📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 একান্ত ঘনিষ্ঠজন

📄 একান্ত ঘনিষ্ঠজন


তিন ব্যক্তি ছিলেন তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠজন ও সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। তারা প্রায় সবসময় তার সঙ্গে থাকতেন। এ তিনজন ছিলেন তার পরিবারের সদস্য। ১. নিজের সুযোগ্যপুত্র আবদুল মালিক, ২. দাস মুযাহিম, ৩. ভাই সাহল ইবন 'আবদিল 'আযীয। মায়মূন ইবন মিত্রান বলেন: ৩০৬
'উমার ইবন 'আবদিল আযীয, তাঁর ছেলে 'আবদুল মালিক ও তাঁর দাস মুযাহিমের চেয়ে অধিকতর ভালো তিনজন মানুষ একটি বাড়ীতে আমি আর দেখিনি।"

টিকাঃ
৩০৬. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬

তিন ব্যক্তি ছিলেন তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠজন ও সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। তারা প্রায় সবসময় তার সঙ্গে থাকতেন। এ তিনজন ছিলেন তার পরিবারের সদস্য। ১. নিজের সুযোগ্যপুত্র আবদুল মালিক, ২. দাস মুযাহিম, ৩. ভাই সাহল ইবন 'আবদিল 'আযীয। মায়মূন ইবন মিত্রান বলেন: ৩০৬
'উমার ইবন 'আবদিল আযীয, তাঁর ছেলে 'আবদুল মালিক ও তাঁর দাস মুযাহিমের চেয়ে অধিকতর ভালো তিনজন মানুষ একটি বাড়ীতে আমি আর দেখিনি।"

টিকাঃ
৩০৬. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 উপদেষ্টা পরিষদ

📄 উপদেষ্টা পরিষদ


তাঁর উচ্চ পর্যায়ের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যবৃন্দ হলেন: মায়মুন ইবন মিত্রান, রাজা' ইবন হায়ওয়া, রিয়াহ ইবন 'উবায়দা আল-কিন্দী। উল্লেখিত ব্যক্তিদের চেয়ে একটু নিম্ন পর্যায়ের আরো কয়েকজন উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরা হলেন: 'আমর ইবন কায়স, 'আওন ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ও মুহাম্মাদ ইবন আয-যুবায়র আল-হানজালী। ৩০৭ তিনি তাঁর সময়ের জ্ঞানী-গুণী, খোদাভীরু, জনগণের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও রাজনীতি বিষয়ে পরিপক্ক ব্যক্তিবর্গের নিকট পত্র লিখে তাঁদের সাহচর্য ও পরামর্শ চাইতেন। কেউ কোন পরামর্শ দান করলে তিনি সানন্দে তা গ্রহণ করতেন ও বাস্তবায়নের চেষ্টাও করতেন। এ জাতীয় খ্যাতিমান কয়েক ব্যক্তি হলেন: হাসান আল-বসরী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা), তাউস, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কারাজী, 'আমর ইবন মুহাজির, যিয়াদ আল-'আবদ, ইয়াযীদ আর-রাক্কাশী (রহ) ও আরো অনেকে। একবার তিনি মুহাম্মাদ আল-কারাজীর একটি উপদেশের পরে বলেন: ৩০৮
'আপনার দানের দ্বারা একজন দরিদ্র ব্যক্তি তার দারিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার চেয়ে আপনার উপদেশ দ্বারা একজন মানুষ ধ্বংস থেকে মুক্তি পাওয়া অধিক ভালো।'

একবার তিনি মায়মূন ইবন মিত্রানকে বললেন: ওহে মায়মূন! খিলাফতের এ দায়িত্ব পালনে আমি কিভাবে সহযোগী নির্বাচন করবো এবং কিভাবে তার উপর আস্থা রাখবো? মায়মূন বললেন: ৩০৯
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আপনি হলেন বাজারতুল্য। বাজারে যা চলে তাই আসে। মানুষ যখন জানবে আপনার নিকট কেবল সঠিক জিনিসই চলে তখন সঠিক জিনিস ছাড়া আর কিছু আপনার নিকট আসবে না।'

মুহাম্মাদ ইবন কা'ব একবার তাঁকে বলেন, যে ব্যক্তির আপনার কাছে কোন প্রয়োজন আছে তাকে আপনার সহচর করবেন না। কারণ, তার প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে তার হৃদ্যতাও শেষ হয়ে যাবে। বরং আপনি সহচর করুন এদেরকে : ৩১০
'কল্যাণমূলক কাজে মহত্তর, সত্যের পথে ধৈর্যশীল ব্যক্তি, সে আপনাকে সাহায্য করবে এবং তাঁর সাহায্যও আপনার জন্য যথেষ্ট হবে।'

একবার 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয ইরাকের ফকীহদেরকে ডেকে পাঠালেন। হাসান আল-বসরী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে আসতে পারলেন না। তবে একথাগুলো লিখে পাঠালেন:
'হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি অটল থাকেন জনগণও অটল থাকবে, যদি আপনি ঝুঁকে যান তারাও ঝুঁকে যাবে। হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি লাভ করেন নূহের জীবন, সুলায়মানের শাসন কর্তৃত্ব, ইবরাহীমের দৃঢ় প্রত্যয় ও লুকমানের জ্ঞান, তাহলেও আপনাকে বাধা অতিক্রম করা ছাড়া উপায় নেই। সেই বাধার পিছনেই হবে জান্নাত অথবা জাহান্নাম। একটা তাকে ভুল করলে অন্যটায় সে প্রবেশ করবে।'

চিঠিটি 'উমারের হাতে পৌছলে তিনি সেটা তাঁর দু'চোখের উপর রাখেন। কিছুক্ষণ কাঁদলেন, তারপর বললেন : আমাকে নূহের জীবন, ইবরাহীমের বিশ্বাস, সুলায়মানের ক্ষমতা ও লুকমানের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কে দেবে? আমি যদি এসব লাভ করতাম তাহলেও পূর্ববর্তীদের পেয়ালা পান করা ছাড়া আমার কোন উপায় থাকতো না। ৩১১

একবার তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ তাউস ইবন কায়সানের নিকট পাঠানো একটি পত্রে রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ চেয়ে পাঠালেন। জবাবে তাউস দশটি বাক্য লিখে পাঠান। তার কয়েকটি বাক্য নিম্নরূপ: ৩১২
'হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনার প্রতি সালাম। মহাপরাক্রমশালী মহিমান্বিত আল্লাহ একখানি গ্রন্থ নাযিল করেছেন। তাতে কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছেন। তাতে কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে কিছু অংশকে করেছেন সুদৃঢ়, আর কিছু অংশকে করেছেন সাদৃশ্যপূর্ণ। অতঃপর আল্লাহর হালালকে হালাল ও আল্লাহর হারামকে হারাম ঘোষণা করুন। আল্লাহর দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে চিন্তা করুন, তাঁর নির্দেশ মত কাজ করুন এবং তাঁর সাদৃশ্যপূর্ণ অংশে ঈমান আনুন। আস্-সালামু আলাইকুম।'

একবার মুহাম্মাদ ইবন আল-কারাজী 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের নিকট গিয়ে দেখেন, তিনি মজলিসে উপস্থিত একজনের উপদেশমূলক বক্তব্য শুনে কাঁদছেন। মুহাম্মাদ তখন দুনিয়া, আখিরাত ও খিলাফত পরিচালনা বিষয়ে বেশ দীর্ঘ একটা ভাষণ দেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপ: ৩১৩
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ দুনিয়া হচ্ছে একটি বাজারের মত। এখান থেকে কেউ লোকসান দিয়ে বাড়ী ফেরে, কেউ ফেরে লাভবান হয়ে। এ দুনিয়া দ্বারা বহু জাতি- সম্প্রদায় প্রতারিত হয়েছে যেমন আমরা হচ্ছি। অবশেষে মৃত্যু এসে তাদের সবকিছু ঘিরে ফেলেছে এবং তিরস্কৃত অবস্থায় তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আখিরাতের জীবনে তারা যা চেয়েছে তার জন্য কোন পাথেয় যেমন তারা সংগে নিয়ে যায়নি, তেমনি যা চায়নি তা থেকে রক্ষারও ব্যবস্থা করে যায়নি।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন এবং আপনার অন্তরে দু'টি পথের যে কোন একটিকে স্থান দিন। যখন আপনি আপনার মহান প্রভুর সামনে উপস্থিত হবেন তখন যে জিনিস আপনার সংগে থাকা আপনি পছন্দ করেন তার দিকে দৃষ্টি দেন। তার বিনিময় অন্বেষণ করুন সেই দিনের জন্য যে দিন কোন বিনিময় গ্রহণ করা হবে না। আপনি সেই পণ্য-সামগ্রীর দিকে অবশ্যই যাবেন না যা আপনার পূর্ববর্তীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আপনি চাইবেন, তা যেন আপনার সামনে থেকে দূর হয়ে যায়।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন। সকল দরজা খোলা রাখুন, পর্দা (নিরাপত্তা প্রহরী) সহজ করুন এবং মজলুমকে সাহায্য ও জালেমকে প্রতিহত করুন। যার মধ্যে তিনটি জিনিস থাকে আল্লাহর প্রতি তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করে। কেউ যখন সন্তুষ্ট হয়, তখন তার এই সন্তুষ্টি তাকে মিথ্যার মধ্যে নিয়ে যায় না। রাগান্বিত হলে তার রাগ তাকে সত্য থেকে বের করে দেয় না। আর ক্ষমতাবান হলে তার অধিকার বহির্ভূত কোন কিছু হাতিয়ে নেয় না।"

