📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা (রহ)

📄 মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা (রহ)


মুহাম্মাদ (রহ)-এর ডাকনাম আবুল কাসিম। পিতা হযরত 'আলী ইবন আবী তালিব (রা)। হযরত হাসান ও হুসাইন (রা)-এর বৈমাত্রেয় ভাই। হযরত 'আলী (রা) নবী-দুহিতা হযরত ফাতিমার (রা) ইনতিকালের পর কয়েকটি বিয়ে করেন। সেই বেগমদের একজন ছিলেন খাওলা। রাসূলে কারীমের (সা) জীবনের শেষ দিকে একদিন 'আলী (রা) তাঁর সাথে বসে আছেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন:

ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার ওফাতের পর যদি আমার কোন পুত্র সন্তান হয় তাহলে আমি কি আপনার নামে তার নাম এবং আপনার উপনামে তার উপনাম রাখতে পারবো? রাসূল (সা) বললেন: হাঁ, পারবে।

সময় গড়িয়ে চললো। একদিন রাসূল (সা) দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন এবং তার মাত্র ছয় মাস পর হাসান-হুসাইনের (রা) মা নবী-দুহিতা ফাতিমা (রা) পিতাকে অনুসরণ করে দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। অতঃপর 'আলী (রা) তাঁর জীবনের এক পর্যায়ে আরবের বানূ হানীফা গোত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি এ গোত্রের জা'ফার ইবন কায়স আল-হানাফিয়‍্যার কন্যা খাওলাকে বিয়ে করেন। এই খাওলার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে এক পুত্র সন্তান। রাসূলুল্লাহর (সা) পূর্ব অনুমতির ভিত্তিতে পিতা 'আলী (রা) সন্তানের নাম মুহাম্মাদ ও ডাকনাম আবুল কাসিম রাখেন। তবে মানুষ ফাতিমাতুয যাত্রার দুই ছেলে হাসান ও হুসাইন (রা) থেকে তাঁকে পার্থক্য করার জন্য ডাকতে থাকে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা অর্থাৎ হানীফা বংশীয় মহিলার গর্ভজাত সন্তান মুহাম্মাদ। অতঃপর ইতিহাসে তিনি এ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

নাম ও কুনিয়াত নিয়ে ঝগড়া
একবার 'আলী ও তালহার (রা) মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে তালহা 'আলীকে লক্ষ্য করে বলেন: না, আপনি রাসূলুল্লাহর (সা) উপর দুঃসাহস দেখিয়েছেন। নিজের ছেলের নাম ও উপনাম রাসূলুল্লাহর (সা) নামে রেখেছেন। অথচ রাসূল (সা) তাঁর পরে উম্মাতের কেউ যেন এমনটি (এক সাথে নাম ও উপনাম) না করে সে ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে বলে গেছেন। জবাবে 'আলী বলেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করাই হলো দুঃসাহস অথচ আমি তো তেমন কিছু করিনি। তারপর তিনি কুরাইশ গোত্রের কয়েক ব্যক্তিকে ডেকে বলেন: তোমরা কোন কথার সাক্ষ্য দিবে? তাঁরা বললেন: আমরা সাক্ষ্য দিব যে, তিনি (রাসূল সা.) বলেছেন: আমার পরে অতি শীঘ্র তোমার একটি ছেলের জন্ম হবে এবং তুমি আমার নামে ও উপনামে তার নাম ও উপনাম রাখবে। আমার পরে আমার উম্মাতের আর কারো জন্য এমনটি করা হালাল (সঙ্গত) হবে না।

তবে হযরত খাওলার (রহ) বংশের ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের মতভেদ আছে। অনেকে তাঁকে ইয়ামাম'র যুদ্ধ বন্দীদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন। আবার অনেকে বলেছেন, তিনি সিন্ধু বংশোদ্ভূত। কেউ কেউ তাঁকে বানু হানীফার দাসী বলেছেন। সঠিক এটাই যে, তিনি বানূ হানীফার এক সম্ভ্রান্ত ঘরের কন্যা ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবন হানাফিয়্যার জন্মের সময় সম্পর্কেও কিছুটা মতপার্থক্য আছে। একটি মতে দ্বিতীয় খলীফা হযরত 'উমার ফারুকের (রা) খিলাফতের শেষের দিকে মাত্র দুই বছর বাকী থাকতে তাঁর জন্ম হয়। এই হিসেবে হিজরী ২১ সনের শেষ অথবা ২২ সনের প্রথম দিক হবে। অন্য একটি মতে খলীফা হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফতকালের একেবারে শেষ দিকে তাঁর জন্ম হয়।

মুহাম্মাদ তাঁর মহান পিতার তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। শিক্ষা-দীক্ষা, ইবাদাত-বন্দেগীর নিয়ম-কানুন ও পার্থিব ভোগ-বিলাস বিমুখ জীবন-যাপনের নিয়ম-পদ্ধতি তাঁর কাছ থেকেই লাভ করেন। সেই সাথে পৈত্রিক সূত্রে লাভ করেন শক্তি, সাহস, বীরত্ব এবং অতুলনীয় বাগ্মিতা ও ভাষা দক্ষতা। পিতার প্রত্যক্ষ নজরদারিতে শৈশবেই তিনি একদিকে হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ অশ্বারোহী যোদ্ধা এবং অন্যদিকে রাতের অন্ধকারে যখন পৃথিবীর মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন হয়ে যান দুনিয়া বিরাগী একজন সাধক ও তাপস।

তাঁর শৈশবকালীন জীবনের কথা তেমন কিছু জানা যায় না। উটের যুদ্ধ থেকে তাঁকে দৃশ্যপটে দেখা যায়। এ সময় তাঁর বয়স খুব টেনে-টুনেও পনের/ষোল বছরের বেশি হবে না। পিতার সাথে তিনি যুদ্ধে যান এবং পিতা তাঁর হাতে সামরিক পতাকা তুলে দেন। আদ-দায়নাওয়ারী বলেন : "'আলী (রা) আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। তখন তাঁর ডান ভাগের দায়িত্বে ছিলেন আল-আশতার এবং বাম ভাগের দায়িত্বে ছিলেন 'আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)। আর 'আলীর (রা) বাহিনীর সবচেয়ে বড় ঝাণ্ডাটি ছিল মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার হাতে।” এরপর থেকে তিনি পিতার সাথে সকল অভিযানে অংশ নেন। যুদ্ধের ময়দানে পিতা তাঁর কাঁধে এত কঠিন দায়িত্ব অর্পণ করেন যা তাঁর অন্য দুই সৎ ভাই হাসান-হুসাইনের (রা) উপর করেননি। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তা, শক্তি ও সাহসের সাথে নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হলো : আপনার পিতা আপনাকে যেরূপ কঠিন বিপদ-আপদের মুখে ঠেলে দেন তেমন তো আপনার অন্য দুই ভাই হাসান-হুসাইনকে দেন না- এর কারণ কি? বললেন : আমার অন্য দুই ভাই হলেন আমার পিতার দুই চোখের মত, আর আমি হলাম তাঁর দুই হাতের মত। তিনি তাঁর দুই হাত দ্বারা দুই চোখের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

উটের যুদ্ধ: এ যুদ্ধের প্রাথমিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার পর 'আলী (রা) মুহাম্মাদকে সামনে এগোনোর নির্দেশ দেন। তিনি পতাকা হাতে নিয়ে নির্ভীকচিত্তে নির্দেশ পালন করে সামনে এগিয়ে যান। বসরাবাসীরা তাঁর প্রতি বর্শা ও তরবারি তাক করে ধরে। তখন তিনি একজন তরুণ। সামনে এগোবার সাহস হারিয়ে ফেলেন। 'আলী (রা) তাঁর হাত থেকে পতাকা নিয়ে নিজেই শত্রু বাহিনীকে আক্রমণ করেন। সহযোগী যোদ্ধারাও তাঁকে সহযোগিতা করেন। এরপর উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এরপর 'আলী (রা) আবার মুহাম্মাদের হাতে পতাকা তুলে দেন।

উটের যুদ্ধের এ ঘটনা মুহাম্মাদ আল-হানাফিয়্যা নিজেই বর্ণনা করেছেন এভাবে: যখন আমাদের সৈনিকরা কাতারবন্দী হলো তখন আমার আব্বা পতাকা আমার হাতে তুলে দিলেন। তারপর দু'বাহিনী মুখোমুখী হয়ে পরস্পরের দিকে অগ্রসর হলো। আব্বা যখন আমার মধ্যে কিছুটা ভীতির ভাব লক্ষ্য করলেন তখন তিনি আমার হাত থেকে পতাকা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। আমিও এগিয়ে গিয়ে এক বসরী সৈনিকের উপর আক্রমণ চালাই। সে আহত অবস্থায় চিৎকার করে বলতে থাকে আমি আবু তালিবের ধর্মমতের উপর আছি। আমি তার কথা শুনে পরবর্তী আঘাত থেকে বিরত থাকি। তারা পরাজিত হওয়ার পর আব্বা ঘোষণা দিলেন, কেউ আহতদের হত্যা করবে না এবং রণক্ষেত্র থেকে পলায়নপর কারো পিছু ধাওয়া করবে না। যুদ্ধ শেষে প্রতিপক্ষ যে সকল ঘোড়া ও অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার করেছিল তা আমার আব্বা গনীমাতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) হিসেবে সৈনিকদের মধ্যে যথারীতি বণ্টন করে দেন।

সিফফীন যুদ্ধ: এ যুদ্ধ হয় 'আলী (রা) ও মু'আবিয়ার (রা) মধ্যে। উটের যুদ্ধের পর পরই সিফফীন যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা এ যুদ্ধে তাঁর পিতার সাথে ছিলেন। সিফফীন যুদ্ধের সূচনা পর্ব তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন : আমার আব্বা মু'আবিয়া (রা) ও শামবাসীদের সাথে যুদ্ধের কথা ভাবতেন এবং ঝাণ্ডা তৈরি করে এই বলে কসম খেতেন যে, যুদ্ধের ময়দান ছাড়া এ ঝাণ্ডা খুলবো না। কিন্তু তাঁর সহচরগণ তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করে যুদ্ধের ব্যাপারে টালবাহানা করতেন। তাদের বিরোধিতা দেখে তিনি শেষ পর্যন্ত ঝাণ্ডা খুলে ফেলে কসমের কাফ্ফারা আদায় করতেন। এভাবে তিনি চারবার ঝাণ্ডা বেঁধে আবার তা খুলে কাফ্ফারা আদায় করেন। ব্যাপারটি আমার মনোপুতঃ হলো না। আমি মিসওয়ার ইবন মাখরামাকে বললাম, আপনি আমার আব্বাকে জিজ্ঞেস করছেন না কেন, এ অবস্থায় তিনি কোথায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? আল্লাহর কসম! আমি এই লোকদের দ্বারা উপকার লাভের কোন আশা দেখছি না। মিসওয়ার বললেন, তিনি যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা করেই ছাড়বেন। আমি তাঁর সাথে কথা বলেছি। তিনি যাত্রার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

যুদ্ধ যখন কোনভাবে এড়ানো গেল না এবং 'আলী (রা) সিফ্ফীনের পথে যাত্রা করলেন তখন মুহাম্মাদও তাঁর সঙ্গী হলেন। 'আলী উটের যুদ্ধের মত সিফ্ফীন যুদ্ধের ঝাণ্ডাও তাঁর হাতে তুলে দেন। এ যুদ্ধের ধারাবাহিকতা অনেক দিন যাবত বিদ্যমান ছিল। প্রথম দিকে বেশ কিছু দিন ধরে সম্মিলিতভাবে চূড়ান্ত যুদ্ধের পরিবর্তে উভয় পক্ষের একজন অথবা দু'জন করে ময়দানে এসে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লিপ্ত হতো। একদিন মুহাম্মাদ ইবন আল- হানাফিয়্যা একজনকে সংগে নিয়ে ময়দানে উপস্থিত হন। শামী সৈনিকদের মধ্য থেকে 'উবাইদুল্লাহ ইবন 'উমার মুকাবিলা করার জন্য এগিয়ে আসে এবং হুংকার ছেড়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামার আহ্বান জানায়। দু'জনই ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ে। 'আলী (রা) এ দৃশ্য দেখে সামনে এগিয়ে গিয়ে মুহাম্মাদের পাশে দাঁড়ান। তিনি নিজের ঘোড়ার লাগামটি তার হাতে দিয়ে বলেন: এটি ধর। তারপর তিনি নিজে 'উবাইদুল্লাহর মুকাবিলার জন্য সামনে এগিয়ে যান। 'আলীকে (রা) দেখে 'উবাইদুল্লাহ একথা বলতে বলতে দূরে সরে যায়: "আমি আপনার সঙ্গে নয়, বরং আপনার ছেলের সঙ্গে লড়তে চাই!” 'উবাইদুল্লাহর চলে যাওয়ার পর মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা পিতাকে বলেন, যদি আপনি আমাকে তার সাথে লড়ার সুযোগ দিতেন তাহলে আমার বিশ্বাস আমি তাকে হত্যা করতে পারতাম। 'আলী (রা) বলেন, আমারও তো সেই রকম বিশ্বাসই ছিল। তবে বিপদ থেকে মুক্ত ছিলে না। আমার ভয় হচ্ছিল, তোমার জীবন বিপন্ন হয়ে না পড়ে। এরপর উভয় পক্ষের অশ্বারোহী যোদ্ধাগণ দুপুর পর্যন্ত লড়তে থাকে; কিন্তু কোন পক্ষ অপর পক্ষকে পরাভূত করতে পারলো না।

এক পর্যায়ে 'আলী (রা) একটি শামী দলের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য তাঁকে নির্দেশ দেন। তাঁকে একথাও বলেন যে, তাদের বক্ষে বর্শাঘাত করার পর হাত চালানো থেকে বিরত থাকবে। অর্থাৎ তরবারি দ্বারা তাদেরকে হত্যা করবে না। আমার পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করবে। তিনি পিতার এ আদেশ মেনে চলেন। 'আলী (রা) আরেকটি দলকে তাঁর সাহায্যের জন্য পাঠান। তারা মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার নেতৃত্বে শামী সৈন্যদেরকে আক্রমণ করে তাড়িয়ে দেন।

সিফফীন যুদ্ধের অনেক সঙ্কটময় পর্যায়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা তাঁর অন্য দুই সৎ ভাই হাসান ও হুসাইনের (রা) সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাঁদের মহান পিতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। 'আলীর (রা) প্রতি যখন চারিদিক থেকে বৃষ্টির মত তীর-বর্শা নিক্ষেপ করা হচ্ছিল তখন মুহাম্মাদ তাঁর দুই ভাইয়ের সাথে নিজেদের দেহকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাঁকে অক্ষত রাখেন। যায়দ ইবন ওয়াহাব বলেন: "আমি 'আলীর প্রতি তাকিয়ে দেখছি, তিনি রাবী'আর দিকে যাচ্ছেন, আর তাঁর সাথে চলছেন তিন ছেলে হাসান, হুসাইন ও মুহাম্মাদ, তীর-বর্শা তাঁর দু'কান ও কাঁধের পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, আর তাঁর ছেলেরা নিজেদের দেহ দিয়ে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।"

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন তিনি সিফফীন যুদ্ধে যোগদান করেন তখন সদ্য কৈশর অতিক্রম করে যৌবনে পা রেখেছেন। তাই এ যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁর অন্তরে ভীষণ প্রভাব ফেলে। তিনি পরবর্তীতে সারা জীবন যুদ্ধ ও রক্তপাত এড়িয়ে চলেন। এ সম্পর্কে তাঁর নিজের একটি বর্ণনা নিম্নরূপ:
আমরা সিফ্ফীনে গেলাম এবং মু'আবিয়ার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলাম। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে আমার ধারণা হলো, আমাদের এবং তাদের কেউ আর বেঁচে থাকবে না। বিষয়টি আমি খুব বড় মনে করলাম এবং আমার কাছে খুব দুঃখজনক মনে হলো। এসব যখন আমি ভাবছি, তখন শুনতে পেলাম কেউ যেন আমার পিছন থেকে চিৎকার করে বলছে:
“ওহে মুসলিম জনমণ্ডলী! আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহকে ভয় কর। ওহে জনমণ্ডলী! নারী ও শিশুদের রক্ষা করবে কে? কে রক্ষা করবে দীন-ধর্ম ও ইজ্জত-আবরু? কে লড়বে রোমান ও দায়লাম বাহিনীর বিরুদ্ধে? ওহে মুসলিম জনমণ্ডলী! আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহকে ভয় কর!"
এরপর আমি প্রতিজ্ঞা করি, আজকের দিনের পর আর কোন মুসলিমের বিরুদ্ধে তরবারি উঠাবো না।

মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা সম্পর্কে হযরত 'আলীর (রা) অন্তিম উপদেশ
সিফ্ফীন যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পর হযরত 'আলী (রা) গুপ্ত ঘাতকের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি হাসান, হুসাইন ও মুহাম্মাদকে উপদেশ দান করেন।
আল-মাস'উদী হযরত 'আলীর (রা) সেই অন্তিম উপদেশ বর্ণনা করেছেন এভাবে:
"অতঃপর তিনি হাসান ও হুসাইনকে (রা) ডেকে বলেন: আমি তোমাদের দু'জনকে এক আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। দুনিয়া তোমাদের প্রত্যাশী হলেও তোমরা তার প্রত্যাশী হবে না, দুনিয়ার কোন কিছু না পেলে তার জন্য আফসোস করবে না, সর্বদা সত্য বলবে, ইয়াতীমের প্রতি দয়া করবে, দুর্বলকে সাহায্য করবে, যালিমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, মাযলূমের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করবে না।"

তারপর তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার দিকে তাকিয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন:
"আমি তোমার দুই ভাইকে যে উপদেশ দিয়েছি তা কি শুনেছো?” তিনি হাঁ সূচক জবাব দিলে 'আলী (রা) বলেন:
"আমি তোমাকেও অনুরূপ উপদেশ দিচ্ছি। আরো উপদেশ দিচ্ছি, তোমার দুই ভাইকে সম্মান করবে, তাদের কাজে সমর্থন দেবে এবং তাদের সাথে পরামর্শ ছাড়া কোন কাজ করবে না।"

তিনি আবার হাসান-হুসাইনের (রা) দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন:
" তোমাদের দু'জনকে আমি তার ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছি। সে তোমাদের দু'জনের অসি এবং তোমাদের পিতার সন্তান। তাঁকে ভালোবাসবে এবং তার অধিকারের প্রতি সচেতন থাকবে।”

হযরত হাসান ও হুসাইন (রা) দু'জনই তাঁদের ছোট ভাইয়ের প্রতি পিতার উপদেশের কথা স্মরণ রাখেন এবং কোন অবস্থাতেই তার প্রতি তাঁদের দায়িত্বের কথা বিস্মৃত হননি। হযরত হাসান (রা) মদীনায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা তখন মদীনার বাইরে তাঁর খামারে অবস্থান করছিলেন। তাঁকে ডেকে পাঠানো হলো। তিনি এসে হযরত হাসানের (রা) ডান পাশে বসেন এবং হযরত হুসাইন (রা) বসেন বাম পাশে। হযরত হাসান (রা) চোখ মেলে তাঁদের দিকে তাকান। তারপর সহোদর ভাই হুসাইনকে (রা) লক্ষ্য করে বলেন:
"আমি তোমাকে তোমার ছোট ভাই মুহাম্মাদের সাথে সদাচরণের উপদেশ দিচ্ছি। সে আমাদের দু চোখের মধ্যবর্তী স্থানের ত্বকের মত অতি প্রিয়। অনুরূপভাবে তিনি মুহাম্মাদকে বলেন, "আমি তোমাকেও বলছি, প্রয়োজনের সময় হুসাইনের (রা) পাশে থেকে তাঁকে সাহায্য করবে।"

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, তাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে গভীর মিল-মুহাব্বাত ছিল। একবার কী যেন একটা কারণে মুহাম্মাদ ও হাসানের (রা) মধ্যে একটু ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয় এবং বড় ভাই হাসান একটু বিরক্ত হন। ছোট ভাই একটু ভেবে-চিন্তে ছোট্ট একটা চিঠিতে বড় ভাইকে লিখলেন : আল্লাহ আপনাকে আমার চাইতে বেশি মর্যাদাবান করেছেন। আপনার মা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ ইবন 'আবদিল্লাহর (সা) কন্যা ফাতিমা (রা)। আর আমার মা বানু হানীফার একজন মহিলা। আপনার নানা রাসূলুল্লাহ (সা)। আর আমার নানা জা'ফার ইবন কায়স।

অতএব, আমার এ পত্র আপনার হাতে পৌঁছানোর সাথে সাথে আমার নিকট এসে আমার সাথে একটা মীমাংসা করুন, যাতে সর্বক্ষেত্রে আমার উপর আপনার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। পত্রটি হযরত হাসানের (রা) হাতে পৌছা মাত্র তিনি ছোট্ট ভাই মুহাম্মাদের বাড়ীতে ছুটে যান এবং তার সাথে আপোষ করে নেন।

