📄 আইউব ইবন আবী তামীমা আস-সাখতিয়ানী (রহ)
হযরত আইউবের ডাকনাম আবূ বাকর এবং পিতার নাম কায়সান। কিন্তু তিনি আবূ তামীমা ডাকনামে বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন। আইউব 'আনযা গোত্রের দাসত্বের রশি গলায় নিয়ে বেড়ে ওঠেন। তাঁর বাসস্থান ছিল বসরার বানু আল-হারীশে।
তার মাহাত্ম্য ও মনীষা
তিনি যদিও দাস ছিলেন, তবে 'ইল্যু ও 'আমলের জগতের মুকুটধারী ছিলেন। আল্লামা ইবন সা'দ লিখেছেন: ক্যানা ছিক্বাতান ছাবতান ফিল হাদীছি জা-মিআন আদলান ওয়া-রাআন কাসীরল ইল্ম হুজ্জাহ। "হাদীছে তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য, বহুগুণের সমাহার, ন্যায়নিষ্ঠ, আল্লাহভীরু, বহু জ্ঞানের অধিকারী দলিল-প্রমাণ সদৃশ মানুষ।" ইমাম নাওবী লিখেছেন, তার মহত্ত্ব, নেতৃত্ব, অগ্রগামিতা, মুখস্থ শক্তি, বিশ্বাসযোগ্যতা, জ্ঞানের ব্যাপকতা, উপলব্ধি ক্ষমতা এবং উঁচু মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবনুল 'ইমাদ-আল-হাম্বলী তাঁকে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় 'আলিম বলে উল্লেখ করেছেন।
শ্রেষ্ঠ 'আলিমগণের স্বীকৃতি
তাঁর সমকালীন সকল বড় 'আলিম তাঁর জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতা ও মহত্ত্বের কথা স্বীকার করেছেন। প্রখ্যাত তাবি'ঈ শু'বা তাঁকে "সায়্যিদুল 'উলামা"- 'আলিমদের নেতা অভিধায় ভূষিত করতেন। ইবন 'উয়ায়না বলতেন, আমি ৮৬ (ছিয়াশি) জন তাবি'ঈর সাক্ষাৎ লাভ করেছি, কিন্তু তাঁদের কাউকে আইউবের সমতুল্য পাইনি। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমার যে সকল মুহাদ্দিছ ও 'আলিমের কাছে বসার সুযোগ হয়েছে, আইউব তাঁদের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সুন্নাতের বেশি অনুসরণকারী। তাঁকে শীর্ষস্থানীয় 'আলিম গণ্য করা হতো। হিশাম ইবন 'উরওয়া বলতেন, বসরায় আইউবের মত দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না। হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে বসরার নওজোয়ানদের নেতা বলতেন। ইবন 'আওন বলতেন, মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের ওফাতের পর আমাদের সামনে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে, তাঁর স্থান পূরণ করার জন্য কে আছে? কিন্তু আমরা এমনিতেই জবাব পেয়ে গেলাম যে, আইউব আছেন। হিশাম ইবন 'উরওয়া বলেন, আমি বসরায় আইউবের মত আর কাউকে দেখিনি।
হাদীছ
তিনি বসরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী লিখেছেন, তিনি ছিলেন হাফিজ ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। হাদীছের জ্ঞান তিনি লাভ করেন বড় বড় তাবি'ঈদের নিকট থেকে। 'উমার ইবন সালামা জারমী, আবু রাজা' 'আতারুন্দী, আবৃ 'উছমান নাহদী, আবুশ শা'ছা' জাবির ইবন যায়দ, হাসান আল-বাসরী, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, নাফি' ইবন আবী মুলায়কা, ইবন মুনকাদির, হুমায়দ ইবন বিলাল, আবূ কিলাবা আল-জারমী, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, 'আবদুর রহমান ইবন কাসিম, 'ইকরিমা, আতা' (রহ) প্রমুখ 'আলিমদের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন এবং তাঁদের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেন। হাদীছে তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা এর দ্বারা অনুমান করা যায় যে, তাঁর বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা ৮০০ (আটশো) এবং কোন কোন বর্ণনা মতে ২০০০ (দু'হাজার) এ পৌছে। মু'আল্লা ইবন মানসূর বলেন, আমি ইসমা'ঈল ইবন 'উলায়্যার নিকট বসরার হাফিজে হাদীছ কারা তা জানতে চাইলাম। তিনি এই লোকগুলোর নাম উল্লেখ করলেন: আইউব, ইবন 'আওন, সুলায়মান আত-তায়মী, হিশাম আদ-দাওয়ায়ী ও সুলায়মান ইবন আল-মুগীরা (রহ)।
ইমাম মালিক, সুফইয়ান ছাওরী, ইবন 'উয়ায়না, ইবন 'উরূবা, মা'মার, আ'মাশ, কাতাদা, শু'বা (রহ) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ 'আলিম ও ইমাম তাঁর জ্ঞান ভাণ্ডার দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। আল-মিযী তাঁর বিখ্যাত ৫৫ জন ছাত্রের নাম উল্লেখ করেছেন যাঁরা তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
হাদীছ শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের নিকট তাঁর বর্ণিত হাদীছের স্থান
অবস্থা ও গুণগত দিক দিয়ে তাঁর বর্ণনাসমূহের যে মর্যাদা ও স্থান ছিল তা কয়েকজন মুহাদ্দিছের মন্তব্য থেকে অনুমান করা যায়। তাঁর বর্ণনাসমূহ সম্পর্কে আবূ হাতিমের ধারণা ছিল, তাঁর মত ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন নেই। মুহাম্মাদ ইবন সীরীন তাঁকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত বলেছেন। মুসলিম ইবন আকয়াস বলেন, আমি ইবন সীরীনকে জিজ্ঞেস করলাম, অমুক অমুক হাদীছ আপনার নিকট কে বর্ণনা করেছে? বললেন: বিশ্বস্ত, বিশ্বস্ত ব্যক্তি আইউব। ইবন আল-মাদীনী, নাসাঈ, ইবন খায়ছামা প্রমুখ মুহাদ্দিছ তাঁর বর্ণনাসমূহকে অতি উঁচু মর্যাদার বলে মনে করতেন। আর শু'বা তো তাঁর ঐ সকল বর্ণনাকে যাতে আইউবের নিজেরই সন্দেহ হতো, অন্যদের নিশ্চিত ও সন্দেহমুক্ত বর্ণনাসমূহের উপর প্রাধান্য দিতেন। একবার তিনি আইউবের কাছে একটি হাদীছ সম্পর্কে জানতে চান। তিনি বলেন, এতে আমার সন্দেহ আছে। শু'বা বললেন, আপনার সন্দেহ আমার নিকট অন্যদের দৃঢ় প্রত্যয়ের চেয়েও পছন্দনীয়।
ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর পূর্ণ দক্ষতা ছিল। শু'বা তাঁকে "সায়্যিদুল ফুকাহা"- ফকীহদের নেতা বলতেন। কিন্তু চরম সতর্কতার কারণে ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পায়নি।
সতর্কতা
এমন মুহাদ্দিছ ও ফকীহসুলভ দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনা এবং ফিক্হ সংক্রান্ত মাসয়ালা বলার ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, প্রশ্নের জবাব দানের ক্ষেত্রে আমি আইউব ও ইউনুছের চেয়ে অন্য কাউকে বেশি অজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেখিনি। জবাব দিলেও তার আগে প্রশ্নকারীর স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা করে দেখতেন যে, সে তাঁর জবাবটি যথাযথভাবে মানুষের নিকট উপস্থাপন করতে পারবে কিনা। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, যখন কোন ব্যক্তি আইউবের নিকট কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো তখন তার মুখ থেকে প্রশ্নটি আবার শুনতে চাইতেন। যদি তা হুবহু পূর্বের মত হতো তাহলে জবাব দিতেন, আর যদি দ্বিতীয়বার কিছু পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে ফেলতো তাহলে জবাব দিতেন না। জবাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতেন না, বরং শুধুমাত্র হাদীছ ও সুন্নাহর বিধান বলে দিতেন। যদি সে বিষয়ে কোন হাদীছ তাঁর কাছে না থাকতো তাহলে নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়ে দিতেন। একবার জনৈক ব্যক্তি কোন একটি বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তিনি সাফ বলে দেন, এ বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। প্রশ্নকারী বললো, কিয়াস ও যুক্তির ভিত্তিতে আপনার মতটি বলুন। বলেন, আমার কোন মতও নেই।
নিজের মতামতকে তিনি একটি বাতিল জিনিস বলে মনে করতেন। এক ব্যক্তি একবার তাঁকে বললো, আপনি কোন মাসয়ালায় নিজের মতামত প্রকাশ করেন না কেন? তিনি উপমার মাধ্যমে জবাব দেন যে, এক ব্যক্তি গাধাকে প্রশ্ন করে, তুমি জাবর কাট না কেন? জবাবে গাধা বলে, এই বাতিল ও অসার বস্তু চিবাতে আমার ভালো লাগে না।
জ্ঞানের অহঙ্কারের ভীতি ও সাবধানতা
মানুষ যখন কোন সম্মানজনক অবস্থান অথবা মর্যাদাবান স্তরে পৌঁছে যায় তখন আত্মতুষ্টি ও অহঙ্কার থেকে বেঁচে থাকা তার জন্য খুবই কষ্টকর। এ জন্য আইউব সব সময় ভীত থাকতেন। তিনি বলতেন, কোন্ মানুষ এর থেকে মুক্ত হতে পেরেছে? যখন কোন ব্যক্তি হাদীছ বর্ণনা করে এবং তার ভিত্তিতে সে মানুষের হৃদয়ে একটি স্থান করে নেয় তখন তার অন্তরে কিছু জিনিস, যেমন : আত্মতুষ্টি, অহমিকা, গর্ব-অহঙ্কার ইত্যাদির উদয় ঘটে।
কিন্তু তিনি এই পঙ্কিলতা থেকে নিরাপদ ছিলেন। জ্ঞানের এটাও একটা ঔদ্বত্য যে, জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতা অন্যের কাছে প্রকাশ হতে দেয় না। পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, তিনি অনেক প্রশ্নকারীকে সাফ বলে দিতেন যে, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। কাউকে বলতেন, অন্য কোন 'আলিমকে জিজ্ঞেস কর।
জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে তাঁর আচরণ
জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন এবং তাদেরকে সম্মানও করতেন। তার অবস্থা অতি সাধারণই হোক না কেন। রাবী' ইবন মুসলিম বলেন, একবার আমি আইউব আস-সাখতিয়ানীর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমরা যখন আবতাহ উপত্যাকায় তখন একজন অতি সাধারণ পোশাক পরা মোটা মানুষের সাথে দেখা হয়। সে আইউবকে খুঁজছিল। আমি তাঁকে বললাম, একজন সাধারণ মানুষ আপনাকে খুঁজছে। তিনি লোকটিকে দেখামাত্র দৌড়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। লোকটির পরিচয় নিয়ে জানা যায়, তিনি প্রখ্যাত 'আলিম তাবি'ঈ হযরত সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (রহ)।
'ইবাদত-বন্দেগী
