📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 জ্ঞানের জগতে ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয (রহ)

📄 জ্ঞানের জগতে ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীয (রহ)


ইসলাম জ্ঞান অন্বেষণের প্রতি দারুণ উৎসাহ দিয়েছে। মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে চিন্তা ও অনুধ্যানের প্রতি। নানাভাবে মানুষের বুদ্ধি-বিবেক ও মেধা-মননকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। আল-কুরআনে জ্ঞানীদের প্রশংসা করে তাদের উঁচু মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন: ৩৪২

وَتِلْکَ الْاَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يَعْقِلُهَا اِلَّا الْعَالِمُوْنَ.

'এ সকল দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য দেই, কিন্তু কেবল জ্ঞানী ব্যক্তিরাই তা বুঝে।' তিনি আরো বলেছেন: ৩৪৩

يَرْفَعِ اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْ وَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ دَرَجٰتٍ.

'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন।'

হযরত রাসূলে কারীমের পবিত্র হাদীছে 'ইলম ও ইবাদাত তথা জ্ঞান ও উপাসনার তুলনা করে ইলমকে প্রাধান্য দান করা হয়েছে। তেমনিভাবে জ্ঞান চর্চার প্রধান উপকরণ লেখার কালিকে শহীদের পবিত্র রক্তের সমান মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে। জ্ঞান অন্বেষণে উৎসাহব্যাঞ্জক রাসূলুল্লাহর (সা) বাণীসমূহের কয়েকটি অংশ নিম্নরূপ:

(১) العلم زينة أمام الأصدقاء وسلاح أمام الأعداء.
(২) ترفرف ملائكة الله بأجنحتها فوق طالب العلم.
(৩) أول ما خلق الله العقل، ولم يخلق أفضل منه.

১. জ্ঞান হচ্ছে বন্ধুদের সামনে সাজ-সজ্জা ও শোভা এবং শত্রুদের সামনে অস্ত্রস্বরূপ।
২. জ্ঞান অন্বেষণকারীর মাথার উপর আল্লাহর ফেরেশতারা তাদের ডানা দ্বারা ছায়া দিতে থাকে।
৩. আল্লাহ সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেছেন তা হলো বুদ্ধি ও জ্ঞান। এর চেয়ে ভালো আর কিছু সৃষ্টি করেননি।

খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কিরাম এ সকল আয়াত ও হাদীছের আলোকে নিজেদের জীবন পরিচালনা করেছেন। নিজেদের সময়ে তাঁরা মূর্খতা, গোঁড়ামী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মানুষকে জ্ঞান ও আলোর দিকে নিয়ে এসেছেন। সাহাবায়ে কিরামের এমনই আবহ ও পরিবেশে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বেড়ে ওঠেন।

মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন শৈশবেই 'উমারের প্রকৃতির মধ্যে জ্ঞানের প্রতি তীব্র আকর্ষণ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। এ কারণে ছোটবেলাতেই জ্ঞানের কেন্দ্র ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের মজলিসের প্রতি তিনি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করতেন। তিনি যখন মিসরে তখন পিতাকে বলতেন: ৩৪৪

ترحلني إلى المدينة، فاقعد إلى فقهائها وأتأدب بهم.

'আমাকে মদীনায় নিয়ে চলুন। আমি সেখানকার ফকীহদের মজলিসে বসবো এবং তাঁদের নিকট জ্ঞান ও আচার-আচরণ শিখবো।' এ কারণে দেখা যায়, কৈশোর-যৌবনে তার সমবয়সী কিশোর-যুবকদের থেকে দূরে থাকতেন। অন্যরা যখন খেলাধুলা ও গল্প-গুজবে সময় কাটাতো তখন তিনি জ্ঞানী ব্যক্তিদের মজলিসে আসা-যাওয়া করতেন। এ ব্যাপারে তাঁর নিজের বক্তব্য শোনা যাক: ৩৪৫

ولقد رأيتني وأنا بالمدينة غلام مع الغلمان، ثم تاقت نفسي إلى العلم، إلى العربية فالشعر، فأصبت منه حاجتي.

'আমি আমার বাল্যকালে মদীনায় বালকদের সাথে খেলতাম। তারপর জ্ঞানের প্রতি, আরবী ভাষার প্রতি, অতঃপর কবিতার প্রতি আমার অন্তর আকৃষ্ট হয়ে পড়লো। আমি তার থেকে আমার প্রয়োজন মত গ্রহণ করলাম।' এরপর তিনি জ্ঞান অন্বেষণে একাগ্র হয়ে পড়েন। ফকীহদের মজলিসে, মুহাদ্দিছদের হালকায় দীর্ঘ সময় ধরে বসে বসে গভীর মনোযোগ সহকারে তাঁদের আলোচনা শুনতেন। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে অধ্যয়ন, লেখালেখি, আলোচনা, বিতর্ক অথবা বিশিষ্ট আলিমদের দারসে অংশগ্রহণ ইত্যাদির মধ্যে তাঁর সময় কাটতো। তখনকার দিনের জ্ঞান চর্চার প্রধান কেন্দ্র মদীনার পবিত্র ভূমিতে এভাবে জীবনের একটা দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে নিজকে যোগ্য করে গড়ে তোলেন।

টিকাঃ
৩৪২. সূরা আল-'আনকাবুত-৪৩
৩৪৩. সূরা আল-মুজাদালা-১১
৩৪৪. ইবনুল জাওযী-১৪
৩৪৫. প্রাগুক্ত

ইসলাম জ্ঞান অন্বেষণের প্রতি দারুণ উৎসাহ দিয়েছে। মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে চিন্তা ও অনুধ্যানের প্রতি। নানাভাবে মানুষের বুদ্ধি-বিবেক ও মেধা-মননকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। আল-কুরআনে জ্ঞানীদের প্রশংসা করে তাদের উঁচু মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন: ৩৪২

وَتِلْکَ الْاَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يَعْقِلُهَا اِلَّا الْعَالِمُوْنَ.

'এ সকল দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য দেই, কিন্তু কেবল জ্ঞানী ব্যক্তিরাই তা বুঝে।' তিনি আরো বলেছেন: ৩৪৩

يَرْفَعِ اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْ وَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ دَرَجٰتٍ.

'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন।'

হযরত রাসূলে কারীমের পবিত্র হাদীছে 'ইলম ও ইবাদাত তথা জ্ঞান ও উপাসনার তুলনা করে ইলমকে প্রাধান্য দান করা হয়েছে। তেমনিভাবে জ্ঞান চর্চার প্রধান উপকরণ লেখার কালিকে শহীদের পবিত্র রক্তের সমান মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে। জ্ঞান অন্বেষণে উৎসাহব্যাঞ্জক রাসূলুল্লাহর (সা) বাণীসমূহের কয়েকটি অংশ নিম্নরূপ:

(১) العلم زينة أمام الأصدقاء وسلاح أمام الأعداء.
(২) ترفرف ملائكة الله بأجنحتها فوق طالب العلم.
(৩) أول ما خلق الله العقل، ولم يخلق أفضل منه.

১. জ্ঞান হচ্ছে বন্ধুদের সামনে সাজ-সজ্জা ও শোভা এবং শত্রুদের সামনে অস্ত্রস্বরূপ।
২. জ্ঞান অন্বেষণকারীর মাথার উপর আল্লাহর ফেরেশতারা তাদের ডানা দ্বারা ছায়া দিতে থাকে।
৩. আল্লাহ সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেছেন তা হলো বুদ্ধি ও জ্ঞান। এর চেয়ে ভালো আর কিছু সৃষ্টি করেননি।

খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কিরাম এ সকল আয়াত ও হাদীছের আলোকে নিজেদের জীবন পরিচালনা করেছেন। নিজেদের সময়ে তাঁরা মূর্খতা, গোঁড়ামী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মানুষকে জ্ঞান ও আলোর দিকে নিয়ে এসেছেন। সাহাবায়ে কিরামের এমনই আবহ ও পরিবেশে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বেড়ে ওঠেন।

মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন শৈশবেই 'উমারের প্রকৃতির মধ্যে জ্ঞানের প্রতি তীব্র আকর্ষণ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। এ কারণে ছোটবেলাতেই জ্ঞানের কেন্দ্র ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের মজলিসের প্রতি তিনি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করতেন। তিনি যখন মিসরে তখন পিতাকে বলতেন: ৩৪৪

ترحلني إلى المدينة، فاقعد إلى فقهائها وأتأدب بهم.

'আমাকে মদীনায় নিয়ে চলুন। আমি সেখানকার ফকীহদের মজলিসে বসবো এবং তাঁদের নিকট জ্ঞান ও আচার-আচরণ শিখবো।' এ কারণে দেখা যায়, কৈশোর-যৌবনে তার সমবয়সী কিশোর-যুবকদের থেকে দূরে থাকতেন। অন্যরা যখন খেলাধুলা ও গল্প-গুজবে সময় কাটাতো তখন তিনি জ্ঞানী ব্যক্তিদের মজলিসে আসা-যাওয়া করতেন। এ ব্যাপারে তাঁর নিজের বক্তব্য শোনা যাক: ৩৪৫

ولقد رأيتني وأنا بالمدينة غلام مع الغلمان، ثم تاقت نفسي إلى العلم، إلى العربية فالشعر، فأصبت منه حاجتي.

