📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের খিলাফত কালের একটি পর্যালোচনা

📄 ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের খিলাফত কালের একটি পর্যালোচনা


আমাদের পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) খিলাফতের আদর্শ ও বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর খিলাফতের ভিত্তি ছিল আল্লাহর কিতাব, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ্ এবং আল্লাহর ইতা'আত বা আনুগত্য। এই মৌলিক নীতিমালা এবং নিজের অবস্থান তিনি তুলে ধরেন খলীফা হিসেবে তাঁর প্রথম ভাষণে। তিনি বলেন: “ওহে জনমণ্ডলী! আপনাদের নবীর (সা) পরে দ্বিতীয় কোন নবী নেই এবং তাঁর উপর যে কিতাব নাযিল হয়েছে তার পরে আর কোন কিতাব নেই। আল্লাহ তাঁর নবীর মাধ্যমে যা কিছু হালাল করেছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত হালাল, আর তাঁর নবীর (সা) মাধ্যমে যা কিছু হারাম করেছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত হারাম থাকবে। আমি নিজে কোন সিদ্ধান্ত দানকারী নই, বরং আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নকারী। আমি নতুন কিছু উদ্ভাবনকারী নই, বরং একজন অনুসরণকারী মাত্র। আল্লাহর নাফরমানির ক্ষেত্রে কারো আনুগত্য লাভের কোন অধিকার নেই। শুনে রাখুন! আমি আপনাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নই। আমি আপনাদের মত একজন সাধারণ মানুষ। তবে আল্লাহ আমার উপর সবচেয়ে ভারী বোঝায় চাপিয়ে দিয়েছেন।”

হযরত 'উমার ইবন 'আযীযের (রহ) এই প্রথম ভাষণটির মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ্ উমাইয়্যা যুগে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লাভ করে যা থেকে তাদেরকে বহু বছর যাবত বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। মদীনার বিখ্যাত ইমাম কাসিম এ ভাষণ শুনে মন্তব্য করেছিলেন: ৬১১ 'যারা কথা বলতে পারতো না এখন তারা কথা বলতে পারবে।' তিনি খিলাফত পরিচালনার ব্যাপারে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত 'উমার ইবন আল- খাত্তাবকে (রা) আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) পৌত্র প্রখ্যাত তাবি'ঈ হযরত সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমারকে (রা) লেখেন: ৬১২ 'যদি আল্লাহর মরজি হয় এবং আমার মধ্যে সে যোগ্যতা ও ক্ষমতা থাকে তাহলে, আমি জনগণের যাবতীয় বিষয় ও ব্যাপারে 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাই। এ কারণে আপনি তাঁর লিখিত যাবতীয় ফরমান এবং মুসলমান ও যিম্মীদের ব্যাপারে যে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আদেশ দান করেন তা সবই পাঠিয়ে দিন। আল্লাহর ইচ্ছা হলে আমি তা অনুসরণ করবো।'

তখন যুগের পরিবর্তন হয়েছিল। নবুওয়াত ও রিসালাত যুগ অতিক্রান্ত হয়েছিল অনেক আগে। রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণও একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। উমাইয়্যা শাসকদের দীর্ঘদিনের শাসনে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যাপারে মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন ঘটেছিল। এ কারণে সেই যুগে ফারূকী আদলের খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ভীষণ কঠিন ব্যাপার ছিল। হযরত সালিম এ সকল সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা অনুধাবন করেন এবং 'উমারকে (রহ) লেখেন: "উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) যা কিছু করেছেন তা ছিল ভিন্ন একটা যুগে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন একদল মানুষের দ্বারা। আপনি যদি এই যুগে এ সকল মানুষের দ্বারা 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) অনুসরণ করতে সক্ষম হন তাহলে আপনি তাঁর চেয়ে উত্তম ব্যক্তিতে পরিণত হবেন।

হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) এই পরিবর্তিত অবস্থা এবং যাবতীয় বাধা-প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও পৃথিবীর মানুষকে আরেকবার ফারূকী খিলাফতের মডেল দেখিয়ে দেন। খলীফা হওয়ার পর তিনি ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবকে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠি পড়ে ইয়াযীদের মুখ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চারিত হয় : 'এই চিঠির ভাষা তাঁর পূর্ববর্তী খলীফাদের ভাষার মত নয়। মনে হচ্ছে তিনি তাদের চলার পথে চলতে চাচ্ছেন না।' এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্যকে তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থার সারসংক্ষেপ বলা যেতে পারে।

