📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 চিঠিপত্রের জবাবে ‘উমারের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য

📄 চিঠিপত্রের জবাবে ‘উমারের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য


‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের নিকট প্রেরিত চিঠি অথবা দরখাস্তের উপর তাঁর কিছু সংক্ষিপ্ত মন্তব্য:

এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা তাঁর একটি শহর পুনঃনির্মাণের অনুমতি চেয়ে চিঠি লিখলেন। ‘উমার সেই চিঠির নীচে নিম্নের মন্তব্যটি লিখে ফেরত পাঠালেন: ‘ওটি তৈরি কর আদল ও ইনসাফ দ্বারা এবং জুলুম-অত্যাচার থেকে ওটির রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন রাখ।’

আরেকজন কর্মকর্তার অনুরূপ একটি চিঠির জবাবে লেখেন: ‘খোদাভীতি দ্বারা ওটি এবং তোমার নিজেকে মজবুত ও সুরক্ষিত কর।’

এক ব্যক্তিকে তিনি যাকাতের দায়িত্বে নিয়োগ দান করেন। লোকটি ছিল কুৎসিত চেহারার। সে আদল ও ইনসাফ মত সুন্দরভাবে কাজ করে। তাকে তিনি এই আয়াতটি লিখে পাঠান: ‘তোমাদের দৃষ্টিতে যারা হেয় তাদের সম্বন্ধে আমি বলিনা যে, আল্লাহ তাদেরকে কখনো কল্যাণ দান করবেন না।’

ইরাকের ওয়ালী তথাকার অধিবাসীদের অবাধ্যতার কথা জানিয়ে চিঠি লিখলেন। ‘উমার সেই চিঠির পাশে এই মন্তব্যটি লিখে তাঁর নিকট ফেরত পাঠালেন: ‘তাদের জন্য তাই পছন্দ কর যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ করে থাক, তারপর তাদের অপরাধের ভিত্তিতে তাদেরকে পাকড়াও কর।’

মদীনার ওয়ালী ঘর নির্মাণের জন্য তাঁর নিকট একখণ্ড ভূমির আবেদন জানিয়ে পত্র লিখলে তিনি এই কথাটি লিখে পাঠান: ‘মৃত্যুর ব্যাপারে সতর্ক হও।’ একজন মজলুমের আবেদনের জবাবে লেখেন: ‘তোমার ইমাম বা খলীফা সাক্ষাৎ ন্যায়বিচার।’ একজন কয়েদীর আবেদনপত্রের উপর মন্তব্য লেখেন: ‘তাওবা কর, মুক্তি পাবে।’

টিকাঃ
৫৯৩. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/২০৯
৫৯৪. সূরা হূদ-৩১

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘উমারের কিছু জ্ঞানগর্ভ কথা

📄 ‘উমারের কিছু জ্ঞানগর্ভ কথা


তিনি বলতেন: ‘যে ব্যক্তি বললো: আমি জানিনে সে অর্ধেক জ্ঞান সংরক্ষণ করলো।’

এক ব্যক্তি ‘উমারকে উট ও সিফফীন যুদ্ধে নিহতদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। তিনি বললেন: ‘তা ছিল কিছু রক্ত। আল্লাহ এই রক্ত থেকে আমার হাতকে বাঁচিয়েছেন। সুতরাং তাতে আমি আমার জিহ্বা ডোবাতে চাই না।’

পাথরের ছোট কণা হাতে নিয়ে তাসবীহ পাঠরত এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ‘উমার দেখলেন, এক শ' বার তাসবীহ পাঠ শেষে একটি পাথর কণা পাশে রেখে দিচ্ছে। তিনি লোকটির উদ্দেশ্যে বললেন: ‘পাথর ফেলে দাও এবং দু'আকে প্রদর্শনী থেকে পরিচ্ছন্ন কর।’

