📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 কাসিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবূ বকর (রা)

📄 কাসিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবূ বকর (রা)


হযরত কাসিমের (রহ) ডাকনাম আবূ মুহাম্মাদ, মতান্তরে আবূ 'আবদির রহমান। তিনি হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) পুত্র মুহাম্মাদের (রহ) সন্তান। তাঁর মা 'সাওদা' ছিলেন 'উম্মু ওয়ালাদ'। 'উম্মু ওয়ালাদ'-এর শব্দগত অর্থ সন্তানের মা। ইসলামের পরিভাষায় যে দাসী মনিবের ঔরসজাত সন্তান জন্ম দেয় তাকে বলা হয় উম্মু ওয়ালাদ। এমন দাসীকে আর কোনভাবে হস্তান্তর করা যায় না। যাই হোক কাসিমের মা সাওদা দাসী হলেও তিনি ছিলেন বিশ্বের এক অভিজাত ঘরের কন্যা। যুদ্ধবন্দী হিসেবে তৎকালীন বিশ্বের রীতি অনুযায়ী দাসীতে পরিণত হন।

মাদায়েন বিজয়ের পর পারস্য সম্রাট ইয়াযদিগুরদ-এর তিন কন্যা মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন। তাদেরকে মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন না করে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। 'আলী (রা) তাঁদের তিনজনকে ক্রয় করেন এবং তিনজন মুসলিম যুবকের হাতে তাদের একজন করে তুলে দেন। একজনকে দেওয়া হয় রাসূলুল্লাহর (সা) দৌহিত্র আল-হুসাইন ইবন 'আলীকে এবং এখানে তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন যায়নুল 'আবিদীন; দ্বিতীয়জনকে লাভ করেন মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর (রা) এবং তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের আলোচ্য ব্যক্তি আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ। তৃতীয়জনকে লাভ করেন 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) এবং তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন সালিম ইবন 'আবল্লিাহ (রা)। ইয়াযদিগুরদের তিন কন্যার এ তিন সন্তান তাদের পরিণত বয়সে নৈতিকতা, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতায় সর্বজনমান্য ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

কাসিম জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতায় মদীনার মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গের অন্যতম ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে মদীনার মনীষীদের দ্বিতীয় তাবকায় (স্তর) উল্লেখ করেছেন।

ইয়াতীম অবস্থা এবং ফুফুর নিকট লালিত-পালিত
হযরত 'উছমানের (রা) বিরুদ্ধাচরণ ও শাহাদাতের ঘটনায় মুহাম্মাদ ইবন আবী বকরের (রা) নামটি ইসলামের ইতিহাসে বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। তিনি হযরত উছমানের (রা) প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন। এমনকি হযরত উছমানের (রা) হত্যাকারীদের মধ্যে তাঁর নামটিও উচ্চারিত হয়। 'উছমানের (রা) শাহাদাতের পর তিনি আলীর (রা) পক্ষ অবলম্বন করেন। হযরত 'আলী ও হযরত মু'আবিয়ার (রা) মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হয় তাতে মুহাম্মাদ 'আলীর (রা) একজন উদ্যমী সহযোগী হিসেবে তাঁর পাশে দাঁড়ান। হযরত 'আলী (রা) তাঁকে মিসরের ওয়ালী নিয়োগ করেন। যখন হযরত মু'আবিয়ার (রা) পক্ষ থেকে হযরত 'আমর ইবন আল-'আস (রা) মিসরে সামরিক অভিযান চালান তখন মুহাম্মাদ ইবন আবী বকর (রা) নিহত হন। কাসিম তখন অল্প বয়সী শিশু। এ কারণে তাঁর ফুফু উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা (রা) তাঁকে নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসেন এবং অত্যন্ত স্নেহ-মমতায় তাঁকে গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে হযরত কাসিম তাঁর শৈশবকালীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলতেন, আমাদের ফুফু-আম্মা 'আয়িশা (রা) 'আরাফার রাতে আমাদের মাথা ন্যাড়া করে দিতেন এবং মাথায় টুপি পরিয়ে মসজিদে পাঠিয়ে দিতেন। পরের দিন সকালে আমাদের পক্ষ থেকে কুরবানী করতেন। তিনি আরো বলতেন, ফুফু-আম্মা নিজ হাতে আমাকে ও আমার ছোট্ট বোনকে খাওয়াতেন। তবে আমাদের সাথে খেতেন না। আমরা খাওয়ার পর যা কিছু অবশিষ্ট থাকতো তাই খেতেন। মা যেমন অতি আদরে তার শিশু সন্তানকে দুধ পান করায় তেমনি তিনিও আমাদের আদর করে খাওয়াতেন। আমাদেরকে গোসল করাতেন, মাথায় চিরুনী করে পরিষ্কার সাদা কাপড় পরিয়ে দিতেন। ভালো কাজ কী তা শেখাতেন, ভালো কাজ করার জন্য উৎসাহিত করতেন ও প্রশিক্ষণ দিতেন। আর মন্দ কাজ কী তাও শেখাতেন এবং তা থেকে বিরত থাকার কথা বলতেন। আমি সন্তানের প্রতি তাঁর চেয়ে বেশি যত্নশীল, তাঁর চেয়ে বেশি স্নেহশীল কোন পিতা-মাতাকে কখনো দেখিনি।

তিনি তাঁর এই স্নেহশীল ফুফুকে আম্মা বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে যখন তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করতেন তখন বলতেন: আমার আম্মা আয়িশা (রা) আমাকে বলেছেন, অথবা আমার আম্মা 'আয়িশার (রা) নিকট শুনেছি। তিনি বলতেন, তাঁর চেয়ে সুন্দর করে কথা বলতে এবং তাঁর চেয়ে বিশুদ্ধ ও মিষ্টভাষী কোন পুরুষ বা নারীকে তাঁর আগে পরে কখনো আমি দেখিনি।

জ্ঞান ও মনীষা
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা (রা) এমন বিদুষী মহিলা ছিলেন যে, তাঁর একজন নগণ্যতম সেবকও জ্ঞান ও কর্মের উচ্চাসন অলঙ্কৃত করেছেন। কাসিম ছিলেন তাঁর অতি স্নেহের সন্তানতুল্য। তাঁর আদর-যত্নে লালিত-পালিত হয়ে তিনি 'ইল্ম ও 'আমল দু'সাগরের সংযোগস্থলে পরিণত হন। ইবন সা'দ লিখেছেন, তিনি উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন ফকীহ, ইমাম, শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ও আল্লাহ ভীরু মানুষ ছিলেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি একজন অতি উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন তাবি'ঈ। তাঁর বিশ্বস্ততা ও ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সকলে একমত।

তাফসীর
ইসলামী জ্ঞানের সকল শাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল। তবে আল্লাহর কালামের তাফসীরের ব্যাপারে ছিলেন খুবই সতর্ক। চরম সতর্কতার কারণে তিনি কুরআনের তাফসীর করতেন না। এ কারণে মুফাস্সির হিসেবে তেমন প্রসিদ্ধি লাভ করেননি।

হাদীছ
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) ব্যক্তি সত্তাটিই ছিল হাদীছের অন্যতম উৎসস্থল। হযরত কাসিম (রহ) এই উৎস থেকে প্রাণ ভরে পরিতৃপ্ত হন। তাছাড়া অন্য সাহাবায়ে কিরাম থেকেও হাদীছ শোনেন। যেমন : 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), আবূ হুরায়রা (রা) ও আরো অনেকে। তিনি নিজেই বলেন, আমি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট বসতাম, তাছাড়া আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) ও আবূ হুরায়রার (রা) নিকটও বসতাম। তাঁদের নিকট থেকে আমি সর্বাধিক উপকার লাভ করেছি। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) নিকট এমন জ্ঞান, খোদাভীরুতা এবং এমন দুর্লভ তথ্য ছিল যা আর কারো নিকট থেকে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। এ সকল ব্যক্তি ছাড়াও তিনি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার, মু'আবিয়া, 'আবদুল্লাহ ইবন খাব্বাব, রাফি' ইবন খাদীজ, আসলাম মাওলা 'উমার (রা) প্রমুখ মহান সাহাবীর নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। এ সকল মহান ব্যক্তিবর্গের কল্যাণে তিনি একজন বিশিষ্ট হাফিজে হাদীছে পরিণত হন। ইবন সা'দ তাকে কাসীরুল হাদীছ - বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী বলেছেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে হাফিজে হাদীছগণের ইমাম ও নেতা বলে উল্লেখ করেছেন। আবুয যানাদ বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে সুন্নাহর বড় 'আলিম কাউকে দেখিনি। তিনি বিশেষভাবে হযরত 'আয়িশার (রা) হাদীছের হাফিজ ছিলেন। খালিদ ইবন বাযযায় বলেন, 'আয়িশার (রা) হাদীছের তিনজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা হলেন কাসিম, 'উরওয়া ও 'আমর (রহ)।

তাঁর বর্ণনাসমূহের মান
মুহাদ্দিছগণ হযরত 'আয়িশা (রা) থেকে তাঁর বর্ণনাসমূহকে খাঁটি সোনার মত মনে করেছেন। ইবন মা'ঈন বলেন, "উবায়দুল্লাহ ইবন উমার আন কাসিম আন আইশা" সনদের এই ধারাটি খাঁটি সোনার শিকলের মত।

হাদীছের পঠন-পাঠন
প্রত্যেক রাতে ঈশার নামাযের পর তিনি এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এক সাথে হাদীছের পঠন-পাঠন করতেন। হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ছিলেন। বর্ণনার ক্ষেত্রে অর্থ নয়, বরং মূল শব্দে হাদীছ বর্ণনা জরুরী বলে মনে করতেন। এই সতর্কতার কারণে তিনি হাদীছ লেখা-লেখি পছন্দ করতেন না।
'আবদুল্লাহ ইবন 'আওন বলেন:
'আল-কাসিম, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন ও রাজা' ইবন হায়ওয়া হাদীছ (রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে উচ্চারিত) বর্ণ ও শব্দে বর্ণনা করতেন। অন্যদিকে হাসান আল-বাসরী, ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ ও আশ-শা'বী-(নিজেদের শব্দ ও বর্ণে) হাদীছের অর্থ ও ভাব বর্ণনা করতেন।

তাঁর ছাত্র-শিষ্য
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেক বড় বড় ইমাম ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন: 'আবদুর রহমান ইবন কাসিম, ইমাম শা'বী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার, সা'ঈদ আল-আনসারীর পুত্র ইয়াহইয়া, সা'ঈদ ইবন আবী মুলায়কা, নাফি' মাওলা ইবন 'উমার, ইমাম যুহরী, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার, আইউব, মালিক ইবন দীনার (রহ) প্রমুখ। তাঁর এ সকল প্রতিভাবান ছাত্র তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

ফিক্‌হ
ফিক্হ ছিল তাঁর বিশেষ অধীত বিষয়। এতে তিনি একজন ইমাম ও মুজতাহিদের মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর ফিক্হ বিষয়ে দক্ষতা ও উৎকর্ষতার সবচেয়ে বড় সনদ এই যে, তিনি ছিলেন মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহর একজন। ফিকহ্ জ্ঞানও তিনি অর্জন করেন ফুফু হযরত 'আয়িশা সিদ্দীকা, ইবন 'উমার ও ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে। তিনি বলতেন, আবূ বাকর ও 'উমারের (রা) সময়ে হযরত 'আয়িশা (রা) স্বতন্ত্রভাবে ফাতওয়া দিতেন এবং আমি তাঁর সাথে থাকতাম। সেই সময়ের সকল আলিম তাঁর ফিক্হ বিষয়ে গভীর জ্ঞানের কথা স্বীকার করেছেন। আবুয যানাদ বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে বড় কোন ফকীহকে দেখিনি। ইমাম মালিক (রহ) বলতেন, কাসিম এই উম্মাতের ফকীহগণের মধ্যে ছিলেন।

ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে সতর্কতা
ফিক্হ বিষয়ে এত জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছের মত ফাতওয়া দানে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। কোন বিষয়ে জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও সে বিষয়ে কথা বলা অথবা কোন মাসয়ালার জবাব দেওয়া খুবই খারাপ মনে করতেন। বলতেন, আল্লাহর ফরয হুকুমগুলো জানার পর কোন বিষয়ে জ্ঞান না থাকার পরও কথা বলার চেয়ে কোন মানুষের মূর্খ থাকা অনেক ভালো। কোন মাসয়ালা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান না থাকলে সোজা নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়ে দিতেন। একবার তাঁকে কোন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। শুধু স্পষ্ট ও সহজ প্রশ্নের জবাব দিতেন। যে সব মাসয়ালার জবাব নিজের মতের ভিত্তিতে দিতেন, তাতে স্পষ্ট বলে দিতেন যে, এটা আমার মত, এ কথা বলছিনা যে, এটাই সত্য।

দারসের আসর
হযরত কাসিমের (রহ) মদীনার মসজিদে নববীতে একটি হালকায়ে দারস বা পাঠদানের আসর ছিল। তাঁর ও সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা) একই আসর ছিল। তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র 'আবদুর রহমান এবং সালিমের ভাই 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) এই আসরে বসতেন, তাঁদের পরে এই স্থানে ইমাম মালিকের আসর বসতে থাকে। স্থানটি ছিল হযরত রাসূলে কারীমের (সা) কবর ও মিম্বারের মাঝামাঝি স্থানে হযরত 'উমারের (রা) সম্মুখে। কাসিম সকাল বেলায় দারস ও ইফতার এই স্থানে এসে দু'রাক'আত নামায আদায়ের পর আসরে বসে যেতেন। এ সময় মানুষের যা কিছু প্রশ্ন করার, করতো।

সমকালীনদের তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি
তাঁর সময়ের অনেক বড় বড় 'আলিম ও বিদগ্ধ ব্যক্তি তাঁর মনীষা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আনসারী বলতেন, আমরা মদীনায় এমন কোন ব্যক্তিকে পাইনি যাঁকে কাসিমের উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়। আবুয যানাদ বলতেন, কাসিম তাঁর যুগে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানের অধিকারী মানুষ ছিলেন, আইউব সাখতিয়ানী বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে উত্তম মানুষ আর দেখিনি।

বিনয় ও সমকালীন 'আলিমদের প্রতি সম্মান
জ্ঞানের এত উঁচু স্তরে অবস্থান করা সত্ত্বেও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের কোন অনুভূতিই তাঁর ছিল না। তিনি নিজের চেয়ে কম মর্যাদার সমকালীনদেরকেও ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর মুখ থেকে কখনো তাদের সম্পর্কে এমন কোন শব্দ বা বাক্য উচ্চারিত হতো না যাতে বিন্দুমাত্র তাদের অসম্মান হয়। এমন সতর্কতার কারণে তিনি কোন কোন স্থানে সঙ্কটজনক অবস্থায় পড়ে যেতেন। একবার একজন মরুচারী বেদুঈন তাঁকে প্রশ্ন করলো : আপনি বড় 'আলিম, না সালিম? এই প্রশ্নের জবাবদানে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যান। যদি প্রকৃত সত্য কথাটি বলে দিতেন তাহলে নিজের মুখে নিজের প্রশংসা হয়ে যেত, আর যদি বলতেন সালিম বড় 'আলিম তাহলে অসত্য কথা হয়ে যেত। এ কারণে প্রথমে সুবহানাল্লাহ পাঠ করে এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু বেদুঈন যখন আবার জিজ্ঞেস করলো তখন তিনি বললেন, সালিম আছেন, তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।

নৈতিক চরিত্র
হযরত কাসিমের (রহ) যে স্তরের 'ইল্ম ছিল, সেই স্তরের 'আমলও ছিল। তাঁর ব্যক্তি সত্তাটি ছিল সকল নৈতিক গুণাবলীর সমাবেশস্থল। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন পুরুষ হযরত আবূ বাকরের (রা) প্রতিরূপ ছিলেন। যুবায়র বলতেন, আমি আবূ বাকরের (রা) সন্তানদের মধ্যে এই কাসিমের চেয়ে বেশি তাঁর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কাউকে পাইনি।

হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) তাঁর অগাধ জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতার কথা অকপটে স্বীকার করতেন। তিনি বলতেন, খিলাফতের কর্তৃত্ব যদি কাসিমের হাতে থাকতো তাহলে কত না ভালো হতো। অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলতেন, খিলাফতের বিষয়টি যদি আমার এখতিয়ারে থাকতো তাহলে আমি কাসিমকে খলীফা বানাতাম। খলীফা 'উমারের (রহ) এ কথা তাঁর কানে পৌঁছলে তিনি বিস্ময়ের সাথে বলেন, আমি যখন আমার পরিবার চালাতে পারি না, সেখানে এই উম্মাতের দায়িত্ব পালন কেমন করে সম্ভব। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ ও লৌকিকতা বিবর্জিত। কাসিম ছিলেন স্বল্পভাষী চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) খলীফা হলেন, তখন মদীনাবাসীরা বললো, এবার কুমারী কাসিম কথা বলবেন।

