📄 ভদ্র, শালীন ও রুচিশীল মানুষ ছিলেন
তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনম্র ও মিষ্টি-মধুর চরিত্রের মানুষ। কিছু বিশেষ লোক ছিলেন যাদের সাথে রাতের বেলা খিলাফতের বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করতেন। কিন্তু যখন তাঁর ইচ্ছা হতো যে, এই লোকগুলো এখন উঠে যাক, তখন শুধু এতটুকু বলতেন যে- যদি আপনারা চান!
একবার 'আবদুল্লাহ ইবন হাসান তাঁর কিছু প্রয়োজনে খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের নিকট আসেন এবং 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে মাধ্যম বানান। এ কারণে সময়ে সময়ে তাঁর কাছে আসা-যাওয়া আরম্ভ করেন। একদিন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে বলেন, আপনি আমার নিকট কেবল তখন আসবেন যখন ভিতরে প্রবেশের অনুমতি লাভ করেন। কারণ, আমার এটা পছন্দ নয় যে, আপনি আমার দরজায় এসে অনুমতি না পেয়ে ফিরে যান।
একদিন তিনি আসলে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে বললেন, সেনাবাহিনীর একজন সদস্য প্লেগে আক্রান্ত হয়েছে। আপনি আপনার জন্মভূমিতে ফিরে যান। কারণ, আপনি আমার একজন অতি প্রিয় ব্যক্তি।
একবার তিনি ভুলক্রমে সালাম না দিয়েই কিছু মানুষের নিকট বসে পড়েন। স্মরণ হলে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম করে আবার বসেন। ৪৫৫
টিকাঃ
৪৫৫. ইবনুল জাওযী-৬২, ৬৩
তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনম্র ও মিষ্টি-মধুর চরিত্রের মানুষ। কিছু বিশেষ লোক ছিলেন যাদের সাথে রাতের বেলা খিলাফতের বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করতেন। কিন্তু যখন তাঁর ইচ্ছা হতো যে, এই লোকগুলো এখন উঠে যাক, তখন শুধু এতটুকু বলতেন যে— যদি আপনারা চান!
একবার 'আবদুল্লাহ ইবন হাসান তাঁর কিছু প্রয়োজনে খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের নিকট আসেন এবং 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে মাধ্যম বানান। এ কারণে সময়ে সময়ে তাঁর কাছে আসা-যাওয়া আরম্ভ করেন। একদিন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে বলেন, আপনি আমার নিকট কেবল তখন আসবেন যখন ভিতরে প্রবেশের অনুমতি লাভ করেন। কারণ, আমার এটা পছন্দ নয় যে, আপনি আমার দরজায় এসে অনুমতি না পেয়ে ফিরে যান।
একদিন তিনি আসলে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে বললেন, সেনাবাহিনীর একজন সদস্য প্লেগে আক্রান্ত হয়েছে। আপনি আপনার জন্মভূমিতে ফিরে যান। কারণ, আপনি আমার একজন অতি প্রিয় ব্যক্তি।
একবার তিনি ভুলক্রমে সালাম না দিয়েই কিছু মানুষের নিকট বসে পড়েন। স্মরণ হলে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম করে আবার বসেন। ৪৫৫
টিকাঃ
৪৫৫. ইবনুল জাওযী-৬২, ৬৩
📄 বিনয়, সাম্য ও নিরহঙ্কার মনের মানুষ
খিলাফতের মসনদে আসীন হওয়ার পূর্বে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন একজন অহঙ্কারী ও বিলাসী মানুষ। অত্যন্ত দামী কাপড় পরতেন, মূল্যবান সুগন্ধি গায়ে লাগাতেন এবং গর্বভরে রাস্তায় চলতেন। তবে খলীফা হওয়ার সাথে সাথে তাঁর স্বভাব-চরিত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। তিনি তাঁর গর্ব-অহঙ্কারকে বিনয় ও নম্রতায় পরিবর্তন ঘটান। যখন তিনি মদীনার ওয়ালী ছিলেন তখন তাঁর আচার-আচরণে পরিষ্কার বুঝা যেত, তিনি একজন ওয়ালী। তবে খলীফা হওয়ার পর কেউ বুঝতে পারতো না যে, তিনি একজন খলীফা।
খলীফা হওয়ার পর যখন রাজকীয় বাহন এসে দাঁড়ালো তখন তিনি তাদেরকে একথা বলে ফিরিয়ে দেন যে, "আমার খচ্চরটিই আমার জন্য যথেষ্ট।” যখন তিনি খচ্চরের উপর সোয়ার হয়ে চলতে যাবেন তখন কোতোয়াল বর্শা উঁচিয়ে আগে আগে চলতে চাইলো। তিনি তাকে একথা বলে বিদায় করেন যে, আমিও অন্য সাধারণ মুসলমানদের মত একজন মুসলমান। শাহী প্রাসাদে প্রবেশ করে দামী দামী পর্দাসমূহ ছিঁড়ে ফেলার নির্দেশ দেন। খলীফাগণ যে মূল্যবান কার্পেট ও বিছানায় বসতেন তা বিক্রী করে সেই অর্থ বায়তুল মালে জমা দিয়ে দেন। ৪৫৬
লোকেরা যখন তাঁর সম্মানে উঠে দাঁড়ালো, তিনি বললেন: "ওহে জনগণ! যদি আপনারা দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে আমিও দাঁড়িয়ে থাকবো। আপনারা বসলে আমিও বসবো। মানুষের কেবল আল্লাহর সামনেই দাঁড়ানো উচিত। ৪৫৭
