📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি ও প্রসারে অবদান

📄 জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি ও প্রসারে অবদান


জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা ও শাস্ত্র নেই যার উন্নতি, প্রসার, বিন্যাস, লিপিবদ্ধকরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে উমাইয়্যা খলীফাদের অবদান লক্ষ্য করা যায় না।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা ও শাস্ত্র নেই যার উন্নতি, প্রসার, বিন্যাস, লিপিবদ্ধকরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে উমাইয়্যা খলীফাদের অবদান লক্ষ্য করা যায় না।

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 কুরআন মাজীদ, তাফসীর ও অন্যান্য শাস্ত্রের ভাষান্তর

📄 কুরআন মাজীদ, তাফসীর ও অন্যান্য শাস্ত্রের ভাষান্তর


কুরআন মাজীদ: কুরআন মাজীদ হলো সকল ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎস। এ মহাগ্রন্থের বিন্যাস ও লিপিবদ্ধকরণের কাজ খিলাফতে রাশেদার আমলে সম্পন্ন হয়েছিল। তবে তখন তাতে নুকতা ও ই'রাব লাগানো হয়নি। এতে কুরআন পাঠ আরবদের জন্য বিশেষ কষ্টকর না হলেও অনারব মুসলমানদের জন্য ছিল দারুণ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ইরাকে কুরআনের ভুল পাঠ চালু হওয়া লক্ষ্য করে হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ সাথে সাথে তা প্রতিবিধানে তৎপর হন এবং একই আকৃতির বর্ণে নুকতা লাগান। এর পরেও ভুল হতে থাকলে পরবর্তীতে অন্যরা ই'রাব প্রয়োগ করেন।

তাফসীর: এ যুগেই তাফসীর লিপিবদ্ধ হয় এবং বড় বড় মুফাস্সিরের জন্ম হয়। তাফসীরের প্রথম লিখিত গ্রন্থটি হযরত সা'ঈদ ইবন জুবায়র (রহ)-এর এবং তিনি এ কাজটি করেন খলীফা 'আবদুল মালিকের অনুরোধে।

হাদীছ: হাদীছ লেখা ও গ্রন্থাবদ্ধ করার যে অনন্য গৌরব তাও বানু উমাইয়্যাদের। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) জীবনীতে তার কিছু আলোচনা এসেছে।

আরবী ব্যাকরণ: আরবী ব্যাকরণ লেখার প্রাথমিক কাজও এ যুগে হয়। আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালী যিয়াদ ইবন আবীহ্'র নিকট ইল্ম নাহ্'র মূল নীতিগুলো লেখার অনুমতি চান। যিয়াদ প্রথমে অনুমতি না দিলেও কিছু দিন পরে দেন।

ইতিহাস: ইতিহাস লেখা ও বিন্যস্ত করার কাজটির শুরু এবং আরবদের প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ রচিত হয় এ যুগে। একদিকে সীরাত ও মাগাযী শাস্ত্রের বড় বড় 'আলিম, যেমন ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ্, মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম আয-যুহরী, মূসা ইবন 'উকবা, 'আওয়ানা প্রমুখ এই শাস্ত্রের বিষয়বস্তু সংগ্রহ, বিন্যাস ও লেখার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, অন্যদিকে বানু উমাইয়্যা খলীফাদেরও ইতিহাসের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ও আকর্ষণ ছিল। আল্লামা মাস'উদী তাঁর 'মুরূজ আয-যাহাব' গ্রন্থে হযরত মু'আবিয়ার (রা) প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি সর্বদা 'ঈশার নামাযের পর প্রথমে মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা, পরামর্শ করতেন। তারপর প্রাচীন ইতিহাসের ঘটনাবলী শুনতেন। ইয়ামনের সান'আর 'উবাইদ ইবন শারিয়‍্যা নামক এই শাস্ত্রের একজন বিশেষজ্ঞকে ডেকে আনেন এবং তাঁর মুখে ইতিহাসের বহু কাহিনী ও ঘটনা শোনেন। তিনি তা একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করান যা 'উবাইদ ইবন শারিয়‍্যার প্রতি আরোপ করা হয়।

