📄 যাইনুল ‘আবিদ্বীন ‘আলী ইবন হুসাইন (রা)
হযরত 'আলী ইবন হুসাইনের (রা) 'কুনিয়াত' বা ডাকনাম আবুল হাসান এবং 'লকব' বা উপাধি যাইনুল 'আবিদীন। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) অত্যন্ত আদরের দৌহিত্র হযরত হুসাইনের (রা) কনিষ্ঠ পুত্র এই 'আলী। কারবালায় নবুওয়াতী উদ্যান তছনছ হওয়ার পর এই একটি মাত্র ফুল অবশিষ্ট ছিল যার মাধ্যমে দুনিয়াতে সাইয়্যিদ বংশের সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে এবং হযরত হুসাইনের (রা) নাম বিদ্যমান থাকে। তাঁর পিতৃকুলের শাজারা-ই-নসব (বংশধারা) সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল এবং চন্দ্রের চেয়েও দীপ্তিমান। তবে মাতৃকুলের শাজারা-ই-নসবের ব্যাপারে কিঞ্চিৎ মত পার্থক্য আছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে তিনি ছিলেন পারস্যের শেষ সম্রাট ইয়াযদাগুরদের দৌহিত্র।
বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে ইয়াযদাগুরদের পরাজয় হয় তখন আরো যুদ্ধ বন্দীদের সাথে তাঁর তিন মেয়েও বন্দী হয়। হযরত 'উমার (রা) অন্যান্য বন্দীদের মতো তাদেরকেও বিক্রির নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত 'আলী (রা) খলীফার সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, এই তিন শাহযাদীর সাথে অন্য সাধারণ মানুষের কন্যাদের সাথে যে আচরণ করা হয়, তেমন করা সঙ্গত হবে না। তিনি প্রস্তাব দেন তাদের মূল্য নির্ধারণ করা হোক এবং সেই মূল্যে যে কিনতে চায়, কিনে নিবে। সম্ভবতঃ হযরত 'আলী (রা) হযরত রাসূলে কারীমের (সা) একটি হাদীছের ভিত্তিতে এমন কথা বলেন। হাদীছটি এই : إِرْحَمُوا عزيز قوم ذل - "কোন কাওম বা জাতির সম্মানিত ব্যক্তি হেয় ও অপমানিত হলে তোমরা তার প্রতি দয়া দেখাবে।” 'উমার (রা) 'আলীর (রা) প্রস্তাবে রাজী হন। তিন শাহযাদীর একটা দাম নির্ধারণ করা হয় এবং তিনজনকেই 'আলী (রা) নিজে ক্রয় করেন। অতঃপর একজনকে হযরত আবূ বকরের (রা) ছেলে মুহাম্মাদকে, আরেকজনকে হযরত 'উমারের (রা) ছেলে হযরত 'আবদুল্লাহকে (রা) এবং তৃতীয়জনকে নিজের ছেলে হযরত হুসাইনকে (রা) দান করেন। এই তিন শাহযাদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন যথাক্রমে হযরত কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, হযরত সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (রা) ও হযরত 'আলী ইবন হুসাইন (রা)।
ইবন কুতাইবা (মৃত্যু ২৭৬ হি) যাইনুল 'আবিদীনের মা'কে সিন্ধুর এবং আল-ইয়া'কূবী কাবুলের মেয়ে এবং তার নাম সুলাফা অথবা গাযালা বলে উল্লেখ করেছেন। ইবন সা'দ গাযালা নামটিকেই গ্রহণ করেছেন। তিনি কোন বংশধারা উল্লেখ করেননি। তবে ইয়াযদাগুরদের শাহী বংশধারার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। ইয়াযদাগুরদের যে কন্যাটিকে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) দৌহিত্র হযরত হুসাইন ইবন 'আলীর (রা) হাতে সমার্পণ করা হয় তার ফার্সী নাম ছিল "শাহে যিনানা।" দাসী হিসাবে হযরত হুসাইনের সাথে যুক্ত হওয়ার পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন নিষ্ঠাবতী মুসলমানে পরিণত হন। পৌত্তলিক জীবনের সকল সম্পর্ক জীবন থেকে মুছে ফেলেন। এমনকি "শাহে যিনানা" (নারীদের রাণী) নামটি পরিত্যাগ করে "গাযালা” নাম ধারণ করেন। হযরত হুসাইন (রা) তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন এবং পরবর্তীতে উভয়ের সম্মতিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এভাবে গাযালা একজন চমৎকার স্বামী লাভ করেন। অল্পদিনের মধ্যে তিনি এক পুত্র সন্তানের মা হন এবং পিতা-মাতা তাঁদের শিশু সন্তানের নাম রাখেন তার মহান দাদা 'আলী ইবন আবী তালিবের (রা) নামে 'আলী ইবন আল হুসাইন (রা)। সন্তান প্রসবের পর মা "গাযালা” জ্বরে আক্রান্ত হন এবং তাতেই ইনতিকাল করেন। শিশু আলী মায়ের আদর ও স্নেহ-মমতা থেকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত হন। একজন দাসী তাঁকে মাতৃ স্নেহে লালন-পালন করেন। জীবনে তাকেই তিনি মা বলে জানেন।
একটু বুদ্ধি হলে তাঁকে শিক্ষার প্রতি মনোযোগী করে তোলা হয়। এ ব্যাপারে তাঁর মধ্যে প্রচণ্ড আগ্রহও লক্ষ্য করা যায়। তাঁর প্রথম শিক্ষালয়টি ছিল নিজ গৃহ। তেমনি প্রথম ও প্রধান শিক্ষক ছিলেন তাঁর মহান পিতা হযরত হুসাইন ইবন 'আলী (রা)। তাঁর দ্বিতীয় শিক্ষালয়টি ছিল মদীনার পবিত্র মাসজিদে নববী। এই মাসজিদ তখন সব সময় জীবিত সাহাবা ও বড় বড় তাবি'ঈন কিরামের (রহ) পদচারণায় মুখর থাকতো। তাঁরা মাসজিদের এখানে ওখানে হালকা করে সাহাবায়ে কিরামের (রা) সন্তানদেরকে কুরআন শিখাতেন, ইসলামী বিধি-বিধানের তত্ত্বজ্ঞান দান করতেন, তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ, সীরাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহের কাহিনী শোনাতেন এবং সেই সাথে আরবী কবিতা ও ভাষা সাহিত্যের জ্ঞানও দান করতেন। সাথে সাথে তাঁরা তাঁদের অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা, ভয়-ভীতির বীজও রোপন করতেন। এভাবে তাঁরা সত্য-সঠিক পথের অনুসারী বা 'আমল 'আলিমে পরিণত হতেন।
'আলী ইবন হুসাইনের (রা) মন মস্তিষ্কে আল কুরআন বিষয়টি যেভাবে স্থান পায় সেভাবে শিক্ষার অন্য কোন বিষয় স্থান পায়নি। সেই শৈশব থেকে আল কুরআনের ভয়-ভীতি ও আযাবের আয়াত পাঠ করে তার দেহে আবেগ অনুভূতি যেভাবে আন্দোলিত হতো তেমন আর কোন ব্যাপারে হতো না। জান্নাতের বর্ণনা সম্বলিত আয়াত পাঠের সময় এতই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়তেন যে, কল্পনায় যেন জান্নাতে পৌঁছে যেতেন। আর জাহান্নামের বর্ণনা সম্বলিত আয়াত পাঠের সময় তাঁর মনে হতো এই আগুনের লেলিহান শিখা যেন তাকে গ্রাস করতে আসছে।
কারবালায় ইয়াযীদ বাহিনীর এক শামী সৈনিক যে আহলি বাইত তথা নবী পরিবারের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিল। কারবালা যুদ্ধের পর সে আলী ইবন হুসাইনের খিদমত করতে থাকে। লোকটি আল্লাহকে ভয় করার কারণে হযরত আলী ইবন হুসাইনের অন্তরে তার প্রতি এক ধরনের মহব্বত সৃষ্টি হয়। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার সাথে আত্মীয়তার ন্যায় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
'উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের সংগে আলোচনা
কারবালায় বন্দী হওয়ার পর হযরত আল হুসাইনের (রা) সঙ্গী অন্য বন্দীদের সাথে তাঁকেও ইবন যিয়াদের সামনে হাজির করা হয়। তারপর দুইজনের মধ্যে নিম্নোক্ত কথোপকথন হয়।
ইবন যিয়াদ: তোমার নাম কি?
যাইনুল 'আবিদীন: আলী ইবন আল হুসাইন।
ইবন যিয়াদ: তোমার আরেক ভাইয়ের নামও তো আলী ছিল। আল্লাহ কি তাকে হত্যা করেননি?
