📄 ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) 'আদল ও ইনসাফভিত্তিক যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, পরবর্তী খলীফা ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক তা মাত্র চল্লিশ দিন বহাল রাখেন। তিনি 'উমারের এই ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক শাসন পদ্ধতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। ৬২৮ 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) যে সকল সৎ ও আল্লাহ ভীরু কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন ইয়াযীদ তাদেরকে বরখাস্ত করেন। নওরোয ও ধর্মীয় উৎসবের যাবতীয় উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ এবং বেগার খাটানোর প্রথা যা 'উমার একেবারে মুছে ফেলেন তা আবার চালু হয়। ফাদাক যা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয স্বীয় উত্তরাধিকার থেকে বের করে হযরত ফাতিমার (রা) বংশধরদের ফিরিয়ে দেন, ইয়াযীদ আবার তা কেড়ে নেন। ৬২৯
মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ ইয়ামনবাসীদের উপর যে নিপীড়নমূলক খারাজ ধার্য করেন 'উমার তা 'উশরে পরিণত করেন। কিন্তু ইয়াযীদ আবার তা খারাজে রূপান্তরিত করেন। ৬৩০ হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ নাজরানের খ্রীস্টানদের নিকট থেকে জিযিয়া হিসেবে আট শ' কারুকাজ করা কাপড় গ্রহণ করতো। 'উমার তা কমিয়ে দু' শ' ধার্য করেন। কিন্তু খলীফা ইয়াযীদের সময়ে আবার তা আট শ'-তে পরিবর্তন করা হয়। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) কাদরিয়া সম্প্রদায়ের মতবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন, কিন্তু ইয়াযীদ ইবন আল-ওয়ালীদ খলীফা হয়ে তাদের ঘোরতর সমর্থকে পরিণত হন। ৬৩২
ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক খিলাফতের দায়িত্বগ্রহণের পরই বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মকর্তাদের নিকট যে পত্রটি লেখেন তাতেই তাঁর কর্মপদ্ধতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পত্রে তিনি লেখেন: 'অতঃপর এই যে, 'উমার ছিলেন প্রতারিত মানুষ। তোমরা ও তোমাদের সঙ্গী-সাথীরা তাঁর সাথে প্রতারণা করেছো। খাজনা-ট্যাক্স কমানোর ব্যাপারে তাঁর কাছে লেখা তোমাদের অনেক চিঠি-পত্র আমি দেখেছি। আমার এ পত্র তোমাদের নিকট পৌঁছা মাত্র তোমাদের জানা তাঁর সকল ওয়াদা-অঙ্গীকার পরিত্যাগ করবে। মানুষকে তাদের সেই পূর্বের মর্যাদা ও স্তরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। চাই ফসল হোক বা খরা হোক, তারা পছন্দ করুক বা না করুক এবং তারা বাঁচুক বা মরুক। ওয়াস সালাম।'
টিকাঃ
৬২৮. তারীখ আল-খুলাফা'-২৪৭
৬২৯. তারীখ আল-ইয়া'কুবী-২/২৭২, ২৬৬, ২৭৬
৬৩০. ফুতুহ আল-বুলদান-১৩০, ১৮০
৬৩১. প্রাগুক্ত-৭২, ৩৭৫
৬৩২. তারীখ আল-খুলাফা'-২৫৫
**. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৪৩
📄 বানূ উমাইয়্যা শাসনের অবসান