'আমি আমার বাল্যকালে মদীনায় বালকদের সাথে খেলতাম। তারপর জ্ঞানের প্রতি, আরবী ভাষার প্রতি, অতঃপর কবিতার প্রতি আমার অন্তর আকৃষ্ট হয়ে পড়লো। আমি তার থেকে আমার প্রয়োজন মত গ্রহণ করলাম।' এরপর তিনি জ্ঞান অন্বেষণে একাগ্র হয়ে পড়েন। ফকীহদের মজলিসে, মুহাদ্দিছদের হালকায় দীর্ঘ সময় ধরে বসে বসে গভীর মনোযোগ সহকারে তাঁদের আলোচনা শুনতেন। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে অধ্যয়ন, লেখালেখি, আলোচনা, বিতর্ক অথবা বিশিষ্ট আলিমদের দারসে অংশগ্রহণ ইত্যাদির মধ্যে তাঁর সময় কাটতো। তখনকার দিনের জ্ঞান চর্চার প্রধান কেন্দ্র মদীনার পবিত্র ভূমিতে এভাবে জীবনের একটা দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে নিজকে যোগ্য করে গড়ে তোলেন।

টিকাঃ
৩৪২. সূরা আল-'আনকাবুত-৪৩
৩৪৩. সূরা আল-মুজাদালা-১১
৩৪৪. ইবনুল জাওযী-১৪
৩৪৫. প্রাগুক্ত

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 সুযোগ্য শিক্ষকবৃন্দ

📄 সুযোগ্য শিক্ষকবৃন্দ


তিনি অনেক সাহাবী ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈর নিকট থেকে সেকালে প্রচলিত জ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জন করেন। সাহাবী শিক্ষকরা হলেন: আনাস ইবন মালিক, তিনি তাঁর থেকে হাদীছ শুনেছেন। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার ইবন আল-খাত্তাব, আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার ইবন আবী তালিব, 'উমার ইবন আবী সালামা আল-মাখযূমী, আস-সায়িব ইবন ইয়াযীদ, ইউসুফ ইবন সাল্লাম, 'উবাদা ইবন আস-সামিত, 'উকবা ইবন 'আমির, 'আয়িশা, খাওলা বিন্ত হাকীম (রা) ও আরো অনেকে।

উঁচু স্তরের একদল তাবি'ঈর নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং বর্ণনাও করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন: সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, আবু বকর ইবন 'আবদির রহমান ইবন আল-হারিছ, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার, 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র, আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান ইবন 'আওফ, 'আমির ইবন সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, খারিজা ইবন যায়দ ইবন ছাবিত, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা, আবু বুরদা ইবন আবী মূসা, ইবন শিহাব আয-যুহরী (রহ) এবং আরো অনেকে। ৩৪৬

আল-ইমাম আল-হাফেজ আল-বাগান্দী (মৃ. ৩১২ হি.) 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বর্ণিত সকল হাদীছ তাঁর বিখ্যাত "মুসনাদ" গ্রন্থে সংকলন করেছেন। তাঁর হাদীছের শায়খদের (উস্তাদ) সংখ্যা তেত্রিশ জনে পৌঁছেছে। তাঁদের মধ্যে আটজন সাহাবী এবং পঁচিশজন তাবি'ঈ।

তাঁর কয়েকজন মহান শায়খ ও শিক্ষকবৃন্দের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

১. 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) (হি. পৃ. ১০-হি. ৭৩): একজন মহান সাহাবী, অনুসরণীয় ইমাম, দুনিয়া বিরাগী 'আবিদ, মহাজ্ঞানী, মুজাহিদ, মুত্তাকী-পরহেযগার ব্যক্তি। জ্ঞান ও কর্মে তিনি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী। সাহাবী সমাজে তাঁকে খলীফা হওয়ার যোগ্য মনে করা হতো। ষাট বছর যাবত তিনি ফাতওয়া দানের দায়িত্ব পালন করেন। কোন কারণে জামা'আতে 'ঈশার নামায আদায় করতে না পারলে সে রাতে আর শয্যায় যেতেন না। ইবাদাত-বন্দেগীতে কাটিয়ে দিতেন। অত্যন্ত কঠোরভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) পদাঙ্ক অনসুরণ করতেন। 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) সন্তানদের মধ্যে তিনিই সর্বাধিক পিতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন।
হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন : إن عبد الله رجل صالح ، لو كان يقوم الليل. 'আবদুল্লাহ একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ, যদি সে কিয়ামুল লাইল করতো অর্থাৎ রাতে নামাযে দাঁড়াতো।' রাসূলুল্লাহর (সা) একথার পর থেকে আমরণ 'কিয়ামুল লাইল' করেছেন। যে সকল দাস-দাসী তিনি মুক্ত করেছেন তার সংখ্যা এক হাজার। উদার হস্তে দান করতেন। একবার এক বৈঠকে ত্রিশ হাজার দিরহাম বিলিয়ে দেন। হযরত জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ (রা) বলেন: ما منا أحد أدرك الدنيا إلا مالت به ومال بها إلا ابن عمر. 'আমাদের মধ্যে একমাত্র ইবন 'উমার ছাড়া আর যে কেউ দুনিয়া পেয়েছে, দুনিয়া তাঁর প্রতি ঝুঁকেছে এবং সেও দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকেছে।'
হযরত রাসূলে কারীম (সা) থেকে সর্বমোট ২৬৩০টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি মক্কায় মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবী। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে ভীষণ পছন্দ করতেন। সেই শৈশবে তিনি মাকে বলতেন, আমি আমার মামার (ইবন 'উমার) মত হবো। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন তাঁর বাসনা পূরণ করেন। পরবর্তী জীবনে সত্যিকার অর্থে তিনি ইবন 'উমারের (রা) অনুসারী হন।

২. আনাস ইবন মালিক (রা): (হি. পৃ. ১০-হি. ৯৩): তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনসারী সাহাবী, তাঁর বিশ্বস্ত খাদেম, ইমাম, মুফতী, কারী, মুহাদ্দিছ। মদীনার খায়রাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহর (সা) দীর্ঘ সাহচর্য লাভ করেন। তাঁর মদীনায় আগমনের পর থেকে ওফাত পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁর খিদমত করেন। একাধিক যুদ্ধে তাঁর সাথে অংশগ্রহণ করেন। হুদায়বিয়ার 'বাই'য়াতে শাজারা'র অন্যতম সদস্য। হযরত নবী কারীম (সা) তাঁর জন্য দু'আ করেছেন যা তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা) আমার জন্য এভাবে দু'আ করেছেন:
اللهم أكثر ماله وولده وأطل حياته.
'হে আল্লাহ! তুমি তার অর্থ-বিত্ত ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধি দাও এবং তার জীবনকাল দীর্ঘ কর।' আল্লাহ আমার সম্পদে এত সমৃদ্ধি দান করেন যে, আমার একটি আঙ্গুরের বাগান ছিল যাতে বছরে দু'বার ফল আসতো এবং আমার ঔরসজাত সন্তান সংখ্যা এক শ' ছয় জন।
তিনি এত বেশী নামায পড়তেন যে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর দু'টি পা ফুলে যেত। হযরত রাসূলে কারীমের ২২৮৬ (দু'হাজার দু'শত ছিয়াশি) টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি বসরায় মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবী।
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর নিকট থেকে হাদীছ শুনেছেন। খলীফা ওয়ালীদের সময় মদীনার ওয়ালী থাকাকালেও এ ধারা অব্যাহত ছিল। হাম্স ইবন 'উমার ইবন আবী তালহা আল-আনসারী বলেন: খলীফা ওয়ালীদের সময় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যখন মদীনার ওয়ালী, তখন একবার তিনি মদীনা থেকে হজ্জে যাওয়ার ইরাদা করেন। তখন একদিন আনাস ইবন মালিক (রা) তাঁর নিকট আসেন। 'উমার তাঁকে বলেন: আবূ হামযা! আপনি কি আমাদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) ভাষণ সম্পর্কে অবহিত করবেন না? আনাস বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় 'ইউমুত তারবিয়‍্যা'র একদিন পূর্বে, 'আরাফার দিন 'আরাফাতে, মিনায় কুরবানীর দিন সকালে এবং মিনা ত্যাগের দিন সকালে খুতবা দেন। ৩৪৭

৩. 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাস'উদ (রা) (মৃ. হি. ৯৮): একজন ইমাম, মদীনার আলিম, মুফতী, সাতজন শ্রেষ্ঠ ফকীহর একজন। ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। মদীনার অধিবাসী অন্ধ মানুষ ছিলেন। তাঁর দাদা উতবা ছিলেন মহান সাহাবী 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) ভাই।
তিনি ছিলেন বিশাল জ্ঞানের অধিকারী মানুষ। হাদীছ ও কবিতায় ছিল তাঁর সীমাহীন জ্ঞান।
ইমাম 'যুহরী বলেন, আমি যখনই কোন 'আলিমের নিকট বসেছি, তাঁর সবটুকু জ্ঞান নিয়ে তবে উঠেছি। আমি 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়রের (রা) নিকট মাঝে মাঝে যেতাম। তাঁর কাছে একই কথা বার বার শুনতাম। তবে ব্যতিক্রম হলেন 'উবায়দুল্লাহ, তাঁর কাছে যতবার গিয়েছি নতুন নতুন জ্ঞান লাভ করেছি। তাঁর সম্পর্কে যুহরী আরো বলেন: আমি মনে করতাম আমি যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করে ফেলেছি। কিন্তু আমি যখন 'উবায়দুল্লাহর সান্নিধ্যে গেলাম, মনে হলো আমি সাগরকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করছি। ইবন 'আবদিল বার বলেন: 'উবায়দুল্লাহ ছিলেন শ্রেষ্ঠ দশ ফকীহর একজন। ফাতওয়ার বিষয়টি যে সাতজনের মধ্যে চক্রাকারে ঘুরতো তিনি তাদেরও অন্যতম। তিনি একজন উঁচু স্তরের 'আলিম, ফিক্ বিষয়ে অগ্রগামী, আল্লাহভীরু ও মননশীল কবি। আমার জানা মতে, সাহাবীদের পর থেকে নিয়ে আমাদের সময় পর্যন্ত কোন ফকীহ তাঁর চেয়ে ভালো কবি হননি, তেমনিভাবে কোন কবি তাঁর মতো ভালো ফকীহ হননি।
এমন মহান ইমামের দারসের মজলিসে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বসেছেন, তাঁর জ্ঞানের সাগর থেকে অঞ্জলী ভরে গ্রহণ করেছেন, তাঁর আদব-আখলাকে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাই অনেকের ধারণা 'উমার জ্ঞান-গরীমা, আদব-আখলাক ও রুচি-সংস্কৃতিতে মহান শিক্ষককেও ছাড়িয়ে গেছেন। তাই 'আলিমগণ 'উবায়দুল্লাহর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন: هو معلم عمر بن عبد العزيز - তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের শিক্ষক।
একবার 'উবায়দুল্লাহ নিম্নের স্বরচিত কবিতাটি 'উমারকে লিখে পাঠান:

بسم الله الذي أنزلت من عنده السور + والحمد لله أما بعد ياعمر
إن كنت تعلم ما تأتى وما تذر + فكن على حذر قد ينفع الحذر
واصبر على القدر المحتوم وارض به + وإن أتاك بما لا تشتهى القدر.
فما صفا لامرئ عيش يسر به + الا سيتبع يوما صفوه كَدَرُ.