খলীফা হিশামের আগ্রহ ও আনুকূল্যে আরবী সাহিত্য ভাণ্ডারে আরো অনেক রচনার সমাবেশ ঘটে। তাঁর জন্যই জাবালা ফার্সী ভাষার কিছু ইতিহাস গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন। হিশাম নিজে "তারীখু মুলুক আল-ফুরস" আরবীতে অনুবাদ করান। এ গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে পারস্য সাম্রাজ্যের আইন-কানুন ও শাহান শাহে ইরানের জীবন চিত্র।

গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষান্তর: গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আরবীতে অনুবাদ করার সূচনাও হয় উমাইয়্যা যুগে। ইবন আছাল হযরত মু'আবিয়ার (রা) জন্য গ্রীক ভাষায় রচিত বেশ কয়েকটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই ছিল কোন অনারব ভাষার গ্রন্থের আরবী অনুবাদ।

মারওয়ান ইবন হাকামের সময়ে মাসির জুওয়া চিকিৎসা বিজ্ঞানের একখানা গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন। অনুবাদটি হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) সরকারী গ্রন্থাগারে পান এবং সেটির একাধিক কপি করে খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান।

বানু উমাইয়্যা খান্দানে খালিদ ইবন ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়া ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যাঁকে 'হাকীমু আলে মারওয়ান' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি গ্রীক ও কিবতী ভাষায় রচিত অনেকগুলো রসায়ন শাস্ত্রের গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করান। হিশাম ইবন 'আবদিল মালিকের সময় পারস্যের ইতিহাস ছাড়াও কিছু গ্রীক গ্রন্থেরও আরবী অনুবাদ হয়।

স্পেনের উমাইয়্যা শাসকরাও এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তাঁদের সময়ে স্পেনবাসী গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিকে দৃষ্টি দেয়। তাঁদের সময়ে সেখানে চিন্তা-দর্শনের বড় বড় মনীষীর জন্ম হয়। স্পেনের এই নতুন জ্ঞান চর্চা শুরু হয় হিজরী তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি এবং চতুর্থ শতকের মাঝামাঝিতে তা উন্নতির চূড়ান্তে পৌঁছে। এরপর আমীর আল-হাকাম আল-মুসতানসির বিল্লাহ ইবন 'আবদির রহমান আন-নাসির লি দীনিল্লাহ বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চার দিকে সীমাহীন মনোযোগ দেন। তিনি বাগদাদ, মিসর ছাড়াও প্রাচ্যের বিভিন্ন শহর থেকে পুরাতন ও নতুন জ্ঞানের বহু অনুপম গ্রন্থ সংগ্রহ করে স্পেনে নিয়ে যান।

টিকাঃ
৬৪৮. প্রাগুক্ত-২/৪২৭
৬৪৯. ইবন নাদীম, কিতাবুল ফিরিস্ত-১৩২
৬৫০. প্রাগুক্ত-৩৩৮, ৩৯৭; ইবন খাল্লিকান, ওয়াফয়াত আল-আ'লাম-১/১৬৮
৬৫১. ইবন সা'য়িদ আল-আন্দালুসী, তাবাকাত আল-উমাম-৬৬

কুরআন মাজীদ: কুরআন মাজীদ হলো সকল ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎস। এ মহাগ্রন্থের বিন্যাস ও লিপিবদ্ধকরণের কাজ খিলাফতে রাশেদার আমলে সম্পন্ন হয়েছিল। তবে তখন তাতে নুকতা ও ই'রাব লাগানো হয়নি। এতে কুরআন পাঠ আরবদের জন্য বিশেষ কষ্টকর না হলেও অনারব মুসলমানদের জন্য ছিল দারুণ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ইরাকে কুরআনের ভুল পাঠ চালু হওয়া লক্ষ্য করে হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ সাথে সাথে তা প্রতিবিধানে তৎপর হন এবং একই আকৃতির বর্ণে নুকতা লাগান। এর পরেও ভুল হতে থাকলে পরবর্তীতে অন্যরা ই'রাব প্রয়োগ করেন।

