📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 বিচার ব্যবস্থা

📄 বিচার ব্যবস্থা


একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পদসমূহের একটি হলো বিচারকের পদ। এ পদটি সবচেয়ে বেশী স্পর্শকাতর এবং জনগণের উপর সর্বাধিক প্রভাবশালীও। একজন কাযী বা বিচারক প্রতিদিন মানুষের সামনে আসেন, তাদের মধ্যে বিচার কাজ পরিচালনা করেন, তাদের ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসা করেন। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, উযীর- শ্রমিক, অখ্যাত-বিখ্যাত প্রতিটি শ্রেণী ও স্তরের মানুষ তাঁর কাছে আসে। তিনি যদি বিশ্বস্ত, ন্যায়পরায়ণ না হন, বিজ্ঞ-বিচক্ষণ না হন; খোদাভীরু ও সত্যের উপর অটল না হন এবং মানুষের অধিকারে যা কিছু আছে সে ব্যাপারে পাক-পবিত্র মানসের না হন, তাহলে তাঁর দ্বারা প্রথম যার ক্ষতি হয় সে হলো রাষ্ট্র ও আমীরুল মু'মিনীন তথা রাষ্ট্র- প্রধানের। এ কারণে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের মত বিজ্ঞ-বিচক্ষণ খলীফা বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করেন। বিচারক হওয়ার জন্য অনেকগুলো গুণ থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন এবং সেভাবে নির্বাচন করে কিছু বিচারক নিয়োগ করেন। তিনি কেবল বিচারক নিয়োগ করেই বসে থাকেননি, তাদেরকে সর্বদা সময়োপযোগী দিক নির্দেশনাও দিয়েছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, 'উমারের সাফল্যের পিছনে এই বিচারকদের বিরাট অবদান রয়েছে।

মুযাহিম ইবন যুফার বলেন: ২৮২
"আমি কৃফার একটি প্রতিনিধি দলের সংগে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট গেলাম। তিনি আমাদের শহর, আমীর ও কাজী সম্পর্কে জানার জন্য আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন। তারপর বললেন: পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কোন একটি যদি কোন কাজীর মধ্যে না থাকে তাহলে তার একটি ত্রুটি বলে বিবেচিত হয়। ১. তিনি হবেন বুদ্ধি-দীপ্ত, ২. তিনি হবেন ধৈর্যশীল, ৩. তিনি হবেন নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী, ৪. তিনি হবেন দৃঢ় ও অনমনীয়, ৫. তিনি হবেন এমন জ্ঞানী, কিছু জানা না থাকলে তা অন্যকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন।"

তিনি বিচারকের গুণ-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরো বলেছেন: ২৮৩
'একজন কাজীর মধ্যে যখন পাঁচটি গুণ-বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে তখন তিনি হন একজন পূর্ণ কাজী। ১. পূর্ববর্তী বিচার-ফয়সালা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা, ২. লোভ-লালসা হতে পবিত্র থাকা, ৩. বিবদমান পক্ষদ্বয়ের প্রতি ধৈর্য ও সহনশীল থাকা, ৪. পূর্ববর্তী ইমামদের অনুসরণ করা এবং ৫. জ্ঞানী ও সিদ্ধান্ত দানের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করা।'

অপর একটি বর্ণনা মতে, তিনি পূর্বে উল্লেখিত গুণগুলোর সাথে আরো একটি গুণের কথাও বলেছেন। তা হলো : তিনি মানুষের তিরস্কার ও সমালোচনার ব্যাপারে হবেন বেপরোয়া। ২৮৪

এসব মূলনীতি ও মাপকাঠির আলোকেই 'উমার তাঁর সকল কাজী নিয়োগ করেন। তিনি কাজীদের নিয়োগ দান করেই বসে থাকেননি, বরং সব সময় তাঁদের করণীয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনাও দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন: ২৮৫
'যখন বাদী তার এক চোখ উপড়ানো অবস্থায় আপনার নিকট আসে তখন বিবাদী না আসা পর্যন্ত তার পক্ষে রায় দিবেন না। কারণ, হতে পারে তার দু'চোখই উপড়ে ফেলা হয়েছে।'

খুরাসানে কাজী হিসেবে নিয়োগ দানের জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একজন উপযুক্ত লোক খুঁজছিলেন। তিনি আবূ মিজলাযকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন: অমুক ব্যক্তি সম্পর্কে আপনি কি বলেন? বললেন : কৃত্রিমভাবে প্রস্তুতকৃত। সে এর উপযুক্ত নয়। আবার জিজ্ঞেস করলেন: অমুক? বললেন: দ্রুত রেগে যায়, মোটেই খুশী হয় না। প্রচুর চায়, খুব কম বিরত হয়। ভাইকে হিংসা করে, পিতার সাথে পাল্লা দেয় এবং দাসকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। তিনি আবার প্রশ্ন করেন: অমুক? বললেন: সমকক্ষ সাথে প্রতিযোগিতা করে, শত্রুর সাথে শত্রুতা করে এবং যা খুশী তাই করে। 'উমার মন্তব্য করেন: এদের কারো মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। ২৮৬

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মায়মূন ইবন মিত্রানকে 'আল-জাযীরা'র বিচার ও রাজস্ব বিভাগের দায়িত্বে নিয়োগ করেন। কিছুদিন পর মায়মূন অব্যাহতি চেয়ে তাঁকে লিখলেন: 'আমি একজন দুর্বল বয়োবৃদ্ধ মানুষ। আমাকে মানুষের ঝগড়া-বিবাদের বিচার করতে হয়। আমার সাধ্যাতীত বোঝা আমার কাঁধে চাপিয়েছেন।' জবাবে 'উমার লিখলেন: ২৮৭
'পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন কর আদায় করুন। যা কিছু আপনার নিকট স্পষ্ট হবে কেবল সে ব্যাপারে ফয়সালা করবেন। কোন ব্যাপার আপনার নিকট অস্পষ্ট হলে তা আমাকে অবহিত করবেন। কোন কিছু বেশী হলেই মানুষ যদি তা পরিত্যাগ করতো তাহলে দীন ও দুনিয়ার কিছুই বিদ্যমান থাকতো না।'

তিনি কাজীদেরকে মানুষের সাথে বসতে, সর্বসাধারণের জন্য দরজা খোলা রাখতে এবং আদল ও ইনসাফের ভিত্তিতে তাদের অধিকার লাভের পথ সহজসাধ্য করতে সব সময় নির্দেশ দিতেন। মদীনার কাজী ও আমীর ইবন হাযমকে লিখলেন: ২৮৮
'আপনি আপনার বাড়ীতে বসে থাকা পরিহার করুন। মানুষের মধ্যে বের হোন এবং বৈঠকে, দেখা-সাক্ষাতে তাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করুন। কারো উপর কেউ যেন আপনার নিকট প্রাধান্য না পায়।'

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কাজীগণ অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সাথে তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। মানুষের ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা এবং মজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তারা রাত-দিন একাধারে কাজ করেন। তাঁদের খলীফার নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতার দীপ্তি ও আভায় তাঁদের অন্তকরণ ও বুদ্ধি আলোকিত হয়ে ওঠে। তাই তাঁরা হয়ে ওঠেন সর্বোত্তম খলীফার সর্বোত্তম কাজী। ইবরাহীম ইবন জা'ফর তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ২৮৯
'আমি আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবন 'আমর ইবন হাযমকে দেখেছি, তিনি তাঁর দিনের কাজের মত রাতেও কাজ করছেন। 'উমারের উৎসাহে তিনি একাজ করতেন।'

