📄 আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ (রহ)
তাঁর পূর্ণ নাম আবূ 'আমর আল-আসওয়াদ এবং পিতার নাম ইয়াযীদ। তাঁর দশম ঊর্ধ্বতন পুরুষ "নাখা”-এর প্রতি আরোপ করে তাঁকে নাখা'ঈ বলা হয়। কুফার অধিবাসী ছিলেন। তিনি একজন "মুখাদরাম" ব্যক্তি ছিলেন। যারা জাহিলী ও ইসলামী উভয় যুগ লাভ করেন তারা হলেন 'মুখাদরাম'। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত তাবি'ঈ 'আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদের ভাই, 'আলকামা ইবন কায়সের ভাতিজা, ইবরাহীম আন- নাখা'ঈর মামা এবং 'আবদুর রহমান ইবন আল-আসওয়াদের পিতা। তিনি 'আলকামা ইবন কায়সের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন।
জ্ঞান-মনীষা ও 'ইবাদত-বন্দেগীর দিক থেকে আল-আসওয়াদকে কৃষ্ণার বিশিষ্ট 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করা হয়। ইমাম যাহাবী তাঁকে ইমাম, ফকীহ, তাপস, দুনিয়া বিরাগী ও কুফার 'আলিম বলেছেন। ইমাম নাওবী লিখেছেন, তাঁর বিশ্বস্ততা ও মহত্ত্বের ব্যাপারে সকলে একমত।
হাদীছ
হাদীছের বিশিষ্ট হাফিজ ছিলেন। হযরত আবূ বাকর, 'উমার, 'আলী, 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ, 'আয়িশা সিদ্দীকা, হুযায়ফা, আবূ মাহযূরা, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, মু'আয ইবন জাবাল, বিলাল ইবন রাবাহ (রা) প্রমুখের মত উঁচু পর্যায়ের সাহাবীর সুহবত এবং তাঁদের থেকে হাদীছ শোনার সৌভাগ্য লাভ করেন। হযরত 'উমার (রা) ও উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) সাথে অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। উল্লেখিত মহান ব্যক্তিবর্গের সকলের সূত্রে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
ছাত্র-শিষ্য
তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করে তাঁর নিজ পরিবারের সকল সদস্য বড় বড় জ্ঞানী ব্যক্তিতে পরিণত হন। যেমন তাঁর ভাগ্নে ইবরাহীম নাখা'ঈ, ভাই 'আবদুর রহমান ও তাঁর পিতার চাচাতো ভাই 'আলকামা। এই 'আলকামা তো তৎকালীন জ্ঞানের জগতের উজ্জ্বল তারকাতুল্য ছিলেন। তাছাড়া অন্যদের মধ্যে 'আম্মারা ইবন 'উমায়র, আবু ইসহাক সুবায়'ঈ, আবূ বুরদা ইবন আবূ মূসা, মুহারিব ইবন দাছারা, আশ'আছ ইবন আবিশ শা'ছা' (রহ) ও আরো অনেকে তাঁর নিকট থেকে হাদীছ শুনেছেন। ফিক্ শাস্ত্রেও তাঁর বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি একজন ফকীহ ছিলেন। ইমাম যাহাবী, ইবন হাজার 'আসকিলানী এবং আরো অনেকে তাঁর ফিক্হ বিষয়ে ব্যুৎপত্তির কথা স্বীকার করেছেন।
'ইবাদত-বন্দেগী ও দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতা
'ইলমের চেয়েও তাঁর 'আমল যথা: আল্লাহভীতি, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ স্বভাব, 'ইবাদত-বন্দেগী ছিল বেশি সুন্দর। তাবি'ঈদের মধ্যে আটজন মহান ব্যক্তি ছিলেন 'ইবাদত-বন্দেগী এবং দুনিয়া বিরাগী স্বভাবের জন্য সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তাঁরা হলেন: আর-রাবী' ইবন খুছায়ম, 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ আত-তামীমী, উয়াইস আল-কারানী, হারাম ইবন হায়্যান, মাসরূক ইবন আল-আজদা', আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ, আবূ মুসলিম আল-খাওলানী ও আল-হাসান আল-বাসরী (রহ)। এই তালিকায় আল-আসওয়াদের নামটিও আছে। ইমাম যাহাবী লিখেছেন, তিনি 'ইবাদতের ক্ষেত্রে খুব উঁচু পর্যায়ের ছিলেন। মনীষীগণ উপরোক্ত আট 'আবিদের মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে বলেছেন: "মহত্ত্ব, জ্ঞান, বিশ্বস্ততায় ও বয়সে আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ ছিলেন মাসরূক ইবন আল-আজদা'র সমকক্ষ। তাঁদের দু'জনের 'ইবাদতের দ্বারা দৃষ্টান্ত দেয়া হয়।"
নামায
তাঁর জীবনের প্রধান কাজ ছিল নামায আদায় করা। প্রতিদিন সাত শো রাক'আত নফল নামায আদায় করতেন। সব সময় প্রথম ওয়াকতেই নামায আদায় করতেন। এ ব্যাপারে এত গুরুত্ব দিতেন যে, তিনি যে কাজে বা যে কোন অবস্থায় থাকতেন না কেন নামাযের সময় হওয়ার সাথে সাথে সবকিছু ছেড়ে নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। তাঁর সফর সঙ্গীরা বলেছেন, সফর অবস্থায় যত বন্ধুর পথই অতিক্রম করুন না কেন নামাযের সময় হওয়ার সাথে সাথে বাহনের পিঠ থেকে নেমে নামায আদায় করে নিতেন। তারপর আবার সামনে এগোতেন।
রোযা
রোযার প্রতিও তাঁর প্রবল আগ্রহ ও মনোযোগ ছিল। প্রায় সব সময় রোযা রাখতেন। প্রচণ্ড গরমের দিনেও রোযা ছাড়তেন না, যখন লাল উটের মত শক্তিশালী এবং তীব্র গরম সহ্য করা প্রাণীও গরমের তীব্রতায় বেহাল অবস্থা হয়ে যেত। সফরেও রোযার ধারাবাহিকতায় কোন রকম ছেদ পড়তো না। অনেক সময় এমন হতো যে, সফরের কষ্ট এবং পিপাসার তীব্রতায় তাঁর চেহারা বিবর্ণ এবং জিহ্বা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত, তবুও তিনি রোযা ছাড়তেন না। এত কঠোর 'ইবাদতের কারণে একটি চোখ নষ্ট হতে চলে, দেহ শুকিয়ে হালকা-পাতলা হয়ে যায়। এ অবস্থায় তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু 'আলকামা ইবন মারছাদ তাঁকে দেখতে আসেন। পিছন থেকে তাঁর দেহ মৃদু স্পর্শ করে বলেন: "ওহে আবু 'আবদির রহমান! এই দেহকে এত কষ্ট দিচ্ছেন কেন?" তিনি জবাব দিলেন: 'ওহে ইসলামের ভাই, আমি এই দেহকে শান্তি দিতে চাই। আবূ শাবল! ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা।'
হজ্জ
তাঁর হজ্জ আদায়ের সংখ্যা দেখে বুঝা যায় তাঁর মধ্যে হজ্জ করার আগ্রহ কী পরিমাণ ছিল। জীবনের এমন কোন বছর হয়তো ছিল না যে বছর হজ্জ করেননি। তাঁর হজ্জ ও 'উমরার সম্মিলিত সংখ্যা সত্তর থেকে আশি (৭০-৮০) হবে। মায়মূন ইবন হামযা বলেন: আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ জীবনে আশিটি হজ্জ ও 'উমরা করেন। তবে দু'টি এক সাথে নয়, পৃথকভাবে। তাঁর পুত্র 'আবদুর রহমানও পিতার মত পৃথকভাবে আশিটি হজ্জ ও 'উমরা করেন। কখনো কখনো আগ্রহের আতিশয্যে কূফা থেকেই ইহরাম বেঁধে- "লাব্বাইকা গাফ্ফারায যুনূবি, লাব্বাইকা লা- শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা লাব্বাইক, লা- শারীকা লাকা লাব্বাইক।" ধ্বনি দিতে দিতে যাত্রা করে মক্কায় পৌঁছতেন। তবে সব সময় এমন করতেন না, বরং বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে তাঁর ইহরাম বাঁধার প্রমাণ পাওয়া যায়। সাধারণতঃ রাতে মক্কায় প্রবেশ করতেন। বায়তুল্লাহর তাওয়াফের সাথে ছিল গভীর আবেগের সম্পর্ক। এ ব্যাপারে তিনি ভীষণ কঠোরও ছিলেন। কেউ যদি হজ্জ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করতো তাহলে সে মারা গেলে তার জানাযার নামায পড়তেন না।
কুরআন তিলাওয়াত