ইসলামী খিলাফতের ভিত্তি কেবল কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কিরামের (রা) কর্ম- পদ্ধতির উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) খিলাফতকালের পূর্বে এই ভিত্তি একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তিনি পুনরায় তা স্থাপন করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত কায়েম রাখেন। একবার তিনি ফরমান জারী করেন, যে আঞ্চলিক কর্মকর্তা কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী শাসন কাজ পরিচালনা করবে না তার আনুগত্য আবশ্যক নয়। একবার একটি ঘটনায় 'আব্বাস ইবন আল-ওয়ালীদ তার সামনে একটি দলিল উপস্থাপন করে। তিনি সেটি দেখে বলেন: 'আল্লাহর কিতাব আল-ওয়ালীদের এই কিতাবের (লিখিত দলিল) চেয়ে বেশী অনুসরণযোগ্য।' আবূ বকর ইবন হাযম বলেন: 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) যত চিঠি আসতো তাতে রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ জীবিত করার ও বিদ'আত দূর করার নির্দেশ অবশ্যই থাকতো।

তিনি বলতেন, যদি আমি আমার দেহের গোশতের প্রতিটি টুকরোর বিনিময়ে একটি বিদ'আত দূর করতে ও একটি সুন্নাহ জীবন্ত করতে পারতাম এবং এভাবে আমার জীবনও চলে যেত তাহলে আল্লাহর সন্তুষ্টির বিনিময়ে এ কাজ খুবই নগণ্য হতো। তিনি আরো বলতেন, যদি আমি সুন্নাহর বাস্তবায়ন করতে ও সত্যের পথে চলতে না পারি তাহলে এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে চাই না। ৬১৩

টিকাঃ
৬১১. মুফতী 'আমীমুল ইহসান, তারীখ আল-ইসলাম-২০৭
৬১২. ইবনুল জাওযী, সীরাতু 'উমার-১২৭
৬১৩. তাবাকাত-৫/৩৮৩
৬১৪. প্রাগুক্ত-৫/৩৪২
৬১৫. ইবনুল জাওযী-৬২; প্রাগুক্ত-৫/৩৮২
৬১৬. তাবাকাত-৫/৩৯২
৬১৭. ইবনুল জাওযী-১০১

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 তাঁর খিলাফত ও ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে মনীষীদের মূল্যায়ন

📄 তাঁর খিলাফত ও ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে মনীষীদের মূল্যায়ন


আমীরুল মু'মিনীন 'উমার খলীফা হিসেবে মানুষের মধ্যে মাত্র দু'বছর পাঁচ মাস ও কয়েক দিন বেঁচে ছিলেন। এ অল্প সময়ে তিনি যে বিশাল কর্মকাণ্ড সম্পাদন করেন তা বহু যুগেও করা সম্ভব ছিল না। এ কারণে তাঁর সময় থেকে নিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত অসংখ্য মনীষী তাঁর খিলাফত পরিচালনা, 'আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি যে একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক, অন্যতম খলীফায়ে রাশেদ ও সৎপথ প্রাপ্ত ইমাম ছিলেন— এ ব্যাপারে সকলে একমত পোষণ করেছেন।

ওয়াহাব ইবন মুনাববিহ্ বলেন: ৬১৮ 'এই উম্মাতের মধ্যে যদি কোন মাহ্দী হয়ে থাকেন তাহলে তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয।' প্রায় এমন কথাই বলেছেন সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, হাসান আল-বসরী, মুহাম্মাদ ইবন 'আলী (রহ) ও অন্যরা। মায়মূন ইবন মিহরান বলেন: ৬১৯ 'আল্লাহ তা'য়ালা একের পর এক নবী পাঠিয়ে মানুষের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। আর আল্লাহ 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের দ্বারা মানুষকে রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন।' ইমাম সুফইয়ান আছ-ছাওরী, শাফি'ঈ ও আবূ বকর ইবন 'আয়্যাশ (রহ) বলেন: ৬২০ 'খলীফায়ে রাশেদ পাঁচজন আবূ বকর, 'উমার ইবন আল-খাত্তাব, 'উছমান, 'আলী ও 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রা)।'

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) বলেন: ৬২১ 'হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, “কল্যাণময় ও সুমহান আল্লাহ প্রতি এক শ' বছরের মাথায় এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাবেন যে এই উম্মাতের জন্য তাদের দীনকে সংস্কার করবে।” আমরা যখন প্রথম শতকে দেখেছি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে পেয়েছি। আর যখন দ্বিতীয় শতকে দেখেছি, শাফি'ঈকে (রহ) পেয়েছি।'