সত্য ও সঠিকভাবে বিচার কাজ সম্পন্ন করার প্রথম ও পূর্বশর্ত হলো সাক্ষী ও প্রমাণ। ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে অথবা লোভ দেখিয়ে যাতে কেউ সাক্ষীকে সাক্ষ্যদান থেকে বিরত না রাখে সে ব্যাপারেও তিনি সতর্ক ছিলেন। তিনি নিজে একটি মামলার একজন সাক্ষীকে ভয় দেখানোর অপরাধে এক ব্যক্তিকে তিরিশটি বেত্রাঘাত করেন। এ বিষয়ে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ালী ও কাজীদেরকে একটি পত্রে লেখেন: ২৯০
'কোন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীকে কেউ কষ্ট দিলে তাকে তিরিশটি বেত্রাঘাত করুন এবং মানুষের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখুন।'

বিচার কাজে তিনি কাজীদেরকে তাঁদের বুদ্ধি-বিবেক কাজে লাগাতে বলেছেন। আল-কিন্দীর 'তারীখ আল-কুজাত' গ্রন্থে এসেছে, একবার মিসরের কাজী আয়্যাদ ইবন 'উবাইদুল্লাহ একটি বিষয়ে 'উমারের পরামর্শ চেয়ে পত্র লিখলেন। জবাবে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয লিখলেন: ২৯১
'এ ব্যাপারে আমার নিকট পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে কিছু পৌছেনি। বিষয়টি আপনার উপর ছেড়ে দিচ্ছি। আপনি আপনার বুদ্ধি-বিবেচনা দ্বারা ফয়সালা করুন।'

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের শাসনকালের অন্যতম সফলতা এই যে, তিনি সুবিজ্ঞ 'আলিম ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ পূতঃপবিত্র মানসের আল্লাহভীরু ব্যক্তিবর্গকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দান করেন, শতকের পর শতক ধরে যাঁদের সুনাম ও খ্যাতি পৃথিবীর মানুষের কানে প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। তাঁদের কয়েকজন হলেন:

১. ইমাম আল-হাসান আল-বসরী (রহ): তিনি কিছুদিন বসরার কাজী ছিলেন। তারপর তিনি অব্যাহতি চাইলে 'উমার তাঁকে অব্যাহতি দেন।
তিনি বসরার ইমাম এবং তাঁর সময়ের তত্ত্বজ্ঞানী 'আলিম। মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। হযরত 'আলী ইবন আবী তালিবের (রা) তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালে খুরাসানের ওয়ালী রাবী' ইবন যিয়াদ তাঁকে সেক্রেটারী হিসেবে গ্রহণ করেন। বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতে মানুষের মনে সশ্রদ্ধ ভীতির উদ্রেক হতো। তিনি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মুখোমুখী নির্ভীকভাবে তাদের সমালোচনা করতেন, আদেশ-নিষেধ করতেন। সত্য উচ্চারণে কারো পরোয়া করতেন না।

ইমাম আল-গাযালী (রহ) বলেন: কথার দিক দিয়ে হাসান আল-বসরী ছিলেন আম্বিয়াদের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ এবং জীবন যাপনের দিক দিয়ে সাহাবীদের অধিক নিকটবর্তী। তিনি ছিলেন চূড়ান্ত পর্যায়ের শুদ্ধভাষী। তাঁর মুখ থেকে সব সময় জ্ঞান ও উপদেশপূর্ণ কথা বের হতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয খলীফা হওয়ার পর তাঁকে লেখেন:
'এই খিলাফতের দায়িত্ব দ্বারা আমাকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। আপনি আমার জন্য কিছু সাহায্যকারী দেখুন।' জবাবে হাসান লেখেন:
'দুনিয়ার সন্তানরা, তা তাদেরকে আপনি চাইবেন না। আর আখিরাতের সন্তানরা, তা তারা আপনাকে চাইবে না। অতএব আপনি আল্লাহর সাহায্য কামনা করুন। ২৯২

২. ইয়াস ইবন মু'আবিয়া: হাসান আল-বসরীর স্থলে তাঁকে নিয়োগ করা হয়। তিনি তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিমত্তার জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

৩. 'আমির আশ-শা'বী: তিনি একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীছ ও ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ, ইমাম। তিনি কৃষ্ণার কাজী ছিলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালের পূর্ণ সময়ে তিনি সেখানকার কাজীর দায়িত্ব পালন করেন।

৪. আবূ তুওয়ালা: তিনি একজন আস্থাভাজন নির্ভরযোগ্য ফকীহ ছিলেন। অত্যধিক সিয়াম পালনকারী, অতিরিক্ত সালাত আদায়কারী এবং কল্যাণমূলক কাজ সম্পাদনকারী মানুষ ছিলেন।

৫. সুলায়মান ইবন হাবীব আল-মুহারিবী আদ-দিমাশ্কী আদ-দাররানী: দিমাঙ্কের কাজী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন উঁচু মর্যাদার অধিকারী ইমাম। তাঁর সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবন মু'ঈন বলেন: তিনি তিরিশ বছর যাবত দিমাঙ্কের শাসনকর্তা ছিলেন।

৬. মায়মূন ইবন মিহরান: তিনি ছিলেন একজন ফকীহ, মুফতী ও মুত্তাকী ইমাম। আল-জাযীরার বিচার ও কর-খাজনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ২৯৩

টিকাঃ
২৮২. তাবাকাত-৫/৩৬৯-৩৭০; শাজারাত আয যাহব-১/২০
২৮৩. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/৮৪
২৮৪. ইবনুল জাওযী-২৭৫
২৮৫. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/৮৪; আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/৪৯৩
২৮৬. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/১৫
২৮৭. কিতাবুল খারাজ-১১৫; ইবনুল জাওযী-১১৯
২৮৮. তাবাকাত-৫/৩৪৩
২৮৯. প্রাগুক্ত-৫/৩৪৭; ইবনুল জাওযী-১০২
২৯০. তাবাকাত-৫/৩৮৫
২৯১. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/২৫৪
২৯২. হিলয়াতুল আওলিয়া-১৩১
২৯৩. তারাবী, তারীখ-৭/৪৫৭-৪৫৮; তাবাকাত-৫/৩৪১; আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/১৫৪-১৫৫; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৮৫

