূল্যবান কাপড় ব্যবহার করতেন। সাদা ও রঙ্গীন দু'ধরনের পোশাকই ব্যবহার করতেন। পশমী বুটিদার কাপড়ও পরতেন। চুল ও দাড়িতে খিজাব লাগাতেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৩
২. ওয়াফইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৫০
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৭
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫০
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৭. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৭
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৯. আত-তাবাকাত-৫/২২৮; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৪
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫০; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৭৩
১১. প্রাগুক্ত
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৪
১৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
১৫. আত-তাবাকাত-৫/২৩৬
১৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৫
১৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫১; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৪
১৮. আত-তাবাকাত-৫/২৩৬
১৯. ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৫০; আত-তাবাকাত-৫/২৩৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
২০. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫১; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৫
২১. আত-তাবাকাত-৫/২৩৮
২২. প্রাগুক্ত; তাবি'ঈন-৪৫১
📄 মাকহূল আদ-দিমাশক্বী (রহ)
হযরত মাকহুলের (রহ) কুনিয়াত তথা ডাকনাম দু'টি : আবূ 'আবদিল্লাহ ও আবূ আইউব। তাঁর বংশ ও জন্মভূমি সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবন সা'দ তাঁকে কাবুলের অধিবাসী বলে উল্লেখ করেছেন। ইবন হাজার কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যার একাংশের দ্বারা জানা যায় তিনি একজন অনারব বংশোদ্ভূত এবং তাঁর পিতার নাম সোহরাব। আর ইবন হাজারের বর্ণনার কিছু অংশের দ্বারা প্রমাণিত হয়, তিনি মিসরীয় ছিলেন, আর কিছু বর্ণনা দ্বারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তিনি একজন আরব এবং হুযালী গোত্রের মানুষ।
তবে শেষের দু'টি বর্ণনা অর্থাৎ হুযালী ও মিসরীয় হওয়া অবশ্যই সঠিক নয়। কারণ তাঁর অনারব বংশোদ্ভূত হওয়া সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। তাঁর হুযালী ও মিসরীয় হওয়া এজন্য প্রসিদ্ধ যে, তিনি তাঁর জীবনের কিছু দিন হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির দাসত্বে ছিলেন এবং কিছুকাল মিসরে অবস্থান করেন।
এ ব্যাপারে ইমাম নাওবীর (রহ) বর্ণনাটি অধিক যুক্তিভিত্তিক ও সঠিক বলে প্রতিভাত হয়। তিনি তাঁকে অনারব বংশোদ্ভূত ও কাবুলের লোক বলেছেন। সুতরাং তার বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মাকহুলের (রহ) উর্ধ্বতন বংশধারা এ রকম :
মাকহুল বিন যিদ যা ইব্ন আবি মুসলিম শুহরাব বিন শায্ল বিন সান্দ বিন শাযদান বিন য়ুরদুক বিন ইয়াগুছ বিন কাস্রি কাবুলী ওয়া দামেশকী
এ বর্ণনা দ্বারা বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে যে সমন্বয়টি পাওয়া যায় তা হলো- তিনি অনারব বংশোদ্ভূত, জন্মভূমি কাবুল এবং দিমাশকে বসবাসকারী ছিলেন। আল-মিযী বলেন : দিমাশকের 'আল-আহাদ' বাজারের পাশে তাঁর বাড়ি ছিল।
তাঁর জীবনের প্রথম পর্বের ইতিহাস হলো, তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলেন। 'আমর তাঁকে হুযালী গোত্রের এক মহিলাকে দান করেন। এই দ্বিতীয়জনের দাসত্বের কারণে তাঁর সম্পর্ক আরোপের ক্ষেত্রে দু'টি বর্ণনা হয়ে গেছে। একটি হলো তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদের দাস ছিলেন, আর দ্বিতীয়টি হলো, তিনি ছিলেন হুযালী গোত্রের দাস। দু'টি বর্ণনাই সঠিক। তিনি নিজেই তাঁর দাসত্ব জীবনের সূচনা সম্পর্কে বলেছেন, "আমি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলাম। পরে তিনি আমাকে হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন।" কথাটি যুক্তিভিত্তিক এজন্য যে, 'আমরের পিতা সা'ঈদ হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে কাবুলের সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে জয় করেন। এটাই যুক্তিসিদ্ধ যে, এই অভিযানের সময় মাকহুল যুদ্ধবন্দী হিসেবে সা'ঈদের অধিকারে আসেন। আর একথার সমর্থন পাওয়া যায় খোদ মাকহুলের একটি বর্ণনাতে। তিনি বলেন, আমি এক সময় সা'ঈদের দাস ছিলাম। পরে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি তাঁর পুত্র 'আমরের অধিকারে এসে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক।
মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনযির শাক্কার বলেন: মাকতূলের মূল হলো হারাতের। তাঁর পিতার নাম আবূ মুসলিম শোহ্রাব ইবন শাযিল। দাদা শাযিল হারাতের অধিবাসী ছিলেন। তিনি কাবুলের এক রাজার মেয়ে বিয়ে করেন। স্ত্রীকে সন্তান সম্ভাবা অবস্থায় রেখে তিনি মারা যান এবং স্ত্রী পিতৃগৃহে চলে যান। সেখানে শোহরাবের জন্ম হয়। শোহরাব কাবুলে বেড়ে ওঠেন এবং সেখানে বিয়ে করেন। অতঃপর সেখানে মাকহুলের জন্ম হয়। একটু বড় হলে তিনি মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং সা'ঈদ ইবন আল- 'আসের হাতে অর্পিত হন। এভাবে তিনি দাসত্বের জালে জড়িয়ে পড়েন। সা'ঈদ ইবন আল-'আস আবার তাঁকে হুযাইল গোত্রের এক মহিলার হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেন। পরে এই মহিলা মাকহুলকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।
জ্ঞান অর্জনের জন্য ইসলামী বিশ্ব ভ্রমণ
মুসলমানরা যে দাসদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দাসত্বের নিকৃষ্ট জীবন থেকে বের করে পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দিত, মাকহুল তাঁর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন শুরু হয়েছে দাসত্বের মাধ্যমে এবং অবশেষে তিনি শামের জ্ঞানের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হন। জ্ঞান অন্বেষণে তাঁর স্বভাবগত আগ্রহ ছিল। এ কারণে দাসত্বের জীবনেই তিনি জ্ঞান অর্জনে মনোযোগী হন। পরে দাসত্ব থেকে মুক্তির পর তৎকালীন গোটা ইসলামী বিশ্বের সকল শ্রেষ্ঠ জ্ঞান কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি বলেন, যখন আমি দাসত্ব থেকে মুক্ত হই তখন মিসরের সকল জ্ঞান আত্মস্থ করে ফেলি। আর যতক্ষণ না আমার মধ্যে এ প্রত্যয় জন্মেছে যে, এখানকার সকল জ্ঞান আমি ধারণ করে ফেলেছি ততক্ষণ সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াইনি।