আমীর মু'আবিয়ার (রা) হাতে বাই'আত
হযরত 'আলীর (রা) শাহাদাতের পর গোটা খিলাফতের কর্তৃত্ব হযরত মু'আবিয়ার (রা) হাতে চলে আসে। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর মান-মর্যাদা ও ঐক্য-সংহতির কথা চিন্তা করে হযরত 'মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকে মেনে নিয়ে তাঁর হাতে বাই'আত করেন। তিনি যে সততা ও আন্তরিকতার সাথে বাই'আত করেছেন হযরত মু'আবিয়া (রা) তা বুঝতে পারেন। তাঁর পক্ষ থেকে যে কোন রকম বিরোধিতা হবে না সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। আর তাই তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে মুহাম্মাদকে তাঁর সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানান। সে আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি বিভিন্ন কারণে একাধিকবার দিমাশকে গিয়ে মু'আবিয়ার (রা) সাথে সাক্ষাৎ করেন।

ইয়াযীদকে খলীফা মেনে নেওয়ার ব্যাপারে হযরত হুসাইন (রা)-কে পরামর্শ
হযরত হাসান (রা)-এর পরে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা হযরত হুসাইনকে (রা) নিজের বড় ভাই বলে মানতেন। একজন বিশ্বস্ত ও নিষ্ঠাবান ভাই হিসেবে তাঁর সকল বিপদ-আপদ ও সমস্যার ক্ষেত্রে সব সময় তাঁর পাশে অবস্থান করেন। হযরত মু'আবিয়ার (রা) ওফাতের পরে ইয়াযীদের নির্দেশে মদীনার গভর্ণর ওয়ালীদ হযরত হুসাইনকে (রা) ইয়াযীদের প্রতি বাই'আতের আহ্বান জানায়। তিনি সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আবর্তে পড়ে যান এবং এক পর্যায়ে মদীনা ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

তখন মুহাম্মাদ ইবন হানাফিয়্যা বিনীতভাবে তাঁকে বলেন: ভাই! আপনি আমার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তিত্ব। এ পৃথিবীতে এমন দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি নেই, আপনার চেয়ে আমি যার হিতাকাঙ্ক্ষী। আমার পরামর্শ হলো যতটুকু সম্ভব এ মুহূর্তে আপনি ইয়াযীদের প্রতি বাই'আত থেকে দূরে থাকুন এবং মদীনা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা ত্যাগ করুন। এখানে অবস্থান করেই বিভিন্ন অঞ্চলে গোপনে দূত পাঠিয়ে মানুষকে আপনার খিলাফতের প্রতি সমর্থনের আহ্বান জানান। যদি তারা আপনার প্রতি বাই'আত করে তাহলে তা হবে আমাদের জন্য বিজয়, আর যদি তারা আপনাকে বাদ দিয়ে অন্য কোন মুসলিমের ব্যাপারে একমত হয়ে যায় তাহলে তাতে আপনার ধর্ম ও বুদ্ধিমত্তায় কোন ঘাটতি হবে না। আপনার সম্মান ও মর্যাদার উপরও তার কোন প্রভাব পড়বে না।

অন্যদিকে যদি আপনি কোন নির্দিষ্ট শহর অথবা নির্দিষ্ট কোন স্থানে যান তাহলে আমার আশংকা হয়, সেখানকার মানুষ দু'দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। একদল আপনার পক্ষ নেবে, কিন্তু অন্য দল হবে আপনার প্রতিপক্ষ। তারপর তাদের মধ্যে হবে ঝগড়া ও মারামারি। মাঝখানে পড়ে আপনি হবেন তাদের তীর-বর্শার লক্ষ্যবস্তু। অবস্থা যদি এমন পর্যায়ে যায় তাহলে সে ক্ষেত্রে বংশ মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গুণ-বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে এই উম্মাতের সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তিটি সবচেয়ে বেশি হেয় ও অপমানিত হবেন এবং তখন তাঁর রক্ত হবে সবচেয়ে সস্তা বস্তু।

মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার এ পরামর্শ শুনে ইমাম হুসাইন (রা) বলেন, তাহলে আমি কোথায় যাব? মুহাম্মাদ বললেন: মক্কায় চলে যান। সেখানে যদি আপনি নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে থাকতে পারেন তাহলে নিশ্চয়ই কোন একটি পথ বেরিয়ে আসবে। আর যদি অবস্থা খারাপ হয় তাহলে মরুভূমি ও পাহাড়ী অঞ্চলে চলে যাবেন। যতদিন খিলাফতের ব্যাপারে চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত না নেবেন ততদিন এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরতে থাকবেন। এই ঘোরাঘুরির মধ্যে আপনি কোন একটি মত ও সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন। কারণ, আপনি যখন কোন অবস্থার মুখোমুখী হন তখন আপনার সিদ্ধান্তই হয় সঠিক এবং কাজেও হয়ে ওঠেন সতর্ক। একথা শুনে হযরত হুসাইন (রা) বলেন, তুমি খুব আবেগধর্মী উপদেশ দিয়েছো। আমি আশা করি তোমার মত সঠিক হবে।

হযরত হুসাইন (রা) একটি সীমা পর্যন্ত তাঁর পরমার্শ মত কাজও করেন। তিনি মদীনা থেকে মক্কা চলে যান। পরে কুফাবাসীদের আমন্ত্রণে সেখান থেকে কুফার দিকে রওয়ানা হন। আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। তাই পথিমধ্যে কারবালায় হৃদয়বিদারক শাহাদাতের ঘটনাটি ঘটে। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা এই ঘটনায় তাঁর সাথে ছিলেন না।

মুখতার ইবন আবী 'উবায়দ আছ-ছাকাফীর বিদ্রোহ এবং মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার সমর্থন
হযরত ইমাম হুসাইনের (রা) শাহাদাতের পর বানু উমাইয়্যাদের বিপরীতে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) খিলাফতের দাবী নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ান। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে অনেকগুলো বছর দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলতে থাকে। এ সময় বানু ছাকীফের মুখতার ইবন 'উবায়দ আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের পক্ষ অবলম্বন করেন। আসলে মুখতার ছিলেন একজন অখ্যাত-অজ্ঞাত ব্যক্তি। কোন এক অপরাধের কারণে এক সময় সে বানু উমাইয়্যাদের হাতে শাস্তিও ভোগ করেছিলেন। পার্থিব সুযোগ-সুবিধা ও কর্তৃত্ব লাভের উদ্দেশ্যেই মূলত তাঁর পক্ষে এসে দাঁড়ান এবং কিছু দিন তাঁর পাশে ছিলেন। কিন্তু যখন বুঝলেন এখানে তাঁর উদ্দেশ্য পূরণ হবার নয় তখন তিনি নিজেই ভাগ্য পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তার মত একজন অতি সাধারণ মানুষের পক্ষে কারো সাহায্য ছাড়া সফল হওয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল, এজন্য সে হযরত হুসাইনের (রা) রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণের দাবীর আশ্রয় নেন। যেহেতু ঘটনাটি ছিল অতি সাম্প্রতিক সময়ের এবং বহু মুসলিম বেদনাহতও ছিলেন। এজন্য বহু সরল মুসলিম তার প্রতারণার জালে আবদ্ধ হন। ইমাম হুসাইনের (রা) রক্তের বদলার শ্লোগানের সাথে সাথে তিনি ইমাম হুসাইনের (রা) স্থলাভিষিক্ত হযরত ইমাম যাইনুল 'আবিদীনের (রহ) নিকট বহু হাদিয়া- তোহফা পাঠিয়ে তাঁর সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করে এই বলে যে, আপনি আমাদের ইমাম। আমাদের থেকে বাই'আত গ্রহণ করে আপনি আমাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করুন। কিন্তু হযরত যাইনুল 'আবিদীন (রহ) তার স্বরূপ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। এ কারণে তিনি তার প্রতারণার ফাঁদে ধরা দেননি। অত্যন্ত অবজ্ঞার সাথে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। শুধু তাই নয় বরং মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে জনগণের সামনে তার মিথ্যা, প্রতারণা ও পাপাচারের বর্ণনা দিয়ে বলেন, এ ব্যক্তি শুধুমাত্র মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য আহলে বায়ত (নবী পরিবার)-কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। তার কথা ও বাস্তবতার কোন মিল নেই।

এটা ছিল সেই সময়ের ঘটনা যখন বাই'আতের বিষয়টি নিয়ে 'আবদুল্লাহ ইবন আয- যুবাইর (রা) ও মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার (রহ) মধ্যে সম্পর্কের দারুণ অবনতি ঘটেছিল। মুখতার এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন। তিনি ইমাম যাইনুল 'আবিদীনের নিকট থেকে হতাশ হয়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার নিকট যান। একথা ইমাম যাইনুল 'আবিদীন জানতে পেরে তাঁকে এই বলে সতর্ক করেন যে, আহলি বায়তের প্রতি মুখতারের ভালোবাসার দাবী শুধুমাত্র মানুষকে তার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য। আসলে তার মুখের কথা, বাস্তবে তা ঠিক নয়। বরং সে আহলি বায়তের একজন দুশমন। আমার মত আপনারও উচিত হবে তার গোপন উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেওয়া। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা বিষয়টি নিয়ে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) সাথে আলোচনা করেন। তিনি সে সময় 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের (রা) দিক থেকে ভীষণ চাপ ও ভয়-ভীতির মধ্যে ছিলেন। এজন্য তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যাকে বলেন, এ ব্যাপারে তুমি যাইনুল 'আবিদীনের পরামর্শে কান দেবে না।

মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যাও মুখতারকে একজন ভালো মানুষ মনে করতেন না এবং মুখতারের উপর তাঁর মোটেও আস্থা ছিল না। কিন্তু যেহেতু 'আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) মুহাম্মাদকে বাই'আতের জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করছিলেন, এ কারণে তিনি বাধ্য হয়ে তাঁর হাত থেকে বাঁচার জন্য মুখতারকে সমর্থন ও সাহায্য-সহযোগিতা এবং তার অভিভাবকত্ব গ্রহণের জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হন।

আহলি বায়তের (নবী বংশ) সমর্থকদের মূল কেন্দ্র ছিল ইরাক। এ কারণে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যাকে অভিভাবক হিসেবে পাওয়ার পর মুখতার তাঁর অনুমতি নিয়ে ইরাক যাত্রা করে। যেহেতু তার উপর মুহাম্মাদের মোটেও আস্থা ছিল না এবং তাকে একজন ভালো মানুষ বলেও মনে করতেন না, এ কারণে তিনি নিজের একান্ত বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি 'আবদুল্লাহ ইবন কামিল আল-হামাদানীকে তার সঙ্গে যাওয়ার নির্দেশ দেন। যাত্রার আগে তিনি গোপনে তাকে বলে দেন, মুখতার তেমন আস্থাভাজন ব্যক্তি নয়। এ কারণে তার সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। ইবন যুবাইর (রা) এ সকল কর্মকাণ্ডের কথা অবহিত ছিলেন না। তিনি তখনও মুখতারকে নিজের একজন হিতাকাঙ্ক্ষী মনে করছিলেন।

এই সুযোগ গ্রহণ করে মুখতার তাঁর নিকট গিয়ে বললেন, মক্কায় আমার অবস্থান করার চেয়ে ইরাকে থাকা আপনার জন্য বেশি কল্যাণকর হবে। এ কারণে আমি সেখানে যাচ্ছি। ইবন যুবাইর (রা) সন্তুষ্টচিত্তে তাঁকে অনুমতি দিলেন। মুখতার 'আবদুল্লাহ ইবন কামিলকে সঙ্গে নিয়ে ইরাক যাত্রা করলেন। 'উয়াইব নামক স্থানে এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ হয়। মুখতার তাকে জিজ্ঞেস করেন, ইরাকে মানুষের মনোভাব কি? সে বলে, তাদের অবস্থা কাণ্ডারীবিহীন জাহাজের মত দোদুল্যমান। মুখতার বললো, আমি হবো তাদের কাণ্ডারী, তাদেরকে সঠিকভাবে চালাবো।

আহলি বায়ত তথা নবী বংশ-প্রেমিক লোকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল কুফায়। এ কারণে মুখতার সোজা কৃফায় যান এবং নিজেকে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার প্রতিনিধি ও মুখপাত্র হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাঁর তাকওয়া-পরহেযগারীর প্রচার এবং সেই সাথে ইবন যুবাইরের (রা) নিন্দা ও সমালোচনা করতে আরম্ভ করেন। তিনি বলতে থাকেন, ইবন খুবাইর (রা) ছিলেন প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার একজন কর্মী। প্রথম দিকে তিনি তাঁর জন্য কাজ করেন, কিন্তু পরে নিজেই ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব হাতিয়ে নেন। এজন্য মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে পাঠিয়েছেন। তাঁর নিজ হাতে ও কলমে লেখা প্রত্যয়ন পত্রও আমার সঙ্গে আছে। যাদের উপর তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস হতো তিনি তাদেরকে প্রত্যয়ন পত্রটি পাঠ করে শুনিয়ে দিতেন। মোটকথা, তাঁর এই চালাকির কারণে বহু নবী বংশ-প্রেমিক মানুষ তাঁর প্রতারণার জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। অচিরেই বিরাট একটি দল গোপনে তাঁর হাতে বাই'আত করে। তবে কিছু লোকের সন্দেহ হয়। তারা মক্কায় মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার নিকট যায় এবং তাঁর নিকট মুখতারের কথা কতটুকু সত্য তা জানতে চায়। তিনি মুখতারের দাবী সরাসরি স্বীকার বা অস্বীকার করতে পারছিলেন না। স্বীকার এজন্য করতে পারেননি যে, মুখতারের কথায় অনেক অতিরঞ্জন তথা মিথ্যাও ছিল। অন্যদিকে অস্বীকার করতে পারেননি এজন্য যে, তিনি তো মুখতারের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তবে তার সততা ও সত্যবাদিতায় তাঁর মোটেও আস্থা ছিল না। এ কারণে তিনি তাদেরকে এভাবে জবাব দেন:
"আপনারা তো দেখছেন আমরা আহলি বায়ত ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ মানুষ হিসেবে বসে আছি। আমি অন্যায়ভাবে কোন মুসলিমের রক্ত ঝরিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী হতে চাই না। তবে আমরা এ পসন্দ করি যে, আল্লাহ তাঁর যে বান্দা দ্বারা আমাদের সাহায্য করতে চান, করুন। অবশ্য তোমরা মিথ্যাবাদীদের থেকে সতর্ক থাকবে, তাদের প্রতারণা থেকে নিজেদের জীবন ও ধর্ম রক্ষা করবে।” একথা শুনে সেই লোকগুলো ইরাকে ফিরে যায়। কুফায় তখন ইবরাহীম ইবন আশতার নাখা'ঈ ছিলেন একজন প্রভাবশালী আহলি বায়ত প্রেমিক ব্যক্তি। মুখতার তাঁকে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার একটি জাল চিঠি দেখিয়ে নিজের দলে ভিড়িয়ে নেন। মুখতার সেই কাজটি সম্পন্ন করেন এভাবে তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার নামে ও ভাষায় ইবরাহীম আল-আশতারকে একটি চিঠি লেখেন। তারপর সেই চিঠিটি নিয়ে কূফায় ইবরাহীমের সাথে পূর্ব অনুমতি নিয়ে সাক্ষাৎ করেন। সংগে তাঁর অনুসারীদের আরো অনেকে ছিল। তারা ইবরাহীমের নিকট মুখতারের পরিচয় দিতে গিলে বলে; তিনি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবার-পরিজনের বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি। মুখতার ছিলেন একজন তুখোড় বক্তা। তিনি উপস্থিত লোকদের লক্ষ্য করে বলেন:
"আপনারা আহলি বায়তের লোক। মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজনের সাহায্যের দ্বারা আল্লাহ আপনাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আপনারা জানেন, তাদের প্রতি কেমন আচরণ করা হয়েছে। তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাদের যে অবস্থা হয়েছে তা আপনি দেখছেন। মাহদী আপনাকে একটি চিঠি লিখেছেন এবং এরা হলো তার সাক্ষী।" অতঃপর সেখানে উপস্থিত ইয়াযীদ ইবন আনাস আল-আসাদী, আল-আহমার ইবন শুমাইত আল-বাজালী, 'আবদুল্লাহ ইবন কামিল আশ শাকিরী ও আবূ 'উমারা কায়সান সমবেত কণ্ঠে বলেঃ
"আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি এটা তাঁর (মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার) চিঠি। এ চিঠি তাঁর (মুখতারের) হাতে অর্পণ করার সময় আমরা উপস্থিত ছিলাম।" ইবরাহীম চিঠি নিয়ে পাঠ করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এভাবে:
"আমি হবো প্রথম সাড়াদানকারী ব্যক্তি। আমাদেরকে আপনার সাহায্য ও সহযোগিতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"

কুফা দখল ও ইমাম হুসাইনের (রা) হত্যাকারীদের হত্যা
ইবরাহীম নাখা'ঈর সমর্থন ও সহযোগিতায় মুখতারের শক্তি অনেক বৃদ্ধি পায়। তিনি এবার প্রকাশ্যে শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। ইবন যুবাইরের (রা) পুলিশ অফিসার ইয়াস ইবন নাদার কিছুটা বিধি-নিষেধ ও কঠোরতা আরোপ করলে ইবরাহীম ইবন আশতার তাঁকে হত্যা করেন। 'আবদুল্লাহ ইবন মুতী', যিনি ইবন যুবাইরের (রা) পক্ষ থেকে কুফার ওয়ালী ছিলেন, মুখতারের বিদ্রোহমূলক আচরণ দমনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। মুখতার ও ইবরাহীম সম্মিলিতভাবে ইবন মুতী'কে পরাজিত করেন। ইবন মুতী' তাঁদের হাত থেকে নিজের প্রাণ ভিক্ষা নিয়ে কুফা ত্যাগ করেন। অতঃপর সেখানে মুখতারের শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

কুফায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর মুখতারের শক্তি অনেক বৃদ্ধি পায়। এখন তার ক্ষমতার দাপট দেখানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। সুতরাং তিনি হযরত হুসাইনের (রা) হত্যাকারীদের এবং তাদের সহযোগীদেরকে নির্মূল করা আরম্ভ করেন। অল্প দিনের মধ্যেই তাদের হত্যা অভিযান শেষ করেন।
'উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের মাথা কেটে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যা ও ইমাম যাইনুল 'আবিদীনের (রহ) নিকট পাঠান। মুখতারের ধোঁকা ও প্রতারণা সম্পর্কে অবহিত থাকা সত্ত্বেও কাজটি এমন ছিল যে, তাঁরা আবেগাপ্লুত না হয়ে পারেননি। অবলীলাক্রমে তাঁদের অনেকের মুখ থেকে এ কাজের জন্য প্রশংসামূলক বাক্য উচ্চারিত হয়। তবে একথা সত্য যে, মুখতারের এ প্রতিশোধমূলক হত্যাযজ্ঞকে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা মোটেও সমর্থন করেননি। ইবন সা'দ বলেন:
"ইবনুল হানাফিয়্যা মুখতারের কর্মকাণ্ড এবং তাঁর সম্পর্কে যে সকল খবর আসতো তা মোটেও পছন্দ করতেন না।"

যাই হোক, হুসাইন (রা) হত্যাকারীদের নির্মূল করার পর মুখতার মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যাকে এ চিঠিটি পাঠান:
"মুহাম্মাদের (সা) পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের দাবীদার মুখতার ইবন আবী 'উবায়দ। আল্লাহ কোন জাতি বা সম্প্রদায় থেকে বদলা নেন না যতক্ষণ না তাদের কৈফিয়াত শেষ হয়ে যায়। আল্লাহ সকল পাপাচারী, পাপাচারীদের অনুসারীদের ধ্বংস করেছেন, আর যা অবশিষ্ট আছে আশা করি আল্লাহ তাদের সর্বশেষ ব্যক্তিকে সর্বপ্রথম ব্যক্তির সাথে মিলিত করবেন।"

ইবন আল-হানাফিয়‍্যাকে আটক ও মুক্তি
'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) প্রথম দিকে নিজের বাই'আতের জন্য ইবন আল-হানাফিয়্যার উপর তেমন চাপ প্রয়োগ করেননি। কিন্তু যখন কূফাসহ অন্য কিছু স্থানে মুখতারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাঁর শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে ইরাকে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার বাই'আত গ্রহণকারীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন ইবন আয-যুবাইর (রা) তাঁর দিক থেকে হুমকি অনুভব করতে থাকেন। আর তখন থেকেই তিনি ইবন আল-হানাফিয়্যা ও 'আবদুল্লাহ ইবন আল-'আব্বাসের (রা) উপর নিজের বাই'আতের জন্য প্রবল চাপ প্রয়োগ করতে আরম্ভ করেন। কিন্তু তাঁরা বাই'আত করতে রাজী হননি। অবশেষে তাঁদেরকে তাদের পরিবার-পরিজনসহ একটি উপত্যকায় নজরবন্দী করা হয়। একটি বর্ণনা মতে ইবন আল-হানাফিয়‍্যাকে যমযম কূপের নিকটে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী করে তার পাশে জ্বালানী কাঠের স্তূপ করা হয়। তারপর ইবন সা'দের বর্ণনা মতে ইবন আয-যুবাইর (রা) তাদেরকে ধমক দেন এ ভাষায়:
"আল্লাহর কসম! তোমরা অবশ্যই বাই'আত করবে অথবা আমি অবশ্যই তোমাদের পুড়িয়ে মারব। ফলে তাঁরা প্রাণের আশংকা করেন।"