তিনি বলেন: ‘এক জিনিসের সাথে আরেকটি জিনিসের যুক্ত করার যা কিছু আছে তার মধ্যে সর্বোত্তম সংযুক্তি হলো জ্ঞানের সাথে বিচক্ষণতা ও ক্ষমতার সাথে ক্ষমার।’

একবার এক ব্যক্তি ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযকে প্রশ্ন করলো: আমি কখন কথা বলবো? বললেন: যখন তোমার চুপ থাকতে ইচ্ছা হয়। সে আবার প্রশ্ন করলো: আমি চুপ থাকবো কখন? বললেন: যখন তোমার কথা বলতে ইচ্ছা হয়।

জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে তিনি বলেন: ‘আল্লাহ-ভীরু ব্যক্তির জিহ্বায় লাগাম লাগানো।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিষয় হচ্ছে তিন প্রকার। এক প্রকার যা সত্য-সঠিক হওয়া স্পষ্ট, সুতরাং তা অনুসরণ কর। আরেক প্রকার যা অসত্য ও ক্ষতিকর হওয়া স্পষ্ট, তা পরিহার কর। তৃতীয় প্রকার হলো অস্পষ্ট ও সংশয়পূর্ণ, সুতরাং তা আল্লাহর দিকে রুজু কর।’

টিকাঃ
৫৯৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩৯৮
৫৯৬. প্রাগুক্ত-২/২৮৯, ৩/১৩০
৫৯৭. প্রাগুক্ত-৩/২৮১
৫৯৮. প্রাগুক্ত-১/২৮৫; ড. 'উমার ফাররূখ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-১/৬০৭
৫৯৯. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/৪৭৩
৬০০. প্রাগুক্ত-৩/১৫১, ১৮৭
৬০১. প্রাগুক্ত-৩/৮১

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘উমারের ভাষা দক্ষতা

📄 ‘উমারের ভাষা দক্ষতা


একদিন ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয বসে আছেন খলীফা আল-ওয়ালীদ ইবন ‘আবদিল মালিকের নিকট। আল-ওয়ালীদ ছিলেন একজন অশুদ্ধ ভাষী ব্যক্তি। তিনি চাকরকে বললেন: ‘ইয়া গুলামু আদউ লি সালিহ’ (ইয়া গুলামু আদউ লি সালিহুন) অর্থাৎ তিনি বলতে চাচ্ছেন: চাকর। সালিহকে আমার কাছে ডেকে আন। যেমন মনিব তেমন চাকর। সে ডাকলো : ‘ইয়া সালিহান’ (ওহে সালিহ)। তার ডাক শুনে আল-ওয়ালীদ চাকরকে বললেন: তুমি আলিফ ফেলে দাও। অর্থাৎ ‘ইয়া সালিহু’ বল। তখন ‘উমার বললেন: আমীরুল মু'মিনীন, আপনিও একটি আলিফ বাড়িয়ে দিন। অর্থাৎ ‘আদউ লি সালিহান’ বলুন। আসলে মনিব ও চাকর উভয়ে স্বর ধ্বনির ব্যাপারে ভুল করেছিল। চাকরকে মনিব শুদ্ধ করেন এবং মনিবকে করেন ‘উমার।

টিকাঃ
৬০৬. প্রাগুক্ত-২/৪৮০, ৪/৪২৩

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আমীরুল মু’মিনীন ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয (রহ)-কে লেখা হাসান আল-বসরীর (রহ) কয়েকটি পত্র

📄 আমীরুল মু’মিনীন ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয (রহ)-কে লেখা হাসান আল-বসরীর (রহ) কয়েকটি পত্র


‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয (রহ) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর ন্যায়পরায়ণ শাসকের গুণাবলী কি তা জানতে চেয়ে হাসান আল-বসরীকে (রহ) একটি পত্র লেখেন। জবাবে হাসান (রহ) ন্যায়পরায়ণ শাসকের পরিচয় তুলে ধরে খলীফাকে একটি পত্র লেখেন। পত্রটির কিছু অংশ নিম্নরূপ:
‘হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি জেনে রাখুন, আল্লাহ তা'আলা ন্যায়পরায়ণ শাসককে প্রত্যেক ঝোঁক-প্রবণ মানুষের জন্য অবলম্বন, প্রত্যেক অত্যাচারীর জন্য সত্য-সঠিক পথ, প্রত্যেক বিনষ্ট ও বিকৃত মানুষের জন্য সংশোধন, প্রত্যেক দুর্বলের জন্য শক্তি, প্রত্যেক অত্যাচারিতের জন্য সুবিচার এবং প্রত্যেক দুঃখিতজনের আশ্রয়স্থল করে দিয়েছেন। হে আমীরুল মু'মিনীন! ন্যায়পরায়ণ শাসক হলেন সেই রাখালের মতো যে তার উটের প্রতি দয়া ও মমতাশীল। ন্যায়পরায়ণ শাসক হলেন সেই স্নেহপ্রবণ পিতার মতো যিনি তাঁর সন্তানদেরকে শৈশবকালে আদর-স্নেহ দিয়ে লালন-পালন করেন। ন্যায়পরায়ণ শাসক হলেন সেই স্নেহময়ী পবিত্র মায়ের মতো। ন্যায়পরায়ণ শাসক আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যে দণ্ডায়মান। তিনি আল্লাহর কথা শোনেন, বান্দাদের শোনান; আল্লাহকে দেখেন, তাদেরকে দেখান; আল্লাহর আনুগত্য করেন এবং তাদেরকে সে দিকে চালিত করেন।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি মৃত্যু ও তার পরবর্তী অবস্থা এবং সেখানে আপনার লোক-লস্কর ও সাহায্যকারীর স্বল্পতার কথা স্মরণ করুন। আপনি মৃত্যু ও তার পরবর্তী বিভীষিকাময় অবস্থার জন্য পাথেয় প্রস্তুত করুন। জেনে রাখুন, আপনি যে বাড়ীতে আছেন, সেটি ছাড়াও আপনার আরেকটি বাড়ী আছে। সেখানে আপনার অবস্থান হবে অনেক দীর্ঘ। আপনার আত্মীয়-বন্ধুরা আপনাকে একাকী কবরের গর্তে রেখে আপনার থেকে পৃথক হয়ে যাবে।

মৃত্যুর আগমন এবং আশা-আরজু বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্বে আপনি সুযোগের ব্যবহার করুন। আপনি আল্লাহর বান্দাদেরকে জাহিলী আইন ও রীতি-পদ্ধতিতে শাসন করবেন না। আপনি তাদের সাথে অত্যাচারী শাসকদের মতো আচরণ করবেন না। আমীরুল মু'মিনীন! আমি আমার এই উপদেশ দ্বারা সেই কাজ করতে পারবো না যা আমার পূর্বে জ্ঞানী ব্যক্তিরা করেছেন। তবে আমি আপনার প্রতি দরদ ও সহানুভূতি প্রকাশ করতে ও উপদেশ দান করতে বিরত থাকিনি। আমার এই পত্রটিকে আপনি সেই বন্ধুর মতো মনে করুন, যে তার অসুস্থ বন্ধুকে অত্যন্ত তিক্ত ঔষুধ জোর করে পান করায় তার সুস্থতার আশায়। আমীরুল মু'মিনীন! আস-সালামু ‘আলায়কা ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!’

টিকাঃ
৬০৭. প্রাগুক্ত-১/৩৫-৩৮; ইবনুল জাওযী, আল-হাসান আল-বাসরী-৫৬; জামহারাতু খুতাব আল- 'আরাব-২/৪৯৫-৪৯৭
৬০৮. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৫২
৬০৯. জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/৪৯৭
৬১০. প্রাগুক্ত-২/৪৯৮-৪৯৯; ইবনুল জাওযী, আল-হাসান আল-বাসরী-৫৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px