📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর কর্মধারা

📄 রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর কর্মধারা


'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বুঝেছিলেন রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামোর পরিচালকদের অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে, চরিত্র ও আদর্শবাদিতায় অনুসরণীয় মানের হতে হবে। তাঁর দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের চারটি স্তম্ভ। তিনি বলেন: ২৯৪
'একজন শাসকের থাকে অনেকগুলো স্তম্ভ। এগুলো ছাড়া সে দৃঢ়পদ হতে পারে না। আঞ্চলিক ওয়ালী বা কর্মকর্তা একটি স্তম্ভ, কাজী একটি স্তম্ভ, বায়তুল মাল-এর পরিচালক একটি স্তম্ভ এবং চতুর্থটি আমি নিজে।"

একজন খলীফা যতই যোগ্যতাসম্পন্ন ও সত্যনিষ্ঠ হোন না কেন এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠা ও জনগণের কল্যাণের যত সদিচ্ছাই তাঁর থাকুক না কেন তিনি কোনভাবে সফলকাম হবেন না যদি না তাঁর পাশে রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু সৎ ও যোগ্য পরিচালক ও উপদেষ্টামণ্ডলী থাকেন। এ কারণে তিনি তাঁর পরামর্শক ও সহযোগী হিসেবে কিছু লোক বেছে নিয়েছিলেন। তাঁরা সব সময় তাঁকে সৎ পরামর্শ দিয়েছেন এবং সঠিক কাজটি করার জন্য সহযোগিতা করেছেন।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর ন্যায়পরায়ণ শাসন ব্যবস্থায় আরব ও অনারবের মধ্যে সাম্য ও সমতা বিধান করেন। কোন বংশ-গোত্রের প্রতি কোন রকম অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করেননি। আঞ্চলিক ওয়ালীগণকে কেবল তাদের যোগ্যতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেন এবং যারা সত্য ও আদল-ইনসাফ পরিপন্থী কাজে দুঃসাহস দেখান তাদেরকে অপসারণ করেন। এই মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহকে অপসারণ করেন। এ কারণে তাঁর সময়কালে সর্বত্র একটা সম্প্রীতি ও ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর এই ন্যায়-নীতি ভিত্তিক সুশাসনে যাঁরা তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজনের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

রাজা' ইবন হায়ওয়া, ইয়াস ইবনু মু'আবিয়া, 'আবদুর রহমান ইবন নু'আইম, 'আবদুর রহমান ইবন 'আবদিল্লাহ আল-কাশইয়ারী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুগীরা, মাকহুল (শামের ফকীহ), আস-সামহ ইবন মালিক আল-খাওলানী, 'আদী ইবন আরতাত, আল-হাসান আল-বসরী, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কারাজী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, যিয়াদ ইবন আবী যিয়াদ, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উতবা, আল-কাসিম ইবন রাবী'আ আল-জাওশানী, মায়মূন ইবন মিত্রান, আবূ কিলাবা, ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব, জা'ফার ইবন রাবী'আ, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী জা'ফার (রহ) ও আরো অনেকে। ২৯৫

এখানে কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো:

১. রাজা' ইবন হায়ওয়া (রহ) : তাঁর সময়ে তিনি শামের শায়খ (ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব), ওয়ায়িজ ও বাগ্মী 'আলিম ছিলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যখন আমীর ছিলেন এবং পরবর্তীকালে যখন খলীফা হন- উভয় অবস্থায় রাজা' তাঁর সংগে ছিলেন। খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে সেক্রেটারী হিসেবে গ্রহণ করেন। মূলতঃ তিনিই 'উমারকে খলীফা মনোনীত করার জন্য সুলায়মানকে পরামর্শ দেন। ২৯৬

২. ইয়াস ইবন মু'আবিয়া (রহ) : তিনি ছিলেন বসরার কাজী। তীক্ষ্ণ মেধা ও প্রখর স্মৃতিশক্তির জন্য যাদেরকে যুগের বিস্ময় বলে মনে করা হতো তিনি তাঁদের একজন। তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও আন্দাজ-অনুমান সত্যে পরিণত হওয়া প্রবাদে পরিণত হয়। একবার তাঁকে বলা হলো: আপনি একজন বিস্ময়কর মানুষ ছাড়া আপনার মধ্যে আর কোন দোষ নেই। বললেন: আমি যা বলি তা কি তোমাদেরকে বিস্মিত করে? লোকেরা বললো: হাঁ! বললেন: তাহলে আমাকে দেখে বিস্মিত হওয়া অধিকতর সঙ্গত।

তিনি ওয়াসিত নগরে গেলেন। কিছুদিন পর সেখানকার অধিবাসীদের বললেন: যে দিন আমি আপনাদের এই শহরে এসেছি সেদিনই আমি আপনাদের ভালো ও মন্দ লোকগুলোকে চিনে ফেলেছি। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো কিভাবে? বললেন: আমাদের সাথে কিছু ভালো লোক আছে এবং তাদের সাথে আপনাদের কিছু লোকের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এর ঠিক বিপরীতে আমাদের সাথে কিছু খারাপ লোক আছে এবং তাদের সাথে আপনাদের কিছু লোকের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এর দ্বারা আমি বুঝেছি আপনাদের ভালো মানুষের সাথে আমাদের ভালো মানুষের এবং আপনাদের মন্দ মানুষের সাথে আমাদের মন্দ মানুষের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আল-জাহিজ বলেন: ইয়াস মুদার গোত্রের গর্ব এবং কাজীদের পুরোধা। তাঁর আন্দাজ-অনুমান সত্য-সঠিক হতো। বিস্ময়কর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, ইলহাম প্রাপ্ত এবং খলীফাদের নিকট অত্যন্ত মান্যবর ব্যক্তি ছিলেন। ২৯৭

৩. মাকহুল (রহ): তিনি একজন হাফেজে হাদীছ এবং তাঁর সময়ে শামের ফকীহ ছিলেন। তাঁর মূল পারস্যের। কাবুলে জন্ম এবং সেখানে বেড়ে ওঠেন। যুদ্ধবন্দী হিসেবে আরবদের হাতে আসেন এবং সেখান থেকে মিসরে এক মহিলার মালিকানায় চলে যান। তাঁর সাথেই তাঁর পরিচয় আরোপ করা হয়। অতঃপর দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। ফিকাহ শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করেন। হাদীছের জ্ঞান অর্জনের জন্য ইরাক যান এবং সেখান থেকে যান মদীনায়। তৎকালীন মুসলিম খিলাফতের বহু অঞ্চল ও শহর ভ্রমণ করেন। অবশেষে দিমাকে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ইমাম যুহরী বলেন: মাকহুলের সময়ে ফাতওয়া বিষয়ে তাঁর চেয়ে অধিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আর কেউ নেই। ২৯৮

৪. আস-সামহু ইবন মালিক (রহ): 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে স্পেনের আমীর নিয়োগ করেন। তাঁকে স্পেনের একটা লিখিত পরিচয় ও বিবরণ লিখে পাঠাতে বলেন এবং ভূমি জরিফ করে খারাজ, খুমুস ও 'উশর নির্ধারণ করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী হি. ১০০ সনে তিনি একটি বিবরণ উপস্থাপন করেন এবং অন্য সকল নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন। বালাতের যুদ্ধে, স্পেনের মাটিতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর শাসনাধীন অঞ্চলের রাজধানী ছিল কর্ডোভা। এই কর্ডোভার পুলটি তিনি নির্মাণ করেন। ২৯৯

৫. 'আদী ইবন আরতাত (রহ): তিনি দিমাঙ্কের অধিবাসী ছিলেন। সে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ও সাহসী ব্যক্তি। হিজরী ৯৯ সনে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে বসরার ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং ইরাকে ইয়াযীদ ইবন আল-মুহাল্লাবের বিদ্রোহের ডামাডোলে ওয়াসিতে মু'আবিয়া ইবন ইয়াযীদের হাতে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। ৩০০

