📄 সাহসী ও স্বাধীনচেতা
খিলাফতের দায়িত্ব লাভের পূর্বে যদিও তিনি সর্বদা অন্য খলীফাদের অধীনস্থ ও প্রভাবাধীনে ছিলেন তথাপি খলীফাদের সামনে প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা বজায় রাখেন। খলীফা ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে পরবর্তী খলীফা হিসেবে সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের বাই'আত (আনুগত্যের শপথ) প্রত্যাহার করতে বলেন। তিনি স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! আমরা একই সাথে আপনাদের দু'জনের বাই'আত করেছি। এজন্য এখন এ কেমন করে সম্ভব যে, তার বাই'আত প্রত্যাহার করে আপনার বাই'আত বহাল রাখি?
একবার 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ও খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের দাসদের মধ্যে মারামারি হয়। 'উমার গেছেন সুলায়মানের নিকট। সুলায়মান তাঁকে বললেন, এ কেমন কথা যে, আপনার দাসেরা আমার দাসদের মারলো? 'উমার বললেন, আপনার বলার পূর্বে আমি এ ঘটনা সম্পর্কে কিছুই শুনিনি। সুলায়মান বললেন, আপনি মিথ্যা বলছেন। 'উমার বললেন, আপনি বলছেন যে, আমি মিথ্যা বলছি। অথচ আমার বুদ্ধি-বিবেক হওয়ার পর থেকে আমি কখনো মিথ্যা বলিনি। আল্লাহর যমীন প্রশস্ত যা আপনার সাহচর্য থেকে আমাকে মুখাপেক্ষীহীন করতে পারে। একথা বলে তিনি খলীফা সুলায়মানের দরবার থেকে উঠে চলে যান এবং মিসরে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। অবশেষে সুলায়মান তাকে ডেকে মিটমাট করে নেন।
একবার খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের নিকট তাঁর পুত্র আইউব বসে ছিলেন। এই আইউবকে তিনি পরবর্তী খলীফা হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। এ সময় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আসেন। এক ব্যক্তি কোন এক খলীফার বেগমদের উত্তরাধিকার দাবী করে। সুলায়মান বললেন, মহিলারা অস্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকার পায় না। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয এমন কথা শুনে অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে বললেন, সুবহানাল্লাহ! কুরআন মাজীদ কোথায়? সুলায়মান চাকরকে ডেকে বললেন, এ ব্যাপারে খলীফা আবদুল মালিক যে অসীয়াত নামা লিখে গেছেন সেটি নিয়ে এসো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একটু বিদ্রূপের সুরে বলেন, মনে হচ্ছে আপনি কুরআন আনতে বলছেন। আইউব এ বিদ্রূপাত্মক কথা শুনে বললো, আমীরুল মু'মিনীনের মজলিসে বসে যদি কেউ এমন কথা বলে তাহলে তার ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা উচিত। সাথে সাথে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, তুমি যদি খলীফা হও তাহলে সাধারণ মানুষ এর চাইতেও বেশী কষ্ট পাবে। খলীফা সুলায়মান দু'জনের কথার মধ্যে হস্তক্ষেপ করেন এবং আইউবকে তিরস্কার করে বলেন, 'উমারকে তুমি এমন অশোভন কথা বললে? 'উমার নমনীয় কণ্ঠে বললেন, আমিও তো তাকে কঠিন কথা শুনিয়ে দিয়েছি।
তাঁর এমন সাহস ও স্বাধীনচিত্ততার ফলাফল এই দাঁড়িয়েছিল যে, তিনি অবলীলায় খলীফাদেরকে সব রকমের নৈতিক উপদেশ দিতেন এবং তাঁদের কোন ধরনের অসন্তুষ্টিকে মোটেই পরোয়া করতেন না। একবার তিনি খলীফা 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানকে একটি চিঠিতে লেখেন:
"আপনি একজন রাখাল মাত্র এবং প্রত্যেক রাখালকে তার পশুর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে। আনাস ইবন মালিক (রা) আমাকে একটি হাদীছ শুনিয়েছেন। হাদীছটি তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে শুনেছেন। এক আল্লাহ তোমাদের সকলকে কিয়ামতের দিন সমবেত করবেন। আল্লাহর চাইতে বেশী সত্যভাষী আর কে হতে পারে?"
একবার খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযও সঙ্গে ছিলেন। 'আসফান নামক স্থানের কাছাকাছি পৌঁছে খলীফা তাঁর লোক-লস্কর, তাঁবু ও সাজ-সরঞ্জাম দেখে বিস্ময় ও আত্মঅহমিকার ঘোরে 'উমারকে জিজ্ঞেস করেন, এসব জিনিস তুমি কোন দৃষ্টিতে দেখছো? 'উমার বললেন, আমার মনে হচ্ছে, দুনিয়া দুনিয়াকে ভক্ষণ করছে। এ ব্যাপারে আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আরাফাতে অবস্থানকালে বৃষ্টির সাথে বিদ্যুৎও চমকাতে থাকে। সুলায়মান ভয়ে জড়সড় হয়ে উটের পিঠে হাওদার মধ্যে মাথা নীচু করে বসে থাকেন। তাঁর এমন বেহাল অবস্থা দেখে 'উমার বলেন, এ বৃষ্টি তো আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ হিসেবে এসেছে। যদি তাঁর গজব ও শাস্তি হিসেবে আসতো তাহলে আপনার অবস্থা কেমন হতো?