হযরত আইউবের মধ্যে যে স্তরের জ্ঞান ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল আল্লাহ-ভীতি ও দুনিয়ার ভোগ-বিমুখতা। ইমাম মালিক (রহ) বলেন, তিনি ছিলেন একজন 'আমলকারী 'আলিম, ভীষণ আল্লাহ-ভীরু 'আবিদ এবং সৎ মানুষ। জীবনে চল্লিশ বার হজ্জ করার সৌভাগ্য লাভ করেন। কিন্তু তিনি নিজের সকল ইবাদত-বন্দেগী গোপন করার চেষ্টা করতেন। বলতেন, এসব কাজ প্রকাশ্যে করার চেয়ে গোপনে করাই উত্তম। সারা রাত ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন, কিন্তু মানুষের নিকট তা গোপন করার উদ্দেশ্যে প্রত্যুষে এমন জোরে আওয়ায করতেন যাতে সবাই মনে করে তিনি এই মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন।
রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি গভীর ভালোবাসা
হযরত রাসূলে কারীমের প্রতি এত উৎসর্গিত প্রাণ ছিলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ শুনে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতেন। তাঁর সেই কাঁদা দেখে অন্যদের দয়া হতো। ইমাম মালিক (রহ) বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তাঁর ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিমাণ দেখে আমি তাঁর নিকট থেকে হাদীছ লিখতে আরম্ভ করি। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইত্তেবা' ও অনুসরণের ক্ষেত্রেও ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমি যে সকল লোকের নিকট বসেছি তাদের সবার চেয়ে উত্তম এবং সবচেয়ে বেশি সুন্নাতের অনুসারী আইউবকে পেয়েছি।
খ্যাতির প্রতি অনীহা ও দুনিয়াদার মানুষ থেকে দূরে থাকা
হযরত আইউবের মধ্যে পূর্বে উল্লেখিত গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যসমূহ বিদ্যমান থাকার কারণে তিনি মানুষের দর্শনস্থলে পরিণত হন। কিন্তু তিনি দুনিয়া, দুনিয়াদার মানুষ এবং খ্যাতি ও নাম-কাম থেকে সর্বদা পালানোর চেষ্টা করতেন। কোন জনসমাবেশ ও মানুষের দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য পথ চলতে গিয়ে সাধারণ পরিচিত ও সোজা পথ বাদ দিয়ে অপরিচিত ঘুর-প্যাচের দীর্ঘ পথে চলতেন। হাম্মাদ-ইবন যায়দ বলেন, পথ চলার সময় আইউব আমাকে দূরের পথে নিয়ে যেতেন। আমি যখন তাঁকে নিকটের পথের কথা বলতাম তখন তিনি বলতেন, আমি অমুক স্থানের মজলিস থেকে দূরে থাকতে চাই। আরেকটি বর্ণনায় হাম্মাদ বলেন, তিনি আমাকে এমন সব রাস্তায় নিয়ে যেতেন যে, সেই রাস্তা তালাশ করা দেখে বিস্মিত হতাম। একাজ করতেন শুধু মানুষের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য। কিন্তু এ পথেও যখন কারো সামনে পড়ে যেতেন তখন নিজেই প্রথমে সালাম করতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের কারণে মানুষ তাঁর সালামের জবাবে অনেক কথা বাড়িয়ে বলতো। এভাবে তাঁকে সম্মান করাও তিনি পছন্দ করতেন না। এ কারণে তাঁদের জবাব শুনে বলতেন, আল্লাহ তুমি ভালো করে জান, আমি এটা চাইনি; এ আমার ইচ্ছা নয়। মানুষের দৃষ্টি এড়াতে অধিকাংশ সময় অন্য কাউকে নিজের সাথে চলার অনুমতি দিতেন না। শু'বা বলেন, অনেক সময় আমি আমার প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে যেতে চাইতাম, কিন্তু তিনি অনুমতি দিতেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট গলি পথে এদিক ওদিক পেঁচিয়ে যেতেন, যাতে লোকে চিনতে না পারে। আর এ কারণে সে যুগে তাঁর স্তরের লোকদের প্রচলিত পোশাক তিনি ছেড়ে দেন। সে যুগের তাপস ও দুনিয়া বিরাগী লোকদের চাদরের প্রান্ত একটু উপরে উঠানো থাকতো। এ ছিল তাঁদের তাপস্য ও বৈরাগ্যের চিহ্ন। এ কারণে তিনি তাঁর চাদর নীচে ছেড়ে দিয়ে চলতেন। মা'বাদ বলেন, আমি আইউবের জামার প্রান্ত লম্বা দেখে প্রতিবাদ করি। তিনি বলেন, আবূ 'উরূবা। পূর্ববর্তী যুগে প্রান্ত ঝুলিয়ে চলা প্রসিদ্ধ ছিল, আর এখন প্রসিদ্ধি গুটিয়ে চলাতে।
বিত্তবানদের সাহচর্য থেকে দূরে থাকা
তিনি সব সময় বিত্তবান ও ধন-ঐশ্বর্যের অধিকারী ব্যক্তিদের সাহচর্য থেকে দূরে থাকতেন। এমনকি খলীফা ও আমীর-উমারাদের কেউ তাঁর বাড়িতে আসা পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, আমার ছেলে বাকর আমার সবচেয়ে প্রিয়। তাকে আমি দাফন করে দিতে পারি, তবু খলীফাদের কেউ আমার কাছে আসা পছন্দ করি না। উমাইয়্যা বংশের ইয়াযীদ ইবন আল-ওয়ালীদ ছিলেন আইউবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যখন তিনি খলীফা হলেন তখন আইউব দু'আ করলেন এই বলে: হে আল্লাহ! তাঁর মন থেকে আমার কথা ভুলিয়ে দাও।
প্রফুল্ল ও মিষ্টি স্বভাব
পূর্বের আলোচনা থেকে কেউ যেন মনে না করে যে, তিনি গোঁমড়া মুখ ও রুক্ষ্ম স্বভাবের মানুষ ছিলেন। মূলতঃ তিনি নিজেকে লুকানোর জন্যই মানুষের সাথে মেলামেশা পছন্দ করতেন না। অন্যথায় তিনি ছিলেন দারুণ প্রফুল্ল ও মিষ্টি স্বভাবের মানুষ। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমি আইউবের চেয়ে বেশি আর কাউকে মানুষের সাথে হাসি মুখে ও অন্তর খুলে মিশতে দেখিনি। কেউ অসুস্থ হলে অথবা কারো মৃত্যু হলে তিনি রোগীকে দেখতে এবং মৃতের আপনজনকে সান্ত্বনা দিতে যেতেন। তখন মনে হতো সেই ব্যক্তি তাঁর দৃষ্টিতে অত্যন্ত সম্মানিত। এ রকম অবস্থায় তিনি অতি সাধারণ মানুষের বাড়িতেও উপস্থিত হতেন। ইয়া'লা ইবন হাকাম নামক একজন দাস তাঁর মহল্লায় থাকতো। সে শুধু তার মাকে রেখে মারা যায়। তিনি তার বাড়িতে একাধারে তিন দিন যান এবং দরজায় গিয়ে বসতেন।
ওফাত
হিজরী ১৩১ সনে বসরায় 'তাউন' রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ (তেষট্টি) বছর। একটি লাল চাদর তিনি বহু দিন পূর্ব থেকে কাফনের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। তিনি সেটি ইহরাম অবস্থায় এবং রমজানের তিরিশ তারিখ রাতে জড়াতেন। মৃত্যুর পূর্বে চাদরটি চুরি হয়ে যায়।
তাঁর মাথায় একটি জটা ছিল। বছরে একবার এবং সাধারণতঃ হজ্জের সময় মুড়ে ফেলতেন। শেষ বয়সে মাথা ও দাড়ির চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে লাল খিজাবও লাগাতেন।
তিনি ছিলেন আল্লাহর একজন অতি প্রিয় বান্দা। আল্লাহ তাঁর দু'আ সাথে সাথে কবুল করতেন। এমন কয়েকটি ঘটনা সীরাতের গ্রন্থাবলীতে দেখা যায়। যেমন ইবন 'আকীল 'শামায়িল আয-যুহহাদ' গ্রন্থে বলেছেন, একবার আইউব একটি কাফেলার সাথে মক্কা যাচ্ছেন। পথিমধ্যে মরুভূমিতে পানি সংকট দেখা দিল। সহযাত্রীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। তিনি একটি স্থানে হাত দিয়ে একটি বৃত্তের মত রেখা টানলেন। তারপর দু'আ করলেন। সাথে সাথে সেখানে একটি পানির ঝর্ণা সৃষ্টি হলো। লোকেরা পান করলো এবং তাদের পশুগুলোকেও পান করালো। প্রয়োজন শেষ হলে তিনি আবার সেই বৃত্তের উপর হাত ঘোরালেন এবং ঝর্ণাটি বন্ধ হয়ে গেল। এ রকম আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা 'আবদুল ওয়াহিদ ইবন যায়দ বর্ণনা করেছেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২/৪০৪
২. তাবাকাতু ইবন সা'দ-৭/১৪
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১
৪. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৮০
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১, তাহযীব আল- কামাল-২/৪০৭
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯৭-৩৯৮; তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৬
৮. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৭
৯. প্রাগুক্ত-২/৪০৫-৪০৬; তাহযীব আল-কাসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩২
১০. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৮
১১. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১-১৩২
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯৮
১৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১; তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৬
১৪. তাবাকাতু ইবন সা'দ-৭/১৪
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
১৬. তাবাকাত-৭/১৪
১৭. প্রাগুক্ত
十八. প্রাগুক্ত
十九. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৫৯
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১
二十一. তাবাকাত-৭/১৬
二十二. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১
二十三. প্রাগুক্ত
二十四. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৪৯
二十五. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৩৩
二十六. তাবি'ঈন-৫৭
二十七. তাবাকাত-৭/১৫-১৬
二十八. প্রাগুক্ত
二十九. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
三十. প্রাগুক্ত
三十一. তাবাকাত-৭/১৬
三十二. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩২
三十三. তাবাকাত-৭/১৬-১৭
三十四. তাবি'ঈন-৫৯
三十五. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩২
হযরত আইউবের ডাকনাম আবূ বাকর এবং পিতার নাম কায়সান। কিন্তু তিনি আবূ তামীমা ডাকনামে বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন। আইউব 'আনযা গোত্রের দাসত্বের রশি গলায় নিয়ে বেড়ে ওঠেন। তাঁর বাসস্থান ছিল বসরার বানু আল-হারীশে।
তার মাহাত্ম্য ও মনীষা