৬. সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (রহ): তিনি মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীর অন্যতম এবং বিশ্বস্ত 'আলিম ও শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের একজন। স্বৈরাচারী উমাইয়া খলীফাগণ তাঁকে ভীষণ সম্মান ও সমাদর করতেন। একবার সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের দরবারে যান। সুলায়মান নিজ আসন থেকে নেমে তাঁকে স্বাগতম জানান এবং তাঁকে সংগে নিয়ে নিজের আসনে পাশাপাশি বসান। ৩০১

৭. 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাস'উদ (রা) (মৃ. হি. ৯৮): তিনি মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহ্ অন্যতম ও তথাকার মুফতী। তিনি একজন কবি। তাঁর অনেক চমৎকার কবিতা আছে। একটি কবিতা আবূ তাম্মাম তাঁর বিখ্যাত "আল-হামাসা" সংকলনে সন্নিবেশ করেছেন। তাছাড়া আবুল ফারাজ আল-ইসফাহানী তাঁর বিখ্যাত "কিতাবুল আসানী" গ্রন্থে অনেক কবিতা সংকলিত করেছেন। তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের একজন শিক্ষক ছিলেন। ৩০২

৮. মায়মূন ইবন মিত্রান (রহ) একজন কাজী ও ফকীহ্। তিনি কূফার এক মহিলার দাস ছিলেন এবং তিনি তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। কৃফায় বেড়ে ওঠেন। অতঃপর রাক্কায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি আল-জাযীরার একজন 'আলিম ও নেতা ছিলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে তথাকার রাজস্ব কর্মকর্তা ও কাজী হিসেবে নিয়োগ দেন। ১০৮ হিজরীতে মু'আবিয়া ইবন হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক সাগর পাড়ি দিয়ে যে "কুবরুস” (সাইপ্রাস) অভিযান পরিচালনা করেন তিনি সেই বাহিনীর একজন অগ্রবর্তী সৈনিক ছিলেন। হাদীছ বর্ণনায় অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং একজন অত্যধিক ইবাদাতকারী ব্যক্তি ছিলেন। ৩০৩

৯. আবূ কিলাবা (রহ) তাঁর আসল নাম 'আবদুল্লাহ ইবন যায়দ। একজন আইন ও বিচারে পারদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে কাজী হিসেবে নিয়োগ করতে চাইলে তিনি শামে পালিয়ে যান এবং সেখানে মারা যান। তিনি একজন বিশ্বস্ত হাদীছ বর্ণনকারী ব্যক্তি ছিলেন। ৩০৪

১০. ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব, যিনি ইয়াযীদ ইবন সুওয়াইদ আল-আযদী নামেও পরিচিত। তিনি মিসরের মুফতী ছিলেন এবং সেখানে ইল্মে দীন ও ইল্মে ফিকহ্র প্রসার ঘটান। ইমাম আল-লাইছ বলেন ইয়াযীদ আমাদের 'আলিম ও নেতা। তিনি হাদীছের একজন হুজ্জাত ও হাফেজ ছিলেন। ৩০৫

টিকাঃ
২৯৪. তাবারী, তারীখ-৭/৪৭৩
২৯৫. 'আলী-ফা'উর, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয-১১০
২৯৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১১; তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৬৫
২৯৭. ওয়াফাইয়াতুল আ'ইয়ান-১/৮১; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৫৬
২৯৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০১; আল-আ'লাম-৭/৩৮৪
২৯৯. নাফহুত তীব-১/১১১
৩০০. আল-মুবাররাদ, আল-কামিল ফিল লুগা-২/১৪৯; তারীখ আল-ইয়া'কূবী-৩/৫২
৩০১. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১৯৩; তাহযীব আত-তাহযীব-৩/৪৩৬
৩০২. 'আলী ফা'উর, সীরাতু 'উমার-১১৩
৩০৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৪
৩০৪. প্রাগুক্ত-১/৯৩
৩০৫. তাহযীবু ইবন 'আসাকির-৭/৪২৬

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বুঝেছিলেন রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামোর পরিচালকদের অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে, চরিত্র ও আদর্শবাদিতায় অনুসরণীয় মানের হতে হবে। তাঁর দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের চারটি স্তম্ভ। তিনি বলেন: ২৯৪
'একজন শাসকের থাকে অনেকগুলো স্তম্ভ। এগুলো ছাড়া সে দৃঢ়পদ হতে পারে না। আঞ্চলিক ওয়ালী বা কর্মকর্তা একটি স্তম্ভ, কাজী একটি স্তম্ভ, বায়তুল মাল-এর পরিচালক একটি স্তম্ভ এবং চতুর্থটি আমি নিজে।"

একজন খলীফা যতই যোগ্যতাসম্পন্ন ও সত্যনিষ্ঠ হোন না কেন এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠা ও জনগণের কল্যাণের যত সদিচ্ছাই তাঁর থাকুক না কেন তিনি কোনভাবে সফলকাম হবেন না যদি না তাঁর পাশে রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু সৎ ও যোগ্য পরিচালক ও উপদেষ্টামণ্ডলী থাকেন। এ কারণে তিনি তাঁর পরামর্শক ও সহযোগী হিসেবে কিছু লোক বেছে নিয়েছিলেন। তাঁরা সব সময় তাঁকে সৎ পরামর্শ দিয়েছেন এবং সঠিক কাজটি করার জন্য সহযোগিতা করেছেন।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর ন্যায়পরায়ণ শাসন ব্যবস্থায় আরব ও অনারবের মধ্যে সাম্য ও সমতা বিধান করেন। কোন বংশ-গোত্রের প্রতি কোন রকম অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করেননি। আঞ্চলিক ওয়ালীগণকে কেবল তাদের যোগ্যতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেন এবং যারা সত্য ও আদল-ইনসাফ পরিপন্থী কাজে দুঃসাহস দেখান তাদেরকে অপসারণ করেন। এই মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহকে অপসারণ করেন। এ কারণে তাঁর সময়কালে সর্বত্র একটা সম্প্রীতি ও ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর এই ন্যায়-নীতি ভিত্তিক সুশাসনে যাঁরা তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজনের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

রাজা' ইবন হায়ওয়া, ইয়াস ইবনু মু'আবিয়া, 'আবদুর রহমান ইবন নু'আইম, 'আবদুর রহমান ইবন 'আবদিল্লাহ আল-কাশইয়ারী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুগীরা, মাকহুল (শামের ফকীহ), আস-সামহ ইবন মালিক আল-খাওলানী, 'আদী ইবন আরতাত, আল-হাসান আল-বসরী, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কারাজী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, যিয়াদ ইবন আবী যিয়াদ, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উতবা, আল-কাসিম ইবন রাবী'আ আল-জাওশানী, মায়মূন ইবন মিত্রান, আবূ কিলাবা, ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব, জা'ফার ইবন রাবী'আ, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী জা'ফার (রহ) ও আরো অনেকে। ২৯৫

এখানে কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো:

১. রাজা' ইবন হায়ওয়া (রহ) : তাঁর সময়ে তিনি শামের শায়খ (ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব), ওয়ায়িজ ও বাগ্মী 'আলিম ছিলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যখন আমীর ছিলেন এবং পরবর্তীকালে যখন খলীফা হন- উভয় অবস্থায় রাজা' তাঁর সংগে ছিলেন। খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে সেক্রেটারী হিসেবে গ্রহণ করেন। মূলতঃ তিনিই 'উমারকে খলীফা মনোনীত করার জন্য সুলায়মানকে পরামর্শ দেন। ২৯৬

২. ইয়াস ইবন মু'আবিয়া (রহ) : তিনি ছিলেন বসরার কাজী। তীক্ষ্ণ মেধা ও প্রখর স্মৃতিশক্তির জন্য যাদেরকে যুগের বিস্ময় বলে মনে করা হতো তিনি তাঁদের একজন। তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও আন্দাজ-অনুমান সত্যে পরিণত হওয়া প্রবাদে পরিণত হয়। একবার তাঁকে বলা হলো: আপনি একজন বিস্ময়কর মানুষ ছাড়া আপনার মধ্যে আর কোন দোষ নেই। বললেন: আমি যা বলি তা কি তোমাদেরকে বিস্মিত করে? লোকেরা বললো: হাঁ! বললেন: তাহলে আমাকে দেখে বিস্মিত হওয়া অধিকতর সঙ্গত।