একবার আবূ হাযিম (রহ) 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে নিম্নের কথাটি লিখে পাঠালেন : ৩১৪
'আপনি মুহাম্মাদ (সা)-এর সাক্ষাতকে ভয় করুন। এমতাবস্থায় যে, আপনি রিসালাতের প্রচার করছেন তাঁর প্রতি বিশ্বাস সহকারে এবং তিনি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন তাঁর উম্মাতের উপর নিকৃষ্টভাবে খিলাফত পরিচালনার ব্যাপারে।'

আরেকবার 'উমার আবূ হাযিমকে বললেন : আবূ হাযিম, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দান করুন। আবূ হাযিম বললেন : ৩১৫
'আপনি শুয়ে পড়ুন। তারপর মৃত্যুকে আপনার মাথার পাশে রেখে দিন। তারপর ভেবে দেখুন, মৃত্যুর সময় আপনি কিসের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন, এখনই তার মধ্যে থাকুন। তেমনিভাবে মৃত্যুর সময় যার মধ্যে থাকতে অপছন্দ করেন তা এখনই ছেড়ে দিন।"

টিকাঃ
৩০৭. তাবাকাত-৫/৩৯৫
৩০৮. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬
৩০৯. তাবাকাত-৫/৩৯৪
৩১০. ইবনুল জাওযী-১৪৭
৩১১. প্রাগুক্ত
৩১২. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-২২১
৩১৩. ইবনুল জাওযী-১৫৭-১৫৯
৩১৪. প্রাগুক্ত
৩১৫. প্রাগুক্ত, হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩১৭

তাঁর উচ্চ পর্যায়ের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যবৃন্দ হলেন: মায়মুন ইবন মিত্রান, রাজা' ইবন হায়ওয়া, রিয়াহ ইবন 'উবায়দা আল-কিন্দী। উল্লেখিত ব্যক্তিদের চেয়ে একটু নিম্ন পর্যায়ের আরো কয়েকজন উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরা হলেন: 'আমর ইবন কায়স, 'আওন ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ও মুহাম্মাদ ইবন আয-যুবায়র আল-হানজালী। ৩০৭ তিনি তাঁর সময়ের জ্ঞানী-গুণী, খোদাভীরু, জনগণের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও রাজনীতি বিষয়ে পরিপক্ক ব্যক্তিবর্গের নিকট পত্র লিখে তাঁদের সাহচর্য ও পরামর্শ চাইতেন। কেউ কোন পরামর্শ দান করলে তিনি সানন্দে তা গ্রহণ করতেন ও বাস্তবায়নের চেষ্টাও করতেন। এ জাতীয় খ্যাতিমান কয়েক ব্যক্তি হলেন: হাসান আল-বসরী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা), তাউস, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কারাজী, 'আমর ইবন মুহাজির, যিয়াদ আল-'আবদ, ইয়াযীদ আর-রাক্কাশী (রহ) ও আরো অনেকে। একবার তিনি মুহাম্মাদ আল-কারাজীর একটি উপদেশের পরে বলেন: ৩০৮
'আপনার দানের দ্বারা একজন দরিদ্র ব্যক্তি তার দারিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার চেয়ে আপনার উপদেশ দ্বারা একজন মানুষ ধ্বংস থেকে মুক্তি পাওয়া অধিক ভালো।'

একবার তিনি মায়মূন ইবন মিত্রানকে বললেন: ওহে মায়মূন! খিলাফতের এ দায়িত্ব পালনে আমি কিভাবে সহযোগী নির্বাচন করবো এবং কিভাবে তার উপর আস্থা রাখবো? মায়মূন বললেন: ৩০৯
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আপনি হলেন বাজারতুল্য। বাজারে যা চলে তাই আসে। মানুষ যখন জানবে আপনার নিকট কেবল সঠিক জিনিসই চলে তখন সঠিক জিনিস ছাড়া আর কিছু আপনার নিকট আসবে না।'

মুহাম্মাদ ইবন কা'ব একবার তাঁকে বলেন, যে ব্যক্তির আপনার কাছে কোন প্রয়োজন আছে তাকে আপনার সহচর করবেন না। কারণ, তার প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে তার হৃদ্যতাও শেষ হয়ে যাবে। বরং আপনি সহচর করুন এদেরকে : ৩১০
'কল্যাণমূলক কাজে মহত্তর, সত্যের পথে ধৈর্যশীল ব্যক্তি, সে আপনাকে সাহায্য করবে এবং তাঁর সাহায্যও আপনার জন্য যথেষ্ট হবে।'

একবার 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয ইরাকের ফকীহদেরকে ডেকে পাঠালেন। হাসান আল-বসরী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে আসতে পারলেন না। তবে একথাগুলো লিখে পাঠালেন:
'হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি অটল থাকেন জনগণও অটল থাকবে, যদি আপনি ঝুঁকে যান তারাও ঝুঁকে যাবে। হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি লাভ করেন নূহের জীবন, সুলায়মানের শাসন কর্তৃত্ব, ইবরাহীমের দৃঢ় প্রত্যয় ও লুকমানের জ্ঞান, তাহলেও আপনাকে বাধা অতিক্রম করা ছাড়া উপায় নেই। সেই বাধার পিছনেই হবে জান্নাত অথবা জাহান্নাম। একটা তাকে ভুল করলে অন্যটায় সে প্রবেশ করবে।'

চিঠিটি 'উমারের হাতে পৌছলে তিনি সেটা তাঁর দু'চোখের উপর রাখেন। কিছুক্ষণ কাঁদলেন, তারপর বললেন : আমাকে নূহের জীবন, ইবরাহীমের বিশ্বাস, সুলায়মানের ক্ষমতা ও লুকমানের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কে দেবে? আমি যদি এসব লাভ করতাম তাহলেও পূর্ববর্তীদের পেয়ালা পান করা ছাড়া আমার কোন উপায় থাকতো না। ৩১১

একবার তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ তাউস ইবন কায়সানের নিকট পাঠানো একটি পত্রে রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ চেয়ে পাঠালেন। জবাবে তাউস দশটি বাক্য লিখে পাঠান। তার কয়েকটি বাক্য নিম্নরূপ: ৩১২
'হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনার প্রতি সালাম। মহাপরাক্রমশালী মহিমান্বিত আল্লাহ একখানি গ্রন্থ নাযিল করেছেন। তাতে কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছেন। তাতে কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে কিছু অংশকে করেছেন সুদৃঢ়, আর কিছু অংশকে করেছেন সাদৃশ্যপূর্ণ। অতঃপর আল্লাহর হালালকে হালাল ও আল্লাহর হারামকে হারাম ঘোষণা করুন। আল্লাহর দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে চিন্তা করুন, তাঁর নির্দেশ মত কাজ করুন এবং তাঁর সাদৃশ্যপূর্ণ অংশে ঈমান আনুন। আস্-সালামু আলাইকুম।'

একবার মুহাম্মাদ ইবন আল-কারাজী 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের নিকট গিয়ে দেখেন, তিনি মজলিসে উপস্থিত একজনের উপদেশমূলক বক্তব্য শুনে কাঁদছেন। মুহাম্মাদ তখন দুনিয়া, আখিরাত ও খিলাফত পরিচালনা বিষয়ে বেশ দীর্ঘ একটা ভাষণ দেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপ: ৩১৩
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ দুনিয়া হচ্ছে একটি বাজারের মত। এখান থেকে কেউ লোকসান দিয়ে বাড়ী ফেরে, কেউ ফেরে লাভবান হয়ে। এ দুনিয়া দ্বারা বহু জাতি- সম্প্রদায় প্রতারিত হয়েছে যেমন আমরা হচ্ছি। অবশেষে মৃত্যু এসে তাদের সবকিছু ঘিরে ফেলেছে এবং তিরস্কৃত অবস্থায় তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আখিরাতের জীবনে তারা যা চেয়েছে তার জন্য কোন পাথেয় যেমন তারা সংগে নিয়ে যায়নি, তেমনি যা চায়নি তা থেকে রক্ষারও ব্যবস্থা করে যায়নি।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন এবং আপনার অন্তরে দু'টি পথের যে কোন একটিকে স্থান দিন। যখন আপনি আপনার মহান প্রভুর সামনে উপস্থিত হবেন তখন যে জিনিস আপনার সংগে থাকা আপনি পছন্দ করেন তার দিকে দৃষ্টি দেন। তার বিনিময় অন্বেষণ করুন সেই দিনের জন্য যে দিন কোন বিনিময় গ্রহণ করা হবে না। আপনি সেই পণ্য-সামগ্রীর দিকে অবশ্যই যাবেন না যা আপনার পূর্ববর্তীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আপনি চাইবেন, তা যেন আপনার সামনে থেকে দূর হয়ে যায়।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন। সকল দরজা খোলা রাখুন, পর্দা (নিরাপত্তা প্রহরী) সহজ করুন এবং মজলুমকে সাহায্য ও জালেমকে প্রতিহত করুন। যার মধ্যে তিনটি জিনিস থাকে আল্লাহর প্রতি তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করে। কেউ যখন সন্তুষ্ট হয়, তখন তার এই সন্তুষ্টি তাকে মিথ্যার মধ্যে নিয়ে যায় না। রাগান্বিত হলে তার রাগ তাকে সত্য থেকে বের করে দেয় না। আর ক্ষমতাবান হলে তার অধিকার বহির্ভূত কোন কিছু হাতিয়ে নেয় না।"