ইমাম আয-যাহাবী বলেন: ৬৬৫ 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন একজন ইমাম, ফকীহ, মুজতাহিদ, সুন্নাহর জ্ঞানে পারদর্শী, বিশাল কর্মকাণ্ডের অধিকারী, দৃঢ় চিত্ত, হাদীছ শাস্ত্রের হুজ্জাত, হাফেজ, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী মানুষ।' ইমাম আন-নাওবী (রহ) লিখেছেন: 'তাঁর বিশাল জ্ঞান, অগাধ পাণ্ডিত্য, পরিচ্ছন্ন স্বভাব, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ তাপস্য, তাকওয়া, 'আদল-ইনসাফ, মুসলমানদের প্রতি দয়া ও মমতা, উন্নত চরিত্র, আল্লাহর রাস্তায় চূড়ান্ত রকমের প্রচেষ্টা, সুন্নাতে নববীর আনুগত্য- অনুসরণ এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুকরণের ব্যাপারে সকলে একমত।'

বন-জঙ্গল ও পাহাড়-পর্বতের ছাগল-ভেড়ার রাখালরাও 'উমারের 'আদল-ইনসাফের, তাঁর সুমহান কর্মকাণ্ডের সাক্ষ্য দিয়েছে। তাঁর সময়ে বন-জঙ্গলের হিংস্র জীব-জানোয়ারও হিংস্রতা ভুলে গিয়ে তাদের ছাগল-ভেড়ার পালের সাথে চরেছে। মালিক ইবন দীনার বলেন: 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যখন খলীফা হলেন, তখন রাজধানী দিমাশক থেকে বহু দূরে পাহাড়ের চূড়ায় ছাগলের রাখালরা বললো: মানুষের শাসন-কর্তৃত্ব হাতে নিয়েছেন, কে এই সত্যনিষ্ঠ মানুষটি? তোমরা বুঝলে কিভাবে? তারা বললো: একজন ন্যায়পরায়ণ খলীফা যখন মানুষের শাসন-কর্তৃত্ব হাতে নেন তখন নেকড়ে আমাদের ছাগল-ভেড়া শিকার করা থেকে বিরত থাকে। মুসা ইবন আ'য়ান বলেন: 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালে হঠাৎ এক রাতে একটি নেকড়ে একটি ছাগল আক্রমণ করে। আমরা বলাবলি করলাম, হয়তো সেই সৎ লোকটি মারা গেছেন। পরে জানা গেল সেই রাতে 'উমার মারা গেছেন। ৬২৫

ইমাম মালিক বর্ণনা করেছেন। "সালিহ ইবন 'আলী একবার শামে গিয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কবরটি কোথায় তা জানার জন্য মানুষের নিকট জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। অবশেষে এক পাদ্রীর নিকট গেলেন। তিনি বললেন: আপনি কি সত্যবাদী লোকটির কবর তালাশ করছেন? সেটা তো ঐ খামারে। ৬২৭

টিকাঃ
৬১৮. তাবাকাত-৫/৩৩৩; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২০০; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১৩০
৬১৯. ইবনুল জাওযী-৭৪
৬২০. সিফাতুস সাফওয়া-২/১১৩; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২০০; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১৩০
৬২১. ফাতহুল বারী-১৩/২৯৫; আল-বিদায়া-৯/২০৭
৬২২. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-২৭১
৬২৩. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-২/১৮
৬২৪. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৩৭২, ৩৭৩
৬২৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২০৩; তারীখ আল-খুলাফা'-২৩৩; তাবাকাত-৫/৩৮৬, ৩৮৭
৬২৬. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৪/৪২৫
৬২৭. ইবনুল জাওযী-৩৩১; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১৪৩

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা

📄 ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা


হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) 'আদল ও ইনসাফভিত্তিক যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, পরবর্তী খলীফা ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক তা মাত্র চল্লিশ দিন বহাল রাখেন। তিনি 'উমারের এই ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক শাসন পদ্ধতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। ৬২৮ 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) যে সকল সৎ ও আল্লাহ ভীরু কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন ইয়াযীদ তাদেরকে বরখাস্ত করেন। নওরোয ও ধর্মীয় উৎসবের যাবতীয় উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ এবং বেগার খাটানোর প্রথা যা 'উমার একেবারে মুছে ফেলেন তা আবার চালু হয়। ফাদাক যা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয স্বীয় উত্তরাধিকার থেকে বের করে হযরত ফাতিমার (রা) বংশধরদের ফিরিয়ে দেন, ইয়াযীদ আবার তা কেড়ে নেন। ৬২৯

মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ ইয়ামনবাসীদের উপর যে নিপীড়নমূলক খারাজ ধার্য করেন 'উমার তা 'উশরে পরিণত করেন। কিন্তু ইয়াযীদ আবার তা খারাজে রূপান্তরিত করেন। ৬৩০ হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ নাজরানের খ্রীস্টানদের নিকট থেকে জিযিয়া হিসেবে আট শ' কারুকাজ করা কাপড় গ্রহণ করতো। 'উমার তা কমিয়ে দু' শ' ধার্য করেন। কিন্তু খলীফা ইয়াযীদের সময়ে আবার তা আট শ'-তে পরিবর্তন করা হয়। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) কাদরিয়া সম্প্রদায়ের মতবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন, কিন্তু ইয়াযীদ ইবন আল-ওয়ালীদ খলীফা হয়ে তাদের ঘোরতর সমর্থকে পরিণত হন। ৬৩২

ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক খিলাফতের দায়িত্বগ্রহণের পরই বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মকর্তাদের নিকট যে পত্রটি লেখেন তাতেই তাঁর কর্মপদ্ধতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পত্রে তিনি লেখেন: 'অতঃপর এই যে, 'উমার ছিলেন প্রতারিত মানুষ। তোমরা ও তোমাদের সঙ্গী-সাথীরা তাঁর সাথে প্রতারণা করেছো। খাজনা-ট্যাক্স কমানোর ব্যাপারে তাঁর কাছে লেখা তোমাদের অনেক চিঠি-পত্র আমি দেখেছি। আমার এ পত্র তোমাদের নিকট পৌঁছা মাত্র তোমাদের জানা তাঁর সকল ওয়াদা-অঙ্গীকার পরিত্যাগ করবে। মানুষকে তাদের সেই পূর্বের মর্যাদা ও স্তরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। চাই ফসল হোক বা খরা হোক, তারা পছন্দ করুক বা না করুক এবং তারা বাঁচুক বা মরুক। ওয়াস সালাম।'

টিকাঃ
৬২৮. তারীখ আল-খুলাফা'-২৪৭
৬২৯. তারীখ আল-ইয়া'কুবী-২/২৭২, ২৬৬, ২৭৬
৬৩০. ফুতুহ আল-বুলদান-১৩০, ১৮০
৬৩১. প্রাগুক্ত-৭২, ৩৭৫
৬৩২. তারীখ আল-খুলাফা'-২৫৫
**. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৪৩

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 বানূ উমাইয়্যা শাসনের অবসান

📄 বানূ উমাইয়্যা শাসনের অবসান


'আব্বাসীয়দের আন্দোলনের সূচনা হয় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) খিলাফতকালে। এর মাত্র তিরিশ বছর পরেই উমাইয়্যা শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) যে রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা তাঁর ইনতিকালের অব্যবহিত পরেই বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে।

হযরত মু'আবিয়ার (রা) সময়ে উমাইয়্যা-হাশিমী এই দু'টি শক্তি পরস্পর মুখোমুখী অবস্থানে দাঁড়ায়। মূলতঃ তখন থেকেই আরবে গৃহ যুদ্ধের সূচনা হয়। খলীফা 'আবদুল মালিক ও আল-ওয়ালীদের সময়কাল পর্যন্ত প্রতিপক্ষ শক্তি গোপন থাকে। তবে যখন তাঁদের মত ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গের অবসান ঘটে তখন বানু হাশিম অনারবদের উপর ভর করে মাথা তুলে দাঁড়ায়। তারা অনারব শক্তির কেন্দ্র ইরাক ও খুরাসানে তাদের কর্মী ও প্রতিনিধিদের ছড়িয়ে দেয়। আবূ মুসলিম খুরাসানী নামক একজন বিস্ময়কর ব্যক্তিকে সহযোগী হিসেবে লাভ করে হাশিমীরা শক্তি বৃদ্ধি করে। অবশেষে উমাইয়্যা বংশের সর্বশেষ খলীফা মারওয়ান ইবন মুহাম্মাদ পালিয়ে মিসরে যাওয়ার পথে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর সাথে হিজরী ১৩২/খ্রী: ৭৫০ সনে উমাইয়্যা শাসনের পতন হয়।

কোন কোন স্থূল পর্যালোচনায় বলা হয় যে, অমুসলিমদের প্রতি 'উমারের উদার ও ন্যায়ানুগ কর্ম-পদ্ধতি গ্রহণের ফলে জিযিয়া ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাজার হাজার অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করায় এবং সচ্ছল ব্যক্তিদের সম্পদ কেড়ে নেওয়ায় আর্থিক ব্যবস্থাপনা ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু আমরা মনে করি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) শূরা ও ইনসাফভিত্তিক যে রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, তার থেকে পরবর্তী খলীফাগণ দূরে সরে যাওয়ার কারণেই উমাইয়্যা খিলাফতের পতন ঘটে। আর বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px