📄 আবূ সালামা ইবন ‘আবদির রহমান (রা)
হযরত 'আবদুল্লাহর (রহ) ডাকনাম আবূ সালামা এবং এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাই অনেকে আবূ সালামা তাঁর আসল নাম বলে মনে করেছেন। তাঁর পিতা মক্কার কুরায়শ গোত্রের বানু যুহরা শাখার প্রখ্যাত সাহাবী হযরত 'আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা) এবং মাতা তুমাদির বিন্ত আল আসবাগ। তুমাদির ছিলেন দিমাশকের সন্নিকটে দাওমাতুল জান্দালে বসবাসরত বানু কাল্ব গোত্রের কুদা'আ শাখার সন্তান। বর্ণিত হয়েছে, তিনি নবীর (সা) জীবনকাল লাভ করেন। তিনি হলেন কাল্ব গোত্রের প্রথম মহিলা যাঁর বিয়ে হয় মক্কার কুরায়শ গোত্রের কোন পুরুষের সাথে।
জ্ঞান ও মনীষা
হযরত 'আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা) ছিলেন 'আশারা মুবাশারার (জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন) অন্যতম সদস্য। এ দ্বারা অনুমান করা যায় যে, তিনি কত উঁচু মাপের ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। আবূ সালামা এমন মহান পিতার 'ইল্ম ও 'আমল (জ্ঞান ও কর্ম)-এর পরিবেশে অত্যন্ত স্নেহ-আদরে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন। পিতার জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলেন এবং অচিরেই সমকালীনদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিতে পরিণত হন। অনেক 'আলিম তাঁকে মদীনার সাত ফকীর মধ্যে গণ্য করেছেন। তবে এটা সর্বজন গৃহীত মত নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁর নামটি উচ্চারিত হওয়া তাঁর যোগ্যতার একটি বড় প্রমাণ। জ্ঞানের জগতে তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা এবং তাঁর ইমাম হওয়ার ব্যাপারে 'আলিমদের ঐকমত্য রয়েছে। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, আবূ সালামার ইমাম হওয়া এবং তাঁর সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত।
হাদীছ
তিনি পিতা হযরত 'আবদুর রহমান ইবন আওফের (রা) নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। তাছাড়া উঁচু স্তরের আরো অনেক সাহাবীর (রা) নিকট থেকেও তিনি তাঁর জ্ঞানের সমৃদ্ধি ঘটান। যেমন: হযরত 'উছমান, তালহা, 'উবাদা ইবন আস-সামিত, আবু কাতাদা, আবুদ দারদা', উসামা ইবন যায়দ, হাসান ইবন ছাবিত, রাফি' ইবন খাদীজ, ছাওবান, নাফি' ইবন আল-হারিছ, 'আবদুল্লাহ ইবন সালাম, আবূ হুরায়রা, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, আবু সা'ঈদ আল-খুদরী, আনাস ইবন মালিক, জাবির, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা সিদ্দীকা, উম্মু সালামা (রা) ও আরো অনেকে। উঁচুস্তরের বহু তাবি'ঈর নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। তাঁদের তালিকা অনেক দীর্ঘ।
উপরে উল্লেখিত মহান ব্যক্তিবর্গের অনুগ্রহ ও অবদান তাঁকে হাদীছের ইমামের পদে অধিষ্ঠিত করে। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন তাবি'ঈ ইমামদের অন্যতম, অসামান্য জ্ঞানের অধিকারী, বিশ্বস্ত 'আলিম ব্যক্তি।" ইবন সা'দ বলেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, সুদৃঢ়, ফকীহ ও বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী।” তিনি আবু সালামাকে মদীনার 'আলিমদের দ্বিতীয় স্তরে উল্লেখ করেছেন।
আবূ সালামার (রহ) স্মৃতির ভাণ্ডারে বহু হাদীছ থাকার কথা শ্রেষ্ঠ 'আলিমগণ স্বীকার করেছেন। ইমাম যুহরী (রহ) বলেন, ইবরাহীম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন কারিজ আমাকে বলতেন যে, তোমাদের মধ্যে দু'ব্যক্তির চেয়ে হাদীছের অন্য কোন বড় 'আলিম আমি দেখিনি। একজন 'উরওয়া ইবন যুবায়র এবং অন্যজন আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান। ইমাম যুহরী আরো বলেন: "আমি চার ব্যক্তিকে জ্ঞানের সাগর রূপে পেয়েছি। তাঁরা হলেন: 'উরওয়া ইবন যুবায়র, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, আবূ সালামা ও 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ।"
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর সুযোগ্য ছাত্রদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম উপস্থাপন করা হলো: ইমাম শা'বী, 'আবদুর রহমান আল-আ'রাজ, 'আররাক ইবন মালিক, 'আমর ইবন দীনার, আবূ হাযিম, আবূ সালামা ইবন দীনার, যুহরী, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, ইয়াহইয়া ইবন আবী কাছীর, মুহাম্মাদ ইবন 'আমর, সালিম আবুন্ নাদর, আবুয যানাদ, সা'দ ইবন ইবরাহীম আল-কাজী (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে আবূ সালামার স্থান এত উঁচুতে ছিল যে, অনেকে তাঁকে মদীনার সাত ফকীহর অন্যতম বলেছেন। ইবন সা'দ তাঁকে ফকীহ বলেছেন। এই উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে তিনি ফিক্হ্-এর জ্ঞান অর্জন করেন। সুযোগ্য শিক্ষকের যোগ্য ছাত্র হিসেবে গভীর অনুধ্যান ও সূক্ষ্ম অনুধাবন ক্ষমতা অর্জন করেন। বিভিন্ন মাসয়ালায় মহান শিক্ষকের সাথে যুক্তি-তর্কে অবতীর্ণ হতেন। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষককে নিজের মতে আনতে সক্ষম হন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: "আবূ সালামা ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে ফিক্হ্-এর গভীর জ্ঞান অর্জন করেন, তাঁর সাথে যুক্তি-তর্কে অবতীর্ণ হতেন এবং তাঁকে তাঁর মত থেকে সরিয়ে নিজের মতে নিয়ে আসতেন।"
ইমাম যুহরী মনে করেন, ইবন 'আব্বাসের (রা) সাথে এই মতপার্থক্যের কারণে তিনি তাঁর অগাধ জ্ঞানের অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত থেকে গেছেন।
বিচারকের পদে
হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালে তৎকালীন মদীনার ওয়ালী সা'ঈদ ইবন আল-'আস তাঁকে মাদীনাতুর রাসূলের কাজীর পদে নিয়োগ দেন। কিন্তু পরবর্তীতে ওলট-পালটের কারণে এ পদে থাকতে পারেননি। সা'ঈদ ইবন আল-'আসের অপসারণ এবং তদস্থলে মারওয়ানের যোগদানের পর আবূ সালামাকে কাজীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।
ওফাত
খলীফা ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিকের খিলাফতকালে হিজরী ৯৪ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে ১০৪ হিজরীতে ৭২ বছর বয়সে তাঁর ইনতিকাল হয় বলে ভিন্ন একটি বর্ণনায় এসেছে। হযরত আবূ সালামা (রহ) ছিলেন একজন সুদর্শন চেহারার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের মানুষ। 'আবদুল্লাহ ইবন আবী ইয়া'কূব আদ-দাববী বলেন : আবূ সালামা ছিলেন দীপ্তিমান চেহারার মানুষ। তাঁর চেহারার সেই দীপ্তি ছিল রোমান সম্রাটদের স্বর্ণমুদ্রার দীপ্তির মত। শেষ জীবনে মাথার চুল ও দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং তাতে তিনি মেহদীর খিযাব লাগতেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২১/২৬৯; তাবি'ঈন-৫৩৪
২. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/১১৫; তাহযীব আল-কামাল-২১/২৬৯
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৩
৫. আত-তাবাকাত-৫/১১৬; তাহযীব আল-কামাল-২১২৭১
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/১১৬
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৩
৮. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪১
৯. আত-তাবাকাত-৫/১১৬
১০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৩
১১. তাহযীব আল-কামাল-২১/২৭২
১২. আত-তাবাকাত-৫/১১৫
১৩. তাহযীব আল-কামাল-২১/২৭২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৩
📄 কাতাদা ইবন দি‘আমা আস-সাদূসী (রহ)
আবুল খাত্তাব কাতাদার পিতার নাম দি'আমা। তিনি হিজরী ৬১ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ঊর্ধ্বতন ৮ম পুরুষ সাদৃস-এর নাম অনুসারে তিনি সাদৃসী নামে পরিচিত। তিনি শ্রেষ্ঠ 'আলিম তাবি'ঈদের একজন। জ্ঞানের সাথে কাতাদার স্বভাবগত একটা সম্পর্ক ছিল। তাঁর মধ্যে জ্ঞান অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত একই রকম ছিল। মাতারুল ওয়াররাক বর্ণনা করেছেন, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত তিনি একজন জ্ঞান অন্বেষণকারী ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন জন্মান্ধ।
তাঁর স্মৃতিশক্তি
জ্ঞান অন্বেষণের তীব্র আকাঙ্ক্ষার সাথে তিনি প্রখর স্মৃতিশক্তি লাভ করেন। কোন কিছু একবার শুনলে চিরদিনের জন্য তা স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়ে যেত। একবার একটি হাদীছ শোনার পর আর কখনো কোন মুহাদ্দিছের নিকট তা দ্বিতীয়বার শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। একবার যে কথা তার কানে ঢুকেছে তা চিরকালের জন্য অন্তর-ভাণ্ডারে সংরক্ষিত হয়ে গেছে। তাঁর স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে বিস্ময়কর সব ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। যেমন একটি ঘটনা 'ইমরান ইবন 'আবদিল্লাহ বর্ণনা করেছেন। একবার কাতাদা প্রখ্যাত তাবি'ঈ সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়ি্যবের (রহ) নিকট গেলেন এবং কিছুদিন সেখানে অবস্থানও করেন। এ সময় তিনি সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের নিকট প্রাণ খুলে হাদীছ শুনতে চাইতেন এবং প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যেতেন। একদিন সা'ঈদ ইবন আল- মুসায়্যিব (রহ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এ পর্যন্ত তুমি আমার নিকট যত কথা জানতে চেয়েছো তা কি সব তোমার মনে আছে? তিনি হাঁ সূচক জবাব দিলেন। তারপর জিজ্ঞাসিত বিষয়গুলো এভাবে বলতে আরম্ভ করলেন : আমি আপনার নিকট একথা জানতে চেয়েছি, আপনি এ জবাব দিয়েছেন। আমি এই প্রশ্ন করেছি, আপনি এই বলেছেন, আর হাসান আল-বাসরী (রহ) এই জবাব দিয়েছিলেন। এভাবে তিনি সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়ি্যবের নিকট থেকে শোনা সব হাদীছ তাঁকে শুনিয়ে দেন। সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) তাঁর এই প্রখর স্মৃতিশক্তি দেখে ভীষণ অবাক হলেন। তিনি মন্তব্য করলেন, আল্লাহ তোমার মত মানুষ সৃষ্টি করেছেন তা আমার কল্পনায়ও ছিল না।
জ্ঞান ও মনীষা
এমন আগ্রহ, আবেগ, জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও প্রখর স্মৃতিশক্তি তাঁকে কুরআন, তাফসীর, হাদীছ, ফিক্হ, ভাষা, সাহিত্য, আরবদের প্রাচীন ইতিহাস, বংশবিদ্যা ইত্যাদিসহ সেই যুগের সকল ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞানের সাগরে পরিণত করে। আল্লামা নাওবী লিখেছেন, তাঁর মাহাত্ম্য ও জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে সকলে একমত।
