📄 অন্তিম রোগশয্যায়
ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) নেতৃত্বে সংঘটিত বিপ্লব সাধারণ মানুষের জন্য দারুণ কল্যাণ বয়ে এনেছিল, বিশ্ববাসীর নিকট ইসলামী রাষ্ট্রের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং পৃথিবী আরেকবার একথা উপলব্ধি করেছিল যে, ইসলাম মানবতার সংরক্ষণ এবং মানব জাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য এসেছে। ইসলাম যে জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে তা কোন শ্রেণী বা দলের পৃষ্ঠপোষকতা ও আরাম-আয়েশের জন্য নয় বরং তার উদ্দেশ্য বিশ্ব মানবতার মুক্তি ও কল্যাণ। বিশ্ববাসী ইসলাম সম্পর্কে এমন সুধারণা রাখুক তা বানু উমাইয়্যাদের মনোপুত ছিল না। কারণ, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) জন্য তারা ভীষণ বিপদে পড়ে গিয়েছিল। তাদের অন্যায়ভাবে অর্জিত ব্যক্তিগত বিষয়-সম্পত্তি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তাদের জবর-দখলকৃত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ কেড়ে নিয়ে প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি আরো কিছু দিন জীবিত থাকলে বানু উমাইয়্যাদের জন্য আরো বেশী অস্থিরতা ও অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতেন। বিশেষতঃ ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিকের মনে তো সব সময় এ সন্দেহ ও সংশয় প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিল যে, তাঁর পরবর্তী খলীফা হওয়ার মনোনয়ন বাতিল করে অন্য কাউকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে না যান। যদিও পূর্ববর্তী খলীফা সুলায়মান ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক তাকে পরবর্তী খলীফা হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে জনগণের থেকে বাই'আতও সম্পন্ন করে গেছেন। সে অঙ্গীকার ও বাই'আত ভঙ্গ করা 'উমারের জন্য এত সহজ ছিল না। তবুও তা সম্ভব ছিল। তাঁর চিন্তা-চেতনায় এটা মোটেই অসম্ভব ছিল না যে তিনি ইয়াযীদকে সরিয়ে তার স্থলে অন্য কোন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে খিলাফতের মনোনয়ন দিয়ে যাবেন।
ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিকের এই সন্দেহ তাঁকে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) হত্যার ষড়যন্ত্র করতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি 'উমারের এক খাস খাদিমকে এক হাজার দীনারের বিনিময়ে নিজের পক্ষে টেনে নেন। সে তাঁকে খাদ্য অথবা পানীয়ের সাথে বিষ মিশিয়ে দেয়। ইবন কাছীর বলেন : ৪৩৫ 'তাঁর ('উমার) এক দাস তাঁকে খাদ্য অথবা পানীয়ে বিষ প্রয়োগ করে। বিনিময়ে সে এক হাজার দীনার লাভ করে। আর এর কারণে তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন।'
ইবন 'আবদি রাব্বিহি বলেন, মানুষের ধারণা ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে বিষ প্রয়োগের ষড়যন্ত্র করেন। তিনি 'উমারের একজন খাদিমকে হাত করেন। সে তার বুড়ো আংগুলের নখে বিষ লাগিয়ে নেয়। 'উমার পান করার জন্য পানি চাইলে সে গ্লাস ভর্তি পানিতে বিষ মিশ্রিত নখ চুবিয়ে পান করতে দেয়। সেই পানি পান করে 'উমার (রহ) রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। সেই রোগেই তাঁর ইনতিকাল হয়। ৪৩৬