মিসরের জ্ঞান ভাণ্ডার শূন্য করার পর তিনি মদীনায় যান এবং সেখান থেকে যান ইরাকে। এ দু'স্থানের জ্ঞানের সকল ঝর্ণাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হওয়ার পর যান শামে। তথাকার জ্ঞানী-গুণীদের নিকট থেকে স্বীয় জ্ঞানভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করেন। মোটকথা, তিনি জ্ঞান অন্বেষণে ইসলামী দুনিয়ার প্রতিটি কোণে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি নিজেই বলেন: তফতু আল আরদ্বা কুল্লাহ ফি ত্বলাবিল ইল্ম - আমি জ্ঞানের অন্বেষণে গোটা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছি।
জ্ঞান অর্জনে তাঁর প্রবল আগ্রহ ও চেষ্টা-সাধনা তাঁকে জ্ঞানের জগতের এমন শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয় যেখানে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তিই পৌঁছাতে পেরেছিলেন। ইমাম যুহরী (রহ) বলতেন; 'আলিম তো মাত্র চারজন। তাঁদের মধ্যে একজন মাকহুল। অন্য তিনজন হলেন: মদীনার সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কূফার 'আমির আশ-শা'বী এবং বসরার হাসান আল-বাসরী। ইবন ইউনুস বলেন, মাকহুল একজন ফকীহ ও 'আলিম ছিলেন। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবন 'আম্মার বলতেন, তিনি শামের অধিবাসীদের ইমাম ছিলেন। হাদীছ ও ফিক্হ উভয় শাস্ত্রে তিনি ইমাম মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
সুলায়মান ইবন মূসা বলতেন আমাদের কাছে 'ইলম যখন হিজাযের যুহরী থেকে, 'ইরাকের হাসান আল-বাসরী থেকে, আল-জাযীরার মায়মূন ইবন মিহরান থেকে এবং শামের মাকহুল থেকে আসলো, আমরা তা গ্রহণ করলাম। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, হিশামের খিলাফাতকালে এ চারজনই ছিলেন মানুষের 'আলিম।
হাদীছ
তিনি হিজায, ইরাক, মিসর, শামসহ জ্ঞান চর্চার সকল কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তথাকার মুহাদ্দিছগণের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। স্মৃতি শক্তি এত প্রখর ছিল যে, যা কিছু শোনেন সবই বক্ষে ধারণ ও সংরক্ষণ করেন। এ কারণে তিনি তাঁর সময়ের একজন বড় হাফিজে হাদীছে পরিণত হন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে তাবি'ঈদের তৃতীয় স্তরের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ বলে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর শিক্ষকবৃন্দ
তিনি তাঁর সময়ের প্রায় সকল বড় 'আলিমের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। এ কারণে তাঁর শিক্ষকদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কোন দেশ তা থেকে বাদ পড়েনি। সেই তাল (রা) প্রতি শ্রদ্ধাবোধ
নিজের পূর্বপুরুষ ও অন্যান্য মহান ব্যক্তিবর্গের মত হযরত আবু বকর ও 'উমারের (রা) প্রতিও ছিল তাঁর প্রগাঢ় ভক্তি ও শ্রদ্ধাবোধ। জাবির বলেন, একবার আমি মুহাম্মাদ ইবন 'আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বংশের কেউ কি আবু বকর ও 'উমারকে (রা) গালি দিতেন? বললেন, না। আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং তাঁদের মাগফিরাতের দু'আ করি। 'ঈসা ইবন দীনার আল-মুয়ায্যিনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি তাঁকেও এরূপ জবাব দেন এবং তাঁদের দু'জনকে ভালোবাসতে ও তাঁদের জন্য দু'আ করতে বলেন। সালিম ইবন আবী হাফসা বলেন, আমি ইমাম আল-বাকির ও তাঁর পুত্র জা'ফার আস- সাদিকের নিকট আবূ বকর ও 'উমারের (রা) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি, তিনি বলেন, সালিম! আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং তাঁদের দুশমনদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তাঁরা দু'জন ছিলেন পথপ্রদর্শক ইমাম। আমাদের পরিবারের সকলকে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে দেখেছি।
বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা
কিছু দল-উপদল এমন সব ভ্রান্ত 'আকীদা-বিশ্বাস ঐ সকল মহান ব্যক্তিবর্গের প্রতি আরোপ করেছে যার সাথে তাঁদের বিন্দু মাত্র সম্পৃক্ততা ছিল না। দীনী বিষয়ে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন ইসলামী আকীদা ছাড়া আর কোন রকম নতুন আকীদা তাঁরা পোষণ করতেন না। জাবির বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন 'আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের আহলি বায়তের মধ্যে কেউ কি এমন ধারণা পোষণ করতেন যে, কোন পাপ শিরক? বললেন, না। আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলাম; তাদের কেউ কি পুনর্জীবনের প্রবক্তা ছিলেন? বললেন, না।
ওফাত
তিনি হামিয়্যা নামক স্থানে ইনতিকাল করেন এবং লাশ মদীনায় এনে জান্নাতুল বাকী'তে দাফন করা হয়। মৃত্যুর সন নিয়ে মত পার্থক্য আছে। হিজরী ১১৪, ১১৫, ১১৭ ও ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে। কত বছর জীবন লাভ করেন সে সম্পর্কে দু'টি বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা মতে ৫৮ বছর এবং অন্যটি মতে ৭৩ বছর। তবে দ্বিতীয়টি যে সত্য নয় তা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ হিজরী ৫৭ সনে যে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সে ব্যাপারে সকলে একমত। সেই হিসাবে প্রথম বর্ণনাটি অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ তখন তাঁর বয়স ৫৮ থেকে ৬১ বছরের মধ্যে হয় এবং কোনভাবেই ৭৩ বছর হয় না।
সন্তানাদি
