📄 ‘উমার ও কবি দুকাইন ইবন সা‘ঈদ আদ-দারিমী
দুকাইন ছিলেন একজন রজয ছন্দের পল্লী কবি। ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয খলীফা সুলায়মানের সময় যখন মদীনার ওয়ালী ছিলেন তখন দুকাইন তাঁর প্রশংসায় একটি কবিতা রচনা করেন। ‘উমার খুশী হয়ে তাঁকে উৎকৃষ্ট জাতের পনেরোটি উট দান করেন। যাত্রাকালে ‘উমার বললেন: দুকাইন! আমার একটি উচ্চাভিলাষী মন আছে। আমার বর্তমান অবস্থার চেয়ে উন্নততর কোন অবস্থায় পৌঁছার কথা যদি জানতে পার তাহলে আমার নিকট আসবে, আমি তোমাকে আরো ইনাম-বখশীশ দেব।
একদিন দুকাইন আল-ইয়ামামা মরু এলাকায় তাঁর উটগুলো চরাচ্ছেন। এমন সময় একজন ঘোষকের মুখে জানতে পারলেন, আমীরুল মু'মিনীন সুলায়মান ইবন ‘আবদিল মালিক ইনতিকাল করেছেন। তিনি তার নিকট পরবর্তী খলীফা কে হয়েছেন তা জানতে চাইলেন। সে বললো ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয। ‘উমারের নামটি শোনার সাথে সাথে তিনি দারুল খিলাফা দিমাশকে যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলেন।
এক সময় তিনি দিমাশকে পৌঁছলেন। খলীফার বাসভবনে গিয়ে পৌঁছলেন। দেখলেন, খলীফা আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে এবং তাকে ঘিরে আছে ইয়াতীম, বিধবা ও বিভিন্ন ধরনের অধিকার বঞ্চিত লোকেরা। এই ভীড়ের বেষ্টনী ভেদ করে তিনি খলীফার নিকট পৌঁছতে পারলেন না। অবশেষে উচ্চকণ্ঠে আবৃত্তি করতে লাগলেন নিম্নের চরণ দু'টি: ‘হে উত্তম কর্মকাণ্ড ও মহৎ গুণাবলীর অধিকারী ‘উমার! হে সুবিশাল খাঞ্চার অধিকারী ‘উমার! আমি হাদারামাওত উপত্যকার কাতান জনপদের দারিম গোত্রের একজন মানুষ। আমি আমার মহান ভাইয়ের নিকট আমার পাওনা দাবী করছি।’
‘উমার তাঁকে কাছে ডেকে বললেন: দুকাইন! মদীনায় আমি যে একটি কথা তোমাকে বলেছিলাম তাকি তোমার স্মরণ আছে? আমি বলেছিলাম আমার একটি মন আছে যে সব সময় আমি যা লাভ করি তা থেকে উন্নততর কিছু লাভের আশায় উদগ্রীব থাকে। আমি দুনিয়ার পরম প্রত্যাশিত বিষয় রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হয়েছি। এখন আমার মন আখিরাতের পরম প্রত্যাশিত বিষয় জান্নাত লাভের জন্য উদগ্রীব। দুনিয়ার বাদশারা তাদের বাদশাহীকে পার্থিব সম্মান ও মর্যাদা লাভের পথ ও পন্থা হিসেবে বিবেচনা করে। আর আমি এটাকে করবো আখিরাতের সম্মান ও মর্যাদা লাভের উপায়।
তারপর তিনি বললেন দুকাইন! আল্লাহর কসম! আমি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলমানদের সম্পদ থেকে না একটি দিরহাম, আর না একটি দীনার গ্রহণ করেছি। এখন আমি মাত্র এক হাজার দিরহামের মালিক। তার থেকে অর্ধেক তুমি নিয়ে বাকী অর্ধেক আমার জন্য রেখে যাও। দুকাইন পাঁচ শ' দিরহাম নিয়ে ফিরে আসেন।
টিকাঃ
৫৮১. প্রাগুক্ত-৩/২০; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৩৩০