বানু উমাইয়্যা খলীফাদের নিয়ম ছিল যখন তাঁরা কোন জানাযায় যোগাদান করতেন তখন সর্বপ্রথম তাঁদের বসার জন্য এক ধরনের বিশেষ চাদর বিছানো হতো। একবার 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একটি জানাযায় যোগদান করেন এবং নিয়ম অনুযায়ী তাঁর জন্যও চাদর বিছানো হয়। তবে তিনি পা দ্বারা চাদরটি খুঁটিয়ে মাটিতে বসে পড়েন। সরকারী নিরাপত্তা প্রহরীদেরকে খলীফার সম্মানে উঠে দাঁড়াতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দেন এবং তাদের সাথে সমান্তরালভাবে পাশাপাশি বসতেন। তারা তাড়াহুড়ো করে আগে ভাগে সালাম দিত। তিনি তাদেরকে বলতেন, তোমরা প্রথমে সালাম করবে না; বরং আমাদের উপর এটা ওয়াজিব যে, আমরা তোমাদেরকে প্রথমে সালাম করি।
গর্ব, অহঙ্কার ও আত্ম-অহমিকার প্রতি তাঁর এতই ঘৃণা ছিল যে, যখন কোন ভাষণ দিতেন অথবা কিছু লিখতেন তখন যদি মনে সামান্য পরিমাণ গর্ব-অহঙ্কারের ভাব সৃষ্টি হতো তাহলে ভাষণ বন্ধ করে চুপ হয়ে যেতেন এবং লেখা কাগজটি ছিঁড়ে ফেলতেন। তারপর আল্লাহর নিকট ফরিয়াদের সুরে বলতেন: হে আল্লাহ! আমি আমার প্রবৃত্তির অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। ৪৫৮
তিনি বলতেন, আত্ম-অহঙ্কারের ভয়ে আমি বেশী কথা বলি না। ৪৫৯
তিনি ছিলেন খলীফা এবং আমীরুল মু'মিনীন। তা সত্ত্বেও নিজেকে ব্যক্তি 'উমারই মনে করতেন। একবার তাঁর এক ভাই এসে বলে, "আপনি অনুমতি দিলে আমি আপনাকে 'উমার হিসেবে এমন কথা বলবো যা আজ আপনার পছন্দ হবে না, তবে আগামী দিনে পছন্দ হবে। আর তা না হলে আপনাকে আমীরুল মু'মিনীন মনে করেই কথা বলবো, যা আজ আপনার পছন্দ হবে কিন্তু আগামীকাল তা হবে অপছন্দ। বললেন, আমাকে তুমি 'উমার মনে করেই কথা বল যা আজ আমার অপ্রিয় হবে কিন্তু আগামীকাল হবে প্রিয়।
সাধারণতঃ সকল জানাযায় তিনি অংশগ্রহণ করতেন এবং অন্য সাধারণ মুসলমানদের মত লাশের খাটিয়ায় কাঁধ দিতেন। একবার এক বৃষ্টির দিনে একটি জানাযার নামায পড়ান। ঘটনাক্রমে একজন মুসাফির এসে পড়ে। তার গায়ে কোন চাদর ছিল না। তিনি লোকটিকে নিকটে ডেকে নিয়ে নিজের গায়ের চাদরে তাকে জড়িয়ে নেন।
একবার তিনি একটি গির্জায় যান। সেখানে দেখতে পান যে, কিছু লোক থালায় করে কিছু নিয়ে যাচ্ছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: এতে কি? লোকেরা বললো: গির্জার পাদরী মানুষকে আহার করাচ্ছেন। এরপর তাঁর সামনেও একটি খাবারের থালা উপস্থাপন করা হলো। তাতে পেস্তা ও বাদাম ছিল। তিনি জানতে চান অন্য থালাতেও একই খাবার আছে কিনা। তারা বললো নেই। তিনি বললেন, তাহলে খাবারের থালাটি ফিরিয়ে নিয়ে যাও। ৪৬০
বিনয় ও নম্রতার কারণে যে কোন প্রশংসাকারীকে ভীষণ অপছন্দ করতেন। একবার জনৈক ব্যক্তি সামনেই তাঁর প্রশংসা করে। তিনি বলেন, আমার নিজের অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে যতটুকু আমি জানি, তা যদি তোমার জানা থাকতো তাহলে তুমি আমার চেহারার দিকে তাকাতেই না।
তাঁর এমন বিনয় ও নম্রতার ফলে যারা তাঁকে জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থায় দেখতে চাইতো, চিনতেই পারতো না। হাকাম ইবন 'উমার আর-রু'আইনী বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একদল মানুষের নিকট থেকে উঠে আরেকদল মানুষের নিকট গিয়ে বসতেন। আগন্তুকদের অনেকে যারা তাঁকে চিনতো না, জিজ্ঞেস করতো, আমীরুল মু'মিনীন কোন দলটির মধ্যে আছেন? ততক্ষণ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে না দেওয়া হতো যে, ইনি আমীরুল মু'মিনীন, তারা তাঁকে চিনতেই পারতো না।
এমন বিনয় স্বভাব সত্ত্বেও তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ ছিল টনটনে। খলীফা হওয়ার পর নিজের বংশের লোকদের সাথে মেলামেশা কমিয়ে দেন। তখন কেউ কেউ বলতো, তিনি অহঙ্কারী হয়ে গেছেন। এ কথা শুনে তিনি বলেন, প্রথমে আমি ছিলাম একটি বখাটে ছোকরা। বংশের লোকেরা বিনা অনুমতিতে আমার কাছে আসতো, আমার গালিচা-বিছানা দলে-মুচড়ে একাকার করে ফেলতো। একজন শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তির যে কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, তা ছিল না। তবে খলীফা হওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, হয় পূর্বের অবস্থায় থেকে আমি আমার অধিকার ক্ষুণ্ণ করার জন্য তাদেরকে শাস্তি দিব, না হয় তাদের সাথে মেলামেশা ছেড়ে দিব। যাতে তারা আমার অধিকার ক্ষুণ্ণ করার দুঃসাহস না করে। আমি এই শেষ পন্থাটি অবলম্বন করেছি। আর অহঙ্কার! তাতো আল্লাহর চাদর, তা নিয়ে আমি টানাটানি করতে পারি কিভাবে? ৪৬১
দাস-দাসীদের সাথে তাঁর আচরণ এমন সমতার রূপ নেয় যে, কখনো কখনো তিনি নিজেই চাকর-বাকরদের সেবায় লেগে যেতেন। একবার পাখা ঘুরাতে ঘুরাতে এক দাসী নিদ্রাকাতর হয়ে পড়ে। তিনি পাখাটি নিয়ে তাকেই বাতাস করতে থাকেন। দাসী চোখ মেলে মনিবকে বাতাস করতে দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে। তিনি তাকে শান্ত করে বলেন, তুমিও তো আমার মত মানুষ, তোমারও তো গরম লাগতে পারে। যেভাবে পাখা ঘুরিয়ে তুমি আমাকে বাতাস করছিলে, তেমনি তোমাকেও বাতাস করা আমি সঙ্গত মনে করেছি। ৪৬২