ইমাম আল-বাকির (রহ) অনেকগুলো সন্তান রেখে যান। জা'ফার ও 'আবদুল্লাহ ছিলেন হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) দৌহিত্রী উম্মু ফারওয়ার (রহ) গর্ভজাত; ইবরাহীম ছিলেন উম্মু হাকীম বিনত উসায়দের গর্ভজাত; 'আলী ও যায়নাব ছিলেন এক দাসীর গর্ভজাত এবং উম্মু সালামা আরেক দাসীর গর্ভজাত ছিলেন। তাঁদের সকলের মধ্যে জা'ফার, যিনি আস-সাদিক উপাধি প্রাপ্ত, সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং তিনি তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। ইমাম আল-বাকির সুন্দর বেশ-ভূষা পছন্দ করতেন। 'খুয' নামক এক প্রকার রেশমের মূল্যবান কাপড় ব্যবহার করতেন। সাদা ও রঙ্গীন দু'ধরনের পোশাকই ব্যবহার করতেন। পশমী বুটিদার কাপড়ও পরতেন। চুল ও দাড়িতে খিজাব লাগাতেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৩
২. ওয়াফইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৫০
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৭
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫০
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৭. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৭
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৯. আত-তাবাকাত-৫/২২৮; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৪
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫০; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৭৩
১১. প্রাগুক্ত
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৪
১৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
১৫. আত-তাবাকাত-৫/২৩৬
১৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৫
১৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫১; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৪
১৮. আত-তাবাকাত-৫/২৩৬
১৯. ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৫০; আত-তাবাকাত-৫/২৩৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
২০. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫১; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৫
২১. আত-তাবাকাত-৫/২৩৮
২২. প্রাগুক্ত; তাবি'ঈন-৪৫১
হযরত মাকহুলের (রহ) কুনিয়াত তথা ডাকনাম দু'টি : আবূ 'আবদিল্লাহ ও আবূ আইউব। তাঁর বংশ ও জন্মভূমি সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবন সা'দ তাঁকে কাবুলের অধিবাসী বলে উল্লেখ করেছেন। ইবন হাজার কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যার একাংশের দ্বারা জানা যায় তিনি একজন অনারব বংশোদ্ভূত এবং তাঁর পিতার নাম সোহরাব। আর ইবন হাজারের বর্ণনার কিছু অংশের দ্বারা প্রমাণিত হয়, তিনি মিসরীয় ছিলেন, আর কিছু বর্ণনা দ্বারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তিনি একজন আরব এবং হুযালী গোত্রের মানুষ।
তবে শেষের দু'টি বর্ণনা অর্থাৎ হুযালী ও মিসরীয় হওয়া অবশ্যই সঠিক নয়। কারণ তাঁর অনারব বংশোদ্ভূত হওয়া সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। তাঁর হুযালী ও মিসরীয় হওয়া এজন্য প্রসিদ্ধ যে, তিনি তাঁর জীবনের কিছু দিন হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির দাসত্বে ছিলেন এবং কিছুকাল মিসরে অবস্থান করেন।
এ ব্যাপারে ইমাম নাওবীর (রহ) বর্ণনাটি অধিক যুক্তিভিত্তিক ও সঠিক বলে প্রতিভাত হয়। তিনি তাঁকে অনারব বংশোদ্ভূত ও কাবুলের লোক বলেছেন। সুতরাং তার বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মাকহুলের (রহ) উর্ধ্বতন বংশধারা এ রকম :
মাকহুল বিন যিদ যা ইব্ন আবি মুসলিম শুহরাব বিন শায্ল বিন সান্দ বিন শাযদান বিন য়ুরদুক বিন ইয়াগুছ বিন কাস্রি কাবুলী ওয়া দামেশকী
এ বর্ণনা দ্বারা বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে যে সমন্বয়টি পাওয়া যায় তা হলো- তিনি অনারব বংশোদ্ভূত, জন্মভূমি কাবুল এবং দিমাশকে বসবাসকারী ছিলেন। আল-মিযী বলেন : দিমাশকের 'আল-আহাদ' বাজারের পাশে তাঁর বাড়ি ছিল।
তাঁর জীবনের প্রথম পর্বের ইতিহাস হলো, তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলেন। 'আমর তাঁকে হুযালী গোত্রের এক মহিলাকে দান করেন। এই দ্বিতীয়জনের দাসত্বের কারণে তাঁর সম্পর্ক আরোপের ক্ষেত্রে দু'টি বর্ণনা হয়ে গেছে। একটি হলো তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদের দাস ছিলেন, আর দ্বিতীয়টি হলো, তিনি ছিলেন হুযালী গোত্রের দাস। দু'টি বর্ণনাই সঠিক। তিনি নিজেই তাঁর দাসত্ব জীবনের সূচনা সম্পর্কে বলেছেন, "আমি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলাম। পরে তিনি আমাকে হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন।" কথাটি যুক্তিভিত্তিক এজন্য যে, 'আমরের পিতা সা'ঈদ হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে কাবুলের সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে জয় করেন। এটাই যুক্তিসিদ্ধ যে, এই অভিযানের সময় মাকহুল যুদ্ধবন্দী হিসেবে সা'ঈদের অধিকারে আসেন। আর একথার সমর্থন পাওয়া যায় খোদ মাকহুলের একটি বর্ণনাতে। তিনি বলেন, আমি এক সময় সা'ঈদের দাস ছিলাম। পরে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি তাঁর পুত্র 'আমরের অধিকারে এসে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক।
মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনযির শাক্কার বলেন: মাকহুলের মূল হলো হারাতের। তাঁর পিতার নাম আবূ মুসলিম শোহ্রাব ইবন শাযিল। দাদা শাযিল হারাতের অধিবাসী ছিলেন। তিনি কাবুলের এক রাজার মেয়ে বিয়ে করেন। স্ত্রীকে সন্তান সম্ভাবা অবস্থায় রেখে তিনি মারা যান এবং স্ত্রী পিতৃগৃহে চলে যান। সেখানে শোহরাবের জন্ম হয়। শোহরাব কাবুলে বেড়ে ওঠেন এবং সেখানে বিয়ে করেন। অতঃপর সেখানে মাকহুলের জন্ম হয়। একটু বড় হলে তিনি মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং সা'ঈদ ইবন আল- 'আসের হাতে অর্পিত হন। এভাবে তিনি দাসত্বের জালে জড়িয়ে পড়েন। সা'ঈদ ইবন আল-'আস আবার তাঁকে হুযাইল গোত্রের এক মহিলার হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেন। পরে এই মহিলা মাকহুলকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।
জ্ঞান অর্জনের জন্য ইসলামী বিশ্ব ভ্রমণ