তিনি যদিও দাস ছিলেন, তবে 'ইল্যু ও 'আমলের জগতের মুকুটধারী ছিলেন। আল্লামা ইবন সা'দ লিখেছেন: ক্যানা ছিক্বাতান ছাবতান ফিল হাদীছি জা-মিআন আদলান ওয়া-রাআন কাসীরল ইল্ম হুজ্জাহ। "হাদীছে তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য, বহুগুণের সমাহার, ন্যায়নিষ্ঠ, আল্লাহভীরু, বহু জ্ঞানের অধিকারী দলিল-প্রমাণ সদৃশ মানুষ।" ইমাম নাওবী লিখেছেন, তার মহত্ত্ব, নেতৃত্ব, অগ্রগামিতা, মুখস্থ শক্তি, বিশ্বাসযোগ্যতা, জ্ঞানের ব্যাপকতা, উপলব্ধি ক্ষমতা এবং উঁচু মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবনুল 'ইমাদ-আল-হাম্বলী তাঁকে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় 'আলিম বলে উল্লেখ করেছেন।
শ্রেষ্ঠ 'আলিমগণের স্বীকৃতি
তাঁর সমকালীন সকল বড় 'আলিম তাঁর জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতা ও মহত্ত্বের কথা স্বীকার করেছেন। প্রখ্যাত তাবি'ঈ শু'বা তাঁকে "সায়্যিদুল 'উলামা"- 'আলিমদের নেতা অভিধায় ভূষিত করতেন। ইবন 'উয়ায়না বলতেন, আমি ৮৬ (ছিয়াশি) জন তাবি'ঈর সাক্ষাৎ লাভ করেছি, কিন্তু তাঁদের কাউকে আইউবের সমতুল্য পাইনি। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমার যে সকল মুহাদ্দিছ ও 'আলিমের কাছে বসার সুযোগ হয়েছে, আইউব তাঁদের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সুন্নাতের বেশি অনুসরণকারী। তাঁকে শীর্ষস্থানীয় 'আলিম গণ্য করা হতো। হিশাম ইবন 'উরওয়া বলতেন, বসরায় আইউবের মত দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না। হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে বসরার নওজোয়ানদের নেতা বলতেন। ইবন 'আওন বলতেন, মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের ওফাতের পর আমাদের সামনে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে, তাঁর স্থান পূরণ করার জন্য কে আছে? কিন্তু আমরা এমনিতেই জবাব পেয়ে গেলাম যে, আইউব আছেন। হিশাম ইবন 'উরওয়া বলেন, আমি বসরায় আইউবের মত আর কাউকে দেখিনি।
হাদীছ
তিনি বসরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী লিখেছেন, তিনি ছিলেন হাফিজ ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। হাদীছের জ্ঞান তিনি লাভ করেন বড় বড় তাবি'ঈদের নিকট থেকে। 'উমার ইবন সালামা জারমী, আবু রাজা' 'আতারুন্দী, আবৃ 'উছমান নাহদী, আবুশ শা'ছা' জাবির ইবন যায়দ, হাসান আল-বাসরী, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, নাফি' ইবন আবী মুলায়কা, ইবন মুনকাদির, হুমায়দ ইবন বিলাল, আবূ কিলাবা আল-জারমী, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, 'আবদুর রহমান ইবন কাসিম, 'ইকরিমা, আতা' (রহ) প্রমুখ 'আলিমদের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন এবং তাঁদের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেন। হাদীছে তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা এর দ্বারা অনুমান করা যায় যে, তাঁর বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা ৮০০ (আটশো) এবং কোন কোন বর্ণনা মতে ২০০০ (দু'হাজার) এ পৌছে। মু'আল্লা ইবন মানসূর বলেন, আমি ইসমা'ঈল ইবন 'উলায়্যার নিকট বসরার হাফিজে হাদীছ কারা তা জানতে চাইলাম। তিনি এই লোকগুলোর নাম উল্লেখ করলেন: আইউব, ইবন 'আওন, সুলায়মান আত-তায়মী, হিশাম আদ-দাওয়ায়ী ও সুলায়মান ইবন আল-মুগীরা (রহ)।
ইমাম মালিক, সুফইয়ান ছাওরী, ইবন 'উয়ায়না, ইবন 'উরূবা, মা'মার, আ'মাশ, কাতাদা, শু'বা (রহ) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ 'আলিম ও ইমাম তাঁর জ্ঞান ভাণ্ডার দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। আল-মিযী তাঁর বিখ্যাত ৫৫ জন ছাত্রের নাম উল্লেখ করেছেন যাঁরা তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
হাদীছ শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের নিকট তাঁর বর্ণিত হাদীছের স্থান
অবস্থা ও গুণগত দিক দিয়ে তাঁর বর্ণনাসমূহের যে মর্যাদা ও স্থান ছিল তা কয়েকজন মুহাদ্দিছের মন্তব্য থেকে অনুমান করা যায়। তাঁর বর্ণনাসমূহ সম্পর্কে আবূ হাতিমের ধারণা ছিল, তাঁর মত ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন নেই। মুহাম্মাদ ইবন সীরীন তাঁকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত বলেছেন। মুসলিম ইবন আকয়াস বলেন, আমি ইবন সীরীনকে জিজ্ঞেস করলাম, অমুক অমুক হাদীছ আপনার নিকট কে বর্ণনা করেছে? বললেন: বিশ্বস্ত, বিশ্বস্ত ব্যক্তি আইউব। ইবন আল-মাদীনী, নাসাঈ, ইবন খায়ছামা প্রমুখ মুহাদ্দিছ তাঁর বর্ণনাসমূহকে অতি উঁচু মর্যাদার বলে মনে করতেন। আর শু'বা তো তাঁর ঐ সকল বর্ণনাকে যাতে আইউবের নিজেরই সন্দেহ হতো, অন্যদের নিশ্চিত ও সন্দেহমুক্ত বর্ণনাসমূহের উপর প্রাধান্য দিতেন। একবার তিনি আইউবের কাছে একটি হাদীছ সম্পর্কে জানতে চান। তিনি বলেন, এতে আমার সন্দেহ আছে। শু'বা বললেন, আপনার সন্দেহ আমার নিকট অন্যদের দৃঢ় প্রত্যয়ের চেয়েও পছন্দনীয়।
ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর পূর্ণ দক্ষতা ছিল। শু'বা তাঁকে "সায়্যিদুল ফুকাহা"- ফকীহদের নেতা বলতেন। কিন্তু চরম সতর্কতার কারণে ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পায়নি।
সতর্কতা
এমন মুহাদ্দিছ ও ফকীহসুলভ দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনা এবং ফিক্হ সংক্রান্ত মাসয়ালা বলার ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, প্রশ্নের জবাব দানের ক্ষেত্রে আমি আইউব ও ইউনুছের চেয়ে অন্য কাউকে বেশি অজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেখিনি। জবাব দিলেও তার আগে প্রশ্নকারীর স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা করে দেখতেন যে, সে তাঁর জবাবটি যথাযথভাবে মানুষের নিকট উপস্থাপন করতে পারবে কিনা। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, যখন কোন ব্যক্তি আইউবের নিকট কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো তখন তার মুখ থেকে প্রশ্নটি আবার শুনতে চাইতেন। যদি তা হুবহু পূর্বের মত হতো তাহলে জবাব দিতেন, আর যদি দ্বিতীয়বার কিছু পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে ফেলতো তাহলে জবাব দিতেন না। জবাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতেন না, বরং শুধুমাত্র হাদীছ ও সুন্নাহর বিধান বলে দিতেন। যদি সে বিষয়ে কোন হাদীছ তাঁর কাছে না থাকতো তাহলে নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়ে দিতেন। একবার জনৈক ব্যক্তি কোন একটি বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তিনি সাফ বলে দেন, এ বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। প্রশ্নকারী বললো, কিয়াস ও যুক্তির ভিত্তিতে আপনার মতটি বলুন। বলেন, আমার কোন মতও নেই।
নিজের মতামতকে তিনি একটি বাতিল জিনিস বলে মনে করতেন। এক ব্যক্তি একবার তাঁকে বললো, আপনি কোন মাসয়ালায় নিজের মতামত প্রকাশ করেন না কেন? তিনি উপমার মাধ্যমে জবাব দেন যে, এক ব্যক্তি গাধাকে প্রশ্ন করে, তুমি জাবর কাট না কেন? জবাবে গাধা বলে, এই বাতিল ও অসার বস্তু চিবাতে আমার ভালো লাগে না।
জ্ঞানের অহঙ্কারের ভীতি ও সাবধানতা
মানুষ যখন কোন সম্মানজনক অবস্থান অথবা মর্যাদাবান স্তরে পৌঁছে যায় তখন আত্মতুষ্টি ও অহঙ্কার থেকে বেঁচে থাকা তার জন্য খুবই কষ্টকর। এ জন্য আইউব সব সময় ভীত থাকতেন। তিনি বলতেন, কোন্ মানুষ এর থেকে মুক্ত হতে পেরেছে? যখন কোন ব্যক্তি হাদীছ বর্ণনা করে এবং তার ভিত্তিতে সে মানুষের হৃদয়ে একটি স্থান করে নেয় তখন তার অন্তরে কিছু জিনিস, যেমন : আত্মতুষ্টি, অহমিকা, গর্ব-অহঙ্কার ইত্যাদির উদয় ঘটে।
কিন্তু তিনি এই পঙ্কিলতা থেকে নিরাপদ ছিলেন। জ্ঞানের এটাও একটা ঔদ্বত্য যে, জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতা অন্যের কাছে প্রকাশ হতে দেয় না। পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, তিনি অনেক প্রশ্নকারীকে সাফ বলে দিতেন যে, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। কাউকে বলতেন, অন্য কোন 'আলিমকে জিজ্ঞেস কর।
জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে তাঁর আচরণ
জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন এবং তাদেরকে সম্মানও করতেন। তার অবস্থা অতি সাধারণই হোক না কেন। রাবী' ইবন মুসলিম বলেন, একবার আমি আইউব আস-সাখতিয়ানীর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমরা যখন আবতাহ উপত্যাকায় তখন একজন অতি সাধারণ পোশাক পরা মোটা মানুষের সাথে দেখা হয়। সে আইউবকে খুঁজছিল। আমি তাঁকে বললাম, একজন সাধারণ মানুষ আপনাকে খুঁজছে। তিনি লোকটিকে দেখামাত্র দৌড়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। লোকটির পরিচয় নিয়ে জানা যায়, তিনি প্রখ্যাত 'আলিম তাবি'ঈ হযরত সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (রহ)।
'ইবাদত-বন্দেগী
হযরত আইউবের মধ্যে যে স্তরের জ্ঞান ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল আল্লাহ-ভীতি ও দুনিয়ার ভোগ-বিমুখতা। ইমাম মালিক (রহ) বলেন, তিনি ছিলেন একজন 'আমলকারী 'আলিম, ভীষণ আল্লাহ-ভীরু 'আবিদ এবং সৎ মানুষ। জীবনে চল্লিশ বার হজ্জ করার সৌভাগ্য লাভ করেন। কিন্তু তিনি নিজের সকল ইবাদত-বন্দেগী গোপন করার চেষ্টা করতেন। বলতেন, এসব কাজ প্রকাশ্যে করার চেয়ে গোপনে করাই উত্তম। সারা রাত ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন, কিন্তু মানুষের নিকট তা গোপন করার উদ্দেশ্যে প্রত্যুষে এমন জোরে আওয়ায করতেন যাতে সবাই মনে করে তিনি এই মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন।
রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি গভীর ভালোবাসা
হযরত রাসূলে কারীমের প্রতি এত উৎসর্গিত প্রাণ ছিলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ শুনে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতেন। তাঁর সেই কাঁদা দেখে অন্যদের দয়া হতো। ইমাম মালিক (রহ) বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তাঁর ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিমাণ দেখে আমি তাঁর নিকট থেকে হাদীছ লিখতে আরম্ভ করি। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইত্তেবা' ও অনুসরণের ক্ষেত্রেও ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমি যে সকল লোকের নিকট বসেছি তাদের সবার চেয়ে উত্তম এবং সবচেয়ে বেশি সুন্নাতের অনুসারী আইউবকে পেয়েছি।
খ্যাতির প্রতি অনীহা ও দুনিয়াদার মানুষ থেকে দূরে থাকা
হযরত আইউবের মধ্যে পূর্বে উল্লেখিত গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যসমূহ বিদ্যমান থাকার কারণে তিনি মানুষের দর্শনস্থলে পরিণত হন। কিন্তু তিনি দুনিয়া, দুনিয়াদার মানুষ এবং খ্যাতি ও নাম-কাম থেকে সর্বদা পালানোর চেষ্টা করতেন। কোন জনসমাবেশ ও মানুষের দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য পথ চলতে গিয়ে সাধারণ পরিচিত ও সোজা পথ বাদ দিয়ে অপরিচিত ঘুর-প্যাচের দীর্ঘ পথে চলতেন। হাম্মাদ-ইবন যায়দ বলেন, পথ চলার সময় আইউব আমাকে দূরের পথে নিয়ে যেতেন। আমি যখন তাঁকে নিকটের পথের কথা বলতাম তখন তিনি বলতেন, আমি অমুক স্থানের মজলিস থেকে দূরে থাকতে চাই। আরেকটি বর্ণনায় হাম্মাদ বলেন, তিনি আমাকে এমন সব রাস্তায় নিয়ে যেতেন যে, সেই রাস্তা তালাশ করা দেখে বিস্মিত হতাম। একাজ করতেন শুধু মানুষের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য। কিন্তু এ পথেও যখন কারো সামনে পড়ে যেতেন তখন নিজেই প্রথমে সালাম করতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের কারণে মানুষ তাঁর সালামের জবাবে অনেক কথা বাড়িয়ে বলতো। এভাবে তাঁকে সম্মান করাও তিনি পছন্দ করতেন না। এ কারণে তাঁদের জবাব শুনে বলতেন, আল্লাহ তুমি ভালো করে জান, আমি এটা চাইনি; এ আমার ইচ্ছা নয়। মানুষের দৃষ্টি এড়াতে অধিকাংশ সময় অন্য কাউকে নিজের সাথে চলার অনুমতি দিতেন না। শু'বা বলেন, অনেক সময় আমি আমার প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে যেতে চাইতাম, কিন্তু তিনি অনুমতি দিতেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট গলি পথে এদিক ওদিক পেঁচিয়ে যেতেন, যাতে লোকে চিনতে না পারে। আর এ কারণে সে যুগে তাঁর স্তরের লোকদের প্রচলিত পোশাক তিনি ছেড়ে দেন। সে যুগের তাপস ও দুনিয়া বিরাগী লোকদের চাদরের প্রান্ত একটু উপরে উঠানো থাকতো। এ ছিল তাঁদের তাপস্য ও বৈরাগ্যের চিহ্ন। এ কারণে তিনি তাঁর চাদর নীচে ছেড়ে দিয়ে চলতেন। মা'বাদ বলেন, আমি আইউবের জামার প্রান্ত লম্বা দেখে প্রতিবাদ করি। তিনি বলেন, আবূ 'উরূবা। পূর্ববর্তী যুগে প্রান্ত ঝুলিয়ে চলা প্রসিদ্ধ ছিল, আর এখন প্রসিদ্ধি গুটিয়ে চলাতে।
বিত্তবানদের সাহচর্য থেকে দূরে থাকা
তিনি সব সময় বিত্তবান ও ধন-ঐশ্বর্যের অধিকারী ব্যক্তিদের সাহচর্য থেকে দূরে থাকতেন। এমনকি খলীফা ও আমীর-উমারাদের কেউ তাঁর বাড়িতে আসা পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, আমার ছেলে বাকর আমার সবচেয়ে প্রিয়। তাকে আমি দাফন করে দিতে পারি, তবু খলীফাদের কেউ আমার কাছে আসা পছন্দ করি না। উমাইয়্যা বংশের ইয়াযীদ ইবন আল-ওয়ালীদ ছিলেন আইউবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যখন তিনি খলীফা হলেন তখন আইউব দু'আ করলেন এই বলে: হে আল্লাহ! তাঁর মন থেকে আমার কথা ভুলিয়ে দাও।
প্রফুল্ল ও মিষ্টি স্বভাব
পূর্বের আলোচনা থেকে কেউ যেন মনে না করে যে, তিনি গোঁমড়া মুখ ও রুক্ষ্ম স্বভাবের মানুষ ছিলেন। মূলতঃ তিনি নিজেকে লুকানোর জন্যই মানুষের সাথে মেলামেশা পছন্দ করতেন না। অন্যথায় তিনি ছিলেন দারুণ প্রফুল্ল ও মিষ্টি স্বভাবের মানুষ। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমি আইউবের চেয়ে বেশি আর কাউকে মানুষের সাথে হাসি মুখে ও অন্তর খুলে মিশতে দেখিনি। কেউ অসুস্থ হলে অথবা কারো মৃত্যু হলে তিনি রোগীকে দেখতে এবং মৃতের আপনজনকে সান্ত্বনা দিতে যেতেন। তখন মনে হতো সেই ব্যক্তি তাঁর দৃষ্টিতে অত্যন্ত সম্মানিত। এ রকম অবস্থায় তিনি অতি সাধারণ মানুষের বাড়িতেও উপস্থিত হতেন। ইয়া'লা ইবন হাকাম নামক একজন দাস তাঁর মহল্লায় থাকতো। সে শুধু তার মাকে রেখে মারা যায়। তিনি তার বাড়িতে একাধারে তিন দিন যান এবং দরজায় গিয়ে বসতেন।
ওফাত
হিজরী ১৩১ সনে বসরায় 'তাউন' রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ (তেষট্টি) বছর। একটি লাল চাদর তিনি বহু দিন পূর্ব থেকে কাফনের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। তিনি সেটি ইহরাম অবস্থায় এবং রমজানের তিরিশ তারিখ রাতে জড়াতেন। মৃত্যুর পূর্বে চাদরটি চুরি হয়ে যায়।
তাঁর মাথায় একটি জটা ছিল। বছরে একবার এবং সাধারণতঃ হজ্জের সময় মুড়ে ফেলতেন। শেষ বয়সে মাথা ও দাড়ির চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে লাল খিজাবও লাগাতেন।
তিনি ছিলেন আল্লাহর একজন অতি প্রিয় বান্দা। আল্লাহ তাঁর দু'আ সাথে সাথে কবুল করতেন। এমন কয়েকটি ঘটনা সীরাতের গ্রন্থাবলীতে দেখা যায়। যেমন ইবন 'আকীল 'শামায়িল আয-যুহহাদ' গ্রন্থে বলেছেন, একবার আইউব একটি কাফেলার সাথে মক্কা যাচ্ছেন। পথিমধ্যে মরুভূমিতে পানি সংকট দেখা দিল। সহযাত্রীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। তিনি একটি স্থানে হাত দিয়ে একটি বৃত্তের মত রেখা টানলেন। তারপর দু'আ করলেন। সাথে সাথে সেখানে একটি পানির ঝর্ণা সৃষ্টি হলো। লোকেরা পান করলো এবং তাদের পশুগুলোকেও পান করালো। প্রয়োজন শেষ হলে তিনি আবার সেই বৃত্তের উপর হাত ঘোরালেন এবং ঝর্ণাটি বন্ধ হয়ে গেল। এ রকম আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা 'আবদুল ওয়াহিদ ইবন যায়দ বর্ণনা করেছেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২/৪০৪
২. তাবাকাতু ইবন সা'দ-৭/১৪
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১
৪. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৮০
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১, তাহযীব আল- কামাল-২/৪০৭
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯৭-৩৯৮; তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৬
৮. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৭
৯. প্রাগুক্ত-২/৪০৫-৪০৬; তাহযীব আল-কাসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩২
১০. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৮
১১. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১-১৩২
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯৮
১৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১; তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৬
১৪. তাবাকাতু ইবন সা'দ-৭/১৪
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
১৬. তাবাকাত-৭/১৪
১৭. প্রাগুক্ত
十八. প্রাগুক্ত
十九. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৫৯
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১
二十一. তাবাকাত-৭/১৬
二十二. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১
二十三. প্রাগুক্ত
二十四. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৪৯
二十五. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৩৩
二十六. তাবি'ঈন-৫৭
二十七. তাবাকাত-৭/১৫-১৬
二十八. প্রাগুক্ত
二十九. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
三十. প্রাগুক্ত
三十一. তাবাকাত-৭/১৬
三十二. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩২
三十三. তাবাকাত-৭/১৬-১৭
三十四. তাবি'ঈন-৫৯
三十五. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩২
📄 জাবির ইবন যায়দ (রহ)
হযরত জাবিরের (রহ) ডাকনাম আবূ আশ-শা'ছা'। পিতার নাম যায়দ। আযদ গোত্রের সন্তান এবং বসরার অধিবাসী। উমান মতান্তরে বসরার 'আল-জাওফ' নামক স্থানের সাথে সম্পর্ক বুঝানোর জন্য তাঁকে 'আল-জাওফী' বলা হয়।
জ্ঞান ও মনীষা
হযরত জাবির (রহ) বহু 'আলিম সাহাবীর নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। তবে হাবরুল উম্মাহ্ (উম্মাতের মহাজ্ঞানী) হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) সাহচর্ষে সবচেয়ে বেশি অবস্থান করেন। এ কারণে তাঁকে "সাহিবু ইবন আল-আব্বাস" অর্থাৎ ইবন আল-আব্বাসের (রা) সাথী বলা হতো। এই সাহচর্যের কল্যাণে তিনি বিশাল জ্ঞানের অধিকারী হন এবং তাঁর সময়ের একজন বিশিষ্ট 'আলিম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে "আহাদুল আ'-লা-মি" বা "বিশিষ্টজনদের একজন” বলেছেন। ইমাম-নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর বিশ্বস্ততা, দৃঢ়তা ও সুউচ্চ মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত। তিনি ছিলেন তাবি'ঈ ইমাম ও ফকীহদের মধ্যে একজন।
কুরআন