কুরআন
তিনি কুরআনের হাফিজ ছিলেন। ভালো মুখস্থ ছিল। বড় বড় সূরাগুলো পাঠের সময় একটি শব্দেও ভুল করতেন না। মা'মার বলেন, একবার কাতাদা সা'ঈদ ইবন 'আরূবাকে না দেখে সূরা আল-বাকারা শোনান এবং একটি হরফেও কোন ভুল করেননি। শোনানোর পর তিনি জিজ্ঞেস করেন, আমি ঠিক মত মুখস্থ রেখেছি? তিনি বললেন, হাঁ। সুফইয়ান ইবন 'উয়ানা বলেন : কাতাদা জাবির ইবন 'আবদিল্লাহর (রা) সহীফা থেকে মুখস্থ করতেন। তিনি তা সুলায়মান আল-ইয়াশকুরীর নিকট থেকে নকল করেন।
তাফসীর
কুরআনের তাফসীরের তিনি একজন বড় 'আলিম ছিলেন। কুরআনের আয়াতের তাফসীর ও তাবীলের ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত। নিজেই বলতেন, কুরআনের এমন কোন আয়াত নেই যে সম্পর্কে আমি কিছু না কিছু শুনিনি। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলতেন, কাতাদা তাফসীরের একজন বড় 'আলিম ছিলেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি কুরআনের সবচেয়ে বড় 'আলিম ছিলেন। ইবন নাসের উদ্দীন তাঁকে মুফাসসিরুল কিতাব বলেছেন।
হাদীছ
কাতাদার জ্ঞান চর্চার মূল বিষয় ছিল হাদীছ। এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান ছিল অতি উঁচুতে। ইবন সা'দ লিখেছেন, হাদীছে তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, আস্থাভাজন ও প্রমাণ সদৃশ্য। আল্লামা যাহাবী তাঁকে হাফিজ ও আল্লামা নামে অভিহিত করেছেন। তাঁকে ইরাকের সবচেয়ে বড় হাফিজে হাদীছ গণ্য করা হতো। সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব বলতেন, কাতাদার চেয়ে বড় ইরাকের কোন হাফিজে হাদীছ আমাদের এখানে আসেননি। সুফইয়ান বলতেন, দুনিয়ায় কাতাদার সমতুল্য কেউ ছিল না। বাকর ইবন 'আবদিল্লাহ আল-মুযানী বলতেন, যে ব্যক্তি সবচেয়ে বড় হাফিজে হাদীছ এবং এমন ব্যক্তিকে দেখতে চায় যিনি হাদীছ যেভাবে শুনেছেন হুবহু সেভাবে বর্ণনা করেন, তাহলে তার কাতাদাকে দেখা উচিত। "আমি এমন কাউকে দেখিনি যে তার চেয়ে হাদীছ ভালো মুখস্থকারী এবং তার চেয়ে ভালো হুবহু বর্ণনাকারী।"
'আবদুর রহমান ইবন মাহদী বলতেন, কাতাদা ছিলেন হুমায়দ-এর মত পঞ্চাশ ব্যক্তি থেকেও বড় হাফিজে হাদীছ। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলতেন, কাতাদা বসরাবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হাফিজ ছিলেন। যা কিছু শুনতেন মুখস্থ করে নিতেন। একবার তাঁর সামনে জাবিরের সহীফা (পুস্তিকা) পাঠ করা হয়। একবার শুনেই তা মুখস্থ হয়ে যায়। ইবন হিব্বান তাঁকে তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় হাফিজে হাদীছ গণ্য করেছেন। সুলায়মান তায়মী ও আইউব সাখতিয়ানীর মত মড় মুহাদ্দিছগণ তাঁর হাদীছের মুখাপেক্ষী ছিলেন এবং তাঁর নিকট জিজ্ঞেস করতেন।
শিক্ষকবৃন্দ
কাতাদার আসল ও প্রধান শায়খ ছিলেন হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ)। বেশির ভাগ তাঁরই ঝর্ণাধারা থেকে জ্ঞান পিপাসা নিবৃত্ত করেন। বারো বছর তাঁর সাহচর্যে কাটান। তিনি বলতেন, আমি বারো বছর যাবত হাসান আল-বাসরীর (রহ) মজলিসে বসেছি এবং তিন বছর তাঁর সাথে ফজরের নামায আদায় করেছি। আমার মত মানুষ তাঁর মত উঁচু মাপের মানুষের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছে। তিনি ছিলেন হাসান আল-বাসরীর (রহ) যোগ্যতম ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম। আবূ হাতিম বলতেন, হাসান আল-বাসরীর (রহ) সবচেয়ে বড় সঙ্গীদের মধ্যে কাতাদা একজন।
হাসান আল-বাসরী (রহ) ছাড়াও সে যুগের একদল শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন। তাঁদের মধ্যে যেমন সাহাবায়ে কিরাম (রা) ছিলেন, তেমনি ছিলেন তাবি'ঈন কিরাম। যেমন: আনাস ইবন মালিক, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, 'ইমরান ইবন হুসায়ন (রা), সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'ইকরিমা, আবু বুরদা ইবন আবী মূসা, শা'বী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাস'উদ, মুতাররিফ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন শিখীর, হাসান আল-বাসরী, 'আতা' ইবন আবী রাবাহ, 'আমর ইবন দীনার, মাসরূক ইবন আওস, মুসলিম ইবন ইয়াসার (রহ) প্রমুখ। জামাল উদ্দীন আল-মিযী শতাধিক শায়খের নাম উল্লেখ করেছেন।
তাঁর এই বিশেষ যোগ্যতা ছিল যে, যে মুহাদ্দিছের নিকটেই তিনি গেছেন, অল্পদিনের মধ্যে তাঁর সকল জ্ঞান আত্মস্থ করে ফেলেছেন। একবার সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের (রহ) নিকট কয়েকদিন অবস্থান করেন এবং এ সময়ে তিনি তাঁকে এত প্রশ্ন করেন যে তিন দিনের মধ্যে তিনি শংকিত হয়ে তাঁকে বলেন, তুমি এখন যাও, আমার সকল জ্ঞান তুমি শূন্য করে ফেলেছো।
তাঁর শিষ্য-শাগরিদ
তাঁর যোগ্যতার কারণে তিনি মানুষের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হন। অসংখ্য জ্ঞান পিপাসু মানুষ তাঁর দারসের মজলিস থেকে পরিতৃপ্ত হয়েছে। তাদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ হবে। এখানে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ছাত্রের নাম তুলে ধরা হলো: আইউব সাখতিয়ানী, সুলায়মান তায়মী, জারীর ইবন হাযিম, শু'বা, মিস'আর, আবূ বিলাল রাসিবী, মাতারুল ওয়াররাক, হাম্মাম ইবন ইয়াহইয়া, 'আমর ইবন হারিছ আল-মিসরী, শায়বান নাহবী, সাল্লাম ইবন আবিল মুতী', সা'ঈদ ইবন আবী 'আরূবা, আবান ইবন ইয়াযীদ আল-'আত্তার, হুসায়ন ইবন যাকওয়ানা, হাম্মাদ ইবন সালামা, আওযা'ঈ, 'আমর ইবন ইবরাহীম 'আবদী, 'ইমরান আল-কাত্তান, সালিহ আল-মুররী, 'আসিম ইবন সুলায়মান আল-আহওয়াল, সুলায়মান আল-আ'মাশ, হুমাইদ আত-তাবীল, সা'ঈদ ইবন আবী 'আহ্মবা (রহ) প্রমুখ।
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। ইবন হিব্বান লিখেছেন, তিনি কুরআন ও ফিক্হ্ বড় 'আলিমদের একজন ছিলেন। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) তাফসীর ও হাদীছে দক্ষতার সাথে ফিক্হ্ও তাঁর পারদর্শিতার কথা বলতেন। বসরার জামা'আতে ইফতার অন্যতম সদস্য ছিলেন।
যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত দানের ক্ষেত্রে সতর্ক
জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে দারুণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কোন বিষয়ে জানা না থাকলে নিজের অজ্ঞতার কথা সাফ বলে দিতেন। নিজের মতের উপর ভিত্তি করে কোন মাসয়ালার জবাব দিতেন না। আবু হিলাল বলেন, একবার আমি কাতাদার নিকট একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি সাফ বলে দিলেন আমি জানিনে। বললাম, নিজের যুক্তির ভিত্তিতে বলে দিন। বললেন: আমি চল্লিশ বছর যাবত নিজের মতের ভিত্তিতে কোন জবাব দিইনি। যখন তিনি একথা বলেন তখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ বছর। তবে আবু আওয়ানা বলেন, কাতাদা বলতেন, আমি তিরিশ বছর যাবত নিজের মত ও সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে কোন ফাতওয়া দিইনি।
কাতাদার মত ব্যাপক মনীষা খুব কম তাবি'ঈর মধ্যে ছিল। তিনি কেবল দীনী 'ইল্মের 'আলিম ছিলেন না, বরং সে যুগে প্রচলিত বিভিন্ন বিষয় যেমন: আরবী ভাষা, সাহিত্য, আরব জাতির ইতিহাস, বংশ বিদ্যা প্রভৃতিরও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আবূ 'উমার বলেন, তিনি একজন বংশ বিদ্যাবিশারদ ছিলেন।
আবূ 'উবায়দা বলেন, বানু উমাইয়্যাদের পক্ষ থেকে প্রতিদিন কোন না কোন ব্যক্তি কাতাদার নিকট ইতিহাস, কবিতা, বংশ বিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে কিছু না কিছু জানার জন্য আসতো। ইবন নাসেরুদ্দীন তাঁর ব্যাপক মনীষার মূল্যায়ন করেছেন এভাবে: "অন্ধ আবুল খাত্তাব আল-কিতাবের মুফাসসির, মুখস্থ শক্তিতে একটি নিদর্শন, বংশ বিদ্যায় ইমাম, আরবী ভাষা, সাহিত্য ও আরবের যুদ্ধ-বিগ্রহের জ্ঞানে নেতৃস্থানীয়।" ইবন সা'দ তাঁকে বসরার তৃতীয় তাবকার (স্তর) মুহাদ্দিহগণের মধ্যে উল্লেখ করেছেন।
হিজরী ১১৭, মতান্তরে ১১৮ সনে মৃত্যুবরণ করেন। আবু হাতিম বলেন, হাসান আল- বাসরীর (রহ) মৃত্যুর সাত বছর পরে তিনি ওয়াসিত নগরে তা'ঊনে (প্লেগ) আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৫৬ অথবা ৫৭ বছর। তবে তাঁর মৃত্যু সন নিয়ে সীরাত বিশেষজ্ঞদের বিস্তর মতভেদ আছে।
টিকাঃ
১. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৫০
২. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৪
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৯
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৭
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৯০-১১০
৬. তাবি'ঈন-৩৮৫
৭. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৮
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৯
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৫৫; শাযারাত আয-যাহাব-১/১৫৩
১০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৯
১১. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৭
১২. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৫৭-৫৮
১৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১০
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৫৫; তাবি'ঈন-৩৮৬
১৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৫৮
১৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৮১; তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৪-২২৬
十七. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৭
十八. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৫২
十九. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৫৫; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৯
二十. আ'লাম আল-মুওয়াকি'ঈন-১/২৭
二十一. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৮
二十二. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৯
二十三. শাযারাত আয-যাহাব-১/১৯৩
二十四. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২৩২-২৩৩
📄 ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ (রহ)
