📄 রাবী‘আ ইবন ফাররূখ আর-রায় (রহ)
হিজরী ৫১ সনের কথা। মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী তখন ইসলামের সুমহান বিশ্বাস ও বাণী বহন করে দিবিদিক ছড়িয়ে পড়েছে। বিজয়ী সেনাপতি, সিজিস্তান বিজয়ী ও খুরাসানের আমীর মহান সাহাবী আর-রাবী' ইবন যিয়াদ আল-হারিছী (রা) তাঁর বাহিনীসহ রণাঙ্গনে অবস্থান করছেন। সংগে আছেন তাঁর সাহসী দাস ফাররূফ।
সায়হুন নদী পার হওয়ার সময় যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয় তাতে সেনাপতির দাস ফাররূফ দারুণ সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দেন। এতে সেনাপতি রাবী' (রা) ভীষণ খুশী হন এবং তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তির ঘোষণা দেন।
সেনাপতি রাবী' ইবন যিয়াদ (রা)-এর মৃত্যুর পর ফাররূফ মদীনায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বিপুল অর্থ-সম্পদ নিয়ে তিনি মদীনায় ফিরে আসলেন এবং এক সম্ভ্রান্ত ঘরের কন্যাকে বিয়ে করলেন। কিন্তু তাঁর সৈনিক জীবন তাঁকে শান্তি দিল না। তিনি আবার রণাঙ্গনে ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। অবশেষে স্ত্রীকে আল্লাহ ও রাসুলের হিফাযতে এবং তিরিশ হাজার দীনার তার হাতে দিয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। যাওয়ার সময় স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন।
ফাররূখের অনুপস্থিতিতে এক পুত্র সন্তান জন্ম নিল। মা তার নাম রাখলেন 'রাবী'আ'। মা তার ছেলের সুশিক্ষার জন্য স্বামীর রেখে যাওয়া অর্থ থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। শিক্ষকরা তাকে কুরআন, হাদীছ এবং দীনী 'ইলমের বিভিন্ন শাখায় দক্ষ করে তোলেন। রাবী'আ নিজের জন্য জ্ঞানচর্চাকে বেছে নিলেন এবং মদীনার মসজিদে নববীতে তাঁর পঠন-পাঠন চলতে লাগলো।
প্রায় তিরিশ বছর পর ফাররূফ মদীনায় ফিরে আসলেন। নিজের ঘরে প্রবেশ করে তিনি এক যুবকের বাধার মুখে পড়লেন। দু'জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলো এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা ছুটে এলো। পরে ফাররূফের স্ত্রী এসে পরিচয় দিলে পিতা ও পুত্রের মিলন হলো। ফাররূফ তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন তিরিশ হাজার দীনারের কথা। স্ত্রী বললেন তা সঠিক জায়গায় আছে।
পরদিন সকালে ফাররূফ মসজিদে নববীতে গিয়ে দেখলেন এক বিশাল 'ইলমী মজলিস। সেখানে শায়খকে ঘিরে বড় বড় 'আলিমরা বসে আছেন। তিনি শায়খের অগাধ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য দেখে মুগ্ধ হলেন। পাশে বসা একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন এই শায়খই হলেন তাঁর পুত্র রাবী'আতুর রা'য়। ফাররূফ আনন্দাশ্রু বিসর্জন দিলেন। বাড়ীতে ফিরে স্ত্রী তাঁকে বললেন, এই তিরিশ হাজার দীনার এবং আপনার ছেলের জ্ঞান ও মর্যাদার এই উচ্চাসন লাভ-এর কোনটি আপনার বেশি প্রিয়? ফাররূফ বললেন: ছেলের এই অবস্থানই আমার বেশি প্রিয়। তখন স্ত্রী জানালেন যে তিনি সেই অর্থ রাবী'আর শিক্ষার পিছনেই ব্যয় করেছেন।
রাবী'আর পরিচয়
রাবী'আর ডাকনাম আবূ 'উছমান, উপাধি আর-রায়। পিতা আবূ 'আবদির রহমান ফাররূখ। তিনি ছিলেন মদীনার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম তাবি'ঈ। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন একাধারে হাদীছের হাফিজ, ফকীহ, মুজতাহিদ এবং বুদ্ধি ও যুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে গভীর অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী। আর এ কারণে তাঁকে রাবী'আতুর রায় বা যুক্তিবাদী রাবী'আ বলা হয়।"
শিক্ষা
যৌবনের সূচনাতেই সেকালে প্রচলিত সকল শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হন। মাত্র ছাব্বিশ/সাতাশ বছর বয়সে তাঁর খ্যাতি দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
Hাদীছ
হযরত রাবী'আর (রহ) যে খ্যাতি তা প্রধানতঃ তাঁর ফিক্হ্ শাস্ত্রে অতুলনীয় দক্ষতার কারণে। তবে তিনি হাদীছেরও একজন প্রথম শ্রেণীর হাফিজ ছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে হাদীছ ধারণের ব্যাপারে সকল ইমাম একমত। ইবনুল মাজেশূন বলেন: "আমি রাবী'আর চেয়ে সুন্নাহ অধিক স্মৃতিতে ধারণকারী আর কাউকে দেখিনি।" প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ছিলেন রাবী'আর বিশেষ ছাত্র।
সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে হযরত আনাস ইবন মালিক ও সায়িব ইবন ইয়াযীদ (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ প্রমুখ মুহাদ্দিছ থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে ছিল হযরত রাবী'আর (রহ) বিশেষ ব্যুৎপত্তি। তিনি ছিলেন এ শাস্ত্রের একজন ইমাম ও মুজতাহিদ। অসাধারণ মেধা ও বুদ্ধিমত্তা তাঁর মধ্যে ইজতিহাদের যোগ্যতা সৃষ্টি করে দেয়। এ কারণে তাঁকে যুক্তি ও বুদ্ধিবাদী অভিধায় ভূষিত করা হয়। আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর প্রথম খলীফা আবুল 'আব্বাস আস-সাফফাহ তাঁকে ডেকে নিয়ে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। ইমাম মালিক (রহ) ছিলেন তাঁর বিশেষ ছাত্র।
ফাতওয়া দানে তাঁর সতর্কতা
ইজতিহাদ, যুক্তি ও কিয়াস প্রয়োগে এত ক্ষমতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কোন মাসয়ালায় যুক্তি ও কিয়াস প্রয়োগের ক্ষেত্রে দারুণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি বলতেন: "কোন মাসয়ালায় জ্ঞান ছাড়া জবাব দানের চেয়ে এটাই উত্তম যে তোমরা মূর্খ অবস্থায় মৃত্যু বরণ কর।"
তাঁর সমকালীন মনীষীদের মূল্যায়ন
'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার বলতেন: "রাবী'আ ছিলেন আমাদের সকল জট উন্মোচনকারী, আমাদের 'আলিম এবং আমাদের সবার চেয়ে উত্তম।” ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ বলতেন: "আমি রাবী'আ ইবন 'আবদির রহমানের চাইতে বেশি তীক্ষ্ণধী আর কাউকে দেখিনি।"
তাঁর দারসের মজলিস
তাঁর দারসের মজলিসে মদীনার বড় বড় 'আলিম, সরকারী কর্মকর্তা ও অভিজাত শ্রেণীর লোকেরাও শরীক হতেন। ইমাম মালিক, ইয়াহইয়া আনসারী, ইমাম আওযা'ঈ প্রমুখের মত ব্যক্তিবর্গও সেখান থেকে ফায়দা হাসিল করতেন।
তাঁর ভোগ-বিলাস বিমুখ জীবন ও ইবাদাত-বন্দেগী
এত জ্ঞান ও বুদ্ধির সাথে সাথে তিনি একজন বড় 'আবিদ ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ ব্যক্তি ছিলেন। ধন-সম্পদ ও অর্থ-বিত্তের প্রতি দারুণ নির্মোহ স্বভাবের ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য তিনি চল্লিশ হাজার দীনার ব্যয় করেন।
বাগ্মিতা
রাবী‘আ ছিলেন একজন বাগ্মী ব্যক্তি। চমৎকার প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলতেন। তিনি যখন কথা বলতেন শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনতো। একবার রাবী'আর (রহ) নিকট আল্লাহর 'আরশে সমাসীন হওয়ার বিষয়টির ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। তিনি বলেন: "সমাসীন হওয়ার বিষয়টি অজানা নয়, তবে তার প্রকৃতিটা বোধগম্য নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকেই রিসালাত হয় এবং রাসূলের দায়িত্ব পৌঁছানো, আর আমাদের কর্তব্য বিশ্বাস করা।"
মৃত্যু
তাঁর মৃত্যু সন ও স্থান নিয়ে একটু মত পার্থক্য আছে। হাফিজ আবূ বাকর ইবন ছাবিত বলেন, প্রথম আব্বাসীয় খলীফা আবুল 'আব্বাস আস-সাফফাহ তাঁকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দানের জন্য আল-আনবারে ডেকে পাঠান। ইবন সা'দ বলেন, আল-ওয়াকিদী আমাকে যে তথ্য দিয়েছেন সে মতে তিনি হিজরী ১৩৬ সনে মদীনায় ইনতিকাল করেন।
টিকাঃ
১. সায়হুন একটি বিশাল নদী। সমরকন্দের পরে তুর্কিস্তান সীমান্তে প্রবাহিত।
২. রাসূলুল্লাহর (সা) কবর ও তাঁর মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান। (সুওরুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৪৯)
৩. প্রাগুক্ত-১৩৫-১৫৪; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৪-১৬৫
৪. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৫৯
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
৭. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২১; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
৮. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৪
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
১০. তারীখু বাগদাদ/৮/৪২৪; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৮; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৩৫
১২. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩
১৩. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৮; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
১৪. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩; তাবি'ঈন-১২০
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
১৬. প্রাগুক্ত-১/১৫৮; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
১৭. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৬; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৭
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৯; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৪, টীকা-১