কুরআন ছিল তাঁর আবাসে-প্রবাসে দিন-রাতের একান্ত সঙ্গী। কুরআন তিলাওয়াত ছিল তাঁর প্রতিদিনের অভ্যাস। রমযান মাসে তিলাওয়াতের আগ্রহ আরো বেড়ে যেত। মাগরিব ও 'ঈশার মাঝের সময়টুক শুয়ে থাকতেন। তারপর উঠে নামায আদায় করে সারা রাত তিলাওয়াত করতেন। এক মাসে দু'রাতে একবার কুরআন খতম করতেন। আর অন্য মাসে প্রতি ছয় রাতে একবার।
মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও হৃদ্যতার সম্পর্ক
আজকাল আমাদের পরস্পরের মধ্যে মতের সামান্য ভিন্নতার কারণে সব রকম সামাজিক কর্মকাণ্ডেও মত পার্থক্যের সৃষ্টি হয়ে যায়। তাই আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদের মত মহান ব্যক্তিদের আদর্শ আমাদের জন্য অনুসরণযোগ্য। মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁরা পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট রাখতেন। আল-আসওয়াদ হযরত 'উমারের (রা) সাহচর্যে বেশিদিন থাকার কারণে তাঁর অনুসারী ছিলেন। অন্যদিকে 'আলকামা ছিলেন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) শাগরিদ ও অনুসারী। কিন্তু তাঁরা দু'জন যখন মিলিত হতেন তখন তাদের মধ্যে মোটেও মতপার্থক্য দেখা যেত না।
ওফাত
হিজরী ৭৫ মতান্তরে ৭৪ সনে তিনি কৃষ্ণায় ইনতিকাল করেন। অন্তিম রোগশয্যায় কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাসে কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। যখন বিছানায় একা পাশ-ফেরাতে পারতেন না তখন ভাগ্নে ইবরাহীম নাখা'ঈর সাহায্য নিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকেন। আত্মীয়-বন্ধুরা বললেন: আবূ 'আবদির রহমান! এমন অস্থির হচ্ছেন কেন? বললেন: কেন হবো না? আল্লাহ যদি আমাকে ক্ষমাও করে দেন, তাহলেও আমি যে পাপ করেছি তার জন্য তো আমাকে লজ্জা পেতে হবে। একেবারে শেষ মুহূর্তে বলেন, আমাকে কালেমায়ে তাইয়িবার তালকীন দাও, যাতে আমার মুখ থেকে বের হওয়া শেষ কথাটি হয়- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ - "আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই।”
জীবনের শেষ দিকে তাঁর দাড়ি ও মাথার চুল সাদা হয়ে যায়। খিজাব লাগাতেন। চূড়া ওয়ালা টুপি পরতেন, কালো রংয়ের পাগড়ী পরতেন, যার প্রান্ত পিছনের দিকে ছাড়া থাকতো।
টিকাঃ
১. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭৪
২. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২/২৫১
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪২
৪. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১২২
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৪২; তাহযীব আল-কামাল-২/২৫১
৬. প্রাগুক্ত
৭. 'আসরুত তাবি'ঈন-৭৩১-৭৩৩
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৩
৯. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৫০-৫১
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৩
১১. আত-তাবাকাত-৬/৪৭; 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭৫
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-কামাল-২/২৫২
১৪. আত-তাবাকাত-৬/৪৭-৪৮
১৫. প্রাগুক্ত
১৬. প্রাগুক্ত; 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭৬
১৭. তাহযীব আল-কামাল-২/২৫২
১৮. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭৬
১৯. আত-তাবাকাত-৬/৫০
২০. প্রাগুক্ত-৬/৫৯
📄 আবূ সালামা ইবন ‘আবদির রহমান (রা)
হযরত 'আবদুল্লাহর (রহ) ডাকনাম আবূ সালামা এবং এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাই অনেকে আবূ সালামা তাঁর আসল নাম বলে মনে করেছেন। তাঁর পিতা মক্কার কুরায়শ গোত্রের বানু যুহরা শাখার প্রখ্যাত সাহাবী হযরত 'আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা) এবং মাতা তুমাদির বিন্ত আল আসবাগ। তুমাদির ছিলেন দিমাশকের সন্নিকটে দাওমাতুল জান্দালে বসবাসরত বানু কাল্ব গোত্রের কুদা'আ শাখার সন্তান। বর্ণিত হয়েছে, তিনি নবীর (সা) জীবনকাল লাভ করেন। তিনি হলেন কাল্ব গোত্রের প্রথম মহিলা যাঁর বিয়ে হয় মক্কার কুরায়শ গোত্রের কোন পুরুষের সাথে।
জ্ঞান ও মনীষা
হযরত 'আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা) ছিলেন 'আশারা মুবাশারার (জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন) অন্যতম সদস্য। এ দ্বারা অনুমান করা যায় যে, তিনি কত উঁচু মাপের ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। আবূ সালামা এমন মহান পিতার 'ইল্ম ও 'আমল (জ্ঞান ও কর্ম)-এর পরিবেশে অত্যন্ত স্নেহ-আদরে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন। পিতার জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলেন এবং অচিরেই সমকালীনদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিতে পরিণত হন। অনেক 'আলিম তাঁকে মদীনার সাত ফকীর মধ্যে গণ্য করেছেন। তবে এটা সর্বজন গৃহীত মত নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁর নামটি উচ্চারিত হওয়া তাঁর যোগ্যতার একটি বড় প্রমাণ। জ্ঞানের জগতে তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা এবং তাঁর ইমাম হওয়ার ব্যাপারে 'আলিমদের ঐকমত্য রয়েছে। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, আবূ সালামার ইমাম হওয়া এবং তাঁর সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত।
হাদীছ
তিনি পিতা হযরত 'আবদুর রহমান ইবন আওফের (রা) নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। তাছাড়া উঁচু স্তরের আরো অনেক সাহাবীর (রা) নিকট থেকেও তিনি তাঁর জ্ঞানের সমৃদ্ধি ঘটান। যেমন: হযরত 'উছমান, তালহা, 'উবাদা ইবন আস-সামিত, আবু কাতাদা, আবুদ দারদা', উসামা ইবন যায়দ, হাসান ইবন ছাবিত, রাফি' ইবন খাদীজ, ছাওবান, নাফি' ইবন আল-হারিছ, 'আবদুল্লাহ ইবন সালাম, আবূ হুরায়রা, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, আবু সা'ঈদ আল-খুদরী, আনাস ইবন মালিক, জাবির, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা সিদ্দীকা, উম্মু সালামা (রা) ও আরো অনেকে। উঁচুস্তরের বহু তাবি'ঈর নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। তাঁদের তালিকা অনেক দীর্ঘ।
উপরে উল্লেখিত মহান ব্যক্তিবর্গের অনুগ্রহ ও অবদান তাঁকে হাদীছের ইমামের পদে অধিষ্ঠিত করে। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন তাবি'ঈ ইমামদের অন্যতম, অসামান্য জ্ঞানের অধিকারী, বিশ্বস্ত 'আলিম ব্যক্তি।" ইবন সা'দ বলেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, সুদৃঢ়, ফকীহ ও বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী।” তিনি আবু সালামাকে মদীনার 'আলিমদের দ্বিতীয় স্তরে উল্লেখ করেছেন।