আরেকবার এক মরুভূমিতে এ রকম একটি ঘটনার অবতারণা হয়। খলীফা সুলায়মান এতই ভয় পেয়ে গেলেন যে, তিনি এক লাখ দিরহাম গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য 'উমারের হাতে তুলে দিলেন। যাতে দানের বরকতে বজ্র-বিদ্যুতের বিপদ দূর হয়ে যায়। 'উমার তাঁকে বললেন, এর চাইতেও ভালো একটি কাজ আছে। সুলায়মান জানতে চাইলেন, সেটি কী? কিছু লোকের জবর-দখলকৃত বিষয়-সম্পত্তি আপনার নিকট আছে। তারা আপনার সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু এখনো পৌঁছাতে পারেনি। তাদের সেই সব জিনিস ফিরিয়ে দিন। সুলায়মান সকল বিষয়-সম্পত্তি ফেরত দেন। ৪৮০
টিকাঃ
৪৮০. 'আবদুস সালাম নাদবী-৭৭
খিলাফতের দায়িত্ব লাভের পূর্বে যদিও তিনি সর্বদা অন্য খলীফাদের অধীনস্থ ও প্রভাবাধীনে ছিলেন তথাপি খলীফাদের সামনে প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা বজায় রাখেন। খলীফা ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে পরবর্তী খলীফা হিসেবে সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের বাই'আত (আনুগত্যের শপথ) প্রত্যাহার করতে বলেন। তিনি স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! আমরা একই সাথে আপনাদের দু'জনের বাই'আত করেছি। এজন্য এখন এ কেমন করে সম্ভব যে, তার বাই'আত প্রত্যাহার করে আপনার বাই'আত বহাল রাখি?
একবার 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ও খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের দাসদের মধ্যে মারামারি হয়। 'উমার গেছেন সুলায়মানের নিকট। সুলায়মান তাঁকে বললেন, এ কেমন কথা যে, আপনার দাসেরা আমার দাসদের মারলো? 'উমার বললেন, আপনার বলার পূর্বে আমি এ ঘটনা সম্পর্কে কিছুই শুনিনি। সুলায়মান বললেন, আপনি মিথ্যা বলছেন। 'উমার বললেন, আপনি বলছেন যে, আমি মিথ্যা বলছি। অথচ আমার বুদ্ধি-বিবেচনা হওয়ার পর থেকে আমি কখনো মিথ্যা বলিনি। আল্লাহর যমীন প্রশস্ত যা আপনার সাহচর্য থেকে আমাকে মুখাপেক্ষীহীন করতে পারে। একথা বলে তিনি খলীফা সুলায়মানের দরবার থেকে উঠে চলে যান এবং মিসরে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। অবশেষে সুলায়মান তাকে ডেকে মিটমাট করে নেন।
একবার খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের নিকট তাঁর পুত্র আইউব বসে ছিলেন। এই আইউবকে তিনি পরবর্তী খলীফা হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। এ সময় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আসেন। এক ব্যক্তি কোন এক খলীফার বেগমদের উত্তরাধিকার দাবী করে। সুলায়মান বললেন, মহিলারা অস্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকার পায় না। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয এমন কথা শুনে অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে বললেন, সুবহানাল্লাহ! কুরআন মাজীদ কোথায়? সুলায়মান চাকরকে ডেকে বললেন, এ ব্যাপারে খলীফা আবদুল মালিক যে অসীয়াত নামা লিখে গেছেন সেটি নিয়ে এসো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একটু বিদ্রূপের সুরে বলেন, মনে হচ্ছে আপনি কুরআন আনতে বলছেন। আইউব এ বিদ্রূপাত্মক কথা শুনে বললো, আমীরুল মু'মিনীনের মজলিসে বসে যদি কেউ এমন কথা বলে তাহলে তার ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা উচিত। সাথে সাথে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন, তুমি যদি খলীফা হও তাহলে সাধারণ মানুষ এর চাইতেও বেশী কষ্ট পাবে। খলীফা সুলায়মান দু'জনের কথার মধ্যে হস্তক্ষেপ করেন এবং আইউবকে তিরস্কার করে বলেন, 'উমারকে তুমি এমন অশোভন কথা বললে? 'উমার নমনীয় কণ্ঠে বললেন, আমিও তো তাকে কঠিন কথা শুনিয়ে দিয়েছি।
তাঁর এমন সাহস ও স্বাধীনচিত্ততার ফলাফল এই দাঁড়িয়েছিল যে, তিনি অবলীলায় খলীফাদেরকে সব রকমের নৈতিক উপদেশ দিতেন এবং তাঁদের কোন ধরনের অসন্তুষ্টিকে মোটেই পরোয়া করতেন না। একবার তিনি খলীফা 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানকে একটি চিঠিতে লেখেন:
"আপনি একজন রাখাল মাত্র এবং প্রত্যেক রাখালকে তার পশুর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে। আনাস ইবন মালিক (রা) আমাকে একটি হাদীছ শুনিয়েছেন। হাদীছটি তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে শুনেছেন। এক আল্লাহ তোমাদের সকলকে কিয়ামতের দিন সমবেত করবেন। আল্লাহর চাইতে বেশী সত্যভাষী আর কে হতে পারে?"