যাইনুল 'আবিদীন: আমার আরেকটি ভাইয়ের নাম আলী ছিল। মানুষ তাকে হত্যা করেছে।
ইবন যিয়াদ: মানুষ নয়, বরং আল্লাহ তাকে হত্যা করেছেন।
ইমাম যাইনুল 'আবিদীন চুপ থাকলেন। ইবন যিয়াদ একই কথা আবারো বললো। এবার যাইনুল 'আবিদীন কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন:
"আল্লাহই প্রাণ হরণ করেন জীবসমূহের তাদের মৃত্যুর সময় এবং যাদের মৃত্যু হয়নি তাদের প্রাণ ঘুমের সময়।" "আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কারো মৃত্যু হতে পারে না, তা এক সুনির্দিষ্ট সময়ের লিখন।"
এ জবাব শুনে ইবন যিয়াদ রাগান্বিত হলো এবং তাকে হত্যার নির্দেশ দিল। এ অবস্থায় যাইনুল 'আবিদীনের ফুফু হযরত যায়নাব (রা) ইবন যিয়াদকে লক্ষ্য করে বলেন: যদি তাকে হত্যা করতে চাও তাহলে তার সাথে আমাকেও হত্যা কর। এরপর আল্লাহ ইবন যিয়াদের অন্তরে দয়া ও করুণা সৃষ্টি করেন। অতঃপর সে আহলি বাইতের অসহায় মহিলাদের সঙ্গে থাকার জন্য ইমাম যাইনুল 'আবিদীনকে ছেড়ে দেন।
ইবন যিয়াদ আহলি বাইত (রা) তথা নবী পরিবারের জীবিত সদস্যদেরকে দিমাশকে ইয়াযীদের নিকট পাঠিয়ে দেয়। তাঁদেরকে ইয়াযীদের সামনে হাজির করা হয়। তিনি ইমাম আল হুসাইনের (রা) ছিন্ন মাথা দেখে যাইনুল 'আবিদীনকে বলেন, 'আলী! যা কিছু তুমি দেখছো তা সবই তোমার পিতার কর্মফল। তিনি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, আমার অধিকারের ব্যাপারে উদাসীনতা দেখিয়েছেন এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে ঝগড়া করেছেন।
জবাবে ইমাম যাইনুল 'আবিদীন (রা) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন:
“পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করবার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে। আল্লাহর পক্ষে ইহা খুবই সহজ।"
পাশেই বসা ছিল ইয়াযীদের ছেলে খালিদ। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বলেন, খালিদ তুমি এর জবাব দাও। কিন্তু সে জবাব দিতে পারলো না। তখন ইয়াযীদ বললেন, তুমি এ আয়াতটি পড়:
"তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃত কর্মের ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তো তিনি ক্ষমা করে দেন।"
এই বৈঠকে জনৈক শামী ব্যক্তি অভিমত ব্যক্ত করে যে, এসব কয়েদী আমাদের জন্য হালাল। হযরত যাইনুল 'আবিদীন (রহ) বললেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি যদি মারাও যাও তবুও তোমার জন্য হালাল নয়। যতক্ষণ তুমি আমাদের দীন-ধর্ম থেকে বেরিয়ে না যাও। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় কোন মুসলমান বন্দী নারী কোন মুসলমানের জন্য হালাল নয়। ইয়াযীদ উক্ত শামী ব্যক্তিকে ধমক দিয়ে বসিয়ে দেন।
ইয়াযীদ আহলি বাইতের সাথে সাক্ষাতের পর তাঁদেরকে শাহী মহল “সারা”তে থাকার ব্যবস্থা করেন। এসব সম্মানিত মহিলাগণ তাঁর আত্মীয়া ছিলেন। এ কারণে তিন দিন পর্যন্ত ইয়াযীদের শাহী মহলে শোক ও মাতম বিরাজ করে। যতদিন তাঁরা সেখানে ছিলেন ইয়াযীদ তাঁদের সাথে অত্যন্ত ভদ্র ব্যবহার করেন। যাইনুল 'আবিদীনকে সংগে নিয়ে একই দস্তরখানে বসে আহার করতেন।
মদীনায় প্রত্যাবর্তন এবং ইয়াযীদের অঙ্গীকার
ইয়াযীদের শাহী মহলে কিছুদিন থাকার পর যখন আহলি বাইত কিছুটা সুস্থ ও স্বাভাবিক হলেন তখন ইয়াযীদ একদিন যাইনুল 'আবিদীনকে বললেন, "তোমরা যদি আমাদের সঙ্গে এখানে থাকতে চাও, থাকতে পার। আমি আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখবো, তোমাদের সকল অধিকার পূরণ করবো। আর ফিরে যেতে চাইলে যেতে পার। আমি তোমাদের সংগে ভালো আচরণ করতে থাকবো।” যাইনুল 'আবিদীন (রহ) ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।
তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী ইয়াযীদ তাঁদেরকে সরকারী সৈন্যদের তত্ত্বাবধানে নিরাপদে মদীনায় পাঠিয়ে দেন। বিদায় বেলা তিনি যাইনুল 'আবিদীনকে বলেন: "ইবন মারজানার উপর আল্লাহর अभিশাপ! আমি যদি উপস্থিত থাকতাম তাহলে আল হুসাইন (রা) যে দাবী করতেন, মেনে নিতাম। এভাবে তাঁর প্রাণ হরণ করতাম না। তাতে আমার নিজের ও আমার সন্তানদের জীবন চলে গেলেও পরোয়া করতাম না। যাই হোক, আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই হয়েছে। আগামীতে যখনই তোমাদের কোন কিছুর প্রয়োজন হবে সংগে সংগে আমাকে লিখে জানাবে। "
মদীনায় অবস্থান এবং নির্জনতা অবলম্বন
আপনজনদের শাহাদাত বরণ, বাড়ী-ঘরের বিধ্বস্ত অবস্থা এবং নিজের অসহায়ত্ব যাইনুল 'আবিদীনের অন্তরকে এমন চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় যে, মদীনায় ফেরার পর তিনি একেবারেই নির্জনতা অবলম্বন করেন এবং পরবর্তী কোন ধরনের আন্দোলনে অংশ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। যে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলামূলক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। ইয়াযীদও সব সময় তাঁর প্রয়োজন ও সুখ-সুবিধার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন।
'আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের (রা) বিদ্রোহ এবং যাইনুল 'আবিদীনের সম্পর্কহীনতা
হযরত ইমাম আল হুসাইনের (রা) শাহাদাত বরণের পর হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) ইয়াযীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। হিজাযের অধিবাসীরা তাঁর আনুগত্যের বাই'আত করে। মক্কা ও মদীনাবাসীরা এই দুই স্থান থেকে উমাইয়াদের নিয়োগকৃত কর্মকর্তাদের তাড়িয়ে দেয়। ইয়াযীদ হারামাইনের অধিবাসীদেরকে সতর্ককরণের জন্য মুসলিম ইবন 'উকবার নেতৃত্বে একদল দুঃসাহসী সৈন্য পাঠান। যাইনুল 'আবিদীনকে (রহ) কোন রকম বিরক্ত না করার জন্য বাহিনীর অধিনায়ককে তিনি সতর্ক করে দেন। মদীনাবাসীরা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। মদীনায় অসংখ্য মানুষ মারা যায়, ইয়াযীদের বাহিনী কয়েকদিন ধরে মদীনায় লুটতরাজ চালায়। এই যুদ্ধে যাইনুল 'আবিদীন (রহ) ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা কোন রকম অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। তাঁরা মদীনা ছেড়ে 'আকীকে চলে যান।
মদীনাতুর রাসূলকে বিরাণভূমিতে পরিণত করার পর মুসলিম ইবন 'উকবা 'আকীকে যাইনুল 'আবিদীনের উপস্থিতির খবর পেয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য লোক পাঠান। তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর ভাইপো আবদুল্লাহ ইবন জাফর। যাইনুল 'আবিদীন অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে মুসলিমের সাথে মিলিত হন। তিনি তাঁকে নিজের পাশে বসিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করেন এবং খলীফার দেয়া সম্মানীর কথা উল্লেখ করেন। যাইনুল 'আবিদীন ইয়াযীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মুখতার আছ-ছাকাফীর বিদ্রোহ এবং যাইনুল আবিদীনের সম্পর্কহীনতা
এ সময় উচ্চাভিলাষী ও পাপাচারী মুখতার আছ-ছাকাফী রাষ্ট্র ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে আহলি বাইতের প্রতি ভালোবাসার নামে হযরত ইমাম হুসাইনের (রা) রক্তের বদলা নেওয়ার দাবীর আশ্রয় নেয়। সে তার উদ্দেশ্যে হাসিলের জন্য যাইনুল আবিদীনের নিকট মোটা অংকের সম্মানী পাঠিয়ে বলে, আপনি আমাদের ইমাম। আমাদের থেকে বাই'আত গ্রহণ করুন। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য যাইনুল আবিদীনের জানা ছিল। এ কারণে তিনি তার এ আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন এবং তিনি মসজিদে নববীতে গিয়ে এই মুখতারের বিকৃতি, পাপাচার ও নাস্তিকতার রাজ-রহস্য ফাঁস করেন দেন। তিনি জনগণকে লক্ষ্য করে বলেন: সে শুধু মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য আহলি বাইতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। আসলে সে আহলি বাইতের একজন দুশমন।