২০. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
২১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৭
২২. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
২৩. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩; তাবি'ঈন-১২২
২৪. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
২৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৮
২৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৯
২৭. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৭
২৮. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৫; ইবন কুতায়বা : আল-মা‘আরিফ-২১৭
২৯. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৭; তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৪
৩০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
৩১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১০২
৩২. প্রাগুক্ত; ওয়াফায়াত আল-আ'য়ান-১/১৮৩
৩৩. সূরা আস-সাজদা-৪; আল-ফুরকান-৫৯
৩৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৮
৩৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২২৪; সাফওয়াতুস সাফওয়া-২/৮৩-৮৬; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৭; আল-মা'আরিফ-২১৭
📄 ইয়াহইয়া ইবন সা‘ঈদ (রহ)
ইয়াহইয়ার (রহ) পিতার নাম সা'ঈদ এবং দাদা কায়স (রা) ইবন 'আমর আল-আনসারী। ডাকনাম আবূ সা'ঈদ। মদীনার বিখ্যাত আনসার গোত্র বানু নাজ্জারের সন্তান। ইবন আল-মাদীনী তাঁর ডাকনাম আবূ নাসর বলেছেন। তাঁর দাদা কায়স (রা) ছিলেন একজন বদরী সাহাবী। ইবন সা'দ বলেন, তাঁর মা ছিলেন 'উম্মু ওয়ালদ'। উল্লেখ্য যে, মনীবের সন্তান জন্মদাত্রী দাসীকে বলে 'উম্মু ওয়ালাদ' বা সন্তানের মা। ইসলামী বিধান মতে এরূপ দাসীকে বিক্রয় বা অন্য কোনভাবে হস্তান্তর করা যায় না।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান ও মনীষায় তিনি ছিলেন সমকালীন বিশিষ্ট তাবি'ঈদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর জ্ঞানের প্রগাঢ়তার ব্যাপারে সকল ইমাম একমত। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর বিশ্বস্ততা, শ্রেষ্ঠতা এবং ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সকলের ইজমা' বা ঐকমত্য আছে। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে হাদীছের হাফিজ ও শায়খুল ইসলাম বলে উল্লেখ করেছেন।
হাদীছ
ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ (রহ) সেই যুগের একজন মহান ব্যক্তিত্ব যখন সাহাবায়ে কিরামের (রা) পুণ্যময় যুগ শেষ হতে চলেছিল। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে যাঁরা তখনো জীবিত ছিলেন তাঁদের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ গ্রহণে কোন রকম ত্রুটি করেননি। সাহাবা ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈন কিরামের মধ্যে যাঁদের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন ও যাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেন তাঁদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজন হলেন : আনাস ইবন মালিক (রা), সায়িব ইবন ইয়াযীদ (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমির ইবন রাবী'আ, আবু উমামা সাহল ইবন হুনায়ফ, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর আস-সিদ্দীক (রা), আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান, 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র (রা) সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহ) প্রমুখ।
উল্লেখিত মহান ব্যক্তিদের উদারতা ইয়াহইয়াকে হাদীছের একজন শ্রেষ্ঠ হাফিজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ইবন সা'দ বলেন: "তিনি ছিলেন অতি বিশ্বস্ত বহু হাদীছের ধারক-বাহক, হুজ্জাত (দলীল-প্রমাণ) ও দৃঢ়পদ।" 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারাক (রহ) তাঁকে হাদীছের শ্রেষ্ঠ হাফিজদের মধ্যে গণ্য করতেন। মদীনার দু'ব্যক্তি এমন ছিলেন, যাঁদের দ্বারা মাদীনাতুর রাসূল (রাসূলের নগরী)-এর সকল সুন্নাহ্ সংরক্ষিত হয়। তাঁদের একজন আয-যুহরী ও অন্যজন ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ। সে সময় যদি এ দু'মনীষীর জন্ম না হতো তাহলে হয়তো বহু সুন্নাহ হারিয়ে যেত। ইবন 'উয়ায়না (রহ) বলেন: "হিজাযের মুহাদ্দিছ ছিলেন ইবন শিহাব, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ও ইবন জুরায়জ। তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে হাদীছ সংগ্রহ করতেন।" আবদুর রহমান ইবন আবী হাতিম তাঁকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ইমাম আয-যুত্রীর সমকক্ষ মনে করতেন। সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলেন: মদীনাবাসীদের নিকট ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদের স্থান ছিল আয-যুত্রীর উপরে। ইয়াহইয়া আল-কাত্তান বলতেন: "তিনি (ইয়াহইয়া) আয-যুহ্রীর উপর প্রাধান্যপ্রাপ্ত। কারণ, আয-যুহ্রীর ব্যাপারে মানুষের মতপার্থক্য আছে, কিন্তু তাঁর ব্যাপারে নেই।" 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক (রহ) বলেন, সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলতেন: "মানুষের মধ্যে হাদীছের হাফিজ চারজন: ইসমা'ঈল ইবন আবী খালিদ, 'আসিম আল-আহওয়াল, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী ও 'আবদুল মালিক ইবন আবী সুলায়মান।" অপর একটি বর্ণনায় তিনজনের কথা এসেছে। তাতে 'আসিম আল-আহওয়ালের নামটি নেই। 'আলী আল-মাদীনী বলেন: উঁচু স্তরের তাবি'ঈদের পরে মদীনায় ইবন শিহাব, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ, আবুয যানাদ ও বুকাইর ইবন 'আবদি'র চেয়ে বেশি জানা ব্যক্তি কেউ নেই। জারীর ইবন 'আবদিল হামীদ বলেন: আমি তাঁর চেয়ে বেশি ধীশক্তি সম্পন্ন মানুষ আর দেখিনি। ইসমা'ঈল ইবন ইসহাক আল-কাজী বলেন, আমি 'আলী ইবন আল-মাদীনীকে একথা বলতে শুনেছি যে, যাঁরা সাহীহ হাদীছের ধারক-বাহক, অতিশয় বিশ্বস্ত এবং যাঁদের বর্ণিত হাদীছ দোষ-ত্রুটিমুক্ত তাঁরা হলেন: বসরার আইউব, কৃষ্ণার মানসূর, মদীনার ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ এবং মক্কার 'আমর ইবন দীনার। ইমাম আল-বুখারী (রহ) 'আলী ইবন আল-মাদীনীর সূত্রে বলেন, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদের বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা প্রায় তিনশো (৩০০)। তবে ইয়াযীদ ইবন হারুন বলেন: "আমি ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদের তিন হাজার হাদীছ মুখস্থ করি। তারপর আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে অর্ধেক ভুলে যাই।" ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) বলতেন: "ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দৃঢ়পদ নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি।"
ছাত্র-শিষ্যবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের পরিধি অনেক বিস্তৃত। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজন হলেন: হিশাম ইবন 'উরওয়া, হুমায়দ আত-তাবীল, ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন উসামা, ইবন জুরায়জ, আল-আওযা'ঈ, মালিক ইবন আনাস, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, হাম্মাদ, লাইছ, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক, শু'বা, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-কাত্তান, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-উমাবী (রহ) প্রমুখ হাদীছ বিশারদ। সকলে তাঁর বিশ্বস্ততা, মনীষা ও জ্ঞানের জগতে নেতৃত্বের কথা বলেছেন। ইমাম আয-যুহরী, ইবন আবী যি'ব, শু'বা, মালিক ইবন আনাস, হাম্মাদ, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, 'আবদুল 'আযীয আল-মাজিশূন, লাইছ ইবন সা'দ, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না প্রমুখের মত সর্বজন স্বীকৃত হাদীছ বিশারদ তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
ফিক্হ্
ফিক্হ্ শাস্ত্রেও তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, একবার মদীনা থেকে আমাদের নিকট আইউব আস-সাখতিয়ানী আসলেন। আমরা বললাম, মদীনায় আপনি কাকে স্থলাভিষিক্ত করে এসেছেন? বললেন: "ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারীর চেয়ে বড় কোন ফকীহকে আমি মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে আসিনি।" ফিক্হ্ বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞানের বড় সনদ এই যে, তিনি মাদীনাতুর রাসূলের, যা সেই সময়ে ফকীহদের আকর বলে খ্যাত ছিল, কাজী ছিলেন। মারওয়ান ইবন মুহাম্মাদের সময়ে হজ্জ মওসুমে মক্কার মাসজিদুল হারামে ঘোষক চিৎকার করে ঘোষণা করতো: "ইয়াহইয়া সা'ঈদ, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ও মালিক ইবন আনাস- এ তিনজন ছাড়া আর কেউ হাজীদেরকে ফাতওয়া দিতে পারবে না।" হাম্মাদ আল-'আজলী বলেন: "كان يحيى بن سعيد رجلا صالحا فقيها ثقة. ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ, ফকীহ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি।"