একবার আবূ হাযিম (রহ) 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে নিম্নের কথাটি লিখে পাঠালেন : ৩১৪
'আপনি মুহাম্মাদ (সা)-এর সাক্ষাতকে ভয় করুন। এমতাবস্থায় যে, আপনি রিসালাতের প্রচার করছেন তাঁর প্রতি বিশ্বাস সহকারে এবং তিনি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন তাঁর উম্মাতের উপর নিকৃষ্টভাবে খিলাফত পরিচালনার ব্যাপারে।'

আরেকবার 'উমার আবূ হাযিমকে বললেন : আবূ হাযিম, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দান করুন। আবূ হাযিম বললেন : ৩১৫
'আপনি শুয়ে পড়ুন। তারপর মৃত্যুকে আপনার মাথার পাশে রেখে দিন। তারপর ভেবে দেখুন, মৃত্যুর সময় আপনি কিসের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন, এখনই তার মধ্যে থাকুন। তেমনিভাবে মৃত্যুর সময় যার মধ্যে থাকতে অপছন্দ করেন তা এখনই ছেড়ে দিন।"

টিকাঃ
৩০৭. তাবাকাত-৫/৩৯৫
৩০৮. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬
৩০৯. তাবাকাত-৫/৩৯৪
৩১০. ইবনুল জাওযী-১৪৭
৩১১. প্রাগুক্ত
৩১২. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-২২১
৩১৩. ইবনুল জাওযী-১৫৭-১৫৯
৩১৪. প্রাগুক্ত
৩১৫. প্রাগুক্ত, হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩১৭

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের অপসারণ

📄 আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের অপসারণ


উমাইয়্যাদের স্বৈরাচারী রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কেবল তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা সাধারণ মানুষের জান-মাল নিয়েও ছিনিমিনি খেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এ কারণে যতদিন এ ধরনের শাসনকর্তাদেরকে অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় পদ্ধতিতে অপসারণ না করা হতো ততদিন রাষ্ট্রের শাসন-শৃঙ্খলা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো না। যার ভিত্তি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আদল ও ইনসাফের উপর স্থাপন করতে চাচ্ছিলেন। এ কারণে তিনি জোর-জবরদস্তী আত্মসাৎকৃত অর্থ-সম্পদ ফেরত দানের পর ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক প্রশাসন থেকে এ জাতীয় প্রজা-পীড়ক শাসনকর্তাদের বিতাড়নে উদ্যোগী হন। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বপ্রথম তিনি খুরাসানের শাসনকর্তা ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবকে অপসারণ করেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পূর্ব থেকেই এই ইয়াযীদকে পছন্দ করতেন না। আর ইয়াযীদও 'উমারকে একজন রিয়াকার বলে মনে করতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয খলীফা হওয়ার পর হিজরী ১০০ সনে তাঁকে লিখলেন: “অন্য কাউকে দায়িত্ব দিয়ে তুমি চলে এসো।"

তিনি নিজ পুত্র মাখলাদকে তথাকার ওয়ালীর দায়িত্ব দিয়ে যে সকল জিনিস ও সম্পদ পুঞ্জিভূত করেছিলেন তা নিয়ে সরে পড়তে চেয়েছিলেন; কিন্তু তথাকার অধিবাসীরা বাধা দেয়। তিনি বসরায় চলে যান। সেখানে 'উমার (রহ) কর্তৃক নিয়োগকৃত ওয়ালী 'আদী ইবন আরতাত তাঁর সাথে দেখা করে খলীফা 'উমারের (রহ) একটি চিঠি তাঁকে দেন। ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব সিতায়া ওয়াত্তা'আ (শুনলাম ও মেনে নিলাম) বলে তাঁর আনুগত্য মেনে নেন। 'আদী তাঁকে বন্দী করে 'উমারের নিকট হাজির করেন। 'উমার তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: আমি পূর্ববর্তী খলীফা সুলায়মানকে লেখা আপনার একটি পত্র পেয়েছি, তাতে আপনি দুই কোটি দিরহাম জমা করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। সেই অর্থ কোথায়? ইয়াযীদ প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে বলেন, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি তা সংগ্রহ করে দেব। 'উমার বললেন কোথা থেকে? বললেন মানুষের নিকট থেকে। 'উমার বললেন: আবার তাদের নিকট থেকে? না, সে সুযোগ তোমাকে দেওয়া হবে না।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তার নিকট সম্পূর্ণ অর্থ দাবী করেন। সে বললো: “সুলায়মানের নিকট আমার যে স্থান ও মর্যাদা ছিল তা আপনি জানেন। আমি সুলায়মানকে এই অর্থের কথা এজন্য জানিয়েছিলাম যে, মানুষ কথাটি জেনে যাক। আমার তো বিশ্বাস ছিল সুলায়মান কখনো আমার নিকট এ অর্থ দাবী করবেন না।" তার জবাবে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয সন্তুষ্ট হলেন না। তাকে বললেন: "আল্লাহকে ভয় কর। এ অর্থ তোমার নিকট গচ্ছিত আমানত। ফেরত দাও। এ মুসলমানদের অধিকার, আমি মাফ করতে পারিনে।"- একথা বলে তিনি তাকে জেলে ঢুকিয়ে দেন।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামীকে খুরাসানের ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং তাঁকে মাখলাদ ইবন ইয়াযীদকে বন্দী করার নির্দেশ দেন। তাঁকে আরো নির্দেশ দেন, কেবল নামাযের জন্য ছাড়া মাখলাদের হাতকড়া ও বেড়ী খোলা যাবে না। আল-জাররাহ তাকে বন্দী করে হাতকড়া পরানো অবস্থায় 'উমারের নিকট পাঠিয়ে দেন। মাখলাদ যখন খলীফার নিকট পৌঁছেন তখন তার মাথায় ছিল সাদা টুপি এবং পরনের কাপড় ছিল মাটি অথবা পায়ের গিরার উপরে। 'উমার তাকে লক্ষ্য করে বলেন: তোমার সম্পর্কে আমি যে তথ্য পেয়েছি, তোমার এখনকার এ অবয়ব তার বিপরীত। তখন আল-জাররাহ বললেন: ৩১৬
'আপনারা হলেন ইমাম (নেতা)। আপনারা কাপড় ঝুলিয়ে চললে আমরাও ঝুলিয়ে চলি, আর আপনারা গুটিয়ে চললে আমরাও গুটিয়ে চলি।'

তাবারীর ইতিহাসে একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, আল-জাররাহ খুরাসানে পৌঁছার পর মাখলাদ সেখান থেকে যাত্রা করে। পথে যে জনপদ ও শহর অতিক্রম করেছিল সেখানে মানুষের মধ্যে দু'হাতে অঢেল অর্থ বিলাতে থাকে। এভাবে এক সময় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সামনে উপস্থিত হয়। খলীফার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে আল্লাহর হামদ ও রাসূলের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশের পর খলীফাকে লক্ষ্য করে বলে, আল্লাহ আপনাকে খলীফা বানিয়ে সমগ্র উম্মাতের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। কেবল আমরাই আপনার কারণে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আপনার খিলাফতে আমাদের উপর এমন মুসীবত আপতিত হওয়া উচিত নয়। আপনি এই বৃদ্ধকে (ইয়াযীদ) কেন বন্দী করে রেখেছেন? তাঁর নিকট যদি কিছু দাবী থাকে তা আমি পূরণ করছি। আপনি আমার সঙ্গে একটি আপোষ-মীমাংসায় আসুন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন, যতক্ষণ সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন রকম আপোষ নেই। সে বললো: 'আপনার নিকট যদি কোন সাক্ষী-প্রমাণ থাকে তাহলে সেই অনুযায়ী কাজ করুন। আর প্রমাণ না থাকলে ইয়াযীদের বক্তব্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করুন। তা না হলে তাঁর নিকট থেকে হলফ নিন। তিনি হলফ করতে অস্বীকার করলে তাঁর সাথে আপোষ করুন।' 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন: সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাঁর ব্যাপারে অন্য কোন উপায় দেখছি না।