কর্মচারী ও চাকর-বাকরদের বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটাতেন না। তাদের বিশ্রামের সময় নিজের কাজ নিজে করে নিতেন। একদিন রাজা' ইবন হায়ওয়ার সাথে কথা বলতে বলতে অনেক রাত হয়ে যায়। এক সময় বাতি দফ দফ করতে থাকে। পাশেই চাকর শুয়ে ছিল। রাজা' বললেন, তাকেই জাগিয়ে দিন সে ঠিক করুক। 'উমার বললেন, না, তাকে ঘুমাতে দিন। রাজা' নিজেই বাতি ঠিক করতে চাইলেন। কিন্তু অতিথির দ্বারা কাজ করানো ভদ্রতার পরিপন্থী, তাই তাঁকেও করতে দিলেন না। তিনি নিজেই উঠে গিয়ে চেরাগে যয়তূনের তেল ঢেলে ঠিক করে ফিরে এসে বললেন: “যখন আমি উঠেছিলাম তখনও 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলাম এবং এখনো 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আছি। ৪৬৩
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আবু আবদিল মালিক বলেছেন, একবার 'ঈদের দিন 'উমার কাতানের জামা গায়ে দিয়ে এবং মাথায় টুপির উপর পাগড়ি পরে আমাদের নিকট আসলেন। আমরা দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন: থাম। আমি একা, আর আপনারা একদল। আমি আপনাদের সালাম দিব, আর আপনারা আমার সালামের জবাব দিবেন। একথা বলে তিনি সালাম দিলেন, আর আমরা তাঁর সালামের জবাব দিলাম। আমরা তাঁর বাহনের পশু হাজির করলাম, কিন্তু তিনি তাতে চড়লেন না। আমরা সকলে তাঁর সাথে হেঁটে মসজিদে গেলাম। তারপর তিনি মিম্বরে উঠে এমন এক হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দেন যে, ডানে-বাঁয়ে সকল দিকের সকল মানুষ কাঁদতে আরম্ভ করে। তারপর তিনি ভাষণ শেষ করে নেমে পড়েন। রাজা ইবন হায়ওয়া তাঁর নিকটে গিয়ে বলেন: আমীরুল মু'মিনীন এমন ভাষণ দিয়েছেন যে, লোকদের অন্তর বিগলিত হয়ে গেছে এবং তাদেরকে কাঁদিয়ে ছেড়েছেন। আর এমন সময় কথা বন্ধ করেছেন যখন তারা তা শুনতে আরো আগ্রহী হয়েছে। 'উমার বললেন: রাজা'! আমি অহঙ্কার একেবারেই পছন্দ করিনে। ৪৬৪
টিকাঃ
৪৫৬. ইবনুল জাওযী: ৫৩-৫৪
৪৫৭. সীরাতু ইবন 'আবদিল হাকাম-৩০
৪৫৮. ইবনুল জাওযী-৫৭, ৬৩, ৮৬
৪৫৯. তারীখ আল-খুলাফা'-২৩৮
৪৬০. সীরাতু ইবন 'আবদিল হাকাম-৫৫
৪৬১. ইবনুল জাওযী: ১৭২-১৭৫
৪৬২. প্রাগুক্ত-১৭২
৪৬৩. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/৪২৫
৪৬৪. প্রাগুক্ত-২/৪৩৩; ৪/৯২-৯৩
খিলাফতের মসনদে আসীন হওয়ার পূর্বে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন একজন অহঙ্কারী ও বিলাসী মানুষ। অত্যন্ত দামী কাপড় পরতেন, মূল্যবান সুগন্ধি গায়ে লাগাতেন এবং গর্বভরে রাস্তায় চলতেন। তবে খলীফা হওয়ার সাথে সাথে তাঁর স্বভাব-চরিত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। তিনি তাঁর গর্ব-অহঙ্কারকে বিনয় ও নম্রতায় পরিবর্তন ঘটান। যখন তিনি মদীনার ওয়ালী ছিলেন তখন তাঁর আচার-আচরণে পরিষ্কার বুঝা যেত, তিনি একজন ওয়ালী। তবে খলীফা হওয়ার পর কেউ বুঝতে পারতো না যে, তিনি একজন খলীফা।
খলীফা হওয়ার পর যখন রাজকীয় বাহন এসে দাঁড়ালো তখন তিনি তাদেরকে একথা বলে ফিরিয়ে দেন যে, "আমার খচ্চরটিই আমার জন্য যথেষ্ট।” যখন তিনি খচ্চরের উপর সোয়ার হয়ে চলতে যাবেন তখন কোতোয়াল বর্শা উঁচিয়ে আগে আগে চলতে চাইলো। তিনি তাকে একথা বলে বিদায় করেন যে, আমিও অন্য সাধারণ মুসলমানদের মত একজন মুসলমান। শাহী প্রাসাদে প্রবেশ করে দামী দামী পর্দাসমূহ ছিঁড়ে ফেলার নির্দেশ দেন। খলীফাগণ যে মূল্যবান কার্পেট ও বিছানায় বসতেন তা বিক্রী করে সেই অর্থ বায়তুল মালে জমা দিয়ে দেন। ৪৫৬
লোকেরা যখন তাঁর সম্মানে উঠে দাঁড়ালো, তিনি বললেন: "ওহে জনমণ্ডলী! যদি আপনারা দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে আমিও দাঁড়িয়ে থাকবো। আপনারা বসলে আমিও বসবো। মানুষের কেবল আল্লাহর সামনেই দাঁড়ানো উচিত। ৪৫৭
বানু উমাইয়্যা খলীফাদের নিয়ম ছিল যখন তাঁরা কোন জানাযায় যোগাদান করতেন তখন সর্বপ্রথম তাঁদের বসার জন্য এক ধরনের বিশেষ চাদর বিছানো হতো। একবার 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একটি জানাযায় যোগদান করেন এবং নিয়ম অনুযায়ী তাঁর জন্যও চাদর বিছানো হয়। তবে তিনি পা দ্বারা চাদরটি খুঁটিয়ে মাটিতে বসে পড়েন। সরকারী নিরাপত্তা প্রহরীদেরকে খলীফার সম্মানে উঠে দাঁড়াতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দেন এবং তাদের সাথে সমান্তরালভাবে পাশাপাশি বসতেন। তারা তাড়াহুড়ো করে আগে ভাগে সালাম দিত। তিনি তাদেরকে বলতেন, তোমরা প্রথমে সালাম করবে না; বরং আমাদের উপর এটা ওয়াজিব যে, আমরা তোমাদেরকে প্রথমে সালাম করি।
