📄 শাসন ও রাজনীতি
বানু উমাইয়্যা খলীফাদের জুলুম-অত্যাচার ও দমন-পীড়ন সম্পর্কে যত ঘটনা সাধারণভাবে প্রসিদ্ধ আছে, তা পাঠ করে এ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, তাঁরা সাধারণ মানুষের সুখ-সুবিধার প্রতি কোন রকম দৃষ্টি দেননি। তাঁরা কেবল নিজেদের ভোগ- বিলাসী জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসে এমন ধারণার বিপক্ষেও প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত মু'আবিয়া (রা) সম্পর্কে মাস'উদী 'মুরূজ আয-যাহাব' গ্রন্থে লিখেছেন: 'তিনি দৈনিক রাত-দিনে পাঁচ বার দরবারে বসতেন। এর মধ্যে একটি সময় কেবল দুর্বল, অসহায়দের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনতেন। এর নিয়ম ছিল, তাঁর চাকর মসজিদে একটি চেয়ার পেতে দিত, তিনি তাতে বসে যেতেন এবং ফৌজদারী মামলার শুনানী করতেন। দুর্বল, অসহায়, বেদুঈন, শিশু, বৃদ্ধ সব ধরনের মানুষ তাঁর সামনে আসতো। তারা বলতো, আমাদের উপর জুলুম করা হয়েছে। তিনি বলতেন, তাদেরকে সাহায্য কর। তারা বলতো, আমাদেরকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে, তিনি বলতেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য তাদের সাথে লোক পাঠাও। তারা বলতো, আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করা হয়েছে। তিনি বলতেন, তাদের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখ। এভাবে যখন শুনানী শেষ হতো, আর কেউ না থাকতো তখন তিনি খলীফার আসনে গিয়ে বসতেন। দরবারী লোকেরা যখন নিজ নিজ পদ মর্যাদা অনুযায়ী আরাম করে বসে যেতেন তখন তিনি বলতেন, যে সকল মানুষ আমাদের পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না তাদের অভাব-অভিযোগের কথা আমাদের সামনে উপস্থাপন কর। এভাবে সকল অভিযোগকারীর অভিযোগের সমাধান হয়ে যেত।'
এরপর মাস'উদী হযরত মু'আবিয়ার (রা) শাসন ও রাজনীতি বিষয়ক অনেকগুলো ঘটনা বর্ণনা করে শেষে লিখেছেন: 'তাঁর চরিত্র, তাঁর দান-অনুগ্রহ ও তাঁর বদান্যতা মানুষকে এত মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে যে তারা নিজেদের আত্মীয়-পরিজনদের থেকেও তাঁকে বেশী পছন্দ করতো।'
হযরত মু'আবিয়ার (রা) পরে 'আবদুল মালিক ও অন্যরা তাঁর চরিত্র, অভ্যাস ও শাসন পদ্ধতি অনুসরণের চেষ্টা করেছেন। মাস'উদীর বর্ণনা অনুযায়ী যদিও তাঁরা হযরত মু'আবিয়ার (রা) মানে পৌঁছতে পারেননি তবে এটা স্বীকৃত সত্য যে: 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান ছিলেন অত্যন্ত সজাগ মস্তিষ্কের এবং তাঁর কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর পর্যবেক্ষক।'
যেমন একবার তিনি জানতে পারলেন যে, কোন একজন কর্মকর্তা কারো নিকট থেকে উপহার গ্রহণ করেছে। সাথে সাথে তাকে ডেকে এনে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আল-ওয়ালীদ ছিলেন খলীফা 'আবদুল মালিকের পুত্র। 'আবদুল মালিক সবসময় তাঁর সন্তানদেরকে মহত্ব, দয়া, পরোপকার ও উন্নত নৈতিকতা অবলম্বনের জন্য উৎসাহ দিতেন। একবার তিনি তাঁর পুত্রদের সম্বোধন করে বলেন: 'আমার ছেলেরা! তোমাদের খান্দানটি একটি অভিজাত খান্দান। অর্থ-বিত্তের বিনিময়ে এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখবে।' এমন শিক্ষার কারণেই আল-ওয়ালীদ শামবাসীদের অন্তরে প্রিয়তম খলীফার আসন লাভ করেন। 