'সেই আল্লাহর নামে যাঁর নিকট থেকে এই সূরাগুলো নাযিল হয়েছে। সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর। অতঃপর হে 'উমার!
যদি তুমি জানতে পার যা কিছু আসে এবং যা কিছু আসে না সে সম্পর্কে, তাহলে তুমি সতর্ক হবে। সতকর্তা উপকারে আসে।
অবশ্যম্ভাবী তাকদীরের উপর ধৈর্য ধারণ করবে এবং তার আচরণে সন্তুষ্ট থাকবে, যদিও সেই তাকদীর তোমার জীবনে এমন কিছু নিয়ে আসে যা তুমি মোটেও কামনা করনি।
মানুষের স্বচ্ছ আনন্দময় জীবনকে এমন একটা দিন সব সময় অনুসরণ করছে যা তার স্বচ্ছতাকে ঘোলা করে দেবে।'

এ কারণে 'উমার যখন মদীনার ওয়ালী, তখন সব সময় তাঁর নিকট আসা-যাওয়া করতেন, তাঁর মজলিসে বসতেন। অনেক সময় হয়তো উস্তাদের সাক্ষাৎ পেতেন না, তাতে তিনি মোটেও বিরক্ত না হয়ে পরের দিন আবার যেতেন। ইবন আবী আয-যিনাদ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'উমার মদীনার ওয়ালী থাকাকালে অনেক সময় আমি তাঁকে 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহর গৃহের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। কখনো ঢোকার অনুমতি পেতেন, কখনো পেতেন না। 'উমার তাঁর এই শিক্ষকের প্রতি এতই মুগ্ধ ছিলেন যে, প্রায়ই বলতেন:
لمجلس من الأعمى : عبيد الله بن عبد الله بن عتبة بن مسعود، أحب إلى من ألف دينار.
'অন্ধ 'উবায়দুল্লাহর একটি মজলিস আমার নিকট হাজার দীনারের চেয়েও প্রিয়।' তিনি তাঁর খিলাফতকালে বলতেন:
لو كان عبيد الله حيا ما صدرت الا عن رأيه ، ولوددت أن لى بيوم واحد من عبيد الله كذا وكذا.
'যদি 'উবায়দুল্লাহ জীবিত থাকতেন তাহলে আমি তাঁর মতামত ব্যতীত কোন ফরমান জারী করতাম না। আর তাঁর একটি দিনের বিনিময়ে আমার এত এত কিছু হোক তাও চাইতাম না।
এই মহান শিক্ষকের প্রতি ছিল দৃঢ় আস্থা ও প্রবল নির্ভরতা। খলীফা হওয়ার পর বলতেন:
لو أدركني عبيد بن عبد الله بن عتبة إذ وقعت فيما وقعت فيه، لهان على ما أنا فيه.
'আমি যে অবস্থায় পড়েছি, এখন যদি 'উবায়দুল্লাহ জীবিত থাকতেন তাহলে এ অবস্থা আমার জন্য খুবই সহজ হয়ে যেত।' 'উমার তাঁর এই মহান শিক্ষকের সূত্রে বহু জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
لما رويت عن عبيد الله بن عبد الله بن عتبة أكثر مما رويت عن جميع الناس.
'আমি অন্য সকল মানুষের নিকট থেকে যা বর্ণনা করেছি, তার চেয়ে অনেক বেশী বর্ণনা করেছি এক 'উবায়দুল্লাহর নিকট থেকে। ৩৪৮

৪. সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) (মৃ. হি. ১০৬): দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ ও নির্মোহ স্বভাবের ইমাম, ফকীহ, মদীনার মুফতী, মদীনার সপ্ত ফকীহর অন্যতম, বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী, উঁচু স্তরের হাদীছ ব্যক্তিত্ব ও একান্ত আল্লাহভীরু তথা মুত্তাকী মানুষ ছিলেন। মুসলিম মনীষীদের মধ্যে যাঁদের জীবনে জ্ঞান ও কর্ম এবং দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতার প্রতি চরম বৈরাগ্য ভাব ও সম্মান-মর্যাদার সমন্বয় ঘটেছিল সালিম তাঁদের অন্যতম। তিনি তাঁর মহান পিতা 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) থেকে বহু হাদীছ বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ বলেন: একবার আমি সালিমকে তাঁর বর্ণিত একটি হাদীছ সম্পর্কে বললাম: আপনি কি হাদীছটি আপনার পিতা 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) থেকে শুনেছেন? তিনি বললেন: একবার? এক শো বারেরও বেশী! চেহারা-সুরতে, চলনে-বলনে তিনি পিতার অনুরূপ ছিলেন। সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন:
كان أشبه ولد عمر بعمر عبد الله، وأشبه ولد عبد الله بعبد الله سالم.
'উমারের (রা) সন্তানদের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ছিলেন 'উমারের সাথে বেশী সাদৃশ্যপূর্ণ, তেমনিভাবে 'আবদুল্লাহর সন্তানদের মধ্যে সালিম ছিলেন তাঁর পিতা 'আবদুল্লাহর সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ।' পিতা তাঁর পুত্রের দারুণ গুণমুগ্ধ ছিলেন। ভীষণ ভালোবাসতেন। তাঁর সমকালীন খলীফাগণ তাঁকে খুবই সমাদর ও সম্মান করতেন। একবার তিনি খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের দরবারে গেলে তিনি এগিয়ে এসে তাঁকে স্বাগতম- শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে সংগে করে তাঁর আসনে পাশাপাশি বসান। ইমাম মালিক (রহ) এই মনীষী সম্পর্কে বলেন: পূর্ববর্তী যে সকল সত্যনিষ্ঠ মনীষী চলে গেছেন, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখিতায় ও জ্ঞান-গরিমায় সালিমের যুগে তাঁদের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ তার চেয়ে আর কেউ ছিলেন না। ৩৪৯

৫. সালিহ ইবন কায়সান (মৃ. ১৪০ হি.): তিনি ছিলেন হাদীছের ইমাম, হাফেজ, হাদীছ বর্ণনায় বিশ্বস্ত, মদীনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম। একবার ইমাম আহমাদকে (রহ) সালিহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন: চমৎকার! চমৎকার! ইবন হিব্বান বলেন: সালিহ ছিলেন মদীনার অন্যতম ফকীহ, হাদীছ ও ফিক্হর সমাবেশস্থল এবং অত্যন্ত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও সম্মানীয় মানুষ। ইবন 'আবদিল বার বলেন: তিনি ছিলেন বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী, বিশ্বস্ত এবং হুজ্জাত তথা প্রমাণতুল্য মানুষ। 'উমারের ছোটবেলার শিক্ষক ছিলেন, অত্যন্ত যত্ন ও কঠোরতার সাথে শিক্ষার পাশাপাশি আদব-কায়দা, আচার- আচরণ ও শিষ্টাচারও শিক্ষা দেন। ৩৫০
পরে 'উমার তাঁর এই মহান শিক্ষককে নিজের সন্তানদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেন। নিজের পরামর্শক হিসেবে সব সময় নিজের কাছে রাখেন।

প্রথম জীবনে 'উমার কবিতার প্রতি ভীষণ অনুরক্ত হয়ে পড়েন। কাব্য চর্চায় অনুরাগী হয়ে ওঠেন। অসংখ্য কবিতা স্মৃতিতে ধারণ করেন। কবিতার একজন সমঝদার সমালোচকও হয়ে পড়েন। তাঁর সময়ে কাব্য চর্চা ইসলামী সমাজের উজ্জ্বলতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। সর্বত্র কবিতা রচনার প্রতিযোগিতা ও কবিতা পাঠের আসর জমে উঠতো। সে সময় আরব জগতের সর্বত্র মৌমাছির গুনগুন আওয়াজের মত কবিদের গুনগুনানি ধ্বনিত হতো। সে সময় আরব বিশ্বের সর্বাধিক খ্যাতিমান কবি ছিলেন তিনজন: জারীর, ফারাযদাক ও আখতাল। দীর্ঘকাল যাবত তাঁরা আরব বিশ্বের মানুষকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। 'উমারও তাঁদের দ্বারা ভীষণ প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তাঁর পিতা 'আবদুল 'আযীয মিসরের ওয়ালী থাকাকালে তাঁর দরবারে কবিদের আসর জমতো। পুরস্কার, দান-অনুগ্রহ লাভের জন্য সেখানে আহওয়াস, কুছায়্যির, 'ইয্যা, নুসায়ব ইবন রাবাহ-এর মত কবিগণ সমবেত হতেন। 'উমার তাঁদের সাথে মেলামেশা করতেন। এতে তিনি যথেষ্ট উপকার লাভ করেন। আরবী দিওয়ান থেকে অসংখ্য কবিতা মুখস্থ করেন, যা তাঁর ভাষা-সাহিত্যের শুদ্ধতায় অবদান রাখে এবং আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ বুঝতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

তিনি নৈতিক মূল্যবোধ ও ইসলামী ভাবধারাসম্পন্ন কবিতা পছন্দ করতেন এবং মাঝে মধ্যে এ জাতীয় কিছু কবিতা রচনাও করেছেন। ইবনুল জাওযী (রহ) তাঁর "সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ওয়া মানাকিবুহু" গ্রন্থে সেই সকল কবিতার কিছু সংকলন করেছেন। মদীনায় অত্যন্ত জনপ্রিয় এক প্রকার রাগ সঙ্গীত তাঁর নামে দীর্ঘকাল প্রচলিত ছিল। সম্ভবতঃ এ রাগ তিনি উদ্ভাবন করেন মদীনার ওয়ালী থাকাকালে। আর তখন তিনি বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। ৩৫১

পিতা 'আবদুল 'আযীযের ইনতিকালের পর চাচা খলীফা 'আবদুল মালিক তাঁকে নিজ পরিবারের সাথে যুক্ত করেন। খলীফা আবদুল মালিকও ছিলেন একজন বড় ফকীহ ও মুহাদ্দিছ। তাঁর সম্পর্কে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন: إن لمروان إبنا فقيها فسلوه 'মারওয়ানের একটি ফকীহ ছেলে আছে। তোমরা তাঁর কাছে জিজ্ঞেস কর।' তিনি আরো বলেন:
ولد الناس أبناء، وولد مروان أبا. 'মানুষ সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করে, আর মারওয়ানের জন্ম হয়েছে পিতা হিসেবে।'

আবুয যিনাদ বলেন: 'মদীনার ফকীহগণ হলেন, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'আবদুল মালিক, 'উরওয়া ও কুবাইসা ইবন যুওয়াইব।' ইমাম আশ-শা'বী বলেন: 'একমাত্র 'আবদুল মালিক ছাড়া আর যার কাছেই আমি বসেছি, নিজেকে তার উপর শ্রেষ্ঠ পেয়েছি।' ৩৫২ মোটকথা খলীফা আবদুল মালিক ছিলেন ক্ষণজন্মা পুরুষ। ধূর্ত রাজনীতিক হওয়া সত্ত্বেও শ্রেষ্ঠ ফকীহদের মধ্যে গণ্য করা হয়। কাব্য শাস্ত্রেও তাঁর প্রচণ্ড দখল ছিল। এমন একজন বিদ্বান চাচার তত্ত্বাবধান লাভ করেন 'উমার এবং নিজেকে চাচার মত গড়ে তোলার জন্য অনুপ্রাণিত হন।