গর্ব, অহঙ্কার ও আত্ম-অহমিকার প্রতি তাঁর এতই ঘৃণা ছিল যে, যখন কোন ভাষণ দিতেন অথবা কিছু লিখতেন তখন যদি মনে সামান্য পরিমাণ গর্ব-অহঙ্কারের ভাব সৃষ্টি হতো তাহলে ভাষণ বন্ধ করে চুপ হয়ে যেতেন এবং লেখা কাগজটি ছিঁড়ে ফেলতেন। তারপর আল্লাহর নিকট ফরিয়াদের সুরে বলতেন: হে আল্লাহ! আমি আমার প্রবৃত্তির অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। ৪৫৮
তিনি বলতেন, আত্ম-অহঙ্কারের ভয়ে আমি বেশী কথা বলি না। ৪৫৯
তিনি ছিলেন খলীফা এবং আমীরুল মু'মিনীন। তা সত্ত্বেও নিজেকে ব্যক্তি 'উমারই মনে করতেন। একবার তাঁর এক ভাই এসে বলে, "আপনি অনুমতি দিলে আমি আপনাকে 'উমার হিসেবে এমন কথা বলবো যা আজ আপনার পছন্দ হবে না, তবে আগামী দিনে পছন্দ হবে। আর তা না হলে আপনাকে আমীরুল মু'মিনীন মনে করেই কথা বলবো, যা আজ আপনার পছন্দ হবে কিন্তু আগামীকাল তা হবে অপছন্দ। বললেন, আমাকে তুমি 'উমার মনে করেই কথা বল যা আজ আমার অপ্রিয় হবে কিন্তু আগামীকাল হবে প্রিয়।
সাধারণতঃ সকল জানাযায় তিনি অংশগ্রহণ করতেন এবং অন্য সাধারণ মুসলমানদের মত লাশের খাটিয়ায় কাঁধ দিতেন। একবার এক বৃষ্টির দিনে একটি জানাযার নামায পড়ান। ঘটনাক্রমে একজন মুসাফির এসে পড়ে। তার গায়ে কোন চাদর ছিল না। তিনি লোকটিকে নিকটে ডেকে নিয়ে নিজের গায়ের চাদরে তাকে জড়িয়ে নেন।
একবার তিনি একটি গির্জায় যান। সেখানে দেখতে পান যে, কিছু লোক থালায় করে কিছু নিয়ে যাচ্ছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: এতে কি? লোকেরা বললো: গির্জার পাদরী মানুষকে আহার করাচ্ছেন। এরপর তাঁর সামনেও একটি খাবারের থালা উপস্থাপন করা হলো। তাতে পেস্তা ও বাদাম ছিল। তিনি জানতে চান অন্য থালাতেও একই খাবার আছে কিনা। তারা বললো নেই। তিনি বললেন, তাহলে খাবারের থালাটি ফিরিয়ে নিয়ে যাও। ৪৬০
বিনয় ও নম্রতার কারণে যে কোন প্রশংসাকারীকে ভীষণ অপছন্দ করতেন। একবার জনৈক ব্যক্তি সামনেই তাঁর প্রশংসা করে। তিনি বলেন, আমার নিজের অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে যতটুকু আমি জানি, তা যদি তোমার জানা থাকতো তাহলে তুমি আমার চেহারার দিকে তাকাতেই না।
তাঁর এমন বিনয় ও নম্রতার ফলে যারা তাঁকে জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থায় দেখতে চাইতো, চিনতেই পারতো না। হাকাম ইবন 'উমার আর-রু'আইনী বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একদল মানুষের নিকট থেকে উঠে আরেকদল মানুষের নিকট গিয়ে বসতেন। আগন্তুকদের অনেকে যারা তাঁকে চিনতো না, জিজ্ঞেস করতো, আমীরুল মু'মিনীন কোন দলটির মধ্যে আছেন? যতক্ষণ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে না দেওয়া হতো যে, ইনি আমীরুল মু'মিনীন, তারা তাঁকে চিনতেই পারতো না।
এমন বিনয় স্বভাব সত্ত্বেও তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ ছিল টনটনে। খলীফা হওয়ার পর নিজের বংশের লোকদের সাথে মেলামেশা কমিয়ে দেন। তখন কেউ কেউ বলতো, তিনি অহঙ্কারী হয়ে গেছেন। এ কথা শুনে তিনি বলেন, প্রথমে আমি ছিলাম একটি বখাটে ছোকরা। বংশের লোকেরা বিনা অনুমতিতে আমার কাছে আসতো, আমার গালিচা-বিছানা দলে-মুচড়ে একাকার করে ফেলতো। একজন শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তির যে কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, তা ছিল না। তবে খলীফা হওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, হয় পূর্বের অবস্থায় থেকে আমি আমার অধিকার ক্ষুণ্ণ করার জন্য তাদেরকে শাস্তি দিব, না হয় তাদের সাথে মেলামেশা ছেড়ে দিব। যাতে তারা আমার অধিকার ক্ষুণ্ণ করার দুঃসাহস না করে। আমি এই শেষ পন্থাটি অবলম্বন করেছি। আর অহঙ্কার! তাতো আল্লাহর চাদর, তা নিয়ে আমি টানাটানি করতে পারি কিভাবে? ৪৬১
দাস-দাসীদের সাথে তাঁর আচরণ এমন সমতার রূপ নেয় যে, কখনো কখনো তিনি নিজেই চাকর-বাকরদের সেবায় লেগে যেতেন। একবার পাখা ঘুরাতে ঘুরাতে এক দাসী নিদ্রাকাতর হয়ে পড়ে। তিনি পাখাটি নিয়ে তাকেই বাতাস করতে থাকেন। দাসী চোখ মেলে মনিবকে বাতাস করতে দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে। তিনি তাকে শান্ত করে বলেন, তুমিও তো আমার মত মানুষ, তোমারও তো গরম লাগতে পারে। যেভাবে পাখা ঘুরিয়ে তুমি আমাকে বাতাস করছিলে, তেমনি তোমাকেও বাতাস করা আমি সঙ্গত মনে করেছি। ৪৬২
