📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 তাঁর জ্ঞানের প্রচার-প্রসার ঘটেনি কেন

📄 তাঁর জ্ঞানের প্রচার-প্রসার ঘটেনি কেন


তাঁর বিশাল জ্ঞান ও বিশাল পাণ্ডিত্য, যা তাঁকে একজন ইমামের মর্যাদা দান করেছে, যাঁকে জ্ঞানে সাগরতুল্য ইমাম আয-যুহ্রীর সমান মনে করা হয়, সমকালীন অন্য সকল 'আলিমকে তাঁর ছাত্রতুল্য গণ্য করা হয়, জ্ঞানের এত অত্যুচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির জ্ঞানের তেমন প্রচার-প্রসার ঘটেনি কেন? তাঁর সমকক্ষ অন্যান্য ইমাম যথা আয-যুহরী, মালিক ও সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব প্রমুখের মত হাদীছ ও ফিক্হ বিষয়ে তাঁর বর্ণনা পাওয়া যায় না কেন?

এ প্রশ্নের জবাবে দু'টি কারণ উল্লেখ করা যায়। প্রথম কারণ, আর এটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তিনি তাঁর বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার ছড়িয়ে দেওয়ার যথেষ্ট সময় ও সুযোগ লাভ করেননি। প্রথম জীবনে মদীনার শ্রেষ্ঠ 'আলিম ও ফকীহদের নিকট থেকে জ্ঞান আহরণের পর মদীনা ত্যাগ করেন। কিছুকাল পরে আবার সেখানে ফিরে আসেন তথাকার ওয়ালী হিসেবে। কিছুদিন পর সেই সাথে যুক্ত হয় মক্কার ইমারতের দায়িত্ব। তখন তিনি হন মক্কা-মদীনা তথা হারামাইনের আমীর। এ বিশাল দায়িত্ব পালনের কারণে তিনি তখন অন্যদের মত দারসের মজলিস করে ছাত্রদের ফিক্‌হর জ্ঞান দিতে পারেননি, তাদের নিকট নিজের সংগ্রহের হাদীছ ভাণ্ডার বর্ণনা করতে সক্ষম হননি। এক সময় এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাঁকে দারুল খিলাফা দিমাকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে বেশ কয়েকটি বছর তাঁর অতিবাহিত হয় খলীফাদের পরামর্শক, উপদেষ্টা হিসেবে এবং কিছুকাল খলীফা সুলায়মানের উযীর হিসেবে।

এরপর তাঁর কাঁধে চেপে বসে বিশাল ইসলামী খিলাফতের মহান দায়িত্ব। যে খিলাফতের সীমা-সরহদ ছিল আটলান্টিকের উপকূল থেকে ভারতবর্ষের সিন্ধু পর্যন্ত। বানু উমাইয়্যারা দীর্ঘকাল ধরে ইসলামী খিলাফতের ধ্যান-ধারণা ও রূপরেখার মধ্যে যে বিকৃতি সাধন করেছিল, তিনি দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার প্রথম দিন থেকে তা আবার খিলাফতে রাশেদার আদলে ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেন। এ কাজ করতে গিয়ে জীবনের সবটুকু সময় এর পিছনে ব্যয় করেন। মৃত্যু পর্যন্ত এমন একটু অবসর পাননি যখন তিনি জ্ঞান চর্চা ও শিক্ষা দানের দিকে মনোযোগ দিতে পারতেন। খিলাফতে রাশেদার প্রথম খলীফা মহান সাহাবী হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) জীবনেও এমনটি ঘটেছিল। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশী হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সঙ্গ ও সাহচর্য লাভ করেছেন। অন্যদের তুলনায় রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে তিনি বেশী জ্ঞান লাভ করেন। মুসলিম উম্মার নিকট সর্বক্ষেত্রে তাঁর যে সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদা, সেই তুলনায় তাঁর সূত্রে বর্ণিত হাদীছ নিতান্ত অপ্রতুল। এর কারণ হলো, হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের পর তিনি খুব অল্প সময় পেয়েছিলেন। আর তাও কেটে যায় ইসলামী খিলাফতের গুরুদায়িত্ব বহনের মধ্য দিয়ে। তেমনিভাবে খলীফা 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান, খলীফা আবু জা'ফার আল-মানসূর ও আরো অনেকের নাম উল্লেখ করা যায়, যাঁরা ছিলেন বিশাল জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিত্ব, কিন্তু খিলাফত পরিচালনা ও রাজনীতির জটিল বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ার কারণে জ্ঞান চর্চার অঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দ্বিতীয় কারণ হলো অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ। চল্লিশটি বছর জীবনকালও পূর্ণ করে যেতে পারেননি।

এ প্রসঙ্গে ইমাম আয-যাহাবীর একটি উক্তি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন: ৩৬৯
'আল-ওয়ালীদের খিলাফতকালে প্রথম মদীনার ওয়ালী নিযুক্ত হন এবং মদীনার মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করেন। সে সময় তাঁকে অত্যধিক ন্যায়পরায়ণ ও ভোগবিলাস বিমুখ বলে উল্লেখ করা হতো না। কিন্তু খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আল্লাহ তাঁকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দেন এবং তিনি নতুন রূপ ধারণ করেন। অতঃপর উত্তম চরিত্র ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তাঁর নানা 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা), দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ স্বভাবের জন্য হাসান আল-বসরী (রহ) এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে আয-যুহরীর (রহ) সাথে তাঁকে তুলনা করা হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যু তাঁর শিক্ষকদের কাছাকাছি সময়ে হওয়ায় তাঁর জ্ঞানের প্রচার- প্রসার তেমন ঘটেনি।'

টিকাঃ
৩৬৯. ইবনুল জাওযী-১৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৯

তাঁর বিশাল জ্ঞান ও বিশাল পাণ্ডিত্য, যা তাঁকে একজন ইমামের মর্যাদা দান করেছে, যাঁকে জ্ঞানে সাগরতুল্য ইমাম আয-যুহ্রীর সমান মনে করা হয়, সমকালীন অন্য সকল 'আলিমকে তাঁর ছাত্রতুল্য গণ্য করা হয়, জ্ঞানের এত অত্যুচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির জ্ঞানের তেমন প্রচার-প্রসার ঘটেনি কেন? তাঁর সমকক্ষ অন্যান্য ইমাম যথা আয-যুহরী, মালিক ও সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব প্রমুখের মত হাদীছ ও ফিক্হ বিষয়ে তাঁর বর্ণনা পাওয়া যায় না কেন?