তিনি রোগগ্রস্ত হওয়ার পর প্রথম প্রথম তাঁর খান্দানের অধিকাংশ মানুষ ধারণা করেছিল যে, তাঁকে জাদু করা হয়েছে। মুজাহিদ বলেছেন, এই অসুস্থ অবস্থায় একদিন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন : মানুষ আমার সম্পর্কে কি বলাবলি করছে? বললাম: আপনাকে জাদু করা হয়েছে। বললেন: আমি জাদুগ্রস্ত নই। ৪৩৭ আসলে যেদিন বিষ প্রয়োগ করা হয় সেদিনই তিনি তা বুঝতে পারেন। কিন্তু তিনি উপেক্ষা ও গোপন রাখার নীতি অবলম্বন করেন। অবশেষে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে তিনি সেই খাস খাদিমকে ডেকে বলেন: ৪৩৮ 'তোমার ধ্বংস হোক! আমাকে বিষ প্রয়োগ করতে কিসে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে? বললো : হাজার দীনার আমাকে দেওয়া হয়েছে এবং আমাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। বললেন: এক হাজার দীনার নিয়ে এসো। সে দীনারগুলো নিয়ে এলো। 'উমার সেগুলো বায়তুল মালে পাঠিয়ে দিয়ে বললেন: কেউ তোমাকে না দেখে এমন স্থানে চলে যাও।'
হযরত 'উমার (রহ) তখন হিমসের 'দায়রু সাম'আন' নামক জনপদে অবস্থান করছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় সেখানে বিশ দিন থাকেন। অসুস্থতার খবর রোমে পৌঁছলে রোমান সম্রাট তাঁর চিকিৎসার জন্য নিজের ব্যক্তিগত চিকিৎসককে পাঠান। তিনি দায়রু সাম'আনে এসে 'উমারকে পরীক্ষা-নির্চনা করে নিশ্চিত হন যে, তাঁকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। তিনি যখন চিকিৎসার উদ্যোগ নেন তখন 'উমার কোন রকম চিকিৎসা করাতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন: ৪৪০ 'আল্লাহর কসম! যদি আমার নিরাময় কেবল এতেই হয় যে, আমি আমার কানের লতি স্পর্শ করি অথবা একটু সুগন্ধির ঘ্রাণ নিই তাহলেও আমি তা করবো না।'
আসলে তিনি নানা কারণে জীবনের প্রতি ভীষণ বিতৃষ্ণ হয়ে উঠেছিলেন। পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে তিনি মোটেও মেনে নিতে পারছিলেন না। ইবন 'আবদিল হাকাম বর্ণনা করেছেন, তাঁর অতি প্রিয় পুত্র 'আবদুল মালিক, ভাই সুহায়ল এবং ব্যক্তিগত খাদিম মুযাহিম-এর মৃত্যুর পর থেকে তিনি সব সময় ভীষণ বিষণ্ণ থাকতেন। পার্থিব কোন কিছুর প্রতি তাঁর আর কোন আকর্ষণ ছিল না। বিশেষ করে পুত্র 'আবদুল মালিকের মৃত্যুতে তিনি শোকে এত কাতর হয়ে পড়েন যে, সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে যান। তারপর একে একে ভাই সুহায়ল এবং একান্ত খাদিম মুযাহিমের মৃত্যু তাঁর জন্য মোটেও কম বেদনার ছিল না। তাই এ সময় তিনি দিমাক্কের তৎকালীন সবচেয়ে বড় দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ আল্লাহ ওয়ালা ব্যক্তি আবূ যাকারিয়াকে ডেকে পাঠান। তিনি উপস্থিত হলে তাঁদের মধ্যে নিম্নের কথোপকথন হয়:
'উমার: 'ওহে ইবন আবী যাকারিয়া, আপনি কি বুঝতে পেরেছেন আমি আপনাকে কি জন্য ডেকে পাঠিয়েছি?
