📄 ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আওন (রহ)
হযরত 'আবদুল্লাহর ডাকনাম আবু 'আওন। তিনি 'আবদুল্লাহ ইবন দুরা আল-মুযানীর দাস ছিলেন। জারিফ প্লাবনের তিন বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি কৃষ্ণার শ্রেষ্ঠ 'আলিমদের মধ্যে ছিলেন। ইমাম আছ-ছাওরী বলতেন, আমি আইউব, ইউনুস, তায়মী এবং 'আওনের মত জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের একটি শহরে একত্রে আর কোথাও দেখিনি।
হাদীছ
হযরত 'আবদুল্লাহ সকল ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। তবে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) হাদীছের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও আকর্ষণ এবং তাতে তিনি এক বিশেষ মর্যাদার আসন লাভ করেন। ইবন সা'দ বলেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত, বহু হাদীছের ধারক-বাহক ও বর্ণনাকারী।" তিনি তাঁর যুগের সকল বড় মুহাদ্দিছের জ্ঞান আত্মস্থ করেন। ইবন 'আদী বলেন, ইবন 'আওন এমন সব সনদবিশিষ্ট হাদীছ সংরক্ষণ করেন যা তাঁর অন্য কোন সঙ্গী-সাথী করতে পারেননি। মদীনার শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছগণের মধ্যে তিনি হযরত সালিম, কাসিম; বসরার মুহাদ্দিছগণের মধ্যে হযরত হাসান আল-বাসরী, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন; কুফার মুহাদ্দিছগণের মধ্যে ইমাম শা'বী, ইমাম নাখা'ঈ; মক্কার মুহাদ্দিছগণের মধ্যে হযরত 'আতা', মুজাহিদ; শামের মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মাকহুল ও রাজা' ইবন হায়ওয়া (রহ) থেকে হাদীছ শোনেন। এভাবে তিনি তৎকালীন সকল হাদীছ চর্চার কেন্দ্রগুলোর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছগণের হাদীছসমূহ লাভ করেন। এছাড়া আরো বহু 'আলিমের নিকট থেকে ফায়দা হাসিল করেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হলেন: ছুমামা ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন আনাস, আনাস ইবন সীরীন, যিয়াদ ইবন যুবায়র, 'আবদুর রহমান ইবন আবী বাকরা, মূসা ইবন আনাস ইবনে মালিক, হিশাম ইবন যায়দ ইবন আনাস, সা'ঈদ ইবন জুবায়র, নাফি' (রহ) প্রমুখ। এ সকল মহান ব্যক্তির সাহচর্য ও উদারতায় তিনি যে জ্ঞান অর্জন করেন তার পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। ইবন মাহদী বলেন, ইরাকে ইবন 'আওনের চেয়ে সুন্নাহ্র বড় 'আলিম আর কেউ ছিলেন না। 'উছমান আল-বাত্তী বলতেন, আমার এ দুচোখ 'আবদুল্লাহ ইবন 'আওনের মত আর কাউকে দেখিনি।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক (রহ) বলতেন, আমি সাক্ষাতের পূর্বে যে সকল ব্যক্তির কথা শুনেছিলাম তাঁদের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ইবন 'আওন, রাজা' ইবন হায়ওয়া ও সুফইয়ান ছাড়া অবশিষ্ট সকলকে সাক্ষাতের পর নিম্নমানের পেয়েছি। তবে ইবন 'আওনের সাথে সাক্ষাতের পর মন চাইতো, চিরদিনের জন্য তাঁর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাই এবং মরণ পর্যন্ত পৃথক না হই। একবার হিশাম ইবন হাসান একটি হাদীছ বর্ণনা করেন। একজন জিজ্ঞেস করলো: হাদীছটি আপনি কার নিকট থেকে শুনেছেন? জবার দিলেন: এমন ব্যক্তির নিকট থেকে যার সমকক্ষ আর কাউকে আমার চোখ দেখেনি। তিনি হাসান আল-বাসরী ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীনকেও ব্যতিক্রম বলেননি।
হাদীছ বর্ণনায় ভীতি ও সতর্কতা
এত গভীর ও ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনায় দারুণ সতর্ক ছিলেন। মানুষকে হাদীছ শোনাতে হবে এই ভয়ে রাস্তা-ঘাটে বের হওয়া বন্ধ করে দেন। বাক্কার ইবন মুহাম্মাদ বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আওন আমাকে বললেন: ভাতিজা! মানুষ আমার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন আমি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হতে পারিনে। বাক্কার বলেন, তাঁর এ কথার অর্থ এই ছিল যে, মানুষ তাঁর কাছে হাদীছ জিজ্ঞেস করতো। তা সত্ত্বেও তিনি হাদীছ বর্ণনার দ্বার একেবারে রুদ্ধ করে দেননি। আলিমগণের স্বীকৃত ও সত্যায়িত হাদীছ তিনি বর্ণনা করতেন। বাক্কার বলেন, ইবন 'আওন কুফাতেই সর্বাধিক জ্ঞান অর্জন করেন এবং তা মুহাম্মাদের সামনে উপস্থাপন করেন। মুহাম্মাদ তা শুনে যে হাদীছের ব্যাপরে একমত ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন, ইবন 'আওন তাই বর্ণনা করেন এবং অবশিষ্টগুলো বাদ দেন।
ছাত্রবৃন্দ
তাঁর ছাত্রদের মধ্যে বড় বড় ইমামও আছেন। যেমন: আ'মাশ, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, শু'বা (রহ) প্রমুখ। সাধারণ ছাত্রদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। তাদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: দাউদ ইবন আবী হিন্দ, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, 'আব্বাদ ইবন আল-'আওয়াম, হাশীম, ইয়াযীদ ইবন যুরায়'ই, ইবন 'আলিয়্যা, বিশর ইবন মুফাদ্দাল, মু'আয, ইয়াযীদ ইবন হারুন, আবু 'আসিম, মুহাম্মাদ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-আনসারী (রহ) ও আরো অনেকে।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
জ্ঞানের চেয়েও তিনি তাঁর তাকওয়া-পরহেযগারী, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলীতে বেশি দীপ্তিমান ছিলেন। ইবন হিব্বান বলেন, ইবাদত-বন্দেগী, তাওয়া-পরহেযগারী, সুন্নাতের অনুসরণ এবং বিদ'আতীদের প্রতি কঠোরতার ব্যাপারে তিনি সমকালীনদের মধ্যে অন্যতম নেতা ছিলেন।
'আকীদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে কঠোরতা
'আকীদার ব্যাপারে তিনি সাহাবায়ে কিরামের (রা) পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন 'আকীদা-বিশ্বাসের অনুসারী ছিলেন এবং এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কম-বেশি করাকে দারুণ অপছন্দ করতেন। আর যারা এমন করতো তাদের তিনি সালামও করতেন না। একবার তাঁর সামনে 'কদর' বিষয়ে আলোচনা হলে তিনি বললেন, এই 'আকীদার বয়সের চেয়ে আমার বয়স বেশি। আমি সা'ঈদ আল-জুহানী ও সানওয়াইহ ব্যতীত পূর্ববর্তীদের কেউ এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলে শুনিনি মূলত এ একটি মন্দ চিন্তা।
'ইবাদত
তাঁর তাওয়া-পরহেযগারী ও ইবাদত-বন্দেগীর মাত্রা মুহাম্মাদ ইবন সীরীনকেও হার মানিয়ে দেয়। কুররা বলেন, আমরা মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের আল্লাহ-ভীতি দেখে অবাক হতাম, কিন্তু 'আবদুল্লাহ ইবন আওন তাঁকেও হার মানান। তাঁর প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল 'ইবাদত। ফজরের নামাযের পর কিবলামুখী হয়ে বসে যিকর করতেন। সূর্যোদয়ের পর ইশরাকের নামায আদায় করে মানুষের সামনে আসতেন। প্রত্যেক রাতে কয়েক শো রাক'আত নফল নামায পড়তেন। কোন কারণে কোন রাতে যদি তা আদায় করতে না পারতেন তাহলে দিনে তা পূরণ করতেন। বাড়ীর সীমানার মধ্যে একটি বিশেষ মসজিদ ছিল। মাগরিব ও 'ঈশা ছাড়া বাকী তিন ওয়াকতের নামায নিজের ছেলে, ভাই এবং উপস্থিত লোকদের নিয়ে এই মসজিদে পড়তেন। জুম'আ ও দু'ঈদের নামাযকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। গোসল করে সুন্দর রুচিসম্মত পোশাক পরে খোশবু লাগাতেন। কখনো বাহনে চড়ে, আবার কখনো পায়ে হেঁটে মসজিদে যেতেন। জুম'আর নামায আদায় করার পরই ঘরে ফিরে যেতেন এবং সুন্নাত-নফল নামায ঘরেই আদায় করতেন। রমযান মাসে 'ইবাদতের মাত্রা অনেক বেড়ে যেত। ফরয নামায জামা'আতের সাথে আদায়ের পর ঘরে ফিরতেন। নির্জনে ইবাদত করতেন এবং নির্জনে বসে বসে- الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبَّنَا এই যিকরে মশগুল থাকতেন। একদিন পর একদিন করে সারা বছর রোযা রাখতেন এবং আমরণ এই নিয়মের ভিন্নতা হয়নি।
জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর (আল্লাহর পথে জিহাদ) উদ্দেশ্যে বিশেষ যত্নে একটি উস্ত্রী পালতেন এবং সেটাকে খুবই ভালোবাসতেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে তাঁর অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়। রোমানদের সাথে কোন একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং একজন রোমান সৈনিকের সাথে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাকে হত্যা করেন।
আত্মশুদ্ধি
আত্মশুদ্ধি ব্যতীত দুনিয়ার আর কোন কিছুর প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল না। বাক্কার ইবন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেছেন, ইবন 'আওন না কারো সাথে রসিকতা করতেন, আর না করতেন কারো সাথে তর্ক-বিতর্ক। কবিতা আবৃত্তিও করতেন না। তিনি কেবল আত্মপরিশুদ্ধির কাজেই নিয়োজিত থাকতেন।
উপকার করে গোপন রাখা
কারো কোন উপকার করে তা প্রকাশ করা খারাপ মনে করতেন। বাক্কার ইবন মুহাম্মাদ বলেন, ইবন 'আওন কারো প্রতি অনুগ্রহ বা সদাচরণ করলে এত গোপনে করতেন যে, কেউ জানতে পারতো না। অন্যের নিকট তা প্রকাশ করা খুবই খারাপ বলে বিশ্বাস করতেন।
কসম পরিহার
তিনি কসম খাওয়া ভালো কাজ বলে মনে করতেন না। কখনো সত্য কসমও খেতেন না। বাক্কার ইবন মুহাম্মাদ বলেন, আমি তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত একটা দীর্ঘ সময় তাঁর সাথে ছিলাম। এ সময়ের মধ্যে কখনো তাঁকে সত্য-মিথ্যা কোন রকম কসম খেতে দেখিনি।
নৈতিক চরিত্র
তিনি অত্যন্ত বিনম্র, বিনয়ী ও উত্তম চরিত্রের মানুষ ছিলেন। কোন অবস্থাতে তাঁর মুখ থেকে কোন অশালীন কথা বের হতো না। বাক্কার বলেন, আমি ইবন 'আওনের চেয়ে বেশি জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এমন কোন মানুষ দেখিনি। তিনি নিজের দাস-দাসী, এমন কি ছাগল-মুরগীকে পর্যন্ত কখনো গালি দিতেন না। জিহাদের যে উস্ত্রীকে তিনি খুবই ভালোবাসতেন তার পিঠে একবার পানি বোঝাই করে আনার জন্য দাসকে নির্দেশ দেন। সে নির্দয়ভাবে উষ্ট্রীর মুখে পেটায় এবং তাতে চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লোকেরা ধারণা করলো যে, দাসের এ আচরণে তিনি অবশ্যই ক্ষুব্ধ হবেন। কিন্তু যখন উষ্ট্রীর প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়লো তখন দাসকে শুধু এতটুকু বললেন, সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন। তুমি পেটানোর জন্য উষ্ট্রীর মুখমণ্ডল ছাড়া দেহের আর কোন অংশ কি পাওনি? তারপর তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে বাড়ী থেকে বের করে দেন। দারুণ সহনশীল ছিলেন। যাদের হাতে তিনি দৈহিকভাবে নির্যাতিত হতেন তাদেরকেও নিন্দা মন্দ করতেন না। একবার তিনি একজন আরব মহিলাকে বিয়ে করলেন। বিলাল ইবন আবী বুরদা তাঁকে এ জন্য চাবুক মারে যে, দাস হয়ে আরব মহিলাকে বিয়ে করেছে। বাক্কার বলেন, আমি এ ঘটনার পরেও ইবন 'আওনের মুখে বিলাল সম্পর্কে একটি কথাও শুনিনি। একবার কিছু লোক বললো, বিলাল আপনার সঙ্গে দারুণ অসদাচরণ করেছে। জবাবে বললেন: একজন মানুষ মজলুম হয়, কিন্তু সেই ঐ যুলুমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে নিজেই শেষে জালিম হয়ে যায়। তোমাদের মধ্যে কেউই আমার চেয়ে বেশি বিলালের প্রতি কঠোর নও। কিন্তু আমি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে নিজেই জালিম হতে পারবো না।
হযরত রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি ভালোবাসা
হযরত রাসূলে কারীমকে (সা) তিনি সীমাহীন ভালোবাসতেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আশা ছিল স্বপ্নে অন্তত একবার তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করা। আল্লাহ তাঁর এ নেক আশা পূর্ণ করেন। মৃত্যুর অল্প কিছু দিন পূর্বে স্বপ্নের মধ্যে এই দীদার সম্পন্ন হয়। এই ঘটনায় তিনি এতই আবেগ আপ্লুত হন যে, ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে মসজিদে যান এবং খুশীর আতিশয্যে মাটিতে পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পান। কিন্তু একটি মহা সৌভাগ্যের স্মৃতিকে ধরে রাখার মানসে সেই আঘাতের কোন চিকিৎসা করাননি।
ওফাত
অবশেষে এই আঘাত তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে এই রোগের সকল কষ্ট সহ্য করেন। বাক্কার ইবন মুহাম্মাদ বলেন, রোগগ্রস্ত অবস্থায় তিনি বাঘের চেয়েও বেশি ধৈর্য ও সহনশীল ছিলেন। এ সময় মুখ থেকে একটি অভিযোগমূলক শব্দও উচ্চারিত হয়নি। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত তিনি সচেতন ছিলেন। আমার ফুফু উম্মু মুহাম্মাদ বিন্ত আবদিল্লাহর কথামত আমি ইবন 'আওনের অন্তিম মুহূর্তে সূরা ইয়াসীন পাঠ করে তাঁকে শুনিয়েছিলাম। আমি মৃত্যুর সময় তাঁর চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান আর কাউকে দেখিনি। যতক্ষণ শ্বাস-প্রশ্বাস ছিল ততক্ষণ কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর যিক্র করতে থাকেন। অবশেষে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার সকল সমস্যার সমাধান করে দেন। হিজরী ১৫১ সনের রজব মাসে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। জানায় এত বেশি লোকের সমাগম হয় যে, মসজিদের মূল ভবনসহ গোটা আঙ্গিনা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। মিহরাবে খাটিয়ায় লাশ রেখে সালাতুল জানাযা আদায় করা হয়। জানাযার নামায পড়ান জামীল ইবন মাহফুজ আল-আযদী।
উত্তরাধিকার
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আওনের (রহ) কোন নগদ অর্থ ছিল না। দু'টি বাড়ী ছিল যার এক-পঞ্চমাংশ নিকটতম আত্মীয়-বন্ধুদের অনুকুলে অসীয়াত করে যান। দশ হাজারের কিছু বেশি দিরহামের ঋণ ছিল। তা পরিশোধ করার পর তার অসীয়াত পূরণ করা হয়। অত্যন্ত সুদর্শন মানুষ ছিলেন। মোঁচ এত ঘন ছিল না। তবে ছাঁটতেন। পরিচ্ছন্ন রুচি ও মেজাজের ছিলেন। কোমল ও পাতলা কাপড়ের সুন্দর পোশাক পরতেন। খুব বেশি সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। পূর্ণ পোশাকে ঘর থেকে বের হতেন। ওজু ও আহারের সময় খাদিম রুমাল এগিয়ে দিত, তা দিয়ে তিনি হাত-মুখ মুছে ফেলতেন। রসুনসহ দুর্গন্ধ জাতীয় খাবার খুবই অপছন্দ করতেন। যে খাবারে রসুন থাকতো তা স্পর্শ করতেন না। একবার দাসী খাবার তৈরি করে সামনে আনে। তিনি রসুনের গন্ধ পেয়ে দাসীকে জিজ্ঞেস করেন। সে স্বীকার করে। অত্যন্ত সহনশীল প্রকৃতির ছিলেন তাই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে শুধু এতটুকু বলেন যে, আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন, আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন! এ খাবার আমার সামনে থেকে নিয়ে যাও।
টিকাঃ
১. তাবাকাত ইবন সা'দ-৭/২৫
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৩৪৭
৩. তাবাকাত-৭/২৪
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৩৪৭' তাহযীব আল-কামাল-১০/৩৯৬
৫. প্রাগুক্ত
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৩৪৮
৭. তাহযীব আল-কামার-১০/৩৯৬
৮. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৩৪৮
৯. তাবাকাত-৭/২৭
১০. প্রাগুক্ত-৭/২৫
১১. প্রাগুক্ত-৭/২৭
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৩৪৭' তাহযীব আল-কামাল-১০/৩৯৬
১৩. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৩৪৮
十四. তাবাকাত-৭/২৫
十五. প্রাগুক্ত
十六. শাযারাত আয-যাহাব-১/২৩০; তাহযীব আল-কামাল-১০/৩৯৮
十七. তাবাকাত-৭/২৫
十八. প্রাগুক্ত
十九. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৩৪৮
二十. তাবাকাত-৫/২৮
二十一. প্রাগুক্ত
二十二. প্রাগুক্ত
二十三. প্রাগুক্ত
二十四. প্রাগুক্ত-৭/২৮
二十五. প্রাগুক্ত-৭/২৫; তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৩৪৮
二十六. তাবাকাত-৭/২৫
二十七. তাহযীব আল-কামাল-১০/৩৯৭-৩৯৮
二十八. প্রাগুক্ত; তাবাকাত-৭/২৯-৩০; তাবি'ঈন-২৪৬
二十九. তাবাকাত-৭/৩০
三十. প্রাগুক্ত-৭/৩৬; তাবি'ঈন-২৪৬
📄 ইয়াস ইবন মু‘আবিয়া (রহ)
বর্তমান সৌদি আরবের নাজদ-এর অন্তর্গত আল-ইয়ামামা প্রদেশে হিজরী ৪৬ সনে ইয়াস ইবন মু'আবিয়া জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পরিবারের সাথে বসরায় চলে যান এবং সেখানে বেড়ে ওঠেন ও শিক্ষা লাভ করেন। জীবনের প্রথম ভাগে মাঝে মাঝে দিমাশকে গেছেন। তাঁর সময়ে জীবিত মহান সাহাবায়ে কিরাম (রা) ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈদের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। শৈশবেই তাঁর মধ্যে প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও সৌভাগ্যের লক্ষণ দেখা যায়। তখনই তাঁর মেধা ও মননের কথা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
ইয়াস-এর ডাকনাম আবূ ওয়াছিলা এবং পিতার নাম মু'আবিয়া ইবন কুবরা। ইয়াস তাঁর যুগের একজন বিখ্যাত কাজী ছিলেন।
হাদীছ ও ফিক্হ
হাদীছ বর্ণনায় তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। তার অর্থ এ নয় যে, এ ক্ষেত্রে তাঁর কোন অবদান নেই। ইবন সা'দ বলেছেন, তিনি অনেক হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি পিতা মু'আবিয়া, আনাস ইবন মালিক, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব, সা'ঈদ ইবন জুবায়র, আবু মিযলায (রহ) প্রমুখের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। আইয়ূব, দাউদ ইবন আবী হিন্দ, হুমাইদ আত-তাবীল, হাম্মাদ শা'বান, শু'বা, মু'আবি ইবন 'আবদিল কারীম (রহ) প্রমুখ মুহাদ্দিছ তাঁর ছাত্র। ফিক্হ ছিল তাঁর বিশেষ অধীত বিষয়। এ শাস্ত্রে তাঁর ছিল বিশেষ অবস্থান। তাঁর জীবনীকারগণ তাঁকে ফকীহ বলে উল্লেখ করেছেন।
কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন
ফিক্হ শাস্ত্রে তাঁর অত্যধিক যোগ্যতার কারণে উমাইয়্যা শাসনামলে বসরার কাজী হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তাঁর নিয়োগ লাভের পর হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। হযরত হাসানকে (রহ) দেখে তিনি কাঁদতে শুরু করেন। উল্লেখ্য যে, হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) তাঁকে বসরার কাজী নিয়োগ করেন।
তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধা, বুদ্ধি ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। ইবন সা'দ লিখেছেন : ক্যানা আ-ক্বিলান মিনার রিজা-লি ফাত্বিনান। তিনি ছিলেন একজন বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ মানুষ। প্রখ্যাত তাবি'ঈ হযরত ইবন সীরীনের (রহ) সামনে তাঁর প্রসঙ্গে কোন কথা উঠলে বলতেন, তিনি তো একজন বাস্তব বুদ্ধি ও বিচক্ষণতাসম্পন্ন ব্যক্তি। তাঁর সমকালীন লোকেরা বলতো, প্রত্যেক শতকে একজন অতি বড় বুদ্ধিমান মানুষের জন্ম হয়। এই শতকের সেই বুদ্ধিমান ব্যক্তিটি হলেন ইয়াস ইবন মু'আবিয়া (রহ)। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন, তাঁর বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা প্রবাদে পরিণত হয়। যেমন বিখ্যাত কবি আবূ তাম্মামের একটি শ্লোকে এসেছে।
ইক্বদা-মু ‘আমরিন ফী শুজা-‘আতি গানতারিন + ফী হিলমি আহনাফা ফী যাকা-য়ি ইয়াসিন
'(প্রশংসিত ব্যক্তি আহমাদ ইবন আল-মু'তাসিম) ছিলেন, সাহসী পদক্ষেপে 'আমর ইবন মা'দিকারিব, বীরত্ব-সাহসিকতায় গানতার, ধৈর্য-সহনশীলতায় আহনাফ ইবন কায়স ও বুদ্ধি-বিচক্ষণতায় ইয়াস। অন্য একটি বর্ণনায় ফী সামা-হাতি হা-তামিন (বদান্যতায় হাতিম তাঈ) এসেছে।
বিচার কাজের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনেকটা নির্ভর করে বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার উপর। এ কারণে ইয়াস ছিলেন উমাইয়্যা যুগের শ্রেষ্ঠ ও সফল বিচারকদের একজন। তাঁর প্রখর মেধা ও বুদ্ধিমত্তার বহু চমকপ্রদ ঘটনা সীরাতের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। এখানে তার বুদ্ধিমত্তার কয়েকটি ঘটনা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো।
একবার এক বিচার কাজের প্রয়োজনে চারজন মহিলা তাঁর আদালতে উপস্থিত হয়। তিনি তাদেরকে দেখামাত্র বলে দেন, এই চারজনের একজন গর্ভবতী, একজন তাঁর শিশু- সন্তানকে দুধ পান করায়, একজন বিবাহিত এবং একজন কুমারী। উপস্থিত লোকেরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেল, তাঁর ধারণা সঠিক। তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কিসের ভিত্তিতে এ অনুমান করলেন? বললেন, গর্ভবতী মহিলাটি যখন কথা বলছিল তখন তার কাপড় পেট থেকে উঠে যাচ্ছিল, যে শিশুকে দুধ পান করায় তার বুক দুলছিল, বিবাহিত যে, সে চোখে চোখ রেখে কথা বলছিল এবং কুমারী চোখ নীচু করে কথা বলছিল, আর আমি এসব আলামত দ্বারাই তাদের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলাম।
একবার এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির নিকট কিছু অর্থ গচ্ছিত রাখে। যখন সে তার অর্থ ফেরত চায়, সে গচ্ছিত রাখার কথা অস্বীকার করে। অর্থের মালিক ইয়াসের আদালতে মামলা দায়ের করে। ইয়াস লোকটিকে বলেন, তুমি এখন চলে যাও এবং বিষয়টি গোপন রাখ। বিবাদী যেন বিষয়টি কোনভাবে জানতে না পারে যে, তুমি আমার নিকট এসেছিলে। দুদিন পরে আবার আসবে। এভাবে বাদীকে ফিরিয়ে দিয়ে ইয়াস বিবাদীকে ডেকে পাঠান। সে উপস্থিত হলে তাকে বলেন, আমার নিকট অনেক অর্থ এসে গেছে, তোমার ঘরটি বেশ মজবুত। তাই আমি আমার কিছু অর্থ তোমার নিকট আমানত রাখতে চাই। সে বলে, ঠিক আছে রাখুন। ইয়াস বললেন, এত অর্থ রাখার জন্য কোন স্থান নির্ধারণ করে বহন করার জন্য লোক সঙ্গে করে আবার এসো। লোকটি চলে গেলে ইয়াস বাদীকে ডেকে এনে বললেন, এবার তুমি তোমার আমানতদারের নিকট যেয়ে তোমার অর্থ ফেরত চাও। যদি দেয় তাহলে তো ভালো, অন্যথায় বলবে, আমার সম্পদ ফিরিয়ে দাও, নইলে আমি কাজী ইয়াসকে বলবো। একথার পর লোকটি তার অর্থ ফিরিয়ে দেয়। এরপর পূর্বের কথামতো লোকটি ইয়াসের নিকট আসে অর্থ নেওয়ার জন্য। কাজী ইয়াস তাঁকে কঠোরভাবে তিরস্কার করে বিদায় দেন।
যৌবনে ইয়াস একাগ্রচিত্তে জ্ঞান ও গবেষণায় মেতে ওঠেন এবং অল্প কালের মধ্যে এতখানি পাণ্ডিত্য ও প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন যে, অনেক বড় বড় শায়খ তাঁর নিকট এসে তাঁর ছাত্রের খাতায় নাম লেখাতে শুরু করেন। তখনও কিন্তু তিনি একজন তরুণ।
একবার 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান বসরা ভ্রমণে গেলেন। তখনও তিনি খলীফা হননি। ইয়াসের তখন দাড়ি-গোঁফ গজায়নি। একদিন 'আবদুল মালিক দেখেন, তরুণ ইয়াস আগে আগে চলছেন, আর পিছনে পিছনে তাঁকে অনুসরণ করছেন সবুজ জোব্বা- পাগড়ী পরিহিত লম্বা দাড়িওয়ালা চারজন কারী। এ দৃশ্য দেখে 'আবদুল মালিক বললেন,- আফসোস এই লম্বা দাড়িওয়ালা লোকদের জন্য! তাদের কেউ একজন সামনে না গিয়ে এই যুবককে সামনে দিয়েছে? তারপর তিনি ইয়াসকে লক্ষ্য করে বললেনঃ ওহে নও- জোয়ান! তোমার বয়স কত?