খলীফা আব্দুল মালিকের খিলাফতকালে ইমাম যাইনুল আবিদীন রাজনৈতিক সংঘাত থেকে দূরে থাকেন। মুখতারের ব্যাপারে তাঁর মন্তব্য ছিল অত্যন্ত কঠোর। আলী ইবনুল হুসাইন মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে মুখতারকে অভিশাপ দিতেন। জনৈক ব্যক্তি একদিন তাঁকে মুখতার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: "সে ছিল মিথ্যাবাদী, আল্লাহ ও রাসূলের (সা) প্রতি মিথ্যা আরোপ করতো।”
দুনীয়া বিরাগী এই মহান ইমামের মৃত্যু সন নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আল্লামা যাহাবী হিজরী ৯৪ সনের কথা বলেছেন। আল-ইয়া'কূবী হিজরী ৯৪ মতান্তরে ৯৫ সনের কথা উল্লেখ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল আটান্ন (৫৮) বছর। মদীনায় ইনতিকাল করেন এবং আল-বাকী' গোরস্তানে চাচা হযরত আল হাসানের (রা) পাশে দাফন করা হয়।
জ্ঞান ও ফিকহ্
জ্ঞানের জগতে তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। ইমাম যুহরী (রহ) বলতেন, "মদীনায় আমি তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কাউকে পাইনি।" ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, "প্রতিটি জিনিসে তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে সকলে একমত।"
হাদীছ: বিখ্যাত হাফিজে হাদীছদের মধ্যে যদিও তাঁকে গণ্য করা হয় না তা সত্ত্বেও হাদীছ হিজ তথা স্মৃতিতে ধারণের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। ইবন সা'দ বলেছেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত আমানতদার, বহু হাদীছের ধারণকারী, অত্যুচ্চ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।"
হাদীছের জ্ঞান তিনি অর্জন করেন মহান পিতা হযরত আল হুসাইন (রা), চাচা হযরত আল হাসান (রা), দাদা ইবনুল 'আব্বাস (রা), নানী উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা), উম্মু সালামা (রা), সাফিয়্যা (রা), আবু হুরাইরা (রা), মিসওয়ার ইবন মাখরামা ও সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের (রহ) নিকট থেকে।
হাদীছ শাস্ত্রে বর্ণনার সনদসমূহের মধ্যে একটি সনদকে 'সিলসিলাতুয যাহাব' বা সোনার চেইন বলা হয়। আর সেটা হলো যে সনদের ধারাবাহিকতায় তাঁর মহান দাদা, পিতা ও তিনি আছেন। আবূ বকর ইবন শাইবা বলেন, "যুহরীর ঐ সকল বর্ণনা যা 'আলী ইবনুল হুসাইন (যাইনুল 'আবিদীন), তাঁর মহান পিতা ও দাদার সিলসিলায় বর্ণিত হয়েছে, তাই হলো সর্বাধিক সঠিক ও বিশুদ্ধ সনদ।
ছাত্র-শিষ্য: তাঁর ছাত্র-শিষ্যের পরিধি অনেক ব্যাপক। তাঁর ছেলেদের মধ্যে মুহাম্মাদ, যায়দ, 'আবদুল্লাহ ও 'উমার সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। সাধারণ রাবীদের মধ্যে আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান, তাউস ইবন কায়সান, ইমাম যুহরী, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, হিশাম ইবন 'উরওয়া এবং আরো অনেকে।
ফিক্হ: ফিক্হ শাস্ত্রে তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। ইমাম যুহরী বলতেন, "আমি 'আলী ইবনুল হুসাইনের (রা) চেয়ে বড় কোন ফকীহ্ দেখিনি।” ফিক্হ শাস্ত্রে তাঁর মনীষার বড় সনদ এই যে, মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহর পরেই ছিল তাঁর স্থান।
জ্ঞানগর্ভ কথা
তাঁর বিভিন্ন কথা তাঁর জ্ঞানগর্ভ পূর্ণতার দর্পণ এবং উপদেশ ও নীতিকথার পাঠ হিসাবে গণ্য করা হয়। তিনি বলতেন, "প্রিয়জনদের হারানোই প্রমাণ করে সে একজন মুসাফির। হে আল্লাহ! আপনি আমার বাহ্যিক অবস্থাকে মানুষের দৃষ্টিতে ভালো দেখিয়ে আমার অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে খারাপ করে দেন- এ ব্যাপারে আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। কিছু মানুষ ভয়ে আল্লাহর 'ইবাদাত করে। এ হলো দাসের 'ইবাদাত। আর কিছু মানুষ জান্নাতের লোভে 'ইবাদাত করে। এ হলো ব্যবসায়ীদের 'ইবাদাত। কিছু মানুষ কেবল আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য 'ইবাদাত করে। এটাই হলো মুক্ত-স্বাধীন মানুষের 'ইবাদাত।"
তিনি বলতেন: কিয়ামতের দিন একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে- মর্যাদাবান ব্যক্তিগণ ওঠো! কিছু লোক উঠে দাঁড়াবে, তখন তাদেরকে বলা হবে: তোমরা বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাও। ফেরেশতারা বলবে: তোমাদের এমন সম্মান ও মর্যাদা কিসের জন্য? তারা বলবে : দুনিয়াতে যখন কেউ আমাদের সাথে মূর্খের মতো আচরণ করেছে, আমরা তখন তাদের সাথে বিচক্ষণ ব্যক্তির মতো আচরণ করেছি। যখন আমরা অত্যাচারিত হয়েছি, ধৈর্য ধারণ করেছি। আমাদেরকে কেউ ব্যথা দিলে আমরা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।
চারিত্রিক গুণাবলী
তাঁর চরিত্র ছিল একটি আলোকিত প্রদীপের মতো যা থেকে অন্যরা পথ দেখতো। তিনি ছিলেন হযরত রাসূলে কারীমের (সা) স্বভাব-আখলাকের প্রতিচ্ছবি। বানু হাশিম খান্দানে তাঁর চাইতে উত্তম আর কেউ তাঁর সময়ে ছিলেন না।
আল্লাহ-ভীতি: তাঁর অন্তর সর্বদা আল্লাহ-ভীতিতে পরিপূর্ণ থাকতো। অনেক সময় আল্লাহর ভয়ে অচেতন হয়ে পড়তেন। একবার 'আলী ইবনুল হুসাইন (রা) হজ্জে গেলেন। ইহরাম বেঁধে যখন বাহনের পিঠে উঠে বসলেন তখন আল্লাহর ভয়ে তাঁর সারা দেহ পাণ্ডুবর্ণ হয়ে যায় এবং এমনভাবে কাঁপতে থাকেন যে মুখ থেকে “লাব্বাইক” পর্যন্ত বের হলো না। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, আপনি “লাব্বাইক" উচ্চারণ করছেন না কেন? বললেন: আমার ভয় হচ্ছে এই ভেবে যে, আমি লাব্বাইক বলবো, আর সেদিক থেকে জবাব আসে “লা লাব্বাক”।
'ইবাদাত ও আধ্যাত্মিক সাধনা: তাঁর শিরা-উপশিরায় ঐ সকল মহান ব্যক্তির পবিত্র রক্ত বহমান ছিল, অসীর নীচেও যাঁদের 'ইবাদাত-বন্দেগী ছুটতে পারেনি। এ কারণে তিনিও ছিলেন একজন দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত 'আবিদ ব্যক্তি। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) বলতেন: 'আলী ইবনুল হুসাইনের (রা) চাইতে বেশী আল্লাহ-ভীরু মানুষ আমার দৃষ্টিতে পড়েনি। রাত-দিনের বেশীরভাগ সময় তাঁর কাটতো 'ইবাদাতে। বলা হয়েছে রাত-দিনে এক হাজার রাক'আত নামায আদায় করতেন। আর এ কারণেই তাঁর উপাধি হয়ে যায় 'যাইনুল 'আবিদীন' বা 'আবিদ ব্যক্তিদের সৌন্দর্য।
তার একাগ্রতার অবস্থা এমন ছিল যে, নামায অবস্থায় অন্য কোন কিছুর খবর থাকতো না। একবার যখন সিজদায় ছিলেন তখন পাশেই কোথাও আগুন লাগে। লোকেরা “ইয়া ইবন রাসূলিল্লাহ”- “হে আল্লাহর রাসূলের বংশধর” বলে ডাকতে থাকে, কিন্তু তিনি সিজদা থেকে মাথা তুললেন না। এক পর্যায়ে আগুন নিভে যায়। পরে লোকেরা জিজ্ঞেস করলো: কোন জিনিস আপনাকে আগুনের ব্যাপারে এত উদাসীন করে দিয়েছিল? বললেন: অন্য আগুন। অর্থাৎ জাহান্নামের আগুন।
হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) বলেন: "আমি 'আলী ইবন আল-হুসাইনের (রা) চাইতে ভালো মানুষ আর কখনো দেখিনি। যখনই তাঁকে দেখেছি, আমি নিজেকে তিরস্কার করেছি। আমি তাঁকে কোন দিন কখনো হাসতে দেখিনি।"
আমর বিল মা'রূফ ও নাহি 'আনিল মুনকার
সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধকে এত গুরুত্ব দিতেন যে, এ ব্যাপারে কোন রকম গাফলাতি বা উদাসীনতাকে কিতাবুল্লাহর প্রতি উদাসীনতা বলে গণ্য করতেন।
ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ
দানশীলতা এবং সাগরের মতো উদারতা ছিল তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর রাস্তায় তিনি অকৃপণ হাতে ব্যয় করতেন। মদীনার কত গরীব পরিবার যে তাঁর উদার সাহায্যে জীবন ধারণ করতো তা অজ্ঞাত রয়ে গেছে। কারণ, কেউ কখনো তা জানতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুর পর জানা গেছে, গোপনে তিনি এক শো পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতেন।
খাদ্য-সামগ্রীর বস্তা নিজের পিঠে উঠিয়ে অভাবীদের গৃহে পৌঁছে দিতেন। মৃত্যুর পর যখন গোসল দেওয়া হচ্ছিল তখন তাঁর দেহে নীল রংয়ের বড় দাগ দেখা যায়। কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় যে, তা ছিল আটার বস্তা বহনের দাগ। সেই আটা তিনি রাতের অন্ধকারে অভাবী মানুষের বাড়ীতে পৌছে দিতেন। তিনি বলতেন, দান-খয়রাত প্রার্থীর হাতে পৌঁছার পূর্বে আল্লাহর হাতে পৌঁছে যায়।
