📄 তাঁর ফিক্হ ও ফাতওয়া বিষয়ক জ্ঞানের কিছু দৃষ্টান্ত
'উমার ছিলেন একজন মহান তাবি'ঈ। তাঁর গভীর জ্ঞান ও সূক্ষ্ম অনুধাবন ক্ষমতা ইসলামী শরী'আতের প্রাণসত্তা বুঝতে, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। শরী'আতের বিধিবিধানের বিভিন্ন কারণ ও গূঢ় রহস্য সম্পর্কে যে কত গভীর জ্ঞান রাখতেন তা বুঝা যায় তাঁর জীবন-ইতিহাস, কর্ম-পদ্ধতি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের নিকট তাঁর পত্রাদি পর্যালোচনা দ্বারা। যেমন ইমাম আদ-দারিমী ইমাম আল-আওযা'ঈ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
كتب عمر بن عبد العزيز أنه لا رأى لأحد في كتاب الله، وإنما رأى الأئمة فيما لم ينزل فيه كتاب ولم تمض به سنة من رسول الله صلى الله عليه وسلم ولا رأى لأحد في سنة سنها رسول الله صلى الله عليه وسلم . ৪০৭
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একটি পত্রে লেখেন, আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে কারো কোন মতামত দেওয়ার অধিকার নেই। ইমামদের মতামত কেবল সেই সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে ব্যাপারে আল্লাহর কিতাবে নাযিলকৃত কিছু নেই এবং নেই কোন দিক-নির্দেশনা রাসূলুল্লাহর সুন্নাতেও। রাসূলুল্লাহ (সা) প্রবর্তিত সুন্নাতের ব্যাপারেও কারো মতামত দানের অধিকার নেই।'
তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বোধ ও বুদ্ধিমত্তার মানুষ ছিলেন। ইসলামী বিধিবিধানের বিভিন্ন শাখায় ছিল গভীর অন্তর্দৃষ্টি। বুদ্ধি-বিবেক ও কিয়াসের ভিত্তিতে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বের করার সীমাহীন যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। এ কারণে তাঁকে "মুজতাহিদ ইমাম" অভিধায় ভূষিত করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ তাঁর কিছু গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত এখানে উপস্থাপন করা হলো:
১. 'তিলা' পানের ব্যাপারে তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
'তিলা' (الطلاء) হলো আঙ্গুল ছাড়া অন্য কোন কিছু ভিজানো পানি, যা পান করলে নেশার উদ্রেক করে। ইবন 'আওন বলেন: 'ইবন সীরীনকে যখন 'তিলা' পানের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন: সত্য-সঠিক পথের অনুসারী ইমাম অর্থাৎ 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তা পান করতে নিষেধ করেছেন।' এ ব্যাপারে 'উমারের যুক্তি হলো, এই 'তিলা'র মধ্যে মুসলমানদের কোন কল্যাণ নেই। 'তিলা' নামে যা বুঝানো হয় আসলে তা মদ (খমর)। এর পরিবর্তে আল্লাহ তা'আলা বহু হালাল পানীয় আমাদেরকে দান করেছেন। সুতরাং নেশাদায়ক পানীয়কে হারাম বিশ্বাস করে তা পান থেকে বিরত থাকা মুসলমানদের উচিত। কারণ, মদ সকল পাপের সদর দরজা। এই 'তিলা' পান করতে করতে এক সময় মুসলিম সমাজ ব্যাপকভাবে মাদকদ্রব্য পানে আসক্ত হওয়ার আশংকার হয়। ৪০৮
২. তিনি নামাযে জোরে 'বিসমিল্লাহ' পাঠ করতেন না।
'আবদুল হাকীম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন আবী ফারওয়া বলেন: 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মদীনায় আমাদের নামাযের ইমামতি করতেন। তিনি জোরে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' পড়তেন না। ৪০৯
৩. সাহু সিজদা সালামের পরে করা।
মুহাম্মাদ ইবন মুহাজির থেকে বর্ণিত। তিনি সাহু সিজদার ব্যাপারে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে লক্ষ্য করে ইমাম যুহরীকে বলতে শোনেন যে, উহা সালামের পূর্বে। কিন্তু 'উমার তা মানতে অস্বীকার করেন এবং বলেন, ওহে ইবন শিহাব! এ ব্যাপারে আবু সালামা ইবন 'আবদির রহমান আমাদেরকে অবহিত করেছেন। মতান্তরে তিনি যুহ্রীকে বলেন: আমাদের সামনে আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান ইবন 'আওফ একথা মানতে অস্বীকার করেছেন। ৪১০
বিশ্বস্ত লোকদের মুখ থেকে তিনি যা শুনেছিলেন তার প্রতি এবং নিজের গভীর চিন্তা-গবেষণার প্রতি কি পরিমাণ আস্থা থাকলে ইমাম যুহরীর মতো মানুষের মত ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন তা ভেবে দেখার বিষয়।
৪. মৃত জন্তুর হাড় অপবিত্র।