খলীফা 'উমার ইবন 'আযীযের (রহ) সাথে আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদের অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। 'উমার তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। হিজরী ৮৬ সনে উমাইয়্যা খলীফা 'আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক খলীফা হন। তিনি হিজরী ৮৭ সনের ২৩ রাবিউল আউয়াল হিশাম ইবন ইসমা'ঈলকে মদীনার ওয়ালীর পদ থেকে অপসারণ করে তদস্থলে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে নিয়োগ দান করেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি মারওয়ান ভবনে ওঠেন। যুহরের নামাযের পর মদীনার তৎকালীন দশজন বিখ্যাত ফকীহ্ ও 'আলিমকে ডেকে পাঠান। তাঁরা হলেন : 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র, আবূ বাকর ইবন সুলায়মান ইবন আবী খায়ছামা, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাসউদ, আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান ইবন আল-হারিছ, সুলায়মান ইবন ইয়াসার, আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আমর, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমির ইবন রাবী'আ ও খারিজা ইবন যায়দ (রহ)। তাঁরা উপস্থিত হলে 'উমার তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণে নিম্নের কথাগুলো বলেন :
'আমি আপনাদেরকে এমন এক কাজের জন্য ডেকেছি যাতে আপনারা আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাবেন এবং সত্যের সহযোগী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবেন। আমি আপনাদের পরামর্শ ছাড়া কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাই না। এ কারণে আপনারা কেউ কারো উপর যুল্ম-অত্যাচার করছে এমন খবর পেলে আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে অবশ্যই অবহিত করবেন।'

তাঁর এ ভাষণ শোনার পর উপস্থিত ফকীহ্ 'আলিমগণ তাঁর মঙ্গল কামনা করতে করতে ফিরে যান। কাসিম ইবন মুহাম্মাদ 'উমারের ভাষণ শেষে মন্তব্য করেন : “আল-ইয়াওমা ইয়ানতিকু মান কা-না লা ইয়ানতিকু” 'যারা কথা বলতে পারতো না এখন তারা কথা বলতে পারবে।

মদীনার ওয়ালী থাকাকালে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যে অক্ষয় কীর্তিগুলো সম্পাদন করেন তার মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ। খলীফা 'আবদুল মালিক এ মসজিদ সম্প্রসারণ করে পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নেন, কিন্তু মদীনাবাসীদের অসহযোগিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়। খলীফা ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক এ ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং তিনি মসজিদটিকে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো ও শৈলীতে নির্মাণ করতে চান। দিমাশকের জামি' মসজিদ নির্মাণ শেষ করে তিনি হিজরী ৮৮ সনে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে লিখলেন, মসজিদে নববী নতুন করে নির্মাণ করতে হবে এবং এর আশে-পাশে আযওয়াজে মুতাহ্হারাত অর্থাৎ হযরত রাসূলে কারীমের (সা) পূতঃপবিত্র বেগমদের যে সকল হুজরা ও অন্যান্য বাড়ি-ঘর আছে অর্থের বিনিময়ে সেগুলো অধিগ্রহণ করে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খলীফার এ আদেশ বাস্তবায়ন করেন।

পত্র পেয়ে 'উমার মসজিদের আশে-পাশের বাড়ি-ঘরের মালিকদের ডেকে খলীফার পত্রটি পাঠ করে শোনান। তাঁরা অর্থের বিনিময়ে নিজেদের মালিকানা ছেড়ে দিতে রাজি হন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পুরাতন মসজিদ, উম্মাহাতুল মু'মিনীনের হুজরাসমূহ ও আশে-পাশের বাড়ি-ঘর ভাংতে আরম্ভ করেন। তখন এ কাজে তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান (রহ) সহ মদীনার বিশিষ্ট ফকীহগণ। তাঁরা সকলে উম্মাহাতুল মু'মিনীনের হুজরাসমূহ মসজিদের মধ্যে ঢুকিয়ে নতুন মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন।

তাকওয়া-পরহেজগারী
তাকওয়া-পরহেজগারীর দিক দিয়েও তিনি ছিলেন একজন শীর্ষস্থানীয় তাবি'ঈ। ইবন সা'দ তাঁকে একজন খোদাভীরু উত্তম তাবি'ঈ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ বলেছেন। ইবন হিব্বান তাঁকে নেতৃস্থানীয় তাবি'ঈ এবং তাঁর যুগের একজন উত্তম তাবি'ঈ বলে গণ্য করেছেন।

বার্ধক্যে ও হজ্জের সময় মিনায় পাথর মারার জন্য পায়ে হেঁটে যেতেন। রাবী'আ ইবন 'আবদির রহমান বলেন, কাসিম যখন অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তখন তিনি তাঁর অবস্থানস্থল থেকে বাহনের পিঠে চড়ে মিনা পর্যন্ত আসতেন। পরে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে পাথর মারার জন্য যেতেন। পাথর মেরে মসজিদ পর্যন্ত হেঁটে যেতেন। তারপর সেখান থেকে বাহনের পিঠে চড়ে অবস্থানস্থলে ফিরতেন।

ধন-সম্পদের প্রতি অমুখাপেক্ষী মনোভাব
পার্থিব ধন-সম্পদের প্রতি এতই উদাসীন ও মুখাপেক্ষীহীন ছিলেন যে, প্রিয়জনের কোন অনুগ্রহ-উপঢৌকনও গ্রহণ করতেন না। সুলায়মান ইবন কুতায়বা বলেন, একবার 'উমার ইবন 'উবায়দিল্লাহ আমার হাতে এক হাজার দীনার দিয়ে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) ও কাসিম ইবন মুহাম্মাদের নিকট পাঠান। ইবন 'উমার (রা) তাঁর অংশের দীনারগুলো গ্রহণ করেন এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এই বলে যে, 'উমার ইবন 'উবায়দ-আত্মীয়তার সম্পর্কের হক আদায় করেছেন। এ সময়ে এ অর্থের আমার খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কাসিম ইবন মুহাম্মাদ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এ কথা তাঁর বেগম সাহেবা জানতে পেরে বলেন, 'উমার ইবন 'উবায়দুল্লাহর সাথে আমাদের (স্বামী-স্ত্রী) দু'জনের সম্পর্ক সমান সমান। কাসিম যদি তাঁর চাচাতো ভাই হন, তাহলে আমিও তো তাঁর ফুফাতো বোন হই। তাঁর এ কথার পর আমি তাঁর হাতেই এ অর্থ তুলে দিই।

সত্যের স্বীকৃতি
এমন সত্যনিষ্ঠ ছিলেন যে, নিজের পিতার কোন ভুলকে তিনি ভুল বলে স্বীকার করতেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করতেন। পূর্বেই এসেছে যে, তাঁর পিতা মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর (রা) আমীরুল মু'মিনীন হযরত 'উছমানের (রা) ভীষণ বিরোধী ছিলেন এবং বিদ্রোহীদের সাথে খলীফার গৃহ অভ্যন্তরেও ঢুকে পড়েছিলেন। হযরত কাসিম (রহ) পিতার এ কাজকে একটা মারাত্মক ভুল বলে স্বীকার করতেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের নিকট দু'আ করতেন: হে আল্লাহ! 'উছমানের (রা) ব্যাপারে আমার পিতার অপরাধকে ক্ষমা করে দিন।

ওফাত
তাঁর মৃত্যুসন নিয়ে একটু মতপার্থক্য আছে। হিজরী ১০৬ থেকে ১১২ সনের মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন একথা নিশ্চিতভাবে জানা যায়। তখন তাঁর বয়স ৭০ অথবা ৭২ (সত্তর/বাহাত্তর) বছর। বার্ধক্যের ভারে জর্জরিত দেহ নিয়ে হজ্জের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বের হয়েছেন। বাহনের পিঠে চড়ে তালবিয়া পাঠ করতে করতে পথ চলছেন। সাথে বেগম সাহেবা আছেন, ছেলে বাহনটি হাঁকাচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাথায় তীব্র ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। এক সময় বুঝলেন তাঁর জীবনকাল শেষ হয়ে এসেছে। আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করলেন। তারপর কাগজ কলম নিয়ে একজনকে অসীয়াত লিখতে বললেন। লেখক তাঁর বলার আগেই লিখে ফেললেন, "কাসিম ইবন মুহাম্মাদ অসীয়াত করছেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।" কাসিম (রহ) এ লেখাটুকু শুনে বললেন, যদি আমি আজকের পূর্বে এই সাক্ষ্য না দিয়ে থাকি তাহলে আমি একজন দারুণ হতভাগ্য। তারপর তিনি বলেন:
"আমার ছেলে: আমি যখন মারা যাব তখন আমি যে কাপড় পরে সালাত আদায় করি তা দিয়েই আমার কাফন বানাবে। আর তা হলো আমার জামা, লুঙ্গি ও চাদর। এ ছিল তোমার দাদা আবূ বাকরের (রা) কাফন। তারপর তোমরা আমাকে আমার কবরে শুইয়ে মাটি চাপা দিয়ে পরিবার-পরিজনের নিকট চলে যাবে। খবরদার, আমার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এমন বলবে না যে, তিনি এমন ছিলেন, এমন ছিলেন। আসলে আমি কিছুই ছিলাম না।"

পুত্র একবার বললেন, আপনি কি দু'খানা নতুন কাপড় পছন্দ করেন না? বললেন, আবূ বাকরকেও তিন কাপড়ে কাফন পরানো হয়েছিল। তাছাড়া মৃতদের চেয়ে জীবিতদেরই নতুন কাপড়ের প্রয়োজন বেশি। এই অসীয়াতের পর তিনি মক্কা-মদীনার মাঝে "কুদাইদ” নামক স্থানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেখান থেকে তিন মাইল দূরে "মুশাল্লাল" নামক স্থানে কবর দেওয়া হয়। মৃত্যুকালে তিনি নগদ এক লাখ দিরহাম রেখে যান। তার মধ্যে একটি দিরহামও অবৈধ উপার্জনের ছিল না।

শেষ জীবনে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। দাড়ি ও মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাতে মেহেদীর খিজাব লাগাতেন। রূপোর আংটি পরতেন এবং তাতে নিজের নাম খোদাই করা ছিল। মার্জিত রঙ্গিন পোশাক পরতেন। জুব্বা, পাগড়ী, চাদর ও অন্যান্য কাপড় সাধারণত "খুষ” সূতার হতো। এ ছাড়া আরো দামী পোশাকও পরতেন। পাগড়ী কালো হতো। জাফরানী রং বেশি পছন্দ ছিল। তাছাড়া সবুজ রংও ব্যবহার করতেন।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৫/১৮৬
২. 'আসরুত তাবি'ঈন-৮১
৩. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৬
৪. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭৩
৫. আত-তাবাকাত-৫/১৪৩
৬. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৫৫
৭. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/১৩৩
১০. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৪; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৫৬
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪; তাবি'ঈন-৩৭৬
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
১৪. আত-তাবাকাত-৫/১৪০
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৮
১৬. প্রাগুক্ত-১৫/১৮৫; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৩
১৭. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৫; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭২
২০. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪
২১. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
২২. প্রাগুক্ত-১/১৪০
২৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪; তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৮; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭৩
২৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪
২৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৫; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৫৯
২৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৮৫
২৮. আল কামিল ফী আত-তারীখ-৪/৫২৬; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২১০; তাবি'ঈদের জীবনকথা-২/৩২৫-৩৬
২৯. আল-কামিল ফী আত-তারীখ-৪/৫৩২; তাবি'ঈদের জীবন কথা-২/৩৭-৩৮
৩০. আত-তাবাকাত-৫/১৪১
৩১. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৫
৩২. আত-তাবাকাত-৫/১৪১
৩৩. ইবন খাল্লিকান, ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪১৮
৩৪. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৫
৩৫. 'আসরুত তাবি'ঈন-৮২
৩৬. আত-তাবাকাত-৫/১৪৩
৩৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৫
৩৮. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৯

হযরত কাসিমের (রহ) ডাকনাম আবূ মুহাম্মাদ, মতান্তরে আবূ 'আবদির রহমান। তিনি হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) পুত্র মুহাম্মাদের (রহ) সন্তান। তাঁর মা 'সাওদা' ছিলেন 'উম্মু ওয়ালাদ'। 'উম্মু ওয়ালাদ'-এর শব্দগত অর্থ সন্তানের মা। ইসলামের পরিভাষায় যে দাসী মনিবের ঔরসজাত সন্তান জন্ম দেয় তাকে বলা হয় উম্মু ওয়ালাদ। এমন দাসীকে আর কোনভাবে হস্তান্তর করা যায় না। যাই হোক কাসিমের মা সাওদা দাসী হলেও তিনি ছিলেন বিশ্বের এক অভিজাত ঘরের কন্যা। যুদ্ধবন্দী হিসেবে তৎকালীন বিশ্বের রীতি অনুযায়ী দাসীতে পরিণত হন।

মাদায়েন বিজয়ের পর পারস্য সম্রাট ইয়াযদিগুরদ-এর তিন কন্যা মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন। তাদেরকে মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন না করে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। 'আলী (রা) তাঁদের তিনজনকে ক্রয় করেন এবং তিনজন মুসলিম যুবকের হাতে তাদের একজন করে তুলে দেন। একজনকে দেওয়া হয় রাসূলুল্লাহর (সা) দৌহিত্র আল-হুসাইন ইবন 'আলীকে এবং এখানে তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন যায়নুল 'আবিদীন; দ্বিতীয়জনকে লাভ করেন মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর (রা) এবং তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের আলোচ্য ব্যক্তি আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ। তৃতীয়জনকে লাভ করেন 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) এবং তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন সালিম ইবন 'আবল্লিাহ (রা)। ইয়াযদিগুরদের তিন কন্যার এ তিন সন্তান তাদের পরিণত বয়সে নৈতিকতা, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতায় সর্বজনমান্য ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

কাসিম জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতায় মদীনার মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গের অন্যতম ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে মদীনার মনীষীদের দ্বিতীয় তাবকায় (স্তর) উল্লেখ করেছেন।

ইয়াতীম অবস্থা এবং ফুফুর নিকট লালিত-পালিত
হযরত 'উছমানের (রা) বিরুদ্ধাচরণ ও শাহাদাতের ঘটনায় মুহাম্মাদ ইবন আবী বকরের (রা) নামটি ইসলামের ইতিহাসে বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। তিনি হযরত উছমানের (রা) প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন। এমনকি হযরত উছমানের (রা) হত্যাকারীদের মধ্যে তাঁর নামটিও উচ্চারিত হয়। 'উছমানের (রা) শাহাদাতের পর তিনি আলীর (রা) পক্ষ অবলম্বন করেন। হযরত 'আলী ও হযরত মু'আবিয়ার (রা) মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হয় তাতে মুহাম্মাদ 'আলীর (রা) একজন উদ্যমী সহযোগী হিসেবে তাঁর পাশে দাঁড়ান। হযরত 'আলী (রা) তাঁকে মিসরের ওয়ালী নিয়োগ করেন। যখন হযরত মু'আবিয়ার (রা) পক্ষ থেকে হযরত 'আমর ইবন আল-'আস (রা) মিসরে সামরিক অভিযান চালান তখন মুহাম্মাদ ইবন আবী বকর (রা) নিহত হন। কাসিম তখন অল্প বয়সী শিশু। এ কারণে তাঁর ফুফু উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা (রা) তাঁকে নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসেন এবং অত্যন্ত স্নেহ-মমতায় তাঁকে গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে হযরত কাসিম তাঁর শৈশবকালীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলতেন, আমাদের ফুফু-আম্মা 'আয়িশা (রা) 'আরাফার রাতে আমাদের মাথা ন্যাড়া করে দিতেন এবং মাথায় টুপি পরিয়ে মসজিদে পাঠিয়ে দিতেন। পরের দিন সকালে আমাদের পক্ষ থেকে কুরবানী করতেন। তিনি আরো বলতেন, ফুফু-আম্মা নিজ হাতে আমাকে ও আমার ছোট্ট বোনকে খাওয়াতেন। তবে আমাদের সাথে খেতেন না। আমরা খাওয়ার পর যা কিছু অবশিষ্ট থাকতো তাই খেতেন। মা যেমন অতি আদরে তার শিশু সন্তানকে দুধ পান করায় তেমনি তিনিও আমাদের আদর করে খাওয়াতেন। আমাদেরকে গোসল করাতেন, মাথায় চিরুনী করে পরিষ্কার সাদা কাপড় পরিয়ে দিতেন। ভালো কাজ কী তা শেখাতেন, ভালো কাজ করার জন্য উৎসাহিত করতেন ও প্রশিক্ষণ দিতেন। আর মন্দ কাজ কী তাও শেখাতেন এবং তা থেকে বিরত থাকার কথা বলতেন। আমি সন্তানের প্রতি তাঁর চেয়ে বেশি যত্নশীল, তাঁর চেয়ে বেশি স্নেহশীল কোন পিতা-মাতাকে কখনো দেখিনি।

তিনি তাঁর এই স্নেহশীল ফুফুকে আম্মা বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে যখন তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করতেন তখন বলতেন: আমার আম্মা আয়িশা (রা) আমাকে বলেছেন, অথবা আমার আম্মা 'আয়িশার (রা) নিকট শুনেছি। তিনি বলতেন, তাঁর চেয়ে সুন্দর করে কথা বলতে এবং তাঁর চেয়ে বিশুদ্ধ ও মিষ্টভাষী কোন পুরুষ বা নারীকে তাঁর আগে পরে কখনো আমি দেখিনি।

জ্ঞান ও মনীষা
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা (রা) এমন বিদুষী মহিলা ছিলেন যে, তাঁর একজন নগণ্যতম সেবকও জ্ঞান ও কর্মের উচ্চাসন অলঙ্কৃত করেছেন। কাসিম ছিলেন তাঁর অতি স্নেহের সন্তানতুল্য। তাঁর আদর-যত্নে লালিত-পালিত হয়ে তিনি 'ইল্ম ও 'আমল দু'সাগরের সংযোগস্থলে পরিণত হন। ইবন সা'দ লিখেছেন, তিনি উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন ফকীহ, ইমাম, শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ও আল্লাহ ভীরু মানুষ ছিলেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি একজন অতি উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন তাবি'ঈ। তাঁর বিশ্বস্ততা ও ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সকলে একমত।

