📄 কবিদের সাথে ‘উমারের সম্পর্ক
একথা সত্য যে, কবিতা জ্ঞানের একটি উত্তম ও কল্যাণকর শাখা। তবে কবিতা কেবল তখনই সাধারণ মানুষের শিক্ষা এবং সমাজ ও পরিবেশ পরিশুদ্ধির কাজে আসতে পারে যখন কবিগণ পরিশুদ্ধ ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী হয়। কিন্তু এটাকে দুর্ভাগ্য বা দুর্ঘটনা যাই বলা হোক না কেন, সে সময়ের কবিগণ ইসলামী নৈতিকতার মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। তারা গোত্রীয় অন্ধ পক্ষপাতিত্ব ও বংশীয় গর্ব ও গৌরবের পতাকাবাহী তো ছিল, কিন্তু কোন নীতি-নৈতিকতার ধারে-কাছেও ছিল না। তা সত্ত্বেও হযরত ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের (রহ) পূর্বে উমাইয়্যা খলীফাগণ তাদের প্রতি অত্যধিক আনুকূল্য প্রদর্শন করতেন।
খলীফাগণ তাদের দ্বারা নানা রকম অসৎ উদ্দেশ্য সাধন করতেন। বিশেষতঃ আন্ত-গোত্রীয় কোন্দল সৃষ্টিতে কবিদেরকে বেশী ব্যবহার করা হতো। বিনিময়ে তারা লাভ করতো সম্মান ও বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ। উমাইয়্যা আমলের সবচেয়ে বড় তিন কবি— ফারাযদাক, আখতাল ও জারীর তো এক্ষেত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।
হযরত ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয (রহ) খিলাফতের মসনদে আসীন হওয়ার পর সেকালের বড় বড় আরব কবিগণ তাঁকে স্বাগতম জানিয়ে কাসীদা পাঠ করার জন্য দিমাশকে সমবেত হন। তাঁদের মধ্যে নুসাইব, জারীর, ফারাযদাক, আহওয়াস, কুছায়্যির, হাজ্জাজ আল-কুদা'ঈ, ‘উমার ও আখতালের মত শ্রেষ্ঠ কবিগণও ছিলেন। নতুন খলীফার ক্ষমতা গ্রহণের খবর শুনে তাঁরা খুশীতে ডগমগ হয়ে এবং বড় ধরনের প্রাপ্তির আশায় দিমাশকে আসলেন। খলীফার সংগে সাক্ষাতের আশায় দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকলেন। কিন্তু ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয (রহ) তাঁদের কাউকে সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন না। অন্যদিকে তাঁর দরবারে ‘আলিম, ফকীহ ও মুহাদ্দিছদের অবাধ যাতায়াত ছিল। তাঁদের প্রতি কোন রকম নিষেধাজ্ঞা ছিল না। কিন্তু কবিদের সাক্ষাতের কোন সুযোগ ছিল না।
উমাইয়্যা খান্দানের পূর্ববর্তী খলীফা ও আমীর-উমারাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সে যুগের কবিগণ একেবারেই লাগামহীন হয়ে পড়েছিল এবং সমাজে মানুষের নৈতিকতার যে চরম ধস নেমেছিল তার পিছনে তাদের রচিত কবিতার বিরাট অবদান ছিল। এ কারণে ‘উমার (রহ) যেখানে জ্ঞানী-গুণী, ও ‘আলিম-‘উলামাদের দারুণ সম্মান ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, বিভিন্ন ভাষার অনুবাদকদের উঁচুমানের সম্মানী দিয়েছেন, সেখানে কোন বড় কবিকে দু'-এক শ' দিরহামের বেশী দেননি। অবশ্য এতে কবিদের মন-মানসিকতায় দারুণ পরিবর্তনও ঘটেছিল।
টিকাঃ
৫৭৩. ইবন কুতায়বা, আশ-শি'র ওয়াশ শু'আরা-১/৫; কিতাবুল আগানী-৭/৪১, ৪৪, ৫১, ৫২, ১৭২