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের এক দাসী বলেন: একবার 'উমার আমাকে তেল আনতে বললেন। আমি তেল ও হাতীর হাড়ের একটি চিরুনী নিয়ে আসলাম। তিনি চিরুনীটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, এটা মৃত জন্তুর অংশ। আমি বললাম: এটা মৃত হলো কিভাবে? বললেন: তোমার জন্য আফসোস! হাতীটি কে জবাই করেছিল? ৪১১
উল্লেখ যে, এটা একটি মতবিরোধমূলক মাসয়ালা। ইমাম যুহরী হাতী বা এ জাতীয় মৃত জন্তু-জানোয়ারের হাড় সম্পর্কে বলেন : আমি পূর্ববর্তী বহু আলিমকে পেয়েছি যাঁরা এ রকম হাড়ের তৈরি চিরুনী দ্বারা চুল আঁচড়িয়েছেন এবং এ রকম হাড়ের পাত্রে তেল রেখে ব্যবহার করেছেন। কোন রকম দোষ মনে করেননি। ৪১২
৫. অর্থের বিনিময়ে মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা। তিনি এ কাজ বৈধ মনে করতেন। বায়তুল মালের অর্থ দিয়ে মাঝে মাঝে এ কাজ করেছেন। এ লক্ষ্যে একবার এক বিশপকে এক লক্ষ দীনার দান করেন। ৪১৩
৬. মুরতাদ ব্যক্তিকে তাওবার সুযোগ দান। রাবী'আ ইবন 'আতা' 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : মুরতাদ ব্যক্তিকে তিন দিন পর্যন্ত তাওবা করতে বলা হবে। যদি তাওবা করে তাহলে ভালো, অন্যথায় তার শিরচ্ছেদ করা হবে। ৪১৪
৭. কারারুদ্ধ ব্যক্তির স্ত্রীর বিয়ে। এ বিষয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন : কারারুদ্ধ ব্যক্তি যতদিন কারাগারে থাকবে তার স্ত্রীকে বিয়ে করা যাবে না। ৪১৫
৮. মধুর যাকাত দিতে হবে না। ইমাম বুখারী বলেন : 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মধুতে যাকাত আছে বলে মনে করেননি। ইমাম মালিক তাঁর “আল-মুওয়াত্তা” গ্রন্থে 'আবদুল্লাহ ইবন আবী বকর ইবন হাযম থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : আমার পিতার নিকট 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের একটি পত্র আসে। তখন তিনি মিনায়। তাতে লেখা ছিল, ঘোড়া ও মধুতে যাকাত নেই। ৪১৬ 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) দাস নাফে' বলেন : 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আমাকে ইয়ামনে পাঠালেন। আমি সেখানে মধুর 'উশর (এক দশমাংশ) গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। তখন মুগীরা ইবন হাকীম আস-সান'আনী আমাকে বললেন : মধুর যাকাত নেই। আমি বিষয়টি জানিয়ে 'উমারকে পত্র লিখলাম। জবাবে তিনি লিখলেন : মুগীরা সত্য বলেছেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ, মধুতে কিছু নেই। ৪১৭ তবে একটি দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, 'উমার মধুতে 'উশর আছে বলে মনে করতেন। ৪১৮
৯. তাঁর মতে ছোলা, মটর কলাই, মসুরি, শিমজাতীয় শস্যের বীচি ইত্যাদির যাকাত দিতে হবে।
ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয লেখেন: ছোলা ও মসুরির যাকাত গ্রহণ করা হোক।
ইয়াযীদ ইবন আবী মালিক তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয থেকে বর্ণনা করেছেন। তাঁর খাতায় লেখা ছিল: শিম জাতীয় শস্যের বীচির যাকাত গ্রহণ করতে হবে, যেভাবে গম-যব থেকে গ্রহণ করা হয়। ৪১৯
১০. ব্যবসায়ীর লাভের অর্থের উপর এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত যাকাত দিতে হবে না।
কাতন ইবন ফুলান বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময় আমি একবার ওয়াসিত গেলাম। সেখানকার লোকেরা আমাকে বললো, আমাদেরকে আমীরুল মু'মিনীনের একটি পত্র পাঠ করে শোনানো হয়েছে এবং তাতে লেখা আছে: তোমরা ব্যবসায়ীর লাভের থেকে কোন কিছু গ্রহণ করবে না, যতক্ষণ না তা এক বছর পূর্ণ হবে। ইবন 'আওন বলেন, আমি মসজিদে গেলাম। শুনলাম, আমি যাওয়ার পূর্বেই একটি পত্র পাঠ করে শোনানো হয়েছে। আমার পাশের লোকটি আমাকে বললো, ব্যবসায়ীর লাভের ব্যাপারে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পত্রটি পাঠের সময় যদি আপনি উপস্থিত থাকতেন! তিনি লিখেছেন, এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত লাভের অর্থ থেকে কোন কিছু গ্রহণ করা যাবে না।
ইমাম মালিকের মতে লাভকে মূলধনের সাথে যোগ করতে হবে। আবূ 'উবায়িদ বলেন, এ ব্যাপারে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যা বলেছেন তাই আমাদের মত। আর তিনি বলেছেন, এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত লাভের অর্থের যাকাত দিতে হবে না। ইমাম লাইছও এমন কথাই বলেছেন।
১১. মহিষের যাকাত
ইবন শিহাব বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয লেখেন: গরুর যাকাত যেভাবে গ্রহণ করা হয় মহিষের যাকাতও সেভাবে গ্রহণ করতে হবে। ৪২০