ইয়াস বললেন: আল্লাহ আমীরকে দীর্ঘজীবি করুন! আমার বয়স উসামা ইবন যায়দের (রা) সেই বয়সের সমান যখন রাসূল (সা) তাঁকে একটি বাহিনীর অধিনায়ক করেন, আর সেই বাহিনীতে ছিলেন আবু বাকর ও উমার (রা)। জবাব শুনে 'আবদুল মালিক বলেনঃ ওহে নও-জোয়ান! তুমি সামনে চল, তুমি সামনে চল। আল্লাহ তোমাকে আরো বরকত, আরো সমৃদ্ধি দান করুন!
একবার মানুষ রমযানের চাঁদ দেখার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে ফাঁকা ময়দানে গেছে। তাঁদের মধ্যে মহান সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকও (রা) আছেন। তখন তিনি বার্ধক্যের ভারে জর্জরিত। বয়স প্রায় একশো বছরের কাছাকাছি। মানুষ আকাশে তন্ন তন্ন করে কিছুই দেখতে পেল না। কিন্তু আনাস (রা) আকাশের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থেকে এক সময় বলতে লাগলেন! আমি নতুন চাঁদ দেখেছি। এই যে এখানে। হাত দিয়ে ইশারা করেও দেখাতে লাগলেন। কিন্তু কেউ কিছু দেখতে পেল না। পাশেই ইয়াস ছিলেন। তিনি হযরত আনাসের (রা) দিকে তাকিয়ে দেখেন, তাঁর ভ্রূর একটি লম্বা পশম তাঁর চোখের উপর ঝুলে পড়েছে। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে অনুমতি নিয়ে হাত দিয়ে সেই পশমটি সরিয়ে ভ্রূটি সমান করে দেন। তারপর তাঁকে জিজ্ঞেস করেন! এখন কি চাঁদ দেখতে পাচ্ছেন, হে আল্লাহর রাসূলের সাহাবী? আনাস (রা) আবার আকাশের দিকে তাকালেন এবং বলতে লাগলেন: না, আমি তো চাঁদ দেখছি না, আমি তো দেখছি না।
হযরত ইয়াসের জ্ঞান ও তীক্ষ্ণ মেধার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ তাঁর নিকট ছুটে আসতে থাকে ইল্ল্ম ও দীন (জ্ঞান ও ধর্ম) বিষয়ে তাদের নানা প্রশ্ন ও সমস্যার সমাধান জানার উদ্দেশ্যে। অনেকে আবার আসে কুট- বিতর্কে জড়িয়ে তাঁকে অক্ষম করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। বর্ণিত হয়েছে, একবার এক আঞ্চলিক নেতা তাঁর মজলিসে উপস্থিত হয়ে প্রশ্ন করে : আবু ওয়াছিলা! নেশা উদ্রেককারী বস্তু সম্পর্কে আপনার মত কি? বললেন : সবই হারাম।
লোকটি বললো : হারাম হওয়ার কারণ কি? কিছু খোরমায় পানি ঢেলে তা গরম করা ছাড়া তো তাতে আর কিছু মেশানো হয়নি। পানি ও খোরমা দুটি জিনিসই তো হালাল। তাহলে তা হারাম হবে কেন?
ইয়াস বললেন : ওহে নেতাজি! আপনার বক্তব্য কি শেষ হয়েছে?
লোকটি বলল : হয়েছে।
ইয়াস বললো : যদি আমি এক অঞ্জলী পানি আপনার শরীরে ছুড়ে মারি তাতে কি আপনি কষ্ট পাবেন?
নেতা বললেন : না।
ইয়াস বললেন : যদি আমি এক মুট ধুলি আপনার দেহে ছুড়ে মারি তাতে কি আপনি কষ্ট পাবেন?
নেতা বললেন : না।
ইয়াস বললেন : যদি এক মুট ভূষি ছুড়ে মারি?
নেতা বললেন : তাতেও আমি কষ্ট পাব না।
ইয়াস বললেন : যদি আমি এই জিনিসগুলো ভালো করে এক সাথে মিশিয়ে রোদে শুকিয়ে শক্ত করে নেই এবং আপনার দেহে ছুড়ে মারি তাতে কি আপনি কষ্ট পাবেন?
নেতা বললেন : হাঁ, কষ্ট পাব। আপনি আমাকে শেষ করে দিলেন।
ইয়াস বললেন : মদের বিষয়টিও এমন। যখন তার বিভিন্ন উপাদান বিশেষ প্রক্রিয়ায় একত্র করা হয়েছে তখন তা নেশা উদ্রেককারী বস্তুতে পরিণত হয়ে হারাম হয়ে গেছে।
ছোট বেলায় তিনি একটি মকতবে এক ইয়াহূদী শিক্ষকের নিকট অংক শিখতেন। একদিন ইয়াসের উপস্থিতিতে সেই শিক্ষকের নিকট তার কয়েকজন ইয়াহুদী বন্ধু আসলো। তারা বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো। ইয়াস চুপ করে এমনভাবে শুনলেন যেন তিনি কিছুই বোঝেন না, কিছুই জানেন না। আলোচনার এক পর্যায়ে শিক্ষক তার বন্ধুদের লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা কি মুসলমানদের এই বিশ্বাসের ব্যাপারে অবাক হবে না যে, তারা জান্নাতে পানাহার করবে কিন্তু মল-মূত্র ত্যাগের প্রয়োজন হবে না? কথাটি শোনামাত্র ইয়াস আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে বললেন: উস্তাদ! আপনারা যে বিষয়ে আলোচনা করছেন সে সম্পর্কে আমাকে কিছু কথা বলার অনুমতি দেবেন কি?
উস্তাদ বললেন: হাঁ, বল।
ইয়াস বললেন: এ পৃথিবীতে আমরা যা কিছু পানাহার করি তা সবই কি মল-মূত্রের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়?
উস্তাদ বললেন: না।
ইয়াস প্রশ্ন করলেন: তাহলে যা বের হয় না তা কোথায় যায়?
উস্তাদ বললেন: দেহের খাদ্য হিসেবে ক্ষয় হয়ে যায়।
ইয়াস বললেন: পৃথিবীতে মানুষ যা কিছু খায় তার কিছু অংশ যদি দেহের খাদ্য হিসেবে ক্ষয় হয়ে যেতে পারে তাহলে জান্নাতে সব কিছু খাদ্য হিসেবে ক্ষয় হলে তাতে অবাক হওয়ার কি আছে?
উস্তাদ তাঁর হাতটি ইয়াসের পিঠের উপর রেখে বললেন: বালক! আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। মতান্তরে উস্তাদ তাঁকে বলেন, তুমি একটা শয়তান।
হযরত ইয়াস ইবন মু'আবিয়া (রহ) কাজী হওয়ার পর মাঝে মধ্যে এমন সব পরিবেশ- পরিস্থিতির মুখোমুখী হন যেখানে তাঁর উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা ও অভিনব কর্মপন্থার প্রকাশ ঘটে। তিনি তাঁর অতুলনীয় মেধা ও কর্মকৌশলের সাহায্যে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করেন। একবার দুব্যক্তি একটি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তাঁর নিকট এলো। একজন দাবী করলো সে অন্যজনের নিকট কিছু অর্থ গচ্ছিত রেখেছিল। কিন্তু যখন সে তার অর্থ ফেরৎ চায় সে তা দিতে অস্বীকার করে।
ইয়াস বিবাদীর নিকট গচ্ছিত রাখার বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে সে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলে, যদি আমার প্রতিপক্ষের কোন প্রমাণ থাকে, সে যেন তা উপস্থাপন করে। তা না হলে আমাকে কসম করে অস্বীকার করা ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই। লোকটির ভাবগতিক দেখে ইয়াস শঙ্কিত হলো এই ভেবে যে, সে গচ্ছিত অর্থের পুরোটাই হজম করে ফেলতে চাচ্ছে। এজন্য তিনি বাদীকে লক্ষ্য করে বললেন: কোন্ জায়গায় বসে তার কাছে অর্থ আমানত রেখেছিলে?
বললো: অমুক জায়গায়।
ইয়াস: সেখানে কি কি আছে?
বললো: একটি বড় গাছ আছে। তার নিচে বসে আমরা কিছু খাবার খাই, তারপর যাওয়ার সময় আমি আমার অর্থ তার হাতে তুলে দিই।
ইয়াস: তুমি সেই গাছের নিচে যাও। হতে পারে সেখানে গেলে তোমার মনে পড়বে তোমার অর্থ তুমি কোথায় রেখেছো বা ফেলে এসেছো। তারপর ফিরে এসে সেখানে কি দেখলে তা আমাকে জানাবে।
লোকটি চলে গেল। ইয়াস বিবাদীকে বললেন: তোমার বন্ধু ফিরে আসা পর্যন্ত তুমি আমার এখানে বস। তারপর তিনি অন্য দুজন বাদী-বিবাদীর দিকে মনোযোগী হলেন এবং তাদের বক্তব্য শুনতে লাগলেন। তবে ফাঁকে ফাঁকে আড় চোখে পাশে বসা পূর্বের বিবাদীকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। যখন তিনি বুঝলেন লোকটি নিশ্চিন্ত ও নিরুদ্বিগ্ন হয়ে গেছে তখন হঠাৎ তাকে প্রশ্ন করেন: যেখানে সে তোমার হাতে তার অর্থ তুলে দিয়েছিল তুমি কি মনে কর এতক্ষণে সে সেখানে পৌঁছে গেছে? লোকটি কোন রকম ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই বলে উঠলো: অসম্ভব। জায়গাটি বহু দূরে।
সাথে সাথে ইয়াস বলে উঠলেন: ওরে আল্লাহর দুশমন! অর্থ গ্রহণের কথা অস্বীকার করছো, অথচ যেখান থেকে তা গ্রহণ করেছো সে স্থানটি চেন? আল্লাহর কসম! তুমি একজন মিথ্যাবাদী, গাদ্দার।
ঘটনার আকস্মিকতায় লোকটি হতভম্ব হয়ে গেল এবং অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকার করলো। ইয়াস তাকে কারারুদ্ধ করেন এবং তার নিকট থেকে সকল অর্থ আদায় করে বাদীকে ফেরত দেন।
আরেকবার একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে। বিবাদমান দুব্যক্তি তাঁর নিকট আসে বিচারের জন্য। তিনি তখন কাজী। ঘটনাটি হলো দুটি 'কাতীফা' নিয়ে। 'কাতীফা' হলো মখমলের রুমাল যা আরবরা মাথার উপর রেখে দুদিক দুকাঁধের উপর ছেড়ে দেয়। তার মধ্যে একটি হলো সবুজ রংয়ের, নতুন ও দামী। আর অন্যটি ছিল লাল রংয়ের পুরানো ও কম মূল্যের।
বাদী বললো: আমি একটি হাউজে গোসলের জন্য গেলাম। আমার অন্য কাপড়-চোপড়র সাথে সবুজ রুমালটিও হাউজের পাশে রেখে হাউজে নামলাম। আমার প্রতিপক্ষ আমার পরে আসলেন এবং তিনিও তার একটি লাল রুমাল ও অন্য কাপড়-চোপড় আমার কাপড়ের পাশে রেখে হাউজে নামলেন। কিন্তু তিনি গোসল সেরে আমার আগে হাউজ থেকে উঠে গেলেন। তিনি তাঁর কাপড় পরলেন এবং আমার সবুজ রুমালটি মাথায় ফেলে দুকাঁধের উপর ঝুলিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। আমি তাঁর পরই হাউজ থেকে উঠলাম এবং আমার রুমালটি না দেখে পিছু ধাওয়া করে তাঁকে ধরলাম এবং রুমালটি ফেরৎ চাইলাম। কিন্তু তিনি বললেন: রুমালটি তার। আমি আমার রুমালটি ফেরৎ চাই।
ইয়াস বিবাদীকে বললেন: তোমার বক্তব্য কি? লোকটি বললো: এটি আমার রুমাল এবং আমার হাতেই আছে।
ইয়াস বাদীকে বললেন: তোমার কি কোন সাক্ষী-প্রমাণ আছে?
লোকটি বললো: না। কোন সাক্ষী প্রমাণ নেই।
এবার ইয়াস তাঁর দারোয়ানকে একটি চিরুনী আনতে বললেন। চিরুনী আনলে তিনি বাদী-বিবাদী উভয়ের মাথায় ভালো করে চিরুনী করলেন। তাতে একজনের মাথা থেকে লাল পশমী রুমালের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ বের হলো এবং অন্যজনের মাথা থেকে বের হলো সবুজ পশমের অংশ। বিষয়টি তিনি বুঝে ফেললেন এবং নতুন সবুজ রুমালটি বাদীকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
তবে ইয়াসের এত মেধা, চিন্তাশক্তি ও উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা থাকা সত্ত্বেও মাঝে মধ্যে অন্যের যুক্তির কাছে হেরে গেছেন। এ রকম একটি ঘটনার কথা তিনি নিজেই এভাবে বলেছেন: এক ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ কখনো আমার উপর বিজয়ী হতে পারেনি। আর তা হলো আমি যখন বসরার কাজী তখন এক ব্যক্তি আমার নিকট এসে সাক্ষ্য দিল যে, অমুক বাগানটির মালিক অমুক। তারপর সে বাগানটির চৌহদ্দি বর্ণনা করলো।
আমি তার কাছে জানতে চাইলাম: বাগানে গাছের সংখ্যা কত?
সে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবলো। তারপর মাথা সোজা করে আমাকে প্রশ্ন করলো: আমাদের মাননীয় কাজী সাহেব এই এজলাসে কত বছর ধরে বসেন?
বললাম: এত বছর।
সে বললোঃ যে ঘরে আপনার এজলাস হয় সে ঘরের ছাদের কড়িকাঠের সংখ্যা কত?