এই আলোচনার পর মাখলাদ ফিরে আসে এবং এর কিছুদিন পর মারা যায়। এখন ইয়াযীদ এই অর্থের একটি পয়সাও দিতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে। এ কারণে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাকে একটি জোব্বা পরিয়ে উটের উপর চড়িয়ে "দাহ্লাক"-এর দিকে নির্বাসন দেন। এ অবস্থায় চলতে চলতে পথে যাকে পাচ্ছিলো তাকে লক্ষ্য করে বলছিল, আমার কি কোন গোত্র নেই? আমাকে কেন দাহ্লাক-এ নির্বাসন করা হচ্ছে? সেখানে তো কেবল পাপাচারী, ডাকাত ও সন্দেহভাজন লোকদের পাঠানো হয়। সুবহানাল্লাহ! আমার কি কোন গোত্র নেই? ইয়াযীদের গোত্রের উপর তার এই উত্তেজনামূলক আবেদনের দারুণ প্রভাব পড়লো। তারা ভীষণ অসন্তুষ্ট হলো। একথা সালামা ইবন নু'আইম আল-খাওলানী অবগত হয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট গেলেন এবং ইয়াযীদের গোত্রের অসন্তুষ্টির কথা জানালেন। তিনি খলীফাকে একথাও বললেন, হয়তো ইয়াযীদের গোত্র তাকে পথ থেকে ছিনতাই করে নিয়ে যাবে। এর প্রেক্ষিতে 'উমার তাকে ফিরিয়ে এনে জেলে বন্দী করে রাখেন। 'উমারের মৃত্যু পর্যন্ত সে জেলেই ছিল।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অন্তিম রোগ শয্যায়। এ খবর পেয়ে কারা অভ্যন্তরে ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব দারুণ বিচলিত হয়ে পড়ে। কারণ, সে ইযায়ীদ ইবন 'আবদিল মালিকের এক নিকট আত্মীয় আবূ 'আকীলের উপর একবার নির্যাতন চালিয়েছিল। যার প্রেক্ষিতে ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক শপথ করেছিলেন যে, যদি কখনো সুযোগ আসে তাহলে ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের চামড়া দিয়ে জুতোর তলা বানিয়ে ছাড়বেন। এখন ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব জেলের ভিতরে বসে ভেবে দেখলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পরে তিনিই খলীফা হবেন। আর তখন তাঁর শপথ পূরণ করার পথে কোন বাধা থাকবে না। ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব জেল থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নিল। নিজের চাকর-বাকর ও চাচাতো ভাইদের বলে রাখলো তারা যেন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কিছু সোয়ারী প্রস্তুত রাখে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আরো বেশী অসুস্থ্য হয়ে পড়লে সে কারাগার থেকে পালিয়ে যায়। সঙ্গী-সাথীদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য পূর্বেই একটি স্থান নির্ধারিত ছিল। সেখানে পৌছে দেখে কেউ নেই। সেখান থেকে স্ত্রীকে সংগে নিয়ে যাত্রার পূর্বে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে একটি পত্র লেখে। যার মর্ম এরূপ: "যদি আপনার বাঁচার আশা থাকতো, আল্লাহর কসম আমি পালাতাম না। কিন্তু ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিকের উপর আমার মোটেই বিশ্বাস নেই।" 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয চিঠি পাঠ করে বলেন, হে আল্লাহ! ইয়াযীদ যদি এই উম্মাতের অকল্যাণ করতে চায় তাহলে আপনি তাদেরকে তার অকল্যাণ থেকে বাঁচান এবং তার ষড়যন্ত্রকে তার দিকে ফিরিয়ে দিন।" ইয়াযীদ পালিয়ে যুকাকে পৌঁছে। সেখানে কায়স গোত্রের কিছু লোকের সাথে হুযায়ল ইবন যুফার আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। তারা ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের পালানোর খবর পেয়ে তার পিছু ধাওয়া করে তার জিনিসপত্র লুটপাট ও কয়েকটি দাস বন্দী করে। ৩১৭

টিকাঃ
৩১৭. আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতে 'উমার :৪৬-৪৭

উমাইয়্যাদের স্বৈরাচারী রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কেবল তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা সাধারণ মানুষের জান-মাল নিয়েও ছিনিমিনি খেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এ কারণে যতদিন এ ধরনের শাসনকর্তাদেরকে অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় পদ্ধতিতে অপসারণ না করা হতো ততদিন রাষ্ট্রের শাসন-শৃঙ্খলা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো না। যার ভিত্তি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আদল ও ইনসাফের উপর স্থাপন করতে চাচ্ছিলেন। এ কারণে তিনি জোর-জবরদস্তী আত্মসাৎকৃত অর্থ-সম্পদ ফেরত দানের পর ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক প্রশাসন থেকে এ জাতীয় প্রজা-পীড়ক শাসনকর্তাদের বিতাড়নে উদ্যোগী হন। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বপ্রথম তিনি খুরাসানের শাসনকর্তা ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবকে অপসারণ করেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পূর্ব থেকেই এই ইয়াযীদকে পছন্দ করতেন না। আর ইয়াযীদও 'উমারকে একজন রিয়াকার বলে মনে করতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয খলীফা হওয়ার পর হিজরী ১০০ সনে তাঁকে লিখলেন: “অন্য কাউকে দায়িত্ব দিয়ে তুমি চলে এসো।"

তিনি নিজ পুত্র মাখলাদকে তথাকার ওয়ালীর দায়িত্ব দিয়ে যে সকল জিনিস ও সম্পদ পুঞ্জিভূত করেছিলেন তা নিয়ে সরে পড়তে চেয়েছিলেন; কিন্তু তথাকার অধিবাসীরা বাধা দেয়। তিনি বসরায় চলে যান। সেখানে 'উমার (রহ) কর্তৃক নিয়োগকৃত ওয়ালী 'আদী ইবন আরতাত তাঁর সাথে দেখা করে খলীফা 'উমারের (রহ) একটি চিঠি তাঁকে দেন। ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব সিতায়া ওয়াত্তা'আ (শুনলাম ও মেনে নিলাম) বলে তাঁর আনুগত্য মেনে নেন। 'আদী তাঁকে বন্দী করে 'উমারের নিকট হাজির করেন। 'উমার তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: আমি পূর্ববর্তী খলীফা সুলায়মানকে লেখা আপনার একটি পত্র পেয়েছি, তাতে আপনি দুই কোটি দিরহাম জমা করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। সেই অর্থ কোথায়? ইয়াযীদ প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে বলেন, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি তা সংগ্রহ করে দেব। 'উমার বললেন কোথা থেকে? বললেন মানুষের নিকট থেকে। 'উমার বললেন: আবার তাদের নিকট থেকে? না, সে সুযোগ তোমাকে দেওয়া হবে না।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তার নিকট সম্পূর্ণ অর্থ দাবী করেন। সে বললো: “সুলায়মানের নিকট আমার যে স্থান ও মর্যাদা ছিল তা আপনি জানেন। আমি সুলায়মানকে এই অর্থের কথা এজন্য জানিয়েছিলাম যে, মানুষ কথাটি জেনে যাক। আমার তো বিশ্বাস ছিল সুলায়মান কখনো আমার নিকট এ অর্থ দাবী করবেন না।" তার জবাবে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয সন্তুষ্ট হলেন না। তাকে বললেন: "আল্লাহকে ভয় কর। এ অর্থ তোমার নিকট গচ্ছিত আমানত। ফেরত দাও। এ মুসলমানদের অধিকার, আমি মাফ করতে পারিনে।"- একথা বলে তিনি তাকে জেলে ঢুকিয়ে দেন।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামীকে খুরাসানের ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং তাঁকে মাখলাদ ইবন ইয়াযীদকে বন্দী করার নির্দেশ দেন। তাঁকে আরো নির্দেশ দেন, কেবল নামাযের জন্য ছাড়া মাখলাদের হাতকড়া ও বেড়ী খোলা যাবে না। আল-জাররাহ তাকে বন্দী করে হাতকড়া পরানো অবস্থায় 'উমারের নিকট পাঠিয়ে দেন। মাখলাদ যখন খলীফার নিকট পৌঁছেন তখন তার মাথায় ছিল সাদা টুপি এবং পরনের কাপড় ছিল মাটি অথবা পায়ের গিরার উপরে। 'উমার তাকে লক্ষ্য করে বলেন: তোমার সম্পর্কে আমি যে তথ্য পেয়েছি, তোমার এখনকার এ অবয়ব তার বিপরীত। তখন আল-জাররাহ বললেন: ৩১৬
'আপনারা হলেন ইমাম (নেতা)। আপনারা কাপড় ঝুলিয়ে চললে আমরাও ঝুলিয়ে চলি, আর আপনারা গুটিয়ে চললে আমরাও গুটিয়ে চলি।'