১২. যিম্মীর জিযিয়া গ্রহণ করার পূর্ব মুহূর্তে যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তা রহিত হয়ে যাবে। 'আমর ইবন আল-মুহাজির 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, বছর পূর্ণ হওয়ার একদিন পূর্বেও যদি কোন যিম্মী মুসলমান হয় তাহলে তার থেকে জিযিয়া নেওয়া যাবে না।
সুওয়াইদ ইবন হুসায়ন বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয লেখেন: জিযিয়া যদি পাল্লার এক প্রান্তে থাকে, আর তখন যিম্মী মুসলমান হয়ে যায়, তাহলেও তার নিকট থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা যাবে না। ৪২১
টিকাঃ
৪০৭. সুনান আদ-দারিমী-১/১২৫-১২৬
৪০৮. ইবনুল জাওযী-৭৪; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১৩০; হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/২৫৭
৪০৯. তাবাকাত-৫/৩৩৫
৪১০. ফিকহুস সুন্নাহ-১/২২৫
৪১১. তাবাকাত-৫/৪০১
৪১২. ফিকহুস সুন্নাহ-১/২৪
৪১৩. তাবাকাত-৫/৩৫০
৪১৪. প্রাগুক্ত; ফিকহুস সুন্নাহ-২/৪৫৭-৪৫৯
৪১৫. তাবাকাত-৫/৩৫১
৪১৬. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৮৯
৪১৭. ফাতহুল বারী-৩/৩৪৭-৩৪৮; আল-আমওয়াল-৩০০
৪১৮. ফিকহুস সুন্নাহ-১/৩৬২-৩৬৩
৪১৯. প্রাগুক্ত-১/৩৪৭-৩৬১; 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৯০
৪২০. তাবাকাত-৫/৩৫৩
৪২১. প্রাগুক্ত
'উমার ছিলেন একজন মহান তাবি'ঈ। তাঁর গভীর জ্ঞান ও সূক্ষ্ম অনুধাবন ক্ষমতা ইসলামী শরী'আতের প্রাণসত্তা বুঝতে, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। শরী'আতের বিধিবিধানের বিভিন্ন কারণ ও গূঢ় রহস্য সম্পর্কে যে কত গভীর জ্ঞান রাখতেন তা বুঝা যায় তাঁর জীবন-ইতিহাস, কর্ম-পদ্ধতি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের নিকট তাঁর পত্রাদি পর্যালোচনা দ্বারা। যেমন ইমাম আদ-দারিমী ইমাম আল-আওযা'ঈ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
كتب عمر بن عبد العزيز أنه لا رأى لأحد في كتاب الله، وإنما رأى الأئمة فيما لم ينزل فيه كتاب ولم تمض به سنة من رسول الله صلى الله عليه وسلم ولا رأى لأحد في سنة سنها رسول الله صلى الله عليه وسلم . ৪০৭
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একটি পত্রে লেখেন, আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে কারো কোন মতামত দেওয়ার অধিকার নেই। ইমামদের মতামত কেবল সেই সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে ব্যাপারে আল্লাহর কিতাবে নাযিলকৃত কিছু নেই এবং নেই কোন দিক-নির্দেশনা রাসূলুল্লাহর সুন্নাতেও। রাসূলুল্লাহ (সা) প্রবর্তিত সুন্নাতের ব্যাপারেও কারো মতামত দানের অধিকার নেই।'
তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বোধ ও বুদ্ধিমত্তার মানুষ ছিলেন। ইসলামী বিধিবিধানের বিভিন্ন শাখায় ছিল গভীর অন্তর্দৃষ্টি। বুদ্ধি-বিবেক ও কিয়াসের ভিত্তিতে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বের করার সীমাহীন যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। এ কারণে তাঁকে "মুজতাহিদ ইমাম" অভিধায় ভূষিত করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ তাঁর কিছু গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত এখানে উপস্থাপন করা হলো:
১. 'তিলা' পানের ব্যাপারে তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
'তিলা' (الطلاء) হলো আঙ্গুল ছাড়া অন্য কোন কিছু ভিজানো পানি, যা পান করলে নেশার উদ্রেক করে। ইবন 'আওন বলেন: 'ইবন সীরীনকে যখন 'তিলা' পানের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন: সত্য-সঠিক পথের অনুসারী ইমাম অর্থাৎ 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তা পান করতে নিষেধ করেছেন।' এ ব্যাপারে 'উমারের যুক্তি হলো, এই 'তিলা'র মধ্যে মুসলমানদের কোন কল্যাণ নেই। 'তিলা' নামে যা বুঝানো হয় আসলে তা মদ (খমর)। এর পরিবর্তে আল্লাহ তা'আলা বহু হালাল পানীয় আমাদেরকে দান করেছেন। সুতরাং নেশাদায়ক পানীয়কে হারাম বিশ্বাস করে তা পান থেকে বিরত থাকা মুসলমানদের উচিত। কারণ, মদ সকল পাপের সদর দরজা। এই 'তিলা' পান করতে করতে এক সময় মুসলিম সমাজ ব্যাপকভাবে মাদকদ্রব্য পানে আসক্ত হওয়ার আশংকার হয়। ৪০৮
২. তিনি নামাযে জোরে 'বিসমিল্লাহ' পাঠ করতেন না।