ইবন আবী যাকারিয়া: না, আমি বুঝতে পারিনি।
'উমার: এমন একটি কথা আমি আপনাকে বলতে চাই, যা আপনি গোপন রাখবেন বলে কসম খেয়ে অঙ্গীকার না করলে আমি বলবো না।
আবূ যাকারিয়া কসম খেয়ে প্রকাশ না করার অঙ্গীকার করলেন।
'উমার বললেন : আপনি আমার জন্য দু'আ করুন আল্লাহ যেন আমাকে মৃত্যু দান করেন।
ইবন আবী যাকারিয়া: এটা মুসলমানদের জন্য খুবই খারাপ কথা হবে। আমি যদি এ দু'আ করি, তা হবে মুসলিম উম্মাহর সংগে চরম দুশমনি।
'উমার (রা) তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, আপনি আমার কাছে কসম খেয়ে অঙ্গীকার করেছেন।
ইবন আবী যাকারিয়া দু'আ করলেন এবং সেই সাথে নিজের মৃত্যু কামনা করেও দু'আ করেন। হযরত 'উমার নিজের ছোট এক সন্তানকেও ডেকে আনান এবং আবু যাকারিয়াকে বলেন, এই সন্তানটিকে আমি খুব বেশী ভালোবাসি। এর মৃত্যু কামনা করেও দু'আ করুন। ইবন আবী যাকারিয়া শিশুটির মৃত্যু কামনা করে দু'আ করেন। বর্ণনাকারী বলেন, 'উমার, ইবন আবী যাকারিয়া ও শিশু তিনজনই একে একে প্রায় একই সঙ্গে মারা যান। ৪৪১
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) চার স্ত্রী ছিলেন। প্রত্যেকেরই সন্তান ছিল। লুমাইস বিন্ত 'আলীর ছিল তিন সন্তান 'আবদুল্লাহ, বাকর, ও উম্মু 'আম্মার। উম্মু 'উছমান বিন্ত শুআইবের ছিল এক ছেলে- ইবরাহীম। ফাতিমা বিন্ত 'আবদিল মালিকের ছিল তিন ছেলে- ইসহাক, ইয়া'কূব ও মূসা। আর উম্মু ওয়ালীদের ছিল নয় ছেলে-মেয়ে। যথা: 'আবদুল মালিক, ওয়ালীদ, 'আসিম, ইয়াযীদ, 'উবায়দুল্লাহ, 'আবদুল 'আযীয, যাবানা, আমাতা ও উম্মু 'আবদিল্লাহ। আল-ইয়া'কূবী বলেন, মৃত্যুর সময় তিনি নয়জন পুত্র সন্তান রেখে যান। ৪৫৪ তাঁর জীবদ্দশায় অতি আদরের ছেলে 'আবদুল মালিকের মৃত্যু হয়। তিনি নিজ হাতে তাকে কবরে নামিয়ে মাটি সমান করেন। কবরের উপর মাথা ও পায়ের দিকে যয়তুনের দু'টি ডাল গেড়ে দেন। মানুষ তখন 'উমারকে ঘিরে ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে মৃত ছেলের উদ্দেশ্যে নিম্নের কথাগুলো উচ্চারণ করেন:
'আমার ছেলে! আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন। তুমি তোমার পিতার বাধ্য ছিলে। আল্লাহর কসম! আল্লাহ তোমাকে দান করার পর থেকে আমি তোমাকে নিয়ে সবসময় খুশী ছিলাম। আল্লাহর কসম! কখনো সে খুশী মাত্রাতিরিক্ত ছিল না। আল্লাহ যেখানে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছেন সেখানে তোমাকে রাখার পর তোমার মধ্যে আমার জন্য আল্লাহর নিকট কিছুই প্রত্যাশা করি না। আল্লাহ তোমার গুনাহ্ মাফ করুন, তোমার ভালো কাজের বদলা দিন এবং খারাপ কাজ উপেক্ষা করুন। দূরের ও নিকটের যে কেউ তোমার জন্য সুপারিশ করেন, আল্লাহ এমন সকল সুপারিশকারীকে দয়া করুন। আমরা আল্লাহর ফয়সালায় রাজি এবং তাঁর ইচ্ছা ও আদেশকে মেনে নিয়েছি। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের জন্য সকল প্রশংসা।'
টিকাঃ
৪৩৫. রশীদ আখতার নাদবী, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ)-৩৬০
৪৩৬. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১১৩
৪৩৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১২১
৪৩৮. প্রাগুক্ত
৪৩৯. দিমাশকের পাশে একটি বিনোদনমূলক স্থান। (আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/২৮৫, টীকা নং-৩, ৪/৪৩২; টীকা নং-৪)
৪৪০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২১০; আল-কামিল ফিত তারীখ-৫/৬৫