মুসলমানরা যে দাসদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দাসত্বের নিকৃষ্ট জীবন থেকে বের করে পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দিত, মাকহুল তাঁর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন শুরু হয়েছে দাসত্বের মাধ্যমে এবং অবশেষে তিনি শামের জ্ঞানের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হন। জ্ঞান অন্বেষণে তাঁর স্বভাবগত আগ্রহ ছিল। এ কারণে দাসত্বের জীবনেই তিনি জ্ঞান অর্জনে মনোযোগী হন। পরে দাসত্ব থেকে মুক্তির পর তৎকালীন গোটা ইসলামী বিশ্বের সকল শ্রেষ্ঠ জ্ঞান কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি বলেন, যখন আমি দাসত্ব থেকে মুক্ত হই তখন মিসরের সকল জ্ঞান আত্মস্থ করে ফেলি। আর যতক্ষণ না আমার মধ্যে এ প্রত্যয় জন্মেছে যে, এখানকার সকল জ্ঞান আমি ধারণ করে ফেলেছি ততক্ষণ সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াইনি।
মিসরের জ্ঞান ভাণ্ডার শূন্য করার পর তিনি মদীনায় যান এবং সেখান থেকে যান ইরাকে। এ দু'স্থানের জ্ঞানের সকল ঝর্ণাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হওয়ার পর যান শামে। তথাকার জ্ঞানী-গুণীদের নিকট থেকে স্বীয় জ্ঞানভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করেন। মোটকথা, তিনি জ্ঞান অন্বেষণে ইসলামী দুনিয়ার প্রতিটি কোণে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি নিজেই বলেন: "ত্বাফতুল আরদ্বা কুল্লাহাফি ত্বলবিল ইল্মি" - আমি জ্ঞানের অন্বেষণে গোটা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছি।
জ্ঞান অর্জনে তাঁর প্রবল আগ্রহ ও চেষ্টা-সাধনা তাঁকে জ্ঞানের জগতের এমন শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয় যেখানে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তিই পৌঁছাতে পেরেছিলেন। ইমাম যুহরী (রহ) বলতেন; 'আলিম তো মাত্র চারজন। তাঁদের মধ্যে একজন মাকহুল। অন্য তিনজন হলেন: মদীনার সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কূফার 'আমির আশ-শা'বী এবং বসরার হাসান আল-বাসরী। ইবন ইউনুস বলেন, মাকহুল একজন ফকীহ ও 'আলিম ছিলেন। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবন 'আম্মার বলতেন, তিনি শামের অধিবাসীদের ইমাম ছিলেন। হাদীছ ও ফিক্হ উভয় শাস্ত্রে তিনি ইমাম মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
সুলায়মান ইবন মূসা বলতেন আমাদের কাছে 'ইলম যখন হিজাযের যুহরী থেকে, 'ইরাকের হাসান আল-বাসরী থেকে, আল-জাযীরার মায়মূন ইবন মিহরান থেকে এবং শামের মাকহুল থেকে আসলো, আমরা তা গ্রহণ করলাম। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, হিশামের খিলাফাতকালে এ চারজনই ছিলেন মানুষের 'আলিম।
হাদীছ
তিনি হিজায, ইরাক, মিসর, শামসহ জ্ঞান চর্চার সকল কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তথাকার মুহাদ্দিছগণের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। স্মৃতি শক্তি এত প্রখর ছিল যে, যা কিছু শোনেন সবই বক্ষে ধারণ ও সংরক্ষণ করেন। এ কারণে তিনি তাঁর সময়ের একজন বড় হাফিজে হাদীছে পরিণত হন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে তাবি'ঈদের তৃতীয় স্তরের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ বলে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর শিক্ষকবৃন্দ
তিনি তাঁর সময়ের প্রায় সকল বড় 'আলিমের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। এ কারণে তাঁর শিক্ষকদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কোন দেশ তা থেকে বাদ পড়েনি। সেই তালিকার মধ্যে বিশাল সংখ্যক সাহাবায়ে কিরামের নামও আছে। তাঁদের মধ্যে আনাস ইবন মালিক, আবূ হিন্দ দারী, ওয়াছিলা ইবন আসকা', আবূ উমামা, 'আবদুর রহমান ইবন গানাম, আবু জান্দাল ইবন সুহায়ল (রা) প্রমুখের নিকট থেকে সরাসরি হাদীছ শুনেছেন। আর উবাই ইবন কা'ব, ছাওবান, 'উবাদা ইবন ছাবিত, আবূ হুরায়রা, আবূ ছা'লাবা খুশানী, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) থেকে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁদের নাম বাদ দিয়ে তিনি নিজেই সরাসরি রাসূল (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন।
বিশিষ্ট তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, মাসরূক, জুবায়র ইবন নাদীর, কুরায়ব, আবূ মুসলিম, আবূ ইদরীস খাওলানী, 'উরওয়া ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন মুহায়রীয, 'আম্বাসা ইবন আবী সুফইয়ান, ওয়াররাদ কাতিব, মুগীরা, কুছায়িয়র মুররা, উম্মুদ দারদা' (রহ) প্রমুখ থেকে হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন।
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডি অত্যন্ত প্রশস্ত। বিশিষ্ট কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো: ইমাম যুহরী, হুমায়দ আত-তাবীল, মুহাম্মাদ ইবন 'আজলান, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আলা', সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ মুহারিবী, মূসা ইবন ইয়াসার, ইমাম আওযা'ঈ, সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয, 'আলা' ইবন আল-হারিছ, ছাওর ইবন ইয়াযীদ, আইউব ইবন মূসা, মুহাম্মাদ ইবন রাশিদ মাকহুলী, মুহাম্মাদ ইবন ওয়ালীদ যুবায়দী, বারদ ইবন সিনান, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আওফ, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল- আনসারী, উসামা ইবন যায়দ লায়ছী, নাখীর ইবন সা'দ, সাফওয়ান ইবন 'আমর, ছাবিত ইবন ছাওবান (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ ও ফাতওয়া
হাদীছ স্মৃতিতে ধারণের সাথে সাথে তিনি ফিক্হ শাস্ত্রের একজন ইমাম ও মুজতাহিদ ছিলেন। আবূ হাতিম বলতেন, আমি শামে মাকহুলের চেয়ে বড় কোন ফকীহ দেখিনি। সাঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে ইমাম যুহরীর চেয়েও বড় ফকীহ বলে মনে করতেন। ইফতার ক্ষেত্রে ছিল তাঁর বিশেষ দক্ষতা ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, তাঁর যুগে ইফতার ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বেশী সূক্ষ্ম দৃষ্টি আর কারো ছিল না।
সতর্কতা
তিনি ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। নিজের মতের ভিত্তিতে যদি কোন মাসয়ালার জবাব দিতেন তাহলে স্পষ্টভাবে সে কথা বলে দিতেন যে, এটা আমার মত। সঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর মনীষা ও উৎকর্ষতার বড় প্রমাণ এই যে, সেই যুগে যখন গ্রন্থ রচনার সূচনাও হয়নি তখন তিনি ফিক্হ বিষয়ে দু'টি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থ দু'টির নাম: ১. কিতাবুস সুনান, ২. কিতাবুল মাসায়িল।
আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়
জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের সাথে সাথে নৈতিক উৎকর্ষিকার মধ্যে বিশাল সংখ্যক সাহাবায়ে কিরামের নামও আছে। তাঁদের মধ্যে আনাস ইবন মালিক, আবূ হিন্দ দারী, ওয়াছিলা ইবন আসকা', আবূ উমামা, 'আবদুর রহমান ইবন গানাম, আবু জান্দাল ইবন সুহায়ল (রা) প্রমুখের নিকট থেকে সরাসরি হাদীছ শুনেছেন। আর উবাই ইবন কা'ব, ছাওবান, 'উবাদা ইবন ছাবিত, আবূ হুরায়রা, আবূ ছা'লাবা খুশানী, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) থেকে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁদের নাম বাদ দিয়ে তিনি নিজেই সরাসরি রাসূল (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন।
বিশিষ্ট তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, মাসরূক, জুবায়র ইবন নাদীর, কুরায়ব, আবূ মুসলিম, আবূ ইদরীস খাওলানী, 'উরওয়া ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন মুহায়রীয, 'আম্বাসা ইবন আবী সুফইয়ান, ওয়াররাদ কাতিব, মুগীরা, কুছায়িয়র মুররা, উম্মুদ দারদা' (রহ) প্রমুখ থেকে হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন।
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডি অত্যন্ত প্রশস্ত। বিশিষ্ট কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো: ইমাম যুহরী, হুমায়দ আত-তাবীল, মুহাম্মাদ ইবন 'আজলান, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আলা', সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ মুহারিবী, মূসা ইবন ইয়াসার, ইমাম আওযা'ঈ, সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয, 'আলা' ইবন আল-হারিছ, ছাওর ইবন ইয়াযীদ, আইউব ইবন মূসা, মুহাম্মাদ ইবন রাশিদ মাকহুলী, মুহাম্মাদ ইবন ওয়ালীদ যুবায়দী, বারদ ইবন সিনান, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আওফ, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল- আনসারী, উসামা ইবন যায়দ লায়ছী, নাখীর ইবন সা'দ, সাফওয়ান ইবন 'আমর, ছাবিত ইবন ছাওবান (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ ও ফাতওয়া
হাদীছ স্মৃতিতে ধারণের সাথে সাথে তিনি ফিক্হ শাস্ত্রের একজন ইমাম ও মুজতাহিদ ছিলেন। আবূ হাতিম বলতেন, আমি শামে মাকহুলের চেয়ে বড় কোন ফকীহ দেখিনি। সাঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে ইমাম যুহরীর চেয়েও বড় ফকীহ বলে মনে করতেন। ইফতার ক্ষেত্রে ছিল তাঁর বিশেষ দক্ষতা ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, তাঁর যুগে ইফতার ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বেশী সূক্ষ্ম দৃষ্টি আর কারো ছিল না।
সতর্কতা
তিনি ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। নিজের মতের ভিত্তিতে যদি কোন মাসয়ালার জবাব দিতেন তাহলে স্পষ্টভাবে সে কথা বলে দিতেন যে, এটা আমার মত। সঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর মনীষা ও উৎকর্ষতার বড় প্রমাণ এই যে, সেই যুগে যখন গ্রন্থ রচনার সূচনাও হয়নি তখন তিনি ফিক্হ বিষয়ে দু'টি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থ দু'টির নাম: ১. কিতাবুস সুনান, ২. কিতাবুল মাসায়িল।
আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়
জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের সাথে সাথে নৈতিক উৎকর্ষতায়ও বিভূষিত ছিলেন। আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয় ও আল্লাহর পথে জিহাদ করা- এ দু'টি গুণ তাঁর মধ্যে পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করেছিল। যা কিছু তাঁর হাতে আসতো সবই আল্লাহর পথে ব্যয় করতেন। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, মাকহুলের ভাতা নির্ধারিত ছিল। তিনি সেই অর্থ আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে ব্যয় করতেন। একবার দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার বড় অঙ্কের অর্থ তাঁর হাতে আসে। তিনি সেই অর্থও আল্লাহর পথে জিহাদে ব্যয় করেন। তিনি একজন মুজাহিদকে তাঁর একটি ঘোড়ার মূল্য হিসেবে পঞ্চাশ স্বর্ণ মুদ্রা দিতেন।
একটি সন্দেহের নিরসন
হযরত মাকহুল (রহ) সম্পর্কে একটা সাধারণ প্রসিদ্ধি ছিল যে, তিনি 'কাদরিয়া' মতবাদে বিশ্বাসী। এর সমর্থনে কিছু বর্ণনাও পাওয়া যায়। কিন্তু সঠিক বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে জানা যায়, এই ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস থেকে তিনি পরিচ্ছন্ন ছিলেন। ইমাম আওযা'ঈ (রহ) তাঁর একজন বিশিষ্ট ছাত্র বলেন, যতটুকু শোনা যায়, তাবি'ঈদের মধ্যে দুই ব্যক্তি হাসান আল-বাসরী ও মাকহুল (রহ) কাদরিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু আমি ব্যাপক অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার পর জেনেছি এই প্রসিদ্ধি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর আরেকজন ছাত্র সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীযও তাঁর এই ভ্রান্ত মতবাদের বিশ্বাস থেকে মুক্ত থাকার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু সন সম্পর্কে মতভেদ আছে। হিজরী ১১২, ১১৩ এবং ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে।
টিকাঃ
১. আত-তাবাকাত-তায়ও বিভূষিত ছিলেন। আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয় ও আল্লাহর পথে জিহাদ করা- এ দু'টি গুণ তাঁর মধ্যে পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করেছিল। যা কিছু তাঁর হাতে আসতো সবই আল্লাহর পথে ব্যয় করতেন। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, মাকহুলের ভাতা নির্ধারিত ছিল। তিনি সেই অর্থ আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে ব্যয় করতেন। একবার দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার বড় অঙ্কের অর্থ তাঁর হাতে আসে। তিনি সেই অর্থও আল্লাহর পথে জিহাদে ব্যয় করেন। তিনি একজন মুজাহিদকে তাঁর একটি ঘোড়ার মূল্য হিসেবে পঞ্চাশ স্বর্ণ মুদ্রা দিতেন।