কুরআন, হাদীছ, ফিক্ তথা সকল ইসলামী জ্ঞানে তিনি সমান পারদর্শিতা অর্জন করেন। 'উলূমুল কুরআন বা কুরআন বিষয়ক বিবিধ জ্ঞানে ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। তাঁর মহান শিক্ষক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা), যিনি নিজেও একজন শ্রেষ্ঠ কুরআন বিশেষজ্ঞ ছিলেন, বলেন:
"বসরাবাসীরা যদি জাবির ইবন যায়দের কথা মেনে নেয় তাহলে কিতাবুল্লাহর (কুরআন) মধ্যে যা কিছু আছে সে বিষয়ে তাদের জ্ঞান অনেক প্রশস্ত হয়ে যাবে।"
হাদীছ
তিনি হাদীছেরও একজন বড় হাফিজ ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে হাদীছের বিশিষ্ট 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করেছেন। হাদীছের জ্ঞান তিনি অর্জন করেন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, হাকাম ইবন 'আমর আল-গিফারী, আমীর মু'আবিয়া (রা) প্রমুখের মত শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণের নিকট থেকে। তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, ইয়া'লা ইবন মুসলিম, আইউব আস-সাখতিয়ানী, 'আমর ইবন জুরহুম (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
ফিক্হ
ফিক্হ বিষয়েও তাঁর পূর্ণ দক্ষতা ছিল। ইমাম নাওবী (রহ) তাঁকে তাবি'ঈ ইমাম ও ফকীহদের মধ্যে গণ্য করেছেন। সাহাবা (রা) ও তাবি'ঈন কিরাম (রহ) ফিক্হ বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতার কথা স্বীকার করেছেন। দাহহাক আদ-দাব্বী বলেন, একবার হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) তাওয়াফের মধ্যে জাবির ইবন যায়দের দেখা পান। তখন তিনি জাবিরকে লক্ষ্য করেন বলেন:
"ওহে জাবির! তুমি বসরার একজন অন্যতম ফকীহ্ এবং তুমি মানুষের জিজ্ঞাসার জবাবে ফাতওয়া দিয়ে থাক। তবে কখনো স্পষ্টভাষী কুরআন ও কার্যকর সুন্নাহ ব্যতীত ফাতওয়া দেবে না। এমনটি না করলে তুমি নিজেও ধ্বংস হবে এবং অন্যদেরকেও ধ্বংস করবে।” হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন:
"আইউবকে জিজ্ঞেস করা হল: আপনি কি জাবির ইবন যায়দকে দেখেছেন? বললেন: হাঁ, দেখেছি। তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ। তারপর উচ্ছ্বসিতভাবে তাঁর ফিক্হ বিষয়ে আলোচনা করতে থাকেন।" ইয়াস ইবন মু'আবিয়া ছিলেন বসরার বিখ্যাত কাজী। তিনি বলেন:
"আমি বসরাবাসী ও তাদের মুফতী জাবির ইবন যায়দকে পেয়েছি।" অপর একটি বর্ণনামতে তিনি বলেন, জাবির ছাড়া বসরাবাসীদের সত্যিকার কোন মুফতী ছিল না। হযরত হাসান আল-বাসরীর (রহ) অনুপস্থিতিতে জাবির ফাতওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করতেন।
হযরত জাবির (রহ) কোন এক কারণে একবার কারারুদ্ধ হন। ধারণা করা হয় যে, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের যুলুম-অত্যাচারের শিকারে পরিণত হন তিনি। তাঁর জ্ঞানের উপর বসরাবাসীদের এত আস্থা ছিল যে, তারা তাদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর লাভের জন্য কারাগারে তাঁর নিকট ছুটে যেত। কাতাদা বলেন, জাবির কারারুদ্ধ হলেন। সে সময় হিজড়ের উত্তরাধিকারের বিষয়ে একটি সমস্যা দেখা দিলে লোকেরা কারাগারে তাঁর নিকট সমাধান চেয়ে পাঠালো। তিনি বললেন, তোমরা তো বেশ ভালো। আমাকে কারাগারে আটক রেখেছো, আবার আমার নিকট ফাতওয়াও চাচ্ছো। অতঃপর তিনি জবাব পাঠিয়ে দেন। বসরাবাসীদের কেউ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট কোন কিছু জানতে চাইলে বলতেন: "তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করছো, অথচ তোমাদের মধ্যে তো জাবির ইবন যায়দ আছে।"
হযরত জাবিরের ব্যক্তি সত্তাটি ছিল বহু জ্ঞানের সমাহার, তিনি তাঁর যুগের একজন খুব বড় 'আলিম ছিলেন। 'আমর ইবন দীনার বলতেন:
"আমি জাবির ইবন যায়দ অপেক্ষা ফাতওয়া বিষয়ে অধিক জানে এমন কাউকে দেখিনি।” তাঁর মৃত্যুর পর হযরত কাতাদার (রহ) মুখ থেকে বার বার উচ্চারিত হচ্ছিল: আল-ইয়াওমা দুফিনা ইলমুল আরদ্বি - “আজ পৃথিবীর জ্ঞান দাফন হয়ে গেল।”
জ্ঞান গ্রন্থাবদ্ধকরণ
সেই যুগের কিছু মহান ব্যক্তির মত তিনিও জ্ঞান গ্রন্থাবদ্ধ করা পছন্দ করতেন না। 'আমর ইবন দীনার বলেন, কিছু লোক জাবির ইবন যায়দকে বললো, মানুষ আপনার মুখ থেকে যা শোনে তা লিখে ফেলে। একথা শুনে তিনি "ইন্না লিল্লাহ" উচ্চারণ করে বলেন, তারা লিখে ফেলে? তাঁর অনীহা দেখে তাঁর ছাত্রদের অনেকে লেখা ছেড়ে দেয়।
এত জ্ঞান-গরীমার সাথে চারিত্রিক বহু গুণ ও বৈশিষ্ট্যে তিনি বিভূষিত ছিলেন। ভালো কাজের বিপরীতে দুনিয়ার যে কোন সুখ-সম্পদের কোন রকম গুরুত্ব তাঁর কাছে ছিল না। তিনি বলতেন, ষাট বছর জীবন পূর্ণ হতে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছু পেয়েছি, আল্লাহর বহু অনুগ্রহ লাভ করেছি। কিন্তু এই ভালো কাজ ছাড়া অবশিষ্ট যা কিছু আমি করেছি এবং এ সকল সুখ-সম্পদ আমার জুতার থেকেও হেয় ও তুচ্ছ। মুহাম্মাদ ইবন হুসায়ন বলতেন, আল্লাহ জাবিরের প্রতি দয়া করুন! তিনি দিরহামের বিপরীতেও একজন মুসলিম ছিলেন।
একটি অপবাদ ও তাঁর সম্পর্কহীনতা
চরমপন্থী খারিজী সম্প্রদায়ের একটি উপদলের নাম 'ইবাদিয়া' । তাদের কিছু লোক তাঁর কাছে আসা-যাওয়া করতো। এ কারণে তাঁর সম্পর্কে কিছু মানুষের এ ধারণা সৃষ্টি হয় যে, এই সম্প্রদায়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক আছে অথবা কমপক্ষে তাদের চিন্তা-দর্শন দ্বারা তিনি কিছুটা প্রভাবিত। কিন্তু তাদের এ ধারণা সবই অমূলক ও ভিত্তিহীন ছিল। ইবাদিয়াদের সাথে তাঁর উঠা-বসা ছিল ঠিক, তবে তাদের চিন্তা-দর্শনের সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না। তিনি তাঁর জীবনে বার বার এবং শেষ জীবনে অন্তিম রোগ শয্যায়ও ইবাদিয়াদের চিন্তা-বিশ্বাসের সাথে তাঁর সম্পর্কহীনতার কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন। তাঁর অন্তিম সময়ে যখন অবস্থা একেবারেই খারাপ হয়ে পড়ে তখন ছাবিত আল-বানানী তার কাছে জানতে চান, আপনার কোন ইচ্ছা আছে কি? বললেন: হাসান আল-বাসরীকে এক নজর দেখতে চাই। সে সময় হাসান আল-বাসরী (রহ) সরকারের কোপদৃষ্টিতে ছিলেন। তাই গ্রেফতার এড়াতে আবু খলীফা নামক এক ব্যক্তির গৃহে আত্মগোপন করে ছিলেন। তাঁকে জাবিরের ইচ্ছার কথা জানানো হলো। সাথে সাথে তিনি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিন্তু ছাবিত তাঁকে বাধা দিয়ে বলেন, বের হলে গ্রেফতার হওয়ার ভয় আছে। তিনি জবাব দিলেন : আল্লাহ আমাকে শত্রুর দৃষ্টি থেকে রক্ষা করবেন। তিনি নিষেধ উপেক্ষা করে তখনই রাতের অন্ধকারে জাবিরের নিকট পৌঁছেন। জাবিরের একা উঠে বসার শক্তি ছিল না। তাই অন্যের সাহায্য নিয়ে উঠে বসেন। হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে কালিমা তায়্যিবা পড়ার তালকীন দেন এবং তিনি কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করেন। তারপর তিনি ইবাদিয়াদের বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য জাবিরের কাছে জিজ্ঞেস করেন, ইবাদিয়াদের সাথে তোমার সম্পর্কের প্রকৃতিটি কেমন ছিল? জাবির বলেন, আমি আল্লাহর কাছে তাদের ব্যাপারে দায়মুক্তি চাই। হাসান আল-বাসরী (রহ) আবার প্রশ্ন করেন: তাদের ব্যাপারে তোমার ধারণা কি? জাবির তাদের সাথে নিজের সম্পর্কহীনতার কথা প্রকাশ করেন। তখন জাবিরের একান্তই অন্তিমদশা। এ কারণে হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে বিদায় দেওয়ার জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু তখনো জাবিরের জীবনকাল শেষ হয়নি। তাই হযরত হাসান (রহ) সুবহে সাদিক হওয়ার পর নামাযে জানাযার ভঙ্গিতে চারটি তাকবীর উচ্চারণ করে জাবিরের মাগফিরাতের জন্য দু'আ করেন। তারপর অন্ধকারেই নিজের অবস্থান স্থলে ফিরে যান। আর এ রোগেই হযরত জাবির (রহ) ইনতিকাল করেন।
ওফাত
ইমাম আহমাদ, আল-ফাল্লাস ও বুখারীর মতে তিনি হিজরী ৯৩ সনে ইনতিকাল করেন। পক্ষান্তরে আল-ওয়াকিদী ও ইবন সা'দের মতে তাঁর মৃত্যু সন হিজরী ১০৩ এবং আল- হায়ছাম ইবন 'আদীর মতে হিজরী ১০৪
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭২
২. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-৩/২৮৬
৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩
৪. প্রাগুক্ত
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৪২
৬. তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৬
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-২/৩৮
৯. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৪২
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩
১১. প্রাগুক্ত; আত-তাবাকাত-৭/১৩১
১২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭২
১৩. আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十四. তাহযীব আত-তাহযীব-২/৩৮
十五. আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十六. তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৬
十七. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩; আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十八. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩
十九. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
二十. প্রাগুক্ত-৭/১৩৪
২১. 'আবদুল্লাহ ইবন ইবাদ-এর অনুসারীদেরকে 'ইবাদিয়া' বলা হয়।
২২. আত-তাবাকাত-৭/৩২
২৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১.৭৩; তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৭.