তাবারীর ইতিহাসে একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, আল-জাররাহ খুরাসানে পৌঁছার পর মাখলাদ সেখান থেকে যাত্রা করে। পথে যে জনপদ ও শহর অতিক্রম করেছিল সেখানে মানুষের মধ্যে দু'হাতে অঢেল অর্থ বিলাতে থাকে। এভাবে এক সময় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সামনে উপস্থিত হয়। খলীফার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে আল্লাহর হামদ ও রাসূলের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশের পর খলীফাকে লক্ষ্য করে বলে, আল্লাহ আপনাকে খলীফা বানিয়ে সমগ্র উম্মাতের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। কেবল আমরাই আপনার কারণে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আপনার খিলাফতে আমাদের উপর এমন মুসীবত আপতিত হওয়া উচিত নয়। আপনি এই বৃদ্ধকে (ইয়াযীদ) কেন বন্দী করে রেখেছেন? তাঁর নিকট যদি কিছু দাবী থাকে তা আমি পূরণ করছি। আপনি আমার সঙ্গে একটি আপোষ-মীমাংসায় আসুন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন, যতক্ষণ সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন রকম আপোষ নেই। সে বললো: 'আপনার নিকট যদি কোন সাক্ষী-প্রমাণ থাকে তাহলে সেই অনুযায়ী কাজ করুন। আর প্রমাণ না থাকলে ইয়াযীদের বক্তব্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করুন। তা না হলে তাঁর নিকট থেকে হলফ নিন। তিনি হলফ করতে অস্বীকার করলে তাঁর সাথে আপোষ করুন।' 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন: সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাঁর ব্যাপারে অন্য কোন উপায় দেখছি না।

এই আলোচনার পর মাখলাদ ফিরে আসে এবং এর কিছুদিন পর মারা যায়। এখন ইয়াযীদ এই অর্থের একটি পয়সাও দিতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে। এ কারণে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাকে একটি জোব্বা পরিয়ে উটের উপর চড়িয়ে "দাহ্লাক"-এর দিকে নির্বাসন দেন। এ অবস্থায় চলতে চলতে পথে যাকে পাচ্ছিলো তাকে লক্ষ্য করে বলছিল, আমার কি কোন গোত্র নেই? আমাকে কেন দাহ্লাক-এ নির্বাসন করা হচ্ছে? সেখানে তো কেবল পাপাচারী, ডাকাত ও সন্দেহভাজন লোকদের পাঠানো হয়। সুবহানাল্লাহ! আমার কি কোন গোত্র নেই? ইয়াযীদের গোত্রের উপর তার এই উত্তেজনামূলক আবেদনের দারুণ প্রভাব পড়লো। তারা ভীষণ অসন্তুষ্ট হলো। একথা সালামা ইবন নু'আইম আল-খাওলানী অবগত হয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট গেলেন এবং ইয়াযীদের গোত্রের অসন্তুষ্টির কথা জানালেন। তিনি খলীফাকে একথাও বললেন, হয়তো ইয়াযীদের গোত্র তাকে পথ থেকে ছিনতাই করে নিয়ে যাবে। এর প্রেক্ষিতে 'উমার তাকে ফিরিয়ে এনে জেলে বন্দী করে রাখেন। 'উমারের মৃত্যু পর্যন্ত সে জেলেই ছিল।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অন্তিম রোগ শয্যায়। এ খবর পেয়ে কারা অভ্যন্তরে ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব দারুণ বিচলিত হয়ে পড়ে। কারণ, সে ইযায়ীদ ইবন 'আবদিল মালিকের এক নিকট আত্মীয় আবূ 'আকীলের উপর একবার নির্যাতন চালিয়েছিল। যার প্রেক্ষিতে ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক শপথ করেছিলেন যে, যদি কখনো সুযোগ আসে তাহলে ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের চামড়া দিয়ে জুতোর তলা বানিয়ে ছাড়বেন। এখন ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব জেলের ভিতরে বসে ভেবে দেখলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পরে তিনিই খলীফা হবেন। আর তখন তাঁর শপথ পূরণ করার পথে কোন বাধা থাকবে না। ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব জেল থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নিল। নিজের চাকর-বাকর ও চাচাতো ভাইদের বলে রাখলো তারা যেন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কিছু সোয়ারী প্রস্তুত রাখে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আরো বেশী অসুস্থ্য হয়ে পড়লে সে কারাগার থেকে পালিয়ে যায়। সঙ্গী-সাথীদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য পূর্বেই একটি স্থান নির্ধারিত ছিল। সেখানে পৌছে দেখে কেউ নেই। সেখান থেকে স্ত্রীকে সংগে নিয়ে যাত্রার পূর্বে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে একটি পত্র লেখে। যার মর্ম এরূপ: "যদি আপনার বাঁচার আশা থাকতো, আল্লাহর কসম আমি পালাতাম না। কিন্তু ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিকের উপর আমার মোটেই বিশ্বাস নেই।" 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয চিঠি পাঠ করে বলেন, হে আল্লাহ! ইয়াযীদ যদি এই উম্মাতের অকল্যাণ করতে চায় তাহলে আপনি তাদেরকে তার অকল্যাণ থেকে বাঁচান এবং তার ষড়যন্ত্রকে তার দিকে ফিরিয়ে দিন।" ইয়াযীদ পালিয়ে যুকাকে পৌঁছে। সেখানে কায়স গোত্রের কিছু লোকের সাথে হুযায়ল ইবন যুফার আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। তারা ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের পালানোর খবর পেয়ে তার পিছু ধাওয়া করে তার জিনিসপত্র লুটপাট ও কয়েকটি দাস বন্দী করে। ৩১৭

টিকাঃ
৩১৭. আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতে 'উমার :৪৬-৪৭

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আঞ্চলিক ওয়ালী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ

📄 আঞ্চলিক ওয়ালী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ


সেকালে প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক কর্মকর্তা বা গভর্ণরকে ওয়ালী বা 'আমিল বলা হতো। তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা এ যুগের রাষ্ট্র ব্যবস্থার মতো ছিল না। বর্তমানকালে শাসকদের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটে, রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা ওলট-পালট হয়, ব্যক্তির জায়গায় গণতন্ত্র স্থান করে নেয়। কিন্তু রাষ্ট্রের পরিচালন ব্যবস্থার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে, কর্মকর্তাদের উপর তার কোন প্রভাবই পড়ে না। তবে প্রাচীনকালে ব্যক্তি শাসকের পরিবর্তনে গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় যেন বিপ্লব ঘটে যেত। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালে এ বিপ্লব সবচেয়ে বেশী পরিমাণে দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি খিলাফতের মসনদে আসীন হওয়ার সাথে সাথে সেই সকল পচন ও বিকৃতির সংশোধন করতে উদ্যোগী হন, যার উপাদান হযরত আমীর মু'আবিয়ার (রা) সময় থেকে শুরু হয় এবং ক্রমান্বয়ে পরিপক্ক হতে থাকে। তবে এই সংশোধনের জন্য এমন জনবলের প্রয়োজন ছিল যারা নিষ্ঠা ও সততার সংগে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চালাতে পারতো। তাঁর সময়ে এ ধরনের জনবলের প্রায় কোন অস্তিত্বই ছিল না। ইয়াস ইবন মু'আবিয়া বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একজন অত্যন্ত দক্ষ কারিগর ছিলেন। কিন্তু তাঁর আশে পাশে এমন কোন সহযোগী ছিল না যাদের সাহায্য তিনি নিতে পারতেন। তিনি নিজেও দেখতেন তাঁর যে ধরনের সহকারী ও সহযোগীর প্রয়োজন তা সরকারী দফতরগুলোতে নেই। এ কারণে তিনি তাঁর দৃষ্টি দূর-দূরান্তে ফেরাতেন। যেখানেই কোন যোগ্য লোক দেখতে পেতেন তাঁকেই এ ফাঁদে আটকাতে চাইতেন, যাতে তিনি নিজে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। সিরিয়ায় তখন একজন সত্যনিষ্ঠ বুযর্গ ব্যক্তি একান্ত নিরিবিলি জীবন যাপন করতেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর কথা জানতে পেরে তাঁকে লিখলেন, সত্যিকার সাহায্যকারী কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি আমাকে সাহায্য করুন। তিনি জবাব দিলেন, আমি পাপীদের সাহায্য করতে পারিনে। এতদসত্ত্বেও খিলাফত পরিচালনার জন্য কর্মচারী-কর্মকর্তাদের নিয়োগ ছিল অপরিহার্য। এ কারণে তিনি খিলাফতের মসনদে আসীন হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বিভিন্ন জনকে নিয়োগ দান করেন। নিম্নে এমন কয়েকজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার নাম দেওয়া হলো :

১. আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবন হাযম। খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে মদীনার গভর্ণর নিয়োগ করেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে উক্ত পদে বহাল রাখেন।
২. আবদুল হামীদ ইবন 'আবদির রহমান ইবন যায়দ ইবন খাত্তাব: তাঁকে কৃষ্ণার গভর্ণর নিয়োগ করেন।
৩. 'আদী ইবন আরতাত: বসরার গভর্ণর।
৪. 'উরওয়াহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন 'আতিয়্যা আস-সা'দী: ইয়ামনের গভর্ণর।
৫. 'আদী ইবন 'আদী আল-কিন্দী: জাযীরার ওয়ালী।
৬. ইসমা'ঈল ইবন 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবিল মুহাজির আফ্রিকার ওয়ালী।
৭. মুহাম্মাদ ইবন সুওয়ায়িদ আল ফিত্রী: দিমাক্কের ওয়ালী।
৮. জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামী: খুরাসানের ওয়ালী। ৩১৮

এছাড়াও আরো অনেক পদ ও পদাধিকারী ব্যক্তি ছিল যারা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের প্রশাসনের জন্য মোটেই প্রয়োজন ছিল না। যেমন, এমন অনেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও রক্ষী ছিল যা কেবল শাসকদের ঠাঁট-বাট, আভিজাত্য ও কৌলিন্য দেখানোর জন্য নিয়োগ করা হতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময়ে তাদের সংখ্যা ছয় শোতে পৌছে। তার মধ্যে তিন শো পুলিশ বাহিনীর সাথে সম্পর্কিত ছিল এবং বাকী তিন শো ছিল নিরাপত্তা রক্ষী। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন সকল প্রকার ঠাঁট-বাট ও জাঁকজমকের ঊর্ধ্বে। আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল তাঁকে একেবারেই নির্ভীক করে তোলে। তাই তিনি খলীফা হওয়ার পর ঐ সকল কর্মচারী-কর্মকর্তাদেরকে সাফ বলে দেন : 'তোমাদের কোন প্রয়োজন আমার নেই। আমার তাকদীর আমার রক্ষক এবং আমার মৃত্যু আমার প্রহরী।" এতদসত্ত্বেও তিনি তাদেরকে একেবারে চাকুরীচ্যুত করা সমীচীন মনে করেননি। তাদেরকে বলে দেন, যারা স্বেচ্ছায় চলে যেতে চাও যেতে পার। আর যারা থাকতে চাও তারা দশ দীনার করে পাবে। ৩১৯

ব্যক্তি হিসেবে তিনি কেবল খালিদ ইবন রায়‍্যানকে বরখাস্ত করেন। সে ছিল জাল্লাদ, সব সময় খলীফাদের সামনে তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কঠোরতার কথা তার জানা ছিল, এ কারণে খলীফা হওয়ার পর খালিদ যখন তার অভ্যাস অনুযায়ী তরবারি উঁচিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় তখন 'উমার তাকে বলেন, খালিদ! তরবারি রেখে দাও। হে আল্লাহ! আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য খালিদকে নত করছি, আপনি আর কখনো তাকে সমুন্নত করবেন না। খালিদকে অপসারণের পর তার স্থলে 'আমর ইবন মুহাজির আল-আনসারীকে নিয়োগ দেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি। ৩২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ-বদলী যে সকল মৌলিক নীতির ভিত্তিতে করা হতো তার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।

১. 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট আত্মীয় হলে তাঁকে কখনো কোথাও ওয়ালী নিয়োগ করতেন না। পুত্রের চেয়ে বেশী প্রিয় আর কে হতে পারে? কিন্তু তিনি তাঁর পুত্রদের কাউকে কোন পদে নিয়োগ দান করেননি। একবার তিনি তাঁর পুত্রদের সকলকে সমবেত করে জিজ্ঞেস করেন : তোমরা কি এটা চাও যে, তোমাদের প্রত্যেককে একটি অঞ্চলের ওয়ালী নিয়োগ করি এবং যখন তোমরা চলবে তখন তোমাদের সাথে ডাক হরকরা চলার সময় ঘণ্টা বাজার মতো ঘণ্টাধ্বনি হতে থাকুক? এক পুত্র বললো, যে কাজ আপনি করবেন না, সে প্রশ্ন করছেন কেন? তিনি তখন বললেন: তোমরা দেখতে পাচ্ছো আমার এ বিছানাটি পুরানো হয়ে গেছে, তবুও আমি চাই না যে, তোমরা এটাকে তোমাদের মোজা দিয়ে ময়লা করে ফেল। তাহলে তোমাদের দীনকে তোমাদের হাতে কিভাবে সোপর্দ করি যাতে তোমরা প্রতিটি অঞ্চলে তাকে ধূলিমলিন করে ফেল। ৩২১ তারীখুল খুলাফা গ্রন্থে এসেছে যে, এ প্রশ্ন তিনি বানু উমাইয়্যার কতিপয় সদস্যকে করেন। হতে পারে তাদের মধ্যে তাঁর পুত্রও ছিল।

একবার আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামী 'আবদুল্লাহ ইবন আহতামকে কোথাও ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ করলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয সে কথা জানতে পেরে লিখলেন: “তাকে অপসারণ কর। কারণ, আরো অনেক কথা ছাড়াও সে খোদ আমীরুল মু'মিনীনের আত্মীয়। "৩২২

২. কোন ব্যক্তি যদি কোন পদে নিয়োগ লাভের প্রার্থনা করতো, তিনি তাকে সেই পদ দিতেন না। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সুন্নাতও ছিল এ রকম। একবার বিলাল ইবন আবী বুরদাহ্ ও 'আবদুর রহমান ইবন আবী বুরদাহ্- দুই ভাই তাঁর নিকট উপস্থিত হয় এবং প্রত্যেকে তাদের মহল্লার মসজিদের মুআযযিন হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তির আবেদন জানায়। তাদের উভয়ের সম্পর্কে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের মনে খারাপ ধারণার সৃষ্টি হয়। তিনি গোপনে এক ব্যক্তিকে নিয়োগ করে বলেন, তুমি তাদের নিকট গিয়ে বলবেন, আমি যদি আমীরুল মু'মিনীনকে বলে তোমাদের দু'জনকে ইরাকের ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ পাইয়ে দিই তাহলে আমাকে কি দেবে? লোকটি বিলালকে জিজ্ঞেস করলে সে এক লাখ দিরহাম দানের অঙ্গীকার করে। লোকটি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে একথা জানালে তিনি ইরাকের ওয়ালী 'আবদুল হামীদ ইবন 'আবদির রহমানকে লিখলেন যে, না বিলাল অর্থাৎ অসৎ বিলালকে কোন পদ দিবে, আর না মূসার কোন বংশধরকে। ৩২৩

৩. কোন অত্যাচারী ও নিরাপরাধ মানুষের রক্তপাতকারী ব্যক্তিকেও তিনি কোন পদে নিয়োগ দিতেন না। একবার আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামী আম্মারাকে কোন স্থানের 'আমিল নিয়োগ করেন। একথা তিনি জানতে পেরে লেখেন: আম্মারার কোন প্রয়োজন নেই। আর যে ব্যক্তি নিজের হাতকে মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত করেছে তারও কোন প্রয়োজন নেই। তাকে অপসারণ কর। ৩২৪ আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ এবং ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের বরখাস্তের কারণও ছিল অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও অত্যাচার। একই কারণে তিনি হাজ্জাজের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তার গোত্রের লোকদের কোন প্রশ্রয় দেননি। আবূ মুসলিম ছিল হাজ্জাজের জাল্লাদ ও স্বগোত্রীয়। সে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময় সেনাবাহিনীতে ঢুকে পড়ে। তিনি তাকে অপসারণ করেন। এমনিভাবে অন্য এক ব্যক্তিকে তিনি একটি পদে নিয়োগ দেন, পরে জানতে পারেন, সে হাজ্জাজের কর্মকর্তা ছিল। তিনি তাকে প্রত্যাহার করেন। লোকটি কৈফিয়াতের সুরে বলে, আমি হাজ্জাজের অধীনে খুব অল্প দিন কাজ করেছি। তিনি বলেন, একদিনের অসৎ সংসর্গও বহু কিছু হতে পারে। ৩২৫

৪. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা হতো সে যেন কুরআন-হাদীছের জ্ঞানে পারদর্শী হয়। তিনি সকল আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তারা যেন কুরআনে পারদর্শী ব্যক্তি ছাড়া কাউকে কোন পদে নিয়োগ না দেয়। কিন্তু তারা সকলে জানায় যে, আমরা কুরআনে পারদর্শীদের নিয়োগ করে দেখেছি, কিন্তু তাদের অনেককে অবিশ্বস্ত পাওয়া গেছে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তবুও তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি আবারও নির্দেশ জারী করেন, আমি যেন একথা না শুনি যে, তোমরা কুরআনের ধারক-বাহক ব্যতীত অন্য কাউকে নিয়োগ দিয়েছো। যদি কুরআনের ধারক-বাহকদের মধ্যে কল্যাণ না থাকে তাহলে অন্যদের মধ্যে তো থাকবেই না। ৩২৬