একবার খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযও সঙ্গে ছিলেন। 'আসফান নামক স্থানের কাছাকাছি পৌঁছে খলীফা তাঁর লোক-লস্কর, তাঁবু ও সাজ-সরঞ্জাম দেখে বিস্ময় ও আত্মঅহমিকার ঘোরে 'উমারকে জিজ্ঞেস করেন, এসব জিনিস তুমি কোন দৃষ্টিতে দেখছো? 'উমার বললেন, আমার মনে হচ্ছে, দুনিয়া দুনিয়াকে ভক্ষণ করছে। এ ব্যাপারে আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আরাফাতে অবস্থানকালে বৃষ্টির সাথে বিদ্যুৎও চমকাতে থাকে। সুলায়মান ভয়ে জড়সড় হয়ে উটের পিঠে হাওদার মধ্যে মাথা নীচু করে বসে থাকেন। তাঁর এমন বেহাল অবস্থা দেখে 'উমার বলেন, এ বৃষ্টি তো আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ হিসেবে এসেছে। যদি তাঁর গজব ও শাস্তি হিসেবে আসতো তাহলে আপনার অবস্থা কেমন হতো?
আরেকবার এক মরুভূমিতে এ রকম একটি ঘটনার অবতারণা হয়। খলীফা সুলায়মান এতই ভয় পেয়ে গেলেন যে, তিনি এক লাখ দিরহাম গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য 'উমারের হাতে তুলে দিলেন। যাতে দানের বরকতে বজ্র-বিদ্যুতের বিপদ দূর হয়ে যায়। 'উমার তাঁকে বললেন, এর চাইতেও ভালো একটি কাজ আছে। সুলায়মান জানতে চাইলেন, সেটি কী? কিছু লোকের জবর-দখলকৃত বিষয়-সম্পত্তি আপনার নিকট আছে। তারা আপনার সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু এখনো পৌঁছাতে পারেনি। তাদের সেই সব জিনিস ফিরিয়ে দিন। সুলায়মান সকল বিষয়-সম্পত্তি ফেরত দেন। ৪৮০
টিকাঃ
৪৮০. 'আবদুস সালাম নাদবী-৭৭
📄 গাম্ভীর্য
গাম্ভীর্য ও স্বচ্ছতার কারণে কোন রকম শোর-গোল, হৈ চৈ মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার এক ব্যক্তি তাঁর সামনে উঁচুস্বরে কথা বললে তিনি তাঁকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কথা এতটুকু জোরে বলাই যথেষ্ট যে, উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি তা শুনতে পায়। কোন রকম হাস্য-রসিকতা তাঁর একেবারেই পছন্দ ছিল না। একবার 'উমাইয়া খান্দানের কিছু লোক তাঁর মজলিসে সমবেত হয় এবং হাস্য-রসিকতামূলক কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করে। তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, তোমরা কি এজন্য সমবেত হয়েছো? হয় কুরআন কারীম সম্পর্কে আলোচনা কর, নয়তো কম সে কম ভদ্রোচিত আলোচনা কর। ৪৮১
দেহের যে সকল অঙ্গ-প্রতঙ্গের নাম উচ্চারণ করতে লজ্জা পেতেন, উচ্চারণ করতেন না। একবার তাঁর বগলে একটা ফোঁড়া বের হয়। লোকেরা জানতে চাইলো ফোঁড়াটি কোথায় বের হয়েছে। যেহেতু বগল কথাটি উচ্চারণ করা পসন্দ করতেন না, এ কারণে কথাটি এভাবে বলেন: আমার হাতের অভ্যন্তরে। একবার এক মজলিসে জনৈক ব্যক্তির মুখ থেকে বের হয়: “তোমার বগলের নীচে”- কথাটি। সাথে সাথে তিনি বলেন, এর চেয়ে মার্জিত ভাষায় কেন কথা বলো না? লোকেরা বললো, সেই মার্জিত ভাষাটি কি? তিনি বললেন, “হাতের নীচে” বলাই উত্তম ছিল। ৪৮২
টিকাঃ
৪৮১. ইবনুল জাওযী-৬৩
৪৮২. প্রাগুক্ত-৬৪
গাম্ভীর্য ও স্বচ্ছতার কারণে কোন রকম শোর-গোল, হৈ চৈ মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার এক ব্যক্তি তাঁর সামনে উঁচুস্বরে কথা বললে তিনি তাঁকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কথা এতটুকু জোরে বলাই যথেষ্ট যে, উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি তা শুনতে পায়। কোন রকম হাস্য-রসিকতা তাঁর একেবারেই পছন্দ ছিল না। একবার 'উমাইয়া খান্দানের কিছু লোক তাঁর মজলিসে সমবেত হয় এবং হাস্য-রসিকতামূলক কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করে। তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, তোমরা কি এজন্য সমবেত হয়েছো? হয় কুরআন কারীম সম্পর্কে আলোচনা কর, নয়তো কম সে কম ভদ্রোচিত আলোচনা কর। ৪৮১