কাজীর পদে
প্রথমে তিনি মদীনার কাজী ছিলেন। আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর খলীফা আবূ জা'ফার আল-মানসূর তাঁকে 'কাজী আল-কুজাত' তথা প্রধান কাজীর সুউচ্চ পদে নিয়োগ দান করেন। মতান্তরে তাঁকে হাশিমিয়ার কাজী নিয়োগ করা হয়। একথাও বর্ণিত আছে যে, বাগদাদের কাজীর পদেও তিনি নিয়োগ লাভ করেন।
বিভিন্ন বিষয়ে মুফতী ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও মতপার্থক্যের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার ও সহনশীল। তিনি বলতেন: "أهل العلم أهل توسعة ، وما برح المفتون يختلفون فيحلل هذا ويحرم هذا ، فلا يعيب على هذا ولا هذا على هذا. জ্ঞানী ব্যক্তিরা অত্যন্ত উদার ও প্রশস্ত মনের মানুষ। বিভিন্ন মাসয়ালায় মুফতীদের সব সময় মতপার্থক্য হয়ে থাকে। একজন এটাকে হালাল বললে অন্যজন হারাম বলেন। তবে কেউ কারো প্রতি কখনো দোষারোপ করেন না।" বর্তমানকালে ইসলামী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে সামান্য বিষয় নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে যখন একজন আরেকজনকে হেয় ও তুচ্ছ প্রতিপন্ন করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যান তখন ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদের উপরোক্ত কথাটি সকলের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।
আর্থিক অবস্থা
মদীনায় অবস্থানকালে তাঁর আর্থিক অবস্থা দারুণ অসচ্ছল হয়ে পড়েছিল। ভীষণ টানাটানির মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করছিলেন। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, জীবনের এমন একটি সংকীর্ণ পর্যায়ে খলীফা মানসূর তাঁকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দান করেন। অতঃপর তাঁর অবস্থার সামান্য পরিবর্তন হয়। তিনি ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হন। তবে মুহাম্মাদ ইবন সাল্লাম আল-জুমাহী বলেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদের আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। খলীফা মানসূর তাকে কাজী নিয়োগ করলেন। তারপরেও তাঁর অবস্থার কোন পরিবর্তন হলো না। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন : যার এ 'নাফস' বা আত্মা একটি, অর্থবিত্ত তার অবস্থা পরিবর্তন করতে পারে না।
মালিক ইবন আনাস বলতেন, একমাত্র ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ছাড়া আমাদের এখান থেকে যিনিই ইরাক গেছেন তাঁর অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। কেবল তিনি যে অবস্থায় গেছেন সেই অবস্থায় ফিরে এসেছেন।
তিনি অত্যন্ত আল্লাহ নির্ভর মানুষ ছিলেন। পার্থিব কোন প্রয়োজনে মানুষের নিকট চাওয়ার মানসিকতা তাঁর মোটেই ছিল না। তিনি নিজের জীবনের একটি ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, একবার আমি আফ্রিকা থাকাকালে পার্থিব কিছু প্রয়োজন অনুভব করলাম এবং তা পূরণের জন্য কায়মনোবাক্যে আল্লাহর নিকট দু'আ করলাম। তারপর আমি আমার এ কাজের জন্য লজ্জিত হলাম। মনে মনে বললাম : আমার এ দু'আ যদি আখিরাতের কোন প্রয়োজনের জন্য হতো তাহলে কতনা সুন্দর হতো! বিষয়টি আমি আমার এক বন্ধুকে বললাম। তিনি বললেন : তোমার এ কাজকে খারাপ মনে করার কোন কারণ নেই। কারণ, দু'আর অসীলায় আল্লাহ তাঁর কোন বান্দার প্রয়োজন পূরণ করে দিতে পারেন। আর এ দু'আর অনুমতি তাঁকে দান করা হয়েছে।
জারীর ইবন 'আবদিল হামীদ বলেন: একবার আমি ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদকে জিজ্ঞেস করলাম: আপনি যে সকল সাহাবী ও তাবি'ঈর সাক্ষাৎ পেয়েছেন, আবূ বাকর, 'উমার, 'উছমান ও 'আলী (রা) সম্পর্কে তাঁদের মতামত কী ছিল? বললেন: আবূ বাকর ও 'উমারের (রা) মর্যাদার ব্যাপারে তাঁদের কোন মতপার্থক্য ছিল না। তাঁদের মতের ভিন্নতা ছিল 'উছমান ও 'আলীর (রা) ব্যাপারে।
সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ১৪৩ সনে তিনি হাশিমিয়ায় ইনতিকাল করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল সত্তরের ঊর্ধ্বে।
টিকাঃ
১. আল-বুখারী, আত-তারীখ আল-কাবীর-৮/২৯৮
২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৭; তাহযীব আল-কামাল-১১/১৯৪
৩. আত-তারীখ আল-কাবীর-৮/২৯৮
৪. তাহযীব আল-কামাল-২০/১০৬
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৫৪
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৩৬
৭. তাহযীব আল-কামাল-১১/১৯৪; ২০/১০৩; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৬৮
৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৭; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩৭
৯. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭৪
১০. আত-তারীখ আল-কাবীর-৮/২৯৮; তাহযীব আল-আসমা'-২/১৭
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩৭
১২. তাহযীব আল-কামাল-২০/১০৭
১৩. প্রাগুক্ত-২০/১০৯; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৭
১৪. তাহযীব আল-কামাণ।-২০/১০৮; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭২
১৫. প্রাগুক্ত
১৬. তাহযীব আল-আসমা'-২/১৭
১৭. তাহযীব আল-কামাল-২/১০৮
১৮. প্রাগুক্ত-২০/১০৬
১৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৭; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭৪
২০. তাহযীব আল-আসমা'-২/১৭
২১. তাহযীব আল-কামাল-২০/১০০-১০৬
২২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৬৯
২৩. তাহযীব আল-কামাল-২০/১০৭; তাহযীব আল-আসমা'-২/১৭
২৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৭
২৫. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭৪
২৬. প্রাগুক্ত
২৭. আত-তারীখ আল-কাবীর-৮/২৯৮
২৮. তাহযীব আল-কামাল-২০/১০২; তাহযীব আল-আসমা'-১/১৫৩
২৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৯
৩০. প্রাগুক্ত-১/১৩৮
৩১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭৫
৩২. তাহযীব আল-কামাল-২০/১১০
৩৩. প্রাগুক্ত-২০/১০৭
৩৪. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭৫; আত-তারীখ আল-কাবীর-৮/২৯৮; তাহযীব আল-কামাল-২০/১০০
📄 ইসমা‘ঈল ইবন আবী খালিদ আল-আহমাসী (রহ)
ইসমা'ঈলের ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। পিতার ডাকনাম আবূ খালিদ, তবে তাঁর আসল নামের ব্যাপারে মতপার্থক্য আছে। যেমন: সা'দ, হুরমুয ও কাছীর। তিনি কৃষ্ণার আল-বাজালা গোত্রের আল-আহমাস শাখার দাস ছিলেন, তাই তাঁকে 'আল-আহমাসী আল-কৃষ্ণী' বলা হয়। ইসমা'ঈলের চার ভাই হলেন: আশ'আছ, খালিদ, সা'ঈদ ও আন-নু'মান। ইবন সা'দের বর্ণনামতে তিনি মোট ছয়জন সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হয়েছেন। তাঁদের নিকট থেকে হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনাও করেছেন। সেই মহান সাহাবীগণ হলেন: তাঁর পিতা আবূ খালিদ, আনাস ইবন মালিক, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী আওফা, আবু কাবিল, আবূ জুহায়ফা ও 'আমর ইবন আল-হুওয়ায়রিছ (রা)। তবে আবূ নু'আঈমের বর্ণনামতে তিনি বারো জন সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেন। 'আলী আল-মাদানী বলেন: "তিনি আনাসকে একবার দেখেন, তবে তাঁর মুখ থেকে কোন হাদীছ শোনেননি।" তিনি পেশায় ছিলেন 'طَحان'- শস্য চূর্ণকারী বা পেষণকারী।
জ্ঞান ও মনীষা
তিনি একজন উঁচু স্তরের তাবি'ঈ ছিলেন। ইমাম আশ-শা'বী (রহ) বলেন: "এই ইসমা'ঈল জ্ঞান একবারেই গিলে ফেলেন।" অপর একটি বর্ণনামতে তিনি বলেন: "ইবন আবী খালিদ (ইসমা'ঈল) জ্ঞান একবারেই পান করেন।" ইমাম আন-নাওবী (রহ) বলেন তাঁর শ্রেষ্ঠতা, মর্যাদা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য রয়েছে।
হাদীছ
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর স্থান অনেক উঁচুতে। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) বলেন : "তিনি ছিলেন (হাদীছ শাস্ত্রের) একজন হুজ্জাত বা দলীল- প্রমাণতুল্য, দারুণ দক্ষ ও বহু হাদীছ ধারণ ও বর্ণনাকারী 'আলিম।" ইমাম সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলেন : হাফিজে হাদীছ মাত্র চারজন। ইসমা'ঈল তাঁদের একজন। অন্যরা হলেন : 'আবদুল মালিক ইবন আবী সুলায়মান, 'আসিম আল-আহওয়াল ও ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী। অপর একটি বর্ণনায় তিনজনের কথা এসেছে। তাতে 'আসিম আল-আলওয়াল বাদ পড়েছেন। আবু হাতিম আস-সিজিস্তানী ইমাম আশ-শা'বীর (রহ) সংগী-সাথীদের কাউকে ইসমা'ঈলের উপর প্রাধান্য দিতেন না। তাঁর সততা, সত্যবাদিতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা এতই প্রসিদ্ধ ছিল যে, লোকে তাঁকে "মীযান” (তুলাদণ্ড) বলতো। আহমাদ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-'ইজলী তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন: "তিনি কুফার অধিবাসী, একজন তাবি'ঈ ও অতি বিশ্বস্ত ব্যক্তি। তিনি ছিলেন একজন সৎকর্মশীল মানুষ। রাসূলুল্লাহর (সা) পাঁচজন সাহাবীর মুখ থেকে হাদীছ শুনেছেন। পেশায় তিনি একজন "তাহ্হান” বা শস্য চূর্ণকারী।" মুহাম্মাদ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-মাসিলী বলেন: "তিনি একজন হুজ্জাত তথা দলীল-প্রমাণতুল্য মানুষ। তিনি যদি হুজ্জাত না হন, তবে হুজ্জাত হবে কে?"