তাফসীর
ইসলামী জ্ঞানের সকল শাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল। তবে আল্লাহর কালামের তাফসীরের ব্যাপারে ছিলেন খুবই সতর্ক। চরম সতর্কতার কারণে তিনি কুরআনের তাফসীর করতেন না। এ কারণে মুফাস্সির হিসেবে তেমন প্রসিদ্ধি লাভ করেননি।

হাদীছ
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) ব্যক্তি সত্তাটিই ছিল হাদীছের অন্যতম উৎসস্থল। হযরত কাসিম (রহ) এই উৎস থেকে প্রাণ ভরে পরিতৃপ্ত হন। তাছাড়া অন্য সাহাবায়ে কিরাম থেকেও হাদীছ শোনেন। যেমন : 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), আবূ হুরায়রা (রা) ও আরো অনেকে। তিনি নিজেই বলেন, আমি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট বসতাম, তাছাড়া আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) ও আবূ হুরায়রার (রা) নিকটও বসতাম। তাঁদের নিকট থেকে আমি সর্বাধিক উপকার লাভ করেছি। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) নিকট এমন জ্ঞান, খোদাভীরুতা এবং এমন দুর্লভ তথ্য ছিল যা আর কারো নিকট থেকে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। এ সকল ব্যক্তি ছাড়াও তিনি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার, মু'আবিয়া, 'আবদুল্লাহ ইবন খাব্বাব, রাফি' ইবন খাদীজ, আসলাম মাওলা 'উমার (রা) প্রমুখ মহান সাহাবীর নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। এ সকল মহান ব্যক্তিবর্গের কল্যাণে তিনি একজন বিশিষ্ট হাফিজে হাদীছে পরিণত হন। ইবন সা'দ তাকে কাসীরুল হাদীছ - বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী বলেছেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে হাফিজে হাদীছগণের ইমাম ও নেতা বলে উল্লেখ করেছেন। আবুয যানাদ বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে সুন্নাহর বড় 'আলিম কাউকে দেখিনি। তিনি বিশেষভাবে হযরত 'আয়িশার (রা) হাদীছের হাফিজ ছিলেন। খালিদ ইবন বাযযায় বলেন, 'আয়িশার (রা) হাদীছের তিনজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা হলেন কাসিম, 'উরওয়া ও 'আমর (রহ)।

তাঁর বর্ণনাসমূহের মান
মুহাদ্দিছগণ হযরত 'আয়িশা (রা) থেকে তাঁর বর্ণনাসমূহকে খাঁটি সোনার মত মনে করেছেন। ইবন মা'ঈন বলেন, "উবায়দুল্লাহ ইবন উমার আন কাসিম আন আইশা" সনদের এই ধারাটি খাঁটি সোনার শিকলের মত।

হাদীছের পঠন-পাঠন
প্রত্যেক রাতে ঈশার নামাযের পর তিনি এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এক সাথে হাদীছের পঠন-পাঠন করতেন। হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ছিলেন। বর্ণনার ক্ষেত্রে অর্থ নয়, বরং মূল শব্দে হাদীছ বর্ণনা জরুরী বলে মনে করতেন। এই সতর্কতার কারণে তিনি হাদীছ লেখা-লেখি পছন্দ করতেন না।
'আবদুল্লাহ ইবন 'আওন বলেন:
'আল-কাসিম, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন ও রাজা' ইবন হায়ওয়া হাদীছ (রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে উচ্চারিত) বর্ণ ও শব্দে বর্ণনা করতেন। অন্যদিকে হাসান আল-বাসরী, ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ ও আশ-শা'বী-(নিজেদের শব্দ ও বর্ণে) হাদীছের অর্থ ও ভাব বর্ণনা করতেন।

তাঁর ছাত্র-শিষ্য
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেক বড় বড় ইমাম ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন: 'আবদুর রহমান ইবন কাসিম, ইমাম শা'বী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার, সা'ঈদ আল-আনসারীর পুত্র ইয়াহইয়া, সা'ঈদ ইবন আবী মুলায়কা, নাফি' মাওলা ইবন 'উমার, ইমাম যুহরী, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার, আইউব, মালিক ইবন দীনার (রহ) প্রমুখ। তাঁর এ সকল প্রতিভাবান ছাত্র তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

ফিক্‌হ
ফিক্হ ছিল তাঁর বিশেষ অধীত বিষয়। এতে তিনি একজন ইমাম ও মুজতাহিদের মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর ফিক্হ বিষয়ে দক্ষতা ও উৎকর্ষতার সবচেয়ে বড় সনদ এই যে, তিনি ছিলেন মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহর একজন। ফিকহ্ জ্ঞানও তিনি অর্জন করেন ফুফু হযরত 'আয়িশা সিদ্দীকা, ইবন 'উমার ও ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে। তিনি বলতেন, আবূ বাকর ও 'উমারের (রা) সময়ে হযরত 'আয়িশা (রা) স্বতন্ত্রভাবে ফাতওয়া দিতেন এবং আমি তাঁর সাথে থাকতাম। সেই সময়ের সকল আলিম তাঁর ফিক্হ বিষয়ে গভীর জ্ঞানের কথা স্বীকার করেছেন। আবুয যানাদ বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে বড় কোন ফকীহকে দেখিনি। ইমাম মালিক (রহ) বলতেন, কাসিম এই উম্মাতের ফকীহগণের মধ্যে ছিলেন।

ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে সতর্কতা
ফিক্হ বিষয়ে এত জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছের মত ফাতওয়া দানে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। কোন বিষয়ে জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও সে বিষয়ে কথা বলা অথবা কোন মাসয়ালার জবাব দেওয়া খুবই খারাপ মনে করতেন। বলতেন, আল্লাহর ফরয হুকুমগুলো জানার পর কোন বিষয়ে জ্ঞান না থাকার পরও কথা বলার চেয়ে কোন মানুষের মূর্খ থাকা অনেক ভালো। কোন মাসয়ালা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান না থাকলে সোজা নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়ে দিতেন। একবার তাঁকে কোন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। শুধু স্পষ্ট ও সহজ প্রশ্নের জবাব দিতেন। যে সব মাসয়ালার জবাব নিজের মতের ভিত্তিতে দিতেন, তাতে স্পষ্ট বলে দিতেন যে, এটা আমার মত, এ কথা বলছিনা যে, এটাই সত্য।

দারসের আসর
হযরত কাসিমের (রহ) মদীনার মসজিদে নববীতে একটি হালকায়ে দারস বা পাঠদানের আসর ছিল। তাঁর ও সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা) একই আসর ছিল। তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র 'আবদুর রহমান এবং সালিমের ভাই 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) এই আসরে বসতেন, তাঁদের পরে এই স্থানে ইমাম মালিকের আসর বসতে থাকে। স্থানটি ছিল হযরত রাসূলে কারীমের (সা) কবর ও মিম্বারের মাঝামাঝি স্থানে হযরত 'উমারের (রা) সম্মুখে। কাসিম সকাল বেলায় দারস ও ইফতার এই স্থানে এসে দু'রাক'আত নামায আদায়ের পর আসরে বসে যেতেন। এ সময় মানুষের যা কিছু প্রশ্ন করার, করতো।

সমকালীনদের তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি
তাঁর সময়ের অনেক বড় বড় 'আলিম ও বিদগ্ধ ব্যক্তি তাঁর মনীষা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আনসারী বলতেন, আমরা মদীনায় এমন কোন ব্যক্তিকে পাইনি যাঁকে কাসিমের উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়। আবুয যানাদ বলতেন, কাসিম তাঁর যুগে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানের অধিকারী মানুষ ছিলেন, আইউব সাখতিয়ানী বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে উত্তম মানুষ আর দেখিনি।

বিনয় ও সমকালীন 'আলিমদের প্রতি সম্মান
জ্ঞানের এত উঁচু স্তরে অবস্থান করা সত্ত্বেও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের কোন অনুভূতিই তাঁর ছিল না। তিনি নিজের চেয়ে কম মর্যাদার সমকালীনদেরকেও ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর মুখ থেকে কখনো তাদের সম্পর্কে এমন কোন শব্দ বা বাক্য উচ্চারিত হতো না যাতে বিন্দুমাত্র তাদের অসম্মান হয়। এমন সতর্কতার কারণে তিনি কোন কোন স্থানে সঙ্কটজনক অবস্থায় পড়ে যেতেন। একবার একজন মরুচারী বেদুঈন তাঁকে প্রশ্ন করলো : আপনি বড় 'আলিম, না সালিম? এই প্রশ্নের জবাবদানে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যান। যদি প্রকৃত সত্য কথাটি বলে দিতেন তাহলে নিজের মুখে নিজের প্রশংসা হয়ে যেত, আর যদি বলতেন সালিম বড় 'আলিম তাহলে অসত্য কথা হয়ে যেত। এ কারণে প্রথমে সুবহানাল্লাহ পাঠ করে এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু বেদুঈন যখন আবার জিজ্ঞেস করলো তখন তিনি বললেন, সালিম আছেন, তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।

নৈতিক চরিত্র
হযরত কাসিমের (রহ) যে স্তরের 'ইল্ম ছিল, সেই স্তরের 'আমলও ছিল। তাঁর ব্যক্তি সত্তাটি ছিল সকল নৈতিক গুণাবলীর সমাবেশস্থল। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন পুরুষ হযরত আবূ বাকরের (রা) প্রতিরূপ ছিলেন। যুবায়র বলতেন, আমি আবূ বাকরের (রা) সন্তানদের মধ্যে এই কাসিমের চেয়ে বেশি তাঁর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কাউকে পাইনি।

হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) তাঁর অগাধ জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতার কথা অকপটে স্বীকার করতেন। তিনি বলতেন, খিলাফতের কর্তৃত্ব যদি কাসিমের হাতে থাকতো তাহলে কত না ভালো হতো। অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলতেন, খিলাফতের বিষয়টি যদি আমার এখতিয়ারে থাকতো তাহলে আমি কাসিমকে খলীফা বানাতাম। খলীফা 'উমারের (রহ) এ কথা তাঁর কানে পৌঁছলে তিনি বিস্ময়ের সাথে বলেন, আমি যখন আমার পরিবার চালাতে পারি না, সেখানে এই উম্মাতের দায়িত্ব পালন কেমন করে সম্ভব। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ ও লৌকিকতা বিবর্জিত। কাসিম ছিলেন স্বল্পভাষী চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) খলীফা হলেন, তখন মদীনাবাসীরা বললো, এবার কুমারী কাসিম কথা বলবেন।

খলীফা 'উমার ইবন 'আযীযের (রহ) সাথে আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদের অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। 'উমার তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। হিজরী ৮৬ সনে উমাইয়্যা খলীফা 'আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক খলীফা হন। তিনি হিজরী ৮৭ সনের ২৩ রাবিউল আউয়াল হিশাম ইবন ইসমা'ঈলকে মদীনার ওয়ালীর পদ থেকে অপসারণ করে তদস্থলে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে নিয়োগ দান করেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি মারওয়ান ভবনে ওঠেন। যুহরের নামাযের পর মদীনার তৎকালীন দশজন বিখ্যাত ফকীহ্ ও 'আলিমকে ডেকে পাঠান। তাঁরা হলেন : 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র, আবূ বাকর ইবন সুলায়মান ইবন আবী খায়ছামা, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাসউদ, আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান ইবন আল-হারিছ, সুলায়মান ইবন ইয়াসার, আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আমর, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমির ইবন রাবী'আ ও খারিজা ইবন যায়দ (রহ)। তাঁরা উপস্থিত হলে 'উমার তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণে নিম্নের কথাগুলো বলেন :
'আমি আপনাদেরকে এমন এক কাজের জন্য ডেকেছি যাতে আপনারা আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাবেন এবং সত্যের সহযোগী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবেন। আমি আপনাদের পরামর্শ ছাড়া কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাই না। এ কারণে আপনারা কেউ কারো উপর যুল্ম-অত্যাচার করছে এমন খবর পেলে আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে অবশ্যই অবহিত করবেন।'

তাঁর এ ভাষণ শোনার পর উপস্থিত ফকীহ্ 'আলিমগণ তাঁর মঙ্গল কামনা করতে করতে ফিরে যান। কাসিম ইবন মুহাম্মাদ 'উমারের ভাষণ শেষে মন্তব্য করেন : “আল-ইয়াওমা ইয়ানতিকু মান কা-না লা ইয়ানতিকু” 'যারা কথা বলতে পারতো না এখন তারা কথা বলতে পারবে।

মদীনার ওয়ালী থাকাকালে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যে অক্ষয় কীর্তিগুলো সম্পাদন করেন তার মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ। খলীফা 'আবদুল মালিক এ মসজিদ সম্প্রসারণ করে পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নেন, কিন্তু মদীনাবাসীদের অসহযোগিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়। খলীফা ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক এ ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং তিনি মসজিদটিকে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো ও শৈলীতে নির্মাণ করতে চান। দিমাশকের জামি' মসজিদ নির্মাণ শেষ করে তিনি হিজরী ৮৮ সনে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে লিখলেন, মসজিদে নববী নতুন করে নির্মাণ করতে হবে এবং এর আশে-পাশে আযওয়াজে মুতাহ্হারাত অর্থাৎ হযরত রাসূলে কারীমের (সা) পূতঃপবিত্র বেগমদের যে সকল হুজরা ও অন্যান্য বাড়ি-ঘর আছে অর্থের বিনিময়ে সেগুলো অধিগ্রহণ করে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খলীফার এ আদেশ বাস্তবায়ন করেন।

পত্র পেয়ে 'উমার মসজিদের আশে-পাশের বাড়ি-ঘরের মালিকদের ডেকে খলীফার পত্রটি পাঠ করে শোনান। তাঁরা অর্থের বিনিময়ে নিজেদের মালিকানা ছেড়ে দিতে রাজি হন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পুরাতন মসজিদ, উম্মাহাতুল মু'মিনীনের হুজরাসমূহ ও আশে-পাশের বাড়ি-ঘর ভাংতে আরম্ভ করেন। তখন এ কাজে তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান (রহ) সহ মদীনার বিশিষ্ট ফকীহগণ। তাঁরা সকলে উম্মাহাতুল মু'মিনীনের হুজরাসমূহ মসজিদের মধ্যে ঢুকিয়ে নতুন মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন।

তাকওয়া-পরহেজগারী
তাকওয়া-পরহেজগারীর দিক দিয়েও তিনি ছিলেন একজন শীর্ষস্থানীয় তাবি'ঈ। ইবন সা'দ তাঁকে একজন খোদাভীরু উত্তম তাবি'ঈ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ বলেছেন। ইবন হিব্বান তাঁকে নেতৃস্থানীয় তাবি'ঈ এবং তাঁর যুগের একজন উত্তম তাবি'ঈ বলে গণ্য করেছেন।

বার্ধক্যে ও হজ্জের সময় মিনায় পাথর মারার জন্য পায়ে হেঁটে যেতেন। রাবী'আ ইবন 'আবদির রহমান বলেন, কাসিম যখন অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তখন তিনি তাঁর অবস্থানস্থল থেকে বাহনের পিঠে চড়ে মিনা পর্যন্ত আসতেন। পরে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে পাথর মারার জন্য যেতেন। পাথর মেরে মসজিদ পর্যন্ত হেঁটে যেতেন। তারপর সেখান থেকে বাহনের পিঠে চড়ে অবস্থানস্থলে ফিরতেন।

ধন-সম্পদের প্রতি অমুখাপেক্ষী মনোভাব
পার্থিব ধন-সম্পদের প্রতি এতই উদাসীন ও মুখাপেক্ষীহীন ছিলেন যে, প্রিয়জনের কোন অনুগ্রহ-উপঢৌকনও গ্রহণ করতেন না। সুলায়মান ইবন কুতায়বা বলেন, একবার 'উমার ইবন 'উবায়দিল্লাহ আমার হাতে এক হাজার দীনার দিয়ে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) ও কাসিম ইবন মুহাম্মাদের নিকট পাঠান। ইবন 'উমার (রা) তাঁর অংশের দীনারগুলো গ্রহণ করেন এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এই বলে যে, 'উমার ইবন 'উবায়দ-আত্মীয়তার সম্পর্কের হক আদায় করেছেন। এ সময়ে এ অর্থের আমার খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কাসিম ইবন মুহাম্মাদ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এ কথা তাঁর বেগম সাহেবা জানতে পেরে বলেন, 'উমার ইবন 'উবায়দুল্লাহর সাথে আমাদের (স্বামী-স্ত্রী) দু'জনের সম্পর্ক সমান সমান। কাসিম যদি তাঁর চাচাতো ভাই হন, তাহলে আমিও তো তাঁর ফুফাতো বোন হই। তাঁর এ কথার পর আমি তাঁর হাতেই এ অর্থ তুলে দিই।

সত্যের স্বীকৃতি
এমন সত্যনিষ্ঠ ছিলেন যে, নিজের পিতার কোন ভুলকে তিনি ভুল বলে স্বীকার করতেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করতেন। পূর্বেই এসেছে যে, তাঁর পিতা মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর (রা) আমীরুল মু'মিনীন হযরত 'উছমানের (রা) ভীষণ বিরোধী ছিলেন এবং বিদ্রোহীদের সাথে খলীফার গৃহ অভ্যন্তরেও ঢুকে পড়েছিলেন। হযরত কাসিম (রহ) পিতার এ কাজকে একটা মারাত্মক ভুল বলে স্বীকার করতেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের নিকট দু'আ করতেন: হে আল্লাহ! 'উছমানের (রা) ব্যাপারে আমার পিতার অপরাধকে ক্ষমা করে দিন।