একটি সন্দেহের নিরসন
হযরত মাকহুল (রহ) সম্পর্কে একটা সাধারণ প্রসিদ্ধি ছিল যে, তিনি 'কাদরিয়া' মতবাদে বিশ্বাসী। এর সমর্থনে কিছু বর্ণনাও পাওয়া যায়। কিন্তু সঠিক বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে জানা যায়, এই ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস থেকে তিনি পরিচ্ছন্ন ছিলেন। ইমাম আওযা'ঈ (রহ) তাঁর একজন বিশিষ্ট ছাত্র বলেন, যতটুকু শোনা যায়, তাবি'ঈদের মধ্যে দুই ব্যক্তি হাসান আল-বাসরী ও মাকহুল (রহ) কাদরিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু আমি ব্যাপক অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার পর জেনেছি এই প্রসিদ্ধি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর আরেকজন ছাত্র সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীযও তাঁর এই ভ্রান্ত মতবাদের বিশ্বাস থেকে মুক্ত থাকার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু সন সম্পর্কে মতভেদ আছে। হিজরী ১১২, ১১৩ এবং ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে।
টিকাঃ
১. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
২. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৬
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১১৩
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৬
৫. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
৬. ফুতূহ আল-বুলদান-৩২২
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৭
৮. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৮
৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
১০. আত-তাবাকাত-৭/১৬০
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৯
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১১৪
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮
১৭. প্রাগুক্ত-১/১০৭
১৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/১১৩
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯০
২০. তাহযীব আল-আসমা'-১/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৭
২১. প্রাগুক্ত
২২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২৩. প্রাগুক্ত
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
২৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৪৬
২৬. ইবন নাদীম, আল-ফিরিস্ত (মিসর সংস্করণ)-৩১৮; তাবি'ঈন-৪৮৯
২৭. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
২৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
৩০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১৮/৩৬০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
📄 মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদির (রহ)
কুরায়শ বংশের বানু তায়ম শাখার সন্তান মুহাম্মাদ (রহ)। তাঁর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। পিতা আল-মুনকাদির ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন আল-হুযায়র। তাঁর অপর দু'ভাই আবূ বাকর ইবন আল-মুনকাদির ও 'উমার ইবন আল-মুনকাদির।
আল-মুনকাদির ছিলেন উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশার (রা) মামা। একদিন তিনি 'আয়িশার (রা) কাছে গিয়ে নিজের প্রয়োজনের কথা বলে কিছু অর্থ সাহায্য চাইলেন। তিনি বললেন, আমার হাতে কিছু অর্থ আসার কথা আছে, আসলে পাঠিয়ে দেব। এরপর দশ হাজার দিরহাম 'আয়িশার (রা) হাতে আসে এবং তিনি সাথে সাথে তা আল-মুনকাদিরের নিকট পাঠিয়ে দেন। মুনকাদির সেই অর্থ দিয়ে একটি দাসী কেনেন। সেই দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে তাঁর তিন ছেলে: মুহাম্মাদ, আবূ বাকর ও 'উমার।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় তিনি অতি উঁচু স্তরের মানুষ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে আল-ইমাম ও শায়খুল ইসলাম (ইসলামের জ্ঞান-বৃদ্ধ ব্যক্তি) বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন: "তাঁর বিশ্বস্ততা এবং 'ইলম ও 'আমলে অগ্রবর্তিতার ব্যাপারে সকলের ঐক্যমত আছে। তিনি 'আতা'র স্তরের মানুষ, তবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে দেরীতে।" ইবন হাজার আল-আসকিলানী (রহ) তাঁকে শীর্ষস্থানীয় ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন।
কিরাআত
আল-কুরআনের একজন বিশিষ্ট কারী ছিলেন। ইমাম মালিক (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন কারীদের নেতা।"
হাদীছ
হাদীছের একজন বিখ্যাত হাফিজ ছিলেন। আল-হুমায়দী বলেন: "ইবন আল-মুনকাদির একজন হাফিজ।" তিনি সাহাবা ও তাবি'ঈন কিরামের বড় একটি দলের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ আইউব আল- আনসারী, আনাস ইবন মালিক, জাবির, আবূ উমামা ইবন সাহল, রাবী'আ ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, আবু কাতাদা, সাফীনা, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', 'উরওয়া ইবন যুবায়র, মু'আয ইবন 'আবদির রহমান আত-তায়মী, সা'ঈদ ইবন 'আবদির রহমান ইয়ারবূ', আবূ বাকর ইবন সুলায়মান (রহ) প্রমুখের সূত্রে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাঁর কিছু মুরসাল হাদীছ আছে। কিন্তু হাদীছের 'আলিমগণ মনে করেন, তাঁর মুরসাল হাদীছ অন্য অনেকের মারফ্' হাদীছের চেয়েও নির্ভরযোগ্য। ইবন 'উয়ায়না বলেন: "তিনি ছিলেন সত্য ও সততার খনিসদৃশ। সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ তাঁর কাছে সমবেত হতেন।" তিনি আরো বলেন, কেউ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আর সকলে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিয়েছেন, একমাত্র তিনি ছাড়া এমন আর কাউকে আমি দেখিনি। ইবরাহীম বলতেন, তিনি মুখস্থ শক্তি, দৃঢ়তা ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাবের চূড়ান্ত পর্যায়ের মানুষ ছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন ইল্মে হাদীছে "হুজ্জাত” (দলিল-প্রমাণ) স্তরের ব্যক্তি।
ছাত্রবৃন্দ
তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন: তাঁর পুত্র ইউসুফ ও আল-মুনকাদির, ভাতিজা ইবরাহীম ও 'আবদুর রহমান এবং অন্যদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, ইমাম যুহরী, আইউব, আনাস ইবন 'উবায়দ, সালামা ইবন দীনার, জা'ফার ইবন মুহাম্মাদ সাদিক, মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি', সা'দ ইবন ইবরাহীম, সুহায়ল ইবন আবী সালিহ, ইবন জুরায়জ, 'আলী ইবন যায়দ, মূসা ইবন 'উকবা, হিশাম ইবন 'উরওয়া, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ
তিনি ফিক্হ ও ফাতওয়ায় পারদর্শী ছিলেন। মদীনার তাবি'ঈ মুফতীগণের মধ্যে তাঁকে গণ্য করা হতো।
তাকওয়া-পরহিযগারী
তাঁর মধ্যে তাকওয়া-পরহিযগারী ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য তিনি অত্যন্ত কঠিন অনুশীলন করতেন। একাধারে চল্লিশ বছর নানাভাবে নক্সের পরিশুদ্ধির কাজ করেন। তিনি নিজেই বলেন: "আমি চল্লিশ বছর যাবত আমার নফসকে কষ্ট দিয়েছি, অতঃপর সে সোজা হয়।" ইমাম মালিক বলতেন, তিনি উঁচু স্তরের 'আবিদ ও যাহিদ (দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ত) মানুষ ছিলেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী বলেন, তাঁর বাড়ীটি ছিল সত্যনিষ্ঠ ও 'আবিদ (সাধক) ব্যক্তিদের ঠিকানা।
খাওফে খোদা বা আল্লাহর ভয় তাঁর অন্তরের গভীরে শিকড় গেঁড়েছিল। কুরআনের বিশেষ বিশেষ আয়াত যখন তিলাওয়াত করতেন তখন তাঁর চোখ থেকে অশ্রু ধারা জারি হয়ে যেত। এক রাতে তাহাজ্জুদ নামাযে ব্যাকুল হয়ে কাঁদলেন। সকালে ভাইয়েরা তাঁর এমন কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন: এ আয়াতটি পাঠের পর আমার এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়: "এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট হতে এমন কিছু প্রকাশিত হবে যা তারা কল্পনাও করেনি।" (আয-যুমার : ৪৭)
তাঁর মরণ সময় ঘনিয়ে এলে তিনি ভীষণ ভীত-শংকিত হয়ে পড়েন। বলেন, 'আমি এ আয়াতকে ভয় পাচ্ছি। আমি ভয় পাচ্ছি, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার সামনে এমন কিছু প্রকাশ হয়ে পড়বে যার কল্পনাও আমি কখনো করিনি। হাদীছের ব্যাপারেও তাঁর অবস্থা এমন ছিল। ইমাম মালিক বলেন: যখন কেউ তাঁর কাছে কোন হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো তখন তিনি কেঁদে ফেলতেন।
হজ্জ আদায়ের ব্যাপারে দারুণ উৎসাহী ও আবেগপ্রবণ ছিলেন। ঋণগ্রস্ত হয়েও হজ্জ করতেন। একবার কেউ একজন প্রতিবাদের সুরে বলে, আপনি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় হজ্জ আদায় করেন কেন? বললেন, হজ্জই ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে বড় উপায় ও সহায়ক। হজ্জে একাকী যেতেন না। স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে সকলকে নিয়ে যেতেন। বলতেন, তাদেরকে আল্লাহর সামনে উপস্থাপনের জন্য নিয়ে যাই। তাকে দেখলে অন্যের নক্সও পরিশুদ্ধ হতো। ইমাম মালিক বলেন, আমি যখন আমার অন্তরে কাঠিণ্য অনুভব করতাম তখন গিয়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদিরকে দেখতাম। এর প্রভাব এই হতো যে, কয়েকদিন পর্যন্ত নক্স আমার নিকট খুব অপ্রিয় থাকতো।
জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আপনার নিকট সবচেয়ে ভালো কাজ কি? বললেন, মুসলমানদেরকে সন্তুষ্ট করা। আবার জিজ্ঞেস করে, সবচেয়ে প্রিয় জগত কোনটি? বললেন : বন্ধুদের সাথে আদান-প্রদান করা।
আল-ওয়াকিদী বলেন : তিনি হিজরী ১৩০ সনে ইনতিকাল করেন। একথা মুহাম্মাদ ইবন সা'দও বলেছেন। তবে হারুন ইবন মুহাম্মাদ আল-ফারবীর সূত্রে ইমাম আল-বুখারী হিজরী ১৩১ সনের কথা বলেছেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না বলেন, তিনি সত্তর (৭০) বছরের উপরে জীবন লাভ করেন। শেষ জীবনে মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাই মেহেদীর খিজাব লাগতেন।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/১২৭
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩
৭. তাবি'ঈন-৪৬৩
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৫
১০. প্রাগুক্ত-৯/৪৭৪; তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৪-২৬৫
১১. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি'ঈন-১/২৬
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৩. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৮
১৭. তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৬
কুরায়শ বংশের বানু তায়ম শাখার সন্তান মুহাম্মাদ (রহ)। তাঁর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। পিতা আল-মুনকাদির ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন আল-হুযায়র। তাঁর অপর দু'ভাই আবূ বাকর ইবন আল-মুনকাদির ও 'উমার ইবন আল-মুনকাদির।
আল-মুনকাদির ছিলেন উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশার (রা) মামা। একদিন তিনি 'আয়িশার (রা) কাছে গিয়ে নিজের প্রয়োজনের কথা বলে কিছু অর্থ সাহায্য চাইলেন। তিনি বললেন, আমার হাতে কিছু অর্থ আসার কথা আছে, আসলে পাঠিয়ে দেব। এরপর দশ হাজার দিরহাম 'আয়িশার (রা) হাতে আসে এবং তিনি সাথে সাথে তা আল-মুনকাদিরের নিকট পাঠিয়ে দেন। মুনকাদির সেই অর্থ দিয়ে একটি দাসী কেনেন। সেই দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে তাঁর তিন ছেলে: মুহাম্মাদ, আবূ বাকর ও 'উমার।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় তিনি অতি উঁচু স্তরের মানুষ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে আল-ইমাম ও শায়খুল ইসলাম (ইসলামের জ্ঞান-বৃদ্ধ ব্যক্তি) বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন: "মুজমাউন আলা ছিক্বাতিহি ওয়া তাক্বাদ্দুমিহি ফিল ইলমি ওয়াল আমালি ওয়া হুয়া মিন ত্ববাক্বাতি আত্বাইন লা-কিননাহু তা-আখখারা মাওতুহু. - তাঁর বিশ্বস্ততা এবং 'ইল্ম ও 'আমলে অগ্রবর্তিতার ব্যাপারে সকলের ঐক্যমত আছে। তিনি 'আতা'র স্তরের মানুষ, তবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে দেরীতে।" ইবন হাজার আল-আসকিলানী (রহ) তাঁকে শীর্ষস্থানীয় ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন।
কিরাআত
আল-কুরআনের একজন বিশিষ্ট কারী ছিলেন। ইমাম মালিক (রহ) বলেন: ক্যানা সাইয়্যিদুল কুররা - তিনি ছিলেন কারীদের নেতা।
হাদীছ