দেহের যে সকল অঙ্গ-প্রতঙ্গের নাম উচ্চারণ করতে লজ্জা পেতেন, উচ্চারণ করতেন না। একবার তাঁর বগলে একটা ফোঁড়া বের হয়। লোকেরা জানতে চাইলো ফোঁড়াটি কোথায় বের হয়েছে। যেহেতু বগল কথাটি উচ্চারণ করা পসন্দ করতেন না, এ কারণে কথাটি এভাবে বলেন: আমার হাতের অভ্যন্তরে। একবার এক মজলিসে জনৈক ব্যক্তির মুখ থেকে বের হয়: “তোমার বগলের নীচে”— কথাটি। সাথে সাথে তিনি বলেন, এর চেয়ে মার্জিত ভাষায় কেন কথা বলো না? লোকেরা বললো, সেই মার্জিত ভাষাটি কি? তিনি বললেন, “হাতের নীচে” বলাই উত্তম ছিল। ৪৮২
টিকাঃ
৪৮১. ইবনুল জাওযী-৬৩
৪৮২. প্রাগুক্ত-৬৪
📄 দয়া-মমতা
দয়া-মমতায় ভরা অত্যন্ত নরম মনের মানুষ ছিলেন। একবার এক বেদুঈন মন গলানো ভাষায় নিজের প্রয়োজনের কথা উপস্থাপন করে, তাতে তিনি এতই প্রভাবিত হন যে, কেঁদে ফেলেন। তাঁর এ দয়া-মমতা কেবল মানুষের ক্ষেত্রে সীমিত ছিল না, বরং জীব- জন্তকেও কোন রকম কষ্ট দেওয়া সহ্য করতে পারতেন না। তাঁর একটি অতিরিক্ত খচ্চর ছিল। চাকর সেটি ভাড়ায় খাটাতো। প্রতিদিন সাধারণতঃ এক দিরহাম আয় হতো। চাকরটি একদিন দেড় দিরহাম নিয়ে আসে। তিনি এই অতিরিক্ত অর্থ কিভাবে হলো তা জানতে চাইলেন। চাকরটি বললো, আজ বাহনের চাহিদা ছিল অন্য দিনের তুলনায় বেশী। এ জবাবে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি ধারণা করলেন, চাকরটি তাকে বেশী খাটিয়েছে। তাই তিনি পশুটিকে তিন দিন বিশ্রামে রাখার নির্দেশ দিলেন। ৪৮৩
ডাক পরিবহণের পশুর ব্যাপারে তাঁর নির্দেশ ছিল যে, চাবুকের আগায় সূঁচালো লোহা এবং পশুর মুখে ভারী লাগাম লাগানো যাবে না। উবাইদুল্লাহ ইবন 'উমার বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পশুকে খোঁচা দেওয়া যায় এমন লোহার ফলা লাগানো চাবুকে ডাক বহন করতে নিষেধ করেছেন। ভারী লাগাম লাগাতেও নিষেধ করেছেন। ৪৮৪
মিসরের ওয়ালী হায়্যানকে লেখেন : আমি জেনেছি, মিসরে ভারবাহী উটের পিঠে এক হাজার রতল ওজনের বোঝা চাপানো হয়। আমার এ পত্র পৌঁছার পর আমি যেন জানতে না পারি যে, কোন উটের পিঠে ছয় শো রতলের বেশী বোঝা চাপানো হয়েছে। ৪৮৫
টিকাঃ
৪৮৩. প্রাগুক্ত-৭৯
৪৮৪. কিতাবুল খারাজ-১৮৬
৪৮৫. সীরাতু ইবন 'আবদিল হাকাম-১৬৬
দয়া-মমতায় ভরা অত্যন্ত নরম মনের মানুষ ছিলেন। একবার এক বেদুঈন মন গলানো ভাষায় নিজের প্রয়োজনের কথা উপস্থাপন করে, তাতে তিনি এতই প্রভাবিত হন যে, কেঁদে ফেলেন। তাঁর এ দয়া-মমতা কেবল মানুষের ক্ষেত্রে সীমিত ছিল না, বরং জীব- জন্তকেও কোন রকম কষ্ট দেওয়া সহ্য করতে পারতেন না। তাঁর একটি অতিরিক্ত খচ্চর ছিল। চাকর সেটি ভাড়ায় খাটাতো। প্রতিদিন সাধারণতঃ এক দিরহাম আয় হতো। চাকরটি একদিন দেড় দিরহাম নিয়ে আসে। তিনি এই অতিরিক্ত অর্থ কিভাবে হলো তা জানতে চাইলেন। চাকরটি বললো, আজ বাহনের চাহিদা ছিল অন্য দিনের তুলনায় বেশী। এ জবাবে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি ধারণা করলেন, চাকরটি তাকে বেশী খাটিয়েছে। তাই তিনি পশুটিকে তিন দিন বিশ্রামে রাখার নির্দেশ দিলেন। ৪৮৩
ডাক পরিবহণের পশুর ব্যাপারে তাঁর নির্দেশ ছিল যে, চাবুকের আগায় সূঁচালো লোহা এবং পশুর মুখে ভারী লাগাম লাগানো যাবে না। উবাইদুল্লাহ ইবন 'উমার বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পশুকে খোঁচা দেওয়া যায় এমন লোহার ফলা লাগানো চাবুকে ডাক বহন করতে নিষেধ করেছেন। ভারী লাগাম লাগাতেও নিষেধ করেছেন। ৪৮৪