ওফাত
তাঁর মৃত্যুসন নিয়ে একটু মতপার্থক্য আছে। হিজরী ১০৬ থেকে ১১২ সনের মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন একথা নিশ্চিতভাবে জানা যায়। তখন তাঁর বয়স ৭০ অথবা ৭২ (সত্তর/বাহাত্তর) বছর। বার্ধক্যের ভারে জর্জরিত দেহ নিয়ে হজ্জের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বের হয়েছেন। বাহনের পিঠে চড়ে তালবিয়া পাঠ করতে করতে পথ চলছেন। সাথে বেগম সাহেবা আছেন, ছেলে বাহনটি হাঁকাচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাথায় তীব্র ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। এক সময় বুঝলেন তাঁর জীবনকাল শেষ হয়ে এসেছে। আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করলেন। তারপর কাগজ কলম নিয়ে একজনকে অসীয়াত লিখতে বললেন। লেখক তাঁর বলার আগেই লিখে ফেললেন, "কাসিম ইবন মুহাম্মাদ অসীয়াত করছেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।" কাসিম (রহ) এ লেখাটুকু শুনে বললেন, যদি আমি আজকের পূর্বে এই সাক্ষ্য না দিয়ে থাকি তাহলে আমি একজন দারুণ হতভাগ্য। তারপর তিনি বলেন:
"আমার ছেলে: আমি যখন মারা যাব তখন আমি যে কাপড় পরে সালাত আদায় করি তা দিয়েই আমার কাফন বানাবে। আর তা হলো আমার জামা, লুঙ্গি ও চাদর। এ ছিল তোমার দাদা আবূ বাকরের (রা) কাফন। তারপর তোমরা আমাকে আমার কবরে শুইয়ে মাটি চাপা দিয়ে পরিবার-পরিজনের নিকট চলে যাবে। খবরদার, আমার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এমন বলবে না যে, তিনি এমন ছিলেন, এমন ছিলেন। আসলে আমি কিছুই ছিলাম না।"

পুত্র একবার বললেন, আপনি কি দু'খানা নতুন কাপড় পছন্দ করেন না? বললেন, আবূ বাকরকেও তিন কাপড়ে কাফন পরানো হয়েছিল। তাছাড়া মৃতদের চেয়ে জীবিতদেরই নতুন কাপড়ের প্রয়োজন বেশি। এই অসীয়াতের পর তিনি মক্কা-মদীনার মাঝে "কুদাইদ” নামক স্থানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেখান থেকে তিন মাইল দূরে "মুশাল্লাল" নামক স্থানে কবর দেওয়া হয়। মৃত্যুকালে তিনি নগদ এক লাখ দিরহাম রেখে যান। তার মধ্যে একটি দিরহামও অবৈধ উপার্জনের ছিল না।

শেষ জীবনে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। দাড়ি ও মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাতে মেহেদীর খিজাব লাগাতেন। রূপোর আংটি পরতেন এবং তাতে নিজের নাম খোদাই করা ছিল। মার্জিত রঙ্গিন পোশাক পরতেন। জুব্বা, পাগড়ী, চাদর ও অন্যান্য কাপড় সাধারণত "খুষ” সূতার হতো। এ ছাড়া আরো দামী পোশাকও পরতেন। পাগড়ী কালো হতো। জাফরানী রং বেশি পছন্দ ছিল। তাছাড়া সবুজ রংও ব্যবহার করতেন।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৫/১৮৬
২. 'আসরুত তাবি'ঈন-৮১
৩. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৬
৪. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭৩
৫. আত-তাবাকাত-৫/১৪৩
৬. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৫৫
৭. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/১৩৩
১০. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৪; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৫৬
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪; তাবি'ঈন-৩৭৬
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
১৪. আত-তাবাকাত-৫/১৪০
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৮
১৬. প্রাগুক্ত-১৫/১৮৫; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৩
১৭. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৫; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭২
২০. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪
২১. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
২২. প্রাগুক্ত-১/১৪০
২৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪; তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৮; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭৩
২৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪
২৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৫; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৫৯
২৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৮৫
২৮. আল কামিল ফী আত-তারীখ-৪/৫২৬; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২১০; তাবি'ঈদের জীবনকথা-২/৩২৫-৩৬
২৯. আল-কামিল ফী আত-তারীখ-৪/৫৩২; তাবি'ঈদের জীবন কথা-২/৩৭-৩৮
৩০. আত-তাবাকাত-৫/১৪১
৩১. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৫
৩২. আত-তাবাকাত-৫/১৪১
৩৩. ইবন খাল্লিকান, ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪১৮
৩৪. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৫
৩৫. 'আসরুত তাবি'ঈন-৮২
৩৬. আত-তাবাকাত-৫/১৪৩
৩৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৫
৩৮. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৯

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ইয়াহইয়া ইবন ইয়া‘মার আল-বাসরী (রহ)

📄 ইয়াহইয়া ইবন ইয়া‘মার আল-বাসরী (রহ)


ইয়াহইয়া (রহ) তাবি'ঈদের মধ্যবর্তী স্তরের মানুষ। ইমাম আয-যাহাবীর মতে এই স্তরের পুরোধা হলেন প্রখ্যাত মনীষী হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ)। ইয়াহইয়ার ডাকনাম আবূ সুলায়মান, মতান্তরে আবূ 'আদী ও আবূ সা'ঈদ। বসরার অধিবাসী এবং 'আদওয়ান গোত্রের সন্তান।

জ্ঞান ও মনীষা
কুরআন, হাদীছ, ফিক্স, ভাষা ও সাহিত্যের বিশাল জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। কুরআনের একজন বিশিষ্ট 'আলিম ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে কুরআন বিশেষজ্ঞ বলে উল্লেখ করেছেন।

হাদীছ
তিনি হাদীছের হাফিজ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে হাফিজ ও লেখক তাবি'ঈদের তৃতীয় তাবকায় (স্তরে) তাঁর জীবনী সন্নিবেশ করেছেন। সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে হযরত 'উছমান, 'আলী, 'আম্মার ইবন ইয়াসির, আবু যার আল-গিফারী, আবূ হুরায়রা, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, সুলায়মান ইবন সুরাদ, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা), জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, নু'মান ইবন বাশীর (রা) প্রমুখের মত উঁচু স্তরের মনীষীদের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম আবূ দাউদ বলেন, তিনি হযরত আয়িশা (রা) থেকে হাদীছ শোনেননি। তাই ইমাম আয়- যাহাবী (রহ) ইমাম আবূ দাউদের নিকট প্রশ্ন রেখেছেন। "ফামা য্যন্নু বিল্লাযীনা ক্বাবলাহা?" - 'আয়িশার (রা) পূর্ববর্তী যাঁরা তাঁদের সম্পর্কে ধারণা কি? অর্থাৎ 'উছমান, 'আলী (রা), যাঁরা 'আয়িশার (রা) বহু পূর্বে ইনতিকাল করেছেন তাঁদের নিকট থেকেও কি ইয়াহইয়া শোনেননি?

ইয়াহইয়া ইবন 'আকীল, সুলায়মান আত-তায়মী, 'আবদুল্লাহ ইবন বুরায়দা, কাতাদা মাওলা ইবন 'আব্বাস (রা), 'আতা' আল-খুরাসানী, রাকীন ইবন রুবা'য়, 'আবদুল্লাহ ইবন কুলাইব সাদৃসী, আযরাক ইবন কায়স, ইসহাক ইবন সুওয়াইদ, আবুল মুনীব 'উবাইদুল্লাহ, 'উমার ইবন 'আতা' ইবন আবিল খাওলা (রহ) প্রমুখ ব্যক্তি তাঁর খ্যাতিমান ছাত্র। তাঁরা সকলে তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

ফিকহ্
ফিক্হ্ বিষয়েও তিনি পারদর্শী ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে একজন ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতার বড় প্রমাণ হলো তিনি মারব-এর কাজীর পদ অলঙ্কৃত করেন।

ভাষা, সাহিত্য ও অলঙ্কার শাস্ত্র
নিছক ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা-সাহিত্যেও তিনি বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আরবী ব্যাকরণের "নাহু” ও আরবী ভাষায় ছিল তাঁর বিশাল পাণ্ডিত্য। নাহুর জ্ঞান তিনি অর্জন করেন এই শাস্ত্রের উদ্ভাবক আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ায়লীর নিকট থেকে। ভাষায় তাঁর প্রচণ্ড দখল ছিল। তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের বিশুদ্ধ ভাষী ও অলঙ্কারশাস্ত্রবিদ। 'আবদুল মালিক ইবন 'উমাইর বলেন: "বিশুদ্ধভাষী মানুষ তিনজন : মূসা ইবন তালহা, ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার ও কাবীসা ইবন জবির।" ইবন হিব্বান তাঁর 'আছ-ছিকাত' গ্রন্থে বলেন: 'তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম বিশুদ্ধভাষী এবং ভাষা জ্ঞানে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি। আর সেই সাথে ছিল তাঁর মধ্যে দারুণ আল্লাহ-ভীতি।'

হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ তাঁকে বসরা থেকে বের করে দিলে কুতায়বা ইবন মুসলিম স্বাগতম জানান এবং খুরাসানের রাজধানী "মারব"-এর কাজী নিয়োগ করেন। সেখানে আদালত ভবন ছিল এবং এজলাসও বসতো। তা সত্ত্বেও তিনি বিচার প্রার্থীদের সুবিধার জন্য পথে-ঘাটে চলতে-ফিরতে মানুষের সাধারণ ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করে দিতেন। মূসা ইবন ইয়াসার বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মারকে বাজারে, রাস্তা-গলিতে মানুষের ঝগড়া-বিবাদের ফয়সালা করতে দেখেছি। অনেক সময় এমনও হতো যে, তিনি বাহনের পিঠে কোথাও যাচ্ছেন, তখন বাদী-বিবাদী এসে সামনে দাঁড়াতো। তিনি থেমে তাদের বক্তব্য শুনে ফয়সালা করে দিতেন।

একটি অক্ষয় কীর্তি
তাঁর জীবনের একটি অক্ষয় কীর্তি যা কিয়ামাত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে তা হলো আল-কুরআনের বর্ণমালায় "নুকতা” প্রদান করা। উল্লেখ্য যে, এর পূর্বে আরবী বর্ণমালার কোন বর্ণে "নুকতা” ছিল না। সাধারণ মানুষ ও অনারবদের কুরআন পাঠ সহজীকরণের জন্য ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার সর্বপ্রথম আল-কুরআনের সমআকৃতির বর্ণমালায় "নুকতা” লাগিয়ে পার্থক্য সূচিত করেন। হারুন ইবন মূসা বলেন : 'ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার প্রথম ব্যক্তি যিনি মাসহাফে নুকতা প্রদান করেন।'

আহলি বায়তের সাথে সম্পর্ক
আহলি বায়ত তথা হযরত রাসূলে কারীমের (সা) বংশধরদের প্রতি গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। কোন রকম বাছ-বিছার ছাড়াই তাঁদেরকে অন্য সকলের উপর প্রাধান্য দিতেন। তবে কাউকে হেয় ও তুচ্ছ মনে করতেন না। একবার হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ তাঁকে বলেন, আপনি বিশ্বাস করেন হাসান ও হুসায়ন (রা) রাসূলুল্লাহর বংশধর। আপনাকে হয় এ বিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে, নতুবা প্রমাণ পেশ করতে হবে। তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন: "তাঁর (ইবরাহীম) বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আইউব, ইউসুফ, মূসা ও হারূনকেও (দান করি)। আর এভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করি এবং যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, 'ঈসা এবং ইলইয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। তারা সকলে সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত।” তারপর বলেন, এই আয়াতে 'ঈসাকে ইবরাহীমের বংশধর বলা হয়েছে। সময়ের এত দীর্ঘ ব্যবধান সত্ত্বেও কেবল মাতৃকূলের সম্পর্কের কারণে যদি 'ঈসা (আ) ইবরাহীমের বংশধর হতে পারেন তাহলে হাসান ও হুসায়ন (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) দৌহিত্র হয়ে তাঁর বংশধর হতে বাধা কোথায়? তাঁর এ যুক্তিতে হাজ্জাজ সন্তুষ্ট হন।

হিজরী ১১৯, মতান্তরে ১২০ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে খলীফা ইবন খায়্যাত তাঁর তারীখে হিজরী ৮০ সনের পরে এবং ৯০ সনের আগে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের সাথে ইয়াহইয়ার জীবনী আলোচনা করেছেন।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭১; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৩
২. তাবাকাত ইবন সা'দ-৭/১০১
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭১
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩২৫; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৪
৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩২৫; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৪
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫; তাবাকাত-৭/১০১
৮. প্রাগুক্ত
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩০৫
১০. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৬
১১. তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৫
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাবাকাত ইবন সা'দ-৭/১০১
十四. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫
十五. সূরা আল-আন'আম-৮৪-৮৫
১৬. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৬
১৭. তাবি'ঈন-৫১৪
十八. তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৫

ইয়াহইয়া (রহ) তাবি'ঈদের মধ্যবর্তী স্তরের মানুষ। ইমাম আয-যাহাবীর মতে এই স্তরের পুরোধা হলেন প্রখ্যাত মনীষী হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ)। ইয়াহইয়ার ডাকনাম আবূ সুলায়মান, মতান্তরে আবূ 'আদী ও আবূ সা'ঈদ। বসরার অধিবাসী এবং 'আদওয়ান গোত্রের সন্তান।

জ্ঞান ও মনীষা
কুরআন, হাদীছ, ফিক্স, ভাষা ও সাহিত্যের বিশাল জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। কুরআনের একজন বিশিষ্ট 'আলিম ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে কুরআন বিশেষজ্ঞ বলে উল্লেখ করেছেন।

হাদীছ
তিনি হাদীছের হাফিজ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে হাফিজ ও লেখক তাবি'ঈদের তৃতীয় তাবকায় (স্তরে) তাঁর জীবনী সন্নিবেশ করেছেন। সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে হযরত 'উছমান, 'আলী, 'আম্মার ইবন ইয়াসির, আবু যার আল-গিফারী, আবূ হুরায়রা, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, সুলায়মান ইবন সুরাদ, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা), জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, নু'মান ইবন বাশীর (রা) প্রমুখের মত উঁচু স্তরের মনীষীদের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম আবূ দাউদ বলেন, তিনি হযরত আয়িশা (রা) থেকে হাদীছ শোনেননি। তাই ইমাম আয়- যাহাবী (রহ) ইমাম আবূ দাউদের নিকট প্রশ্ন রেখেছেন। "ফামা য্যন্নু বিল্লাযীনা ক্বাবলাহা?" - 'আয়িশার (রা) পূর্ববর্তী যাঁরা তাঁদের সম্পর্কে ধারণা কি? অর্থাৎ 'উছমান, 'আলী (রা), যাঁরা 'আয়িশার (রা) বহু পূর্বে ইনতিকাল করেছেন তাঁদের নিকট থেকেও কি ইয়াহইয়া শোনেননি?

ইয়াহইয়া ইবন 'আকীল, সুলায়মান আত-তায়মী, 'আবদুল্লাহ ইবন বুরায়দা, কাতাদা মাওলা ইবন 'আব্বাস (রা), 'আতা' আল-খুরাসানী, রাকীন ইবন রুবা'য়, 'আবদুল্লাহ ইবন কুলাইব সাদৃসী, আযরাক ইবন কায়স, ইসহাক ইবন সুওয়াইদ, আবুল মুনীব 'উবাইদুল্লাহ, 'উমার ইবন 'আতা' ইবন আবিল খাওলা (রহ) প্রমুখ ব্যক্তি তাঁর খ্যাতিমান ছাত্র। তাঁরা সকলে তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

ফিকহ্
ফিক্হ্ বিষয়েও তিনি পারদর্শী ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে একজন ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতার বড় প্রমাণ হলো তিনি মারব-এর কাজীর পদ অলঙ্কৃত করেন।

ভাষা, সাহিত্য ও অলঙ্কার শাস্ত্র
নিছক ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা-সাহিত্যেও তিনি বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আরবী ব্যাকরণের "নাহু” ও আরবী ভাষায় ছিল তাঁর বিশাল পাণ্ডিত্য। নাহুর জ্ঞান তিনি অর্জন করেন এই শাস্ত্রের উদ্ভাবক আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ায়লীর নিকট থেকে। ভাষায় তাঁর প্রচণ্ড দখল ছিল। তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের বিশুদ্ধ ভাষী ও অলঙ্কারশাস্ত্রবিদ। 'আবদুল মালিক ইবন 'উমাইর বলেন: "বিশুদ্ধভাষী মানুষ তিনজন : মূসা ইবন তালহা, ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার ও কাবীসা ইবন জবির।" ইবন হিব্বান তাঁর 'আছ-ছিকাত' গ্রন্থে বলেন: 'তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম বিশুদ্ধভাষী এবং ভাষা জ্ঞানে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি। আর সেই সাথে ছিল তাঁর মধ্যে দারুণ আল্লাহ-ভীতি।'

হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ তাঁকে বসরা থেকে বের করে দিলে কুতায়বা ইবন মুসলিম স্বাগতম জানান এবং খুরাসানের রাজধানী "মারব"-এর কাজী নিয়োগ করেন। সেখানে আদালত ভবন ছিল এবং এজলাসও বসতো। তা সত্ত্বেও তিনি বিচার প্রার্থীদের সুবিধার জন্য পথে-ঘাটে চলতে-ফিরতে মানুষের সাধারণ ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করে দিতেন। মূসা ইবন ইয়াসার বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মারকে বাজারে, রাস্তা-গলিতে মানুষের ঝগড়া-বিবাদের ফয়সালা করতে দেখেছি। অনেক সময় এমনও হতো যে, তিনি বাহনের পিঠে কোথাও যাচ্ছেন, তখন বাদী-বিবাদী এসে সামনে দাঁড়াতো। তিনি থেমে তাদের বক্তব্য শুনে ফয়সালা করে দিতেন।