তিনি ওয়াসিত নগরে গেলেন। কিছুদিন পর সেখানকার অধিবাসীদের বললেন: যে দিন আমি আপনাদের এই শহরে এসেছি সেদিনই আমি আপনাদের ভালো ও মন্দ লোকগুলোকে চিনে ফেলেছি। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো কিভাবে? বললেন: আমাদের সাথে কিছু ভালো লোক আছে এবং তাদের সাথে আপনাদের কিছু লোকের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এর ঠিক বিপরীতে আমাদের সাথে কিছু খারাপ লোক আছে এবং তাদের সাথে আপনাদের কিছু লোকের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এর দ্বারা আমি বুঝেছি আপনাদের ভালো মানুষের সাথে আমাদের ভালো মানুষের এবং আপনাদের মন্দ মানুষের সাথে আমাদের মন্দ মানুষের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আল-জাহিজ বলেন: ইয়াস মুদার গোত্রের গর্ব এবং কাজীদের পুরোধা। তাঁর আন্দাজ-অনুমান সত্য-সঠিক হতো। বিস্ময়কর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, ইলহাম প্রাপ্ত এবং খলীফাদের নিকট অত্যন্ত মান্যবর ব্যক্তি ছিলেন। ২৯৭

৩. মাকহুল (রহ): তিনি একজন হাফেজে হাদীছ এবং তাঁর সময়ে শামের ফকীহ ছিলেন। তাঁর মূল পারস্যের। কাবুলে জন্ম এবং সেখানে বেড়ে ওঠেন। যুদ্ধবন্দী হিসেবে আরবদের হাতে আসেন এবং সেখান থেকে মিসরে এক মহিলার মালিকানায় চলে যান। তাঁর সাথেই তাঁর পরিচয় আরোপ করা হয়। অতঃপর দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। ফিকাহ শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করেন। হাদীছের জ্ঞান অর্জনের জন্য ইরাক যান এবং সেখান থেকে যান মদীনায়। তৎকালীন মুসলিম খিলাফতের বহু অঞ্চল ও শহর ভ্রমণ করেন। অবশেষে দিমাকে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ইমাম যুহরী বলেন: মাকহুলের সময়ে ফাতওয়া বিষয়ে তাঁর চেয়ে অধিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আর কেউ নেই। ২৯৮

৪. আস-সামহু ইবন মালিক (রহ): 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে স্পেনের আমীর নিয়োগ করেন। তাঁকে স্পেনের একটা লিখিত পরিচয় ও বিবরণ লিখে পাঠাতে বলেন এবং ভূমি জরিফ করে খারাজ, খুমুস ও 'উশর নির্ধারণ করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী হি. ১০০ সনে তিনি একটি বিবরণ উপস্থাপন করেন এবং অন্য সকল নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন। বালাতের যুদ্ধে, স্পেনের মাটিতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর শাসনাধীন অঞ্চলের রাজধানী ছিল কর্ডোভা। এই কর্ডোভার পুলটি তিনি নির্মাণ করেন। ২৯৯

৫. 'আদী ইবন আরতাত (রহ): তিনি দিমাঙ্কের অধিবাসী ছিলেন। সে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ও সাহসী ব্যক্তি। হিজরী ৯৯ সনে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে বসরার ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং ইরাকে ইয়াযীদ ইবন আল-মুহাল্লাবের বিদ্রোহের ডামাডোলে ওয়াসিতে মু'আবিয়া ইবন ইয়াযীদের হাতে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। ৩০০

৬. সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (রহ): তিনি মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীর অন্যতম এবং বিশ্বস্ত 'আলিম ও শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের একজন। স্বৈরাচারী উমাইয়া খলীফাগণ তাঁকে ভীষণ সম্মান ও সমাদর করতেন। একবার সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের দরবারে যান। সুলায়মান নিজ আসন থেকে নেমে তাঁকে স্বাগতম জানান এবং তাঁকে সংগে নিয়ে নিজের আসনে পাশাপাশি বসান। ৩০১

৭. 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাস'উদ (রা) (মৃ. হি. ৯৮): তিনি মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহ্ অন্যতম ও তথাকার মুফতী। তিনি একজন কবি। তাঁর অনেক চমৎকার কবিতা আছে। একটি কবিতা আবূ তাম্মাম তাঁর বিখ্যাত "আল-হামাসা" সংকলনে সন্নিবেশ করেছেন। তাছাড়া আবুল ফারাজ আল-ইসফাহানী তাঁর বিখ্যাত "কিতাবুল আসানী" গ্রন্থে অনেক কবিতা সংকলিত করেছেন। তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের একজন শিক্ষক ছিলেন। ৩০২

৮. মায়মূন ইবন মিত্রান (রহ) একজন কাজী ও ফকীহ্। তিনি কূফার এক মহিলার দাস ছিলেন এবং তিনি তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। কৃফায় বেড়ে ওঠেন। অতঃপর রাক্কায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি আল-জাযীরার একজন 'আলিম ও নেতা ছিলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে তথাকার রাজস্ব কর্মকর্তা ও কাজী হিসেবে নিয়োগ দেন। ১০৮ হিজরীতে মু'আবিয়া ইবন হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক সাগর পাড়ি দিয়ে যে "কুবরুস” (সাইপ্রাস) অভিযান পরিচালনা করেন তিনি সেই বাহিনীর একজন অগ্রবর্তী সৈনিক ছিলেন। হাদীছ বর্ণনায় অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং একজন অত্যধিক ইবাদাতকারী ব্যক্তি ছিলেন। ৩০৩

৯. আবূ কিলাবা (রহ) তাঁর আসল নাম 'আবদুল্লাহ ইবন যায়দ। একজন আইন ও বিচারে পারদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে কাজী হিসেবে নিয়োগ করতে চাইলে তিনি শামে পালিয়ে যান এবং সেখানে মারা যান। তিনি একজন বিশ্বস্ত হাদীছ বর্ণনকারী ব্যক্তি ছিলেন। ৩০৪

১০. ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব, যিনি ইয়াযীদ ইবন সুওয়াইদ আল-আযদী নামেও পরিচিত। তিনি মিসরের মুফতী ছিলেন এবং সেখানে ইল্মে দীন ও ইল্মে ফিকহ্র প্রসার ঘটান। ইমাম আল-লাইছ বলেন ইয়াযীদ আমাদের 'আলিম ও নেতা। তিনি হাদীছের একজন হুজ্জাত ও হাফেজ ছিলেন। ৩০৫

টিকাঃ
২৯৪. তাবারী, তারীখ-৭/৪৭৩
২৯৫. 'আলী-ফা'উর, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয-১১০
২৯৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১১; তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৬৫
২৯৭. ওয়াফাইয়াতুল আ'ইয়ান-১/৮১; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৫৬
২৯৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০১; আল-আ'লাম-৭/৩৮৪
২৯৯. নাফহুত তীব-১/১১১
৩০০. আল-মুবাররাদ, আল-কামিল ফিল লুগা-২/১৪৯; তারীখ আল-ইয়া'কূবী-৩/৫২
৩০১. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১৯৩; তাহযীব আত-তাহযীব-৩/৪৩৬
৩০২. 'আলী ফা'উর, সীরাতু 'উমার-১১৩
৩০৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৪
৩০৪. প্রাগুক্ত-১/৯৩
৩০৫. তাহযীবু ইবন 'আসাকির-৭/৪২৬

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 একান্ত ঘনিষ্ঠজন

📄 একান্ত ঘনিষ্ঠজন


তিন ব্যক্তি ছিলেন তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠজন ও সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। তারা প্রায় সবসময় তার সঙ্গে থাকতেন। এ তিনজন ছিলেন তার পরিবারের সদস্য। ১. নিজের সুযোগ্যপুত্র আবদুল মালিক, ২. দাস মুযাহিম, ৩. ভাই সাহল ইবন 'আবদিল 'আযীয। মায়মূন ইবন মিত্রান বলেন: ৩০৬
'উমার ইবন 'আবদিল আযীয, তাঁর ছেলে 'আবদুল মালিক ও তাঁর দাস মুযাহিমের চেয়ে অধিকতর ভালো তিনজন মানুষ একটি বাড়ীতে আমি আর দেখিনি।"