আবূ সালামার (রহ) স্মৃতির ভাণ্ডারে বহু হাদীছ থাকার কথা শ্রেষ্ঠ 'আলিমগণ স্বীকার করেছেন। ইমাম যুহরী (রহ) বলেন, ইবরাহীম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন কারিজ আমাকে বলতেন যে, তোমাদের মধ্যে দু'ব্যক্তির চেয়ে হাদীছের অন্য কোন বড় 'আলিম আমি দেখিনি। একজন 'উরওয়া ইবন যুবায়র এবং অন্যজন আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান। ইমাম যুহরী আরো বলেন: "আমি চার ব্যক্তিকে জ্ঞানের সাগর রূপে পেয়েছি। তাঁরা হলেন: 'উরওয়া ইবন যুবায়র, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, আবূ সালামা ও 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ।"
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর সুযোগ্য ছাত্রদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম উপস্থাপন করা হলো: ইমাম শা'বী, 'আবদুর রহমান আল-আ'রাজ, 'আররাক ইবন মালিক, 'আমর ইবন দীনার, আবূ হাযিম, আবূ সালামা ইবন দীনার, যুহরী, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, ইয়াহইয়া ইবন আবী কাছীর, মুহাম্মাদ ইবন 'আমর, সালিম আবুন্ নাদর, আবুয যানাদ, সা'দ ইবন ইবরাহীম আল-কাজী (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে আবূ সালামার স্থান এত উঁচুতে ছিল যে, অনেকে তাঁকে মদীনার সাত ফকীহর অন্যতম বলেছেন। ইবন সা'দ তাঁকে ফকীহ বলেছেন। এই উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে তিনি ফিক্হ্-এর জ্ঞান অর্জন করেন। সুযোগ্য শিক্ষকের যোগ্য ছাত্র হিসেবে গভীর অনুধ্যান ও সূক্ষ্ম অনুধাবন ক্ষমতা অর্জন করেন। বিভিন্ন মাসয়ালায় মহান শিক্ষকের সাথে যুক্তি-তর্কে অবতীর্ণ হতেন। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষককে নিজের মতে আনতে সক্ষম হন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: "আবূ সালামা ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে ফিক্হ্-এর গভীর জ্ঞান অর্জন করেন, তাঁর সাথে যুক্তি-তর্কে অবতীর্ণ হতেন এবং তাঁকে তাঁর মত থেকে সরিয়ে নিজের মতে নিয়ে আসতেন।"
ইমাম যুহরী মনে করেন, ইবন 'আব্বাসের (রা) সাথে এই মতপার্থক্যের কারণে তিনি তাঁর অগাধ জ্ঞানের অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত থেকে গেছেন।
বিচারকের পদে
হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালে তৎকালীন মদীনার ওয়ালী সা'ঈদ ইবন আল-'আস তাঁকে মাদীনাতুর রাসূলের কাজীর পদে নিয়োগ দেন। কিন্তু পরবর্তীতে ওলট-পালটের কারণে এ পদে থাকতে পারেননি। সা'ঈদ ইবন আল-'আসের অপসারণ এবং তদস্থলে মারওয়ানের যোগদানের পর আবূ সালামাকে কাজীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।
ওফাত
খলীফা ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিকের খিলাফতকালে হিজরী ৯৪ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে ১০৪ হিজরীতে ৭২ বছর বয়সে তাঁর ইনতিকাল হয় বলে ভিন্ন একটি বর্ণনায় এসেছে। হযরত আবূ সালামা (রহ) ছিলেন একজন সুদর্শন চেহারার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের মানুষ। 'আবদুল্লাহ ইবন আবী ইয়া'কূব আদ-দাববী বলেন : আবূ সালামা ছিলেন দীপ্তিমান চেহারার মানুষ। তাঁর চেহারার সেই দীপ্তি ছিল রোমান সম্রাটদের স্বর্ণমুদ্রার দীপ্তির মত। শেষ জীবনে মাথার চুল ও দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং তাতে তিনি মেহদীর খিযাব লাগতেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২১/২৬৯; তাবি'ঈন-৫৩৪
২. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/১১৫; তাহযীব আল-কামাল-২১/২৬৯
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৩
৫. আত-তাবাকাত-৫/১১৬; তাহযীব আল-কামাল-২১২৭১
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/১১৬
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৩
৮. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪১
৯. আত-তাবাকাত-৫/১১৬
১০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৩
১১. তাহযীব আল-কামাল-২১/২৭২
১২. আত-তাবাকাত-৫/১১৫
১৩. তাহযীব আল-কামাল-২১/২৭২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৩
📄 কাতাদা ইবন দি‘আমা আস-সাদূসী (রহ)
আবুল খাত্তাব কাতাদার পিতার নাম দি'আমা। তিনি হিজরী ৬১ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ঊর্ধ্বতন ৮ম পুরুষ সাদৃস-এর নাম অনুসারে তিনি সাদৃসী নামে পরিচিত। তিনি শ্রেষ্ঠ 'আলিম তাবি'ঈদের একজন। জ্ঞানের সাথে কাতাদার স্বভাবগত একটা সম্পর্ক ছিল। তাঁর মধ্যে জ্ঞান অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত একই রকম ছিল। মাতারুল ওয়াররাক বর্ণনা করেছেন, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত তিনি একজন জ্ঞান অন্বেষণকারী ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন জন্মান্ধ।
তাঁর স্মৃতিশক্তি
জ্ঞান অন্বেষণের তীব্র আকাঙ্ক্ষার সাথে তিনি প্রখর স্মৃতিশক্তি লাভ করেন। কোন কিছু একবার শুনলে চিরদিনের জন্য তা স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়ে যেত। একবার একটি হাদীছ শোনার পর আর কখনো কোন মুহাদ্দিছের নিকট তা দ্বিতীয়বার শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। একবার যে কথা তার কানে ঢুকেছে তা চিরকালের জন্য অন্তর-ভাণ্ডারে সংরক্ষিত হয়ে গেছে। তাঁর স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে বিস্ময়কর সব ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। যেমন একটি ঘটনা 'ইমরান ইবন 'আবদিল্লাহ বর্ণনা করেছেন। একবার কাতাদা প্রখ্যাত তাবি'ঈ সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়ি্যবের (রহ) নিকট গেলেন এবং কিছুদিন সেখানে অবস্থানও করেন। এ সময় তিনি সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের নিকট প্রাণ খুলে হাদীছ শুনতে চাইতেন এবং প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যেতেন। একদিন সা'ঈদ ইবন আল- মুসায়্যিব (রহ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এ পর্যন্ত তুমি আমার নিকট যত কথা জানতে চেয়েছো তা কি সব তোমার মনে আছে? তিনি হাঁ সূচক জবাব দিলেন। তারপর জিজ্ঞাসিত বিষয়গুলো এভাবে বলতে আরম্ভ করলেন : আমি আপনার নিকট একথা জানতে চেয়েছি, আপনি এ জবাব দিয়েছেন। আমি এই প্রশ্ন করেছি, আপনি এই বলেছেন, আর হাসান আল-বাসরী (রহ) এই জবাব দিয়েছিলেন। এভাবে তিনি সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়ি্যবের নিকট থেকে শোনা সব হাদীছ তাঁকে শুনিয়ে দেন। সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) তাঁর এই প্রখর স্মৃতিশক্তি দেখে ভীষণ অবাক হলেন। তিনি মন্তব্য করলেন, আল্লাহ তোমার মত মানুষ সৃষ্টি করেছেন তা আমার কল্পনায়ও ছিল না।
জ্ঞান ও মনীষা