হযরত ওয়াহাবের (রহ) ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে: "ওয়াহাব ইবন মুনাবিহ একজন হাফিজ, ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। তিনি সান'আর অধিবাসী এবং ইয়ামনবাসীদের একজন 'আলিম।” তিনি অনারব বংশোদ্ভূত। পারস্য সম্রাট কিস্সা আঁ নওশেরওয়ান যখন সায়ফ যী ইয়াযিনের নেতৃত্বে হাবশায় অভিযান চালান তখন ওয়াহাবের পিতা মুনাব্বিহ পারস্যের হারাত থেকে ইয়ামনে আসেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার মত অন্য যারা বাইরে থেকে ইয়ামনে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে ইতিহাসে তারা "আবনা" নামে প্রসিদ্ধ। এ কারণে আল্লামা আয-যিরিকলী তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন: ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ আবনা' বংশোদ্ভূত, সান'আর অধিবাসী। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকালে তাঁর পিতা মুনাব্বিহ ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু সন নিয়ে কিছুটা মত পার্থক্য আছে। তবে প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ৩৪, খ্রীস্টাব্দ ৬৫৪ সনে ওয়াহাব ইয়ামনের সান'আয় জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরী ১১৪, খ্রীস্টাব্দ ৭৩২ সনে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁরা ছিলেন চার ভাই: ওয়াহাব, মা'কিল, হাম্মাম ও গায়লান। ওয়াহাব সবার বড় ও গায়লান সবার ছোট ছিলেন। অপর একটি বর্ণনায় মাসলামা নামে তাঁর আরেক ভাইয়ের নাম জানা যায়।
জ্ঞান ও মনীষা
ইসলামী জ্ঞানে তিনি তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। তবে একেবারে অপরিচিতও ছিলেন না। অন্য অনেক ধর্মের গ্রন্থাবলীর একজন সুবিজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। তাই 'আলিম তাবি'ঈনের মধ্যে তাঁরও একটা বিশেষ স্থান ছিল। আয-যিরিকলী বলেন, তিনি বিভিন্ন ধর্মের প্রাচীন গ্রন্থসমূহ থেকে বহু কাহিনীর বর্ণনাকারী এবং পূর্ববর্তীদের বহু কাহিনীর একজন অভিজ্ঞ পণ্ডিত। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি একজন উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন তাবি'ঈ। তাঁর বিশ্বস্ততা ও দৃঢ়তার ব্যাপারে সকলে একমত। আল-'ইজলী বলেন: "তিনি একজন বিশ্বস্ত, তাবি'ঈ ব্যক্তি, সান'আর কাজীর পদে আসীন ছিলেন।" 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের সময় তিনি কাজী ছিলেন। খলীফা ইবন খায়্যাত তাঁকে ইয়ামনীদের দ্বিতীয় তাবকায় (স্তরে) এবং ইবন সা'দ তৃতীয় তাবকায় স্থান দিয়েছেন। আবূ যুরআ ও আন-নাসাঈ (রহ) তাঁকে 'ছিকা' (বিশ্বস্ত) বলে প্রত্যয়ন করেছেন।
হাদীছ
বহু সাহাবীর নিকট থেকে তিনি হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, আবূ হুরায়রা, জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, আনাস ইবন মালিক, নু'মান ইবন বাশীর (রা) প্রমুখ সাহাবীর সূত্রে তাঁর বর্ণনা পাওয়া যায়। তাবি'ঈদের মধ্যে তাউস ইবন কায়সান, 'আমর ইবন দীনার, 'আমর ইবন শু'আয়ব, তাঁর ভাই হাম্মাম ইবন মুনাব্বিহ (রহ) প্রমুখের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন।
তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন তাঁর দু'পুত্র 'আবদুল্লাহ ও 'আবদুর রহমান, ভাতিজা 'আবদুস সামাদ ও 'আকীল, দৌহিত্র ইদরীস ইবন সিনান এবং অন্যদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, সিমাক ইবন ফাদল, ইসরাঈল আবূ মূসা (রহ) ও আরো অনেকে।
বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে তাঁর পাণ্ডিত্য
পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে যে, তিনি অন্য ধর্মের গ্রন্থসমূহের একজন খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর সমকক্ষ পারদর্শী সেকালে আর কেউ ছিলেন না। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি প্রাচীন গ্রন্থসমূহের জ্ঞানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর যুগে তাঁকে কা'ব আল-আহবারের সমকক্ষ বলে মানা হতো।"
উল্লেখ্য যে, এই কা'ব আল-আহবার ছিলেন একজন মহাজ্ঞানী ব্যক্তি। আহলি কিতাবের শ্রেষ্ঠ 'আলিমগণের একজন। হযরত আবূ বাকরের (রা) খিলাফতকালে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে ইয়ামন থেকে মদীনায় আসেন।
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ সম্পর্কে একথাও প্রচলিত আছে যে, তিনি ইহুদী বংশোদ্ভূত। প্রাচীন আরবী গ্রন্থসমূহে ছড়িয়ে থাকা অধিকাংশ ইহূদী উপাখ্যানসমূহের উৎস তিনি। প্রাচীন গ্রীক, সুরইয়ানী, ও হিমইয়ারী ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন এবং দুর্বোধ্য প্রাচীন লেখা যা কেউ পাঠ করতে পারতো না, তিনি তা সহজে খুব সুন্দরভাবে পাঠ করতেন। ইয়ামনী আহলি কিতাব, যাদের সংখ্যা সে সময় দক্ষিণ আরবে যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল, তাদের সাথে ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ছিল এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ইহুদী ও খ্রীস্টানদের পবিত্র গ্রন্থসমূহের বিষয়বস্তু আয়ত্ত করেন।
বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি বিরানব্বই (৯২) খানা আসমানী গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। তার মধ্যে এমন কয়েকখানি ছিল যে সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান খুবই অপ্রতুল। দাউদ ইবন কায়স বলেন : তিনি বলতেন, আমি বিরানব্বই খানা গ্রন্থ পাঠ করেছি যার সবগুলোই আসমানী। বাহাত্তর (৭২) খানা গির্জায় এবং মানুষের হাতে আছে। আর বিশ (২০) খানার জ্ঞান খুব কম সংখ্যক লোকেরই আছে। কোন কোন বর্ণনায় একথা এসেছে যে, তিনি এমন তিরিশখানা গ্রন্থ পাঠ করেন যা তিরিশ জন নবীর উপর নাযিল হয়েছিল।
যাই হোক না কেন, একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, তিনি অতীতের আসমানী গ্রন্থসমূহের একজন বড় 'আলিম ছিলেন এবং এ বিষয়ের বিখ্যাত দু'জন বিশেষজ্ঞ কা'ব আল-আহবার ও 'আবদুল্লাহ ইবন সালামের (রা) সামষ্টিক জ্ঞান তাঁর একক সত্তার মধ্যে পুঞ্জিভূত করেন। নিজের জ্ঞানের জন্য তাঁর দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ও ছিল। যেমন তিনি বলেন: "লোকেরা বলে থাকে 'আবদুল্লাহ ইবন সালাম তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় জ্ঞানী, কা'ব তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। তুমি কি দেখেছো কে এই দু'জনের জ্ঞান জমা করেছে? মূলত সেই ব্যক্তি যে তিনি নিজে সে কথা বলতে চেয়েছেন।"
কেউ কেউ "কাদরিয়া" মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন বলে তাঁর প্রতি দোষারোপ করেছেন এবং পরবর্তীতে তা থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন, সে কথাও বলেছেন। তাঁরা দাবী করেন, এ বিষয়ে তিনি একখানা পুস্তক রচনা করেন; অতঃপর অনুতপ্ত হন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন: "আমি "কাদর" বা ইচ্ছার স্বাধীনতার কথা বলতাম। অবশেষে নবীদের সত্তরের অধিক গ্রন্থ পাঠ করলাম। তার সবগুলোতে আছে, যে কেউ ইচ্ছার কোন কিছু নিজের দিকে আরোপ করবে, কাফির হয়ে যাবে। অতঃপর আমি আমার কথা ত্যাগ করি।" বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয় এবং কঠোরতার মুখোমুখি হতে হয়।
ইতিহাস
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ (রহ) একজন বড় ঐতিহাসিক এবং ইতিহাস গ্রন্থ প্রণেতা। আরবী ভাষায় সংকলক ও গ্রন্থ রচনার সূচনা হয় মূলত উমাইয়্যা যুগে। এ ক্ষেত্রে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ড. 'উমার ফাররূখ বলেন: "উমাইয়্যা যুগ যে লিপিবদ্ধকরণ তথা গ্রন্থ রচনার সাথে পরিচিত হয়, ইতিহাস বিষয়ে তা ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহর প্রতি আরোপ করা হয়। আর ফি ও হাদীছে তা আরোপ করা হয় যথাক্রমে মুহাম্মাদ ইবন 'আবদির রহমান আল-'আমিরী (মৃ. ১২০ হি.) ও মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম আয-যুহরীর (মৃ. ১২৪ হি.) প্রতি। তবে সে যুগের লেখা কোন কিছু আমাদের নিকট পৌঁছেনি।" ঐতিহাসিক জুরজী যায়দান বলেন: "অতঃপর তাঁরা ইতিহাস, বিশেষতঃ মাগাযী (যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস) রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। এ বিষয়ে সর্বপ্রাচীন যে গ্রন্থটির কথা আমাদের নিকট পৌঁছেছে তা হলো ইতিহাস ও কাহিনী বিশেষজ্ঞ ওয়াহাব ইবন মুনাবিহ রচিত গ্রন্থটি।... তিনি ইয়ামনের হিময়ার রাজ বংশের মুকুটধারী রাজন্যবর্গ, তাঁদের ইতিহাস, কবিতা ও উপাখ্যান বিষয়ে একখানা গ্রন্থ রচনা করেন। ইবন খাল্লিকান বলেন, তিনি সে গ্রন্থটি দেখেছেন এবং সেটির প্রশংসাও করেছেন।"
বিখ্যাত "কাশফুজ জুনূন” গ্রন্থের রচয়িতা হাজী খলীফা বলেন, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ মাগাযী অর্থাৎ রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধ-বিগ্রহের তথ্য সংগ্রহ করেন। তবে সীরাতের প্রাচীন গ্রন্থসমূহে সীরাতুন নাবীর বর্ণনাকারীদের সাথে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি।
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ বর্ণিত হযরত রাসূলে কারীমের (সা) খুব অল্প তথ্যই আমাদের নিকট পৌঁছেছে। Schott Reinhardt কৃত সংকলনে Papyrus-এর উপর লেখা ছোট্ট একটি টুকরো C. H-Becker লাভ করেন। তাতে বায়'আতে 'আকাবার উল্লেখ আছে। লেখাটি জার্মানীর Heidelberg-এ সংরক্ষিত আছে। ইবন ইসহাক ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ থেকে ফায়ামিউন ও সালিহ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে নাজরানে খৃস্ট ধর্মের প্রচার ও প্রসারের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাটির উপসংহারে ইবন ইসহাক বলেছেন: 'ওয়াহাব ইবন মুনাবিরহের বক্তব্য।'
বিভিন্ন মূল সূত্রসমূহে ওয়াহাবকে "ছিকা” বা বিশ্বস্ত বলা হয়েছে। কিন্তু বর্ণনাকারীগণ অতি অল্প ক্ষেত্রেই তাঁর বর্ণনা গ্রহণের জন্য আগ্রহী হয়েছেন। পক্ষান্তরে মদীনার অন্য বর্ণনাকারীদের নিকট থেকে তাঁরা গ্রহণ করেছেন। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম একটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন, যা ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ তাঁর ভাই হাম্মাম থেকে এবং তিনি আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, এই হাম্মাম একজন দীর্ঘজীবি মানুষ ছিলেন এবং প্রায় ১৩০ বছর জীবন লাভ করেন।