বললাম: আমার তো তা জানা নেই। আমি তার যুক্তির কাছে হেরে গেলাম। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করলাম।
ইয়াস বলতেন: "আমি যদি ওয়াসিত নগরের প্রধান প্রবেশ দ্বারে বসি তাহলে আমার পাশ দিয়ে যেই অতিক্রম করুক আমি তার কাজ ও পেশা কি তা তোমাদেরকে বলতে পারবো।"
আবুল হাসান আল-মাদায়িনী বলেন, একদিন ইয়াস কোন কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত তিন মহিলাকে দেখলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করলেন: এদের মধ্যে এটি গর্ভবতী, এটি স্তন্যদানকারিণী এবং এটি কুমারী, একথা শুনে এক ব্যক্তি মহিলা তিনজনের নিকট গেল এবং তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে ইয়াসের কথার সত্যতা পেল। তখন ইয়াসকে জিজ্ঞেস করা হলো: এ কথা আপনি কীভাবে জানলেন? বললেন: তারা যখন ভয় পেয়েছে তখন অতি স্বাভাবিকভাবে তাদের নিজ নিজ হাত তাদের দেহের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে পৌঁছে গেছে, আর আমি তা দেখেই তাদেরকে চিনে ফেলেছি। স্তন্যদানকারী তার হাত তার দু'স্তনের উপর রেখেছে, গর্ভবতী তার পেটের উপর এবং কুমারী তার তল পেটের নীচে রেখেছে।
আল-আসমা'ঈ বলেন, ইয়াস একদিন একজন অপরিচিত লোককে দেখে ডাক দেন: ওহে ইয়ামামার অধিবাসী ব্যক্তি! সে বললো: আমি ইয়ামামার লোক নই। তিনি এবার ডাকলেন : ওহে আল-আদাখার অধিবাসী! লোকটি বললো: আমি আদাখার লোক নই। এবার তিনি ডাকলেন: ওহে দারিয়্যার অধিবাসী! লোকটি তাঁর নিকট এগিয়ে গেল। তিনি তার পরিচয় জানতে চাইলেন। সে বললো: আমার জন্ম ইয়ামামায়, বড় হয়েছি আদাখায় এবং পরে দারিয়্যায় চলে গিয়েছি।
হুমাইদ আত-তাবীল বলেন, ইয়াস ইবন মু'আবিয়া কাজীর দায়িত্ব গ্রহণের পর হাসান আল-বাসরী (রহ) সাক্ষাৎ করতে আসেন। তাঁকে দেখে ইয়াস কাঁদতে শুরু করেন। হাসান জিজ্ঞেস করেন: কাঁদছেন কেন? ইয়াস এই হাদীছটি উল্লেখ করেন: "কাজী তিন প্রকার: দুই প্রকার জাহান্নামী এবং এক প্রকার জান্নাতী হবে।" হাসান বলেন: আল্লাহ দাউদ ও সুলায়মানের (আ) বিচার কাজের বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে দাউদের ভুলের জন্য তিরস্কার তো করেননি। তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন এ আয়াত: "এবং স্মরণ কর দাউদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তারা বিচার করছিল শস্যক্ষেত সম্পর্কে; তাতে রাত্রিকালে প্রবেশ করেছিল সম্প্রদায়ের কোন মেষ; আমি প্রত্যক্ষ করছিলাম তাদের বিচার। অতঃপর আমি সুলায়মানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেককে আমি দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান।"
এ আয়াতে আল্লাহ সুলায়মানের প্রশংসা করেছেন, তবে দাউদের নিন্দা করেননি।
কাজীদের সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা
কোন বিভাগ বা শাখার লোকের তার নিজের বিভাগ বা শাখার সমপেশার লোকদের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান থাকা বিশেষ যোগ্যতা বলে বিবেচিত হয়। ইয়াস তাঁর সমকালীন সকল মুফতী ও কাজীর দোষ-ত্রুটি ও উত্তম বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগত ছিলেন। হাবীব ইবন শুহাইদ বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি ইয়াসের নিকট আসে এবং তার একটি মামলার ব্যাপারে পরামর্শের জন্য কার কাছে যাবে সে ব্যাপারে তাঁর মতামত চায়। তিনি বলেন, তুমি যদি এর সঠিক ফয়সালা চাও তাহলে 'আবদুল মালিক ইবন ইয়া'লার নিকট যাও। সঠিক অর্থে তিনি একজন কাজী। আর যদি শুধু ফাতওয়া নিতে চাও তাহলে হাসান আল-বাসরীর নিকট যাও। তিনি আমার পিতার ও আমার উসতাদ। আর যদি সন্ধি ও চুক্তি করতে চাও তাহলে হুমাইদ আত-তাবীলের নিকট যাও। তাঁর সন্ধির পদ্ধতি এ রকম যে, তিনি তোমাকে বলবেন, তুমি তোমার অধিকার কিছু নিয়ে কিছু ছেড়ে দাও। আর যদি মামলাবাজি করতে চাও তাহলে সালিহ আদ-দাওসীর নিকট যাও। তিনি তোমাকে বলবেন, প্রতিপক্ষের অধিকার সম্পূর্ণ অস্বীকার কর এবং নিজের যতটুকু অধিকার তার চেয়ে বেশি দাবী কর। আর যারা উপস্থিত ছিল না তাদেরকে সাক্ষী মান।
পরিচ্ছন্ন 'আকীদা-বিশ্বাস এবং বিদ'আতীদের সাথে তর্ক-বাহাছ
এত প্রখর মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আকীদার ক্ষেত্রে কোন রকম নতুনত্ব ও সংযোজন-বিয়োজন ভীষণ অপছন্দ করতেন। যারা এমন করতো তাদের বক্তব্যের প্রতিবাদ ও প্রত্যাখ্যান করতেন। তিনি বিদ'আতী, বিশেষ করে কাদরিয়্যাদের সাথে তর্ক-বাহাছ করতেন। কাদরিয়্যাদের 'আকীদা হলো, আল্লাহ আদিল বা ন্যায়বিচারক। এতটুকু পরিমাণ তো সঠিক ছিল। তবে এই মূলনীতির ভিত্তিতে যে সকল কর্ম দৃশ্যতঃ যুগ্ম ও অন্যায় বলে মনে হয় তা আল্লাহর প্রতি আরোপ করতো না। এ ব্যাপারে তারা এত বাড়াবাড়ি করতো যে, আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতাও অস্বীকার করা হতো। একবার কাদরিয়্যাদের সাথে তাঁর তর্ক-বাহাছ হয়। তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন, যুগ্ম কাকে বলে? তারা বলে, কারো এমন কোন জিনিস নিয়ে নেওয়া যা তার নেওয়ার অধিকার নেই। তিনি বললেন, সব জিনিসই তো আল্লাহর, অর্থাৎ সব জিনিসই যখন আল্লাহর তখন তার কোন কাজকে যুগ্ম বলা সঠিক নয়।
তাঁর কিছু বাণী খুবই মনোমুগ্ধকর। তিনি বলতেন: যার অন্তর তার নিজের দৃষ্টিতে সম্মানিত তার দৃষ্টিতে দুনিয়ার কোন মূল্যই থাকে না। যে ব্যক্তি তার জীবন যাপনে সঙ্গীদের সাথে মানিয়ে চলতে পারে না সে বুদ্ধিমান নয়। আল্লাহ জান্নাতকে তোমাদের প্রাণের বিনিময়ে নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং অন্য কোন কিছুর বিনিময়ে তা বিক্রি করো না। যে কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয় না তা ব্যর্থ হয়ে যায়।
তিনি বলতেন: যার মধ্যে কোন দোষ নেই সে নির্বোধ। একজন জিজ্ঞেস করে: আপনার মধ্যে কি দোষ আছে? বললেন: অতিরিক্ত কথা বলা। তিনি বলতেন, আমি মানুষের সকল গুণ পরীক্ষা করেছি। তার মধ্যে সত্য কথা বলাকে শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে পেয়েছি।
যে সকল বাগ্মী, খতীব, ফকীহ ও আমীর উমারা অনর্গল কথা বলতেন; কিন্তু খুব কমই ভুল করতেন তাঁদের একটি বর্ণনা আল-জাহিজ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ইয়াসের নামটিও তিনি উল্লেখ করেছেন। কৃষ্ণার কাজী 'আবদুল্লাহ ইবন শুবরামা (মৃত্যু-১৪৪ হি.) একবার হযরত ইয়াসের অতি কথনের কারণে বলেন: "আমি ও আপনি একমতে পৌঁছাতে পারবো না। আপনি চুপ করতে চান না, আর আমি শুনতে চাই না।"
একবার তিনি অতি সাধারণ বেশ-ভূষায় দিমাশকের মসজিদে কুরায়শদের একটি আসরে উপস্থিত হলেন। উপস্থিত লোকেরা তাঁকে চিনতে না পেরে তাঁর প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষার ভাব দেখালো। যখন তারা চিনতে পারলো তখন ক্ষমা চাওয়ার সূরে তাঁকে বললো! অপরাধ আমাদের ও আপনার উভয়ের সমান। কারণ, আপনি এসেছেন একজন রিক্ত- নিঃস্ব দরিদ্রের পোশাক পরে। তবে আমাদের সাথে কথা বলেছেন একেবারে রাজা- বাদশাদের ভাষায়।
আল-জাহিজ বলেন, আমি দেখেছি মানুষ ইয়াস ইবন মু'আবিয়ার একটি জবাব খুবই পছন্দ করে। আর তা হলো, একবার তাঁকে বলা হলো, আপনি আপনার কথার কারণে নিজেই একটা বিস্ময় হয়ে গেছেন, এছাড়া আপনার মধ্যে আর কোন দোষ নেই। তিনি প্রশ্ন করেন: আমার কথা আপনাদেরকে বিস্মিত করে? লোকেরা বললো: হাঁ, বিস্মিত করে। তিনি বললেন: আমি যা বলি এবং আমার কথা শুনে আপনারা যে বিস্মিত হন সে জন্য আমি নিজেই সর্বাধিক বিস্মিত হওয়ার উপযুক্ত। লোকেরা একদিন তাঁকে বললো : মানুষ আপনার বুদ্ধিমত্তায় বিস্মিত। তিনি বললেন: মানুষ বিস্মিত না হলে আমি তার দ্বারা বিচার কাজ করতাম না।
একবার তাকে বলা হলো, বেশি কথা বলা ছাড়া আপনার মধ্যে আর কোন দোষ নেই। তিনি জানতে চাইলেন, আমার যেসব কথা আপনারা শোনেন তা কি সঠিক না ভুল? বলা হলো: সঠিক। তখন তিনি বলেন: ফায্ যিয়া-দাতু মিনাল খাইরি খাইরুন ভালোর আধিক্য তো ভালো।
ইমাম আল-আসমা'ঈ বর্ণনা করেছেন, 'উমার ইবন হুবায়রা যখন ইয়াসকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দিতে চাইলেন তখন ইয়াস বললেন আমি এ পদের যোগ্য নই। প্রশ্ন করা হলো: কেন? বললেন: প্রথমত: আমার ভাষার জড়তা, দ্বিতীয়ত: আমি দেখতে অসুন্দর, কুৎসিত এবং তৃতীয়ত: লোহার মত শক্ত প্রকৃতির। ইবন হুবায়রা বললেন: কঠোরতা চাবুক সোজা করে দেবে। আর আপনি যে অসুন্দর, তাতে কি হয়েছে, আমি তো আপনার দ্বারা কাউকে সুন্দর করতে চাচ্ছিনা। আর ভাষার যে জড়তার কথা বলছেন, তা আপনি তো আপনার মনের কথা প্রকাশ করছেন।
আল-জাহিজ বলেন: আসলে ইয়াসের যদি জড়তা থাকতো তাহলে তিনি বেশি কথা বলা পরিহার করতেন। আর একারণে আমরা এমন কাউকে জানি না যিনি ইয়াসের ভাষা জড়তার কথা বলেছেন। বরং এর বিপরীতটি দেখা যায়। তাঁর প্রতি বেশি কথা বলার দোষারোপ করা হয়। 'উতবা ইবন 'উমার বলেছেন, আমি বহু মানুষের বুদ্ধি-জ্ঞান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি যে, তা প্রায় একে অপরের কাছাকাছি। ব্যতিক্রম দেখেছি কেবল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ও ইয়াস ইবন মু'আবিয়ার ক্ষেত্রে। অন্যদের তুলনায় তাঁদের দু'জনের বুদ্ধির পাল্লা ভারী পেয়েছি।
একবার এক ব্যক্তি ইয়াসকে জিজ্ঞেস করলো: আপনি বিচার কাজে দ্রুততা করেন কেন? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন: তোমার একটি হাতে আঙ্গুল কয়টি? বললো: পাঁচটি। ইয়াস বললেন: খুব দ্রুত জবাব দিয়েছো। লোকটি বললো: যে জেনে বুঝে হত্যা করে সে তো দ্রুত স্বীকার করে না। ইয়াস বললেন: তোমার প্রশ্নের এটাই আমার জবাব। তিনি প্রায়ই জাহিলী ও ইসলামী যুগের বিখ্যাত কবি আন-নাবিগা আল-জা'দীর (রা) নিম্নের শ্লোকটি আওড়াতেন:
আবা- লিয়াল বালা-উ ওয়া আন্নী ইমরাউন ইযা- মা- তাবারাইয়্যানতু লাম আরতাব।
'বিপদ-আপদ আমাকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আমি এমন একজন পুরুষ, যখন তা পরীক্ষা করেছি, ভীত-কম্পিত হইনি।
ইয়াস ইবন মু'আবিয়া বলেছেন: আমি প্রতারক নই এবং কোন প্রতারক আমার সাথে প্রতারণা করতে পারবে না।
তিনি যখন অল্প বয়সী একজন তরুণ তখন একবার শামে যান। সেখানে তাঁর একজন অতি বৃদ্ধ শত্রুর দেখা পান এবং তাকে নিয়ে খলীফা 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানের একজন কাজীর দরবারে হাজির হন। কাজী তাঁকে বললেন: আপনি এই বৃদ্ধকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন, লজ্জা করে না? ইয়াস বললেন: সত্য এই বৃদ্ধের চেয়েও বড়। কাজী ধমকের সুরে বললেন: চুপ করুন। ইয়াস বললেন: তাহলে আমার যুক্তি-প্রমাণ তুলে ধরবে কে? কাজী বললেন: আমার মনে হয় না আপনি সত্য বলেছেন। এই এজলাসে উপস্থিত হওয়ার পর থেকে অসত্য বলে যাচ্ছেন। ইয়াস বললেনঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! এ কি সত্য, না অসত্য? কাজী বললেন: সত্য, কা'বার প্রভুর শপথ! সত্য। কাজী বললেন: আমার ধারণা আপনি একজন যালিম। ইয়াস বললেন: কাজীর ধারণা সত্য হলে আমি ঘর থেকে বের হতাম না। এরপর কাজী উঠে খলীফা 'আবদুল মালিকের দরবারে ঢুকলেন এবং সব ঘটনা খুলে বললেন। 'আবদুল মালিক বললেনঃ তার বিষয়টি এখনই নিষ্পত্তি করে তাকে শাম থেকে বের করে দিন। অন্যথায় সে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে। আল-জাহিজ বলেন, খলীফা আবদুল মালিক ইয়াসের তরুণ বয়সে যখন তাঁকে নিয়ে এত ভীত ছিলেন তখন তার পরিণত বয়সের অবস্থা কেমন ছিল।
সর্বশেষ আল-জাহিজ তাঁর সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে :
"ইয়াস সম্পর্কে সার্বিক কথা হলো, তিনি মুদার গোত্রের অন্যতম গৌরব ও অগ্রবর্তী কাজী। তিনি ছিলেন দৈহিক গঠন তথা প্রকৃতিগতভাবে ফকীহ্ ও সূক্ষ্মদর্শী বিচক্ষণ ব্যক্তি। তাঁর আন্দাজ-অনুমান সত্যে পরিণত হতো, দূরদর্শিতাও ছিল বিস্ময়কর। তিনি ছিলেন পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন বস্তু আহারকারী উত্তম স্বভাব ও চরিত্রের মানুষ। খলীফাদের নিকট সম্মানীয় ও সমকক্ষদের নিকট প্রাধান্যপ্রাপ্ত।"
ইয়াস বলেছেন:
"কার্পণ্য একটি বন্ধন, ক্রোধ একটি পাগলামি এবং মদমত্ততা সকল অপকর্মের চাবিকাঠি।"
একবার আবান ইবন আল-ওয়ালীদ-ইয়াসকে বললেন: আমি আপনার চেয়ে বেশি ধনী। ইয়াস বললেন: না, আপনার চেয়ে আমি বেশি ধনী। আবান বললেন: তা কিভাবে হয়। আমার এত এত সম্পদ আছে। আপনার তো তা নেই। ইয়াস বললেন: তাহলে কি হবে। আপনার আয় আপনার ব্যয়ের অতিরিক্ত নয়। কিন্তু আমার ব্যয়ের চেয়ে আয় বেশি।
একদিন খলীফা উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) বিনিদ্র রজনী অতিবাহিত করলেন। সারা রাত চোখের পাতা বুজলো না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কাটালেন। দিমাশকের তীব্র ঠাণ্ডার সেই রাতটি কাটালেন বসরায় একজন কাজী নিয়োগের চিন্তায়। সেই কাজী এমন হবেন যিনি আল্লাহর নাযিলকৃত কুরআনের বিধান অনুযায়ী মানুষের মাঝে 'আদল-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন এবং সত্যের ব্যাপারে কারো রাগ-বিরাগের পরোয়া করবেন না।
কাজী নির্বাচনের ক্ষেত্রে 'উমারের দৃষ্টি দু'ব্যক্তির উপর নিবদ্ধ হল, যারা সব দিক দিয়ে সমতায় দৌড় প্রতিযোগী দু'অশ্বের মত ছিলেন। দীনের তত্ত্ব জ্ঞানে, সত্যের উপর দৃঢ়তায়, চিন্তার ঔজ্জ্বল্যে এবং দৃষ্টিশক্তির তীক্ষ্ণতায় উভয়ে ছিলেন সমান সমান। যখনই তিনি একজনকে কোন একটি বৈশিষ্ট্যের দরুন প্রাধান্য দিচ্ছিলেন তখনই অন্যজন তাঁর একটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণে অগ্রাধিকার লাভের যোগ্য বলে মনে করছিলেন।
এভাবে রাত কেটে গেল। সকালে তিনি ইরাকের ওয়ালী 'আদী ইবন আরতাতকে ডেকে পাঠালেন। 'আদী তখন দারুল খিলাফা দিমাশকে অবস্থান করছিলেন। তিনি 'আদীকে বললেন: আপনি ইয়াস ইবন মু'আবিয়্যা আল-মুযানী ও কাসিম ইবন রাবী'আ আল-হারিছী, মতান্তরে বাকর ইবন 'আবদিল্লাহকে ডেকে তাদের সঙ্গে বসরার বিচার বিষয়ে কথা বলুন এবং তাঁদের একজনকে তথাকার কাজী নিয়োগ করুন।
আমীরুল মু'মিনীনের নির্দেশ মত 'আদী ইবন আরতাত ইয়াস ও কাসিমকে ডেকে বললেন: আমীরুল মু'মিনীনের নির্দেশমত আমি আপনাদের দু'জনের যে কোন একজনকে বসরার কাজী নিয়োগ করতে চাই। এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত কি? তখন দু'জনের প্রত্যেকে অপরজন সম্পর্কে বললেন: এ পদের জন্য আমার চেয়ে তিনি বেশি উপযুক্ত। এরপর তাঁর মহত্ব, মর্যাদা, জ্ঞান ও ফিক্ বিষয়ে পারদর্শিতার কথা তুলে ধরেন।
'আদী বললেন: এ ব্যাপারে আপনারা নিজেরা একটি সিদ্ধান্তে না আসা পর্যন্ত আমার এ সভা থেকে উঠতে পারবেন না।
ইয়াস বললেন: মাননীয় আমীর! আপনি কাসিম ও আমার সম্পর্কে ইরাকের দু'জন সর্বজন মান্য ফকীহ হাসান আল-বাসরী ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীনকে (রহ) জিজ্ঞেস করুন। আমাদের দু'জনের মূল্যায়নের ব্যাপারে তাঁরাই যোগ্যতম ব্যক্তি।
আসলে কাসিম ও তাঁদের দু'জনের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তাঁদের সাথে ইয়াসের তেমন যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল না। তাই কাসিম মনে করলেন, ইয়াসের এ প্রস্তাব নিজেকে বাঁচানোর একটি কৌশলমাত্র। কারণ আমীর হাসান আল-বাসরী ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের সাথে পরামর্শ করলে তাঁরা অবশ্যই তাঁর নামটিই সমর্থন করবেন। তাই মোটেই দেরী না করে তিনি আমীরকে লক্ষ্য করে বললেন: মাননীয় আমীর! আমার ও তাঁর সম্পর্কে জানার জন্য কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। সেই আল্লাহর নামের কসম যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, ইয়াস আল্লাহর দীনের ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশি পারদর্শী ও বিচার বিষয়ে অধিক জ্ঞানী। আমার এ কথায় আমি যদি মিথ্যাবাদী হই, তাহলে একজন মিথ্যাাবাসীকে বিচারকের পদে নিয়োগ দেওয়া আপনার জন্য বৈধ হবে না। আর আমি সত্যবাদী হলে যোগ্যতম ব্যক্তিকে বাদ দেওয়া সঙ্গত হবে না।
এবার ইয়াস আমীরের দিকে তাকিয়ে বললেন: জনাব, আপনি এক ব্যক্তিকে কাজীর পদে নিয়োগদানের জন্য ডেকে এনেছেন এবং তাঁকে যেন জাহান্নামের পাশে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। আর তিনি মিথ্যা শপথ করে তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিলেন। একটু পরেই আবার তাওবা করে নিবেন। কিন্তু তিনি তো মুক্তি পেয়ে গেলেন।
জবাবে 'আদী ইবন আরতাত তাঁকে বললেন: আপনার মত যিনি এ কথাটি বুঝতে পারেন তিনিই কাজী হওয়ার উপযুক্ত। অতঃপর তিনি ইয়াসকে বসরার কাজী নিয়োগ করেন।
মৃত্যু
ইয়াস ইবন মু'আবিয়ার (রহ) বয়স যখন ৭৬ (ছিয়াত্তর) বছরে পৌঁছালো তখন একদিন স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি ও তাঁর পিতা দু'জন দু'টি ঘোড়ার পিঠে আরোহী হয়েছেন এবং উভয়ে নিজ নিজ ঘোড়া দাবড়ান। কিন্তু কেউ কাউকে পিছনে ফেলতে পারলেন না; বরং দু'জনই পাশাপাশি থাকেন। তাঁর পিতা মু'আবিয়া ৭৬ (ছিয়াত্তর) বছর বয়সে মারা যান। এ ঘটনার পর একদিন রাতে ইয়াস ঘুমানোর জন্য বিছানায় শুয়ে পরিবারের লোকদের ডেকে বলেন: তোমরা কি জান এটা কোন্ রাত?
তারা বললো: না, জানি না।
তিনি বললেন: এ রাতে আমার পিতা তাঁর জীবনপূর্ণ করেন।
রাত পোহালে সকাল বেলায় পরিবারের লোকেরা বিছানায় তাঁকে মৃত দেখতে পান। হিজরী ১২২ সনে তিনি বসরায়, মতান্তরে ওয়াসিত-এর 'আবদাসা নামক পল্লীতে মৃত্যুবরণ করেন।
ইয়াসের মা মৃত্যুবরণ করলে তিনি শোকে কাতর হয়ে ভীষণ কান্নাকাটি করেন। লোকেরা যখন সান্ত্বনা দিত, তিনি বলতেন: "আমার জন্য জান্নাতের দু'টি দরজা খোলা ছিল। এখন একটি বন্ধ হয়ে গেল।"
টিকাঃ
১. সুওরুল মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৬৮-৬৯
২. আত-তাবাকাত-৭/৫
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯০
৪. আত-তাবাকাত-৭/৫
৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৯৮, টীকা নং-১
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯০
৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৪/৭৯; শাযারাত আয যাহাব-১/১৬০
৮. ইবন আল-জাওযী, আত-তুরুক আল-হিকমিয়্যা-২৮-২৯; তাবি'ঈন-৫০
৯. প্রাগুক্ত-২৯
১০. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৭১
১১. প্রাগুক্ত-৭২
১২. প্রাগুক্ত-৭৩-৭৪; তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭২
১৩. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৬৯-৭০ তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭৩
十四. আত-তুরুক আল-হিকমিয়্যা-২৯; তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭৯
十五. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭৯
十六. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৭৬
十七. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৮৬
十八. প্রাগুক্ত-২/৩৮৩
十九. প্রাগুক্ত-২/৩৮৪
二十. আবু দাউদ, কিতাব আল-আকাদিয়্যাতি, বাব: আল-কাদী ইউখতিউ, হাদীছ নং ৩৫৭৩; আত- তিরমিযী, কিতাব আল-আহকাম (১৩২২); ইবন মাজা, কিতাব আল-আহকাম (২৩১৫)
২১. সূরা আল-আম্বিয়া'-৭৮-৭৯
২২. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭৬
২৩. প্রাগুক্ত-২/৩৭৫; তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯০
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯২
২৫. আত-তাবাকাত-৭/৫
২৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯১
২৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৯৮, ২/৩১৫
২৮. প্রাগুক্ত
২৯. প্রাগুক্ত
三十. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৮৮
三十一. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৯৯
三十二. প্রাগুক্ত
三十三. প্রাগুক্ত-১/১০০, ২৭৫
三十四. প্রাগুক্ত
三十五. কিতাব আল-হাওয়ান-৩/৪৯৫
三十六. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১০১
三十七. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭২-৩৭৩; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৭০
三十八. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১০১
三十九. প্রাগুক্ত
四十. প্রাগুক্ত-১/১৯৫
四十一. প্রাগুক্ত-৪/৯১; তাহযীব আল-কামাল-২/৩৮৫
四十二. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭৫; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৬৫-৬৮
四十三. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৯৮; সাওয়ারুন মিন হায়াত আত তাবি'ঈন-৭৮-৭৯
四十四. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৮৯, ৩৯২
বর্তমান সৌদি আরবের নাজদ-এর অন্তর্গত আল-ইয়ামামা প্রদেশে হিজরী ৪৬ সনে ইয়াস ইবন মু'আবিয়া জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পরিবারের সাথে বসরায় চলে যান এবং সেখানে বেড়ে ওঠেন ও শিক্ষা লাভ করেন। জীবনের প্রথম ভাগে মাঝে মাঝে দিমাশকে গেছেন। তাঁর সময়ে জীবিত মহান সাহাবায়ে কিরাম (রা) ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈদের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। শৈশবেই তাঁর মধ্যে প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও সৌভাগ্যের লক্ষণ দেখা যায়। তখনই তাঁর মেধা ও মননের কথা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
ইয়াস-এর ডাকনাম আবূ ওয়াছিলা এবং পিতার নাম মু'আবিয়া ইবন কুবরা। ইয়াস তাঁর যুগের একজন বিখ্যাত কাজী ছিলেন।
হাদীছ ও ফিক্হ
হাদীছ বর্ণনায় তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। তার অর্থ এ নয় যে, এ ক্ষেত্রে তাঁর কোন অবদান নেই। ইবন সা'দ বলেছেন, তিনি অনেক হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি পিতা মু'আবিয়া, আনাস ইবন মালিক, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব, সা'ঈদ ইবন জুবায়র, আবু মিযলায (রহ) প্রমুখের নিকট থেকে হাদীছ শোনেন। আইয়ূব, দাউদ ইবন আবী হিন্দ, হুমাইদ আত-তাবীল, হাম্মাদ শা'বান, শু'বা, মু'আবি ইবন 'আবদিল কারীম (রহ) প্রমুখ মুহাদ্দিছ তাঁর ছাত্র। ফিক্হ ছিল তাঁর বিশেষ অধীত বিষয়। এ শাস্ত্রে তাঁর ছিল বিশেষ অবস্থান। তাঁর জীবনীকারগণ তাঁকে ফকীহ বলে উল্লেখ করেছেন।
কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন
ফিক্হ শাস্ত্রে তাঁর অত্যধিক যোগ্যতার কারণে উমাইয়্যা শাসনামলে বসরার কাজী হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তাঁর নিয়োগ লাভের পর হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। হযরত হাসানকে (রহ) দেখে তিনি কাঁদতে শুরু করেন। উল্লেখ্য যে, হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) তাঁকে বসরার কাজী নিয়োগ করেন।
তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধা, বুদ্ধি ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। ইবন সা'দ লিখেছেন : ক্যানা আ-ক্বিলান মিনার রিজা-লি ফাত্বিনান। তিনি ছিলেন একজন বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ মানুষ। প্রখ্যাত তাবি'ঈ হযরত ইবন সীরীনের (রহ) সামনে তাঁর প্রসঙ্গে কোন কথা উঠলে বলতেন, তিনি তো একজন বাস্তব বুদ্ধি ও বিচক্ষণতাসম্পন্ন ব্যক্তি। তাঁর সমকালীন লোকেরা বলতো, প্রত্যেক শতকে একজন অতি বড় বুদ্ধিমান মানুষের জন্ম হয়। এই শতকের সেই বুদ্ধিমান ব্যক্তিটি হলেন ইয়াস ইবন মু'আবিয়া (রহ)। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন, তাঁর বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা প্রবাদে পরিণত হয়। যেমন বিখ্যাত কবি আবূ তাম্মামের একটি শ্লোকে এসেছে।
ইক্বদা-মু ‘আমরিন ফী শুজা-‘আতি গানতারিন + ফী হিলমি আহনাফা ফী যাকা-য়ি ইয়াসিন
'(প্রশংসিত ব্যক্তি আহমাদ ইবন আল-মু'তাসিম) ছিলেন, সাহসী পদক্ষেপে 'আমর ইবন মা'দিকারিব, বীরত্ব-সাহসিকতায় গানতার, ধৈর্য-সহনশীলতায় আহনাফ ইবন কায়স ও বুদ্ধি-বিচক্ষণতায় ইয়াস। অন্য একটি বর্ণনায় ফী সামা-হাতি হা-তামিন (বদান্যতায় হাতিম তাঈ) এসেছে।
বিচার কাজের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনেকটা নির্ভর করে বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার উপর। এ কারণে ইয়াস ছিলেন উমাইয়্যা যুগের শ্রেষ্ঠ ও সফল বিচারকদের একজন। তাঁর প্রখর মেধা ও বুদ্ধিমত্তার বহু চমকপ্রদ ঘটনা সীরাতের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। এখানে তার বুদ্ধিমত্তার কয়েকটি ঘটনা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো।
একবার এক বিচার কাজের প্রয়োজনে চারজন মহিলা তাঁর আদালতে উপস্থিত হয়। তিনি তাদেরকে দেখামাত্র বলে দেন, এই চারজনের একজন গর্ভবতী, একজন তাঁর শিশু- সন্তানকে দুধ পান করায়, একজন বিবাহিত এবং একজন কুমারী। উপস্থিত লোকেরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেল, তাঁর ধারণা সঠিক। তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কিসের ভিত্তিতে এ অনুমান করলেন? বললেন, গর্ভবতী মহিলাটি যখন কথা বলছিল তখন তার কাপড় পেট থেকে উঠে যাচ্ছিল, যে শিশুকে দুধ পান করায় তার বুক দুলছিল, বিবাহিত যে, সে চোখে চোখ রেখে কথা বলছিল এবং কুমারী চোখ নীচু করে কথা বলছিল, আর আমি এসব আলামত দ্বারাই তাদের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলাম।
একবার এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির নিকট কিছু অর্থ গচ্ছিত রাখে। যখন সে তার অর্থ ফেরত চায়, সে গচ্ছিত রাখার কথা অস্বীকার করে। অর্থের মালিক ইয়াসের আদালতে মামলা দায়ের করে। ইয়াস লোকটিকে বলেন, তুমি এখন চলে যাও এবং বিষয়টি গোপন রাখ। বিবাদী যেন বিষয়টি কোনভাবে জানতে না পারে যে, তুমি আমার নিকট এসেছিলে। দুদিন পরে আবার আসবে। এভাবে বাদীকে ফিরিয়ে দিয়ে ইয়াস বিবাদীকে ডেকে পাঠান। সে উপস্থিত হলে তাকে বলেন, আমার নিকট অনেক অর্থ এসে গেছে, তোমার ঘরটি বেশ মজবুত। তাই আমি আমার কিছু অর্থ তোমার নিকট আমানত রাখতে চাই। সে বলে, ঠিক আছে রাখুন। ইয়াস বললেন, এত অর্থ রাখার জন্য কোন স্থান নির্ধারণ করে বহন করার জন্য লোক সঙ্গে করে আবার এসো। লোকটি চলে গেলে ইয়াস বাদীকে ডেকে এনে বললেন, এবার তুমি তোমার আমানতদারের নিকট যেয়ে তোমার অর্থ ফেরত চাও। যদি দেয় তাহলে তো ভালো, অন্যথায় বলবে, আমার সম্পদ ফিরিয়ে দাও, নইলে আমি কাজী ইয়াসকে বলবো। একথার পর লোকটি তার অর্থ ফিরিয়ে দেয়। এরপর পূর্বের কথামতো লোকটি ইয়াসের নিকট আসে অর্থ নেওয়ার জন্য। কাজী ইয়াস তাঁকে কঠোরভাবে তিরস্কার করে বিদায় দেন।
যৌবনে ইয়াস একাগ্রচিত্তে জ্ঞান ও গবেষণায় মেতে ওঠেন এবং অল্প কালের মধ্যে এতখানি পাণ্ডিত্য ও প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন যে, অনেক বড় বড় শায়খ তাঁর নিকট এসে তাঁর ছাত্রের খাতায় নাম লেখাতে শুরু করেন। তখনও কিন্তু তিনি একজন তরুণ।
একবার 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান বসরা ভ্রমণে গেলেন। তখনও তিনি খলীফা হননি। ইয়াসের তখন দাড়ি-গোঁফ গজায়নি। একদিন 'আবদুল মালিক দেখেন, তরুণ ইয়াস আগে আগে চলছেন, আর পিছনে পিছনে তাঁকে অনুসরণ করছেন সবুজ জোব্বা- পাগড়ী পরিহিত লম্বা দাড়িওয়ালা চারজন কারী। এ দৃশ্য দেখে 'আবদুল মালিক বললেন,- আফসোস এই লম্বা দাড়িওয়ালা লোকদের জন্য! তাদের কেউ একজন সামনে না গিয়ে এই যুবককে সামনে দিয়েছে? তারপর তিনি ইয়াসকে লক্ষ্য করে বললেনঃ ওহে নও- জোয়ান! তোমার বয়স কত?