'আবদুল হাকীম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন আবী ফারওয়া বলেন: 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মদীনায় আমাদের নামাযের ইমামতি করতেন। তিনি জোরে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' পড়তেন না। ৪০৯
৩. সাহু সিজদা সালামের পরে করা।
মুহাম্মাদ ইবন মুহাজির থেকে বর্ণিত। তিনি সাহু সিজদার ব্যাপারে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে লক্ষ্য করে ইমাম যুহরীকে বলতে শোনেন যে, উহা সালামের পূর্বে। কিন্তু 'উমার তা মানতে অস্বীকার করেন এবং বলেন, ওহে ইবন শিহাব! এ ব্যাপারে আবু সালামা ইবন 'আবদির রহমান আমাদেরকে অবহিত করেছেন। মতান্তরে তিনি যুহ্রীকে বলেন: আমাদের সামনে আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান ইবন 'আওফ একথা মানতে অস্বীকার করেছেন। ৪১০
বিশ্বস্ত লোকদের মুখ থেকে তিনি যা শুনেছিলেন তার প্রতি এবং নিজের গভীর চিন্তা-গবেষণার প্রতি কি পরিমাণ আস্থা থাকলে ইমাম যুহরীর মতো মানুষের মত ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন তা ভেবে দেখার বিষয়।
৪. মৃত জন্তুর হাড় অপবিত্র।
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের এক দাসী বলেন: একবার 'উমার আমাকে তেল আনতে বললেন। আমি তেল ও হাতীর হাড়ের একটি চিরুনী নিয়ে আসলাম। তিনি চিরুনীটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, এটা মৃত জন্তুর অংশ। আমি বললাম: এটা মৃত হলো কিভাবে? বললেন: তোমার জন্য আফসোস! হাতীটি কে জবাই করেছিল? ৪১১
উল্লেখ যে, এটা একটি মতবিরোধমূলক মাসয়ালা। ইমাম যুহরী হাতী বা এ জাতীয় মৃত জন্তু-জানোয়ারের হাড় সম্পর্কে বলেন : আমি পূর্ববর্তী বহু আলিমকে পেয়েছি যাঁরা এ রকম হাড়ের তৈরি চিরুনী দ্বারা চুল আঁচড়িয়েছেন এবং এ রকম হাড়ের পাত্রে তেল রেখে ব্যবহার করেছেন। কোন রকম দোষ মনে করেননি। ৪১২
৫. অর্থের বিনিময়ে মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা। তিনি এ কাজ বৈধ মনে করতেন। বায়তুল মালের অর্থ দিয়ে মাঝে মাঝে এ কাজ করেছেন। এ লক্ষ্যে একবার এক বিশপকে এক লক্ষ দীনার দান করেন। ৪১৩
৬. মুরতাদ ব্যক্তিকে তাওবার সুযোগ দান। রাবী'আ ইবন 'আতা' 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : মুরতাদ ব্যক্তিকে তিন দিন পর্যন্ত তাওবা করতে বলা হবে। যদি তাওবা করে তাহলে ভালো, অন্যথায় তার শিরচ্ছেদ করা হবে। ৪১৪
৭. কারারুদ্ধ ব্যক্তির স্ত্রীর বিয়ে। এ বিষয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বলেন : কারারুদ্ধ ব্যক্তি যতদিন কারাগারে থাকবে তার স্ত্রীকে বিয়ে করা যাবে না। ৪১৫
৮. মধুর যাকাত দিতে হবে না। ইমাম বুখারী বলেন : 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মধুতে যাকাত আছে বলে মনে করেননি। ইমাম মালিক তাঁর “আল-মুওয়াত্তা” গ্রন্থে 'আবদুল্লাহ ইবন আবী বকর ইবন হাযম থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : আমার পিতার নিকট 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের একটি পত্র আসে। তখন তিনি মিনায়। তাতে লেখা ছিল, ঘোড়া ও মধুতে যাকাত নেই। ৪১৬ 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) দাস নাফে' বলেন : 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আমাকে ইয়ামনে পাঠালেন। আমি সেখানে মধুর 'উশর (এক দশমাংশ) গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। তখন মুগীরা ইবন হাকীম আস-সান'আনী আমাকে বললেন : মধুর যাকাত নেই। আমি বিষয়টি জানিয়ে 'উমারকে পত্র লিখলাম। জবাবে তিনি লিখলেন : মুগীরা সত্য বলেছেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ, মধুতে কিছু নেই। ৪১৭ তবে একটি দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, 'উমার মধুতে 'উশর আছে বলে মনে করতেন। ৪১৮
৯. তাঁর মতে ছোলা, মটর কলাই, মসুরি, শিমজাতীয় শস্যের বীচি ইত্যাদির যাকাত দিতে হবে।
ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয লেখেন: ছোলা ও মসুরির যাকাত গ্রহণ করা হোক।
ইয়াযীদ ইবন আবী মালিক তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয থেকে বর্ণনা করেছেন। তাঁর খাতায় লেখা ছিল: শিম জাতীয় শস্যের বীচির যাকাত গ্রহণ করতে হবে, যেভাবে গম-যব থেকে গ্রহণ করা হয়। ৪১৯