একটি অক্ষয় কীর্তি
তাঁর জীবনের একটি অক্ষয় কীর্তি যা কিয়ামাত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে তা হলো আল-কুরআনের বর্ণমালায় "নুকতা” প্রদান করা। উল্লেখ্য যে, এর পূর্বে আরবী বর্ণমালার কোন বর্ণে "নুকতা” ছিল না। সাধারণ মানুষ ও অনারবদের কুরআন পাঠ সহজীকরণের জন্য ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার সর্বপ্রথম আল-কুরআনের সমআকৃতির বর্ণমালায় "নুকতা” লাগিয়ে পার্থক্য সূচিত করেন। হারুন ইবন মূসা বলেন : 'ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার প্রথম ব্যক্তি যিনি মাসহাফে নুকতা প্রদান করেন।'

আহলি বায়তের সাথে সম্পর্ক
আহলি বায়ত তথা হযরত রাসূলে কারীমের (সা) বংশধরদের প্রতি গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। কোন রকম বাছ-বিছার ছাড়াই তাঁদেরকে অন্য সকলের উপর প্রাধান্য দিতেন। তবে কাউকে হেয় ও তুচ্ছ মনে করতেন না। একবার হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ তাঁকে বলেন, আপনি বিশ্বাস করেন হাসান ও হুসায়ন (রা) রাসূলুল্লাহর বংশধর। আপনাকে হয় এ বিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে, নতুবা প্রমাণ পেশ করতে হবে। তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন: "তাঁর (ইবরাহীম) বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আইউব, ইউসুফ, মূসা ও হারূনকেও (দান করি)। আর এভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করি এবং যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, 'ঈসা এবং ইলইয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। তারা সকলে সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত।” তারপর বলেন, এই আয়াতে 'ঈসাকে ইবরাহীমের বংশধর বলা হয়েছে। সময়ের এত দীর্ঘ ব্যবধান সত্ত্বেও কেবল মাতৃকূলের সম্পর্কের কারণে যদি 'ঈসা (আ) ইবরাহীমের বংশধর হতে পারেন তাহলে হাসান ও হুসায়ন (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) দৌহিত্র হয়ে তাঁর বংশধর হতে বাধা কোথায়? তাঁর এ যুক্তিতে হাজ্জাজ সন্তুষ্ট হন।

হিজরী ১১৯, মতান্তরে ১২০ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে খলীফা ইবন খায়্যাত তাঁর তারীখে হিজরী ৮০ সনের পরে এবং ৯০ সনের আগে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের সাথে ইয়াহইয়ার জীবনী আলোচনা করেছেন।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭১; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৩
২. তাবাকাত ইবন সা'দ-৭/১০১
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭১
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩২৫; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৪
৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩২৫; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৪
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫; তাবাকাত-৭/১০১
৮. প্রাগুক্ত
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩০৫
১০. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৬
১১. তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৫
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাবাকাত ইবন সা'দ-৭/১০১
十四. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫
十五. সূরা আল-আন'আম-৮৪-৮৫
১৬. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৬
১৭. তাবি'ঈন-৫১৪
十八. তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৫

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আইউব ইবন আবী তামীমা আস-সাখতিয়ানী (রহ)

📄 আইউব ইবন আবী তামীমা আস-সাখতিয়ানী (রহ)


হযরত আইউবের ডাকনাম আবূ বাকর এবং পিতার নাম কায়সান। কিন্তু তিনি আবূ তামীমা ডাকনামে বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন। আইউব 'আনযা গোত্রের দাসত্বের রশি গলায় নিয়ে বেড়ে ওঠেন। তাঁর বাসস্থান ছিল বসরার বানু আল-হারীশে।

তার মাহাত্ম্য ও মনীষা
তিনি যদিও দাস ছিলেন, তবে 'ইল্যু ও 'আমলের জগতের মুকুটধারী ছিলেন। আল্লামা ইবন সা'দ লিখেছেন: ক্যানা ছিক্বাতান ছাবতান ফিল হাদীছি জা-মিআন আদলান ওয়া-রাআন কাসীরল ইল্ম হুজ্জাহ। "হাদীছে তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য, বহুগুণের সমাহার, ন্যায়নিষ্ঠ, আল্লাহভীরু, বহু জ্ঞানের অধিকারী দলিল-প্রমাণ সদৃশ মানুষ।" ইমাম নাওবী লিখেছেন, তার মহত্ত্ব, নেতৃত্ব, অগ্রগামিতা, মুখস্থ শক্তি, বিশ্বাসযোগ্যতা, জ্ঞানের ব্যাপকতা, উপলব্ধি ক্ষমতা এবং উঁচু মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবনুল 'ইমাদ-আল-হাম্বলী তাঁকে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় 'আলিম বলে উল্লেখ করেছেন।

শ্রেষ্ঠ 'আলিমগণের স্বীকৃতি
তাঁর সমকালীন সকল বড় 'আলিম তাঁর জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতা ও মহত্ত্বের কথা স্বীকার করেছেন। প্রখ্যাত তাবি'ঈ শু'বা তাঁকে "সায়্যিদুল 'উলামা"- 'আলিমদের নেতা অভিধায় ভূষিত করতেন। ইবন 'উয়ায়না বলতেন, আমি ৮৬ (ছিয়াশি) জন তাবি'ঈর সাক্ষাৎ লাভ করেছি, কিন্তু তাঁদের কাউকে আইউবের সমতুল্য পাইনি। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমার যে সকল মুহাদ্দিছ ও 'আলিমের কাছে বসার সুযোগ হয়েছে, আইউব তাঁদের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সুন্নাতের বেশি অনুসরণকারী। তাঁকে শীর্ষস্থানীয় 'আলিম গণ্য করা হতো। হিশাম ইবন 'উরওয়া বলতেন, বসরায় আইউবের মত দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না। হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে বসরার নওজোয়ানদের নেতা বলতেন। ইবন 'আওন বলতেন, মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের ওফাতের পর আমাদের সামনে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে, তাঁর স্থান পূরণ করার জন্য কে আছে? কিন্তু আমরা এমনিতেই জবাব পেয়ে গেলাম যে, আইউব আছেন। হিশাম ইবন 'উরওয়া বলেন, আমি বসরায় আইউবের মত আর কাউকে দেখিনি।

হাদীছ
তিনি বসরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী লিখেছেন, তিনি ছিলেন হাফিজ ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। হাদীছের জ্ঞান তিনি লাভ করেন বড় বড় তাবি'ঈদের নিকট থেকে। 'উমার ইবন সালামা জারমী, আবু রাজা' 'আতারুন্দী, আবৃ 'উছমান নাহদী, আবুশ শা'ছা' জাবির ইবন যায়দ, হাসান আল-বাসরী, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, নাফি' ইবন আবী মুলায়কা, ইবন মুনকাদির, হুমায়দ ইবন বিলাল, আবূ কিলাবা আল-জারমী, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, 'আবদুর রহমান ইবন কাসিম, 'ইকরিমা, আতা' (রহ) প্রমুখ 'আলিমদের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন এবং তাঁদের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেন। হাদীছে তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা এর দ্বারা অনুমান করা যায় যে, তাঁর বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা ৮০০ (আটশো) এবং কোন কোন বর্ণনা মতে ২০০০ (দু'হাজার) এ পৌছে। মু'আল্লা ইবন মানসূর বলেন, আমি ইসমা'ঈল ইবন 'উলায়‍্যার নিকট বসরার হাফিজে হাদীছ কারা তা জানতে চাইলাম। তিনি এই লোকগুলোর নাম উল্লেখ করলেন: আইউব, ইবন 'আওন, সুলায়মান আত-তায়মী, হিশাম আদ-দাওয়ায়ী ও সুলায়মান ইবন আল-মুগীরা (রহ)।

ইমাম মালিক, সুফইয়ান ছাওরী, ইবন 'উয়ায়না, ইবন 'উরূবা, মা'মার, আ'মাশ, কাতাদা, শু'বা (রহ) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ 'আলিম ও ইমাম তাঁর জ্ঞান ভাণ্ডার দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। আল-মিযী তাঁর বিখ্যাত ৫৫ জন ছাত্রের নাম উল্লেখ করেছেন যাঁরা তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

হাদীছ শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের নিকট তাঁর বর্ণিত হাদীছের স্থান
অবস্থা ও গুণগত দিক দিয়ে তাঁর বর্ণনাসমূহের যে মর্যাদা ও স্থান ছিল তা কয়েকজন মুহাদ্দিছের মন্তব্য থেকে অনুমান করা যায়। তাঁর বর্ণনাসমূহ সম্পর্কে আবূ হাতিমের ধারণা ছিল, তাঁর মত ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন নেই। মুহাম্মাদ ইবন সীরীন তাঁকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত বলেছেন। মুসলিম ইবন আকয়াস বলেন, আমি ইবন সীরীনকে জিজ্ঞেস করলাম, অমুক অমুক হাদীছ আপনার নিকট কে বর্ণনা করেছে? বললেন: বিশ্বস্ত, বিশ্বস্ত ব্যক্তি আইউব। ইবন আল-মাদীনী, নাসাঈ, ইবন খায়ছামা প্রমুখ মুহাদ্দিছ তাঁর বর্ণনাসমূহকে অতি উঁচু মর্যাদার বলে মনে করতেন। আর শু'বা তো তাঁর ঐ সকল বর্ণনাকে যাতে আইউবের নিজেরই সন্দেহ হতো, অন্যদের নিশ্চিত ও সন্দেহমুক্ত বর্ণনাসমূহের উপর প্রাধান্য দিতেন। একবার তিনি আইউবের কাছে একটি হাদীছ সম্পর্কে জানতে চান। তিনি বলেন, এতে আমার সন্দেহ আছে। শু'বা বললেন, আপনার সন্দেহ আমার নিকট অন্যদের দৃঢ় প্রত্যয়ের চেয়েও পছন্দনীয়।

ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর পূর্ণ দক্ষতা ছিল। শু'বা তাঁকে "সায়্যিদুল ফুকাহা"- ফকীহদের নেতা বলতেন। কিন্তু চরম সতর্কতার কারণে ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পায়নি।

সতর্কতা
এমন মুহাদ্দিছ ও ফকীহসুলভ দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনা এবং ফিক্হ সংক্রান্ত মাসয়ালা বলার ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, প্রশ্নের জবাব দানের ক্ষেত্রে আমি আইউব ও ইউনুছের চেয়ে অন্য কাউকে বেশি অজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেখিনি। জবাব দিলেও তার আগে প্রশ্নকারীর স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা করে দেখতেন যে, সে তাঁর জবাবটি যথাযথভাবে মানুষের নিকট উপস্থাপন করতে পারবে কিনা। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, যখন কোন ব্যক্তি আইউবের নিকট কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো তখন তার মুখ থেকে প্রশ্নটি আবার শুনতে চাইতেন। যদি তা হুবহু পূর্বের মত হতো তাহলে জবাব দিতেন, আর যদি দ্বিতীয়বার কিছু পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে ফেলতো তাহলে জবাব দিতেন না। জবাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতেন না, বরং শুধুমাত্র হাদীছ ও সুন্নাহর বিধান বলে দিতেন। যদি সে বিষয়ে কোন হাদীছ তাঁর কাছে না থাকতো তাহলে নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়ে দিতেন। একবার জনৈক ব্যক্তি কোন একটি বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তিনি সাফ বলে দেন, এ বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। প্রশ্নকারী বললো, কিয়াস ও যুক্তির ভিত্তিতে আপনার মতটি বলুন। বলেন, আমার কোন মতও নেই।

নিজের মতামতকে তিনি একটি বাতিল জিনিস বলে মনে করতেন। এক ব্যক্তি একবার তাঁকে বললো, আপনি কোন মাসয়ালায় নিজের মতামত প্রকাশ করেন না কেন? তিনি উপমার মাধ্যমে জবাব দেন যে, এক ব্যক্তি গাধাকে প্রশ্ন করে, তুমি জাবর কাট না কেন? জবাবে গাধা বলে, এই বাতিল ও অসার বস্তু চিবাতে আমার ভালো লাগে না।

জ্ঞানের অহঙ্কারের ভীতি ও সাবধানতা
মানুষ যখন কোন সম্মানজনক অবস্থান অথবা মর্যাদাবান স্তরে পৌঁছে যায় তখন আত্মতুষ্টি ও অহঙ্কার থেকে বেঁচে থাকা তার জন্য খুবই কষ্টকর। এ জন্য আইউব সব সময় ভীত থাকতেন। তিনি বলতেন, কোন্ মানুষ এর থেকে মুক্ত হতে পেরেছে? যখন কোন ব্যক্তি হাদীছ বর্ণনা করে এবং তার ভিত্তিতে সে মানুষের হৃদয়ে একটি স্থান করে নেয় তখন তার অন্তরে কিছু জিনিস, যেমন : আত্মতুষ্টি, অহমিকা, গর্ব-অহঙ্কার ইত্যাদির উদয় ঘটে।

কিন্তু তিনি এই পঙ্কিলতা থেকে নিরাপদ ছিলেন। জ্ঞানের এটাও একটা ঔদ্বত্য যে, জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতা অন্যের কাছে প্রকাশ হতে দেয় না। পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, তিনি অনেক প্রশ্নকারীকে সাফ বলে দিতেন যে, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। কাউকে বলতেন, অন্য কোন 'আলিমকে জিজ্ঞেস কর।

জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে তাঁর আচরণ
জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন এবং তাদেরকে সম্মানও করতেন। তার অবস্থা অতি সাধারণই হোক না কেন। রাবী' ইবন মুসলিম বলেন, একবার আমি আইউব আস-সাখতিয়ানীর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমরা যখন আবতাহ উপত্যাকায় তখন একজন অতি সাধারণ পোশাক পরা মোটা মানুষের সাথে দেখা হয়। সে আইউবকে খুঁজছিল। আমি তাঁকে বললাম, একজন সাধারণ মানুষ আপনাকে খুঁজছে। তিনি লোকটিকে দেখামাত্র দৌড়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। লোকটির পরিচয় নিয়ে জানা যায়, তিনি প্রখ্যাত 'আলিম তাবি'ঈ হযরত সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (রহ)।

'ইবাদত-বন্দেগী
হযরত আইউবের মধ্যে যে স্তরের জ্ঞান ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল আল্লাহ-ভীতি ও দুনিয়ার ভোগ-বিমুখতা। ইমাম মালিক (রহ) বলেন, তিনি ছিলেন একজন 'আমলকারী 'আলিম, ভীষণ আল্লাহ-ভীরু 'আবিদ এবং সৎ মানুষ। জীবনে চল্লিশ বার হজ্জ করার সৌভাগ্য লাভ করেন। কিন্তু তিনি নিজের সকল ইবাদত-বন্দেগী গোপন করার চেষ্টা করতেন। বলতেন, এসব কাজ প্রকাশ্যে করার চেয়ে গোপনে করাই উত্তম। সারা রাত ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন, কিন্তু মানুষের নিকট তা গোপন করার উদ্দেশ্যে প্রত্যুষে এমন জোরে আওয়ায করতেন যাতে সবাই মনে করে তিনি এই মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন।

রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি গভীর ভালোবাসা
হযরত রাসূলে কারীমের প্রতি এত উৎসর্গিত প্রাণ ছিলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ শুনে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতেন। তাঁর সেই কাঁদা দেখে অন্যদের দয়া হতো। ইমাম মালিক (রহ) বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তাঁর ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিমাণ দেখে আমি তাঁর নিকট থেকে হাদীছ লিখতে আরম্ভ করি। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইত্তেবা' ও অনুসরণের ক্ষেত্রেও ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমি যে সকল লোকের নিকট বসেছি তাদের সবার চেয়ে উত্তম এবং সবচেয়ে বেশি সুন্নাতের অনুসারী আইউবকে পেয়েছি।

খ্যাতির প্রতি অনীহা ও দুনিয়াদার মানুষ থেকে দূরে থাকা
হযরত আইউবের মধ্যে পূর্বে উল্লেখিত গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যসমূহ বিদ্যমান থাকার কারণে তিনি মানুষের দর্শনস্থলে পরিণত হন। কিন্তু তিনি দুনিয়া, দুনিয়াদার মানুষ এবং খ্যাতি ও নাম-কাম থেকে সর্বদা পালানোর চেষ্টা করতেন। কোন জনসমাবেশ ও মানুষের দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য পথ চলতে গিয়ে সাধারণ পরিচিত ও সোজা পথ বাদ দিয়ে অপরিচিত ঘুর-প্যাচের দীর্ঘ পথে চলতেন। হাম্মাদ-ইবন যায়দ বলেন, পথ চলার সময় আইউব আমাকে দূরের পথে নিয়ে যেতেন। আমি যখন তাঁকে নিকটের পথের কথা বলতাম তখন তিনি বলতেন, আমি অমুক স্থানের মজলিস থেকে দূরে থাকতে চাই। আরেকটি বর্ণনায় হাম্মাদ বলেন, তিনি আমাকে এমন সব রাস্তায় নিয়ে যেতেন যে, সেই রাস্তা তালাশ করা দেখে বিস্মিত হতাম। একাজ করতেন শুধু মানুষের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য। কিন্তু এ পথেও যখন কারো সামনে পড়ে যেতেন তখন নিজেই প্রথমে সালাম করতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের কারণে মানুষ তাঁর সালামের জবাবে অনেক কথা বাড়িয়ে বলতো। এভাবে তাঁকে সম্মান করাও তিনি পছন্দ করতেন না। এ কারণে তাঁদের জবাব শুনে বলতেন, আল্লাহ তুমি ভালো করে জান, আমি এটা চাইনি; এ আমার ইচ্ছা নয়। মানুষের দৃষ্টি এড়াতে অধিকাংশ সময় অন্য কাউকে নিজের সাথে চলার অনুমতি দিতেন না। শু'বা বলেন, অনেক সময় আমি আমার প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে যেতে চাইতাম, কিন্তু তিনি অনুমতি দিতেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট গলি পথে এদিক ওদিক পেঁচিয়ে যেতেন, যাতে লোকে চিনতে না পারে। আর এ কারণে সে যুগে তাঁর স্তরের লোকদের প্রচলিত পোশাক তিনি ছেড়ে দেন। সে যুগের তাপস ও দুনিয়া বিরাগী লোকদের চাদরের প্রান্ত একটু উপরে উঠানো থাকতো। এ ছিল তাঁদের তাপস্য ও বৈরাগ্যের চিহ্ন। এ কারণে তিনি তাঁর চাদর নীচে ছেড়ে দিয়ে চলতেন। মা'বাদ বলেন, আমি আইউবের জামার প্রান্ত লম্বা দেখে প্রতিবাদ করি। তিনি বলেন, আবূ 'উরূবা। পূর্ববর্তী যুগে প্রান্ত ঝুলিয়ে চলা প্রসিদ্ধ ছিল, আর এখন প্রসিদ্ধি গুটিয়ে চলাতে।