সাহাবী ছাড়া অন্য যাঁদের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং যাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্য থেকে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো: ইসমা'ঈল ইবন 'আবদির রহমান আস-সুদ্দী, ভাই আশ'আছ ইবন আবী খালিদ, 'আমর ইবন হুরায়ছ-এর দাস আসবাগ, আল-হারিছ ইবন শুবায়ল আল-আহমাসী, হাকীম ইবন জাবির আল-আহমাসী, ভাই খালিদ ইবন আবী খালিদ, যাকওয়ান ইবন আবী সালিহ আস-সাম্মান, যুবায়র ইবন 'আদী, যিক্ ইবন হুবায়শ আল-আসাদী, যায়দ ইবন ওয়াহাব আল-জুহানী, ভাই সা'ঈদ ইবন আবী খালিদ, সালামা ইবন কুহায়ল, শুবায়ল ইবন 'আওফ আল-আহমাসী, তালহা ইবন আল-'আলা' আল-আহমাসী, তালহা ইবন মুসারিফ, 'আমির আশ-শা'বী, 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী আওফা, 'আবদুল্লাহ ইবন 'ঈসা, 'আবদুল্লাহ আল-বাহী, 'আবদুর রহমান ইবন 'আয়িয, 'আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা, 'আতা' ইবন আস-সায়িব, 'আমর ইবন হুরায়ছ আল-মাখযুমী, আবূ ইসহাক 'আমর ইবন 'আবদিল্লাহ আস-সুবা'ঈ, কায়স ইবন আবী হাযিম, মুহাম্মাদ ইবন সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা), আবু দাউদ আল-আ'মা, আবূ বাকর ইবন 'উমারা, পিতা আবূ খালিদ আল-আহমাসী ও আরো অনেকে।
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের তালিকা অনেক দীর্ঘ। তাঁর সনদে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজন হলেন: ইবরাহীম ইবন হুমায়দ আর-রুআসী, জারীর ইবন 'আবদিল হামীদ, জা'ফার ইবন 'আওন, হাম্স ইবন গিয়াছ, আল-হাকাম ইবন 'উতায়বা, আবূ উসামা হাম্মাদ ইবন উসামা, খালিদ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-ওয়াসিতী, যায়িদা ইবন কুদামা, যুহায়র ইবন মু'আবিয়া, সা'দান ইবন ইয়াহইয়া আল-লাখমী, সা'ঈদ ইবন আন-নাদর আল-কৃষ্ণী, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, শুরাইক ইবন 'আবদিল্লাহ আন-নাখা'ঈ, শু'বা ইবন আল্-হাজ্জাজ, 'আবাদ ইবন আল-'আওয়াম, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারাক, 'আবদুল্লাহ ইবন নুমায়র, 'উবায়দুল্লাহ ইবন মূসা, 'ঈসা ইবন ইউনুস, মালিক ইবন মিগওয়াল, মুহাম্মাদ ইবন বিশর আল-'আবদী, আবূ মু'আবিয়া মুহাম্মাদ ইবন খাযিম আদ-দারীর, মুহাম্মাদ ইবন খালিদ আল-ওয়াহ্হ্বী, মুহাম্মাদ ইবন ইয়াযীদ আল-ওয়াসিতী, মারওয়ান ইবন মু'আবিয়া আল-ফায়ারী, মু'তামির ইবন সুলায়মান, হুশায়ম ইবন বাশীর, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-কাত্তান, ইয়াযীদ ইবন হারূন (রহ) ও আরো অনেকে।
ইবন আল-মাদীনীর মতে ইসমা'ঈলের বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা তিনশো- একথা ইমাম আল-বুখারী বলেছেন। তবে আল-'ইজলীর বর্ণনামতে পাঁচশো'র কাছাকাছি। 'ইলমের সাথে তাঁর মধ্যে 'আমলও ছিল। ইমাম আয-যাহাবী বলেন: "তিনি ছিলেন বা-'আমল তথা আমলকারী 'আলিমদের একজন।" ইবন হিব্বান বলেন: 'তিনি ছিলেন একজন সৎকর্মশীল ও সত্যনিষ্ঠ শায়খ বা জ্ঞানী ব্যক্তি।'
ইসলামের ইতিহাসে আলিমদের এ বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যে, তাঁরা তাঁদের জ্ঞানকে জীবিকা ও অর্থ উপার্জনের উপায় ও উপকরণে পরিণত করেননি। ইসমা'ঈলও তাঁর অর্জিত জ্ঞান কোন পেশায় পরিণত করেননি। আটা পেষার চাক্কি ঘুরিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।
হিজরী ১৪৫, মতান্তরে ১৪৬ সনে তিনি ইনতিকাল করেন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২/১৫৬
২. আত-তাবাকাত-২/২৪০
৩. তাহযীব আত-তাহযীব-১/২৯২
৪. আত-তাহযীব-১/২৫৫
৫. তাহযীব আল-কামাল-২/১৫৬; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৩
৬. প্রাগুক্ত
৭. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১২১
৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৩
৯. আত-তাবাকাত-২/২৪০
১০. তাহযীব আল-কামাল-২/১৫৮
১১. তাহযীব আত-তাহযীব-১/২৯১
১২. তাহযীব আল-আসমা'-১/১২১
১৩. তাহযীব আল-কামাল-২/১৫৮, ১৫৯
十四. প্রাগুক্ত
১৫. প্রাগুক্ত-২/১৫৭-১৫৮; তাহযীব আত-তাহযীব-১/২৯১
১৬. তাহযীব আল-কামাল-২/১৫৯; তাহযীব আল-আসমা'-১/১৩১
১৭. তাহযীব আত-তাহযীব-১/২৯৩
১৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৪
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-১/২৯২
২০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৩; তাহযীব আল-কামাল-২/১৫৯
২১. প্রাগুক্ত; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১২৯, টীকা-৭।
📄 ‘ইকরিমা মাওলা ‘আবদিল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রা)
হযরত 'ইকরিমা (রহ) মরক্কোর বারবার বংশোদ্ভূত এবং প্রখ্যাত সাহাবী হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) একজন প্রতিভাবান দাস। প্রথমে তিনি হুসায়ন ইবন আল-হুর আল-'আনবারীর দাসত্বে ছিলেন এবং হুসায়ন তাঁকে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসকে (রা) দান করেন। 'ইকরিমার বয়স তখন অল্প। এ কারণে তিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন এবং তাঁর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কল্যাণে এত উঁচু মানে উন্নীত হন যে, তাঁর ব্যক্তিত্ব অনেক বড় বড় মুক্ত-স্বাধীন 'আলিমের জন্য ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 'ইকরিমার ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ।
শিক্ষা
হযরত 'ইকরিমা (রহ) মধ্যে স্বভাবগতভাবে জ্ঞান অর্জনের যোগ্যতা ও আগ্রহ-উদ্দীপনা ছিল। তিনি প্রত্যেকটি জিনিস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। তিনি বলেন, যখন আমি বাজারে যেতাম এবং কোন কথা শুনতাম তখন আমার জন্য জ্ঞানের পঞ্চাশটি দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যেত। এমন উপযুক্ত স্বভাব-প্রকৃতির সাথে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) মত জ্ঞানের সাগর ও স্নেহশীল মনিবও তিনি পেয়ে যান। তিনি অত্যধিক শ্রম ও সাধনা ব্যয় করে তাঁকে শিক্ষা দেন। জ্ঞানের প্রতি 'ইকরিমার পিপাসা এত তীব্র ছিল যে, সারা জীবনেও পরিতৃপ্ত হননি। একাধারে চল্লিশ বছর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। তিনি বলতেন: "আমি চল্লিশ বছর জ্ঞান অর্জন করেছি। 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) গৃহে অবস্থান কালেও আমি দরজায় বসে ফাতওয়া দিতাম।"
জ্ঞান ও মনীষা
তাঁর ব্যক্তিগত উৎসাহ-উদ্যোগ এবং মনিব হযরত 'আবদুল্লাহর (রা) তদারকিতে তিনি জ্ঞানের সাগরে পরিণত হন। ইবন সা'দ লিখেছেন: তিনি জ্ঞানের সমুদ্রসমূহের মধ্যে একটি সমুদ্র ছিলেন। ইমাম যাহাবী (রহ) তাঁকে حَبْرُ الْعَالَمِ তথা বিশ্বের তত্ত্বজ্ঞানীর উপাধিতে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সময়ে কোন দাস তো দূরের কথা অভিজাত ঘরের সন্তানদেরও কেউ তাঁর সমকক্ষ ছিল না। তাফসীর, হাদীছ, ফিক্হ তথা সকল ইসলামী জ্ঞানে তিনি ইমাম পদ-মর্যাদা লাভ করেন।
তাফসীর
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) তাফসীরের এত বড় 'আলিম ছিলেন যে, খুব কম সংখ্যক সাহাবীই এ ক্ষেত্রে তাঁর সমকক্ষতা দাবী করতে পারতেন। তিনি ছিলেন 'রঈসুল মুফাস্সিরীন বা মুফাস্সিরগণের নেতা। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ ও শ্রম দিয়ে 'ইকরিমাকে তাফসীরের জ্ঞান দান করেন। নিজের সীনা থেকে সকল জ্ঞান তাঁর সীনায় স্থানান্তর করেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) ছাত্রদের মধ্যে তাফসীরের জ্ঞানে একজনও তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না। 'আব্বাস ইবন মুস'আব আল-মারূযী বলেন, ইবন 'আব্বাসের ছাত্রদের মধ্যে তাফসীরে 'ইকরিমা সবচেয়ে বড় 'আলিম ছিলেন। কাতাদা (রহ) বলতেন, সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী তাবি'ঈ হলেন চারজন। তাঁদের মধ্যে 'ইকরিমা তাফসীরের সবচেয়ে বড় 'আলিম। ইমাম শা'বী (রহ) বলতেন, 'ইকরিমার চেয়ে কিতাবুল্লাহর (কুরআন) বেশি জ্ঞান রাখে এখন তেমন কেউ বিদ্যমান নেই। 'ইকরিমা যতক্ষণ বসরায় থাকতেন, ততক্ষণ হাসান আল-বাসরী (রহ) তাফসীর বর্ণনা করতেন না।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) জীবদ্দশাতেই 'ইকরিমা একজন বড় মুফাস্সির হয়ে যান। ইবন 'আব্বাস (রা) মাঝে মাঝে তাঁর পরীক্ষাও নিতেন এবং তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ জবাব শুনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন। একবার তিনি নিম্নের এ আয়াতটি পাঠ করেন: "আল্লাহ যাদেরকে ধ্বংস করবেন অথবা কঠোর শাস্তি দেবেন, তোমরা তাদেরকে সদুপদেশ দাও কেন?" তারপর বলেন, এই আয়াতে যে লোকদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, আমাদের জানা নেই তারা মুক্তি পেয়েছে না ধ্বংস হয়েছে। 'ইকরিমা অতি উত্তমরূপে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করে দেন যে, তারা মুক্তি পেয়েছে। ইবন 'আব্বাস (রা) এত খুশী হন যে, তাঁকে একটি চাদর পরিয়ে দেন।