কর্মচারী ও চাকর-বাকরদের বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটাতেন না। তাদের বিশ্রামের সময় নিজের কাজ নিজে করে নিতেন। একদিন রাজা' ইবন হায়ওয়ার সাথে কথা বলতে বলতে অনেক রাত হয়ে যায়। এক সময় বাতি দফ দফ করতে থাকে। পাশেই চাকর শুয়ে ছিল। রাজা' বললেন, তাকেই জাগিয়ে দিন সে ঠিক করুক। 'উমার বললেন, না, তাকে ঘুমাতে দিন। রাজা' নিজেই বাতি ঠিক করতে চাইলেন। কিন্তু অতিথির দ্বারা কাজ করানো ভদ্রতার পরিপন্থী, তাই তাঁকেও করতে দিলেন না। তিনি নিজেই উঠে গিয়ে চেরাগে যয়তূনের তেল ঢেলে ঠিক করে ফিরে এসে বললেন: “যখন আমি উঠেছিলাম তখনও 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলাম এবং এখনো 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আছি। ৪৬৩
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আবু আবদিল মালিক বলেছেন, একবার 'ঈদের দিন 'উমার কাতানের জামা গায়ে দিয়ে এবং মাথায় টুপির উপর পাগড়ি পরে আমাদের নিকট আসলেন। আমরা দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন: থাম। আমি একা, আর আপনারা একদল। আমি আপনাদের সালাম দিব, আর আপনারা আমার সালামের জবাব দিবেন। একথা বলে তিনি সালাম দিলেন, আর আমরা তাঁর সালামের জবাব দিলাম। আমরা তাঁর বাহনের পশু হাজির করলাম, কিন্তু তিনি তাতে চড়লেন না। আমরা সকলে তাঁর সাথে হেঁটে মসজিদে গেলাম। তারপর তিনি মিম্বরে উঠে এমন এক হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দেন যে, ডানে-বাঁয়ে সকল দিকের সকল মানুষ কাঁদতে আরম্ভ করে। তারপর তিনি ভাষণ শেষ করে নেমে পড়েন। রাজা ইবন হায়ওয়া তাঁর নিকটে গিয়ে বলেন: আমীরুল মু'মিনীন এমন ভাষণ দিয়েছেন যে, লোকদের অন্তর বিগলিত হয়ে গেছে এবং তাদেরকে কাঁদিয়ে ছেড়েছেন। আর এমন সময় কথা বন্ধ করেছেন যখন তারা তা শুনতে আরো আগ্রহী হয়েছে। 'উমার বললেন: রাজা'! আমি অহঙ্কার একেবারেই পছন্দ করিনে। ৪৬৪
টিকাঃ
৪৫৬. ইবনুল জাওযী: ৫৩-৫৪
৪৫৭. সীরাতু ইবন 'আবদিল হাকাম-৩০
৪৫৮. ইবনুল জাওযী-৫৭, ৬৩, ৮৬
৪৫৯. তারীখ আল-খুলাফা'-২৩৮
৪৬০. সীরাতু ইবন 'আবদিল হাকাম-৫৫
৪৬১. ইবনুল জাওযী: ১৭২-১৭৫
৪৬২. প্রাগুক্ত-১৭২
৪৬৩. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/৪২৫
৪৬৪. প্রাগুক্ত-২/৪৩৩; ৪/৯২-৯৩
📄 শিষ্টাচারিতা, বুদ্ধিমত্তা ও উদারতা
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যৌবনের সূচনা পর্ব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন ক্ষমতাধর শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী মানুষ হিসেবে জীবন যাপন করেন। তবে সব সময় একজন বিচক্ষণ, বিনম্র ও ভারসাম্যপূর্ণ স্বভাবের মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। একবার একজন খারিজী সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিককে সমালোচনা ও নিন্দামন্দ করে। এই অপরাধে সুলায়মান লোকটিকে হত্যা করান। তবে হত্যার পূর্বে যখন তিনি 'উমারের সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করেন তখন তিনি বলেন: "আপনিও তার সমালোচনা ও নিন্দামন্দ করুন। ৪৬৫
সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের জীবদ্দশায় তো তিনি এই পরামর্শ দেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তিনি নিজে যখন খলীফা হলেন তখন তা বাস্তবায়নের সময় আসে। সুতরাং একবার আঞ্চলিক কর্মকর্তা আবদুল হামীদ তাঁকে লিখে জানালেন, আমার এজলাসে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই অপরাধের মোকদ্দমা দায়ের করা হয়েছে যে, সে আপনাকে গালি দেয়। আমি তার শিরচ্ছেদের ইচ্ছা করেছিলাম। কিন্তু পরে তাকে এই ভেবে কারারুদ্ধ করেছি যে, এ ব্যাপারে আপনার মতামতটি জেনে নিই। জবাবে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয লিখলেন, যদি তুমি তাকে হত্যা করতে তাহলে আমি তোমার থেকে কিসাস নিতাম। অর্থাৎ বিনিময়ে তোমাকে হত্যা করতাম। একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সা) ছাড়া আর কাউকে কেউ গালি দিলে তাকে হত্যা করা যায় না। এ কারণে তুমি ইচ্ছা করলে তাকে গালি দিতে পার, অন্যথায় তাকে মুক্তি দাও। ৪৬৬
একবার তিনি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। এক ব্যক্তি বলে উঠলো, আমি যদি সাক্ষ্য দিই যে, আপনি একজন ফাসিক মানুষ। একথা শুনে শুধু এতটুকু বলেন যে, তুমি একজন মিথ্যাবাদী সাক্ষী। আমি তোমার সাক্ষ্য গ্রহণ করিনে।