'আদাব আস-সুলতানিয়্যা' গ্রন্থে এসেছে: 'আল-ওয়ালীদ নৈতিকতার দিক দিয়ে শামের অধিবাসীদের নিকট অন্য সকল উমাইয়্যা খলীফাদের চেয়ে ভালো ছিলেন।' তাঁর এমন প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণ এই বলা হয়েছে যে, তিনি দিমাঙ্কের জামি' মসজিদ, মদীনার মসজিদে নববী, মসজিদে আকসা পুনঃনির্মাণ করান। কুষ্ঠরোগীদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে ভিক্ষা করার অপমান থেকে তাদেরকে রক্ষা করেন। তিনি প্রত্যেক পঙ্গুর জন্য একজন সেবক এবং প্রত্যেক অন্ধের জন্য একজন পথপ্রদর্শক নিয়োগ করেন। খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের গৌরব ও গর্বের জন্য শুধু এতটুক বলাই যথেষ্ট হবে যে, হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থার ভিত্তি মূলতঃ তাঁর সময়েই স্থাপিত হয়েছিল। মানুষের জবর-দখলকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যে সকল মানুষকে অন্যায়ভাবে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সময়মত নামায কায়েম করা, গান-বাজনা নিষিদ্ধ করা এবং হাজ্জাজের সকল কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে (রহ) স্বীয় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁর সকল সৎ পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
টিকাঃ
৬৫২. মুরূজ আয-যাহাব (নাফস্থত তীব)-২/৪২২, ৪২৩, ৪৩১
৬৫৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৮৬
৬৫৪. মুরূজ আয-যাহাব-২/২০০, ৫৩৭
৬৫৫. আদাব আস-সুলতানিয়্যা-১২৪
বানু উমাইয়্যা খলীফাদের জুলুম-অত্যাচার ও দমন-পীড়ন সম্পর্কে যত ঘটনা সাধারণভাবে প্রসিদ্ধ আছে, তা পাঠ করে এ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, তাঁরা সাধারণ মানুষের সুখ-সুবিধার প্রতি কোন রকম দৃষ্টি দেননি। তাঁরা কেবল নিজেদের ভোগ- বিলাসী জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসে এমন ধারণার বিপক্ষেও প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত মু'আবিয়া (রা) সম্পর্কে মাস'উদী 'মুরূজ আয-যাহাব' গ্রন্থে লিখেছেন: 'তিনি দৈনিক রাত-দিনে পাঁচ বার দরবারে বসতেন। এর মধ্যে একটি সময় কেবল দুর্বল, অসহায়দের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনতেন। এর নিয়ম ছিল, তাঁর চাকর মসজিদে একটি চেয়ার পেতে দিত, তিনি তাতে বসে যেতেন এবং ফৌজদারী মামলার শুনানী করতেন। দুর্বল, অসহায়, বেদুঈন, শিশু, বৃদ্ধ সব ধরনের মানুষ তাঁর সামনে আসতো। তারা বলতো, আমাদের উপর জুলুম করা হয়েছে। তিনি বলতেন, তাদেরকে সাহায্য কর। তারা বলতো, আমাদেরকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে, তিনি বলতেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য তাদের সাথে লোক পাঠাও। তারা বলতো, আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করা হয়েছে। তিনি বলতেন, তাদের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখ। এভাবে যখন শুনানী শেষ হতো, আর কেউ না থাকতো তখন তিনি খলীফার আসনে গিয়ে বসতেন। দরবারী লোকেরা যখন নিজ নিজ পদ মর্যাদা অনুযায়ী আরাম করে বসে যেতেন তখন তিনি বলতেন, যে সকল মানুষ আমাদের পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না তাদের অভাব-অভিযোগের কথা আমাদের সামনে উপস্থাপন কর। এভাবে সকল অভিযোগকারীর অভিযোগের সমাধান হয়ে যেত।'
এরপর মাস'উদী হযরত মু'আবিয়ার (রা) শাসন ও রাজনীতি বিষয়ক অনেকগুলো ঘটনা বর্ণনা করে শেষে লিখেছেন: 'তাঁর চরিত্র, তাঁর দান-অনুগ্রহ ও তাঁর বদান্যতা মানুষকে এত মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে যে তারা নিজেদের আত্মীয়-পরিজনদের থেকেও তাঁকে বেশী পছন্দ করতো।'
হযরত মু'আবিয়ার (রা) পরে 'আবদুল মালিক ও অন্যরা তাঁর চরিত্র, অভ্যাস ও শাসন পদ্ধতি অনুসরণের চেষ্টা করেছেন। মাস'উদীর বর্ণনা অনুযায়ী যদিও তাঁরা হযরত মু'আবিয়ার (রা) মানে পৌঁছতে পারেননি তবে এটা স্বীকৃত সত্য যে: 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান ছিলেন অত্যন্ত সজাগ মস্তিষ্কের এবং তাঁর কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর পর্যবেক্ষক।'