৪৪১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২১০; সীরাতু ইবন 'আবদিল হাকাম-১১৫
৪৪২. ইবনুল জাওযী-২৮০; আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৩৯; সিফাতুস সাফওয়া-২/১২৬; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/১১২-১১৪
৪৪৩. জামহারাতু রাসায়িল আল-'আরাব-২/৩১৪
৪৪৪. ইবনুল জাওযী-২৮০
৪৪৫. তাবাকাত-৫/২৯৮
৪৫৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৮২; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২১৭
📄 কবরের জন্য ভূমি ক্রয়
অতঃপর তিনি দায়রু সাম'আনের এক যিম্মীর নিকট থেকে চল্লিশ হাজার দিরহামে কবরের জন্য একখণ্ড ভূমি ক্রয় করেন। কিন্তু লোকটি মূল্য গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলে, আপনি আমার ভূমিতে দাফন হচ্ছেন, সেটাই আমার শুভ ও কল্যাণের কারণ হবে। কিন্তু 'উমার তাঁর কোন কথা শুনলেন না। জোর করে ভূমির মূল্য তার হাতে তুলে দেন। ৪৪৬
একেবারে অন্তিম সময়ে মাসলামা ইবন 'আবদিল মালিক দেখা করতে চাইলেন। অতি অল্প সময়ের জন্য অনুমতি দিলেন। মাসলামা মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন: হে আমীরুল মু'মিনীন! আমাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনি আমাদের পাষাণ হৃদয়কে কোমল করে দিয়েছেন। আপনি আমাদেরকে সৎকর্মশীলদের মধ্যে পরিগণিত হওয়ার যোগ্য করে তুলেছেন।
রাজা' ইবন হায়ওয়াকে ডেকে বললেন, তিনি যেন গোসল দেন, কাফন পরান এবং ধরে কবরে নামান। দাসীকে সুগন্ধির সাথে মিল্ক মিশাতে নিষেধ করেন, ইট দিয়ে কবর পাকা করতেও বারণ করেন। কাফনের জন্য নিজেই পাঁচ প্রস্থ কাপড় নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন এবং বলে রেখেছিলেন যে, হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) তাঁর খান্দানের মৃতদেরকে এভাবে কাফন পরাতেন। হযরত রাসূলে কারীমের (রা) কয়েক টুকরো নখ ও কয়েকটি কেশ চেয়ে এনে কাফনের মধ্যে দেওয়ার কথা বলে যান। ৪৪৮
একেবারে অন্তিম সময়ে স্ত্রী ফাতিমা ও শ্যালক মাসলামা নিকটে বসা ছিলেন। তাঁদেরকে বলেন: 'আমার কাছ থেকে তোমরা একটু সরে যাও। আমি দেখতে পাচ্ছি, বিশাল সংখ্যক এক ধরনের সৃষ্টি (মাখলুক) আমার নিকট সমবেত হচ্ছে। তারা না জিন এবং না মানুষ।'
ফাতিমা ও মাসলামা দু'জনই তাঁর কথা মত উঠে পাশের একটি কক্ষে গেলেন। সেখান থেকেই তাঁরা নিম্নের এ আয়াতটি পাঠের আওয়াজ শুনতে পেলেন: 'ইহা আখিরাতের সেই আবাস যা আমি নির্ধারিত করি তাদের জন্য যারা এই পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।' ৪৪৯
অল্প কিছু পরেই চাকর মুযাহিম দেখে খলীফা ঘাড় কাৎ করে পড়ে আছেন। সে চিৎকার দিয়ে উঠলে স্ত্রী ও মাসলামা ছুটে গিয়ে তাঁকে মৃত পান। মুখ কিবলার দিকে, একটি হাত মুখের উপর এবং আরেকটি হাত চোখের উপর রাখা। এভাবেই দুনিয়া থেকে বিদায় নেন হিজরী দ্বিতীয় শতকের প্রথম বছরে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বেশী সৎ, আল্লাহভীরু ও মর্যাদাবান মানুষটি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'ঊন। সেটা ছিল হিজরী ১০১ সনের রজব মাসের ২০, মতান্তরে ২৪ অথবা ২৫ তারিখ, খ্রী. ৭১৯ সন। ৪৫০ তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর কয়েক মাস, মতান্তরে ৪০ বছর কয়েক মাস। মোট দুই বছর পাঁচ মাস খিলাফতের মসনদে আসীন ছিলেন। খুনাসিরা মতান্তরে দায়রু সাম'আন-এ তাঁকে দাফন করা হয়। ৪৫১ মাসলামা ইবন 'আবদিল মালিক তাঁর জানাযার নামায পড়ান। ৪৫২
টিকাঃ