এ প্রশ্নের জবাবে দু'টি কারণ উল্লেখ করা যায়। প্রথম কারণ, আর এটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তিনি তাঁর বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার ছড়িয়ে দেওয়ার যথেষ্ট সময় ও সুযোগ লাভ করেননি। প্রথম জীবনে মদীনার শ্রেষ্ঠ 'আলিম ও ফকীহদের নিকট থেকে জ্ঞান আহরণের পর মদীনা ত্যাগ করেন। কিছুকাল পরে আবার সেখানে ফিরে আসেন তথাকার ওয়ালী হিসেবে। কিছুদিন পর সেই সাথে যুক্ত হয় মক্কার ইমারতের দায়িত্ব। তখন তিনি হন মক্কা-মদীনা তথা হারামাইনের আমীর। এ বিশাল দায়িত্ব পালনের কারণে তিনি তখন অন্যদের মত দারসের মজলিস করে ছাত্রদের ফিক্‌হর জ্ঞান দিতে পারেননি, তাদের নিকট নিজের সংগ্রহের হাদীছ ভাণ্ডার বর্ণনা করতে সক্ষম হননি। এক সময় এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাঁকে দারুল খিলাফা দিমাকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে বেশ কয়েকটি বছর তাঁর অতিবাহিত হয় খলীফাদের পরামর্শক, উপদেষ্টা হিসেবে এবং কিছুকাল খলীফা সুলায়মানের উযীর হিসেবে।

এরপর তাঁর কাঁধে চেপে বসে বিশাল ইসলামী খিলাফতের মহান দায়িত্ব। যে খিলাফতের সীমা-সরহদ ছিল আটলান্টিকের উপকূল থেকে ভারতবর্ষের সিন্ধু পর্যন্ত। বানু উমাইয়্যারা দীর্ঘকাল ধরে ইসলামী খিলাফতের ধ্যান-ধারণা ও রূপরেখার মধ্যে যে বিকৃতি সাধন করেছিল, তিনি দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার প্রথম দিন থেকে তা আবার খিলাফতে রাশেদার আদলে ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেন। এ কাজ করতে গিয়ে জীবনের সবটুকু সময় এর পিছনে ব্যয় করেন। মৃত্যু পর্যন্ত এমন একটু অবসর পাননি যখন তিনি জ্ঞান চর্চা ও শিক্ষা দানের দিকে মনোযোগ দিতে পারতেন। খিলাফতে রাশেদার প্রথম খলীফা মহান সাহাবী হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) জীবনেও এমনটি ঘটেছিল। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশী হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সঙ্গ ও সাহচর্য লাভ করেছেন। অন্যদের তুলনায় রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে তিনি বেশী জ্ঞান লাভ করেন। মুসলিম উম্মার নিকট সর্বক্ষেত্রে তাঁর যে সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদা, সেই তুলনায় তাঁর সূত্রে বর্ণিত হাদীছ নিতান্ত অপ্রতুল। এর কারণ হলো, হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের পর তিনি খুব অল্প সময় পেয়েছিলেন। আর তাও কেটে যায় ইসলামী খিলাফতের গুরুদায়িত্ব বহনের মধ্য দিয়ে। তেমনিভাবে খলীফা 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান, খলীফা আবু জা'ফার আল-মানসূর ও আরো অনেকের নাম উল্লেখ করা যায়, যাঁরা ছিলেন বিশাল জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিত্ব, কিন্তু খিলাফত পরিচালনা ও রাজনীতির জটিল বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ার কারণে জ্ঞান চর্চার অঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দ্বিতীয় কারণ হলো অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ। চল্লিশটি বছর জীবনকালও পূর্ণ করে যেতে পারেননি।

এ প্রসঙ্গে ইমাম আয-যাহাবীর একটি উক্তি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন: ৩৬৯
'আল-ওয়ালীদের খিলাফতকালে প্রথম মদীনার ওয়ালী নিযুক্ত হন এবং মদীনার মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করেন। সে সময় তাঁকে অত্যধিক ন্যায়পরায়ণ ও ভোগবিলাস বিমুখ বলে উল্লেখ করা হতো না। কিন্তু খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আল্লাহ তাঁকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দেন এবং তিনি নতুন রূপ ধারণ করেন। অতঃপর উত্তম চরিত্র ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তাঁর নানা 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা), দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ স্বভাবের জন্য হাসান আল-বসরী (রহ) এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে আয-যুহরীর (রহ) সাথে তাঁকে তুলনা করা হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যু তাঁর শিক্ষকদের কাছাকাছি সময়ে হওয়ায় তাঁর জ্ঞানের প্রচার- প্রসার তেমন ঘটেনি।'

টিকাঃ
৩৬৯. ইবনুল জাওযী-১৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৯

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 জ্ঞানের প্রচার-প্রসার ও লিপিবদ্ধকরণে তাঁর অবদান

📄 জ্ঞানের প্রচার-প্রসার ও লিপিবদ্ধকরণে তাঁর অবদান


আমীরুল মু'মিনীন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর অর্জিত জ্ঞান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কোন হালকায়ে দারসে বসেননি, তেমনিভাবে বসেননি কোন ফিকহ ও ইফতার মজলিসে। তবে এক্ষেত্রে তিনি এক বিশাল অবদান রেখে গেছেন। আর তা হলো, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ লিপিবদ্ধকরণ, মানুষকে শিক্ষাদান এবং তাদেরকে সত্য-সঠিক পথে পরিচালনার জন্য খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য 'উলামা-ফকীহকে প্রেরণ।

নিম্নে এক্ষেত্রে তাঁর কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. বিভিন্ন শহর ও জনপদে জ্ঞানের প্রচার-প্রসার: জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী ও উপযোগী লোকদের নিকট শিক্ষার উপায়-উপকরণ সহজ সাধ্য করে দেওয়া ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অতি চমৎকারভাবে এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে বিভিন্ন শহরে, এমনকি বিভিন্ন পল্লীতে পাঠান যাতে সেখানে বসবাসকারী মানুষ তাঁদের নিকট থেকে আল্লাহর দীনের বিধি-বিধান সম্পর্কে অবহিত হতে পারে।

মদীনার বিখ্যাত ইমাম, মুফতী ও 'আলিম হযরত নাফে'কে তিনি মিসরে পাঠান। এই নাফে' ছিলেন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) আযাদকৃত দাস এবং তাঁর হাদীছের একজন বর্ণনাকারী। এ প্রসঙ্গে 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন: ৩৭০
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয নাফে'- ইবন 'উমারের দাসকে মিসরবাসীদের নিকট পাঠান, যাতে তিনি তাদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহসমূহ শিক্ষা দিতে পারেন।'

তিনি তাবি'ঈ ফকীহদের মধ্য থেকে দশজনকে আফ্রিকায় পাঠান। হিজায, শাম ও ইরাকের বিভিন্ন শহর ও জনপদে যেমন অসংখ্য মুহাদ্দিছ ও ফকীহ তাবি'ঈ ইসলামী জ্ঞানের প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত ছিলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয প্রেরিত এই তাবি'ঈগণও আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় জনগণকে ইসলামী জ্ঞান ও আমলে সমৃদ্ধ করে তোলেন। সেই দশজন বিখ্যাত তাবি'ঈ হলেন:

১. আবূ ছুমামা বাকর ইবন সাওয়াদা আল-জুযামী আল-মিসরী। তাঁর সম্পর্কে হাফেজ ইবন হাজার বলেন, 'আফ্রিকাবাসীদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে সেখানে পাঠান। তিনি ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য মুফতী ফকীহ। '৩৭১

২. 'আবদুর রহমান ইবন রাফি' আত-তানূখী। ইবন হাজার তাঁর সম্পর্কে বলেন, 'আফ্রিকাবাসীদেরকে ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যে দশজন ফকীহ (ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী) পাঠান, তিনি ছিলেন তাঁদের একজন। তিনি আফ্রিকার কাজীর দায়িত্বও পালন করেন। '৩৭২