'আব্বাসীয়দের আন্দোলনের সূচনা হয় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) খিলাফতকালে। এর মাত্র তিরিশ বছর পরেই উমাইয়্যা শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) যে রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা তাঁর ইনতিকালের অব্যবহিত পরেই বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে।
হযরত মু'আবিয়ার (রা) সময়ে উমাইয়্যা-হাশিমী এই দু'টি শক্তি পরস্পর মুখোমুখী অবস্থানে দাঁড়ায়। মূলতঃ তখন থেকেই আরবে গৃহ যুদ্ধের সূচনা হয়। খলীফা 'আবদুল মালিক ও আল-ওয়ালীদের সময়কাল পর্যন্ত প্রতিপক্ষ শক্তি গোপন থাকে। তবে যখন তাঁদের মত ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গের অবসান ঘটে তখন বানু হাশিম অনারবদের উপর ভর করে মাথা তুলে দাঁড়ায়। তারা অনারব শক্তির কেন্দ্র ইরাক ও খুরাসানে তাদের কর্মী ও প্রতিনিধিদের ছড়িয়ে দেয়। আবূ মুসলিম খুরাসানী নামক একজন বিস্ময়কর ব্যক্তিকে সহযোগী হিসেবে লাভ করে হাশিমীরা শক্তি বৃদ্ধি করে। অবশেষে উমাইয়্যা বংশের সর্বশেষ খলীফা মারওয়ান ইবন মুহাম্মাদ পালিয়ে মিসরে যাওয়ার পথে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর সাথে হিজরী ১৩২/খ্রী: ৭৫০ সনে উমাইয়্যা শাসনের পতন হয়।
কোন কোন স্থূল পর্যালোচনায় বলা হয় যে, অমুসলিমদের প্রতি 'উমারের উদার ও ন্যায়ানুগ কর্ম-পদ্ধতি গ্রহণের ফলে জিযিয়া ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাজার হাজার অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করায় এবং সচ্ছল ব্যক্তিদের সম্পদ কেড়ে নেওয়ায় আর্থিক ব্যবস্থাপনা ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু আমরা মনে করি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) শূরা ও ইনসাফভিত্তিক যে রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, তার থেকে পরবর্তী খলীফাগণ দূরে সরে যাওয়ার কারণেই উমাইয়্যা খিলাফতের পতন ঘটে। আর বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।
📄 উমাইয়্যাদের অবদান
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) ছিলেন উমাইয়্যা খান্দানের সদস্য। উমাইয়্যা খিলাফতের যিনি প্রতিষ্ঠাতা, তিনি হযরত রাসূলে কারীমের (সা) একজন মহান সাহাবী। মারওয়ান ইবন আল-হাকাম মুসলিম উম্মাহকে আবদুল মালিক ও 'আবদুল আযীযের মত যে দু'জন সুশিক্ষিত সন্তান উপহার দেন তা আমরা ভুলবো কেমন করে? এই মারওয়ানেরই পৌত্র মুসলিম উম্মাহর নয়নমণি ও কলিজার টুকরা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ)।
উমাইয়্যা শাসনামলের একজন আঞ্চলিক গভর্ণর হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ অনারবদের জন্য কুরআন পাঠ সহজ করার উদ্দেশ্যে নুকতা, হারাকাত, ওয়াক্ফ-সুকুন ইত্যাদি চিহ্নের যে ব্যবস্থা করে গেছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষয় হয়ে থাকবে। পারস্য, ভারতবর্ষসহ মধ্য এশিয়ার বিশাল অঞ্চলে ইসলামের যে বিস্তৃতি তা তো তাঁদেরই অবদান। সুতরাং মুসলিম উম্মাহর জন্য তাদের যে বিশাল অবদান তা খাটো করে দেখার কোন সুযোগ নেই।