যেমন একবার তিনি জানতে পারলেন যে, কোন একজন কর্মকর্তা কারো নিকট থেকে উপহার গ্রহণ করেছে। সাথে সাথে তাকে ডেকে এনে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আল-ওয়ালীদ ছিলেন খলীফা 'আবদুল মালিকের পুত্র। 'আবদুল মালিক সবসময় তাঁর সন্তানদেরকে মহত্ব, দয়া, পরোপকার ও উন্নত নৈতিকতা অবলম্বনের জন্য উৎসাহ দিতেন। একবার তিনি তাঁর পুত্রদের সম্বোধন করে বলেন: 'আমার ছেলেরা! তোমাদের খান্দানটি একটি অভিজাত খান্দান। অর্থ-বিত্তের বিনিময়ে এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখবে।' এমন শিক্ষার কারণেই আল-ওয়ালীদ শামবাসীদের অন্তরে প্রিয়তম খলীফার আসন লাভ করেন। 'আদাব আস-সুলতানিয়্যা' গ্রন্থে এসেছে: 'আল-ওয়ালীদ নৈতিকতার দিক দিয়ে শামের অধিবাসীদের নিকট অন্য সকল উমাইয়্যা খলীফাদের চেয়ে ভালো ছিলেন।' তাঁর এমন প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণ এই বলা হয়েছে যে, তিনি দিমাঙ্কের জামি' মসজিদ, মদীনার মসজিদে নববী, মসজিদে আকসা পুনঃনির্মাণ করান। কুষ্ঠরোগীদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে ভিক্ষা করার অপমান থেকে তাদেরকে রক্ষা করেন। তিনি প্রত্যেক পঙ্গুর জন্য একজন সেবক এবং প্রত্যেক অন্ধের জন্য একজন পথপ্রদর্শক নিয়োগ করেন। খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের গৌরব ও গর্বের জন্য শুধু এতটুক বলাই যথেষ্ট হবে যে, হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থার ভিত্তি মূলতঃ তাঁর সময়েই স্থাপিত হয়েছিল। মানুষের জবর-দখলকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যে সকল মানুষকে অন্যায়ভাবে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সময়মত নামায কায়েম করা, গান-বাজনা নিষিদ্ধ করা এবং হাজ্জাজের সকল কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে (রহ) স্বীয় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁর সকল সৎ পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
টিকাঃ
৬৫২. মুরূজ আয-যাহাব (নাফস্থত তীব)-২/৪২২, ৪২৩, ৪৩১
৬৫৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৮৬
৬৫৪. মুরূজ আয-যাহাব-২/২০০, ৫৩৭
৬৫৫. আদাব আস-সুলতানিয়্যা-১২৪
📄 অভিযোগ খণ্ডন
বানু উমাইয়্যাদের রাষ্ট্র পরিচালন পদ্ধতি ও শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যত অভিযোগ আছে তার সংক্ষিপ্ত জবাবের জন্য আমরা খলীফা 'আবদুল মালিকের নিম্নের কথাগুলো তুলে ধরাই যথেষ্ট মনে করছি:
'কোথায় সেই সব মানুষ যাদেরকে 'উমার শাসন করতেন, আর কোথায় এই যুগের মানুষ? আমার ধারণা, রাজার আচার-আচরণ প্রজাদের পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টাতে থাকে। যদি কেউ এ যুগে হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) রূপ ধারণ করে তাহলে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে তার বাড়ীতে চড়াও হবে, লুটপাট চালাবে এবং পরস্পর মারামারি-কাটাকাটিতে লিপ্ত হবে। এ কারণে শাসকের সেই রূপ ও রীতি ধারণ করা কর্তব্য যা তার যুগের জন্য উপযুক্ত।'
টিকাঃ
৬৫৬. ইবন সা'দ, তাবাকাত-৫/২৭৩
বানু উমাইয়্যাদের রাষ্ট্র পরিচালন পদ্ধতি ও শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যত অভিযোগ আছে তার সংক্ষিপ্ত জবাবের জন্য আমরা খলীফা 'আবদুল মালিকের নিম্নের কথাগুলো তুলে ধরাই যথেষ্ট মনে করছি:
'কোথায় সেই সব মানুষ যাদেরকে 'উমার শাসন করতেন, আর কোথায় এই যুগের মানুষ? আমার ধারণা, রাজার আচার-আচরণ প্রজাদের পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টাতে থাকে। যদি কেউ এ যুগে হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) রূপ ধারণ করে তাহলে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে তার বাড়ীতে চড়াও হবে, লুটপাট চালাবে এবং পরস্পর মারামারি-কাটাকাটিতে লিপ্ত হবে। এ কারণে শাসকের সেই রূপ ও রীতি ধারণ করা কর্তব্য যা তার যুগের জন্য উপযুক্ত।'
টিকাঃ
৬৫৬. ইবন সা'দ, তাবাকাত-৫/২৭৩