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পদসমূহের একটি হলো বিচারকের পদ। এ পদটি সবচেয়ে বেশী স্পর্শকাতর এবং জনগণের উপর সর্বাধিক প্রভাবশালীও। একজন কাযী বা বিচারক প্রতিদিন মানুষের সামনে আসেন, তাদের মধ্যে বিচার কাজ পরিচালনা করেন, তাদের ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসা করেন। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, উযীর- শ্রমিক, অখ্যাত-বিখ্যাত প্রতিটি শ্রেণী ও স্তরের মানুষ তাঁর কাছে আসে। তিনি যদি বিশ্বস্ত, ন্যায়পরায়ণ না হন, বিজ্ঞ-বিচক্ষণ না হন; খোদাভীরু ও সত্যের উপর অটল না হন এবং মানুষের অধিকারে যা কিছু আছে সে ব্যাপারে পাক-পবিত্র মানসের না হন, তাহলে তাঁর দ্বারা প্রথম যার ক্ষতি হয় সে হলো রাষ্ট্র ও আমীরুল মু'মিনীন তথা রাষ্ট্র- প্রধানের। এ কারণে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের মত বিজ্ঞ-বিচক্ষণ খলীফা বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করেন। বিচারক হওয়ার জন্য অনেকগুলো গুণ থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন এবং সেভাবে নির্বাচন করে কিছু বিচারক নিয়োগ করেন। তিনি কেবল বিচারক নিয়োগ করেই বসে থাকেননি, তাদেরকে সর্বদা সময়োপযোগী দিক নির্দেশনাও দিয়েছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, 'উমারের সাফল্যের পিছনে এই বিচারকদের বিরাট অবদান রয়েছে।

মুযাহিম ইবন যুফার বলেন: ২৮২
"আমি কৃফার একটি প্রতিনিধি দলের সংগে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট গেলাম। তিনি আমাদের শহর, আমীর ও কাজী সম্পর্কে জানার জন্য আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন। তারপর বললেন: পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কোন একটি যদি কোন কাজীর মধ্যে না থাকে তাহলে তার একটি ত্রুটি বলে বিবেচিত হয়। ১. তিনি হবেন বুদ্ধি-দীপ্ত, ২. তিনি হবেন ধৈর্যশীল, ৩. তিনি হবেন নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী, ৪. তিনি হবেন দৃঢ় ও অনমনীয়, ৫. তিনি হবেন এমন জ্ঞানী, কিছু জানা না থাকলে তা অন্যকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন।"

তিনি বিচারকের গুণ-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরো বলেছেন: ২৮৩
'একজন কাজীর মধ্যে যখন পাঁচটি গুণ-বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে তখন তিনি হন একজন পূর্ণ কাজী। ১. পূর্ববর্তী বিচার-ফয়সালা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা, ২. লোভ-লালসা হতে পবিত্র থাকা, ৩. বিবদমান পক্ষদ্বয়ের প্রতি ধৈর্য ও সহনশীল থাকা, ৪. পূর্ববর্তী ইমামদের অনুসরণ করা এবং ৫. জ্ঞানী ও সিদ্ধান্ত দানের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করা।'

অপর একটি বর্ণনা মতে, তিনি পূর্বে উল্লেখিত গুণগুলোর সাথে আরো একটি গুণের কথাও বলেছেন। তা হলো : তিনি মানুষের তিরস্কার ও সমালোচনার ব্যাপারে হবেন বেপরোয়া। ২৮৪

এসব মূলনীতি ও মাপকাঠির আলোকেই 'উমার তাঁর সকল কাজী নিয়োগ করেন। তিনি কাজীদের নিয়োগ দান করেই বসে থাকেননি, বরং সব সময় তাঁদের করণীয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনাও দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন: ২৮৫
'যখন বাদী তার এক চোখ উপড়ানো অবস্থায় আপনার নিকট আসে তখন বিবাদী না আসা পর্যন্ত তার পক্ষে রায় দিবেন না। কারণ, হতে পারে তার দু'চোখই উপড়ে ফেলা হয়েছে।'

খুরাসানে কাজী হিসেবে নিয়োগ দানের জন্য 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয একজন উপযুক্ত লোক খুঁজছিলেন। তিনি আবূ মিজলাযকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন: অমুক ব্যক্তি সম্পর্কে আপনি কি বলেন? বললেন : কৃত্রিমভাবে প্রস্তুতকৃত। সে এর উপযুক্ত নয়। আবার জিজ্ঞেস করলেন: অমুক? বললেন: দ্রুত রেগে যায়, মোটেই খুশী হয় না। প্রচুর চায়, খুব কম বিরত হয়। ভাইকে হিংসা করে, পিতার সাথে পাল্লা দেয় এবং দাসকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। তিনি আবার প্রশ্ন করেন: অমুক? বললেন: সমকক্ষ সাথে প্রতিযোগিতা করে, শত্রুর সাথে শত্রুতা করে এবং যা খুশী তাই করে। 'উমার মন্তব্য করেন: এদের কারো মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। ২৮৬

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মায়মূন ইবন মিত্রানকে 'আল-জাযীরা'র বিচার ও রাজস্ব বিভাগের দায়িত্বে নিয়োগ করেন। কিছুদিন পর মায়মূন অব্যাহতি চেয়ে তাঁকে লিখলেন: 'আমি একজন দুর্বল বয়োবৃদ্ধ মানুষ। আমাকে মানুষের ঝগড়া-বিবাদের বিচার করতে হয়। আমার সাধ্যাতীত বোঝা আমার কাঁধে চাপিয়েছেন।' জবাবে 'উমার লিখলেন: ২৮৭
'পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন কর আদায় করুন। যা কিছু আপনার নিকট স্পষ্ট হবে কেবল সে ব্যাপারে ফয়সালা করবেন। কোন ব্যাপার আপনার নিকট অস্পষ্ট হলে তা আমাকে অবহিত করবেন। কোন কিছু বেশী হলেই মানুষ যদি তা পরিত্যাগ করতো তাহলে দীন ও দুনিয়ার কিছুই বিদ্যমান থাকতো না।'

তিনি কাজীদেরকে মানুষের সাথে বসতে, সর্বসাধারণের জন্য দরজা খোলা রাখতে এবং আদল ও ইনসাফের ভিত্তিতে তাদের অধিকার লাভের পথ সহজসাধ্য করতে সব সময় নির্দেশ দিতেন। মদীনার কাজী ও আমীর ইবন হাযমকে লিখলেন: ২৮৮
'আপনি আপনার বাড়ীতে বসে থাকা পরিহার করুন। মানুষের মধ্যে বের হোন এবং বৈঠকে, দেখা-সাক্ষাতে তাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করুন। কারো উপর কেউ যেন আপনার নিকট প্রাধান্য না পায়।'

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কাজীগণ অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সাথে তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। মানুষের ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা এবং মজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তারা রাত-দিন একাধারে কাজ করেন। তাঁদের খলীফার নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতার দীপ্তি ও আভায় তাঁদের অন্তকরণ ও বুদ্ধি আলোকিত হয়ে ওঠে। তাই তাঁরা হয়ে ওঠেন সর্বোত্তম খলীফার সর্বোত্তম কাজী। ইবরাহীম ইবন জা'ফর তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ২৮৯
'আমি আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবন 'আমর ইবন হাযমকে দেখেছি, তিনি তাঁর দিনের কাজের মত রাতেও কাজ করছেন। 'উমারের উৎসাহে তিনি একাজ করতেন।'

সত্য ও সঠিকভাবে বিচার কাজ সম্পন্ন করার প্রথম ও পূর্বশর্ত হলো সাক্ষী ও প্রমাণ। ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে অথবা লোভ দেখিয়ে যাতে কেউ সাক্ষীকে সাক্ষ্যদান থেকে বিরত না রাখে সে ব্যাপারেও তিনি সতর্ক ছিলেন। তিনি নিজে একটি মামলার একজন সাক্ষীকে ভয় দেখানোর অপরাধে এক ব্যক্তিকে তিরিশটি বেত্রাঘাত করেন। এ বিষয়ে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ালী ও কাজীদেরকে একটি পত্রে লেখেন: ২৯০
'কোন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীকে কেউ কষ্ট দিলে তাকে তিরিশটি বেত্রাঘাত করুন এবং মানুষের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখুন।'