'উমার উপলব্ধি করেছিলেন জ্ঞান চর্চাই তাঁর জীবন, আর এর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে মরণ। এ কারণে তিনি শত ব্যস্ততার মাঝেও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সঙ্গ উপভোগ করতেন, তাঁদের নিকট না জানা বিষয় প্রশ্ন করে জেনে নিিতেন। যেমন পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, হজ্জের সময় হযরত রাসূলে কারীম (সা) কোথায় কিভাবে খুতবা দিয়েছিলেন তা সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিককে (রা) প্রশ্ন করে জেনে নেন। অথচ তখন 'উমার মদীনার ওয়ালী। আরেকবার হাউজ সম্পর্কে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা) একটি হাদীছ বর্ণনাকারী একজন তাবি'ঈর মুখ থেকে শোনার জন্য তাঁকে আনতে লোক পাঠান। 'আব্বাস ইবন সালিম আল-লাখমী বলেন: ৩৫৩
بعث عمر بن عبد العزيز إلى أبي سلام الحبشي يُحمل على البريد، فلما قدم عليه قال : لقد شقّ على. قال عمر : ما أردنا ذلك ، ولكنه بلغنى عنك حديث ثوبان في الحوض، فأحببت أن أشافهك به ! فقال : سمعت ثوبان يقول : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : إن حوضى من عدن إلى عمان البلقاء، ماؤه اشد بياضا من اللبن واحلى من العسل، وأكوابه عدد نجوم السماء، من شرب منه شربة لم يظمأ بعدها أبدا، أول الناس ورودا عليه فقراء المهاجرين.
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ডাকের বাহনে চড়িয়ে আবী সাল্লাম আল-হাবশীকে আনার জন্য লোক পাঠালেন। যখন তিনি আসলেন, বললেন: আমার জন্য কষ্টকর হয়েছে। 'উমার বললেন: আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি, তবে আপনার সূত্রে "হাউজ” বিষয়ে ছাওবানের হাদীছটি পৌছেছে। সেটি আমি আপনার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছি। তিনি বললেন: আমি ছাওবানকে বলতে শুনেছি, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি: আমার হাউজ হবে 'আদন (এডেন) থেকে 'আম্মানের বালকা' পর্যন্ত প্রশস্ত। এর পানি হবে দুধের চেয়ে বেশী সাদা, মধুর চেয়ে মিষ্টি, এবং পেয়ালার সংখ্যা হবে আকাশের নক্ষত্ররাজির সম-সংখ্যক। কেউ একবার এর পানি পান করলে অনন্তকালের জন্য আর তৃণা অনুভব করবে না। এই হাউজে প্রথম অবতরণকারী হবে মুহাজিরদের দরিদ্র মানুষেরা।

টিকাঃ
৩৪৬. আয-যাহবী, তারীখ আল-ইসলাম-১/১৮৭-১৮৮; তাহযীব আত-তাহযীব-৭/৪৭; সিফাতুস সাফওয়া-২/১২৬-১২৭; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১১৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৮
৩৪৭. তাবাকাত-৫/৩৩১; সিয়ারু আ'লাম আল-নুবালা'-৩/৩৯৫; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৪
৩৪৮. ইবনুল জাওযী: ৮০-৯০; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৮
৩৪৯. তাবাকাত-৫/১৯৫; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১৯৩, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২৩৪
৩৫০. শাজারাতুয যাহ্ব-১/২০৮; তাহযীব আত-তাহযীব-৪/৩৫০; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৪৮
৩৫১. ইবুনল জাওযী-২২৫
৩৫২. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-৬১
৩৫৩. ইবনুল জাওযী: ৩২-৩৩

তিনি অনেক সাহাবী ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈর নিকট থেকে সেকালে প্রচলিত জ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জন করেন। সাহাবী শিক্ষকরা হলেন: আনাস ইবন মালিক, তিনি তাঁর থেকে হাদীছ শুনেছেন। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার ইবন আল-খাত্তাব, আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার ইবন আবী তালিব, 'উমার ইবন আবী সালামা আল-মাখযূমী, আস-সায়িব ইবন ইয়াযীদ, ইউসুফ ইবন সাল্লাম, 'উবাদা ইবন আস-সামিত, 'উকবা ইবন 'আমির, 'আয়িশা, খাওলা বিন্ত হাকীম (রা) ও আরো অনেকে।

উঁচু স্তরের একদল তাবি'ঈর নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং বর্ণনাও করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন: সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, আবু বকর ইবন 'আবদির রহমান ইবন আল-হারিছ, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার, 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র, আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান ইবন 'আওফ, 'আমির ইবন সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, খারিজা ইবন যায়দ ইবন ছাবিত, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা, আবু বুরদা ইবন আবী মূসা, ইবন শিহাব আয-যুহরী (রহ) এবং আরো অনেকে। ৩৪৬

আল-ইমাম আল-হাফেজ আল-বাগান্দী (মৃ. ৩১২ হি.) 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বর্ণিত সকল হাদীছ তাঁর বিখ্যাত "মুসনাদ" গ্রন্থে সংকলন করেছেন। তাঁর হাদীছের শায়খদের (উস্তাদ) সংখ্যা তেত্রিশ জনে পৌঁছেছে। তাঁদের মধ্যে আটজন সাহাবী এবং পঁচিশজন তাবি'ঈ।

তাঁর কয়েকজন মহান শায়খ ও শিক্ষকবৃন্দের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

১. 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) (হি. পৃ. ১০-হি. ৭৩): একজন মহান সাহাবী, অনুসরণীয় ইমাম, দুনিয়া বিরাগী 'আবিদ, মহাজ্ঞানী, মুজাহিদ, মুত্তাকী-পরহেযগার ব্যক্তি। জ্ঞান ও কর্মে তিনি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী। সাহাবী সমাজে তাঁকে খলীফা হওয়ার যোগ্য মনে করা হতো। ষাট বছর যাবত তিনি ফাতওয়া দানের দায়িত্ব পালন করেন। কোন কারণে জামা'আতে 'ঈশার নামায আদায় করতে না পারলে সে রাতে আর শয্যায় যেতেন না। ইবাদাত-বন্দেগীতে কাটিয়ে দিতেন। অত্যন্ত কঠোরভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) পদাঙ্ক অনসুরণ করতেন। 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) সন্তানদের মধ্যে তিনিই সর্বাধিক পিতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন।
হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন : إن عبد الله رجل صالح ، لو كان يقوم الليل. 'আবদুল্লাহ একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ, যদি সে কিয়ামুল লাইল করতো অর্থাৎ রাতে নামাযে দাঁড়াতো।' রাসূলুল্লাহর (সা) একথার পর থেকে আমরণ 'কিয়ামুল লাইল' করেছেন। যে সকল দাস-দাসী তিনি মুক্ত করেছেন তার সংখ্যা এক হাজার। উদার হস্তে দান করতেন। একবার এক বৈঠকে ত্রিশ হাজার দিরহাম বিলিয়ে দেন। হযরত জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ (রা) বলেন: ما منا أحد أدرك الدنيا إلا مالت به ومال بها إلا ابن عمر. 'আমাদের মধ্যে একমাত্র ইবন 'উমার ছাড়া আর যে কেউ দুনিয়া পেয়েছে, দুনিয়া তাঁর প্রতি ঝুঁকেছে এবং সেও দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকেছে।'
হযরত রাসূলে কারীম (সা) থেকে সর্বমোট ২৬৩০টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি মক্কায় মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবী। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে ভীষণ পছন্দ করতেন। সেই শৈশবে তিনি মাকে বলতেন, আমি আমার মামার (ইবন 'উমার) মত হবো। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন তাঁর বাসনা পূরণ করেন। পরবর্তী জীবনে সত্যিকার অর্থে তিনি ইবন 'উমারের (রা) অনুসারী হন।

২. আনাস ইবন মালিক (রা): (হি. পৃ. ১০-হি. ৯৩): তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনসারী সাহাবী, তাঁর বিশ্বস্ত খাদেম, ইমাম, মুফতী, কারী, মুহাদ্দিছ। মদীনার খায়রাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহর (সা) দীর্ঘ সাহচর্য লাভ করেন। তাঁর মদীনায় আগমনের পর থেকে ওফাত পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁর খিদমত করেন। একাধিক যুদ্ধে তাঁর সাথে অংশগ্রহণ করেন। হুদায়বিয়ার 'বাই'য়াতে শাজারা'র অন্যতম সদস্য। হযরত নবী কারীম (সা) তাঁর জন্য দু'আ করেছেন যা তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা) আমার জন্য এভাবে দু'আ করেছেন:
اللهم أكثر ماله وولده وأطل حياته.
'হে আল্লাহ! তুমি তার অর্থ-বিত্ত ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধি দাও এবং তার জীবনকাল দীর্ঘ কর।' আল্লাহ আমার সম্পদে এত সমৃদ্ধি দান করেন যে, আমার একটি আঙ্গুরের বাগান ছিল যাতে বছরে দু'বার ফল আসতো এবং আমার ঔরসজাত সন্তান সংখ্যা এক শ' ছয় জন।
তিনি এত বেশী নামায পড়তেন যে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর দু'টি পা ফুলে যেত। হযরত রাসূলে কারীমের ২২৮৬ (দু'হাজার দু'শত ছিয়াশি) টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি বসরায় মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবী।
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর নিকট থেকে হাদীছ শুনেছেন। খলীফা ওয়ালীদের সময় মদীনার ওয়ালী থাকাকালেও এ ধারা অব্যাহত ছিল। হাম্স ইবন 'উমার ইবন আবী তালহা আল-আনসারী বলেন: খলীফা ওয়ালীদের সময় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যখন মদীনার ওয়ালী, তখন একবার তিনি মদীনা থেকে হজ্জে যাওয়ার ইরাদা করেন। তখন একদিন আনাস ইবন মালিক (রা) তাঁর নিকট আসেন। 'উমার তাঁকে বলেন: আবূ হামযা! আপনি কি আমাদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) ভাষণ সম্পর্কে অবহিত করবেন না? আনাস বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় 'ইউমুত তারবিয়‍্যা'র একদিন পূর্বে, 'আরাফার দিন 'আরাফাতে, মিনায় কুরবানীর দিন সকালে এবং মিনা ত্যাগের দিন সকালে খুতবা দেন। ৩৪৭