ইয়াস বললেন: আল্লাহ আমীরকে দীর্ঘজীবি করুন! আমার বয়স উসামা ইবন যায়দের (রা) সেই বয়সের সমান যখন রাসূল (সা) তাঁকে একটি বাহিনীর অধিনায়ক করেন, আর সেই বাহিনীতে ছিলেন আবু বাকর ও উমার (রা)। জবাব শুনে 'আবদুল মালিক বলেনঃ ওহে নও-জোয়ান! তুমি সামনে চল, তুমি সামনে চল। আল্লাহ তোমাকে আরো বরকত, আরো সমৃদ্ধি দান করুন!
একবার মানুষ রমযানের চাঁদ দেখার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে ফাঁকা ময়দানে গেছে। তাঁদের মধ্যে মহান সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকও (রা) আছেন। তখন তিনি বার্ধক্যের ভারে জর্জরিত। বয়স প্রায় একশো বছরের কাছাকাছি। মানুষ আকাশে তন্ন তন্ন করে কিছুই দেখতে পেল না। কিন্তু আনাস (রা) আকাশের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থেকে এক সময় বলতে লাগলেন! আমি নতুন চাঁদ দেখেছি। এই যে এখানে। হাত দিয়ে ইশারা করেও দেখাতে লাগলেন। কিন্তু কেউ কিছু দেখতে পেল না। পাশেই ইয়াস ছিলেন। তিনি হযরত আনাসের (রা) দিকে তাকিয়ে দেখেন, তাঁর ভ্রূর একটি লম্বা পশম তাঁর চোখের উপর ঝুলে পড়েছে। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে অনুমতি নিয়ে হাত দিয়ে সেই পশমটি সরিয়ে ভ্রূটি সমান করে দেন। তারপর তাঁকে জিজ্ঞেস করেন! এখন কি চাঁদ দেখতে পাচ্ছেন, হে আল্লাহর রাসূলের সাহাবী? আনাস (রা) আবার আকাশের দিকে তাকালেন এবং বলতে লাগলেন: না, আমি তো চাঁদ দেখছি না, আমি তো দেখছি না।
হযরত ইয়াসের জ্ঞান ও তীক্ষ্ণ মেধার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ তাঁর নিকট ছুটে আসতে থাকে ইল্ল্ম ও দীন (জ্ঞান ও ধর্ম) বিষয়ে তাদের নানা প্রশ্ন ও সমস্যার সমাধান জানার উদ্দেশ্যে। অনেকে আবার আসে কুট- বিতর্কে জড়িয়ে তাঁকে অক্ষম করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। বর্ণিত হয়েছে, একবার এক আঞ্চলিক নেতা তাঁর মজলিসে উপস্থিত হয়ে প্রশ্ন করে : আবু ওয়াছিলা! নেশা উদ্রেককারী বস্তু সম্পর্কে আপনার মত কি? বললেন : সবই হারাম।
লোকটি বললো : হারাম হওয়ার কারণ কি? কিছু খোরমায় পানি ঢেলে তা গরম করা ছাড়া তো তাতে আর কিছু মেশানো হয়নি। পানি ও খোরমা দুটি জিনিসই তো হালাল। তাহলে তা হারাম হবে কেন?
ইয়াস বললেন : ওহে নেতাজি! আপনার বক্তব্য কি শেষ হয়েছে?
লোকটি বলল : হয়েছে।
ইয়াস বললো : যদি আমি এক অঞ্জলী পানি আপনার শরীরে ছুড়ে মারি তাতে কি আপনি কষ্ট পাবেন?
নেতা বললেন : না।
ইয়াস বললেন : যদি আমি এক মুট ধুলি আপনার দেহে ছুড়ে মারি তাতে কি আপনি কষ্ট পাবেন?
নেতা বললেন : না।
ইয়াস বললেন : যদি এক মুট ভূষি ছুড়ে মারি?
নেতা বললেন : তাতেও আমি কষ্ট পাব না।
ইয়াস বললেন : যদি আমি এই জিনিসগুলো ভালো করে এক সাথে মিশিয়ে রোদে শুকিয়ে শক্ত করে নেই এবং আপনার দেহে ছুড়ে মারি তাতে কি আপনি কষ্ট পাবেন?
নেতা বললেন : হাঁ, কষ্ট পাব। আপনি আমাকে শেষ করে দিলেন।
ইয়াস বললেন : মদের বিষয়টিও এমন। যখন তার বিভিন্ন উপাদান বিশেষ প্রক্রিয়ায় একত্র করা হয়েছে তখন তা নেশা উদ্রেককারী বস্তুতে পরিণত হয়ে হারাম হয়ে গেছে।
ছোট বেলায় তিনি একটি মকতবে এক ইয়াহূদী শিক্ষকের নিকট অংক শিখতেন। একদিন ইয়াসের উপস্থিতিতে সেই শিক্ষকের নিকট তার কয়েকজন ইয়াহুদী বন্ধু আসলো। তারা বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো। ইয়াস চুপ করে এমনভাবে শুনলেন যেন তিনি কিছুই বোঝেন না, কিছুই জানেন না। আলোচনার এক পর্যায়ে শিক্ষক তার বন্ধুদের লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা কি মুসলমানদের এই বিশ্বাসের ব্যাপারে অবাক হবে না যে, তারা জান্নাতে পানাহার করবে কিন্তু মল-মূত্র ত্যাগের প্রয়োজন হবে না? কথাটি শোনামাত্র ইয়াস আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে বললেন: উস্তাদ! আপনারা যে বিষয়ে আলোচনা করছেন সে সম্পর্কে আমাকে কিছু কথা বলার অনুমতি দেবেন কি?
উস্তাদ বললেন: হাঁ, বল।
ইয়াস বললেন: এ পৃথিবীতে আমরা যা কিছু পানাহার করি তা সবই কি মল-মূত্রের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়?
উস্তাদ বললেন: না।
ইয়াস প্রশ্ন করলেন: তাহলে যা বের হয় না তা কোথায় যায়?
উস্তাদ বললেন: দেহের খাদ্য হিসেবে ক্ষয় হয়ে যায়।
ইয়াস বললেন: পৃথিবীতে মানুষ যা কিছু খায় তার কিছু অংশ যদি দেহের খাদ্য হিসেবে ক্ষয় হয়ে যেতে পারে তাহলে জান্নাতে সব কিছু খাদ্য হিসেবে ক্ষয় হলে তাতে অবাক হওয়ার কি আছে?
উস্তাদ তাঁর হাতটি ইয়াসের পিঠের উপর রেখে বললেন: বালক! আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। মতান্তরে উস্তাদ তাঁকে বলেন, তুমি একটা শয়তান।
হযরত ইয়াস ইবন মু'আবিয়া (রহ) কাজী হওয়ার পর মাঝে মধ্যে এমন সব পরিবেশ- পরিস্থিতির মুখোমুখী হন যেখানে তাঁর উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা ও অভিনব কর্মপন্থার প্রকাশ ঘটে। তিনি তাঁর অতুলনীয় মেধা ও কর্মকৌশলের সাহায্যে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করেন। একবার দুব্যক্তি একটি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তাঁর নিকট এলো। একজন দাবী করলো সে অন্যজনের নিকট কিছু অর্থ গচ্ছিত রেখেছিল। কিন্তু যখন সে তার অর্থ ফেরৎ চায় সে তা দিতে অস্বীকার করে।
ইয়াস বিবাদীর নিকট গচ্ছিত রাখার বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে সে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলে, যদি আমার প্রতিপক্ষের কোন প্রমাণ থাকে, সে যেন তা উপস্থাপন করে। তা না হলে আমাকে কসম করে অস্বীকার করা ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই। লোকটির ভাবগতিক দেখে ইয়াস শঙ্কিত হলো এই ভেবে যে, সে গচ্ছিত অর্থের পুরোটাই হজম করে ফেলতে চাচ্ছে। এজন্য তিনি বাদীকে লক্ষ্য করে বললেন: কোন্ জায়গায় বসে তার কাছে অর্থ আমানত রেখেছিলে?
বললো: অমুক জায়গায়।
ইয়াস: সেখানে কি কি আছে?
বললো: একটি বড় গাছ আছে। তার নিচে বসে আমরা কিছু খাবার খাই, তারপর যাওয়ার সময় আমি আমার অর্থ তার হাতে তুলে দিই।
ইয়াস: তুমি সেই গাছের নিচে যাও। হতে পারে সেখানে গেলে তোমার মনে পড়বে তোমার অর্থ তুমি কোথায় রেখেছো বা ফেলে এসেছো। তারপর ফিরে এসে সেখানে কি দেখলে তা আমাকে জানাবে।
লোকটি চলে গেল। ইয়াস বিবাদীকে বললেন: তোমার বন্ধু ফিরে আসা পর্যন্ত তুমি আমার এখানে বস। তারপর তিনি অন্য দুজন বাদী-বিবাদীর দিকে মনোযোগী হলেন এবং তাদের বক্তব্য শুনতে লাগলেন। তবে ফাঁকে ফাঁকে আড় চোখে পাশে বসা পূর্বের বিবাদীকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। যখন তিনি বুঝলেন লোকটি নিশ্চিন্ত ও নিরুদ্বিগ্ন হয়ে গেছে তখন হঠাৎ তাকে প্রশ্ন করেন: যেখানে সে তোমার হাতে তার অর্থ তুলে দিয়েছিল তুমি কি মনে কর এতক্ষণে সে সেখানে পৌঁছে গেছে? লোকটি কোন রকম ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই বলে উঠলো: অসম্ভব। জায়গাটি বহু দূরে।
সাথে সাথে ইয়াস বলে উঠলেন: ওরে আল্লাহর দুশমন! অর্থ গ্রহণের কথা অস্বীকার করছো, অথচ যেখান থেকে তা গ্রহণ করেছো সে স্থানটি চেন? আল্লাহর কসম! তুমি একজন মিথ্যাবাদী, গাদ্দার।
ঘটনার আকস্মিকতায় লোকটি হতভম্ব হয়ে গেল এবং অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকার করলো। ইয়াস তাকে কারারুদ্ধ করেন এবং তার নিকট থেকে সকল অর্থ আদায় করে বাদীকে ফেরত দেন।
আরেকবার একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে। বিবাদমান দুব্যক্তি তাঁর নিকট আসে বিচারের জন্য। তিনি তখন কাজী। ঘটনাটি হলো দুটি 'কাতীফা' নিয়ে। 'কাতীফা' হলো মখমলের রুমাল যা আরবরা মাথার উপর রেখে দুদিক দুকাঁধের উপর ছেড়ে দেয়। তার মধ্যে একটি হলো সবুজ রংয়ের, নতুন ও দামী। আর অন্যটি ছিল লাল রংয়ের পুরানো ও কম মূল্যের।
বাদী বললো: আমি একটি হাউজে গোসলের জন্য গেলাম। আমার অন্য কাপড়-চোপড়র সাথে সবুজ রুমালটিও হাউজের পাশে রেখে হাউজে নামলাম। আমার প্রতিপক্ষ আমার পরে আসলেন এবং তিনিও তার একটি লাল রুমাল ও অন্য কাপড়-চোপড় আমার কাপড়ের পাশে রেখে হাউজে নামলেন। কিন্তু তিনি গোসল সেরে আমার আগে হাউজ থেকে উঠে গেলেন। তিনি তাঁর কাপড় পরলেন এবং আমার সবুজ রুমালটি মাথায় ফেলে দুকাঁধের উপর ঝুলিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। আমি তাঁর পরই হাউজ থেকে উঠলাম এবং আমার রুমালটি না দেখে পিছু ধাওয়া করে তাঁকে ধরলাম এবং রুমালটি ফেরৎ চাইলাম। কিন্তু তিনি বললেন: রুমালটি তার। আমি আমার রুমালটি ফেরৎ চাই।
ইয়াস বিবাদীকে বললেন: তোমার বক্তব্য কি? লোকটি বললো: এটি আমার রুমাল এবং আমার হাতেই আছে।
ইয়াস বাদীকে বললেন: তোমার কি কোন সাক্ষী-প্রমাণ আছে?
লোকটি বললো: না। কোন সাক্ষী প্রমাণ নেই।
এবার ইয়াস তাঁর দারোয়ানকে একটি চিরুনী আনতে বললেন। চিরুনী আনলে তিনি বাদী-বিবাদী উভয়ের মাথায় ভালো করে চিরুনী করলেন। তাতে একজনের মাথা থেকে লাল পশমী রুমালের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ বের হলো এবং অন্যজনের মাথা থেকে বের হলো সবুজ পশমের অংশ। বিষয়টি তিনি বুঝে ফেললেন এবং নতুন সবুজ রুমালটি বাদীকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
তবে ইয়াসের এত মেধা, চিন্তাশক্তি ও উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা থাকা সত্ত্বেও মাঝে মধ্যে অন্যের যুক্তির কাছে হেরে গেছেন। এ রকম একটি ঘটনার কথা তিনি নিজেই এভাবে বলেছেন: এক ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ কখনো আমার উপর বিজয়ী হতে পারেনি। আর তা হলো আমি যখন বসরার কাজী তখন এক ব্যক্তি আমার নিকট এসে সাক্ষ্য দিল যে, অমুক বাগানটির মালিক অমুক। তারপর সে বাগানটির চৌহদ্দি বর্ণনা করলো।
আমি তার কাছে জানতে চাইলাম: বাগানে গাছের সংখ্যা কত?
সে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবলো। তারপর মাথা সোজা করে আমাকে প্রশ্ন করলো: আমাদের মাননীয় কাজী সাহেব এই এজলাসে কত বছর ধরে বসেন?
বললাম: এত বছর।
সে বললোঃ যে ঘরে আপনার এজলাস হয় সে ঘরের ছাদের কড়িকাঠের সংখ্যা কত?