মিসরের ওয়ালী হায়্যানকে লেখেন : আমি জেনেছি, মিসরে ভারবাহী উটের পিঠে এক হাজার রতল ওজনের বোঝা চাপানো হয়। আমার এ পত্র পৌঁছার পর আমি যেন জানতে না পারি যে, কোন উটের পিঠে ছয় শো রতলের বেশী বোঝা চাপানো হয়েছে। ৪৮৫
টিকাঃ
৪৮৩. প্রাগুক্ত-৭৯
探৮৪. কিতাবুল খারাজ-১৮৬
৪৮৫. সীরাতু ইবন 'আবদিল হাকাম-১৬৬
📄 তাঁর নিকট মানুষের মর্যাদা
তিনি একজন দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ, আল্লাহভীরু, পবিত্র আত্মা, ন্যায়পরায়ণ, দয়ালু, বুদ্ধিমান, দৃঢ় সংকল্প ইত্যাদি গুণসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তাঁর যাবতীয় কর্ম তৎপরতার মূল চেতনা ছিল মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব, কল্যাণ চিন্তা, সর্বোপরি মানুষের সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা। দেশের একজন অতি সাধারণ মানুষের দুঃখ, কষ্টেও তিনি কাতর হয়ে পড়তেন এবং তা দূর করার যাবতীয় পন্থা অবলম্বন করতেন। তাঁর জীবন-ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা দেখা যায় যাতে তাঁর মহত্ব ও তীব্র মানবতাবোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি প্রায়ই বলতেন: ৪৮৬ 'দুনিয়াতে কোন মানুষ কোন মানুষের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি দেখালে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার প্রতিও দয়া ও সহানুভূতি দেখাবেন।' একবার কা'বার হাজেব তথা রক্ষণা-বেক্ষণকারীগণ কা'বার গিলাফের জন্য খলীফার নিকট আবেদন জানালেন। পূর্ববর্তী খলীফাগণের সময় থেকে গিলাফ দানের নিয়ম চলে আসছিল। জবাবে 'উমার লিখলেন: ৪৮৭ 'আমি মনে করেছি ঐ গিলাফ ক্ষুধার্তদের কলিজায় লাগাবো। কারণ, ঘরের চেয়ে তারাই তা পাওয়ার অধিক উপযুক্ত।'
এই মহান খলীফার বিবেচনায় মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কা'বা ঘর তো মানুষের জন্য। সেই মানুষ যদি অনাহারে মারা যায় তাহলে সেই ঘর আবাদ করবে কে? মানুষ যদি সুস্থ-সবলভাবে বেঁচে থাকে তাহলে কা'বা ঘরের জৌলুষও বাড়াবে।
রোমানদের সাথে মুসলমানদের বহু বছর যাবত যুদ্ধ হয়। এ সকল যুদ্ধে উভয়পক্ষের সৈনিক প্রতিপক্ষের হাতে বন্দী হতো। আমীরুল মু'মিনীন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট মুসলমানের জীবন, সুখ-শান্তি ও মর্যাদা এত বেশী প্রাধান্যযোগ্য ছিল যে, একবার মাত্র একজন মুসলিম বন্দীর মুক্তির বিনিময়ে দশ হাজার রোমান সৈনিককে মুক্তি দেন। ৪৮৮ অপর একটি ঘটনায় একজন মুসলমান বন্দীকে এক লাখ দিরহাম মুক্তি পণ দিয়ে শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করেন। তিনি খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মকর্তাদের লেখেন: ৪৯০ 'মুক্তি পণ দিয়ে মুসলমান বন্দীদের মুক্ত করুন, তাতে যদি সকল সম্পদও ব্যয় হয় তাতেও পরোয়া করবেন না।'
কনস্টান্টিনোপল অভিযানের সময় বহু মুসলিম সৈনিক রোমানদের হাতে বন্দী হয়। তাদের বন্দী জীবনের কষ্টের কথা চিন্তা করে 'উমার ভীষণ কাতর হয়ে পড়তেন। মাঝে মধ্যে পত্র লিখে বন্দীদের খোঁজ-খবর নিতেন, তাদেরকে সাহস দিতেন ও সমবেদনা জানাতেন। কনস্টান্টিনোপলের যুদ্ধ বন্দীদের উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর একটি পত্র নিম্নরূপ: ৪৯১
'অতঃপর এই যে, তোমরা হয়তো নিজেদেরকে যুদ্ধবন্দী মনে করছো, আসলে তোমরা যুদ্ধবন্দী নও। আল্লাহর পানাহ্ চাই! আসলে তোমরা আল্লাহর পথে নিজেদেরকে অবরুদ্ধকারী। তোমরা জেনে রাখ, আমি আমার জনগণের মধ্যে কোন কিছু বণ্টন করলে তোমাদের পরিবারবর্গকে বেশী পরিমাণে এবং ভালো জিনিসটি দিয়ে থাকি। আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য পাঁচ দীনার করে পাঠালাম, বেশী পাঠালে রোমানরা আটকে দেবে, এ ভয় আমার না থাকলে আমি আরো বেশী করে পাঠাতাম। আমি তোমাদের নিকট অমুকের ছেলে অমুককে পাঠালাম। সে তাদের দাবী মত তোমাদের ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, স্বাধীন-দাস প্রত্যেকের মুক্তি পণ আদায় করবে। তোমাদের জন্য সুসংবাদ, তোমাদের জন্য সুসংবাদ।'