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ (রহ) একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। বিভিন্ন ধর্মের উল্লেখিত গ্রন্থাবলী অধ্যয়নের কারণে তিনি আরো বিচক্ষণ ও 'ইবাদতকারী হয়ে যান। তিনি সারা রাত নামাযে দাঁড়িয়ে কাটাতেন। একাধারে বিশ বছর 'ঈশার নামাযের ওজুতে ফজরের নামায আদায় করেন। এত কোমল প্রকৃতির ছিলেন যে, জীবনে কাউকে কখনো কটু কথা বলেননি বা গালি দেননি।
আধ্যাত্মিকতায় তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। তাঁর থেকে সংঘটিত কিছু অলৌকিক কর্মকাণ্ডের কথা ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন আবু কাছীর ইবন 'উবায়েদ একবার তাঁর সাথে 'সা'দা' নামক স্থানে একজনের বাড়িতে যান এবং রাত্রি যাপন করেন। রাতে বাড়ির সকল বাতি নিভিয়ে দেওয়ার পর সকলে শয্যা গ্রহণ করে। গভীর রাতে গৃহকর্তার মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে ওয়াহাবের ঘরে আলো। সে তার পিতাকে বিষয়টি অবহিত করে। পিতা জানালার ছিদ্রপথে উঁকি দিয়ে দেখে তাঁর পা দু'টি এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে যেন সূর্যের আলোর শুভ্রতা ছড়িয়ে পড়ছে। সকালে গৃহকর্তা ওয়াহাবকে বললেন : গত রাতে আমি আপনাকে এমন এক অবস্থায় দেখেছি যা আর কাউকে কখনো সে অবস্থায় দেখিনি। তিনি জানতে চাইলেন, কী অবস্থায় দেখেছেন? তিনি বললেন: আমি আপনাকে সূর্যের আলো থেকেও উজ্জ্বল আলোর মধ্যে দেখেছি। তাঁর কথা শুনে ওয়াহাব বললেন: যা দেখেছেন গোপন রাখুন।
'আবদুস সামাদ ইবন মা'কিল বলেন, একবার ওয়াহাবকে বলা হলো, ওহে আবূ 'আবদিল্লাহ: আপনি স্বপ্ন দেখে আমাদের নিকট বর্ণনা করেন এবং তা সবই সত্যে পরিণত হয়। তিনি বললেন: এখন আর সে অবস্থায় নেই। যেদিন আমি কাজীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছি সেদিন থেকে সেই অবস্থাটি চলে গেছে।
যাই হোক না কেন, একথা সত্য যে, কা'ব আল-আহবারের মত ওয়াহাব ইবন মুনাবিরহের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে বহু ভিত্তিহীন ইহূদী উপাখ্যান ছড়িয়ে পড়েছে। সীরাতের গ্রন্থাবলীতে তাঁর বহু জ্ঞানগর্ভ কথা পাওয়া যায়। নিম্নে তার কিছু তুলে ধরা হলো: একবার তিনি 'আতা' আল-খুরাসানীকে বলেন: "আমাদের পূর্ববর্তীকালের জ্ঞানী ব্যক্তিগণ নিজেদের জ্ঞান নিয়ে অন্যদের দুনিয়া থেকে মুখাপেক্ষীহীন থাকতেন। তাঁরা অন্যদের দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টি দিতেন না। আর দুনিয়াদার লোকেরা জ্ঞানীদের জ্ঞানচর্চার পিছনে তাদের দুনিয়া ব্যয় করতো। আমাদের আজকের দিনের জ্ঞানীরা যখন দুনিয়াদার লোকদের দুনিয়া পাওয়ার লোভে তাদের জ্ঞান ব্যয় করেন তখন দুনিয়াদার লোকেরা জ্ঞানীদের এই নিকৃষ্ট অবস্থান প্রত্যক্ষ করে তাদের দুনিয়া জ্ঞানীদের জ্ঞানচর্চার পিছনে ব্যয় করা ছেড়ে দিয়েছে।" তিনি একবার মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন। ভাষণে তিনি বলেন: "আমার এই তিনটি কথা মনে রাখবে: অনুসৃত প্রবৃত্তি, খারাপ বন্ধু ও আত্ম-তুষ্টি- এই তিনটি জিনিস থেকে তোমরা দূরে থাকবে।" আবদুস সামাদ বলেন, আমি ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহকে বলতে শুনেছি: "তোমার কোন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ পরিহার কর। কারণ দুই ব্যক্তিকে কখনো পরাভূত করা যায় না। এক ব্যক্তি যে তোমার চেয়ে বেশি জানে। যে তোমার চেয়ে বেশি জানে তার সাথে তুমি কিভাবে ঝগড়া ও শত্রুতা করবে? আরেক ব্যক্তি যার থেকে তুমি বেশি জান। সুতরাং তুমি যার থেকে বেশি জান, অথচ সে তোমাকে মানে না, তার সাথে তুমি ঝগড়া ও শত্রুতা করবে কিভাবে? সুতরাং তা থেকে বিরত থাক।" আবূ সাল্লাম ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: "জ্ঞান মু'মিন ব্যক্তির বন্ধু, বিচক্ষণতা তার মন্ত্রী, বুদ্ধিমত্তা তার নির্দেশিকা, কর্ম তার তত্ত্বাবধায়ক, ধৈর্য তার বাহিনীর পরিচালক, দয়া-সহানুভূতি তার পিতা এবং কোমল আচরণ তার ভাই।" তিনি সব সময় বলতেন: "মু'মনি ব্যক্তি দেখে শেখার জন্য এবং চুপ থাকে, কথা বলে বুঝার জন্য এবং নির্জনতা অবলম্বন করে সাফল্য লাভের জন্য।" তিনি আরো বলেন: "ঈমান হলো একেবারে খোলামেলা পবিত্র বিষয়, তার পোশাক হলো আল্লাহভীতি, তার সাজ-শোভা হলো লজ্জা-শরম এবং তার সম্পদ হলো বিজ্ঞতা।" একবার তিনি তাঁর এক সঙ্গীকে বললেন: "আমি কি তোমাকে এমন একটি জ্ঞান শিক্ষা দেব যে ব্যাপারে ফকীহগণ অক্ষম হননি? সে বললো: হা, দিন। বললেন: যদি কেউ তোমাকে এমন কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করে যে সম্পর্কে তোমার জ্ঞানে আছে, তাহলে তুমি তোমার জ্ঞান অনুযায়ী তাকে অবহিত করবে, অন্যথায় বলবে: আমি জানিনে।" 'আমর ইবন 'আমির আল-বাজালী বলেন, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ বলতেন: "তিনটি জিনিস যার মধ্যে থাকবে সে সৎ গুণের অধিকারী হবে: অন্তরের উদারতা, কষ্টের সময় ধৈর্যধারণ এবং মিষ্টি কথা বলা।" 'আব্বাস ইবন ইয়াযীদ বলেন, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ বলতেন: "যথা সম্ভব বন্ধুর সংখ্যা বৃদ্ধি করবে। তুমি যদি তাদের মুখাপেক্ষী না হও তাতে তারা তোমার কোন ক্ষতি করবে না, আর মুখাপেক্ষী হলে তারা তোমার উপকার করবে।" তিনি বলতেন: "যখন কোন ব্যক্তিকে তোমার মধ্যে নেই এমন গুণের কথা বলে তোমার প্রশংসা করতে শুনবে তখন তোমার মধ্যে নেই এমন দোষের কথা বলে তোমাকে নিন্দা না করার ব্যাপারেও তাকে আস্থাভাজন মনে করবে না।" 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক বলেন, একবার এক ব্যক্তি এসে তাঁকে বললো, মানুষ এখন এসব কাজ করছে, তাতে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, তাদের সাথে আর মেলামেশা করবো না। তিনি বললেন না, এমন করবে না। মানুষ তোমার কাছে আসবে, তুমিও তাদের কাছে যাবে, তাদের তোমার কাছে প্রয়োজন আছে, তোমারও তাদের কাছে প্রয়োজন আছে। তবে তুমি তাদের মধ্যে থাকবে বধির শ্রোতা, অন্ধ চক্ষুষ্মান এবং নিরব বক্তা হিসেবে।
জা'ফার ইবন বুরকান বর্ণনা করেন, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ বলতেন: সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য, যার নিজের দোষ তার ভাইয়ের দোষ চর্চা থেকে বিরত রেখেছে। সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য যে অক্ষম হওয়ার পূর্বে আল্লাহর কাছে নত হয়েছে। সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য যে কোন রকম পাপ-পঙ্কিলতা ছাড়া অর্জিত অর্থ-সম্পদ থেকে সাদাকা করে। সুসংবাদ ক্ষতিগ্রস্ত ও অক্ষমদের জন্য। সুসংবাদ তার জন্য যে জ্ঞানী ও বিচক্ষণ লোকদের সাথে বসে। সুসংবাদ তার জন্য সুন্নাহ্ যাকে ধারণ করেছে, সুতরাং সে তার সীমা অতিক্রম করে না।
আল-হায়ছাম ইবন 'আদী বলেন, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ বলতেন: "নির্বোধ ব্যক্তি যখন কথা বলে তখন তার নির্বুদ্ধিতা তাকে লজ্জিত করে, যখন চুপ থাকে তখন তার এই অক্ষমতাই তাকে লজ্জিত করে। কাজ করলে বিকৃত করে, পরিত্যাগ করলে বিনষ্ট করে। তার নিজের জ্ঞান যেমন তাকে সাহায্য করে না, তেমনি অন্যের জ্ঞানও তার কোন উপকারে আসে না। মা মনে করে তার সন্তানের মৃত্যু হয়েছে, স্ত্রী মনে করে স্বামীহারা হয়েছে। তার প্রতিবেশী তার থেকে একাকীত্ব কামনা করে, তার বন্ধুরা তার থেকে নির্জনতা অবলম্বন করে।" এরপর তিনি কবি মিসকীন আদ-দারিমীর নিম্নের শ্লোকগুলো আবৃত্তি করতেন।
"বোকা লোকের সাহচর্য থেকে দূরে থাক। বোকা লোক জীর্ণ পোশাকের মত। তুমি তার কোন একদিকে তালি লাগালে, বাতাসের দোলায় তার দুর্বল অংশ আবার ফেটে যাবে। অথবা সে কাঁচে ভাঙ্গনের মত। তুমি কি কাঁচের ভাঙ্গন জোড়া লাগতে দেখেছো? তুমি তার সাথে কোন সমাবেশে বসলে, সে তার বোকামী দ্বারা সমাবেশ নষ্ট করে দেবে। সতর্ক করার জন্য যদি তুমি তাকে নিষেধ কর তাহলে তার মূর্খতা বৃদ্ধি পাবে এবং নির্বুদ্ধিতার চূড়ান্তে পৌঁছাবে।”
তিনি একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির চরিত্রের দশটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। যেমন: বিচক্ষণতা, জ্ঞান, সঠিক পথপ্রাপ্ত হওয়া, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী হওয়া, সকল পঙ্কিলতা থেকে নিজকে সংরক্ষণ করা, লজ্জা-শরম, গাম্ভীর্য, সর্বদা কল্যাণের উপর থাকা, মন্দ ও অকল্যাণ প্রত্যাখ্যান করা এবং যারা অকল্যাণের উপর থাকে তাদেরকে ঘৃণা করা, উপদেশ দানকারীর উপদেশ গ্রহণ ও তার আনুগত্য করা। তারপর তিনি প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্য থেকে বের হওয়া দশটি করে শাখা বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন।
তিনি ছিলেন একজন সুরসিক ও উদার মনের মানুষ। সহজে রাগতেন না। ইবন 'আয়্যাশ বলেন, একবার আমি ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহর সাথে বসে আছি। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে ওয়াহাবকে বললো- আমি অমুক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনলাম, সে আপনাকে গালি দিচ্ছে। তার কথা শুনে ওয়াহাব রাগের সাথে বললেন: "শয়তান কি তোমাকে ছাড়া আর কোন রাসূল (দূত) পায়নি?' আমি সেখানে বসে থাকতেই সেই গালি দানকারী লোকটি আসে এবং সালাম দেয়। ওয়াহাব সালামের জবাব দিয়ে তার সাথে হাত মিলান এবং হাসিমুখে তার হাত ধরে নিজের পাশে বসান। বর্ণিত হয়েছে, চল্লিশ বছরের মধ্যে তিনি প্রাণ আছে এমন কোন কিছুকে গালি দেননি।
তিনি সাধারণত রাগতেন না, তবে অন্যায় কোন কিছু দেখলে রেগে যেতেন। সিমাক ইবন আল-ফাদল বলেন, একবার আমরা 'উরওয়া ইবন মুহাম্মাদের নিকট বসা ছিলাম। ওয়াহাব ছিলেন 'উরওয়ার পাশেই। এ সময় কিছু লোক এসে তাদের এলাকার শাসকের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ তুলে ধরলো। তার মধ্যে কিছু মন্দ কথাও ছিল। ওয়াহাব 'উরওয়ার হাতে থাকা লাঠিটি কেড়ে নিয়ে অভিযুক্ত শাসনকর্তার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। তাতে তার মাথা কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। ওয়াহাবের এমন রাগ দেখে উরওয়া হাসতে হাসতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েন। তারপর বলেন, আমরা রেগে যাই বলে আবূ 'আবদিল্লাহ ওয়াহাব দোষারোপ করেন, আর এখন তিনিই এভাবে রেগে গেলেন? বললেন: আমি না রেগে পারি কি করে? যিনি ধৈর্য ও সহনশীলতার স্রষ্টা তিনিই তো রেগে যান। তিনি বলেন: "যখন তারা আমাকে ক্রোধান্বিত করলো, আমি তাদেরকে শাস্তি দিলাম এবং ডুবিয়ে দিলাম তাদের সকলকে।" আল-জা'দ ইবন দিরহাম বলেন: "আমি যখনই কোন 'আলিমের সাথে কথা বলেছি তাকে রেগে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে দেখেছি। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ।”