দাস-দাসী মুক্ত করা ছিল তাঁর আরেকটি প্রিয় কাজ। বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর জীবনে এক হাজার দাস মুক্ত করেন। সাধারণত: 'ঈদুল ফিতরের রাতেই অধিক হারে দাস-মুক্তির কাজটি করতেন।
ধৈর্য ও সহনশীলতা
ধৈর্য ও সহনশীলতায় পিতা হযরত হুসাইনের (রা) মতই ছিলেন। অনেক সময় অনেক বেয়াদব তাঁকে গালি দিত, তিনি তা হজম করতেন। একবার তিনি মসজিদ থেকে বের হলেন, পথে এক ব্যক্তি তাঁকে গালি দিতে শুরু করলো। তিনি লোকটিকে লক্ষ্য করে বললেন, আমার যে সকল গুণ তোমার অজানা তা তুমি যা বলছো তার চাইতে অনেক ভালো। তোমার কোন প্রয়োজন থাকলে বল আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। এমন জবাব শুনে লোকটি ভীষণ লজ্জিত হয়। তিনি নিজের জামাটি খুলে তাকে দান করেন। সেই সাথে এক হাজার দিরহামও দেন।
ক্ষমা ও উপেক্ষা
তাঁর চরম দুশমন, তাঁর প্রতি হিংসা-বিদ্বেষে যাদের অন্তর পরিপূর্ণ ছিল, সুযোগ পেয়েও তিনি কোন বদলা নেননি। মদীনার ওয়ালী হিশাম ইবন ইসমা'ঈল তাঁকে এবং গোটা আহলি বাইতকে নানাভাবে ভীষণ কষ্ট দিত। পরে যখন হিশাম ক্ষমতাচ্যুত হলো এবং তাকে শাস্তি দেয়ার নির্দেশ হলো, তখন যাইনুল আবিদীন তাঁর সাথীদের হিশামকে কষ্ট দিতে বারণ করেন। এতে হিশাম তাঁর গুণমুগ্ধ হয়ে যান।
মানুষের প্রীতি ও ভক্তি-শ্রদ্ধা
তাঁর এমন ধৈর্য, সহনশীলতা, ক্ষমা, উদারতা ও নম্রতার ফলে মানুষের অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসা স্থায়ী হয়ে যায়। একবার হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক (তখোনো খলীফা হননি) হজ্জে গিয়ে ভীড়ের কারণে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতে পারলেন না। কিন্তু ইমাম যাইনুল 'আবিদীন আসতেই মানুষ পথ ছেড়ে দিল এবং তিনি সহজেই চুমু দিলেন। এ দৃশ্য দেখে এক শামী ব্যক্তি পরিচয় জানতে চাইলে হিশাম ঈর্ষাবশত বলেন: জানি না। তখন কবি ফারাযদাক তাৎক্ষণিকভাবে হযরত যাইনুল 'আবিদীনের প্রশংসায় একটি কাসীদা পাঠ করেন।
সাম্য ও সমতা
বংশীয় আভিজাত্য দূর করা এবং সাম্য ও সমতার বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য তিনি নিজের এক মেয়েকে তাঁর এক দাসের সাথে বিয়ে দেন এবং এক দাসীকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে নিজে তাঁকে বিয়ে করেন।
আহলি বায়তের ভালোবাসার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থার উপদেশ
তিনি ভক্তদের অসংযত প্রেমকে অপসন্দ করতেন। বলতেন: 'তোমরা ইসলাম নির্ধারিত সীমার মধ্যে আমাদেরকে ভালোবাস। আল্লাহর কসম! তোমরা আমাদের সম্পর্কে এত অতিরঞ্জিত কথা বলে থাক যা অনেকের নিকট আমাদেরকে অপ্রিয় করে দিয়েছে।"
তিনজন খলীফায়ে রাশেদা-এর প্রতি সুধারণা
নিজের সত্যপন্থী পূর্বসূরীদের মত আবু বকর, 'উমার ও 'উসমান (রা)- তিন খলীফার প্রতি ইমাম যাইনুল 'আবিদীনও সুধারণা পোষণ করতেন। তাঁদের নিন্দা-মন্দ ও সমালোচনা শোনা মোটেই পসন্দ করতেন না। হযরত 'উসমান (রা) সম্পর্কে তিনি বলতেন, আল্লাহর কসম! তাঁকে অন্যায়ভাবে শহীদ করা হয়েছে।
দৈহিক অবয়ব ও আকৃতি: তিনি সুন্দর অবয়ব ও আকৃতির ছিলেন। দেহ থেকে সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়তো। সুন্দর ও দামী পোশাক পরতেন। সুরুচি ও পরিচ্ছন্নতা ছিল তাঁর স্বভাবগত। এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলো কেন তিনি পায়খানায় যাওয়ার জন্য আলাদা পোশাক বানাতে চেয়েছেন? তিনি বলেছিলেন: কারণ আমি দেখেছি ময়লার ওপর মাছি বসে এবং তা উঁকে এসে মানুষের গায়ে পড়ে।
টিকাঃ
১. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৩
২. ইবন কুতাইবা, আল মা'আরিফ-৫৪
৩. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৩; তাবি'ঈন-২৯৩
৭. তাবাকাত-৫/১৫৭
৮. প্রাগুক্ত
৯. সূরা আয-যুমার-৪২; সূরা আলে 'ইমরান-১৪৫
১০. তাবাকাত-৫/১৫৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৪/৭০-৭১
১১. সূরা আল-হাদীদ-২২
১২. সূরা আশ-শূরা-৩০
১৩. তারীখ আত-তাবারী-৭/৩৭৬
১৪. প্রাগুক্ত
১৫. তাবাকাত-৫/১৫৭
১৬. আত-তাবারী-৭/৩৭৯
১৭. ইবন সা'দের তাবাকাতে নামটি মুসরিফ ইবন ‘উকরা এসেছে।
১৮. মাসউদী, মুরূজ আয-যাহাব-২/৪৭৯-৪৮০
১৯. তাবাকাত-৫/১৫৮
২০. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৫
২১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৫
২২. আল-ইয়া'কূবী, তারীখ-২/৩০৩; ইবন খাল্লিকান, ওয়াফইয়াত
২৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৪৩
২৪. তাবাকাত-৫/১৬৪
২৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/৩০৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫
২৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/৩০৫
২৭. প্রাগুক্ত
২৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৫
২৯. আ'লাম আল-মুওক্কি'ঈন-১/২৬
৩০. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৩
৩১. প্রাগুক্ত
৩২. আল-ইয়া'কূবী, তারীখ-২/৩০৩-৩০৪
৩৩. তাহযীবুল আসমা'-১/৩৪৩
৩৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/৩০৬
৩৫. আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৩; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৫ মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৭
৩৬. তাবাকাত-৫/১৬০
৩৭. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৩৪২
৩৮. প্রাগুক্ত
৩৯. সূরা আল-মু'মিনূন-১০১
৪০. সূরা আল-আম্বিয়া-২৮
৪১. সূরা আল-আ'রাফ-৫৬
৪২. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন: ৩৪৩-৩৪৪
৪৩. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৩
৪৪. তাবাকাত-৫/১৬০
৪৫. আল-ইয়া'কূবী, তারীখ-২/৩০৩
৪৬. প্রাগুক্ত
৪৭. তাবাকাত-৫/১৬০
৪৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/৩৪৩
৪৯. আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৩; মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৪
৫০. তাবাকাত-৫/১৬০-১৬২
৫১. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৩৪৮
৫২. প্রাগুক্ত-৩৪৬
৫৩. প্রাগুক্ত: ৩৪১-৩২
৫৪. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৭
৫৫. তাবাকাত-৫/১৬৩
৫৬. ড: 'উমার ফাররূখ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-১/৬৬২; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন: ৩৪৯-৩৫২
৫৭. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৬
৫৮. প্রাগুক্ত
৫৯. তাবাকাত-৫/১৫৯
৬০. প্রাগুক্ত-৫/১৫৮
৬১. সূরা আল-হাশর-৮
৬২. প্রাগুক্ত-৯
৬৩. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৪; তাবাকাত-৫/১৬০
৬৪. তাবাকাত-৫/১৬০
৬৫. প্রাগুক্ত-৫/১৬২
৬৬. প্রাগুক্ত
📄 ‘আমর ইবন দীনার (রহ)
হযরত 'আমর ইবন দীনারের (রহ) কুনিয়াত বা ডাকনাম ছিল আবূ মুহাম্মাদ। বাযান 'আজমীর আযাদকৃত দাস ছিলেন। হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালে হিজরী ৪৫/৪৬ সনে অথবা তার কাছাকাছি সময়ে মক্কায় জন্ম গ্রহণ করেন।
তাঁর সম্মান ও মর্যাদা
জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি মক্কার শ্রেষ্ঠ 'আলিমদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে হাদীছের হাফিয, ইমাম ও মক্কার হারামের ইমাম অভিধায় ভূষিত করেছেন। তিনি বলেন:
"তিনি তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব ও মক্কার হারামের শায়খ তথা সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি।"
ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মহত্ত্ব, নেতৃত্ব ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সকলে একমত। তিনি ছিলেন তাবি'ঈন শ্রেণীর ইমাম। আল-হাকেম তাঁর "আল-মুযাক্কী আল-আখবার" গ্রন্থে বলেছেন: "তিনি শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের একজন।"
'ইলমে হাদীছে তাঁর স্থান