বিচার কাজে তিনি কাজীদেরকে তাঁদের বুদ্ধি-বিবেক কাজে লাগাতে বলেছেন। আল-কিন্দীর 'তারীখ আল-কুজাত' গ্রন্থে এসেছে, একবার মিসরের কাজী আয়্যাদ ইবন 'উবাইদুল্লাহ একটি বিষয়ে 'উমারের পরামর্শ চেয়ে পত্র লিখলেন। জবাবে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয লিখলেন: ২৯১
'এ ব্যাপারে আমার নিকট পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে কিছু পৌছেনি। বিষয়টি আপনার উপর ছেড়ে দিচ্ছি। আপনি আপনার বুদ্ধি-বিবেচনা দ্বারা ফয়সালা করুন।'

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের শাসনকালের অন্যতম সফলতা এই যে, তিনি সুবিজ্ঞ 'আলিম ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ পূতঃপবিত্র মানসের আল্লাহভীরু ব্যক্তিবর্গকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দান করেন, শতকের পর শতক ধরে যাঁদের সুনাম ও খ্যাতি পৃথিবীর মানুষের কানে প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। তাঁদের কয়েকজন হলেন:

১. ইমাম আল-হাসান আল-বসরী (রহ): তিনি কিছুদিন বসরার কাজী ছিলেন। তারপর তিনি অব্যাহতি চাইলে 'উমার তাঁকে অব্যাহতি দেন।
তিনি বসরার ইমাম এবং তাঁর সময়ের তত্ত্বজ্ঞানী 'আলিম। মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। হযরত 'আলী ইবন আবী তালিবের (রা) তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালে খুরাসানের ওয়ালী রাবী' ইবন যিয়াদ তাঁকে সেক্রেটারী হিসেবে গ্রহণ করেন। বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতে মানুষের মনে সশ্রদ্ধ ভীতির উদ্রেক হতো। তিনি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মুখোমুখী নির্ভীকভাবে তাদের সমালোচনা করতেন, আদেশ-নিষেধ করতেন। সত্য উচ্চারণে কারো পরোয়া করতেন না।

ইমাম আল-গাযালী (রহ) বলেন: কথার দিক দিয়ে হাসান আল-বসরী ছিলেন আম্বিয়াদের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ এবং জীবন যাপনের দিক দিয়ে সাহাবীদের অধিক নিকটবর্তী। তিনি ছিলেন চূড়ান্ত পর্যায়ের শুদ্ধভাষী। তাঁর মুখ থেকে সব সময় জ্ঞান ও উপদেশপূর্ণ কথা বের হতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয খলীফা হওয়ার পর তাঁকে লেখেন:
'এই খিলাফতের দায়িত্ব দ্বারা আমাকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। আপনি আমার জন্য কিছু সাহায্যকারী দেখুন।' জবাবে হাসান লেখেন:
'দুনিয়ার সন্তানরা, তা তাদেরকে আপনি চাইবেন না। আর আখিরাতের সন্তানরা, তা তারা আপনাকে চাইবে না। অতএব আপনি আল্লাহর সাহায্য কামনা করুন। ২৯২

২. ইয়াস ইবন মু'আবিয়া: হাসান আল-বসরীর স্থলে তাঁকে নিয়োগ করা হয়। তিনি তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিমত্তার জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

৩. 'আমির আশ-শা'বী: তিনি একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীছ ও ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ, ইমাম। তিনি কৃষ্ণার কাজী ছিলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালের পূর্ণ সময়ে তিনি সেখানকার কাজীর দায়িত্ব পালন করেন।

৪. আবূ তুওয়ালা: তিনি একজন আস্থাভাজন নির্ভরযোগ্য ফকীহ ছিলেন। অত্যধিক সিয়াম পালনকারী, অতিরিক্ত সালাত আদায়কারী এবং কল্যাণমূলক কাজ সম্পাদনকারী মানুষ ছিলেন।

৫. সুলায়মান ইবন হাবীব আল-মুহারিবী আদ-দিমাশ্কী আদ-দাররানী: দিমাঙ্কের কাজী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন উঁচু মর্যাদার অধিকারী ইমাম। তাঁর সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবন মু'ঈন বলেন: তিনি তিরিশ বছর যাবত দিমাঙ্কের শাসনকর্তা ছিলেন।

৬. মায়মূন ইবন মিহরান: তিনি ছিলেন একজন ফকীহ, মুফতী ও মুত্তাকী ইমাম। আল-জাযীরার বিচার ও কর-খাজনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ২৯৩

টিকাঃ
২৮২. তাবাকাত-৫/৩৬৯-৩৭০; শাজারাত আয যাহব-১/২০
২৮৩. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/৮৪
২৮৪. ইবনুল জাওযী-২৭৫
২৮৫. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/৮৪; আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/৪৯৩
২৮৬. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/১৫
২৮৭. কিতাবুল খারাজ-১১৫; ইবনুল জাওযী-১১৯
২৮৮. তাবাকাত-৫/৩৪৩
২৮৯. প্রাগুক্ত-৫/৩৪৭; ইবনুল জাওযী-১০২
২৯০. তাবাকাত-৫/৩৮৫
২৯১. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/২৫৪
২৯২. হিলয়াতুল আওলিয়া-১৩১
২৯৩. তারাবী, তারীখ-৭/৪৫৭-৪৫৮; তাবাকাত-৫/৩৪১; আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/১৫৪-১৫৫; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/১৮৫

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর কর্মধারা

📄 রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর কর্মধারা


'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বুঝেছিলেন রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামোর পরিচালকদের অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে, চরিত্র ও আদর্শবাদিতায় অনুসরণীয় মানের হতে হবে। তাঁর দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের চারটি স্তম্ভ। তিনি বলেন: ২৯৪
'একজন শাসকের থাকে অনেকগুলো স্তম্ভ। এগুলো ছাড়া সে দৃঢ়পদ হতে পারে না। আঞ্চলিক ওয়ালী বা কর্মকর্তা একটি স্তম্ভ, কাজী একটি স্তম্ভ, বায়তুল মাল-এর পরিচালক একটি স্তম্ভ এবং চতুর্থটি আমি নিজে।"

একজন খলীফা যতই যোগ্যতাসম্পন্ন ও সত্যনিষ্ঠ হোন না কেন এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠা ও জনগণের কল্যাণের যত সদিচ্ছাই তাঁর থাকুক না কেন তিনি কোনভাবে সফলকাম হবেন না যদি না তাঁর পাশে রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু সৎ ও যোগ্য পরিচালক ও উপদেষ্টামণ্ডলী থাকেন। এ কারণে তিনি তাঁর পরামর্শক ও সহযোগী হিসেবে কিছু লোক বেছে নিয়েছিলেন। তাঁরা সব সময় তাঁকে সৎ পরামর্শ দিয়েছেন এবং সঠিক কাজটি করার জন্য সহযোগিতা করেছেন।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর ন্যায়পরায়ণ শাসন ব্যবস্থায় আরব ও অনারবের মধ্যে সাম্য ও সমতা বিধান করেন। কোন বংশ-গোত্রের প্রতি কোন রকম অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করেননি। আঞ্চলিক ওয়ালীগণকে কেবল তাদের যোগ্যতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেন এবং যারা সত্য ও আদল-ইনসাফ পরিপন্থী কাজে দুঃসাহস দেখান তাদেরকে অপসারণ করেন। এই মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহকে অপসারণ করেন। এ কারণে তাঁর সময়কালে সর্বত্র একটা সম্প্রীতি ও ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর এই ন্যায়-নীতি ভিত্তিক সুশাসনে যাঁরা তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজনের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