তাফসীর: এ যুগেই তাফসীর লিপিবদ্ধ হয় এবং বড় বড় মুফাস্সিরের জন্ম হয়। তাফসীরের প্রথম লিখিত গ্রন্থটি হযরত সা'ঈদ ইবন জুবায়র (রহ)-এর এবং তিনি এ কাজটি করেন খলীফা 'আবদুল মালিকের অনুরোধে।

হাদীছ: হাদীছ লেখা ও গ্রন্থাবদ্ধ করার যে অনন্য গৌরব তাও বানু উমাইয়্যাদের। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) জীবনীতে তার কিছু আলোচনা এসেছে।

আরবী ব্যাকরণ: আরবী ব্যাকরণ লেখার প্রাথমিক কাজও এ যুগে হয়। আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালী যিয়াদ ইবন আবীহ্'র নিকট ইল্ম নাহ্'র মূল নীতিগুলো লেখার অনুমতি চান। যিয়াদ প্রথমে অনুমতি না দিলেও কিছু দিন পরে দেন।

ইতিহাস: ইতিহাস লেখা ও বিন্যস্ত করার কাজটির শুরু এবং আরবদের প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ রচিত হয় এ যুগে। একদিকে সীরাত ও মাগাযী শাস্ত্রের বড় বড় 'আলিম, যেমন ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ্, মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম আয-যুহরী, মূসা ইবন 'উকবা, 'আওয়ানা প্রমুখ এই শাস্ত্রের বিষয়বস্তু সংগ্রহ, বিন্যাস ও লেখার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, অন্যদিকে বানু উমাইয়্যা খলীফাদেরও ইতিহাসের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ও আকর্ষণ ছিল। আল্লামা মাস'উদী তাঁর 'মুরূজ আয-যাহাব' গ্রন্থে হযরত মু'আবিয়ার (রা) প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি সর্বদা 'ঈশার নামাযের পর প্রথমে মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা, পরামর্শ করতেন। তারপর প্রাচীন ইতিহাসের ঘটনাবলী শুনতেন। ইয়ামনের সান'আর 'উবাইদ ইবন শারিয়‍্যা নামক এই শাস্ত্রের একজন বিশেষজ্ঞকে ডেকে আনেন এবং তাঁর মুখে ইতিহাসের বহু কাহিনী ও ঘটনা শোনেন। তিনি তা একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করান যা 'উবাইদ ইবন শারিয়‍্যার প্রতি আরোপ করা হয়।

খলীফা হিশামের আগ্রহ ও আনুকূল্যে আরবী সাহিত্য ভাণ্ডারে আরো অনেক রচনার সমাবেশ ঘটে। তাঁর জন্যই জাবালা ফার্সী ভাষার কিছু ইতিহাস গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন। হিশাম নিজে "তারীখু মুলুক আল-ফুরস" আরবীতে অনুবাদ করান। এ গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে পারস্য সাম্রাজ্যের আইন-কানুন ও শাহান শাহে ইরানের জীবন চিত্র।

গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষান্তর: গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আরবীতে অনুবাদ করার সূচনাও হয় উমাইয়্যা যুগে। ইবন আছাল হযরত মু'আবিয়ার (রা) জন্য গ্রীক ভাষায় রচিত বেশ কয়েকটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই ছিল কোন অনারব ভাষার গ্রন্থের আরবী অনুবাদ।

মারওয়ান ইবন হাকামের সময়ে মাসির জুওয়া চিকিৎসা বিজ্ঞানের একখানা গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন। অনুবাদটি হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) সরকারী গ্রন্থাগারে পান এবং সেটির একাধিক কপি করে খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান।