৩. 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাস'উদ (রা) (মৃ. হি. ৯৮): একজন ইমাম, মদীনার আলিম, মুফতী, সাতজন শ্রেষ্ঠ ফকীহর একজন। ডাকনাম আবূ 'আবদিল্লাহ। মদীনার অধিবাসী অন্ধ মানুষ ছিলেন। তাঁর দাদা উতবা ছিলেন মহান সাহাবী 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) ভাই।
তিনি ছিলেন বিশাল জ্ঞানের অধিকারী মানুষ। হাদীছ ও কবিতায় ছিল তাঁর সীমাহীন জ্ঞান।
ইমাম 'যুহরী বলেন, আমি যখনই কোন 'আলিমের নিকট বসেছি, তাঁর সবটুকু জ্ঞান নিয়ে তবে উঠেছি। আমি 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়রের (রা) নিকট মাঝে মাঝে যেতাম। তাঁর কাছে একই কথা বার বার শুনতাম। তবে ব্যতিক্রম হলেন 'উবায়দুল্লাহ, তাঁর কাছে যতবার গিয়েছি নতুন নতুন জ্ঞান লাভ করেছি। তাঁর সম্পর্কে যুহরী আরো বলেন: আমি মনে করতাম আমি যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করে ফেলেছি। কিন্তু আমি যখন 'উবায়দুল্লাহর সান্নিধ্যে গেলাম, মনে হলো আমি সাগরকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করছি। ইবন 'আবদিল বার বলেন: 'উবায়দুল্লাহ ছিলেন শ্রেষ্ঠ দশ ফকীহর একজন। ফাতওয়ার বিষয়টি যে সাতজনের মধ্যে চক্রাকারে ঘুরতো তিনি তাদেরও অন্যতম। তিনি একজন উঁচু স্তরের 'আলিম, ফিক্ বিষয়ে অগ্রগামী, আল্লাহভীরু ও মননশীল কবি। আমার জানা মতে, সাহাবীদের পর থেকে নিয়ে আমাদের সময় পর্যন্ত কোন ফকীহ তাঁর চেয়ে ভালো কবি হননি, তেমনিভাবে কোন কবি তাঁর মতো ভালো ফকীহ হননি।
এমন মহান ইমামের দারসের মজলিসে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বসেছেন, তাঁর জ্ঞানের সাগর থেকে অঞ্জলী ভরে গ্রহণ করেছেন, তাঁর আদব-আখলাকে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাই অনেকের ধারণা 'উমার জ্ঞান-গরীমা, আদব-আখলাক ও রুচি-সংস্কৃতিতে মহান শিক্ষককেও ছাড়িয়ে গেছেন। তাই 'আলিমগণ 'উবায়দুল্লাহর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন: هو معلم عمر بن عبد العزيز - তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের শিক্ষক।
একবার 'উবায়দুল্লাহ নিম্নের স্বরচিত কবিতাটি 'উমারকে লিখে পাঠান:

بسم الله الذي أنزلت من عنده السور + والحمد لله أما بعد ياعمر
إن كنت تعلم ما تأتى وما تذر + فكن على حذر قد ينفع الحذر
واصبر على القدر المحتوم وارض به + وإن أتاك بما لا تشتهى القدر.
فما صفا لامرئ عيش يسر به + الا سيتبع يوما صفوه كَدَرُ.

'সেই আল্লাহর নামে যাঁর নিকট থেকে এই সূরাগুলো নাযিল হয়েছে। সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর। অতঃপর হে 'উমার!
যদি তুমি জানতে পার যা কিছু আসে এবং যা কিছু আসে না সে সম্পর্কে, তাহলে তুমি সতর্ক হবে। সতকর্তা উপকারে আসে।
অবশ্যম্ভাবী তাকদীরের উপর ধৈর্য ধারণ করবে এবং তার আচরণে সন্তুষ্ট থাকবে, যদিও সেই তাকদীর তোমার জীবনে এমন কিছু নিয়ে আসে যা তুমি মোটেও কামনা করনি।
মানুষের স্বচ্ছ আনন্দময় জীবনকে এমন একটা দিন সব সময় অনুসরণ করছে যা তার স্বচ্ছতাকে ঘোলা করে দেবে।'

এ কারণে 'উমার যখন মদীনার ওয়ালী, তখন সব সময় তাঁর নিকট আসা-যাওয়া করতেন, তাঁর মজলিসে বসতেন। অনেক সময় হয়তো উস্তাদের সাক্ষাৎ পেতেন না, তাতে তিনি মোটেও বিরক্ত না হয়ে পরের দিন আবার যেতেন। ইবন আবী আয-যিনাদ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'উমার মদীনার ওয়ালী থাকাকালে অনেক সময় আমি তাঁকে 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহর গৃহের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। কখনো ঢোকার অনুমতি পেতেন, কখনো পেতেন না। 'উমার তাঁর এই শিক্ষকের প্রতি এতই মুগ্ধ ছিলেন যে, প্রায়ই বলতেন:
لمجلس من الأعمى : عبيد الله بن عبد الله بن عتبة بن مسعود، أحب إلى من ألف دينار.
'অন্ধ 'উবায়দুল্লাহর একটি মজলিস আমার নিকট হাজার দীনারের চেয়েও প্রিয়।' তিনি তাঁর খিলাফতকালে বলতেন:
لو كان عبيد الله حيا ما صدرت الا عن رأيه ، ولوددت أن لى بيوم واحد من عبيد الله كذا وكذا.
'যদি 'উবায়দুল্লাহ জীবিত থাকতেন তাহলে আমি তাঁর মতামত ব্যতীত কোন ফরমান জারী করতাম না। আর তাঁর একটি দিনের বিনিময়ে আমার এত এত কিছু হোক তাও চাইতাম না।
এই মহান শিক্ষকের প্রতি ছিল দৃঢ় আস্থা ও প্রবল নির্ভরতা। খলীফা হওয়ার পর বলতেন:
لو أدركني عبيد بن عبد الله بن عتبة إذ وقعت فيما وقعت فيه، لهان على ما أنا فيه.
'আমি যে অবস্থায় পড়েছি, এখন যদি 'উবায়দুল্লাহ জীবিত থাকতেন তাহলে এ অবস্থা আমার জন্য খুবই সহজ হয়ে যেত।' 'উমার তাঁর এই মহান শিক্ষকের সূত্রে বহু জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
لما رويت عن عبيد الله بن عبد الله بن عتبة أكثر مما رويت عن جميع الناس.
'আমি অন্য সকল মানুষের নিকট থেকে যা বর্ণনা করেছি, তার চেয়ে অনেক বেশী বর্ণনা করেছি এক 'উবায়দুল্লাহর নিকট থেকে। ৩৪৮

৪. সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) (মৃ. হি. ১০৬): দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ ও নির্মোহ স্বভাবের ইমাম, ফকীহ, মদীনার মুফতী, মদীনার সপ্ত ফকীহর অন্যতম, বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী, উঁচু স্তরের হাদীছ ব্যক্তিত্ব ও একান্ত আল্লাহভীরু তথা মুত্তাকী মানুষ ছিলেন। মুসলিম মনীষীদের মধ্যে যাঁদের জীবনে জ্ঞান ও কর্ম এবং দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতার প্রতি চরম বৈরাগ্য ভাব ও সম্মান-মর্যাদার সমন্বয় ঘটেছিল সালিম তাঁদের অন্যতম। তিনি তাঁর মহান পিতা 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) থেকে বহু হাদীছ বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ বলেন: একবার আমি সালিমকে তাঁর বর্ণিত একটি হাদীছ সম্পর্কে বললাম: আপনি কি হাদীছটি আপনার পিতা 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) থেকে শুনেছেন? তিনি বললেন: একবার? এক শো বারেরও বেশী! চেহারা-সুরতে, চলনে-বলনে তিনি পিতার অনুরূপ ছিলেন। সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন:
كان أشبه ولد عمر بعمر عبد الله، وأشبه ولد عبد الله بعبد الله سالم.
'উমারের (রা) সন্তানদের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ছিলেন 'উমারের সাথে বেশী সাদৃশ্যপূর্ণ, তেমনিভাবে 'আবদুল্লাহর সন্তানদের মধ্যে সালিম ছিলেন তাঁর পিতা 'আবদুল্লাহর সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ।' পিতা তাঁর পুত্রের দারুণ গুণমুগ্ধ ছিলেন। ভীষণ ভালোবাসতেন। তাঁর সমকালীন খলীফাগণ তাঁকে খুবই সমাদর ও সম্মান করতেন। একবার তিনি খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের দরবারে গেলে তিনি এগিয়ে এসে তাঁকে স্বাগতম- শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে সংগে করে তাঁর আসনে পাশাপাশি বসান। ইমাম মালিক (রহ) এই মনীষী সম্পর্কে বলেন: পূর্ববর্তী যে সকল সত্যনিষ্ঠ মনীষী চলে গেছেন, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখিতায় ও জ্ঞান-গরিমায় সালিমের যুগে তাঁদের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ তার চেয়ে আর কেউ ছিলেন না। ৩৪৯

৫. সালিহ ইবন কায়সান (মৃ. ১৪০ হি.): তিনি ছিলেন হাদীছের ইমাম, হাফেজ, হাদীছ বর্ণনায় বিশ্বস্ত, মদীনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম। একবার ইমাম আহমাদকে (রহ) সালিহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন: চমৎকার! চমৎকার! ইবন হিব্বান বলেন: সালিহ ছিলেন মদীনার অন্যতম ফকীহ, হাদীছ ও ফিক্হর সমাবেশস্থল এবং অত্যন্ত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও সম্মানীয় মানুষ। ইবন 'আবদিল বার বলেন: তিনি ছিলেন বহু হাদীছের ধারক ও বর্ণনাকারী, বিশ্বস্ত এবং হুজ্জাত তথা প্রমাণতুল্য মানুষ। 'উমারের ছোটবেলার শিক্ষক ছিলেন, অত্যন্ত যত্ন ও কঠোরতার সাথে শিক্ষার পাশাপাশি আদব-কায়দা, আচার- আচরণ ও শিষ্টাচারও শিক্ষা দেন। ৩৫০
পরে 'উমার তাঁর এই মহান শিক্ষককে নিজের সন্তানদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেন। নিজের পরামর্শক হিসেবে সব সময় নিজের কাছে রাখেন।

