📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক (রহ)

📄 মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক (রহ)


মুহাম্মাদ-এর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ, মতান্তরে আবূ বাকর এবং পিতার নাম ইসহাক। দাদা ইয়াসার ছিলেন 'আয়নুত তামার-এর যুদ্ধবন্দীদের একজন। মুস'আব ইবন 'আবদিল্লাহ আধ দুবায়রী তাঁর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে: "আবদুল্লাহ ইবন কায়সের দাস ও 'আল-মাগাযী' রচয়িতা মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের দাদা ইয়াসার ছিলেন 'আয়নুত তামার-এর একজন যুদ্ধবন্দী। তিনি মদীনায় প্রবেশকারী ইরাকের প্রথম যুদ্ধবন্দী।” সম্ভবতঃ এ কারণে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি কায়স ইবন মাখরামা ইবন মুত্তালিব ইবন 'আবদু মান্নাফের দাস ছিলেন। ইতিহাস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে তিনি ইবন ইসহাক নামে প্রসিদ্ধ। হিজরী ৮৫, খ্রীস্টাব্দ ৭০৪ সনে জন্ম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় বেড়ে ওঠেন। এ কারণে 'আল-মাদানী' বলা হয়। রাসূলুল্লাহর (সা) মহান সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালিকের দর্শন লাভে ধন্য হন। তিনি বলতেন: "আমি আনাস ইবনে মালিককে (রা) দেখেছি এমন অবস্থায় যে, তাঁর মাথায় কালো পাগড়ি এবং শিশু-কিশোররা তাঁকে নিয়ে কোরাস করে গাইছে: ইনি নবীর (সা) একজন সাহাবী, দাজ্জালকে না দেখে মৃত্যুবরণ করবেন না।"

ইবন ইসহাক ছিলেন শ্রেষ্ঠ 'আলিম তাবি'ঈদের একজন। বিশেষতঃ তিনি মাগাযী ও সীরাত শাস্ত্রের একজন ইমাম ছিলেন। সীরাত অর্থ জীবনী এবং মাগাযী অর্থ যুদ্ধ-বিগ্রহ। তবে আল-মাগাযী ও আস-সীরাহ্ বলতে সাধারণত রাসূলে কারীমের (সা) জীবন চরিত ও তাঁর যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস বুঝায়।

তিনি ছিলেন মদীনার অধিবাসী। ইমাম যুহরীর (রহ) অন্যতম ছাত্র এবং মদীনাবাসী আরব ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রবীণতম ব্যক্তি। হাদীছ চর্চা ও বর্ণনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। পরবর্তীকালে 'আসিম ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী বাকর ও যুহরীর (রহ) ন্যায় প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ 'আলিমগণের মজলিসে বসে জ্ঞানের পরিধি আরো বৃদ্ধি করেন। তিনি তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহে এ তিনজনসহ অন্য মুহাদ্দিছদের নিকট থেকে সংগৃহীত তথ্যসমূহ বর্ণনা করেছেন। একমাত্র মদীনাবাসী প্রায় একশো রাবী (বর্ণনাকারী)-এর নাম উল্লেখ করেছেন যাঁদের নিকট থেকে তিনি তাঁর রচনাবলীর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন।

হিজরী ১১৫, খ্রীস্টাব্দ ৭৩৩ সনে ইবন ইসহাক ইসকান্দারিয়া যান এবং সেখানে ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব (মৃ. ১২৮/৭৪৫)-এর নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। এই ইয়াযীদ মিসরে সর্বপ্রথম হাদীছ চর্চার সূচনা করেন। এরপর ইবন ইসহাক আবার মদীনায় ফিরে আসেন। হি. ১২৩, খ্রীস্টাব্দ ৭৪১ সনে তাঁর শিক্ষক ইমাম যুহরীর সাথে কোন এক সাক্ষাতের সময় তিনি প্রিয় ছাত্র ইবন ইসহাককে উপস্থিত 'আলিমদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৩২/৭৪৯ সনে মদীনায় সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়নার সাথে সাক্ষাৎ করেন। তারপর তিনি মদীনা ত্যাগ করে যথাক্রমে কুফা, আল-জাযীরা, রায় ও বাগদাদে যান। বাগদাদেই তিনি আমরণ অবস্থান করেন। 'আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল- মানসূরের খিলাফতকালে (১৩৬-১৫৮/৭৫৪-৭৭৫) আল-জাযীরার ওয়ালী ছিলেন (১৪২/৭৫৯) আল-'আব্বাস ইবন মুহাম্মাদ আল-'আব্বাসী। ইবন ইসহাক জাযীরায় অবস্থানকালে তাঁর সাথেও যোগাযোগ করেন।

ইমাম মালিক (রহ)সহ আরো কিছু 'আলিম তাঁর কিছু দোষ-ত্রুটির কথা বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তবে দু'একজন ছাড়া অন্য সকল ইমাম ও হাদীছ বিশারদ তাঁর মুখস্থ শক্তি ও ধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে আস্থা ব্যক্ত করেছেন। আবূ যার'আ আবদুর রহমান ইবন 'আমর বলেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক এমন এক ব্যক্তি যাঁর থেকে হাদীছ গ্রহণের ব্যাপারে সুফইয়ান আছ-ছাওরী, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, হাম্মাদ ইবন যায়দ, হাম্মাদ ইবন সালামা, ইবনুল মুবারক, ইবরাহীম ইবন সা'দ (রহ) প্রমুখের মত 'আলিমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীবের মত উঁচু স্তরের 'আলিম তাঁর থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। হাদীছ বিশারদগণ তাঁকে পরীক্ষা-নরীরীক্ষা করে সত্যবাদী ও সৎ মানুষ হিসেবে পেয়েছেন।

'আলিমদের স্বীকারোক্তি
শু'বা তাঁকে "আমীরুল মু'মিনীন ফিল হাদীছ” (হাদীছ শাস্ত্রে বিশ্বাসীদের আমীর) বলতেন। লোকেরা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করে যে, আপনি মুহাম্মাদ ইবন ইসহাককে এমন অভিধায় ভূষিত করেন কী কারণে? জবাবে তিনি বলেন: তাঁর মুখস্থ শক্তির কারণে। ইয়াযীদ ইবন হারূন বলতেন, যদি আমার হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা থাকতো তাহলে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাককে মুহাদ্দিছগণের আমীর বানাতাম । আবূ মু'আবিয়া তাঁকে (আহফাজুন নাস - মানুষের মধ্যে সর্বাধিক হাদীছ মুখস্থকারী), ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন "ছিকা” (বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য) ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল "হাসানুল হাদীছ" বলেছেন। অর্থাৎ তাঁর বর্ণিত হাদীছ সাহীহ পর্যায়ের নয়, বরং তার পরবর্তী হাসান পর্যায়ের। আলী ইবন আল-মাদীনী বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছের কেন্দ্র ছিলেন ছয় ব্যক্তি, পরে এই ছয়জনের জ্ঞান বারোতে স্থানান্তরিত হয়। তাঁদের একজন হলেন মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক।

ইমাম যুহরীর কর্ম-পদ্ধতি
ইমাম যুহরী (রহ) ছিলেন মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের উস্তাদ। ছাত্রের জ্ঞানের উপর তাঁর এত পরিমাণ আস্থা ছিল যে, তিনি বলতেন: "যতদিন মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক আছে ততদিন মদীনাবাসীদের মধ্যে জ্ঞান থাকবে।" তিনি যখন মদীনার বাইরে কোথাও যেতেন তখন মুহাম্মাদকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। একবার তিনি মদীনার বাইরে কোথাও যাওয়ার ইরাদা করলেন। জ্ঞান পিপাসুদের অনেকে তাঁর সঙ্গী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, আমি এই নও-জোয়ান ইবন ইসহাককে তোমাদের মধ্যে রেখে যাচ্ছি। তাঁর এই স্থলাভিষিক্তি যুহরীর (রহ) শিষ্য-শাগরিদদের মধ্যে স্বীকৃত ছিল। এ কারণে যুহরীর মৃত্যুর পর তাঁর বর্ণনাসমূহের সত্যায়নের জন্য মানুষ ইবন ইসহাকের নিকট যেত। ইবন 'উয়াইনা বলেন, ইবন ইসহাকের প্রতি কেউ কোন দোষারোপ করেছে এমন কাউকে আমি দেখিনি। ইমাম যুহরী (রহ) তাঁর বাড়ীর দারোয়ানকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন যে, ইবন ইসহাক যখনই আসবে তাকে যেন ঢুকতে দেওয়া হয়। এর দ্বারা বুঝা যায় যুহরীর নিকট ইবন ইসহাকের স্থান কি ছিল। একবার ইবন ইসহাক নিয়মের চেয়ে একটু দেরীতে আসলেন। যুহরী (রহ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন : কোথায় ছিলে? ইবন ইসহাক বললেন : দারোয়ানদের কারণে কেউ কি আপনার নিকট আসতে পারে? যুহরী সাথে সাথে দারোয়ানকে ডেকে বলেন দেন, ইবন ইসহাক যখনই আসুক তাকে ঢুকতে বাধা দেবে না।

ইমাম মালিক ও হিশামের সমালোচনা এবং তার কারণ
মনীষীদের এত প্রশংসা ও স্বীকৃতি লাভ সত্ত্বেও ইবন ইসহাক ইমাম মালিক ও হিশামের কঠোর সমালোচনার মুখোমুখীও হয়েছেন। বিশেষতঃ তাঁর সম্পর্কে ইমাম মালিকের মতামত ছিল অত্যন্ত কঠোর। এমনকি তিনি তাঁর সম্পর্কে অনেক অশোভন শব্দও ব্যবহার করেছেন। যেমন তিনি একবার ইবন ইসহাক সম্পর্কে বলেন: উনজুরু ইলা দাজ্জালিম মিনা দাজাজিলা 'তোমরা দাজ্জালদের মধ্য থেকে একজন দাজ্জালকে দেখ।' এ বাক্যে তিনি মুহাম্মাদ ইবন ইসহাককে দাজ্জাল বলেছেন। হিশামও তাঁকে নির্ভরযোগ্য মনে করতেন না। তবে মুহাদ্দিছগণ নিজেরাই তাঁদের দু'জনের এমন কঠোর সমালোচনার কারণ বলে দিয়েছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ মোটামুটি এ রকম:

হাদীছ গ্রহণে ইমাম মালিক এত কঠোর এবং যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর নীতিমালা এত উঁচুমানের ছিল যে, কারো মধ্যে সামান্য দোষ-ত্রুটি দেখলে তিনি তার সমালোচনায় অতি কঠোর শব্দ উচ্চারণে কোন রকম দ্বিধা করতেন না। খতীব আল-বাগদাদী লিখেছেন, কিছু 'আলিম এ রকম বলেছেন যে, সত্যনিষ্ঠ, দীনদার, মুত্তাকী, বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে ইমাম মালিকের এমন কঠোর ভাষা প্রয়োগের জন্য সমকালীন বহু 'আলিম তাঁরও সমালোচনা করেছেন। ইবরাহীম ইবন আল-মুনযির বলেন: ইবন আবী যি'ব, 'আবদুল 'আযীয আল-মাজিশূন, ইবন আবী হাযিম ও মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক- এঁদের প্রত্যেকে মালিক ইবন আনাসের সমালোচনা করেছেন। তবে সবচেয়ে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক। তিনি বলতেন: "তোমরা তাঁর কিছু বই আমার কাছে নিয়ে এসো, যাতে আমি তাঁর কিছু দোষ-ত্রুটির বর্ণনা দিতে পারি। আমি তাঁর পুস্তকসমূহের চিকিৎসক।” এই প্রেক্ষাপটে ইমাম মালিক যদি ইবন ইসহাক সম্পর্কে কিছু রূঢ় শব্দ প্রয়োগ করে থাকেন তাতে তাঁর নির্ভরযোগ্যতায় বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারে না।

তৃতীয় কারণ এই যে, ইবন ইসহাক গাযওয়া বা রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধ-বিগ্রহের বর্ণনা গ্রহণের ব্যাপারে তেমন বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতেন না। এ কারণে ইমাম মালিক তাঁর আল-মাগাযী (যুদ্ধ-বিগ্রহ) বিষয়ক বর্ণনার সমালোচনা করতেন। তবে আল-মাগাযী ছাড়া ইবন ইসহাক বর্ণিত অন্যসব হাদীছের সাথে এই সমালোচনার কোন সম্পর্ক ছিল না। ইবন হিব্বান বলেন, ইমাম মালিক একবার মাত্র ইবন ইসহাক সম্পর্কে রূঢ় শব্দ প্রয়োগ করেন। তারপর তাঁর মর্যাদা অনুযায়ী তাঁর সাথে আচরণ করতেন। ইমাম মালিক তাঁর হাদীছের কারণে নয়, বরং মাগাযীর কারণে তাঁর সমালোচনা করতেন। কারণ, ইবন ইসহাক খায়বারসহ আরো কিছু যুদ্ধের বিবরণ ইয়াহূদীদের নও-মুসলিম সন্তানদের নিকট থেকে শুনে গ্রহণ করতেন। আর তারা আবার সেই সব বিবরণ দিত তাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষের সূত্রে। যদিও ইবন ইসহাক এসব বর্ণনা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতেন না। তবে ইমাম মালিক পরম বিশ্বাসভাজন ও আস্থাশীল ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো কোন বর্ণনা গ্রহণ করা মোটেই সমীচীন মনে করতেন না।