১০. ব্যবসায়ীর লাভের অর্থের উপর এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত যাকাত দিতে হবে না।
কাতন ইবন ফুলান বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময় আমি একবার ওয়াসিত গেলাম। সেখানকার লোকেরা আমাকে বললো, আমাদেরকে আমীরুল মু'মিনীনের একটি পত্র পাঠ করে শোনানো হয়েছে এবং তাতে লেখা আছে: তোমরা ব্যবসায়ীর লাভের থেকে কোন কিছু গ্রহণ করবে না, যতক্ষণ না তা এক বছর পূর্ণ হবে। ইবন 'আওন বলেন, আমি মসজিদে গেলাম। শুনলাম, আমি যাওয়ার পূর্বেই একটি পত্র পাঠ করে শোনানো হয়েছে। আমার পাশের লোকটি আমাকে বললো, ব্যবসায়ীর লাভের ব্যাপারে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পত্রটি পাঠের সময় যদি আপনি উপস্থিত থাকতেন! তিনি লিখেছেন, এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত লাভের অর্থ থেকে কোন কিছু গ্রহণ করা যাবে না।
ইমাম মালিকের মতে লাভকে মূলধনের সাথে যোগ করতে হবে। আবূ 'উবায়িদ বলেন, এ ব্যাপারে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যা বলেছেন তাই আমাদের মত। আর তিনি বলেছেন, এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত লাভের অর্থের যাকাত দিতে হবে না। ইমাম লাইছও এমন কথাই বলেছেন।
১১. মহিষের যাকাত
ইবন শিহাব বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয লেখেন: গরুর যাকাত যেভাবে গ্রহণ করা হয় মহিষের যাকাতও সেভাবে গ্রহণ করতে হবে। ৪২০
১২. যিম্মীর জিযিয়া গ্রহণ করার পূর্ব মুহূর্তে যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তা রহিত হয়ে যাবে। 'আমর ইবন আল-মুহাজির 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, বছর পূর্ণ হওয়ার একদিন পূর্বেও যদি কোন যিম্মী মুসলমান হয় তাহলে তার থেকে জিযিয়া নেওয়া যাবে না।
সুওয়াইদ ইবন হুসায়ন বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয লেখেন: জিযিয়া যদি পাল্লার এক প্রান্তে থাকে, আর তখন যিম্মী মুসলমান হয়ে যায়, তাহলেও তার নিকট থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা যাবে না। ৪২১
টিকাঃ
৪০৭. সুনান আদ-দারিমী-১/১২৫-১২৬
৪০৮. ইবনুল জাওযী-৭৪; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১৩০; হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/২৫৭
৪০৯. তাবাকাত-৫/৩৩৫
৪১০. ফিকহুস সুন্নাহ-১/২২৫
৪১১. তাবাকাত-৫/৪০১
৪১২. ফিকহুস সুন্নাহ-১/২৪
৪১৩. তাবাকাত-৫/৩৫০
৪১৪. প্রাগুক্ত; ফিকহুস সুন্নাহ-২/৪৫৭-৪৫৯
৪১৫. তাবাকাত-৫/৩৫১
৪১৬. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৮৯
৪১৭. ফাতহুল বারী-৩/৩৪৭-৩৪৮; আল-আমওয়াল-৩০০
৪১৮. ফিকহুস সুন্নাহ-১/৩৬২-৩৬৩
৪১৯. প্রাগুক্ত-১/৩৪৭-৩৬১; 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৯০
৪২০. তাবাকাত-৫/৩৫৩
৪২১. প্রাগুক্ত
📄 তাঁর বিচার ও রায়
আমাদের পূর্বের আলোচনা থেকে হাদীছ ও ফিকহ বিষয়ে 'উমারের গভীর জ্ঞান ও ইসলামের বিধি বিধানের প্রাণসত্তা সম্পর্কে তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার কিছুটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানে তাঁর বিচার-ফয়সালা ও রায় সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করে এ প্রসঙ্গটির সমাপ্তি টানবো। ইসলামী শরী'আতের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও প্রাণসত্তা সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞানের কারণে মানুষের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ নিষ্পত্তি ও বিচার-ফয়সালার ক্ষেত্রে সবসময় তিনি সঠিক রায়টি প্রদান করতে সক্ষম হয়েছেন। আমাদের একথার স্বপক্ষে ইমাম আল-লাইছ ইবন সা'দের বর্ণনাটি উপস্থাপন করাই যথেষ্ট হবে বলে মনে করি। তিনি বলেন: ৪২২
'কাদিম আল-বারবারী আমাকে বলেছেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মদীনায় থাকাকালে যে সকল বিচার-ফয়সালা করেন সে ব্যাপারে তিনি রাবী'আ ইবন আবদির রহমানের সাথে কিছু আলোচনা করেন। এক পর্যায়ে রাবী'আ বলেন: তুমি যেন বলতে চাচ্ছো, তিনি ভুল করেছেন। যাঁর হাতে আমার জীবন, সেই সত্তার শপথ! তিনি কখনো ভুল করেননি।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই রাবী'আ হলেন, মদীনার সেই বিখ্যাত ইমাম, ফকীহ ও মুজতাহিদ। তাঁর সময়ের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম এবং যিনি 'রাবী'আতুর রায়' নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। পূর্বে উল্লেখিত তাঁর মন্তব্যে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের জ্ঞান-গরিমা ও সঠিক রায় ও সিদ্ধান্তের পক্ষে বিরাট সাক্ষ্য।