রাজা' ইবন হায়ওয়া, ইয়াস ইবনু মু'আবিয়া, 'আবদুর রহমান ইবন নু'আইম, 'আবদুর রহমান ইবন 'আবদিল্লাহ আল-কাশইয়ারী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুগীরা, মাকহুল (শামের ফকীহ), আস-সামহ ইবন মালিক আল-খাওলানী, 'আদী ইবন আরতাত, আল-হাসান আল-বসরী, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কারাজী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, যিয়াদ ইবন আবী যিয়াদ, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উতবা, আল-কাসিম ইবন রাবী'আ আল-জাওশানী, মায়মূন ইবন মিত্রান, আবূ কিলাবা, ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব, জা'ফার ইবন রাবী'আ, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী জা'ফার (রহ) ও আরো অনেকে। ২৯৫

এখানে কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো:

১. রাজা' ইবন হায়ওয়া (রহ) : তাঁর সময়ে তিনি শামের শায়খ (ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব), ওয়ায়িজ ও বাগ্মী 'আলিম ছিলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যখন আমীর ছিলেন এবং পরবর্তীকালে যখন খলীফা হন- উভয় অবস্থায় রাজা' তাঁর সংগে ছিলেন। খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে সেক্রেটারী হিসেবে গ্রহণ করেন। মূলতঃ তিনিই 'উমারকে খলীফা মনোনীত করার জন্য সুলায়মানকে পরামর্শ দেন। ২৯৬

২. ইয়াস ইবন মু'আবিয়া (রহ) : তিনি ছিলেন বসরার কাজী। তীক্ষ্ণ মেধা ও প্রখর স্মৃতিশক্তির জন্য যাদেরকে যুগের বিস্ময় বলে মনে করা হতো তিনি তাঁদের একজন। তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও আন্দাজ-অনুমান সত্যে পরিণত হওয়া প্রবাদে পরিণত হয়। একবার তাঁকে বলা হলো: আপনি একজন বিস্ময়কর মানুষ ছাড়া আপনার মধ্যে আর কোন দোষ নেই। বললেন: আমি যা বলি তা কি তোমাদেরকে বিস্মিত করে? লোকেরা বললো: হাঁ! বললেন: তাহলে আমাকে দেখে বিস্মিত হওয়া অধিকতর সঙ্গত।

তিনি ওয়াসিত নগরে গেলেন। কিছুদিন পর সেখানকার অধিবাসীদের বললেন: যে দিন আমি আপনাদের এই শহরে এসেছি সেদিনই আমি আপনাদের ভালো ও মন্দ লোকগুলোকে চিনে ফেলেছি। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো কিভাবে? বললেন: আমাদের সাথে কিছু ভালো লোক আছে এবং তাদের সাথে আপনাদের কিছু লোকের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এর ঠিক বিপরীতে আমাদের সাথে কিছু খারাপ লোক আছে এবং তাদের সাথে আপনাদের কিছু লোকের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এর দ্বারা আমি বুঝেছি আপনাদের ভালো মানুষের সাথে আমাদের ভালো মানুষের এবং আপনাদের মন্দ মানুষের সাথে আমাদের মন্দ মানুষের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আল-জাহিজ বলেন: ইয়াস মুদার গোত্রের গর্ব এবং কাজীদের পুরোধা। তাঁর আন্দাজ-অনুমান সত্য-সঠিক হতো। বিস্ময়কর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, ইলহাম প্রাপ্ত এবং খলীফাদের নিকট অত্যন্ত মান্যবর ব্যক্তি ছিলেন। ২৯৭

৩. মাকহুল (রহ): তিনি একজন হাফেজে হাদীছ এবং তাঁর সময়ে শামের ফকীহ ছিলেন। তাঁর মূল পারস্যের। কাবুলে জন্ম এবং সেখানে বেড়ে ওঠেন। যুদ্ধবন্দী হিসেবে আরবদের হাতে আসেন এবং সেখান থেকে মিসরে এক মহিলার মালিকানায় চলে যান। তাঁর সাথেই তাঁর পরিচয় আরোপ করা হয়। অতঃপর দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। ফিকাহ শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করেন। হাদীছের জ্ঞান অর্জনের জন্য ইরাক যান এবং সেখান থেকে যান মদীনায়। তৎকালীন মুসলিম খিলাফতের বহু অঞ্চল ও শহর ভ্রমণ করেন। অবশেষে দিমাকে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ইমাম যুহরী বলেন: মাকহুলের সময়ে ফাতওয়া বিষয়ে তাঁর চেয়ে অধিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আর কেউ নেই। ২৯৮

৪. আস-সামহু ইবন মালিক (রহ): 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে স্পেনের আমীর নিয়োগ করেন। তাঁকে স্পেনের একটা লিখিত পরিচয় ও বিবরণ লিখে পাঠাতে বলেন এবং ভূমি জরিফ করে খারাজ, খুমুস ও 'উশর নির্ধারণ করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী হি. ১০০ সনে তিনি একটি বিবরণ উপস্থাপন করেন এবং অন্য সকল নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন। বালাতের যুদ্ধে, স্পেনের মাটিতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর শাসনাধীন অঞ্চলের রাজধানী ছিল কর্ডোভা। এই কর্ডোভার পুলটি তিনি নির্মাণ করেন। ২৯৯

৫. 'আদী ইবন আরতাত (রহ): তিনি দিমাঙ্কের অধিবাসী ছিলেন। সে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ও সাহসী ব্যক্তি। হিজরী ৯৯ সনে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে বসরার ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং ইরাকে ইয়াযীদ ইবন আল-মুহাল্লাবের বিদ্রোহের ডামাডোলে ওয়াসিতে মু'আবিয়া ইবন ইয়াযীদের হাতে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। ৩০০

৬. সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (রহ): তিনি মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীর অন্যতম এবং বিশ্বস্ত 'আলিম ও শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের একজন। স্বৈরাচারী উমাইয়া খলীফাগণ তাঁকে ভীষণ সম্মান ও সমাদর করতেন। একবার সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের দরবারে যান। সুলায়মান নিজ আসন থেকে নেমে তাঁকে স্বাগতম জানান এবং তাঁকে সংগে নিয়ে নিজের আসনে পাশাপাশি বসান। ৩০১

৭. 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাস'উদ (রা) (মৃ. হি. ৯৮): তিনি মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহ্ অন্যতম ও তথাকার মুফতী। তিনি একজন কবি। তাঁর অনেক চমৎকার কবিতা আছে। একটি কবিতা আবূ তাম্মাম তাঁর বিখ্যাত "আল-হামাসা" সংকলনে সন্নিবেশ করেছেন। তাছাড়া আবুল ফারাজ আল-ইসফাহানী তাঁর বিখ্যাত "কিতাবুল আসানী" গ্রন্থে অনেক কবিতা সংকলিত করেছেন। তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের একজন শিক্ষক ছিলেন। ৩০২