কিছু 'আলিম বলেছেন, ইমাম মালিকের সমালোচনা মাগাযীর জন্য নয়, বরং তাঁর 'আকীদার (বিশ্বাস) জন্য ছিল। 'আবদুর রহমান ইবন 'আমর আন-নাসরী বলেন, আমি দুহাইমের সামনে ইবন ইসহাক সম্পর্কে ইমাম মালিকের সমালোচনার প্রসঙ্গটি উঠালাম। তিনি বললেন, এটা হাদীছের কারণে ছিল না, বরং তা এজন্য ছিল যে, ইমাম মালিক ইবন ইসহাককে কাদরিয়াদের আকীদায় বিশ্বাসী বলে অভিযুক্ত করতেন। যাই হোক, উপরে উল্লেখিত বর্ণনাসমূহ দ্বারা এতটুকু জানা গেছে যে, ইবন ইসহাকের অগ্রহণযোগ্যতা ও দুর্বলতা ইমাম মালিকের কঠোর সমালোচনার কারণ ছিল না। এর কারণ ছিল অন্য কিছু। এ কারণে এ সমালোচনার প্রভাব ইবন ইসহাক বর্ণিত হাদীছের উপর পড়তে পারে না। এজন্য ইমাম মালিক ছাড়া অন্য সকল ইমাম ও 'আলিম তাঁর বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। এমনকি ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ), যিনি 'আকীদার ক্ষেত্রে কঠোরতার ব্যাপারে ইমাম মালিক থেকে কোন অংশে কম ছিলেন না, ইবন ইসহাকের বর্ণনা গ্রহণ করেছেন।

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের (রহ) পুত্র আবদুল্লাহ একবার মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক সম্পর্কে এক ব্যক্তির একটি জিজ্ঞাসার জবাবে বলেন, আমার পিতা তাঁর বর্ণনাসমূহ যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করতেন এবং মুসনাদে স্থান দিতেন। তবে সুনানের ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতেন না।

ইমাম মালিকের (রহ) পরে ইবন ইসহাকের কঠোর সমালোচকদের মধ্যে দ্বিতীয় আরেকটি নাম হিশাম। তাঁর এমন অবস্থানের রহস্য হলো, ইবন ইসহাক হিশামের স্ত্রী ফাতিমা বিনত মুনযিরের সূত্রে কিছু হাদীছ বর্ণনা করেছেন। হিশাম বলতেন, আমার স্ত্রী ফাতিমা একজন পর্দানশীন মহিলা, তার নয় বছর বয়স থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন বেগানা পুরুষ তাঁকে দেখেনি। তাহলে ইবন ইসহাক তার থেকে হাদীছ শোনেন কিভাবে? তবে অনেক মুহাদ্দিছের মতে শুধু একথার ভিত্তিতে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের বর্ণনাসমূহকে ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করা সঠিক নয়। কারণ, তিনি তো পর্দার আড়াল থেকে শুনে থাকতে পারেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) হিশামের এ বক্তব্য বর্ণনার পর মন্তব্য করেছেন এ ভাষায়: "হিশাম যে তাঁর স্ত্রী নয় বছর বয়সের কথা বলেন, তা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, হিশামের চেয়ে তাঁর স্ত্রী তের বছরের বড়। ইব্‌ন ইসহাক্ব যখন তাঁর নিকট থেকে হাদীছ গ্রহণ করেন তখন হিশামের স্ত্রীর বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে। ইব্‌ন ইসহাক্ব ছাড়াও মুহাম্মাদ ইব্‌ন সূকা’র মত বেগানা পুরুষরাও তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।” ইব্‌ন হিব্বান তাঁর “আছ্-ছিকাত” গ্রন্থে বলেন: "মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইসহাক্ব সম্পর্কে ইমাম মালিক ও হিশাম- দু’ব্যক্তিই কথা বলেছেন। তবে হিশামের কথায় কোন মানুষ অভিযুক্ত হতে পারে না। কারণ, অসংখ্য তাবি‘ঈ উম্মুল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশার (রা) প্রতি দৃষ্টিপাত না করে পর্দার আড়াল থেকে তাঁর কথা শুনতেন। একইভাবে ইব্‌ন ইসহাক্বও ফাতিমার কথা শুনে থাকবেন।” ‘আলী ইব্‌ন আল-মাদীনী বলেন: "হিশাম যা বলেছেন তা কোন দলীল হতে পারে না। সম্ভবতঃ তিনি (ইব্‌ন ইসহাক্ব) তাঁর স্ত্রীর নিকট অপ্রাপ্ত বয়সে গিয়েছেন এবং তাঁর থেকে হাদীছ শুনেছেন।

ইব্‌ন ইসহাক্বের শায়খগণ
ইব্‌ন ইসহাক্ব ছিলেন ইমাম যুহরীর (রহঃ) খাস শাগরিদ। তবে তিনি ছাড়া আরো অনেক শায়খের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। যেমন তাঁর শায়খদের মধ্যে তাঁর পিতা ইসহাক্ব, চাচা মূসা, ‘উবায়দুল্লাহ ইব্‌ন ‘আবদিল্লাহ ইব্‌ন ‘আমর, মু’আইদ ইব্‌ন কা’ব ইব্‌ন মালিক, মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইবরাহীম আত-তায়মী, কাসিম ইব্‌ন মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবী বাকর (রা), মুহাম্মাদ ইব্‌ন জা’ফার ইব্‌ন যুবায়র, ‘আসিম ইব্‌ন ‘আমর ইব্‌ন ক্বাতাদা, ‘আব্বাস ইব্‌ন সাহল ইব্‌ন সা’দ, ইব্‌ন মুনকাদির, মাকহুল, ইবরাহীম ইব্‌ন ‘উক্ববা, হুমায়দ আত-তাবীল, সালিম আবী আন-নাদার, সা‘ঈদ মুকরী, সা‘ঈদ ইব্‌ন আবী হিন্দ, আবূ আয-যানাদ, ‘আবদুর রহমান ইব্‌ন আসওয়াদ আন-নাখা‘ঈ, ‘আত্বা’ ইব্‌ন আবী রাবাহ, ‘ইকরিমা ইব্‌ন খালিদ, ‘আলা’ ইব্‌ন ‘আবদির রহমান, ‘আমর ইব্‌ন শু‘আয়ব, নফি', আবূ জা'ফার আল-বাকির, ফাতিমা বিন্ত আল-মুনযির (রহ) প্রমুখের মত বড় আলিমগণ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। জামাল উদ্দীন আল-মিযযী তাঁর ১২২ (একশত বাইশ) জন শায়খের নাম উল্লেখ করেছেন।

তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের তালিকা অতি দীর্ঘ। এখানে কিছু বিশিষ্ট ছাত্র যাঁরা তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো: জারীর ইবন হাযিম, 'আবদুল্লাহ ইবন সা'ঈদ ইবন 'আওন, ইবরাহীম ইবন সা'দ, শু'বা ইবন আল-হাজ্জাজ, ইবন 'উয়ায়না, ইবন মু'আবিয়া, 'আবদুল্লাহ ইবন ইদরীস, আবূ 'আওয়ানা, 'আবদুল আ'লা আশ-শামী, 'আবদুহু ইবন সুলায়মান, জারীর ইবন 'আবদিল হামীদ, যিয়াদ আল-বাক্বা'ঈ, হাম্মাদ ইবন যায়দ, সালামা ইবন আল-ফাদল, মুহাম্মাদ ইবন সালামা আল-হাররানী, ইউনুস ইবন বুকাইর, ইয়াযীদ ইবন হারূন, আহমাদ ইবন খালিদ, ইয়া'লা ইবন উবায়দ, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-উমাবী, ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব আল-মিসরী, ইউনুস ইবন বুকাইর আশ- শায়বানী, ইয়া'লা ইবন 'উবায়দ আত-তানাফুসী, 'হারূন ইবন মূসা আন-নাহবী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারাক (রহ) ও আরো অনেকে।

সীরাত ও মাগাযী
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের অধ্যয়নের আসল ক্ষেত্র ছিল মাগাযী ও সীরাত শাস্ত্র। এ শাস্ত্রের তিনি একজন ইমাম ছিলেন। ইমাম যাহাবী বলেন: 'তিনি মাগাযী ও সীরাত বিদ্যায় ছিলেন একজন তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি।' ইমাম শাফি'ঈ (রহ) বলতেন, কেউ যদি মাগাযী শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে চায় তাকে ইবন ইসহাকের মুখাপেক্ষী হতে হবে। খতীব বাগদাদী লিখেছেন, তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি এই বিদ্যার দিকে দৃষ্টি দেন এবং এত সমৃদ্ধি ঘটান যে, তাঁর পরে আর কেউ তাতে কোন কিছু সংযোজন করতে পারেননি। তিনি আমীর-উমারা ও শাসক শ্রেণীর দৃষ্টি ফলাফল শূন্য ও অর্থহীন কিস্সা-কাহিনী থেকে প্রকৃত ইতিহাসের দিকে ফিরিয়ে দেন। এভাবে তিনি সর্বপ্রথম ইতিহাস চর্চার রুচি সৃষ্টি করেন। শাসকদের রুচির পরিবর্তন ঘটানো, অর্থহীন গ্রন্থ ও কিস্সা-কাহিনীর চর্চা থেকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) মাগাযী, সুন্নাহ এবং বিশ্বের উৎপত্তির ইতিহাসের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোন কিছুই যদি তিনি না করতেন তাহলে এই একটি মাত্র কাজ তাঁর পথিকৃৎ ও শ্রেষ্ঠত্বের গৌরবজনক আসন লাভের জন্য যথেষ্ট ছিল। তাঁর পরে আরো অনেকে এই শাস্ত্রের উপর গ্রন্থ রচনা করেছেন, কিন্তু কেউ তাঁর সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেননি। যে ইমাম যুহরীর নিকট থেকে তিনি এ শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেন, তিনিও এ ক্ষেত্রে তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।

ইতিহাস যদিও মাগাযী ও সীরাত ইতিহাসেরই একটি শাখা, তবে ইবন ইসহাক সাধারণ ইতিহাসেরও একজন পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। খতীব বাগদাদী বলেন, তিনি সীরাত, মাগাযী, আরবের অতীত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ঘটনাবলী, মানব জাতির উৎপত্তি এবং নবীদের কিস্সা-কাহিনীরও 'আলিম ছিলেন।

আল-মাগাযী বিষয়ে লেখালেখির সূচনা হয় কখন?
এখানে এ বিষয়টি উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, হিজরী প্রথম শতকে 'তাদবীনে হাদীছ' তথা হাদীছ লেখালেখির কাজ শুরু হয় এবং দ্বিতীয় শতকে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে। হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণের সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই সামরিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলীও লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। এগুলোকে পৃথকভাবে 'আল-মাগাযী' নামে বিন্যস্ত করা হয়। এ ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি দেখা দিতে পারে তা হলো, সীরাত ও মাগাযী লেখার সূচনা হলো কীভাবে? এ শাস্ত্রটি কি হাদীছ শাস্ত্রের সাথে অথবা পৃথকভাবে গড়ে ওঠে? এ ব্যাপারে প্রাচ্যবিদদের ধারণা হলো, হাদীছ শাস্ত্র ছিল একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বিষয় এবং সীরাত ও মাগাযী ছিল তারই একটি অংশ বিশেষ। তবে কিছু মুসলিম ঐতিহাসিকের রয়েছে ভিন্ন মত। তাঁরা বলেন: সীরাত ও মাগাযীর উৎপত্তি হয় সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে এবং হাদীছ শাস্ত্রের পাশাপাশি স্বতন্ত্রভাবে তা উন্নতি লাভ করে। সম্ভবতঃ এ মতপার্থক্যের কারণ হলো, প্রাথমিক যুগে সীরাত ও মাগাযী লেখকরা হাদীছ শাস্ত্রেরও আলিম ছিলেন এবং তাঁদেরকেও 'মুহাদ্দিছ' বলা হতো। তাঁরা হাদীছ ও মাগাযী বিষয়ক তথ্য একই রকম গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সাথে সংগ্রহ করতেন। সীরাত ও মাগাযী বিষয়ক তথ্য প্রথম থেকেই সংগ্রহ করার ঝোঁক সাহাবা ও তাবি'ঈদের মধ্যে ছিল। সুতরাং তাঁরা এ বিষয়ের তথ্য হাদীছ থেকে স্বতন্ত্রভাবে সংগ্রহ করেন। একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে, সীরাত ও মাগাযীর রাবীগণের যদিও হাদীছে পারদর্শিতা ছিল, তবে তাঁদের বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা খুবই কম। মুহাদ্দিছ হিসেবেও তাঁরা তেমন খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি।

তাঁর রচনাবলী
তিনি ইতিহাস ও সীরাত বিষয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। ইবন নাদীম বলেন: 'তাঁর অনেকগুলো গ্রন্থ আছে। 'কিতাবুল খুলাফা' গ্রন্থটি তাঁর থেকে 'উমাবী বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া আছে 'কিতাবুস সীরাহ্ ওয়াল মুবতাদা ওয়াল মাগাযী।'

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রাচীনতম রচনাটি হলো সীরাত গ্রন্থটি। বহুকাল যাবত গ্রন্থটি দুষ্প্রাপ্য। তবে এ গ্রন্থের সকল বর্ণনা এখনো বিদ্যমান আছে। ইবন হিশামের সীরাতের সবচেয়ে বড় উৎস এই সীরাত। এ কারণে তাঁর সকল বর্ণনা এতে সংরক্ষিত হয়েছে। ইবন হিশামের বর্তমান সীরাত গ্রন্থটি প্রকৃতপক্ষে ইবন ইসহাকের সীরাতের সংক্ষিপ্ত রূপ।