তিনি হাদীছের একজন বড় হাফিয ছিলেন, ইবন সা'দ বলেন: "'আমর ছিলেন বিশ্বস্ত, সুদৃঢ় ও বহু হাদীছ স্মৃতিতে ধারণ ও বর্ণনাকারী।" সাহাবীদের মধ্যে ইবন 'উমার, ইবন 'আব্বাস, ইবন যুবাইর, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, আবূ হুরাইরা, জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, আবুত তুফায়ল, সায়িব ইবন ইয়াযীদ, আনাস ইবন মালিক (রা) প্রমুখের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন। তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, সা'ঈদ ইবন আয-যুবাইর, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, তাউস, 'আতা, মুহাম্মাদ ইবন 'আলী, মুজাহিদ, আবূ মুলাইকা, সুলাইমান ইবন ইয়াসার, ওয়াহাব ইবন 'উতবা, যুহরী, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) প্রমুখ সহ বিখ্যাত তাবি'ঈদের বড় একটি দলের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন ও বর্ণনা করেন।
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞান ছিল অতি ব্যাপক ও গভীর। সমকালীন আলিমদের সম্মিলিত জ্ঞান তিনি নিজের বুকে ধারণ করেন। বিখ্যাত তাবি'ঈ তাউস (রহ) তাঁর ছেলেকে বলতেন:
"ছেলে, যখন তুমি মক্কায় যাবে, 'আমর ইবন দীনারের সাথে অবশ্যই সাক্ষাৎ করবে। কারণ, তাঁর কান 'আলিমদের বশীভূত।"
তাঁর বর্ণিত হাদীছের স্থান
হাদীছ বিশারদদের নিকট তাঁর বর্ণিত হাদীছের স্থান অনেক ঊর্ধ্বে। ইমাম যুহরী বলতেন, আমি উঁচু মানের হাদীছের ক্ষেত্রে এই শায়খ তথা বিজ্ঞ ব্যক্তির চাইতে আর কাউকে দেখিনি। ইবন 'উয়ায়না ও 'আমর ইবন জারীর তাঁকে- "বিশ্বস্ত, দৃঢ়পদ, সত্যবাদী ও বহু হাদীছের ধারক"- বলতেন।
রিওয়ায়াত বিল মা'না বা হাদীছের ভাব ও অর্থ বর্ণনা
হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তা সত্ত্বেও শ্রুত মূল শব্দসহ হাদীছ বর্ণনা করা জরুরী মনে করতেন না। তিনি নিজের ভাষায় শ্রুত হাদীছের অর্থ ও ভাব বর্ণনা করতেন। হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর অগাধ জ্ঞানের কারণে তিনি এর একজন নির্ভরযোগ্য সূত্রে পরিণত হন।
তাঁর ছাত্র-শিষ্য
তাঁর ব্যাপক জ্ঞান তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডিকে ভীষণ প্রশস্ত করে দেয়। তাঁর সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজন ছাত্র হলেন: ইমাম জা'ফার আস-সাদিক, আবু কাতাদা, মিসওয়ার, ইবন আবী নাজীহ, হাম্মাদ, সুফইয়ান (রহ) ও আরো অনেকে।
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রেও তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত। কুরআন ও সুন্নাহতে গবেষণা করে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও আইন-কানুন বের করার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল যেমন ইজতিহাদের বিশেষ যোগ্যতা, তেমনি ছিল স্বকীয়তাও। ইমাম নাওবী (রহ) লিখেছেন, তিনি মাযহাবপন্থীদের অনুকরণীয় একজন বড় মুজতাহিদ ছিলেন। প্রায় তিরিশ বছর যাবত ফাতওয়া দেন। তৎকালীন অনেক বড় বড় আলিম তাঁকে তাউস, 'আতা ও মুজাহিদের (রহ) মতো শ্রেষ্ঠ 'আলিমদের উপর প্রাধান্য দিতেন।
সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না বলতেন:
"আমাদের দৃষ্টিতে 'আমর ইবন দীনারের চাইতে বড় ফকীহ্, বড় 'আলিম এবং বড় হাফিযে হাদীছ আর কেউ ছিলেন না।"
সতর্কতা
অত্যধিক সতর্কতার কারণে তিনি হাদীছ ও ফিক্হ সংক্রান্ত মাসআলা-মাসায়িল লেখালেখি পসন্দ করতেন না। বলতেন, মানুষ আমাদেরকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে। আমরা তার উত্তর দিলে তারা তা পাথরে খোদাই করার মতো লিখে নেয়। হতে পারে আজ যে সিদ্ধান্ত আমরা দিলাম, আগামীকাল তা প্রত্যাহার করে নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম। তখন পূর্বের ভুল সিদ্ধান্তটি লিখিত থেকে গেল। একবার জনৈক ব্যক্তি তাঁকে বললো, সুফইয়ান আপনার নিকট থেকে যা কিছু শোনে তা লিখে রাখে। একথা শুনে তিনি কাঁদতে থাকেন। তারপর বলেন, যে ব্যক্তি আমার কথা লেখে সে আমার প্রতি বড় যুলুম করে। তিনি বলতেন:
"আমার থেকে কেউ কিছু লিখে রাখুক তা আমি পসন্দ করি না। আমি কারো কাছ থেকে কিছু লিখিনি। আমি মুখস্থ করতাম।"
একবার এক ব্যক্তি কোন একটি জিনিস সম্পর্কে তাঁর নিকট জিজ্ঞেস করে। তিনি কোন জবাব দিলেন না। প্রশ্নকারী বললো, জিনিসটির ব্যাপারে আমার অন্তরে একটু সন্দেহ আছে। এ কারণে আপনার নিকট থেকে একটি জবাব পেতে চাই। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! তোমার অন্তরে আবূ কুবায়স পাহাড় পরিমাণ সন্দেহ থাকার পরিবর্তে আমার অন্তরে একটি পশম পরিমাণ সন্দেহ থাকা আমার কাছে বেশী অপসন্দনীয়।
তাঁর 'ইবাদাত-বন্দেগী
তিনি একজন ভীষণ 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। রাতের বেশীর ভাগ 'ইবাদাত-বন্দেগীতে অতিবাহিত করতেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না (রহ) বলেনঃ
"'আমর ইবন দীনার রাতকে তিন ভাগে ভাগ করে নিতেন। এক ভাগে ঘুমোতেন, এক ভাগে হাদীছ বর্ণনা করতেন এবং আরেক ভাগ নামাযে অতিবাহিত করতেন।"
জামা'আতে নামায আদায়ের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান
তিনি জামা'আতে নামায আদায়ের প্রতি এত গুরুত্ব দিতেন যে, বার্ধক্যে যখন শক্তিহীন হয়ে পড়েন এখনও নিজের বাসস্থান থেকে বেশ দূরে মসজিদেই নামায আদায় করতেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না (রহ) বলেন, তিনি জীবনের কোন পর্যায়ে মসজিদে যাওয়া- আসা বন্ধ করেননি। গাধার পিঠে বসিয়ে তাঁকে মসজিদে আনা হতো।
ইসলামী সেবামূলক কাজের বিনিময়ে কোন কিছু না নেয়া
তিনি সেবামূলক কোন কাজের বিনিময় বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা ভালো মনে করতেন না। এ জাতীয় সকল কাজ তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করতেন। তৎকালীন খলীফা একবার তাঁর ইচ্ছার কথা এভাবে ব্যক্ত করেন যে, আমি আপনার জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দেই, আর আপনি নিশ্চিন্ত মনে ফাতওয়ার দায়িত্বটি পালন করে যান। তিনি এ প্রস্তাবে রাজী হননি।
আল-ওয়াকিদী বলেছেন, 'আমর ইবন দীনার হিজরী ১২৬ সনে আশি বছর বয়সে ইনতিকাল করেন।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৩; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৩০০; আসরুত তাবি'ঈন-৪৪৭
২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৩
৩. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৩০০
৪. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২৭
৫. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৩/৫০০
৬. তাবাকাত-৫/৪৮০
৭. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৩
৮. তাবাকাত-৫/৪৭৯; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/২৯
৯. তাবাকাত-৫/৪৮০
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩০
১১. তাবাকাত-৫/৪৮০
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩০
১৩. তাহযীবুল আসমা'-১/২৭; তাহযীবুত তাহযীব-৮/৩০
১৪. তাহযীবুল আসমা'-১/২৭
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৩; 'আসরুত তাবি'ঈন-৪৪৭
১৬. তাবাকাত-৫/৪৮০
১৭. প্রাগুক্ত
১৮. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৩০১
১৯. প্রাগুক্ত-৫/৩০৭
২০. তাবাকাত-৫/৪৮০
২১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৩০২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৩
২২. তাবাকাত-৫/৪৭৯
২৩. প্রাগুক্ত
২৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৩
📄 রাবী‘আ ইবন ফাররূখ আর-রায় (রহ)
হিজরী ৫১ সনের কথা। মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী তখন ইসলামের সুমহান বিশ্বাস ও বাণী বহন করে দিবিদিক ছড়িয়ে পড়েছে। বিজয়ী সেনাপতি, সিজিস্তান বিজয়ী ও খুরাসানের আমীর মহান সাহাবী আর-রাবী' ইবন যিয়াদ আল-হারিছী (রা) তাঁর বাহিনীসহ রণাঙ্গনে অবস্থান করছেন। সংগে আছেন তাঁর সাহসী দাস ফাররূফ।
সায়হুন নদী পার হওয়ার সময় যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয় তাতে সেনাপতির দাস ফাররূফ দারুণ সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দেন। এতে সেনাপতি রাবী' (রা) ভীষণ খুশী হন এবং তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তির ঘোষণা দেন।