টিকাঃ
৩০৬. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬

তিন ব্যক্তি ছিলেন তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠজন ও সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। তারা প্রায় সবসময় তার সঙ্গে থাকতেন। এ তিনজন ছিলেন তার পরিবারের সদস্য। ১. নিজের সুযোগ্যপুত্র আবদুল মালিক, ২. দাস মুযাহিম, ৩. ভাই সাহল ইবন 'আবদিল 'আযীয। মায়মূন ইবন মিত্রান বলেন: ৩০৬
'উমার ইবন 'আবদিল আযীয, তাঁর ছেলে 'আবদুল মালিক ও তাঁর দাস মুযাহিমের চেয়ে অধিকতর ভালো তিনজন মানুষ একটি বাড়ীতে আমি আর দেখিনি।"

টিকাঃ
৩০৬. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 উপদেষ্টা পরিষদ

📄 উপদেষ্টা পরিষদ


তাঁর উচ্চ পর্যায়ের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যবৃন্দ হলেন: মায়মুন ইবন মিত্রান, রাজা' ইবন হায়ওয়া, রিয়াহ ইবন 'উবায়দা আল-কিন্দী। উল্লেখিত ব্যক্তিদের চেয়ে একটু নিম্ন পর্যায়ের আরো কয়েকজন উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরা হলেন: 'আমর ইবন কায়স, 'আওন ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ও মুহাম্মাদ ইবন আয-যুবায়র আল-হানজালী। ৩০৭ তিনি তাঁর সময়ের জ্ঞানী-গুণী, খোদাভীরু, জনগণের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও রাজনীতি বিষয়ে পরিপক্ক ব্যক্তিবর্গের নিকট পত্র লিখে তাঁদের সাহচর্য ও পরামর্শ চাইতেন। কেউ কোন পরামর্শ দান করলে তিনি সানন্দে তা গ্রহণ করতেন ও বাস্তবায়নের চেষ্টাও করতেন। এ জাতীয় খ্যাতিমান কয়েক ব্যক্তি হলেন: হাসান আল-বসরী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা), তাউস, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কারাজী, 'আমর ইবন মুহাজির, যিয়াদ আল-'আবদ, ইয়াযীদ আর-রাক্কাশী (রহ) ও আরো অনেকে। একবার তিনি মুহাম্মাদ আল-কারাজীর একটি উপদেশের পরে বলেন: ৩০৮
'আপনার দানের দ্বারা একজন দরিদ্র ব্যক্তি তার দারিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার চেয়ে আপনার উপদেশ দ্বারা একজন মানুষ ধ্বংস থেকে মুক্তি পাওয়া অধিক ভালো।'

একবার তিনি মায়মূন ইবন মিত্রানকে বললেন: ওহে মায়মূন! খিলাফতের এ দায়িত্ব পালনে আমি কিভাবে সহযোগী নির্বাচন করবো এবং কিভাবে তার উপর আস্থা রাখবো? মায়মূন বললেন: ৩০৯
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আপনি হলেন বাজারতুল্য। বাজারে যা চলে তাই আসে। মানুষ যখন জানবে আপনার নিকট কেবল সঠিক জিনিসই চলে তখন সঠিক জিনিস ছাড়া আর কিছু আপনার নিকট আসবে না।'

মুহাম্মাদ ইবন কা'ব একবার তাঁকে বলেন, যে ব্যক্তির আপনার কাছে কোন প্রয়োজন আছে তাকে আপনার সহচর করবেন না। কারণ, তার প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে তার হৃদ্যতাও শেষ হয়ে যাবে। বরং আপনি সহচর করুন এদেরকে : ৩১০
'কল্যাণমূলক কাজে মহত্তর, সত্যের পথে ধৈর্যশীল ব্যক্তি, সে আপনাকে সাহায্য করবে এবং তাঁর সাহায্যও আপনার জন্য যথেষ্ট হবে।'

একবার 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয ইরাকের ফকীহদেরকে ডেকে পাঠালেন। হাসান আল-বসরী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে আসতে পারলেন না। তবে একথাগুলো লিখে পাঠালেন:
'হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি অটল থাকেন জনগণও অটল থাকবে, যদি আপনি ঝুঁকে যান তারাও ঝুঁকে যাবে। হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি লাভ করেন নূহের জীবন, সুলায়মানের শাসন কর্তৃত্ব, ইবরাহীমের দৃঢ় প্রত্যয় ও লুকমানের জ্ঞান, তাহলেও আপনাকে বাধা অতিক্রম করা ছাড়া উপায় নেই। সেই বাধার পিছনেই হবে জান্নাত অথবা জাহান্নাম। একটা তাকে ভুল করলে অন্যটায় সে প্রবেশ করবে।'

চিঠিটি 'উমারের হাতে পৌছলে তিনি সেটা তাঁর দু'চোখের উপর রাখেন। কিছুক্ষণ কাঁদলেন, তারপর বললেন : আমাকে নূহের জীবন, ইবরাহীমের বিশ্বাস, সুলায়মানের ক্ষমতা ও লুকমানের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কে দেবে? আমি যদি এসব লাভ করতাম তাহলেও পূর্ববর্তীদের পেয়ালা পান করা ছাড়া আমার কোন উপায় থাকতো না। ৩১১

একবার তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ তাউস ইবন কায়সানের নিকট পাঠানো একটি পত্রে রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ চেয়ে পাঠালেন। জবাবে তাউস দশটি বাক্য লিখে পাঠান। তার কয়েকটি বাক্য নিম্নরূপ: ৩১২
'হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনার প্রতি সালাম। মহাপরাক্রমশালী মহিমান্বিত আল্লাহ একখানি গ্রন্থ নাযিল করেছেন। তাতে কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছেন। তাতে কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে কিছু অংশকে করেছেন সুদৃঢ়, আর কিছু অংশকে করেছেন সাদৃশ্যপূর্ণ। অতঃপর আল্লাহর হালালকে হালাল ও আল্লাহর হারামকে হারাম ঘোষণা করুন। আল্লাহর দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে চিন্তা করুন, তাঁর নির্দেশ মত কাজ করুন এবং তাঁর সাদৃশ্যপূর্ণ অংশে ঈমান আনুন। আস্-সালামু আলাইকুম।'

একবার মুহাম্মাদ ইবন আল-কারাজী 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের নিকট গিয়ে দেখেন, তিনি মজলিসে উপস্থিত একজনের উপদেশমূলক বক্তব্য শুনে কাঁদছেন। মুহাম্মাদ তখন দুনিয়া, আখিরাত ও খিলাফত পরিচালনা বিষয়ে বেশ দীর্ঘ একটা ভাষণ দেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপ: ৩১৩
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ দুনিয়া হচ্ছে একটি বাজারের মত। এখান থেকে কেউ লোকসান দিয়ে বাড়ী ফেরে, কেউ ফেরে লাভবান হয়ে। এ দুনিয়া দ্বারা বহু জাতি- সম্প্রদায় প্রতারিত হয়েছে যেমন আমরা হচ্ছি। অবশেষে মৃত্যু এসে তাদের সবকিছু ঘিরে ফেলেছে এবং তিরস্কৃত অবস্থায় তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আখিরাতের জীবনে তারা যা চেয়েছে তার জন্য কোন পাথেয় যেমন তারা সংগে নিয়ে যায়নি, তেমনি যা চায়নি তা থেকে রক্ষারও ব্যবস্থা করে যায়নি।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন এবং আপনার অন্তরে দু'টি পথের যে কোন একটিকে স্থান দিন। যখন আপনি আপনার মহান প্রভুর সামনে উপস্থিত হবেন তখন যে জিনিস আপনার সংগে থাকা আপনি পছন্দ করেন তার দিকে দৃষ্টি দেন। তার বিনিময় অন্বেষণ করুন সেই দিনের জন্য যে দিন কোন বিনিময় গ্রহণ করা হবে না। আপনি সেই পণ্য-সামগ্রীর দিকে অবশ্যই যাবেন না যা আপনার পূর্ববর্তীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আপনি চাইবেন, তা যেন আপনার সামনে থেকে দূর হয়ে যায়।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন। সকল দরজা খোলা রাখুন, পর্দা (নিরাপত্তা প্রহরী) সহজ করুন এবং মজলুমকে সাহায্য ও জালেমকে প্রতিহত করুন। যার মধ্যে তিনটি জিনিস থাকে আল্লাহর প্রতি তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করে। কেউ যখন সন্তুষ্ট হয়, তখন তার এই সন্তুষ্টি তাকে মিথ্যার মধ্যে নিয়ে যায় না। রাগান্বিত হলে তার রাগ তাকে সত্য থেকে বের করে দেয় না। আর ক্ষমতাবান হলে তার অধিকার বহির্ভূত কোন কিছু হাতিয়ে নেয় না।"