৩. 'আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ আল-মু'আফিরী। হাফেজ ইবন হাজার বলেন, 'আফ্রিকাবাসীদেরকে ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে সেখানে পাঠান। তিনি সেখানে ব্যাপকভাবে জ্ঞান ছড়িয়ে দেন। তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য, সৎ ও জ্ঞানী মানুষ। '৩৭৩

৪. তালাক ইবন জা'বান : তাঁর সম্পর্কে হাফেজ ইবন মাকূলা বলেন: 'মাগরিব (মরক্কো) বাসীদেরকে ইসলামী জ্ঞান দানের জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যে সকল মিসরীয় ফকীহকে পাঠান, তিনি তাঁদের অন্যতম।'

৫. সা'দ ইবন মাস'উদ আত-তুজায়বী : তিনি কায়রাওয়ানে অবস্থান করে সেখানে ব্যাপকভাবে ইসলামী জ্ঞান ছড়িয়ে দেন।

৬. ইসমা'ঈল ইবন 'উবায়দুল্লাহ আল-আনসারী: তিনি কায়রাওয়ানে অবস্থান করেন। তথাকার এবং আশেপাশের অসংখ্য মানুষ তাঁর দ্বারা ব্যাপক উপকার লাভ করে। তিনি কায়রাওয়ানে বিশাল একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। উক্ত মসজিদটি বর্তমানে 'মসজিদ আয-যায়তুনা' নামে পরিচিত। তিনি তাঁর আয়ের এক তৃতীয়াংশ আল্লাহর পথে ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন। এ কারণে জনগণের নিকট থেকে 'তাজিরুল্লাহ' বা আল্লাহর ব্যবসায়ী উপাধি লাভ করেন। হিজরী ১০৭ সনে তিনি সাগরে নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। লাশ উত্তোলনের পর দেখা যায় কুরআনের একটি কপি তিনি হাত দিয়ে বুকের সাথে ঠেসে ধরে রেখেছেন। ৩৭৪

৭. ইসমা'ঈল ইবন 'উবায়দিল্লাহ ইবন আবিল মুহাজির : বানু মাখযূমের আযাদকৃত দাস। তিনি ছিলেন একজন বড় ইমাম ও আস্থাভাজন 'আলিম। আফ্রিকাবাসীদেরকে ইসলামী জ্ঞান শিক্ষাদান ও তাদের মধ্যে বিচার কাজ পরিচালনার জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে সেখানে পাঠান। উত্তম জীবনধারার অধিকারী মানুষ এবং একজন ভালো আমীর ছিলেন। ফিকহ বিষয়ক তাঁর জ্ঞান মানুষের মধ্যে প্রসার লাভ করে। তাঁর সময়ে বারবার উপজাতির অধিকাংশ লোক ইসলাম গ্রহণ করে। হিজরী ১৩২ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। ৩৭৫

৮. আবূ সা'ঈদ জু'ছাল ইবন হা'আন আর-রু'আয়নী : হাফেজ ইবন হাজার ইবন ইউনুসের সূত্রে উল্লেখ করেছেন যে, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে মরক্কোবাসীদেরকে কুরআন শিক্ষাদানের জন্য পাঠান। তিনি ছিলেন ফকীহ কারীদের একজন। ৩৭৬

৯. হিব্বান ইবন আবী জাবালা আল-কুরাশী : মিসরের অধিবাসী। অতঃপর কায়রাওয়ানে বসবাস করেন। তথাকার অধিবাসীরা শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর দ্বারা ব্যাপকভাবে উপকার লাভ করে। ৩৭৭

১০. মাওহাব ইবন হায় আল-মু'আফিরী : তিনি কায়রাওয়ানে আবাসন গড়ে তোলেন এবং সেখানে ইসলামী জ্ঞান ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেন।

উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও তিনি ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী বহু ব্যক্তিকে বিভিন্ন পল্লী ও জনপদে পাঠান, যাতে তথাকার অধিবাসীরা তাঁদের নিকট থেকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে।

টিকাঃ
৩৭০. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৯৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০০; হুসনুল মুহাদারা-১/১১৯
৩৭১. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৪২৪; তাকরীব আত-তাহযীব-১/১০৬
৩৭২. তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৫৩; তাকরীব আত-তাহযীব-১/৪৭৮; মীযান আল-ই'তিদাল-২/৫৬০
৩৭৩. তাহযীব আত-তাহযীব-৬/৭৪; তাকরীব আত-তাহযীব-১/৪৬২
৩৭৪. 'আবদুল সাত্তার আশ-শায়খ-৭০
৩৭৫. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/২১৩; আল-আ'লাম-১/৩১৯
৩৭৬. তাহযীব আত-তাহযীব-২/৬৮; তাকরীব আত-তাহযীব-১/১২৮
৩৭৭. তাহযীব আত-তাহযীব-২/১৪৯; তাকরীব আত-তাহযীব-১/১৪৭

আমীরুল মু'মিনীন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর অর্জিত জ্ঞান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কোন হালকায়ে দারসে বসেননি, তেমনিভাবে বসেননি কোন ফিকহ ও ইফতার মজলিসে। তবে এক্ষেত্রে তিনি এক বিশাল অবদান রেখে গেছেন। আর তা হলো, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ লিপিবদ্ধকরণ, মানুষকে শিক্ষাদান এবং তাদেরকে সত্য-সঠিক পথে পরিচালনার জন্য খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য 'উলামা-ফকীহকে প্রেরণ।

নিম্নে এক্ষেত্রে তাঁর কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. বিভিন্ন শহর ও জনপদে জ্ঞানের প্রচার-প্রসার: জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী ও উপযোগী লোকদের নিকট শিক্ষার উপায়-উপকরণ সহজ সাধ্য করে দেওয়া ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অতি চমৎকারভাবে এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে বিভিন্ন শহরে, এমনকি বিভিন্ন পল্লীতে পাঠান যাতে সেখানে বসবাসকারী মানুষ তাঁদের নিকট থেকে আল্লাহর দীনের বিধি-বিধান সম্পর্কে অবহিত হতে পারে।

মদীনার বিখ্যাত ইমাম, মুফতী ও 'আলিম হযরত নাফে'কে তিনি মিসরে পাঠান। এই নাফে' ছিলেন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) আযাদকৃত দাস এবং তাঁর হাদীছের একজন বর্ণনাকারী। এ প্রসঙ্গে 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন: ৩৭০
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয নাফে'- ইবন 'উমারের দাসকে মিসরবাসীদের নিকট পাঠান, যাতে তিনি তাদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহসমূহ শিক্ষা দিতে পারেন।'

তিনি তাবি'ঈ ফকীহদের মধ্য থেকে দশজনকে আফ্রিকায় পাঠান। হিজায, শাম ও ইরাকের বিভিন্ন শহর ও জনপদে যেমন অসংখ্য মুহাদ্দিছ ও ফকীহ তাবি'ঈ ইসলামী জ্ঞানের প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত ছিলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয প্রেরিত এই তাবি'ঈগণও আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় জনগণকে ইসলামী জ্ঞান ও আমলে সমৃদ্ধ করে তোলেন। সেই দশজন বিখ্যাত তাবি'ঈ হলেন:

১. আবূ ছুমামা বাকর ইবন সাওয়াদা আল-জুযামী আল-মিসরী। তাঁর সম্পর্কে হাফেজ ইবন হাজার বলেন, 'আফ্রিকাবাসীদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে সেখানে পাঠান। তিনি ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য মুফতী ফকীহ। '৩৭১

২. 'আবদুর রহমান ইবন রাফি' আত-তানূখী। ইবন হাজার তাঁর সম্পর্কে বলেন, 'আফ্রিকাবাসীদেরকে ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যে দশজন ফকীহ (ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী) পাঠান, তিনি ছিলেন তাঁদের একজন। তিনি আফ্রিকার কাজীর দায়িত্বও পালন করেন। '৩৭২

৩. 'আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ আল-মু'আফিরী। হাফেজ ইবন হাজার বলেন, 'আফ্রিকাবাসীদেরকে ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে সেখানে পাঠান। তিনি সেখানে ব্যাপকভাবে জ্ঞান ছড়িয়ে দেন। তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য, সৎ ও জ্ঞানী মানুষ। '৩৭৩

৪. তালাক ইবন জা'বান : তাঁর সম্পর্কে হাফেজ ইবন মাকূলা বলেন: 'মাগরিব (মরক্কো) বাসীদেরকে ইসলামী জ্ঞান দানের জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যে সকল মিসরীয় ফকীহকে পাঠান, তিনি তাঁদের অন্যতম।'

৫. সা'দ ইবন মাস'উদ আত-তুজায়বী : তিনি কায়রাওয়ানে অবস্থান করে সেখানে ব্যাপকভাবে ইসলামী জ্ঞান ছড়িয়ে দেন।

৬. ইসমা'ঈল ইবন 'উবায়দুল্লাহ আল-আনসারী: তিনি কায়রাওয়ানে অবস্থান করেন। তথাকার এবং আশেপাশের অসংখ্য মানুষ তাঁর দ্বারা ব্যাপক উপকার লাভ করে। তিনি কায়রাওয়ানে বিশাল একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। উক্ত মসজিদটি বর্তমানে 'মসজিদ আয-যায়তুনা' নামে পরিচিত। তিনি তাঁর আয়ের এক তৃতীয়াংশ আল্লাহর পথে ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন। এ কারণে জনগণের নিকট থেকে 'তাজিরুল্লাহ' বা আল্লাহর ব্যবসায়ী উপাধি লাভ করেন। হিজরী ১০৭ সনে তিনি সাগরে নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। লাশ উত্তোলনের পর দেখা যায় কুরআনের একটি কপি তিনি হাত দিয়ে বুকের সাথে ঠেসে ধরে রেখেছেন। ৩৭৪

৭. ইসমা'ঈল ইবন 'উবায়দিল্লাহ ইবন আবিল মুহাজির : বানু মাখযূমের আযাদকৃত দাস। তিনি ছিলেন একজন বড় ইমাম ও আস্থাভাজন 'আলিম। আফ্রিকাবাসীদেরকে ইসলামী জ্ঞান শিক্ষাদান ও তাদের মধ্যে বিচার কাজ পরিচালনার জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে সেখানে পাঠান। উত্তম জীবনধারার অধিকারী মানুষ এবং একজন ভালো আমীর ছিলেন। ফিকহ বিষয়ক তাঁর জ্ঞান মানুষের মধ্যে প্রসার লাভ করে। তাঁর সময়ে বারবার উপজাতির অধিকাংশ লোক ইসলাম গ্রহণ করে। হিজরী ১৩২ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। ৩৭৫

৮. আবূ সা'ঈদ জু'ছাল ইবন হা'আন আর-রু'আয়নী : হাফেজ ইবন হাজার ইবন ইউনুসের সূত্রে উল্লেখ করেছেন যে, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে মরক্কোবাসীদেরকে কুরআন শিক্ষাদানের জন্য পাঠান। তিনি ছিলেন ফকীহ কারীদের একজন। ৩৭৬

৯. হিব্বান ইবন আবী জাবালা আল-কুরাশী : মিসরের অধিবাসী। অতঃপর কায়রাওয়ানে বসবাস করেন। তথাকার অধিবাসীরা শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর দ্বারা ব্যাপকভাবে উপকার লাভ করে। ৩৭৭

১০. মাওহাব ইবন হায় আল-মু'আফিরী : তিনি কায়রাওয়ানে আবাসন গড়ে তোলেন এবং সেখানে ইসলামী জ্ঞান ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেন।

উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও তিনি ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী বহু ব্যক্তিকে বিভিন্ন পল্লী ও জনপদে পাঠান, যাতে তথাকার অধিবাসীরা তাঁদের নিকট থেকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে।

টিকাঃ
৩৭০. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/৯৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০০; হুসনুল মুহাদারা-১/১১৯
৩৭১. তাহযীব আত-তাহযীব-১/৪২৪; তাকরীব আত-তাহযীব-১/১০৬
৩৭২. তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৫৩; তাকরীব আত-তাহযীব-১/৪৭৮; মীযান আল-ই'তিদাল-২/৫৬০
৩৭৩. তাহযীব আত-তাহযীব-৬/৭৪; তাকরীব আত-তাহযীব-১/৪৬২
৩৭৪. 'আবদুল সাত্তার আশ-শায়খ-৭০
৩৭৫. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/২১৩; আল-আ'লাম-১/৩১৯
৩৭৬. তাহযীব আত-তাহযীব-২/৬৮; তাকরীব আত-তাহযীব-১/১২৮
৩৭৭. তাহযীব আত-তাহযীব-২/১৪৯; তাকরীব আত-তাহযীব-১/১৪৭

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 জ্ঞানের প্রচার-প্রসারে তাঁর কর্মপদ্ধতি

📄 জ্ঞানের প্রচার-প্রসারে তাঁর কর্মপদ্ধতি


ক. 'আলিমদের জন্য বেতন-ভাতা নির্ধারণ; এমনকি এমন প্রত্যেকের জন্য বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা যারা জ্ঞান চর্চা ও শিক্ষাদানের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কুরআনের হাফেজ, কুরআনের শিক্ষক, হাদীছের ছাত্র, শিক্ষক, সংগ্রাহক, ফকীহ, ফিকহর ছাত্র, কুরআন-হাদীছের গবেষক- প্রত্যেকের জন্য 'উমার ভাতার ব্যবস্থা করেন। জীবিকা ও ঘর-সংসার প্রতিপালনের চিন্তা থেকে তাদেরকে মুক্ত রাখার জন্য বায়তুল মাল থেকে জ্ঞান চর্চার সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেকের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। মূলতঃ এ দ্বারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে কর্মরত ব্যক্তিরা দারুণ উৎসাহিত হন। তারা জ্ঞানের প্রচার-প্রসার এবং দীন ও উম্মাহ্র সেবায় নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত করেন।

খতীব আল-বাগদাদী ও ইবনুল জাওযী আবূ বকর ইবন আবী মারইয়ামের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ৩৮১
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয হিমসের ওয়ালীকে লেখেন: 'আপনি বায়তুল মাল থেকে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদেরকে তাদের প্রয়োজন পূরণ হয় এমন পরিমাণ অর্থদানের নির্দেশ দিবেন, যাতে কুরআন তিলাওয়াত এবং যে সকল হাদীছ তাঁরা বহন করছে, তার আলোচনা থেকে কোন কিছু তাঁদেরকে বিরত রাখতে না পারে।'

ইবনুল জাওযী ইবন আবী মারইয়াম থেকে আরো বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয হিমসের ওয়ালীকে লেখেন: ৩৮২
'অনুরূপভাবে ফিকাহ বিষয়ে গবেষণার জন্য নিজেদেরকে নিবদ্ধ করেছে এবং দুনিয়ার চাওয়া-পাওয়া থেকে মুক্ত থেকে মসজিদে আবদ্ধ করেছে, তাদের প্রতি দৃষ্টি দিন। আমার এ পত্র আপনার নিকট পৌঁছার পর মুসলমানদের বায়তুল মাল থেকে তাদের প্রত্যেককে এক শ' দীনার করে দিন। এ দ্বারা তারা তাদের প্রয়োজন পূরণ করবে। ভালোর ভালো হলো তাড়াতাড়ি করা। ওয়াস সালামু 'আলাইকুম!'