একবার জনৈক ব্যক্তি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে একটি অসংগত কথা বলে। তিনি কোন উত্তর দিলেন না। লোকেরা বললো, আপনি চুপ করে আছেন কেন? বললেন, তাকওয়া আমার মুখে লাগাম লাগিয়ে দিয়েছে। একবার এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁকে বলে, সে আপনাকে গালি দেয়। তিনি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। লোকটি আবার বললো। তিনি আবার মুখ ফিরিয়ে নেন। তৃতীয়বার বললে তিনি বলেন, 'উমার তাকে এমন ঢিল দিচ্ছে যে, সে তা জানতেই পারে না।
একবার তিনি বাহনের পিঠে সোয়ার হয়ে কোথাও যাচ্ছেন। এক ব্যক্তি সোয়ারীর সামনে পড়ে গেল। সে রাগের সাথে বলে উঠলো : তুমি দেখতে পাও না? যখন সব সোয়ারীগুলো পার হয়ে গেল তখন লোকটি বলে উঠলো : এমন কেউ কি আছে যে তার বাহনের পিঠে আমাকে উঠিয়ে নিতে পারে? 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর দাসকে নির্দেশ দিলেন তাঁকে তার বাহনের পিঠে উঠিয়ে 'খাছমিয়া' পর্যন্ত পৌঁছে দিতে।
একদিন রাতে তিনি মসজিদে গেলেন। এক ব্যক্তি শুয়ে ছিল। অন্ধকারে লোকটির পায়ের সাথে ঠোকর খেলেন। লোকটি উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলো : তুমি কি পাগল! তিনি শুধু বললেন : না। তবে সাথে থাকা চাকরটি লোকটির এমন অমার্জিত আচরণের জন্য শাস্তি দিতে চাইলো। কিন্তু 'উমার তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, সে তো শুধু আমার কাছে জানতে চেয়েছে, আমি পাগল কিনা। আমি তার জবাবে বলেছি, না।
একবার এক ব্যক্তি তাঁকে ভীষণ কটু কথা বলে। তিনি বললেন, তুমি চাচ্ছো যে, আমি রাষ্ট্রক্ষমতার অহঙ্কারে তোমার সাথে এমন আচরণ করি যা তুমি কিয়ামতের দিন আমার সাথে করবে। একথা বলে তাকে ক্ষমা করে দেন।
একদিন তিনি দুপুরের বিশ্রামের জন্য উঠছেন, এমন সময় এক ব্যক্তি কাগজের একটি বাণ্ডিল হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো এবং বাণ্ডিলটি তাঁর দিকে ছুড়ে দিল। তিনি মুখ ফিরিয়ে সেদিকে তাকাতেই বাণ্ডিলটি তাঁর মুখে এসে পড়লো। এতে তিনি মুখে চোট পেলেন এবং রক্তও বের হলো। তিনি একটুও উত্তেজিত না হয়ে তার আবেদন পত্রটি পাঠ করলেন এবং তার প্রয়োজন পূরণের নির্দেশ দিলেন।
একবার প্রতিবেশীর এক ছেলে তাঁর এক ছেলেকে মারে। লোকেরা ছেলেটিকে ধরে তাঁর স্ত্রী ফাতিমার নিকট নিয়ে আসে। 'উমার তখন অন্য একটি কক্ষে ছিলেন। হৈ চৈ শুনে বেরিয়ে আসেন। এ সময় একজন মহিলা এসে বলে, এ আমার ছেলে এবং পিতৃহীন ইয়াতীম। 'উমার তাকে জিজ্ঞেস করেন, এই ইয়াতীম ছেলে কি ভাতা পায়? সে বলে : না। তিনি সেই ছেলেটির নাম ভাতাপ্রাপ্ত শিশুদের তালিকায় লিখে নেওয়ার নির্দেশ দেন। স্ত্রী ফাতিমা তখন বলেন: যদি আমার ছেলেকে সে আবারও না মারে তাহলে আল্লাহ তাঁর সাথে যেন এমন আচরণ করেন। তিনি বললেন: তুমি তো তাকে ভয় পাইয়ে দিলে।
একবার তিনি এক ব্যক্তির উপর ভীষণ ক্রুদ্ধ হলেন এবং তার শরীর থেকে কাপড় খুলে চাবুক লাগাতে চাইলেন। কিন্তু চাবুক লাগানোর সময় তাকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, যদি আমি ক্রুদ্ধ অবস্থায় না থাকতাম তাহলে তাকে শাস্তি দিতাম। তারপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন: والكاظمين الغيظ والعافين عن الناس. (آল ইমরান : ১৩৪) 'এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল।' ৪৬৭
টিকাঃ
৪৬৫. ইবনুল জাওযী-৩৯
৪৬৬. তাবাকাত-৫/৩৭২
৪৬৭. ইবনুল জাওযী: ১৭৬-১৭৮
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যৌবনের সূচনা পর্ব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন ক্ষমতাধর শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী মানুষ হিসেবে জীবন যাপন করেন। তবে সব সময় একজন বিচক্ষণ, বিনম্র ও ভারসাম্যপূর্ণ স্বভাবের মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। একবার একজন খারিজী সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিককে সমালোচনা ও নিন্দামন্দ করে। এই অপরাধে সুলায়মান লোকটিকে হত্যা করান। তবে হত্যার পূর্বে যখন তিনি 'উমারের সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করেন তখন তিনি বলেন: "আপনিও তার সমালোচনা ও নিন্দামন্দ করুন। ৪৬৫
সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের জীবদ্দশায় তো তিনি এই পরামর্শ দেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তিনি নিজে যখন খলীফা হলেন তখন তা বাস্তবায়নের সময় আসে। সুতরাং একবার আঞ্চলিক কর্মকর্তা আবদুল হামীদ তাঁকে লিখে জানালেন, আমার এজলাসে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই অপরাধের মোকদ্দমা দায়ের করা হয়েছে যে, সে আপনাকে গালি দেয়। আমি তার শিরচ্ছেদের ইচ্ছা করেছিলাম। কিন্তু পরে তাকে এই ভেবে কারারুদ্ধ করেছি যে, এ ব্যাপারে আপনার মতামতটি জেনে নিই। জবাবে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয লিখলেন, যদি তুমি তাকে হত্যা করতে তাহলে আমি তোমার থেকে কিসাস নিতাম। অর্থাৎ বিনিময়ে তোমাকে হত্যা করতাম। একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সা) ছাড়া আর কাউকে কেউ গালি দিলে তাকে হত্যা করা যায় না। এ কারণে তুমি ইচ্ছা করলে তাকে গালি দিতে পার, অন্যথায় তাকে মুক্তি দাও। ৪৬৬