৫৭৪. কিতাবুল আগানী-৭/১৭২-১৭৩
৫৭৫. প্রাগুক্ত-১/১৩৫-১৩৬, ১৪৫
৫৭৬. ইবনুল জাওযী-১৬২; আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/৯১-৯২
📄 কবি কুছায়্যির
কবি কুছায়্যির দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর খলীফা ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের নিকট পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং নিজের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে সাহায্যের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। ‘উমার কুছায়্যিরকে লক্ষ্য করে বললেন: ওহে কুছায়্যির! সাদাকা তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণ ভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। তুমি কি এর কোন একটিতেও পড়? কুছায়্যির বললেন: হাঁ, আমি পাথেয় শেষ হয়ে যাওয়া পথিকের মধ্যে পড়ি। ‘উমার জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি আবু সা'ঈদের অতিথি নও? কুছায়্যির বললেন: হাঁ, আমি তাঁর অতিথি। ‘উমার বললেন: আমি আবূ সা'ঈদের অতিথির পাথেয় শেষ হয়েছে বলে মনে করি না। এরপর কুছায়্যির ‘উমারের অনুমতি নিয়ে তাঁকে একটি দীর্ঘ কবিতা শোনান। অতঃপর ‘উমার কবি কুছায়্যিরকে তিন শ' দিরহাম দানের নির্দেশ দেন।
টিকাঃ
৫৭৭. সূরা আত-তাওবা-৬০
৫৭৮. ইবন কুতায়বা, আশ-শি'র ওয়াশ-শু'আরা'-২৫৪-২৫৬; আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/৮৬-৯১
📄 কবি নুসাইব
কবি নুসাইব ইবন রাবাহ একদিন ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের সাক্ষাত প্রার্থনা করলেন। তিনি অনুমতি দিলেন না। কবি তখন দ্বাররক্ষীদের বললেন, তোমরা আমীরুল মু'মিনীনকে অবহিত কর যে, আমি এমন একটি কবিতা রচনা করেছি যার প্রথম কথাটি হলো “আল-হামদু লিল্লাহ”। তারা আমীরুল মু'মিনীন ‘উমারকে অবহিত করলো। এবার তিনি কবিকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। ভিতরে প্রবেশ করে তিনি যে কবিতাটি শোনালেন তার প্রথম দু'টি চরণ এই:
সকল প্রশংসা আল্লাহর। অতঃপর হে ‘উমার! নানাবিধ প্রয়োজন ও ভাগ্য আমাদেরকে আপনার নিকট নিয়ে এসেছে। আপনি হলেন কুরায়শদের মাথা এবং ঐ গোত্রের নেতার বংশধর। আর মাথায় থাকে কান ও চোখ।
‘উমার তাঁকে দেড় শ' দিরহাম দানের নির্দেশ দেন।
টিকাঃ
৫৬৯. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৫/২৯২
৫৮০. প্রাগুক্ত-৫/২৯২, ২/৮৪
📄 ‘উমার ও কবি দুকাইন ইবন সা‘ঈদ আদ-দারিমী
দুকাইন ছিলেন একজন রজয ছন্দের পল্লী কবি। ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয খলীফা সুলায়মানের সময় যখন মদীনার ওয়ালী ছিলেন তখন দুকাইন তাঁর প্রশংসায় একটি কবিতা রচনা করেন। ‘উমার খুশী হয়ে তাঁকে উৎকৃষ্ট জাতের পনেরোটি উট দান করেন। যাত্রাকালে ‘উমার বললেন: দুকাইন! আমার একটি উচ্চাভিলাষী মন আছে। আমার বর্তমান অবস্থার চেয়ে উন্নততর কোন অবস্থায় পৌঁছার কথা যদি জানতে পার তাহলে আমার নিকট আসবে, আমি তোমাকে আরো ইনাম-বখশীশ দেব।