৮. মায়মূন ইবন মিত্রান (রহ) একজন কাজী ও ফকীহ্। তিনি কূফার এক মহিলার দাস ছিলেন এবং তিনি তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। কৃফায় বেড়ে ওঠেন। অতঃপর রাক্কায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি আল-জাযীরার একজন 'আলিম ও নেতা ছিলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে তথাকার রাজস্ব কর্মকর্তা ও কাজী হিসেবে নিয়োগ দেন। ১০৮ হিজরীতে মু'আবিয়া ইবন হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক সাগর পাড়ি দিয়ে যে "কুবরুস” (সাইপ্রাস) অভিযান পরিচালনা করেন তিনি সেই বাহিনীর একজন অগ্রবর্তী সৈনিক ছিলেন। হাদীছ বর্ণনায় অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং একজন অত্যধিক ইবাদাতকারী ব্যক্তি ছিলেন। ৩০৩

৯. আবূ কিলাবা (রহ) তাঁর আসল নাম 'আবদুল্লাহ ইবন যায়দ। একজন আইন ও বিচারে পারদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে কাজী হিসেবে নিয়োগ করতে চাইলে তিনি শামে পালিয়ে যান এবং সেখানে মারা যান। তিনি একজন বিশ্বস্ত হাদীছ বর্ণনকারী ব্যক্তি ছিলেন। ৩০৪

১০. ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব, যিনি ইয়াযীদ ইবন সুওয়াইদ আল-আযদী নামেও পরিচিত। তিনি মিসরের মুফতী ছিলেন এবং সেখানে ইল্মে দীন ও ইল্মে ফিকহ্র প্রসার ঘটান। ইমাম আল-লাইছ বলেন ইয়াযীদ আমাদের 'আলিম ও নেতা। তিনি হাদীছের একজন হুজ্জাত ও হাফেজ ছিলেন। ৩০৫

টিকাঃ
২৯৪. তাবারী, তারীখ-৭/৪৭৩
২৯৫. 'আলী-ফা'উর, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয-১১০
২৯৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১১; তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৬৫
২৯৭. ওয়াফাইয়াতুল আ'ইয়ান-১/৮১; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৫৬
২৯৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০১; আল-আ'লাম-৭/৩৮৪
২৯৯. নাফহুত তীব-১/১১১
৩০০. আল-মুবাররাদ, আল-কামিল ফিল লুগা-২/১৪৯; তারীখ আল-ইয়া'কূবী-৩/৫২
৩০১. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১৯৩; তাহযীব আত-তাহযীব-৩/৪৩৬
৩০২. 'আলী ফা'উর, সীরাতু 'উমার-১১৩
৩০৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৪
৩০৪. প্রাগুক্ত-১/৯৩
৩০৫. তাহযীবু ইবন 'আসাকির-৭/৪২৬

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বুঝেছিলেন রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামোর পরিচালকদের অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে, চরিত্র ও আদর্শবাদিতায় অনুসরণীয় মানের হতে হবে। তাঁর দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের চারটি স্তম্ভ। তিনি বলেন: ২৯৪
'একজন শাসকের থাকে অনেকগুলো স্তম্ভ। এগুলো ছাড়া সে দৃঢ়পদ হতে পারে না। আঞ্চলিক ওয়ালী বা কর্মকর্তা একটি স্তম্ভ, কাজী একটি স্তম্ভ, বায়তুল মাল-এর পরিচালক একটি স্তম্ভ এবং চতুর্থটি আমি নিজে।"

একজন খলীফা যতই যোগ্যতাসম্পন্ন ও সত্যনিষ্ঠ হোন না কেন এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠা ও জনগণের কল্যাণের যত সদিচ্ছাই তাঁর থাকুক না কেন তিনি কোনভাবে সফলকাম হবেন না যদি না তাঁর পাশে রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু সৎ ও যোগ্য পরিচালক ও উপদেষ্টামণ্ডলী থাকেন। এ কারণে তিনি তাঁর পরামর্শক ও সহযোগী হিসেবে কিছু লোক বেছে নিয়েছিলেন। তাঁরা সব সময় তাঁকে সৎ পরামর্শ দিয়েছেন এবং সঠিক কাজটি করার জন্য সহযোগিতা করেছেন।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর ন্যায়পরায়ণ শাসন ব্যবস্থায় আরব ও অনারবের মধ্যে সাম্য ও সমতা বিধান করেন। কোন বংশ-গোত্রের প্রতি কোন রকম অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করেননি। আঞ্চলিক ওয়ালীগণকে কেবল তাদের যোগ্যতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেন এবং যারা সত্য ও আদল-ইনসাফ পরিপন্থী কাজে দুঃসাহস দেখান তাদেরকে অপসারণ করেন। এই মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহকে অপসারণ করেন। এ কারণে তাঁর সময়কালে সর্বত্র একটা সম্প্রীতি ও ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর এই ন্যায়-নীতি ভিত্তিক সুশাসনে যাঁরা তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজনের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

রাজা' ইবন হায়ওয়া, ইয়াস ইবনু মু'আবিয়া, 'আবদুর রহমান ইবন নু'আইম, 'আবদুর রহমান ইবন 'আবদিল্লাহ আল-কাশইয়ারী, 'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুগীরা, মাকহুল (শামের ফকীহ), আস-সামহ ইবন মালিক আল-খাওলানী, 'আদী ইবন আরতাত, আল-হাসান আল-বসরী, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কারাজী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ, যিয়াদ ইবন আবী যিয়াদ, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'উতবা, আল-কাসিম ইবন রাবী'আ আল-জাওশানী, মায়মূন ইবন মিত্রান, আবূ কিলাবা, ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব, জা'ফার ইবন রাবী'আ, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী জা'ফার (রহ) ও আরো অনেকে। ২৯৫

এখানে কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো:

১. রাজা' ইবন হায়ওয়া (রহ) : তাঁর সময়ে তিনি শামের শায়খ (ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব), ওয়ায়িজ ও বাগ্মী 'আলিম ছিলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয যখন আমীর ছিলেন এবং পরবর্তীকালে যখন খলীফা হন- উভয় অবস্থায় রাজা' তাঁর সংগে ছিলেন। খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে সেক্রেটারী হিসেবে গ্রহণ করেন। মূলতঃ তিনিই 'উমারকে খলীফা মনোনীত করার জন্য সুলায়মানকে পরামর্শ দেন। ২৯৬

২. ইয়াস ইবন মু'আবিয়া (রহ) : তিনি ছিলেন বসরার কাজী। তীক্ষ্ণ মেধা ও প্রখর স্মৃতিশক্তির জন্য যাদেরকে যুগের বিস্ময় বলে মনে করা হতো তিনি তাঁদের একজন। তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও আন্দাজ-অনুমান সত্যে পরিণত হওয়া প্রবাদে পরিণত হয়। একবার তাঁকে বলা হলো: আপনি একজন বিস্ময়কর মানুষ ছাড়া আপনার মধ্যে আর কোন দোষ নেই। বললেন: আমি যা বলি তা কি তোমাদেরকে বিস্মিত করে? লোকেরা বললো: হাঁ! বললেন: তাহলে আমাকে দেখে বিস্মিত হওয়া অধিকতর সঙ্গত।