ইবন ইসহাক তাঁর এই গ্রন্থটি আব্বাসীয় খলীফা আল-মাহদীর ছেলের জন্য লেখেন। একবার তিনি খলীফা আল-মাহদীর দরবারে যান। তখন সেখানে খলীফার এক ছেলেও উপস্থিত ছিল। খলীফা নিজের ছেলের প্রতি ইঙ্গিত করে ইবন ইসহাককে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি একে চেনেন? তিনি বলেন: আমীরুল মু'মিনীনের ছেলে। খলীফা অনুরোধ করেন, তিনি যেন তাঁর এ ছেলের জন্য এমন একখানি গ্রন্থ রচনা করেন যাতে আদমের সৃষ্টি থেকে তাঁর সময় পর্যন্ত পৃথিবীর সকল ঘটনার বিবরণ থাকে। এই নির্দেশ অনুযায়ী তিনি এক বৃহদাকৃতির গ্রন্থ রচনা করে খলীফার সামনে উপস্থাপন করেন। গ্রন্থটির কলেবর দেখে তিনি বলেন, এ তো অনেক বড় গ্রন্থ। এটাকে একটু সংক্ষিপ্ত করুন। তিনি সেটা সংক্ষেপ করেন। প্রথম গ্রন্থটি খলীফা আল-মাহদীর গ্রন্থাগারে রাখা হয়। তবে ইবন সা'দ বলেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক হীরায় আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল- মানসূরের নিকট আসেন এবং তাঁর জন্যই তিনি "আল-মাগাযী” রচনা করেন।

তাঁর সীরাত ও মাগাযী
খলীফা আল-মানসূর ১৪৬/৭৬৩ সনে নতুন রাজধানী বাগদাদে যাওয়ার পূর্বে হীরায় অবস্থানকালে ইবন ইসহাক তাঁর আল-মাগাযী গ্রন্থটির রচনা সমাপ্ত করে তাঁর নিকট পাঠান। এ বর্ণনা দ্বারা কোনভাবেই বুঝা যায় না যে, তিনি কোন খলীফার নির্দেশে তাঁর আল-মাগাযী রচনা করেন। তাছাড়া তাঁর রাবী (বর্ণনাকারী)-দের তালিকা দ্বারা একথাও প্রতীয়মান হয় যে, তিনি মদীনা ও মিসরে অবস্থানকালে যে সকল হাদীছ সংগ্রহ করেন তারই ভিত্তিতে আল-মাগাযী সংকলন করেন। তিনি কোন ইরাকী রাবীর নাম উল্লেখ করেননি। এতেও স্পষ্ট হয় যে, তিনি শেষ বারের মত মদীনা ত্যাগের পূর্বে গ্রন্থখানির রচনা সমাপ্ত করেন।

এখানে একটি কথা উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ইবন ইসহাকের আল-মাগাযী গ্রন্থখানা অথবা সঠিক অর্থে তাঁর অংশ বিশেষ 'আরবী খিযানা' তথা গ্রন্থ ভাণ্ডার থেকে হারিয়ে যাওয়া এবং ৫০৬/১১১২ সনে লিখিতভাবে তাঁর অংশ বিশেষ ফাসের 'কারাবী' খিযানায় প্রাপ্তি, গ্রন্থখানা সম্পর্কে আমাদের সার্বিক অবগতির ক্ষেত্রে একটি শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। তবে ইবন হিশাম (মৃ. ২১৮/৮২৮) 'সীরাতুন্নাবী (সা)' নামে ইবন ইসহাকের গ্রন্থখানা সংক্ষেপে করে একটি মহৎ কাজ সম্পাদন করেন।

তিনি ইবন ইসহাকের অন্যতম প্রসিদ্ধ ছাত্র 'বাক্ক্কাঈ' (মৃ. ১৮৩/৭৯৯)-এর বর্ণনা থেকে গ্রহণ করেছেন। তিনি তাবারীসহ ইতিহাসের অন্যান্য গ্রন্থে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা অংশসমূহ জোড়া দিয়ে মূল গ্রন্থটির পদ্ধতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট চিত্র অংকনের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন।

ইবন ইসহাকের মূল গ্রন্থে ইবন হিশাম যে সকল পরিবর্তন ঘটিয়েছেন তা তিনি 'সীরাতুন্নাবী'র ভূমিকায় স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। যেমন আদম (আ) থেকে ইবরাহীম (আ) পর্যন্ত আহলি কিতাবদের ইতিহাস তিনি পরিত্যাগ করেছেন। আমাদের মহানবীর (সা) প্রত্যক্ষ ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ ছাড়া ইসমা'ঈলের (আ) বংশধরদের আলোচনা বাদ দিয়েছেন। অনুরূপভাবে তিনি ইবন ইসহাক বর্ণিত এমন সব কাহিনী বাদ দিয়েছেন যাতে নবী কারীম (সা) সম্পর্কে কোন কথা নেই, সে কাহিনীর আল-কুরআনে কোন ইঙ্গিত নেই এবং গ্রন্থে বর্ণিত অন্য কোন ঘটনার সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক নেই। গ্রন্থটির সংক্ষিপ্তকরণই এ বাদ দেওয়ার প্রধান কারণ। অন্যান্য কারণেও আরো কিছু অংশ বাদ দিয়েছেন। যেমন কিছু প্রাচীন আরবী কবিতা যা পণ্ডিতদের নিকট অপরিচিত, কিছু তথ্য যা ব্যক্তি বিশেষের জন্য পীড়াদায়ক অথবা তাদের প্রতি পাঠকের মধ্যে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া কিছু তথ্য ইবন ইসহাকের গ্রন্থে ছিল কিন্তু বাক্কাঈ তা ভুলে গেছেন, ফলে ইবন হিশাম তা পাননি।

ইবন হিশাম বহু কিছু সংশোধন এবং আরব বংশ পরিচয় ও ভাষার ক্ষেত্রে অনেক কিছু সংযোজনও করেছেন। সে সবের প্রতি যথাস্থানে ইঙ্গিতও করেছেন। তবে তিনি মূল পাঠে কোন রকম পরিবর্তন করেননি। যেখানে তিনি কোন কিছু পরিবর্তন ও সংক্ষিপ্ত করেছেন বা বাদ দিয়েছেন সেখানে তার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তবে ইবন হিশামের সংক্ষিপ্তকরণের ফলে জ্ঞানের জগতে যে ক্ষতি হয়েছে তা আমরা পুষিয়ে নিতে পারি প্রাচীন আরবী গ্রন্থরাজির বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ইবন ইসহাকের গ্রন্থখানির অংশ বিশেষ একত্র করে পাঠের মাধ্যমে। ইমাম আত-তাবারী তাঁর বিখ্যাত তারীখ ও তাফসীর গ্রন্থদ্বয়ে ইবন ইসহাকের সীরাত গ্রন্থের 'আল-মুবতাদা' (সূচনাপর্ব) অধ্যায়ের পরিচ্ছেদগুলোর বহু অংশ বিশ্ববাসীর জন্য সংরক্ষণ করেছেন। অন্যদিকে আল-আযরুকী তাঁর 'আখবারু মাক্কাহ' গ্রন্থে ইবন হিশাম কর্তৃক বাদ দেওয়া অনেক খবরই ধরে রেখেছেন। ইবন হিশামের ভূমিকার মাধ্যমে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, আল-মাগাযী অধ্যায় থেকে যা বাদ পড়েছে তা অতি সামান্য, পক্ষান্তরে 'আল-মুরতাদা' অধ্যায় থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ বাদ পড়েছে। তবে এ ক্ষতি পূরণ করার ক্ষেত্রে আত-তাবারীর অবদান অন্য সকলকে অতিক্রম করে গেছে।

যদি আমরা বিভিন্ন গ্রন্থে সংরক্ষিত বিক্ষিপ্ত অংশসমূহের প্রতি যত্নবান হই, তাহলে ইবন ইসহাকের গ্রন্থটির নিম্নের চিত্র দেখতে পাই। ইবন ইসহাক তাঁর 'আল-মাগাযী' প্রণয়নের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বলিত একটি পদ্ধতির অনুসরণ করেছেন এবং তা তিনটি বিষয় বস্তুতে বিন্যাস করেছেন। যেমন: ১. আল-মুবতাদা ২. আল-মাব'আছ ৩. আল-মাগাযী

১. আল-মুবতাদা
এ অধ্যায়ে ইবন ইসহাক জাহিলী যুগের আরবের ইতিহাস আলোচনা করেছেন। তিনি এ অধ্যায়ের বিষয়বস্তু চারটি পরিচ্ছেদে সাজিয়েছেন। প্রথম পরিচ্ছেদে প্রাক-ইসলামী যুগের ওহী, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ইয়ামনের ইতিহাস, তৃতীয় পরিচ্ছেদে আরবগোত্রসমূহ ও তাদের মূর্তি পূজা এবং চতুর্থ পরিচ্ছেদে আমাদের মহানবী (সা)-এর প্রত্যক্ষ পূর্ব পুরুষ ও মক্কার ধর্মসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এ অধ্যায়ের সনদের উপর নির্ভরতা খুবই কম।

২. আল-মাব'আছ
এ অধ্যায়ে ইবন ইসহাক দু'টি বিষয়ে আলোচনা করেছেন। প্রথম পরিচ্ছেদে নবী কারীমের (সা) মাক্কী জীবন এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে হিজরাত ও মদীনায় প্রথম বছরের কর্মতৎপরতার বিবরণ এসেছে। মাব'আছ অধ্যায়ে যে বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষণীয় তা হলো পূর্ববর্তী অধ্যায়ের তুলনায় সনদের আধিক্য এবং বিশেষভাবে ইবন ইসহাকের মাদানী শিক্ষকদের বর্ণনার উপর নির্ভরতা, যা তিনি সন ভিত্তিক বিন্যাস করেছেন।

এ অংশে সনদ ছাড়া অথবা সনদ সহকারে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনার পাশাপাশি মদীনার বিভিন্ন গোত্রের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) বিখ্যাত চুক্তিগুলো, যা মদীনার সামাজিক বিধি-বিধান নামে আখ্যায়িত, সে সম্পর্কে ইবন ইসহাক সংগৃহীত দলিল-প্রমাণাদি পাওয়া যায়। এতে আরো পাওয়া যায় একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা, যার কিছু অংশে রয়েছে প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের নাম, কিছু অংশে হাবশার মুহাজিরদের ও প্রথম যুগের আনসারদের নাম ইত্যাদি। এভাবে দ্বিতীয় অধ্যায় শেষ হয়েছে।

৩. আল-মাগাযী
ইবন ইসহাক তাঁর আল-মাগাযীতে মদীনায় মুশরিক গোত্রসমূহের বিরুদ্ধে নবী কারীমের (সা) প্রথম যুদ্ধের আহ্বান থেকে তাঁর ওফাত পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। এ অংশে তিনি মহানবীর (সা) অন্তিম রোগ ও ওফাতের বিবরণ ছাড়া আর কিছু বিস্তারিত বর্ণনা করেননি। তবে এ অংশে সব কিছুই সনদ সহকারে বর্ণিত হয়েছে। যুদ্ধগুলো বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। আলোচ্য বিষয়ের সারকথা ভূমিকায় বর্ণনা করেছেন। আল-মাগাযীতে নামের তালিকার সংখ্যাও অনেক। যেমন বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, নিহত, আহত ও বন্দী ব্যক্তিবর্গের তালিকা। অনুরূপ তালিকা দিয়েছেন উহুদ, খন্দক, খায়বার, মৃতাসহ বিভিন্ন যুদ্ধেরও। হাবশা থেকে প্রত্যাবর্তনকারী মুহাজিরদেরও ভিন্ন একটি তালিকা তিনি দিয়েছেন।

একটি কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইবন ইসহাক তাঁর গ্রন্থের তৃতীয় অংশের নামে সম্পূর্ণ গ্রন্থটির নামকরণ করেন- আল-মাগাযী। এরপর নামটির এত প্রসিদ্ধি ঘটে যে, পরবর্তীকালে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সীরাত লেখক তাঁদের রচিত রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনীকে এ নামে নামকরণ করেছেন।

ইবন ইসহাকের আল-মাগাযী যে এক বিরাট কর্মকাণ্ড সে ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। বিভিন্ন বর্ণনা ও খবর সংগ্রহের ব্যাপারে তিনি তাঁর সবটুকু শ্রম ব্যয় করেছেন। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী সকল রাবী ও সূত্রের উল্লেখসহ সকল খবর লিপিবদ্ধ করেছেন। এ গ্রন্থে ইবন ইসহাকের সংকলন ও বিন্যাসের অসাধারণ ক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনিই সর্বপ্রথম সীরাত বিষয়ক ঘটনাবলী ইতিহাসের পদ্ধতিতে একের পর এক সাজান। তাঁর পূর্বে আর কেউ এমনভাবে সাজাননি। এসব কারণে তিনি সীরাত ও মাগাযী রচনায় পথিকৃতের স্থান দখল করে আছেন। আবূ আহমাদ ইবন 'আদী বলেন: "তাঁর থেকে "আল-মাগাযী" বর্ণনা করেছেন ইবরাহীম ইবন সা'দ, সালামা ইবন আল-ফাদল, মুহাম্মাদ ইবন সালামা, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-উমাবী, সা'ঈদ ইবন বাযীগ, জারীর ইবন হাযিম, যিয়াদ আল-বাক্বাঈ ও আরো অনেকে। তিনি "আল-মুবতাদা" ও "আল-মাব'আছ" আল-বাক্বাঈ থেকে বর্ণনা করেছেন। কোন কিছুই অর্জিত হয় না- এমন সব গ্রন্থ পাঠের ব্যস্ততা থেকে রাজা-বাদশাদেরকে সরিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) আল- মাগাযী, আল-মাব'আছ ও আল-মুবতাদা (পৃথিবীর সূচনা) পাঠের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজটি ছাড়া আর কোন কিছুই যদি ইবন ইসহাক না করতেন, তাহলেও এই একটি মাত্র কাজের জন্য তিনি সকলকে অতিক্রম করে যেতেন। তাঁর পরে আরো অনেকে এ বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন, কিন্তু কেউই তাঁর সমকক্ষতা লাভ করতে সক্ষম হননি।'