বানু উমাইয়্যা খান্দানে খালিদ ইবন ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়া ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যাঁকে 'হাকীমু আলে মারওয়ান' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি গ্রীক ও কিবতী ভাষায় রচিত অনেকগুলো রসায়ন শাস্ত্রের গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করান। হিশাম ইবন 'আবদিল মালিকের সময় পারস্যের ইতিহাস ছাড়াও কিছু গ্রীক গ্রন্থেরও আরবী অনুবাদ হয়।

স্পেনের উমাইয়্যা শাসকরাও এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তাঁদের সময়ে স্পেনবাসী গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিকে দৃষ্টি দেয়। তাঁদের সময়ে সেখানে চিন্তা-দর্শনের বড় বড় মনীষীর জন্ম হয়। স্পেনের এই নতুন জ্ঞান চর্চা শুরু হয় হিজরী তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি এবং চতুর্থ শতকের মাঝামাঝিতে তা উন্নতির চূড়ান্তে পৌঁছে। এরপর আমীর আল-হাকাম আল-মুসতানসির বিল্লাহ ইবন 'আবদির রহমান আন-নাসির লি দীনিল্লাহ বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চার দিকে সীমাহীন মনোযোগ দেন। তিনি বাগদাদ, মিসর ছাড়াও প্রাচ্যের বিভিন্ন শহর থেকে পুরাতন ও নতুন জ্ঞানের বহু অনুপম গ্রন্থ সংগ্রহ করে স্পেনে নিয়ে যান।

টিকাঃ
৬৪৮. প্রাগুক্ত-২/৪২৭
৬৪৯. ইবন নাদীম, কিতাবুল ফিরিস্ত-১৩২
৬৫০. প্রাগুক্ত-৩৩৮, ৩৯৭; ইবন খাল্লিকান, ওয়াফয়াত আল-আ'লাম-১/১৬৮
৬৫১. ইবন সা'য়িদ আল-আন্দালুসী, তাবাকাত আল-উমাম-৬৬

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 শাসন ও রাজনীতি

📄 শাসন ও রাজনীতি


বানু উমাইয়‍্যা খলীফাদের জুলুম-অত্যাচার ও দমন-পীড়ন সম্পর্কে যত ঘটনা সাধারণভাবে প্রসিদ্ধ আছে, তা পাঠ করে এ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, তাঁরা সাধারণ মানুষের সুখ-সুবিধার প্রতি কোন রকম দৃষ্টি দেননি। তাঁরা কেবল নিজেদের ভোগ- বিলাসী জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসে এমন ধারণার বিপক্ষেও প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত মু'আবিয়া (রা) সম্পর্কে মাস'উদী 'মুরূজ আয-যাহাব' গ্রন্থে লিখেছেন: 'তিনি দৈনিক রাত-দিনে পাঁচ বার দরবারে বসতেন। এর মধ্যে একটি সময় কেবল দুর্বল, অসহায়দের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনতেন। এর নিয়ম ছিল, তাঁর চাকর মসজিদে একটি চেয়ার পেতে দিত, তিনি তাতে বসে যেতেন এবং ফৌজদারী মামলার শুনানী করতেন। দুর্বল, অসহায়, বেদুঈন, শিশু, বৃদ্ধ সব ধরনের মানুষ তাঁর সামনে আসতো। তারা বলতো, আমাদের উপর জুলুম করা হয়েছে। তিনি বলতেন, তাদেরকে সাহায্য কর। তারা বলতো, আমাদেরকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে, তিনি বলতেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য তাদের সাথে লোক পাঠাও। তারা বলতো, আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করা হয়েছে। তিনি বলতেন, তাদের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখ। এভাবে যখন শুনানী শেষ হতো, আর কেউ না থাকতো তখন তিনি খলীফার আসনে গিয়ে বসতেন। দরবারী লোকেরা যখন নিজ নিজ পদ মর্যাদা অনুযায়ী আরাম করে বসে যেতেন তখন তিনি বলতেন, যে সকল মানুষ আমাদের পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না তাদের অভাব-অভিযোগের কথা আমাদের সামনে উপস্থাপন কর। এভাবে সকল অভিযোগকারীর অভিযোগের সমাধান হয়ে যেত।'