এমনকি যাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধ-বিগ্রহ, সাহাবীদের পরিচিতি-বৈশিষ্ট্য, ইসলামের প্রথম দিকের ঘটনাবলী গল্পাকারে বর্ণনা করতো এবং মানুষের মধ্যে যারা ওয়াজ-নসীহত করতো তাদের সকলের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেন। 'আসিম ইবন 'উমার ইবন কাতাদা ছিলেন সে যুগের একজন বড় 'আলিম। সীরাত ও মাগাযীতে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। হাদীছ বর্ণনায় তিনি বিশ্বস্ত এবং বহু হাদীছের বর্ণনাকারী। ইবন সা'দ বলেন, এই 'আসিম 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালে বড় রকমের একটা ঋণে জড়িয়ে পড়েন এবং তা পরিশোধ করা তাঁর জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সে ঋণ 'উমার পরিশোধ করেন এবং বায়তুল মাল থেকে তাঁকে ভাতা দানের নির্দেশ দেন। আর 'আসিমকে নির্দেশ দেন তিনি যেন দিমাশ্কের জামি' মসজিদে বসে রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সাহাবীদের জীবনকথা মানুষকে শোনান। তিনি 'আসিমকে এই ভাষায় নির্দেশ দেন: ৩৮৩
'বানু মারওয়ান এ কাজ অপছন্দ করতো এবং এ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখতো। আপনি বসুন এবং মানুষের নিকট বর্ণনা করুন।' অতঃপর তিনি তা পালন করেন।

ইবন শাব্বাহ্ বলেন: 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মদীনায় বসবাসকারী এক ব্যক্তিকে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ঘটনাবলী গল্পাকারে মানুষকে শোনানোর নির্দেশ দেন এবং তার জন্য মাসিক দু' দীনার ভাতা নির্ধারণ করেন। পরে হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক এ ভাতা কমিয়ে বাৎসরিক ছয় দীনার করেন। ৩৮৪

শিক্ষার্থীরা যাতে রুজি-রিযিক ও অর্থ সঙ্কটের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে একাগ্রচিত্তে পড়াশোনা করতে পারে সে জন্য তাদের ভাতার ব্যবস্থা করেন। ইবন 'আবদিল বার ইয়াহইয়া ইবন আবী কাছীরের সূত্রে উল্লেখ করেছেন: ৩৮৫
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর কর্মকর্তাদেরকে লেখেন : শিক্ষার্থীদের জীবিকার ব্যবস্থা করে তাদেরকে জ্ঞান অন্বেষণে একাগ্র হওয়ার সুযোগ করে দাও।'

খ. তিনি জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে জ্ঞানের প্রচার-প্রসারের জন্য ভীষণ উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁদেরকে দেশের সকল মসজিদকে জনগণের ধর্মীয় শিক্ষা দানের কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দান, হাদীছ লেখা এবং সুন্নাহর পুনরুজ্জীবনের নির্দেশ দেন। ইয়ামনের অধিবাসী 'আকরামা ইবন 'আম্মার বলেন, আমি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের এই পত্রটি পাঠ করতে শুনেছি: ৩৮৬
'অতঃপর এই যে, জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে তাদের নিজ নিজ মসজিদসমূহে জ্ঞান প্রচারের নির্দেশ দাও। কারণ, সুন্নাহর মৃত্যু হয়েছে।'

ইবন 'আবদিল বার জা'ফার ইবন বুরকান আর-রাকী থেকে বর্ণনা করেছেন। এই রাকী ছিলেন সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের অধিবাসী। তিনি বলেন: ৩৮৭
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আমাদেরকে লেখেন : অতঃপর এই যে, ফিকাহ শাস্ত্রের অধিকারী ও জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে তাঁরা যা জানে তা তাঁদের নিজ নিজ বৈঠক ও মসজিদসমূহে প্রচারের নির্দেশ দাও। ওয়াস সালাম।'

তিনি সকল শ্রেণীর মানুষকে জ্ঞানার্জন, জ্ঞান চর্চার বৈঠকসমূহে বসা এবং মুহাদ্দিছ, ফকীহ ও ওয়াজ-নসীহতকারীদের মুখ থেকে দীনের কথা শোনার জন্য উৎসাহিত করেন। যেমন, তিনি প্রায়ই বলতেন: ৩৮৮
'সম্ভব হলে 'আলিম হও, তা না হলে শিক্ষার্থী হও। তা সম্ভব না হলে তাদেরকে ভালোবাস। তাও সম্ভব না হলে, অন্ততঃ তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না। তারপর বলেন: আল্লাহ চাইলে তাতেই তার মুক্তির পথ করে দিতে পারেন।'

টিকাঃ
৩৮১. ইবনুল জাওযী-১২৩; উসূল আল-হাদীছ-১৭৮
৩৮২. প্রাগুক্ত
৩৮৩. তাবাকাত-৫/৩৪৯; তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৪৭
৩৮৪. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৭৩
৩৮৫. জামি'উ বায়ান আল-'ইলম-১/২২৮
৩৮৬. ইবনুল জাওযী-১১৩; উসূল আল-হাদীছ-১৭৮
৩৮৭. জামি'উ বায়ান আল-'ইলম-১/১৪৯
৩৮৮. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৭৪

ক. 'আলিমদের জন্য বেতন-ভাতা নির্ধারণ; এমনকি এমন প্রত্যেকের জন্য বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা যারা জ্ঞান চর্চা ও শিক্ষাদানের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কুরআনের হাফেজ, কুরআনের শিক্ষক, হাদীছের ছাত্র, শিক্ষক, সংগ্রাহক, ফকীহ, ফিকহর ছাত্র, কুরআন-হাদীছের গবেষক- প্রত্যেকের জন্য 'উমার ভাতার ব্যবস্থা করেন। জীবিকা ও ঘর-সংসার প্রতিপালনের চিন্তা থেকে তাদেরকে মুক্ত রাখার জন্য বায়তুল মাল থেকে জ্ঞান চর্চার সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেকের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। মূলতঃ এ দ্বারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে কর্মরত ব্যক্তিরা দারুণ উৎসাহিত হন। তারা জ্ঞানের প্রচার-প্রসার এবং দীন ও উম্মাহ্র সেবায় নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত করেন।