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০০
২. আল-মাগাযী আল-উলা ওয়া মুয়াল্লিফ্হা-২৭; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৪৮৯
৩. আল-আ'লাম-৮/১২৫
৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০০-১০১
৫. তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৮৮, ৫০১-৫০২
৬. আল-আ'লাম-৮/১২৫
৭. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৪৯
৮. তাহযীব আল-কামাল-১৯/৪৮৮; তাবি'ঈন-৫০৩
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১৯/৪৮৭
১০. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৪৪
১১. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৪৯
১২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০১
১৩. জাওয়াদ 'আলী তারীখ আল-'আরাব কাবলাল ইসলাম-১/৮৪
১৪. আত-তাবাকাত-৫/৩৯২
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১/৪৮৯
১৬. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯১
十七. ড. 'উমার ফাররূখ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-১/৩৭৯
十八. জুরজী যায়দান, তারীখ আত-তামাদ্দুন আল-ইসলামী-২/৫৮; ইবন খাল্লিকান, ওয়াফাইয়াত আ'য়ান-২/১৮০
十九. আল-মাগাযী আল-উনা ওয়া মুয়াল্লিফুহা-৩০-৩৪
二十. মুকাদ্দিমা, আল-মাগাযী আল-উলা-২২
二十一. সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩১-৩৪
二十二. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০১; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৫০২
二十三. প্রাগুক্ত
二十四. তাহযীব আল-কামাল-১৯/৪৯০
二十五. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯১
二十六. প্রাগুক্ত
二十七. প্রাগুক্ত
二十八. প্রাগুক্ত
二十九. প্রাগুক্ত
三十. প্রাগুক্ত
三十一. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯৩-৪৯৪
三十二. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯৮-৫০১
三十三. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯০, ৪৯৩
三十四. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯১
三十五. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯০
📄 মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক (রহ)
মুহাম্মাদ-এর ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ, মতান্তরে আবূ বাকর এবং পিতার নাম ইসহাক। দাদা ইয়াসার ছিলেন 'আয়নুত তামার-এর যুদ্ধবন্দীদের একজন। মুস'আব ইবন 'আবদিল্লাহ আধ দুবায়রী তাঁর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে: "আবদুল্লাহ ইবন কায়সের দাস ও 'আল-মাগাযী' রচয়িতা মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের দাদা ইয়াসার ছিলেন 'আয়নুত তামার-এর একজন যুদ্ধবন্দী। তিনি মদীনায় প্রবেশকারী ইরাকের প্রথম যুদ্ধবন্দী।” সম্ভবতঃ এ কারণে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি কায়স ইবন মাখরামা ইবন মুত্তালিব ইবন 'আবদু মান্নাফের দাস ছিলেন। ইতিহাস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে তিনি ইবন ইসহাক নামে প্রসিদ্ধ। হিজরী ৮৫, খ্রীস্টাব্দ ৭০৪ সনে জন্ম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় বেড়ে ওঠেন। এ কারণে 'আল-মাদানী' বলা হয়। রাসূলুল্লাহর (সা) মহান সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালিকের দর্শন লাভে ধন্য হন। তিনি বলতেন: "আমি আনাস ইবনে মালিককে (রা) দেখেছি এমন অবস্থায় যে, তাঁর মাথায় কালো পাগড়ি এবং শিশু-কিশোররা তাঁকে নিয়ে কোরাস করে গাইছে: ইনি নবীর (সা) একজন সাহাবী, দাজ্জালকে না দেখে মৃত্যুবরণ করবেন না।"
ইবন ইসহাক ছিলেন শ্রেষ্ঠ 'আলিম তাবি'ঈদের একজন। বিশেষতঃ তিনি মাগাযী ও সীরাত শাস্ত্রের একজন ইমাম ছিলেন। সীরাত অর্থ জীবনী এবং মাগাযী অর্থ যুদ্ধ-বিগ্রহ। তবে আল-মাগাযী ও আস-সীরাহ্ বলতে সাধারণত রাসূলে কারীমের (সা) জীবন চরিত ও তাঁর যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস বুঝায়।
তিনি ছিলেন মদীনার অধিবাসী। ইমাম যুহরীর (রহ) অন্যতম ছাত্র এবং মদীনাবাসী আরব ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রবীণতম ব্যক্তি। হাদীছ চর্চা ও বর্ণনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। পরবর্তীকালে 'আসিম ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী বাকর ও যুহরীর (রহ) ন্যায় প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ 'আলিমগণের মজলিসে বসে জ্ঞানের পরিধি আরো বৃদ্ধি করেন। তিনি তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহে এ তিনজনসহ অন্য মুহাদ্দিছদের নিকট থেকে সংগৃহীত তথ্যসমূহ বর্ণনা করেছেন। একমাত্র মদীনাবাসী প্রায় একশো রাবী (বর্ণনাকারী)-এর নাম উল্লেখ করেছেন যাঁদের নিকট থেকে তিনি তাঁর রচনাবলীর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন।
হিজরী ১১৫, খ্রীস্টাব্দ ৭৩৩ সনে ইবন ইসহাক ইসকান্দারিয়া যান এবং সেখানে ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব (মৃ. ১২৮/৭৪৫)-এর নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। এই ইয়াযীদ মিসরে সর্বপ্রথম হাদীছ চর্চার সূচনা করেন। এরপর ইবন ইসহাক আবার মদীনায় ফিরে আসেন। হি. ১২৩, খ্রীস্টাব্দ ৭৪১ সনে তাঁর শিক্ষক ইমাম যুহরীর সাথে কোন এক সাক্ষাতের সময় তিনি প্রিয় ছাত্র ইবন ইসহাককে উপস্থিত 'আলিমদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৩২/৭৪৯ সনে মদীনায় সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়নার সাথে সাক্ষাৎ করেন। তারপর তিনি মদীনা ত্যাগ করে যথাক্রমে কুফা, আল-জাযীরা, রায় ও বাগদাদে যান। বাগদাদেই তিনি আমরণ অবস্থান করেন। 'আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল- মানসূরের খিলাফতকালে (১৩৬-১৫৮/৭৫৪-৭৭৫) আল-জাযীরার ওয়ালী ছিলেন (১৪২/৭৫৯) আল-'আব্বাস ইবন মুহাম্মাদ আল-'আব্বাসী। ইবন ইসহাক জাযীরায় অবস্থানকালে তাঁর সাথেও যোগাযোগ করেন।
ইমাম মালিক (রহ)সহ আরো কিছু 'আলিম তাঁর কিছু দোষ-ত্রুটির কথা বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তবে দু'একজন ছাড়া অন্য সকল ইমাম ও হাদীছ বিশারদ তাঁর মুখস্থ শক্তি ও ধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে আস্থা ব্যক্ত করেছেন। আবূ যার'আ আবদুর রহমান ইবন 'আমর বলেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক এমন এক ব্যক্তি যাঁর থেকে হাদীছ গ্রহণের ব্যাপারে সুফইয়ান আছ-ছাওরী, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, হাম্মাদ ইবন যায়দ, হাম্মাদ ইবন সালামা, ইবনুল মুবারক, ইবরাহীম ইবন সা'দ (রহ) প্রমুখের মত 'আলিমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীবের মত উঁচু স্তরের 'আলিম তাঁর থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। হাদীছ বিশারদগণ তাঁকে পরীক্ষা-নরীরীক্ষা করে সত্যবাদী ও সৎ মানুষ হিসেবে পেয়েছেন।
'আলিমদের স্বীকারোক্তি
শু'বা তাঁকে "আমীরুল মু'মিনীন ফিল হাদীছ” (হাদীছ শাস্ত্রে বিশ্বাসীদের আমীর) বলতেন। লোকেরা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করে যে, আপনি মুহাম্মাদ ইবন ইসহাককে এমন অভিধায় ভূষিত করেন কী কারণে? জবাবে তিনি বলেন: তাঁর মুখস্থ শক্তির কারণে। ইয়াযীদ ইবন হারূন বলতেন, যদি আমার হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা থাকতো তাহলে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাককে মুহাদ্দিছগণের আমীর বানাতাম । আবূ মু'আবিয়া তাঁকে (আহফাজুন নাস - মানুষের মধ্যে সর্বাধিক হাদীছ মুখস্থকারী), ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন "ছিকা” (বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য) ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল "হাসানুল হাদীছ" বলেছেন। অর্থাৎ তাঁর বর্ণিত হাদীছ সাহীহ পর্যায়ের নয়, বরং তার পরবর্তী হাসান পর্যায়ের। আলী ইবন আল-মাদীনী বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছের কেন্দ্র ছিলেন ছয় ব্যক্তি, পরে এই ছয়জনের জ্ঞান বারোতে স্থানান্তরিত হয়। তাঁদের একজন হলেন মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক।
ইমাম যুহরীর কর্ম-পদ্ধতি
ইমাম যুহরী (রহ) ছিলেন মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের উস্তাদ। ছাত্রের জ্ঞানের উপর তাঁর এত পরিমাণ আস্থা ছিল যে, তিনি বলতেন: "যতদিন মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক আছে ততদিন মদীনাবাসীদের মধ্যে জ্ঞান থাকবে।" তিনি যখন মদীনার বাইরে কোথাও যেতেন তখন মুহাম্মাদকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। একবার তিনি মদীনার বাইরে কোথাও যাওয়ার ইরাদা করলেন। জ্ঞান পিপাসুদের অনেকে তাঁর সঙ্গী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, আমি এই নও-জোয়ান ইবন ইসহাককে তোমাদের মধ্যে রেখে যাচ্ছি। তাঁর এই স্থলাভিষিক্তি যুহরীর (রহ) শিষ্য-শাগরিদদের মধ্যে স্বীকৃত ছিল। এ কারণে যুহরীর মৃত্যুর পর তাঁর বর্ণনাসমূহের সত্যায়নের জন্য মানুষ ইবন ইসহাকের নিকট যেত। ইবন 'উয়াইনা বলেন, ইবন ইসহাকের প্রতি কেউ কোন দোষারোপ করেছে এমন কাউকে আমি দেখিনি। ইমাম যুহরী (রহ) তাঁর বাড়ীর দারোয়ানকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন যে, ইবন ইসহাক যখনই আসবে তাকে যেন ঢুকতে দেওয়া হয়। এর দ্বারা বুঝা যায় যুহরীর নিকট ইবন ইসহাকের স্থান কি ছিল। একবার ইবন ইসহাক নিয়মের চেয়ে একটু দেরীতে আসলেন। যুহরী (রহ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন : কোথায় ছিলে? ইবন ইসহাক বললেন : দারোয়ানদের কারণে কেউ কি আপনার নিকট আসতে পারে? যুহরী সাথে সাথে দারোয়ানকে ডেকে বলেন দেন, ইবন ইসহাক যখনই আসুক তাকে ঢুকতে বাধা দেবে না।
ইমাম মালিক ও হিশামের সমালোচনা এবং তার কারণ
মনীষীদের এত প্রশংসা ও স্বীকৃতি লাভ সত্ত্বেও ইবন ইসহাক ইমাম মালিক ও হিশামের কঠোর সমালোচনার মুখোমুখীও হয়েছেন। বিশেষতঃ তাঁর সম্পর্কে ইমাম মালিকের মতামত ছিল অত্যন্ত কঠোর। এমনকি তিনি তাঁর সম্পর্কে অনেক অশোভন শব্দও ব্যবহার করেছেন। যেমন তিনি একবার ইবন ইসহাক সম্পর্কে বলেন: উনজুরু ইলা দাজ্জালিম মিনা দাজাজিলা 'তোমরা দাজ্জালদের মধ্য থেকে একজন দাজ্জালকে দেখ।' এ বাক্যে তিনি মুহাম্মাদ ইবন ইসহাককে দাজ্জাল বলেছেন। হিশামও তাঁকে নির্ভরযোগ্য মনে করতেন না। তবে মুহাদ্দিছগণ নিজেরাই তাঁদের দু'জনের এমন কঠোর সমালোচনার কারণ বলে দিয়েছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ মোটামুটি এ রকম:
হাদীছ গ্রহণে ইমাম মালিক এত কঠোর এবং যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর নীতিমালা এত উঁচুমানের ছিল যে, কারো মধ্যে সামান্য দোষ-ত্রুটি দেখলে তিনি তার সমালোচনায় অতি কঠোর শব্দ উচ্চারণে কোন রকম দ্বিধা করতেন না। খতীব আল-বাগদাদী লিখেছেন, কিছু 'আলিম এ রকম বলেছেন যে, সত্যনিষ্ঠ, দীনদার, মুত্তাকী, বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে ইমাম মালিকের এমন কঠোর ভাষা প্রয়োগের জন্য সমকালীন বহু 'আলিম তাঁরও সমালোচনা করেছেন। ইবরাহীম ইবন আল-মুনযির বলেন: ইবন আবী যি'ব, 'আবদুল 'আযীয আল-মাজিশূন, ইবন আবী হাযিম ও মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক- এঁদের প্রত্যেকে মালিক ইবন আনাসের সমালোচনা করেছেন। তবে সবচেয়ে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক। তিনি বলতেন: "তোমরা তাঁর কিছু বই আমার কাছে নিয়ে এসো, যাতে আমি তাঁর কিছু দোষ-ত্রুটির বর্ণনা দিতে পারি। আমি তাঁর পুস্তকসমূহের চিকিৎসক।” এই প্রেক্ষাপটে ইমাম মালিক যদি ইবন ইসহাক সম্পর্কে কিছু রূঢ় শব্দ প্রয়োগ করে থাকেন তাতে তাঁর নির্ভরযোগ্যতায় বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারে না।
তৃতীয় কারণ এই যে, ইবন ইসহাক গাযওয়া বা রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধ-বিগ্রহের বর্ণনা গ্রহণের ব্যাপারে তেমন বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতেন না। এ কারণে ইমাম মালিক তাঁর আল-মাগাযী (যুদ্ধ-বিগ্রহ) বিষয়ক বর্ণনার সমালোচনা করতেন। তবে আল-মাগাযী ছাড়া ইবন ইসহাক বর্ণিত অন্যসব হাদীছের সাথে এই সমালোচনার কোন সম্পর্ক ছিল না। ইবন হিব্বান বলেন, ইমাম মালিক একবার মাত্র ইবন ইসহাক সম্পর্কে রূঢ় শব্দ প্রয়োগ করেন। তারপর তাঁর মর্যাদা অনুযায়ী তাঁর সাথে আচরণ করতেন। ইমাম মালিক তাঁর হাদীছের কারণে নয়, বরং মাগাযীর কারণে তাঁর সমালোচনা করতেন। কারণ, ইবন ইসহাক খায়বারসহ আরো কিছু যুদ্ধের বিবরণ ইয়াহূদীদের নও-মুসলিম সন্তানদের নিকট থেকে শুনে গ্রহণ করতেন। আর তারা আবার সেই সব বিবরণ দিত তাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষের সূত্রে। যদিও ইবন ইসহাক এসব বর্ণনা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতেন না। তবে ইমাম মালিক পরম বিশ্বাসভাজন ও আস্থাশীল ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো কোন বর্ণনা গ্রহণ করা মোটেই সমীচীন মনে করতেন না।
কিছু 'আলিম বলেছেন, ইমাম মালিকের সমালোচনা মাগাযীর জন্য নয়, বরং তাঁর 'আকীদার (বিশ্বাস) জন্য ছিল। 'আবদুর রহমান ইবন 'আমর আন-নাসরী বলেন, আমি দুহাইমের সামনে ইবন ইসহাক সম্পর্কে ইমাম মালিকের সমালোচনার প্রসঙ্গটি উঠালাম। তিনি বললেন, এটা হাদীছের কারণে ছিল না, বরং তা এজন্য ছিল যে, ইমাম মালিক ইবন ইসহাককে কাদরিয়াদের আকীদায় বিশ্বাসী বলে অভিযুক্ত করতেন। যাই হোক, উপরে উল্লেখিত বর্ণনাসমূহ দ্বারা এতটুকু জানা গেছে যে, ইবন ইসহাকের অগ্রহণযোগ্যতা ও দুর্বলতা ইমাম মালিকের কঠোর সমালোচনার কারণ ছিল না। এর কারণ ছিল অন্য কিছু। এ কারণে এ সমালোচনার প্রভাব ইবন ইসহাক বর্ণিত হাদীছের উপর পড়তে পারে না। এজন্য ইমাম মালিক ছাড়া অন্য সকল ইমাম ও 'আলিম তাঁর বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। এমনকি ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ), যিনি 'আকীদার ক্ষেত্রে কঠোরতার ব্যাপারে ইমাম মালিক থেকে কোন অংশে কম ছিলেন না, ইবন ইসহাকের বর্ণনা গ্রহণ করেছেন।
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের (রহ) পুত্র আবদুল্লাহ একবার মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক সম্পর্কে এক ব্যক্তির একটি জিজ্ঞাসার জবাবে বলেন, আমার পিতা তাঁর বর্ণনাসমূহ যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করতেন এবং মুসনাদে স্থান দিতেন। তবে সুনানের ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতেন না।
ইমাম মালিকের (রহ) পরে ইবন ইসহাকের কঠোর সমালোচকদের মধ্যে দ্বিতীয় আরেকটি নাম হিশাম। তাঁর এমন অবস্থানের রহস্য হলো, ইবন ইসহাক হিশামের স্ত্রী ফাতিমা বিনত মুনযিরের সূত্রে কিছু হাদীছ বর্ণনা করেছেন। হিশাম বলতেন, আমার স্ত্রী ফাতিমা একজন পর্দানশীন মহিলা, তার নয় বছর বয়স থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন বেগানা পুরুষ তাঁকে দেখেনি। তাহলে ইবন ইসহাক তার থেকে হাদীছ শোনেন কিভাবে? তবে অনেক মুহাদ্দিছের মতে শুধু একথার ভিত্তিতে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের বর্ণনাসমূহকে ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করা সঠিক নয়। কারণ, তিনি তো পর্দার আড়াল থেকে শুনে থাকতে পারেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) হিশামের এ বক্তব্য বর্ণনার পর মন্তব্য করেছেন এ ভাষায়: "হিশাম যে তাঁর স্ত্রী নয় বছর বয়সের কথা বলেন, তা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, হিশামের চেয়ে তাঁর স্ত্রী তের বছরের বড়। ইব্ন ইসহাক্ব যখন তাঁর নিকট থেকে হাদীছ গ্রহণ করেন তখন হিশামের স্ত্রীর বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে। ইব্ন ইসহাক্ব ছাড়াও মুহাম্মাদ ইব্ন সূকা’র মত বেগানা পুরুষরাও তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।” ইব্ন হিব্বান তাঁর “আছ্-ছিকাত” গ্রন্থে বলেন: "মুহাম্মাদ ইব্ন ইসহাক্ব সম্পর্কে ইমাম মালিক ও হিশাম- দু’ব্যক্তিই কথা বলেছেন। তবে হিশামের কথায় কোন মানুষ অভিযুক্ত হতে পারে না। কারণ, অসংখ্য তাবি‘ঈ উম্মুল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশার (রা) প্রতি দৃষ্টিপাত না করে পর্দার আড়াল থেকে তাঁর কথা শুনতেন। একইভাবে ইব্ন ইসহাক্বও ফাতিমার কথা শুনে থাকবেন।” ‘আলী ইব্ন আল-মাদীনী বলেন: "হিশাম যা বলেছেন তা কোন দলীল হতে পারে না। সম্ভবতঃ তিনি (ইব্ন ইসহাক্ব) তাঁর স্ত্রীর নিকট অপ্রাপ্ত বয়সে গিয়েছেন এবং তাঁর থেকে হাদীছ শুনেছেন।
ইব্ন ইসহাক্বের শায়খগণ
ইব্ন ইসহাক্ব ছিলেন ইমাম যুহরীর (রহঃ) খাস শাগরিদ। তবে তিনি ছাড়া আরো অনেক শায়খের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। যেমন তাঁর শায়খদের মধ্যে তাঁর পিতা ইসহাক্ব, চাচা মূসা, ‘উবায়দুল্লাহ ইব্ন ‘আবদিল্লাহ ইব্ন ‘আমর, মু’আইদ ইব্ন কা’ব ইব্ন মালিক, মুহাম্মাদ ইব্ন ইবরাহীম আত-তায়মী, কাসিম ইব্ন মুহাম্মাদ ইব্ন আবী বাকর (রা), মুহাম্মাদ ইব্ন জা’ফার ইব্ন যুবায়র, ‘আসিম ইব্ন ‘আমর ইব্ন ক্বাতাদা, ‘আব্বাস ইব্ন সাহল ইব্ন সা’দ, ইব্ন মুনকাদির, মাকহুল, ইবরাহীম ইব্ন ‘উক্ববা, হুমায়দ আত-তাবীল, সালিম আবী আন-নাদার, সা‘ঈদ মুকরী, সা‘ঈদ ইব্ন আবী হিন্দ, আবূ আয-যানাদ, ‘আবদুর রহমান ইব্ন আসওয়াদ আন-নাখা‘ঈ, ‘আত্বা’ ইব্ন আবী রাবাহ, ‘ইকরিমা ইব্ন খালিদ, ‘আলা’ ইব্ন ‘আবদির রহমান, ‘আমর ইব্ন শু‘আয়ব, নফি', আবূ জা'ফার আল-বাকির, ফাতিমা বিন্ত আল-মুনযির (রহ) প্রমুখের মত বড় আলিমগণ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। জামাল উদ্দীন আল-মিযযী তাঁর ১২২ (একশত বাইশ) জন শায়খের নাম উল্লেখ করেছেন।
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের তালিকা অতি দীর্ঘ। এখানে কিছু বিশিষ্ট ছাত্র যাঁরা তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো: জারীর ইবন হাযিম, 'আবদুল্লাহ ইবন সা'ঈদ ইবন 'আওন, ইবরাহীম ইবন সা'দ, শু'বা ইবন আল-হাজ্জাজ, ইবন 'উয়ায়না, ইবন মু'আবিয়া, 'আবদুল্লাহ ইবন ইদরীস, আবূ 'আওয়ানা, 'আবদুল আ'লা আশ-শামী, 'আবদুহু ইবন সুলায়মান, জারীর ইবন 'আবদিল হামীদ, যিয়াদ আল-বাক্বা'ঈ, হাম্মাদ ইবন যায়দ, সালামা ইবন আল-ফাদল, মুহাম্মাদ ইবন সালামা আল-হাররানী, ইউনুস ইবন বুকাইর, ইয়াযীদ ইবন হারূন, আহমাদ ইবন খালিদ, ইয়া'লা ইবন উবায়দ, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-উমাবী, ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব আল-মিসরী, ইউনুস ইবন বুকাইর আশ- শায়বানী, ইয়া'লা ইবন 'উবায়দ আত-তানাফুসী, 'হারূন ইবন মূসা আন-নাহবী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারাক (রহ) ও আরো অনেকে।
সীরাত ও মাগাযী
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের অধ্যয়নের আসল ক্ষেত্র ছিল মাগাযী ও সীরাত শাস্ত্র। এ শাস্ত্রের তিনি একজন ইমাম ছিলেন। ইমাম যাহাবী বলেন: 'তিনি মাগাযী ও সীরাত বিদ্যায় ছিলেন একজন তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি।' ইমাম শাফি'ঈ (রহ) বলতেন, কেউ যদি মাগাযী শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে চায় তাকে ইবন ইসহাকের মুখাপেক্ষী হতে হবে। খতীব বাগদাদী লিখেছেন, তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি এই বিদ্যার দিকে দৃষ্টি দেন এবং এত সমৃদ্ধি ঘটান যে, তাঁর পরে আর কেউ তাতে কোন কিছু সংযোজন করতে পারেননি। তিনি আমীর-উমারা ও শাসক শ্রেণীর দৃষ্টি ফলাফল শূন্য ও অর্থহীন কিস্সা-কাহিনী থেকে প্রকৃত ইতিহাসের দিকে ফিরিয়ে দেন। এভাবে তিনি সর্বপ্রথম ইতিহাস চর্চার রুচি সৃষ্টি করেন। শাসকদের রুচির পরিবর্তন ঘটানো, অর্থহীন গ্রন্থ ও কিস্সা-কাহিনীর চর্চা থেকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) মাগাযী, সুন্নাহ এবং বিশ্বের উৎপত্তির ইতিহাসের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোন কিছুই যদি তিনি না করতেন তাহলে এই একটি মাত্র কাজ তাঁর পথিকৃৎ ও শ্রেষ্ঠত্বের গৌরবজনক আসন লাভের জন্য যথেষ্ট ছিল। তাঁর পরে আরো অনেকে এই শাস্ত্রের উপর গ্রন্থ রচনা করেছেন, কিন্তু কেউ তাঁর সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেননি। যে ইমাম যুহরীর নিকট থেকে তিনি এ শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেন, তিনিও এ ক্ষেত্রে তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।
ইতিহাস যদিও মাগাযী ও সীরাত ইতিহাসেরই একটি শাখা, তবে ইবন ইসহাক সাধারণ ইতিহাসেরও একজন পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। খতীব বাগদাদী বলেন, তিনি সীরাত, মাগাযী, আরবের অতীত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ঘটনাবলী, মানব জাতির উৎপত্তি এবং নবীদের কিস্সা-কাহিনীরও 'আলিম ছিলেন।
আল-মাগাযী বিষয়ে লেখালেখির সূচনা হয় কখন?