৫. কোন ব্যক্তির মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিকতার দিক দিয়ে কোন গুণ-বৈশিষ্ট্য দেখতে পেলে তাকে রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় কাজে লাগাতে চাইতেন। তাঁর খিলাফতকালের পূর্বে সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের নিকট মিসরবাসীদের একটি প্রতিনিধি দল আসে। সেই দলটির মধ্যে ইবন বুযামির নামের এক ব্যক্তি ছিল। খলীফা সুলায়মান তাদের নিকট আফ্রিকাবাসীদের কিছু অবস্থা জানতে চাইলেন। একমাত্র ইবন খুযামির ছাড়া অন্য সকলে সেখানকার অবস্থা বর্ণনা করলো। প্রতিনিধিদলটি দরবার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একান্তে ইবন খুযামিরের এই চুপ থাকার কারণ জানতে চাইলেন।
তিনি বললেন, মিথ্যা বলতে আমার আল্লাহর ভয় হয়। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের এ ঘটনাটি মনে ছিল। তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর ইবন খুযামিরকে মিসরের কাযী নিয়োগ করেন। ৩২৭

নৈতিক গুণাবলীর মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতেন সততা ও বিশ্বস্ততার উপর। একবার 'আদী ইবন আরতাতকে লেখেন, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দাদের পরীক্ষা-নির্ণয় করুন। যে বিশ্বস্ত বলে প্রমাণিত হবে তাকে রাখবেন, আর যার সততায় আপনাদের আস্থা হবে না তাকে বিদায় করে তার স্থলে অন্যকে নিয়োগ করবেন। তবে সর্বদা আমানতদারী ও তাকওয়া-পরহেযগারীর প্রতি সবচেয়ে বেশী দৃষ্টি দেবেন। ৩২৮ বিচারকের জন্য আরো বেশী শর্ত আরোপ করেন। তিনি বলতেন, বিচারকের মধ্যে পাঁচটি গুণ থাকা উচিত। ক. রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের জ্ঞান থাকতে হবে। খ. বিচক্ষণ হতে হবে। গ. তাড়াহুড়োকারী হবে না। ঘ. পবিত্র আত্মা হতে হবে। ঙ. পরামর্শকারী হবে। ৩২৯

টিকাঃ
৩১৮. তাবাকাত-৫/২৫১
৩১৯. ইবনুল জাওযী-৯৮
৩২০. প্রাগুক্ত-৪০
৩২১. প্রাগুক্ত-২৭৪
৩২২. প্রাগুক্ত-৮৬
৩২৩. তাবাকাত-৫/২৯২
৩২৪. ইবনুল জাওযী-৮৬
৩২৫. প্রাগুক্ত-৮৯
৩২৬. প্রাগুক্ত-১০০
৩২৭. কিতাবু উলাতি মিসর-৩৩৮
৩২৮. তাবাকাত-৫/২৯৩
৩২৯. ইবনুল জাওযী-২৩৮

সেকালে প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক কর্মকর্তা বা গভর্ণরকে ওয়ালী বা 'আমিল বলা হতো। তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা এ যুগের রাষ্ট্র ব্যবস্থার মতো ছিল না। বর্তমানকালে শাসকদের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটে, রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা ওলট-পালট হয়, ব্যক্তির জায়গায় গণতন্ত্র স্থান করে নেয়। কিন্তু রাষ্ট্রের পরিচালন ব্যবস্থার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে, কর্মকর্তাদের উপর তার কোন প্রভাবই পড়ে না। তবে প্রাচীনকালে ব্যক্তি শাসকের পরিবর্তনে গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় যেন বিপ্লব ঘটে যেত। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালে এ বিপ্লব সবচেয়ে বেশী পরিমাণে দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি খিলাফতের মসনদে আসীন হওয়ার সাথে সাথে সেই সকল পচন ও বিকৃতির সংশোধন করতে উদ্যোগী হন, যার উপাদান হযরত আমীর মু'আবিয়ার (রা) সময় থেকে শুরু হয় এবং ক্রমান্বয়ে পরিপক্ক হতে থাকে। তবে এই সংশোধনের জন্য এমন জনবলের প্রয়োজন ছিল যারা নিষ্ঠা ও সততার সংগে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চালাতে পারতো। তাঁর সময়ে এ ধরনের জনবলের প্রায় কোন অস্তিত্বই ছিল না। ইয়াস ইবন মু'আবিয়া বলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একজন অত্যন্ত দক্ষ কারিগর ছিলেন। কিন্তু তাঁর আশে পাশে এমন কোন সহযোগী ছিল না যাদের সাহায্য তিনি নিতে পারতেন। তিনি নিজেও দেখতেন তাঁর যে ধরনের সহকারী ও সহযোগীর প্রয়োজন তা সরকারী দফতরগুলোতে নেই। এ কারণে তিনি তাঁর দৃষ্টি দূর-দূরান্তে ফেরাতেন। যেখানেই কোন যোগ্য লোক দেখতে পেতেন তাঁকেই এ ফাঁদে আটকাতে চাইতেন, যাতে তিনি নিজে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। সিরিয়ায় তখন একজন সত্যনিষ্ঠ বুযর্গ ব্যক্তি একান্ত নিরিবিলি জীবন যাপন করতেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর কথা জানতে পেরে তাঁকে লিখলেন, সত্যিকার সাহায্যকারী কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি আমাকে সাহায্য করুন। তিনি জবাব দিলেন, আমি পাপীদের সাহায্য করতে পারিনে। এতদসত্ত্বেও খিলাফত পরিচালনার জন্য কর্মচারী-কর্মকর্তাদের নিয়োগ ছিল অপরিহার্য। এ কারণে তিনি খিলাফতের মসনদে আসীন হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বিভিন্ন জনকে নিয়োগ দান করেন। নিম্নে এমন কয়েকজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার নাম দেওয়া হলো :

১. আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবন হাযম। খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে মদীনার গভর্ণর নিয়োগ করেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে উক্ত পদে বহাল রাখেন।
২. আবদুল হামীদ ইবন 'আবদির রহমান ইবন যায়দ ইবন খাত্তাব: তাঁকে কৃষ্ণার গভর্ণর নিয়োগ করেন।
৩. 'আদী ইবন আরতাত: বসরার গভর্ণর।
৪. 'উরওয়াহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন 'আতিয়্যা আস-সা'দী: ইয়ামনের গভর্ণর।
৫. 'আদী ইবন 'আদী আল-কিন্দী: জাযীরার ওয়ালী।
৬. ইসমা'ঈল ইবন 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবিল মুহাজির আফ্রিকার ওয়ালী।
৭. মুহাম্মাদ ইবন সুওয়ায়িদ আল ফিত্রী: দিমাক্কের ওয়ালী।
৮. জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামী: খুরাসানের ওয়ালী। ৩১৮

এছাড়াও আরো অনেক পদ ও পদাধিকারী ব্যক্তি ছিল যারা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের প্রশাসনের জন্য মোটেই প্রয়োজন ছিল না। যেমন, এমন অনেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও রক্ষী ছিল যা কেবল শাসকদের ঠাঁট-বাট, আভিজাত্য ও কৌলিন্য দেখানোর জন্য নিয়োগ করা হতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময়ে তাদের সংখ্যা ছয় শোতে পৌছে। তার মধ্যে তিন শো পুলিশ বাহিনীর সাথে সম্পর্কিত ছিল এবং বাকী তিন শো ছিল নিরাপত্তা রক্ষী। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ছিলেন সকল প্রকার ঠাঁট-বাট ও জাঁকজমকের ঊর্ধ্বে। আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল তাঁকে একেবারেই নির্ভীক করে তোলে। তাই তিনি খলীফা হওয়ার পর ঐ সকল কর্মচারী-কর্মকর্তাদেরকে সাফ বলে দেন : 'তোমাদের কোন প্রয়োজন আমার নেই। আমার তাকদীর আমার রক্ষক এবং আমার মৃত্যু আমার প্রহরী।" এতদসত্ত্বেও তিনি তাদেরকে একেবারে চাকুরীচ্যুত করা সমীচীন মনে করেননি। তাদেরকে বলে দেন, যারা স্বেচ্ছায় চলে যেতে চাও যেতে পার। আর যারা থাকতে চাও তারা দশ দীনার করে পাবে। ৩১৯

ব্যক্তি হিসেবে তিনি কেবল খালিদ ইবন রায়‍্যানকে বরখাস্ত করেন। সে ছিল জাল্লাদ, সব সময় খলীফাদের সামনে তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কঠোরতার কথা তার জানা ছিল, এ কারণে খলীফা হওয়ার পর খালিদ যখন তার অভ্যাস অনুযায়ী তরবারি উঁচিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় তখন 'উমার তাকে বলেন, খালিদ! তরবারি রেখে দাও। হে আল্লাহ! আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য খালিদকে নত করছি, আপনি আর কখনো তাকে সমুন্নত করবেন না। খালিদকে অপসারণের পর তার স্থলে 'আমর ইবন মুহাজির আল-আনসারীকে নিয়োগ দেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি। ৩২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ-বদলী যে সকল মৌলিক নীতির ভিত্তিতে করা হতো তার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।