খতীব আল-বাগদাদী ও ইবনুল জাওযী আবূ বকর ইবন আবী মারইয়ামের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ৩৮১
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয হিমসের ওয়ালীকে লেখেন: 'আপনি বায়তুল মাল থেকে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদেরকে তাদের প্রয়োজন পূরণ হয় এমন পরিমাণ অর্থদানের নির্দেশ দিবেন, যাতে কুরআন তিলাওয়াত এবং যে সকল হাদীছ তাঁরা বহন করছে, তার আলোচনা থেকে কোন কিছু তাঁদেরকে বিরত রাখতে না পারে।'

ইবনুল জাওযী ইবন আবী মারইয়াম থেকে আরো বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয হিমসের ওয়ালীকে লেখেন: ৩৮২
'অনুরূপভাবে ফিকাহ বিষয়ে গবেষণার জন্য নিজেদেরকে নিবদ্ধ করেছে এবং দুনিয়ার চাওয়া-পাওয়া থেকে মুক্ত থেকে মসজিদে আবদ্ধ করেছে, তাদের প্রতি দৃষ্টি দিন। আমার এ পত্র আপনার নিকট পৌঁছার পর মুসলমানদের বায়তুল মাল থেকে তাদের প্রত্যেককে এক শ' দীনার করে দিন। এ দ্বারা তারা তাদের প্রয়োজন পূরণ করবে। ভালোর ভালো হলো তাড়াতাড়ি করা। ওয়াস সালামু 'আলাইকুম!'

এমনকি যাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধ-বিগ্রহ, সাহাবীদের পরিচিতি-বৈশিষ্ট্য, ইসলামের প্রথম দিকের ঘটনাবলী গল্পাকারে বর্ণনা করতো এবং মানুষের মধ্যে যারা ওয়াজ-নসীহত করতো তাদের সকলের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেন। 'আসিম ইবন 'উমার ইবন কাতাদা ছিলেন সে যুগের একজন বড় 'আলিম। সীরাত ও মাগাযীতে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। হাদীছ বর্ণনায় তিনি বিশ্বস্ত এবং বহু হাদীছের বর্ণনাকারী। ইবন সা'দ বলেন, এই 'আসিম 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালে বড় রকমের একটা ঋণে জড়িয়ে পড়েন এবং তা পরিশোধ করা তাঁর জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সে ঋণ 'উমার পরিশোধ করেন এবং বায়তুল মাল থেকে তাঁকে ভাতা দানের নির্দেশ দেন। আর 'আসিমকে নির্দেশ দেন তিনি যেন দিমাশ্কের জামি' মসজিদে বসে রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সাহাবীদের জীবনকথা মানুষকে শোনান। তিনি 'আসিমকে এই ভাষায় নির্দেশ দেন: ৩৮৩
'বানু মারওয়ান এ কাজ অপছন্দ করতো এবং এ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখতো। আপনি বসুন এবং মানুষের নিকট বর্ণনা করুন।' অতঃপর তিনি তা পালন করেন।

ইবন শাব্বাহ্ বলেন: 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মদীনায় বসবাসকারী এক ব্যক্তিকে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ঘটনাবলী গল্পাকারে মানুষকে শোনানোর নির্দেশ দেন এবং তার জন্য মাসিক দু' দীনার ভাতা নির্ধারণ করেন। পরে হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক এ ভাতা কমিয়ে বাৎসরিক ছয় দীনার করেন। ৩৮৪

শিক্ষার্থীরা যাতে রুজি-রিযিক ও অর্থ সঙ্কটের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে একাগ্রচিত্তে পড়াশোনা করতে পারে সে জন্য তাদের ভাতার ব্যবস্থা করেন। ইবন 'আবদিল বার ইয়াহইয়া ইবন আবী কাছীরের সূত্রে উল্লেখ করেছেন: ৩৮৫
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর কর্মকর্তাদেরকে লেখেন : শিক্ষার্থীদের জীবিকার ব্যবস্থা করে তাদেরকে জ্ঞান অন্বেষণে একাগ্র হওয়ার সুযোগ করে দাও।'

খ. তিনি জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে জ্ঞানের প্রচার-প্রসারের জন্য ভীষণ উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁদেরকে দেশের সকল মসজিদকে জনগণের ধর্মীয় শিক্ষা দানের কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দান, হাদীছ লেখা এবং সুন্নাহর পুনরুজ্জীবনের নির্দেশ দেন। ইয়ামনের অধিবাসী 'আকরামা ইবন 'আম্মার বলেন, আমি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের এই পত্রটি পাঠ করতে শুনেছি: ৩৮৬
'অতঃপর এই যে, জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে তাদের নিজ নিজ মসজিদসমূহে জ্ঞান প্রচারের নির্দেশ দাও। কারণ, সুন্নাহর মৃত্যু হয়েছে।'

ইবন 'আবদিল বার জা'ফার ইবন বুরকান আর-রাকী থেকে বর্ণনা করেছেন। এই রাকী ছিলেন সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের অধিবাসী। তিনি বলেন: ৩৮৭
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আমাদেরকে লেখেন : অতঃপর এই যে, ফিকাহ শাস্ত্রের অধিকারী ও জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে তাঁরা যা জানে তা তাঁদের নিজ নিজ বৈঠক ও মসজিদসমূহে প্রচারের নির্দেশ দাও। ওয়াস সালাম।'

তিনি সকল শ্রেণীর মানুষকে জ্ঞানার্জন, জ্ঞান চর্চার বৈঠকসমূহে বসা এবং মুহাদ্দিছ, ফকীহ ও ওয়াজ-নসীহতকারীদের মুখ থেকে দীনের কথা শোনার জন্য উৎসাহিত করেন। যেমন, তিনি প্রায়ই বলতেন: ৩৮৮
'সম্ভব হলে 'আলিম হও, তা না হলে শিক্ষার্থী হও। তা সম্ভব না হলে তাদেরকে ভালোবাস। তাও সম্ভব না হলে, অন্ততঃ তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না। তারপর বলেন: আল্লাহ চাইলে তাতেই তার মুক্তির পথ করে দিতে পারেন।'

টিকাঃ
৩৮১. ইবনুল জাওযী-১২৩; উসূল আল-হাদীছ-১৭৮
৩৮২. প্রাগুক্ত
৩৮৩. তাবাকাত-৫/৩৪৯; তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৪৭
৩৮৪. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৭৩
৩৮৫. জামি'উ বায়ান আল-'ইলম-১/২২৮
৩৮৬. ইবনুল জাওযী-১১৩; উসূল আল-হাদীছ-১৭৮
৩৮৭. জামি'উ বায়ান আল-'ইলম-১/১৪৯
৩৮৮. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৭৪

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণ এবং এ ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা

📄 হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণ এবং এ ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা


ইসলামের প্রাথমিক পর্বে হযরত রাসূলে কারীম (সা) কেবল কুরআন ছাড়া আর কোন কিছু লেখার প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, অন্য যা কিছু লেখা হবে তা হয়তো কালক্রমে কুরআনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে এবং মানুষ তা কুরআন মনে করে চর্চা শুরু করে দেবে। পরবর্তীকালে রাসূল (সা) এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন এবং কুরআনের সাথে সাথে হাদীছও লেখার অনুমতি দান করেন। খতীব আল-বাগদাদী বলেন: কিতাবুল্লাহর সাথে যাতে অন্য কোন কিছু মিলেমিশে না যায় অথবা মানুষ কুরআন ছেড়ে অন্য কোন কিছু নিয়ে মাতামাতি শুরু করে না দেয়, এ কারণে ইসলামের প্রথম পর্বে হাদীছ লেখা অপছন্দনীয় কাজ মনে করা হয়েছে। তাছাড়া সে সময় ইসলামের তত্ত্বজ্ঞানী লোকের সংখ্যা ছিল অনেক কম। পল্লী এলাকার যে সকল বেদুঈন ইসলাম গ্রহণ করেছিল, দীন সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ছিল খুবই অপ্রতুল। তারা ওহী এবং ওহী বহির্ভূত বাণীর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম ছিল না। লিখিত কোন কিছু দেখলেই তারা কুরআন মনে করে ভুল করতে পারতো। এ কারণে তখন হাদীছ লেখালেখির জন্য অনুমতি বা উৎসাহ দেওয়া হয়নি।

'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণের চিন্তা করেন। দীর্ঘ ভাবনা-চিন্তার পর এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র (রা) বর্ণনা করেছেন: ৩৮৯
'উমার ইবন আল-খাত্তাব সুন্নাহ লিপিবদ্ধকরণের ইচ্ছা করেন। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের মতামত তলব করেন। তাঁরা লেখার প্রতি ইঙ্গিত করেন। অতঃপর 'উমার (রা) এক মাস যাবত এ ব্যাপারে আল্লাহর নিকট ইসতিখারা (সঠিক ও কল্যাণকর কোনটি তা জানার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা) করতে থাকেন। আল্লাহ তাঁকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফীক দান করেন। তিনি বলেন: আমি ইচ্ছা করেছিলাম সুন্নাহ লিপিবদ্ধকরণের। সাথে একথাও স্মরণ করলাম, তোমাদের পূর্ববর্তী সেই সম্প্রদায়ের কথা যারা গ্রন্থ রচনা করেছিল এবং আল্লাহর কিতাব ছেড়ে তাই নিয়ে মেতে উঠেছিল। আল্লাহর কসম! আমি কখনো আল্লাহর কিতাবের সাথে কোন কিছু সংমিশ্রণ ঘটাবো না।'

যখন উপরোক্ত আশঙ্কা দূর হয়ে যায় এবং সুন্নাহ লেখার প্রয়োজনও দেখা দেয়, তখন আর লেখালেখি খারাপ মনে করা হতো না। একথা প্রমাণিত যে, বহু সাহাবী হাদীছ লিপিবদ্ধ করা দোষণীয় মনে করেননি, তাঁরা নিজেদের জন্য কিছু কিছু হাদীছ লিখে রেখেছেন, তাঁদের ছাত্র-শিষ্যরা তাঁদের সামনে হাদীছ লিখেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা হাদীছ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও লেখার জন্য উপদেশ দিতেন। ইবনুস সালাহ বলেন:
'অতঃপর এই মতবিরোধ দূর হয়ে যায় এবং মুসলমানরা হাদীছ লেখার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছে। যদি তা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা না হতো তাহলে পরবর্তীকালে তা বিলীন হয়ে যেত।'

একথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে, হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) সর্বপ্রথম সরকারীভাবে হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণের ফরমান জারি করেন। তবে একথা সত্য যে, তাঁর পিতা 'আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান মিসরের ওয়ালী থাকাকালে হাদীছ লিপিবদ্ধকরণের প্রয়োজন অনুভব করেন। এ ব্যাপারে তাঁর লেখা একটি পত্র ইবন সা'দ লাইছ ইবন সা'দের সূত্রে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:
'ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব আমাকে বলেছেন, 'আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান কুছায়্যির ইবন মুররা আল-হাদরামীকে লেখেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের নিকট থেকে যে সকল হাদীছ শুনেছেন তা যেন তাঁকে লিখে পাঠান। তবে আবূ হুরায়রার (রা) হাদীছ পাঠানোর প্রয়োজন নেই। কারণ, তা আমাদের নিকট আছে। উল্লেখ্য যে, এই কুছায়্যির ইবন মুররা হিমসে রাসূলুল্লাহর (সা) সত্তরজন বদরী সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন। লাইছ বলেন, তাঁকে 'অগবর্তী সৈনিক' নামে আখ্যায়িত করা হতো।'

হিমসের এই 'আলিমের নিকট মিসরের আমীরের এ পত্রটি লেখা হয় সম্ভবতঃ হিজরী ৭৫ সনে বা তার কাছাকাছি সময়ে। কারণ, কুছায়্যির হিজরী ৭৫ থেকে ৮০ সনের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে ইনতিকাল করেন। ৩৯০

তবে 'আবদুল 'আযীযের পরে তাঁর সুযোগ্য পুত্র আমীরুল মু'মিনীন 'উমার হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণের সত্যিকার ফলপ্রসু উদ্যোগ ও ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি সর্বত্র ও সর্বদা একথাটি উচ্চারণ করতে থাকেন: ৩১১
'ওহে জনগণ! দান-অনুগ্রহকে কৃতজ্ঞতা দ্বারা এবং জ্ঞানকে গ্রন্থের দ্বারা বন্দী কর।'

তিনি মানুষকে শুধু এতটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলের 'আলিমদেরকে হাদীছ সংগ্রহ ও লেখার নির্দেশ দেন। কারণ, বহু তাবি'ঈ যাঁরা তাঁদের বক্ষে রাসূলুল্লাহর (সা) বহু বাণী ধারণ করে রেখেছিলেন, 'উমার আশঙ্কা করেছিলেন, সাহাবীগণের যুগ শেষ হতে চলেছে, আর তাবি'ঈদের এই প্রজন্মটি দুনিয়া থেকে চলে গেলে এই হাদীছও বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে। তাছাড়া স্মৃতিতে ধারণ করার মত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গও সবসময় পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে গ্রন্থে লিখিত না থাকায় প্রয়োজনের সময় হাদীছ দ্বারা উপকারও পাওয়া যায় না। এ সকল কারণের পাশাপাশি আরো একটি বড় বিপদ তখন দেখা দেয়- আর তা হলো, বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর উদ্ভবের ফলে জাল ও মিথ্যা হাদীছ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফলে কোনটি বিশুদ্ধ হাদীছ, আর কোনটি জাল হাদীছ তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। কালক্রমে এ বিপদ আরো বৃদ্ধি পাবে, এ আশঙ্কায় 'উমারের মত আরো অনেক 'আলিম, তাবি'ঈ উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন।

টিকাঃ
৩৮৯. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৭৪-৭৫
৩৯০. তাবাকাত-৭/৪৪৮; উসূল আল-হাদীছ-১৭৬, ২১৮-২১৯
৩৯১. ইবনুল জাওযী-২৭৬
৩৯২. উসূল আল-হাদীছ-১৭৬-১৭৭, ১৮৬

