📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘উমারের মৃত্যুর পর মনীষীদের মন্তব্য ও শোক

📄 ‘উমারের মৃত্যুর পর মনীষীদের মন্তব্য ও শোক


তাঁর মৃত্যুর পর একদল ফকীহ তাঁর বেগম সাহেবা ফাতিমার নিকট এসে বললেন: ‘উমারের মৃত্যুতে আমরা আপনাকে শোক ও সমবেদনা জানাতে এসেছি। তাঁর মৃত্যুতে গোটা উম্মাতের উপর যেন মুসীবত নেমে এসেছে। আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করুন! গৃহ অভ্যন্তরে ‘উমারের অবস্থা কেমন ছিল, সে সম্পর্কে আমাদেরকে একটু অবহিত করুন। কারণ, একজন মানুষ সম্পর্কে তার পরিবারের লোকেরাই সবচেয়ে বেশী জানে।

বেগম সাহেবা বললেন : আল্লাহর কসম, ‘উমার আপনাদের চেয়ে বেশী সালাত আদায়কারী ও সিয়াম পালনকারী ছিলেন না। তবে ‘উমারের চেয়ে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহর এমন কোন বান্দাকে আমি কখনো দেখিনি। একজন পুরুষের তার স্ত্রীর সাথে চরম আনন্দঘন মুহূর্তেও, যখন আমি ও তিনি একই লেপের তলে থাকতাম, তখনও যদি আল্লাহর কোন নির্দেশের কথা স্মরণ হতো, অমনি পানিতে পড়া পাখীর মত ডানা ঝাপটা দিয়ে উঠে যেতেন। তারপর এমন ভীত-বিহ্বলভাবে চেঁচিয়ে কাঁদতে থাকতেন যে, আমি বলতাম : এখনই তাঁর প্রাণটা বেরিয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি আমি আমাদের লেপটি সরিয়ে ফেলতাম। তাঁর প্রতি আমার দয়া হতো। মনে মনে বলতাম, হায়! আমাদের ও এই ইমারত বা রাষ্ট্র ক্ষমতার মধ্যে যদি পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব হতো! আল্লাহর কসম! ইমারত ও খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর কোন রকম আনন্দ-খুশী আমরা উপভোগ করিনি।

‘উমারকে কাফন পরানোর পর মাসলামা ইবন ‘আবদিল ‘আযীয দাঁড়িয়ে বললেন: হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করুন। হিদায়াত ও আনুগত্য-অনুসরণের ক্ষেত্রে আপনি আমাদের সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের যোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন। আপনার উপদেশ ও নীতিকথা দ্বারা আপনি আমাদের অন্তরকে তাকওয়া ও আল্লাহভীতিতে পূর্ণ করে দিয়েছেন। আপনার সম্মান ও মর্যাদা দ্বারা আমাদেরকে গৌরব ও গর্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন এবং সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাঝে আমাদেরকে স্মরণীয় করে গেছেন।

‘আবদুল মালিক ইবন ‘উমাইর বলেন: হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন! আপনি ছিলেন দৃষ্টিকে অবনতকারী, যৌনাঙ্গের সংযতকারী, সত্যের ব্যাপারে উদার ও মিথ্যার ব্যাপারে অনুদার। রাগের সময় রাগ করতেন, খুশীর সময় খুশী হতেন। আপনি না ছিলেন কোন রসিকতাকারী, না ছিলেন মানুষের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণকারী, আর না ছিলেন কোন গীবতকারী।

হাসান আল-বসরী মৃত্যুর খবর শুনে মন্তব্য করেন: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন - সবচেয়ে ভালো মানুষটির মৃত্যু হয়েছে।’

টিকাঃ
৫৫৬. ইবনুল জাওযী-২০৩; 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৩৯৭
৫৫৭. কিতাবুল আগানী-৯/৩০৩-৩০৪; ইবনুল জাওযী-৩২৯
৫৫৮. ইবনুল জাওযী-৩০৩
৫৫৯. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১৪২; মুখতাসার তারীখ ইবন 'আসাকির-১২৭

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 তাঁর মৃত্যুতে মরছিয়া ও ক্রন্দন

📄 তাঁর মৃত্যুতে মরছিয়া ও ক্রন্দন


তাঁর মৃত্যুতে গোটা মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি মানুষ শোকাতুর হয়ে পড়ে। দুস্থ, ইয়াতীম, ধনী, গরিব, ছাত্র, শিক্ষক, নারী, পুরুষ, ছোট, বড় প্রতিটি মানুষ চোখের পানি ফেলে। এমন কি ইসলামী বিশ্বের বাইরেও এ শোক ছড়িয়ে পড়ে। যে রোমান সম্রাট তাঁর চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক পাঠান তিনিও ভীষণ দুঃখ পান। তাঁর সমকালীন কবি জারীর ইবন ‘আতিয়্যা আত-তামীমী আল-বাসরী বলেন:

ঘোষক আমীরুল মু'মিনীনের মৃত্যুর ঘোষণা করেছে। হে আল্লাহর ঘরের হজ্জ ও ‘উমরাকারীদের মধ্যের সর্বোত্তম ব্যক্তি! আপনি একটি বিরাট দায়িত্ব বহন করেছেন এবং শক্ত ও মজবুতভাবে তা বহন করেছেন। হে ‘উমার! আল্লাহর নির্দেশমত সে দায়িত্ব পালন করেছেন। সূর্য খর-তাপবিহীন বিষণ্ণ হয়ে পড়েছে, যেন উদিত হয়নি। রাতে আকাশের চাঁদ ও তারকারাজি আপনার জন্য কাঁদছে।

কবি কুছায়্যির ইবন ‘আয্যা তাঁর শোকগাঁথায় বলেন:
তাঁর সকল শিল্প ও সৃষ্টি শোকক্লিষ্ট, বিষণ্ণ, সুতরাং তাতে ব্যাপক ধ্বংসক্রিয়া চলেছে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষকে প্রতিদান দেওয়া হবে। সকল মানুষের শোক ও দুঃখ এক। প্রতিটি গৃহে চলছে ক্রন্দন ও বিলাপ। যাদের কোন কল্যাণ ও উপকারও আপনি করেননি তারাও আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কারণ, আপনি প্রশংসারই যোগ্য। আল্লাহ দায়রু সাম'আনের কবরে বৃষ্টি বর্ষণ করুন। সেখানে সৎকর্মশীল ‘উমার শায়িত আছেন। প্রত্যূষে প্রবল বর্ষণে ভিজে থাক এবং সন্ধ্যায় কালো গাঢ় মেঘ অঝোরে বর্ষণ করুক!

এছাড়া আরো অনেক কবি তাঁর মৃত্যুতে মরছিয়া রচনা করেছেন। আরবী সাহিত্যের প্রাচীন ইতিহাস ও সংকলনে সে সকল মরছিয়া সংরক্ষিত আছে।

ইসলামের পরম শত্রু রোমান সম্রাট ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের (রহ) মৃত্যু সংবাদ পেয়ে শোকে-দুঃখে কাতর হয়ে পড়েন। মুহাম্মাদ ইবন মা'বাদ বলেন, আমীরুল মু'মিনীন ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয (রহ) আমাকে বন্দী বিনিময়ের ব্যাপারে আলোচনার জন্য রোমান সম্রাটের নিকট পাঠালেন। আমি সেখানে গেলাম এবং সম্রাটের দরবারে যাতায়াত করতে লাগলাম। একদিন দরবারে ঢুকে দেখি সম্রাট বিষণ্ণ ও বেদনাক্লিষ্ট চেহারায় মেঝেতে বসে আছেন। আমি বললাম: মহামান্য সম্রাটের এ অবস্থা কেন? তিনি বললেন: কি ঘটেছে তাকি আপনি জানেন না? বললাম: কী ঘটেছে? বললেন: সৎ লোকটি মারা গেছেন। বললাম: কে? বললেন: ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয। আমার বিশ্বাস, ‘ঈসা ইবন মারইয়ামের (আ) পরে যদি কেউ মৃতকে জীবিত করতে পারতেন তাহলে তা কেবল ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযই পারতেন। একজন দুনিয়া বিরাগী পাদ্রী দুনিয়ার সবকিছু ত্যাগ করে, ঘরের দরজা বন্ধ করে সব সময় উপাসনায় নিমগ্ন থাকে, এতে আমি বিস্মিত হই না। কিন্তু আমি বিস্ময়ে হতবাক হই যখন দেখি কোন ব্যক্তির পায়ের তলায় গোটা দুনিয়া গড়াগড়ি খায়, আর তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বৈরাগ্য জীবন যাপন করেন।

টিকাঃ
৫৬০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২১১-২১২; মুখতাসার তারীখ ইবন 'আসাকির-১২৭
৫৬১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২১১; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১৪৪; মু'জামুল বুলদান-২/৫১৭
৫৬২. হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/২৯০; ইবনুল জাওযী-২৩০-২৩১; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'- ৫/১৪২-১৪৩

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের (রহ) সন্তানরা কেমন ছিলেন

📄 ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের (রহ) সন্তানরা কেমন ছিলেন


‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের (রহ) চার স্ত্রী ছিলেন। প্রত্যেকেরই সন্তান ছিল। লুমাইস বিন্ত ‘আলীর ছিল তিন সন্তান ‘আবদুল্লাহ, বাকর, ও উম্মু ‘আম্মার। উম্মু ‘উছমান বিন্ত শুআইবের ছিল এক ছেলে- ইবরাহীম। ফাতিমা বিন্ত ‘আবদিল মালিকের ছিল তিন ছেলে- ইসহাক, ইয়া’কূব ও মূসা। আর উম্মু ওয়ালীদের ছিল নয় ছেলে-মেয়ে। যথা: ‘আবদুল মালিক, ওয়ালীদ, ‘আসিম, ইয়াযীদ, ‘উবায়দুল্লাহ, ‘আবদুল ‘আযীয, যাবানা, আমাতা ও উম্মু ‘আবদিল্লাহ। আল-ইয়া’কূবী বলেন, মৃত্যুর সময় তিনি নয়জন পুত্র সন্তান রেখে যান।

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘আবদুল মালিক- ‘আবদুল ‘আযীয- ‘আবদুল্লাহ

📄 ‘আবদুল মালিক- ‘আবদুল ‘আযীয- ‘আবদুল্লাহ


‘আবদুল মালিক: অতিপ্রিয় সন্তান ‘আবদুল মালিক তাঁর জীবদ্দশায় অল্প বয়সে ইনতিকাল করেন এবং তিনি নিজে তাঁকে কবর দেন। এই ‘আবদুল মালিক ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান, আল্লাহভীরু, পার্থিব ভোগ-বিলাস বিমুখ উঁচু পর্যায়ের তাপস ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে আলোকিত একজন মানুষ। একবার তাঁর স্ত্রী খুব সেজেগুজে সামনে এলে তিনি বলেন, ‘এবার তোমার ‘ইদ্দত পালন করতে বসা উচিত।’ শামের কিছু ইসলামী ব্যক্তিত্ব বর্ণনা করেছেন, ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয (রহ) তাঁর ছেলে ‘আবদুল মালিককে দেখেই ‘ইবাদত-বন্দেগীর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সায়্যার ইবন আল-হাকাম বলেন, ‘আবদুল মালিক তাঁর পিতা ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয অপেক্ষা উত্তম ছিলেন। মায়মূন ইবন মিহরান বলেন, আমি এক বাড়ীতে তিনজন ভালো মানুষ থাকে, এর চাইতে ভালো বাড়ী আর দেখিনি। তাদের একজন ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয, দ্বিতীয়জন তাঁর ছেলে ‘আবদুল মালিক এবং তৃতীয়জন তাঁদের দাস মুযাহিম। এ কারণে ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। তাঁর উপর নির্ভরও করতেন। শৈশব থেকেই ‘আবদুল মালিকের অন্তরে আল্লাহর ভয় শক্তভাবে গেঁথে বসে।

‘আবদুল ‘আযীয: আমীরুল মু'মিনীন ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের (রহ) পুত্র ‘আবদুল ‘আযীয পরবর্তী খলীফা ইয়াযীদ ইবন ‘আবদিল মালিক ও মারওয়ান ইবন মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে মক্কা ও মদীনার গভর্ণর ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন অন্যতম হাদীছ বর্ণনাকারী।

‘আবদুল্লাহ: তাঁর আরেক পুত্র ‘আবদুল্লাহ খলীফা ইয়াযীদ ইবন আল-ওয়ালীদের পক্ষ থেকে কৃষ্ণার গভর্ণর ছিলেন। তিনি যখন গভর্ণরের দায়িত্ব নিয়ে কৃষ্ণায় আসেন তখন বসরার অধিবাসীরা সেখানে একটি খাল খননের আবেদন জানায়। তিনি বিষয়টি খলীফা ইয়াযীদকে অবহিত করেন। খলীফা তাঁকে লেখেন: ‘ইরাক থেকে আদায়কৃত সকল রাজস্ব যদি ব্যয় হয়ে যায় তবুও সেখানে একটি খাল খনন করে দাও।’ তিনি তিন লাখ দিরহাম ব্যয় করে একটি খাল খনন করেন যা ইতিহাসে তাঁর নামে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।

টিকাঃ
৫৬৩. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৮৪
৫৬৪. সূরা আশ-শু'আরা': ২০৫-২০৭
৫৬৯. প্রাগুক্ত-৩/৩০৯
৫৭১. ফুতুহ আল-বুলদান-৩৭৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px