হাদীছের একজন বিখ্যাত হাফিজ ছিলেন। আল-হুমায়দী বলেন: ইবনুল মুনকাদিন হাফিজান - ইবন আল-মুনকাদির একজন হাফিজ। তিনি সাহাবা ও তাবি'ঈন কিরামের বড় একটি দলের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ আইউব আল- আনসারী, আনাস ইবন মালিক, জাবির, আবূ উমামা ইবন সাহল, রাবী'আ ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, আবু কাতাদা, সাফীনা, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', 'উরওয়া ইবন যুবায়র, মু'আয ইবন 'আবদির রহমান আত-তায়মী, সা'ঈদ ইবন 'আবদির রহমান ইয়ারবূ', আবূ বাকর ইবন সুলায়মান (রহ) প্রমুখের সূত্রে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাঁর কিছু মুরসাল হাদীছ আছে। কিন্তু হাদীছের 'আলিমগণ মনে করেন, তাঁর মুরসাল হাদীছ অন্য অনেকের মারফ্' হাদীছের চেয়েও নির্ভরযোগ্য। ইবন 'উয়ায়না বলেন: "তিনি ছিলেন সত্য ও সততার খনিসদৃশ। সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ তাঁর কাছে সমবেত হতেন।” তিনি আরো বলেন, কেউ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন বলেছেন, আর সকলে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিয়েছেন, একমাত্র তিনি ছাড়া এমন আর কাউকে আমি দেখিনি। ইবরাহীম বলতেন, তিনি মুখস্থ শক্তি, দৃঢ়তা ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাবের চূড়ান্ত পর্যায়ের মানুষ ছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন ইল্মে হাদীছে "হুজ্জাত” (দলিল-প্রমাণ) স্তরের ব্যক্তি।
ছাত্রবৃন্দ
তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন: তাঁর পুত্র ইউসুফ ও আল-মুনকাদির, ভাতিজা ইবরাহীম ও 'আবদুর রহমান এবং অন্যদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, ইমাম যুহরী, আইউব, আনাস ইবন 'উবায়দ, সালামা ইবন দীনার, জা'ফার ইবন মুহাম্মাদ সাদিক, মুহাম্মাদ ইবন ওয়াসি', সা'দ ইবন ইবরাহীম, সুহায়ল ইবন আবী সালিহ, ইবন জুরায়জ, 'আলী ইবন যায়দ, মূসা ইবন 'উকবা, হিশাম ইবন 'উরওয়া, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ
তিনি ফিক্হ ও ফাতওয়ায় পারদর্শী ছিলেন। মদীনার তাবি'ঈ মুফতীগণের মধ্যে তাঁকে গণ্য করা হতো।
তাকওয়া-পরহিযগারী
তাঁর মধ্যে তাকওয়া-পরহিযগারী ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য তিনি অত্যন্ত কঠিন অনুশীলন করতেন। একাধারে চল্লিশ বছর নানাভাবে নক্সের পরিশুদ্ধির কাজ করেন। তিনি নিজেই বলেন: আর্বাইনা সানাতান কা-বাদতু নাফসী হাত্তা ইসতাক্ব-মাত - "আমি চল্লিশ বছর যাবত আমার নক্সকে কষ্ট দিয়েছি, অতঃপর সে সোজা হয়।" ইমাম মালিক বলতেন, তিনি উঁচু স্তরের 'আবিদ ও যাহিদ (দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ত) মানুষ ছিলেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী বলেন, তাঁর বাড়ীটি ছিল সত্যনিষ্ঠ ও 'আবিদ (সাধক) ব্যক্তিদের ঠিকানা।
খাওফে খোদা বা আল্লাহর ভয় তাঁর অন্তরের গভীরে শিকড় গেঁড়েছিল। কুরআনের বিশেষ বিশেষ আয়াত যখন তিলাওয়াত করতেন তখন তাঁর চোখ থেকে অশ্রু ধারা জারি হয়ে যেত। এক রাতে তাহাজ্জুদ নামাযে ব্যাকুল হয়ে কাঁদলেন। সকালে ভাইয়েরা তাঁর এমন কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন: এ আয়াতটি পাঠের পর আমার এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়: "এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট হতে এমন কিছু প্রকাশিত হবে যা তারা কল্পনাও করেনি। (যুমার: ৪৭)" তাঁর মরণ সময় ঘনিয়ে এলে তিনি ভীষণ ভীত-শংকিত হয়ে পড়েন। বলেন, 'আমি এ আয়াতকে ভয় পাচ্ছি। আমি ভয় পাচ্ছি, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার সামনে এমন কিছু প্রকাশ হয়ে পড়বে যার কল্পনাও আমি কখনো করিনি। হাদীছের ব্যাপারেও তাঁর অবস্থা এমন ছিল। ইমাম মালিক বলেন: যখন কেউ তাঁর কাছে কোন হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো তখন তিনি কেঁদে ফেলতেন।
হজ্জ আদায়ের ব্যাপারে দারুণ উৎসাহী ও আবেগপ্রবণ ছিলেন। ঋণগ্রস্ত হয়েও হজ্জ করতেন। একবার কেউ একজন প্রতিবাদের সুরে বলে, আপনি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় হজ্জ আদায় করেন কেন? বললেন, হজ্জই ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে বড় উপায় ও সহায়ক। হজ্জে একাকী যেতেন না। স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে সকলকে নিয়ে যেতেন। বলতেন, তাদেরকে আল্লাহর সামনে উপস্থাপনের জন্য নিয়ে যাই। তাকে দেখলে অন্যের নক্সও পরিশুদ্ধ হতো। ইমাম মালিক বলেন, আমি যখন আমার অন্তরে কাঠিণ্য অনুভব করতাম তখন গিয়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদিরকে দেখতাম। এর প্রভাব এই হতো যে, কয়েকদিন পর্যন্ত নক্স আমার নিকট খুব অপ্রিয় থাকতো।
জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আপনার নিকট সবচেয়ে ভালো কাজ কি? বললেন, মুসলমানদেরকে সন্তুষ্ট করা। আবার জিজ্ঞেস করে, সবচেয়ে প্রিয় জগত কোনটি? বললেন : বন্ধুদের সাথে আদান-প্রদান করা।
আল-ওয়াকিদী বলেন : তিনি হিজরী ১৩০ সনে ইনতিকাল করেন। একথা মুহাম্মাদ ইবন সা'দও বলেছেন। তবে হারুন ইবন মুহাম্মাদ আল-ফারবীর সূত্রে ইমাম আল-বুখারী হিজরী ১৩১ সনের কথা বলেছেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না বলেন, তিনি সত্তর (৭০) বছরের উপরে জীবন লাভ করেন। শেষ জীবনে মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাই মেহেদীর খিজাব লাগতেন।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/১২৭
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৩
৭. তাবি'ঈন-৪৬৩
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৭; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৩৬৫
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৭৫
১০. প্রাগুক্ত-৯/৪৭৪; তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৪-২৬৫
১১. ই'লাম আল-মুওয়াক্কি'ঈন-১/২৬
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৩. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৭
১৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৮
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৮
১৭. তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৬৬