একবার আবূ হাযিম (রহ) 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে নিম্নের কথাটি লিখে পাঠালেন : ৩১৪
'আপনি মুহাম্মাদ (সা)-এর সাক্ষাতকে ভয় করুন। এমতাবস্থায় যে, আপনি রিসালাতের প্রচার করছেন তাঁর প্রতি বিশ্বাস সহকারে এবং তিনি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন তাঁর উম্মাতের উপর নিকৃষ্টভাবে খিলাফত পরিচালনার ব্যাপারে।'

আরেকবার 'উমার আবূ হাযিমকে বললেন : আবূ হাযিম, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দান করুন। আবূ হাযিম বললেন : ৩১৫
'আপনি শুয়ে পড়ুন। তারপর মৃত্যুকে আপনার মাথার পাশে রেখে দিন। তারপর ভেবে দেখুন, মৃত্যুর সময় আপনি কিসের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন, এখনই তার মধ্যে থাকুন। তেমনিভাবে মৃত্যুর সময় যার মধ্যে থাকতে অপছন্দ করেন তা এখনই ছেড়ে দিন।"

টিকাঃ
৩০৭. তাবাকাত-৫/৩৯৫
৩০৮. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬
৩০৯. তাবাকাত-৫/৩৯৪
৩১০. ইবনুল জাওযী-১৪৭
৩১১. প্রাগুক্ত
৩১২. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-২২১
৩১৩. ইবনুল জাওযী-১৫৭-১৫৯
৩১৪. প্রাগুক্ত
৩১৫. প্রাগুক্ত, হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩১৭

তাঁর উচ্চ পর্যায়ের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যবৃন্দ হলেন: মায়মুন ইবন মিত্রান, রাজা' ইবন হায়ওয়া, রিয়াহ ইবন 'উবায়দা আল-কিন্দী। উল্লেখিত ব্যক্তিদের চেয়ে একটু নিম্ন পর্যায়ের আরো কয়েকজন উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরা হলেন: 'আমর ইবন কায়স, 'আওন ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ও মুহাম্মাদ ইবন আয-যুবায়র আল-হানজালী। ৩০৭ তিনি তাঁর সময়ের জ্ঞানী-গুণী, খোদাভীরু, জনগণের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও রাজনীতি বিষয়ে পরিপক্ক ব্যক্তিবর্গের নিকট পত্র লিখে তাঁদের সাহচর্য ও পরামর্শ চাইতেন। কেউ কোন পরামর্শ দান করলে তিনি সানন্দে তা গ্রহণ করতেন ও বাস্তবায়নের চেষ্টাও করতেন। এ জাতীয় খ্যাতিমান কয়েক ব্যক্তি হলেন: হাসান আল-বসরী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা), তাউস, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কারাজী, 'আমর ইবন মুহাজির, যিয়াদ আল-'আবদ, ইয়াযীদ আর-রাক্কাশী (রহ) ও আরো অনেকে। একবার তিনি মুহাম্মাদ আল-কারাজীর একটি উপদেশের পরে বলেন: ৩০৮
'আপনার দানের দ্বারা একজন দরিদ্র ব্যক্তি তার দারিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার চেয়ে আপনার উপদেশ দ্বারা একজন মানুষ ধ্বংস থেকে মুক্তি পাওয়া অধিক ভালো।'

একবার তিনি মায়মূন ইবন মিত্রানকে বললেন: ওহে মায়মূন! খিলাফতের এ দায়িত্ব পালনে আমি কিভাবে সহযোগী নির্বাচন করবো এবং কিভাবে তার উপর আস্থা রাখবো? মায়মূন বললেন: ৩০৯
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আপনি হলেন বাজারতুল্য। বাজারে যা চলে তাই আসে। মানুষ যখন জানবে আপনার নিকট কেবল সঠিক জিনিসই চলে তখন সঠিক জিনিস ছাড়া আর কিছু আপনার নিকট আসবে না।'

মুহাম্মাদ ইবন কা'ব একবার তাঁকে বলেন, যে ব্যক্তির আপনার কাছে কোন প্রয়োজন আছে তাকে আপনার সহচর করবেন না। কারণ, তার প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে তার হৃদ্যতাও শেষ হয়ে যাবে। বরং আপনি সহচর করুন এদেরকে : ৩১০
'কল্যাণমূলক কাজে মহত্তর, সত্যের পথে ধৈর্যশীল ব্যক্তি, সে আপনাকে সাহায্য করবে এবং তাঁর সাহায্যও আপনার জন্য যথেষ্ট হবে।'

একবার 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয ইরাকের ফকীহদেরকে ডেকে পাঠালেন। হাসান আল-বসরী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে আসতে পারলেন না। তবে একথাগুলো লিখে পাঠালেন:
'হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি অটল থাকেন জনগণও অটল থাকবে, যদি আপনি ঝুঁকে যান তারাও ঝুঁকে যাবে। হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি লাভ করেন নূহের জীবন, সুলায়মানের শাসন কর্তৃত্ব, ইবরাহীমের দৃঢ় প্রত্যয় ও লুকমানের জ্ঞান, তাহলেও আপনাকে বাধা অতিক্রম করা ছাড়া উপায় নেই। সেই বাধার পিছনেই হবে জান্নাত অথবা জাহান্নাম। একটা তাকে ভুল করলে অন্যটায় সে প্রবেশ করবে।'

চিঠিটি 'উমারের হাতে পৌছলে তিনি সেটা তাঁর দু'চোখের উপর রাখেন। কিছুক্ষণ কাঁদলেন, তারপর বললেন : আমাকে নূহের জীবন, ইবরাহীমের বিশ্বাস, সুলায়মানের ক্ষমতা ও লুকমানের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কে দেবে? আমি যদি এসব লাভ করতাম তাহলেও পূর্ববর্তীদের পেয়ালা পান করা ছাড়া আমার কোন উপায় থাকতো না। ৩১১

একবার তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ তাউস ইবন কায়সানের নিকট পাঠানো একটি পত্রে রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ চেয়ে পাঠালেন। জবাবে তাউস দশটি বাক্য লিখে পাঠান। তার কয়েকটি বাক্য নিম্নরূপ: ৩১২
'হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনার প্রতি সালাম। মহাপরাক্রমশালী মহিমান্বিত আল্লাহ একখানি গ্রন্থ নাযিল করেছেন। তাতে কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছেন। তাতে কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে কিছু অংশকে করেছেন সুদৃঢ়, আর কিছু অংশকে করেছেন সাদৃশ্যপূর্ণ। অতঃপর আল্লাহর হালালকে হালাল ও আল্লাহর হারামকে হারাম ঘোষণা করুন। আল্লাহর দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে চিন্তা করুন, তাঁর নির্দেশ মত কাজ করুন এবং তাঁর সাদৃশ্যপূর্ণ অংশে ঈমান আনুন। আস্-সালামু আলাইকুম।'