প্রথম জীবনে 'উমার কবিতার প্রতি ভীষণ অনুরক্ত হয়ে পড়েন। কাব্য চর্চায় অনুরাগী হয়ে ওঠেন। অসংখ্য কবিতা স্মৃতিতে ধারণ করেন। কবিতার একজন সমঝদার সমালোচকও হয়ে পড়েন। তাঁর সময়ে কাব্য চর্চা ইসলামী সমাজের উজ্জ্বলতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। সর্বত্র কবিতা রচনার প্রতিযোগিতা ও কবিতা পাঠের আসর জমে উঠতো। সে সময় আরব জগতের সর্বত্র মৌমাছির গুনগুন আওয়াজের মত কবিদের গুনগুনানি ধ্বনিত হতো। সে সময় আরব বিশ্বের সর্বাধিক খ্যাতিমান কবি ছিলেন তিনজন: জারীর, ফারাযদাক ও আখতাল। দীর্ঘকাল যাবত তাঁরা আরব বিশ্বের মানুষকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। 'উমারও তাঁদের দ্বারা ভীষণ প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তাঁর পিতা 'আবদুল 'আযীয মিসরের ওয়ালী থাকাকালে তাঁর দরবারে কবিদের আসর জমতো। পুরস্কার, দান-অনুগ্রহ লাভের জন্য সেখানে আহওয়াস, কুছায়্যির, 'ইয্যা, নুসায়ব ইবন রাবাহ-এর মত কবিগণ সমবেত হতেন। 'উমার তাঁদের সাথে মেলামেশা করতেন। এতে তিনি যথেষ্ট উপকার লাভ করেন। আরবী দিওয়ান থেকে অসংখ্য কবিতা মুখস্থ করেন, যা তাঁর ভাষা-সাহিত্যের শুদ্ধতায় অবদান রাখে এবং আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ বুঝতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

তিনি নৈতিক মূল্যবোধ ও ইসলামী ভাবধারাসম্পন্ন কবিতা পছন্দ করতেন এবং মাঝে মধ্যে এ জাতীয় কিছু কবিতা রচনাও করেছেন। ইবনুল জাওযী (রহ) তাঁর "সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ওয়া মানাকিবুহু" গ্রন্থে সেই সকল কবিতার কিছু সংকলন করেছেন। মদীনায় অত্যন্ত জনপ্রিয় এক প্রকার রাগ সঙ্গীত তাঁর নামে দীর্ঘকাল প্রচলিত ছিল। সম্ভবতঃ এ রাগ তিনি উদ্ভাবন করেন মদীনার ওয়ালী থাকাকালে। আর তখন তিনি বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। ৩৫১

পিতা 'আবদুল 'আযীযের ইনতিকালের পর চাচা খলীফা 'আবদুল মালিক তাঁকে নিজ পরিবারের সাথে যুক্ত করেন। খলীফা আবদুল মালিকও ছিলেন একজন বড় ফকীহ ও মুহাদ্দিছ। তাঁর সম্পর্কে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন: إن لمروان إبنا فقيها فسلوه 'মারওয়ানের একটি ফকীহ ছেলে আছে। তোমরা তাঁর কাছে জিজ্ঞেস কর।' তিনি আরো বলেন:
ولد الناس أبناء، وولد مروان أبا. 'মানুষ সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করে, আর মারওয়ানের জন্ম হয়েছে পিতা হিসেবে।'

আবুয যিনাদ বলেন: 'মদীনার ফকীহগণ হলেন, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'আবদুল মালিক, 'উরওয়া ও কুবাইসা ইবন যুওয়াইব।' ইমাম আশ-শা'বী বলেন: 'একমাত্র 'আবদুল মালিক ছাড়া আর যার কাছেই আমি বসেছি, নিজেকে তার উপর শ্রেষ্ঠ পেয়েছি।' ৩৫২ মোটকথা খলীফা আবদুল মালিক ছিলেন ক্ষণজন্মা পুরুষ। ধূর্ত রাজনীতিক হওয়া সত্ত্বেও শ্রেষ্ঠ ফকীহদের মধ্যে গণ্য করা হয়। কাব্য শাস্ত্রেও তাঁর প্রচণ্ড দখল ছিল। এমন একজন বিদ্বান চাচার তত্ত্বাবধান লাভ করেন 'উমার এবং নিজেকে চাচার মত গড়ে তোলার জন্য অনুপ্রাণিত হন।

'উমার উপলব্ধি করেছিলেন জ্ঞান চর্চাই তাঁর জীবন, আর এর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে মরণ। এ কারণে তিনি শত ব্যস্ততার মাঝেও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সঙ্গ উপভোগ করতেন, তাঁদের নিকট না জানা বিষয় প্রশ্ন করে জেনে নিিতেন। যেমন পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, হজ্জের সময় হযরত রাসূলে কারীম (সা) কোথায় কিভাবে খুতবা দিয়েছিলেন তা সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিককে (রা) প্রশ্ন করে জেনে নেন। অথচ তখন 'উমার মদীনার ওয়ালী। আরেকবার হাউজ সম্পর্কে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা) একটি হাদীছ বর্ণনাকারী একজন তাবি'ঈর মুখ থেকে শোনার জন্য তাঁকে আনতে লোক পাঠান। 'আব্বাস ইবন সালিম আল-লাখমী বলেন: ৩৫৩
بعث عمر بن عبد العزيز إلى أبي سلام الحبشي يُحمل على البريد، فلما قدم عليه قال : لقد شقّ على. قال عمر : ما أردنا ذلك ، ولكنه بلغنى عنك حديث ثوبان في الحوض، فأحببت أن أشافهك به ! فقال : سمعت ثوبان يقول : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : إن حوضى من عدن إلى عمان البلقاء، ماؤه اشد بياضا من اللبن واحلى من العسل، وأكوابه عدد نجوم السماء، من شرب منه شربة لم يظمأ بعدها أبدا، أول الناس ورودا عليه فقراء المهاجرين.
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ডাকের বাহনে চড়িয়ে আবী সাল্লাম আল-হাবশীকে আনার জন্য লোক পাঠালেন। যখন তিনি আসলেন, বললেন: আমার জন্য কষ্টকর হয়েছে। 'উমার বললেন: আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি, তবে আপনার সূত্রে "হাউজ” বিষয়ে ছাওবানের হাদীছটি পৌছেছে। সেটি আমি আপনার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছি। তিনি বললেন: আমি ছাওবানকে বলতে শুনেছি, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি: আমার হাউজ হবে 'আদন (এডেন) থেকে 'আম্মানের বালকা' পর্যন্ত প্রশস্ত। এর পানি হবে দুধের চেয়ে বেশী সাদা, মধুর চেয়ে মিষ্টি, এবং পেয়ালার সংখ্যা হবে আকাশের নক্ষত্ররাজির সম-সংখ্যক। কেউ একবার এর পানি পান করলে অনন্তকালের জন্য আর তৃণা অনুভব করবে না। এই হাউজে প্রথম অবতরণকারী হবে মুহাজিরদের দরিদ্র মানুষেরা।

টিকাঃ
৩৪৬. আয-যাহবী, তারীখ আল-ইসলাম-১/১৮৭-১৮৮; তাহযীব আত-তাহযীব-৭/৪৭; সিফাতুস সাফওয়া-২/১২৬-১২৭; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১১৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৮
৩৪৭. তাবাকাত-৫/৩৩১; সিয়ারু আ'লাম আল-নুবালা'-৩/৩৯৫; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৪
৩৪৮. ইবনুল জাওযী: ৮০-৯০; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৬৮
৩৪৯. তাবাকাত-৫/১৯৫; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১৯৩, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২৩৪
৩৫০. শাজারাতুয যাহ্ব-১/২০৮; তাহযীব আত-তাহযীব-৪/৩৫০; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৪৮
৩৫১. ইবুনল জাওযী-২২৫
৩৫২. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-৬১
৩৫৩. ইবনুল জাওযী: ৩২-৩৩

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 তাঁর জ্ঞানের গভীরতা

📄 তাঁর জ্ঞানের গভীরতা


তাঁর সময়ের বড় বড় জ্ঞানী-গুণীদের দারসে বসা ও সাহচর্য লাভের কারণে তিনিও বহু শাস্ত্রে বিশাল পাণ্ডিত্যের অধিকারী হন। অর্জিত জ্ঞানের জন্য তিনিও বেশ তুষ্ট ছিলেন বলে মনে হয়। যেমন তিনি মদীনা ত্যাগের সময়কালের অবস্থা বর্ণনা করেছেন এভাবে: ৩৫৪
خرجت من المدينة وما من رجل أعلم منى، فلما قدمت الشام نسيت.
'আমি যখন মদীনা থেকে বের হলাম তখন আমার চেয়ে বড় 'আলিম কেউ ছিলেন না। অতঃপর আমি শামে এসে সব ভুলে গেলাম।'

নিজের জ্ঞানের প্রতি তাঁর কতখানি আস্থা থাকলে তিনি এমন কথা বলতে পারেন? অথচ সে সময় মদীনাতে হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব ও তাঁর মত আরো অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি বিদ্যমান ছিলেন। ইমাম যুহরীর সঙ্গে একদিন সারা রাত হাদীছ ও ফিকহ বিষয়ে আলোচনা করলেন। ইমাম যুহরী 'উমারকে বহু হাদীছ শোনালেন। আলোচনার শেষ পর্যায়ে 'উমার বললেন: আজ রাতে আপনি যত হাদীছ বর্ণনা করেছেন, সবই আমি পূর্বে শুনেছি। তবে আপনি মুখস্থ রেখেছেন, আর আমি ভুলে গিয়েছি। ৩৫৫