জা'ঊনা ইবন আল-হারিছকে তিনি 'মালতিয়া'র শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। জা'ঊনা সেখানে একটি যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করেন এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে বহু ছাগল- ভেড়া লাভ করেন। অভিযান শেষে তিনি নিজ পুত্রকে এ সংবাদসহ আমীরুল মু'মিনীন 'উমারের নিকট পাঠান। যথাসময়ে সে দিমাকে পৌঁছে এবং খলীফাকে অভিযান সম্পর্কে অবহিত করে। খলীফা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন : মুসলমানদের কেউ নিহত হয়েছে কি? এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে বলে সে জানালো। খলীফা অত্যন্ত দুঃখের সাথে এক ব্যক্তি, এক ব্যক্তি, একথাটি দু'বার উচ্চারণ করলেন। তুমি একজন মুসলমানের বিনিময়ে ছাগল-গরু প্রাপ্তির সংবাদ নিয়ে এসেছো? আমার জীবদ্দশায় তোমরা বাপ-বেটা দু'জনের কেউই আর কোন দায়িত্ব পাবে না। ৪৯২
একবার তিনি রোমান সম্রাটের নিকট পাঠানো দূতের মারফত জানতে পারলেন যে, একজন মুসলমান বন্দীকে রোমানরা ভীষণ অপমান করেছে। তারা সেই বন্দীর দ্বারা আটা পেষা ও রুটি বানানোর কাজ করাচ্ছে। সংগে সংগে তিনি রোমান সম্রাটকে লেখেন: ৪৯৩ 'অতঃপর এই যে, আমি অমুকের বিষয়ে অবগত হয়েছি। আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, যদি তাকে আমার নিকট ফেরত না পাঠান তাহলে আপনার বিরুদ্ধে এমন এক বিশাল বাহিনী পাঠাবো যার প্রথম সৈনিকটি থাকবে আপনার নিকট, আর শেষ সৈনিকটি থাকবে আমার নিকট।' খলীফার এ পত্র রোমান সম্রাট পাঠ করার পর বললেন : আমরা এই সৎ লোকটিকে এই কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারি না। এই ব্যক্তিকে আমরা তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেব।'
উল্লেখিত ঘটনার অনুরূপ আরেকটি ঘটনা ইতিহাসে দেখা যায়। আর তা হলো, যে সকল সৈনিক কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেছিল তাদের মধ্য থেকে একজন দুঃসাহসী লড়াকু সৈনিক রোমানদের হাতে বন্দী হয়। আমীরুল মু'মিনীন জানতে পারলেন, তাকে রোমান সম্রাটের সামনে হাজির করা হয় এবং সম্রাট তাকে ইসলাম ত্যাগ করার জন্য প্রবল চাপ প্রয়োগ করেন। আর সৈনিকটি দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে। অবশেষে আল্লাহদ্রোহী সম্রাট তার দু'টি চোখ উপড়ে ফেলার নির্দেশ দেন। খবরটি 'উমারের কানে পৌঁছালো। সাথে সাথে তিনি সম্রাটকে এই সংক্ষিপ্ত পত্রটি লিখলেন: ৪৯৪ 'অতঃপর এই যে, আপনি আপনার অমুক বন্দীর সাথে যে আচরণ করেছেন, তা আমার কানে পৌছেছে। আমি আল্লাহ্ নামে কসম করেছি, যদি আপনি তাকে এই মুহূর্তে আমার নিকট পাঠিয়ে না দেন তাহলে এমন এক বিশাল বাহিনী পাঠাবো যার প্রথম দিক থাকবে আপনার নিকট, আর শেষ দিক থাকবে আমার নিকট।' 'উমারের এই ধমক খেয়ে রোমান সম্রাট ভীত-শঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিলম্ব না করে সেই মুসলমান বন্দীকে মুক্তি দিয়ে স্বদেশে পাঠিয়ে দেন।
টিকাঃ
৪৮৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২০১-২০২
৪৮৭. হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩০৬; ইবনুল জাওযী-৯৪
৪৮৮. তাবাকাত-৫/৩৫৪
৪৮৯. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-২/২২
৪৯০. ইবনুল জাওযী-১২০
৪৯১. কিতাবুল আসানী-৯/৩০৪