একবার মুহাম্মাদ ইবন আল-কারাজী 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের নিকট গিয়ে দেখেন, তিনি মজলিসে উপস্থিত একজনের উপদেশমূলক বক্তব্য শুনে কাঁদছেন। মুহাম্মাদ তখন দুনিয়া, আখিরাত ও খিলাফত পরিচালনা বিষয়ে বেশ দীর্ঘ একটা ভাষণ দেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপ: ৩১৩
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ দুনিয়া হচ্ছে একটি বাজারের মত। এখান থেকে কেউ লোকসান দিয়ে বাড়ী ফেরে, কেউ ফেরে লাভবান হয়ে। এ দুনিয়া দ্বারা বহু জাতি- সম্প্রদায় প্রতারিত হয়েছে যেমন আমরা হচ্ছি। অবশেষে মৃত্যু এসে তাদের সবকিছু ঘিরে ফেলেছে এবং তিরস্কৃত অবস্থায় তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আখিরাতের জীবনে তারা যা চেয়েছে তার জন্য কোন পাথেয় যেমন তারা সংগে নিয়ে যায়নি, তেমনি যা চায়নি তা থেকে রক্ষারও ব্যবস্থা করে যায়নি।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন এবং আপনার অন্তরে দু'টি পথের যে কোন একটিকে স্থান দিন। যখন আপনি আপনার মহান প্রভুর সামনে উপস্থিত হবেন তখন যে জিনিস আপনার সংগে থাকা আপনি পছন্দ করেন তার দিকে দৃষ্টি দেন। তার বিনিময় অন্বেষণ করুন সেই দিনের জন্য যে দিন কোন বিনিময় গ্রহণ করা হবে না। আপনি সেই পণ্য-সামগ্রীর দিকে অবশ্যই যাবেন না যা আপনার পূর্ববর্তীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আপনি চাইবেন, তা যেন আপনার সামনে থেকে দূর হয়ে যায়।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন। সকল দরজা খোলা রাখুন, পর্দা (নিরাপত্তা প্রহরী) সহজ করুন এবং মজলুমকে সাহায্য ও জালেমকে প্রতিহত করুন। যার মধ্যে তিনটি জিনিস থাকে আল্লাহর প্রতি তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করে। কেউ যখন সন্তুষ্ট হয়, তখন তার এই সন্তুষ্টি তাকে মিথ্যার মধ্যে নিয়ে যায় না। রাগান্বিত হলে তার রাগ তাকে সত্য থেকে বের করে দেয় না। আর ক্ষমতাবান হলে তার অধিকার বহির্ভূত কোন কিছু হাতিয়ে নেয় না।"

একবার আবূ হাযিম (রহ) 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে নিম্নের কথাটি লিখে পাঠালেন : ৩১৪
'আপনি মুহাম্মাদ (সা)-এর সাক্ষাতকে ভয় করুন। এমতাবস্থায় যে, আপনি রিসালাতের প্রচার করছেন তাঁর প্রতি বিশ্বাস সহকারে এবং তিনি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন তাঁর উম্মাতের উপর নিকৃষ্টভাবে খিলাফত পরিচালনার ব্যাপারে।'

আরেকবার 'উমার আবূ হাযিমকে বললেন : আবূ হাযিম, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দান করুন। আবূ হাযিম বললেন : ৩১৫
'আপনি শুয়ে পড়ুন। তারপর মৃত্যুকে আপনার মাথার পাশে রেখে দিন। তারপর ভেবে দেখুন, মৃত্যুর সময় আপনি কিসের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন, এখনই তার মধ্যে থাকুন। তেমনিভাবে মৃত্যুর সময় যার মধ্যে থাকতে অপছন্দ করেন তা এখনই ছেড়ে দিন।"

টিকাঃ
৩০৭. তাবাকাত-৫/৩৯৫
৩০৮. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬
৩০৯. তাবাকাত-৫/৩৯৪
৩১০. ইবনুল জাওযী-১৪৭
৩১১. প্রাগুক্ত
৩১২. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-২২১
৩১৩. ইবনুল জাওযী-১৫৭-১৫৯
৩১৪. প্রাগুক্ত
৩১৫. প্রাগুক্ত, হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩১৭

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের অপসারণ

📄 আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের অপসারণ


উমাইয়্যাদের স্বৈরাচারী রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কেবল তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা সাধারণ মানুষের জান-মাল নিয়েও ছিনিমিনি খেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এ কারণে যতদিন এ ধরনের শাসনকর্তাদেরকে অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় পদ্ধতিতে অপসারণ না করা হতো ততদিন রাষ্ট্রের শাসন-শৃঙ্খলা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো না। যার ভিত্তি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আদল ও ইনসাফের উপর স্থাপন করতে চাচ্ছিলেন। এ কারণে তিনি জোর-জবরদস্তী আত্মসাৎকৃত অর্থ-সম্পদ ফেরত দানের পর ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক প্রশাসন থেকে এ জাতীয় প্রজা-পীড়ক শাসনকর্তাদের বিতাড়নে উদ্যোগী হন। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বপ্রথম তিনি খুরাসানের শাসনকর্তা ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবকে অপসারণ করেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পূর্ব থেকেই এই ইয়াযীদকে পছন্দ করতেন না। আর ইয়াযীদও 'উমারকে একজন রিয়াকার বলে মনে করতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয খলীফা হওয়ার পর হিজরী ১০০ সনে তাঁকে লিখলেন: “অন্য কাউকে দায়িত্ব দিয়ে তুমি চলে এসো।"

তিনি নিজ পুত্র মাখলাদকে তথাকার ওয়ালীর দায়িত্ব দিয়ে যে সকল জিনিস ও সম্পদ পুঞ্জিভূত করেছিলেন তা নিয়ে সরে পড়তে চেয়েছিলেন; কিন্তু তথাকার অধিবাসীরা বাধা দেয়। তিনি বসরায় চলে যান। সেখানে 'উমার (রহ) কর্তৃক নিয়োগকৃত ওয়ালী 'আদী ইবন আরতাত তাঁর সাথে দেখা করে খলীফা 'উমারের (রহ) একটি চিঠি তাঁকে দেন। ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব সিতায়া ওয়াত্তা'আ (শুনলাম ও মেনে নিলাম) বলে তাঁর আনুগত্য মেনে নেন। 'আদী তাঁকে বন্দী করে 'উমারের নিকট হাজির করেন। 'উমার তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: আমি পূর্ববর্তী খলীফা সুলায়মানকে লেখা আপনার একটি পত্র পেয়েছি, তাতে আপনি দুই কোটি দিরহাম জমা করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। সেই অর্থ কোথায়? ইয়াযীদ প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে বলেন, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি তা সংগ্রহ করে দেব। 'উমার বললেন কোথা থেকে? বললেন মানুষের নিকট থেকে। 'উমার বললেন: আবার তাদের নিকট থেকে? না, সে সুযোগ তোমাকে দেওয়া হবে না।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তার নিকট সম্পূর্ণ অর্থ দাবী করেন। সে বললো: “সুলায়মানের নিকট আমার যে স্থান ও মর্যাদা ছিল তা আপনি জানেন। আমি সুলায়মানকে এই অর্থের কথা এজন্য জানিয়েছিলাম যে, মানুষ কথাটি জেনে যাক। আমার তো বিশ্বাস ছিল সুলায়মান কখনো আমার নিকট এ অর্থ দাবী করবেন না।" তার জবাবে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয সন্তুষ্ট হলেন না। তাকে বললেন: "আল্লাহকে ভয় কর। এ অর্থ তোমার নিকট গচ্ছিত আমানত। ফেরত দাও। এ মুসলমানদের অধিকার, আমি মাফ করতে পারিনে।"- একথা বলে তিনি তাকে জেলে ঢুকিয়ে দেন।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামীকে খুরাসানের ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং তাঁকে মাখলাদ ইবন ইয়াযীদকে বন্দী করার নির্দেশ দেন। তাঁকে আরো নির্দেশ দেন, কেবল নামাযের জন্য ছাড়া মাখলাদের হাতকড়া ও বেড়ী খোলা যাবে না। আল-জাররাহ তাকে বন্দী করে হাতকড়া পরানো অবস্থায় 'উমারের নিকট পাঠিয়ে দেন। মাখলাদ যখন খলীফার নিকট পৌঁছেন তখন তার মাথায় ছিল সাদা টুপি এবং পরনের কাপড় ছিল মাটি অথবা পায়ের গিরার উপরে। 'উমার তাকে লক্ষ্য করে বলেন: তোমার সম্পর্কে আমি যে তথ্য পেয়েছি, তোমার এখনকার এ অবয়ব তার বিপরীত। তখন আল-জাররাহ বললেন: ৩১৬
'আপনারা হলেন ইমাম (নেতা)। আপনারা কাপড় ঝুলিয়ে চললে আমরাও ঝুলিয়ে চলি, আর আপনারা গুটিয়ে চললে আমরাও গুটিয়ে চলি।'