বিত্তবানদের সাহচর্য থেকে দূরে থাকা
তিনি সব সময় বিত্তবান ও ধন-ঐশ্বর্যের অধিকারী ব্যক্তিদের সাহচর্য থেকে দূরে থাকতেন। এমনকি খলীফা ও আমীর-উমারাদের কেউ তাঁর বাড়িতে আসা পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, আমার ছেলে বাকর আমার সবচেয়ে প্রিয়। তাকে আমি দাফন করে দিতে পারি, তবু খলীফাদের কেউ আমার কাছে আসা পছন্দ করি না। উমাইয়‍্যা বংশের ইয়াযীদ ইবন আল-ওয়ালীদ ছিলেন আইউবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যখন তিনি খলীফা হলেন তখন আইউব দু'আ করলেন এই বলে: হে আল্লাহ! তাঁর মন থেকে আমার কথা ভুলিয়ে দাও।

প্রফুল্ল ও মিষ্টি স্বভাব
পূর্বের আলোচনা থেকে কেউ যেন মনে না করে যে, তিনি গোঁমড়া মুখ ও রুক্ষ্ম স্বভাবের মানুষ ছিলেন। মূলতঃ তিনি নিজেকে লুকানোর জন্যই মানুষের সাথে মেলামেশা পছন্দ করতেন না। অন্যথায় তিনি ছিলেন দারুণ প্রফুল্ল ও মিষ্টি স্বভাবের মানুষ। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমি আইউবের চেয়ে বেশি আর কাউকে মানুষের সাথে হাসি মুখে ও অন্তর খুলে মিশতে দেখিনি। কেউ অসুস্থ হলে অথবা কারো মৃত্যু হলে তিনি রোগীকে দেখতে এবং মৃতের আপনজনকে সান্ত্বনা দিতে যেতেন। তখন মনে হতো সেই ব্যক্তি তাঁর দৃষ্টিতে অত্যন্ত সম্মানিত। এ রকম অবস্থায় তিনি অতি সাধারণ মানুষের বাড়িতেও উপস্থিত হতেন। ইয়া'লা ইবন হাকাম নামক একজন দাস তাঁর মহল্লায় থাকতো। সে শুধু তার মাকে রেখে মারা যায়। তিনি তার বাড়িতে একাধারে তিন দিন যান এবং দরজায় গিয়ে বসতেন।

ওফাত
হিজরী ১৩১ সনে বসরায় 'তাউন' রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ (তেষট্টি) বছর। একটি লাল চাদর তিনি বহু দিন পূর্ব থেকে কাফনের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। তিনি সেটি ইহরাম অবস্থায় এবং রমজানের তিরিশ তারিখ রাতে জড়াতেন। মৃত্যুর পূর্বে চাদরটি চুরি হয়ে যায়।

তাঁর মাথায় একটি জটা ছিল। বছরে একবার এবং সাধারণতঃ হজ্জের সময় মুড়ে ফেলতেন। শেষ বয়সে মাথা ও দাড়ির চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে লাল খিজাবও লাগাতেন।

তিনি ছিলেন আল্লাহর একজন অতি প্রিয় বান্দা। আল্লাহ তাঁর দু'আ সাথে সাথে কবুল করতেন। এমন কয়েকটি ঘটনা সীরাতের গ্রন্থাবলীতে দেখা যায়। যেমন ইবন 'আকীল 'শামায়িল আয-যুহহাদ' গ্রন্থে বলেছেন, একবার আইউব একটি কাফেলার সাথে মক্কা যাচ্ছেন। পথিমধ্যে মরুভূমিতে পানি সংকট দেখা দিল। সহযাত্রীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। তিনি একটি স্থানে হাত দিয়ে একটি বৃত্তের মত রেখা টানলেন। তারপর দু'আ করলেন। সাথে সাথে সেখানে একটি পানির ঝর্ণা সৃষ্টি হলো। লোকেরা পান করলো এবং তাদের পশুগুলোকেও পান করালো। প্রয়োজন শেষ হলে তিনি আবার সেই বৃত্তের উপর হাত ঘোরালেন এবং ঝর্ণাটি বন্ধ হয়ে গেল। এ রকম আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা 'আবদুল ওয়াহিদ ইবন যায়দ বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২/৪০৪
২. তাবাকাতু ইবন সা'দ-৭/১৪
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১
৪. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৮০
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১, তাহযীব আল- কামাল-২/৪০৭
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯৭-৩৯৮; তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৬
৮. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৭
৯. প্রাগুক্ত-২/৪০৫-৪০৬; তাহযীব আল-কাসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩২
১০. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৮
১১. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১-১৩২
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯৮
১৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১; তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৬
১৪. তাবাকাতু ইবন সা'দ-৭/১৪
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
১৬. তাবাকাত-৭/১৪
১৭. প্রাগুক্ত
十八. প্রাগুক্ত
十九. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৫৯
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১
二十一. তাবাকাত-৭/১৬
二十二. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১
二十三. প্রাগুক্ত
二十四. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৪৯
二十五. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৩৩
二十六. তাবি'ঈন-৫৭
二十七. তাবাকাত-৭/১৫-১৬
二十八. প্রাগুক্ত
二十九. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
三十. প্রাগুক্ত
三十一. তাবাকাত-৭/১৬
三十二. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩২
三十三. তাবাকাত-৭/১৬-১৭
三十四. তাবি'ঈন-৫৯
三十五. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩২

হযরত আইউবের ডাকনাম আবূ বাকর এবং পিতার নাম কায়সান। কিন্তু তিনি আবূ তামীমা ডাকনামে বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন। আইউব 'আনযা গোত্রের দাসত্বের রশি গলায় নিয়ে বেড়ে ওঠেন। তাঁর বাসস্থান ছিল বসরার বানু আল-হারীশে।

তার মাহাত্ম্য ও মনীষা
তিনি যদিও দাস ছিলেন, তবে 'ইল্যু ও 'আমলের জগতের মুকুটধারী ছিলেন। আল্লামা ইবন সা'দ লিখেছেন: ক্যানা ছিক্বাতান ছাবতান ফিল হাদীছি জা-মিআন আদলান ওয়া-রাআন কাসীরল ইল্ম হুজ্জাহ। "হাদীছে তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য, বহুগুণের সমাহার, ন্যায়নিষ্ঠ, আল্লাহভীরু, বহু জ্ঞানের অধিকারী দলিল-প্রমাণ সদৃশ মানুষ।" ইমাম নাওবী লিখেছেন, তার মহত্ত্ব, নেতৃত্ব, অগ্রগামিতা, মুখস্থ শক্তি, বিশ্বাসযোগ্যতা, জ্ঞানের ব্যাপকতা, উপলব্ধি ক্ষমতা এবং উঁচু মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত। ইবনুল 'ইমাদ-আল-হাম্বলী তাঁকে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় 'আলিম বলে উল্লেখ করেছেন।

শ্রেষ্ঠ 'আলিমগণের স্বীকৃতি
তাঁর সমকালীন সকল বড় 'আলিম তাঁর জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতা ও মহত্ত্বের কথা স্বীকার করেছেন। প্রখ্যাত তাবি'ঈ শু'বা তাঁকে "সায়্যিদুল 'উলামা"- 'আলিমদের নেতা অভিধায় ভূষিত করতেন। ইবন 'উয়ায়না বলতেন, আমি ৮৬ (ছিয়াশি) জন তাবি'ঈর সাক্ষাৎ লাভ করেছি, কিন্তু তাঁদের কাউকে আইউবের সমতুল্য পাইনি। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমার যে সকল মুহাদ্দিছ ও 'আলিমের কাছে বসার সুযোগ হয়েছে, আইউব তাঁদের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সুন্নাতের বেশি অনুসরণকারী। তাঁকে শীর্ষস্থানীয় 'আলিম গণ্য করা হতো। হিশাম ইবন 'উরওয়া বলতেন, বসরায় আইউবের মত দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না। হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে বসরার নওজোয়ানদের নেতা বলতেন। ইবন 'আওন বলতেন, মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের ওফাতের পর আমাদের সামনে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে, তাঁর স্থান পূরণ করার জন্য কে আছে? কিন্তু আমরা এমনিতেই জবাব পেয়ে গেলাম যে, আইউব আছেন। হিশাম ইবন 'উরওয়া বলেন, আমি বসরায় আইউবের মত আর কাউকে দেখিনি।

হাদীছ
তিনি বসরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী লিখেছেন, তিনি ছিলেন হাফিজ ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। হাদীছের জ্ঞান তিনি লাভ করেন বড় বড় তাবি'ঈদের নিকট থেকে। 'উমার ইবন সালামা জারমী, আবু রাজা' 'আতারুন্দী, আবৃ 'উছমান নাহদী, আবুশ শা'ছা' জাবির ইবন যায়দ, হাসান আল-বাসরী, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, নাফি' ইবন আবী মুলায়কা, ইবন মুনকাদির, হুমায়দ ইবন বিলাল, আবূ কিলাবা আল-জারমী, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, 'আবদুর রহমান ইবন কাসিম, 'ইকরিমা, আতা' (রহ) প্রমুখ 'আলিমদের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন এবং তাঁদের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেন। হাদীছে তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা এর দ্বারা অনুমান করা যায় যে, তাঁর বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা ৮০০ (আটশো) এবং কোন কোন বর্ণনা মতে ২০০০ (দু'হাজার) এ পৌছে। মু'আল্লা ইবন মানসূর বলেন, আমি ইসমা'ঈল ইবন 'উলায়‍্যার নিকট বসরার হাফিজে হাদীছ কারা তা জানতে চাইলাম। তিনি এই লোকগুলোর নাম উল্লেখ করলেন: আইউব, ইবন 'আওন, সুলায়মান আত-তায়মী, হিশাম আদ-দাওয়ায়ী ও সুলায়মান ইবন আল-মুগীরা (রহ)।

ইমাম মালিক, সুফইয়ান ছাওরী, ইবন 'উয়ায়না, ইবন 'উরূবা, মা'মার, আ'মাশ, কাতাদা, শু'বা (রহ) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ 'আলিম ও ইমাম তাঁর জ্ঞান ভাণ্ডার দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। আল-মিযী তাঁর বিখ্যাত ৫৫ জন ছাত্রের নাম উল্লেখ করেছেন যাঁরা তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

হাদীছ শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের নিকট তাঁর বর্ণিত হাদীছের স্থান
অবস্থা ও গুণগত দিক দিয়ে তাঁর বর্ণনাসমূহের যে মর্যাদা ও স্থান ছিল তা কয়েকজন মুহাদ্দিছের মন্তব্য থেকে অনুমান করা যায়। তাঁর বর্ণনাসমূহ সম্পর্কে আবূ হাতিমের ধারণা ছিল, তাঁর মত ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন নেই। মুহাম্মাদ ইবন সীরীন তাঁকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত বলেছেন। মুসলিম ইবন আকয়াস বলেন, আমি ইবন সীরীনকে জিজ্ঞেস করলাম, অমুক অমুক হাদীছ আপনার নিকট কে বর্ণনা করেছে? বললেন: বিশ্বস্ত, বিশ্বস্ত ব্যক্তি আইউব। ইবন আল-মাদীনী, নাসাঈ, ইবন খায়ছামা প্রমুখ মুহাদ্দিছ তাঁর বর্ণনাসমূহকে অতি উঁচু মর্যাদার বলে মনে করতেন। আর শু'বা তো তাঁর ঐ সকল বর্ণনাকে যাতে আইউবের নিজেরই সন্দেহ হতো, অন্যদের নিশ্চিত ও সন্দেহমুক্ত বর্ণনাসমূহের উপর প্রাধান্য দিতেন। একবার তিনি আইউবের কাছে একটি হাদীছ সম্পর্কে জানতে চান। তিনি বলেন, এতে আমার সন্দেহ আছে। শু'বা বললেন, আপনার সন্দেহ আমার নিকট অন্যদের দৃঢ় প্রত্যয়ের চেয়েও পছন্দনীয়।

ফিক্হ শাস্ত্রেও তাঁর পূর্ণ দক্ষতা ছিল। শু'বা তাঁকে "সায়্যিদুল ফুকাহা"- ফকীহদের নেতা বলতেন। কিন্তু চরম সতর্কতার কারণে ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পায়নি।

সতর্কতা
এমন মুহাদ্দিছ ও ফকীহসুলভ দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনা এবং ফিক্হ সংক্রান্ত মাসয়ালা বলার ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, প্রশ্নের জবাব দানের ক্ষেত্রে আমি আইউব ও ইউনুছের চেয়ে অন্য কাউকে বেশি অজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেখিনি। জবাব দিলেও তার আগে প্রশ্নকারীর স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা করে দেখতেন যে, সে তাঁর জবাবটি যথাযথভাবে মানুষের নিকট উপস্থাপন করতে পারবে কিনা। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, যখন কোন ব্যক্তি আইউবের নিকট কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো তখন তার মুখ থেকে প্রশ্নটি আবার শুনতে চাইতেন। যদি তা হুবহু পূর্বের মত হতো তাহলে জবাব দিতেন, আর যদি দ্বিতীয়বার কিছু পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে ফেলতো তাহলে জবাব দিতেন না। জবাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতেন না, বরং শুধুমাত্র হাদীছ ও সুন্নাহর বিধান বলে দিতেন। যদি সে বিষয়ে কোন হাদীছ তাঁর কাছে না থাকতো তাহলে নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়ে দিতেন। একবার জনৈক ব্যক্তি কোন একটি বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তিনি সাফ বলে দেন, এ বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। প্রশ্নকারী বললো, কিয়াস ও যুক্তির ভিত্তিতে আপনার মতটি বলুন। বলেন, আমার কোন মতও নেই।

নিজের মতামতকে তিনি একটি বাতিল জিনিস বলে মনে করতেন। এক ব্যক্তি একবার তাঁকে বললো, আপনি কোন মাসয়ালায় নিজের মতামত প্রকাশ করেন না কেন? তিনি উপমার মাধ্যমে জবাব দেন যে, এক ব্যক্তি গাধাকে প্রশ্ন করে, তুমি জাবর কাট না কেন? জবাবে গাধা বলে, এই বাতিল ও অসার বস্তু চিবাতে আমার ভালো লাগে না।

জ্ঞানের অহঙ্কারের ভীতি ও সাবধানতা
মানুষ যখন কোন সম্মানজনক অবস্থান অথবা মর্যাদাবান স্তরে পৌঁছে যায় তখন আত্মতুষ্টি ও অহঙ্কার থেকে বেঁচে থাকা তার জন্য খুবই কষ্টকর। এ জন্য আইউব সব সময় ভীত থাকতেন। তিনি বলতেন, কোন্ মানুষ এর থেকে মুক্ত হতে পেরেছে? যখন কোন ব্যক্তি হাদীছ বর্ণনা করে এবং তার ভিত্তিতে সে মানুষের হৃদয়ে একটি স্থান করে নেয় তখন তার অন্তরে কিছু জিনিস, যেমন : আত্মতুষ্টি, অহমিকা, গর্ব-অহঙ্কার ইত্যাদির উদয় ঘটে।

কিন্তু তিনি এই পঙ্কিলতা থেকে নিরাপদ ছিলেন। জ্ঞানের এটাও একটা ঔদ্বত্য যে, জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতা অন্যের কাছে প্রকাশ হতে দেয় না। পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, তিনি অনেক প্রশ্নকারীকে সাফ বলে দিতেন যে, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। কাউকে বলতেন, অন্য কোন 'আলিমকে জিজ্ঞেস কর।

জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে তাঁর আচরণ
জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন এবং তাদেরকে সম্মানও করতেন। তার অবস্থা অতি সাধারণই হোক না কেন। রাবী' ইবন মুসলিম বলেন, একবার আমি আইউব আস-সাখতিয়ানীর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমরা যখন আবতাহ উপত্যাকায় তখন একজন অতি সাধারণ পোশাক পরা মোটা মানুষের সাথে দেখা হয়। সে আইউবকে খুঁজছিল। আমি তাঁকে বললাম, একজন সাধারণ মানুষ আপনাকে খুঁজছে। তিনি লোকটিকে দেখামাত্র দৌড়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। লোকটির পরিচয় নিয়ে জানা যায়, তিনি প্রখ্যাত 'আলিম তাবি'ঈ হযরত সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (রহ)।