এমন আগ্রহ, আবেগ, জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও প্রখর স্মৃতিশক্তি তাঁকে কুরআন, তাফসীর, হাদীছ, ফিক্হ, ভাষা, সাহিত্য, আরবদের প্রাচীন ইতিহাস, বংশবিদ্যা ইত্যাদিসহ সেই যুগের সকল ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞানের সাগরে পরিণত করে। আল্লামা নাওবী লিখেছেন, তাঁর মাহাত্ম্য ও জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে সকলে একমত।
কুরআন
তিনি কুরআনের হাফিজ ছিলেন। ভালো মুখস্থ ছিল। বড় বড় সূরাগুলো পাঠের সময় একটি শব্দেও ভুল করতেন না। মা'মার বলেন, একবার কাতাদা সা'ঈদ ইবন 'আরূবাকে না দেখে সূরা আল-বাকারা শোনান এবং একটি হরফেও কোন ভুল করেননি। শোনানোর পর তিনি জিজ্ঞেস করেন, আমি ঠিক মত মুখস্থ রেখেছি? তিনি বললেন, হাঁ। সুফইয়ান ইবন 'উয়ানা বলেন : কাতাদা জাবির ইবন 'আবদিল্লাহর (রা) সহীফা থেকে মুখস্থ করতেন। তিনি তা সুলায়মান আল-ইয়াশকুরীর নিকট থেকে নকল করেন।
তাফসীর
কুরআনের তাফসীরের তিনি একজন বড় 'আলিম ছিলেন। কুরআনের আয়াতের তাফসীর ও তাবীলের ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত। নিজেই বলতেন, কুরআনের এমন কোন আয়াত নেই যে সম্পর্কে আমি কিছু না কিছু শুনিনি। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলতেন, কাতাদা তাফসীরের একজন বড় 'আলিম ছিলেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি কুরআনের সবচেয়ে বড় 'আলিম ছিলেন। ইবন নাসের উদ্দীন তাঁকে মুফাসসিরুল কিতাব বলেছেন।
হাদীছ
কাতাদার জ্ঞান চর্চার মূল বিষয় ছিল হাদীছ। এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান ছিল অতি উঁচুতে। ইবন সা'দ লিখেছেন, হাদীছে তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, আস্থাভাজন ও প্রমাণ সদৃশ্য। আল্লামা যাহাবী তাঁকে হাফিজ ও আল্লামা নামে অভিহিত করেছেন। তাঁকে ইরাকের সবচেয়ে বড় হাফিজে হাদীছ গণ্য করা হতো। সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব বলতেন, কাতাদার চেয়ে বড় ইরাকের কোন হাফিজে হাদীছ আমাদের এখানে আসেননি। সুফইয়ান বলতেন, দুনিয়ায় কাতাদার সমতুল্য কেউ ছিল না। বাকর ইবন 'আবদিল্লাহ আল-মুযানী বলতেন, যে ব্যক্তি সবচেয়ে বড় হাফিজে হাদীছ এবং এমন ব্যক্তিকে দেখতে চায় যিনি হাদীছ যেভাবে শুনেছেন হুবহু সেভাবে বর্ণনা করেন, তাহলে তার কাতাদাকে দেখা উচিত। "আমি এমন কাউকে দেখিনি যে তার চেয়ে হাদীছ ভালো মুখস্থকারী এবং তার চেয়ে ভালো হুবহু বর্ণনাকারী।"
'আবদুর রহমান ইবন মাহদী বলতেন, কাতাদা ছিলেন হুমায়দ-এর মত পঞ্চাশ ব্যক্তি থেকেও বড় হাফিজে হাদীছ। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলতেন, কাতাদা বসরাবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হাফিজ ছিলেন। যা কিছু শুনতেন মুখস্থ করে নিতেন। একবার তাঁর সামনে জাবিরের সহীফা (পুস্তিকা) পাঠ করা হয়। একবার শুনেই তা মুখস্থ হয়ে যায়। ইবন হিব্বান তাঁকে তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় হাফিজে হাদীছ গণ্য করেছেন। সুলায়মান তায়মী ও আইউব সাখতিয়ানীর মত মড় মুহাদ্দিছগণ তাঁর হাদীছের মুখাপেক্ষী ছিলেন এবং তাঁর নিকট জিজ্ঞেস করতেন।
শিক্ষকবৃন্দ
কাতাদার আসল ও প্রধান শায়খ ছিলেন হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ)। বেশির ভাগ তাঁরই ঝর্ণাধারা থেকে জ্ঞান পিপাসা নিবৃত্ত করেন। বারো বছর তাঁর সাহচর্যে কাটান। তিনি বলতেন, আমি বারো বছর যাবত হাসান আল-বাসরীর (রহ) মজলিসে বসেছি এবং তিন বছর তাঁর সাথে ফজরের নামায আদায় করেছি। আমার মত মানুষ তাঁর মত উঁচু মাপের মানুষের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছে। তিনি ছিলেন হাসান আল-বাসরীর (রহ) যোগ্যতম ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম। আবূ হাতিম বলতেন, হাসান আল-বাসরীর (রহ) সবচেয়ে বড় সঙ্গীদের মধ্যে কাতাদা একজন।
হাসান আল-বাসরী (রহ) ছাড়াও সে যুগের একদল শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন। তাঁদের মধ্যে যেমন সাহাবায়ে কিরাম (রা) ছিলেন, তেমনি ছিলেন তাবি'ঈন কিরাম। যেমন: আনাস ইবন মালিক, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, 'ইমরান ইবন হুসায়ন (রা), সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'ইকরিমা, আবু বুরদা ইবন আবী মূসা, শা'বী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাস'উদ, মুতাররিফ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন শিখীর, হাসান আল-বাসরী, 'আতা' ইবন আবী রাবাহ, 'আমর ইবন দীনার, মাসরূক ইবন আওস, মুসলিম ইবন ইয়াসার (রহ) প্রমুখ। জামাল উদ্দীন আল-মিযী শতাধিক শায়খের নাম উল্লেখ করেছেন।
তাঁর এই বিশেষ যোগ্যতা ছিল যে, যে মুহাদ্দিছের নিকটেই তিনি গেছেন, অল্পদিনের মধ্যে তাঁর সকল জ্ঞান আত্মস্থ করে ফেলেছেন। একবার সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের (রহ) নিকট কয়েকদিন অবস্থান করেন এবং এ সময়ে তিনি তাঁকে এত প্রশ্ন করেন যে তিন দিনের মধ্যে তিনি শংকিত হয়ে তাঁকে বলেন, তুমি এখন যাও, আমার সকল জ্ঞান তুমি শূন্য করে ফেলেছো।
তাঁর শিষ্য-শাগরিদ
তাঁর যোগ্যতার কারণে তিনি মানুষের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হন। অসংখ্য জ্ঞান পিপাসু মানুষ তাঁর দারসের মজলিস থেকে পরিতৃপ্ত হয়েছে। তাদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ হবে। এখানে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ছাত্রের নাম তুলে ধরা হলো: আইউব সাখতিয়ানী, সুলায়মান তায়মী, জারীর ইবন হাযিম, শু'বা, মিস'আর, আবূ বিলাল রাসিবী, মাতারুল ওয়াররাক, হাম্মাম ইবন ইয়াহইয়া, 'আমর ইবন হারিছ আল-মিসরী, শায়বান নাহবী, সাল্লাম ইবন আবিল মুতী', সা'ঈদ ইবন আবী 'আরূবা, আবান ইবন ইয়াযীদ আল-'আত্তার, হুসায়ন ইবন যাকওয়ানা, হাম্মাদ ইবন সালামা, আওযা'ঈ, 'আমর ইবন ইবরাহীম 'আবদী, 'ইমরান আল-কাত্তান, সালিহ আল-মুররী, 'আসিম ইবন সুলায়মান আল-আহওয়াল, সুলায়মান আল-আ'মাশ, হুমাইদ আত-তাবীল, সা'ঈদ ইবন আবী 'আহ্মবা (রহ) প্রমুখ।
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। ইবন হিব্বান লিখেছেন, তিনি কুরআন ও ফিক্হ্ বড় 'আলিমদের একজন ছিলেন। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) তাফসীর ও হাদীছে দক্ষতার সাথে ফিক্হ্ও তাঁর পারদর্শিতার কথা বলতেন। বসরার জামা'আতে ইফতার অন্যতম সদস্য ছিলেন।
যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত দানের ক্ষেত্রে সতর্ক
জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে দারুণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কোন বিষয়ে জানা না থাকলে নিজের অজ্ঞতার কথা সাফ বলে দিতেন। নিজের মতের উপর ভিত্তি করে কোন মাসয়ালার জবাব দিতেন না। আবু হিলাল বলেন, একবার আমি কাতাদার নিকট একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি সাফ বলে দিলেন আমি জানিনে। বললাম, নিজের যুক্তির ভিত্তিতে বলে দিন। বললেন: আমি চল্লিশ বছর যাবত নিজের মতের ভিত্তিতে কোন জবাব দিইনি। যখন তিনি একথা বলেন তখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ বছর। তবে আবু আওয়ানা বলেন, কাতাদা বলতেন, আমি তিরিশ বছর যাবত নিজের মত ও সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে কোন ফাতওয়া দিইনি।
কাতাদার মত ব্যাপক মনীষা খুব কম তাবি'ঈর মধ্যে ছিল। তিনি কেবল দীনী 'ইল্মের 'আলিম ছিলেন না, বরং সে যুগে প্রচলিত বিভিন্ন বিষয় যেমন: আরবী ভাষা, সাহিত্য, আরব জাতির ইতিহাস, বংশ বিদ্যা প্রভৃতিরও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আবূ 'উমার বলেন, তিনি একজন বংশ বিদ্যাবিশারদ ছিলেন।
আবূ 'উবায়দা বলেন, বানু উমাইয়্যাদের পক্ষ থেকে প্রতিদিন কোন না কোন ব্যক্তি কাতাদার নিকট ইতিহাস, কবিতা, বংশ বিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে কিছু না কিছু জানার জন্য আসতো। ইবন নাসেরুদ্দীন তাঁর ব্যাপক মনীষার মূল্যায়ন করেছেন এভাবে: "অন্ধ আবুল খাত্তাব আল-কিতাবের মুফাসসির, মুখস্থ শক্তিতে একটি নিদর্শন, বংশ বিদ্যায় ইমাম, আরবী ভাষা, সাহিত্য ও আরবের যুদ্ধ-বিগ্রহের জ্ঞানে নেতৃস্থানীয়।" ইবন সা'দ তাঁকে বসরার তৃতীয় তাবকার (স্তর) মুহাদ্দিহগণের মধ্যে উল্লেখ করেছেন।
হিজরী ১১৭, মতান্তরে ১১৮ সনে মৃত্যুবরণ করেন। আবু হাতিম বলেন, হাসান আল- বাসরীর (রহ) মৃত্যুর সাত বছর পরে তিনি ওয়াসিত নগরে তা'ঊনে (প্লেগ) আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৫৬ অথবা ৫৭ বছর। তবে তাঁর মৃত্যু সন নিয়ে সীরাত বিশেষজ্ঞদের বিস্তর মতভেদ আছে।
টিকাঃ
১. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৫০
২. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৪
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৯
৪. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৭
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৯০-১১০
৬. তাবি'ঈন-৩৮৫
৭. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৮
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৯
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৫৫; শাযারাত আয-যাহাব-১/১৫৩
১০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৯
১১. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৭
১২. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৫৭-৫৮
১৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১০
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৫৫; তাবি'ঈন-৩৮৬
১৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৫৮
১৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৮১; তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৪-২২৬
十七. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৭
十八. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৫২
十九. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৫৫; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৯
二十. আ'লাম আল-মুওয়াকি'ঈন-১/২৭
二十一. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২২৮
二十二. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৯
二十三. শাযারাত আয-যাহাব-১/১৯৩
二十四. তাহযীব আল-কামাল-১৫/২৩২-২৩৩
📄 ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ (রহ)
হযরত ওয়াহাবের (রহ) ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে: "ওয়াহাব ইবন মুনাবিহ একজন হাফিজ, ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। তিনি সান'আর অধিবাসী এবং ইয়ামনবাসীদের একজন 'আলিম।” তিনি অনারব বংশোদ্ভূত। পারস্য সম্রাট কিস্সা আঁ নওশেরওয়ান যখন সায়ফ যী ইয়াযিনের নেতৃত্বে হাবশায় অভিযান চালান তখন ওয়াহাবের পিতা মুনাব্বিহ পারস্যের হারাত থেকে ইয়ামনে আসেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার মত অন্য যারা বাইরে থেকে ইয়ামনে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে ইতিহাসে তারা "আবনা" নামে প্রসিদ্ধ। এ কারণে আল্লামা আয-যিরিকলী তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন: ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ আবনা' বংশোদ্ভূত, সান'আর অধিবাসী। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকালে তাঁর পিতা মুনাব্বিহ ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু সন নিয়ে কিছুটা মত পার্থক্য আছে। তবে প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ৩৪, খ্রীস্টাব্দ ৬৫৪ সনে ওয়াহাব ইয়ামনের সান'আয় জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরী ১১৪, খ্রীস্টাব্দ ৭৩২ সনে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁরা ছিলেন চার ভাই: ওয়াহাব, মা'কিল, হাম্মাম ও গায়লান। ওয়াহাব সবার বড় ও গায়লান সবার ছোট ছিলেন। অপর একটি বর্ণনায় মাসলামা নামে তাঁর আরেক ভাইয়ের নাম জানা যায়।
জ্ঞান ও মনীষা
ইসলামী জ্ঞানে তিনি তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। তবে একেবারে অপরিচিতও ছিলেন না। অন্য অনেক ধর্মের গ্রন্থাবলীর একজন সুবিজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। তাই 'আলিম তাবি'ঈনের মধ্যে তাঁরও একটা বিশেষ স্থান ছিল। আয-যিরিকলী বলেন, তিনি বিভিন্ন ধর্মের প্রাচীন গ্রন্থসমূহ থেকে বহু কাহিনীর বর্ণনাকারী এবং পূর্ববর্তীদের বহু কাহিনীর একজন অভিজ্ঞ পণ্ডিত। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি একজন উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন তাবি'ঈ। তাঁর বিশ্বস্ততা ও দৃঢ়তার ব্যাপারে সকলে একমত। আল-'ইজলী বলেন: "তিনি একজন বিশ্বস্ত, তাবি'ঈ ব্যক্তি, সান'আর কাজীর পদে আসীন ছিলেন।" 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের সময় তিনি কাজী ছিলেন। খলীফা ইবন খায়্যাত তাঁকে ইয়ামনীদের দ্বিতীয় তাবকায় (স্তরে) এবং ইবন সা'দ তৃতীয় তাবকায় স্থান দিয়েছেন। আবূ যুরআ ও আন-নাসাঈ (রহ) তাঁকে 'ছিকা' (বিশ্বস্ত) বলে প্রত্যয়ন করেছেন।
হাদীছ
বহু সাহাবীর নিকট থেকে তিনি হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, আবূ হুরায়রা, জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, আনাস ইবন মালিক, নু'মান ইবন বাশীর (রা) প্রমুখ সাহাবীর সূত্রে তাঁর বর্ণনা পাওয়া যায়। তাবি'ঈদের মধ্যে তাউস ইবন কায়সান, 'আমর ইবন দীনার, 'আমর ইবন শু'আয়ব, তাঁর ভাই হাম্মাম ইবন মুনাব্বিহ (রহ) প্রমুখের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন।
তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন তাঁর দু'পুত্র 'আবদুল্লাহ ও 'আবদুর রহমান, ভাতিজা 'আবদুস সামাদ ও 'আকীল, দৌহিত্র ইদরীস ইবন সিনান এবং অন্যদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, সিমাক ইবন ফাদল, ইসরাঈল আবূ মূসা (রহ) ও আরো অনেকে।
বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে তাঁর পাণ্ডিত্য
পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে যে, তিনি অন্য ধর্মের গ্রন্থসমূহের একজন খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর সমকক্ষ পারদর্শী সেকালে আর কেউ ছিলেন না। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি প্রাচীন গ্রন্থসমূহের জ্ঞানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর যুগে তাঁকে কা'ব আল-আহবারের সমকক্ষ বলে মানা হতো।"
উল্লেখ্য যে, এই কা'ব আল-আহবার ছিলেন একজন মহাজ্ঞানী ব্যক্তি। আহলি কিতাবের শ্রেষ্ঠ 'আলিমগণের একজন। হযরত আবূ বাকরের (রা) খিলাফতকালে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে ইয়ামন থেকে মদীনায় আসেন।
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ সম্পর্কে একথাও প্রচলিত আছে যে, তিনি ইহুদী বংশোদ্ভূত। প্রাচীন আরবী গ্রন্থসমূহে ছড়িয়ে থাকা অধিকাংশ ইহূদী উপাখ্যানসমূহের উৎস তিনি। প্রাচীন গ্রীক, সুরইয়ানী, ও হিমইয়ারী ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন এবং দুর্বোধ্য প্রাচীন লেখা যা কেউ পাঠ করতে পারতো না, তিনি তা সহজে খুব সুন্দরভাবে পাঠ করতেন। ইয়ামনী আহলি কিতাব, যাদের সংখ্যা সে সময় দক্ষিণ আরবে যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল, তাদের সাথে ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ছিল এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ইহুদী ও খ্রীস্টানদের পবিত্র গ্রন্থসমূহের বিষয়বস্তু আয়ত্ত করেন।
বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি বিরানব্বই (৯২) খানা আসমানী গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। তার মধ্যে এমন কয়েকখানি ছিল যে সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান খুবই অপ্রতুল। দাউদ ইবন কায়স বলেন : তিনি বলতেন, আমি বিরানব্বই খানা গ্রন্থ পাঠ করেছি যার সবগুলোই আসমানী। বাহাত্তর (৭২) খানা গির্জায় এবং মানুষের হাতে আছে। আর বিশ (২০) খানার জ্ঞান খুব কম সংখ্যক লোকেরই আছে। কোন কোন বর্ণনায় একথা এসেছে যে, তিনি এমন তিরিশখানা গ্রন্থ পাঠ করেন যা তিরিশ জন নবীর উপর নাযিল হয়েছিল।
যাই হোক না কেন, একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, তিনি অতীতের আসমানী গ্রন্থসমূহের একজন বড় 'আলিম ছিলেন এবং এ বিষয়ের বিখ্যাত দু'জন বিশেষজ্ঞ কা'ব আল-আহবার ও 'আবদুল্লাহ ইবন সালামের (রা) সামষ্টিক জ্ঞান তাঁর একক সত্তার মধ্যে পুঞ্জিভূত করেন। নিজের জ্ঞানের জন্য তাঁর দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ও ছিল। যেমন তিনি বলেন: "লোকেরা বলে থাকে 'আবদুল্লাহ ইবন সালাম তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় জ্ঞানী, কা'ব তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। তুমি কি দেখেছো কে এই দু'জনের জ্ঞান জমা করেছে? মূলত সেই ব্যক্তি যে তিনি নিজে সে কথা বলতে চেয়েছেন।"
কেউ কেউ "কাদরিয়া" মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন বলে তাঁর প্রতি দোষারোপ করেছেন এবং পরবর্তীতে তা থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন, সে কথাও বলেছেন। তাঁরা দাবী করেন, এ বিষয়ে তিনি একখানা পুস্তক রচনা করেন; অতঃপর অনুতপ্ত হন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন: "আমি "কাদর" বা ইচ্ছার স্বাধীনতার কথা বলতাম। অবশেষে নবীদের সত্তরের অধিক গ্রন্থ পাঠ করলাম। তার সবগুলোতে আছে, যে কেউ ইচ্ছার কোন কিছু নিজের দিকে আরোপ করবে, কাফির হয়ে যাবে। অতঃপর আমি আমার কথা ত্যাগ করি।" বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয় এবং কঠোরতার মুখোমুখি হতে হয়।
ইতিহাস
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ (রহ) একজন বড় ঐতিহাসিক এবং ইতিহাস গ্রন্থ প্রণেতা। আরবী ভাষায় সংকলক ও গ্রন্থ রচনার সূচনা হয় মূলত উমাইয়্যা যুগে। এ ক্ষেত্রে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ড. 'উমার ফাররূখ বলেন: "উমাইয়্যা যুগ যে লিপিবদ্ধকরণ তথা গ্রন্থ রচনার সাথে পরিচিত হয়, ইতিহাস বিষয়ে তা ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহর প্রতি আরোপ করা হয়। আর ফি ও হাদীছে তা আরোপ করা হয় যথাক্রমে মুহাম্মাদ ইবন 'আবদির রহমান আল-'আমিরী (মৃ. ১২০ হি.) ও মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম আয-যুহরীর (মৃ. ১২৪ হি.) প্রতি। তবে সে যুগের লেখা কোন কিছু আমাদের নিকট পৌঁছেনি।" ঐতিহাসিক জুরজী যায়দান বলেন: "অতঃপর তাঁরা ইতিহাস, বিশেষতঃ মাগাযী (যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস) রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। এ বিষয়ে সর্বপ্রাচীন যে গ্রন্থটির কথা আমাদের নিকট পৌঁছেছে তা হলো ইতিহাস ও কাহিনী বিশেষজ্ঞ ওয়াহাব ইবন মুনাবিহ রচিত গ্রন্থটি।... তিনি ইয়ামনের হিময়ার রাজ বংশের মুকুটধারী রাজন্যবর্গ, তাঁদের ইতিহাস, কবিতা ও উপাখ্যান বিষয়ে একখানা গ্রন্থ রচনা করেন। ইবন খাল্লিকান বলেন, তিনি সে গ্রন্থটি দেখেছেন এবং সেটির প্রশংসাও করেছেন।"
বিখ্যাত "কাশফুজ জুনূন” গ্রন্থের রচয়িতা হাজী খলীফা বলেন, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ মাগাযী অর্থাৎ রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধ-বিগ্রহের তথ্য সংগ্রহ করেন। তবে সীরাতের প্রাচীন গ্রন্থসমূহে সীরাতুন নাবীর বর্ণনাকারীদের সাথে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি।
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ বর্ণিত হযরত রাসূলে কারীমের (সা) খুব অল্প তথ্যই আমাদের নিকট পৌঁছেছে। Schott Reinhardt কৃত সংকলনে Papyrus-এর উপর লেখা ছোট্ট একটি টুকরো C. H-Becker লাভ করেন। তাতে বায়'আতে 'আকাবার উল্লেখ আছে। লেখাটি জার্মানীর Heidelberg-এ সংরক্ষিত আছে। ইবন ইসহাক ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ থেকে ফায়ামিউন ও সালিহ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে নাজরানে খৃস্ট ধর্মের প্রচার ও প্রসারের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাটির উপসংহারে ইবন ইসহাক বলেছেন: 'ওয়াহাব ইবন মুনাবিরহের বক্তব্য।'