অপরাধীকে শাস্তি দানের ক্ষেত্রে তাঁর ধৈর্য ও বিচক্ষণতা সম্পর্কে ইমাম আল-আওযা'ঈ বলেন: ৪২৩
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যখন কোন ব্যক্তিকে শাস্তিদানের ইচ্ছা করতেন তখন তিনদিন তাকে আটকে রাখতেন। তারপর শাস্তি দিতেন। রাগের প্রথম পর্যায়ে তাড়াহুড়ো করে শাস্তি দান পছন্দ না করার কারণে এমন করতেন।'
বিচার কাজ পরিচালনা ও রায় দানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ভীষণ বিনয়ী। রায় দানের পরেও ভুল বুঝতে পারলে খুব সহজেই পূর্ববর্তী রায় থেকে ফিরে আসতেন। প্রকাশিত সত্যের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিতেন। 'আবদুর রহমান ইবন আল-হাসান আল-আযরুকী তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি একবার 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের দরবারে বসা ছিলেন। তখন কুরায়শদের পরস্পর বিবদমান দু'টি দল নিজেদের বিবাদ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে সেখানে উপস্থিত হয়। 'উমার উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সিদ্ধান্ত দিলেন। তখন রায়টি যার বিপক্ষে গেল সে বললো: আমার একটি প্রমাণ আছে যা উপস্থিত করা হয়নি। 'উমার বললেন: আমি যখন দেখেছি সত্য তোমার প্রতিপক্ষের দিকে আছে তখন সিদ্ধান্ত দানে বিলম্ব করতে পারিনে। তবে তুমি দ্রুত চলে যাও এবং তোমার প্রমাণ উপস্থিত কর। যদি দেখি সত্য তোমার পক্ষে, তাহলে আমি হবো প্রথম ব্যক্তি যে তার পূর্ববর্তী রায়কে বাতিল করে নতুন রায় দিবে। ৪২৪
তিনি আরো বলতেন: একটি মাটির ঢেলা টুকরো টুকরো করে ফেলা, অথবা একটি পত্র পাঠানোর পর তা আবার ফিরিয়ে আনার চেয়ে আমার একটি বিচারের রায় টুকরো টুকরো ফেলা আমার নিকট অধিক সহজ, যখন আমি দেখতে পাই যে, সত্য আমার প্রদত্ত রায়ের বিপক্ষে রয়েছে। ৪২৫
এ প্রসঙ্গে আরেকটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে আমাদের বক্তব্য শেষ করছি। ইমাম শাফি'ঈ (রহ) তাঁর নিজস্ব সনদে মাখলাদ ইবন খুফাফ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি একটি দাস খরিদ করে কিছু আয়ের জন্য তাকে কাজে লাগালাম। কয়েকদিন পর দাসটির দোষ ধরা পড়লো। বিক্রেতার সংগে এ নিয়ে ঝগড়া হলো। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য আমি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে বিচারক মানলাম। তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে দাসটি এবং আমার যিম্মাদারিতে থাকা অবস্থায় তার আয়ের অর্থ ফেরত দানের নির্দেশ দিলেন। অপরদিকে বিক্রেতাকেও নির্দেশ দিলেন মূল্য ফেরতদানের জন্য। এরপর আমি গেলাম 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র (রা)-এর নিকট এবং তাকে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, আমি আজ সন্ধ্যায় 'উমারের নিকট যাব এবং তাঁকে জানাবো যে, আয়িশা (রা) আমাকে বলেছেন, রাসূল (সা) এমনই একটি বিচার করেছিলেন এবং রায়ে বলেছিলেন:
'যিম্মাদারির কারণে আয় পাবে যিম্মাদার বা ক্রেতা।' কারণ, এ সময়ে দাসটি মারা গেলে বিক্রেতার উপর কোন কিছুই বর্তাতো না; সবটুকু ক্ষতি হতো ক্রেতার। আমি আবার 'উমারের নিকট গেলাম এবং তাঁকে 'উরওয়ার মুখে শোনা 'আয়িশার (রা) সূত্রে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা) বিচার ও রায়ের কথা জানালাম। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! আমি যে বিচার করেছি, তাতে সত্য ছাড়া আর কোন কিছুই আমার উদ্দেশ্য ছিল না। এখন আমার নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ পৌঁছেছে। আমি 'উমারের সিদ্ধান্ত বাতিল করছি এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিচ্ছি। এরপর 'উরওয়া তাঁর কাছে যান। অতঃপর আমাকে দাসের আয় গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। ৪২৬
টিকাঃ
৪২২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৯৪; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১১৮
৪২৩. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১৩৩; তারীখ আল-খুলাফা'-২৩৬