এখানে এ বিষয়টি উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, হিজরী প্রথম শতকে 'তাদবীনে হাদীছ' তথা হাদীছ লেখালেখির কাজ শুরু হয় এবং দ্বিতীয় শতকে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে। হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণের সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই সামরিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলীও লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। এগুলোকে পৃথকভাবে 'আল-মাগাযী' নামে বিন্যস্ত করা হয়। এ ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি দেখা দিতে পারে তা হলো, সীরাত ও মাগাযী লেখার সূচনা হলো কীভাবে? এ শাস্ত্রটি কি হাদীছ শাস্ত্রের সাথে অথবা পৃথকভাবে গড়ে ওঠে? এ ব্যাপারে প্রাচ্যবিদদের ধারণা হলো, হাদীছ শাস্ত্র ছিল একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বিষয় এবং সীরাত ও মাগাযী ছিল তারই একটি অংশ বিশেষ। তবে কিছু মুসলিম ঐতিহাসিকের রয়েছে ভিন্ন মত। তাঁরা বলেন: সীরাত ও মাগাযীর উৎপত্তি হয় সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে এবং হাদীছ শাস্ত্রের পাশাপাশি স্বতন্ত্রভাবে তা উন্নতি লাভ করে। সম্ভবতঃ এ মতপার্থক্যের কারণ হলো, প্রাথমিক যুগে সীরাত ও মাগাযী লেখকরা হাদীছ শাস্ত্রেরও আলিম ছিলেন এবং তাঁদেরকেও 'মুহাদ্দিছ' বলা হতো। তাঁরা হাদীছ ও মাগাযী বিষয়ক তথ্য একই রকম গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সাথে সংগ্রহ করতেন। সীরাত ও মাগাযী বিষয়ক তথ্য প্রথম থেকেই সংগ্রহ করার ঝোঁক সাহাবা ও তাবি'ঈদের মধ্যে ছিল। সুতরাং তাঁরা এ বিষয়ের তথ্য হাদীছ থেকে স্বতন্ত্রভাবে সংগ্রহ করেন। একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে, সীরাত ও মাগাযীর রাবীগণের যদিও হাদীছে পারদর্শিতা ছিল, তবে তাঁদের বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা খুবই কম। মুহাদ্দিছ হিসেবেও তাঁরা তেমন খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি।
তাঁর রচনাবলী
তিনি ইতিহাস ও সীরাত বিষয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। ইবন নাদীম বলেন: 'তাঁর অনেকগুলো গ্রন্থ আছে। 'কিতাবুল খুলাফা' গ্রন্থটি তাঁর থেকে 'উমাবী বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া আছে 'কিতাবুস সীরাহ্ ওয়াল মুবতাদা ওয়াল মাগাযী।'
তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রাচীনতম রচনাটি হলো সীরাত গ্রন্থটি। বহুকাল যাবত গ্রন্থটি দুষ্প্রাপ্য। তবে এ গ্রন্থের সকল বর্ণনা এখনো বিদ্যমান আছে। ইবন হিশামের সীরাতের সবচেয়ে বড় উৎস এই সীরাত। এ কারণে তাঁর সকল বর্ণনা এতে সংরক্ষিত হয়েছে। ইবন হিশামের বর্তমান সীরাত গ্রন্থটি প্রকৃতপক্ষে ইবন ইসহাকের সীরাতের সংক্ষিপ্ত রূপ।
ইবন ইসহাক তাঁর এই গ্রন্থটি আব্বাসীয় খলীফা আল-মাহদীর ছেলের জন্য লেখেন। একবার তিনি খলীফা আল-মাহদীর দরবারে যান। তখন সেখানে খলীফার এক ছেলেও উপস্থিত ছিল। খলীফা নিজের ছেলের প্রতি ইঙ্গিত করে ইবন ইসহাককে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি একে চেনেন? তিনি বলেন: আমীরুল মু'মিনীনের ছেলে। খলীফা অনুরোধ করেন, তিনি যেন তাঁর এ ছেলের জন্য এমন একখানি গ্রন্থ রচনা করেন যাতে আদমের সৃষ্টি থেকে তাঁর সময় পর্যন্ত পৃথিবীর সকল ঘটনার বিবরণ থাকে। এই নির্দেশ অনুযায়ী তিনি এক বৃহদাকৃতির গ্রন্থ রচনা করে খলীফার সামনে উপস্থাপন করেন। গ্রন্থটির কলেবর দেখে তিনি বলেন, এ তো অনেক বড় গ্রন্থ। এটাকে একটু সংক্ষিপ্ত করুন। তিনি সেটা সংক্ষেপ করেন। প্রথম গ্রন্থটি খলীফা আল-মাহদীর গ্রন্থাগারে রাখা হয়। তবে ইবন সা'দ বলেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক হীরায় আব্বাসীয় খলীফা আবূ জা'ফার আল- মানসূরের নিকট আসেন এবং তাঁর জন্যই তিনি "আল-মাগাযী” রচনা করেন।
তাঁর সীরাত ও মাগাযী
খলীফা আল-মানসূর ১৪৬/৭৬৩ সনে নতুন রাজধানী বাগদাদে যাওয়ার পূর্বে হীরায় অবস্থানকালে ইবন ইসহাক তাঁর আল-মাগাযী গ্রন্থটির রচনা সমাপ্ত করে তাঁর নিকট পাঠান। এ বর্ণনা দ্বারা কোনভাবেই বুঝা যায় না যে, তিনি কোন খলীফার নির্দেশে তাঁর আল-মাগাযী রচনা করেন। তাছাড়া তাঁর রাবী (বর্ণনাকারী)-দের তালিকা দ্বারা একথাও প্রতীয়মান হয় যে, তিনি মদীনা ও মিসরে অবস্থানকালে যে সকল হাদীছ সংগ্রহ করেন তারই ভিত্তিতে আল-মাগাযী সংকলন করেন। তিনি কোন ইরাকী রাবীর নাম উল্লেখ করেননি। এতেও স্পষ্ট হয় যে, তিনি শেষ বারের মত মদীনা ত্যাগের পূর্বে গ্রন্থখানির রচনা সমাপ্ত করেন।
এখানে একটি কথা উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ইবন ইসহাকের আল-মাগাযী গ্রন্থখানা অথবা সঠিক অর্থে তাঁর অংশ বিশেষ 'আরবী খিযানা' তথা গ্রন্থ ভাণ্ডার থেকে হারিয়ে যাওয়া এবং ৫০৬/১১১২ সনে লিখিতভাবে তাঁর অংশ বিশেষ ফাসের 'কারাবী' খিযানায় প্রাপ্তি, গ্রন্থখানা সম্পর্কে আমাদের সার্বিক অবগতির ক্ষেত্রে একটি শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। তবে ইবন হিশাম (মৃ. ২১৮/৮২৮) 'সীরাতুন্নাবী (সা)' নামে ইবন ইসহাকের গ্রন্থখানা সংক্ষেপে করে একটি মহৎ কাজ সম্পাদন করেন।
তিনি ইবন ইসহাকের অন্যতম প্রসিদ্ধ ছাত্র 'বাক্ক্কাঈ' (মৃ. ১৮৩/৭৯৯)-এর বর্ণনা থেকে গ্রহণ করেছেন। তিনি তাবারীসহ ইতিহাসের অন্যান্য গ্রন্থে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা অংশসমূহ জোড়া দিয়ে মূল গ্রন্থটির পদ্ধতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট চিত্র অংকনের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
ইবন ইসহাকের মূল গ্রন্থে ইবন হিশাম যে সকল পরিবর্তন ঘটিয়েছেন তা তিনি 'সীরাতুন্নাবী'র ভূমিকায় স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। যেমন আদম (আ) থেকে ইবরাহীম (আ) পর্যন্ত আহলি কিতাবদের ইতিহাস তিনি পরিত্যাগ করেছেন। আমাদের মহানবীর (সা) প্রত্যক্ষ ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ ছাড়া ইসমা'ঈলের (আ) বংশধরদের আলোচনা বাদ দিয়েছেন। অনুরূপভাবে তিনি ইবন ইসহাক বর্ণিত এমন সব কাহিনী বাদ দিয়েছেন যাতে নবী কারীম (সা) সম্পর্কে কোন কথা নেই, সে কাহিনীর আল-কুরআনে কোন ইঙ্গিত নেই এবং গ্রন্থে বর্ণিত অন্য কোন ঘটনার সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক নেই। গ্রন্থটির সংক্ষিপ্তকরণই এ বাদ দেওয়ার প্রধান কারণ। অন্যান্য কারণেও আরো কিছু অংশ বাদ দিয়েছেন। যেমন কিছু প্রাচীন আরবী কবিতা যা পণ্ডিতদের নিকট অপরিচিত, কিছু তথ্য যা ব্যক্তি বিশেষের জন্য পীড়াদায়ক অথবা তাদের প্রতি পাঠকের মধ্যে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া কিছু তথ্য ইবন ইসহাকের গ্রন্থে ছিল কিন্তু বাক্কাঈ তা ভুলে গেছেন, ফলে ইবন হিশাম তা পাননি।
ইবন হিশাম বহু কিছু সংশোধন এবং আরব বংশ পরিচয় ও ভাষার ক্ষেত্রে অনেক কিছু সংযোজনও করেছেন। সে সবের প্রতি যথাস্থানে ইঙ্গিতও করেছেন। তবে তিনি মূল পাঠে কোন রকম পরিবর্তন করেননি। যেখানে তিনি কোন কিছু পরিবর্তন ও সংক্ষিপ্ত করেছেন বা বাদ দিয়েছেন সেখানে তার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তবে ইবন হিশামের সংক্ষিপ্তকরণের ফলে জ্ঞানের জগতে যে ক্ষতি হয়েছে তা আমরা পুষিয়ে নিতে পারি প্রাচীন আরবী গ্রন্থরাজির বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ইবন ইসহাকের গ্রন্থখানির অংশ বিশেষ একত্র করে পাঠের মাধ্যমে। ইমাম আত-তাবারী তাঁর বিখ্যাত তারীখ ও তাফসীর গ্রন্থদ্বয়ে ইবন ইসহাকের সীরাত গ্রন্থের 'আল-মুবতাদা' (সূচনাপর্ব) অধ্যায়ের পরিচ্ছেদগুলোর বহু অংশ বিশ্ববাসীর জন্য সংরক্ষণ করেছেন। অন্যদিকে আল-আযরুকী তাঁর 'আখবারু মাক্কাহ' গ্রন্থে ইবন হিশাম কর্তৃক বাদ দেওয়া অনেক খবরই ধরে রেখেছেন। ইবন হিশামের ভূমিকার মাধ্যমে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, আল-মাগাযী অধ্যায় থেকে যা বাদ পড়েছে তা অতি সামান্য, পক্ষান্তরে 'আল-মুরতাদা' অধ্যায় থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ বাদ পড়েছে। তবে এ ক্ষতি পূরণ করার ক্ষেত্রে আত-তাবারীর অবদান অন্য সকলকে অতিক্রম করে গেছে।
যদি আমরা বিভিন্ন গ্রন্থে সংরক্ষিত বিক্ষিপ্ত অংশসমূহের প্রতি যত্নবান হই, তাহলে ইবন ইসহাকের গ্রন্থটির নিম্নের চিত্র দেখতে পাই। ইবন ইসহাক তাঁর 'আল-মাগাযী' প্রণয়নের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বলিত একটি পদ্ধতির অনুসরণ করেছেন এবং তা তিনটি বিষয় বস্তুতে বিন্যাস করেছেন। যেমন: ১. আল-মুবতাদা ২. আল-মাব'আছ ৩. আল-মাগাযী
১. আল-মুবতাদা
এ অধ্যায়ে ইবন ইসহাক জাহিলী যুগের আরবের ইতিহাস আলোচনা করেছেন। তিনি এ অধ্যায়ের বিষয়বস্তু চারটি পরিচ্ছেদে সাজিয়েছেন। প্রথম পরিচ্ছেদে প্রাক-ইসলামী যুগের ওহী, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ইয়ামনের ইতিহাস, তৃতীয় পরিচ্ছেদে আরবগোত্রসমূহ ও তাদের মূর্তি পূজা এবং চতুর্থ পরিচ্ছেদে আমাদের মহানবী (সা)-এর প্রত্যক্ষ পূর্ব পুরুষ ও মক্কার ধর্মসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এ অধ্যায়ের সনদের উপর নির্ভরতা খুবই কম।
২. আল-মাব'আছ
এ অধ্যায়ে ইবন ইসহাক দু'টি বিষয়ে আলোচনা করেছেন। প্রথম পরিচ্ছেদে নবী কারীমের (সা) মাক্কী জীবন এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে হিজরাত ও মদীনায় প্রথম বছরের কর্মতৎপরতার বিবরণ এসেছে। মাব'আছ অধ্যায়ে যে বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষণীয় তা হলো পূর্ববর্তী অধ্যায়ের তুলনায় সনদের আধিক্য এবং বিশেষভাবে ইবন ইসহাকের মাদানী শিক্ষকদের বর্ণনার উপর নির্ভরতা, যা তিনি সন ভিত্তিক বিন্যাস করেছেন।