ইবন ইসহাক তাঁর আল-মাগাযী গ্রন্থে বিভিন্ন ব্যক্তি, গোত্র-গোষ্ঠী ও জাতির নামে বহু আরবী কবিতা সন্নিবেশ করেছেন। তাঁর সমকালীন ও পরবর্তীকালের বসরা ও কুফার আরবী ভাষা-সাহিত্যের পণ্ডিতগণ সেসব কবিতার অধিকাংশ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে মত প্রকাশ করেছেন। পরবর্তীকালে ইবন হিশাম বসরা-কৃষ্ণার পণ্ডিতদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সেসব কবিতার সত্যাসত্য যাচাই করেছেন এবং অধিকাংশ বাদ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে হিজরী তৃতীয় শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আরবী সাহিত্য বিশারদ মুহাম্মাদ ইবন সাল্লাম আল-জামহী (মৃ. ২৩২) যে মতামত প্রকাশ করেছেন তা উপস্থাপন করে আমাদের বক্তব্য শেষ করছি। তিনি বলেন: 'যারা আরবী কবিতার ক্ষতি ও ধ্বংস করেছে এবং কবিতার নামে সব আবর্জনা ও জঞ্জাল গ্রহণ করেছে, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক তাদের অন্যতম। তিনি একজন সীরাত বিশেষজ্ঞ। লোকেরা তাঁর নিকট থেকে আরবী কবিতা গ্রহণ করেছে। তিনি আপত্তি করে বলতেন: কবিতা সম্পর্কে আমার কোন জ্ঞান নেই। আমার নিকট কবিতা আনা হয়, আর তা গ্রহণ করি। এটা তাঁর জন্য কোন কৈফিয়ত হতে পারে না। তিনি তাঁর সীরাত গ্রন্থে এমন সব লোকের কবিতা সন্নিবেশ করেছেন যারা কখনো কোন কবিতা বলেনি। পুরুষদের কবিতা ছাড়াও মহিলাদের কবিতাও সংকলন করেছেন। এ পর্যন্ত তিনি থেমে থাকেননি, বরং 'আদ ও ছামূদ জাতি পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছেন। তিনি কি নিজে কখনো চিন্তা করেননি, এসব কবিতা কারা এতদিন ধারণ করেছে এবং হাজার হাজার বছর ধরে কে বা তা সংরক্ষণ করেছে? আল্লাহ বলেন: তিনিই প্রথম 'আদকে ধ্বংস করেছেন এবং ছামুদকে এমনভাবে নির্মূল করেছেন যে, তাদের একজনকেও বাঁচিয়ে রাখেননি। 'আদ জাতি সম্পর্কে অন্যত্র বলেন: তুমি কি এখনো তাদের কাউকে অবশিষ্ট দেখতে পাবে? তিনি আরো বলেন: তোমাদের কাছে কি সেই জাতিসমূহের অবস্থার বিবরণ আসেনি যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে? নূহের জাতি, 'আদ-ছামুদ এবং তাদের পরবর্তীকালের বহু জাতি যাদের সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।'

কাদরিয়া মতবাদ
কোন কোন বর্ণনায় জানা যায় যে, ইবন ইসহাক কাদরিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। আরবী 'কদর' শব্দ হতে 'কাদরিয়া' কথাটি এসেছে। 'কদর' মানে শক্তি। এই সম্প্রদায়ের চিন্তাবিদরা মানুষের ইচ্ছার স্বাতন্ত্র্যে ও কর্মের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন বলে তারা কাদরিয়া নামে পরিচিত। তবে তিনি কাদরিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না বলেও অনেকে বলেছেন। মুহাম্মাদ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন নুমাইর বলেন, ইবন ইসহাক কাদরিয়া ছিলেন বলে দোষারোপ করা হয়, অথচ এই মতবাদের সাথে তাঁর দূরতম সম্পর্কও ছিল না।

মৃত্যু
প্রথম জীবনে তিনি মদীনায় বসবাস করতেন। পরে এখান থেকে কৃষ্ণা, জাযীরা, রায় প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণ করতে থাকেন। সর্বশেষ বাগদাদে যান এবং সেখানে হিজরী ১৫১, খ্রী. ৭৬৮, মতান্তরে ১৫২ অথবা ১৫৩ সনে ইনতিকাল করেন। খলীফা হারুন আর-রাশীদের মা খায়যুরানের কবরস্তানে সমাহিত হন।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৬/৭৩
২. প্রাগুক্ত-১৬/৭০; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭২-১৭৩
৩. তারীখু বাগদাদ-১/২২৪
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৮, ৮১; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭৩
৫. তারীখু বাগদাদ-১/২২৪; তাবি'ঈন-৩৯৯
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭৩
৭. তারীখু বাগদাদ-১/২২৪; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৪
৮. প্রাগুক্ত
৯. ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৮৪; তাবি'ঈন-৩৯৯
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৭৩
১১. তারীখু বাগদাদ-১/2১৯; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৪
১২. তারীখু বাগদাদ-১/২২৩
১৩. ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৮৩; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১৭৩
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৫
১৫. তারীখু বাগদাদ-১/২২৪; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৭
১৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৯, ৪০
十七. প্রাগুক্ত
十八. তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৮
十九. প্রাগুক্ত-১৬/৭২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭২; তাহযীব আত-তাহ্যব-৯/৩৯
二十. প্রাগুক্ত
二十一. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭৩
二十二. তারীখু বাদগাদ-১/২১৫
二十৩. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৪
二十四. তারীখু বাগদাদ-১/২১৯; তাবি'ঈন-৪০৩
二十五. প্রাগুক্ত
二十六. ড. মাহমুদুল হাসান, আরবূ মে তারীখ নিগারী কি নাশূ ও নামা (ইসলাম আওর আসরে জাদীদ, খণ্ড-১. ১৯৬৭)
二十七. ইবন নাদীম, আল-ফিরিস্ত-১৩৬
二十八. তারীখু বাগদাদ-১/২২১
二十九. তাবাকাত-৭/২৭; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৮১
三十. আল-মাগাযী আল-উলা' ওয়া মুয়াল্লিফুহা-৭৫-৮১
三十一. তাহযীব আল-কামাল-১৬/৮২
三十二. তাবাকাতু ফুহুল আশ-শু'আরা'-৭-৮
三十三. তারীখু বাগদাদ-১/২২২; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৮
三十四. তাবাকাত-৭/২৭' তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৭৩; আল-আ'লাম-৬/২৮

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মুজাহিদ ইবন জাবর (রহ)

📄 মুজাহিদ ইবন জাবর (রহ)


হযরত মুজাহিদ (রহ)-এর ডাকনাম আবুল হাজ্জাজ। তিনি কায়স ইবন আস-সায়িব আল-মাখযূমীর আযাদকৃত দাস ছিলেন। তাঁর পিতার নাম জাবর ও জুবায়র দু'রকম বর্ণিত হয়েছে। তিনি একজন দাস হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞানের জগতের সম্রাট ছিলেন। জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন ইমাম পদ মর্যাদার অধিকারী। ইবন সা'দ লিখেছেন: 'তিনি ছিলেন একজন ফকীহ, 'আলিম, বিশ্বস্ত ও বহু হাদীছের ধারক-বাহক।' ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে জ্ঞানের ভাণ্ডার বলেছেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মহত্ত্ব ও ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য আছে। তাফসীর, হাদীছ, ফিকহসহ সকল ইসলামী জ্ঞানে তিনি ইমাম পদ মর্যাদা লাভ করেন।

'ইলমুল কিরাআত ও তাফসীর
আল-কুরআনের পঠন-পাঠনও একটি শাস্ত্র, যাকে ইলমুল কিরাআত বা কিরাআত শাস্ত্র বলা হয়। এটা উলূম আল-কুরআনের একটি শাখা। এ শাস্ত্রে কুরআন পাঠের যাবতীয় নিময়- পদ্ধতি পঠিত হয়। তিনি এই 'ইল্মুল কিরাআত ও তাফসীর শাস্ত্রের সে যুগের একজন খ্যাতিমান 'আলিম ছিলেন। তাফসীরর জ্ঞান তিনি অর্জন করেন মুসলিম উম্মাহ্র জ্ঞানের সাগর হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে। পূর্ণ তিরিশ বার তিনি তাঁকে কুরআন শোনান ও তাফসীর শোনেন। এত মনোযোগ ও অধ্যবসায় সহকারে এ কাজ করতেন যে, প্রত্যেক সূরা পাঠ করে থেমে যেতেন, তারপর সূরা ও বিভিন্ন আয়াতের শানে নুযূলসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন করে জেনে নিতেন। তাঁর এমন মনোযোগ, অধ্যবসায় ও 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) মত মহান মুফাস্সিরে কুরআনের (কুরআন ভাষ্যকার) নিকট শিক্ষার কল্যাণে তিনি একজন উঁচু স্তরের মুফাস্সিরে পরিণত হন। খাসীফ বলেন, মুজাহিদ তাফসীরের সবচেয়ে বড় 'আলিম ছিলেন। হযরত কাতাদা (রহ) বলতেন, সেই সময়ের জীবিত সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে মুজাহিদ সবচেয়ে বড় ‘আলিম। পবিত্র কুরআনের একজন বিখ্যাত কারীও ছিলেন তিনি। সুফইয়ান আছ- ছাওরী বলতেন, তোমরা মুজাহিদ, সা'ঈদ ইবন জুবায়র, 'ইকরিমা ও আদ-দাহ্হাক ইবন মুযাহিম- এই চারজনের নিকট থেকে কুরআনের তাফসীর গ্রহণ করবে।

হাদীছ
তিনি হাদীছের একজন অতি প্রসিদ্ধ 'আলিম ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে মুফাস্সির ও হাদীছের হাফিজ, ইবন সা'দ – বহু হাদীছের ধারক-বাহক এবং ইমাম নাওবী (রহ) হাদীছের ইমাম বলেছেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) তাঁর স্মৃতি শক্তির দারুণ প্রশংসা করতেন। বলতেন, হায়, নাফি'র মুখস্থ শক্তি যদি তোমার মত হতো!

হযরত 'আলী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-আ'স, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, আবূ হুরায়রা, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, রাফি' ইবন খাদীজ, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা সিদ্দীকা, জুওয়ায়রিয়া বিনত আল-হারীছ, উম্মু হানী (রা) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ সাহাবীদের নিকট থেকে তিনি হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। তাছাড়া তাবি'ঈদের মধ্যে 'আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা, তাউস, 'আবদুল্লাহ ইবন সায়িব, 'আবদুল্লাহ ইবন সানজারা, 'আবদুর রহমান ইবন সাফওয়ান, 'উমার ইবন আসওয়াদ, মুওয়াররিক আল-'আজলী, আবূ 'আয়‍্যাশ আয-যারকী, আবূ 'উবায়দা ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন মাসউদ (রহ) প্রমুখের নিকট থেকেও তিনি হাদীছ শোনেন।

তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডি অনেক প্রশস্ত। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: আইউব আস-সিখতিয়ানী, 'আতা', 'ইকরিমা ইবন 'আওন, 'আমর ইবন দীনার, আবূ ইসহাক সুবায়'ঈ, আবুয যুবায়র মাক্কী, কাতাদা, হাবীব ইবন আবী ছাবিত, হাসান ইবন 'আমর, সালামা ইবন কাহয়াল, সুলায়মান আল-আহওয়াল, সুলায়মান আল-আ'মাশ, মুসলিম, আল-বাতীন, তালহা ইবন মুসরিফ, 'আবদুল্লাহ ইবন কাছীর (রহ) ও আরো অনেকে।

ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রেও তিনি একজন ইমাম ও মুজতাহিদ পর্যায়ের ব্যক্তি ছিলেন। ইমাম যাহাবী, ইবন হাজার, ইমাম নাওবী (রহ) সকলে তাঁর ফিক্‌ বিষয়ে পারদর্শিতার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর দক্ষতার জন্য এ সনদই যথেষ্ট যে, সে কালের জ্ঞানের নগরী মক্কার শ্রেষ্ঠ মুফতীদের মধ্যে তিনিও একজন।

আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জ্ঞান চর্চা
জ্ঞান চর্চার উদ্দেশ্য পার্থিব উপকার প্রাপ্তির আশা থেকে একেবারে মুক্ত থাকে না। কিন্তু হযরত মুজাহিদের জ্ঞান চর্চা সব রকম চাওয়া-পাওয়ার আশা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। সালামা ইবন কুহায়ল বলেন, 'আতা', তাউস ও মুজাহিদ- এই তিনজন ছাড়া আমি এমন কাউকে পাইনি যার জ্ঞান চর্চা ছিল শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