৪২৪. তাবাকাত-৫/৩৮৬
৪২৫. ইবনুল জাওযী-৯৩
৪২৬. ইমাম শাফি'ঈ (রহ) তাঁর আর-রিসালা-তে এবং আল-বায়হাকী তাঁর 'সুনান' গ্রন্থে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া 'লিসানুল 'আরাব'-১/৮০৮ দ্রঃ।
আমাদের পূর্বের আলোচনা থেকে হাদীছ ও ফিকহ বিষয়ে 'উমারের গভীর জ্ঞান ও ইসলামের বিধি বিধানের প্রাণসত্তা সম্পর্কে তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার কিছুটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানে তাঁর বিচার-ফয়সালা ও রায় সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করে এ প্রসঙ্গটির সমাপ্তি টানবো। ইসলামী শরী'আতের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও প্রাণসত্তা সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞানের কারণে মানুষের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ নিষ্পত্তি ও বিচার-ফয়সালার ক্ষেত্রে সবসময় তিনি সঠিক রায়টি প্রদান করতে সক্ষম হয়েছেন। আমাদের একথার স্বপক্ষে ইমাম আল-লাইছ ইবন সা'দের বর্ণনাটি উপস্থাপন করাই যথেষ্ট হবে বলে মনে করি। তিনি বলেন: ৪২২
'কাদিম আল-বারবারী আমাকে বলেছেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মদীনায় থাকাকালে যে সকল বিচার-ফয়সালা করেন সে ব্যাপারে তিনি রাবী'আ ইবন আবদির রহমানের সাথে কিছু আলোচনা করেন। এক পর্যায়ে রাবী'আ বলেন: তুমি যেন বলতে চাচ্ছো, তিনি ভুল করেছেন। যাঁর হাতে আমার জীবন, সেই সত্তার শপথ! তিনি কখনো ভুল করেননি।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই রাবী'আ হলেন, মদীনার সেই বিখ্যাত ইমাম, ফকীহ ও মুজতাহিদ। তাঁর সময়ের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম এবং যিনি 'রাবী'আতুর রায়' নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। পূর্বে উল্লেখিত তাঁর মন্তব্যে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের জ্ঞান-গরিমা ও সঠিক রায় ও সিদ্ধান্তের পক্ষে বিরাট সাক্ষ্য।
অপরাধীকে শাস্তি দানের ক্ষেত্রে তাঁর ধৈর্য ও বিচক্ষণতা সম্পর্কে ইমাম আল-আওযা'ঈ বলেন: ৪২৩
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যখন কোন ব্যক্তিকে শাস্তিদানের ইচ্ছা করতেন তখন তিনদিন তাকে আটকে রাখতেন। তারপর শাস্তি দিতেন। রাগের প্রথম পর্যায়ে তাড়াহুড়ো করে শাস্তি দান পছন্দ না করার কারণে এমন করতেন।'
বিচার কাজ পরিচালনা ও রায় দানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ভীষণ বিনয়ী। রায় দানের পরেও ভুল বুঝতে পারলে খুব সহজেই পূর্ববর্তী রায় থেকে ফিরে আসতেন। প্রকাশিত সত্যের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিতেন। 'আবদুর রহমান ইবন আল-হাসান আল-আযরুকী তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি একবার 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের দরবারে বসা ছিলেন। তখন কুরায়শদের পরস্পর বিবদমান দু'টি দল নিজেদের বিবাদ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে সেখানে উপস্থিত হয়। 'উমার উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সিদ্ধান্ত দিলেন। তখন রায়টি যার বিপক্ষে গেল সে বললো: আমার একটি প্রমাণ আছে যা উপস্থিত করা হয়নি। 'উমার বললেন: আমি যখন দেখেছি সত্য তোমার প্রতিপক্ষের দিকে আছে তখন সিদ্ধান্ত দানে বিলম্ব করতে পারিনে। তবে তুমি দ্রুত চলে যাও এবং তোমার প্রমাণ উপস্থিত কর। যদি দেখি সত্য তোমার পক্ষে, তাহলে আমি হবো প্রথম ব্যক্তি যে তার পূর্ববর্তী রায়কে বাতিল করে নতুন রায় দিবে। ৪২৪
তিনি আরো বলতেন: একটি মাটির ঢেলা টুকরো টুকরো করে ফেলা, অথবা একটি পত্র পাঠানোর পর তা আবার ফিরিয়ে আনার চেয়ে আমার একটি বিচারের রায় টুকরো টুকরো ফেলা আমার নিকট অধিক সহজ, যখন আমি দেখতে পাই যে, সত্য আমার প্রদত্ত রায়ের বিপক্ষে রয়েছে। ৪২৫