ইমাম যুহরীর মত মহাজ্ঞানী মানুষকে এমন কথা বলতে পারায় প্রমাণিত হয় জ্ঞানের জগতে তাঁর ভিত্তি ছিল অতি মজবুত, জানাশোনার পরিধি ছিল অতি ব্যাপক ও প্রশস্ত এবং তাঁর শ্রুত ও বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা অনেক বেশী। এ কারণে পরবর্তীকালে সংকলিত হাদীছের অথবা রচিত ফিকহর অধিকাংশ গ্রন্থাবলীতে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নাম দেখা যায়। হয়তো তা হাদীছ বর্ণনা সূত্রে, ফিকহ বিষয়ক কোন মতামত, কোন আদেশ-নিষেধ অথবা বিচার-ফয়সালার সিদ্ধান্ত হিসেবে। ইসলামের প্রথম পর্বের 'আলিম ও ইমাম-মুজতাহিদগণ বিভিন্ন বিষয়ে নিজ নিজ মতের স্বপক্ষে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কথা ও কাজকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এ ক্ষেত্রে ইমাম আল-লায়ছ ইবন সা'দ-এর সেই বিখ্যাত চিঠিটির কথা উল্লেখ করা যায়, যা তিনি ইমাম মালিকের নিকট পাঠিয়েছিলেন। যাতে তিনি ইমাম মালিকের মতের বিরুদ্ধে এবং নিজের মতের স্বপক্ষে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কথা ও কাজকে একাধিক মাসয়ালায় উল্লেখ করেছেন। এমনকি চার মাযহাবের ফিকহর গ্রন্থাবলীতে প্রমাণ হিসেবে বার বার তাঁর কথা ও কাজ উল্লেখ করা হয়েছে। হানাফী মাযহাবের ইমামগণ তাঁকে তাঁর মাতৃকূলের ঊর্ধ্বতন পুরুষ হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) থেকে পৃথক করার জন্য তাঁকে "'উমার আস-সাগীর" তথা ছোট 'উমার নামে অভিহিত করেছেন। ইমাম মালিক (রহ) তাঁর বিখ্যাত "আল-মুওয়াত্তা” গ্রন্থে বিশ বারেরও অধিক তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন। ইমাম মালিকের অনুসারী পরবর্তী ইমাম-মুজতাহিদগণ তাঁদের রচিত গ্রন্থাবলীতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সংগে বহুবার বহুভাবে তাঁর কথা ও কাজ উল্লেখ করেছেন। শাফি'ঈ মাযহাবের অনুসারী ইমামগণও তেমন করেছেন। ইমাম আন-নাওবী (রহ) তাঁর 'তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত' গ্রন্থে তাঁর জীবনী সন্নিবেশ করেছেন। আর হাম্বলী মাযহাবের লোকেরা তাঁকে কতখানি গুরুত্ব দিয়েছেন তা বুঝা যায় এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের এই উক্তি দ্বারা: ৩৫৬
لا أدرى قول أحد من التابعين حجة إلا قول عمر بن عبد العزيز.
'একমাত্র 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কথা ছাড়া অন্য কোন তাবি'ঈর কোন কথা 'হুজ্জাত' (প্রমাণ) হিসেবে ধরা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।' কাদরিয়‍্যাদের মতবাদ খণ্ডন করে তিনি যে পত্রটি লেখেন তাতে যে শক্তিশালী যুক্তি এবং কুরআন-হাদীছের উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেন তাতে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা অনুমান করা যায়। তেমনিভাবে খারেজীদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত যুক্তিতেও তাঁর গভীর প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্য প্রমাণিত হয়। ৩৫৭

টিকাঃ
৩৫৪. 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৯৫; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১২১
৩৫৫. প্রাগুক্ত; ইবনুল জাওযী-৩৭
৩৫৬. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৬৩
৩৫৭. হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩০৯-৩১০, ৩৪৬, ৩৫৩; ইবনুল জাওযী: ৯০-৯৬

তাঁর সময়ের বড় বড় জ্ঞানী-গুণীদের দারসে বসা ও সাহচর্য লাভের কারণে তিনিও বহু শাস্ত্রে বিশাল পাণ্ডিত্যের অধিকারী হন। অর্জিত জ্ঞানের জন্য তিনিও বেশ তুষ্ট ছিলেন বলে মনে হয়। যেমন তিনি মদীনা ত্যাগের সময়কালের অবস্থা বর্ণনা করেছেন এভাবে: ৩৫৪
خرجت من المدينة وما من رجل أعلم منى، فلما قدمت الشام نسيت.
'আমি যখন মদীনা থেকে বের হলাম তখন আমার চেয়ে বড় 'আলিম কেউ ছিলেন না। অতঃপর আমি শামে এসে সব ভুলে গেলাম।'

নিজের জ্ঞানের প্রতি তাঁর কতখানি আস্থা থাকলে তিনি এমন কথা বলতে পারেন? অথচ সে সময় মদীনাতে হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব ও তাঁর মত আরো অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি বিদ্যমান ছিলেন। ইমাম যুহরীর সঙ্গে একদিন সারা রাত হাদীছ ও ফিকহ বিষয়ে আলোচনা করলেন। ইমাম যুহরী 'উমারকে বহু হাদীছ শোনালেন। আলোচনার শেষ পর্যায়ে 'উমার বললেন: আজ রাতে আপনি যত হাদীছ বর্ণনা করেছেন, সবই আমি পূর্বে শুনেছি। তবে আপনি মুখস্থ রেখেছেন, আর আমি ভুলে গিয়েছি। ৩৫৫

ইমাম যুহরীর মত মহাজ্ঞানী মানুষকে এমন কথা বলতে পারায় প্রমাণিত হয় জ্ঞানের জগতে তাঁর ভিত্তি ছিল অতি মজবুত, জানাশোনার পরিধি ছিল অতি ব্যাপক ও প্রশস্ত এবং তাঁর শ্রুত ও বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা অনেক বেশী। এ কারণে পরবর্তীকালে সংকলিত হাদীছের অথবা রচিত ফিকহর অধিকাংশ গ্রন্থাবলীতে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নাম দেখা যায়। হয়তো তা হাদীছ বর্ণনা সূত্রে, ফিকহ বিষয়ক কোন মতামত, কোন আদেশ-নিষেধ অথবা বিচার-ফয়সালার সিদ্ধান্ত হিসেবে। ইসলামের প্রথম পর্বের 'আলিম ও ইমাম-মুজতাহিদগণ বিভিন্ন বিষয়ে নিজ নিজ মতের স্বপক্ষে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কথা ও কাজকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এ ক্ষেত্রে ইমাম আল-লায়ছ ইবন সা'দ-এর সেই বিখ্যাত চিঠিটির কথা উল্লেখ করা যায়, যা তিনি ইমাম মালিকের নিকট পাঠিয়েছিলেন। যাতে তিনি ইমাম মালিকের মতের বিরুদ্ধে এবং নিজের মতের স্বপক্ষে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কথা ও কাজকে একাধিক মাসয়ালায় উল্লেখ করেছেন। এমনকি চার মাযহাবের ফিকহর গ্রন্থাবলীতে প্রমাণ হিসেবে বার বার তাঁর কথা ও কাজ উল্লেখ করা হয়েছে। হানাফী মাযহাবের ইমামগণ তাঁকে তাঁর মাতৃকূলের ঊর্ধ্বতন পুরুষ হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) থেকে পৃথক করার জন্য তাঁকে "'উমার আস-সাগীর" তথা ছোট 'উমার নামে অভিহিত করেছেন। ইমাম মালিক (রহ) তাঁর বিখ্যাত "আল-মুওয়াত্তা” গ্রন্থে বিশ বারেরও অধিক তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন। ইমাম মালিকের অনুসারী পরবর্তী ইমাম-মুজতাহিদগণ তাঁদের রচিত গ্রন্থাবলীতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সংগে বহুবার বহুভাবে তাঁর কথা ও কাজ উল্লেখ করেছেন। শাফি'ঈ মাযহাবের অনুসারী ইমামগণও তেমন করেছেন। ইমাম আন-নাওবী (রহ) তাঁর 'তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত' গ্রন্থে তাঁর জীবনী সন্নিবেশ করেছেন। আর হাম্বলী মাযহাবের লোকেরা তাঁকে কতখানি গুরুত্ব দিয়েছেন তা বুঝা যায় এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের এই উক্তি দ্বারা: ৩৫৬
لا أدرى قول أحد من التابعين حجة إلا قول عمر بن عبد العزيز.
'একমাত্র 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কথা ছাড়া অন্য কোন তাবি'ঈর কোন কথা 'হুজ্জাত' (প্রমাণ) হিসেবে ধরা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।' কাদরিয়‍্যাদের মতবাদ খণ্ডন করে তিনি যে পত্রটি লেখেন তাতে যে শক্তিশালী যুক্তি এবং কুরআন-হাদীছের উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেন তাতে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা অনুমান করা যায়। তেমনিভাবে খারেজীদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত যুক্তিতেও তাঁর গভীর প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্য প্রমাণিত হয়। ৩৫৭

টিকাঃ
৩৫৪. 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৯৫; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১২১
৩৫৫. প্রাগুক্ত; ইবনুল জাওযী-৩৭
৩৫৬. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-৬৩
৩৫৭. হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩০৯-৩১০, ৩৪৬, ৩৫৩; ইবনুল জাওযী: ৯০-৯৬

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 তাঁর জ্ঞান-গরিমা সম্পর্কে তাঁর সমকালীন ও পরবর্তীকালের মনীষীদের কিছু মন্তব্য

📄 তাঁর জ্ঞান-গরিমা সম্পর্কে তাঁর সমকালীন ও পরবর্তীকালের মনীষীদের কিছু মন্তব্য


পণ্ডিত মনীষীদের মন্তব্য ও সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হয় যে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন তত্ত্ব-জ্ঞানী ব্যক্তিত্বের অন্যতম। তিনি ছিলেন প্রথম শ্রেণীর তাবি'ঈ 'আলিমদের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান ও মর্যাদার অধিকারী। নিম্নে কয়েকজন বিশিষ্ট মনীষীর উক্তি উপস্থাপন করা হলো:
ইমাম যুহরী 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। 'উবায়দুল্লাহ বলেন: ৩৫৮
كانت العلماء عند عمر بن عبد العزيز تلامذة.
"'আলিমগণ 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট ছিলেন ছাত্র সমতুল্য।"

বিখ্যাত তাবি'ঈ মুজাহিদ (রহ) বলেন: ৩৫৯
أتينا عمر بن عبد العزيز ونحن نرى أنه سيحتاج إلينا، فما خرجنا من عنده حتى احتجنا إليه.
'আমরা এই ধারণা নিয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট গেলাম যে, তিনি আমাদের জ্ঞানের মুখাপেক্ষী হবেন; কিন্তু যখন তাঁর নিকট থেকে বের হলাম তখন আমরাই তাঁর জ্ঞানের মুখাপেক্ষী হয়ে গেলাম।' তিনি আরো বলেন:
أتينا عمر نعلمه، فما برحنا حتى تعلمنا منه.
'আমরা 'উমারের নিকট গেলাম তাঁকে কিছু শেখাবো বলে, কিন্তু অল্পক্ষণ পরে আমরাই তাঁর নিকট থেকে শিখতে লাগলাম।'

মায়মূন ইবন মিহরান বলেন: ৩৬০
كان عمر بن عبد العزيز معلم العلماء.
"'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন 'আলিমদের মু'আল্লিম বা শিক্ষক।" তিনি আরো বলেন:
أتينا عمر بن عبد العزيز ونحن نرى أنه يحتاج إلينا، فما كنا معه إلا تلامذة.
'আমরা এই ধারণা নিয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট গেলাম যে, তিনি আমাদের জ্ঞানের মুখাপেক্ষী হবেন; কিন্তু কিছুক্ষণ তাঁর সঙ্গে থাকার পর আমরাই তাঁর ছাত্র হয়ে গেলাম।'

প্রখ্যাত তাবি'ঈ মুহাদ্দিছ আইউব আস-সিখতিয়ানী বলেন: আমরা যাঁদেরকে পেয়েছি তাঁদের কেউ 'উমারের চেয়ে নবীর (সা) হাদীছ অধিক ধারণকারী আছেন বলে আমার জানা নেই। ৩৬১