তিনি ওয়াসিত নগরে গেলেন। কিছুদিন পর সেখানকার অধিবাসীদের বললেন: যে দিন আমি আপনাদের এই শহরে এসেছি সেদিনই আমি আপনাদের ভালো ও মন্দ লোকগুলোকে চিনে ফেলেছি। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো কিভাবে? বললেন: আমাদের সাথে কিছু ভালো লোক আছে এবং তাদের সাথে আপনাদের কিছু লোকের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এর ঠিক বিপরীতে আমাদের সাথে কিছু খারাপ লোক আছে এবং তাদের সাথে আপনাদের কিছু লোকের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এর দ্বারা আমি বুঝেছি আপনাদের ভালো মানুষের সাথে আমাদের ভালো মানুষের এবং আপনাদের মন্দ মানুষের সাথে আমাদের মন্দ মানুষের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আল-জাহিজ বলেন: ইয়াস মুদার গোত্রের গর্ব এবং কাজীদের পুরোধা। তাঁর আন্দাজ-অনুমান সত্য-সঠিক হতো। বিস্ময়কর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, ইলহাম প্রাপ্ত এবং খলীফাদের নিকট অত্যন্ত মান্যবর ব্যক্তি ছিলেন। ২৯৭

৩. মাকহুল (রহ): তিনি একজন হাফেজে হাদীছ এবং তাঁর সময়ে শামের ফকীহ ছিলেন। তাঁর মূল পারস্যের। কাবুলে জন্ম এবং সেখানে বেড়ে ওঠেন। যুদ্ধবন্দী হিসেবে আরবদের হাতে আসেন এবং সেখান থেকে মিসরে এক মহিলার মালিকানায় চলে যান। তাঁর সাথেই তাঁর পরিচয় আরোপ করা হয়। অতঃপর দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। ফিকাহ শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করেন। হাদীছের জ্ঞান অর্জনের জন্য ইরাক যান এবং সেখান থেকে যান মদীনায়। তৎকালীন মুসলিম খিলাফতের বহু অঞ্চল ও শহর ভ্রমণ করেন। অবশেষে দিমাকে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ইমাম যুহরী বলেন: মাকহুলের সময়ে ফাতওয়া বিষয়ে তাঁর চেয়ে অধিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আর কেউ নেই। ২৯৮

৪. আস-সামহু ইবন মালিক (রহ): 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে স্পেনের আমীর নিয়োগ করেন। তাঁকে স্পেনের একটা লিখিত পরিচয় ও বিবরণ লিখে পাঠাতে বলেন এবং ভূমি জরিফ করে খারাজ, খুমুস ও 'উশর নির্ধারণ করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী হি. ১০০ সনে তিনি একটি বিবরণ উপস্থাপন করেন এবং অন্য সকল নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন। বালাতের যুদ্ধে, স্পেনের মাটিতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর শাসনাধীন অঞ্চলের রাজধানী ছিল কর্ডোভা। এই কর্ডোভার পুলটি তিনি নির্মাণ করেন। ২৯৯

৫. 'আদী ইবন আরতাত (রহ): তিনি দিমাঙ্কের অধিবাসী ছিলেন। সে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ও সাহসী ব্যক্তি। হিজরী ৯৯ সনে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে বসরার ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং ইরাকে ইয়াযীদ ইবন আল-মুহাল্লাবের বিদ্রোহের ডামাডোলে ওয়াসিতে মু'আবিয়া ইবন ইয়াযীদের হাতে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। ৩০০

৬. সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (রহ): তিনি মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীর অন্যতম এবং বিশ্বস্ত 'আলিম ও শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের একজন। স্বৈরাচারী উমাইয়া খলীফাগণ তাঁকে ভীষণ সম্মান ও সমাদর করতেন। একবার সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের দরবারে যান। সুলায়মান নিজ আসন থেকে নেমে তাঁকে স্বাগতম জানান এবং তাঁকে সংগে নিয়ে নিজের আসনে পাশাপাশি বসান। ৩০১

৭. 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাস'উদ (রা) (মৃ. হি. ৯৮): তিনি মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহ্ অন্যতম ও তথাকার মুফতী। তিনি একজন কবি। তাঁর অনেক চমৎকার কবিতা আছে। একটি কবিতা আবূ তাম্মাম তাঁর বিখ্যাত "আল-হামাসা" সংকলনে সন্নিবেশ করেছেন। তাছাড়া আবুল ফারাজ আল-ইসফাহানী তাঁর বিখ্যাত "কিতাবুল আসানী" গ্রন্থে অনেক কবিতা সংকলিত করেছেন। তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের একজন শিক্ষক ছিলেন। ৩০২

৮. মায়মূন ইবন মিত্রান (রহ) একজন কাজী ও ফকীহ্। তিনি কূফার এক মহিলার দাস ছিলেন এবং তিনি তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। কৃফায় বেড়ে ওঠেন। অতঃপর রাক্কায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি আল-জাযীরার একজন 'আলিম ও নেতা ছিলেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে তথাকার রাজস্ব কর্মকর্তা ও কাজী হিসেবে নিয়োগ দেন। ১০৮ হিজরীতে মু'আবিয়া ইবন হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক সাগর পাড়ি দিয়ে যে "কুবরুস” (সাইপ্রাস) অভিযান পরিচালনা করেন তিনি সেই বাহিনীর একজন অগ্রবর্তী সৈনিক ছিলেন। হাদীছ বর্ণনায় অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং একজন অত্যধিক ইবাদাতকারী ব্যক্তি ছিলেন। ৩০৩

৯. আবূ কিলাবা (রহ) তাঁর আসল নাম 'আবদুল্লাহ ইবন যায়দ। একজন আইন ও বিচারে পারদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে কাজী হিসেবে নিয়োগ করতে চাইলে তিনি শামে পালিয়ে যান এবং সেখানে মারা যান। তিনি একজন বিশ্বস্ত হাদীছ বর্ণনকারী ব্যক্তি ছিলেন। ৩০৪

১০. ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব, যিনি ইয়াযীদ ইবন সুওয়াইদ আল-আযদী নামেও পরিচিত। তিনি মিসরের মুফতী ছিলেন এবং সেখানে ইল্মে দীন ও ইল্মে ফিকহ্র প্রসার ঘটান। ইমাম আল-লাইছ বলেন ইয়াযীদ আমাদের 'আলিম ও নেতা। তিনি হাদীছের একজন হুজ্জাত ও হাফেজ ছিলেন। ৩০৫

টিকাঃ
২৯৪. তাবারী, তারীখ-৭/৪৭৩
২৯৫. 'আলী-ফা'উর, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয-১১০
২৯৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১১১; তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৬৫
২৯৭. ওয়াফাইয়াতুল আ'ইয়ান-১/৮১; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৫৬
২৯৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০১; আল-আ'লাম-৭/৩৮৪
২৯৯. নাফহুত তীব-১/১১১
৩০০. আল-মুবাররাদ, আল-কামিল ফিল লুগা-২/১৪৯; তারীখ আল-ইয়া'কূবী-৩/৫২
৩০১. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১৯৩; তাহযীব আত-তাহযীব-৩/৪৩৬
৩০২. 'আলী ফা'উর, সীরাতু 'উমার-১১৩
৩০৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৪
৩০৪. প্রাগুক্ত-১/৯৩
৩০৫. তাহযীবু ইবন 'আসাকির-৭/৪২৬