এ অংশে সনদ ছাড়া অথবা সনদ সহকারে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনার পাশাপাশি মদীনার বিভিন্ন গোত্রের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) বিখ্যাত চুক্তিগুলো, যা মদীনার সামাজিক বিধি-বিধান নামে আখ্যায়িত, সে সম্পর্কে ইবন ইসহাক সংগৃহীত দলিল-প্রমাণাদি পাওয়া যায়। এতে আরো পাওয়া যায় একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা, যার কিছু অংশে রয়েছে প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের নাম, কিছু অংশে হাবশার মুহাজিরদের ও প্রথম যুগের আনসারদের নাম ইত্যাদি। এভাবে দ্বিতীয় অধ্যায় শেষ হয়েছে।
৩. আল-মাগাযী
ইবন ইসহাক তাঁর আল-মাগাযীতে মদীনায় মুশরিক গোত্রসমূহের বিরুদ্ধে নবী কারীমের (সা) প্রথম যুদ্ধের আহ্বান থেকে তাঁর ওফাত পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। এ অংশে তিনি মহানবীর (সা) অন্তিম রোগ ও ওফাতের বিবরণ ছাড়া আর কিছু বিস্তারিত বর্ণনা করেননি। তবে এ অংশে সব কিছুই সনদ সহকারে বর্ণিত হয়েছে। যুদ্ধগুলো বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। আলোচ্য বিষয়ের সারকথা ভূমিকায় বর্ণনা করেছেন। আল-মাগাযীতে নামের তালিকার সংখ্যাও অনেক। যেমন বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, নিহত, আহত ও বন্দী ব্যক্তিবর্গের তালিকা। অনুরূপ তালিকা দিয়েছেন উহুদ, খন্দক, খায়বার, মৃতাসহ বিভিন্ন যুদ্ধেরও। হাবশা থেকে প্রত্যাবর্তনকারী মুহাজিরদেরও ভিন্ন একটি তালিকা তিনি দিয়েছেন।
একটি কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইবন ইসহাক তাঁর গ্রন্থের তৃতীয় অংশের নামে সম্পূর্ণ গ্রন্থটির নামকরণ করেন- আল-মাগাযী। এরপর নামটির এত প্রসিদ্ধি ঘটে যে, পরবর্তীকালে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সীরাত লেখক তাঁদের রচিত রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনীকে এ নামে নামকরণ করেছেন।
ইবন ইসহাকের আল-মাগাযী যে এক বিরাট কর্মকাণ্ড সে ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। বিভিন্ন বর্ণনা ও খবর সংগ্রহের ব্যাপারে তিনি তাঁর সবটুকু শ্রম ব্যয় করেছেন। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী সকল রাবী ও সূত্রের উল্লেখসহ সকল খবর লিপিবদ্ধ করেছেন। এ গ্রন্থে ইবন ইসহাকের সংকলন ও বিন্যাসের অসাধারণ ক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনিই সর্বপ্রথম সীরাত বিষয়ক ঘটনাবলী ইতিহাসের পদ্ধতিতে একের পর এক সাজান। তাঁর পূর্বে আর কেউ এমনভাবে সাজাননি। এসব কারণে তিনি সীরাত ও মাগাযী রচনায় পথিকৃতের স্থান দখল করে আছেন। আবূ আহমাদ ইবন 'আদী বলেন: "তাঁর থেকে "আল-মাগাযী" বর্ণনা করেছেন ইবরাহীম ইবন সা'দ, সালামা ইবন আল-ফাদল, মুহাম্মাদ ইবন সালামা, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-উমাবী, সা'ঈদ ইবন বাযীগ, জারীর ইবন হাযিম, যিয়াদ আল-বাক্বাঈ ও আরো অনেকে। তিনি "আল-মুবতাদা" ও "আল-মাব'আছ" আল-বাক্বাঈ থেকে বর্ণনা করেছেন। কোন কিছুই অর্জিত হয় না- এমন সব গ্রন্থ পাঠের ব্যস্ততা থেকে রাজা-বাদশাদেরকে সরিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) আল- মাগাযী, আল-মাব'আছ ও আল-মুবতাদা (পৃথিবীর সূচনা) পাঠের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজটি ছাড়া আর কোন কিছুই যদি ইবন ইসহাক না করতেন, তাহলেও এই একটি মাত্র কাজের জন্য তিনি সকলকে অতিক্রম করে যেতেন। তাঁর পরে আরো অনেকে এ বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন, কিন্তু কেউই তাঁর সমকক্ষতা লাভ করতে সক্ষম হননি।'
ইবন ইসহাক তাঁর আল-মাগাযী গ্রন্থে বিভিন্ন ব্যক্তি, গোত্র-গোষ্ঠী ও জাতির নামে বহু আরবী কবিতা সন্নিবেশ করেছেন। তাঁর সমকালীন ও পরবর্তীকালের বসরা ও কুফার আরবী ভাষা-সাহিত্যের পণ্ডিতগণ সেসব কবিতার অধিকাংশ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে মত প্রকাশ করেছেন। পরবর্তীকালে ইবন হিশাম বসরা-কৃষ্ণার পণ্ডিতদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সেসব কবিতার সত্যাসত্য যাচাই করেছেন এবং অধিকাংশ বাদ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে হিজরী তৃতীয় শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আরবী সাহিত্য বিশারদ মুহাম্মাদ ইবন সাল্লাম আল-জামহী (মৃ. ২৩২) যে মতামত প্রকাশ করেছেন তা উপস্থাপন করে আমাদের বক্তব্য শেষ করছি। তিনি বলেন: 'যারা আরবী কবিতার ক্ষতি ও ধ্বংস করেছে এবং কবিতার নামে সব আবর্জনা ও জঞ্জাল গ্রহণ করেছে, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক তাদের অন্যতম। তিনি একজন সীরাত বিশেষজ্ঞ। লোকেরা তাঁর নিকট থেকে আরবী কবিতা গ্রহণ করেছে। তিনি আপত্তি করে বলতেন: কবিতা সম্পর্কে আমার কোন জ্ঞান নেই। আমার নিকট কবিতা আনা হয়, আর তা গ্রহণ করি। এটা তাঁর জন্য কোন কৈফিয়ত হতে পারে না। তিনি তাঁর সীরাত গ্রন্থে এমন সব লোকের কবিতা সন্নিবেশ করেছেন যারা কখনো কোন কবিতা বলেনি। পুরুষদের কবিতা ছাড়াও মহিলাদের কবিতাও সংকলন করেছেন। এ পর্যন্ত তিনি থেমে থাকেননি, বরং 'আদ ও ছামূদ জাতি পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছেন। তিনি কি নিজে কখনো চিন্তা করেননি, এসব কবিতা কারা এতদিন ধারণ করেছে এবং হাজার হাজার বছর ধরে কে বা তা সংরক্ষণ করেছে? আল্লাহ বলেন: তিনিই প্রথম 'আদকে ধ্বংস করেছেন এবং ছামুদকে এমনভাবে নির্মূল করেছেন যে, তাদের একজনকেও বাঁচিয়ে রাখেননি। 'আদ জাতি সম্পর্কে অন্যত্র বলেন: তুমি কি এখনো তাদের কাউকে অবশিষ্ট দেখতে পাবে? তিনি আরো বলেন: তোমাদের কাছে কি সেই জাতিসমূহের অবস্থার বিবরণ আসেনি যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে? নূহের জাতি, 'আদ-ছামুদ এবং তাদের পরবর্তীকালের বহু জাতি যাদের সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।'
কাদরিয়া মতবাদ
কোন কোন বর্ণনায় জানা যায় যে, ইবন ইসহাক কাদরিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। আরবী 'কদর' শব্দ হতে 'কাদরিয়া' কথাটি এসেছে। 'কদর' মানে শক্তি। এই সম্প্রদায়ের চিন্তাবিদরা মানুষের ইচ্ছার স্বাতন্ত্র্যে ও কর্মের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন বলে তারা কাদরিয়া নামে পরিচিত। তবে তিনি কাদরিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না বলেও অনেকে বলেছেন। মুহাম্মাদ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন নুমাইর বলেন, ইবন ইসহাক কাদরিয়া ছিলেন বলে দোষারোপ করা হয়, অথচ এই মতবাদের সাথে তাঁর দূরতম সম্পর্কও ছিল না।
মৃত্যু
প্রথম জীবনে তিনি মদীনায় বসবাস করতেন। পরে এখান থেকে কৃষ্ণা, জাযীরা, রায় প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণ করতে থাকেন। সর্বশেষ বাগদাদে যান এবং সেখানে হিজরী ১৫১, খ্রী. ৭৬৮, মতান্তরে ১৫২ অথবা ১৫৩ সনে ইনতিকাল করেন। খলীফা হারুন আর-রাশীদের মা খায়যুরানের কবরস্তানে সমাহিত হন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৬/৭৩
২. প্রাগুক্ত-১৬/৭০; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭২-১৭৩
৩. তারীখু বাগদাদ-১/২২৪
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৮, ৮১; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭৩
৫. তারীখু বাগদাদ-১/২২৪; তাবি'ঈন-৩৯৯
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭৩
৭. তারীখু বাগদাদ-১/২২৪; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৪
৮. প্রাগুক্ত
৯. ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৮৪; তাবি'ঈন-৩৯৯
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৭৩
১১. তারীখু বাগদাদ-১/2১৯; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৪
১২. তারীখু বাগদাদ-১/২২৩
১৩. ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪৮৩; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১৭৩
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৫
১৫. তারীখু বাগদাদ-১/২২৪; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৭
১৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৯, ৪০
十七. প্রাগুক্ত
十八. তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৮
十九. প্রাগুক্ত-১৬/৭২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭২; তাহযীব আত-তাহ্যব-৯/৩৯
二十. প্রাগুক্ত
二十一. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭৩
二十二. তারীখু বাদগাদ-১/২১৫
二十৩. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৪৪
二十四. তারীখু বাগদাদ-১/২১৯; তাবি'ঈন-৪০৩
二十五. প্রাগুক্ত
二十六. ড. মাহমুদুল হাসান, আরবূ মে তারীখ নিগারী কি নাশূ ও নামা (ইসলাম আওর আসরে জাদীদ, খণ্ড-১. ১৯৬৭)
二十七. ইবন নাদীম, আল-ফিরিস্ত-১৩৬
二十八. তারীখু বাগদাদ-১/২২১
二十九. তাবাকাত-৭/২৭; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৮১
三十. আল-মাগাযী আল-উলা' ওয়া মুয়াল্লিফুহা-৭৫-৮১
三十一. তাহযীব আল-কামাল-১৬/৮২
三十二. তাবাকাতু ফুহুল আশ-শু'আরা'-৭-৮
三十三. তারীখু বাগদাদ-১/২২২; তাহযীব আল-কামাল-১৬/৭৮
三十四. তাবাকাত-৭/২৭' তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৭৩; আল-আ'লাম-৬/২৮