বিভিন্ন মূল সূত্রসমূহে ওয়াহাবকে "ছিকা” বা বিশ্বস্ত বলা হয়েছে। কিন্তু বর্ণনাকারীগণ অতি অল্প ক্ষেত্রেই তাঁর বর্ণনা গ্রহণের জন্য আগ্রহী হয়েছেন। পক্ষান্তরে মদীনার অন্য বর্ণনাকারীদের নিকট থেকে তাঁরা গ্রহণ করেছেন। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম একটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন, যা ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ তাঁর ভাই হাম্মাম থেকে এবং তিনি আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, এই হাম্মাম একজন দীর্ঘজীবি মানুষ ছিলেন এবং প্রায় ১৩০ বছর জীবন লাভ করেন।
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ (রহ) একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। বিভিন্ন ধর্মের উল্লেখিত গ্রন্থাবলী অধ্যয়নের কারণে তিনি আরো বিচক্ষণ ও 'ইবাদতকারী হয়ে যান। তিনি সারা রাত নামাযে দাঁড়িয়ে কাটাতেন। একাধারে বিশ বছর 'ঈশার নামাযের ওজুতে ফজরের নামায আদায় করেন। এত কোমল প্রকৃতির ছিলেন যে, জীবনে কাউকে কখনো কটু কথা বলেননি বা গালি দেননি।
আধ্যাত্মিকতায় তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। তাঁর থেকে সংঘটিত কিছু অলৌকিক কর্মকাণ্ডের কথা ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন আবু কাছীর ইবন 'উবায়েদ একবার তাঁর সাথে 'সা'দা' নামক স্থানে একজনের বাড়িতে যান এবং রাত্রি যাপন করেন। রাতে বাড়ির সকল বাতি নিভিয়ে দেওয়ার পর সকলে শয্যা গ্রহণ করে। গভীর রাতে গৃহকর্তার মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে ওয়াহাবের ঘরে আলো। সে তার পিতাকে বিষয়টি অবহিত করে। পিতা জানালার ছিদ্রপথে উঁকি দিয়ে দেখে তাঁর পা দু'টি এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে যেন সূর্যের আলোর শুভ্রতা ছড়িয়ে পড়ছে। সকালে গৃহকর্তা ওয়াহাবকে বললেন : গত রাতে আমি আপনাকে এমন এক অবস্থায় দেখেছি যা আর কাউকে কখনো সে অবস্থায় দেখিনি। তিনি জানতে চাইলেন, কী অবস্থায় দেখেছেন? তিনি বললেন: আমি আপনাকে সূর্যের আলো থেকেও উজ্জ্বল আলোর মধ্যে দেখেছি। তাঁর কথা শুনে ওয়াহাব বললেন: যা দেখেছেন গোপন রাখুন।
'আবদুস সামাদ ইবন মা'কিল বলেন, একবার ওয়াহাবকে বলা হলো, ওহে আবূ 'আবদিল্লাহ: আপনি স্বপ্ন দেখে আমাদের নিকট বর্ণনা করেন এবং তা সবই সত্যে পরিণত হয়। তিনি বললেন: এখন আর সে অবস্থায় নেই। যেদিন আমি কাজীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছি সেদিন থেকে সেই অবস্থাটি চলে গেছে।
যাই হোক না কেন, একথা সত্য যে, কা'ব আল-আহবারের মত ওয়াহাব ইবন মুনাবিরহের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে বহু ভিত্তিহীন ইহূদী উপাখ্যান ছড়িয়ে পড়েছে। সীরাতের গ্রন্থাবলীতে তাঁর বহু জ্ঞানগর্ভ কথা পাওয়া যায়। নিম্নে তার কিছু তুলে ধরা হলো: একবার তিনি 'আতা' আল-খুরাসানীকে বলেন: "আমাদের পূর্ববর্তীকালের জ্ঞানী ব্যক্তিগণ নিজেদের জ্ঞান নিয়ে অন্যদের দুনিয়া থেকে মুখাপেক্ষীহীন থাকতেন। তাঁরা অন্যদের দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টি দিতেন না। আর দুনিয়াদার লোকেরা জ্ঞানীদের জ্ঞানচর্চার পিছনে তাদের দুনিয়া ব্যয় করতো। আমাদের আজকের দিনের জ্ঞানীরা যখন দুনিয়াদার লোকদের দুনিয়া পাওয়ার লোভে তাদের জ্ঞান ব্যয় করেন তখন দুনিয়াদার লোকেরা জ্ঞানীদের এই নিকৃষ্ট অবস্থান প্রত্যক্ষ করে তাদের দুনিয়া জ্ঞানীদের জ্ঞানচর্চার পিছনে ব্যয় করা ছেড়ে দিয়েছে।" তিনি একবার মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন। ভাষণে তিনি বলেন: "আমার এই তিনটি কথা মনে রাখবে: অনুসৃত প্রবৃত্তি, খারাপ বন্ধু ও আত্ম-তুষ্টি- এই তিনটি জিনিস থেকে তোমরা দূরে থাকবে।" আবদুস সামাদ বলেন, আমি ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহকে বলতে শুনেছি: "তোমার কোন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ পরিহার কর। কারণ দুই ব্যক্তিকে কখনো পরাভূত করা যায় না। এক ব্যক্তি যে তোমার চেয়ে বেশি জানে। যে তোমার চেয়ে বেশি জানে তার সাথে তুমি কিভাবে ঝগড়া ও শত্রুতা করবে? আরেক ব্যক্তি যার থেকে তুমি বেশি জান। সুতরাং তুমি যার থেকে বেশি জান, অথচ সে তোমাকে মানে না, তার সাথে তুমি ঝগড়া ও শত্রুতা করবে কিভাবে? সুতরাং তা থেকে বিরত থাক।" আবূ সাল্লাম ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: "জ্ঞান মু'মিন ব্যক্তির বন্ধু, বিচক্ষণতা তার মন্ত্রী, বুদ্ধিমত্তা তার নির্দেশিকা, কর্ম তার তত্ত্বাবধায়ক, ধৈর্য তার বাহিনীর পরিচালক, দয়া-সহানুভূতি তার পিতা এবং কোমল আচরণ তার ভাই।" তিনি সব সময় বলতেন: "মু'মনি ব্যক্তি দেখে শেখার জন্য এবং চুপ থাকে, কথা বলে বুঝার জন্য এবং নির্জনতা অবলম্বন করে সাফল্য লাভের জন্য।" তিনি আরো বলেন: "ঈমান হলো একেবারে খোলামেলা পবিত্র বিষয়, তার পোশাক হলো আল্লাহভীতি, তার সাজ-শোভা হলো লজ্জা-শরম এবং তার সম্পদ হলো বিজ্ঞতা।" একবার তিনি তাঁর এক সঙ্গীকে বললেন: "আমি কি তোমাকে এমন একটি জ্ঞান শিক্ষা দেব যে ব্যাপারে ফকীহগণ অক্ষম হননি? সে বললো: হা, দিন। বললেন: যদি কেউ তোমাকে এমন কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করে যে সম্পর্কে তোমার জ্ঞানে আছে, তাহলে তুমি তোমার জ্ঞান অনুযায়ী তাকে অবহিত করবে, অন্যথায় বলবে: আমি জানিনে।" 'আমর ইবন 'আমির আল-বাজালী বলেন, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ বলতেন: "তিনটি জিনিস যার মধ্যে থাকবে সে সৎ গুণের অধিকারী হবে: অন্তরের উদারতা, কষ্টের সময় ধৈর্যধারণ এবং মিষ্টি কথা বলা।" 'আব্বাস ইবন ইয়াযীদ বলেন, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ বলতেন: "যথা সম্ভব বন্ধুর সংখ্যা বৃদ্ধি করবে। তুমি যদি তাদের মুখাপেক্ষী না হও তাতে তারা তোমার কোন ক্ষতি করবে না, আর মুখাপেক্ষী হলে তারা তোমার উপকার করবে।" তিনি বলতেন: "যখন কোন ব্যক্তিকে তোমার মধ্যে নেই এমন গুণের কথা বলে তোমার প্রশংসা করতে শুনবে তখন তোমার মধ্যে নেই এমন দোষের কথা বলে তোমাকে নিন্দা না করার ব্যাপারেও তাকে আস্থাভাজন মনে করবে না।" 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক বলেন, একবার এক ব্যক্তি এসে তাঁকে বললো, মানুষ এখন এসব কাজ করছে, তাতে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, তাদের সাথে আর মেলামেশা করবো না। তিনি বললেন না, এমন করবে না। মানুষ তোমার কাছে আসবে, তুমিও তাদের কাছে যাবে, তাদের তোমার কাছে প্রয়োজন আছে, তোমারও তাদের কাছে প্রয়োজন আছে। তবে তুমি তাদের মধ্যে থাকবে বধির শ্রোতা, অন্ধ চক্ষুষ্মান এবং নিরব বক্তা হিসেবে।