একদিন দুকাইন আল-ইয়ামামা মরু এলাকায় তাঁর উটগুলো চরাচ্ছেন। এমন সময় একজন ঘোষকের মুখে জানতে পারলেন, আমীরুল মু'মিনীন সুলায়মান ইবন ‘আবদিল মালিক ইনতিকাল করেছেন। তিনি তার নিকট পরবর্তী খলীফা কে হয়েছেন তা জানতে চাইলেন। সে বললো ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয। ‘উমারের নামটি শোনার সাথে সাথে তিনি দারুল খিলাফা দিমাশকে যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলেন।
এক সময় তিনি দিমাশকে পৌঁছলেন। খলীফার বাসভবনে গিয়ে পৌঁছলেন। দেখলেন, খলীফা আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে এবং তাকে ঘিরে আছে ইয়াতীম, বিধবা ও বিভিন্ন ধরনের অধিকার বঞ্চিত লোকেরা। এই ভীড়ের বেষ্টনী ভেদ করে তিনি খলীফার নিকট পৌঁছতে পারলেন না। অবশেষে উচ্চকণ্ঠে আবৃত্তি করতে লাগলেন নিম্নের চরণ দু'টি: ‘হে উত্তম কর্মকাণ্ড ও মহৎ গুণাবলীর অধিকারী ‘উমার! হে সুবিশাল খাঞ্চার অধিকারী ‘উমার! আমি হাদারামাওত উপত্যকার কাতান জনপদের দারিম গোত্রের একজন মানুষ। আমি আমার মহান ভাইয়ের নিকট আমার পাওনা দাবী করছি।’
‘উমার তাঁকে কাছে ডেকে বললেন: দুকাইন! মদীনায় আমি যে একটি কথা তোমাকে বলেছিলাম তাকি তোমার স্মরণ আছে? আমি বলেছিলাম আমার একটি মন আছে যে সব সময় আমি যা লাভ করি তা থেকে উন্নততর কিছু লাভের আশায় উদগ্রীব থাকে। আমি দুনিয়ার পরম প্রত্যাশিত বিষয় রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হয়েছি। এখন আমার মন আখিরাতের পরম প্রত্যাশিত বিষয় জান্নাত লাভের জন্য উদগ্রীব। দুনিয়ার বাদশারা তাদের বাদশাহীকে পার্থিব সম্মান ও মর্যাদা লাভের পথ ও পন্থা হিসেবে বিবেচনা করে। আর আমি এটাকে করবো আখিরাতের সম্মান ও মর্যাদা লাভের উপায়।
তারপর তিনি বললেন দুকাইন! আল্লাহর কসম! আমি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলমানদের সম্পদ থেকে না একটি দিরহাম, আর না একটি দীনার গ্রহণ করেছি। এখন আমি মাত্র এক হাজার দিরহামের মালিক। তার থেকে অর্ধেক তুমি নিয়ে বাকী অর্ধেক আমার জন্য রেখে যাও। দুকাইন পাঁচ শ' দিরহাম নিয়ে ফিরে আসেন।
টিকাঃ
৫৮১. প্রাগুক্ত-৩/২০; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৩৩০
৫৮২. হ্রাস করা বাদলের দিন- অর্থাৎ লাজুক সৌখিন প্রিয়ার সাথে উঁচু তাঁবুর বাসরে একটি বাদল ঘন দিন যাপন করে দীর্ঘ সময়কে কমিয়ে দেওয়া। একা একা বাদল ঘন দিন কাটানো কষ্টকর। প্রেয়সীর সঙ্গে এমন দিন কাটানো, আনন্দময় অবস্থায় কেটে যায় বলে মনে হয় সময় আরো দীর্ঘ হলে ভালো হতো। এই অর্থে দীর্ঘ সময় কমানো।
৫৮৩. কাব্যানুবাদ, নূরুদ্দীন আহমদ, অস-সব'উল মু'আল্লাকাত (কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা-১৯৭২), পৃ. ১৯৯
৫৮৪. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৬/১২-১৩, ২২০