হযরত জাবিরের (রহ) ডাকনাম আবূ আশ-শা'ছা'। পিতার নাম যায়দ। আযদ গোত্রের সন্তান এবং বসরার অধিবাসী। উমান মতান্তরে বসরার 'আল-জাওফ' নামক স্থানের সাথে সম্পর্ক বুঝানোর জন্য তাঁকে 'আল-জাওফী' বলা হয়।
জ্ঞান ও মনীষা
হযরত জাবির (রহ) বহু 'আলিম সাহাবীর নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। তবে হাবরুল উম্মাহ্ (উম্মাতের মহাজ্ঞানী) হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) সাহচর্ষে সবচেয়ে বেশি অবস্থান করেন। এ কারণে তাঁকে "সাহিবু ইবন আল-আব্বাস" অর্থাৎ ইবন আল-আব্বাসের (রা) সাথী বলা হতো। এই সাহচর্যের কল্যাণে তিনি বিশাল জ্ঞানের অধিকারী হন এবং তাঁর সময়ের একজন বিশিষ্ট 'আলিম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে "আহাদুল আ'-লা-মি" বা "বিশিষ্টজনদের একজন” বলেছেন। ইমাম-নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর বিশ্বস্ততা, দৃঢ়তা ও সুউচ্চ মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত। তিনি ছিলেন তাবি'ঈ ইমাম ও ফকীহদের মধ্যে একজন।
কুরআন
কুরআন, হাদীছ, ফিক্ তথা সকল ইসলামী জ্ঞানে তিনি সমান পারদর্শিতা অর্জন করেন। 'উলূমুল কুরআন বা কুরআন বিষয়ক বিবিধ জ্ঞানে ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। তাঁর মহান শিক্ষক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা), যিনি নিজেও একজন শ্রেষ্ঠ কুরআন বিশেষজ্ঞ ছিলেন, বলেন:
"বসরাবাসীরা যদি জাবির ইবন যায়দের কথা মেনে নেয় তাহলে কিতাবুল্লাহর (কুরআন) মধ্যে যা কিছু আছে সে বিষয়ে তাদের জ্ঞান অনেক প্রশস্ত হয়ে যাবে।"
হাদীছ
তিনি হাদীছেরও একজন বড় হাফিজ ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে হাদীছের বিশিষ্ট 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করেছেন। হাদীছের জ্ঞান তিনি অর্জন করেন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, হাকাম ইবন 'আমর আল-গিফারী, আমীর মু'আবিয়া (রা) প্রমুখের মত শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণের নিকট থেকে। তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, ইয়া'লা ইবন মুসলিম, আইউব আস-সাখতিয়ানী, 'আমর ইবন জুরহুম (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
ফিক্হ
ফিক্হ বিষয়েও তাঁর পূর্ণ দক্ষতা ছিল। ইমাম নাওবী (রহ) তাঁকে তাবি'ঈ ইমাম ও ফকীহদের মধ্যে গণ্য করেছেন। সাহাবা (রা) ও তাবি'ঈন কিরাম (রহ) ফিক্হ বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতার কথা স্বীকার করেছেন। দাহহাক আদ-দাব্বী বলেন, একবার হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) তাওয়াফের মধ্যে জাবির ইবন যায়দের দেখা পান। তখন তিনি জাবিরকে লক্ষ্য করেন বলেন:
"ওহে জাবির! তুমি বসরার একজন অন্যতম ফকীহ্ এবং তুমি মানুষের জিজ্ঞাসার জবাবে ফাতওয়া দিয়ে থাক। তবে কখনো স্পষ্টভাষী কুরআন ও কার্যকর সুন্নাহ ব্যতীত ফাতওয়া দেবে না। এমনটি না করলে তুমি নিজেও ধ্বংস হবে এবং অন্যদেরকেও ধ্বংস করবে।” হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন:
"আইউবকে জিজ্ঞেস করা হল: আপনি কি জাবির ইবন যায়দকে দেখেছেন? বললেন: হাঁ, দেখেছি। তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ। তারপর উচ্ছ্বসিতভাবে তাঁর ফিক্হ বিষয়ে আলোচনা করতে থাকেন।" ইয়াস ইবন মু'আবিয়া ছিলেন বসরার বিখ্যাত কাজী। তিনি বলেন:
"আমি বসরাবাসী ও তাদের মুফতী জাবির ইবন যায়দকে পেয়েছি।" অপর একটি বর্ণনামতে তিনি বলেন, জাবির ছাড়া বসরাবাসীদের সত্যিকার কোন মুফতী ছিল না। হযরত হাসান আল-বাসরীর (রহ) অনুপস্থিতিতে জাবির ফাতওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করতেন।
হযরত জাবির (রহ) কোন এক কারণে একবার কারারুদ্ধ হন। ধারণা করা হয় যে, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের যুলুম-অত্যাচারের শিকারে পরিণত হন তিনি। তাঁর জ্ঞানের উপর বসরাবাসীদের এত আস্থা ছিল যে, তারা তাদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর লাভের জন্য কারাগারে তাঁর নিকট ছুটে যেত। কাতাদা বলেন, জাবির কারারুদ্ধ হলেন। সে সময় হিজড়ের উত্তরাধিকারের বিষয়ে একটি সমস্যা দেখা দিলে লোকেরা কারাগারে তাঁর নিকট সমাধান চেয়ে পাঠালো। তিনি বললেন, তোমরা তো বেশ ভালো। আমাকে কারাগারে আটক রেখেছো, আবার আমার নিকট ফাতওয়াও চাচ্ছো। অতঃপর তিনি জবাব পাঠিয়ে দেন। বসরাবাসীদের কেউ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট কোন কিছু জানতে চাইলে বলতেন: "তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করছো, অথচ তোমাদের মধ্যে তো জাবির ইবন যায়দ আছে।"
হযরত জাবিরের ব্যক্তি সত্তাটি ছিল বহু জ্ঞানের সমাহার, তিনি তাঁর যুগের একজন খুব বড় 'আলিম ছিলেন। 'আমর ইবন দীনার বলতেন:
"আমি জাবির ইবন যায়দ অপেক্ষা ফাতওয়া বিষয়ে অধিক জানে এমন কাউকে দেখিনি।” তাঁর মৃত্যুর পর হযরত কাতাদার (রহ) মুখ থেকে বার বার উচ্চারিত হচ্ছিল: আল-ইয়াওমা দুফিনা ইলমুল আরদ্বি - “আজ পৃথিবীর জ্ঞান দাফন হয়ে গেল।”
জ্ঞান গ্রন্থাবদ্ধকরণ
সেই যুগের কিছু মহান ব্যক্তির মত তিনিও জ্ঞান গ্রন্থাবদ্ধ করা পছন্দ করতেন না। 'আমর ইবন দীনার বলেন, কিছু লোক জাবির ইবন যায়দকে বললো, মানুষ আপনার মুখ থেকে যা শোনে তা লিখে ফেলে। একথা শুনে তিনি "ইন্না লিল্লাহ" উচ্চারণ করে বলেন, তারা লিখে ফেলে? তাঁর অনীহা দেখে তাঁর ছাত্রদের অনেকে লেখা ছেড়ে দেয়।
এত জ্ঞান-গরীমার সাথে চারিত্রিক বহু গুণ ও বৈশিষ্ট্যে তিনি বিভূষিত ছিলেন। ভালো কাজের বিপরীতে দুনিয়ার যে কোন সুখ-সম্পদের কোন রকম গুরুত্ব তাঁর কাছে ছিল না। তিনি বলতেন, ষাট বছর জীবন পূর্ণ হতে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছু পেয়েছি, আল্লাহর বহু অনুগ্রহ লাভ করেছি। কিন্তু এই ভালো কাজ ছাড়া অবশিষ্ট যা কিছু আমি করেছি এবং এ সকল সুখ-সম্পদ আমার জুতার থেকেও হেয় ও তুচ্ছ। মুহাম্মাদ ইবন হুসায়ন বলতেন, আল্লাহ জাবিরের প্রতি দয়া করুন! তিনি দিরহামের বিপরীতেও একজন মুসলিম ছিলেন।
একটি অপবাদ ও তাঁর সম্পর্কহীনতা
চরমপন্থী খারিজী সম্প্রদায়ের একটি উপদলের নাম 'ইবাদিয়া' । তাদের কিছু লোক তাঁর কাছে আসা-যাওয়া করতো। এ কারণে তাঁর সম্পর্কে কিছু মানুষের এ ধারণা সৃষ্টি হয় যে, এই সম্প্রদায়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক আছে অথবা কমপক্ষে তাদের চিন্তা-দর্শন দ্বারা তিনি কিছুটা প্রভাবিত। কিন্তু তাদের এ ধারণা সবই অমূলক ও ভিত্তিহীন ছিল। ইবাদিয়াদের সাথে তাঁর উঠা-বসা ছিল ঠিক, তবে তাদের চিন্তা-দর্শনের সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না। তিনি তাঁর জীবনে বার বার এবং শেষ জীবনে অন্তিম রোগ শয্যায়ও ইবাদিয়াদের চিন্তা-বিশ্বাসের সাথে তাঁর সম্পর্কহীনতার কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন। তাঁর অন্তিম সময়ে যখন অবস্থা একেবারেই খারাপ হয়ে পড়ে তখন ছাবিত আল-বানানী তার কাছে জানতে চান, আপনার কোন ইচ্ছা আছে কি? বললেন: হাসান আল-বাসরীকে এক নজর দেখতে চাই। সে সময় হাসান আল-বাসরী (রহ) সরকারের কোপদৃষ্টিতে ছিলেন। তাই গ্রেফতার এড়াতে আবু খলীফা নামক এক ব্যক্তির গৃহে আত্মগোপন করে ছিলেন। তাঁকে জাবিরের ইচ্ছার কথা জানানো হলো। সাথে সাথে তিনি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিন্তু ছাবিত তাঁকে বাধা দিয়ে বলেন, বের হলে গ্রেফতার হওয়ার ভয় আছে। তিনি জবাব দিলেন : আল্লাহ আমাকে শত্রুর দৃষ্টি থেকে রক্ষা করবেন। তিনি নিষেধ উপেক্ষা করে তখনই রাতের অন্ধকারে জাবিরের নিকট পৌঁছেন। জাবিরের একা উঠে বসার শক্তি ছিল না। তাই অন্যের সাহায্য নিয়ে উঠে বসেন। হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে কালিমা তায়্যিবা পড়ার তালকীন দেন এবং তিনি কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করেন। তারপর তিনি ইবাদিয়াদের বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য জাবিরের কাছে জিজ্ঞেস করেন, ইবাদিয়াদের সাথে তোমার সম্পর্কের প্রকৃতিটি কেমন ছিল? জাবির বলেন, আমি আল্লাহর কাছে তাদের ব্যাপারে দায়মুক্তি চাই। হাসান আল-বাসরী (রহ) আবার প্রশ্ন করেন: তাদের ব্যাপারে তোমার ধারণা কি? জাবির তাদের সাথে নিজের সম্পর্কহীনতার কথা প্রকাশ করেন। তখন জাবিরের একান্তই অন্তিমদশা। এ কারণে হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে বিদায় দেওয়ার জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু তখনো জাবিরের জীবনকাল শেষ হয়নি। তাই হযরত হাসান (রহ) সুবহে সাদিক হওয়ার পর নামাযে জানাযার ভঙ্গিতে চারটি তাকবীর উচ্চারণ করে জাবিরের মাগফিরাতের জন্য দু'আ করেন। তারপর অন্ধকারেই নিজের অবস্থান স্থলে ফিরে যান। আর এ রোগেই হযরত জাবির (রহ) ইনতিকাল করেন।
ওফাত
ইমাম আহমাদ, আল-ফাল্লাস ও বুখারীর মতে তিনি হিজরী ৯৩ সনে ইনতিকাল করেন। পক্ষান্তরে আল-ওয়াকিদী ও ইবন সা'দের মতে তাঁর মৃত্যু সন হিজরী ১০৩ এবং আল- হায়ছাম ইবন 'আদীর মতে হিজরী ১০৪
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭২
২. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-৩/২৮৬
৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩
৪. প্রাগুক্ত
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৪২
৬. তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৬
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-২/৩৮
৯. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৪২
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩
১১. প্রাগুক্ত; আত-তাবাকাত-৭/১৩১
১২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭২
১৩. আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十四. তাহযীব আত-তাহযীব-২/৩৮
十五. আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十六. তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৬
十七. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩; আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十八. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩
十九. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
二十. প্রাগুক্ত-৭/১৩৪
২১. 'আবদুল্লাহ ইবন ইবাদ-এর অনুসারীদেরকে 'ইবাদিয়া' বলা হয়।
২২. আত-তাবাকাত-৭/৩২
২৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১.৭৩; তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৭.