জ্ঞানের সাথে তাঁর মধ্যে আল্লাহ-ভীতি ও দুনিয়া বিরাগী মনোভাব পূর্ণমাত্রায় ছিল। ইবন হিব্বান বলেন, মুজাহিদ ছিলেন একজন ফকীহ, আল্লাহ-ভীরু, তাপস ও দুনিয়া বিরাগী মানুষ।

দুনিয়ার সাথে সম্পর্কহীনতা
আজীবন তিনি দুনিয়ার কাছে অপরিচিত ও তার সাথে সম্পর্কহীন থেকে গেছেন। পার্থিব ভোগ-বিলাস বা কোন জিনিসের প্রতি তাঁর মন কখনো আসক্তি বোধ করেনি। সব সময় চিন্তাক্লিষ্ট ও বিষণ্ণ থাকতেন। আ'মাশ বলেন, মুজাহিদকে আমরা যখনই দেখতাম, বিষণ্ণ দেখতাম। জনৈক ব্যক্তি তাঁকে এই বিষণ্ণতার কারণ জিজ্ঞেস করে। তিনি বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) আমার হাত মুট করে ধরে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমার হাত ধরে বলেছেন, 'আবদুল্লাহ! দুনিয়াতে এমনভাবে থাক যেন মনে হয় তুমি কোন মুসাফির অথবা কোন পথিক।'

সরল ও সাদাসিধে জীবন
বাহ্যিক চাকচিক্য ও সাজ-শোভার প্রতি এতই বেপরোয়া ছিলেন যে, প্রথম দৃষ্টিতে তাঁর ও একজন অতি সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা দুঃসাধ্য ছিল। আ'মাশ বলেন, যখন আমি মুজাহিদকে তাঁর বাহ্যিক অবস্থায় দেখতাম তখন তাঁকে একজন অতি তুচ্ছ মানুষ মনে হতো। বাহ্যিক বেশভূষায় কোন সহিস বলে ধারণা হতো। মনে হতো তার গাধা হারিয়ে গেছে এবং সে অস্থির ও উদ্ভ্রান্তের মত তা তালাশ করছে। তবে জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর যে সম্মান ও মর্যাদা ছিল তাতে কোন হেরফের হতো না। তিনি যখন কথা বলতেন তখন তাঁর মুখ থেকে যেন মুক্তো ঝরতো। অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁকে সম্মান ও সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখতেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) মত মহান ব্যক্তি তাঁর বাহনের জিনের আংটা চেপে ধরে তাঁকে উঠা-নামায় সাহায্য করতেন। তিনি বলতেন, আমি 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) সাহচর্য পেয়েছি। আমি চাইতাম তাঁর সেবা করতে, কিন্তু উল্টো তিনিই আমার সেবা করতেন।

হযরত মুজাহিদের (রহ) ভ্রমণ করা ও পৃথিবীর বিস্ময়কর বস্তু ও নিদর্শনসমূহ দেখার দারুণ শখ ছিল। তিনি বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখতেন। তিনি বাবেলে যান কুরআনে বিধৃত হারূত-মারূতের ঘটনাটির স্থান পরিদর্শনের জন্য।

ওফাত
মৃত্যুর সন সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা আছে। হিজরী ১০২ মতান্তরে ১০৩ সনে তাঁর মৃত্যু হয়। নামাযে সিজদা অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি সত্তর (৭০), মতান্তরে আশি (৮০) বছর জীবন লাভ করেন।

টিকাঃ
১. আত-তাবাকাত-৫/৪৬৬
২. আল-ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাহাবা-৩/৪৮৫-৪৮৬ (জীবনী নং ৮৩৬৩); 'আসরুত তাবি'ঈন-৪৫৭
৩. আত-তাবাকাত-৫/৪৬৬
৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯২
৫. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৩
৬. আত-তাবাকাত-৫/৪৬৬
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/৪৩; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯২
৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৩
৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯২
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/৪৪
১১. 'আসরুত তাবি'ঈন-৪৫৬, ৪৫৯
১২. শাজারাত আয-যাহাব-১/১২৫
১৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/৪২
十四. প্রাগুক্ত
十五. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৩
十六. ই'লাম আল-মুওয়ার্কি'ঈন-১/২৬
十七. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৪২; তারীখু ইবন 'আসাকির-১৬/১২৯
十八. প্রাগুক্ত
十九. শাজারাত আয-যাহাব-১/১২৫
二十. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯২; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৪৫৩
二十一. প্রাগুক্ত; তারীখু ইবন 'আসাকির-১৬/১২৯
二十二. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৪৫৫
二十三. আত-তাবাকাত-৫/৪৬৬; 'আসরুত তাবি'ঈন-৪৬৫

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী ইবন হুসায়ন আল-বাকির (রহ)

📄 মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী ইবন হুসায়ন আল-বাকির (রহ)


হযরত রাসূলে কারীমের (সা) দৌহিত্র হযরত হুসায়নের (রা) পৌত্র মুহাম্মাদের ডাকনাম আবূ জা'ফার এবং উপাধি আল-বাকির। তাঁর পিতা ইমাম যায়নুল 'আবিদীন 'আলী ইবন হুসায়ন (রা) এবং মাতা হযরত ইমাম হাসানের (রা) কন্যা উম্মু 'আবদিল্লাহ। সুতরাং ইমাম হুসায়ন ও ইমাম হাসান (রা) যথাক্রমে তাঁর মহান দাদা ও নানা। পিতৃ ও মাতৃ উভয়কুলের দিক দিয়ে তাঁর ধমনীতে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) পবিত্র রক্ত বহমান ছিল। হিজরী ৫৭ সনের সফর মাসে তিনি মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। এই হিসাবে কারবালায় হযরত ইমাম হুসায়নের (রা) মর্মান্তিকভাবে শাহাদাত বরণের সময় তিনি তিন/চার বছরের শিশু মাত্র।

জ্ঞান ও মনীষা
হযরত বাকির ছিলেন সেই খনির রত্ন ও রাতের বাতি যার কল্যাণে সারা পৃথিবীতে 'ইল্ম ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। তারপর তিনি ইমাম যায়নুল 'আবিদীনের (রহ) মত জ্ঞানের দু'সাগরের মোহনা সমতুল্য পিতার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। বংশীয় ঐতিহ্যের প্রভাব ছাড়াও তাঁর মধ্যে স্বভাবগতভাবে জ্ঞান অর্জনের প্রবল আগ্রহও ছিল। এ সকল কারণ সম্মিলিতভাবে তাঁকে তাঁর যুগের একজন শীর্ষ স্থানীয় 'আলিমে পরিণত করে। তিনি স্বীয় অগাধ জ্ঞানের কারণে "বাকির" অভিধায় ভূষিত হন। আরবী বাকির শব্দটি বাক্কারা থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বিদীর্ণ করা, ফেঁড়ে ফেলা। তিনি 'ইল্ম তথা জ্ঞানকে বিদীর্ণ করে তার মূল ও অভ্যন্তরীণ গোপন রহস্য অবগত হন, তাই তাঁকে বাকির বলা হয়।

অনেক 'আলিম মনে করতেন তাঁর মহান পিতার জ্ঞানের চেয়েও তাঁর জ্ঞান অনেক ব্যাপক ছিল। মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদির বলেন, যতদিন আমি মুহাম্মাদকে না দেখেছি ততদিন মনে করতাম, এমন কোন 'আলিম নেই যাঁকে 'আলী ইবন হুসায়ন যায়নুল 'আবিদীনের (রহ) উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়। তিনি তাঁর সময়ে তাঁর পুরো খান্দানের নেতা ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: "তিনি তাঁর সময়ে বানু হাশিমের নেতা ছিলেন।" ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি একজন অতি সম্মানিত তাবি'ঈ ও শ্রেষ্ঠ ইমাম ছিলেন। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে সকলে একমত। মদীনার ফিক্হ ও ইমামগণের মধ্যে তিনি পরিগণিত। ইমাম যাহাবী তাঁকে শীর্ষস্থানীয় দৃঢ়পদ ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন।

হাদীছ
হাদীছ তো তাঁর নিজ গৃহের সম্পদ। এ কারণে এর সবচেয়ে বেশী অধিকার ছিল তাঁর। ইবন সা'দ বলেছেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, বহু জ্ঞান ও হাদীছের ধারক-বাহক।" এই জ্ঞান তিনি অর্জন করেন পারিবারিক পরিমণ্ডলে নিজ বংশের ঊর্ধ্বতন পুরুষদের নিকট থেকে। যেমন: পিতা ইমাম যায়নুল 'আবিদীন, নানা হাসান, দাদা হুসায়ন ইবন 'আলী, মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা, দাদার চাচাতো ভাই 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস ও উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা ও উম্মু সালামা (রা) প্রমুখ মহান ব্যক্তিবর্গের জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে পরোক্ষভাবে অর্জন করেন। অর্থাৎ তাঁদের সূত্রে তাঁর সকল বর্ণনা "মুরসাল”। নিজ পরিবারের বাইরে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা), সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', হারমালা, 'আতা' ইবন ইয়াসার, ইয়াযীদ ইবন হুরমুয, আবু মুররা (রহ) প্রমুখের নিকট থেকেও ফায়দা হাসিল করেন।

তাঁর ছাত্রবৃন্দ
সেই সময়ের বড় বড় ইমাম যেমন: আবান ইবন তাগলিব আল-কুফী, জাবির ইবন ইয়াযীদ আল-জু'ফী, হাজ্জাজ ইবন আরতাত, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আতা', আওযা'ঈ, আল-আ'মাশ, ইবন জুরাইজ, ইমাম যুহরী, 'আমর ইবন দীনার, আবু ইসহাক সুবায়'ঈ (রহ) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ এবং তাবি' তাবি'ঈনের বড় একটি দল তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করেন।

ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। ইবন আল-বারকী তাঁকে ফকীহ ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী বলেছেন। মনীষীগণ তাঁকে মদীনার তাবি'ঈ ফকীহ ও ইমামদের মধ্যে গণ্য করেছেন।

'イবাদত-বন্দেগী
তিনি সেই সব মহান ব্যক্তিবর্গের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন যাঁদের জীবনের প্রধান কাজই ছিল 'ইবাদত-বন্দেগী করা, আর যে পরিবেশে তিনি জন্মের পর চোখ মেলে তাকান সেখানে সর্বক্ষণ আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের যিক্র ও তাসবীহ-তাহমীদের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হতে থাকতো। এ কারণে 'ইবাদতের সেই প্রাণশক্তি তাঁর মধ্যেও অনুপ্রবেশ করেছিল। রাত-দিন দেড়শো রাক'আত নফল নামায আদায় করতেন। অতিরিক্ত সিজদার কারণে কপালে স্পষ্ট দাগ পড়ে গিয়েছিল। তবে সেটা তেমন গভীর ছিল না।

হযরত আবু বকর ও 'উমারেরারা থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বিদীর্ণ করা, ফেঁড়ে ফেলা। তিনি 'ইল্ম তথা জ্ঞানকে বিদীর্ণ করে তার মূল ও অভ্যন্তরীণ গোপন রহস্য অবগত হন, তাই তাঁকে বাকির বলা হয়।

অনেক 'আলিম মনে করতেন তাঁর মহান পিতার জ্ঞানের চেয়েও তাঁর জ্ঞান অনেক ব্যাপক ছিল। মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনকাদির বলেন, যতদিন আমি মুহাম্মাদকে না দেখেছি ততদিন মনে করতাম, এমন কোন 'আলিম নেই যাঁকে 'আলী ইবন হুসায়ন যায়নুল 'আবিদীনের (রহ) উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়। তিনি তাঁর সময়ে তাঁর পুরো খান্দানের নেতা ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: তিনি তাঁর সময়ে বানু হাশিমের নেতা ছিলেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি একজন অতি সম্মানিত তাবি'ঈ ও শ্রেষ্ঠ ইমাম ছিলেন। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে সকলে একমত। মদীনার ফিক্হ ও ইমামগণের মধ্যে তিনি পরিগণিত। ইমাম যাহাবী তাঁকে শীর্ষস্থানীয় দৃঢ়পদ ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন।

হাদীছ
হাদীছ তো তাঁর নিজ গৃহের সম্পদ। এ কারণে এর সবচেয়ে বেশী অধিকার ছিল তাঁর। ইবন সা'দ বলেছেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, বহু জ্ঞান ও হাদীছের ধারক-বাহক।" এই জ্ঞান তিনি অর্জন করেন পারিবারিক পরিমণ্ডলে নিজ বংশের ঊর্ধ্বতন পুরুষদের নিকট থেকে। যেমন: পিতা ইমাম যায়নুল 'আবিদীন, নানা হাসান, দাদা হুসায়ন ইবন 'আলী, মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা, দাদার চাচাতো ভাই 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস ও উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা ও উম্মু সালামা (রা) প্রমুখ মহান ব্যক্তিবর্গের জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে পরোক্ষভাবে অর্জন করেন। অর্থাৎ তাঁদের সূত্রে তাঁর সকল বর্ণনা "মুরসাল”। নিজ পরিবারের বাইরে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা), সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী রাফি', হারমালা, 'আতা' ইবন ইয়াসার, ইয়াযীদ ইবন হুরমুয, আবু মুররা (রহ) প্রমুখের নিকট থেকেও ফায়দা হাসিল করেন।