৫৮২. হ্রাস করা বাদলের দিন- অর্থাৎ লাজুক সৌখিন প্রিয়ার সাথে উঁচু তাঁবুর বাসরে একটি বাদল ঘন দিন যাপন করে দীর্ঘ সময়কে কমিয়ে দেওয়া। একা একা বাদল ঘন দিন কাটানো কষ্টকর। প্রেয়সীর সঙ্গে এমন দিন কাটানো, আনন্দময় অবস্থায় কেটে যায় বলে মনে হয় সময় আরো দীর্ঘ হলে ভালো হতো। এই অর্থে দীর্ঘ সময় কমানো।
৫৮৩. কাব্যানুবাদ, নূরুদ্দীন আহমদ, অস-সব'উল মু'আল্লাকাত (কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা-১৯৭২), পৃ. ১৯৯
৫৮৪. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৬/১২-১৩, ২২০
📄 বক্তৃতা-ভাষণ
‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয যদিও একজন বাগ্মী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেননি, তবে তাঁর বক্তৃতা-ভাষণ ছিল দারুণ প্রভাব সৃষ্টিকারী ও মনোমুগ্ধকর। খিলাফতের গুরুদায়িত্ব তাঁর কাঁধে অর্পিত হওয়ার পর তিনি প্রথম যে ভাষণটি দেন তাতে বলেন: ‘ওহে জনমণ্ডলী! খিলাফতের এ দায়িত্বভার আমার কাঁধে চাপানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার কোন মতামত নেওয়া হয়নি, আমি তা চাইনি এবং মুসলমানদের কোন পরামর্শও নেওয়া হয়নি। আপনাদের কাঁধে আমার বাই'আতের যে বোঝা চাপানো হয়েছে আমি তা নামিয়ে নিলাম। এখন আপনারা নিজেদের জন্য অন্য কাউকে খলীফা মনোনীত করুন।’ সকলে সমস্বরে বলে উঠলো— হে আমীরুল মু'মিনীন! আমরা আপনাকেই নির্বাচিত করেছি এবং আপনার প্রতি সন্তুষ্ট আছি।
পুনরায় জনগণের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে খলীফা নির্বাচিত হয়ে তিনি যে ভাষণ দেন তাতে বলেন: ‘ওহে জনমণ্ডলী! আপনাদের নবীর (সা) পরে কোন নবী নেই এবং তাঁর উপর যে কিতাব নাযিল হয়েছে তার পরে আর কোন কিতাব নেই। আল্লাহ তাঁর নবীর মাধ্যমে যা কিছু হালাল করেছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত হালাল, আর তাঁর নবীর (সা) মাধ্যমে যা কিছু হারাম করেছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত হারাম থাকবে। আমি নিজে কোন সিদ্ধান্ত দানকারী নই, বরং আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নকারী। আমি নতুন কিছু উদ্ভাবনকারী নই, বরং একজন অনুসরণকারী মাত্র। আল্লাহর নাফরমানির ক্ষেত্রে কারো আনুগত্য লাভের কোন অধিকার নেই। শুনে রাখুন! আমি আপনাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নই। আমি আপনাদের মত একজন সাধারণ মানুষ। তবে আল্লাহ আমার উপর সবচেয়ে ভারী বোঝায় চাপিয়ে দিয়েছেন। ওহে জনমণ্ডলী! ফরযসমূহ আদায় করা এবং হারামসমূহ পরহেয করা সর্বোত্তম ইবাদাত।’
‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয (রহ) তাঁর খিলাফতকালে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নবীর (সা) পদ্ধতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য যা কিছু যেভাবে করণীয় সবই করেন। তাঁর একটি ভাষণে তিনি বলেন: ‘প্রত্যেক ভ্রমণের জন্য থাকে পাথেয় ও প্রস্তুতি। সুতরাং আপনারা দুনিয়া থেকে আখিরাতে ভ্রমণের জন্য পাথেয় সঞ্চয় করুন। আপনাদের জীবনকাল অবশ্য বৃদ্ধি পাবে না, আর তা হলে আপনাদের অন্তর শক্ত হয়ে যাবে এবং আপনারা আপনাদের শত্রুর আনুগত্য করবেন। আল্লাহর কসম! যে জানে না যে, সে সকালের পর সন্ধ্যা এবং সন্ধ্যার পর সকাল পর্যন্ত বাঁচবে কিনা, তার সব আশা পূর্ণ হতে পারে না।’
খুনাসিরা নামক শহরে তিনি তাঁর জীবনের সর্বশেষ ভাষণটি দান করেন। আল্লাহর হামদ ও ছানা ব্যক্ত করার পর তিনি বলেন: ‘ওহে জনমণ্ডলী! আপনাদেরকে অহেতুক সৃষ্টি করা হয়নি এবং এমনিই ছেড়ে দেওয়া হবে না। আপনাদের একটি প্রত্যাবর্তনস্থল আছে, সেখানে আল্লাহ আপনাদের বিচার-ফয়সালা করবেন। জেনে রাখুন! আগামীকালের নিরাপত্তা তার জন্য যে আজকে ভয় পায়। আপনারা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা তাদেরকে বিদায় জানাচ্ছেন যারা তাদের জীবনকাল শেষ করেছে। আমি আপনাদেরকে একথাই বলছি। আমার পাপের চেয়ে বেশী পাপ আপনাদের কারো আছে বলে আমার জানা নেই। অতএব আপনারা আমার জন্য ও আপনাদের নিজেদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন।’
টিকাঃ
৫৮৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৯৪
৫৮৬. মুরূজ আয-যাহাব-৩/১৯৪
৫৮৭. কিতাবুল আমালী-২/১০০
৫৮৮. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/১৪৩; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২০৯
৫৮৯. তারীখ আত-তাবারী-৮/১৪১
৫৯০. জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২০৭
৫৯১. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৩৭
৫৯২. প্রাগুক্ত-৪/৯৫; সিফাতুস সাফওয়া-২/১২৩, ১২৪
📄 চিঠিপত্রের জবাবে ‘উমারের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য
‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের নিকট প্রেরিত চিঠি অথবা দরখাস্তের উপর তাঁর কিছু সংক্ষিপ্ত মন্তব্য:
এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা তাঁর একটি শহর পুনঃনির্মাণের অনুমতি চেয়ে চিঠি লিখলেন। ‘উমার সেই চিঠির নীচে নিম্নের মন্তব্যটি লিখে ফেরত পাঠালেন: ‘ওটি তৈরি কর আদল ও ইনসাফ দ্বারা এবং জুলুম-অত্যাচার থেকে ওটির রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন রাখ।’
আরেকজন কর্মকর্তার অনুরূপ একটি চিঠির জবাবে লেখেন: ‘খোদাভীতি দ্বারা ওটি এবং তোমার নিজেকে মজবুত ও সুরক্ষিত কর।’
এক ব্যক্তিকে তিনি যাকাতের দায়িত্বে নিয়োগ দান করেন। লোকটি ছিল কুৎসিত চেহারার। সে আদল ও ইনসাফ মত সুন্দরভাবে কাজ করে। তাকে তিনি এই আয়াতটি লিখে পাঠান: ‘তোমাদের দৃষ্টিতে যারা হেয় তাদের সম্বন্ধে আমি বলিনা যে, আল্লাহ তাদেরকে কখনো কল্যাণ দান করবেন না।’