একবার তিনি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। এক ব্যক্তি বলে উঠলো, আমি যদি সাক্ষ্য দিই যে, আপনি একজন ফাসিক মানুষ। একথা শুনে শুধু এতটুকু বলেন যে, তুমি একজন মিথ্যাবাদী সাক্ষী। আমি তোমার সাক্ষ্য গ্রহণ করিনে।
একবার জনৈক ব্যক্তি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে একটি অসংগত কথা বলে। তিনি কোন উত্তর দিলেন না। লোকেরা বললো, আপনি চুপ করে আছেন কেন? বললেন, তাকওয়া আমার মুখে লাগাম লাগিয়ে দিয়েছে। একবার এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁকে বলে, সে আপনাকে গালি দেয়। তিনি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। লোকটি আবার বললো। তিনি আবার মুখ ফিরিয়ে নেন। তৃতীয়বার বললে তিনি বলেন, 'উমার তাকে এমন ঢিল দিচ্ছে যে, সে তা জানতেই পারে না।
একবার তিনি বাহনের পিঠে সোয়ার হয়ে কোথাও যাচ্ছেন। এক ব্যক্তি সোয়ারীর সামনে পড়ে গেল। সে রাগের সাথে বলে উঠলো : তুমি দেখতে পাও না? যখন সব সোয়ারীগুলো পার হয়ে গেল তখন লোকটি বলে উঠলো : এমন কেউ কি আছে যে তার বাহনের পিঠে আমাকে উঠিয়ে নিতে পারে? 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর দাসকে নির্দেশ দিলেন তাঁকে তার বাহনের পিঠে উঠিয়ে 'খাছমিয়া' পর্যন্ত পৌঁছে দিতে।
একদিন রাতে তিনি মসজিদে গেলেন। এক ব্যক্তি শুয়ে ছিল। অন্ধকারে লোকটির পায়ের সাথে ঠোকর খেলেন। লোকটি উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলো : তুমি কি পাগল! তিনি শুধু বললেন : না। তবে সাথে থাকা চাকরটি লোকটির এমন অমার্জিত আচরণের জন্য শাস্তি দিতে চাইলো। কিন্তু 'উমার তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, সে তো শুধু আমার কাছে জানতে চেয়েছে, আমি পাগল কিনা। আমি তার জবাবে বলেছি, না।
একবার এক ব্যক্তি তাঁকে ভীষণ কটু কথা বলে। তিনি বললেন, তুমি চাচ্ছো যে, আমি রাষ্ট্রক্ষমতার অহঙ্কারে তোমার সাথে এমন আচরণ করি যা তুমি কিয়ামতের দিন আমার সাথে করবে। একথা বলে তাকে ক্ষমা করে দেন।
একদিন তিনি দুপুরের বিশ্রামের জন্য উঠছেন, এমন সময় এক ব্যক্তি কাগজের একটি বাণ্ডিল হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো এবং বাণ্ডিলটি তাঁর দিকে ছুড়ে দিল। তিনি মুখ ফিরিয়ে সেদিকে তাকাতেই বাণ্ডিলটি তাঁর মুখে এসে পড়লো। এতে তিনি মুখে চোট পেলেন এবং রক্তও বের হলো। তিনি একটুও উত্তেজিত না হয়ে তার আবেদন পত্রটি পাঠ করলেন এবং তার প্রয়োজন পূরণের নির্দেশ দিলেন।
একবার প্রতিবেশীর এক ছেলে তাঁর এক ছেলেকে মারে। লোকেরা ছেলেটিকে ধরে তাঁর স্ত্রী ফাতিমার নিকট নিয়ে আসে। 'উমার তখন অন্য একটি কক্ষে ছিলেন। হৈ চৈ শুনে বেরিয়ে আসেন। এ সময় একজন মহিলা এসে বলে, এ আমার ছেলে এবং পিতৃহীন ইয়াতীম। 'উমার তাকে জিজ্ঞেস করেন, এই ইয়াতীম ছেলে কি ভাতা পায়? সে বলে : না। তিনি সেই ছেলেটির নাম ভাতাপ্রাপ্ত শিশুদের তালিকায় লিখে নেওয়ার নির্দেশ দেন। স্ত্রী ফাতিমা তখন বলেন: যদি আমার ছেলেকে সে আবারও না মারে তাহলে আল্লাহ তাঁর সাথে যেন এমন আচরণ করেন। তিনি বললেন: তুমি তো তাকে ভয় পাইয়ে দিলে।
একবার তিনি এক ব্যক্তির উপর ভীষণ ক্রুদ্ধ হলেন এবং তার শরীর থেকে কাপড় খুলে চাবুক লাগাতে চাইলেন। কিন্তু চাবুক লাগানোর সময় তাকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, যদি আমি ক্রুদ্ধ অবস্থায় না থাকতাম তাহলে তাকে শাস্তি দিতাম। তারপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন: والكاظمين الغيظ والعافين عن الناس. (آল ইমরান : ১৩৪) 'এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল।' ৪৬৭
টিকাঃ
৪৬৫. ইবনুল জাওযী-৩৯
৪৬৬. তাবাকাত-৫/৩৭২
৪৬৭. ইবনুল জাওযী: ১৭৬-১৭৮
📄 ধৈর্য ও সহনশীলতা