জা'ফার ইবন বুরকান বর্ণনা করেন, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ বলতেন: সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য, যার নিজের দোষ তার ভাইয়ের দোষ চর্চা থেকে বিরত রেখেছে। সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য যে অক্ষম হওয়ার পূর্বে আল্লাহর কাছে নত হয়েছে। সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য যে কোন রকম পাপ-পঙ্কিলতা ছাড়া অর্জিত অর্থ-সম্পদ থেকে সাদাকা করে। সুসংবাদ ক্ষতিগ্রস্ত ও অক্ষমদের জন্য। সুসংবাদ তার জন্য যে জ্ঞানী ও বিচক্ষণ লোকদের সাথে বসে। সুসংবাদ তার জন্য সুন্নাহ্ যাকে ধারণ করেছে, সুতরাং সে তার সীমা অতিক্রম করে না।
আল-হায়ছাম ইবন 'আদী বলেন, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ বলতেন: "নির্বোধ ব্যক্তি যখন কথা বলে তখন তার নির্বুদ্ধিতা তাকে লজ্জিত করে, যখন চুপ থাকে তখন তার এই অক্ষমতাই তাকে লজ্জিত করে। কাজ করলে বিকৃত করে, পরিত্যাগ করলে বিনষ্ট করে। তার নিজের জ্ঞান যেমন তাকে সাহায্য করে না, তেমনি অন্যের জ্ঞানও তার কোন উপকারে আসে না। মা মনে করে তার সন্তানের মৃত্যু হয়েছে, স্ত্রী মনে করে স্বামীহারা হয়েছে। তার প্রতিবেশী তার থেকে একাকীত্ব কামনা করে, তার বন্ধুরা তার থেকে নির্জনতা অবলম্বন করে।" এরপর তিনি কবি মিসকীন আদ-দারিমীর নিম্নের শ্লোকগুলো আবৃত্তি করতেন।
"বোকা লোকের সাহচর্য থেকে দূরে থাক। বোকা লোক জীর্ণ পোশাকের মত। তুমি তার কোন একদিকে তালি লাগালে, বাতাসের দোলায় তার দুর্বল অংশ আবার ফেটে যাবে। অথবা সে কাঁচে ভাঙ্গনের মত। তুমি কি কাঁচের ভাঙ্গন জোড়া লাগতে দেখেছো? তুমি তার সাথে কোন সমাবেশে বসলে, সে তার বোকামী দ্বারা সমাবেশ নষ্ট করে দেবে। সতর্ক করার জন্য যদি তুমি তাকে নিষেধ কর তাহলে তার মূর্খতা বৃদ্ধি পাবে এবং নির্বুদ্ধিতার চূড়ান্তে পৌঁছাবে।”
তিনি একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির চরিত্রের দশটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। যেমন: বিচক্ষণতা, জ্ঞান, সঠিক পথপ্রাপ্ত হওয়া, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী হওয়া, সকল পঙ্কিলতা থেকে নিজকে সংরক্ষণ করা, লজ্জা-শরম, গাম্ভীর্য, সর্বদা কল্যাণের উপর থাকা, মন্দ ও অকল্যাণ প্রত্যাখ্যান করা এবং যারা অকল্যাণের উপর থাকে তাদেরকে ঘৃণা করা, উপদেশ দানকারীর উপদেশ গ্রহণ ও তার আনুগত্য করা। তারপর তিনি প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্য থেকে বের হওয়া দশটি করে শাখা বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন।
তিনি ছিলেন একজন সুরসিক ও উদার মনের মানুষ। সহজে রাগতেন না। ইবন 'আয়্যাশ বলেন, একবার আমি ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহর সাথে বসে আছি। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে ওয়াহাবকে বললো- আমি অমুক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনলাম, সে আপনাকে গালি দিচ্ছে। তার কথা শুনে ওয়াহাব রাগের সাথে বললেন: "শয়তান কি তোমাকে ছাড়া আর কোন রাসূল (দূত) পায়নি?' আমি সেখানে বসে থাকতেই সেই গালি দানকারী লোকটি আসে এবং সালাম দেয়। ওয়াহাব সালামের জবাব দিয়ে তার সাথে হাত মিলান এবং হাসিমুখে তার হাত ধরে নিজের পাশে বসান। বর্ণিত হয়েছে, চল্লিশ বছরের মধ্যে তিনি প্রাণ আছে এমন কোন কিছুকে গালি দেননি।
তিনি সাধারণত রাগতেন না, তবে অন্যায় কোন কিছু দেখলে রেগে যেতেন। সিমাক ইবন আল-ফাদল বলেন, একবার আমরা 'উরওয়া ইবন মুহাম্মাদের নিকট বসা ছিলাম। ওয়াহাব ছিলেন 'উরওয়ার পাশেই। এ সময় কিছু লোক এসে তাদের এলাকার শাসকের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ তুলে ধরলো। তার মধ্যে কিছু মন্দ কথাও ছিল। ওয়াহাব 'উরওয়ার হাতে থাকা লাঠিটি কেড়ে নিয়ে অভিযুক্ত শাসনকর্তার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। তাতে তার মাথা কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। ওয়াহাবের এমন রাগ দেখে উরওয়া হাসতে হাসতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েন। তারপর বলেন, আমরা রেগে যাই বলে আবূ 'আবদিল্লাহ ওয়াহাব দোষারোপ করেন, আর এখন তিনিই এভাবে রেগে গেলেন? বললেন: আমি না রেগে পারি কি করে? যিনি ধৈর্য ও সহনশীলতার স্রষ্টা তিনিই তো রেগে যান। তিনি বলেন: "যখন তারা আমাকে ক্রোধান্বিত করলো, আমি তাদেরকে শাস্তি দিলাম এবং ডুবিয়ে দিলাম তাদের সকলকে।" আল-জা'দ ইবন দিরহাম বলেন: "আমি যখনই কোন 'আলিমের সাথে কথা বলেছি তাকে রেগে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে দেখেছি। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ।”
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০০
২. আল-মাগাযী আল-উলা ওয়া মুয়াল্লিফ্হা-২৭; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৪৮৯
৩. আল-আ'লাম-৮/১২৫
৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০০-১০১
৫. তাহযীব আল-কামাল-১৯/২৮৮, ৫০১-৫০২
৬. আল-আ'লাম-৮/১২৫
৭. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৪৯
৮. তাহযীব আল-কামাল-১৯/৪৮৮; তাবি'ঈন-৫০৩
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১৯/৪৮৭
১০. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৪৪
১১. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৪৯
১২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০১
১৩. জাওয়াদ 'আলী তারীখ আল-'আরাব কাবলাল ইসলাম-১/৮৪
১৪. আত-তাবাকাত-৫/৩৯২
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১/৪৮৯
১৬. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯১
十七. ড. 'উমার ফাররূখ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-১/৩৭৯
十八. জুরজী যায়দান, তারীখ আত-তামাদ্দুন আল-ইসলামী-২/৫৮; ইবন খাল্লিকান, ওয়াফাইয়াত আ'য়ান-২/১৮০
十九. আল-মাগাযী আল-উনা ওয়া মুয়াল্লিফুহা-৩০-৩৪
二十. মুকাদ্দিমা, আল-মাগাযী আল-উলা-২২
二十一. সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩১-৩৪
二十二. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০১; তাহযীব আল-কামাল-১৯/৫০২
二十三. প্রাগুক্ত
二十四. তাহযীব আল-কামাল-১৯/৪৯০
二十五. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯১
二十六. প্রাগুক্ত
二十七. প্রাগুক্ত
二十八. প্রাগুক্ত
二十九. প্রাগুক্ত
三十. প্রাগুক্ত
三十一. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯৩-৪৯৪
三十二. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯৮-৫০১
三十三. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯০, ৪৯৩
三十四. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯১
三十五. প্রাগুক্ত-১৯/৪৯০