📄 আরবীয় স্বভাব, দেশ জয় ও উন্নয়নমূলক কাজ
আরবীয় স্বভাব ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখা: এ তাদের একটি বড় কৃতিত্ব যে, খিলাফত পরিচালনায় সর্বক্ষেত্রে তারা আরবীয় প্রভাব ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখে। আরবদের সরলতা ও ঐতিহ্য তারা সংরক্ষণ করে। তাদের ভিত্তি ছিল শক্তি, সাহস ও বীরত্ব। অনারবদের জীবনের কোন কৃত্রিমতা ব্যক্তি, সমাজ, আচার-অনুষ্ঠান কোথাও কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।
দেশ জয়: উমাইয়্যা যুগে এত বেশী দেশ ও অঞ্চল বিজিত হয় যে, গোটা ইসলামের ইতিহাসে তার কোন নজীর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ত্রিপলি, তিউনিসিয়া, মরক্কো, স্পেন, কনস্টান্টিনোপল, ইরাক, খুরাসান, তাবারিস্তান, জুরজান, সিজিস্তান, আফগানিস্তান, ভারতবর্ষ, চীন ইত্যাদি দেশ ইসলামী খিলাফতের অংশে পরিণত হয়। এ ক্ষেত্রে খলীফা আল-ওয়ালীদের শাসনকালকে গৌরবজনক অধ্যায় বলে গণ্য করা হয়। ৬৩৪ নিয়মতান্ত্রিকভাবে নৌ অভিযানের সূচনা হয় এই উমাইয়্যা যুগে এবং তা ব্যাপকতা লাভ করে। এ সময় যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণের কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভূমি জরিপ: ভূমি জরিফের কাজ শুরু হয় উমাইয়্যা যুগে। ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক ভূমি জরিফ করান এবং 'উমার ইবন হুবাইরাকে ইরাকের ভূমি বন্দোবস্ত দানের নির্দেশ দেন। ৬৬
সেচের জন্য কূপ-খাল খনন: হযরত মু'আবিয়া (রা) সেচ ব্যবস্থার প্রতি ভীষণ গুরুত্ব দেন। তিনি নাহ্রু কাজামা, নারু আযরাক, নারু শুহাদা' ইত্যাদি খাল খনন করেন। ৬৩৭
পানীয় জলের জন্য খাল খনন: খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক মক্কায় একটি খাল খনন করেন। খলীফা আল-ওয়ালীদ বসরায় 'নাহরু 'উমার' নামক খাল খনন করেন।
রাস্তা-ঘাট সমতলকরণ: আল-ওয়ালীদ আরবের রাস্তা-ঘাট সমতল করে জনগণের চলাচলের জন্য সুগম করেন, আর সেই সংগে পথচারীদের পানির প্রয়োজন মেটানোর জন্য মাঝে মাঝে কূপ খনন করান।
হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা: আল-ওয়ালীদ প্রথম মুসলিম শাসক যিনি জনগণের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ৬৩৯
ভাতা প্রবর্তন: আল-ওয়ালীদ অন্ধ, আঁতুড়, খঞ্জ, কুষ্ঠরোগী, দুঃস্থ ও ইয়াতীমদের জন্য ভাতা চালু করেন। ৬৪১
ভবন নির্মাণ: স্থাপত্য শিল্পের উন্নতি বানু উমাইয়্যাদের যুগে হয়েছে। দিমাশকের জামে' মসজিদ, মসজিদে নববী, মসজিদে আকসা পুনর্নির্মাণ এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ।
টিকাঃ
৬৩৩. আদাবুস সুলতানিয়্যা-৩২
৬৩৪. তারীখ আল-খুলাফা'-২২৪
৬৩৫. মুরূজ আয-যাহাব (নাফহুত তীব-এর পার্শ্বটীকা)-৩/২১
৬৩৬. তারীখ আল-ইয়া'কুবী-২/৩৭৬
৬৩৭. খুলাসাতুল ওয়াফা-২৩৭
৬৩৮. তারীখ আল-ইয়া'কুবী-২/৩৫২
৬৩৯. প্রাগুক্ত-২/৩৪৮
৬৪০. প্রাগুক্ত-২/৩৩৮
৬৪১. প্রাগুক্ত-২/৩৪৫; তারীখ আল-খুলাফা'-২৪৪
৬৪২. তারীখ আল-ইয়া'কুবী-২/২৭৬
৬৪৩. আদাব আস-সুলতানিয়্যা-১১৪