📄 আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ (রহ)
তাঁর পূর্ণ নাম আবূ 'আমর আল-আসওয়াদ এবং পিতার নাম ইয়াযীদ। তাঁর দশম ঊর্ধ্বতন পুরুষ "নাখা”-এর প্রতি আরোপ করে তাঁকে নাখা'ঈ বলা হয়। কুফার অধিবাসী ছিলেন। তিনি একজন "মুখাদরাম" ব্যক্তি ছিলেন। যারা জাহিলী ও ইসলামী উভয় যুগ লাভ করেন তারা হলেন 'মুখাদরাম'। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত তাবি'ঈ 'আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদের ভাই, 'আলকামা ইবন কায়সের ভাতিজা, ইবরাহীম আন- নাখা'ঈর মামা এবং 'আবদুর রহমান ইবন আল-আসওয়াদের পিতা। তিনি 'আলকামা ইবন কায়সের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন।
জ্ঞান-মনীষা ও 'ইবাদত-বন্দেগীর দিক থেকে আল-আসওয়াদকে কৃষ্ণার বিশিষ্ট 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করা হয়। ইমাম যাহাবী তাঁকে ইমাম, ফকীহ, তাপস, দুনিয়া বিরাগী ও কুফার 'আলিম বলেছেন। ইমাম নাওবী লিখেছেন, তাঁর বিশ্বস্ততা ও মহত্ত্বের ব্যাপারে সকলে একমত।
হাদীছ
হাদীছের বিশিষ্ট হাফিজ ছিলেন। হযরত আবূ বাকর, 'উমার, 'আলী, 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ, 'আয়িশা সিদ্দীকা, হুযায়ফা, আবূ মাহযূরা, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, মু'আয ইবন জাবাল, বিলাল ইবন রাবাহ (রা) প্রমুখের মত উঁচু পর্যায়ের সাহাবীর সুহবত এবং তাঁদের থেকে হাদীছ শোনার সৌভাগ্য লাভ করেন। হযরত 'উমার (রা) ও উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) সাথে অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। উল্লেখিত মহান ব্যক্তিবর্গের সকলের সূত্রে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
ছাত্র-শিষ্য
তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করে তাঁর নিজ পরিবারের সকল সদস্য বড় বড় জ্ঞানী ব্যক্তিতে পরিণত হন। যেমন তাঁর ভাগ্নে ইবরাহীম নাখা'ঈ, ভাই 'আবদুর রহমান ও তাঁর পিতার চাচাতো ভাই 'আলকামা। এই 'আলকামা তো তৎকালীন জ্ঞানের জগতের উজ্জ্বল তারকাতুল্য ছিলেন। তাছাড়া অন্যদের মধ্যে 'আম্মারা ইবন 'উমায়র, আবু ইসহাক সুবায়'ঈ, আবূ বুরদা ইবন আবূ মূসা, মুহারিব ইবন দাছারা, আশ'আছ ইবন আবিশ শা'ছা' (রহ) ও আরো অনেকে তাঁর নিকট থেকে হাদীছ শুনেছেন। ফিক্ শাস্ত্রেও তাঁর বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি একজন ফকীহ ছিলেন। ইমাম যাহাবী, ইবন হাজার 'আসকিলানী এবং আরো অনেকে তাঁর ফিক্হ বিষয়ে ব্যুৎপত্তির কথা স্বীকার করেছেন।
'ইবাদত-বন্দেগী ও দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতা
'ইলমের চেয়েও তাঁর 'আমল যথা: আল্লাহভীতি, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ স্বভাব, 'ইবাদত-বন্দেগী ছিল বেশি সুন্দর। তাবি'ঈদের মধ্যে আটজন মহান ব্যক্তি ছিলেন 'ইবাদত-বন্দেগী এবং দুনিয়া বিরাগী স্বভাবের জন্য সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তাঁরা হলেন: আর-রাবী' ইবন খুছায়ম, 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ আত-তামীমী, উয়াইস আল-কারানী, হারাম ইবন হায়্যান, মাসরূক ইবন আল-আজদা', আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ, আবূ মুসলিম আল-খাওলানী ও আল-হাসান আল-বাসরী (রহ)। এই তালিকায় আল-আসওয়াদের নামটিও আছে। ইমাম যাহাবী লিখেছেন, তিনি 'ইবাদতের ক্ষেত্রে খুব উঁচু পর্যায়ের ছিলেন। মনীষীগণ উপরোক্ত আট 'আবিদের মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে বলেছেন: "মহত্ত্ব, জ্ঞান, বিশ্বস্ততায় ও বয়সে আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ ছিলেন মাসরূক ইবন আল-আজদা'র সমকক্ষ। তাঁদের দু'জনের 'ইবাদতের দ্বারা দৃষ্টান্ত দেয়া হয়।"
নামায
তাঁর জীবনের প্রধান কাজ ছিল নামায আদায় করা। প্রতিদিন সাত শো রাক'আত নফল নামায আদায় করতেন। সব সময় প্রথম ওয়াকতেই নামায আদায় করতেন। এ ব্যাপারে এত গুরুত্ব দিতেন যে, তিনি যে কাজে বা যে কোন অবস্থায় থাকতেন না কেন নামাযের সময় হওয়ার সাথে সাথে সবকিছু ছেড়ে নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। তাঁর সফর সঙ্গীরা বলেছেন, সফর অবস্থায় যত বন্ধুর পথই অতিক্রম করুন না কেন নামাযের সময় হওয়ার সাথে সাথে বাহনের পিঠ থেকে নেমে নামায আদায় করে নিতেন। তারপর আবার সামনে এগোতেন।
রোযা
রোযার প্রতিও তাঁর প্রবল আগ্রহ ও মনোযোগ ছিল। প্রায় সব সময় রোযা রাখতেন। প্রচণ্ড গরমের দিনেও রোযা ছাড়তেন না, যখন লাল উটের মত শক্তিশালী এবং তীব্র গরম সহ্য করা প্রাণীও গরমের তীব্রতায় বেহাল অবস্থা হয়ে যেত। সফরেও রোযার ধারাবাহিকতায় কোন রকম ছেদ পড়তো না। অনেক সময় এমন হতো যে, সফরের কষ্ট এবং পিপাসার তীব্রতায় তাঁর চেহারা বিবর্ণ এবং জিহ্বা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত, তবুও তিনি রোযা ছাড়তেন না। এত কঠোর 'ইবাদতের কারণে একটি চোখ নষ্ট হতে চলে, দেহ শুকিয়ে হালকা-পাতলা হয়ে যায়। এ অবস্থায় তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু 'আলকামা ইবন মারছাদ তাঁকে দেখতে আসেন। পিছন থেকে তাঁর দেহ মৃদু স্পর্শ করে বলেন: "ওহে আবু 'আবদির রহমান! এই দেহকে এত কষ্ট দিচ্ছেন কেন?" তিনি জবাব দিলেন: 'ওহে ইসলামের ভাই, আমি এই দেহকে শান্তি দিতে চাই। আবূ শাবল! ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা।'
হজ্জ
তাঁর হজ্জ আদায়ের সংখ্যা দেখে বুঝা যায় তাঁর মধ্যে হজ্জ করার আগ্রহ কী পরিমাণ ছিল। জীবনের এমন কোন বছর হয়তো ছিল না যে বছর হজ্জ করেননি। তাঁর হজ্জ ও 'উমরার সম্মিলিত সংখ্যা সত্তর থেকে আশি (৭০-৮০) হবে। মায়মূন ইবন হামযা বলেন: আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ জীবনে আশিটি হজ্জ ও 'উমরা করেন। তবে দু'টি এক সাথে নয়, পৃথকভাবে। তাঁর পুত্র 'আবদুর রহমানও পিতার মত পৃথকভাবে আশিটি হজ্জ ও 'উমরা করেন। কখনো কখনো আগ্রহের আতিশয্যে কূফা থেকেই ইহরাম বেঁধে- "লাব্বাইকা গাফ্ফারায যুনূবি, লাব্বাইকা লা- শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা লাব্বাইক, লা- শারীকা লাকা লাব্বাইক।" ধ্বনি দিতে দিতে যাত্রা করে মক্কায় পৌঁছতেন। তবে সব সময় এমন করতেন না, বরং বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে তাঁর ইহরাম বাঁধার প্রমাণ পাওয়া যায়। সাধারণতঃ রাতে মক্কায় প্রবেশ করতেন। বায়তুল্লাহর তাওয়াফের সাথে ছিল গভীর আবেগের সম্পর্ক। এ ব্যাপারে তিনি ভীষণ কঠোরও ছিলেন। কেউ যদি হজ্জ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করতো তাহলে সে মারা গেলে তার জানাযার নামায পড়তেন না।
কুরআন তিলাওয়াত
কুরআন ছিল তাঁর আবাসে-প্রবাসে দিন-রাতের একান্ত সঙ্গী। কুরআন তিলাওয়াত ছিল তাঁর প্রতিদিনের অভ্যাস। রমযান মাসে তিলাওয়াতের আগ্রহ আরো বেড়ে যেত। মাগরিব ও 'ঈশার মাঝের সময়টুক শুয়ে থাকতেন। তারপর উঠে নামায আদায় করে সারা রাত তিলাওয়াত করতেন। এক মাসে দু'রাতে একবার কুরআন খতম করতেন। আর অন্য মাসে প্রতি ছয় রাতে একবার।
মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও হৃদ্যতার সম্পর্ক
আজকাল আমাদের পরস্পরের মধ্যে মতের সামান্য ভিন্নতার কারণে সব রকম সামাজিক কর্মকাণ্ডেও মত পার্থক্যের সৃষ্টি হয়ে যায়। তাই আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদের মত মহান ব্যক্তিদের আদর্শ আমাদের জন্য অনুসরণযোগ্য। মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁরা পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট রাখতেন। আল-আসওয়াদ হযরত 'উমারের (রা) সাহচর্যে বেশিদিন থাকার কারণে তাঁর অনুসারী ছিলেন। অন্যদিকে 'আলকামা ছিলেন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) শাগরিদ ও অনুসারী। কিন্তু তাঁরা দু'জন যখন মিলিত হতেন তখন তাদের মধ্যে মোটেও মতপার্থক্য দেখা যেত না।
ওফাত
হিজরী ৭৫ মতান্তরে ৭৪ সনে তিনি কৃষ্ণায় ইনতিকাল করেন। অন্তিম রোগশয্যায় কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাসে কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। যখন বিছানায় একা পাশ-ফেরাতে পারতেন না তখন ভাগ্নে ইবরাহীম নাখা'ঈর সাহায্য নিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকেন। আত্মীয়-বন্ধুরা বললেন: আবূ 'আবদির রহমান! এমন অস্থির হচ্ছেন কেন? বললেন: কেন হবো না? আল্লাহ যদি আমাকে ক্ষমাও করে দেন, তাহলেও আমি যে পাপ করেছি তার জন্য তো আমাকে লজ্জা পেতে হবে। একেবারে শেষ মুহূর্তে বলেন, আমাকে কালেমায়ে তাইয়িবার তালকীন দাও, যাতে আমার মুখ থেকে বের হওয়া শেষ কথাটি হয়- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ - "আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই।”