৪৯২. হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩৩৪
৪৯৩. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৩২৫
৪৯৪. প্রাগুক্ত-৩২৬
তিনি একজন দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ, আল্লাহভীরু, পবিত্র আত্মা, ন্যায়পরায়ণ, দয়ালু, বুদ্ধিমান, দৃঢ় সংকল্প ইত্যাদি গুণসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তাঁর যাবতীয় কর্ম তৎপরতার মূল চেতনা ছিল মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব, কল্যাণ চিন্তা, সর্বোপরি মানুষের সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা। দেশের একজন অতি সাধারণ মানুষের দুঃখ, কষ্টেও তিনি কাতর হয়ে পড়তেন এবং তা দূর করার যাবতীয় পন্থা অবলম্বন করতেন। তাঁর জীবন-ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা দেখা যায় যাতে তাঁর মহত্ব ও তীব্র মানবতাবোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি প্রায়ই বলতেন: ৪৮৬ 'দুনিয়াতে কোন মানুষ কোন মানুষের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি দেখালে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার প্রতিও দয়া ও সহানুভূতি দেখাবেন।' একবার কা'বার হাজেব তথা রক্ষণা-বেক্ষণকারীগণ কা'বার গিলাফের জন্য খলীফার নিকট আবেদন জানালেন। পূর্ববর্তী খলীফাগণের সময় থেকে গিলাফ দানের নিয়ম চলে আসছিল। জবাবে 'উমার লিখলেন: ৪৮৭ 'আমি মনে করেছি ঐ গিলাফ ক্ষুধার্তদের কলিজায় লাগাবো। কারণ, ঘরের চেয়ে তারাই তা পাওয়ার অধিক উপযুক্ত।'
এই মহান খলীফার বিবেচনায় মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কা'বা ঘর তো মানুষের জন্য। সেই মানুষ যদি অনাহারে মারা যায় তাহলে সেই ঘর আবাদ করবে কে? মানুষ যদি সুস্থ-সবলভাবে বেঁচে থাকে তাহলে কা'বা ঘরের জৌলুষও বাড়াবে।
রোমানদের সাথে মুসলমানদের বহু বছর যাবত যুদ্ধ হয়। এ সকল যুদ্ধে উভয়পক্ষের সৈনিক প্রতিপক্ষের হাতে বন্দী হতো। আমীরুল মু'মিনীন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট মুসলমানের জীবন, সুখ-শান্তি ও মর্যাদা এত বেশী প্রাধান্যযোগ্য ছিল যে, একবার মাত্র একজন মুসলিম বন্দীর মুক্তির বিনিময়ে দশ হাজার রোমান সৈনিককে মুক্তি দেন। ৪৮৮ অপর একটি ঘটনায় একজন মুসলমান বন্দীকে এক লাখ দিরহাম মুক্তি পণ দিয়ে শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করেন। তিনি খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মকর্তাদের লেখেন: ৪৯০ 'মুক্তি পণ দিয়ে মুসলমান বন্দীদের মুক্ত করুন, তাতে যদি সকল সম্পদও ব্যয় হয় তাতেও পরোয়া করবেন না।'
কনস্টান্টিনোপল অভিযানের সময় বহু মুসলিম সৈনিক রোমানদের হাতে বন্দী হয়। তাদের বন্দী জীবনের কষ্টের কথা চিন্তা করে 'উমার ভীষণ কাতর হয়ে পড়তেন। মাঝে মধ্যে পত্র লিখে বন্দীদের খোঁজ-খবর নিতেন, তাদেরকে সাহস দিতেন ও সমবেদনা জানাতেন। কনস্টান্টিনোপলের যুদ্ধ বন্দীদের উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর একটি পত্র নিম্নরূপ: ৪৯১
'অতঃপর এই যে, আপনারা নিজেদেরকে যুদ্ধবন্দী মনে করছেন, আসলে আপনারা যুদ্ধবন্দী নন। আল্লাহর পানাহ্ চাই! আপনারা আল্লাহর পথে নিজেদেরকে অবরুদ্ধকারী। আপনারা জেনে রাখুন, আমি আমার জনগণের মধ্যে কোন কিছু বণ্টন করলে আপনাদের পরিবারবর্গকে বেশী পরিমাণে এবং ভালো জিনিসটি দিয়ে থাকি। আমি আপনাদের প্রত্যেকের জন্য পাঁচ দীনার করে পাঠালাম, বেশী পাঠালে রোমানরা আটকে দেবে, এ ভয় আমার না থাকলে আমি আরো বেশী করে পাঠাতাম। আমি আপনাদের নিকট অমুকের ছেলে অমুককে পাঠালাম। সে তাদের দাবী মত আপনাদের ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, স্বাধীন-দাস প্রত্যেকের মুক্তি পণ আদায় করবে। আপনাদের জন্য সুসংবাদ, আপনাদের জন্য সুসংবাদ।'