সেনাপতি রাবী' ইবন যিয়াদ (রা)-এর মৃত্যুর পর ফাররূফ মদীনায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বিপুল অর্থ-সম্পদ নিয়ে তিনি মদীনায় ফিরে আসলেন এবং এক সম্ভ্রান্ত ঘরের কন্যাকে বিয়ে করলেন। কিন্তু তাঁর সৈনিক জীবন তাঁকে শান্তি দিল না। তিনি আবার রণাঙ্গনে ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। অবশেষে স্ত্রীকে আল্লাহ ও রাসুলের হিফাযতে এবং তিরিশ হাজার দীনার তার হাতে দিয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। যাওয়ার সময় স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন।
ফাররূখের অনুপস্থিতিতে এক পুত্র সন্তান জন্ম নিল। মা তার নাম রাখলেন 'রাবী'আ'। মা তার ছেলের সুশিক্ষার জন্য স্বামীর রেখে যাওয়া অর্থ থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। শিক্ষকরা তাকে কুরআন, হাদীছ এবং দীনী 'ইলমের বিভিন্ন শাখায় দক্ষ করে তোলেন। রাবী'আ নিজের জন্য জ্ঞানচর্চাকে বেছে নিলেন এবং মদীনার মসজিদে নববীতে তাঁর পঠন-পাঠন চলতে লাগলো।
প্রায় তিরিশ বছর পর ফাররূফ মদীনায় ফিরে আসলেন। নিজের ঘরে প্রবেশ করে তিনি এক যুবকের বাধার মুখে পড়লেন। দু'জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলো এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা ছুটে এলো। পরে ফাররূফের স্ত্রী এসে পরিচয় দিলে পিতা ও পুত্রের মিলন হলো। ফাররূফ তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন তিরিশ হাজার দীনারের কথা। স্ত্রী বললেন তা সঠিক জায়গায় আছে।
পরদিন সকালে ফাররূফ মসজিদে নববীতে গিয়ে দেখলেন এক বিশাল 'ইলমী মজলিস। সেখানে শায়খকে ঘিরে বড় বড় 'আলিমরা বসে আছেন। তিনি শায়খের অগাধ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য দেখে মুগ্ধ হলেন। পাশে বসা একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন এই শায়খই হলেন তাঁর পুত্র রাবী'আতুর রা'য়। ফাররূফ আনন্দাশ্রু বিসর্জন দিলেন। বাড়ীতে ফিরে স্ত্রী তাঁকে বললেন, এই তিরিশ হাজার দীনার এবং আপনার ছেলের জ্ঞান ও মর্যাদার এই উচ্চাসন লাভ-এর কোনটি আপনার বেশি প্রিয়? ফাররূফ বললেন: ছেলের এই অবস্থানই আমার বেশি প্রিয়। তখন স্ত্রী জানালেন যে তিনি সেই অর্থ রাবী'আর শিক্ষার পিছনেই ব্যয় করেছেন।
রাবী'আর পরিচয়
রাবী'আর ডাকনাম আবূ 'উছমান, উপাধি আর-রায়। পিতা আবূ 'আবদির রহমান ফাররূখ। তিনি ছিলেন মদীনার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম তাবি'ঈ। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন একাধারে হাদীছের হাফিজ, ফকীহ, মুজতাহিদ এবং বুদ্ধি ও যুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে গভীর অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী। আর এ কারণে তাঁকে রাবী'আতুর রায় বা যুক্তিবাদী রাবী'আ বলা হয়।"
শিক্ষা
যৌবনের সূচনাতেই সেকালে প্রচলিত সকল শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হন। মাত্র ছাব্বিশ/সাতাশ বছর বয়সে তাঁর খ্যাতি দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
Hাদীছ
হযরত রাবী'আর (রহ) যে খ্যাতি তা প্রধানতঃ তাঁর ফিক্হ্ শাস্ত্রে অতুলনীয় দক্ষতার কারণে। তবে তিনি হাদীছেরও একজন প্রথম শ্রেণীর হাফিজ ছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে হাদীছ ধারণের ব্যাপারে সকল ইমাম একমত। ইবনুল মাজেশূন বলেন: "আমি রাবী'আর চেয়ে সুন্নাহ অধিক স্মৃতিতে ধারণকারী আর কাউকে দেখিনি।" প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ছিলেন রাবী'আর বিশেষ ছাত্র।
সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে হযরত আনাস ইবন মালিক ও সায়িব ইবন ইয়াযীদ (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ প্রমুখ মুহাদ্দিছ থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।
ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে ছিল হযরত রাবী'আর (রহ) বিশেষ ব্যুৎপত্তি। তিনি ছিলেন এ শাস্ত্রের একজন ইমাম ও মুজতাহিদ। অসাধারণ মেধা ও বুদ্ধিমত্তা তাঁর মধ্যে ইজতিহাদের যোগ্যতা সৃষ্টি করে দেয়। এ কারণে তাঁকে যুক্তি ও বুদ্ধিবাদী অভিধায় ভূষিত করা হয়। আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর প্রথম খলীফা আবুল 'আব্বাস আস-সাফফাহ তাঁকে ডেকে নিয়ে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। ইমাম মালিক (রহ) ছিলেন তাঁর বিশেষ ছাত্র।
ফাতওয়া দানে তাঁর সতর্কতা
ইজতিহাদ, যুক্তি ও কিয়াস প্রয়োগে এত ক্ষমতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কোন মাসয়ালায় যুক্তি ও কিয়াস প্রয়োগের ক্ষেত্রে দারুণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি বলতেন: "কোন মাসয়ালায় জ্ঞান ছাড়া জবাব দানের চেয়ে এটাই উত্তম যে তোমরা মূর্খ অবস্থায় মৃত্যু বরণ কর।"
তাঁর সমকালীন মনীষীদের মূল্যায়ন
'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার বলতেন: "রাবী'আ ছিলেন আমাদের সকল জট উন্মোচনকারী, আমাদের 'আলিম এবং আমাদের সবার চেয়ে উত্তম।” ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ বলতেন: "আমি রাবী'আ ইবন 'আবদির রহমানের চাইতে বেশি তীক্ষ্ণধী আর কাউকে দেখিনি।"
তাঁর দারসের মজলিস
তাঁর দারসের মজলিসে মদীনার বড় বড় 'আলিম, সরকারী কর্মকর্তা ও অভিজাত শ্রেণীর লোকেরাও শরীক হতেন। ইমাম মালিক, ইয়াহইয়া আনসারী, ইমাম আওযা'ঈ প্রমুখের মত ব্যক্তিবর্গও সেখান থেকে ফায়দা হাসিল করতেন।
তাঁর ভোগ-বিলাস বিমুখ জীবন ও ইবাদাত-বন্দেগী
এত জ্ঞান ও বুদ্ধির সাথে সাথে তিনি একজন বড় 'আবিদ ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ ব্যক্তি ছিলেন। ধন-সম্পদ ও অর্থ-বিত্তের প্রতি দারুণ নির্মোহ স্বভাবের ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য তিনি চল্লিশ হাজার দীনার ব্যয় করেন।
বাগ্মিতা
রাবী‘আ ছিলেন একজন বাগ্মী ব্যক্তি। চমৎকার প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলতেন। তিনি যখন কথা বলতেন শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনতো। একবার রাবী'আর (রহ) নিকট আল্লাহর 'আরশে সমাসীন হওয়ার বিষয়টির ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। তিনি বলেন: "সমাসীন হওয়ার বিষয়টি অজানা নয়, তবে তার প্রকৃতিটা বোধগম্য নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকেই রিসালাত হয় এবং রাসূলের দায়িত্ব পৌঁছানো, আর আমাদের কর্তব্য বিশ্বাস করা।"
মৃত্যু
তাঁর মৃত্যু সন ও স্থান নিয়ে একটু মত পার্থক্য আছে। হাফিজ আবূ বাকর ইবন ছাবিত বলেন, প্রথম আব্বাসীয় খলীফা আবুল 'আব্বাস আস-সাফফাহ তাঁকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দানের জন্য আল-আনবারে ডেকে পাঠান। ইবন সা'দ বলেন, আল-ওয়াকিদী আমাকে যে তথ্য দিয়েছেন সে মতে তিনি হিজরী ১৩৬ সনে মদীনায় ইনতিকাল করেন।
টিকাঃ
১. সায়হুন একটি বিশাল নদী। সমরকন্দের পরে তুর্কিস্তান সীমান্তে প্রবাহিত।
২. রাসূলুল্লাহর (সা) কবর ও তাঁর মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান। (সুওরুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৪৯)
৩. প্রাগুক্ত-১৩৫-১৫৪; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৪-১৬৫
৪. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৫৯
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
৭. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২১; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
৮. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৪
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
১০. তারীখু বাগদাদ/৮/৪২৪; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৮; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৩৫
১২. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩
১৩. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৮; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
১৪. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩; তাবি'ঈন-১২০
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
১৬. প্রাগুক্ত-১/১৫৮; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
১৭. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৬; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৭
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৯; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৪, টীকা-১
২০. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
২১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৭
২২. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
২৩. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩; তাবি'ঈন-১২২
২৪. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
২৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৮
২৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৯
২৭. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৭
২৮. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৫; ইবন কুতায়বা : আল-মা‘আরিফ-২১৭
২৯. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৭; তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৪
৩০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
৩১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১০২
৩২. প্রাগুক্ত; ওয়াফায়াত আল-আ'য়ান-১/১৮৩
৩৩. সূরা আস-সাজদা-৪; আল-ফুরকান-৫৯
৩৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৮
৩৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২২৪; সাফওয়াতুস সাফওয়া-২/৮৩-৮৬; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৭; আল-মা'আরিফ-২১৭
📄 ইয়াহইয়া ইবন সা‘ঈদ (রহ)
ইয়াহইয়ার (রহ) পিতার নাম সা'ঈদ এবং দাদা কায়স (রা) ইবন 'আমর আল-আনসারী। ডাকনাম আবূ সা'ঈদ। মদীনার বিখ্যাত আনসার গোত্র বানু নাজ্জারের সন্তান। ইবন আল-মাদীনী তাঁর ডাকনাম আবূ নাসর বলেছেন। তাঁর দাদা কায়স (রা) ছিলেন একজন বদরী সাহাবী। ইবন সা'দ বলেন, তাঁর মা ছিলেন 'উম্মু ওয়ালদ'। উল্লেখ্য যে, মনীবের সন্তান জন্মদাত্রী দাসীকে বলে 'উম্মু ওয়ালাদ' বা সন্তানের মা। ইসলামী বিধান মতে এরূপ দাসীকে বিক্রয় বা অন্য কোনভাবে হস্তান্তর করা যায় না।
জ্ঞান ও মনীষা
জ্ঞান ও মনীষায় তিনি ছিলেন সমকালীন বিশিষ্ট তাবি'ঈদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর জ্ঞানের প্রগাঢ়তার ব্যাপারে সকল ইমাম একমত। ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর বিশ্বস্ততা, শ্রেষ্ঠতা এবং ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সকলের ইজমা' বা ঐকমত্য আছে। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) তাঁকে হাদীছের হাফিজ ও শায়খুল ইসলাম বলে উল্লেখ করেছেন।
হাদীছ
ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ (রহ) সেই যুগের একজন মহান ব্যক্তিত্ব যখন সাহাবায়ে কিরামের (রা) পুণ্যময় যুগ শেষ হতে চলেছিল। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে যাঁরা তখনো জীবিত ছিলেন তাঁদের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ গ্রহণে কোন রকম ত্রুটি করেননি। সাহাবা ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈন কিরামের মধ্যে যাঁদের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন ও যাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেন তাঁদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজন হলেন : আনাস ইবন মালিক (রা), সায়িব ইবন ইয়াযীদ (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমির ইবন রাবী'আ, আবু উমামা সাহল ইবন হুনায়ফ, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর আস-সিদ্দীক (রা), আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান, 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র (রা) সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহ) প্রমুখ।
উল্লেখিত মহান ব্যক্তিদের উদারতা ইয়াহইয়াকে হাদীছের একজন শ্রেষ্ঠ হাফিজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ইবন সা'দ বলেন: "তিনি ছিলেন অতি বিশ্বস্ত বহু হাদীছের ধারক-বাহক, হুজ্জাত (দলীল-প্রমাণ) ও দৃঢ়পদ।" 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারাক (রহ) তাঁকে হাদীছের শ্রেষ্ঠ হাফিজদের মধ্যে গণ্য করতেন। মদীনার দু'ব্যক্তি এমন ছিলেন, যাঁদের দ্বারা মাদীনাতুর রাসূল (রাসূলের নগরী)-এর সকল সুন্নাহ্ সংরক্ষিত হয়। তাঁদের একজন আয-যুহরী ও অন্যজন ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ। সে সময় যদি এ দু'মনীষীর জন্ম না হতো তাহলে হয়তো বহু সুন্নাহ হারিয়ে যেত। ইবন 'উয়ায়না (রহ) বলেন: "হিজাযের মুহাদ্দিছ ছিলেন ইবন শিহাব, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ও ইবন জুরায়জ। তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে হাদীছ সংগ্রহ করতেন।" আবদুর রহমান ইবন আবী হাতিম তাঁকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ইমাম আয-যুত্রীর সমকক্ষ মনে করতেন। সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলেন: মদীনাবাসীদের নিকট ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদের স্থান ছিল আয-যুত্রীর উপরে। ইয়াহইয়া আল-কাত্তান বলতেন: "তিনি (ইয়াহইয়া) আয-যুহ্রীর উপর প্রাধান্যপ্রাপ্ত। কারণ, আয-যুহ্রীর ব্যাপারে মানুষের মতপার্থক্য আছে, কিন্তু তাঁর ব্যাপারে নেই।" 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক (রহ) বলেন, সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) বলতেন: "মানুষের মধ্যে হাদীছের হাফিজ চারজন: ইসমা'ঈল ইবন আবী খালিদ, 'আসিম আল-আহওয়াল, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী ও 'আবদুল মালিক ইবন আবী সুলায়মান।" অপর একটি বর্ণনায় তিনজনের কথা এসেছে। তাতে 'আসিম আল-আহওয়ালের নামটি নেই। 'আলী আল-মাদীনী বলেন: উঁচু স্তরের তাবি'ঈদের পরে মদীনায় ইবন শিহাব, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ, আবুয যানাদ ও বুকাইর ইবন 'আবদি'র চেয়ে বেশি জানা ব্যক্তি কেউ নেই। জারীর ইবন 'আবদিল হামীদ বলেন: আমি তাঁর চেয়ে বেশি ধীশক্তি সম্পন্ন মানুষ আর দেখিনি। ইসমা'ঈল ইবন ইসহাক আল-কাজী বলেন, আমি 'আলী ইবন আল-মাদীনীকে একথা বলতে শুনেছি যে, যাঁরা সাহীহ হাদীছের ধারক-বাহক, অতিশয় বিশ্বস্ত এবং যাঁদের বর্ণিত হাদীছ দোষ-ত্রুটিমুক্ত তাঁরা হলেন: বসরার আইউব, কৃষ্ণার মানসূর, মদীনার ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ এবং মক্কার 'আমর ইবন দীনার। ইমাম আল-বুখারী (রহ) 'আলী ইবন আল-মাদীনীর সূত্রে বলেন, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদের বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা প্রায় তিনশো (৩০০)। তবে ইয়াযীদ ইবন হারুন বলেন: "আমি ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদের তিন হাজার হাদীছ মুখস্থ করি। তারপর আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে অর্ধেক ভুলে যাই।" ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) বলতেন: "ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দৃঢ়পদ নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি।"
ছাত্র-শিষ্যবৃন্দ