এরপর মাস'উদী হযরত মু'আবিয়ার (রা) শাসন ও রাজনীতি বিষয়ক অনেকগুলো ঘটনা বর্ণনা করে শেষে লিখেছেন: 'তাঁর চরিত্র, তাঁর দান-অনুগ্রহ ও তাঁর বদান্যতা মানুষকে এত মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে যে তারা নিজেদের আত্মীয়-পরিজনদের থেকেও তাঁকে বেশী পছন্দ করতো।'

হযরত মু'আবিয়ার (রা) পরে 'আবদুল মালিক ও অন্যরা তাঁর চরিত্র, অভ্যাস ও শাসন পদ্ধতি অনুসরণের চেষ্টা করেছেন। মাস'উদীর বর্ণনা অনুযায়ী যদিও তাঁরা হযরত মু'আবিয়ার (রা) মানে পৌঁছতে পারেননি তবে এটা স্বীকৃত সত্য যে: 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান ছিলেন অত্যন্ত সজাগ মস্তিষ্কের এবং তাঁর কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর পর্যবেক্ষক।'

যেমন একবার তিনি জানতে পারলেন যে, কোন একজন কর্মকর্তা কারো নিকট থেকে উপহার গ্রহণ করেছে। সাথে সাথে তাকে ডেকে এনে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আল-ওয়ালীদ ছিলেন খলীফা 'আবদুল মালিকের পুত্র। 'আবদুল মালিক সবসময় তাঁর সন্তানদেরকে মহত্ব, দয়া, পরোপকার ও উন্নত নৈতিকতা অবলম্বনের জন্য উৎসাহ দিতেন। একবার তিনি তাঁর পুত্রদের সম্বোধন করে বলেন: 'আমার ছেলেরা! তোমাদের খান্দানটি একটি অভিজাত খান্দান। অর্থ-বিত্তের বিনিময়ে এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখবে।' এমন শিক্ষার কারণেই আল-ওয়ালীদ শামবাসীদের অন্তরে প্রিয়তম খলীফার আসন লাভ করেন। 'আদাব আস-সুলতানিয়্যা' গ্রন্থে এসেছে: 'আল-ওয়ালীদ নৈতিকতার দিক দিয়ে শামের অধিবাসীদের নিকট অন্য সকল উমাইয়্যা খলীফাদের চেয়ে ভালো ছিলেন।' তাঁর এমন প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণ এই বলা হয়েছে যে, তিনি দিমাঙ্কের জামি' মসজিদ, মদীনার মসজিদে নববী, মসজিদে আকসা পুনঃনির্মাণ করান। কুষ্ঠরোগীদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে ভিক্ষা করার অপমান থেকে তাদেরকে রক্ষা করেন। তিনি প্রত্যেক পঙ্গুর জন্য একজন সেবক এবং প্রত্যেক অন্ধের জন্য একজন পথপ্রদর্শক নিয়োগ করেন। খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের গৌরব ও গর্বের জন্য শুধু এতটুক বলাই যথেষ্ট হবে যে, হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থার ভিত্তি মূলতঃ তাঁর সময়েই স্থাপিত হয়েছিল। মানুষের জবর-দখলকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যে সকল মানুষকে অন্যায়ভাবে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সময়মত নামায কায়েম করা, গান-বাজনা নিষিদ্ধ করা এবং হাজ্জাজের সকল কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে (রহ) স্বীয় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁর সকল সৎ পরামর্শ গ্রহণ করতেন।

টিকাঃ
৬৫২. মুরূজ আয-যাহাব (নাফস্থত তীব)-২/৪২২, ৪২৩, ৪৩১
৬৫৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৮৬
৬৫৪. মুরূজ আয-যাহাব-২/২০০, ৫৩৭
৬৫৫. আদাব আস-সুলতানিয়্যা-১২৪