বললাম: আমার তো তা জানা নেই। আমি তার যুক্তির কাছে হেরে গেলাম। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করলাম।
ইয়াস বলতেন: "আমি যদি ওয়াসিত নগরের প্রধান প্রবেশ দ্বারে বসি তাহলে আমার পাশ দিয়ে যেই অতিক্রম করুক আমি তার কাজ ও পেশা কি তা তোমাদেরকে বলতে পারবো।"
আবুল হাসান আল-মাদায়িনী বলেন, একদিন ইয়াস কোন কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত তিন মহিলাকে দেখলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করলেন: এদের মধ্যে এটি গর্ভবতী, এটি স্তন্যদানকারিণী এবং এটি কুমারী, একথা শুনে এক ব্যক্তি মহিলা তিনজনের নিকট গেল এবং তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে ইয়াসের কথার সত্যতা পেল। তখন ইয়াসকে জিজ্ঞেস করা হলো: এ কথা আপনি কীভাবে জানলেন? বললেন: তারা যখন ভয় পেয়েছে তখন অতি স্বাভাবিকভাবে তাদের নিজ নিজ হাত তাদের দেহের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে পৌঁছে গেছে, আর আমি তা দেখেই তাদেরকে চিনে ফেলেছি। স্তন্যদানকারী তার হাত তার দু'স্তনের উপর রেখেছে, গর্ভবতী তার পেটের উপর এবং কুমারী তার তল পেটের নীচে রেখেছে।
আল-আসমা'ঈ বলেন, ইয়াস একদিন একজন অপরিচিত লোককে দেখে ডাক দেন: ওহে ইয়ামামার অধিবাসী ব্যক্তি! সে বললো: আমি ইয়ামামার লোক নই। তিনি এবার ডাকলেন : ওহে আল-আদাখার অধিবাসী! লোকটি বললো: আমি আদাখার লোক নই। এবার তিনি ডাকলেন: ওহে দারিয়্যার অধিবাসী! লোকটি তাঁর নিকট এগিয়ে গেল। তিনি তার পরিচয় জানতে চাইলেন। সে বললো: আমার জন্ম ইয়ামামায়, বড় হয়েছি আদাখায় এবং পরে দারিয়্যায় চলে গিয়েছি।
হুমাইদ আত-তাবীল বলেন, ইয়াস ইবন মু'আবিয়া কাজীর দায়িত্ব গ্রহণের পর হাসান আল-বাসরী (রহ) সাক্ষাৎ করতে আসেন। তাঁকে দেখে ইয়াস কাঁদতে শুরু করেন। হাসান জিজ্ঞেস করেন: কাঁদছেন কেন? ইয়াস এই হাদীছটি উল্লেখ করেন: "কাজী তিন প্রকার: দুই প্রকার জাহান্নামী এবং এক প্রকার জান্নাতী হবে।" হাসান বলেন: আল্লাহ দাউদ ও সুলায়মানের (আ) বিচার কাজের বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে দাউদের ভুলের জন্য তিরস্কার তো করেননি। তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন এ আয়াত: "এবং স্মরণ কর দাউদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তারা বিচার করছিল শস্যক্ষেত সম্পর্কে; তাতে রাত্রিকালে প্রবেশ করেছিল সম্প্রদায়ের কোন মেষ; আমি প্রত্যক্ষ করছিলাম তাদের বিচার। অতঃপর আমি সুলায়মানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেককে আমি দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান।"
এ আয়াতে আল্লাহ সুলায়মানের প্রশংসা করেছেন, তবে দাউদের নিন্দা করেননি।
কাজীদের সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা
কোন বিভাগ বা শাখার লোকের তার নিজের বিভাগ বা শাখার সমপেশার লোকদের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান থাকা বিশেষ যোগ্যতা বলে বিবেচিত হয়। ইয়াস তাঁর সমকালীন সকল মুফতী ও কাজীর দোষ-ত্রুটি ও উত্তম বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগত ছিলেন। হাবীব ইবন শুহাইদ বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি ইয়াসের নিকট আসে এবং তার একটি মামলার ব্যাপারে পরামর্শের জন্য কার কাছে যাবে সে ব্যাপারে তাঁর মতামত চায়। তিনি বলেন, তুমি যদি এর সঠিক ফয়সালা চাও তাহলে 'আবদুল মালিক ইবন ইয়া'লার নিকট যাও। সঠিক অর্থে তিনি একজন কাজী। আর যদি শুধু ফাতওয়া নিতে চাও তাহলে হাসান আল-বাসরীর নিকট যাও। তিনি আমার পিতার ও আমার উসতাদ। আর যদি সন্ধি ও চুক্তি করতে চাও তাহলে হুমাইদ আত-তাবীলের নিকট যাও। তাঁর সন্ধির পদ্ধতি এ রকম যে, তিনি তোমাকে বলবেন, তুমি তোমার অধিকার কিছু নিয়ে কিছু ছেড়ে দাও। আর যদি মামলাবাজি করতে চাও তাহলে সালিহ আদ-দাওসীর নিকট যাও। তিনি তোমাকে বলবেন, প্রতিপক্ষের অধিকার সম্পূর্ণ অস্বীকার কর এবং নিজের যতটুকু অধিকার তার চেয়ে বেশি দাবী কর। আর যারা উপস্থিত ছিল না তাদেরকে সাক্ষী মান।
পরিচ্ছন্ন 'আকীদা-বিশ্বাস এবং বিদ'আতীদের সাথে তর্ক-বাহাছ
এত প্রখর মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আকীদার ক্ষেত্রে কোন রকম নতুনত্ব ও সংযোজন-বিয়োজন ভীষণ অপছন্দ করতেন। যারা এমন করতো তাদের বক্তব্যের প্রতিবাদ ও প্রত্যাখ্যান করতেন। তিনি বিদ'আতী, বিশেষ করে কাদরিয়্যাদের সাথে তর্ক-বাহাছ করতেন। কাদরিয়্যাদের 'আকীদা হলো, আল্লাহ আদিল বা ন্যায়বিচারক। এতটুকু পরিমাণ তো সঠিক ছিল। তবে এই মূলনীতির ভিত্তিতে যে সকল কর্ম দৃশ্যতঃ যুগ্ম ও অন্যায় বলে মনে হয় তা আল্লাহর প্রতি আরোপ করতো না। এ ব্যাপারে তারা এত বাড়াবাড়ি করতো যে, আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতাও অস্বীকার করা হতো। একবার কাদরিয়্যাদের সাথে তাঁর তর্ক-বাহাছ হয়। তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন, যুগ্ম কাকে বলে? তারা বলে, কারো এমন কোন জিনিস নিয়ে নেওয়া যা তার নেওয়ার অধিকার নেই। তিনি বললেন, সব জিনিসই তো আল্লাহর, অর্থাৎ সব জিনিসই যখন আল্লাহর তখন তার কোন কাজকে যুগ্ম বলা সঠিক নয়।
তাঁর কিছু বাণী খুবই মনোমুগ্ধকর। তিনি বলতেন: যার অন্তর তার নিজের দৃষ্টিতে সম্মানিত তার দৃষ্টিতে দুনিয়ার কোন মূল্যই থাকে না। যে ব্যক্তি তার জীবন যাপনে সঙ্গীদের সাথে মানিয়ে চলতে পারে না সে বুদ্ধিমান নয়। আল্লাহ জান্নাতকে তোমাদের প্রাণের বিনিময়ে নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং অন্য কোন কিছুর বিনিময়ে তা বিক্রি করো না। যে কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয় না তা ব্যর্থ হয়ে যায়।
তিনি বলতেন: যার মধ্যে কোন দোষ নেই সে নির্বোধ। একজন জিজ্ঞেস করে: আপনার মধ্যে কি দোষ আছে? বললেন: অতিরিক্ত কথা বলা। তিনি বলতেন, আমি মানুষের সকল গুণ পরীক্ষা করেছি। তার মধ্যে সত্য কথা বলাকে শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে পেয়েছি।
যে সকল বাগ্মী, খতীব, ফকীহ ও আমীর উমারা অনর্গল কথা বলতেন; কিন্তু খুব কমই ভুল করতেন তাঁদের একটি বর্ণনা আল-জাহিজ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ইয়াসের নামটিও তিনি উল্লেখ করেছেন। কৃষ্ণার কাজী 'আবদুল্লাহ ইবন শুবরামা (মৃত্যু-১৪৪ হি.) একবার হযরত ইয়াসের অতি কথনের কারণে বলেন: "আমি ও আপনি একমতে পৌঁছাতে পারবো না। আপনি চুপ করতে চান না, আর আমি শুনতে চাই না।"
একবার তিনি অতি সাধারণ বেশ-ভূষায় দিমাশকের মসজিদে কুরায়শদের একটি আসরে উপস্থিত হলেন। উপস্থিত লোকেরা তাঁকে চিনতে না পেরে তাঁর প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষার ভাব দেখালো। যখন তারা চিনতে পারলো তখন ক্ষমা চাওয়ার সূরে তাঁকে বললো! অপরাধ আমাদের ও আপনার উভয়ের সমান। কারণ, আপনি এসেছেন একজন রিক্ত- নিঃস্ব দরিদ্রের পোশাক পরে। তবে আমাদের সাথে কথা বলেছেন একেবারে রাজা- বাদশাদের ভাষায়।
আল-জাহিজ বলেন, আমি দেখেছি মানুষ ইয়াস ইবন মু'আবিয়ার একটি জবাব খুবই পছন্দ করে। আর তা হলো, একবার তাঁকে বলা হলো, আপনি আপনার কথার কারণে নিজেই একটা বিস্ময় হয়ে গেছেন, এছাড়া আপনার মধ্যে আর কোন দোষ নেই। তিনি প্রশ্ন করেন: আমার কথা আপনাদেরকে বিস্মিত করে? লোকেরা বললো: হাঁ, বিস্মিত করে। তিনি বললেন: আমি যা বলি এবং আমার কথা শুনে আপনারা যে বিস্মিত হন সে জন্য আমি নিজেই সর্বাধিক বিস্মিত হওয়ার উপযুক্ত। লোকেরা একদিন তাঁকে বললো : মানুষ আপনার বুদ্ধিমত্তায় বিস্মিত। তিনি বললেন: মানুষ বিস্মিত না হলে আমি তার দ্বারা বিচার কাজ করতাম না।
একবার তাকে বলা হলো, বেশি কথা বলা ছাড়া আপনার মধ্যে আর কোন দোষ নেই। তিনি জানতে চাইলেন, আমার যেসব কথা আপনারা শোনেন তা কি সঠিক না ভুল? বলা হলো: সঠিক। তখন তিনি বলেন: ফায্ যিয়া-দাতু মিনাল খাইরি খাইরুন ভালোর আধিক্য তো ভালো।
ইমাম আল-আসমা'ঈ বর্ণনা করেছেন, 'উমার ইবন হুবায়রা যখন ইয়াসকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দিতে চাইলেন তখন ইয়াস বললেন আমি এ পদের যোগ্য নই। প্রশ্ন করা হলো: কেন? বললেন: প্রথমত: আমার ভাষার জড়তা, দ্বিতীয়ত: আমি দেখতে অসুন্দর, কুৎসিত এবং তৃতীয়ত: লোহার মত শক্ত প্রকৃতির। ইবন হুবায়রা বললেন: কঠোরতা চাবুক সোজা করে দেবে। আর আপনি যে অসুন্দর, তাতে কি হয়েছে, আমি তো আপনার দ্বারা কাউকে সুন্দর করতে চাচ্ছিনা। আর ভাষার যে জড়তার কথা বলছেন, তা আপনি তো আপনার মনের কথা প্রকাশ করছেন।
আল-জাহিজ বলেন: আসলে ইয়াসের যদি জড়তা থাকতো তাহলে তিনি বেশি কথা বলা পরিহার করতেন। আর একারণে আমরা এমন কাউকে জানি না যিনি ইয়াসের ভাষা জড়তার কথা বলেছেন। বরং এর বিপরীতটি দেখা যায়। তাঁর প্রতি বেশি কথা বলার দোষারোপ করা হয়। 'উতবা ইবন 'উমার বলেছেন, আমি বহু মানুষের বুদ্ধি-জ্ঞান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি যে, তা প্রায় একে অপরের কাছাকাছি। ব্যতিক্রম দেখেছি কেবল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ও ইয়াস ইবন মু'আবিয়ার ক্ষেত্রে। অন্যদের তুলনায় তাঁদের দু'জনের বুদ্ধির পাল্লা ভারী পেয়েছি।
একবার এক ব্যক্তি ইয়াসকে জিজ্ঞেস করলো: আপনি বিচার কাজে দ্রুততা করেন কেন? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন: তোমার একটি হাতে আঙ্গুল কয়টি? বললো: পাঁচটি। ইয়াস বললেন: খুব দ্রুত জবাব দিয়েছো। লোকটি বললো: যে জেনে বুঝে হত্যা করে সে তো দ্রুত স্বীকার করে না। ইয়াস বললেন: তোমার প্রশ্নের এটাই আমার জবাব। তিনি প্রায়ই জাহিলী ও ইসলামী যুগের বিখ্যাত কবি আন-নাবিগা আল-জা'দীর (রা) নিম্নের শ্লোকটি আওড়াতেন:
আবা- লিয়াল বালা-উ ওয়া আন্নী ইমরাউন ইযা- মা- তাবারাইয়্যানতু লাম আরতাব।
'বিপদ-আপদ আমাকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আমি এমন একজন পুরুষ, যখন তা পরীক্ষা করেছি, ভীত-কম্পিত হইনি।
ইয়াস ইবন মু'আবিয়া বলেছেন: আমি প্রতারক নই এবং কোন প্রতারক আমার সাথে প্রতারণা করতে পারবে না।
তিনি যখন অল্প বয়সী একজন তরুণ তখন একবার শামে যান। সেখানে তাঁর একজন অতি বৃদ্ধ শত্রুর দেখা পান এবং তাকে নিয়ে খলীফা 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানের একজন কাজীর দরবারে হাজির হন। কাজী তাঁকে বললেন: আপনি এই বৃদ্ধকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন, লজ্জা করে না? ইয়াস বললেন: সত্য এই বৃদ্ধের চেয়েও বড়। কাজী ধমকের সুরে বললেন: চুপ করুন। ইয়াস বললেন: তাহলে আমার যুক্তি-প্রমাণ তুলে ধরবে কে? কাজী বললেন: আমার মনে হয় না আপনি সত্য বলেছেন। এই এজলাসে উপস্থিত হওয়ার পর থেকে অসত্য বলে যাচ্ছেন। ইয়াস বললেনঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! এ কি সত্য, না অসত্য? কাজী বললেন: সত্য, কা'বার প্রভুর শপথ! সত্য। কাজী বললেন: আমার ধারণা আপনি একজন যালিম। ইয়াস বললেন: কাজীর ধারণা সত্য হলে আমি ঘর থেকে বের হতাম না। এরপর কাজী উঠে খলীফা 'আবদুল মালিকের দরবারে ঢুকলেন এবং সব ঘটনা খুলে বললেন। 'আবদুল মালিক বললেনঃ তার বিষয়টি এখনই নিষ্পত্তি করে তাকে শাম থেকে বের করে দিন। অন্যথায় সে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে। আল-জাহিজ বলেন, খলীফা আবদুল মালিক ইয়াসের তরুণ বয়সে যখন তাঁকে নিয়ে এত ভীত ছিলেন তখন তার পরিণত বয়সের অবস্থা কেমন ছিল।
সর্বশেষ আল-জাহিজ তাঁর সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে :
"ইয়াস সম্পর্কে সার্বিক কথা হলো, তিনি মুদার গোত্রের অন্যতম গৌরব ও অগ্রবর্তী কাজী। তিনি ছিলেন দৈহিক গঠন তথা প্রকৃতিগতভাবে ফকীহ্ ও সূক্ষ্মদর্শী বিচক্ষণ ব্যক্তি। তাঁর আন্দাজ-অনুমান সত্যে পরিণত হতো, দূরদর্শিতাও ছিল বিস্ময়কর। তিনি ছিলেন পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন বস্তু আহারকারী উত্তম স্বভাব ও চরিত্রের মানুষ। খলীফাদের নিকট সম্মানীয় ও সমকক্ষদের নিকট প্রাধান্যপ্রাপ্ত।"
ইয়াস বলেছেন:
"কার্পণ্য একটি বন্ধন, ক্রোধ একটি পাগলামি এবং মদমত্ততা সকল অপকর্মের চাবিকাঠি।"
একবার আবান ইবন আল-ওয়ালীদ-ইয়াসকে বললেন: আমি আপনার চেয়ে বেশি ধনী। ইয়াস বললেন: না, আপনার চেয়ে আমি বেশি ধনী। আবান বললেন: তা কিভাবে হয়। আমার এত এত সম্পদ আছে। আপনার তো তা নেই। ইয়াস বললেন: তাহলে কি হবে। আপনার আয় আপনার ব্যয়ের অতিরিক্ত নয়। কিন্তু আমার ব্যয়ের চেয়ে আয় বেশি।
একদিন খলীফা উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) বিনিদ্র রজনী অতিবাহিত করলেন। সারা রাত চোখের পাতা বুজলো না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কাটালেন। দিমাশকের তীব্র ঠাণ্ডার সেই রাতটি কাটালেন বসরায় একজন কাজী নিয়োগের চিন্তায়। সেই কাজী এমন হবেন যিনি আল্লাহর নাযিলকৃত কুরআনের বিধান অনুযায়ী মানুষের মাঝে 'আদল-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন এবং সত্যের ব্যাপারে কারো রাগ-বিরাগের পরোয়া করবেন না।
কাজী নির্বাচনের ক্ষেত্রে 'উমারের দৃষ্টি দু'ব্যক্তির উপর নিবদ্ধ হল, যারা সব দিক দিয়ে সমতায় দৌড় প্রতিযোগী দু'অশ্বের মত ছিলেন। দীনের তত্ত্ব জ্ঞানে, সত্যের উপর দৃঢ়তায়, চিন্তার ঔজ্জ্বল্যে এবং দৃষ্টিশক্তির তীক্ষ্ণতায় উভয়ে ছিলেন সমান সমান। যখনই তিনি একজনকে কোন একটি বৈশিষ্ট্যের দরুন প্রাধান্য দিচ্ছিলেন তখনই অন্যজন তাঁর একটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণে অগ্রাধিকার লাভের যোগ্য বলে মনে করছিলেন।
এভাবে রাত কেটে গেল। সকালে তিনি ইরাকের ওয়ালী 'আদী ইবন আরতাতকে ডেকে পাঠালেন। 'আদী তখন দারুল খিলাফা দিমাশকে অবস্থান করছিলেন। তিনি 'আদীকে বললেন: আপনি ইয়াস ইবন মু'আবিয়্যা আল-মুযানী ও কাসিম ইবন রাবী'আ আল-হারিছী, মতান্তরে বাকর ইবন 'আবদিল্লাহকে ডেকে তাদের সঙ্গে বসরার বিচার বিষয়ে কথা বলুন এবং তাঁদের একজনকে তথাকার কাজী নিয়োগ করুন।
আমীরুল মু'মিনীনের নির্দেশ মত 'আদী ইবন আরতাত ইয়াস ও কাসিমকে ডেকে বললেন: আমীরুল মু'মিনীনের নির্দেশমত আমি আপনাদের দু'জনের যে কোন একজনকে বসরার কাজী নিয়োগ করতে চাই। এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত কি? তখন দু'জনের প্রত্যেকে অপরজন সম্পর্কে বললেন: এ পদের জন্য আমার চেয়ে তিনি বেশি উপযুক্ত। এরপর তাঁর মহত্ব, মর্যাদা, জ্ঞান ও ফিক্ বিষয়ে পারদর্শিতার কথা তুলে ধরেন।
'আদী বললেন: এ ব্যাপারে আপনারা নিজেরা একটি সিদ্ধান্তে না আসা পর্যন্ত আমার এ সভা থেকে উঠতে পারবেন না।
ইয়াস বললেন: মাননীয় আমীর! আপনি কাসিম ও আমার সম্পর্কে ইরাকের দু'জন সর্বজন মান্য ফকীহ হাসান আল-বাসরী ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীনকে (রহ) জিজ্ঞেস করুন। আমাদের দু'জনের মূল্যায়নের ব্যাপারে তাঁরাই যোগ্যতম ব্যক্তি।
আসলে কাসিম ও তাঁদের দু'জনের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তাঁদের সাথে ইয়াসের তেমন যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল না। তাই কাসিম মনে করলেন, ইয়াসের এ প্রস্তাব নিজেকে বাঁচানোর একটি কৌশলমাত্র। কারণ আমীর হাসান আল-বাসরী ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের সাথে পরামর্শ করলে তাঁরা অবশ্যই তাঁর নামটিই সমর্থন করবেন। তাই মোটেই দেরী না করে তিনি আমীরকে লক্ষ্য করে বললেন: মাননীয় আমীর! আমার ও তাঁর সম্পর্কে জানার জন্য কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। সেই আল্লাহর নামের কসম যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, ইয়াস আল্লাহর দীনের ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশি পারদর্শী ও বিচার বিষয়ে অধিক জ্ঞানী। আমার এ কথায় আমি যদি মিথ্যাবাদী হই, তাহলে একজন মিথ্যাাবাসীকে বিচারকের পদে নিয়োগ দেওয়া আপনার জন্য বৈধ হবে না। আর আমি সত্যবাদী হলে যোগ্যতম ব্যক্তিকে বাদ দেওয়া সঙ্গত হবে না।
এবার ইয়াস আমীরের দিকে তাকিয়ে বললেন: জনাব, আপনি এক ব্যক্তিকে কাজীর পদে নিয়োগদানের জন্য ডেকে এনেছেন এবং তাঁকে যেন জাহান্নামের পাশে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। আর তিনি মিথ্যা শপথ করে তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিলেন। একটু পরেই আবার তাওবা করে নিবেন। কিন্তু তিনি তো মুক্তি পেয়ে গেলেন।
জবাবে 'আদী ইবন আরতাত তাঁকে বললেন: আপনার মত যিনি এ কথাটি বুঝতে পারেন তিনিই কাজী হওয়ার উপযুক্ত। অতঃপর তিনি ইয়াসকে বসরার কাজী নিয়োগ করেন।
মৃত্যু
ইয়াস ইবন মু'আবিয়ার (রহ) বয়স যখন ৭৬ (ছিয়াত্তর) বছরে পৌঁছালো তখন একদিন স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি ও তাঁর পিতা দু'জন দু'টি ঘোড়ার পিঠে আরোহী হয়েছেন এবং উভয়ে নিজ নিজ ঘোড়া দাবড়ান। কিন্তু কেউ কাউকে পিছনে ফেলতে পারলেন না; বরং দু'জনই পাশাপাশি থাকেন। তাঁর পিতা মু'আবিয়া ৭৬ (ছিয়াত্তর) বছর বয়সে মারা যান। এ ঘটনার পর একদিন রাতে ইয়াস ঘুমানোর জন্য বিছানায় শুয়ে পরিবারের লোকদের ডেকে বলেন: তোমরা কি জান এটা কোন্ রাত?