তাফসীরের দারস
হযরত মুজাহিদ ও সা'ঈদ ইবন জুবায়রের মত বিদ্যান ব্যক্তিগণ তাঁর থেকে তাফসীর বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতেন। তাঁরা দু'জন তাঁকে প্রশ্ন করতেন, 'ইকরিমা তার জবাব দিতেন। তাঁদের প্রশ্ন শেষ হওয়ার পর নিজের পক্ষ থেকে তিনি আয়াতের শানে নুযূল বর্ণনা করতেন। তাঁরই অনুগ্রহ ও কল্যাণে মুজাহিদ তাফসীর শাস্ত্রের ইমাম হয়ে যান। আবু হাতিমকে 'ইকরিমা ও সা'ঈদ জুবায়র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, এঁদের মধ্যে তাফসীর বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানী কে? তিনি বলেন, ইবন 'আব্বাসের (রা) ছাত্ররা সকলে 'ইকরিমার মুখাপেক্ষী।
হাদীছ
তাঁর বিশেষ অধীত বিষয় ছিল হাদীছ। এ বিষয়ে ছিল তাঁর অগাধ জ্ঞান। এ শাস্ত্রের বেশিরভাগ জ্ঞান তিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) থেকে লাভ করেন। তাছাড়া আরো অনেক সাহাবীর নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। যেমন: হযরত 'আলী, আবূ হুরায়রা, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী, 'উকবা ইবন 'আমির, হাজ্জাজ ইবন 'আমর ইবন গারমিয়া, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান, সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা, ইয়া'লা ইবন উমাইয়্যা, জাবির, আবু কাতাদা, উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা সিদ্দীকা, হামনা বিনত জাহাশ (রা) ও আরো অনেকে।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) বর্ণিত হাদীছ যা প্রায় কয়েক হাজার অতিক্রম করেছে, তার অধিকাংশ 'ইকরিমার সূত্রে পাওয়া। এর দ্বারা এ শাস্ত্রের তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা অনুমান করা যায়। ইবন সা'দ তাঁকে “ হাদীছ" তথা বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী বলেছেন। শাহ্ ইবন হাওশাব বলতেন, প্রত্যেক জাতির একজন বিদগ্ধ ব্যক্তি (খাবীর) থাকেন, আর এই উম্মাতের সেই বিদগ্ধ ব্যক্তি হলেন ইবন 'আব্বাসের দাস 'ইকরিমা।
হাদীছ অন্বেষণকারীদের কাঙ্খিত ব্যক্তি
তাঁর ব্যক্তি সত্তাটি ছিল অসংখ্য মানুষের কেন্দ্র বিন্দু, যেখানে তারা সমবেত হতো। হাদীছ অন্বেষণকারীরা দূর-দূরান্ত থেকে তাঁর থেকে উপকার লাভের আশায় সেখানে ভীড় জমাতো। কোথাও ভ্রমণের সময় যে পথে তিনি যেতেন, আশে-পাশে উৎসাহী ছাত্র-জনতার ভীড় জমে যেত। আইউব বলেন, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম 'ইকরিমা পৃথিবীর যেখানেই থাকুন না কেন তাঁর সাথে আমি সাক্ষাৎ করবো। ঘটনাক্রমে একদিন বসরার বাজারে পেয়ে গেলাম। তাঁর চারপাশে মানুষের প্রচণ্ড ভীড়। আমি ভীড় ঠেলে নিকটে গেলাম। কিন্তু ভীড়ের কারণে জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। এমতাবস্থায় আমি তাঁর বাহনের পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। মানুষ যা কিছু জিজ্ঞেস করছিল তিনি তাঁর জবাব দিচ্ছিলেন, আর আমি তা স্মৃতিতে ধারণ করছিলাম। আইউব আরো বলেন, একবার 'ইকরিমা আমাদের এখানে আসলেন। মানুষের এত ভীড় জমে গেল যে, বাধ্য হয়ে তাঁকে ঘরের ছাদে নিয়ে বসাতে হলো।
'ইকরিমার সমালোচনা
তাঁর মনীষা ও মহত্ত্বের এ সকল বর্ণনার পাশাপাশি 'আসমা' আর-রিজাল' (চরিত- অভিধান)-এর গ্রন্থাবলীতে তাঁর সম্পর্কে সমালোচনামূলক এমন কিছু মন্তব্য দেখা যায় যাতে তাঁর বর্ণিত হাদীছের যথার্থতা ও বিশুদ্ধতা সম্পর্কে কিছু সন্দেহ সৃষ্টি হয়। সেই মন্তব্যগুলো নিম্নরূপ:
১. আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়াঈলী বলতেন, 'ইকরিমার মধ্যে বোধ-বুদ্ধি একটু কম ছিল। যখন তাঁর নিকট এমন কোন হাদীছ জিজ্ঞেস করা হতো যা তিনি দু'ব্যক্তির নিকট থেকে শুনেছেন, তখন তা এক ব্যক্তির দিকে আরোপ করতেন, আবার অন্য সময় আরেক ব্যক্তির দিকে। কিন্তু এ কোন দোষের বিষয় নয়, কারণ একটি বর্ণনা দু'জন রাবীর নিকট থেকে শুনে থাকলে যে কোন একজনের প্রতি অথবা উভয়ের প্রতি আরোপ করে বর্ণনা করার স্বাধীনতা তাঁর আছে। এতে তাঁর বোধ-বুদ্ধির স্বল্পতা প্রমাণ হয় কিভাবে?
২. আবূ খালাফ আল-খারারীজী আল-বাক্বারী বর্ণনা করেন, তিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারকে (রা) বলতে শুনেছেন যে, তিনি তাঁর দাস নাফি'কে বলতেন: নাফি'! আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার প্রতি এমন মিথ্যা আরোপ করবে না যেমন 'ইকরিমা 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের প্রতি করে থাকে।
৩. জারীর ইবন 'আবদিল হামীদ ইয়াযীদ ইবন আবী যিয়াদ থেকে বর্ণনা করেছেন। 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের পুত্র 'ইকরিমাকে তাঁর পিতার প্রতি মিথ্যা আরোপ করার অপরাধে শাস্তি দিতেন।
৪. হিশাম ইবন সা'দ 'আতা' খুরাসানী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে বললাম, 'ইকরিমার ধারণা যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইহরাম অবস্থায় হযরত মায়মূনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি বললেন, তিনি মিথ্যা বলেছেন।
৫. কাতার ইবন খলীফা বলেন, আমি 'আতা'কে বললাম, 'ইকরিমা বলে থাকেন যে, মোজার উপর মাসেহ করার নিয়মকে কুরআনের হুকুম বাতিল ও রহিত করেছে। 'আতা' বললেন, তিনি মিথ্যা বলেছেন। আমি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) থেকে শুনেছি। তিনি বলতেন, তোমরা মোজার উপর মাসেহ কর, তা তোমরা পায়খানা থেকে বের হও না কেন।
৬. ইসরাঈল 'আবদুল করীম আল-জাযারী থেকে বর্ণনা করেছেন। 'ইকরিমা ভূমি ইজারা দেওয়াকে মাকরূহ বলেন। তিনি সা'ঈদ ইবন জুবায়রের সংগে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন। সা'ঈদ বললেন, 'ইকরিমা মিথ্যা বলেছে।
৭. উহাইব ইবন খালিদ ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি 'ইকরিমাকে মিথ্যাবাদী বলতেন।
৮. ইবরাহীম ইবন মুনযির মা'আন ইবন 'ঈসা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ইমাম মালিক (রহ) 'ইকরিমাকে বিশ্বস্ত মনে করতেন না। তিনি তাঁর সূত্রে কোন কিছু বর্ণনা করতে নিষেধ করতেন। এ ধরনের আরো কিছু বর্ণনা তাঁর সম্পর্কে পাওয়া যায়।
উল্লেখিত বর্ণনাসমূহের পর্যালোচনা
উল্লেখিত বর্ণনাসমূহের একটিও নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ, প্রথমত সনদের ধারাবাহিকতা নেই, দ্বিতীয়ত বর্ণনাসমূহের রাবীগণও নির্ভরযোগ্য নয়। আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়াঈলীর মধ্যে ছিল শী'আ 'আকীদা-বিশ্বাসের প্রভাব। যদিও শী'আ হওয়া অগ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ নয়। কিন্তু খারিজীদের কিছু চিন্তা-বিশ্বাস 'ইকরিমার প্রতি আরোপিত ছিল। এমতাবস্থায় 'ইকরিমা সম্পর্কে একজন শী'আর বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। দ্বিতীয় বর্ণনার রাবী আবূ খালাফ ইয়াহইয়া ইবন আল-বাক্বার রিজাল শাস্ত্রবিদদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মতে একজন অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। তৃতীয় বর্ণনার একজন রাবী ইয়াযীদ এবং তিনি শী'আ। তাছাড়া তিনি নিজেই 'ইকরিমার বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। এমতাবস্থায় তাঁর বর্ণনা তাঁর কাজের পরিপন্থী হয়ে যায়। তৃতীয় বর্ণনার রাবী জারীর ইবন 'আবদিল হামীদও খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি নন। চতুর্থ বর্ণনার রাবী হিশাম ইবন সা'দের বর্ণনাসমূহ গ্রহণযোগ্যতার মান পর্যন্ত পৌঁছে না। সতর্ক মুহাদ্দিছগণ তাঁর কোন বর্ণনা গ্রহণ করতেন না। পঞ্চম বর্ণনায় কাতার ইবন খলীফা অনেক বিশেষজ্ঞের মতে নির্ভরযোগ্য নন। ষষ্ঠ বর্ণনার রাবী ইসরাঈল একেবারেই একজন অখ্যাত মানুষ। তাছাড়া তাঁর বর্ণনায় যে ভিত্তিতে 'ইকরিমাকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে তার অবস্থা এই যে, যদিও সহীহ বর্ণনায় এসেছে যে রাসূলুল্লাহর (সা) সময়কালে ভূমির ইজারাপ্রথা ছিল, কিন্তু অনেক সাহাবীর তা জানা না থাকার কারণে তা জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ ছিল। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) যদিও জানতেন যে, রাসূলের (সা) জীবদ্দশায় ভূমির ইজারা চালু ছিল, কিন্তু কোন কোন সাহাবীর তা না জানা থাকার কারণে জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ ছিল; এ কারণে তিনিও এই ধারণায় ইজারা গ্রহণ ছেড়ে দেন যে, হয়তো এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর (সা) নিষেধের কথা তিনি শোনেননি। এমতাবস্থায় 'ইকরিমার ধারণা একেবারে ভিত্তিহীন ছিল না। সপ্তম বর্ণনায় উহাইব ইবন খালিদ একজন দুর্বল (ضعیف) রাবী। আর অষ্টম বর্ণনায় ইবরাহীম ইবন মুনযিলের বর্ণনা বিতর্কিত।
মোটকথা 'ইকরিমার প্রতি অভিযোগ সম্বলিত এ সকল বর্ণনার কোনটাই গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাছাড়া এ সকল বর্ণনার বিপরীতে এত বেশি বর্ণনা আছে যে, তা থাকতে 'ইকরিমাকে অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
'আলিম ও মুহাদ্দিছগণের ঐকমত্য
ইসহাক ইবন 'ঈসা আত-তাব্বা' বর্ণনা করেন। আমি মালিক ইবন আনাসকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কি 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) এই কথাটি জানা আছে- "আমার প্রতি সেই রকম মিথ্যা আরোপ করবে না যে রকম 'ইকরিমা ইবন 'আব্বাসের প্রতি আরোপ করে থাকে?" মালিক বললেন, না। এ ব্যাপারে কিছু জানা নেই। অবশ্য সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব তাঁর দাস বুদকে এমন বলতেন। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, সা'ঈদ ইবন জুবায়র অন্যদের মুখে শোনা 'ইকরিমার কিছু বর্ণনায় সন্দেহ প্রকাশ করতেন। কিন্তু যখন খোদ তাঁর মুখে বর্ণনাটি শুনতেন তখন তাঁর সেই সন্দেহ দূর হয়ে যেত। আবূ ইসহাক বলেন, আমি একবার সা'ঈদ ইবন জুবায়রকে একথা বলতে শুনেছি যে, তোমরা 'ইকরিমার এমন সব হাদীছ বর্ণনা কর, যদি আমি তাঁর নিকট থাকতাম তাহলে সম্ভবতঃ তা বর্ণনা করতেন না। ঘটনাক্রমে কিছুক্ষণ পরে সেখানে 'ইকরিমা এসে উপস্থিত হন এবং তিনি সেই হাদীছগুলো বর্ণনা করেন। উপস্থিত সকলে চুপ করে শোনেন। সা'ঈদও কিছু বললেন না। 'ইকরিমা চলে যাওয়ার পর লোকেরা সা'ঈদ ইবন জুবায়রকে জিজ্ঞেস করে : আবূ 'আবদিল্লাহ! কী ব্যাপার, আপনি চুপ থাকলেন কেন? বললেন : 'ইকরিমা সঠিক বর্ণনা করেছেন। সকল মুহাদ্দিছ তাঁর সত্যবাদিতা ও অগাধ জ্ঞানের স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং তাঁর বর্ণনাসমূহ গ্রহণ করেছেন। হযরত 'আতা' ও সা'ঈদ ইবন জুবায়র উভয়ে বিনা দ্বিধায় তাঁর সকল হাদীছ গ্রহণ করতেন। হাবীব আবী ছাবিত বলেন, একবার 'ইকরিমা ও 'আতা' গেলেন সা'ঈদের নিকট এবং তাঁকে হাদীছ শোনালেন। যখন 'ইকরিমা হাদীছ শুনিয়ে উঠে গেলেন তখন আমি তাঁদের দু'জনকে প্রশ্ন করলাম: 'ইকরিমা যা কিছু বর্ণনা করেছেন তার কোন অংশে আপনাদের অস্বীকৃতি আছে? তাঁরা বললেন: না।
হযরত সা'ঈদ ইবন জুবায়র (রহ) যিনি নিজেই একজন বড় 'আলিম ছিলেন, 'ইকরিমাকে নিজের চেয়েও বড় 'আলিম বলে মানতেন। তাবি' তাবি'ঈনের মধ্যে ইবন জুরায়জ ছিলেন একজন অতি উঁচু স্তরের মুহাদ্দিছ। তিনি 'ইকরিমার এত গুণমুগ্ধ ছিলেন যে, একবার ইয়াহইয়া ইবন আইউব আল-মিসরীকে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি 'ইকরিমা থেকে কিছু লিখেছো? তাঁরা বললেন: না। ইবন জুরায়জ বললেন, তাহলে তো তোমরা দুই তৃতীয়াংশ 'ইলম (জ্ঞান) বিনষ্ট করে ফেলেছো। কাতাদা (রহ) চার ব্যক্তিকে বড় 'আলিম বলে মানতেন, তাঁদের মধ্যে একজন 'ইকরিমা। মুহাম্মাদ ইবন সীরীন (রহ) হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) সকল হাদীছ 'ইকরিমার সূত্রে গ্রহণ করেছেন।
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল 'ইকরিমার বর্ণনাসমূহকে দলীল-প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করতেন। ইবন মা'ঈন বিশ্বাস ও নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে 'ইকরিমাকে সা'ঈদ ইবন জুবায়রের সমকক্ষ বলে বিশ্বাস করতেন। তাঁর প্রতি ইবন মা'ঈনের এত প্রবল ভক্তি ও বিশ্বাস ছিল যে, তাঁর সম্পর্কে কোন রকম খারাপ ধারণা পোষণ করা মোটেই সহ্য করতেন না। তিনি বলতেন, যখন আমি কোন ব্যক্তিকে 'ইকরিমা ও হাম্মাদ ইবন সালামার দোষ-ত্রুটি আলোচনা করতে দেখি তখন তার মুসলিম হওয়ার ব্যাপারে আমার মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। ইবন আল-মাদীনী বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) দাসদের মধ্যে 'ইকরিমার চেয়ে ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না। 'ইকরিমা জ্ঞানী ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। ইমাম বুখারী বলতেন, আমাদের সকল সংগী-সাথী 'ইকরিমার বর্ণনা দ্বারা দলীল-প্রমাণ গ্রহণ করেন। ইমাম নাসাঈ তাঁকে বিশ্বস্ত বলেছেন। ইবন আবী হাতিম বলেন, আমি আমার পিতাকে প্রশ্ন করলাম: 'ইকরিমা কেমন? জবাব দিলেন: ছিকা বা বিশ্বস্ত। আবার প্রশ্ন করলাম! তাঁর হাদীছসমূহ কি দলীল-প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য? বললেন: হাঁ, যখন তিনি বিশ্বস্ত রাবীদের থেকে বর্ণনা করেন। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ও ইমাম মালিক (রহ) তাঁর হাদীছসমূহ নয়, বরং তাঁর নিজের মতামতকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁদেরকে প্রশ্ন করা হয়: 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) অন্য দাসদের অবস্থা কি? তাঁরা বলেন: 'ইকরিমা তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু মর্যাদার অধিকারী। এই স্থানে তাঁর কোন হাদীছ বর্ণনার প্রয়োজন নেই। বিশ্বস্ত রাবীগণ তাঁর থেকে যা কিছু বর্ণনা করেছেন তা সবই সহীহ বা সঠিক। হাদীছের ইমামগণ তাঁর বর্ণনা গ্রহণ করতে নিষেধ করেননি। সহীহ হাদীছের সংকলনকারীগণ তাঁর বর্ণনাসমূহকে তাঁদের সহীহ গ্রন্থসমূহে সন্নিবেশ করেছেন এবং তাঁর ব্যক্তিত্ব এর চেয়েও উন্নত যে, আমি তাঁর হাদীছসমূহ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করি।
ইবন মুন্দাহ বলেন, শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের বিশাল একটি সংখ্যা এবং তাবি' তাবি'ঈগণ 'ইকরিমাকে ন্যায়নিষ্ঠ বলেছেন, তাঁর থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন এবং তার একক বর্ণনা দ্বারা আল্লাহর সিফাত, সুন্নাহ ও বিভিন্ন আহকামের দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর থেকে তিনশো'র অধিক মানুষ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাদের সত্তর (৭০) জনের অধিক উঁচু পর্যায়ের তাবি'ঈ। এ এমন মর্যাদা যা অন্য কোন তাবি'ঈ অর্জন করতে পারেননি। যে সকল ইমাম তাঁর সমালোচনা করেছেন তাঁরাও তাঁর থেকে হাদীছ গ্রহণ এড়াতে পারেননি। তাবি'ঈদের যুগ থেকে নিয়ে ইমাম বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ ও নাসা'ঈর যুগ পর্যন্ত সকল ইমাম তাঁর সহীহ বর্ণনাসমূহ গ্রহণ করে তা ছাবিত, সাকীম ও সাহীহ তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। যুগের পর যুগ ধরে ইমামের পর ইমামগণ তাঁর বর্ণিত হাদীছসমূহকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বিখ্যাত চার মাযহাবের মহান ইমামগণ তাঁর হাদীছসমূহ দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইমাম মুসলিম (রহ) তাঁর সম্পর্কে সুধারণা রাখতেন না, তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর হাদীছ গ্রহণ করেছেন। চুলচেরা সমালোচনার পর তাঁর মূল্যায়ন করে তাঁকে ন্যায়নিষ্ঠ বলেছেন।