তাবারীর ইতিহাসে একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, আল-জাররাহ খুরাসানে পৌঁছার পর মাখলাদ সেখান থেকে যাত্রা করে। পথে যে জনপদ ও শহর অতিক্রম করেছিল সেখানে মানুষের মধ্যে দু'হাতে অঢেল অর্থ বিলাতে থাকে। এভাবে এক সময় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সামনে উপস্থিত হয়। খলীফার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে আল্লাহর হামদ ও রাসূলের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশের পর খলীফাকে লক্ষ্য করে বলে, আল্লাহ আপনাকে খলীফা বানিয়ে সমগ্র উম্মাতের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। কেবল আমরাই আপনার কারণে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আপনার খিলাফতে আমাদের উপর এমন মুসীবত আপতিত হওয়া উচিত নয়। আপনি এই বৃদ্ধকে (ইয়াযীদ) কেন বন্দী করে রেখেছেন? তাঁর নিকট যদি কিছু দাবী থাকে তা আমি পূরণ করছি। আপনি আমার সঙ্গে একটি আপোষ-মীমাংসায় আসুন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন, যতক্ষণ সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন রকম আপোষ নেই। সে বললো: 'আপনার নিকট যদি কোন সাক্ষী-প্রমাণ থাকে তাহলে সেই অনুযায়ী কাজ করুন। আর প্রমাণ না থাকলে ইয়াযীদের বক্তব্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করুন। তা না হলে তাঁর নিকট থেকে হলফ নিন। তিনি হলফ করতে অস্বীকার করলে তাঁর সাথে আপোষ করুন।' 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন: সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাঁর ব্যাপারে অন্য কোন উপায় দেখছি না।

এই আলোচনার পর মাখলাদ ফিরে আসে এবং এর কিছুদিন পর মারা যায়। এখন ইয়াযীদ এই অর্থের একটি পয়সাও দিতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে। এ কারণে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাকে একটি জোব্বা পরিয়ে উটের উপর চড়িয়ে "দাহ্লাক"-এর দিকে নির্বাসন দেন। এ অবস্থায় চলতে চলতে পথে যাকে পাচ্ছিলো তাকে লক্ষ্য করে বলছিল, আমার কি কোন গোত্র নেই? আমাকে কেন দাহ্লাক-এ নির্বাসন করা হচ্ছে? সেখানে তো কেবল পাপাচারী, ডাকাত ও সন্দেহভাজন লোকদের পাঠানো হয়। সুবহানাল্লাহ! আমার কি কোন গোত্র নেই? ইয়াযীদের গোত্রের উপর তার এই উত্তেজনামূলক আবেদনের দারুণ প্রভাব পড়লো। তারা ভীষণ অসন্তুষ্ট হলো। একথা সালামা ইবন নু'আইম আল-খাওলানী অবগত হয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট গেলেন এবং ইয়াযীদের গোত্রের অসন্তুষ্টির কথা জানালেন। তিনি খলীফাকে একথাও বললেন, হয়তো ইয়াযীদের গোত্র তাকে পথ থেকে ছিনতাই করে নিয়ে যাবে। এর প্রেক্ষিতে 'উমার তাকে ফিরিয়ে এনে জেলে বন্দী করে রাখেন। 'উমারের মৃত্যু পর্যন্ত সে জেলেই ছিল।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অন্তিম রোগ শয্যায়। এ খবর পেয়ে কারা অভ্যন্তরে ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব দারুণ বিচলিত হয়ে পড়ে। কারণ, সে ইযায়ীদ ইবন 'আবদিল মালিকের এক নিকট আত্মীয় আবূ 'আকীলের উপর একবার নির্যাতন চালিয়েছিল। যার প্রেক্ষিতে ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক শপথ করেছিলেন যে, যদি কখনো সুযোগ আসে তাহলে ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের চামড়া দিয়ে জুতোর তলা বানিয়ে ছাড়বেন। এখন ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব জেলের ভিতরে বসে ভেবে দেখলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পরে তিনিই খলীফা হবেন। আর তখন তাঁর শপথ পূরণ করার পথে কোন বাধা থাকবে না। ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব জেল থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নিল। নিজের চাকর-বাকর ও চাচাতো ভাইদের বলে রাখলো তারা যেন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কিছু সোয়ারী প্রস্তুত রাখে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আরো বেশী অসুস্থ্য হয়ে পড়লে সে কারাগার থেকে পালিয়ে যায়। সঙ্গী-সাথীদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য পূর্বেই একটি স্থান নির্ধারিত ছিল। সেখানে পৌছে দেখে কেউ নেই। সেখান থেকে স্ত্রীকে সংগে নিয়ে যাত্রার পূর্বে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে একটি পত্র লেখে। যার মর্ম এরূপ: "যদি আপনার বাঁচার আশা থাকতো, আল্লাহর কসম আমি পালাতাম না। কিন্তু ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিকের উপর আমার মোটেই বিশ্বাস নেই।" 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয চিঠি পাঠ করে বলেন, হে আল্লাহ! ইয়াযীদ যদি এই উম্মাতের অকল্যাণ করতে চায় তাহলে আপনি তাদেরকে তার অকল্যাণ থেকে বাঁচান এবং তার ষড়যন্ত্রকে তার দিকে ফিরিয়ে দিন।" ইয়াযীদ পালিয়ে যুকাকে পৌঁছে। সেখানে কায়স গোত্রের কিছু লোকের সাথে হুযায়ল ইবন যুফার আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। তারা ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের পালানোর খবর পেয়ে তার পিছু ধাওয়া করে তার জিনিসপত্র লুটপাট ও কয়েকটি দাস বন্দী করে। ৩১৭

টিকাঃ
৩১৭. আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতে 'উমার :৪৬-৪৭

উমাইয়্যাদের স্বৈরাচারী রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কেবল তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা সাধারণ মানুষের জান-মাল নিয়েও ছিনিমিনি খেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এ কারণে যতদিন এ ধরনের শাসনকর্তাদেরকে অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় পদ্ধতিতে অপসারণ না করা হতো ততদিন রাষ্ট্রের শাসন-শৃঙ্খলা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো না। যার ভিত্তি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আদল ও ইনসাফের উপর স্থাপন করতে চাচ্ছিলেন। এ কারণে তিনি জোর-জবরদস্তী আত্মসাৎকৃত অর্থ-সম্পদ ফেরত দানের পর ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক প্রশাসন থেকে এ জাতীয় প্রজা-পীড়ক শাসনকর্তাদের বিতাড়নে উদ্যোগী হন। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বপ্রথম তিনি খুরাসানের শাসনকর্তা ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবকে অপসারণ করেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পূর্ব থেকেই এই ইয়াযীদকে পছন্দ করতেন না। আর ইয়াযীদও 'উমারকে একজন রিয়াকার বলে মনে করতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয খলীফা হওয়ার পর হিজরী ১০০ সনে তাঁকে লিখলেন: “অন্য কাউকে দায়িত্ব দিয়ে তুমি চলে এসো।"