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের পরিধি অনেক বিস্তৃত। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজন হলেন: হিশাম ইবন 'উরওয়া, হুমায়দ আত-তাবীল, ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন উসামা, ইবন জুরায়জ, আল-আওযা'ঈ, মালিক ইবন আনাস, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, হাম্মাদ, লাইছ, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক, শু'বা, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-কাত্তান, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-উমাবী (রহ) প্রমুখ হাদীছ বিশারদ। সকলে তাঁর বিশ্বস্ততা, মনীষা ও জ্ঞানের জগতে নেতৃত্বের কথা বলেছেন। ইমাম আয-যুহরী, ইবন আবী যি'ব, শু'বা, মালিক ইবন আনাস, হাম্মাদ, সুফইয়ান আছ-ছাওরী, 'আবদুল 'আযীয আল-মাজিশূন, লাইছ ইবন সা'দ, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না প্রমুখের মত সর্বজন স্বীকৃত হাদীছ বিশারদ তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
ফিক্হ্
ফিক্হ্ শাস্ত্রেও তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। হাম্মাদ ইবন যায়দ বলেন, একবার মদীনা থেকে আমাদের নিকট আইউব আস-সাখতিয়ানী আসলেন। আমরা বললাম, মদীনায় আপনি কাকে স্থলাভিষিক্ত করে এসেছেন? বললেন: "ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারীর চেয়ে বড় কোন ফকীহকে আমি মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে আসিনি।" ফিক্হ্ বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞানের বড় সনদ এই যে, তিনি মাদীনাতুর রাসূলের, যা সেই সময়ে ফকীহদের আকর বলে খ্যাত ছিল, কাজী ছিলেন। মারওয়ান ইবন মুহাম্মাদের সময়ে হজ্জ মওসুমে মক্কার মাসজিদুল হারামে ঘোষক চিৎকার করে ঘোষণা করতো: "ইয়াহইয়া সা'ঈদ, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ও মালিক ইবন আনাস- এ তিনজন ছাড়া আর কেউ হাজীদেরকে ফাতওয়া দিতে পারবে না।" হাম্মাদ আল-'আজলী বলেন: "كان يحيى بن سعيد رجلا صالحا فقيها ثقة. ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ, ফকীহ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি।"
কাজীর পদে
প্রথমে তিনি মদীনার কাজী ছিলেন। আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর খলীফা আবূ জা'ফার আল-মানসূর তাঁকে 'কাজী আল-কুজাত' তথা প্রধান কাজীর সুউচ্চ পদে নিয়োগ দান করেন। মতান্তরে তাঁকে হাশিমিয়ার কাজী নিয়োগ করা হয়। একথাও বর্ণিত আছে যে, বাগদাদের কাজীর পদেও তিনি নিয়োগ লাভ করেন।
বিভিন্ন বিষয়ে মুফতী ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও মতপার্থক্যের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার ও সহনশীল। তিনি বলতেন: "أهل العلم أهل توسعة ، وما برح المفتون يختلفون فيحلل هذا ويحرم هذا ، فلا يعيب على هذا ولا هذا على هذا. জ্ঞানী ব্যক্তিরা অত্যন্ত উদার ও প্রশস্ত মনের মানুষ। বিভিন্ন মাসয়ালায় মুফতীদের সব সময় মতপার্থক্য হয়ে থাকে। একজন এটাকে হালাল বললে অন্যজন হারাম বলেন। তবে কেউ কারো প্রতি কখনো দোষারোপ করেন না।" বর্তমানকালে ইসলামী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে সামান্য বিষয় নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে যখন একজন আরেকজনকে হেয় ও তুচ্ছ প্রতিপন্ন করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যান তখন ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদের উপরোক্ত কথাটি সকলের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।
আর্থিক অবস্থা
মদীনায় অবস্থানকালে তাঁর আর্থিক অবস্থা দারুণ অসচ্ছল হয়ে পড়েছিল। ভীষণ টানাটানির মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করছিলেন। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, জীবনের এমন একটি সংকীর্ণ পর্যায়ে খলীফা মানসূর তাঁকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দান করেন। অতঃপর তাঁর অবস্থার সামান্য পরিবর্তন হয়। তিনি ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হন। তবে মুহাম্মাদ ইবন সাল্লাম আল-জুমাহী বলেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদের আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। খলীফা মানসূর তাকে কাজী নিয়োগ করলেন। তারপরেও তাঁর অবস্থার কোন পরিবর্তন হলো না। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন : যার এ 'নাফস' বা আত্মা একটি, অর্থবিত্ত তার অবস্থা পরিবর্তন করতে পারে না।
মালিক ইবন আনাস বলতেন, একমাত্র ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ছাড়া আমাদের এখান থেকে যিনিই ইরাক গেছেন তাঁর অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। কেবল তিনি যে অবস্থায় গেছেন সেই অবস্থায় ফিরে এসেছেন।
তিনি অত্যন্ত আল্লাহ নির্ভর মানুষ ছিলেন। পার্থিব কোন প্রয়োজনে মানুষের নিকট চাওয়ার মানসিকতা তাঁর মোটেই ছিল না। তিনি নিজের জীবনের একটি ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, একবার আমি আফ্রিকা থাকাকালে পার্থিব কিছু প্রয়োজন অনুভব করলাম এবং তা পূরণের জন্য কায়মনোবাক্যে আল্লাহর নিকট দু'আ করলাম। তারপর আমি আমার এ কাজের জন্য লজ্জিত হলাম। মনে মনে বললাম : আমার এ দু'আ যদি আখিরাতের কোন প্রয়োজনের জন্য হতো তাহলে কতনা সুন্দর হতো! বিষয়টি আমি আমার এক বন্ধুকে বললাম। তিনি বললেন : তোমার এ কাজকে খারাপ মনে করার কোন কারণ নেই। কারণ, দু'আর অসীলায় আল্লাহ তাঁর কোন বান্দার প্রয়োজন পূরণ করে দিতে পারেন। আর এ দু'আর অনুমতি তাঁকে দান করা হয়েছে।
জারীর ইবন 'আবদিল হামীদ বলেন: একবার আমি ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদকে জিজ্ঞেস করলাম: আপনি যে সকল সাহাবী ও তাবি'ঈর সাক্ষাৎ পেয়েছেন, আবূ বাকর, 'উমার, 'উছমান ও 'আলী (রা) সম্পর্কে তাঁদের মতামত কী ছিল? বললেন: আবূ বাকর ও 'উমারের (রা) মর্যাদার ব্যাপারে তাঁদের কোন মতপার্থক্য ছিল না। তাঁদের মতের ভিন্নতা ছিল 'উছমান ও 'আলীর (রা) ব্যাপারে।
সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ১৪৩ সনে তিনি হাশিমিয়ায় ইনতিকাল করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল সত্তরের ঊর্ধ্বে।
টিকাঃ
১. আল-বুখারী, আত-তারীখ আল-কাবীর-৮/২৯৮
২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৭; তাহযীব আল-কামাল-১১/১৯৪
৩. আত-তারীখ আল-কাবীর-৮/২৯৮
৪. তাহযীব আল-কামাল-২০/১০৬
৫. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/১৫৪
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৩৬
৭. তাহযীব আল-কামাল-১১/১৯৪; ২০/১০৩; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৬৮
৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/১৭; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩৭
৯. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭৪
১০. আত-তারীখ আল-কাবীর-৮/২৯৮; তাহযীব আল-আসমা'-২/১৭
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩৭
১২. তাহযীব আল-কামাল-২০/১০৭
১৩. প্রাগুক্ত-২০/১০৯; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৭
১৪. তাহযীব আল-কামাণ।-২০/১০৮; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭২
১৫. প্রাগুক্ত
১৬. তাহযীব আল-আসমা'-২/১৭
১৭. তাহযীব আল-কামাল-২/১০৮
১৮. প্রাগুক্ত-২০/১০৬
১৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৭; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭৪
২০. তাহযীব আল-আসমা'-২/১৭
২১. তাহযীব আল-কামাল-২০/১০০-১০৬
২২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৬৯
২৩. তাহযীব আল-কামাল-২০/১০৭; তাহযীব আল-আসমা'-২/১৭
২৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৭
২৫. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭৪
২৬. প্রাগুক্ত
২৭. আত-তারীখ আল-কাবীর-৮/২৯৮
২৮. তাহযীব আল-কামাল-২০/১০২; তাহযীব আল-আসমা'-১/১৫৩
২৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৯
৩০. প্রাগুক্ত-১/১৩৮
৩১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭৫
৩২. তাহযীব আল-কামাল-২০/১১০
৩৩. প্রাগুক্ত-২০/১০৭
৩৪. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/৪৭৫; আত-তারীখ আল-কাবীর-৮/২৯৮; তাহযীব আল-কামাল-২০/১০০