তাঁর ছাত্রবৃন্দ
সেই সময়ের বড় বড় ইমাম যেমন: আবান ইবন তাগলিব আল-কুফী, জাবির ইবন ইয়াযীদ আল-জু'ফী, হাজ্জাজ ইবন আরতাত, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আতা', আওযা'ঈ, আল-আ'মাশ, ইবন জুরাইজ, ইমাম যুহরী, 'আমর ইবন দীনার, আবু ইসহাক সুবায়'ঈ (রহ) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ এবং তাবি' তাবি'ঈনের বড় একটি দল তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করেন।

ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। ইবন আল-বারকী তাঁকে ফকীহ ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী বলেছেন। মনীষীগণ তাঁকে মদীনার তাবি'ঈ ফকীহ ও ইমামদের মধ্যে গণ্য করেছেন।

'ইবাদত-বন্দেগী
তিনি সেই সব মহান ব্যক্তিবর্গের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন। যাঁদের জীবনের প্রধান কাজই ছিল 'ইবাদত-বন্দেগী করা, আর যে পরিবেশে তিনি জন্মের পর চোখ মেলে তাকান সেখানে সর্বক্ষণ আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের যিক্র ও তাসবীহ-তাহমীদের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হতে থাকতো। এ কারণে 'ইবাদতের সেই প্রাণশক্তি তাঁর মধ্যেও অনুপ্রবেশ করেছিল। রাত-দিন দেড়শো রাক'আত নফল নামায আদায় করতেন। অতিরিক্ত সিজদার কারণে কপালে স্পষ্ট দাগ পড়ে গিয়েছিল। তবে সেটা তেমন গভীর ছিল না।

হযরত আবু বকর ও 'উমারের (রা) প্রতি শ্রদ্ধাবোধ
নিজের পূর্বপুরুষ ও অন্যান্য মহান ব্যক্তির মত হযরত আবূ বাকরের (রা) প্রতিও ছিল তাঁর প্রগাঢ় ভক্তি ও শ্রদ্ধাবোধ। জাবির বলেন, একবার আমি মুহাম্মাদ ইবন 'আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বংশের কেউ কি আবু বকর ও 'উমারকে (রা) গালি দিতেন? বললেন, না। আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং তাঁদের মাগফিরাতের দু'আ করি। 'ঈসা ইবন দীনার আল-মুয়ায্যিনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি তাঁকেও এরূপ জবাব দেন এবং তাঁদের দু'জনকে ভালোবাসতে ও তাঁদের জন্য দু'আ করতে বলেন। সালিম ইবন আবী হাফসা বলেন, আমি ইমাম আল-বাকির ও তাঁর পুত্র জা'ফার আস- সাদিকের নিকট আবূ বকর ও 'উমার (রা) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি, তিনি বলেন, সালিম! আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং তাঁদের দুশমনদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তাঁরা দু'জন ছিলেন পথপ্রদর্শক ইমাম। আমাদের পরিবারের সকলকে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে দেখেছি।

বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা
কিছু দল-উপদল এমন সব ভ্রান্ত 'আকীদা-বিশ্বাস ঐ সকল মহান ব্যক্তিবর্গের প্রতি আরোপ করেছে যার সাথে তাঁদের বিন্দু মাত্র সম্পৃক্ততা ছিল না। দীনী বিষয়ে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন ইসলামী আকীদা ছাড়া আর কোন রকম নতুন আকীদা তাঁরা পোষণ করতেননা। জাবির বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন 'আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের আহলি বায়তের মধ্যে কেউ কি এমন ধারণা পোষণ করতেন যে, কোন পাপ শিরক? বললেন, না। আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলাম; তাদের কেউ কি পুনর্জীবনের প্রবক্তা ছিলেন? বললেন, না।

ওফাত
তিনি হামিয়্যা নামক স্থানে ইনতিকাল করেন এবং লাশ মদীনায় এনে জান্নাতুল বাকী'তে দাফন করা হয়। মৃত্যুর সন নিয়ে মত পার্থক্য আছে। হিজরী ১১৪, ১১৫, ১১৭ ও ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে। কত বছর জীবন লাভ করেন সে সম্পর্কে দু'টি বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা মতে ৫৮ বছর এবং অন্যটি মতে ৭৩ বছর। তবে দ্বিতীয়টি যে সত্য নয় তা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ হিজরী ৫৭ সনে যে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সে ব্যাপারে সকলে একমত। সেই হিসাবে প্রথম বর্ণনাটি অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ তখন তাঁর বয়স ৫৮ থেকে ৬১ বছরের মধ্যে হয় এবং কোনভাবেই ৭৩ বছর হয় না।

সন্তানাদি
ইমাম আল-বাকির (রহ) অনেকগুলো সন্তান রেখে যান। জা'ফার ও 'আবদুল্লাহ ছিলেন হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) দৌহিত্রী উম্মু ফারওয়ার (রহ) গর্ভজাত; ইবরাহীম ছিলেন উম্মু হাকীম বিনত উসায়দের গর্ভজাত; 'আলী ও যায়নাব ছিলেন এক দাসীর গর্ভজাত এবং উম্মু সালামা আরেক দাসীর গর্ভজাত ছিলেন। তাঁদের সকলের মধ্যে জা'ফার, যিনি আস-সাদিক উপাধি প্রাপ্ত, সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং তিনি তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত হন।

ইমাম আল-বাকির সুন্দর বেশ-ভূষা পছন্দ করতেন। 'খুয' নামক এক প্রকার রেশমের মূল্যবান কাপড় ব্যবহার করতেন। সাদা ও রঙ্গীন দু'ধরনের পোশাকই ব্যবহার করতেন। পশমী বুটিদার কাপড়ও পরতেন। চুল ও দাড়িতে খিজাব লাগাতেন।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৩
২. ওয়াফইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৫০
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৭
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫০
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৭. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৭
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৯. আত-তাবাকাত-৫/২২৮; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৪
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫০; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৭৩
১১. প্রাগুক্ত
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৪
১৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
১৫. আত-তাবাকাত-৫/২৩৬
১৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৫
১৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫১; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৪
১৮. আত-তাবাকাত-৫/২৩৬
১৯. ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৫০; আত-তাবাকাত-৫/২৩৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
২০. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫১; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৫
২১. আত-তাবাকাত-৫/২৩৮
২২. প্রাগুক্ত; তাবি'ঈন-৪৫১

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মাকহূল আদ-দিমাশক্বী (রহ)

📄 মাকহূল আদ-দিমাশক্বী (রহ)


হযরত মাকহুলের (রহ) কুনিয়াত তথা ডাকনাম দু'টি : আবূ 'আবদিল্লাহ ও আবূ আইউব। তাঁর বংশ ও জন্মভূমি সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবন সা'দ তাঁকে কাবুলের অধিবাসী বলে উল্লেখ করেছেন। ইবন হাজার কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যার একাংশের দ্বারা জানা যায় তিনি একজন অনারব বংশোদ্ভূত এবং তাঁর পিতার নাম সোহরাব। আর ইবন হাজারের বর্ণনার কিছু অংশের দ্বারা প্রমাণিত হয়, তিনি মিসরীয় ছিলেন, আর কিছু বর্ণনা দ্বারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তিনি একজন আরব এবং হুযালী গোত্রের মানুষ।

তবে শেষের দু'টি বর্ণনা অর্থাৎ হুযালী ও মিসরীয় হওয়া অবশ্যই সঠিক নয়। কারণ তাঁর অনারব বংশোদ্ভূত হওয়া সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। তাঁর হুযালী ও মিসরীয় হওয়া এজন্য প্রসিদ্ধ যে, তিনি তাঁর জীবনের কিছু দিন হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির দাসত্বে ছিলেন এবং কিছুকাল মিসরে অবস্থান করেন।

এ ব্যাপারে ইমাম নাওবীর (রহ) বর্ণনাটি অধিক যুক্তিভিত্তিক ও সঠিক বলে প্রতিভাত হয়। তিনি তাঁকে অনারব বংশোদ্ভূত ও কাবুলের লোক বলেছেন। সুতরাং তার বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মাকহুলের (রহ) উর্ধ্বতন বংশধারা এ রকম :
মাকহুল বিন যিদ যা ইব্‌ন আবি মুসলিম শুহরাব বিন শায্‌ল বিন সান্‌দ বিন শাযদান বিন য়ুরদুক বিন ইয়াগুছ বিন কাস্‌রি কাবুলী ওয়া দামেশকী

এ বর্ণনা দ্বারা বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে যে সমন্বয়টি পাওয়া যায় তা হলো- তিনি অনারব বংশোদ্ভূত, জন্মভূমি কাবুল এবং দিমাশকে বসবাসকারী ছিলেন। আল-মিযী বলেন : দিমাশকের 'আল-আহাদ' বাজারের পাশে তাঁর বাড়ি ছিল।

তাঁর জীবনের প্রথম পর্বের ইতিহাস হলো, তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলেন। 'আমর তাঁকে হুযালী গোত্রের এক মহিলাকে দান করেন। এই দ্বিতীয়জনের দাসত্বের কারণে তাঁর সম্পর্ক আরোপের ক্ষেত্রে দু'টি বর্ণনা হয়ে গেছে। একটি হলো তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদের দাস ছিলেন, আর দ্বিতীয়টি হলো, তিনি ছিলেন হুযালী গোত্রের দাস। দু'টি বর্ণনাই সঠিক। তিনি নিজেই তাঁর দাসত্ব জীবনের সূচনা সম্পর্কে বলেছেন, "আমি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলাম। পরে তিনি আমাকে হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন।" কথাটি যুক্তিভিত্তিক এজন্য যে, 'আমরের পিতা সা'ঈদ হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে কাবুলের সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে জয় করেন। এটাই যুক্তিসিদ্ধ যে, এই অভিযানের সময় মাকহুল যুদ্ধবন্দী হিসেবে সা'ঈদের অধিকারে আসেন। আর একথার সমর্থন পাওয়া যায় খোদ মাকহুলের একটি বর্ণনাতে। তিনি বলেন, আমি এক সময় সা'ঈদের দাস ছিলাম। পরে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি তাঁর পুত্র 'আমরের অধিকারে এসে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক।

মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনযির শাক্কার বলেন: মাকতূলের মূল হলো হারাতের। তাঁর পিতার নাম আবূ মুসলিম শোহ্রাব ইবন শাযিল। দাদা শাযিল হারাতের অধিবাসী ছিলেন। তিনি কাবুলের এক রাজার মেয়ে বিয়ে করেন। স্ত্রীকে সন্তান সম্ভাবা অবস্থায় রেখে তিনি মারা যান এবং স্ত্রী পিতৃগৃহে চলে যান। সেখানে শোহরাবের জন্ম হয়। শোহরাব কাবুলে বেড়ে ওঠেন এবং সেখানে বিয়ে করেন। অতঃপর সেখানে মাকহুলের জন্ম হয়। একটু বড় হলে তিনি মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং সা'ঈদ ইবন আল- 'আসের হাতে অর্পিত হন। এভাবে তিনি দাসত্বের জালে জড়িয়ে পড়েন। সা'ঈদ ইবন আল-'আস আবার তাঁকে হুযাইল গোত্রের এক মহিলার হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেন। পরে এই মহিলা মাকহুলকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।

জ্ঞান অর্জনের জন্য ইসলামী বিশ্ব ভ্রমণ
মুসলমানরা যে দাসদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দাসত্বের নিকৃষ্ট জীবন থেকে বের করে পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দিত, মাকহুল তাঁর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন শুরু হয়েছে দাসত্বের মাধ্যমে এবং অবশেষে তিনি শামের জ্ঞানের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হন। জ্ঞান অন্বেষণে তাঁর স্বভাবগত আগ্রহ ছিল। এ কারণে দাসত্বের জীবনেই তিনি জ্ঞান অর্জনে মনোযোগী হন। পরে দাসত্ব থেকে মুক্তির পর তৎকালীন গোটা ইসলামী বিশ্বের সকল শ্রেষ্ঠ জ্ঞান কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি বলেন, যখন আমি দাসত্ব থেকে মুক্ত হই তখন মিসরের সকল জ্ঞান আত্মস্থ করে ফেলি। আর যতক্ষণ না আমার মধ্যে এ প্রত্যয় জন্মেছে যে, এখানকার সকল জ্ঞান আমি ধারণ করে ফেলেছি ততক্ষণ সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াইনি।

মিসরের জ্ঞান ভাণ্ডার শূন্য করার পর তিনি মদীনায় যান এবং সেখান থেকে যান ইরাকে। এ দু'স্থানের জ্ঞানের সকল ঝর্ণাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হওয়ার পর যান শামে। তথাকার জ্ঞানী-গুণীদের নিকট থেকে স্বীয় জ্ঞানভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করেন। মোটকথা, তিনি জ্ঞান অন্বেষণে ইসলামী দুনিয়ার প্রতিটি কোণে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি নিজেই বলেন: তফতু আল আরদ্বা কুল্লাহ ফি ত্বলাবিল ইল্ম - আমি জ্ঞানের অন্বেষণে গোটা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছি।

জ্ঞান অর্জনে তাঁর প্রবল আগ্রহ ও চেষ্টা-সাধনা তাঁকে জ্ঞানের জগতের এমন শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয় যেখানে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তিই পৌঁছাতে পেরেছিলেন। ইমাম যুহরী (রহ) বলতেন; 'আলিম তো মাত্র চারজন। তাঁদের মধ্যে একজন মাকহুল। অন্য তিনজন হলেন: মদীনার সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কূফার 'আমির আশ-শা'বী এবং বসরার হাসান আল-বাসরী। ইবন ইউনুস বলেন, মাকহুল একজন ফকীহ ও 'আলিম ছিলেন। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবন 'আম্মার বলতেন, তিনি শামের অধিবাসীদের ইমাম ছিলেন। হাদীছ ও ফিক্হ উভয় শাস্ত্রে তিনি ইমাম মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।