আবূ 'আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন নাসর আল-মুরূযী বলেন, 'ইকরিমার হাদীছসমূহ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের ব্যাপারে হাদীছের সকল 'আলিমের ইজমা' আছে। আমাদের যুগের সকল শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ, যেমন : আহমাদ ইবন হাম্বল, ইবন রাহুওয়াইহ, ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন, আবূ ছাওর প্রমুখের এ ব্যাপারে ঐকমত্য আছে। আমি তাঁর বর্ণনাসমূহ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে ইবন রাহুওয়াইহ-এর নিকট জিজ্ঞেস করি। তিনি আমার প্রশ্নে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমাদের মতে 'ইকরিমা সারা পৃথিবীর ইমাম। কিছু লোক ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈনকে একই প্রশ্ন করে। তিনিও এমন প্রশ্নে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
জাবির ইবন যায়দ বলতেন, 'ইকরিমা হলেন মানুষের মধ্যে অধিক জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি। যার মধ্যে জ্ঞানের সুগন্ধি অনুভব করার সামান্যতম শক্তি আছে তার ইয়াযীদ ইবন আবী যিয়াদের কথার (পূর্বে উল্লেখিত) উপর নির্ভর করা উচিত নয়। ইয়াযীদ ইবন আবী যিয়াদ এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি নন। আর একজন সমালোচিত ব্যক্তির কথা দ্বারা একজন ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি সমালোচিত ও দোষী হতে পারেন না। 'ইকরিমা এমন ব্যক্তি যাঁর জ্ঞানের ঝর্ণাধারা থেকে জ্ঞানী ব্যক্তিরা পরিতৃপ্ত হয়ে সমগ্র পৃথিবীতে হাদীছ ও ফিক্হের প্রসার ঘটিয়েছেন। তাঁর মধ্যে কিছু কৌতুকপ্রিয়তা ছাড়া মন্দ কোন কিছুর কথা আমার জানা নেই।
মোটকথা, পূর্বে আলোচিত কিছু দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা ছাড়া সকল 'আলিম ও মুহাদ্দিছ 'ইকরিমার মহত্ত্ব, মনীষা ও সত্যবাদিতার ব্যাপারে এ রকম মত পোষণ করেছেন। তাঁর সত্যবাদিতার অনস্বীকার্য সাক্ষ্য এই যে, খোদ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা), যাঁর আশ্রয়ে তিনি বেড়ে ওঠেন, তাঁর জ্ঞানের উপর এতখানি আস্থা ছিল যে, তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, 'ইকরিমা আমার সূত্রে যা বর্ণনা করবে তোমরা তা সত্য বলে জানবে। সে আমার নামে মিথ্যা বলবে না। এখানে যে পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হলো তাতে জ্ঞানের জগতে হযরত 'ইকরিমার (রহ) সুউচ্চ আসন ও মর্যাদার ব্যাপারে কোন রকম সন্দেহের অবকাশ থাকে না।
তাঁর ছাত্র
জ্ঞানের জগতে তাঁর যে সুউচ্চ আসন ছিল তা তাঁর ছাত্র সংখ্যা দ্বারা বুঝা যায়। অসংখ্য ছাত্র তাঁর নিকট থেকে হাদীছ শুনেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে ছিলেন ইমাম পর্যায়ের। ছাত্রদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ হবে, তাই কয়েকজন বিশিষ্ট ছাত্রের নাম এখানে উপস্থাপন করা হলো: ইবরাহীম নাখা'ঈ, জাবির ইবন যায়দ, ইমাম শা'বী, আবূ ইসহাক সুবায়'ঈ, আবুয যুবায়র, কাতাদা, সাম্মাক ইবন হারব, 'আসিম আল-আহওয়াল, হুসায়ন ইবন 'আবদির রহমান, আইউব, খালিদ, দাউদ ইবন আবী হিন্দ, 'আসিম ইবন বাহদালা, 'আবদুল কারীম আল-জাযারী, হুমায়দ আত-তাবীল, মূসা ইবন 'উকবা, 'আমর ইবন দীনার, 'আতা' ইবন সায়িব, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব, আবূ ইসহাক আশ-শায়বানী, হিশাম ইবন হাসান, ইয়াহইয়া ইবন কাছীর, হাকাম ইবন 'উয়ায়না, খাসীফ আল-জাযারী, দাউদ ইবন আল-হুসায়ন, 'আতা' আল-খুরাসানী, 'আতা' ইবন আস-সায়িব, 'আতা' আল-'আওফী, 'আবদুল কারীম আবূ উমাইয়্যা আল-বাসরী, 'আবদুল মালিক ইবন আবী বাশীর আল-মাদায়িনী, 'উছমান ইবন সা'দ আল-কাতিব, 'উছমান ইবন গিয়াছ আল-বাসরী (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ
হযরত 'ইকরিমার (রহ) মূল বিষয় ছিল হাদীছ। তবে তিনি ফিক্হ শাস্ত্রেও সুদক্ষ ছিলেন। ইবন হিব্বান বলেন, 'ইকরিমা তাঁর সময়ে ফিক্হ ও কুরআনের অন্যতম বড় 'আলিম ছিলেন। ফিক্হ বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতার বড় সনদ এই যে, হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) স্বীয় জীবদ্দশায় তাঁকে ফাতওয়া দানের অনুমতি দান করেছিলেন। তিনি নিজেই বলেন, ইবন 'আব্বাস (রা) আমাকে ফাতওয়া দিতে বলেন। আমি দু'বার অপারগতা প্রকাশ করে বলি যে, যদি এ যুগের মানুষ পূর্ববর্তী যুগের সত্যনিষ্ঠ মানুষদের মত হতো তাহলে আমার কোন আপত্তি থাকতো না। আমার এ আপত্তির কথা শুনেও তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোন ব্যক্তি জরুরী কোন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলে তা বলে দেবে। আর কেউ অহেতুক প্রশ্ন করলে তার জবাব দেবে না। এই কর্ম-পদ্ধতিতে তোমার দুই-তৃতীয়াংশ বোঝা হালকা হয়ে যাবে। ফিক্হ শাস্ত্রে তাঁর মনীষা ও পাণ্ডিত্য এতখানি স্বীকৃত ছিল যে, যখন তিনি বসরায় যেতেন এবং যতদিন সেখানে অবস্থান করতেন ততদিন পর্যন্ত হাসান আল-বাসরী (রহ) ফাতওয়া দিতেন না। তাঁর ইনতিকালের পর মানুষের মুখে মুখে একথাটি উচ্চারিত হতো: ফিক্হ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি দুনিয়া থেকে চলে গেছেন।
তাঁর সমকালীন জ্ঞানী-গুণীরা বিভিন্ন মাসয়ালার ক্ষেত্রে তাঁকে নির্ভরযোগ্য মনে করে তাঁর কাছেই জানতে চাইতেন। 'আমর ইবন দীনার বলেন, জাবির ইবন যায়দ কয়েকটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করার জন্য আমাকে 'ইকরিমার নিকট পাঠালেন এবং আমাকে একথাও বললেন যে, ইবন 'আব্বাসের (রা) এ দাস জ্ঞানের সাগর। তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করবে।
মাগাযী
মাগাযী হলো হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবন-ইতিহাস। বিশেষত তাঁর সময়ের যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস। হাদীছ ও ফিক্হ ছাড়াও ইতিহাসেও তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। মাগাযী শাস্ত্রে একজন বিশিষ্ট 'আলিম ছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর এত জ্ঞান ছিল যে, যখন মাগাযীর বর্ণনা দিতেন তখন সাবলীল ভাষায় শ্রোতাদেরকে যেন যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে উপস্থিত করতেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না বলেন, 'ইকরিমা যখন মাগাযী বর্ণনা করতেন তখন শ্রোতাদের মনে হতো তারা যেন মুজাহিদদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং তাঁদেরকে দেখছে। কাতাদা (রহ) বলতেন : 'তাবি'ঈদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি চারজন : হজ্জের আহকাম ও 'ইবাদাত বিষয়ক জ্ঞানে 'আতা' ইবন আবী রাবাহ; তাফসীর বিষয়ক জ্ঞানে সা'ঈদ ইবন জুবায়র, সীরাতুন নবী (সা) বিষয়ক জ্ঞানে 'ইকরিমা এবং হালাল-হারাম বিষয়ক জ্ঞানে আল-হাসান সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি।'
ওফাত
হিজরী ১০৫, মতান্তরে ১০৬ অথবা ১০৭ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ইমাম যাহাবীর মতে হিজরী ১০৭ সনে মদীনায় তাঁর মৃত্যু হয়। একটি বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি আফ্রিকার কায়রোয়ানে ইনতিকাল করেন। তবে এ বর্ণনা নির্ভরযোগ্য নয়।
কিছু সন্দেহের অপনোদন
কিছু বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, হযরত 'ইকরিমার একটু ঝোঁক ছিল খারিজীদের সাফরিয়্যা ও 'ইবাদিয়্যা সম্প্রদায়ের আকীদা-বিশ্বাসের প্রতি এবং নাজদা খারিজীর সাথে তার গভীর সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছিল। এমনকি নাজদা তাঁর নিকট ছয় মাস পর্যন্ত অবস্থানও করেছিল। মরক্কোর খারিজীরা তাঁর নিকট জ্ঞান অর্জন করেছে। তবে এ সকল বর্ণনার সবই সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ। তাবাকাতে ইবন সা'দ, যেটি সবচেয়ে প্রাচীন সূত্র বলে স্বীকৃত, তাতে শুধু এ বাক্যটি পাওয়া যায়: 'ধারণা করা হয় যে, তিনি খারিজীদের মত পোষণ করতেন।' এ বর্ণনার ভিত্তি যে কতটুকু শক্ত তা "يظن” অর্থাৎ ধারণা ও অনুমান শব্দ প্রয়োগের দ্বারা বুঝা যায়। কিছু মানুষ তো এ বর্ণনাকে একেবারে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই 'আজলী বলেন, তিনি একজন মাক্কী তাবি'ঈ, বিশ্বাসযোগ্য এবং খারিজী মত পোষণের যে অভিযোগ তার প্রতি আরোপ করা হয় তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
