📄 খারেজীদের বিশৃঙ্খলা দমন
হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালের সময় থেকে নিয়ে তাঁর সময় পর্যন্ত ইতিহাসের পাতা মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল। এ কারণে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয এ ব্যাপারে এত সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যে, কোন বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টিকারী ইসলামী উপদলের বিরুদ্ধেও অস্ত্র চালনার অনুমতি দেননি। খারেজীরা ছিল উমাইয়্যাদের পুরানো দুশমন। তাদের বিরুদ্ধাচরণমূলক আচরণ 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময় পর্যন্তও বিদ্যমান ছিল। তিনি সম্ভাব্য সব রকম মাধ্যম ও পদ্ধতিতে তাদেরকে এ হিংসাত্মক আচরণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। তিনি কুফার ওয়ালী আবদুল হামীদকে- যিনি তখন খারেজীদের দমনের দায়িত্বে ছিলেন, লেখেন, "যতক্ষণ তারা খুন-খারাবি ও ফাসাদ সৃষ্টি না করে ততক্ষণ তাদের উপর চড়াও হবেন না। একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ধীর-স্থির প্রকৃতির লোককে আমার এ নির্দেশ জানিয়ে অল্প কিছু সৈনিকসহ তাদের নিকট পাঠান।” এই নির্দেশ মত 'আবদুল হামীদ মুহাম্মাদ ইবন জারীর আল-বাজালীকে দুই হাজার সৈন্যসহ তাদের নিকট পাঠান।
এর চেয়ে আরো একটি সতর্ক পদক্ষেপ নেন। আর তা হলো খারেজীদের নেতা বুসতামকে সংশোধন ও বিতর্কের আহ্বান জানিয়ে পত্র লেখেন। তিনি বলেন: 'আসুন, আমরা পরস্পর বাহাছ-মুনাজিরা করি। যদি আমরা সত্যের উপর থাকি তাহলে আপনারা আনুগত্য করবেন। আর যদি আপনারা সত্যের উপর থাকেন তাহলে আমরা আমাদের ব্যাপারটি ভেবে দেখবো।' এই আহ্বানের প্রেক্ষিতে বিতর্কের জন্য বুসতাম দুই ব্যক্তিকে পাঠান এবং বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বুসতাম প্রেরিত লোক দু'টি বললো: আমরা মানছি যে, আপনার রীতি-পদ্ধতি আপনার খান্দানের থেকে ভিন্ন এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে আপনি জুলুম-অত্যাচার বলে অভিহিত করেন। কিন্তু তারা যদি ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার উপর থেকে থাকে তাহলে আপনি তাদের প্রতি লা'নত বা অভিশাপ দেন না কেন? হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয জবাব দিলেন: তাদের নিন্দা জানানোর জন্য এতটুকু যথেষ্ট নয় যে, আমি তাদের কর্মকাণ্ডকে জুলুম-অত্যাচার বলে থাকি? এর পরেও তাঁদের প্রতি লা'নত বা অভিশাপ দেওয়া এত জরুরী কেন? তোমরা ফির'আউনের প্রতি কতবার লা'নত দিয়ে থাক? এভাবে তিনি খারেজীদের একেকটি প্রশ্নের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে থাকেন। সবশেষে ঐ দুই জনের একজন বললো: একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি কি এটা মেনে নিতে পারেন যে, তাঁর স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি একজন জালেম হোক? 'উমার বললেন: না। সে বললো: তাহলে আপনি আপনার পরে ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিকের হাতে খিলাফতের দায়িত্ব ও ক্ষমতা অর্পণ করে যাবেন কিভাবে? অথচ আপনি জানেন যে, সে সত্য ও ন্যায়ের উপর অটল থাকবে না। 'উমার বললেন: তার জন্য তো আমার পূর্বসূরী সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক আমার পরে খলীফা হওয়ার বাই'আত সম্পন্ন করে গেছেন। এখন আমি কি করতে পারি? আমার পরে মুসলমনরাই তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবে। লোকটি বললো যে ব্যক্তি আপনার পরে ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিককে মনোনীত করেছেন, আপনার ধারণায় তার কি একাজ করার অধিকার ছিল এবং এ সিদ্ধান্ত কি সঠিক ছিল? এবার হযরত 'উমার নিরুত্তর হয়ে যান। বিতর্ক সভা ভেঙ্গে যাবার পর তিনি বারবার বলতে থাকেন:
আহ্লাকানী আমরু ইয়াযীদ ওয়াখাসামতু ফিহি, ফাস্তাগফিরুল্লাহ।
'ইয়াযীদদের বিষয়টি আমাকে শেষ করে দিয়েছে এবং তাতে আমি পরাজিত হয়েছি। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।'
এই ঘটনার পর বানু উমাইয়্যারা শঙ্কিত হয়ে পড়ে যে, তিনি ইয়াযীদের স্থলাভিষিক্তির বাই'আতকে বাতিল করে খিলাফতকে আবার শূরা ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দিয়ে যান কিনা। তারা 'উমারকে বিষ প্রয়োগের জন্য একজনকে নিয়োগ করে। ৩৪০
যাই হোক, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাদেরকে বুঝানোর সব রকম চেষ্টা করেন, কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। তারা তাদের সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত হলো না। অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি কয়েকটি শর্তে তাদের সাথে যুদ্ধ করার অনুমতি দান করেন। শর্তগুলো নিম্নরূপ:
১. নারী, শিশু ও বন্দীদের হত্যা করা যাবে না এবং আহতদের পিছু ধাওয়া করা যাবে না।
২. বিজয় লাভের পর গনীমতের যে সম্পদ হস্তগত হবে তা তাদের পরিবার ও সন্তানদের নিকট ফেরত দেওয়া হবে।
৩. বন্দী ততদিন পর্যন্ত বন্দী অবস্থায় থাকবে যতদিন সে ঠিক পথে ফিরে না আসে।
এই বিধি নিষেধের আওতায় 'আবদুল হামীদ তাদের উপর আক্রমণ চালান, কিন্তু তিনি পরাজিত হন। এ খবর খলীফা 'উমারের নিকট পৌছলে তিনি মাসলামা ইবন 'আবদিল মালিককে পাঠান। অল্প কিছুদিনের মধ্যে তিনি তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।
টিকাঃ
৩৪০. আল-কামিল ফিত তারীখ-৫/৪৫-৪৮; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৮৭; মুরূজ আয-যাহাব-২/১৭১; খিলাফত ও মুলুকিয়াত-১৯০-১৯১; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২১৪-২১৭
📄 নৌ-অভিযান
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের যুদ্ধ অভিযানসমূহের মধ্যে নৌ যুদ্ধের কোন কথা পাওয়া যায় না। আল্লামা যুরকানী বলেছেন, হযরত 'উছমানের যুগে নৌ যুদ্ধের যে ধারা শুরু হয় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তা একেবারে বন্ধ করে দেন। তাঁর নৌ অভিযানের মধ্যে কেবল এটাই দেখা যায় যে, হিজরী ১০০ সনে রোমানরা যখন লাযেকিয়ার উপকূলবর্তী জনপদে আক্রমণ করে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং তথাকার অধিবাসীদেরকে বন্দী করে নিয়ে যায় তখন 'উমার জনপদের পুনঃনির্মাণ, নিরাপত্তার নিশ্চিতকরণ এবং বন্দীদের মুক্তির জন্য মুক্তিপণ পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর মধ্যে হিজরী ১০১ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অতঃপর ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক এ কাজগুলো সমাধা করেন। কিন্তু অপর একটি বর্ণনা মতে জনপদের পুনঃনির্মাণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য দুর্গ তৈরির কাজ দু'টি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযই শেষ করে যান। ৩৪১
টিকাঃ
৩৪১. ফুতূহ আল-বুলদান-১৩৯