বানু উমাইয়‍্যা খলীফাদের জুলুম-অত্যাচার ও দমন-পীড়ন সম্পর্কে যত ঘটনা সাধারণভাবে প্রসিদ্ধ আছে, তা পাঠ করে এ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, তাঁরা সাধারণ মানুষের সুখ-সুবিধার প্রতি কোন রকম দৃষ্টি দেননি। তাঁরা কেবল নিজেদের ভোগ- বিলাসী জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসে এমন ধারণার বিপক্ষেও প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত মু'আবিয়া (রা) সম্পর্কে মাস'উদী 'মুরূজ আয-যাহাব' গ্রন্থে লিখেছেন: 'তিনি দৈনিক রাত-দিনে পাঁচ বার দরবারে বসতেন। এর মধ্যে একটি সময় কেবল দুর্বল, অসহায়দের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনতেন। এর নিয়ম ছিল, তাঁর চাকর মসজিদে একটি চেয়ার পেতে দিত, তিনি তাতে বসে যেতেন এবং ফৌজদারী মামলার শুনানী করতেন। দুর্বল, অসহায়, বেদুঈন, শিশু, বৃদ্ধ সব ধরনের মানুষ তাঁর সামনে আসতো। তারা বলতো, আমাদের উপর জুলুম করা হয়েছে। তিনি বলতেন, তাদেরকে সাহায্য কর। তারা বলতো, আমাদেরকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে, তিনি বলতেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য তাদের সাথে লোক পাঠাও। তারা বলতো, আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করা হয়েছে। তিনি বলতেন, তাদের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখ। এভাবে যখন শুনানী শেষ হতো, আর কেউ না থাকতো তখন তিনি খলীফার আসনে গিয়ে বসতেন। দরবারী লোকেরা যখন নিজ নিজ পদ মর্যাদা অনুযায়ী আরাম করে বসে যেতেন তখন তিনি বলতেন, যে সকল মানুষ আমাদের পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না তাদের অভাব-অভিযোগের কথা আমাদের সামনে উপস্থাপন কর। এভাবে সকল অভিযোগকারীর অভিযোগের সমাধান হয়ে যেত।'

এরপর মাস'উদী হযরত মু'আবিয়ার (রা) শাসন ও রাজনীতি বিষয়ক অনেকগুলো ঘটনা বর্ণনা করে শেষে লিখেছেন: 'তাঁর চরিত্র, তাঁর দান-অনুগ্রহ ও তাঁর বদান্যতা মানুষকে এত মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে যে তারা নিজেদের আত্মীয়-পরিজনদের থেকেও তাঁকে বেশী পছন্দ করতো।'

হযরত মু'আবিয়ার (রা) পরে 'আবদুল মালিক ও অন্যরা তাঁর চরিত্র, অভ্যাস ও শাসন পদ্ধতি অনুসরণের চেষ্টা করেছেন। মাস'উদীর বর্ণনা অনুযায়ী যদিও তাঁরা হযরত মু'আবিয়ার (রা) মানে পৌঁছতে পারেননি তবে এটা স্বীকৃত সত্য যে: 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান ছিলেন অত্যন্ত সজাগ মস্তিষ্কের এবং তাঁর কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর পর্যবেক্ষক।'