এ প্রসঙ্গে আরেকটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে আমাদের বক্তব্য শেষ করছি। ইমাম শাফি'ঈ (রহ) তাঁর নিজস্ব সনদে মাখলাদ ইবন খুফাফ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি একটি দাস খরিদ করে কিছু আয়ের জন্য তাকে কাজে লাগালাম। কয়েকদিন পর দাসটির দোষ ধরা পড়লো। বিক্রেতার সংগে এ নিয়ে ঝগড়া হলো। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য আমি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে বিচারক মানলাম। তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে দাসটি এবং আমার যিম্মাদারিতে থাকা অবস্থায় তার আয়ের অর্থ ফেরত দানের নির্দেশ দিলেন। অপরদিকে বিক্রেতাকেও নির্দেশ দিলেন মূল্য ফেরতদানের জন্য। এরপর আমি গেলাম 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র (রা)-এর নিকট এবং তাকে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, আমি আজ সন্ধ্যায় 'উমারের নিকট যাব এবং তাঁকে জানাবো যে, আয়িশা (রা) আমাকে বলেছেন, রাসূল (সা) এমনই একটি বিচার করেছিলেন এবং রায়ে বলেছিলেন:
'যিম্মাদারির কারণে আয় পাবে যিম্মাদার বা ক্রেতা।' কারণ, এ সময়ে দাসটি মারা গেলে বিক্রেতার উপর কোন কিছুই বর্তাতো না; সবটুকু ক্ষতি হতো ক্রেতার। আমি আবার 'উমারের নিকট গেলাম এবং তাঁকে 'উরওয়ার মুখে শোনা 'আয়িশার (রা) সূত্রে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা) বিচার ও রায়ের কথা জানালাম। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! আমি যে বিচার করেছি, তাতে সত্য ছাড়া আর কোন কিছুই আমার উদ্দেশ্য ছিল না। এখন আমার নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ পৌঁছেছে। আমি 'উমারের সিদ্ধান্ত বাতিল করছি এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিচ্ছি। এরপর 'উরওয়া তাঁর কাছে যান। অতঃপর আমাকে দাসের আয় গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। ৪২৬
টিকাঃ
৪২২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৯৪; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১১৮
৪২৩. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১৩৩; তারীখ আল-খুলাফা'-২৩৬
৪২৪. তাবাকাত-৫/৩৮৬
৪২৫. ইবনুল জাওযী-৯৩
৪২৬. ইমাম শাফি'ঈ (রহ) তাঁর আর-রিসালা-তে এবং আল-বায়হাকী তাঁর 'সুনান' গ্রন্থে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া 'লিসানুল 'আরাব'-১/৮০৮ দ্রঃ।
📄 গ্রীক গ্রন্থের প্রকাশনা
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের যদিও মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলের প্রচার ও প্রসার এবং সম্ভাব্য সকল পন্থায় তিনি একাজ করেছেনও, তা সত্ত্বেও অন্যান্য জাতির কল্যাণকর জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে মুসলমানদের একেবারে অজ্ঞাতও রাখেননি। 'আহরান আল-কুস' ছিলেন একজন বিখ্যাত গ্রীক চিকিৎসক। চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর তাঁর একখানি বিখ্যাত গ্রন্থ ছিল। খলীফা মারওয়ান ইবন আল-হাকামের সময় 'মাসিরজুয়া' নামক এক ব্যক্তি গ্রন্থটি আরবীতে অনুবাদ করেন। অনূদিত পাণ্ডুলিপিটিসহ গ্রন্থটি সরকারী গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ছিল। সেটি খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের দৃষ্টিতে পড়ে। গ্রন্থটির অনুবাদ মানুষের মাঝে প্রকাশ করা ঠিক হবে কি হবে না, এ ব্যাপারে তিনি চল্লিশ দিন পর্যন্ত আল্লাহর নিকট ইসতিখারা করেন। তারপর সেটি খিলাফতের সর্বত্র ব্যাপকভাবে প্রচার করেন। ৪২৭
টিকাঃ
৪২৭. আখবারুল হুকামা'-২১৩
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের যদিও মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলের প্রচার ও প্রসার এবং সম্ভাব্য সকল পন্থায় তিনি একাজ করেছেনও, তা সত্ত্বেও অন্যান্য জাতির কল্যাণকর জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে মুসলমানদের একেবারে অজ্ঞাতও রাখেননি। 'আহরান আল-কুস' ছিলেন একজন বিখ্যাত গ্রীক চিকিৎসক। চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর তাঁর একখানি বিখ্যাত গ্রন্থ ছিল। খলীফা মারওয়ান ইবন আল-হাকামের সময় 'মাসিরজুয়া' নামক এক ব্যক্তি গ্রন্থটি আরবীতে অনুবাদ করেন। অনূদিত পাণ্ডুলিপিটিসহ গ্রন্থটি সরকারী গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ছিল। সেটি খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের দৃষ্টিতে পড়ে। গ্রন্থটির অনুবাদ মানুষের মাঝে প্রকাশ করা ঠিক হবে কি হবে না, এ ব্যাপারে তিনি চল্লিশ দিন পর্যন্ত আল্লাহর নিকট ইসতিখারা করেন। তারপর সেটি খিলাফতের সর্বত্র ব্যাপকভাবে প্রচার করেন। ৪২৭
টিকাঃ
৪২৭. আখবারুল হুকামা'-২১৩