ইরাকের ওয়ালী তথাকার অধিবাসীদের অবাধ্যতার কথা জানিয়ে চিঠি লিখলেন। ‘উমার সেই চিঠির পাশে এই মন্তব্যটি লিখে তাঁর নিকট ফেরত পাঠালেন: ‘তাদের জন্য তাই পছন্দ কর যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ করে থাক, তারপর তাদের অপরাধের ভিত্তিতে তাদেরকে পাকড়াও কর।’
মদীনার ওয়ালী ঘর নির্মাণের জন্য তাঁর নিকট একখণ্ড ভূমির আবেদন জানিয়ে পত্র লিখলে তিনি এই কথাটি লিখে পাঠান: ‘মৃত্যুর ব্যাপারে সতর্ক হও।’ একজন মজলুমের আবেদনের জবাবে লেখেন: ‘তোমার ইমাম বা খলীফা সাক্ষাৎ ন্যায়বিচার।’ একজন কয়েদীর আবেদনপত্রের উপর মন্তব্য লেখেন: ‘তাওবা কর, মুক্তি পাবে।’
টিকাঃ
৫৯৩. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/২০৯
৫৯৪. সূরা হূদ-৩১
📄 ‘উমারের কিছু জ্ঞানগর্ভ কথা
তিনি বলতেন: ‘যে ব্যক্তি বললো: আমি জানিনে সে অর্ধেক জ্ঞান সংরক্ষণ করলো।’
এক ব্যক্তি ‘উমারকে উট ও সিফফীন যুদ্ধে নিহতদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। তিনি বললেন: ‘তা ছিল কিছু রক্ত। আল্লাহ এই রক্ত থেকে আমার হাতকে বাঁচিয়েছেন। সুতরাং তাতে আমি আমার জিহ্বা ডোবাতে চাই না।’
পাথরের ছোট কণা হাতে নিয়ে তাসবীহ পাঠরত এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ‘উমার দেখলেন, এক শ' বার তাসবীহ পাঠ শেষে একটি পাথর কণা পাশে রেখে দিচ্ছে। তিনি লোকটির উদ্দেশ্যে বললেন: ‘পাথর ফেলে দাও এবং দু'আকে প্রদর্শনী থেকে পরিচ্ছন্ন কর।’
তিনি বলেন: ‘এক জিনিসের সাথে আরেকটি জিনিসের যুক্ত করার যা কিছু আছে তার মধ্যে সর্বোত্তম সংযুক্তি হলো জ্ঞানের সাথে বিচক্ষণতা ও ক্ষমতার সাথে ক্ষমার।’
একবার এক ব্যক্তি ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযকে প্রশ্ন করলো: আমি কখন কথা বলবো? বললেন: যখন তোমার চুপ থাকতে ইচ্ছা হয়। সে আবার প্রশ্ন করলো: আমি চুপ থাকবো কখন? বললেন: যখন তোমার কথা বলতে ইচ্ছা হয়।
জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে তিনি বলেন: ‘আল্লাহ-ভীরু ব্যক্তির জিহ্বায় লাগাম লাগানো।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিষয় হচ্ছে তিন প্রকার। এক প্রকার যা সত্য-সঠিক হওয়া স্পষ্ট, সুতরাং তা অনুসরণ কর। আরেক প্রকার যা অসত্য ও ক্ষতিকর হওয়া স্পষ্ট, তা পরিহার কর। তৃতীয় প্রকার হলো অস্পষ্ট ও সংশয়পূর্ণ, সুতরাং তা আল্লাহর দিকে রুজু কর।’
টিকাঃ
৫৯৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩৯৮
৫৯৬. প্রাগুক্ত-২/২৮৯, ৩/১৩০
৫৯৭. প্রাগুক্ত-৩/২৮১
৫৯৮. প্রাগুক্ত-১/২৮৫; ড. 'উমার ফাররূখ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-১/৬০৭
৫৯৯. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/৪৭৩
৬০০. প্রাগুক্ত-৩/১৫১, ১৮৭
৬০১. প্রাগুক্ত-৩/৮১