৪৪৬. প্রাগুক্ত-৫/২৯৯; আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৩২, ৪৪০
৪৪৭. আল-কামিল ফিল লুগাহ্ ওয়াল আদাব-১/১৩৯-১৪০
৪৪৮. তাবাকাত-৫/৩০০; ইবনুল জাওযী-২৮২
৪৪৯. আল-কামিল ফিত তারীখ-৫/৬২
৪৫০. ড. 'উমার ফাররূখ, তারীখুল আদাব আল-'আরাবী-১/৬০৫
৪৫১. তাবাকাত-৫/৩০১-৩০২; আল-কামিল ফিত তারীখ-২/৬২
৪৫২. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৮
📄 পরবর্তী খলীফা
তিনি ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিককে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে যান। অবশ্য একথাই সঠিক যে, তাঁর পূর্ববর্তী খলীফা সুলায়মান 'উমারের পরে ইয়াযীদকে মনোনীত করে যান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি বলেছিলেন: ৪৫৩ 'বিষয়টি যদি আমার হাতে থাকতো তাহলে আমি মায়মূন ইবন মিত্রান ও কাসিম ইবন মুহাম্মাদকে মনোনীত করতাম।'
টিকাঃ
৪৫৩. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৮
📄 সন্তান
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) চার স্ত্রী ছিলেন। প্রত্যেকেরই সন্তান ছিল। লুমাইস বিন্ত 'আলীর ছিল তিন সন্তান 'আবদুল্লাহ, বাকর ও উম্মু 'আম্মার। উম্মু 'উছমান বিন্ত শুআইবের ছিল এক ছেলে- ইবরাহীম। ফাতিমা বিন্ত 'আবদিল মালিকের ছিল তিন ছেলে- ইসহাক, ইয়া'কূব ও মূসা। আর উম্মু ওয়ালীদের ছিল নয় ছেলে-মেয়ে। যথা: 'আবদুল মালিক, ওয়ালীদ, 'আসিম, ইয়াযীদ, 'উবায়দুল্লাহ, 'আবদুল 'আযীয, যাবানা, আমাতা ও উম্মু 'আবদিল্লাহ। আল-ইয়া'কূবী বলেন, মৃত্যুর সময় তিনি নয়জন পুত্র সন্তান রেখে যান। ৪৫৪ তাঁর জীবদ্দশায় অতি আদরের ছেলে 'আবদুল মালিকের মৃত্যু হয়। তিনি নিজ হাতে তাকে কবরে নামিয়ে মাটি সমান করেন। কবরের উপর মাথা ও পায়ের দিকে যয়তুনের দু'টি ডাল গেড়ে দেন। মানুষ তখন 'উমারকে ঘিরে ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে মৃত ছেলের উদ্দেশ্যে নিম্নের কথাগুলো উচ্চারণ করেন:
رحمك الله يا بنى ، فقد كنت برا بأبيك ، والله مازلت من وهبك الله لى بك مسرورا ولا و الله ما كنتُ قط أشدّ سرورا بك، ولا أرجى لحظى من الله فيك، مذوضعتك في الموضع الذي صيرك الله إليه ، فغفر الله لك ذنبك، وجازاك بأحسن عملك، وتجاوز عن سيئاتك، وحم الله كل شافع يشفع لك بخير من شاهد أو غائب، رضينا بقضاء الله، وسلمنا لأمره ، والحمد لله رب العالمين.
'আমার ছেলে! আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন। তুমি তোমার পিতার বাধ্য ছিলে। আল্লাহর কসম! আল্লাহ তোমাকে দান করার পর থেকে আমি তোমাকে নিয়ে সবসময় খুশী ছিলাম। আল্লাহর কসম! কখনো সে খুশী মাত্রাতিরিক্ত ছিল না। আল্লাহ যেখানে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছেন সেখানে তোমাকে রাখার পর তোমার মধ্যে আমার জন্য আল্লাহর নিকট কিছুই প্রত্যাশা করি না। আল্লাহ তোমার গুনাহ্ মাফ করুন, তোমার ভালো কাজের বদলা দিন এবং খারাপ কাজ উপেক্ষা করুন। দূরের ও নিকটের যে কেউ তোমার জন্য সুপারিশ করেন, আল্লাহ এমন সকল সুপারিশকারীকে দয়া করুন। আমরা আল্লাহর ফয়সালায় রাজি এবং তাঁর ইচ্ছা ও আদেশকে মেনে নিয়েছি। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের জন্য সকল প্রশংসা।'
টিকাঃ
৪৫৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৮২; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২১৭