তিনি নিজ পুত্র মাখলাদকে তথাকার ওয়ালীর দায়িত্ব দিয়ে যে সকল জিনিস ও সম্পদ পুঞ্জিভূত করেছিলেন তা নিয়ে সরে পড়তে চেয়েছিলেন; কিন্তু তথাকার অধিবাসীরা বাধা দেয়। তিনি বসরায় চলে যান। সেখানে 'উমার (রহ) কর্তৃক নিয়োগকৃত ওয়ালী 'আদী ইবন আরতাত তাঁর সাথে দেখা করে খলীফা 'উমারের (রহ) একটি চিঠি তাঁকে দেন। ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব সিতায়া ওয়াত্তা'আ (শুনলাম ও মেনে নিলাম) বলে তাঁর আনুগত্য মেনে নেন। 'আদী তাঁকে বন্দী করে 'উমারের নিকট হাজির করেন। 'উমার তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: আমি পূর্ববর্তী খলীফা সুলায়মানকে লেখা আপনার একটি পত্র পেয়েছি, তাতে আপনি দুই কোটি দিরহাম জমা করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। সেই অর্থ কোথায়? ইয়াযীদ প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে বলেন, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি তা সংগ্রহ করে দেব। 'উমার বললেন কোথা থেকে? বললেন মানুষের নিকট থেকে। 'উমার বললেন: আবার তাদের নিকট থেকে? না, সে সুযোগ তোমাকে দেওয়া হবে না।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তার নিকট সম্পূর্ণ অর্থ দাবী করেন। সে বললো: “সুলায়মানের নিকট আমার যে স্থান ও মর্যাদা ছিল তা আপনি জানেন। আমি সুলায়মানকে এই অর্থের কথা এজন্য জানিয়েছিলাম যে, মানুষ কথাটি জেনে যাক। আমার তো বিশ্বাস ছিল সুলায়মান কখনো আমার নিকট এ অর্থ দাবী করবেন না।" তার জবাবে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয সন্তুষ্ট হলেন না। তাকে বললেন: "আল্লাহকে ভয় কর। এ অর্থ তোমার নিকট গচ্ছিত আমানত। ফেরত দাও। এ মুসলমানদের অধিকার, আমি মাফ করতে পারিনে।"- একথা বলে তিনি তাকে জেলে ঢুকিয়ে দেন।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামীকে খুরাসানের ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং তাঁকে মাখলাদ ইবন ইয়াযীদকে বন্দী করার নির্দেশ দেন। তাঁকে আরো নির্দেশ দেন, কেবল নামাযের জন্য ছাড়া মাখলাদের হাতকড়া ও বেড়ী খোলা যাবে না। আল-জাররাহ তাকে বন্দী করে হাতকড়া পরানো অবস্থায় 'উমারের নিকট পাঠিয়ে দেন। মাখলাদ যখন খলীফার নিকট পৌঁছেন তখন তার মাথায় ছিল সাদা টুপি এবং পরনের কাপড় ছিল মাটি অথবা পায়ের গিরার উপরে। 'উমার তাকে লক্ষ্য করে বলেন: তোমার সম্পর্কে আমি যে তথ্য পেয়েছি, তোমার এখনকার এ অবয়ব তার বিপরীত। তখন আল-জাররাহ বললেন: ৩১৬
'আপনারা হলেন ইমাম (নেতা)। আপনারা কাপড় ঝুলিয়ে চললে আমরাও ঝুলিয়ে চলি, আর আপনারা গুটিয়ে চললে আমরাও গুটিয়ে চলি।'

তাবারীর ইতিহাসে একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, আল-জাররাহ খুরাসানে পৌঁছার পর মাখলাদ সেখান থেকে যাত্রা করে। পথে যে জনপদ ও শহর অতিক্রম করেছিল সেখানে মানুষের মধ্যে দু'হাতে অঢেল অর্থ বিলাতে থাকে। এভাবে এক সময় 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সামনে উপস্থিত হয়। খলীফার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে আল্লাহর হামদ ও রাসূলের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশের পর খলীফাকে লক্ষ্য করে বলে, আল্লাহ আপনাকে খলীফা বানিয়ে সমগ্র উম্মাতের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। কেবল আমরাই আপনার কারণে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আপনার খিলাফতে আমাদের উপর এমন মুসীবত আপতিত হওয়া উচিত নয়। আপনি এই বৃদ্ধকে (ইয়াযীদ) কেন বন্দী করে রেখেছেন? তাঁর নিকট যদি কিছু দাবী থাকে তা আমি পূরণ করছি। আপনি আমার সঙ্গে একটি আপোষ-মীমাংসায় আসুন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন, যতক্ষণ সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন রকম আপোষ নেই। সে বললো: 'আপনার নিকট যদি কোন সাক্ষী-প্রমাণ থাকে তাহলে সেই অনুযায়ী কাজ করুন। আর প্রমাণ না থাকলে ইয়াযীদের বক্তব্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করুন। তা না হলে তাঁর নিকট থেকে হলফ নিন। তিনি হলফ করতে অস্বীকার করলে তাঁর সাথে আপোষ করুন।' 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন: সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাঁর ব্যাপারে অন্য কোন উপায় দেখছি না।

এই আলোচনার পর মাখলাদ ফিরে আসে এবং এর কিছুদিন পর মারা যায়। এখন ইয়াযীদ এই অর্থের একটি পয়সাও দিতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে। এ কারণে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাকে একটি জোব্বা পরিয়ে উটের উপর চড়িয়ে "দাহ্লাক"-এর দিকে নির্বাসন দেন। এ অবস্থায় চলতে চলতে পথে যাকে পাচ্ছিলো তাকে লক্ষ্য করে বলছিল, আমার কি কোন গোত্র নেই? আমাকে কেন দাহ্লাক-এ নির্বাসন করা হচ্ছে? সেখানে তো কেবল পাপাচারী, ডাকাত ও সন্দেহভাজন লোকদের পাঠানো হয়। সুবহানাল্লাহ! আমার কি কোন গোত্র নেই? ইয়াযীদের গোত্রের উপর তার এই উত্তেজনামূলক আবেদনের দারুণ প্রভাব পড়লো। তারা ভীষণ অসন্তুষ্ট হলো। একথা সালামা ইবন নু'আইম আল-খাওলানী অবগত হয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট গেলেন এবং ইয়াযীদের গোত্রের অসন্তুষ্টির কথা জানালেন। তিনি খলীফাকে একথাও বললেন, হয়তো ইয়াযীদের গোত্র তাকে পথ থেকে ছিনতাই করে নিয়ে যাবে। এর প্রেক্ষিতে 'উমার তাকে ফিরিয়ে এনে জেলে বন্দী করে রাখেন। 'উমারের মৃত্যু পর্যন্ত সে জেলেই ছিল।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অন্তিম রোগ শয্যায়। এ খবর পেয়ে কারা অভ্যন্তরে ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব দারুণ বিচলিত হয়ে পড়ে। কারণ, সে ইযায়ীদ ইবন 'আবদিল মালিকের এক নিকট আত্মীয় আবূ 'আকীলের উপর একবার নির্যাতন চালিয়েছিল। যার প্রেক্ষিতে ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিক শপথ করেছিলেন যে, যদি কখনো সুযোগ আসে তাহলে ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের চামড়া দিয়ে জুতোর তলা বানিয়ে ছাড়বেন। এখন ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব জেলের ভিতরে বসে ভেবে দেখলেন, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পরে তিনিই খলীফা হবেন। আর তখন তাঁর শপথ পূরণ করার পথে কোন বাধা থাকবে না। ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাব জেল থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নিল। নিজের চাকর-বাকর ও চাচাতো ভাইদের বলে রাখলো তারা যেন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কিছু সোয়ারী প্রস্তুত রাখে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয আরো বেশী অসুস্থ্য হয়ে পড়লে সে কারাগার থেকে পালিয়ে যায়। সঙ্গী-সাথীদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য পূর্বেই একটি স্থান নির্ধারিত ছিল। সেখানে পৌছে দেখে কেউ নেই। সেখান থেকে স্ত্রীকে সংগে নিয়ে যাত্রার পূর্বে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে একটি পত্র লেখে। যার মর্ম এরূপ: "যদি আপনার বাঁচার আশা থাকতো, আল্লাহর কসম আমি পালাতাম না। কিন্তু ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিকের উপর আমার মোটেই বিশ্বাস নেই।" 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয চিঠি পাঠ করে বলেন, হে আল্লাহ! ইয়াযীদ যদি এই উম্মাতের অকল্যাণ করতে চায় তাহলে আপনি তাদেরকে তার অকল্যাণ থেকে বাঁচান এবং তার ষড়যন্ত্রকে তার দিকে ফিরিয়ে দিন।" ইয়াযীদ পালিয়ে যুকাকে পৌঁছে। সেখানে কায়স গোত্রের কিছু লোকের সাথে হুযায়ল ইবন যুফার আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। তারা ইয়াযীদ ইবন মুহাল্লাবের পালানোর খবর পেয়ে তার পিছু ধাওয়া করে তার জিনিসপত্র লুটপাট ও কয়েকটি দাস বন্দী করে। ৩১৭

টিকাঃ
৩১৭. আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতে 'উমার :৪৬-৪৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px