ইমাম মালিক ও ইবন 'উয়ায়না বলেন: ৩৬২
- عمر بن عبد العزيز إمام
"'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একজন ইমাম।"

ইবন সা'দ বলেন: তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত ও আমানতদার। তাঁর ছিল ফিকহ ও অন্যান্য বিষয় সংক্রান্ত জ্ঞান এবং খোদাভীতি। বহু হাদীছ তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি একজন ন্যায়নিষ্ঠ ইমাম। আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন ও সন্তুষ্ট থাকুন! ৩৬৩

হাফেজ ইবন 'আবদিল বার বলেন: ৩৬৪
كان أحد الراسخين في العلم.
'জ্ঞানের জগতে তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ ও পারদর্শী ব্যক্তি।'

ইমাম আয-যাহাবী বলেন: ৩৬৫
وكان إماما فقيها مجتهدا عارفا بالسنن، كبير الشان ثبتا، حجة، حافظا، قانتا الله أواها منيبا.
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন একজন ইমাম, ফকীহ, মুজতাহিদ, সুন্নাহর জ্ঞানে পারদর্শী, বিশাল কর্মকাণ্ডের অধিকারী, দৃঢ় চিত্ত, হাদীছ শাস্ত্রের হুজ্জাত, হাফেজ, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী মানুষ।'

ইমাম আল-লায়ছ বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার ও 'আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসের (রা) সুহবত ও সাহচার্য পেয়েছেন এবং 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে জাযীরার ওয়ালী নিয়োগ করেছিলেন, এমন এক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন: ৩৬৬
ما التمسنا علم شيئ إلا وجدنا عمر بن عبد العزيز أعلم الناس بأصله وفرعه، وكان العلماء عند عمر بن عبد العزيز إلا تلامذة.
'আমরা যখনই কোন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতে চেয়েছি তখন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে সে বিষয়ের মূল ও শাখা-প্রশাখায় সকলের চেয়ে অধিক জ্ঞানী ব্যক্তিরূপে পেয়েছি। অন্য সকল 'আলিম 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট ছাত্র সমতুল্য ছিলেন।'

ইমাম নাওবী (রহ) লিখেছেন: 'তাঁর বিশাল জ্ঞান, অগাধ পাণ্ডিত্য, পরিচ্ছন্ন স্বভাব, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ তাপস্য, তাকওয়া, 'আদল-ইনসাফ, মুসলমানদের প্রতি দয়া ও মমতা, উন্নত চরিত্র, আল্লাহর রাস্তায় চূড়ান্ত রকমের প্রচেষ্টা, সুন্নাতে নববীর আনুগত্য- অনুসরণ এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুকরণের ব্যাপারে সকলে একমত।'

'আল্লামা আবুল হাসান 'আলী আন-নাদবীর (রহ) একটি মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এ প্রসঙ্গের সমাপ্তি টানছি। তিনি বলেন: ৩৬৭
وكان عمر من العلماء الراسخين الربانيين، ولولا الخلافة وتكاليفها لكان من العلماء المعدودين ، ومن الفقهاء المشهورين.
"'উমার ছিলেন আল্লাহ ওয়ালা সুদক্ষ জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন। যদি খিলাফত ও তার বিশাল দায়িত্ব তাঁর উপর না চাপতো তাহলে মুষ্টিমেয় হাতে গোনা জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন এবং বিখ্যাত ফকীহদের মধ্যে গণ্য হতেন।'

টিকাঃ
৩৫৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৯৪; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৯
৩৫৯. তাবাকাত-৫/৩৬৮; তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-২/২২; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১২০
৩৬০. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৯
৩৬১. তাহযীবুত তাহযীব-৭/৪১৪
৩৬২. প্রাগুক্ত
৩৬৩. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১১৫
৩৬৪. জামি' বায়ান আল-'ইলম-২/১৩০
৩৬৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৮; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১১৪
৩৬৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৯৪
৩৬৭. রিজালুল ফিক্স ওয়াদ দা'ওয়া-১/৫২

পণ্ডিত মনীষীদের মন্তব্য ও সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হয় যে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন তত্ত্ব-জ্ঞানী ব্যক্তিত্বের অন্যতম। তিনি ছিলেন প্রথম শ্রেণীর তাবি'ঈ 'আলিমদের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান ও মর্যাদার অধিকারী। নিম্নে কয়েকজন বিশিষ্ট মনীষীর উক্তি উপস্থাপন করা হলো:
ইমাম যুহরী 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। 'উবায়দুল্লাহ বলেন: ৩৫৮
كانت العلماء عند عمر بن عبد العزيز تلامذة.
"'আলিমগণ 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট ছিলেন ছাত্র সমতুল্য।"

বিখ্যাত তাবি'ঈ মুজাহিদ (রহ) বলেন: ৩৫৯
أتينا عمر بن عبد العزيز ونحن نرى أنه سيحتاج إلينا، فما خرجنا من عنده حتى احتجنا إليه.
'আমরা এই ধারণা নিয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট গেলাম যে, তিনি আমাদের জ্ঞানের মুখাপেক্ষী হবেন; কিন্তু যখন তাঁর নিকট থেকে বের হলাম তখন আমরাই তাঁর জ্ঞানের মুখাপেক্ষী হয়ে গেলাম।' তিনি আরো বলেন:
أتينا عمر نعلمه، فما برحنا حتى تعلمنا منه.
'আমরা 'উমারের নিকট গেলাম তাঁকে কিছু শেখাবো বলে, কিন্তু অল্পক্ষণ পরে আমরাই তাঁর নিকট থেকে শিখতে লাগলাম।'

মায়মূন ইবন মিহরান বলেন: ৩৬০
كان عمر بن عبد العزيز معلم العلماء.
"'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন 'আলিমদের মু'আল্লিম বা শিক্ষক।" তিনি আরো বলেন:
أتينا عمر بن عبد العزيز ونحن نرى أنه يحتاج إلينا، فما كنا معه إلا تلامذة.
'আমরা এই ধারণা নিয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট গেলাম যে, তিনি আমাদের জ্ঞানের মুখাপেক্ষী হবেন; কিন্তু কিছুক্ষণ তাঁর সঙ্গে থাকার পর আমরাই তাঁর ছাত্র হয়ে গেলাম।'

প্রখ্যাত তাবি'ঈ মুহাদ্দিছ আইউব আস-সিখতিয়ানী বলেন: আমরা যাঁদেরকে পেয়েছি তাঁদের কেউ 'উমারের চেয়ে নবীর (সা) হাদীছ অধিক ধারণকারী আছেন বলে আমার জানা নেই। ৩৬১

ইমাম মালিক ও ইবন 'উয়ায়না বলেন: ৩৬২
- عمر بن عبد العزيز إمام
"'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একজন ইমাম।"

ইবন সা'দ বলেন: তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত ও আমানতদার। তাঁর ছিল ফিকহ ও অন্যান্য বিষয় সংক্রান্ত জ্ঞান এবং খোদাভীতি। বহু হাদীছ তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি একজন ন্যায়নিষ্ঠ ইমাম। আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন ও সন্তুষ্ট থাকুন! ৩৬৩

হাফেজ ইবন 'আবদিল বার বলেন: ৩৬৪
كان أحد الراسخين في العلم.
'জ্ঞানের জগতে তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ ও পারদর্শী ব্যক্তি।'

ইমাম আয-যাহাবী বলেন: ৩৬৫
وكان إماما فقيها مجتهدا عارفا بالسنن، كبير الشان ثبتا، حجة، حافظا، قانتا الله أواها منيبا.
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন একজন ইমাম, ফকীহ, মুজতাহিদ, সুন্নাহর জ্ঞানে পারদর্শী, বিশাল কর্মকাণ্ডের অধিকারী, দৃঢ় চিত্ত, হাদীছ শাস্ত্রের হুজ্জাত, হাফেজ, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী মানুষ।'

ইমাম আল-লায়ছ বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার ও 'আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসের (রা) সুহবত ও সাহচার্য পেয়েছেন এবং 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে জাযীরার ওয়ালী নিয়োগ করেছিলেন, এমন এক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন: ৩৬৬
ما التمسنا علم شيئ إلا وجدنا عمر بن عبد العزيز أعلم الناس بأصله وفرعه، وكان العلماء عند عمر بن عبد العزيز إلا تلامذة.
'আমরা যখনই কোন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতে চেয়েছি তখন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে সে বিষয়ের মূল ও শাখা-প্রশাখায় সকলের চেয়ে অধিক জ্ঞানী ব্যক্তিরূপে পেয়েছি। অন্য সকল 'আলিম 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট ছাত্র সমতুল্য ছিলেন।'

ইমাম নাওবী (রহ) লিখেছেন: 'তাঁর বিশাল জ্ঞান, অগাধ পাণ্ডিত্য, পরিচ্ছন্ন স্বভাব, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ তাপস্য, তাকওয়া, 'আদল-ইনসাফ, মুসলমানদের প্রতি দয়া ও মমতা, উন্নত চরিত্র, আল্লাহর রাস্তায় চূড়ান্ত রকমের প্রচেষ্টা, সুন্নাতে নববীর আনুগত্য- অনুসরণ এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুকরণের ব্যাপারে সকলে একমত।'

'আল্লামা আবুল হাসান 'আলী আন-নাদবীর (রহ) একটি মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এ প্রসঙ্গের সমাপ্তি টানছি। তিনি বলেন: ৩৬৭
وكان عمر من العلماء الراسخين الربانيين، ولولا الخلافة وتكاليفها لكان من العلماء المعدودين ، ومن الفقهاء المشهورين.
"'উমার ছিলেন আল্লাহ ওয়ালা সুদক্ষ জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন। যদি খিলাফত ও তার বিশাল দায়িত্ব তাঁর উপর না চাপতো তাহলে মুষ্টিমেয় হাতে গোনা জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন এবং বিখ্যাত ফকীহদের মধ্যে গণ্য হতেন।'

টিকাঃ
৩৫৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৯৪; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৯
৩৫৯. তাবাকাত-৫/৩৬৮; তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-২/২২; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১২০
৩৬০. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৯
৩৬১. তাহযীবুত তাহযীব-৭/৪১৪
৩৬২. প্রাগুক্ত
৩৬৩. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১১৫
৩৬৪. জামি' বায়ান আল-'ইলম-২/১৩০
৩৬৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১৮; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৫/১১৪
৩৬৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৯৪
৩৬৭. রিজালুল ফিক্স ওয়াদ দা'ওয়া-১/৫২

ফন্ট সাইজ
15px
17px