হুমকি দেওয়া হয় যে, যদি তিনি বাই'আত না করেন তাহলে তাতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হবে। এমন এক নাজুক অবস্থায় তিনি সুলাইম আবু 'আমির মারফত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট তাঁর করণীয় কী সে সম্পর্কে জানতে চান। তিনি বলে পাঠান যে, কক্ষনো আনুগত্য স্বীকার করবে না, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। কিন্তু মক্কায় অবস্থান করে বাই'আতের অস্বীকৃতির উপর অটল থাকা অসম্ভব ছিল। এ কারণে তিনি মক্কা ছেড়ে কুফা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। মুখতার এ সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে মোটেই খুশী হতে পারলেন না। কারণ, ইবন আল-হানাফিয়্যা ইরাক পৌছালে তাঁর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। মূলতঃ মুখতার তো ইবন আল-হানাফিয়্যার নামটিই কেবল ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তাই তিনি তাঁর কুফা আগমন ঠেকানোর জন্য কুফাবাসীদেরকে বলতে শুরু করেন যে, 'মেহেদীর আলামত হলো, যখন তিনি তোমাদের এখানে আসবেন তখন এক ব্যক্তি তাঁকে বাজারের মধ্যে তরবারি দিয়ে আঘাত করবে, কিন্তু তাতে মেহেদী মোটেই আহত বা ব্যথা পাবেন না। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা নিজের সম্পর্কে প্রচারিত এই অলৌকিক ক্ষমতার কথা জানতে পেরে কুফা যাওয়ার সিদ্ধান্ত ত্যাগ করেন। তিনি আবূ তুফাইল 'আমির ইবন ওয়াছিলার মাধ্যমে স্বীয় ইরাকী অনুসারীদের নিকট নিজের অসহায় অবস্থার কথা জানিয়ে দেন। 'আমির ইরাক পৌঁছে তথাকার অধিবাসীদের নিকট ইবন আল-হানাফিয়্যার বিস্তারিত অবস্থা তুলে ধরেন। অতঃপর মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যাকে মুক্ত করার জন্য মুখতার 'আবূ 'আবদিল্লাহ আল-জাদালীর নেতৃত্বে চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী পাঠান। যাত্রাকালে তিনি আবূ 'আবদিল্লাহকে বলেন, যদি বানু হাশিম জীবিত থাকে তাহলে তাদেরকে সব ধরনের সহযোগিতা এবং তাদের আদেশ-নিষেধ মান্য করবে। আর যদি তাদেরকে হত্যা করা হয়ে থাকে তাহলে যেভাবে সম্ভব আলে যুবাইর তথা যুবাইর বংশের লোকদেরকে খতম করে ফেলবে।

'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের (রা) মধ্যে মুখতারের এই চৌকষ বাহিনীর প্রতিরোধ করার শক্তি ছিল না। এ কারণে একটি বর্ণনা মতে, তিনি মুখতারের বাহিনী মক্কা পৌঁছার পূর্বে দারুন নাদওয়া-তে গিয়ে অবস্থান নেন। তবে অপর একটি বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি কা'বার গিলাফের তলে আশ্রয় নেন। এদিকে ইরাকী বাহিনী মক্কা পৌঁছে জ্বালানী কাঠের স্তূপের মধ্য থেকে ইবন আল-হানাফিয়্যা ও ইবন 'আব্বাসকে উদ্ধার করে। এর মধ্যে ইবন আয-যুবাইরের লোকজন মক্কায় এসে যায়। তবে কোন সংঘাত-সংঘর্ষ হয়নি।

ইরাকীদের পক্ষ থেকে আবূ 'আবদিল্লাহ আল-জাদালী ইবনুল হানাফিয়্যা ও ইবন 'আব্বাসকে (রা) বলেন, আপনারা অনুমতি দিলে আমরা ইবন আয-যুবাইরকে হত্যা করে মানুষকে এই আপদ থেকে মুক্তি দিতে পারি। কিন্তু ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, না, তাঁকে হত্যা করা যাবে না। কারণ আল্লাহ এই শহরে প্রাণী হত্যা হারাম ঘোষণা করেছেন। কেবল নবী কারীমের (সা) সম্মানে কয়েক ঘণ্টার জন্য এ নিষেধাজ্ঞা রহিত করা হয়। অন্যথায় না তাঁর পূর্বে অন্য কারো জন্য, আর না তাঁর পরে কখনো রহিত হয়েছে। যতটুকু হয়েছে, তাই যথেষ্ট। তোমরা আমাদেরকে মুক্ত করে নিয়ে যাও। অতঃপর ইরাকী সৈনিকরা তাঁদেরকে মুক্ত করে মিনায় নিয়ে যায়। কয়েক দিন তাঁরা সেখানে অবস্থান করে ইবন আয-যুবাইরের হাত থেকে বাঁচার জন্য তায়িফ চলে যান। সেখানে হজ পর্যন্ত অবস্থান করেন।

হিজরী ৬৮ সনে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) তায়িফে ইনতিকাল করেন। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা তাঁর জানাযার নামায পড়ান।

আমীরুল হজ্জ
তখন সময়টি ছিল আন্তঃকলহ ও গৃহ বিবাদের। কমপক্ষে চার ব্যক্তি খিলাফাতের দাবীদার ছিলেন। সুতরাং সেই বছর চারজন আমীরের নেতৃত্বে হজ্জ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা তায়িফবাসীদের সংগে, 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) তাঁর অনুসারীদের সংগে, নাজদা ইবন 'আমির হারূরী খারিজীদের সংগে এবং বানূ উমাইয়‍্যারা শামবাসীদের সংগে হজ্জ আদায়ের জন্য মক্কায় আসে। চারটি চরম প্রতিদ্বন্দ্বী দলের একত্র সমাবেশ মোটেই বিপদমুক্ত ছিল না। মক্কার পবিত্র হারামে যে কোন সময় সংঘাত-সংঘর্ষের প্রবল সম্ভাবনা ছিল। বিষয়টি উপলব্ধি করে মুহাম্মাদ ইবন যুবাইর ইবন মুত'ইম (আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের ভাই নন, বরং ভিন্ন ব্যক্তি) স্বউদ্যোগে চারটি দলের প্রত্যেক নেতার নিকট যান এবং তাঁদেরকে সংযম ও ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেন। প্রথমে তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার নিকট যান এবং তাঁকে বলেন: 'আবুল কাসিম! আল্লাহকে ভয় করুন। আমরা এখন পবিত্র শহরে পবিত্র স্থানে অবস্থান করছি। হাজীগণ কা'বা ঘরে আল্লাহর প্রতিনিধি ও মেহমানস্বরূপ। এজন্য তাঁদের হজ্জ বিনষ্ট করবেন না।' জবাবে ইবন আল-হানাফিয়‍্যা বলেন: আল্লাহর কসম! আমিও এটা চাই না। আমি কোন মুসলিমকে বাইতুল্লাহ-তে আসতে বাধা দিব না এবং আমার দলের কোন হাজীও তা করবে না। তবে আমি আত্মরক্ষার জন্য যা করার তা করবো। আর কেবল তখনই আমি খিলাফাতের দাবী করবো যখন দু'জন মানুষও আমার দাবীর বিরোধিতা করবে না। আমার দিক থেকে নিশ্চিন্তে থাকুন। আমাকে বাদ দিয়ে আপনি বরং 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) ও নাজদা হারূরীর নিকট যান এবং তাঁদের সাথে কথা বলুন। অতঃপর মুহাম্মাদ ইবন যুবাইর যান 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের (রা) নিকট এবং ইবন আল-হানাফিয়্যাকে যে কথা বলেছিলেন তাঁকেও একই কথা বলেন। 'আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) জবাব দেন: 'আমার খিলাফাতের ব্যাপারে মুসলিমদের ইজমা' (ঐকমত্য) হয়ে গেছে। সকলে আমার বাই'আত করেছে। কেবল এই লোকগুলো (বানু হাশিম) আমার বিরোধিতা করছে।' মুহাম্মাদ ইবন যুবাইর বললেন, যা কিছুই হোক, এ সময় আপনার হাত নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিৎ হবে। তিনি বলেন, ঠিক আছে, আমি আপনার কথা মত কাজ করবো। এরপর মুহাম্মাদ ইবন যুবাইর গেলেন নাজদা হারূরীর নিকট। নাজদা বললেন, আমরা সংঘাতের সূচনা করবো না। তবে যারা আমাদের সংগে লড়বে আমরা তার মুকাবিলা করবো। সবশেষে তিনি গেলেন বানু উমাইয়্যাদের নিকট। তারা বললো, আমরা তো আমাদের পতাকার নিকট অবস্থান করছি। কেউ আগ বাড়িয়ে আমাদের সাথে সংঘর্ষে না জড়ালে আমরা আগে কাউকে আক্রমণ করবো না। মুহাম্মাদ ইবন যুবাইর বলেন, এই চারটি দলের পতাকার মধ্যে ইবন আল-হানাফিয়্যার পতাকাটি ছিল সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ও প্রশান্ত। এভাবে মুহাম্মাদ ইবন যুবাইরের চেষ্টায় সে যাত্রায় একটা রক্তক্ষয়ী সংঘাত থেকে মুসলিম উম্মাহ রক্ষা পায়। এ বছর মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা তাঁর চার হাজার সঙ্গী-সাথীসহ হজ্জ আদায় করেন।

মুখতারের সমাপ্তি এবং মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার নিকট 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের (রা) প্রস্তাব
হিজরী ৬৮ সনে 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের (রা) ভাই মুস'আব ইবন আয-যুবাইর (রা) বড় বড় কয়েকটি যুদ্ধের মাধ্যমে মুখতারের হত্যা ও তাঁর শক্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেন। এ সকল যুদ্ধের সাথে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার কোন সম্পর্ক অথবা এর পিছনে কোন প্রকার ভূমিকা ছিল না।

মুখতারের পরিসমাপ্তির পর মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েন। তাঁকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসবে এমন আর কেউ ছিল না। এ কারণে 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) আবার তাঁর নিকট বাই'আতের তাকীদ দিতে আরম্ভ করেন এবং নিজের ভাই 'উরওয়াকে তাঁর নিকট পাঠান। তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল- হানাফিয়‍্যাকে এই বার্তা পৌছে দেন যে, "আমার বাই'আত না করা পর্যন্ত আমি আপনাকে ছাড়ছি না। যদি বাই'আত না করেন তাহলে আবার নজরবন্দী করবো। যে ভয়ংকর মিথ্যাবাদীর সাহায্য ও সহযোগিতার উপর আপনার আশা-ভরসা ছিল আল্লাহ তাঁকে ধ্বংস করেছেন। এখন ইরাকসহ গোটা আরব আমার খিলাফাতের ব্যাপারে একমত হয়েছে। এ কারণে আপনিও আমার বাই'আত করুন। অন্যথায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হোন।"

ইবন আল-হানাফিয়্যা এই হুমকিমূলক বার্তা ধৈর্যসহকারে শোনেন। তারপর বলেন, 'আপনার ভাই 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) সম্পর্ক ছিন্ন এবং সত্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করার ব্যাপারে খুবই তাড়াহুড়োকারী, আর সেই সাথে আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারেও দারুণ উদাসীন। তিনি মনে করেন, দুনিয়াতে চিরকাল থাকবেন, এই কিছুদিন পূর্বেও যখন মুখতার তাঁর সহযোগী ছিল, তিনি আমার চেয়েও মুখতার ও তার কর্মকাণ্ডের বেশি স্বীকৃতি দানকারী ছিলেন। আল্লাহর কসম! আমি মুখতারকে না আমার আহ্বানকারী নিয়োগ করেছি, আর না তাকে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করেছি। এই তো কিছুদিন আগের কথা, সে তো আমার চেয়েও 'আবদুল্লাহর (রা) বেশি অনুগত এবং অনুসারী ছিল। সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তাহলে বহু দিন যাবত তো তিনি এই ভয়ংকর মিথ্যাবাদীকে নিজের সংগে রেখেছিলেন। আর যদি সে মিথ্যাবাদী না হয় তাহলে আমার চেয়েও 'আবদুল্লাহর (রা) তা বেশি জানা থাকার কথা। আমি 'আবদুল্লাহর (রা) প্রতিপক্ষ নই। যদি তাই হতাম তাহলে তাঁর কাছাকাছি থাকতাম না, যারা আমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে তাদের কাছে চলে যেতাম। কিন্তু আমি কারো আমন্ত্রণ গ্রহণ করিনি। আপনার ভাইয়ের আরেকজন প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান। তিনিও আপনার ভাইয়ের মত দুনিয়ার প্রত্যাশী। তিনি তাঁর শক্তি ও ক্ষমতাবলে আপনার ভাইয়ের ঘাড় চেপে ধরেছে। আমার মনে হচ্ছে আপনার ভাইয়ের নৈকট্যের চেয়ে 'আবদুল মালিকের নৈকট্য আমার জন্য স্বস্তিকর। 'আবদুল মালিক পত্র মারফত আমাকে তাঁর কাছে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।"

উরওয়া প্রশ্ন করলেন তাহলে সেখানে চলে যাচ্ছেন না কেন? জবাবে ইবন আল- হানাফিয়্যা বলেন: খুব শীঘ্র এ ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট ইসতিখারা (সঠিক ও মঙ্গলজনক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ) করবো। আমার এখান থেকে চলে যাওয়া আপনার ভাইয়ের পছন্দ হবে এবং এতে তিনি খুশী হবেন। 'উরওয়া বলেন: আমি আপনার বক্তব্য আমার ভাইকে জানাবো।

এই আলোচনার পর 'উরওয়া ফিরে গেলেন। ইবন আল-হানাফিয়‍্যার সমর্থক কিছু লোক 'উরওয়াকে হত্যা করতে চায়। কিন্তু তিনি তাদেরকে শক্তভাবে বাধা দেন। এ কারণে 'উরওয়া সহীহ-সালামতে ফিরে যাওয়াতে তারা ভীষণ নাখোশ হয়। তারা ইবন আল- হানাফিয়‍্যাকে বলে যদি আপনি আমাদের কথা শুনতেন তাহলে আমরা তার ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতাম। ইবন আল-হানাফিয়‍্যা বলেন: কোন অপরাধে তোমরা তাঁকে হত্যা করতে? তিনি শুধু তাঁর ভাইয়ের দূত হিসেবে এসেছিলেন এবং আমাদের যিম্মায় ও নিরাপত্তায় ছিলেন। আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং আলোচনার পর আমরা তাঁকে তাঁর ভাইয়ের নিকট ফেরত পাঠিয়েছি। তোমরা যে কথা বলছো তা তো প্রতারণা। আর প্রতারণার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। যদি আমি তোমাদের কথামত কাজ করতাম তাহলে মক্কায় রক্ত ঝরতো। আর এই ব্যাপারে তোমরা আমার চিন্তাধারা সম্পর্কে অবহিত আছো। যদি সকল মুসলিম আমার খিলাফাতের ব্যাপারে একমত হয়ে যায় এবং একজন মাত্র মানুষ ভিন্নমত পোষণ করে তাহলেও আমি ঐ লোকটির সাথে যুদ্ধ করা সঙ্গত মনে করবো না।"

'উরওয়া ফিরে গেলেন এবং ভাইকে ইবন আল-হানাফিয়্যার বক্তব্য শোনালেন। সেই সাথে এ পরামর্শও দিলেন যে, আপনি তাঁর সঙ্গে আর বিবাদ না করে তাঁকে মুক্ত করে দিন। তিনি আমাদের এখান থেকে যেখানে ইচ্ছা দূরে কোথাও চলে যাক। 'আবদুল মালিক তাঁর থেকে বাই'আত না নিয়ে তাঁকে শামে থাকতেই দেবে না। আর যতক্ষণ পর্যন্ত সকল মুসলিম 'আবদুল মালিকের খিলাফাতের ব্যাপারে একমত না হবে ততক্ষণ তিনিও তাঁর বাই'আত করবেন না। এমতাবস্থায় 'আবদুল মালিক তাঁকে হত্যা অথবা কারারুদ্ধ করবে। আর এতে আপনার উদ্দেশ্য তার দ্বারা পূর্ণ হবে। তাতে আপনি দায়মুক্ত থাকবেন। 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) তাঁর ভাইয়ের এ উপদেশ গ্রহণ করেন এবং ইবন আল-হানাফিয়্যার সাথে আর কোন বিবাদে গেলেন না।

'আবদুল মালিকের আমন্ত্রণ এবং ইবন আল-হানাফিয়্যার শাম গমন ও প্রত্যাবর্তন
'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরকে (রা) প্রতিহত করার উদ্দেশে 'আবদুল মালিক মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার সমর্থন লাভের আশায় বহুদিন আগে থেকে তাঁকে শামে চলে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে আসছিলেন। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার নিকট থেকে 'উরওয়ার ফিরে যারওয়ার পর 'আবদুল মালিক ইবন আল-হানাফিয়্যাকে আরেকটি পত্র পাঠান। পত্রটি নিম্নরূপ:
"আমি জেনেছি, আপনার বাই'আত আদায়ের জন্য 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন, আপনার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, আপনার সম্মান ও অধিকার ভুলুণ্ঠিত করছেন। আপনি যা কিছু করেছেন তা আপনার জীবন ও দীনের প্রতি লক্ষ্য রেখে করেছেন। এই শাম আপনার সেবার জন্য প্রস্তুত। এখানে আপনি যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারবেন। আমরা আপনার সব ধরনের নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করবো।"

আগে থেকেই মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা মক্কা থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছিলেন। তাই এই চিঠি পেয়ে তিনি শামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। প্রথমে আয়লায় পৌঁছেন। তথাকার অধিবাসীরা তাঁর সকল সহযাত্রীসহ তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। তাঁর প্রতি দারুণ বিনয়, ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। অত্যন্ত সম্মানের সাথে তিনি সেখানে অবস্থান করতে থাকেন। দু'চার দিনের মধ্যেই তিনি সেখানে "আমর বিল মা'রূফ ও নাহি 'আনিল মুনকার" (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)-এর কাজ শুরু করেন। তিনি মানুষকে বলতে থাকেন, তাঁর অনুসারীদের উপর এবং তাঁর উপস্থিতিতে যেন কেউ কারো উপর যুলম না করে। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার আয়লায় উপস্থিতি ও জনপ্রিয়তার কথা 'আবদুল মালিক জানতে পেরে শংকিত হলেন। তিনি তাঁর বিশেষ উপদেষ্টা কুবায়সা ইবন যুওয়াইব ও রাও'উ ইবন যানবা' জুযামীর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তারা বলেন, তাঁর বাই'আত গ্রহণ ছাড়া তাঁকে এত নিকটে অবস্থান করার অনুমতি দেওয়া ঠিক হবে না। হয় তিনি বাই'আত করবেন, না হয় তাঁকে আবার হিজাযে পাঠিয়ে দিন।

উপরোক্ত পরামর্শের ভিত্তিতে 'আবদুল মালিক মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যাকে লেখেন:
"আপনি আমার দেশের একটি কোণে এসে অবস্থান নিয়েছেন। আপনি জানেন এখন আমার ও ইবন আয-যুবাইরের (রা) মধ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। আপনি একজন বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি। এ কারণে আমার ক্ষমতাধীন দেশে আমার বাই'আত ছাড়া আপনার অবস্থান আমার স্বার্থের পরিপন্থী। যদি আপনি বাই'আত করতে ইচ্ছুক হন তাহলে লোহিত সাগরে যে একশো জাহাজ ভর্তি দ্রব্যসামগ্রী এসেছে তা সবই এবং সেই সাথে আরো বিশ লাখ দিরহাম আপনাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হবে। তার মধ্যে পাঁচ লাখ এক্ষুণি দেওয়া হবে এবং পনেরো লাখ পরে পাঠানো হবে। এছাড়া আপনি যে পরিমাণ নির্ধারণ করবেন সেই অনুযায়ী আপনার নিকট আত্মীয়, দাস-দাসী এবং আপনার সংগী-সাথীদের ভাতা প্রদান করা হবে। আর যদি আপনি বাই'আত না করেন তাহলে এই মুহূর্তে আমার দেশ ছেড়ে আমার সীমানার বাইরে চলে যান।"