জীবনের শেষ দিকে তাঁর দাড়ি ও মাথার চুল সাদা হয়ে যায়। খিজাব লাগাতেন। চূড়া ওয়ালা টুপি পরতেন, কালো রংয়ের পাগড়ী পরতেন, যার প্রান্ত পিছনের দিকে ছাড়া থাকতো।
টিকাঃ
১. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭৪
২. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২/২৫১
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪২
৪. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১২২
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৪২; তাহযীব আল-কামাল-২/২৫১
৬. প্রাগুক্ত
৭. 'আসরুত তাবি'ঈন-৭৩১-৭৩৩
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৩
৯. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৫০-৫১
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৩
১১. আত-তাবাকাত-৬/৪৭; 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭৫
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাহযীব আল-কামাল-২/২৫২
১৪. আত-তাবাকাত-৬/৪৭-৪৮
১৫. প্রাগুক্ত
১৬. প্রাগুক্ত; 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭৬
১৭. তাহযীব আল-কামাল-২/২৫২
১৮. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭৬
১৯. আত-তাবাকাত-৬/৫০
২০. প্রাগুক্ত-৬/৫৯
📄 আবূ সালামা ইবন ‘আবদির রহমান (রা)
হযরত 'আবদুল্লাহর (রহ) ডাকনাম আবূ সালামা এবং এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাই অনেকে আবূ সালামা তাঁর আসল নাম বলে মনে করেছেন। তাঁর পিতা মক্কার কুরায়শ গোত্রের বানু যুহরা শাখার প্রখ্যাত সাহাবী হযরত 'আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা) এবং মাতা তুমাদির বিন্ত আল আসবাগ। তুমাদির ছিলেন দিমাশকের সন্নিকটে দাওমাতুল জান্দালে বসবাসরত বানু কাল্ব গোত্রের কুদা'আ শাখার সন্তান। বর্ণিত হয়েছে, তিনি নবীর (সা) জীবনকাল লাভ করেন। তিনি হলেন কাল্ব গোত্রের প্রথম মহিলা যাঁর বিয়ে হয় মক্কার কুরায়শ গোত্রের কোন পুরুষের সাথে।
জ্ঞান ও মনীষা
হযরত 'আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা) ছিলেন 'আশারা মুবাশারার (জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন) অন্যতম সদস্য। এ দ্বারা অনুমান করা যায় যে, তিনি কত উঁচু মাপের ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। আবূ সালামা এমন মহান পিতার 'ইল্ম ও 'আমল (জ্ঞান ও কর্ম)-এর পরিবেশে অত্যন্ত স্নেহ-আদরে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন। পিতার জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলেন এবং অচিরেই সমকালীনদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিতে পরিণত হন। অনেক 'আলিম তাঁকে মদীনার সাত ফকীর মধ্যে গণ্য করেছেন। তবে এটা সর্বজন গৃহীত মত নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁর নামটি উচ্চারিত হওয়া তাঁর যোগ্যতার একটি বড় প্রমাণ। জ্ঞানের জগতে তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা এবং তাঁর ইমাম হওয়ার ব্যাপারে 'আলিমদের ঐকমত্য রয়েছে। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, আবূ সালামার ইমাম হওয়া এবং তাঁর সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত।
হাদীছ
তিনি পিতা হযরত 'আবদুর রহমান ইবন আওফের (রা) নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। তাছাড়া উঁচু স্তরের আরো অনেক সাহাবীর (রা) নিকট থেকেও তিনি তাঁর জ্ঞানের সমৃদ্ধি ঘটান। যেমন: হযরত 'উছমান, তালহা, 'উবাদা ইবন আস-সামিত, আবু কাতাদা, আবুদ দারদা', উসামা ইবন যায়দ, হাসান ইবন ছাবিত, রাফি' ইবন খাদীজ, ছাওবান, নাফি' ইবন আল-হারিছ, 'আবদুল্লাহ ইবন সালাম, আবূ হুরায়রা, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, আবু সা'ঈদ আল-খুদরী, আনাস ইবন মালিক, জাবির, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা সিদ্দীকা, উম্মু সালামা (রা) ও আরো অনেকে। উঁচুস্তরের বহু তাবি'ঈর নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। তাঁদের তালিকা অনেক দীর্ঘ।
উপরে উল্লেখিত মহান ব্যক্তিবর্গের অনুগ্রহ ও অবদান তাঁকে হাদীছের ইমামের পদে অধিষ্ঠিত করে। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন তাবি'ঈ ইমামদের অন্যতম, অসামান্য জ্ঞানের অধিকারী, বিশ্বস্ত 'আলিম ব্যক্তি।" ইবন সা'দ বলেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, সুদৃঢ়, ফকীহ ও বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী।” তিনি আবু সালামাকে মদীনার 'আলিমদের দ্বিতীয় স্তরে উল্লেখ করেছেন।
আবূ সালামার (রহ) স্মৃতির ভাণ্ডারে বহু হাদীছ থাকার কথা শ্রেষ্ঠ 'আলিমগণ স্বীকার করেছেন। ইমাম যুহরী (রহ) বলেন, ইবরাহীম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন কারিজ আমাকে বলতেন যে, তোমাদের মধ্যে দু'ব্যক্তির চেয়ে হাদীছের অন্য কোন বড় 'আলিম আমি দেখিনি। একজন 'উরওয়া ইবন যুবায়র এবং অন্যজন আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান। ইমাম যুহরী আরো বলেন: "আমি চার ব্যক্তিকে জ্ঞানের সাগর রূপে পেয়েছি। তাঁরা হলেন: 'উরওয়া ইবন যুবায়র, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, আবূ সালামা ও 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ।"
তাঁর ছাত্রবৃন্দ
তাঁর সুযোগ্য ছাত্রদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম উপস্থাপন করা হলো: ইমাম শা'বী, 'আবদুর রহমান আল-আ'রাজ, 'আররাক ইবন মালিক, 'আমর ইবন দীনার, আবূ হাযিম, আবূ সালামা ইবন দীনার, যুহরী, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, ইয়াহইয়া ইবন আবী কাছীর, মুহাম্মাদ ইবন 'আমর, সালিম আবুন্ নাদর, আবুয যানাদ, সা'দ ইবন ইবরাহীম আল-কাজী (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে আবূ সালামার স্থান এত উঁচুতে ছিল যে, অনেকে তাঁকে মদীনার সাত ফকীহর অন্যতম বলেছেন। ইবন সা'দ তাঁকে ফকীহ বলেছেন। এই উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে তিনি ফিক্হ্-এর জ্ঞান অর্জন করেন। সুযোগ্য শিক্ষকের যোগ্য ছাত্র হিসেবে গভীর অনুধ্যান ও সূক্ষ্ম অনুধাবন ক্ষমতা অর্জন করেন। বিভিন্ন মাসয়ালায় মহান শিক্ষকের সাথে যুক্তি-তর্কে অবতীর্ণ হতেন। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষককে নিজের মতে আনতে সক্ষম হন। ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন: "আবূ সালামা ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে ফিক্হ্-এর গভীর জ্ঞান অর্জন করেন, তাঁর সাথে যুক্তি-তর্কে অবতীর্ণ হতেন এবং তাঁকে তাঁর মত থেকে সরিয়ে নিজের মতে নিয়ে আসতেন।"
ইমাম যুহরী মনে করেন, ইবন 'আব্বাসের (রা) সাথে এই মতপার্থক্যের কারণে তিনি তাঁর অগাধ জ্ঞানের অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত থেকে গেছেন।
বিচারকের পদে
হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালে তৎকালীন মদীনার ওয়ালী সা'ঈদ ইবন আল-'আস তাঁকে মাদীনাতুর রাসূলের কাজীর পদে নিয়োগ দেন। কিন্তু পরবর্তীতে ওলট-পালটের কারণে এ পদে থাকতে পারেননি। সা'ঈদ ইবন আল-'আসের অপসারণ এবং তদস্থলে মারওয়ানের যোগদানের পর আবূ সালামাকে কাজীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।
ওফাত
খলীফা ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিকের খিলাফতকালে হিজরী ৯৪ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে ১০৪ হিজরীতে ৭২ বছর বয়সে তাঁর ইনতিকাল হয় বলে ভিন্ন একটি বর্ণনায় এসেছে। হযরত আবূ সালামা (রহ) ছিলেন একজন সুদর্শন চেহারার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের মানুষ। 'আবদুল্লাহ ইবন আবী ইয়া'কূব আদ-দাববী বলেন : আবূ সালামা ছিলেন দীপ্তিমান চেহারার মানুষ। তাঁর চেহারার সেই দীপ্তি ছিল রোমান সম্রাটদের স্বর্ণমুদ্রার দীপ্তির মত। শেষ জীবনে মাথার চুল ও দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং তাতে তিনি মেহদীর খিযাব লাগতেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২১/২৬৯; তাবি'ঈন-৫৩৪
২. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/১১৫; তাহযীব আল-কামাল-২১/২৬৯
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৩
৫. আত-তাবাকাত-৫/১১৬; তাহযীব আল-কামাল-২১২৭১
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/১১৬
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৩
৮. প্রাগুক্ত; তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪১
৯. আত-তাবাকাত-৫/১১৬
১০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৩
১১. তাহযীব আল-কামাল-২১/২৭২
১২. আত-তাবাকাত-৫/১১৫
১৩. তাহযীব আল-কামাল-২১/২৭২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৩