'ইবাদত-বন্দেগী
হযরত আইউবের মধ্যে যে স্তরের জ্ঞান ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল আল্লাহ-ভীতি ও দুনিয়ার ভোগ-বিমুখতা। ইমাম মালিক (রহ) বলেন, তিনি ছিলেন একজন 'আমলকারী 'আলিম, ভীষণ আল্লাহ-ভীরু 'আবিদ এবং সৎ মানুষ। জীবনে চল্লিশ বার হজ্জ করার সৌভাগ্য লাভ করেন। কিন্তু তিনি নিজের সকল ইবাদত-বন্দেগী গোপন করার চেষ্টা করতেন। বলতেন, এসব কাজ প্রকাশ্যে করার চেয়ে গোপনে করাই উত্তম। সারা রাত ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন, কিন্তু মানুষের নিকট তা গোপন করার উদ্দেশ্যে প্রত্যুষে এমন জোরে আওয়ায করতেন যাতে সবাই মনে করে তিনি এই মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন।

রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি গভীর ভালোবাসা
হযরত রাসূলে কারীমের প্রতি এত উৎসর্গিত প্রাণ ছিলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ শুনে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতেন। তাঁর সেই কাঁদা দেখে অন্যদের দয়া হতো। ইমাম মালিক (রহ) বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তাঁর ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিমাণ দেখে আমি তাঁর নিকট থেকে হাদীছ লিখতে আরম্ভ করি। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইত্তেবা' ও অনুসরণের ক্ষেত্রেও ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমি যে সকল লোকের নিকট বসেছি তাদের সবার চেয়ে উত্তম এবং সবচেয়ে বেশি সুন্নাতের অনুসারী আইউবকে পেয়েছি।

খ্যাতির প্রতি অনীহা ও দুনিয়াদার মানুষ থেকে দূরে থাকা
হযরত আইউবের মধ্যে পূর্বে উল্লেখিত গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যসমূহ বিদ্যমান থাকার কারণে তিনি মানুষের দর্শনস্থলে পরিণত হন। কিন্তু তিনি দুনিয়া, দুনিয়াদার মানুষ এবং খ্যাতি ও নাম-কাম থেকে সর্বদা পালানোর চেষ্টা করতেন। কোন জনসমাবেশ ও মানুষের দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য পথ চলতে গিয়ে সাধারণ পরিচিত ও সোজা পথ বাদ দিয়ে অপরিচিত ঘুর-প্যাচের দীর্ঘ পথে চলতেন। হাম্মাদ-ইবন যায়দ বলেন, পথ চলার সময় আইউব আমাকে দূরের পথে নিয়ে যেতেন। আমি যখন তাঁকে নিকটের পথের কথা বলতাম তখন তিনি বলতেন, আমি অমুক স্থানের মজলিস থেকে দূরে থাকতে চাই। আরেকটি বর্ণনায় হাম্মাদ বলেন, তিনি আমাকে এমন সব রাস্তায় নিয়ে যেতেন যে, সেই রাস্তা তালাশ করা দেখে বিস্মিত হতাম। একাজ করতেন শুধু মানুষের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য। কিন্তু এ পথেও যখন কারো সামনে পড়ে যেতেন তখন নিজেই প্রথমে সালাম করতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের কারণে মানুষ তাঁর সালামের জবাবে অনেক কথা বাড়িয়ে বলতো। এভাবে তাঁকে সম্মান করাও তিনি পছন্দ করতেন না। এ কারণে তাঁদের জবাব শুনে বলতেন, আল্লাহ তুমি ভালো করে জান, আমি এটা চাইনি; এ আমার ইচ্ছা নয়। মানুষের দৃষ্টি এড়াতে অধিকাংশ সময় অন্য কাউকে নিজের সাথে চলার অনুমতি দিতেন না। শু'বা বলেন, অনেক সময় আমি আমার প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে যেতে চাইতাম, কিন্তু তিনি অনুমতি দিতেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট গলি পথে এদিক ওদিক পেঁচিয়ে যেতেন, যাতে লোকে চিনতে না পারে। আর এ কারণে সে যুগে তাঁর স্তরের লোকদের প্রচলিত পোশাক তিনি ছেড়ে দেন। সে যুগের তাপস ও দুনিয়া বিরাগী লোকদের চাদরের প্রান্ত একটু উপরে উঠানো থাকতো। এ ছিল তাঁদের তাপস্য ও বৈরাগ্যের চিহ্ন। এ কারণে তিনি তাঁর চাদর নীচে ছেড়ে দিয়ে চলতেন। মা'বাদ বলেন, আমি আইউবের জামার প্রান্ত লম্বা দেখে প্রতিবাদ করি। তিনি বলেন, আবূ 'উরূবা। পূর্ববর্তী যুগে প্রান্ত ঝুলিয়ে চলা প্রসিদ্ধ ছিল, আর এখন প্রসিদ্ধি গুটিয়ে চলাতে।

বিত্তবানদের সাহচর্য থেকে দূরে থাকা
তিনি সব সময় বিত্তবান ও ধন-ঐশ্বর্যের অধিকারী ব্যক্তিদের সাহচর্য থেকে দূরে থাকতেন। এমনকি খলীফা ও আমীর-উমারাদের কেউ তাঁর বাড়িতে আসা পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, আমার ছেলে বাকর আমার সবচেয়ে প্রিয়। তাকে আমি দাফন করে দিতে পারি, তবু খলীফাদের কেউ আমার কাছে আসা পছন্দ করি না। উমাইয়‍্যা বংশের ইয়াযীদ ইবন আল-ওয়ালীদ ছিলেন আইউবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যখন তিনি খলীফা হলেন তখন আইউব দু'আ করলেন এই বলে: হে আল্লাহ! তাঁর মন থেকে আমার কথা ভুলিয়ে দাও।

প্রফুল্ল ও মিষ্টি স্বভাব
পূর্বের আলোচনা থেকে কেউ যেন মনে না করে যে, তিনি গোঁমড়া মুখ ও রুক্ষ্ম স্বভাবের মানুষ ছিলেন। মূলতঃ তিনি নিজেকে লুকানোর জন্যই মানুষের সাথে মেলামেশা পছন্দ করতেন না। অন্যথায় তিনি ছিলেন দারুণ প্রফুল্ল ও মিষ্টি স্বভাবের মানুষ। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, আমি আইউবের চেয়ে বেশি আর কাউকে মানুষের সাথে হাসি মুখে ও অন্তর খুলে মিশতে দেখিনি। কেউ অসুস্থ হলে অথবা কারো মৃত্যু হলে তিনি রোগীকে দেখতে এবং মৃতের আপনজনকে সান্ত্বনা দিতে যেতেন। তখন মনে হতো সেই ব্যক্তি তাঁর দৃষ্টিতে অত্যন্ত সম্মানিত। এ রকম অবস্থায় তিনি অতি সাধারণ মানুষের বাড়িতেও উপস্থিত হতেন। ইয়া'লা ইবন হাকাম নামক একজন দাস তাঁর মহল্লায় থাকতো। সে শুধু তার মাকে রেখে মারা যায়। তিনি তার বাড়িতে একাধারে তিন দিন যান এবং দরজায় গিয়ে বসতেন।

ওফাত
হিজরী ১৩১ সনে বসরায় 'তাউন' রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ (তেষট্টি) বছর। একটি লাল চাদর তিনি বহু দিন পূর্ব থেকে কাফনের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। তিনি সেটি ইহরাম অবস্থায় এবং রমজানের তিরিশ তারিখ রাতে জড়াতেন। মৃত্যুর পূর্বে চাদরটি চুরি হয়ে যায়।

তাঁর মাথায় একটি জটা ছিল। বছরে একবার এবং সাধারণতঃ হজ্জের সময় মুড়ে ফেলতেন। শেষ বয়সে মাথা ও দাড়ির চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে লাল খিজাবও লাগাতেন।

তিনি ছিলেন আল্লাহর একজন অতি প্রিয় বান্দা। আল্লাহ তাঁর দু'আ সাথে সাথে কবুল করতেন। এমন কয়েকটি ঘটনা সীরাতের গ্রন্থাবলীতে দেখা যায়। যেমন ইবন 'আকীল 'শামায়িল আয-যুহহাদ' গ্রন্থে বলেছেন, একবার আইউব একটি কাফেলার সাথে মক্কা যাচ্ছেন। পথিমধ্যে মরুভূমিতে পানি সংকট দেখা দিল। সহযাত্রীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। তিনি একটি স্থানে হাত দিয়ে একটি বৃত্তের মত রেখা টানলেন। তারপর দু'আ করলেন। সাথে সাথে সেখানে একটি পানির ঝর্ণা সৃষ্টি হলো। লোকেরা পান করলো এবং তাদের পশুগুলোকেও পান করালো। প্রয়োজন শেষ হলে তিনি আবার সেই বৃত্তের উপর হাত ঘোরালেন এবং ঝর্ণাটি বন্ধ হয়ে গেল। এ রকম আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা 'আবদুল ওয়াহিদ ইবন যায়দ বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২/৪০৪
২. তাবাকাতু ইবন সা'দ-৭/১৪
৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১
৪. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৮০
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১, তাহযীব আল- কামাল-২/৪০৭
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯৭-৩৯৮; তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৬
৮. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৭
৯. প্রাগুক্ত-২/৪০৫-৪০৬; তাহযীব আল-কাসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩২
১০. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৮
১১. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১-১৩২
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯৮
১৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৩১; তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৬
১৪. তাবাকাতু ইবন সা'দ-৭/১৪
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
১৬. তাবাকাত-৭/১৪
১৭. প্রাগুক্ত
十八. প্রাগুক্ত
十九. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৫৯
二十. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১
二十一. তাবাকাত-৭/১৬
二十二. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩১
二十三. প্রাগুক্ত
二十四. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৪৯
二十五. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৩৩
二十六. তাবি'ঈন-৫৭
二十七. তাবাকাত-৭/১৫-১৬
二十八. প্রাগুক্ত
二十九. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩১
三十. প্রাগুক্ত
三十一. তাবাকাত-৭/১৬
三十二. তাহযীব আল-কামাল-২/৪০৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩২
三十三. তাবাকাত-৭/১৬-১৭
三十四. তাবি'ঈন-৫৯
三十五. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩২

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 জাবির ইবন যায়দ (রহ)

📄 জাবির ইবন যায়দ (রহ)


হযরত জাবিরের (রহ) ডাকনাম আবূ আশ-শা'ছা'। পিতার নাম যায়দ। আযদ গোত্রের সন্তান এবং বসরার অধিবাসী। উমান মতান্তরে বসরার 'আল-জাওফ' নামক স্থানের সাথে সম্পর্ক বুঝানোর জন্য তাঁকে 'আল-জাওফী' বলা হয়।

জ্ঞান ও মনীষা
হযরত জাবির (রহ) বহু 'আলিম সাহাবীর নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। তবে হাবরুল উম্মাহ্ (উম্মাতের মহাজ্ঞানী) হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) সাহচর্ষে সবচেয়ে বেশি অবস্থান করেন। এ কারণে তাঁকে "সাহিবু ইবন আল-আব্বাস" অর্থাৎ ইবন আল-আব্বাসের (রা) সাথী বলা হতো। এই সাহচর্যের কল্যাণে তিনি বিশাল জ্ঞানের অধিকারী হন এবং তাঁর সময়ের একজন বিশিষ্ট 'আলিম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে "আহাদুল আ'-লা-মি" বা "বিশিষ্টজনদের একজন” বলেছেন। ইমাম-নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর বিশ্বস্ততা, দৃঢ়তা ও সুউচ্চ মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত। তিনি ছিলেন তাবি'ঈ ইমাম ও ফকীহদের মধ্যে একজন।

কুরআন
কুরআন, হাদীছ, ফিক্‌ তথা সকল ইসলামী জ্ঞানে তিনি সমান পারদর্শিতা অর্জন করেন। 'উলূমুল কুরআন বা কুরআন বিষয়ক বিবিধ জ্ঞানে ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। তাঁর মহান শিক্ষক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা), যিনি নিজেও একজন শ্রেষ্ঠ কুরআন বিশেষজ্ঞ ছিলেন, বলেন:
"বসরাবাসীরা যদি জাবির ইবন যায়দের কথা মেনে নেয় তাহলে কিতাবুল্লাহর (কুরআন) মধ্যে যা কিছু আছে সে বিষয়ে তাদের জ্ঞান অনেক প্রশস্ত হয়ে যাবে।"

হাদীছ
তিনি হাদীছেরও একজন বড় হাফিজ ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে হাদীছের বিশিষ্ট 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করেছেন। হাদীছের জ্ঞান তিনি অর্জন করেন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, হাকাম ইবন 'আমর আল-গিফারী, আমীর মু'আবিয়া (রা) প্রমুখের মত শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণের নিকট থেকে। তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, ইয়া'লা ইবন মুসলিম, আইউব আস-সাখতিয়ানী, 'আমর ইবন জুরহুম (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ফিক্হ
ফিক্হ বিষয়েও তাঁর পূর্ণ দক্ষতা ছিল। ইমাম নাওবী (রহ) তাঁকে তাবি'ঈ ইমাম ও ফকীহদের মধ্যে গণ্য করেছেন। সাহাবা (রা) ও তাবি'ঈন কিরাম (রহ) ফিক্হ বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতার কথা স্বীকার করেছেন। দাহহাক আদ-দাব্বী বলেন, একবার হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) তাওয়াফের মধ্যে জাবির ইবন যায়দের দেখা পান। তখন তিনি জাবিরকে লক্ষ্য করেন বলেন:
"ওহে জাবির! তুমি বসরার একজন অন্যতম ফকীহ্ এবং তুমি মানুষের জিজ্ঞাসার জবাবে ফাতওয়া দিয়ে থাক। তবে কখনো স্পষ্টভাষী কুরআন ও কার্যকর সুন্নাহ ব্যতীত ফাতওয়া দেবে না। এমনটি না করলে তুমি নিজেও ধ্বংস হবে এবং অন্যদেরকেও ধ্বংস করবে।” হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন:
"আইউবকে জিজ্ঞেস করা হল: আপনি কি জাবির ইবন যায়দকে দেখেছেন? বললেন: হাঁ, দেখেছি। তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ। তারপর উচ্ছ্বসিতভাবে তাঁর ফিক্হ বিষয়ে আলোচনা করতে থাকেন।" ইয়াস ইবন মু'আবিয়া ছিলেন বসরার বিখ্যাত কাজী। তিনি বলেন:
"আমি বসরাবাসী ও তাদের মুফতী জাবির ইবন যায়দকে পেয়েছি।" অপর একটি বর্ণনামতে তিনি বলেন, জাবির ছাড়া বসরাবাসীদের সত্যিকার কোন মুফতী ছিল না। হযরত হাসান আল-বাসরীর (রহ) অনুপস্থিতিতে জাবির ফাতওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করতেন।

হযরত জাবির (রহ) কোন এক কারণে একবার কারারুদ্ধ হন। ধারণা করা হয় যে, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের যুলুম-অত্যাচারের শিকারে পরিণত হন তিনি। তাঁর জ্ঞানের উপর বসরাবাসীদের এত আস্থা ছিল যে, তারা তাদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর লাভের জন্য কারাগারে তাঁর নিকট ছুটে যেত। কাতাদা বলেন, জাবির কারারুদ্ধ হলেন। সে সময় হিজড়ের উত্তরাধিকারের বিষয়ে একটি সমস্যা দেখা দিলে লোকেরা কারাগারে তাঁর নিকট সমাধান চেয়ে পাঠালো। তিনি বললেন, তোমরা তো বেশ ভালো। আমাকে কারাগারে আটক রেখেছো, আবার আমার নিকট ফাতওয়াও চাচ্ছো। অতঃপর তিনি জবাব পাঠিয়ে দেন। বসরাবাসীদের কেউ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট কোন কিছু জানতে চাইলে বলতেন: "তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করছো, অথচ তোমাদের মধ্যে তো জাবির ইবন যায়দ আছে।"

হযরত জাবিরের ব্যক্তি সত্তাটি ছিল বহু জ্ঞানের সমাহার, তিনি তাঁর যুগের একজন খুব বড় 'আলিম ছিলেন। 'আমর ইবন দীনার বলতেন:
"আমি জাবির ইবন যায়দ অপেক্ষা ফাতওয়া বিষয়ে অধিক জানে এমন কাউকে দেখিনি।” তাঁর মৃত্যুর পর হযরত কাতাদার (রহ) মুখ থেকে বার বার উচ্চারিত হচ্ছিল: আল-ইয়াওমা দুফিনা ইলমুল আরদ্বি - “আজ পৃথিবীর জ্ঞান দাফন হয়ে গেল।”

জ্ঞান গ্রন্থাবদ্ধকরণ
সেই যুগের কিছু মহান ব্যক্তির মত তিনিও জ্ঞান গ্রন্থাবদ্ধ করা পছন্দ করতেন না। 'আমর ইবন দীনার বলেন, কিছু লোক জাবির ইবন যায়দকে বললো, মানুষ আপনার মুখ থেকে যা শোনে তা লিখে ফেলে। একথা শুনে তিনি "ইন্না লিল্লাহ" উচ্চারণ করে বলেন, তারা লিখে ফেলে? তাঁর অনীহা দেখে তাঁর ছাত্রদের অনেকে লেখা ছেড়ে দেয়।

এত জ্ঞান-গরীমার সাথে চারিত্রিক বহু গুণ ও বৈশিষ্ট্যে তিনি বিভূষিত ছিলেন। ভালো কাজের বিপরীতে দুনিয়ার যে কোন সুখ-সম্পদের কোন রকম গুরুত্ব তাঁর কাছে ছিল না। তিনি বলতেন, ষাট বছর জীবন পূর্ণ হতে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছু পেয়েছি, আল্লাহর বহু অনুগ্রহ লাভ করেছি। কিন্তু এই ভালো কাজ ছাড়া অবশিষ্ট যা কিছু আমি করেছি এবং এ সকল সুখ-সম্পদ আমার জুতার থেকেও হেয় ও তুচ্ছ। মুহাম্মাদ ইবন হুসায়ন বলতেন, আল্লাহ জাবিরের প্রতি দয়া করুন! তিনি দিরহামের বিপরীতেও একজন মুসলিম ছিলেন।