তারা বললো: না, জানি না।
তিনি বললেন: এ রাতে আমার পিতা তাঁর জীবনপূর্ণ করেন।
রাত পোহালে সকাল বেলায় পরিবারের লোকেরা বিছানায় তাঁকে মৃত দেখতে পান। হিজরী ১২২ সনে তিনি বসরায়, মতান্তরে ওয়াসিত-এর 'আবদাসা নামক পল্লীতে মৃত্যুবরণ করেন।
ইয়াসের মা মৃত্যুবরণ করলে তিনি শোকে কাতর হয়ে ভীষণ কান্নাকাটি করেন। লোকেরা যখন সান্ত্বনা দিত, তিনি বলতেন: "আমার জন্য জান্নাতের দু'টি দরজা খোলা ছিল। এখন একটি বন্ধ হয়ে গেল।"
টিকাঃ
১. সুওরুল মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৬৮-৬৯
২. আত-তাবাকাত-৭/৫
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯০
৪. আত-তাবাকাত-৭/৫
৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৯৮, টীকা নং-১
৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯০
৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৪/৭৯; শাযারাত আয যাহাব-১/১৬০
৮. ইবন আল-জাওযী, আত-তুরুক আল-হিকমিয়্যা-২৮-২৯; তাবি'ঈন-৫০
৯. প্রাগুক্ত-২৯
১০. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৭১
১১. প্রাগুক্ত-৭২
১২. প্রাগুক্ত-৭৩-৭৪; তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭২
১৩. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৬৯-৭০ তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭৩
十四. আত-তুরুক আল-হিকমিয়্যা-২৯; তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭৯
十五. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭৯
十六. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৭৬
十七. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৮৬
十八. প্রাগুক্ত-২/৩৮৩
十九. প্রাগুক্ত-২/৩৮৪
二十. আবু দাউদ, কিতাব আল-আকাদিয়্যাতি, বাব: আল-কাদী ইউখতিউ, হাদীছ নং ৩৫৭৩; আত- তিরমিযী, কিতাব আল-আহকাম (১৩২২); ইবন মাজা, কিতাব আল-আহকাম (২৩১৫)
২১. সূরা আল-আম্বিয়া'-৭৮-৭৯
২২. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭৬
২৩. প্রাগুক্ত-২/৩৭৫; তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯০
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯২
২৫. আত-তাবাকাত-৭/৫
২৬. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯১
২৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৯৮, ২/৩১৫
২৮. প্রাগুক্ত
২৯. প্রাগুক্ত
三十. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৮৮
三十一. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৯৯
三十二. প্রাগুক্ত
三十三. প্রাগুক্ত-১/১০০, ২৭৫
三十四. প্রাগুক্ত
三十五. কিতাব আল-হাওয়ান-৩/৪৯৫
三十六. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১০১
三十七. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭২-৩৭৩; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৭০
三十八. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১০১
三十九. প্রাগুক্ত
四十. প্রাগুক্ত-১/১৯৫
四十一. প্রাগুক্ত-৪/৯১; তাহযীব আল-কামাল-২/৩৮৫
四十二. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৭৫; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৬৫-৬৮
四十三. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৩৯; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৯৮; সাওয়ারুন মিন হায়াত আত তাবি'ঈন-৭৮-৭৯
四十四. তাহযীব আল-কামাল-২/৩৮৯, ৩৯২
📄 কাসিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবূ বকর (রা)
হযরত কাসিমের (রহ) ডাকনাম আবূ মুহাম্মাদ, মতান্তরে আবূ 'আবদির রহমান। তিনি হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) পুত্র মুহাম্মাদের (রহ) সন্তান। তাঁর মা 'সাওদা' ছিলেন 'উম্মু ওয়ালাদ'। 'উম্মু ওয়ালাদ'-এর শব্দগত অর্থ সন্তানের মা। ইসলামের পরিভাষায় যে দাসী মনিবের ঔরসজাত সন্তান জন্ম দেয় তাকে বলা হয় উম্মু ওয়ালাদ। এমন দাসীকে আর কোনভাবে হস্তান্তর করা যায় না। যাই হোক কাসিমের মা সাওদা দাসী হলেও তিনি ছিলেন বিশ্বের এক অভিজাত ঘরের কন্যা। যুদ্ধবন্দী হিসেবে তৎকালীন বিশ্বের রীতি অনুযায়ী দাসীতে পরিণত হন।
মাদায়েন বিজয়ের পর পারস্য সম্রাট ইয়াযদিগুরদ-এর তিন কন্যা মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন। তাদেরকে মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন না করে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। 'আলী (রা) তাঁদের তিনজনকে ক্রয় করেন এবং তিনজন মুসলিম যুবকের হাতে তাদের একজন করে তুলে দেন। একজনকে দেওয়া হয় রাসূলুল্লাহর (সা) দৌহিত্র আল-হুসাইন ইবন 'আলীকে এবং এখানে তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন যায়নুল 'আবিদীন; দ্বিতীয়জনকে লাভ করেন মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর (রা) এবং তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের আলোচ্য ব্যক্তি আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ। তৃতীয়জনকে লাভ করেন 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) এবং তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন সালিম ইবন 'আবল্লিাহ (রা)। ইয়াযদিগুরদের তিন কন্যার এ তিন সন্তান তাদের পরিণত বয়সে নৈতিকতা, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতায় সর্বজনমান্য ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
কাসিম জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতায় মদীনার মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গের অন্যতম ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে মদীনার মনীষীদের দ্বিতীয় তাবকায় (স্তর) উল্লেখ করেছেন।
ইয়াতীম অবস্থা এবং ফুফুর নিকট লালিত-পালিত
হযরত 'উছমানের (রা) বিরুদ্ধাচরণ ও শাহাদাতের ঘটনায় মুহাম্মাদ ইবন আবী বকরের (রা) নামটি ইসলামের ইতিহাসে বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। তিনি হযরত উছমানের (রা) প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন। এমনকি হযরত উছমানের (রা) হত্যাকারীদের মধ্যে তাঁর নামটিও উচ্চারিত হয়। 'উছমানের (রা) শাহাদাতের পর তিনি আলীর (রা) পক্ষ অবলম্বন করেন। হযরত 'আলী ও হযরত মু'আবিয়ার (রা) মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হয় তাতে মুহাম্মাদ 'আলীর (রা) একজন উদ্যমী সহযোগী হিসেবে তাঁর পাশে দাঁড়ান। হযরত 'আলী (রা) তাঁকে মিসরের ওয়ালী নিয়োগ করেন। যখন হযরত মু'আবিয়ার (রা) পক্ষ থেকে হযরত 'আমর ইবন আল-'আস (রা) মিসরে সামরিক অভিযান চালান তখন মুহাম্মাদ ইবন আবী বকর (রা) নিহত হন। কাসিম তখন অল্প বয়সী শিশু। এ কারণে তাঁর ফুফু উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা (রা) তাঁকে নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসেন এবং অত্যন্ত স্নেহ-মমতায় তাঁকে গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে হযরত কাসিম তাঁর শৈশবকালীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলতেন, আমাদের ফুফু-আম্মা 'আয়িশা (রা) 'আরাফার রাতে আমাদের মাথা ন্যাড়া করে দিতেন এবং মাথায় টুপি পরিয়ে মসজিদে পাঠিয়ে দিতেন। পরের দিন সকালে আমাদের পক্ষ থেকে কুরবানী করতেন। তিনি আরো বলতেন, ফুফু-আম্মা নিজ হাতে আমাকে ও আমার ছোট্ট বোনকে খাওয়াতেন। তবে আমাদের সাথে খেতেন না। আমরা খাওয়ার পর যা কিছু অবশিষ্ট থাকতো তাই খেতেন। মা যেমন অতি আদরে তার শিশু সন্তানকে দুধ পান করায় তেমনি তিনিও আমাদের আদর করে খাওয়াতেন। আমাদেরকে গোসল করাতেন, মাথায় চিরুনী করে পরিষ্কার সাদা কাপড় পরিয়ে দিতেন। ভালো কাজ কী তা শেখাতেন, ভালো কাজ করার জন্য উৎসাহিত করতেন ও প্রশিক্ষণ দিতেন। আর মন্দ কাজ কী তাও শেখাতেন এবং তা থেকে বিরত থাকার কথা বলতেন। আমি সন্তানের প্রতি তাঁর চেয়ে বেশি যত্নশীল, তাঁর চেয়ে বেশি স্নেহশীল কোন পিতা-মাতাকে কখনো দেখিনি।
তিনি তাঁর এই স্নেহশীল ফুফুকে আম্মা বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে যখন তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করতেন তখন বলতেন: আমার আম্মা আয়িশা (রা) আমাকে বলেছেন, অথবা আমার আম্মা 'আয়িশার (রা) নিকট শুনেছি। তিনি বলতেন, তাঁর চেয়ে সুন্দর করে কথা বলতে এবং তাঁর চেয়ে বিশুদ্ধ ও মিষ্টভাষী কোন পুরুষ বা নারীকে তাঁর আগে পরে কখনো আমি দেখিনি।
জ্ঞান ও মনীষা
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা (রা) এমন বিদুষী মহিলা ছিলেন যে, তাঁর একজন নগণ্যতম সেবকও জ্ঞান ও কর্মের উচ্চাসন অলঙ্কৃত করেছেন। কাসিম ছিলেন তাঁর অতি স্নেহের সন্তানতুল্য। তাঁর আদর-যত্নে লালিত-পালিত হয়ে তিনি 'ইল্ম ও 'আমল দু'সাগরের সংযোগস্থলে পরিণত হন। ইবন সা'দ লিখেছেন, তিনি উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন ফকীহ, ইমাম, শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ও আল্লাহ ভীরু মানুষ ছিলেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি একজন অতি উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন তাবি'ঈ। তাঁর বিশ্বস্ততা ও ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সকলে একমত।
তাফসীর
ইসলামী জ্ঞানের সকল শাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল। তবে আল্লাহর কালামের তাফসীরের ব্যাপারে ছিলেন খুবই সতর্ক। চরম সতর্কতার কারণে তিনি কুরআনের তাফসীর করতেন না। এ কারণে মুফাস্সির হিসেবে তেমন প্রসিদ্ধি লাভ করেননি।
হাদীছ
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) ব্যক্তি সত্তাটিই ছিল হাদীছের অন্যতম উৎসস্থল। হযরত কাসিম (রহ) এই উৎস থেকে প্রাণ ভরে পরিতৃপ্ত হন। তাছাড়া অন্য সাহাবায়ে কিরাম থেকেও হাদীছ শোনেন। যেমন : 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), আবূ হুরায়রা (রা) ও আরো অনেকে। তিনি নিজেই বলেন, আমি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট বসতাম, তাছাড়া আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) ও আবূ হুরায়রার (রা) নিকটও বসতাম। তাঁদের নিকট থেকে আমি সর্বাধিক উপকার লাভ করেছি। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) নিকট এমন জ্ঞান, খোদাভীরুতা এবং এমন দুর্লভ তথ্য ছিল যা আর কারো নিকট থেকে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। এ সকল ব্যক্তি ছাড়াও তিনি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার, মু'আবিয়া, 'আবদুল্লাহ ইবন খাব্বাব, রাফি' ইবন খাদীজ, আসলাম মাওলা 'উমার (রা) প্রমুখ মহান সাহাবীর নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। এ সকল মহান ব্যক্তিবর্গের কল্যাণে তিনি একজন বিশিষ্ট হাফিজে হাদীছে পরিণত হন। ইবন সা'দ তাকে কাসীরুল হাদীছ - বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী বলেছেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে হাফিজে হাদীছগণের ইমাম ও নেতা বলে উল্লেখ করেছেন। আবুয যানাদ বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে সুন্নাহর বড় 'আলিম কাউকে দেখিনি। তিনি বিশেষভাবে হযরত 'আয়িশার (রা) হাদীছের হাফিজ ছিলেন। খালিদ ইবন বাযযায় বলেন, 'আয়িশার (রা) হাদীছের তিনজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা হলেন কাসিম, 'উরওয়া ও 'আমর (রহ)।
তাঁর বর্ণনাসমূহের মান
মুহাদ্দিছগণ হযরত 'আয়িশা (রা) থেকে তাঁর বর্ণনাসমূহকে খাঁটি সোনার মত মনে করেছেন। ইবন মা'ঈন বলেন, "উবায়দুল্লাহ ইবন উমার আন কাসিম আন আইশা" সনদের এই ধারাটি খাঁটি সোনার শিকলের মত।
হাদীছের পঠন-পাঠন
প্রত্যেক রাতে ঈশার নামাযের পর তিনি এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এক সাথে হাদীছের পঠন-পাঠন করতেন। হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ছিলেন। বর্ণনার ক্ষেত্রে অর্থ নয়, বরং মূল শব্দে হাদীছ বর্ণনা জরুরী বলে মনে করতেন। এই সতর্কতার কারণে তিনি হাদীছ লেখা-লেখি পছন্দ করতেন না।
'আবদুল্লাহ ইবন 'আওন বলেন:
'আল-কাসিম, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন ও রাজা' ইবন হায়ওয়া হাদীছ (রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে উচ্চারিত) বর্ণ ও শব্দে বর্ণনা করতেন। অন্যদিকে হাসান আল-বাসরী, ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ ও আশ-শা'বী-(নিজেদের শব্দ ও বর্ণে) হাদীছের অর্থ ও ভাব বর্ণনা করতেন।
তাঁর ছাত্র-শিষ্য
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেক বড় বড় ইমাম ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন: 'আবদুর রহমান ইবন কাসিম, ইমাম শা'বী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার, সা'ঈদ আল-আনসারীর পুত্র ইয়াহইয়া, সা'ঈদ ইবন আবী মুলায়কা, নাফি' মাওলা ইবন 'উমার, ইমাম যুহরী, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার, আইউব, মালিক ইবন দীনার (রহ) প্রমুখ। তাঁর এ সকল প্রতিভাবান ছাত্র তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
ফিক্হ
ফিক্হ ছিল তাঁর বিশেষ অধীত বিষয়। এতে তিনি একজন ইমাম ও মুজতাহিদের মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর ফিক্হ বিষয়ে দক্ষতা ও উৎকর্ষতার সবচেয়ে বড় সনদ এই যে, তিনি ছিলেন মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহর একজন। ফিকহ্ জ্ঞানও তিনি অর্জন করেন ফুফু হযরত 'আয়িশা সিদ্দীকা, ইবন 'উমার ও ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে। তিনি বলতেন, আবূ বাকর ও 'উমারের (রা) সময়ে হযরত 'আয়িশা (রা) স্বতন্ত্রভাবে ফাতওয়া দিতেন এবং আমি তাঁর সাথে থাকতাম। সেই সময়ের সকল আলিম তাঁর ফিক্হ বিষয়ে গভীর জ্ঞানের কথা স্বীকার করেছেন। আবুয যানাদ বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে বড় কোন ফকীহকে দেখিনি। ইমাম মালিক (রহ) বলতেন, কাসিম এই উম্মাতের ফকীহগণের মধ্যে ছিলেন।
ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে সতর্কতা
ফিক্হ বিষয়ে এত জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছের মত ফাতওয়া দানে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। কোন বিষয়ে জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও সে বিষয়ে কথা বলা অথবা কোন মাসয়ালার জবাব দেওয়া খুবই খারাপ মনে করতেন। বলতেন, আল্লাহর ফরয হুকুমগুলো জানার পর কোন বিষয়ে জ্ঞান না থাকার পরও কথা বলার চেয়ে কোন মানুষের মূর্খ থাকা অনেক ভালো। কোন মাসয়ালা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান না থাকলে সোজা নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়ে দিতেন। একবার তাঁকে কোন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। শুধু স্পষ্ট ও সহজ প্রশ্নের জবাব দিতেন। যে সব মাসয়ালার জবাব নিজের মতের ভিত্তিতে দিতেন, তাতে স্পষ্ট বলে দিতেন যে, এটা আমার মত, এ কথা বলছিনা যে, এটাই সত্য।
দারসের আসর
হযরত কাসিমের (রহ) মদীনার মসজিদে নববীতে একটি হালকায়ে দারস বা পাঠদানের আসর ছিল। তাঁর ও সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা) একই আসর ছিল। তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র 'আবদুর রহমান এবং সালিমের ভাই 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) এই আসরে বসতেন, তাঁদের পরে এই স্থানে ইমাম মালিকের আসর বসতে থাকে। স্থানটি ছিল হযরত রাসূলে কারীমের (সা) কবর ও মিম্বারের মাঝামাঝি স্থানে হযরত 'উমারের (রা) সম্মুখে। কাসিম সকাল বেলায় দারস ও ইফতার এই স্থানে এসে দু'রাক'আত নামায আদায়ের পর আসরে বসে যেতেন। এ সময় মানুষের যা কিছু প্রশ্ন করার, করতো।
সমকালীনদের তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি
তাঁর সময়ের অনেক বড় বড় 'আলিম ও বিদগ্ধ ব্যক্তি তাঁর মনীষা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আনসারী বলতেন, আমরা মদীনায় এমন কোন ব্যক্তিকে পাইনি যাঁকে কাসিমের উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়। আবুয যানাদ বলতেন, কাসিম তাঁর যুগে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানের অধিকারী মানুষ ছিলেন, আইউব সাখতিয়ানী বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে উত্তম মানুষ আর দেখিনি।
বিনয় ও সমকালীন 'আলিমদের প্রতি সম্মান
জ্ঞানের এত উঁচু স্তরে অবস্থান করা সত্ত্বেও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের কোন অনুভূতিই তাঁর ছিল না। তিনি নিজের চেয়ে কম মর্যাদার সমকালীনদেরকেও ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর মুখ থেকে কখনো তাদের সম্পর্কে এমন কোন শব্দ বা বাক্য উচ্চারিত হতো না যাতে বিন্দুমাত্র তাদের অসম্মান হয়। এমন সতর্কতার কারণে তিনি কোন কোন স্থানে সঙ্কটজনক অবস্থায় পড়ে যেতেন। একবার একজন মরুচারী বেদুঈন তাঁকে প্রশ্ন করলো : আপনি বড় 'আলিম, না সালিম? এই প্রশ্নের জবাবদানে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যান। যদি প্রকৃত সত্য কথাটি বলে দিতেন তাহলে নিজের মুখে নিজের প্রশংসা হয়ে যেত, আর যদি বলতেন সালিম বড় 'আলিম তাহলে অসত্য কথা হয়ে যেত। এ কারণে প্রথমে সুবহানাল্লাহ পাঠ করে এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু বেদুঈন যখন আবার জিজ্ঞেস করলো তখন তিনি বললেন, সালিম আছেন, তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।
নৈতিক চরিত্র
হযরত কাসিমের (রহ) যে স্তরের 'ইল্ম ছিল, সেই স্তরের 'আমলও ছিল। তাঁর ব্যক্তি সত্তাটি ছিল সকল নৈতিক গুণাবলীর সমাবেশস্থল। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন পুরুষ হযরত আবূ বাকরের (রা) প্রতিরূপ ছিলেন। যুবায়র বলতেন, আমি আবূ বাকরের (রা) সন্তানদের মধ্যে এই কাসিমের চেয়ে বেশি তাঁর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কাউকে পাইনি।
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) তাঁর অগাধ জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতার কথা অকপটে স্বীকার করতেন। তিনি বলতেন, খিলাফতের কর্তৃত্ব যদি কাসিমের হাতে থাকতো তাহলে কত না ভালো হতো। অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলতেন, খিলাফতের বিষয়টি যদি আমার এখতিয়ারে থাকতো তাহলে আমি কাসিমকে খলীফা বানাতাম। খলীফা 'উমারের (রহ) এ কথা তাঁর কানে পৌঁছলে তিনি বিস্ময়ের সাথে বলেন, আমি যখন আমার পরিবার চালাতে পারি না, সেখানে এই উম্মাতের দায়িত্ব পালন কেমন করে সম্ভব। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ ও লৌকিকতা বিবর্জিত। কাসিম ছিলেন স্বল্পভাষী চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) খলীফা হলেন, তখন মদীনাবাসীরা বললো, এবার কুমারী কাসিম কথা বলবেন।
খলীফা 'উমার ইবন 'আযীযের (রহ) সাথে আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদের অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। 'উমার তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। হিজরী ৮৬ সনে উমাইয়্যা খলীফা 'আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক খলীফা হন। তিনি হিজরী ৮৭ সনের ২৩ রাবিউল আউয়াল হিশাম ইবন ইসমা'ঈলকে মদীনার ওয়ালীর পদ থেকে অপসারণ করে তদস্থলে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে নিয়োগ দান করেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি মারওয়ান ভবনে ওঠেন। যুহরের নামাযের পর মদীনার তৎকালীন দশজন বিখ্যাত ফকীহ্ ও 'আলিমকে ডেকে পাঠান। তাঁরা হলেন : 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র, আবূ বাকর ইবন সুলায়মান ইবন আবী খায়ছামা, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাসউদ, আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান ইবন আল-হারিছ, সুলায়মান ইবন ইয়াসার, আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আমর, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমির ইবন রাবী'আ ও খারিজা ইবন যায়দ (রহ)। তাঁরা উপস্থিত হলে 'উমার তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণে নিম্নের কথাগুলো বলেন :
'আমি আপনাদেরকে এমন এক কাজের জন্য ডেকেছি যাতে আপনারা আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাবেন এবং সত্যের সহযোগী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবেন। আমি আপনাদের পরামর্শ ছাড়া কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাই না। এ কারণে আপনারা কেউ কারো উপর যুল্ম-অত্যাচার করছে এমন খবর পেলে আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে অবশ্যই অবহিত করবেন।'
তাঁর এ ভাষণ শোনার পর উপস্থিত ফকীহ্ 'আলিমগণ তাঁর মঙ্গল কামনা করতে করতে ফিরে যান। কাসিম ইবন মুহাম্মাদ 'উমারের ভাষণ শেষে মন্তব্য করেন : “আল-ইয়াওমা ইয়ানতিকু মান কা-না লা ইয়ানতিকু” 'যারা কথা বলতে পারতো না এখন তারা কথা বলতে পারবে।
মদীনার ওয়ালী থাকাকালে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যে অক্ষয় কীর্তিগুলো সম্পাদন করেন তার মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ। খলীফা 'আবদুল মালিক এ মসজিদ সম্প্রসারণ করে পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নেন, কিন্তু মদীনাবাসীদের অসহযোগিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়। খলীফা ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক এ ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং তিনি মসজিদটিকে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো ও শৈলীতে নির্মাণ করতে চান। দিমাশকের জামি' মসজিদ নির্মাণ শেষ করে তিনি হিজরী ৮৮ সনে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে লিখলেন, মসজিদে নববী নতুন করে নির্মাণ করতে হবে এবং এর আশে-পাশে আযওয়াজে মুতাহ্হারাত অর্থাৎ হযরত রাসূলে কারীমের (সা) পূতঃপবিত্র বেগমদের যে সকল হুজরা ও অন্যান্য বাড়ি-ঘর আছে অর্থের বিনিময়ে সেগুলো অধিগ্রহণ করে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খলীফার এ আদেশ বাস্তবায়ন করেন।
পত্র পেয়ে 'উমার মসজিদের আশে-পাশের বাড়ি-ঘরের মালিকদের ডেকে খলীফার পত্রটি পাঠ করে শোনান। তাঁরা অর্থের বিনিময়ে নিজেদের মালিকানা ছেড়ে দিতে রাজি হন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পুরাতন মসজিদ, উম্মাহাতুল মু'মিনীনের হুজরাসমূহ ও আশে-পাশের বাড়ি-ঘর ভাংতে আরম্ভ করেন। তখন এ কাজে তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান (রহ) সহ মদীনার বিশিষ্ট ফকীহগণ। তাঁরা সকলে উম্মাহাতুল মু'মিনীনের হুজরাসমূহ মসজিদের মধ্যে ঢুকিয়ে নতুন মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন।
তাকওয়া-পরহেজগারী
তাকওয়া-পরহেজগারীর দিক দিয়েও তিনি ছিলেন একজন শীর্ষস্থানীয় তাবি'ঈ। ইবন সা'দ তাঁকে একজন খোদাভীরু উত্তম তাবি'ঈ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ বলেছেন। ইবন হিব্বান তাঁকে নেতৃস্থানীয় তাবি'ঈ এবং তাঁর যুগের একজন উত্তম তাবি'ঈ বলে গণ্য করেছেন।
বার্ধক্যে ও হজ্জের সময় মিনায় পাথর মারার জন্য পায়ে হেঁটে যেতেন। রাবী'আ ইবন 'আবদির রহমান বলেন, কাসিম যখন অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তখন তিনি তাঁর অবস্থানস্থল থেকে বাহনের পিঠে চড়ে মিনা পর্যন্ত আসতেন। পরে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে পাথর মারার জন্য যেতেন। পাথর মেরে মসজিদ পর্যন্ত হেঁটে যেতেন। তারপর সেখান থেকে বাহনের পিঠে চড়ে অবস্থানস্থলে ফিরতেন।
ধন-সম্পদের প্রতি অমুখাপেক্ষী মনোভাব
পার্থিব ধন-সম্পদের প্রতি এতই উদাসীন ও মুখাপেক্ষীহীন ছিলেন যে, প্রিয়জনের কোন অনুগ্রহ-উপঢৌকনও গ্রহণ করতেন না। সুলায়মান ইবন কুতায়বা বলেন, একবার 'উমার ইবন 'উবায়দিল্লাহ আমার হাতে এক হাজার দীনার দিয়ে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) ও কাসিম ইবন মুহাম্মাদের নিকট পাঠান। ইবন 'উমার (রা) তাঁর অংশের দীনারগুলো গ্রহণ করেন এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এই বলে যে, 'উমার ইবন 'উবায়দ-আত্মীয়তার সম্পর্কের হক আদায় করেছেন। এ সময়ে এ অর্থের আমার খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কাসিম ইবন মুহাম্মাদ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এ কথা তাঁর বেগম সাহেবা জানতে পেরে বলেন, 'উমার ইবন 'উবায়দুল্লাহর সাথে আমাদের (স্বামী-স্ত্রী) দু'জনের সম্পর্ক সমান সমান। কাসিম যদি তাঁর চাচাতো ভাই হন, তাহলে আমিও তো তাঁর ফুফাতো বোন হই। তাঁর এ কথার পর আমি তাঁর হাতেই এ অর্থ তুলে দিই।