সুলায়মান ইবন মূসা বলতেন আমাদের কাছে 'ইলম যখন হিজাযের যুহরী থেকে, 'ইরাকের হাসান আল-বাসরী থেকে, আল-জাযীরার মায়মূন ইবন মিহরান থেকে এবং শামের মাকহুল থেকে আসলো, আমরা তা গ্রহণ করলাম। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, হিশামের খিলাফাতকালে এ চারজনই ছিলেন মানুষের 'আলিম।

হাদীছ
তিনি হিজায, ইরাক, মিসর, শামসহ জ্ঞান চর্চার সকল কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তথাকার মুহাদ্দিছগণের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। স্মৃতি শক্তি এত প্রখর ছিল যে, যা কিছু শোনেন সবই বক্ষে ধারণ ও সংরক্ষণ করেন। এ কারণে তিনি তাঁর সময়ের একজন বড় হাফিজে হাদীছে পরিণত হন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে তাবি'ঈদের তৃতীয় স্তরের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ বলে উল্লেখ করেছেন।

তাঁর শিক্ষকবৃন্দ
তিনি তাঁর সময়ের প্রায় সকল বড় 'আলিমের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। এ কারণে তাঁর শিক্ষকদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কোন দেশ তা থেকে বাদ পড়েনি। সেই তাল (রা) প্রতি শ্রদ্ধাবোধ
নিজের পূর্বপুরুষ ও অন্যান্য মহান ব্যক্তিবর্গের মত হযরত আবু বকর ও 'উমারের (রা) প্রতিও ছিল তাঁর প্রগাঢ় ভক্তি ও শ্রদ্ধাবোধ। জাবির বলেন, একবার আমি মুহাম্মাদ ইবন 'আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বংশের কেউ কি আবু বকর ও 'উমারকে (রা) গালি দিতেন? বললেন, না। আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং তাঁদের মাগফিরাতের দু'আ করি। 'ঈসা ইবন দীনার আল-মুয়ায্যিনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি তাঁকেও এরূপ জবাব দেন এবং তাঁদের দু'জনকে ভালোবাসতে ও তাঁদের জন্য দু'আ করতে বলেন। সালিম ইবন আবী হাফসা বলেন, আমি ইমাম আল-বাকির ও তাঁর পুত্র জা'ফার আস- সাদিকের নিকট আবূ বকর ও 'উমারের (রা) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি, তিনি বলেন, সালিম! আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং তাঁদের দুশমনদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তাঁরা দু'জন ছিলেন পথপ্রদর্শক ইমাম। আমাদের পরিবারের সকলকে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে দেখেছি।

বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা
কিছু দল-উপদল এমন সব ভ্রান্ত 'আকীদা-বিশ্বাস ঐ সকল মহান ব্যক্তিবর্গের প্রতি আরোপ করেছে যার সাথে তাঁদের বিন্দু মাত্র সম্পৃক্ততা ছিল না। দীনী বিষয়ে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন ইসলামী আকীদা ছাড়া আর কোন রকম নতুন আকীদা তাঁরা পোষণ করতেন না। জাবির বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন 'আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের আহলি বায়তের মধ্যে কেউ কি এমন ধারণা পোষণ করতেন যে, কোন পাপ শিরক? বললেন, না। আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলাম; তাদের কেউ কি পুনর্জীবনের প্রবক্তা ছিলেন? বললেন, না।

ওফাত
তিনি হামিয়্যা নামক স্থানে ইনতিকাল করেন এবং লাশ মদীনায় এনে জান্নাতুল বাকী'তে দাফন করা হয়। মৃত্যুর সন নিয়ে মত পার্থক্য আছে। হিজরী ১১৪, ১১৫, ১১৭ ও ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে। কত বছর জীবন লাভ করেন সে সম্পর্কে দু'টি বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা মতে ৫৮ বছর এবং অন্যটি মতে ৭৩ বছর। তবে দ্বিতীয়টি যে সত্য নয় তা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ হিজরী ৫৭ সনে যে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সে ব্যাপারে সকলে একমত। সেই হিসাবে প্রথম বর্ণনাটি অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ তখন তাঁর বয়স ৫৮ থেকে ৬১ বছরের মধ্যে হয় এবং কোনভাবেই ৭৩ বছর হয় না।

সন্তানাদি
ইমাম আল-বাকির (রহ) অনেকগুলো সন্তান রেখে যান। জা'ফার ও 'আবদুল্লাহ ছিলেন হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) দৌহিত্রী উম্মু ফারওয়ার (রহ) গর্ভজাত; ইবরাহীম ছিলেন উম্মু হাকীম বিনত উসায়দের গর্ভজাত; 'আলী ও যায়নাব ছিলেন এক দাসীর গর্ভজাত এবং উম্মু সালামা আরেক দাসীর গর্ভজাত ছিলেন। তাঁদের সকলের মধ্যে জা'ফার, যিনি আস-সাদিক উপাধি প্রাপ্ত, সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং তিনি তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। ইমাম আল-বাকির সুন্দর বেশ-ভূষা পছন্দ করতেন। 'খুয' নামক এক প্রকার রেশমের মূল্যবান কাপড় ব্যবহার করতেন। সাদা ও রঙ্গীন দু'ধরনের পোশাকই ব্যবহার করতেন। পশমী বুটিদার কাপড়ও পরতেন। চুল ও দাড়িতে খিজাব লাগাতেন।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৩
২. ওয়াফইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৫০
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৮৭
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫০
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৭. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৭
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
৯. আত-তাবাকাত-৫/২২৮; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৪
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫০; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৭৩
১১. প্রাগুক্ত
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১২৪
১৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
১৫. আত-তাবাকাত-৫/২৩৬
১৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৫
১৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫১; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৪
১৮. আত-তাবাকাত-৫/২৩৬
১৯. ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৫০; আত-তাবাকাত-৫/২৩৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২৪
২০. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৫১; তাহযীব আল-কামাল-১৭/৭৫
২১. আত-তাবাকাত-৫/২৩৮
২২. প্রাগুক্ত; তাবি'ঈন-৪৫১

হযরত মাকহুলের (রহ) কুনিয়াত তথা ডাকনাম দু'টি : আবূ 'আবদিল্লাহ ও আবূ আইউব। তাঁর বংশ ও জন্মভূমি সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবন সা'দ তাঁকে কাবুলের অধিবাসী বলে উল্লেখ করেছেন। ইবন হাজার কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যার একাংশের দ্বারা জানা যায় তিনি একজন অনারব বংশোদ্ভূত এবং তাঁর পিতার নাম সোহরাব। আর ইবন হাজারের বর্ণনার কিছু অংশের দ্বারা প্রমাণিত হয়, তিনি মিসরীয় ছিলেন, আর কিছু বর্ণনা দ্বারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তিনি একজন আরব এবং হুযালী গোত্রের মানুষ।

তবে শেষের দু'টি বর্ণনা অর্থাৎ হুযালী ও মিসরীয় হওয়া অবশ্যই সঠিক নয়। কারণ তাঁর অনারব বংশোদ্ভূত হওয়া সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। তাঁর হুযালী ও মিসরীয় হওয়া এজন্য প্রসিদ্ধ যে, তিনি তাঁর জীবনের কিছু দিন হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির দাসত্বে ছিলেন এবং কিছুকাল মিসরে অবস্থান করেন।

এ ব্যাপারে ইমাম নাওবীর (রহ) বর্ণনাটি অধিক যুক্তিভিত্তিক ও সঠিক বলে প্রতিভাত হয়। তিনি তাঁকে অনারব বংশোদ্ভূত ও কাবুলের লোক বলেছেন। সুতরাং তার বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মাকহুলের (রহ) উর্ধ্বতন বংশধারা এ রকম :
মাকহুল বিন যিদ যা ইব্‌ন আবি মুসলিম শুহরাব বিন শায্‌ল বিন সান্‌দ বিন শাযদান বিন য়ুরদুক বিন ইয়াগুছ বিন কাস্‌রি কাবুলী ওয়া দামেশকী
এ বর্ণনা দ্বারা বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে যে সমন্বয়টি পাওয়া যায় তা হলো- তিনি অনারব বংশোদ্ভূত, জন্মভূমি কাবুল এবং দিমাশকে বসবাসকারী ছিলেন। আল-মিযী বলেন : দিমাশকের 'আল-আহাদ' বাজারের পাশে তাঁর বাড়ি ছিল।

তাঁর জীবনের প্রথম পর্বের ইতিহাস হলো, তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলেন। 'আমর তাঁকে হুযালী গোত্রের এক মহিলাকে দান করেন। এই দ্বিতীয়জনের দাসত্বের কারণে তাঁর সম্পর্ক আরোপের ক্ষেত্রে দু'টি বর্ণনা হয়ে গেছে। একটি হলো তিনি 'আমর ইবন সা'ঈদের দাস ছিলেন, আর দ্বিতীয়টি হলো, তিনি ছিলেন হুযালী গোত্রের দাস। দু'টি বর্ণনাই সঠিক। তিনি নিজেই তাঁর দাসত্ব জীবনের সূচনা সম্পর্কে বলেছেন, "আমি 'আমর ইবন সা'ঈদ ইবন আল-'আসের দাস ছিলাম। পরে তিনি আমাকে হুযালী গোত্রের এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন।" কথাটি যুক্তিভিত্তিক এজন্য যে, 'আমরের পিতা সা'ঈদ হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে কাবুলের সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে জয় করেন। এটাই যুক্তিসিদ্ধ যে, এই অভিযানের সময় মাকহুল যুদ্ধবন্দী হিসেবে সা'ঈদের অধিকারে আসেন। আর একথার সমর্থন পাওয়া যায় খোদ মাকহুলের একটি বর্ণনাতে। তিনি বলেন, আমি এক সময় সা'ঈদের দাস ছিলাম। পরে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি তাঁর পুত্র 'আমরের অধিকারে এসে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক।

মুহাম্মাদ ইবন আল-মুনযির শাক্কার বলেন: মাকহুলের মূল হলো হারাতের। তাঁর পিতার নাম আবূ মুসলিম শোহ্রাব ইবন শাযিল। দাদা শাযিল হারাতের অধিবাসী ছিলেন। তিনি কাবুলের এক রাজার মেয়ে বিয়ে করেন। স্ত্রীকে সন্তান সম্ভাবা অবস্থায় রেখে তিনি মারা যান এবং স্ত্রী পিতৃগৃহে চলে যান। সেখানে শোহরাবের জন্ম হয়। শোহরাব কাবুলে বেড়ে ওঠেন এবং সেখানে বিয়ে করেন। অতঃপর সেখানে মাকহুলের জন্ম হয়। একটু বড় হলে তিনি মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং সা'ঈদ ইবন আল- 'আসের হাতে অর্পিত হন। এভাবে তিনি দাসত্বের জালে জড়িয়ে পড়েন। সা'ঈদ ইবন আল-'আস আবার তাঁকে হুযাইল গোত্রের এক মহিলার হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেন। পরে এই মহিলা মাকহুলকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।

জ্ঞান অর্জনের জন্য ইসলামী বিশ্ব ভ্রমণ
মুসলমানরা যে দাসদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দাসত্বের নিকৃষ্ট জীবন থেকে বের করে পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দিত, মাকহুল তাঁর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন শুরু হয়েছে দাসত্বের মাধ্যমে এবং অবশেষে তিনি শামের জ্ঞানের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হন। জ্ঞান অন্বেষণে তাঁর স্বভাবগত আগ্রহ ছিল। এ কারণে দাসত্বের জীবনেই তিনি জ্ঞান অর্জনে মনোযোগী হন। পরে দাসত্ব থেকে মুক্তির পর তৎকালীন গোটা ইসলামী বিশ্বের সকল শ্রেষ্ঠ জ্ঞান কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি বলেন, যখন আমি দাসত্ব থেকে মুক্ত হই তখন মিসরের সকল জ্ঞান আত্মস্থ করে ফেলি। আর যতক্ষণ না আমার মধ্যে এ প্রত্যয় জন্মেছে যে, এখানকার সকল জ্ঞান আমি ধারণ করে ফেলেছি ততক্ষণ সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াইনি।

মিসরের জ্ঞান ভাণ্ডার শূন্য করার পর তিনি মদীনায় যান এবং সেখান থেকে যান ইরাকে। এ দু'স্থানের জ্ঞানের সকল ঝর্ণাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হওয়ার পর যান শামে। তথাকার জ্ঞানী-গুণীদের নিকট থেকে স্বীয় জ্ঞানভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করেন। মোটকথা, তিনি জ্ঞান অন্বেষণে ইসলামী দুনিয়ার প্রতিটি কোণে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি নিজেই বলেন: "ত্বাফতুল আরদ্বা কুল্লাহাফি ত্বলবিল ইল্মি" - আমি জ্ঞানের অন্বেষণে গোটা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছি।