জবাবে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা লিখলেন:
"বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। মুহাম্মাদ ইবন 'আলীর পক্ষ থেকে 'আবদুল মালিকের প্রতি সালাম। সেই আল্লাহর প্রশংসা যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। অতঃপর এই যে, খিলাফাতের ব্যাপারে আমার চিন্তাধারা সম্পর্কে আপনি পূর্বেই অবহিত আছেন। এ ব্যাপারে আমি কাউকে বোকা বানিয়ে ধোঁকা দিই না। আল্লাহর কসম! যদি গোটা মুসলিম উম্মাহ আমার খিলাফাতের ব্যাপারে একমত হয়ে যায় এবং কেবল যারকা' বাসীরা দ্বিমত পোষণ করে তাহলেও তাদের সংগে সংঘাতে যাব না। তাদেরকে ছেড়ে বিচ্ছিন্নও হয়ে যাব না, যতক্ষণ না তারা ঐকমত্যে আসে। মদীনায় অস্থিরতার কারণে মক্কায় চলে এসেছিলাম এবং 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের নিকটে অবস্থান করছিলাম। কিন্তু তিনি আমার সাথে সদাচরণ করেননি, আমার থেকে বাই'আত নিতে চেয়েছেন, কিন্তু অস্বীকার করেছি। বলেছি, যতক্ষণ আপনার ও তাঁর মধ্যেকার বিরোধে মুসলিম উম্মাহ কোন ঐকমত্যে না পৌঁছবে ততক্ষণ আমি বাই'আত করবো না। তারা যে সিদ্ধান্ত নিবে, আমিও তাদের সাথে থাকবো। এই অবস্থা এবং এমন টানাপোড়নের মধ্যে আপনি আমাকে এখানে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমি সে আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে আপনার ক্ষমতাধীন দেশের একটি কোণায় এসে অবস্থান নিয়েছি। আল্লাহর কসম! 'আমার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোন ইচ্ছা নেই। আমার সকল লোকজন আমার সংগেই ছিল। দেখলাম এ স্থানটি নিরিবিলি জীবন যাপনের জন্য উপযুক্ত। তাই মনে করলাম, ভালো হলো, আপনার নিকটে থেকে আপনার সাথে সম্পর্কের দ্বারা উপকৃত হবো। কিন্তু এখন আপনি যা লেখার তা লিখছেন। এ কারণে, ইনশাআল্লাহ আমরা আবার ফিরে যাব।”

এই জবাবী পত্রটি পাঠিয়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা নিজের সাত হাজার সঙ্গীর সামনে নিম্নের এই ভাষণটি দান করেন:
"আল্লাহ সকল কাজ ও বিষয়ের অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রক। তিনি যা চান তাই হয়, আর যা না চান তা হয় না। যা কিছু হওয়ার তা অবশ্যই হবে। আপনারা খিলাফাতের ব্যাপারে সময়ের পূর্বেই খুব তাড়াহুড়ো করেছেন। সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার জীবন! আমাদের পশ্চাতে এমন সব জীবন উৎসর্গকারী মানুষ আছে যারা মুহাম্মাদ (সা)-এর বংশধরদের সাহায্যের জন্য যুদ্ধ করবে। মুহাম্মাদ (সা)-এর বংশধরদের অধিকার অংশীবাদীদের জন্য ঢাকা থাকবে না। দেরীতে হলেও পূরণ হবে। সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতের মুঠোয় আমার জীবন! যেভাবে এ খিলাফাত তোমাদের মধ্যে ছিল, একদিন আবার তোমাদের মধ্যে ফিরে আসবে। সেই আল্লাহর শোকর যিনি আপনাদের জীবন বাঁচিয়েছেন এবং আপনাদের দীনের হিফাযাত করেছেন। আপনাদের মধ্যে যারা নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে নিজ নিজ শহর ও আবাসস্থলে ফিরে যেতে পারবেন বলে মনে করেন, তারা যেতে পারেন।"

এই অনুমতির পর মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার অধিকাংশ সঙ্গী চলে যায়। সাত হাজারে মধ্যে মাত্র নয় শো থেকে যায়। তাদেরকে সংগে নিয়ে তিনি মক্কায় ফিরে যান। আয়লা থেকে ফিরে আসার পর মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার অবস্থা সম্পর্কে দু'টি বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা এ রকম যে, তখন ছিল হজ্জের মওসুম। এ কারণে তিনি 'উমরার নিয়‍্যাতে ইহরাম বাঁধেন এবং কুরবানীর পশু সংগে নিয়ে সোজা মক্কায় পৌঁছেন। কিন্তু যখন হারামে প্রবেশ করতে যাবেন তখন 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের (রা) অশ্বারোহী সৈনিকরা বাধা দেয়। তিনি ইবন আয-যুবাইরের (রা) নিকট এ বার্তা পাঠান যে, আমি মক্কা থেকে যাওয়ার সময়ও যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বের হইনি এবং এখন, ফেরার পরেও সে ইচ্ছা নেই। এ কারণে আমাদের পথ ছেড়ে দিন, আমরা বাইতুল্লাহ-তে যেয়ে হজ্জের অনুষ্ঠানাদি পালন করি। হজ্জ আদায়ের পর আমরা এখান থেকে চলে যাব। কিন্তু ইবন আয-যুবাইর (রা) তাঁকে বায়তুল্লাহ'-য় যাওয়ার অনুমতি দেননি। তাই তিনি কুরবানীর পশুসহ মদীনায় চলে যান এবং সেখানে অবস্থান করতে থাকেন।

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি মক্কায় পৌঁছে তাঁর মিনার শিবিরে অবস্থান নেন। দু'দিন পরেই ইবন আয-যুবাইর (রা) তাঁকে এ বার্তা পাঠান যে, এখান থেকে সরে যান, আমাদের কাছাকাছি থাকবেন না। এ বার্তা পেয়ে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা মন্তব্য করেন : 'যতক্ষণ আল্লাহ আমাদের জন্য কোন উপায় বের করে না দেন ততক্ষণ আমরা ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক ধৈর্যধারণ করবো। আল্লাহর কসম! আমি এখনো পর্যন্ত তরবারি উঠানোর ইচ্ছা করিনি। যদি আমি তরবারি উঠাতাম তাহলে আমি একা হলেও এবং তাঁর সাথে তাঁর পুরো দল থাকলেও তিনি এভাবে আমার সাথে খেলতে পারতেন না। কিন্তু আমি তরবারি উঠাতে চাই না। ইবন আয-যুবাইর (রা) প্রতিবেশীকে দুঃখ দান থেকে বিরত হবেন না।" এরপর তিনি তায়িফ চলে যান। এর কয়েক মাস পরেই হিজরী ৭২ সনে যুল কা'দা মাসে হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ মক্কা অবরোধ করে এবং ইবন আয- যুবাইরকে তাঁর সঙ্গী-সাথীসহ নির্মমভাবে হত্যা করে।

আরেকটি বর্ণনা এ রকমও আছে যে, হাজ্জাজ কর্তৃক 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা মক্কাতেই ছিলেন। হাজ্জাজ তাঁর কাছেও 'আবদুল মালিকের বাই'আতের জন্য বার্তা পাঠায়। জবাবে তিনি হাজ্জাজকে বলে পাঠান : আমার মক্কায় অবস্থান, তায়িফ ও শাম সফরের অবস্থা আপনার জানা আছে। সব রকমের কষ্ট আমি এজন্য সহ্য করছি যে, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত কারো হাতে বাই'আত করতে চাই না যতক্ষণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোন একজনের ব্যাপারে জনগণ ঐকমত্যে না পৌঁছে। আমার মধ্যে বিরুদ্ধাচরণের কোন প্রেরণা নেই। কিন্তু আমি যখন দেখেছি খিলাফাতের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে মত পার্থক্য আছে তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি যতক্ষণ সকলে কোন একজনের ব্যাপারে একমত না হবে ততক্ষণ এই বিষয় থেকে দূরে থাকবো। আল্লাহর এই শহরে, যার সম্মান ও মর্যাদা সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক, যেখানে একটি পাখীও নিরাপদ, সেখানে আমি আশ্রয় নিয়েছি। ইবন আয-যুবাইর (রা) আমার সাথে সদাচরণ করেননি, তাই আমি শামে চলে যাই। কিন্তু সেখানে 'আবদুল মালিকও আমার নৈকট্য চাননি। এ কারণে আমি আবার মক্কার হারামে চলে এসেছি। এখন যদি ইবন আয-যুবাইর (রা) নিহত হন এবং 'আবদুল মালিকের খিলাফাতের ব্যাপারে সকল মুসলমান একমত হয়ে যায় তাহলে আমি আপনার হাতে বাই'আত করে নিব। কিন্তু হাজ্জাজ বাই'আতের ব্যাপারে অপেক্ষা করতে মোটেই রাজী ছিলেন না। তিনি বার বার চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন, আর ইবন আল-হানাফিয়্যাও কোন না কোনভাবে এড়িয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) নিহত হলেন। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার ছেলে হাসান বলেন: "আমার পিতা হাজ্জাজের বাই'আত করেননি।

'আবদুল মালিকের অনুকুলে বাই'আত
'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) নিহত হওয়ার পর 'আবদুল মালিক হাজ্জাজকে লিখলেন যে, "মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার মধ্যে বিরোধিতার কোন মানসিকতা নেই। তাই আশা করা যায় এখন তিনি তোমার কাছে এসে বাই'আত করে নিবেন। তাঁর সাথে নম্র ব্যবহার কর।" মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা নিজেও প্রথম থেকে বলে আসছিলেন যে, যখন কোন এক ব্যক্তির ব্যাপারে মুসলমানদের ঐকমত্য হয়ে যাবে তখন আমি তাঁকে মেনে নিব। অতএব 'আবদুল মালিকের ব্যাপারে সকলে একমত হওয়ার পর যখন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) তাঁর বাই'আত করেন তখন তিনি মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যাকে বলেন, এখন তো বিষয়টি আর অমীমাংসিত নয়। সুতরাং আপনিও বাই'আত করে নিন। পূর্বেই এ ব্যাপারে তিনি সিদ্ধান্তে এসে গিয়েছিলেন, তাই এখন হাজ্জাজের হাতে বাই'আত করে খলীফা 'আবদুল মালিককে নিম্নের পত্রটি লেখেন:
"বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর বান্দা আব্দুল মালিক আমীরুল মু'মিনীনের প্রতি মুহাম্মাদ ইবনে আলী থেকে। অতঃপর এই যে, সেই সময় যখন উম্মাতের মধ্যে খলীফার ব্যাপারে মত বিরোধ ছিল, আমি মানুষের থেকে দূরে ছিলাম। এখন, যখন আপনি খিলাফাত পেয়ে গেছেন এবং মুসলমানরাও আপনার বাই'আত করেছে, তখন আমিও এই দলে মিশে গেলাম। তারা যে কল্যাণের মধ্যে প্রবেশ করেছে আমিও তাতে প্রবেশ করলাম। আমি হাজ্জাজের হাতে আপনার বাই'আত করেছি এবং এখন এই লিখিত বাই'আত আপনাকে পাঠাচ্ছি। কারণ, আপনার খিলাফাতের ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা' হয়ে গেছে। এখন আমি চাই, আপনি মানুষকে নিরাপত্তা ও অঙ্গীকার পূরণের আশ্বাস দিন। প্রতারণার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। আর যদি এখনো আপনার মধ্যে দ্বিধা-সংশয় থাকে, অথবা থাকে অস্বীকৃতি, তাহলে জেনে রাখুন আল্লাহর এই যমীন খুবই প্রশস্ত।”

এ পত্র পাওয়ার পর 'আবদুল মালিক তাঁর বিশেষ উপদেষ্টা কুবায়সা ইবন যুওয়াইব ও রাও'উ ইবন যানবা' জুযামীর সংগে পরামর্শ করেন। তাঁরা বলেন: 'মুহাম্মাদ ইবন আল- হানাফিয়‍্যার উপর আজও আপনার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি যখন ইচ্ছা তখন সংঘাত- সংঘর্ষ বাঁধিয়ে দিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারেন। এমতাবস্থায় তিনি যখন আপনার খিলাফাত মেনে নিয়ে বাই'আত করেছেন, তখন আমাদের পরামর্শ হলো, আপনি এক্ষুণি তাঁকে জান-মালের নিরাপত্তার অঙ্গীকার পত্র লিখে পাঠিয়ে দিন। সেই সাথে তাঁর সংগী- সাথীদের ব্যাপারেও তাঁর অঙ্গীকার আদায় করে নিন। তাঁদের এ পরামর্শের পর 'আবদুল মালিক যে পত্রটি লেখেন তা নিম্নরূপ:
"এখন আপনি আমার নিকট একজন প্রশংসা পাওয়ারযোগ্য, সবচেয়ে বেশি প্রিয় এবং ইবন আয-যুবাইরের (রা) চেয়েও অধিকতর নিকটতম ব্যক্তিত্ব। এ কারণে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে হাজির-নাজির জেনে অঙ্গীকার করছি যে, আপনাকে এবং আপনার সংগী-সাথীদের কাউকে এমন আচরণ ও কর্মের দ্বারা অস্থির করা হবে না যা আপনি মোটেই পছন্দ করেন না। আপনি আপনার নিজ শহরে ফিরে যান এবং যেখানে ইচ্ছা নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে অবস্থান করুন। আমি যতদিন জীবিত থাকবো আপনার এই প্রীতি ও শুভেচ্ছার কথা ভুলবো না এবং আপনাকে সাহায্যের ব্যাপারে কোন রকম কার্পণ্য করবো না।" এই পত্রের সাথে হাজ্জাজকেও একটি পত্র লেখেন। তাতে তিনি হাজ্জাজকে ইবন আল-হানাফিয়্যার সাথে সদাচরণের এবং তাঁর সম্মান ও মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দেন। এই আনন্দদায়ক সন্ধি ও সমঝোতার পর মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যা মদীনায় ফিরে যান এবং শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে সেখানে বসবাসের সুযোগ লাভ করেন।

শাম গমন ও 'আবদুল মালিকের সদাচরণ
কয়েক বছর পর মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা 'আবদুল মালিকের সাক্ষাৎ কামনা করে একটি পত্র লেখেন। তিনি সানন্দে তা মঞ্জুর করেন। সুতরাং মুহাম্মাদ ইবন আল- হানাফিয়্যা হিজরী ৭৮ সনে শাম সফর করেন। 'আবদুল মালিক হৃষ্টচিত্তে তাঁকে স্বাগতম জানান এবং তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক স্বীয় মহলে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেন। তাঁর সঙ্গী-সাথীদের আতিথেয়তার জন্য শাহী ভাণ্ডারের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। এক মাসেরও কিছু বেশি সময় তিনি দিমাশকে অবস্থান করেন। এ সময়ে মাঝে মাঝে তিনি 'আবদুল মালিকের সাথে মিলিত হতেন। দরবারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শাহী খান্দানের লোকদের পরেই ছিল তাঁর স্থান। একদিন নিরিবিলিতে তিনি 'আবদুল মালিককে তাঁর মোটা অংকের ঋণের কথা বলেন। 'আবদুল মালিক তা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন এবং তাঁর আরো কোন প্রয়োজন আছে কিনা তা জানতে চান। তিনি ঋণ পরিশোধ, আরো কিছু প্রয়োজন এবং নিজের সন্তানাদি, সঙ্গী-সাথী, চাকর-বাকর ও দাস-দাসীদের ভাতা নির্ধারণের কথাও তাঁকে বলেন। 'আবদুল মালিক দাস-দাসীদের ভাতা ছাড়া অন্য সকল প্রয়োজন ও দাবী পূরণ করেন। তারপর তাঁর একান্ত পীড়াপীড়িতে দাস-দাসীদের ভাতাও নির্ধারণ করেন। তবে তাদের পরিমাণ কম রাখেন। শেষ পর্যন্ত ইবন আল-হানাফিয়্যার অত্যধিক চাপে 'আবদুল মালিক তাদেরও ভাতা বাড়িয়ে দেন। তিনি তাঁর সকল দাবী ও প্রয়োজন পূরণের প্রতিশ্রুতি আদায় করে মদীনায় ফেরেন। মৃত্যু পর্যন্ত খলীফা 'আবদুল মালিকের সাথে তাঁর এ সম্পর্ক অটুট ছিল।

মৃত্যু: মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার মৃত্যু সন ও স্থান নিয়ে বিস্তর মত পার্থক্য আছে। সঠিক মতে তিনি হিজরী ৮১, খৃস্টাব্দ ৭০০ সনে মদীনায় ইনতিকাল করেন এবং বাকী' গোরস্তানে দাফন করা হয়। একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি ইবন আয-যুবাইরের হাত থেকে বাঁচার জন্য কুফায় পালিয়ে যান এবং সেখানেই ইনতিকাল করেন। তবে শী'আদের একটি উপদল কায়সানিয়্যা মনে করে, তিনি জীবিত আছেন, মৃত্যু বরণ করেননি।

পূর্ববর্তী বর্ণনার উপর একটি পর্যালোচনা
পূর্বে যা কিছু উপস্থাপন করা হয়েছে তা কেবল ইতিহাসের আলোকে তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। কোন রকম পর্যালোচনা করা হয়নি। কিন্তু এমন অনেক ঘটনা ও বিষয় আছে যা পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সাপেক্ষ। অন্যথায় পূর্বে উল্লেখিত ঘটনাবলীর অনেকটা ইবন আল-হানাফিয়্যার জীবন চিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এখানে কয়েকটি ঘটনার কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

হযরত ইমাম হুসাইনের (রা) প্রকৃত উত্তরাধিকারী ছিলেন হযরত ইমাম যাইনুল 'আবিদীন (রহ)। কিন্তু তিনি তাঁর পিতার শাহাদাতের পর পার্থিব ভোগ-বিলাস ও চাকচিক্যের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েন এবং ইমামত ও খিলাফাতের বিবাদ থেকে নিজেকে সযত্নে সম্পূর্ণ দূরে রাখেন। 'আলীর (রা) অনুসারীরা তাঁকে বহু ক্ষেত্রে টেনে আনতে চায়। কিন্তু তিনি এতো দুঃখ ভারাক্রান্ত ছিলেন যে কারো কোন আহ্বানে কখনো ঘরের বাইরে পা রাখেননি। তাঁর থেকে হতাশ হয়ে 'আলীর (রা) অনুসারীরা ইবন আল-হানাফিয়‍্যার কাঁধে এই কঠিন দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়। এ কারণে খিলাফাত, ইমামত, আহলি বায়ত ও গায়র আহলি বায়তের প্রশ্ন এবং এর থেকে উদ্ভব বিভিন্ন 'আকীদা, চিন্তা-ভাবনা ও মাসয়ালা ইবন আল-হানাফিয়্যার ব্যক্তি সত্তার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় ইবন আল-হানাফিয়্যা এমন কিছু কাজ করেছেন এবং এমন কিছু 'আকীদা ও চিন্তা-ভাবনা তাঁর প্রতি আরোপ করা হয়েছে যা প্রকৃতপক্ষে তাঁর নয়। এসব বিষয় পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন আছে।

শী'আ আন্দোলন এবং আহলি বায়ত ও গায়র আহলি বায়ত (নবী পরিবার-নবী পরিবারের বাইরের লোক) ইত্যাদি বিষয়ের ভিত্তি পুরোটাই প্রচার-প্রোপাগাণ্ডার উপর। এই দল নিজেদের আন্দোলন এবং উদ্দেশ্য সফল করার জন্য এমন বহু 'আকীদা ও চিন্তা আহলি বায়তের প্রতি আরোপ করেছে। এ কারণে তিনি খিলাফাতের প্রতি দারুণ লোভী বলে চিত্রিত হয়েছেন। এর মধ্যে কিছু চিন্তা এমন আছে যা নিতান্তই বিভ্রান্তিকর, যা মানুষকে গোমরাহীর দিকে নিয়ে যায়। এসব কথা ও চিন্তা যদি ঐ সকল মহান ব্যক্তির জীবদ্দশায় প্রকাশ পেত অথবা তাঁরা যদি অবগত হতেন তাহলে তার উদ্ভাবক ও প্রচারকদেরকে নিজেদের দল থেকে বের করে দিতেন।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, "ইসলামী খিলাফাত” যখন পার্থিব অন্যসব রাষ্ট্র ব্যবস্থার রূপ ধারণ করে তখন আহলি বায়তের মধ্যে খিলাফাত লাভ করার প্রেরণা অবশ্যই সৃষ্টি হয়েছে। অনেকাংশে তা সঠিকও ছিল। কারণ ইসলামী খিলাফাত ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা যতক্ষণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির উপর থাকে। ঠিক তেমনি তা গণতান্ত্রিক হবে যখন তা খিলাফাত থাকে। ব্যক্তি ও বংশগত রাষ্ট্র ব্যবস্থার রূপ লাভ করার পর তার দীনী অবস্থান আর অবশিষ্ট থাকে না। সে সময় যদি ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকারীদের অন্তরে তা লাভ করার প্রেরণা সৃষ্টি হয়, অথবা কোন দল তাদের সাহায্যের জন্য উঠে দাঁড়ায় তাহলে তা দোষের কিছু হতে পারে না। কিন্তু আহলি বায়তের প্রেমিক ও সমর্থক বলে দাবীদারগণ ভ্রান্ত 'আকীদা বিশ্বাস আবিষ্কার করে ঐসব মহান ব্যক্তির প্রতি আরোপ করেছে। আসলে তারা ঐসব কথা ও বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।

মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা ছিলেন এমন একজন মহান তাওহীদবাদীর ('আলী রা.) বংশধর যিনি তাঁর নিজের সম্পর্কে ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণকারীদেরকে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে জ্বালিয়ে দেন। এ কারণে ভ্রান্ত বিশ্বাস দ্বারা তিনি কলুষিত হতেই পারেন না.। এ ধরনের ভ্রান্ত কথা-বার্তা ও চিন্তা-ভাবনার কথা যখন তাঁর কানে আসতো, তিনি তা শক্তভাবে অস্বীকার করতেন। একবার তিনি জানতে পারলেন, মুখতারের অনুসারীরা প্রচার করছে যে, ইবন আল-হানাফিয়্যার নিকট কুরআন ছাড়াও অন্তরস্থ জ্ঞানের একটি অংশ আছে। একথা শুনে তিনি বিশেষভাবে একটি ভাষণ দেন। তিনি বলেন: "আল্লাহর কসম! এই গ্রন্থ ছাড়া অর্থাৎ কুরআন ছাড়া উত্তরাধিকার হিসেবে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে আর কোন জ্ঞান পাইনি।"

তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল অনেকে তাঁকে মাহদী বলে সালাম করতো। বলতো সালামুন 'আলাইকা ইয়া মাহদী! জবাবে তিনি বলতেন, এই অর্থে আমি অবশ্যই মাহদী যে, আমি মানুষকে ভালো ও কল্যাণের পথ দেখাই। কিন্তু আমার নাম আল্লাহর নবীর নামে এবং আমার কুনিয়াত বা উপনাম নবীর কুনিয়াতের উপরে। এ কারণে তোমরা যখন সালাম করবে তখন মাহদীর পরিবর্তে বলবে আস-সালামু 'আলাইকা ইয়া মুহাম্মাদ, অথবা আস-সালামু 'আলাইকা ইয়া আবাল কাসিম।

সাধারণ মানুষ কুরাইশ বংশের দু'টি শাখা-বানু হাশিম ও বানু উমাইয়‍্যার মর্যাদা পূজা- উপাসনার সীমা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। একটির ভিত্তি ছিল পার্থিব ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি এবং অন্যটির ছিল দীনী নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যা এটাকে খুবই অপছন্দ করতেন। তিনি বলতেন:
"আমাদের কুরাইশ গোত্রের দু'টি শাখা- আমরা আহলি বায়ত ও বানু উমাইয়্যাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে ফেলা হয়েছে।”

কোন কোন উপদল 'আলীকে (রা) আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে দেয়। কিন্তু ইবন আল-হানাফিয়‍্যা তাঁকে একজন আল্লাহর বান্দা হিসেবেই দেখতেন। তিনি বলতেন:
"আমি রাসূলুল্লাহর (সা) পরে কোন মানুষের নাজাত ও তার জান্নাতী হওয়ার নিশ্চিত সাক্ষ্য দিতে পারিনে। এমনকি আমার পিতা 'আলী (রা) সম্পর্কেও, যিনি আমাকে জন্ম দিয়েছেন, নিশ্চিতভাবে বলতে পারিনে তিনি জান্নাতী।"

মুখতার আছ-ছাকাফীর পৃষ্ঠপোষকতার কারণ
একথা দৃঢ়তার সাথে বলা যায় যে, মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার 'আকীদা বিশুদ্ধ ইসলামী 'আকীদার পরিপন্থী ছিল না। মুখতার আছ-ছাকাফীর প্রতারণার ফাঁদে আটকে যাওয়া বাহ্যত অগ্রহণযোগ্য মনে হয়। কিন্তু এটা ছিল মানব স্বভাবের দাবী। হযরত মু'আবিয়া (রা) আজীবন আহলি বায়তের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সচেতন ছিলেন। কিন্তু তাঁর পরে ইয়াযীদ থেকে নিয়ে 'আবদুল মালিকের সময় পর্যন্ত এই পরিবারের মহান ব্যক্তিবর্গের সাথে উমাইয়্যা খলীফাগণ যে আচরণ করেছেন তা খুবই নিষ্ঠুর ও অবমাননাকর। ইমাম হুসাইন (রা) ও নবী পরিবারের সকল সদস্যকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়, যা গোটা উমাইয়া শাসনের উপর এমন কলঙ্ক লেপন করেছে যা মোটেই উঠার নয়। এ অবস্থায় কেবল মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা নন, বরং বানু হাশিমের সকল সদস্যের অন্তর উমাইয়্যাদের উপর ভীষণ বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। এছাড়া 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের (রা) ভীতি তাদের মাথার উপর চেপে বসেছিল। এমতাবস্থায় মুখতার ইমাম হুসাইনের রক্তের বদলা নেওয়ার দাবী নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ান এবং হুসাইনের (রা) হত্যাকারীদের তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করে হত্যা করেন। তিনি বানু উমাইয়্যা ও 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের (রা) মুকাবিলা করার জন্য মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যাকে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে গ্রহণ করেন। এরূপ অবস্থায় যদি মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা মানব স্বভাব অনুযায়ী অথবা অন্য কোন কল্যাণ চিন্তায় তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকেন তাতে তেমন দোষের কিছু আছে বলে মনে হয় না। তারপরেও তিনি মুখতারকে কখনো বিশ্বাস করেননি। তাঁকে কার্যসিদ্ধির একটি হাতিয়ারের বেশি কিছু ভাবেননি। আমাদের পূর্ববর্তী আলোচনায় এসেছে যে, যখন মুখতার মুহাম্মাদ ইবন আল- হানাফিয়্যার নিকট ইরাক যাওয়ার অনুমতি চান তখন তিনি অনুমতি দেন। তবে তাঁর প্রতি বিশ্বাস না থাকায় 'আবদুল্লাহ ইবন কামিল হামাদানীকে তাঁর সাথে দিয়ে দেন। তাকে একথাও বলে দেন যে, মুখতার তেমন আস্থাভাজন ব্যক্তি নয়। অতএব তার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। অথবা যখন 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইরের (রা) পক্ষ থেকে তাঁর ভাই 'উরওয়া আসেন মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার নিকট বার্তা নিয়ে তখন তিনি 'উরওয়াকে বলেন, আমি না মুখতারকে আমার প্রচারক হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম, না সাহায্যকারী হিসেবে, অথবা যখন মুখতারের কথা ও বক্তৃতা-ভাষণে কিছু ইরাকীর সন্দেহ হয় এবং তারা তাঁর কথার সত্যতা যাঁচাইয়ের জন্য মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার নিকট যায় তখন তিনি তাদেরকে বলেন : এটা আমরা পছন্দ করি যে, আল্লাহ তার যে বান্দা দ্বারা চেয়েছেন, আমাদের সাহায্য করেছেন। তবে তোমরা অবশ্যই মিথ্যাবাদীদের থেকে সতর্ক থাকবেন এবং তাদের থেকে নিজেদের জীবন ও নিজেদের দীনের হিফাযাত করবে।

তবে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার মধ্যে গোত্রীয় টান ও খিলাফাত লাভের সহজাত প্রবণতা অবশ্যই ছিল। আর এই প্রবণতাকে উসকে দেওয়ার পিছনে কাজ করে বানু উমাইয়্যাদের লাগামহীন আচরণ ও স্বৈরাচারী কর্মপদ্ধতি। 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) ও 'আবদুল মালিকের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার উপর 'আবদুল্লাহর (রা) বাড়াবাড়িমূলক শক্তি প্রয়োগ এই প্রবণতাকে আরো শক্ত ও চাঙ্গা করে দেয়। কিন্তু তার জন্য বাস্তবে তিনি কোন চেষ্টা করেননি। বরং সব সময় একথাই বলতে থাকেন যে, আমি খিলাফাত অবশ্যই চাই। তবে তা এ অবস্থায় যে, তাতে একজন মুসলমানও ভিন্নমত পোষণ করবে না। উমাইয়্যাদের বিপরীতে তাঁর এ অবস্থান কোনভাবেই অসঙ্গত ও অযৌক্তিক বলা যাবে না।

মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার অনুসারী একটি দল
যদিও মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যা শী'আ সম্প্রদায়ের "ইছনা 'আশরিয়া” উপ-দলের ইমাম নন এবং তাঁদের সকল ইমাম নবী দুহিতা হযরত ফাতিমার (রা) বংশধর, তথাপি শী'আদের একটি উপ-দল হযরত হুসাইনের (রা) পরে তাঁকেই ইমাম বলে মানে। এই দলটির নাম "কায়সানিয়া"। তারা বিশ্বাস করে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা মৃত্যু বরণ করেননি, বরং তিনি তাঁর চল্লিশজন ভক্ত-অনুসারীসহ মদীনা থেকে সাত দিনের দূরত্বে "রিদাবী" পাহাড়ে গমন করেন এবং এখনো সেখানে বিদ্যমান আছেন। একটি বাঘ ও একটি চিতা তাঁদেরকে পাহারা দিচ্ছে এবং তাঁদের পিপাসা নিবৃত্তির জন্য একটি মধু ও একটি পানির ঝর্ণা প্রবাহমান আছে। এই নির্জন স্থানে আল্লাহ তাঁদের খাদ্য সরবরাহ করেন। একদিন তিনি এ পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং আদল-ইনসাফে পূর্ণ করে দেবেন। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার পরে তাঁর পুত্র 'আবদুল্লাহ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

এই "কায়সানিয়্যা” সম্প্রদায়ের জন্ম কুফায় মুখতার আছ-ছাকাফীর পৃষ্ঠপোষকতায়। তাদের বিশ্বাসের মূল কথা হলো, পিতা 'আলীর (রা) পরে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা হলেন ইমাম। তাদের বিশ্বাস মতে তাদের ইমামগণ আল্লাহর জ্ঞানের অধিকারী হন, তাই ইবন আল-হানাফিয়্যাও এ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাঁর দু'ভাই আল-হাসান ও আল-হুসাইন (রা) তাঁকে গূঢ় রহস্যের জ্ঞান দেন এবং ব্যাখ্যা ও বাতিনী জ্ঞানও দান করেন। তাদের একটি শাখা বিশ্বাস করে যে, 'আলী, আল-হাসান ও আল-হুসাইন (রা) ও ইবন আল-হানাফিয়্যা (রহ) সকলে নবী। তারা জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করে। সুতরাং ইবন আল-হানাফিয়্যা আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। তবে তাদের মধ্যে এ ব্যাপারে মত পার্থক্য আছে যে, তিনি পিতা 'আলীর (রা) মৃত্যুর পর সরাসরি উত্তরাধিকার সূত্রে ইমাম হন, না তাঁর দু'ভাই আল-হাসান ও আল-হুসাইনের (রা) মাধ্যমে হন? আবু মুহাম্মাদ আল-হাসান ইবন মূসা আন-নাওবাখতী (২৩২/৮৪৭) বলেন:
"কয়েকটি উপদল মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যার ইমামতের কথা বলে। কারণ বসরার যুদ্ধের দিন (উটের যুদ্ধ) তাঁর দু'ভাই নন, তিনিই তাঁর পিতার ঝাণ্ডাবাহী ছিলেন। আল-মুখতার দাবী করেন, তিনি যে তাঁর পিতার পরে ইমাম, সে কথা বলতে তিনি তাকে আদেশ করেছেন। আল-মুখতার একথাও বলতেন যে, মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা 'আলী (রা) ইবন আবী তালিবের অছি, তাঁর নির্বাচিত ইমাম, দায়িত্বশীল ও শাসক।"

আশ-শাহরাস্তানী বলেন, প্রাচীন পারস্যের অগ্নি উপাসক, ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণ্যবাদ, প্রাচীন কালের দার্শনিক ও মূর্তি পূজকদের চিন্তা দর্শনের উপর ভিত্তি করে কায়সানিয়‍্যারা তাদের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করে।

জ্ঞান ও বিজ্ঞতা
মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা ছিলেন হযরত 'আলীর (রা) মত জ্ঞানের সাগরতুল্য পিতার সন্তান। এ কারণে উত্তরাধিকার সূত্রে জ্ঞানের ঐশ্বর্য লাভ করেন। ইবন সা'দ লিখেছেন:
"তিনি একজন বড় জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন।" ইবন হিব্বান তাঁকে তাঁর বংশের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিদের মধ্যে গণ্য করেছেন।

কিন্তু তাঁর জ্ঞানের বিস্তারিত বিবরণ কোন গ্রন্থে পাওয়া যায় না। তিনি বলতেন:
"হাসান ও হুসাইন আমার চেয়ে উত্তম। তবে আমি তাঁদের চেয়ে বেশি জানি।”

Hাদীছ: হাদীসের জ্ঞান তিনি লাভ করেন তাঁর সম্মানিত পিতা 'আলীর (রা) নিকট থেকে। তাছাড়া আর যাঁদের নিকট থেকে এ জ্ঞান অর্জন করেন তাঁরা হলেন: 'উসমান ইবন 'আফফান, 'আম্মার ইবন ইয়াসির, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান, আবূ হুরাইরা ও 'আবদুল্লাহ ইবন আল-'আব্বাস (রা)। অনেক মুহাদ্দিছের মতে তাঁর সূত্রে বর্ণিত হযরত 'আলীর (রা) হাদীছগুলির সনদই সর্বাধিক শক্তিশালী।

তাঁর ছাত্র-শিষ্যের পরিধি অনেক বিস্তৃত। তাঁর চার পুত্র: ইবরাহীম, হাসান, 'আবদুল্লাহ ও 'আওন; ভাতিজা মুহাম্মাদ ইবন 'উমার ইবন 'আলী (রা), ভাইয়ের পৌত্র মুহাম্মাদ ইবন 'আলী ইবন হাসান (রা), ভাগিনা 'আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন 'আকীল এবং অন্যদের মধ্যে 'আতা' ইবন আবী রাবাহ, মিনহাল ইবন 'আমর, মুহাম্মাদ ইবন কায়স ইবন মাখরামা, মুনযির ইবন ইয়া'লা, মুহাম্মাদ ইবন বাশীর হামাদানী, সালিম ইবন আবী আল-জা'দ ও 'আমর ইবন দীনার তাঁর জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে উদারভাবে গ্রহণ করেন।

মূল্যবান উক্তি
তাঁর কিছু মূল্যবান উক্তি সূক্ষ্ম ভাব সমৃদ্ধ ও শিক্ষাপ্রদ। তিনি বলতেন: “যার অন্তর তার নিজের দৃষ্টিতে সম্মানিত তার দৃষ্টিতে দুনিয়ার কোন মূল্যই থাকে না। যে ব্যক্তি তার জীবন যাপনে সঙ্গীদের সাথে মানিয়ে চলতে পারে না সে বুদ্ধিমান নয়। আল্লাহ জান্নাতকে তোমাদের প্রাণের বিনিময়ে নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং অন্য কোন কিছুর বিনিময়ে তা বিক্রি করো না। যে কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয় না তা ব্যর্থ হয়ে যায়।

'ইবাদাত-বন্দেগী
তিনি যেমন একজন বড় মাপের 'আলিম ছিলেন তেমনি ছিলেন একজন বড় 'আবিদ ব্যক্তি। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি ছিলেন একেবারেই উদাসীন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন, তিনি 'ইলম ও ইবাদাত দুটিতেই ছিলেন চূড়ান্ত পর্যায়ের মানুষ।

মায়ের খিদমত
তিনি মায়ের খিদমতে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। নিজ হাতে তাঁর চুলে খিজাব লাগাতেন, চিরুনী করতেন ও খোপা বাঁধতেন। একদিন ঘর থেকে বেরিয়ে মানুষের সামনে এলে দেখা গেল তাঁর হাতে মেহেদীর ছাপ। একজনের প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, আমি মায়ের চুলে খিজাব লাগাচ্ছিলাম।

দৈহিক শক্তি ও সাহস
আসাদুল্লাহ আল-গালিব 'আলীর (রা) যথার্থ উত্তরাধিকারী ছিলেন তিনি। 'ইলমের সাথে শক্তি ও সাহসও উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন। এত শক্তিশালী ছিলেন যে, লৌহ বর্ম দু'হাতে ধরে ফেঁড়ে ফেলতেন। হযরত 'আলীর (রা) একটি বর্ম একটু লম্বা ছিল। একদিন তিনি বর্মটি মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার হাতে দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, এই বেশি অংশটুকু কম করে দাও। তিনি এক হাতে বর্মটি ধরে অন্য হাতে বেশি অংশটুকু ধরে এক টানে দু'টুকরো করে ফেলেন। দৈহিক শক্তিতে 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর (রা) ছিলেন তাঁর প্রতিপক্ষ। একথা তাঁর সামনে কেউ উঠালে তিনি রাগে কাঁপতে থাকতেন। আল্লামা যিরিক্লী তাঁর শক্তি ও সাহসের কথা বলেছেন এভাবে:
"ইসলামের প্রাথমিক যুগের একজন শক্ত-কঠিন বীর। তাঁর শক্তি ও বীরত্বের কাহিনী অনেক।"
একবার রোমান সম্রাট খলীফা হযরত মু'আবিয়াকে (রা) লিখলেন, আমাদের এখানকার রাজা-বাদশারা বিভিন্ন জিনিস আদান-প্রদান করেন এবং প্রত্যেকে তার নিজ নিজ দেশের অভিনব ও বিস্ময়কর জিনিস পাঠিয়ে অন্যকে অভিভূত ও বিস্মিত করে থাকেন এবং গৌরব বোধও করেন। আপনার অনুমতি পেলে আমরাও তেমন আদান-প্রদান করতে পারি। হযরত মু'আবিয়া (রা) সম্মতি জানিয়ে তাঁকে তেমন কিছু পাঠানোর অনুমতি দেন। রোমান সম্রাট বিস্ময়কর দু'জন পুরুষ মানুষ মু'আবিয়ার (রা) নিকট পাঠান। তাদের একজন ছিল অত্যধিক লম্বা ও অত্যধিক মোটা। যেন জঙ্গলের কোন সুউচ্চ বৃক্ষ অথবা বিশাল আকৃতির কোন অট্টালিকা।

অন্যজন ছিল অত্যধিক শক্তিশালী এবং পাথরের মত শক্ত ও কঠিন। যেন একটা হিংস্র জন্তু। তাদের সাথে পাঠানো একটি পত্রে তিনি বলেন, আপনার সাম্রাজ্যে লম্বায় ও শক্তিতে এ দু'ব্যক্তির সমকক্ষ কেউ আছে কি? মু'আবিয়া (রা) 'আমর ইবন আল-'আসকে (রা) বললেন: লম্বায় তার মত একজনকে পেয়েছি, বরং তার চেয়ে একটু বেশি লম্বা হবে। আর সে হলো কায়স ইবন সা'দ ইবন 'উবাদা। তবে শক্তিমান ব্যক্তিটির ব্যাপারে আমি আপনার মতামত কামনা করছি।

'আমর বললেন: এই ব্যাপারটির জন্য দু'জন উপযুক্ত মানুষ আছেন। তবে দু'জনই এখন আপনার থেকে দূরে আছেন। তাঁরা হলেন 'আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর ও মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যা (রা)।

মু'আবিয়া (রা) বললেন: মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা দূরে নয়, কাছেই আছেন।

'আমর বললেন: আপনি কি মনে করেন তাঁর মত মর্যাদাবান ব্যক্তি এভাবে প্রকাশ্যে মানুষের সামনে একজন রোমানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে রাজী হবেন? মু'আবিয়া (রা) বললেন: তিনি যদি দেখেন এতে ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে তাহলে শুধু এতটুকু নয়, বরং এর চেয়ে বেশি করবেন।

হযরত মু'আবিয়া (রা) কায়স ইবন সা'দ ও মুহাম্মাদ উভয়কে ডেকে পাঠালেন। তাঁরা উপস্থিত হলেন। বৈঠক বসলো। এক পর্যায়ে কায়স ইবন সা'দ তাঁর একটি পায়জামা বিরাট বপুধারী রোমান পালোয়ানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সেটি তাকে পরতে বলেন। রোমান পালোয়ান সেটি পরলে তার বুকের উপরি ভাগ পর্যন্ত পৌঁছে। এ অবস্থা দেখে উপস্থিত লোকেরা হাসিতে ফেটে পড়ে।

অন্যদিকে মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়্যা দোভাষীকে বললেন: আপনি রোমান পালোয়ানকে বলুন, সে ইচ্ছা করলে বসে থেকে আমার দিকে একটি হাত বাড়িয়ে দিক এবং আমি দাঁড়িয়ে তাকে উঠানোর চেষ্টা করি। হয় আমি তাকে টেনে তুলবো, অথবা সে আমাকে টেনে বসিয়ে দেবে। অথরা এর বিপরীতটাও হতে পারে অর্থাৎ আমি বসে থাকবো, আর সে দাঁড়িয়ে আমাকে উঠানোর চেষ্টা করবে। রোমান পালোয়ান বসে থাকতে চাইলো। মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যা একটানে তাকে দাঁড়িয়ে দিলেন। রোমান ব্যক্তি মুহাম্মাদকে বসাতে ব্যর্থ হলো। এতে তার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লাগলো। সে এবার দাঁড়িয়ে মুহাম্মাদকে বসা অবস্থা থেকে উঠাতে চাইলো। মুহাম্মাদ বসলেন এবং রোমান লোকটির হাত ধরে এমন জোরে টান দিলেন যে, মনে হলো তার হাতটি কাঁধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তিনি তাকে মাটিতে বসিয়ে দিলেন।
এভাবে বিশাল দেহের অধিকারী-পালোয়ানদ্বয় শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে দেশে ফিরে গেল।

অবয়ব-আকৃতি ও পোশাক-পরিচ্ছদ
তিনি মধ্যমাকৃতির ছিলেন। শেষ বয়সে মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। চুলে মেহেদীর খিজাব লাগাতেন। "খুয” নামক এক প্রকার বস্ত্র ব্যবহার করতেন। মাথায় কালো পাগড়ী ধারণ করতেন এবং হাতে আংটি পরতেন। আবূ ইদরীস একদিন তাঁকে খিজাব লাগানো অবস্থায় দেখে প্রশ্ন করেন: আপনার পিতা 'আলী (রা) কি খিজাব লাগাতেন? বললেন: না। তবে আমি এটা করি স্ত্রীদের নিকট নিজেকে যুবক হিসেবে প্রকাশ করার জন্য।