সত্যের স্বীকৃতি
এমন সত্যনিষ্ঠ ছিলেন যে, নিজের পিতার কোন ভুলকে তিনি ভুল বলে স্বীকার করতেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করতেন। পূর্বেই এসেছে যে, তাঁর পিতা মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর (রা) আমীরুল মু'মিনীন হযরত 'উছমানের (রা) ভীষণ বিরোধী ছিলেন এবং বিদ্রোহীদের সাথে খলীফার গৃহ অভ্যন্তরেও ঢুকে পড়েছিলেন। হযরত কাসিম (রহ) পিতার এ কাজকে একটা মারাত্মক ভুল বলে স্বীকার করতেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের নিকট দু'আ করতেন: হে আল্লাহ! 'উছমানের (রা) ব্যাপারে আমার পিতার অপরাধকে ক্ষমা করে দিন।
ওফাত
তাঁর মৃত্যুসন নিয়ে একটু মতপার্থক্য আছে। হিজরী ১০৬ থেকে ১১২ সনের মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন একথা নিশ্চিতভাবে জানা যায়। তখন তাঁর বয়স ৭০ অথবা ৭২ (সত্তর/বাহাত্তর) বছর। বার্ধক্যের ভারে জর্জরিত দেহ নিয়ে হজ্জের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বের হয়েছেন। বাহনের পিঠে চড়ে তালবিয়া পাঠ করতে করতে পথ চলছেন। সাথে বেগম সাহেবা আছেন, ছেলে বাহনটি হাঁকাচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাথায় তীব্র ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। এক সময় বুঝলেন তাঁর জীবনকাল শেষ হয়ে এসেছে। আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করলেন। তারপর কাগজ কলম নিয়ে একজনকে অসীয়াত লিখতে বললেন। লেখক তাঁর বলার আগেই লিখে ফেললেন, "কাসিম ইবন মুহাম্মাদ অসীয়াত করছেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।" কাসিম (রহ) এ লেখাটুকু শুনে বললেন, যদি আমি আজকের পূর্বে এই সাক্ষ্য না দিয়ে থাকি তাহলে আমি একজন দারুণ হতভাগ্য। তারপর তিনি বলেন:
"আমার ছেলে: আমি যখন মারা যাব তখন আমি যে কাপড় পরে সালাত আদায় করি তা দিয়েই আমার কাফন বানাবে। আর তা হলো আমার জামা, লুঙ্গি ও চাদর। এ ছিল তোমার দাদা আবূ বাকরের (রা) কাফন। তারপর তোমরা আমাকে আমার কবরে শুইয়ে মাটি চাপা দিয়ে পরিবার-পরিজনের নিকট চলে যাবে। খবরদার, আমার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এমন বলবে না যে, তিনি এমন ছিলেন, এমন ছিলেন। আসলে আমি কিছুই ছিলাম না।"
পুত্র একবার বললেন, আপনি কি দু'খানা নতুন কাপড় পছন্দ করেন না? বললেন, আবূ বাকরকেও তিন কাপড়ে কাফন পরানো হয়েছিল। তাছাড়া মৃতদের চেয়ে জীবিতদেরই নতুন কাপড়ের প্রয়োজন বেশি। এই অসীয়াতের পর তিনি মক্কা-মদীনার মাঝে "কুদাইদ” নামক স্থানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেখান থেকে তিন মাইল দূরে "মুশাল্লাল" নামক স্থানে কবর দেওয়া হয়। মৃত্যুকালে তিনি নগদ এক লাখ দিরহাম রেখে যান। তার মধ্যে একটি দিরহামও অবৈধ উপার্জনের ছিল না।
শেষ জীবনে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। দাড়ি ও মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাতে মেহেদীর খিজাব লাগাতেন। রূপোর আংটি পরতেন এবং তাতে নিজের নাম খোদাই করা ছিল। মার্জিত রঙ্গিন পোশাক পরতেন। জুব্বা, পাগড়ী, চাদর ও অন্যান্য কাপড় সাধারণত "খুষ” সূতার হতো। এ ছাড়া আরো দামী পোশাকও পরতেন। পাগড়ী কালো হতো। জাফরানী রং বেশি পছন্দ ছিল। তাছাড়া সবুজ রংও ব্যবহার করতেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৫/১৮৬
২. 'আসরুত তাবি'ঈন-৮১
৩. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৬
৪. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭৩
৫. আত-তাবাকাত-৫/১৪৩
৬. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৫৫
৭. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/১৩৩
১০. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৪; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৫৬
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪; তাবি'ঈন-৩৭৬
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
১৪. আত-তাবাকাত-৫/১৪০
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৮
১৬. প্রাগুক্ত-১৫/১৮৫; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৩
১৭. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৫; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭২
২০. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪
২১. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
২২. প্রাগুক্ত-১/১৪০
২৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪; তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৮; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭৩
২৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪
২৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৫; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৫৯
২৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৮৫
২৮. আল কামিল ফী আত-তারীখ-৪/৫২৬; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২১০; তাবি'ঈদের জীবনকথা-২/৩২৫-৩৬
২৯. আল-কামিল ফী আত-তারীখ-৪/৫৩২; তাবি'ঈদের জীবন কথা-২/৩৭-৩৮
৩০. আত-তাবাকাত-৫/১৪১
৩১. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৫
৩২. আত-তাবাকাত-৫/১৪১
৩৩. ইবন খাল্লিকান, ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪১৮
৩৪. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৫
৩৫. 'আসরুত তাবি'ঈন-৮২
৩৬. আত-তাবাকাত-৫/১৪৩
৩৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৫
৩৮. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৯
হযরত কাসিমের (রহ) ডাকনাম আবূ মুহাম্মাদ, মতান্তরে আবূ 'আবদির রহমান। তিনি হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) পুত্র মুহাম্মাদের (রহ) সন্তান। তাঁর মা 'সাওদা' ছিলেন 'উম্মু ওয়ালাদ'। 'উম্মু ওয়ালাদ'-এর শব্দগত অর্থ সন্তানের মা। ইসলামের পরিভাষায় যে দাসী মনিবের ঔরসজাত সন্তান জন্ম দেয় তাকে বলা হয় উম্মু ওয়ালাদ। এমন দাসীকে আর কোনভাবে হস্তান্তর করা যায় না। যাই হোক কাসিমের মা সাওদা দাসী হলেও তিনি ছিলেন বিশ্বের এক অভিজাত ঘরের কন্যা। যুদ্ধবন্দী হিসেবে তৎকালীন বিশ্বের রীতি অনুযায়ী দাসীতে পরিণত হন।
মাদায়েন বিজয়ের পর পারস্য সম্রাট ইয়াযদিগুরদ-এর তিন কন্যা মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন। তাদেরকে মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন না করে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। 'আলী (রা) তাঁদের তিনজনকে ক্রয় করেন এবং তিনজন মুসলিম যুবকের হাতে তাদের একজন করে তুলে দেন। একজনকে দেওয়া হয় রাসূলুল্লাহর (সা) দৌহিত্র আল-হুসাইন ইবন 'আলীকে এবং এখানে তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন যায়নুল 'আবিদীন; দ্বিতীয়জনকে লাভ করেন মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর (রা) এবং তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের আলোচ্য ব্যক্তি আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ। তৃতীয়জনকে লাভ করেন 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) এবং তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন সালিম ইবন 'আবল্লিাহ (রা)। ইয়াযদিগুরদের তিন কন্যার এ তিন সন্তান তাদের পরিণত বয়সে নৈতিকতা, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতায় সর্বজনমান্য ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
কাসিম জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতায় মদীনার মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গের অন্যতম ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে মদীনার মনীষীদের দ্বিতীয় তাবকায় (স্তর) উল্লেখ করেছেন।
ইয়াতীম অবস্থা এবং ফুফুর নিকট লালিত-পালিত
হযরত 'উছমানের (রা) বিরুদ্ধাচরণ ও শাহাদাতের ঘটনায় মুহাম্মাদ ইবন আবী বকরের (রা) নামটি ইসলামের ইতিহাসে বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। তিনি হযরত উছমানের (রা) প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন। এমনকি হযরত উছমানের (রা) হত্যাকারীদের মধ্যে তাঁর নামটিও উচ্চারিত হয়। 'উছমানের (রা) শাহাদাতের পর তিনি আলীর (রা) পক্ষ অবলম্বন করেন। হযরত 'আলী ও হযরত মু'আবিয়ার (রা) মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হয় তাতে মুহাম্মাদ 'আলীর (রা) একজন উদ্যমী সহযোগী হিসেবে তাঁর পাশে দাঁড়ান। হযরত 'আলী (রা) তাঁকে মিসরের ওয়ালী নিয়োগ করেন। যখন হযরত মু'আবিয়ার (রা) পক্ষ থেকে হযরত 'আমর ইবন আল-'আস (রা) মিসরে সামরিক অভিযান চালান তখন মুহাম্মাদ ইবন আবী বকর (রা) নিহত হন। কাসিম তখন অল্প বয়সী শিশু। এ কারণে তাঁর ফুফু উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা (রা) তাঁকে নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসেন এবং অত্যন্ত স্নেহ-মমতায় তাঁকে গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে হযরত কাসিম তাঁর শৈশবকালীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলতেন, আমাদের ফুফু-আম্মা 'আয়িশা (রা) 'আরাফার রাতে আমাদের মাথা ন্যাড়া করে দিতেন এবং মাথায় টুপি পরিয়ে মসজিদে পাঠিয়ে দিতেন। পরের দিন সকালে আমাদের পক্ষ থেকে কুরবানী করতেন। তিনি আরো বলতেন, ফুফু-আম্মা নিজ হাতে আমাকে ও আমার ছোট্ট বোনকে খাওয়াতেন। তবে আমাদের সাথে খেতেন না। আমরা খাওয়ার পর যা কিছু অবশিষ্ট থাকতো তাই খেতেন। মা যেমন অতি আদরে তার শিশু সন্তানকে দুধ পান করায় তেমনি তিনিও আমাদের আদর করে খাওয়াতেন। আমাদেরকে গোসল করাতেন, মাথায় চিরুনী করে পরিষ্কার সাদা কাপড় পরিয়ে দিতেন। ভালো কাজ কী তা শেখাতেন, ভালো কাজ করার জন্য উৎসাহিত করতেন ও প্রশিক্ষণ দিতেন। আর মন্দ কাজ কী তাও শেখাতেন এবং তা থেকে বিরত থাকার কথা বলতেন। আমি সন্তানের প্রতি তাঁর চেয়ে বেশি যত্নশীল, তাঁর চেয়ে বেশি স্নেহশীল কোন পিতা-মাতাকে কখনো দেখিনি।
তিনি তাঁর এই স্নেহশীল ফুফুকে আম্মা বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে যখন তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করতেন তখন বলতেন: আমার আম্মা আয়িশা (রা) আমাকে বলেছেন, অথবা আমার আম্মা 'আয়িশার (রা) নিকট শুনেছি। তিনি বলতেন, তাঁর চেয়ে সুন্দর করে কথা বলতে এবং তাঁর চেয়ে বিশুদ্ধ ও মিষ্টভাষী কোন পুরুষ বা নারীকে তাঁর আগে পরে কখনো আমি দেখিনি।
জ্ঞান ও মনীষা
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশা (রা) এমন বিদুষী মহিলা ছিলেন যে, তাঁর একজন নগণ্যতম সেবকও জ্ঞান ও কর্মের উচ্চাসন অলঙ্কৃত করেছেন। কাসিম ছিলেন তাঁর অতি স্নেহের সন্তানতুল্য। তাঁর আদর-যত্নে লালিত-পালিত হয়ে তিনি 'ইল্ম ও 'আমল দু'সাগরের সংযোগস্থলে পরিণত হন। ইবন সা'দ লিখেছেন, তিনি উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন ফকীহ, ইমাম, শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ ও আল্লাহ ভীরু মানুষ ছিলেন। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তিনি একজন অতি উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন তাবি'ঈ। তাঁর বিশ্বস্ততা ও ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সকলে একমত।
তাফসীর
ইসলামী জ্ঞানের সকল শাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল। তবে আল্লাহর কালামের তাফসীরের ব্যাপারে ছিলেন খুবই সতর্ক। চরম সতর্কতার কারণে তিনি কুরআনের তাফসীর করতেন না। এ কারণে মুফাস্সির হিসেবে তেমন প্রসিদ্ধি লাভ করেননি।
হাদীছ
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) ব্যক্তি সত্তাটিই ছিল হাদীছের অন্যতম উৎসস্থল। হযরত কাসিম (রহ) এই উৎস থেকে প্রাণ ভরে পরিতৃপ্ত হন। তাছাড়া অন্য সাহাবায়ে কিরাম থেকেও হাদীছ শোনেন। যেমন : 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), আবূ হুরায়রা (রা) ও আরো অনেকে। তিনি নিজেই বলেন, আমি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট বসতাম, তাছাড়া আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) ও আবূ হুরায়রার (রা) নিকটও বসতাম। তাঁদের নিকট থেকে আমি সর্বাধিক উপকার লাভ করেছি। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) নিকট এমন জ্ঞান, খোদাভীরুতা এবং এমন দুর্লভ তথ্য ছিল যা আর কারো নিকট থেকে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। এ সকল ব্যক্তি ছাড়াও তিনি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার, মু'আবিয়া, 'আবদুল্লাহ ইবন খাব্বাব, রাফি' ইবন খাদীজ, আসলাম মাওলা 'উমার (রা) প্রমুখ মহান সাহাবীর নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। এ সকল মহান ব্যক্তিবর্গের কল্যাণে তিনি একজন বিশিষ্ট হাফিজে হাদীছে পরিণত হন। ইবন সা'দ তাকে কাসীরুল হাদীছ - বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী বলেছেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে হাফিজে হাদীছগণের ইমাম ও নেতা বলে উল্লেখ করেছেন। আবুয যানাদ বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে সুন্নাহর বড় 'আলিম কাউকে দেখিনি। তিনি বিশেষভাবে হযরত 'আয়িশার (রা) হাদীছের হাফিজ ছিলেন। খালিদ ইবন বাযযায় বলেন, 'আয়িশার (রা) হাদীছের তিনজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা হলেন কাসিম, 'উরওয়া ও 'আমর (রহ)।
তাঁর বর্ণনাসমূহের মান
মুহাদ্দিছগণ হযরত 'আয়িশা (রা) থেকে তাঁর বর্ণনাসমূহকে খাঁটি সোনার মত মনে করেছেন। ইবন মা'ঈন বলেন, "উবায়দুল্লাহ ইবন উমার আন কাসিম আন আইশা" সনদের এই ধারাটি খাঁটি সোনার শিকলের মত।
হাদীছের পঠন-পাঠন
প্রত্যেক রাতে ঈশার নামাযের পর তিনি এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এক সাথে হাদীছের পঠন-পাঠন করতেন। হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ছিলেন। বর্ণনার ক্ষেত্রে অর্থ নয়, বরং মূল শব্দে হাদীছ বর্ণনা জরুরী বলে মনে করতেন। এই সতর্কতার কারণে তিনি হাদীছ লেখা-লেখি পছন্দ করতেন না।
'আবদুল্লাহ ইবন 'আওন বলেন:
'আল-কাসিম, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন ও রাজা' ইবন হায়ওয়া হাদীছ (রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে উচ্চারিত) বর্ণ ও শব্দে বর্ণনা করতেন। অন্যদিকে হাসান আল-বাসরী, ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ ও আশ-শা'বী-(নিজেদের শব্দ ও বর্ণে) হাদীছের অর্থ ও ভাব বর্ণনা করতেন।
তাঁর ছাত্র-শিষ্য
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেক বড় বড় ইমাম ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন: 'আবদুর রহমান ইবন কাসিম, ইমাম শা'বী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার, সা'ঈদ আল-আনসারীর পুত্র ইয়াহইয়া, সা'ঈদ ইবন আবী মুলায়কা, নাফি' মাওলা ইবন 'উমার, ইমাম যুহরী, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার, আইউব, মালিক ইবন দীনার (রহ) প্রমুখ। তাঁর এ সকল প্রতিভাবান ছাত্র তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
ফিক্হ
ফিক্হ ছিল তাঁর বিশেষ অধীত বিষয়। এতে তিনি একজন ইমাম ও মুজতাহিদের মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর ফিক্হ বিষয়ে দক্ষতা ও উৎকর্ষতার সবচেয়ে বড় সনদ এই যে, তিনি ছিলেন মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহর একজন। ফিকহ্ জ্ঞানও তিনি অর্জন করেন ফুফু হযরত 'আয়িশা সিদ্দীকা, ইবন 'উমার ও ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে। তিনি বলতেন, আবূ বাকর ও 'উমারের (রা) সময়ে হযরত 'আয়িশা (রা) স্বতন্ত্রভাবে ফাতওয়া দিতেন এবং আমি তাঁর সাথে থাকতাম। সেই সময়ের সকল আলিম তাঁর ফিক্হ বিষয়ে গভীর জ্ঞানের কথা স্বীকার করেছেন। আবুয যানাদ বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে বড় কোন ফকীহকে দেখিনি। ইমাম মালিক (রহ) বলতেন, কাসিম এই উম্মাতের ফকীহগণের মধ্যে ছিলেন।
ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে সতর্কতা
ফিক্হ বিষয়ে এত জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি হাদীছের মত ফাতওয়া দানে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। কোন বিষয়ে জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও সে বিষয়ে কথা বলা অথবা কোন মাসয়ালার জবাব দেওয়া খুবই খারাপ মনে করতেন। বলতেন, আল্লাহর ফরয হুকুমগুলো জানার পর কোন বিষয়ে জ্ঞান না থাকার পরও কথা বলার চেয়ে কোন মানুষের মূর্খ থাকা অনেক ভালো। কোন মাসয়ালা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান না থাকলে সোজা নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়ে দিতেন। একবার তাঁকে কোন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। শুধু স্পষ্ট ও সহজ প্রশ্নের জবাব দিতেন। যে সব মাসয়ালার জবাব নিজের মতের ভিত্তিতে দিতেন, তাতে স্পষ্ট বলে দিতেন যে, এটা আমার মত, এ কথা বলছিনা যে, এটাই সত্য।
দারসের আসর
হযরত কাসিমের (রহ) মদীনার মসজিদে নববীতে একটি হালকায়ে দারস বা পাঠদানের আসর ছিল। তাঁর ও সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা) একই আসর ছিল। তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র 'আবদুর রহমান এবং সালিমের ভাই 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) এই আসরে বসতেন, তাঁদের পরে এই স্থানে ইমাম মালিকের আসর বসতে থাকে। স্থানটি ছিল হযরত রাসূলে কারীমের (সা) কবর ও মিম্বারের মাঝামাঝি স্থানে হযরত 'উমারের (রা) সম্মুখে। কাসিম সকাল বেলায় দারস ও ইফতার এই স্থানে এসে দু'রাক'আত নামায আদায়ের পর আসরে বসে যেতেন। এ সময় মানুষের যা কিছু প্রশ্ন করার, করতো।
সমকালীনদের তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি
তাঁর সময়ের অনেক বড় বড় 'আলিম ও বিদগ্ধ ব্যক্তি তাঁর মনীষা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আনসারী বলতেন, আমরা মদীনায় এমন কোন ব্যক্তিকে পাইনি যাঁকে কাসিমের উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়। আবুয যানাদ বলতেন, কাসিম তাঁর যুগে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানের অধিকারী মানুষ ছিলেন, আইউব সাখতিয়ানী বলতেন, আমি কাসিমের চেয়ে উত্তম মানুষ আর দেখিনি।
বিনয় ও সমকালীন 'আলিমদের প্রতি সম্মান
জ্ঞানের এত উঁচু স্তরে অবস্থান করা সত্ত্বেও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের কোন অনুভূতিই তাঁর ছিল না। তিনি নিজের চেয়ে কম মর্যাদার সমকালীনদেরকেও ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর মুখ থেকে কখনো তাদের সম্পর্কে এমন কোন শব্দ বা বাক্য উচ্চারিত হতো না যাতে বিন্দুমাত্র তাদের অসম্মান হয়। এমন সতর্কতার কারণে তিনি কোন কোন স্থানে সঙ্কটজনক অবস্থায় পড়ে যেতেন। একবার একজন মরুচারী বেদুঈন তাঁকে প্রশ্ন করলো : আপনি বড় 'আলিম, না সালিম? এই প্রশ্নের জবাবদানে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যান। যদি প্রকৃত সত্য কথাটি বলে দিতেন তাহলে নিজের মুখে নিজের প্রশংসা হয়ে যেত, আর যদি বলতেন সালিম বড় 'আলিম তাহলে অসত্য কথা হয়ে যেত। এ কারণে প্রথমে সুবহানাল্লাহ পাঠ করে এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু বেদুঈন যখন আবার জিজ্ঞেস করলো তখন তিনি বললেন, সালিম আছেন, তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।
নৈতিক চরিত্র
হযরত কাসিমের (রহ) যে স্তরের 'ইল্ম ছিল, সেই স্তরের 'আমলও ছিল। তাঁর ব্যক্তি সত্তাটি ছিল সকল নৈতিক গুণাবলীর সমাবেশস্থল। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন পুরুষ হযরত আবূ বাকরের (রা) প্রতিরূপ ছিলেন। যুবায়র বলতেন, আমি আবূ বাকরের (রা) সন্তানদের মধ্যে এই কাসিমের চেয়ে বেশি তাঁর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কাউকে পাইনি।
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) তাঁর অগাধ জ্ঞান ও নৈতিক উৎকর্ষতার কথা অকপটে স্বীকার করতেন। তিনি বলতেন, খিলাফতের কর্তৃত্ব যদি কাসিমের হাতে থাকতো তাহলে কত না ভালো হতো। অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলতেন, খিলাফতের বিষয়টি যদি আমার এখতিয়ারে থাকতো তাহলে আমি কাসিমকে খলীফা বানাতাম। খলীফা 'উমারের (রহ) এ কথা তাঁর কানে পৌঁছলে তিনি বিস্ময়ের সাথে বলেন, আমি যখন আমার পরিবার চালাতে পারি না, সেখানে এই উম্মাতের দায়িত্ব পালন কেমন করে সম্ভব। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ ও লৌকিকতা বিবর্জিত। কাসিম ছিলেন স্বল্পভাষী চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) খলীফা হলেন, তখন মদীনাবাসীরা বললো, এবার কুমারী কাসিম কথা বলবেন।
খলীফা 'উমার ইবন 'আযীযের (রহ) সাথে আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদের অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। 'উমার তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। হিজরী ৮৬ সনে উমাইয়্যা খলীফা 'আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক খলীফা হন। তিনি হিজরী ৮৭ সনের ২৩ রাবিউল আউয়াল হিশাম ইবন ইসমা'ঈলকে মদীনার ওয়ালীর পদ থেকে অপসারণ করে তদস্থলে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে নিয়োগ দান করেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি মারওয়ান ভবনে ওঠেন। যুহরের নামাযের পর মদীনার তৎকালীন দশজন বিখ্যাত ফকীহ্ ও 'আলিমকে ডেকে পাঠান। তাঁরা হলেন : 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র, আবূ বাকর ইবন সুলায়মান ইবন আবী খায়ছামা, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাসউদ, আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান ইবন আল-হারিছ, সুলায়মান ইবন ইয়াসার, আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আমর, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমির ইবন রাবী'আ ও খারিজা ইবন যায়দ (রহ)। তাঁরা উপস্থিত হলে 'উমার তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণে নিম্নের কথাগুলো বলেন :
'আমি আপনাদেরকে এমন এক কাজের জন্য ডেকেছি যাতে আপনারা আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাবেন এবং সত্যের সহযোগী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবেন। আমি আপনাদের পরামর্শ ছাড়া কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাই না। এ কারণে আপনারা কেউ কারো উপর যুল্ম-অত্যাচার করছে এমন খবর পেলে আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে অবশ্যই অবহিত করবেন।'
তাঁর এ ভাষণ শোনার পর উপস্থিত ফকীহ্ 'আলিমগণ তাঁর মঙ্গল কামনা করতে করতে ফিরে যান। কাসিম ইবন মুহাম্মাদ 'উমারের ভাষণ শেষে মন্তব্য করেন : “আল-ইয়াওমা ইয়ানতিকু মান কা-না লা ইয়ানতিকু” 'যারা কথা বলতে পারতো না এখন তারা কথা বলতে পারবে।
মদীনার ওয়ালী থাকাকালে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যে অক্ষয় কীর্তিগুলো সম্পাদন করেন তার মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ। খলীফা 'আবদুল মালিক এ মসজিদ সম্প্রসারণ করে পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নেন, কিন্তু মদীনাবাসীদের অসহযোগিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়। খলীফা ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক এ ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং তিনি মসজিদটিকে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো ও শৈলীতে নির্মাণ করতে চান। দিমাশকের জামি' মসজিদ নির্মাণ শেষ করে তিনি হিজরী ৮৮ সনে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে লিখলেন, মসজিদে নববী নতুন করে নির্মাণ করতে হবে এবং এর আশে-পাশে আযওয়াজে মুতাহ্হারাত অর্থাৎ হযরত রাসূলে কারীমের (সা) পূতঃপবিত্র বেগমদের যে সকল হুজরা ও অন্যান্য বাড়ি-ঘর আছে অর্থের বিনিময়ে সেগুলো অধিগ্রহণ করে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খলীফার এ আদেশ বাস্তবায়ন করেন।