এ সকল বর্ণনা ছাড়া যুক্তি দ্বারাও প্রমাণ করা যায় যে, খারিজীদের সাথে তাঁর সম্পর্ক থাকতে পারে না। কারণ, তিনি লালিত-পালিত হন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে, আর তিনি ছিলেন খারিজীদের প্রবল প্রতিপক্ষ। 'ইকরিমার প্রথম মনিব হুসায়ন ইবন আল-হুর আল-আম্বরও ছিলেন আহলি বায়ত তথা নবী-পরিবারের ভক্ত। এমতাবস্থায় খারিজী চিন্তা-বিশ্বাসের দিকে তাঁর ঝোঁক থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। অপর দিকে শী'আ মত-বিশ্বাসের দিকে ঝোঁক প্রবণতার কথা যদি তাঁর সূত্রে বর্ণিত হতো তাহলে তা অধিক যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারতো। বিভিন্ন বর্ণনা পর্যালোচনার পর এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, হযরত 'ইকরিমা মুসলিম জনসাধারণের মত খারিজীদের ব্যাপারে কঠোর মনোভাবাপন্ন ছিলেন না। তিনি তাদের সাথে লৌকিক ও সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতেন। যেহেতু এ কাজ মুসলিম জনসাধারণের কর্ম-পদ্ধতির বিপরীতে ছিল এবং জনগণ তা পছন্দ করতোনা, এ কারণে তাঁর খারিজী হওয়ার কথাটি প্রসিদ্ধি লাভ করে। এটাও হতে পারে যে, বিশেষ কোন মাসয়ালায় তাঁর মতামত খারিজীদের মতামতের সাথে মিলে যায়, এ কারণে তিনি খারিজী হিসেবে প্রসিদ্ধি পান। অন্যথায় এই গোমরাহ দলের সাথে তাঁর কোন রকম সম্পর্ক ছিল না।
দেশ ভ্রমণে তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। সারা জীবনই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করেছেন। পূর্বে সমরকন্দ থেকে পশ্চিমে মিসর তথা আফ্রিকার প্রান্তসীমা পর্যন্ত ছিল তাঁর ভ্রমণের পরিধি। তাঁর আল-মাগরিব তথা মরক্কো সফরের কারণ সম্পর্কে আবুল আসওয়াদ বলেছেন এভাবে: "ইকরিমার আল-মাগরিব যাত্রার প্রথম কারণ আমি। আর তা হলো আমি মিসর থেকে মদীনায় আসি এবং 'ইকরিমা আমার সাথে দেখা করেন। তিনি আল-মাগরিববাসীদের সম্পর্কে আমার নিকট জানতে চাইলেন। আমি তাদের অমনোযোগিতা ও গাফলতি সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করলাম। অতঃপর তিনি (মদীনা থেকে) আল-মাগরিববাসীদের দিকে বেরিয়ে পড়লেন।" ইবন বুকাইর বলেন, 'ইকরিমা আল-মাগরিব যাওয়ার পথে মিসর আসেন। তিনি নিজের বাড়ির পাশে একটি বাড়ি দেখিয়ে বলতেন, 'ইকরিমা এই বাড়িতে অবস্থান করেন এবং এখান থেকে আল-মাগরিবের দিকে বেরিয়ে পড়েন।
তাঁর বসরা গমনের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন আইউব এভাবে: 'আমি 'ইকরিমার খ্যাতির কথা শুনে তিনি যেখানেই থাকুন না কেন তাঁর কাছে যাওয়ার ইরাদ্য করছিলাম। একদিন আমি বসরার বাজারে বসে আছি, এমন সময় এক ব্যক্তি গাধায় চড়ে সেখানে আসলেন। লোকেরা আমাকে বললো, ইনিই 'ইকরিমা। লোকেরা তাঁকে ঘিরে ধরলো। আমিও উঠে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু কোন প্রশ্ন করতে পারলাম না। আমার সব প্রশ্ন যেন ভুলে গেলাম। আমি তাঁর গাধার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষের সকল প্রশ্ন ও তাঁর উত্তর শুনতে ও মুখস্থ করতে লাগলাম। আইউব আরো বলেন, তাঁর পাশে মানুষের এত ভীড় হয় যে, তা সামলাতে তাঁকে একটি ঘরের ছাদের উপর বসানো হয়। এই বসরা ভ্রমণকালে সেখানে আইউব, সুলায়মান আত-তায়মী, ইউনুস ইবন 'উবায়দ তাঁর নিকট থেকে হাদীছ শোনেন।
তিনি খুরাসান ও সমরকন্দেও যান। আল-মুগীরা ইবন মুসলিম বলেন, খুরাসানে তাঁর হজ্জ বিষয়ে অনেক প্রশ্ন করা হয়। আবুত তায়্যিব মূসা ইবন ইয়াসার বলেন, আমি 'ইকরিমাকে গাধায় চড়ে সমরকন্দ থেকে আসতে দেখেছি। সেই গাধার পিঠে ঝোলানো রেশমভরা দু'টি বস্তা ছিল, যা সমরকন্দের শাসক তাঁকে দিয়েছিলেন। সংগে একটি দাসও ছিল। আবুত তায়্যিব আরো বলেন, আমি এই সমরকন্দেই তাঁর নিকট থেকে হাদীছ শুনেছি। এখানে একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি হারামাইন (মক্কা- মদীনা) ছেড়ে এই খুরাসান-সমরকন্দে এসেছেন কেন? তিনি বলেন, প্রয়োজনই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।
আসলে তিনি সাধারণ মানুষের দান-উপহার গ্রহণ করতেন না, বরং আমীর-উমারাদের থেকেই গ্রহণ করতেন। একবার তাঁর মাথায় একটি পুরাতন জীর্ণ পাগড়ী দেখে এক ব্যক্তি তাঁকে বললো, আপনি এই পাগড়ীটি বাদ দিন, আমাদের অনেক পাগড়ী আছে, তার থেকে একটি পাঠিয়ে দিচ্ছি, আপনি সেটা পরবেন। বললেন: "আমি সাধারণ মানুষের নিকট থেকে কোন কিছু গ্রহণ করিনে। গ্রহণ করি কেবল আমীর- উমারাদের থেকে।" ইবরাহীম ইবন ইয়া'কূব বলেন, আমি আহমাদ ইবন হাম্বলের নিকট জানতে চাইলাম যে, 'ইকরিমা কি আল-মাগারিবের 'বারবার' সম্প্রদায়ের নিকট গিয়েছিলেন? বললেন: হাঁ। তিনি খুরাসানের আমীর-উমারাদের নিকট গিয়ে তাঁদের দান-অনুগ্রহ গ্রহণ করতেন।
খালিদ ইবন আবী 'ইমরান বলেন, ইবন 'আব্বাসের (রা) দাস 'ইকরিমা একটা মেলার মৌসুমে আমাদের আফ্রিকাতে আসেন এবং একটি বল্লম হাতে নিয়ে বলেন, আমি মেলায় যাব, ডানে-বামে যাকে পাব এই বল্লম দিয়ে পেটাবো। তিনি মেলায় যান এবং মেলায় অংশ গ্রহণকারীদের প্রতিরোধের মুখে পড়েন।
টিকাঃ
১. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-১৩/১৬৩
২. তাবাকাত-৫/২১৩
৩. প্রাগুক্ত; ইবন খাল্লিকান, ওয়াফাইয়াত আল-আ'ইয়ান-১/৩১৯
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৪
৫. তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৬৬
৬. তাবাকাত-৫/২১৬
৭. তাবাকাত-৫/২১২
৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/৮৩
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/২৬৫; তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৬৭
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/২৬৬
১১. সূরা আল-আ'রাফ-১৬৪
১২. তাবাকাত-৫/২১৪; তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৬৮
১৩. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/২৬৬; তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৬৯
十四. তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৭৯
十五. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/২৬৬; তাবি'ঈন-২৮২
১৬. তাবাকাত-৭/২১৬
十七. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/২৬৫
十八. তাবাকাত-৫/২১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৭০
十九. তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৭৩
二十. প্রাগুক্ত-১৩/১৭৪
২১. তাহযীব আত-তাহযীব গ্রন্থের ৭ম খণ্ডে 'ইকরিমার জীবনীতে দ্রষ্টব্য।
২২. তাহযীব আত-তাহযীব-১২/১১
২৩. প্রাগুক্ত-১১/২৭৯
২৪. প্রাগুক্ত-১১/৩২৯
২৫. প্রাগুক্ত-২/৭৬
২৬. প্রাগুক্ত-৭/২১৩
২৭. প্রাগুক্ত-৮/৩০২
২৮. প্রাগুক্ত-১১/১৭০; ১/১৬৭
২৯. তাবাকাত-৫/২১৩; তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৭০
৩০. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/২৬৬
三十一. প্রাগুক্ত-৭/২৬৬-২৭০
三十二. প্রাগুক্ত-৭/৫২
三十三. প্রাগুক্ত-৭/২৭২-২৭৩
三十四. প্রাগুক্ত-৭/২৬৫; তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৬৮
三十五. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/২৬৪; তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৬৪
三十六. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/২৭১
三十七. প্রাগুক্ত
三十八. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৮৪
三十九. তাবাকাত-৫/২১৬
四十. প্রাগুক্ত-৫/২১৩
四十一. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/২৬৬; তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৬৮
四十二. তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৬৮
四十三. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৮৪; তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৮১
四十四. তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৭৮
四十五. প্রাগুক্ত-১৩/১৮০; তাবাকাত-৫/২১৬
四十六. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/২৭০
四十七. প্রাগুক্ত
四十八. তাহযীব আল-কামাল-১৩/১৭২
四十九. প্রাগুক্ত
五十. প্রাগুক্ত
五十一. প্রাগুক্ত-১৩/১৭৬
五十二. প্রাগুক্ত-১৩/১৭২, ১৭৬
五十三. প্রাগুক্ত-১৩/১৭২