একটি অপবাদ ও তাঁর সম্পর্কহীনতা
চরমপন্থী খারিজী সম্প্রদায়ের একটি উপদলের নাম 'ইবাদিয়া' । তাদের কিছু লোক তাঁর কাছে আসা-যাওয়া করতো। এ কারণে তাঁর সম্পর্কে কিছু মানুষের এ ধারণা সৃষ্টি হয় যে, এই সম্প্রদায়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক আছে অথবা কমপক্ষে তাদের চিন্তা-দর্শন দ্বারা তিনি কিছুটা প্রভাবিত। কিন্তু তাদের এ ধারণা সবই অমূলক ও ভিত্তিহীন ছিল। ইবাদিয়াদের সাথে তাঁর উঠা-বসা ছিল ঠিক, তবে তাদের চিন্তা-দর্শনের সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না। তিনি তাঁর জীবনে বার বার এবং শেষ জীবনে অন্তিম রোগ শয্যায়ও ইবাদিয়াদের চিন্তা-বিশ্বাসের সাথে তাঁর সম্পর্কহীনতার কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন। তাঁর অন্তিম সময়ে যখন অবস্থা একেবারেই খারাপ হয়ে পড়ে তখন ছাবিত আল-বানানী তার কাছে জানতে চান, আপনার কোন ইচ্ছা আছে কি? বললেন: হাসান আল-বাসরীকে এক নজর দেখতে চাই। সে সময় হাসান আল-বাসরী (রহ) সরকারের কোপদৃষ্টিতে ছিলেন। তাই গ্রেফতার এড়াতে আবু খলীফা নামক এক ব্যক্তির গৃহে আত্মগোপন করে ছিলেন। তাঁকে জাবিরের ইচ্ছার কথা জানানো হলো। সাথে সাথে তিনি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিন্তু ছাবিত তাঁকে বাধা দিয়ে বলেন, বের হলে গ্রেফতার হওয়ার ভয় আছে। তিনি জবাব দিলেন : আল্লাহ আমাকে শত্রুর দৃষ্টি থেকে রক্ষা করবেন। তিনি নিষেধ উপেক্ষা করে তখনই রাতের অন্ধকারে জাবিরের নিকট পৌঁছেন। জাবিরের একা উঠে বসার শক্তি ছিল না। তাই অন্যের সাহায্য নিয়ে উঠে বসেন। হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে কালিমা তায়্যিবা পড়ার তালকীন দেন এবং তিনি কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করেন। তারপর তিনি ইবাদিয়াদের বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য জাবিরের কাছে জিজ্ঞেস করেন, ইবাদিয়াদের সাথে তোমার সম্পর্কের প্রকৃতিটি কেমন ছিল? জাবির বলেন, আমি আল্লাহর কাছে তাদের ব্যাপারে দায়মুক্তি চাই। হাসান আল-বাসরী (রহ) আবার প্রশ্ন করেন: তাদের ব্যাপারে তোমার ধারণা কি? জাবির তাদের সাথে নিজের সম্পর্কহীনতার কথা প্রকাশ করেন। তখন জাবিরের একান্তই অন্তিমদশা। এ কারণে হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে বিদায় দেওয়ার জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু তখনো জাবিরের জীবনকাল শেষ হয়নি। তাই হযরত হাসান (রহ) সুবহে সাদিক হওয়ার পর নামাযে জানাযার ভঙ্গিতে চারটি তাকবীর উচ্চারণ করে জাবিরের মাগফিরাতের জন্য দু'আ করেন। তারপর অন্ধকারেই নিজের অবস্থান স্থলে ফিরে যান। আর এ রোগেই হযরত জাবির (রহ) ইনতিকাল করেন।

ওফাত
ইমাম আহমাদ, আল-ফাল্লাস ও বুখারীর মতে তিনি হিজরী ৯৩ সনে ইনতিকাল করেন। পক্ষান্তরে আল-ওয়াকিদী ও ইবন সা'দের মতে তাঁর মৃত্যু সন হিজরী ১০৩ এবং আল- হায়ছাম ইবন 'আদীর মতে হিজরী ১০৪

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭২
২. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-৩/২৮৬
৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩
৪. প্রাগুক্ত
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৪২
৬. তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৬
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-২/৩৮
৯. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৪২
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩
১১. প্রাগুক্ত; আত-তাবাকাত-৭/১৩১
১২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭২
১৩. আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十四. তাহযীব আত-তাহযীব-২/৩৮
十五. আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十六. তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৬
十七. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩; আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十八. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩
十九. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
二十. প্রাগুক্ত-৭/১৩৪
২১. 'আবদুল্লাহ ইবন ইবাদ-এর অনুসারীদেরকে 'ইবাদিয়া' বলা হয়।
২২. আত-তাবাকাত-৭/৩২
২৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১.৭৩; তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৭.

হযরত জাবিরের (রহ) ডাকনাম আবূ আশ-শা'ছা'। পিতার নাম যায়দ। আযদ গোত্রের সন্তান এবং বসরার অধিবাসী। উমান মতান্তরে বসরার 'আল-জাওফ' নামক স্থানের সাথে সম্পর্ক বুঝানোর জন্য তাঁকে 'আল-জাওফী' বলা হয়।

জ্ঞান ও মনীষা
হযরত জাবির (রহ) বহু 'আলিম সাহাবীর নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। তবে হাবরুল উম্মাহ্ (উম্মাতের মহাজ্ঞানী) হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) সাহচর্ষে সবচেয়ে বেশি অবস্থান করেন। এ কারণে তাঁকে "সাহিবু ইবন আল-আব্বাস" অর্থাৎ ইবন আল-আব্বাসের (রা) সাথী বলা হতো। এই সাহচর্যের কল্যাণে তিনি বিশাল জ্ঞানের অধিকারী হন এবং তাঁর সময়ের একজন বিশিষ্ট 'আলিম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে "আহাদুল আ'-লা-মি" বা "বিশিষ্টজনদের একজন” বলেছেন। ইমাম-নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর বিশ্বস্ততা, দৃঢ়তা ও সুউচ্চ মর্যাদার ব্যাপারে সকলে একমত। তিনি ছিলেন তাবি'ঈ ইমাম ও ফকীহদের মধ্যে একজন।

কুরআন
কুরআন, হাদীছ, ফিক্‌ তথা সকল ইসলামী জ্ঞানে তিনি সমান পারদর্শিতা অর্জন করেন। 'উলূমুল কুরআন বা কুরআন বিষয়ক বিবিধ জ্ঞানে ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। তাঁর মহান শিক্ষক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা), যিনি নিজেও একজন শ্রেষ্ঠ কুরআন বিশেষজ্ঞ ছিলেন, বলেন:
"বসরাবাসীরা যদি জাবির ইবন যায়দের কথা মেনে নেয় তাহলে কিতাবুল্লাহর (কুরআন) মধ্যে যা কিছু আছে সে বিষয়ে তাদের জ্ঞান অনেক প্রশস্ত হয়ে যাবে।"

হাদীছ
তিনি হাদীছেরও একজন বড় হাফিজ ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে হাদীছের বিশিষ্ট 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করেছেন। হাদীছের জ্ঞান তিনি অর্জন করেন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, হাকাম ইবন 'আমর আল-গিফারী, আমীর মু'আবিয়া (রা) প্রমুখের মত শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণের নিকট থেকে। তাঁর নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে 'আমর ইবন দীনার, ইয়া'লা ইবন মুসলিম, আইউব আস-সাখতিয়ানী, 'আমর ইবন জুরহুম (রহ) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ফিক্হ
ফিক্হ বিষয়েও তাঁর পূর্ণ দক্ষতা ছিল। ইমাম নাওবী (রহ) তাঁকে তাবি'ঈ ইমাম ও ফকীহদের মধ্যে গণ্য করেছেন। সাহাবা (রা) ও তাবি'ঈন কিরাম (রহ) ফিক্হ বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতার কথা স্বীকার করেছেন। দাহহাক আদ-দাব্বী বলেন, একবার হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) তাওয়াফের মধ্যে জাবির ইবন যায়দের দেখা পান। তখন তিনি জাবিরকে লক্ষ্য করেন বলেন:
"ওহে জাবির! তুমি বসরার একজন অন্যতম ফকীহ্ এবং তুমি মানুষের জিজ্ঞাসার জবাবে ফাতওয়া দিয়ে থাক। তবে কখনো স্পষ্টভাষী কুরআন ও কার্যকর সুন্নাহ ব্যতীত ফাতওয়া দেবে না। এমনটি না করলে তুমি নিজেও ধ্বংস হবে এবং অন্যদেরকেও ধ্বংস করবে।” হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন:
"আইউবকে জিজ্ঞেস করা হল: আপনি কি জাবির ইবন যায়দকে দেখেছেন? বললেন: হাঁ, দেখেছি। তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ। তারপর উচ্ছ্বসিতভাবে তাঁর ফিক্হ বিষয়ে আলোচনা করতে থাকেন।" ইয়াস ইবন মু'আবিয়া ছিলেন বসরার বিখ্যাত কাজী। তিনি বলেন:
"আমি বসরাবাসী ও তাদের মুফতী জাবির ইবন যায়দকে পেয়েছি।" অপর একটি বর্ণনামতে তিনি বলেন, জাবির ছাড়া বসরাবাসীদের সত্যিকার কোন মুফতী ছিল না। হযরত হাসান আল-বাসরীর (রহ) অনুপস্থিতিতে জাবির ফাতওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করতেন।

হযরত জাবির (রহ) কোন এক কারণে একবার কারারুদ্ধ হন। ধারণা করা হয় যে, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের যুলুম-অত্যাচারের শিকারে পরিণত হন তিনি। তাঁর জ্ঞানের উপর বসরাবাসীদের এত আস্থা ছিল যে, তারা তাদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর লাভের জন্য কারাগারে তাঁর নিকট ছুটে যেত। কাতাদা বলেন, জাবির কারারুদ্ধ হলেন। সে সময় হিজড়ের উত্তরাধিকারের বিষয়ে একটি সমস্যা দেখা দিলে লোকেরা কারাগারে তাঁর নিকট সমাধান চেয়ে পাঠালো। তিনি বললেন, তোমরা তো বেশ ভালো। আমাকে কারাগারে আটক রেখেছো, আবার আমার নিকট ফাতওয়াও চাচ্ছো। অতঃপর তিনি জবাব পাঠিয়ে দেন। বসরাবাসীদের কেউ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট কোন কিছু জানতে চাইলে বলতেন: "তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করছো, অথচ তোমাদের মধ্যে তো জাবির ইবন যায়দ আছে।"

হযরত জাবিরের ব্যক্তি সত্তাটি ছিল বহু জ্ঞানের সমাহার, তিনি তাঁর যুগের একজন খুব বড় 'আলিম ছিলেন। 'আমর ইবন দীনার বলতেন:
"আমি জাবির ইবন যায়দ অপেক্ষা ফাতওয়া বিষয়ে অধিক জানে এমন কাউকে দেখিনি।” তাঁর মৃত্যুর পর হযরত কাতাদার (রহ) মুখ থেকে বার বার উচ্চারিত হচ্ছিল: আল-ইয়াওমা দুফিনা ইলমুল আরদ্বি - “আজ পৃথিবীর জ্ঞান দাফন হয়ে গেল।”

জ্ঞান গ্রন্থাবদ্ধকরণ
সেই যুগের কিছু মহান ব্যক্তির মত তিনিও জ্ঞান গ্রন্থাবদ্ধ করা পছন্দ করতেন না। 'আমর ইবন দীনার বলেন, কিছু লোক জাবির ইবন যায়দকে বললো, মানুষ আপনার মুখ থেকে যা শোনে তা লিখে ফেলে। একথা শুনে তিনি "ইন্না লিল্লাহ" উচ্চারণ করে বলেন, তারা লিখে ফেলে? তাঁর অনীহা দেখে তাঁর ছাত্রদের অনেকে লেখা ছেড়ে দেয়।

এত জ্ঞান-গরীমার সাথে চারিত্রিক বহু গুণ ও বৈশিষ্ট্যে তিনি বিভূষিত ছিলেন। ভালো কাজের বিপরীতে দুনিয়ার যে কোন সুখ-সম্পদের কোন রকম গুরুত্ব তাঁর কাছে ছিল না। তিনি বলতেন, ষাট বছর জীবন পূর্ণ হতে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছু পেয়েছি, আল্লাহর বহু অনুগ্রহ লাভ করেছি। কিন্তু এই ভালো কাজ ছাড়া অবশিষ্ট যা কিছু আমি করেছি এবং এ সকল সুখ-সম্পদ আমার জুতার থেকেও হেয় ও তুচ্ছ। মুহাম্মাদ ইবন হুসায়ন বলতেন, আল্লাহ জাবিরের প্রতি দয়া করুন! তিনি দিরহামের বিপরীতেও একজন মুসলিম ছিলেন।

একটি অপবাদ ও তাঁর সম্পর্কহীনতা
চরমপন্থী খারিজী সম্প্রদায়ের একটি উপদলের নাম 'ইবাদিয়া' । তাদের কিছু লোক তাঁর কাছে আসা-যাওয়া করতো। এ কারণে তাঁর সম্পর্কে কিছু মানুষের এ ধারণা সৃষ্টি হয় যে, এই সম্প্রদায়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক আছে অথবা কমপক্ষে তাদের চিন্তা-দর্শন দ্বারা তিনি কিছুটা প্রভাবিত। কিন্তু তাদের এ ধারণা সবই অমূলক ও ভিত্তিহীন ছিল। ইবাদিয়াদের সাথে তাঁর উঠা-বসা ছিল ঠিক, তবে তাদের চিন্তা-দর্শনের সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না। তিনি তাঁর জীবনে বার বার এবং শেষ জীবনে অন্তিম রোগ শয্যায়ও ইবাদিয়াদের চিন্তা-বিশ্বাসের সাথে তাঁর সম্পর্কহীনতার কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন। তাঁর অন্তিম সময়ে যখন অবস্থা একেবারেই খারাপ হয়ে পড়ে তখন ছাবিত আল-বানানী তার কাছে জানতে চান, আপনার কোন ইচ্ছা আছে কি? বললেন: হাসান আল-বাসরীকে এক নজর দেখতে চাই। সে সময় হাসান আল-বাসরী (রহ) সরকারের কোপদৃষ্টিতে ছিলেন। তাই গ্রেফতার এড়াতে আবু খলীফা নামক এক ব্যক্তির গৃহে আত্মগোপন করে ছিলেন। তাঁকে জাবিরের ইচ্ছার কথা জানানো হলো। সাথে সাথে তিনি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিন্তু ছাবিত তাঁকে বাধা দিয়ে বলেন, বের হলে গ্রেফতার হওয়ার ভয় আছে। তিনি জবাব দিলেন : আল্লাহ আমাকে শত্রুর দৃষ্টি থেকে রক্ষা করবেন। তিনি নিষেধ উপেক্ষা করে তখনই রাতের অন্ধকারে জাবিরের নিকট পৌঁছেন। জাবিরের একা উঠে বসার শক্তি ছিল না। তাই অন্যের সাহায্য নিয়ে উঠে বসেন। হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে কালিমা তায়্যিবা পড়ার তালকীন দেন এবং তিনি কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করেন। তারপর তিনি ইবাদিয়াদের বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য জাবিরের কাছে জিজ্ঞেস করেন, ইবাদিয়াদের সাথে তোমার সম্পর্কের প্রকৃতিটি কেমন ছিল? জাবির বলেন, আমি আল্লাহর কাছে তাদের ব্যাপারে দায়মুক্তি চাই। হাসান আল-বাসরী (রহ) আবার প্রশ্ন করেন: তাদের ব্যাপারে তোমার ধারণা কি? জাবির তাদের সাথে নিজের সম্পর্কহীনতার কথা প্রকাশ করেন। তখন জাবিরের একান্তই অন্তিমদশা। এ কারণে হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁকে বিদায় দেওয়ার জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু তখনো জাবিরের জীবনকাল শেষ হয়নি। তাই হযরত হাসান (রহ) সুবহে সাদিক হওয়ার পর নামাযে জানাযার ভঙ্গিতে চারটি তাকবীর উচ্চারণ করে জাবিরের মাগফিরাতের জন্য দু'আ করেন। তারপর অন্ধকারেই নিজের অবস্থান স্থলে ফিরে যান। আর এ রোগেই হযরত জাবির (রহ) ইনতিকাল করেন।

ওফাত
ইমাম আহমাদ, আল-ফাল্লাস ও বুখারীর মতে তিনি হিজরী ৯৩ সনে ইনতিকাল করেন। পক্ষান্তরে আল-ওয়াকিদী ও ইবন সা'দের মতে তাঁর মৃত্যু সন হিজরী ১০৩ এবং আল- হায়ছাম ইবন 'আদীর মতে হিজরী ১০৪

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭২
২. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-৩/২৮৬
৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩
৪. প্রাগুক্ত
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৪২
৬. তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৬
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-২/৩৮
৯. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৪২
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩
১১. প্রাগুক্ত; আত-তাবাকাত-৭/১৩১
১২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭২
১৩. আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十四. তাহযীব আত-তাহযীব-২/৩৮
十五. আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十六. তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৬
十七. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩; আত-তাবাকাত-৭/১৩১
十八. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩
十九. আত-তাবাকাত-৭/১৩৬
二十. প্রাগুক্ত-৭/১৩৪
২১. 'আবদুল্লাহ ইবন ইবাদ-এর অনুসারীদেরকে 'ইবাদিয়া' বলা হয়।
২২. আত-তাবাকাত-৭/৩২
২৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১.৭৩; তাহযীব আল-কামাল-৩/২৮৭.

ফন্ট সাইজ
15px
17px