পত্র পেয়ে 'উমার মসজিদের আশে-পাশের বাড়ি-ঘরের মালিকদের ডেকে খলীফার পত্রটি পাঠ করে শোনান। তাঁরা অর্থের বিনিময়ে নিজেদের মালিকানা ছেড়ে দিতে রাজি হন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পুরাতন মসজিদ, উম্মাহাতুল মু'মিনীনের হুজরাসমূহ ও আশে-পাশের বাড়ি-ঘর ভাংতে আরম্ভ করেন। তখন এ কাজে তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, আবূ বাকর ইবন 'আবদির রহমান (রহ) সহ মদীনার বিশিষ্ট ফকীহগণ। তাঁরা সকলে উম্মাহাতুল মু'মিনীনের হুজরাসমূহ মসজিদের মধ্যে ঢুকিয়ে নতুন মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন।
তাকওয়া-পরহেজগারী
তাকওয়া-পরহেজগারীর দিক দিয়েও তিনি ছিলেন একজন শীর্ষস্থানীয় তাবি'ঈ। ইবন সা'দ তাঁকে একজন খোদাভীরু উত্তম তাবি'ঈ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ বলেছেন। ইবন হিব্বান তাঁকে নেতৃস্থানীয় তাবি'ঈ এবং তাঁর যুগের একজন উত্তম তাবি'ঈ বলে গণ্য করেছেন।
বার্ধক্যে ও হজ্জের সময় মিনায় পাথর মারার জন্য পায়ে হেঁটে যেতেন। রাবী'আ ইবন 'আবদির রহমান বলেন, কাসিম যখন অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তখন তিনি তাঁর অবস্থানস্থল থেকে বাহনের পিঠে চড়ে মিনা পর্যন্ত আসতেন। পরে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে পাথর মারার জন্য যেতেন। পাথর মেরে মসজিদ পর্যন্ত হেঁটে যেতেন। তারপর সেখান থেকে বাহনের পিঠে চড়ে অবস্থানস্থলে ফিরতেন।
ধন-সম্পদের প্রতি অমুখাপেক্ষী মনোভাব
পার্থিব ধন-সম্পদের প্রতি এতই উদাসীন ও মুখাপেক্ষীহীন ছিলেন যে, প্রিয়জনের কোন অনুগ্রহ-উপঢৌকনও গ্রহণ করতেন না। সুলায়মান ইবন কুতায়বা বলেন, একবার 'উমার ইবন 'উবায়দিল্লাহ আমার হাতে এক হাজার দীনার দিয়ে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) ও কাসিম ইবন মুহাম্মাদের নিকট পাঠান। ইবন 'উমার (রা) তাঁর অংশের দীনারগুলো গ্রহণ করেন এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এই বলে যে, 'উমার ইবন 'উবায়দ-আত্মীয়তার সম্পর্কের হক আদায় করেছেন। এ সময়ে এ অর্থের আমার খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কাসিম ইবন মুহাম্মাদ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এ কথা তাঁর বেগম সাহেবা জানতে পেরে বলেন, 'উমার ইবন 'উবায়দুল্লাহর সাথে আমাদের (স্বামী-স্ত্রী) দু'জনের সম্পর্ক সমান সমান। কাসিম যদি তাঁর চাচাতো ভাই হন, তাহলে আমিও তো তাঁর ফুফাতো বোন হই। তাঁর এ কথার পর আমি তাঁর হাতেই এ অর্থ তুলে দিই।
সত্যের স্বীকৃতি
এমন সত্যনিষ্ঠ ছিলেন যে, নিজের পিতার কোন ভুলকে তিনি ভুল বলে স্বীকার করতেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করতেন। পূর্বেই এসেছে যে, তাঁর পিতা মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর (রা) আমীরুল মু'মিনীন হযরত 'উছমানের (রা) ভীষণ বিরোধী ছিলেন এবং বিদ্রোহীদের সাথে খলীফার গৃহ অভ্যন্তরেও ঢুকে পড়েছিলেন। হযরত কাসিম (রহ) পিতার এ কাজকে একটা মারাত্মক ভুল বলে স্বীকার করতেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের নিকট দু'আ করতেন: হে আল্লাহ! 'উছমানের (রা) ব্যাপারে আমার পিতার অপরাধকে ক্ষমা করে দিন।
ওফাত
তাঁর মৃত্যুসন নিয়ে একটু মতপার্থক্য আছে। হিজরী ১০৬ থেকে ১১২ সনের মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন একথা নিশ্চিতভাবে জানা যায়। তখন তাঁর বয়স ৭০ অথবা ৭২ (সত্তর/বাহাত্তর) বছর। বার্ধক্যের ভারে জর্জরিত দেহ নিয়ে হজ্জের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বের হয়েছেন। বাহনের পিঠে চড়ে তালবিয়া পাঠ করতে করতে পথ চলছেন। সাথে বেগম সাহেবা আছেন, ছেলে বাহনটি হাঁকাচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাথায় তীব্র ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। এক সময় বুঝলেন তাঁর জীবনকাল শেষ হয়ে এসেছে। আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করলেন। তারপর কাগজ কলম নিয়ে একজনকে অসীয়াত লিখতে বললেন। লেখক তাঁর বলার আগেই লিখে ফেললেন, "কাসিম ইবন মুহাম্মাদ অসীয়াত করছেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।" কাসিম (রহ) এ লেখাটুকু শুনে বললেন, যদি আমি আজকের পূর্বে এই সাক্ষ্য না দিয়ে থাকি তাহলে আমি একজন দারুণ হতভাগ্য। তারপর তিনি বলেন:
"আমার ছেলে: আমি যখন মারা যাব তখন আমি যে কাপড় পরে সালাত আদায় করি তা দিয়েই আমার কাফন বানাবে। আর তা হলো আমার জামা, লুঙ্গি ও চাদর। এ ছিল তোমার দাদা আবূ বাকরের (রা) কাফন। তারপর তোমরা আমাকে আমার কবরে শুইয়ে মাটি চাপা দিয়ে পরিবার-পরিজনের নিকট চলে যাবে। খবরদার, আমার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এমন বলবে না যে, তিনি এমন ছিলেন, এমন ছিলেন। আসলে আমি কিছুই ছিলাম না।"
পুত্র একবার বললেন, আপনি কি দু'খানা নতুন কাপড় পছন্দ করেন না? বললেন, আবূ বাকরকেও তিন কাপড়ে কাফন পরানো হয়েছিল। তাছাড়া মৃতদের চেয়ে জীবিতদেরই নতুন কাপড়ের প্রয়োজন বেশি। এই অসীয়াতের পর তিনি মক্কা-মদীনার মাঝে "কুদাইদ” নামক স্থানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেখান থেকে তিন মাইল দূরে "মুশাল্লাল" নামক স্থানে কবর দেওয়া হয়। মৃত্যুকালে তিনি নগদ এক লাখ দিরহাম রেখে যান। তার মধ্যে একটি দিরহামও অবৈধ উপার্জনের ছিল না।
শেষ জীবনে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। দাড়ি ও মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাতে মেহেদীর খিজাব লাগাতেন। রূপোর আংটি পরতেন এবং তাতে নিজের নাম খোদাই করা ছিল। মার্জিত রঙ্গিন পোশাক পরতেন। জুব্বা, পাগড়ী, চাদর ও অন্যান্য কাপড় সাধারণত "খুষ” সূতার হতো। এ ছাড়া আরো দামী পোশাকও পরতেন। পাগড়ী কালো হতো। জাফরানী রং বেশি পছন্দ ছিল। তাছাড়া সবুজ রংও ব্যবহার করতেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৫/১৮৬
২. 'আসরুত তাবি'ঈন-৮১
৩. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৬
৪. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭৩
৫. আত-তাবাকাত-৫/১৪৩
৬. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৫৫
৭. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/১৩৩
১০. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৪; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৫৬
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪; তাবি'ঈন-৩৭৬
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
১৪. আত-তাবাকাত-৫/১৪০
১৫. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৮
১৬. প্রাগুক্ত-১৫/১৮৫; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৩
১৭. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৫; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭২
২০. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪
২১. আত-তাবাকাত-৫/১৩৯
২২. প্রাগুক্ত-১/১৪০
২৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ
২৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪; তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৮; 'আসরুত তাবি'ঈন-৭৩
২৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৪
২৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৫; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৫৯
২৭. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৮৫
২৮. আল কামিল ফী আত-তারীখ-৪/৫২৬; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২১০; তাবি'ঈদের জীবনকথা-২/৩২৫-৩৬
২৯. আল-কামিল ফী আত-তারীখ-৪/৫৩২; তাবি'ঈদের জীবন কথা-২/৩৭-৩৮
৩০. আত-তাবাকাত-৫/১৪১
৩১. তাহযীব আল-আসমা'-১/৫৫; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩৩৫
৩২. আত-তাবাকাত-৫/১৪১
৩৩. ইবন খাল্লিকান, ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৪১৮
৩৪. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৫
৩৫. 'আসরুত তাবি'ঈন-৮২
৩৬. আত-তাবাকাত-৫/১৪৩
৩৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৫
৩৮. তাহযীব আল-কামাল-১৫/১৮৯
📄 ইয়াহইয়া ইবন ইয়া‘মার আল-বাসরী (রহ)
ইয়াহইয়া (রহ) তাবি'ঈদের মধ্যবর্তী স্তরের মানুষ। ইমাম আয-যাহাবীর মতে এই স্তরের পুরোধা হলেন প্রখ্যাত মনীষী হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ)। ইয়াহইয়ার ডাকনাম আবূ সুলায়মান, মতান্তরে আবূ 'আদী ও আবূ সা'ঈদ। বসরার অধিবাসী এবং 'আদওয়ান গোত্রের সন্তান।
জ্ঞান ও মনীষা
কুরআন, হাদীছ, ফিক্স, ভাষা ও সাহিত্যের বিশাল জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। কুরআনের একজন বিশিষ্ট 'আলিম ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে কুরআন বিশেষজ্ঞ বলে উল্লেখ করেছেন।
হাদীছ
তিনি হাদীছের হাফিজ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে হাফিজ ও লেখক তাবি'ঈদের তৃতীয় তাবকায় (স্তরে) তাঁর জীবনী সন্নিবেশ করেছেন। সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে হযরত 'উছমান, 'আলী, 'আম্মার ইবন ইয়াসির, আবু যার আল-গিফারী, আবূ হুরায়রা, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, সুলায়মান ইবন সুরাদ, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা), জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, নু'মান ইবন বাশীর (রা) প্রমুখের মত উঁচু স্তরের মনীষীদের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম আবূ দাউদ বলেন, তিনি হযরত আয়িশা (রা) থেকে হাদীছ শোনেননি। তাই ইমাম আয়- যাহাবী (রহ) ইমাম আবূ দাউদের নিকট প্রশ্ন রেখেছেন। "ফামা য্যন্নু বিল্লাযীনা ক্বাবলাহা?" - 'আয়িশার (রা) পূর্ববর্তী যাঁরা তাঁদের সম্পর্কে ধারণা কি? অর্থাৎ 'উছমান, 'আলী (রা), যাঁরা 'আয়িশার (রা) বহু পূর্বে ইনতিকাল করেছেন তাঁদের নিকট থেকেও কি ইয়াহইয়া শোনেননি?
ইয়াহইয়া ইবন 'আকীল, সুলায়মান আত-তায়মী, 'আবদুল্লাহ ইবন বুরায়দা, কাতাদা মাওলা ইবন 'আব্বাস (রা), 'আতা' আল-খুরাসানী, রাকীন ইবন রুবা'য়, 'আবদুল্লাহ ইবন কুলাইব সাদৃসী, আযরাক ইবন কায়স, ইসহাক ইবন সুওয়াইদ, আবুল মুনীব 'উবাইদুল্লাহ, 'উমার ইবন 'আতা' ইবন আবিল খাওলা (রহ) প্রমুখ ব্যক্তি তাঁর খ্যাতিমান ছাত্র। তাঁরা সকলে তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
ফিকহ্
ফিক্হ্ বিষয়েও তিনি পারদর্শী ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে একজন ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতার বড় প্রমাণ হলো তিনি মারব-এর কাজীর পদ অলঙ্কৃত করেন।
ভাষা, সাহিত্য ও অলঙ্কার শাস্ত্র
নিছক ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা-সাহিত্যেও তিনি বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আরবী ব্যাকরণের "নাহু” ও আরবী ভাষায় ছিল তাঁর বিশাল পাণ্ডিত্য। নাহুর জ্ঞান তিনি অর্জন করেন এই শাস্ত্রের উদ্ভাবক আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ায়লীর নিকট থেকে। ভাষায় তাঁর প্রচণ্ড দখল ছিল। তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের বিশুদ্ধ ভাষী ও অলঙ্কারশাস্ত্রবিদ। 'আবদুল মালিক ইবন 'উমাইর বলেন: "বিশুদ্ধভাষী মানুষ তিনজন : মূসা ইবন তালহা, ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার ও কাবীসা ইবন জবির।" ইবন হিব্বান তাঁর 'আছ-ছিকাত' গ্রন্থে বলেন: 'তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম বিশুদ্ধভাষী এবং ভাষা জ্ঞানে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি। আর সেই সাথে ছিল তাঁর মধ্যে দারুণ আল্লাহ-ভীতি।'
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ তাঁকে বসরা থেকে বের করে দিলে কুতায়বা ইবন মুসলিম স্বাগতম জানান এবং খুরাসানের রাজধানী "মারব"-এর কাজী নিয়োগ করেন। সেখানে আদালত ভবন ছিল এবং এজলাসও বসতো। তা সত্ত্বেও তিনি বিচার প্রার্থীদের সুবিধার জন্য পথে-ঘাটে চলতে-ফিরতে মানুষের সাধারণ ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করে দিতেন। মূসা ইবন ইয়াসার বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মারকে বাজারে, রাস্তা-গলিতে মানুষের ঝগড়া-বিবাদের ফয়সালা করতে দেখেছি। অনেক সময় এমনও হতো যে, তিনি বাহনের পিঠে কোথাও যাচ্ছেন, তখন বাদী-বিবাদী এসে সামনে দাঁড়াতো। তিনি থেমে তাদের বক্তব্য শুনে ফয়সালা করে দিতেন।
একটি অক্ষয় কীর্তি
তাঁর জীবনের একটি অক্ষয় কীর্তি যা কিয়ামাত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে তা হলো আল-কুরআনের বর্ণমালায় "নুকতা” প্রদান করা। উল্লেখ্য যে, এর পূর্বে আরবী বর্ণমালার কোন বর্ণে "নুকতা” ছিল না। সাধারণ মানুষ ও অনারবদের কুরআন পাঠ সহজীকরণের জন্য ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার সর্বপ্রথম আল-কুরআনের সমআকৃতির বর্ণমালায় "নুকতা” লাগিয়ে পার্থক্য সূচিত করেন। হারুন ইবন মূসা বলেন : 'ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার প্রথম ব্যক্তি যিনি মাসহাফে নুকতা প্রদান করেন।'
আহলি বায়তের সাথে সম্পর্ক
আহলি বায়ত তথা হযরত রাসূলে কারীমের (সা) বংশধরদের প্রতি গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। কোন রকম বাছ-বিছার ছাড়াই তাঁদেরকে অন্য সকলের উপর প্রাধান্য দিতেন। তবে কাউকে হেয় ও তুচ্ছ মনে করতেন না। একবার হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ তাঁকে বলেন, আপনি বিশ্বাস করেন হাসান ও হুসায়ন (রা) রাসূলুল্লাহর বংশধর। আপনাকে হয় এ বিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে, নতুবা প্রমাণ পেশ করতে হবে। তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন: "তাঁর (ইবরাহীম) বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আইউব, ইউসুফ, মূসা ও হারূনকেও (দান করি)। আর এভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করি এবং যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, 'ঈসা এবং ইলইয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। তারা সকলে সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত।” তারপর বলেন, এই আয়াতে 'ঈসাকে ইবরাহীমের বংশধর বলা হয়েছে। সময়ের এত দীর্ঘ ব্যবধান সত্ত্বেও কেবল মাতৃকূলের সম্পর্কের কারণে যদি 'ঈসা (আ) ইবরাহীমের বংশধর হতে পারেন তাহলে হাসান ও হুসায়ন (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) দৌহিত্র হয়ে তাঁর বংশধর হতে বাধা কোথায়? তাঁর এ যুক্তিতে হাজ্জাজ সন্তুষ্ট হন।
হিজরী ১১৯, মতান্তরে ১২০ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে খলীফা ইবন খায়্যাত তাঁর তারীখে হিজরী ৮০ সনের পরে এবং ৯০ সনের আগে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের সাথে ইয়াহইয়ার জীবনী আলোচনা করেছেন।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭১; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৩
২. তাবাকাত ইবন সা'দ-৭/১০১
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭১
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩২৫; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৪
৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩২৫; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৪
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫; তাবাকাত-৭/১০১
৮. প্রাগুক্ত
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩০৫
১০. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৬
১১. তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৫
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাবাকাত ইবন সা'দ-৭/১০১
十四. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫
十五. সূরা আল-আন'আম-৮৪-৮৫
১৬. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৬
১৭. তাবি'ঈন-৫১৪
十八. তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৫
ইয়াহইয়া (রহ) তাবি'ঈদের মধ্যবর্তী স্তরের মানুষ। ইমাম আয-যাহাবীর মতে এই স্তরের পুরোধা হলেন প্রখ্যাত মনীষী হযরত হাসান আল-বাসরী (রহ)। ইয়াহইয়ার ডাকনাম আবূ সুলায়মান, মতান্তরে আবূ 'আদী ও আবূ সা'ঈদ। বসরার অধিবাসী এবং 'আদওয়ান গোত্রের সন্তান।
জ্ঞান ও মনীষা
কুরআন, হাদীছ, ফিক্স, ভাষা ও সাহিত্যের বিশাল জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। কুরআনের একজন বিশিষ্ট 'আলিম ছিলেন। ইবন সা'দ তাঁকে কুরআন বিশেষজ্ঞ বলে উল্লেখ করেছেন।
হাদীছ
তিনি হাদীছের হাফিজ ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে হাফিজ ও লেখক তাবি'ঈদের তৃতীয় তাবকায় (স্তরে) তাঁর জীবনী সন্নিবেশ করেছেন। সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে হযরত 'উছমান, 'আলী, 'আম্মার ইবন ইয়াসির, আবু যার আল-গিফারী, আবূ হুরায়রা, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, সুলায়মান ইবন সুরাদ, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা সিদ্দীকা (রা), জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, নু'মান ইবন বাশীর (রা) প্রমুখের মত উঁচু স্তরের মনীষীদের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম আবূ দাউদ বলেন, তিনি হযরত আয়িশা (রা) থেকে হাদীছ শোনেননি। তাই ইমাম আয়- যাহাবী (রহ) ইমাম আবূ দাউদের নিকট প্রশ্ন রেখেছেন। "ফামা য্যন্নু বিল্লাযীনা ক্বাবলাহা?" - 'আয়িশার (রা) পূর্ববর্তী যাঁরা তাঁদের সম্পর্কে ধারণা কি? অর্থাৎ 'উছমান, 'আলী (রা), যাঁরা 'আয়িশার (রা) বহু পূর্বে ইনতিকাল করেছেন তাঁদের নিকট থেকেও কি ইয়াহইয়া শোনেননি?
ইয়াহইয়া ইবন 'আকীল, সুলায়মান আত-তায়মী, 'আবদুল্লাহ ইবন বুরায়দা, কাতাদা মাওলা ইবন 'আব্বাস (রা), 'আতা' আল-খুরাসানী, রাকীন ইবন রুবা'য়, 'আবদুল্লাহ ইবন কুলাইব সাদৃসী, আযরাক ইবন কায়স, ইসহাক ইবন সুওয়াইদ, আবুল মুনীব 'উবাইদুল্লাহ, 'উমার ইবন 'আতা' ইবন আবিল খাওলা (রহ) প্রমুখ ব্যক্তি তাঁর খ্যাতিমান ছাত্র। তাঁরা সকলে তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
ফিকহ্
ফিক্হ্ বিষয়েও তিনি পারদর্শী ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে একজন ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতার বড় প্রমাণ হলো তিনি মারব-এর কাজীর পদ অলঙ্কৃত করেন।
ভাষা, সাহিত্য ও অলঙ্কার শাস্ত্র
নিছক ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা-সাহিত্যেও তিনি বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আরবী ব্যাকরণের "নাহু” ও আরবী ভাষায় ছিল তাঁর বিশাল পাণ্ডিত্য। নাহুর জ্ঞান তিনি অর্জন করেন এই শাস্ত্রের উদ্ভাবক আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ায়লীর নিকট থেকে। ভাষায় তাঁর প্রচণ্ড দখল ছিল। তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের বিশুদ্ধ ভাষী ও অলঙ্কারশাস্ত্রবিদ। 'আবদুল মালিক ইবন 'উমাইর বলেন: "বিশুদ্ধভাষী মানুষ তিনজন : মূসা ইবন তালহা, ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার ও কাবীসা ইবন জবির।" ইবন হিব্বান তাঁর 'আছ-ছিকাত' গ্রন্থে বলেন: 'তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম বিশুদ্ধভাষী এবং ভাষা জ্ঞানে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি। আর সেই সাথে ছিল তাঁর মধ্যে দারুণ আল্লাহ-ভীতি।'
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ তাঁকে বসরা থেকে বের করে দিলে কুতায়বা ইবন মুসলিম স্বাগতম জানান এবং খুরাসানের রাজধানী "মারব"-এর কাজী নিয়োগ করেন। সেখানে আদালত ভবন ছিল এবং এজলাসও বসতো। তা সত্ত্বেও তিনি বিচার প্রার্থীদের সুবিধার জন্য পথে-ঘাটে চলতে-ফিরতে মানুষের সাধারণ ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করে দিতেন। মূসা ইবন ইয়াসার বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মারকে বাজারে, রাস্তা-গলিতে মানুষের ঝগড়া-বিবাদের ফয়সালা করতে দেখেছি। অনেক সময় এমনও হতো যে, তিনি বাহনের পিঠে কোথাও যাচ্ছেন, তখন বাদী-বিবাদী এসে সামনে দাঁড়াতো। তিনি থেমে তাদের বক্তব্য শুনে ফয়সালা করে দিতেন।
একটি অক্ষয় কীর্তি
তাঁর জীবনের একটি অক্ষয় কীর্তি যা কিয়ামাত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে তা হলো আল-কুরআনের বর্ণমালায় "নুকতা” প্রদান করা। উল্লেখ্য যে, এর পূর্বে আরবী বর্ণমালার কোন বর্ণে "নুকতা” ছিল না। সাধারণ মানুষ ও অনারবদের কুরআন পাঠ সহজীকরণের জন্য ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার সর্বপ্রথম আল-কুরআনের সমআকৃতির বর্ণমালায় "নুকতা” লাগিয়ে পার্থক্য সূচিত করেন। হারুন ইবন মূসা বলেন : 'ইয়াহইয়া ইবন ইয়া'মার প্রথম ব্যক্তি যিনি মাসহাফে নুকতা প্রদান করেন।'
আহলি বায়তের সাথে সম্পর্ক
আহলি বায়ত তথা হযরত রাসূলে কারীমের (সা) বংশধরদের প্রতি গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। কোন রকম বাছ-বিছার ছাড়াই তাঁদেরকে অন্য সকলের উপর প্রাধান্য দিতেন। তবে কাউকে হেয় ও তুচ্ছ মনে করতেন না। একবার হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ তাঁকে বলেন, আপনি বিশ্বাস করেন হাসান ও হুসায়ন (রা) রাসূলুল্লাহর বংশধর। আপনাকে হয় এ বিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে, নতুবা প্রমাণ পেশ করতে হবে। তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন: "তাঁর (ইবরাহীম) বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আইউব, ইউসুফ, মূসা ও হারূনকেও (দান করি)। আর এভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করি এবং যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, 'ঈসা এবং ইলইয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। তারা সকলে সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত।” তারপর বলেন, এই আয়াতে 'ঈসাকে ইবরাহীমের বংশধর বলা হয়েছে। সময়ের এত দীর্ঘ ব্যবধান সত্ত্বেও কেবল মাতৃকূলের সম্পর্কের কারণে যদি 'ঈসা (আ) ইবরাহীমের বংশধর হতে পারেন তাহলে হাসান ও হুসায়ন (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) দৌহিত্র হয়ে তাঁর বংশধর হতে বাধা কোথায়? তাঁর এ যুক্তিতে হাজ্জাজ সন্তুষ্ট হন।
হিজরী ১১৯, মতান্তরে ১২০ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে খলীফা ইবন খায়্যাত তাঁর তারীখে হিজরী ৮০ সনের পরে এবং ৯০ সনের আগে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের সাথে ইয়াহইয়ার জীবনী আলোচনা করেছেন।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭১; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৩
২. তাবাকাত ইবন সা'দ-৭/১০১
৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭১
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩২৫; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৪
৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫
৬. প্রাগুক্ত; তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩২৫; তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৪
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫; তাবাকাত-৭/১০১
৮. প্রাগুক্ত
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১১/৩০৫
১০. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৬
১১. তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৫
১২. প্রাগুক্ত
১৩. তাবাকাত ইবন সা'দ-৭/১০১
十四. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫
十五. সূরা আল-আন'আম-৮৪-৮৫
১৬. শাজারাত আয-যাহাব-১/১৭৬
১৭. তাবি'ঈন-৫১৪
十八. তাহযীব আল-কামাল-৩২/৫৫