ইসলামের প্রাথমিক পর্বে হযরত রাসূলে কারীম (সা) কেবল কুরআন ছাড়া আর কোন কিছু লেখার প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, অন্য যা কিছু লেখা হবে তা হয়তো কালক্রমে কুরআনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে এবং মানুষ তা কুরআন মনে করে চর্চা শুরু করে দেবে। পরবর্তীকালে রাসূল (সা) এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন এবং কুরআনের সাথে সাথে হাদীছও লেখার অনুমতি দান করেন। খতীব আল-বাগদাদী বলেন: কিতাবুল্লাহর সাথে যাতে অন্য কোন কিছু মিলেমিশে না যায় অথবা মানুষ কুরআন ছেড়ে অন্য কোন কিছু নিয়ে মাতামাতি শুরু করে না দেয়, এ কারণে ইসলামের প্রথম পর্বে হাদীছ লেখা অপছন্দনীয় কাজ মনে করা হয়েছে। তাছাড়া সে সময় ইসলামের তত্ত্বজ্ঞানী লোকের সংখ্যা ছিল অনেক কম। পল্লী এলাকার যে সকল বেদুঈন ইসলাম গ্রহণ করেছিল, দীন সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ছিল খুবই অপ্রতুল। তারা ওহী এবং ওহী বহির্ভূত বাণীর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম ছিল না। লিখিত কোন কিছু দেখলেই তারা কুরআন মনে করে ভুল করতে পারতো। এ কারণে তখন হাদীছ লেখালেখির জন্য অনুমতি বা উৎসাহ দেওয়া হয়নি।

'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণের চিন্তা করেন। দীর্ঘ ভাবনা-চিন্তার পর এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র (রা) বর্ণনা করেছেন: ৩৮৯
'উমার ইবন আল-খাত্তাব সুন্নাহ লিপিবদ্ধকরণের ইচ্ছা করেন। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের মতামত তলব করেন। তাঁরা লেখার প্রতি ইঙ্গিত করেন। অতঃপর 'উমার (রা) এক মাস যাবত এ ব্যাপারে আল্লাহর নিকট ইসতিখারা (সঠিক ও কল্যাণকর কোনটি তা জানার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা) করতে থাকেন। আল্লাহ তাঁকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফীক দান করেন। তিনি বলেন: আমি ইচ্ছা করেছিলাম সুন্নাহ লিপিবদ্ধকরণের। সাথে একথাও স্মরণ করলাম, তোমাদের পূর্ববর্তী সেই সম্প্রদায়ের কথা যারা গ্রন্থ রচনা করেছিল এবং আল্লাহর কিতাব ছেড়ে তাই নিয়ে মেতে উঠেছিল। আল্লাহর কসম! আমি কখনো আল্লাহর কিতাবের সাথে কোন কিছু সংমিশ্রণ ঘটাবো না।'

যখন উপরোক্ত আশঙ্কা দূর হয়ে যায় এবং সুন্নাহ লেখার প্রয়োজনও দেখা দেয়, তখন আর লেখালেখি খারাপ মনে করা হতো না। একথা প্রমাণিত যে, বহু সাহাবী হাদীছ লিপিবদ্ধ করা দোষণীয় মনে করেননি, তাঁরা নিজেদের জন্য কিছু কিছু হাদীছ লিখে রেখেছেন, তাঁদের ছাত্র-শিষ্যরা তাঁদের সামনে হাদীছ লিখেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা হাদীছ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও লেখার জন্য উপদেশ দিতেন। ইবনুস সালাহ বলেন:
'অতঃপর এই মতবিরোধ দূর হয়ে যায় এবং মুসলমানরা হাদীছ লেখার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছে। যদি তা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা না হতো তাহলে পরবর্তীকালে তা বিলীন হয়ে যেত।'

একথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে, হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) সর্বপ্রথম সরকারীভাবে হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণের ফরমান জারি করেন। তবে একথা সত্য যে, তাঁর পিতা 'আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান মিসরের ওয়ালী থাকাকালে হাদীছ লিপিবদ্ধকরণের প্রয়োজন অনুভব করেন। এ ব্যাপারে তাঁর লেখা একটি পত্র ইবন সা'দ লাইছ ইবন সা'দের সূত্রে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:
'ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব আমাকে বলেছেন, 'আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান কুছায়্যির ইবন মুররা আল-হাদরামীকে লেখেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের নিকট থেকে যে সকল হাদীছ শুনেছেন তা যেন তাঁকে লিখে পাঠান। তবে আবূ হুরায়রার (রা) হাদীছ পাঠানোর প্রয়োজন নেই। কারণ, তা আমাদের নিকট আছে। উল্লেখ্য যে, এই কুছায়্যির ইবন মুররা হিমসে রাসূলুল্লাহর (সা) সত্তরজন বদরী সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন। লাইছ বলেন, তাঁকে 'অগবর্তী সৈনিক' নামে আখ্যায়িত করা হতো।'

হিমসের এই 'আলিমের নিকট মিসরের আমীরের এ পত্রটি লেখা হয় সম্ভবতঃ হিজরী ৭৫ সনে বা তার কাছাকাছি সময়ে। কারণ, কুছায়্যির হিজরী ৭৫ থেকে ৮০ সনের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে ইনতিকাল করেন। ৩৯০

তবে 'আবদুল 'আযীযের পরে তাঁর সুযোগ্য পুত্র আমীরুল মু'মিনীন 'উমার হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণের সত্যিকার ফলপ্রসু উদ্যোগ ও ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি সর্বত্র ও সর্বদা একথাটি উচ্চারণ করতে থাকেন: ৩১১
'ওহে জনগণ! দান-অনুগ্রহকে কৃতজ্ঞতা দ্বারা এবং জ্ঞানকে গ্রন্থের দ্বারা বন্দী কর।'

তিনি মানুষকে শুধু এতটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলের 'আলিমদেরকে হাদীছ সংগ্রহ ও লেখার নির্দেশ দেন। কারণ, বহু তাবি'ঈ যাঁরা তাঁদের বক্ষে রাসূলুল্লাহর (সা) বহু বাণী ধারণ করে রেখেছিলেন, 'উমার আশঙ্কা করেছিলেন, সাহাবীগণের যুগ শেষ হতে চলেছে, আর তাবি'ঈদের এই প্রজন্মটি দুনিয়া থেকে চলে গেলে এই হাদীছও বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে। তাছাড়া স্মৃতিতে ধারণ করার মত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গও সবসময় পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে গ্রন্থে লিখিত না থাকায় প্রয়োজনের সময় হাদীছ দ্বারা উপকারও পাওয়া যায় না। এ সকল কারণের পাশাপাশি আরো একটি বড় বিপদ তখন দেখা দেয়- আর তা হলো, বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর উদ্ভবের ফলে জাল ও মিথ্যা হাদীছ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফলে কোনটি বিশুদ্ধ হাদীছ, আর কোনটি জাল হাদীছ তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। কালক্রমে এ বিপদ আরো বৃদ্ধি পাবে, এ আশঙ্কায় 'উমারের মত আরো অনেক 'আলিম, তাবি'ঈ উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন।

টিকাঃ
৩৮৯. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৭৪-৭৫
৩৯০. তাবাকাত-৭/৪৪৮; উসূল আল-হাদীছ-১৭৬, ২১৮-২১৯
৩৯১. ইবনুল জাওযী-২৭৬
৩৯২. উসূল আল-হাদীছ-১৭৬-১৭৭, ১৮৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px