১. 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট আত্মীয় হলে তাঁকে কখনো কোথাও ওয়ালী নিয়োগ করতেন না। পুত্রের চেয়ে বেশী প্রিয় আর কে হতে পারে? কিন্তু তিনি তাঁর পুত্রদের কাউকে কোন পদে নিয়োগ দান করেননি। একবার তিনি তাঁর পুত্রদের সকলকে সমবেত করে জিজ্ঞেস করেন : তোমরা কি এটা চাও যে, তোমাদের প্রত্যেককে একটি অঞ্চলের ওয়ালী নিয়োগ করি এবং যখন তোমরা চলবে তখন তোমাদের সাথে ডাক হরকরা চলার সময় ঘণ্টা বাজার মতো ঘণ্টাধ্বনি হতে থাকুক? এক পুত্র বললো, যে কাজ আপনি করবেন না, সে প্রশ্ন করছেন কেন? তিনি তখন বললেন: তোমরা দেখতে পাচ্ছো আমার এ বিছানাটি পুরানো হয়ে গেছে, তবুও আমি চাই না যে, তোমরা এটাকে তোমাদের মোজা দিয়ে ময়লা করে ফেল। তাহলে তোমাদের দীনকে তোমাদের হাতে কিভাবে সোপর্দ করি যাতে তোমরা প্রতিটি অঞ্চলে তাকে ধূলিমলিন করে ফেল। ৩২১ তারীখুল খুলাফা গ্রন্থে এসেছে যে, এ প্রশ্ন তিনি বানু উমাইয়্যার কতিপয় সদস্যকে করেন। হতে পারে তাদের মধ্যে তাঁর পুত্রও ছিল।

একবার আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামী 'আবদুল্লাহ ইবন আহতামকে কোথাও ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ করলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয সে কথা জানতে পেরে লিখলেন: “তাকে অপসারণ কর। কারণ, আরো অনেক কথা ছাড়াও সে খোদ আমীরুল মু'মিনীনের আত্মীয়। "৩২২

২. কোন ব্যক্তি যদি কোন পদে নিয়োগ লাভের প্রার্থনা করতো, তিনি তাকে সেই পদ দিতেন না। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সুন্নাতও ছিল এ রকম। একবার বিলাল ইবন আবী বুরদাহ্ ও 'আবদুর রহমান ইবন আবী বুরদাহ্- দুই ভাই তাঁর নিকট উপস্থিত হয় এবং প্রত্যেকে তাদের মহল্লার মসজিদের মুআযযিন হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তির আবেদন জানায়। তাদের উভয়ের সম্পর্কে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের মনে খারাপ ধারণার সৃষ্টি হয়। তিনি গোপনে এক ব্যক্তিকে নিয়োগ করে বলেন, তুমি তাদের নিকট গিয়ে বলবেন, আমি যদি আমীরুল মু'মিনীনকে বলে তোমাদের দু'জনকে ইরাকের ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ পাইয়ে দিই তাহলে আমাকে কি দেবে? লোকটি বিলালকে জিজ্ঞেস করলে সে এক লাখ দিরহাম দানের অঙ্গীকার করে। লোকটি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে একথা জানালে তিনি ইরাকের ওয়ালী 'আবদুল হামীদ ইবন 'আবদির রহমানকে লিখলেন যে, না বিলাল অর্থাৎ অসৎ বিলালকে কোন পদ দিবে, আর না মূসার কোন বংশধরকে। ৩২৩

৩. কোন অত্যাচারী ও নিরাপরাধ মানুষের রক্তপাতকারী ব্যক্তিকেও তিনি কোন পদে নিয়োগ দিতেন না। একবার আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামী আম্মারাকে কোন স্থানের 'আমিল নিয়োগ করেন। একথা তিনি জানতে পেরে লেখেন: আম্মারার কোন প্রয়োজন নেই। আর যে ব্যক্তি নিজের হাতকে মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত করেছে তারও কোন প্রয়োজন নেই। তাকে অপসারণ কর। ৩২৪ আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ এবং ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের বরখাস্তের কারণও ছিল অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও অত্যাচার। একই কারণে তিনি হাজ্জাজের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তার গোত্রের লোকদের কোন প্রশ্রয় দেননি। আবূ মুসলিম ছিল হাজ্জাজের জাল্লাদ ও স্বগোত্রীয়। সে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময় সেনাবাহিনীতে ঢুকে পড়ে। তিনি তাকে অপসারণ করেন। এমনিভাবে অন্য এক ব্যক্তিকে তিনি একটি পদে নিয়োগ দেন, পরে জানতে পারেন, সে হাজ্জাজের কর্মকর্তা ছিল। তিনি তাকে প্রত্যাহার করেন। লোকটি কৈফিয়াতের সুরে বলে, আমি হাজ্জাজের অধীনে খুব অল্প দিন কাজ করেছি। তিনি বলেন, একদিনের অসৎ সংসর্গও বহু কিছু হতে পারে। ৩২৫

৪. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা হতো সে যেন কুরআন-হাদীছের জ্ঞানে পারদর্শী হয়। তিনি সকল আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তারা যেন কুরআনে পারদর্শী ব্যক্তি ছাড়া কাউকে কোন পদে নিয়োগ না দেয়। কিন্তু তারা সকলে জানায় যে, আমরা কুরআনে পারদর্শীদের নিয়োগ করে দেখেছি, কিন্তু তাদের অনেককে অবিশ্বস্ত পাওয়া গেছে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তবুও তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি আবারও নির্দেশ জারী করেন, আমি যেন একথা না শুনি যে, তোমরা কুরআনের ধারক-বাহক ব্যতীত অন্য কাউকে নিয়োগ দিয়েছো। যদি কুরআনের ধারক-বাহকদের মধ্যে কল্যাণ না থাকে তাহলে অন্যদের মধ্যে তো থাকবেই না। ৩২৬

৫. কোন ব্যক্তির মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিকতার দিক দিয়ে কোন গুণ-বৈশিষ্ট্য দেখতে পেলে তাকে রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় কাজে লাগাতে চাইতেন। তাঁর খিলাফতকালের পূর্বে সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের নিকট মিসরবাসীদের একটি প্রতিনিধি দল আসে। সেই দলটির মধ্যে ইবন বুযামির নামের এক ব্যক্তি ছিল। খলীফা সুলায়মান তাদের নিকট আফ্রিকাবাসীদের কিছু অবস্থা জানতে চাইলেন। একমাত্র ইবন খুযামির ছাড়া অন্য সকলে সেখানকার অবস্থা বর্ণনা করলো। প্রতিনিধিদলটি দরবার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একান্তে ইবন খুযামিরের এই চুপ থাকার কারণ জানতে চাইলেন।
তিনি বললেন, মিথ্যা বলতে আমার আল্লাহর ভয় হয়। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের এ ঘটনাটি মনে ছিল। তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর ইবন খুযামিরকে মিসরের কাযী নিয়োগ করেন। ৩২৭

নৈতিক গুণাবলীর মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতেন সততা ও বিশ্বস্ততার উপর। একবার 'আদী ইবন আরতাতকে লেখেন, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দাদের পরীক্ষা-নির্ণয় করুন। যে বিশ্বস্ত বলে প্রমাণিত হবে তাকে রাখবেন, আর যার সততায় আপনাদের আস্থা হবে না তাকে বিদায় করে তার স্থলে অন্যকে নিয়োগ করবেন। তবে সর্বদা আমানতদারী ও তাকওয়া-পরহেযগারীর প্রতি সবচেয়ে বেশী দৃষ্টি দেবেন। ৩২৮ বিচারকের জন্য আরো বেশী শর্ত আরোপ করেন। তিনি বলতেন, বিচারকের মধ্যে পাঁচটি গুণ থাকা উচিত। ক. রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের জ্ঞান থাকতে হবে। খ. বিচক্ষণ হতে হবে। গ. তাড়াহুড়োকারী হবে না। ঘ. পবিত্র আত্মা হতে হবে। ঙ. পরামর্শকারী হবে। ৩২৯

টিকাঃ
৩১৮. তাবাকাত-৫/২৫১
৩১৯. ইবনুল জাওযী-৯৮
৩২০. প্রাগুক্ত-৪০
৩২১. প্রাগুক্ত-২৭৪
৩২২. প্রাগুক্ত-৮৬
৩২৩. তাবাকাত-৫/২৯২
৩২৪. ইবনুল জাওযী-৮৬
৩২৫. প্রাগুক্ত-৮৯
৩২৬. প্রাগুক্ত-১০০
৩২৭. কিতাবু উলাতি মিসর-৩৩৮
৩২৮. তাবাকাত-৫/২৯৩
৩২৯. ইবনুল জাওযী-২৩৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px