জ্ঞান অর্জনে তাঁর প্রবল আগ্রহ ও চেষ্টা-সাধনা তাঁকে জ্ঞানের জগতের এমন শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয় যেখানে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তিই পৌঁছাতে পেরেছিলেন। ইমাম যুহরী (রহ) বলতেন; 'আলিম তো মাত্র চারজন। তাঁদের মধ্যে একজন মাকহুল। অন্য তিনজন হলেন: মদীনার সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কূফার 'আমির আশ-শা'বী এবং বসরার হাসান আল-বাসরী। ইবন ইউনুস বলেন, মাকহুল একজন ফকীহ ও 'আলিম ছিলেন। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবন 'আম্মার বলতেন, তিনি শামের অধিবাসীদের ইমাম ছিলেন। হাদীছ ও ফিক্হ উভয় শাস্ত্রে তিনি ইমাম মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।

সুলায়মান ইবন মূসা বলতেন আমাদের কাছে 'ইলম যখন হিজাযের যুহরী থেকে, 'ইরাকের হাসান আল-বাসরী থেকে, আল-জাযীরার মায়মূন ইবন মিহরান থেকে এবং শামের মাকহুল থেকে আসলো, আমরা তা গ্রহণ করলাম। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, হিশামের খিলাফাতকালে এ চারজনই ছিলেন মানুষের 'আলিম।

হাদীছ
তিনি হিজায, ইরাক, মিসর, শামসহ জ্ঞান চর্চার সকল কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তথাকার মুহাদ্দিছগণের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। স্মৃতি শক্তি এত প্রখর ছিল যে, যা কিছু শোনেন সবই বক্ষে ধারণ ও সংরক্ষণ করেন। এ কারণে তিনি তাঁর সময়ের একজন বড় হাফিজে হাদীছে পরিণত হন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে তাবি'ঈদের তৃতীয় স্তরের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ বলে উল্লেখ করেছেন।

তাঁর শিক্ষকবৃন্দ
তিনি তাঁর সময়ের প্রায় সকল বড় 'আলিমের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। এ কারণে তাঁর শিক্ষকদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কোন দেশ তা থেকে বাদ পড়েনি। সেই তালিকার মধ্যে বিশাল সংখ্যক সাহাবায়ে কিরামের নামও আছে। তাঁদের মধ্যে আনাস ইবন মালিক, আবূ হিন্দ দারী, ওয়াছিলা ইবন আসকা', আবূ উমামা, 'আবদুর রহমান ইবন গানাম, আবু জান্দাল ইবন সুহায়ল (রা) প্রমুখের নিকট থেকে সরাসরি হাদীছ শুনেছেন। আর উবাই ইবন কা'ব, ছাওবান, 'উবাদা ইবন ছাবিত, আবূ হুরায়রা, আবূ ছা'লাবা খুশানী, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) থেকে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁদের নাম বাদ দিয়ে তিনি নিজেই সরাসরি রাসূল (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

বিশিষ্ট তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, মাসরূক, জুবায়র ইবন নাদীর, কুরায়ব, আবূ মুসলিম, আবূ ইদরীস খাওলানী, 'উরওয়া ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন মুহায়রীয, 'আম্বাসা ইবন আবী সুফইয়ান, ওয়াররাদ কাতিব, মুগীরা, কুছায়িয়র মুররা, উম্মুদ দারদা' (রহ) প্রমুখ থেকে হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন।

তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডি অত্যন্ত প্রশস্ত। বিশিষ্ট কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো: ইমাম যুহরী, হুমায়দ আত-তাবীল, মুহাম্মাদ ইবন 'আজলান, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আলা', সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ মুহারিবী, মূসা ইবন ইয়াসার, ইমাম আওযা'ঈ, সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয, 'আলা' ইবন আল-হারিছ, ছাওর ইবন ইয়াযীদ, আইউব ইবন মূসা, মুহাম্মাদ ইবন রাশিদ মাকহুলী, মুহাম্মাদ ইবন ওয়ালীদ যুবায়দী, বারদ ইবন সিনান, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আওফ, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল- আনসারী, উসামা ইবন যায়দ লায়ছী, নাখীর ইবন সা'দ, সাফওয়ান ইবন 'আমর, ছাবিত ইবন ছাওবান (রহ) ও আরো অনেকে।

ফিক্হ ও ফাতওয়া
হাদীছ স্মৃতিতে ধারণের সাথে সাথে তিনি ফিক্হ শাস্ত্রের একজন ইমাম ও মুজতাহিদ ছিলেন। আবূ হাতিম বলতেন, আমি শামে মাকহুলের চেয়ে বড় কোন ফকীহ দেখিনি। সাঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে ইমাম যুহরীর চেয়েও বড় ফকীহ বলে মনে করতেন। ইফতার ক্ষেত্রে ছিল তাঁর বিশেষ দক্ষতা ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, তাঁর যুগে ইফতার ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বেশী সূক্ষ্ম দৃষ্টি আর কারো ছিল না।

সতর্কতা
তিনি ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। নিজের মতের ভিত্তিতে যদি কোন মাসয়ালার জবাব দিতেন তাহলে স্পষ্টভাবে সে কথা বলে দিতেন যে, এটা আমার মত। সঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর মনীষা ও উৎকর্ষতার বড় প্রমাণ এই যে, সেই যুগে যখন গ্রন্থ রচনার সূচনাও হয়নি তখন তিনি ফিক্হ বিষয়ে দু'টি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থ দু'টির নাম: ১. কিতাবুস সুনান, ২. কিতাবুল মাসায়িল।

আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়
জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের সাথে সাথে নৈতিক উৎকর্ষিকার মধ্যে বিশাল সংখ্যক সাহাবায়ে কিরামের নামও আছে। তাঁদের মধ্যে আনাস ইবন মালিক, আবূ হিন্দ দারী, ওয়াছিলা ইবন আসকা', আবূ উমামা, 'আবদুর রহমান ইবন গানাম, আবু জান্দাল ইবন সুহায়ল (রা) প্রমুখের নিকট থেকে সরাসরি হাদীছ শুনেছেন। আর উবাই ইবন কা'ব, ছাওবান, 'উবাদা ইবন ছাবিত, আবূ হুরায়রা, আবূ ছা'লাবা খুশানী, 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা) থেকে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁদের নাম বাদ দিয়ে তিনি নিজেই সরাসরি রাসূল (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

বিশিষ্ট তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, মাসরূক, জুবায়র ইবন নাদীর, কুরায়ব, আবূ মুসলিম, আবূ ইদরীস খাওলানী, 'উরওয়া ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন মুহায়রীয, 'আম্বাসা ইবন আবী সুফইয়ান, ওয়াররাদ কাতিব, মুগীরা, কুছায়িয়র মুররা, উম্মুদ দারদা' (রহ) প্রমুখ থেকে হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন।

তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডি অত্যন্ত প্রশস্ত। বিশিষ্ট কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো: ইমাম যুহরী, হুমায়দ আত-তাবীল, মুহাম্মাদ ইবন 'আজলান, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আলা', সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ মুহারিবী, মূসা ইবন ইয়াসার, ইমাম আওযা'ঈ, সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয, 'আলা' ইবন আল-হারিছ, ছাওর ইবন ইয়াযীদ, আইউব ইবন মূসা, মুহাম্মাদ ইবন রাশিদ মাকহুলী, মুহাম্মাদ ইবন ওয়ালীদ যুবায়দী, বারদ ইবন সিনান, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আওফ, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল- আনসারী, উসামা ইবন যায়দ লায়ছী, নাখীর ইবন সা'দ, সাফওয়ান ইবন 'আমর, ছাবিত ইবন ছাওবান (রহ) ও আরো অনেকে।

ফিক্হ ও ফাতওয়া
হাদীছ স্মৃতিতে ধারণের সাথে সাথে তিনি ফিক্হ শাস্ত্রের একজন ইমাম ও মুজতাহিদ ছিলেন। আবূ হাতিম বলতেন, আমি শামে মাকহুলের চেয়ে বড় কোন ফকীহ দেখিনি। সাঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে ইমাম যুহরীর চেয়েও বড় ফকীহ বলে মনে করতেন। ইফতার ক্ষেত্রে ছিল তাঁর বিশেষ দক্ষতা ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, তাঁর যুগে ইফতার ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বেশী সূক্ষ্ম দৃষ্টি আর কারো ছিল না।

সতর্কতা
তিনি ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। নিজের মতের ভিত্তিতে যদি কোন মাসয়ালার জবাব দিতেন তাহলে স্পষ্টভাবে সে কথা বলে দিতেন যে, এটা আমার মত। সঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর মনীষা ও উৎকর্ষতার বড় প্রমাণ এই যে, সেই যুগে যখন গ্রন্থ রচনার সূচনাও হয়নি তখন তিনি ফিক্হ বিষয়ে দু'টি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থ দু'টির নাম: ১. কিতাবুস সুনান, ২. কিতাবুল মাসায়িল।

আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়
জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের সাথে সাথে নৈতিক উৎকর্ষতায়ও বিভূষিত ছিলেন। আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয় ও আল্লাহর পথে জিহাদ করা- এ দু'টি গুণ তাঁর মধ্যে পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করেছিল। যা কিছু তাঁর হাতে আসতো সবই আল্লাহর পথে ব্যয় করতেন। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, মাকহুলের ভাতা নির্ধারিত ছিল। তিনি সেই অর্থ আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে ব্যয় করতেন। একবার দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার বড় অঙ্কের অর্থ তাঁর হাতে আসে। তিনি সেই অর্থও আল্লাহর পথে জিহাদে ব্যয় করেন। তিনি একজন মুজাহিদকে তাঁর একটি ঘোড়ার মূল্য হিসেবে পঞ্চাশ স্বর্ণ মুদ্রা দিতেন।

একটি সন্দেহের নিরসন
হযরত মাকহুল (রহ) সম্পর্কে একটা সাধারণ প্রসিদ্ধি ছিল যে, তিনি 'কাদরিয়া' মতবাদে বিশ্বাসী। এর সমর্থনে কিছু বর্ণনাও পাওয়া যায়। কিন্তু সঠিক বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে জানা যায়, এই ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস থেকে তিনি পরিচ্ছন্ন ছিলেন। ইমাম আওযা'ঈ (রহ) তাঁর একজন বিশিষ্ট ছাত্র বলেন, যতটুকু শোনা যায়, তাবি'ঈদের মধ্যে দুই ব্যক্তি হাসান আল-বাসরী ও মাকহুল (রহ) কাদরিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু আমি ব্যাপক অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার পর জেনেছি এই প্রসিদ্ধি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর আরেকজন ছাত্র সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীযও তাঁর এই ভ্রান্ত মতবাদের বিশ্বাস থেকে মুক্ত থাকার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু সন সম্পর্কে মতভেদ আছে। হিজরী ১১২, ১১৩ এবং ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
১. আত-তাবাকাত-তায়ও বিভূষিত ছিলেন। আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয় ও আল্লাহর পথে জিহাদ করা- এ দু'টি গুণ তাঁর মধ্যে পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করেছিল। যা কিছু তাঁর হাতে আসতো সবই আল্লাহর পথে ব্যয় করতেন। সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, মাকহুলের ভাতা নির্ধারিত ছিল। তিনি সেই অর্থ আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে ব্যয় করতেন। একবার দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার বড় অঙ্কের অর্থ তাঁর হাতে আসে। তিনি সেই অর্থও আল্লাহর পথে জিহাদে ব্যয় করেন। তিনি একজন মুজাহিদকে তাঁর একটি ঘোড়ার মূল্য হিসেবে পঞ্চাশ স্বর্ণ মুদ্রা দিতেন।

একটি সন্দেহের নিরসন
হযরত মাকহুল (রহ) সম্পর্কে একটা সাধারণ প্রসিদ্ধি ছিল যে, তিনি 'কাদরিয়া' মতবাদে বিশ্বাসী। এর সমর্থনে কিছু বর্ণনাও পাওয়া যায়। কিন্তু সঠিক বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে জানা যায়, এই ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস থেকে তিনি পরিচ্ছন্ন ছিলেন। ইমাম আওযা'ঈ (রহ) তাঁর একজন বিশিষ্ট ছাত্র বলেন, যতটুকু শোনা যায়, তাবি'ঈদের মধ্যে দুই ব্যক্তি হাসান আল-বাসরী ও মাকহুল (রহ) কাদরিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু আমি ব্যাপক অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার পর জেনেছি এই প্রসিদ্ধি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর আরেকজন ছাত্র সা'ঈদ ইবন 'আবদিল 'আযীযও তাঁর এই ভ্রান্ত মতবাদের বিশ্বাস থেকে মুক্ত থাকার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু সন সম্পর্কে মতভেদ আছে। হিজরী ১১২, ১১৩ এবং ১১৮ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
১. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
২. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৬
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১১৩
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৬
৫. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
৬. ফুতূহ আল-বুলদান-৩২২
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৭
৮. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৮
৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
১০. আত-তাবাকাত-৭/১৬০
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৯
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১১৪
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮
১৭. প্রাগুক্ত-১/১০৭
১৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/১১৩
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯০
২০. তাহযীব আল-আসমা'-১/১১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৫৭
২১. প্রাগুক্ত
২২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২৩. প্রাগুক্ত
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
২৫. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৪৬
২৬. ইবন নাদীম, আল-ফিরিস্ত (মিসর সংস্করণ)-৩১৮; তাবি'ঈন-৪৮৯
২৭. আত-তাবাকাত-৭/১৬১
২৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১০/২৯১; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০
৩০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১৮/৩৬০; তাহযীব আল-কামাল-১৮/৩৬০

ফন্ট সাইজ
15px
17px