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) চার স্ত্রী ছিলেন। প্রত্যেকেরই সন্তান ছিল। লুমাইস বিন্ত 'আলীর ছিল তিন সন্তান 'আবদুল্লাহ, বাকর, ও উম্মু 'আম্মার। উম্মু 'উছমান বিন্ত শুআইবের ছিল এক ছেলে- ইবরাহীম। ফাতিমা বিন্ত 'আবদিল মালিকের ছিল তিন ছেলে- ইসহাক, ইয়া'কূব ও মূসা। আর উম্মু ওয়ালীদের ছিল নয় ছেলে-মেয়ে। যথা: 'আবদুল মালিক, ওয়ালীদ, 'আসিম, ইয়াযীদ, 'উবায়দুল্লাহ, 'আবদুল 'আযীয, যাবানা, আমাতা ও উম্মু 'আবদিল্লাহ। আল-ইয়া'কূবী বলেন, মৃত্যুর সময় তিনি নয়জন পুত্র সন্তান রেখে যান। ৪৫৪
অতিপ্রিয় সন্তান 'আবদুল মালিক তাঁর জীবদ্দশায় অল্প বয়সে ইনতিকাল করেন। এই 'আবদুল মালিক ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান, আল্লাহভীরু, পার্থিব ভোগ-বিলাস বিমুখ উঁচু পর্যায়ের তাপস ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে আলোকিত একজন মানুষ। শামের কিছু ইসলামী ব্যক্তিত্ব বর্ণনা করেছেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) তাঁর ছেলে 'আবদুল মালিককে দেখেই 'ইবাদত-বন্দেগীর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সায়্যার ইবন আল-হাকাম বলেন, 'আবদুল মালিক তাঁর পিতা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অপেক্ষা উত্তম ছিলেন। ৫৬৩ মায়মূন ইবন মিহরান বলেন, আমি এক বাড়ীতে তিনজন ভালো মানুষ থাকে, এর চাইতে ভালো বাড়ী আর দেখিনি। তাঁদের একজন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয, দ্বিতীয়জন তাঁর ছেলে 'আবদুল মালিক এবং তৃতীয়জন তাঁদের দাস মুযাহিম।
নও-জোয়ান 'আবদুল মালিক শত্রু বাহিনীর সাথে মুসলিম মুজাহিদদের সংঘাত-সংঘর্ষ হয় এমন এক স্থানে বসবাস করা পছন্দ করতেন। তাই তিনি দারুল খিলাফা দিমাশ্ক ছেড়ে সিরিয়া সীমান্তে এসে বসবাস করতে থাকেন। পিতা 'উমারের তাঁর যোগ্যতা, সততা ও খোদাভীতির উপর পূর্ণ আস্থা থাকা সত্ত্বেও দূরে অবস্থানকারী পুত্রের জন্য দুশ্চিন্তায় থাকতেন। মায়মূন ইবন মাহরান বলেন, একদিন 'উমার তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন: মায়মূন! আমার পুত্র 'আবদুল মালিক আমার চোখের একটি শোভা ও সৌন্দর্য। আপনি একটু তার কাছে যান এবং তাকে একটু পরীক্ষা করুন। আমি তাঁর ঠিকানায় পৌঁছলাম। দেখলাম তিনি তরুণ যুবক। সতেজ, দীপ্তিমান ও ভীষণ বিনয়ী। আমি বাপ-বেটার চিন্তা ও কথার মিল দেখে বিস্মিত হলাম।
'আবদুল মালিক পিতার জীবদ্দশায় প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পিতা 'উমার (রহ) লাশের নিকট গিয়ে বলেন: ছেলে! দুনিয়াতে তুমি তেমনই ছিলে যেমন আল্লাহ বলেছেন: 'ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা ও সৌন্দর্য।' আর তুমি ছিলে দুনিয়ার সর্বোত্তম শোভা। আমি আশা করি তুমি আজ থেকে চিরস্থায়ী সৎকর্মসমূহের মধ্যে পরিগণিত হয়েছো, যার প্রতিদান সবচেয়ে বড়। ৫৬৭
টিকাঃ
৪৫৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৮২; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২১৭
৫৬৩. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৮৪
৫৬৪. সূরা আশ-শু'আরা': ২০৫-২০৭
৫৬৫. সিফাতুস সাফওয়া-২/১১৩-১২৬; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৯৩
৫৬৬. প্রাগুক্ত
৫৬৭. সীরাতু ইবন 'আবদিল হাকাম-১১৬
৫৬৮. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/৩০৩, ৩১১
৫৬৯. প্রাগুক্ত
৫৭০. প্রাগুক্ত
৫৭১. ফুতুহ আল-বুলদান-৩৭৭
৫৭২. ইবনুল জাওযী-৩৩৮; 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৩৯৭