স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি
তিনি একাধিক বিয়ে করেন। সেই স্ত্রী ও দাসীদের গর্ভে জন্ম নেয়া বহু সন্তানের জনক তিনি। সন্তানদের বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ: ১. আবূ হাশিম, ২. 'আবদুল্লাহ, ৩. হামযা, ৪. 'আলী, ৫. জা'ফার আল-আকবর- এ পাঁচজন একজন দাসীর গর্ভের সন্তান। ৬. হাসান- কায়স ইবন মাখরামা ইবন আল-মুত্তালিবের কন্যা জামাল-এর গর্ভজাত। ৭. ইবরাহীম- মুসরি'আ ইবন 'আব্বাদ ইবন শায়বান-এর গর্ভজাত। ৮. কাসিম, ৯. 'আবদুর রহমান- এ দু'জন বাররা বিনত 'আবদির রহমান ইবন হারিছ আল- মুত্তালিবীর গর্ভজাত। ১০. জা'ফার আল-আসগার, ১১. 'আওন, ১২. 'আবদুল্লাহ আল-আসগার- এ তিনজন হযরত জা'ফার ইবন আবী তালিবের পৌত্রী উম্মু কুলছুমের গর্ভজাত এবং ১৩. 'আবদুল্লাহ ও ১৪. রুকাইয়া- এ দু'জন একজন দাসীর গর্ভের সন্তান। ইবন সা'দ তাঁর সন্তানদের পরিচয় দান করতে গিয়ে বলেন:
"মুহাম্মাদ ইবন আল-হানাফিয়‍্যার ছেলে আল-হাসান ছিলেন বানু হাশিমের সুরসিক ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিবর্গের অন্যতম। তিনি 'ইরজা' মতবাদের প্রথম প্রবক্তা।”

টিকাঃ
১. আল-আ'লাম-৬/২৭০
২. আত-তাবাকাত-৫/৯২-
৩. আল-আ'লাম-৬/২৭০; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-২৬৬
৪. আত-তাবাকাত-৫/৯২
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩৯৫
৬. আত-তাবাকাত-৫/৯১; তাবি'ঈন-৪০৫
৭. ওয়াফাইয়াতুল আ'য়ান-১/৪৫০
৮. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-২৬৭
৯. আল-আখবার আত-তিওয়াল-১৪৮
১০. ওয়াফাইয়াত আল-আ'য়ান-১/৪৪৯; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-২৬৮
১১. আল-আখবার আত-তিওয়াল-১৪৮-১৪৯; তাবি'ঈন-৪০৬
১২. আত-তাবাকাত-৫/৯৩
১৩. প্রাগুক্ত
১৪. প্রাগুক্ত
১৫. আল-আখবার আত-তিওয়াল-১৭৫-১৭৬
১৬. আল-কামিল ফী আত-তারীখ-৩/২৬২
১৭. আল-আখবার আত-তিওয়াল-১৮২
১৮. মুরূজ আয-যাহাব-১/৩৪১
১৯. আল-আখবার আত-তিওয়াল-২২১
২০. সুওয়ারুন মিন হায়াত-আত-তাবি'ঈন-২৬৫
২১. প্রাগুক্ত
২২. আল-কামিল ফী আত-তারীখ-২/১৫২
২৩. তাবি'ঈন-৪১০
২৪. মুরূজ আয-যাহাব-১/৩৬৬
২৫. আত-তাবাকাত-৫/৯৮
২৬. প্রাগুক্ত
২৭. প্রাগুক্ত-৫/৯৯
২৮. প্রাগুক্ত
২৯. প্রাগুক্ত
৩০. আল-আখবার আত-তিওয়াল-২৫৭-৩০০; তাবি'ঈন-৪১৩
৩১. ইবন সা'দ
৩২. আত-তাবাকাত-৫/১০১
৩৩. প্রাগুক্ত-৫/১০১
৩৪. প্রাগুক্ত-৫/১০১-১০২
৩৫. প্রাগুক্ত-৫/১০৩-১০৪
৩৬. প্রাগুক্ত-৫/১০৫-১০৬: তাবি'ঈন-৪১৭-৪১৯
৩৭. প্রাগুক্ত-৫/১০৭
৩৮. প্রাগুক্ত
৩৯. প্রাগুক্ত-৫/১০৮
৪০. প্রাগুক্ত
৪১. প্রাগুক্ত-৫/১০৯
৪২. প্রাগুক্ত
৪৩. প্রাগুক্ত--৫/১১০
৪৪. প্রাগুক্ত-৫/১১১
৪৫. প্রাগুক্ত; তাবি'ঈন-৪২৪
৪৬. আত-তাবাকাত-৫/১১২; আল-আ'লাম-৬/২৭০; তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩১৯
৪৭. আত-তাবাকাত-৫/৯৪; তাবি'ঈন-৪২৮
৪৮. প্রাগুক্ত-৫/৯৯, ১০৬
৪৯. ওয়াফাইয়াত আল-আ'য়ান-১/৪৫; ড. হাসান ইবরাহীম হাসান, তারীখ আল-ইসলাম-১/৪০৫
৫০. আশ-শাহরাস্তানী, কিতাব আল-মিলাল ওয়া আন-নিহাল-২/১৯৬-১৯৮
৫১. কিতাবু ফিরাক আশ-শী'আ-২০-২১
৫২. আল-মিলাল ওয়া আন-নিহাল-২০২
৫৩. আত-তাবাকাত-৫/৯৪
৫৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩১৬
৫৫. আল-আ'লাম-৬/২৭০
৫৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৯/৩১৫
৫৭. প্রাগুক্ত; ড. হাসান ইবরাহীম হাসান-১/২৫৩
৫৮. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়া-১৩২
৫৯. শাযারাত আয-যাহাব-১/৮৯
৬০. আত-তাবাকাত-৫/৮৮
৬১. আল-আ'লাম-৬/২৭০
৬২. ওয়াফায়াত আল-আ'য়ান-১/৪৪৯; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-২৭৪
৬৩. আত-তাবাকাত-৫/১১৪
৬৪. ওয়াফায়াত আল-আ'য়ান-১/৪৫৩
৬৫. আত-তাবাকাত-৫/৯২

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 যাইনুল ‘আবিদ্বীন ‘আলী ইবন হুসাইন (রা)

📄 যাইনুল ‘আবিদ্বীন ‘আলী ইবন হুসাইন (রা)


হযরত 'আলী ইবন হুসাইনের (রা) 'কুনিয়াত' বা ডাকনাম আবুল হাসান এবং 'লকব' বা উপাধি যাইনুল 'আবিদীন। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) অত্যন্ত আদরের দৌহিত্র হযরত হুসাইনের (রা) কনিষ্ঠ পুত্র এই 'আলী। কারবালায় নবুওয়াতী উদ্যান তছনছ হওয়ার পর এই একটি মাত্র ফুল অবশিষ্ট ছিল যার মাধ্যমে দুনিয়াতে সাইয়্যিদ বংশের সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে এবং হযরত হুসাইনের (রা) নাম বিদ্যমান থাকে। তাঁর পিতৃকুলের শাজারা-ই-নসব (বংশধারা) সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল এবং চন্দ্রের চেয়েও দীপ্তিমান। তবে মাতৃকুলের শাজারা-ই-নসবের ব্যাপারে কিঞ্চিৎ মত পার্থক্য আছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে তিনি ছিলেন পারস্যের শেষ সম্রাট ইয়াযদাগুরদের দৌহিত্র।

বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে ইয়াযদাগুরদের পরাজয় হয় তখন আরো যুদ্ধ বন্দীদের সাথে তাঁর তিন মেয়েও বন্দী হয়। হযরত 'উমার (রা) অন্যান্য বন্দীদের মতো তাদেরকেও বিক্রির নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত 'আলী (রা) খলীফার সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, এই তিন শাহযাদীর সাথে অন্য সাধারণ মানুষের কন্যাদের সাথে যে আচরণ করা হয়, তেমন করা সঙ্গত হবে না। তিনি প্রস্তাব দেন তাদের মূল্য নির্ধারণ করা হোক এবং সেই মূল্যে যে কিনতে চায়, কিনে নিবে। সম্ভবতঃ হযরত 'আলী (রা) হযরত রাসূলে কারীমের (সা) একটি হাদীছের ভিত্তিতে এমন কথা বলেন। হাদীছটি এই : إِرْحَمُوا عزيز قوم ذل - "কোন কাওম বা জাতির সম্মানিত ব্যক্তি হেয় ও অপমানিত হলে তোমরা তার প্রতি দয়া দেখাবে।” 'উমার (রা) 'আলীর (রা) প্রস্তাবে রাজী হন। তিন শাহযাদীর একটা দাম নির্ধারণ করা হয় এবং তিনজনকেই 'আলী (রা) নিজে ক্রয় করেন। অতঃপর একজনকে হযরত আবূ বকরের (রা) ছেলে মুহাম্মাদকে, আরেকজনকে হযরত 'উমারের (রা) ছেলে হযরত 'আবদুল্লাহকে (রা) এবং তৃতীয়জনকে নিজের ছেলে হযরত হুসাইনকে (রা) দান করেন। এই তিন শাহযাদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন যথাক্রমে হযরত কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, হযরত সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (রা) ও হযরত 'আলী ইবন হুসাইন (রা)।

ইবন কুতাইবা (মৃত্যু ২৭৬ হি) যাইনুল 'আবিদীনের মা'কে সিন্ধুর এবং আল-ইয়া'কূবী কাবুলের মেয়ে এবং তার নাম সুলাফা অথবা গাযালা বলে উল্লেখ করেছেন। ইবন সা'দ গাযালা নামটিকেই গ্রহণ করেছেন। তিনি কোন বংশধারা উল্লেখ করেননি। তবে ইয়াযদাগুরদের শাহী বংশধারার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। ইয়াযদাগুরদের যে কন্যাটিকে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) দৌহিত্র হযরত হুসাইন ইবন 'আলীর (রা) হাতে সমার্পণ করা হয় তার ফার্সী নাম ছিল "শাহে যিনানা।" দাসী হিসাবে হযরত হুসাইনের সাথে যুক্ত হওয়ার পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন নিষ্ঠাবতী মুসলমানে পরিণত হন। পৌত্তলিক জীবনের সকল সম্পর্ক জীবন থেকে মুছে ফেলেন। এমনকি "শাহে যিনানা" (নারীদের রাণী) নামটি পরিত্যাগ করে "গাযালা” নাম ধারণ করেন। হযরত হুসাইন (রা) তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন এবং পরবর্তীতে উভয়ের সম্মতিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এভাবে গাযালা একজন চমৎকার স্বামী লাভ করেন। অল্পদিনের মধ্যে তিনি এক পুত্র সন্তানের মা হন এবং পিতা-মাতা তাঁদের শিশু সন্তানের নাম রাখেন তার মহান দাদা 'আলী ইবন আবী তালিবের (রা) নামে 'আলী ইবন আল হুসাইন (রা)। সন্তান প্রসবের পর মা "গাযালা” জ্বরে আক্রান্ত হন এবং তাতেই ইনতিকাল করেন। শিশু আলী মায়ের আদর ও স্নেহ-মমতা থেকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত হন। একজন দাসী তাঁকে মাতৃ স্নেহে লালন-পালন করেন। জীবনে তাকেই তিনি মা বলে জানেন।

একটু বুদ্ধি হলে তাঁকে শিক্ষার প্রতি মনোযোগী করে তোলা হয়। এ ব্যাপারে তাঁর মধ্যে প্রচণ্ড আগ্রহও লক্ষ্য করা যায়। তাঁর প্রথম শিক্ষালয়টি ছিল নিজ গৃহ। তেমনি প্রথম ও প্রধান শিক্ষক ছিলেন তাঁর মহান পিতা হযরত হুসাইন ইবন 'আলী (রা)। তাঁর দ্বিতীয় শিক্ষালয়টি ছিল মদীনার পবিত্র মাসজিদে নববী। এই মাসজিদ তখন সব সময় জীবিত সাহাবা ও বড় বড় তাবি'ঈন কিরামের (রহ) পদচারণায় মুখর থাকতো। তাঁরা মাসজিদের এখানে ওখানে হালকা করে সাহাবায়ে কিরামের (রা) সন্তানদেরকে কুরআন শিখাতেন, ইসলামী বিধি-বিধানের তত্ত্বজ্ঞান দান করতেন, তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ, সীরাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহের কাহিনী শোনাতেন এবং সেই সাথে আরবী কবিতা ও ভাষা সাহিত্যের জ্ঞানও দান করতেন। সাথে সাথে তাঁরা তাঁদের অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা, ভয়-ভীতির বীজও রোপন করতেন। এভাবে তাঁরা সত্য-সঠিক পথের অনুসারী বা 'আমল 'আলিমে পরিণত হতেন।

'আলী ইবন হুসাইনের (রা) মন মস্তিষ্কে আল কুরআন বিষয়টি যেভাবে স্থান পায় সেভাবে শিক্ষার অন্য কোন বিষয় স্থান পায়নি। সেই শৈশব থেকে আল কুরআনের ভয়-ভীতি ও আযাবের আয়াত পাঠ করে তার দেহে আবেগ অনুভূতি যেভাবে আন্দোলিত হতো তেমন আর কোন ব্যাপারে হতো না। জান্নাতের বর্ণনা সম্বলিত আয়াত পাঠের সময় এতই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়তেন যে, কল্পনায় যেন জান্নাতে পৌঁছে যেতেন। আর জাহান্নামের বর্ণনা সম্বলিত আয়াত পাঠের সময় তাঁর মনে হতো এই আগুনের লেলিহান শিখা যেন তাকে গ্রাস করতে আসছে।

কারবালায় ইয়াযীদ বাহিনীর এক শামী সৈনিক যে আহলি বাইত তথা নবী পরিবারের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিল। কারবালা যুদ্ধের পর সে আলী ইবন হুসাইনের খিদমত করতে থাকে। লোকটি আল্লাহকে ভয় করার কারণে হযরত আলী ইবন হুসাইনের অন্তরে তার প্রতি এক ধরনের মহব্বত সৃষ্টি হয়। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার সাথে আত্মীয়তার ন্যায় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

'উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের সংগে আলোচনা
কারবালায় বন্দী হওয়ার পর হযরত আল হুসাইনের (রা) সঙ্গী অন্য বন্দীদের সাথে তাঁকেও ইবন যিয়াদের সামনে হাজির করা হয়। তারপর দুইজনের মধ্যে নিম্নোক্ত কথোপকথন হয়।

ইবন যিয়াদ: তোমার নাম কি?
যাইনুল 'আবিদীন: আলী ইবন আল হুসাইন।
ইবন যিয়াদ: তোমার আরেক ভাইয়ের নামও তো আলী ছিল। আল্লাহ কি তাকে হত্যা করেননি?
যাইনুল 'আবিদীন: আমার আরেকটি ভাইয়ের নাম আলী ছিল। মানুষ তাকে হত্যা করেছে।
ইবন যিয়াদ: মানুষ নয়, বরং আল্লাহ তাকে হত্যা করেছেন।

ইমাম যাইনুল 'আবিদীন চুপ থাকলেন। ইবন যিয়াদ একই কথা আবারো বললো। এবার যাইনুল 'আবিদীন কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন:
"আল্লাহই প্রাণ হরণ করেন জীবসমূহের তাদের মৃত্যুর সময় এবং যাদের মৃত্যু হয়নি তাদের প্রাণ ঘুমের সময়।" "আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কারো মৃত্যু হতে পারে না, তা এক সুনির্দিষ্ট সময়ের লিখন।"

এ জবাব শুনে ইবন যিয়াদ রাগান্বিত হলো এবং তাকে হত্যার নির্দেশ দিল। এ অবস্থায় যাইনুল 'আবিদীনের ফুফু হযরত যায়নাব (রা) ইবন যিয়াদকে লক্ষ্য করে বলেন: যদি তাকে হত্যা করতে চাও তাহলে তার সাথে আমাকেও হত্যা কর। এরপর আল্লাহ ইবন যিয়াদের অন্তরে দয়া ও করুণা সৃষ্টি করেন। অতঃপর সে আহলি বাইতের অসহায় মহিলাদের সঙ্গে থাকার জন্য ইমাম যাইনুল 'আবিদীনকে ছেড়ে দেন।

ইবন যিয়াদ আহলি বাইত (রা) তথা নবী পরিবারের জীবিত সদস্যদেরকে দিমাশকে ইয়াযীদের নিকট পাঠিয়ে দেয়। তাঁদেরকে ইয়াযীদের সামনে হাজির করা হয়। তিনি ইমাম আল হুসাইনের (রা) ছিন্ন মাথা দেখে যাইনুল 'আবিদীনকে বলেন, 'আলী! যা কিছু তুমি দেখছো তা সবই তোমার পিতার কর্মফল। তিনি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, আমার অধিকারের ব্যাপারে উদাসীনতা দেখিয়েছেন এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে ঝগড়া করেছেন।

জবাবে ইমাম যাইনুল 'আবিদীন (রা) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন:
“পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করবার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে। আল্লাহর পক্ষে ইহা খুবই সহজ।"

পাশেই বসা ছিল ইয়াযীদের ছেলে খালিদ। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বলেন, খালিদ তুমি এর জবাব দাও। কিন্তু সে জবাব দিতে পারলো না। তখন ইয়াযীদ বললেন, তুমি এ আয়াতটি পড়:
"তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃত কর্মের ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তো তিনি ক্ষমা করে দেন।"

এই বৈঠকে জনৈক শামী ব্যক্তি অভিমত ব্যক্ত করে যে, এসব কয়েদী আমাদের জন্য হালাল। হযরত যাইনুল 'আবিদীন (রহ) বললেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি যদি মারাও যাও তবুও তোমার জন্য হালাল নয়। যতক্ষণ তুমি আমাদের দীন-ধর্ম থেকে বেরিয়ে না যাও। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় কোন মুসলমান বন্দী নারী কোন মুসলমানের জন্য হালাল নয়। ইয়াযীদ উক্ত শামী ব্যক্তিকে ধমক দিয়ে বসিয়ে দেন।

ইয়াযীদ আহলি বাইতের সাথে সাক্ষাতের পর তাঁদেরকে শাহী মহল “সারা”তে থাকার ব্যবস্থা করেন। এসব সম্মানিত মহিলাগণ তাঁর আত্মীয়া ছিলেন। এ কারণে তিন দিন পর্যন্ত ইয়াযীদের শাহী মহলে শোক ও মাতম বিরাজ করে। যতদিন তাঁরা সেখানে ছিলেন ইয়াযীদ তাঁদের সাথে অত্যন্ত ভদ্র ব্যবহার করেন। যাইনুল 'আবিদীনকে সংগে নিয়ে একই দস্তরখানে বসে আহার করতেন।

মদীনায় প্রত্যাবর্তন এবং ইয়াযীদের অঙ্গীকার
ইয়াযীদের শাহী মহলে কিছুদিন থাকার পর যখন আহলি বাইত কিছুটা সুস্থ ও স্বাভাবিক হলেন তখন ইয়াযীদ একদিন যাইনুল 'আবিদীনকে বললেন, "তোমরা যদি আমাদের সঙ্গে এখানে থাকতে চাও, থাকতে পার। আমি আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখবো, তোমাদের সকল অধিকার পূরণ করবো। আর ফিরে যেতে চাইলে যেতে পার। আমি তোমাদের সংগে ভালো আচরণ করতে থাকবো।” যাইনুল 'আবিদীন (রহ) ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।

তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী ইয়াযীদ তাঁদেরকে সরকারী সৈন্যদের তত্ত্বাবধানে নিরাপদে মদীনায় পাঠিয়ে দেন। বিদায় বেলা তিনি যাইনুল 'আবিদীনকে বলেন: "ইবন মারজানার উপর আল্লাহর अभিশাপ! আমি যদি উপস্থিত থাকতাম তাহলে আল হুসাইন (রা) যে দাবী করতেন, মেনে নিতাম। এভাবে তাঁর প্রাণ হরণ করতাম না। তাতে আমার নিজের ও আমার সন্তানদের জীবন চলে গেলেও পরোয়া করতাম না। যাই হোক, আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই হয়েছে। আগামীতে যখনই তোমাদের কোন কিছুর প্রয়োজন হবে সংগে সংগে আমাকে লিখে জানাবে। "

মদীনায় অবস্থান এবং নির্জনতা অবলম্বন
আপনজনদের শাহাদাত বরণ, বাড়ী-ঘরের বিধ্বস্ত অবস্থা এবং নিজের অসহায়ত্ব যাইনুল 'আবিদীনের অন্তরকে এমন চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় যে, মদীনায় ফেরার পর তিনি একেবারেই নির্জনতা অবলম্বন করেন এবং পরবর্তী কোন ধরনের আন্দোলনে অংশ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। যে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলামূলক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। ইয়াযীদও সব সময় তাঁর প্রয়োজন ও সুখ-সুবিধার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন।

'আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের (রা) বিদ্রোহ এবং যাইনুল 'আবিদীনের সম্পর্কহীনতা
হযরত ইমাম আল হুসাইনের (রা) শাহাদাত বরণের পর হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) ইয়াযীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। হিজাযের অধিবাসীরা তাঁর আনুগত্যের বাই'আত করে। মক্কা ও মদীনাবাসীরা এই দুই স্থান থেকে উমাইয়াদের নিয়োগকৃত কর্মকর্তাদের তাড়িয়ে দেয়। ইয়াযীদ হারামাইনের অধিবাসীদেরকে সতর্ককরণের জন্য মুসলিম ইবন 'উকবার নেতৃত্বে একদল দুঃসাহসী সৈন্য পাঠান। যাইনুল 'আবিদীনকে (রহ) কোন রকম বিরক্ত না করার জন্য বাহিনীর অধিনায়ককে তিনি সতর্ক করে দেন। মদীনাবাসীরা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। মদীনায় অসংখ্য মানুষ মারা যায়, ইয়াযীদের বাহিনী কয়েকদিন ধরে মদীনায় লুটতরাজ চালায়। এই যুদ্ধে যাইনুল 'আবিদীন (রহ) ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা কোন রকম অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। তাঁরা মদীনা ছেড়ে 'আকীকে চলে যান।

মদীনাতুর রাসূলকে বিরাণভূমিতে পরিণত করার পর মুসলিম ইবন 'উকবা 'আকীকে যাইনুল 'আবিদীনের উপস্থিতির খবর পেয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য লোক পাঠান। তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর ভাইপো আবদুল্লাহ ইবন জাফর। যাইনুল 'আবিদীন অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে মুসলিমের সাথে মিলিত হন। তিনি তাঁকে নিজের পাশে বসিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করেন এবং খলীফার দেয়া সম্মানীর কথা উল্লেখ করেন। যাইনুল 'আবিদীন ইয়াযীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

মুখতার আছ-ছাকাফীর বিদ্রোহ এবং যাইনুল আবিদীনের সম্পর্কহীনতা
এ সময় উচ্চাভিলাষী ও পাপাচারী মুখতার আছ-ছাকাফী রাষ্ট্র ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে আহলি বাইতের প্রতি ভালোবাসার নামে হযরত ইমাম হুসাইনের (রা) রক্তের বদলা নেওয়ার দাবীর আশ্রয় নেয়। সে তার উদ্দেশ্যে হাসিলের জন্য যাইনুল আবিদীনের নিকট মোটা অংকের সম্মানী পাঠিয়ে বলে, আপনি আমাদের ইমাম। আমাদের থেকে বাই'আত গ্রহণ করুন। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য যাইনুল আবিদীনের জানা ছিল। এ কারণে তিনি তার এ আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন এবং তিনি মসজিদে নববীতে গিয়ে এই মুখতারের বিকৃতি, পাপাচার ও নাস্তিকতার রাজ-রহস্য ফাঁস করেন দেন। তিনি জনগণকে লক্ষ্য করে বলেন: সে শুধু মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য আহলি বাইতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। আসলে সে আহলি বাইতের একজন দুশমন।

খলীফা আব্দুল মালিকের খিলাফতকালে ইমাম যাইনুল আবিদীন রাজনৈতিক সংঘাত থেকে দূরে থাকেন। মুখতারের ব্যাপারে তাঁর মন্তব্য ছিল অত্যন্ত কঠোর। আলী ইবনুল হুসাইন মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে মুখতারকে অভিশাপ দিতেন। জনৈক ব্যক্তি একদিন তাঁকে মুখতার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: "সে ছিল মিথ্যাবাদী, আল্লাহ ও রাসূলের (সা) প্রতি মিথ্যা আরোপ করতো।”

দুনীয়া বিরাগী এই মহান ইমামের মৃত্যু সন নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আল্লামা যাহাবী হিজরী ৯৪ সনের কথা বলেছেন। আল-ইয়া'কূবী হিজরী ৯৪ মতান্তরে ৯৫ সনের কথা উল্লেখ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল আটান্ন (৫৮) বছর। মদীনায় ইনতিকাল করেন এবং আল-বাকী' গোরস্তানে চাচা হযরত আল হাসানের (রা) পাশে দাফন করা হয়।

জ্ঞান ও ফিকহ্
জ্ঞানের জগতে তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। ইমাম যুহরী (রহ) বলতেন, "মদীনায় আমি তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কাউকে পাইনি।" ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, "প্রতিটি জিনিসে তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে সকলে একমত।"

হাদীছ: বিখ্যাত হাফিজে হাদীছদের মধ্যে যদিও তাঁকে গণ্য করা হয় না তা সত্ত্বেও হাদীছ হিজ তথা স্মৃতিতে ধারণের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। ইবন সা'দ বলেছেন: "তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত আমানতদার, বহু হাদীছের ধারণকারী, অত্যুচ্চ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।"

হাদীছের জ্ঞান তিনি অর্জন করেন মহান পিতা হযরত আল হুসাইন (রা), চাচা হযরত আল হাসান (রা), দাদা ইবনুল 'আব্বাস (রা), নানী উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা), উম্মু সালামা (রা), সাফিয়্যা (রা), আবু হুরাইরা (রা), মিসওয়ার ইবন মাখরামা ও সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের (রহ) নিকট থেকে।

হাদীছ শাস্ত্রে বর্ণনার সনদসমূহের মধ্যে একটি সনদকে 'সিলসিলাতুয যাহাব' বা সোনার চেইন বলা হয়। আর সেটা হলো যে সনদের ধারাবাহিকতায় তাঁর মহান দাদা, পিতা ও তিনি আছেন। আবূ বকর ইবন শাইবা বলেন, "যুহরীর ঐ সকল বর্ণনা যা 'আলী ইবনুল হুসাইন (যাইনুল 'আবিদীন), তাঁর মহান পিতা ও দাদার সিলসিলায় বর্ণিত হয়েছে, তাই হলো সর্বাধিক সঠিক ও বিশুদ্ধ সনদ।

ছাত্র-শিষ্য: তাঁর ছাত্র-শিষ্যের পরিধি অনেক ব্যাপক। তাঁর ছেলেদের মধ্যে মুহাম্মাদ, যায়দ, 'আবদুল্লাহ ও 'উমার সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। সাধারণ রাবীদের মধ্যে আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান, তাউস ইবন কায়সান, ইমাম যুহরী, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, হিশাম ইবন 'উরওয়া এবং আরো অনেকে।

ফিক্হ: ফিক্হ শাস্ত্রে তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। ইমাম যুহরী বলতেন, "আমি 'আলী ইবনুল হুসাইনের (রা) চেয়ে বড় কোন ফকীহ্ দেখিনি।” ফিক্হ শাস্ত্রে তাঁর মনীষার বড় সনদ এই যে, মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহর পরেই ছিল তাঁর স্থান।

জ্ঞানগর্ভ কথা
তাঁর বিভিন্ন কথা তাঁর জ্ঞানগর্ভ পূর্ণতার দর্পণ এবং উপদেশ ও নীতিকথার পাঠ হিসাবে গণ্য করা হয়। তিনি বলতেন, "প্রিয়জনদের হারানোই প্রমাণ করে সে একজন মুসাফির। হে আল্লাহ! আপনি আমার বাহ্যিক অবস্থাকে মানুষের দৃষ্টিতে ভালো দেখিয়ে আমার অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে খারাপ করে দেন- এ ব্যাপারে আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। কিছু মানুষ ভয়ে আল্লাহর 'ইবাদাত করে। এ হলো দাসের 'ইবাদাত। আর কিছু মানুষ জান্নাতের লোভে 'ইবাদাত করে। এ হলো ব্যবসায়ীদের 'ইবাদাত। কিছু মানুষ কেবল আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য 'ইবাদাত করে। এটাই হলো মুক্ত-স্বাধীন মানুষের 'ইবাদাত।"

তিনি বলতেন: কিয়ামতের দিন একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে- মর্যাদাবান ব্যক্তিগণ ওঠো! কিছু লোক উঠে দাঁড়াবে, তখন তাদেরকে বলা হবে: তোমরা বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাও। ফেরেশতারা বলবে: তোমাদের এমন সম্মান ও মর্যাদা কিসের জন্য? তারা বলবে : দুনিয়াতে যখন কেউ আমাদের সাথে মূর্খের মতো আচরণ করেছে, আমরা তখন তাদের সাথে বিচক্ষণ ব্যক্তির মতো আচরণ করেছি। যখন আমরা অত্যাচারিত হয়েছি, ধৈর্য ধারণ করেছি। আমাদেরকে কেউ ব্যথা দিলে আমরা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

চারিত্রিক গুণাবলী
তাঁর চরিত্র ছিল একটি আলোকিত প্রদীপের মতো যা থেকে অন্যরা পথ দেখতো। তিনি ছিলেন হযরত রাসূলে কারীমের (সা) স্বভাব-আখলাকের প্রতিচ্ছবি। বানু হাশিম খান্দানে তাঁর চাইতে উত্তম আর কেউ তাঁর সময়ে ছিলেন না।

আল্লাহ-ভীতি: তাঁর অন্তর সর্বদা আল্লাহ-ভীতিতে পরিপূর্ণ থাকতো। অনেক সময় আল্লাহর ভয়ে অচেতন হয়ে পড়তেন। একবার 'আলী ইবনুল হুসাইন (রা) হজ্জে গেলেন। ইহরাম বেঁধে যখন বাহনের পিঠে উঠে বসলেন তখন আল্লাহর ভয়ে তাঁর সারা দেহ পাণ্ডুবর্ণ হয়ে যায় এবং এমনভাবে কাঁপতে থাকেন যে মুখ থেকে “লাব্বাইক” পর্যন্ত বের হলো না। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, আপনি “লাব্বাইক" উচ্চারণ করছেন না কেন? বললেন: আমার ভয় হচ্ছে এই ভেবে যে, আমি লাব্বাইক বলবো, আর সেদিক থেকে জবাব আসে “লা লাব্বাক”।

'ইবাদাত ও আধ্যাত্মিক সাধনা: তাঁর শিরা-উপশিরায় ঐ সকল মহান ব্যক্তির পবিত্র রক্ত বহমান ছিল, অসীর নীচেও যাঁদের 'ইবাদাত-বন্দেগী ছুটতে পারেনি। এ কারণে তিনিও ছিলেন একজন দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত 'আবিদ ব্যক্তি। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) বলতেন: 'আলী ইবনুল হুসাইনের (রা) চাইতে বেশী আল্লাহ-ভীরু মানুষ আমার দৃষ্টিতে পড়েনি। রাত-দিনের বেশীরভাগ সময় তাঁর কাটতো 'ইবাদাতে। বলা হয়েছে রাত-দিনে এক হাজার রাক'আত নামায আদায় করতেন। আর এ কারণেই তাঁর উপাধি হয়ে যায় 'যাইনুল 'আবিদীন' বা 'আবিদ ব্যক্তিদের সৌন্দর্য।

তার একাগ্রতার অবস্থা এমন ছিল যে, নামায অবস্থায় অন্য কোন কিছুর খবর থাকতো না। একবার যখন সিজদায় ছিলেন তখন পাশেই কোথাও আগুন লাগে। লোকেরা “ইয়া ইবন রাসূলিল্লাহ”- “হে আল্লাহর রাসূলের বংশধর” বলে ডাকতে থাকে, কিন্তু তিনি সিজদা থেকে মাথা তুললেন না। এক পর্যায়ে আগুন নিভে যায়। পরে লোকেরা জিজ্ঞেস করলো: কোন জিনিস আপনাকে আগুনের ব্যাপারে এত উদাসীন করে দিয়েছিল? বললেন: অন্য আগুন। অর্থাৎ জাহান্নামের আগুন।

হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) বলেন: "আমি 'আলী ইবন আল-হুসাইনের (রা) চাইতে ভালো মানুষ আর কখনো দেখিনি। যখনই তাঁকে দেখেছি, আমি নিজেকে তিরস্কার করেছি। আমি তাঁকে কোন দিন কখনো হাসতে দেখিনি।"

আমর বিল মা'রূফ ও নাহি 'আনিল মুনকার
সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধকে এত গুরুত্ব দিতেন যে, এ ব্যাপারে কোন রকম গাফলাতি বা উদাসীনতাকে কিতাবুল্লাহর প্রতি উদাসীনতা বলে গণ্য করতেন।

ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ
দানশীলতা এবং সাগরের মতো উদারতা ছিল তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর রাস্তায় তিনি অকৃপণ হাতে ব্যয় করতেন। মদীনার কত গরীব পরিবার যে তাঁর উদার সাহায্যে জীবন ধারণ করতো তা অজ্ঞাত রয়ে গেছে। কারণ, কেউ কখনো তা জানতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুর পর জানা গেছে, গোপনে তিনি এক শো পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতেন।

খাদ্য-সামগ্রীর বস্তা নিজের পিঠে উঠিয়ে অভাবীদের গৃহে পৌঁছে দিতেন। মৃত্যুর পর যখন গোসল দেওয়া হচ্ছিল তখন তাঁর দেহে নীল রংয়ের বড় দাগ দেখা যায়। কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় যে, তা ছিল আটার বস্তা বহনের দাগ। সেই আটা তিনি রাতের অন্ধকারে অভাবী মানুষের বাড়ীতে পৌছে দিতেন। তিনি বলতেন, দান-খয়রাত প্রার্থীর হাতে পৌঁছার পূর্বে আল্লাহর হাতে পৌঁছে যায়।

দাস-দাসী মুক্ত করা ছিল তাঁর আরেকটি প্রিয় কাজ। বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর জীবনে এক হাজার দাস মুক্ত করেন। সাধারণত: 'ঈদুল ফিতরের রাতেই অধিক হারে দাস-মুক্তির কাজটি করতেন।

ধৈর্য ও সহনশীলতা
ধৈর্য ও সহনশীলতায় পিতা হযরত হুসাইনের (রা) মতই ছিলেন। অনেক সময় অনেক বেয়াদব তাঁকে গালি দিত, তিনি তা হজম করতেন। একবার তিনি মসজিদ থেকে বের হলেন, পথে এক ব্যক্তি তাঁকে গালি দিতে শুরু করলো। তিনি লোকটিকে লক্ষ্য করে বললেন, আমার যে সকল গুণ তোমার অজানা তা তুমি যা বলছো তার চাইতে অনেক ভালো। তোমার কোন প্রয়োজন থাকলে বল আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। এমন জবাব শুনে লোকটি ভীষণ লজ্জিত হয়। তিনি নিজের জামাটি খুলে তাকে দান করেন। সেই সাথে এক হাজার দিরহামও দেন।

ক্ষমা ও উপেক্ষা
তাঁর চরম দুশমন, তাঁর প্রতি হিংসা-বিদ্বেষে যাদের অন্তর পরিপূর্ণ ছিল, সুযোগ পেয়েও তিনি কোন বদলা নেননি। মদীনার ওয়ালী হিশাম ইবন ইসমা'ঈল তাঁকে এবং গোটা আহলি বাইতকে নানাভাবে ভীষণ কষ্ট দিত। পরে যখন হিশাম ক্ষমতাচ্যুত হলো এবং তাকে শাস্তি দেয়ার নির্দেশ হলো, তখন যাইনুল আবিদীন তাঁর সাথীদের হিশামকে কষ্ট দিতে বারণ করেন। এতে হিশাম তাঁর গুণমুগ্ধ হয়ে যান।

মানুষের প্রীতি ও ভক্তি-শ্রদ্ধা
তাঁর এমন ধৈর্য, সহনশীলতা, ক্ষমা, উদারতা ও নম্রতার ফলে মানুষের অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসা স্থায়ী হয়ে যায়। একবার হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক (তখোনো খলীফা হননি) হজ্জে গিয়ে ভীড়ের কারণে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতে পারলেন না। কিন্তু ইমাম যাইনুল 'আবিদীন আসতেই মানুষ পথ ছেড়ে দিল এবং তিনি সহজেই চুমু দিলেন। এ দৃশ্য দেখে এক শামী ব্যক্তি পরিচয় জানতে চাইলে হিশাম ঈর্ষাবশত বলেন: জানি না। তখন কবি ফারাযদাক তাৎক্ষণিকভাবে হযরত যাইনুল 'আবিদীনের প্রশংসায় একটি কাসীদা পাঠ করেন।

সাম্য ও সমতা
বংশীয় আভিজাত্য দূর করা এবং সাম্য ও সমতার বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য তিনি নিজের এক মেয়েকে তাঁর এক দাসের সাথে বিয়ে দেন এবং এক দাসীকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে নিজে তাঁকে বিয়ে করেন।

আহলি বায়তের ভালোবাসার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থার উপদেশ
তিনি ভক্তদের অসংযত প্রেমকে অপসন্দ করতেন। বলতেন: 'তোমরা ইসলাম নির্ধারিত সীমার মধ্যে আমাদেরকে ভালোবাস। আল্লাহর কসম! তোমরা আমাদের সম্পর্কে এত অতিরঞ্জিত কথা বলে থাক যা অনেকের নিকট আমাদেরকে অপ্রিয় করে দিয়েছে।"

তিনজন খলীফায়ে রাশেদা-এর প্রতি সুধারণা
নিজের সত্যপন্থী পূর্বসূরীদের মত আবু বকর, 'উমার ও 'উসমান (রা)- তিন খলীফার প্রতি ইমাম যাইনুল 'আবিদীনও সুধারণা পোষণ করতেন। তাঁদের নিন্দা-মন্দ ও সমালোচনা শোনা মোটেই পসন্দ করতেন না। হযরত 'উসমান (রা) সম্পর্কে তিনি বলতেন, আল্লাহর কসম! তাঁকে অন্যায়ভাবে শহীদ করা হয়েছে।

দৈহিক অবয়ব ও আকৃতি: তিনি সুন্দর অবয়ব ও আকৃতির ছিলেন। দেহ থেকে সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়তো। সুন্দর ও দামী পোশাক পরতেন। সুরুচি ও পরিচ্ছন্নতা ছিল তাঁর স্বভাবগত। এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলো কেন তিনি পায়খানায় যাওয়ার জন্য আলাদা পোশাক বানাতে চেয়েছেন? তিনি বলেছিলেন: কারণ আমি দেখেছি ময়লার ওপর মাছি বসে এবং তা উঁকে এসে মানুষের গায়ে পড়ে।

টিকাঃ
১. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৩
২. ইবন কুতাইবা, আল মা'আরিফ-৫৪
৩. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৩; তাবি'ঈন-২৯৩
৭. তাবাকাত-৫/১৫৭
৮. প্রাগুক্ত
৯. সূরা আয-যুমার-৪২; সূরা আলে 'ইমরান-১৪৫
১০. তাবাকাত-৫/১৫৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৪/৭০-৭১
১১. সূরা আল-হাদীদ-২২
১২. সূরা আশ-শূরা-৩০
১৩. তারীখ আত-তাবারী-৭/৩৭৬
১৪. প্রাগুক্ত
১৫. তাবাকাত-৫/১৫৭
১৬. আত-তাবারী-৭/৩৭৯
১৭. ইবন সা'দের তাবাকাতে নামটি মুসরিফ ইবন ‘উকরা এসেছে।
১৮. মাসউদী, মুরূজ আয-যাহাব-২/৪৭৯-৪৮০
১৯. তাবাকাত-৫/১৫৮
২০. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৫
২১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৫
২২. আল-ইয়া'কূবী, তারীখ-২/৩০৩; ইবন খাল্লিকান, ওয়াফইয়াত
২৩. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৪৩
২৪. তাবাকাত-৫/১৬৪
২৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/৩০৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৫
২৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/৩০৫
২৭. প্রাগুক্ত
২৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৫
২৯. আ'লাম আল-মুওক্কি'ঈন-১/২৬
৩০. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৩
৩১. প্রাগুক্ত
৩২. আল-ইয়া'কূবী, তারীখ-২/৩০৩-৩০৪
৩৩. তাহযীবুল আসমা'-১/৩৪৩
৩৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৭/৩০৬
৩৫. আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৩; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৫ মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৭
৩৬. তাবাকাত-৫/১৬০
৩৭. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৩৪২
৩৮. প্রাগুক্ত
৩৯. সূরা আল-মু'মিনূন-১০১
৪০. সূরা আল-আম্বিয়া-২৮
৪১. সূরা আল-আ'রাফ-৫৬
৪২. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন: ৩৪৩-৩৪৪
৪৩. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৩
৪৪. তাবাকাত-৫/১৬০
৪৫. আল-ইয়া'কূবী, তারীখ-২/৩০৩
৪৬. প্রাগুক্ত
৪৭. তাবাকাত-৫/১৬০
৪৮. তাহযীব আল-আসমা'-১/৩৪৩
৪৯. আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৩; মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৪
৫০. তাবাকাত-৫/১৬০-১৬২
৫১. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৩৪৮
৫২. প্রাগুক্ত-৩৪৬
৫৩. প্রাগুক্ত: ৩৪১-৩২
৫৪. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৭
৫৫. তাবাকাত-৫/১৬৩
৫৬. ড: 'উমার ফাররূখ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-১/৬৬২; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন: ৩৪৯-৩৫২
৫৭. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৬
৫৮. প্রাগুক্ত
৫৯. তাবাকাত-৫/১৫৯
৬০. প্রাগুক্ত-৫/১৫৮
৬১. সূরা আল-হাশর-৮
৬২. প্রাগুক্ত-৯
৬৩. মুখতাসার সাফওয়াতিস সাফওয়াহ্-১৩৪; তাবাকাত-৫/১৬০
৬৪. তাবাকাত-৫/১৬০
৬৫. প্রাগুক্ত-৫/১৬২
৬৬. প্রাগুক্ত