জা'ঊনা ইবন আল-হারিছকে তিনি 'মালতিয়া'র শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। জা'ঊনা সেখানে একটি যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করেন এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে বহু ছাগল- ভেড়া লাভ করেন। অভিযান শেষে তিনি নিজ পুত্রকে এ সংবাদসহ আমীরুল মু'মিনীন 'উমারের নিকট পাঠান। যথাসময়ে সে দিমাকে পৌঁছে এবং খলীফাকে অভিযান সম্পর্কে অবহিত করে। খলীফা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন : মুসলমানদের কেউ নিহত হয়েছে কি? এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে বলে সে জানালো। খলীফা অত্যন্ত দুঃখের সাথে এক ব্যক্তি, এক ব্যক্তি, একথাটি দু'বার উচ্চারণ করলেন। তুমি একজন মুসলমানের বিনিময়ে ছাগল-গরু প্রাপ্তির সংবাদ নিয়ে এসেছো? আমার জীবদ্দশায় তোমরা বাপ-বেটা দু'জনের কেউই আর কোন দায়িত্ব পাবে না। ৪৯২
একবার তিনি রোমান সম্রাটের নিকট পাঠানো দূতের মারফত জানতে পারলেন যে, একজন মুসলমান বন্দীকে রোমানরা ভীষণ অপমান করেছে। তারা সেই বন্দীর দ্বারা আটা পেষা ও রুটি বানানোর কাজ করাচ্ছে। সংগে সংগে তিনি রোমান সম্রাটকে লেখেন: ৪৯৩ 'অতঃপর এই যে, আমি অমুকের বিষয়ে অবগত হয়েছি। আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, যদি তাকে আমার নিকট ফেরত না পাঠান তাহলে আপনার বিরুদ্ধে এমন এক বিশাল বাহিনী পাঠাবো যার প্রথম সৈনিকটি থাকবে আপনার নিকট, আর শেষ সৈনিকটি থাকবে আমার নিকট।' খলীফার এ পত্র রোমান সম্রাট পাঠ করার পর বললেন : আমরা এই সৎ লোকটিকে এই কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারি না। এই ব্যক্তিকে আমরা তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেব।'
উল্লেখিত ঘটনার অনুরূপ আরেকটি ঘটনা ইতিহাসে দেখা যায়। আর তা হলো, যে সকল সৈনিক কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেছিল তাদের মধ্য থেকে একজন দুঃসাহসী লড়াকু সৈনিক রোমানদের হাতে বন্দী হয়। আমীরুল মু'মিনীন জানতে পারলেন, তাকে রোমান সম্রাটের সামনে হাজির করা হয় এবং সম্রাট তাকে ইসলাম ত্যাগ করার জন্য প্রবল চাপ প্রয়োগ করেন। আর সৈনিকটি দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে। অবশেষে আল্লাহদ্রোহী সম্রাট তার দু'টি চোখ উপড়ে ফেলার নির্দেশ দেন। খবরটি 'উমারের কানে পৌঁছালো। সাথে সাথে তিনি সম্রাটকে এই সংক্ষিপ্ত পত্রটি লিখলেন: ৪৯৪ 'অতঃপর এই যে, আপনি আপনার অমুক বন্দীর সাথে যে আচরণ করেছেন, তা আমার কানে পৌছেছে। আমি আল্লাহ্ নামে কসম করেছি, যদি আপনি তাকে এই মুহূর্তে আমার নিকট পাঠিয়ে না দেন তাহলে এমন এক বিশাল বাহিনী পাঠাবো যার প্রথম দিক থাকবে আপনার নিকট, আর শেষ দিক থাকবে আমার নিকট।' 'উমারের এই ধমক খেয়ে রোমান সম্রাট ভীত-শঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিলম্ব না করে সেই মুসলমান বন্দীকে মুক্তি দিয়ে স্বদেশে পাঠিয়ে দেন।
টিকাঃ
৪৮৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২০১-২০২
৪৮৭. হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩০৬; ইবনুল জাওযী-৯৪
৪৮৮. তাবাকাত-৫/৩৫৪
৪৮৯. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-২/২২
৪৯০. ইবনুল জাওযী-১২০
৪৯১. কিতাবুল আসানী-৯/৩০৪
৪৯২. হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩৩৪
৪৯৩. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৩২৫
৪৯৪. প্রাগুক্ত-৩২৬