একটা সময়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের উপর হঠাৎ করে যেন বিপদ-আপদের পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে। তাঁর সর্বাধিক প্রিয় তিন ব্যক্তি অল্প দিনের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করে। তারা হলো পুত্র আবদুল মালিক, ভাই সাহল ইবন 'আবদিল 'আযীয এবং অতি বিশ্বস্ত খাদেম মুযাহিম। এ সময় তিনি কেবল ধৈর্য ধারণই করেননি, বরং যে দৃঢ়তা অবলম্বন করেন তা দেখে লোকেরা অবাক হয়ে যায়। তিনি যখন পুত্র আবদুল মালিকের দাফন কাজে ব্যস্ত তখন এক ব্যক্তি বাম হাতে ইঙ্গিত করে বলে, আল্লাহ আমীরুল মু'মিনীনকে তাঁর এই ধৈর্যের বদলা দিন। তিনি লোকটির ভুল শুধরে দিয়ে বলেন, কথার মধ্যে বাম হাতে ইঙ্গিত করবে না, ডান হাতে করবে। লোকটি মন্তব্য করে আমি আজকের মত এত বিস্ময়কর ঘটনা আর দেখিনি। একজন মানুষ তার সর্বাধিক প্রিয় সন্তানকে দাফন করছে, অথচ সে সময়ও তার ডান-বাম হাতের কথাও স্মরণ আছে।
উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গের মৃত্যুর পর মানুষ সমবেদনামূলক যত কথা বলেছে, তিনি জবাবে কেবল ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। একবার রাবী' ইবন সুবরা তাঁর কাছে আসেন এবং বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা আপনাকে অশেষ প্রতিদান দিন। আমি এমন কোন ব্যক্তি দেখি না যার উপর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এত সব মুসীবত আপতিত হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি আপনার পুত্রের মত কোন পুত্র, আপনার ভাইয়ের মত কোন ভাই এবং আপনার চাকরের মত কোন চাকর আর কখনো দেখিনি। একথা শুনে 'উমার মাথা নীচু করে ফেলেন। রাবী'র পাশে আরেক ব্যক্তি বসা ছিল। সে বললো, আপনি তো আমীরুল মু'মিনীনকে অস্থির করে ফেললেন। একথা শুনে 'উমার মাথা উঁচু করলেন এবং বললেন: রাবী'! তুমি কি বললে? রাবী' তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি বললেন: সেই সত্তার শপথ! যিনি তাদের মৃত্যুর ফয়সালা করেছেন। এ আমার পছন্দ নয় যে, এসব ঘটনা না ঘটতো। আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর তিনি যে ভাষণটি দেন তাতে বলেন, জন্মের পর থেকে সে ছিল আমার অন্তরের সন্তুষ্টি ও চোখের প্রশান্তি। কিন্তু আজকের মত এত প্রশান্তি আর কখনো অনুভব করিনি। তারপর তিনি মাতম ও শোক পালন না করার নির্দেশ জারী করেন। ৪৬৮
টিকাঃ
৪৬৮. প্রাগুক্ত: ২৬৪-২৬৫
একটা সময়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের উপর হঠাৎ করে যেন বিপদ-আপদের পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে। তাঁর সর্বাধিক প্রিয় তিন ব্যক্তি অল্প দিনের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করে। তারা হলো পুত্র আবদুল মালিক, ভাই সাহল ইবন 'আবদিল 'আযীয এবং অতি বিশ্বস্ত খাদেম মুযাহিম। এ সময় তিনি কেবল ধৈর্য ধারণই করেননি, বরং যে দৃঢ়তা অবলম্বন করেন তা দেখে লোকেরা অবাক হয়ে যায়। তিনি যখন পুত্র আবদুল মালিকের দাফন কাজে ব্যস্ত তখন এক ব্যক্তি বাম হাতে ইঙ্গিত করে বলে, আল্লাহ আমীরুল মু'মিনীনকে তাঁর এই ধৈর্যের বদলা দিন। তিনি লোকটির ভুল শুধরে দিয়ে বলেন, কথার মধ্যে বাম হাতে ইঙ্গিত করবে না, ডান হাতে করবে। লোকটি মন্তব্য করে আমি আজকের মত এত বিস্ময়কর ঘটনা আর দেখিনি। একজন মানুষ তার সর্বাধিক প্রিয় সন্তানকে দাফন করছে, অথচ সে সময়ও তার ডান-বাম হাতের কথাও স্মরণ আছে।
উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গের মৃত্যুর পর মানুষ সমবেদনামূলক যত কথা বলেছে, তিনি জবাবে কেবল ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। একবার রাবী' ইবন সুবরা তাঁর কাছে আসেন এবং বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা আপনাকে অশেষ প্রতিদান দিন। আমি এমন কোন ব্যক্তি দেখি না যার উপর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এত সব মুসীবত আপতিত হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি আপনার পুত্রের মত কোন পুত্র, আপনার ভাইয়ের মত কোন ভাই এবং আপনার চাকরের মত কোন চাকর আর কখনো দেখিনি। একথা শুনে 'উমার মাথা নীচু করে ফেলেন। রাবী'র পাশে আরেক ব্যক্তি বসা ছিল। সে বললো, আপনি তো আমীরুল মু'মিনীনকে অস্থির করে ফেললেন। একথা শুনে 'উমার মাথা উঁচু করলেন এবং বললেন: রাবী'! তুমি কি বললে? রাবী' তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি বললেন: সেই সত্তার শপথ! যিনি তাদের মৃত্যুর ফয়সালা করেছেন। এ আমার পছন্দ নয় যে, এসব ঘটনা না ঘটতো। আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর তিনি যে ভাষণটি দেন তাতে বলেন, জন্মের পর থেকে সে ছিল আমার অন্তরের সন্তুষ্টি ও চোখের প্রশান্তি। কিন্তু আজকের মত এত প্রশান্তি আর কখনো অনুভব করিনি। তারপর তিনি মাতম ও শোক পালন না করার নির্দেশ জারী করেন। ৪৬৮
টিকাঃ
৪৬৮. প্রাগুক্ত: ২৬৪-২৬৫