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘আমর ইবন দীনার (রহ)

📄 ‘আমর ইবন দীনার (রহ)


হযরত 'আমর ইবন দীনারের (রহ) কুনিয়াত বা ডাকনাম ছিল আবূ মুহাম্মাদ। বাযান 'আজমীর আযাদকৃত দাস ছিলেন। হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালে হিজরী ৪৫/৪৬ সনে অথবা তার কাছাকাছি সময়ে মক্কায় জন্ম গ্রহণ করেন।

তাঁর সম্মান ও মর্যাদা
জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি মক্কার শ্রেষ্ঠ 'আলিমদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে হাদীছের হাফিয, ইমাম ও মক্কার হারামের ইমাম অভিধায় ভূষিত করেছেন। তিনি বলেন:
"তিনি তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব ও মক্কার হারামের শায়খ তথা সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি।"
ইমাম নাওবী (রহ) বলেন, তাঁর মহত্ত্ব, নেতৃত্ব ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সকলে একমত। তিনি ছিলেন তাবি'ঈন শ্রেণীর ইমাম। আল-হাকেম তাঁর "আল-মুযাক্কী আল-আখবার" গ্রন্থে বলেছেন: "তিনি শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের একজন।"

'ইলমে হাদীছে তাঁর স্থান
তিনি হাদীছের একজন বড় হাফিয ছিলেন, ইবন সা'দ বলেন: "'আমর ছিলেন বিশ্বস্ত, সুদৃঢ় ও বহু হাদীছ স্মৃতিতে ধারণ ও বর্ণনাকারী।" সাহাবীদের মধ্যে ইবন 'উমার, ইবন 'আব্বাস, ইবন যুবাইর, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, আবূ হুরাইরা, জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, আবুত তুফায়ল, সায়িব ইবন ইয়াযীদ, আনাস ইবন মালিক (রা) প্রমুখের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন। তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, সা'ঈদ ইবন আয-যুবাইর, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, তাউস, 'আতা, মুহাম্মাদ ইবন 'আলী, মুজাহিদ, আবূ মুলাইকা, সুলাইমান ইবন ইয়াসার, ওয়াহাব ইবন 'উতবা, যুহরী, সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না, সুফইয়ান আছ-ছাওরী (রহ) প্রমুখ সহ বিখ্যাত তাবি'ঈদের বড় একটি দলের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন ও বর্ণনা করেন।

হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞান ছিল অতি ব্যাপক ও গভীর। সমকালীন আলিমদের সম্মিলিত জ্ঞান তিনি নিজের বুকে ধারণ করেন। বিখ্যাত তাবি'ঈ তাউস (রহ) তাঁর ছেলেকে বলতেন:
"ছেলে, যখন তুমি মক্কায় যাবে, 'আমর ইবন দীনারের সাথে অবশ্যই সাক্ষাৎ করবে। কারণ, তাঁর কান 'আলিমদের বশীভূত।"

তাঁর বর্ণিত হাদীছের স্থান
হাদীছ বিশারদদের নিকট তাঁর বর্ণিত হাদীছের স্থান অনেক ঊর্ধ্বে। ইমাম যুহরী বলতেন, আমি উঁচু মানের হাদীছের ক্ষেত্রে এই শায়খ তথা বিজ্ঞ ব্যক্তির চাইতে আর কাউকে দেখিনি। ইবন 'উয়ায়না ও 'আমর ইবন জারীর তাঁকে- "বিশ্বস্ত, দৃঢ়পদ, সত্যবাদী ও বহু হাদীছের ধারক"- বলতেন।

রিওয়ায়াত বিল মা'না বা হাদীছের ভাব ও অর্থ বর্ণনা
হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তা সত্ত্বেও শ্রুত মূল শব্দসহ হাদীছ বর্ণনা করা জরুরী মনে করতেন না। তিনি নিজের ভাষায় শ্রুত হাদীছের অর্থ ও ভাব বর্ণনা করতেন। হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর অগাধ জ্ঞানের কারণে তিনি এর একজন নির্ভরযোগ্য সূত্রে পরিণত হন।

তাঁর ছাত্র-শিষ্য
তাঁর ব্যাপক জ্ঞান তাঁর ছাত্র-শিষ্যের গণ্ডিকে ভীষণ প্রশস্ত করে দেয়। তাঁর সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজন ছাত্র হলেন: ইমাম জা'ফার আস-সাদিক, আবু কাতাদা, মিসওয়ার, ইবন আবী নাজীহ, হাম্মাদ, সুফইয়ান (রহ) ও আরো অনেকে।

ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রেও তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত। কুরআন ও সুন্নাহতে গবেষণা করে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও আইন-কানুন বের করার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল যেমন ইজতিহাদের বিশেষ যোগ্যতা, তেমনি ছিল স্বকীয়তাও। ইমাম নাওবী (রহ) লিখেছেন, তিনি মাযহাবপন্থীদের অনুকরণীয় একজন বড় মুজতাহিদ ছিলেন। প্রায় তিরিশ বছর যাবত ফাতওয়া দেন। তৎকালীন অনেক বড় বড় আলিম তাঁকে তাউস, 'আতা ও মুজাহিদের (রহ) মতো শ্রেষ্ঠ 'আলিমদের উপর প্রাধান্য দিতেন।

সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না বলতেন:
"আমাদের দৃষ্টিতে 'আমর ইবন দীনারের চাইতে বড় ফকীহ্, বড় 'আলিম এবং বড় হাফিযে হাদীছ আর কেউ ছিলেন না।"

সতর্কতা
অত্যধিক সতর্কতার কারণে তিনি হাদীছ ও ফিক্হ সংক্রান্ত মাসআলা-মাসায়িল লেখালেখি পসন্দ করতেন না। বলতেন, মানুষ আমাদেরকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে। আমরা তার উত্তর দিলে তারা তা পাথরে খোদাই করার মতো লিখে নেয়। হতে পারে আজ যে সিদ্ধান্ত আমরা দিলাম, আগামীকাল তা প্রত্যাহার করে নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম। তখন পূর্বের ভুল সিদ্ধান্তটি লিখিত থেকে গেল। একবার জনৈক ব্যক্তি তাঁকে বললো, সুফইয়ান আপনার নিকট থেকে যা কিছু শোনে তা লিখে রাখে। একথা শুনে তিনি কাঁদতে থাকেন। তারপর বলেন, যে ব্যক্তি আমার কথা লেখে সে আমার প্রতি বড় যুলুম করে। তিনি বলতেন:
"আমার থেকে কেউ কিছু লিখে রাখুক তা আমি পসন্দ করি না। আমি কারো কাছ থেকে কিছু লিখিনি। আমি মুখস্থ করতাম।"

একবার এক ব্যক্তি কোন একটি জিনিস সম্পর্কে তাঁর নিকট জিজ্ঞেস করে। তিনি কোন জবাব দিলেন না। প্রশ্নকারী বললো, জিনিসটির ব্যাপারে আমার অন্তরে একটু সন্দেহ আছে। এ কারণে আপনার নিকট থেকে একটি জবাব পেতে চাই। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! তোমার অন্তরে আবূ কুবায়স পাহাড় পরিমাণ সন্দেহ থাকার পরিবর্তে আমার অন্তরে একটি পশম পরিমাণ সন্দেহ থাকা আমার কাছে বেশী অপসন্দনীয়।

তাঁর 'ইবাদাত-বন্দেগী
তিনি একজন ভীষণ 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। রাতের বেশীর ভাগ 'ইবাদাত-বন্দেগীতে অতিবাহিত করতেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না (রহ) বলেনঃ
"'আমর ইবন দীনার রাতকে তিন ভাগে ভাগ করে নিতেন। এক ভাগে ঘুমোতেন, এক ভাগে হাদীছ বর্ণনা করতেন এবং আরেক ভাগ নামাযে অতিবাহিত করতেন।"

জামা'আতে নামায আদায়ের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান
তিনি জামা'আতে নামায আদায়ের প্রতি এত গুরুত্ব দিতেন যে, বার্ধক্যে যখন শক্তিহীন হয়ে পড়েন এখনও নিজের বাসস্থান থেকে বেশ দূরে মসজিদেই নামায আদায় করতেন। সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না (রহ) বলেন, তিনি জীবনের কোন পর্যায়ে মসজিদে যাওয়া- আসা বন্ধ করেননি। গাধার পিঠে বসিয়ে তাঁকে মসজিদে আনা হতো।

ইসলামী সেবামূলক কাজের বিনিময়ে কোন কিছু না নেয়া
তিনি সেবামূলক কোন কাজের বিনিময় বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা ভালো মনে করতেন না। এ জাতীয় সকল কাজ তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করতেন। তৎকালীন খলীফা একবার তাঁর ইচ্ছার কথা এভাবে ব্যক্ত করেন যে, আমি আপনার জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দেই, আর আপনি নিশ্চিন্ত মনে ফাতওয়ার দায়িত্বটি পালন করে যান। তিনি এ প্রস্তাবে রাজী হননি।

আল-ওয়াকিদী বলেছেন, 'আমর ইবন দীনার হিজরী ১২৬ সনে আশি বছর বয়সে ইনতিকাল করেন।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৩; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৩০০; আসরুত তাবি'ঈন-৪৪৭
২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৩
৩. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৩০০
৪. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২৭
৫. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৩/৫০০
৬. তাবাকাত-৫/৪৮০
৭. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৩
৮. তাবাকাত-৫/৪৭৯; তাহযীব আত-তাহযীব-৮/২৯
৯. তাবাকাত-৫/৪৮০
১০. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩০
১১. তাবাকাত-৫/৪৮০
১২. তাহযীব আত-তাহযীব-৮/৩০
১৩. তাহযীবুল আসমা'-১/২৭; তাহযীবুত তাহযীব-৮/৩০
১৪. তাহযীবুল আসমা'-১/২৭
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৩; 'আসরুত তাবি'ঈন-৪৪৭
১৬. তাবাকাত-৫/৪৮০
১৭. প্রাগুক্ত
১৮. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৩০১
১৯. প্রাগুক্ত-৫/৩০৭
২০. তাবাকাত-৫/৪৮০
২১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৩০২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৩
২২. তাবাকাত-৫/৪৭৯
২৩. প্রাগুক্ত
২৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৩

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 রাবী‘আ ইবন ফাররূখ আর-রায় (রহ)

📄 রাবী‘আ ইবন ফাররূখ আর-রায় (রহ)


হিজরী ৫১ সনের কথা। মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী তখন ইসলামের সুমহান বিশ্বাস ও বাণী বহন করে দিবিদিক ছড়িয়ে পড়েছে। বিজয়ী সেনাপতি, সিজিস্তান বিজয়ী ও খুরাসানের আমীর মহান সাহাবী আর-রাবী' ইবন যিয়াদ আল-হারিছী (রা) তাঁর বাহিনীসহ রণাঙ্গনে অবস্থান করছেন। সংগে আছেন তাঁর সাহসী দাস ফাররূফ।

সায়হুন নদী পার হওয়ার সময় যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয় তাতে সেনাপতির দাস ফাররূফ দারুণ সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দেন। এতে সেনাপতি রাবী' (রা) ভীষণ খুশী হন এবং তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তির ঘোষণা দেন।

সেনাপতি রাবী' ইবন যিয়াদ (রা)-এর মৃত্যুর পর ফাররূফ মদীনায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বিপুল অর্থ-সম্পদ নিয়ে তিনি মদীনায় ফিরে আসলেন এবং এক সম্ভ্রান্ত ঘরের কন্যাকে বিয়ে করলেন। কিন্তু তাঁর সৈনিক জীবন তাঁকে শান্তি দিল না। তিনি আবার রণাঙ্গনে ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। অবশেষে স্ত্রীকে আল্লাহ ও রাসুলের হিফাযতে এবং তিরিশ হাজার দীনার তার হাতে দিয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। যাওয়ার সময় স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন।

ফাররূখের অনুপস্থিতিতে এক পুত্র সন্তান জন্ম নিল। মা তার নাম রাখলেন 'রাবী'আ'। মা তার ছেলের সুশিক্ষার জন্য স্বামীর রেখে যাওয়া অর্থ থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। শিক্ষকরা তাকে কুরআন, হাদীছ এবং দীনী 'ইলমের বিভিন্ন শাখায় দক্ষ করে তোলেন। রাবী'আ নিজের জন্য জ্ঞানচর্চাকে বেছে নিলেন এবং মদীনার মসজিদে নববীতে তাঁর পঠন-পাঠন চলতে লাগলো।

প্রায় তিরিশ বছর পর ফাররূফ মদীনায় ফিরে আসলেন। নিজের ঘরে প্রবেশ করে তিনি এক যুবকের বাধার মুখে পড়লেন। দু'জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলো এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা ছুটে এলো। পরে ফাররূফের স্ত্রী এসে পরিচয় দিলে পিতা ও পুত্রের মিলন হলো। ফাররূফ তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন তিরিশ হাজার দীনারের কথা। স্ত্রী বললেন তা সঠিক জায়গায় আছে।

পরদিন সকালে ফাররূফ মসজিদে নববীতে গিয়ে দেখলেন এক বিশাল 'ইলমী মজলিস। সেখানে শায়খকে ঘিরে বড় বড় 'আলিমরা বসে আছেন। তিনি শায়খের অগাধ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য দেখে মুগ্ধ হলেন। পাশে বসা একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন এই শায়খই হলেন তাঁর পুত্র রাবী'আতুর রা'য়। ফাররূফ আনন্দাশ্রু বিসর্জন দিলেন। বাড়ীতে ফিরে স্ত্রী তাঁকে বললেন, এই তিরিশ হাজার দীনার এবং আপনার ছেলের জ্ঞান ও মর্যাদার এই উচ্চাসন লাভ-এর কোনটি আপনার বেশি প্রিয়? ফাররূফ বললেন: ছেলের এই অবস্থানই আমার বেশি প্রিয়। তখন স্ত্রী জানালেন যে তিনি সেই অর্থ রাবী'আর শিক্ষার পিছনেই ব্যয় করেছেন।

রাবী'আর পরিচয়
রাবী'আর ডাকনাম আবূ 'উছমান, উপাধি আর-রায়। পিতা আবূ 'আবদির রহমান ফাররূখ। তিনি ছিলেন মদীনার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম তাবি'ঈ। ইমাম আয-যাহাবী (রহ) বলেন: "তিনি ছিলেন একাধারে হাদীছের হাফিজ, ফকীহ, মুজতাহিদ এবং বুদ্ধি ও যুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে গভীর অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী। আর এ কারণে তাঁকে রাবী'আতুর রায় বা যুক্তিবাদী রাবী'আ বলা হয়।"

শিক্ষা
যৌবনের সূচনাতেই সেকালে প্রচলিত সকল শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হন। মাত্র ছাব্বিশ/সাতাশ বছর বয়সে তাঁর খ্যাতি দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

Hাদীছ
হযরত রাবী'আর (রহ) যে খ্যাতি তা প্রধানতঃ তাঁর ফিক্হ্ শাস্ত্রে অতুলনীয় দক্ষতার কারণে। তবে তিনি হাদীছেরও একজন প্রথম শ্রেণীর হাফিজ ছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে হাদীছ ধারণের ব্যাপারে সকল ইমাম একমত। ইবনুল মাজেশূন বলেন: "আমি রাবী'আর চেয়ে সুন্নাহ অধিক স্মৃতিতে ধারণকারী আর কাউকে দেখিনি।" প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ছিলেন রাবী'আর বিশেষ ছাত্র।

সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে হযরত আনাস ইবন মালিক ও সায়িব ইবন ইয়াযীদ (রা) এবং তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ প্রমুখ মুহাদ্দিছ থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন।

ফিক্হ
ফিক্হ শাস্ত্রে ছিল হযরত রাবী'আর (রহ) বিশেষ ব্যুৎপত্তি। তিনি ছিলেন এ শাস্ত্রের একজন ইমাম ও মুজতাহিদ। অসাধারণ মেধা ও বুদ্ধিমত্তা তাঁর মধ্যে ইজতিহাদের যোগ্যতা সৃষ্টি করে দেয়। এ কারণে তাঁকে যুক্তি ও বুদ্ধিবাদী অভিধায় ভূষিত করা হয়। আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর প্রথম খলীফা আবুল 'আব্বাস আস-সাফফাহ তাঁকে ডেকে নিয়ে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। ইমাম মালিক (রহ) ছিলেন তাঁর বিশেষ ছাত্র।

ফাতওয়া দানে তাঁর সতর্কতা
ইজতিহাদ, যুক্তি ও কিয়াস প্রয়োগে এত ক্ষমতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কোন মাসয়ালায় যুক্তি ও কিয়াস প্রয়োগের ক্ষেত্রে দারুণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি বলতেন: "কোন মাসয়ালায় জ্ঞান ছাড়া জবাব দানের চেয়ে এটাই উত্তম যে তোমরা মূর্খ অবস্থায় মৃত্যু বরণ কর।"

তাঁর সমকালীন মনীষীদের মূল্যায়ন
'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার বলতেন: "রাবী'আ ছিলেন আমাদের সকল জট উন্মোচনকারী, আমাদের 'আলিম এবং আমাদের সবার চেয়ে উত্তম।” ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ বলতেন: "আমি রাবী'আ ইবন 'আবদির রহমানের চাইতে বেশি তীক্ষ্ণধী আর কাউকে দেখিনি।"

তাঁর দারসের মজলিস
তাঁর দারসের মজলিসে মদীনার বড় বড় 'আলিম, সরকারী কর্মকর্তা ও অভিজাত শ্রেণীর লোকেরাও শরীক হতেন। ইমাম মালিক, ইয়াহইয়া আনসারী, ইমাম আওযা'ঈ প্রমুখের মত ব্যক্তিবর্গও সেখান থেকে ফায়দা হাসিল করতেন।

তাঁর ভোগ-বিলাস বিমুখ জীবন ও ইবাদাত-বন্দেগী
এত জ্ঞান ও বুদ্ধির সাথে সাথে তিনি একজন বড় 'আবিদ ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ ব্যক্তি ছিলেন। ধন-সম্পদ ও অর্থ-বিত্তের প্রতি দারুণ নির্মোহ স্বভাবের ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য তিনি চল্লিশ হাজার দীনার ব্যয় করেন।

বাগ্মিতা
রাবী‘আ ছিলেন একজন বাগ্মী ব্যক্তি। চমৎকার প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলতেন। তিনি যখন কথা বলতেন শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনতো। একবার রাবী'আর (রহ) নিকট আল্লাহর 'আরশে সমাসীন হওয়ার বিষয়টির ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। তিনি বলেন: "সমাসীন হওয়ার বিষয়টি অজানা নয়, তবে তার প্রকৃতিটা বোধগম্য নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকেই রিসালাত হয় এবং রাসূলের দায়িত্ব পৌঁছানো, আর আমাদের কর্তব্য বিশ্বাস করা।"

মৃত্যু
তাঁর মৃত্যু সন ও স্থান নিয়ে একটু মত পার্থক্য আছে। হাফিজ আবূ বাকর ইবন ছাবিত বলেন, প্রথম আব্বাসীয় খলীফা আবুল 'আব্বাস আস-সাফফাহ তাঁকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দানের জন্য আল-আনবারে ডেকে পাঠান। ইবন সা'দ বলেন, আল-ওয়াকিদী আমাকে যে তথ্য দিয়েছেন সে মতে তিনি হিজরী ১৩৬ সনে মদীনায় ইনতিকাল করেন।

টিকাঃ
১. সায়হুন একটি বিশাল নদী। সমরকন্দের পরে তুর্কিস্তান সীমান্তে প্রবাহিত।
২. রাসূলুল্লাহর (সা) কবর ও তাঁর মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান। (সুওরুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৪৯)
৩. প্রাগুক্ত-১৩৫-১৫৪; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৪-১৬৫
৪. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৫৯
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
৭. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২১; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
৮. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৪
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
১০. তারীখু বাগদাদ/৮/৪২৪; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৮; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৩৫
১২. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩
১৩. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৮; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
১৪. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩; তাবি'ঈন-১২০
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
১৬. প্রাগুক্ত-১/১৫৮; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
১৭. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৬; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৭
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৯; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৪, টীকা-১
২০. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
২১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৭
২২. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
২৩. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৩; তাবি'ঈন-১২২
২৪. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬
২৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৮
২৬. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৫৯
২৭. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৭
২৮. তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৫; ইবন কুতায়বা : আল-মা‘আরিফ-২১৭
২৯. তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৭; তারীখু বাগদাদ-৮/৪২৪
৩০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৫৭
৩১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১০২
৩২. প্রাগুক্ত; ওয়াফায়াত আল-আ'য়ান-১/১৮৩
৩৩. সূরা আস-সাজদা-৪; আল-ফুরকান-৫৯
৩৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৫৮
৩৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২২৪; সাফওয়াতুস সাফওয়া-২/৮৩-৮৬; তাহযীব আল-কামাল-৬/১৬৭; আল-মা'আরিফ-২১৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px