যেমন একবার তিনি জানতে পারলেন যে, কোন একজন কর্মকর্তা কারো নিকট থেকে উপহার গ্রহণ করেছে। সাথে সাথে তাকে ডেকে এনে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আল-ওয়ালীদ ছিলেন খলীফা 'আবদুল মালিকের পুত্র। 'আবদুল মালিক সবসময় তাঁর সন্তানদেরকে মহত্ব, দয়া, পরোপকার ও উন্নত নৈতিকতা অবলম্বনের জন্য উৎসাহ দিতেন। একবার তিনি তাঁর পুত্রদের সম্বোধন করে বলেন: 'আমার ছেলেরা! তোমাদের খান্দানটি একটি অভিজাত খান্দান। অর্থ-বিত্তের বিনিময়ে এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখবে।' এমন শিক্ষার কারণেই আল-ওয়ালীদ শামবাসীদের অন্তরে প্রিয়তম খলীফার আসন লাভ করেন। 'আদাব আস-সুলতানিয়্যা' গ্রন্থে এসেছে: 'আল-ওয়ালীদ নৈতিকতার দিক দিয়ে শামের অধিবাসীদের নিকট অন্য সকল উমাইয়্যা খলীফাদের চেয়ে ভালো ছিলেন।' তাঁর এমন প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণ এই বলা হয়েছে যে, তিনি দিমাঙ্কের জামি' মসজিদ, মদীনার মসজিদে নববী, মসজিদে আকসা পুনঃনির্মাণ করান। কুষ্ঠরোগীদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে ভিক্ষা করার অপমান থেকে তাদেরকে রক্ষা করেন। তিনি প্রত্যেক পঙ্গুর জন্য একজন সেবক এবং প্রত্যেক অন্ধের জন্য একজন পথপ্রদর্শক নিয়োগ করেন। খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের গৌরব ও গর্বের জন্য শুধু এতটুক বলাই যথেষ্ট হবে যে, হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থার ভিত্তি মূলতঃ তাঁর সময়েই স্থাপিত হয়েছিল। মানুষের জবর-দখলকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যে সকল মানুষকে অন্যায়ভাবে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সময়মত নামায কায়েম করা, গান-বাজনা নিষিদ্ধ করা এবং হাজ্জাজের সকল কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে (রহ) স্বীয় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁর সকল সৎ পরামর্শ গ্রহণ করতেন।

টিকাঃ
৬৫২. মুরূজ আয-যাহাব (নাফস্থত তীব)-২/৪২২, ৪২৩, ৪৩১
৬৫৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৮৬
৬৫৪. মুরূজ আয-যাহাব-২/২০০, ৫৩৭
৬৫৫. আদাব আস-সুলতানিয়্যা-১২৪

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 অভিযোগ খণ্ডন

📄 অভিযোগ খণ্ডন


বানু উমাইয়‍্যাদের রাষ্ট্র পরিচালন পদ্ধতি ও শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যত অভিযোগ আছে তার সংক্ষিপ্ত জবাবের জন্য আমরা খলীফা 'আবদুল মালিকের নিম্নের কথাগুলো তুলে ধরাই যথেষ্ট মনে করছি:

'কোথায় সেই সব মানুষ যাদেরকে 'উমার শাসন করতেন, আর কোথায় এই যুগের মানুষ? আমার ধারণা, রাজার আচার-আচরণ প্রজাদের পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টাতে থাকে। যদি কেউ এ যুগে হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) রূপ ধারণ করে তাহলে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে তার বাড়ীতে চড়াও হবে, লুটপাট চালাবে এবং পরস্পর মারামারি-কাটাকাটিতে লিপ্ত হবে। এ কারণে শাসকের সেই রূপ ও রীতি ধারণ করা কর্তব্য যা তার যুগের জন্য উপযুক্ত।'

টিকাঃ
৬৫৬. ইবন সা'দ, তাবাকাত-৫/২৭৩

বানু উমাইয়‍্যাদের রাষ্ট্র পরিচালন পদ্ধতি ও শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যত অভিযোগ আছে তার সংক্ষিপ্ত জবাবের জন্য আমরা খলীফা 'আবদুল মালিকের নিম্নের কথাগুলো তুলে ধরাই যথেষ্ট মনে করছি:

'কোথায় সেই সব মানুষ যাদেরকে 'উমার শাসন করতেন, আর কোথায় এই যুগের মানুষ? আমার ধারণা, রাজার আচার-আচরণ প্রজাদের পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টাতে থাকে। যদি কেউ এ যুগে হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) রূপ ধারণ করে তাহলে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে তার বাড়ীতে চড়াও হবে, লুটপাট চালাবে এবং পরস্পর মারামারি-কাটাকাটিতে লিপ্ত হবে। এ কারণে শাসকের সেই রূপ ও রীতি ধারণ করা কর্তব্য যা তার যুগের জন্য উপযুক্ত।'

টিকাঃ
৬৫৬. ইবন সা'দ, তাবাকাত-৫/২৭৩

ফন্ট সাইজ
15px
17px