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 একান্ত ঘনিষ্ঠজন

📄 একান্ত ঘনিষ্ঠজন


তিন ব্যক্তি ছিলেন তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠজন ও সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। তারা প্রায় সবসময় তার সঙ্গে থাকতেন। এ তিনজন ছিলেন তার পরিবারের সদস্য। ১. নিজের সুযোগ্যপুত্র আবদুল মালিক, ২. দাস মুযাহিম, ৩. ভাই সাহল ইবন 'আবদিল 'আযীয। মায়মূন ইবন মিত্রান বলেন: ৩০৬
'উমার ইবন 'আবদিল আযীয, তাঁর ছেলে 'আবদুল মালিক ও তাঁর দাস মুযাহিমের চেয়ে অধিকতর ভালো তিনজন মানুষ একটি বাড়ীতে আমি আর দেখিনি।"

টিকাঃ
৩০৬. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬

তিন ব্যক্তি ছিলেন তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠজন ও সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। তারা প্রায় সবসময় তার সঙ্গে থাকতেন। এ তিনজন ছিলেন তার পরিবারের সদস্য। ১. নিজের সুযোগ্যপুত্র আবদুল মালিক, ২. দাস মুযাহিম, ৩. ভাই সাহল ইবন 'আবদিল 'আযীয। মায়মূন ইবন মিত্রান বলেন: ৩০৬
'উমার ইবন 'আবদিল আযীয, তাঁর ছেলে 'আবদুল মালিক ও তাঁর দাস মুযাহিমের চেয়ে অধিকতর ভালো তিনজন মানুষ একটি বাড়ীতে আমি আর দেখিনি।"

টিকাঃ
৩০৬. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 উপদেষ্টা পরিষদ

📄 উপদেষ্টা পরিষদ


তাঁর উচ্চ পর্যায়ের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যবৃন্দ হলেন: মায়মুন ইবন মিত্রান, রাজা' ইবন হায়ওয়া, রিয়াহ ইবন 'উবায়দা আল-কিন্দী। উল্লেখিত ব্যক্তিদের চেয়ে একটু নিম্ন পর্যায়ের আরো কয়েকজন উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরা হলেন: 'আমর ইবন কায়স, 'আওন ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ও মুহাম্মাদ ইবন আয-যুবায়র আল-হানজালী। ৩০৭ তিনি তাঁর সময়ের জ্ঞানী-গুণী, খোদাভীরু, জনগণের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও রাজনীতি বিষয়ে পরিপক্ক ব্যক্তিবর্গের নিকট পত্র লিখে তাঁদের সাহচর্য ও পরামর্শ চাইতেন। কেউ কোন পরামর্শ দান করলে তিনি সানন্দে তা গ্রহণ করতেন ও বাস্তবায়নের চেষ্টাও করতেন। এ জাতীয় খ্যাতিমান কয়েক ব্যক্তি হলেন: হাসান আল-বসরী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা), তাউস, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কারাজী, 'আমর ইবন মুহাজির, যিয়াদ আল-'আবদ, ইয়াযীদ আর-রাক্কাশী (রহ) ও আরো অনেকে। একবার তিনি মুহাম্মাদ আল-কারাজীর একটি উপদেশের পরে বলেন: ৩০৮
'আপনার দানের দ্বারা একজন দরিদ্র ব্যক্তি তার দারিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার চেয়ে আপনার উপদেশ দ্বারা একজন মানুষ ধ্বংস থেকে মুক্তি পাওয়া অধিক ভালো।'

একবার তিনি মায়মূন ইবন মিত্রানকে বললেন: ওহে মায়মূন! খিলাফতের এ দায়িত্ব পালনে আমি কিভাবে সহযোগী নির্বাচন করবো এবং কিভাবে তার উপর আস্থা রাখবো? মায়মূন বললেন: ৩০৯
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আপনি হলেন বাজারতুল্য। বাজারে যা চলে তাই আসে। মানুষ যখন জানবে আপনার নিকট কেবল সঠিক জিনিসই চলে তখন সঠিক জিনিস ছাড়া আর কিছু আপনার নিকট আসবে না।'

মুহাম্মাদ ইবন কা'ব একবার তাঁকে বলেন, যে ব্যক্তির আপনার কাছে কোন প্রয়োজন আছে তাকে আপনার সহচর করবেন না। কারণ, তার প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে তার হৃদ্যতাও শেষ হয়ে যাবে। বরং আপনি সহচর করুন এদেরকে : ৩১০
'কল্যাণমূলক কাজে মহত্তর, সত্যের পথে ধৈর্যশীল ব্যক্তি, সে আপনাকে সাহায্য করবে এবং তাঁর সাহায্যও আপনার জন্য যথেষ্ট হবে।'

একবার 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয ইরাকের ফকীহদেরকে ডেকে পাঠালেন। হাসান আল-বসরী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে আসতে পারলেন না। তবে একথাগুলো লিখে পাঠালেন:
'হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি অটল থাকেন জনগণও অটল থাকবে, যদি আপনি ঝুঁকে যান তারাও ঝুঁকে যাবে। হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি লাভ করেন নূহের জীবন, সুলায়মানের শাসন কর্তৃত্ব, ইবরাহীমের দৃঢ় প্রত্যয় ও লুকমানের জ্ঞান, তাহলেও আপনাকে বাধা অতিক্রম করা ছাড়া উপায় নেই। সেই বাধার পিছনেই হবে জান্নাত অথবা জাহান্নাম। একটা তাকে ভুল করলে অন্যটায় সে প্রবেশ করবে।'

চিঠিটি 'উমারের হাতে পৌছলে তিনি সেটা তাঁর দু'চোখের উপর রাখেন। কিছুক্ষণ কাঁদলেন, তারপর বললেন : আমাকে নূহের জীবন, ইবরাহীমের বিশ্বাস, সুলায়মানের ক্ষমতা ও লুকমানের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কে দেবে? আমি যদি এসব লাভ করতাম তাহলেও পূর্ববর্তীদের পেয়ালা পান করা ছাড়া আমার কোন উপায় থাকতো না। ৩১১

একবার তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ তাউস ইবন কায়সানের নিকট পাঠানো একটি পত্রে রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ চেয়ে পাঠালেন। জবাবে তাউস দশটি বাক্য লিখে পাঠান। তার কয়েকটি বাক্য নিম্নরূপ: ৩১২
'হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনার প্রতি সালাম। মহাপরাক্রমশালী মহিমান্বিত আল্লাহ একখানি গ্রন্থ নাযিল করেছেন। তাতে কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছেন। তাতে কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে কিছু অংশকে করেছেন সুদৃঢ়, আর কিছু অংশকে করেছেন সাদৃশ্যপূর্ণ। অতঃপর আল্লাহর হালালকে হালাল ও আল্লাহর হারামকে হারাম ঘোষণা করুন। আল্লাহর দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে চিন্তা করুন, তাঁর নির্দেশ মত কাজ করুন এবং তাঁর সাদৃশ্যপূর্ণ অংশে ঈমান আনুন। আস্-সালামু আলাইকুম।'

একবার মুহাম্মাদ ইবন আল-কারাজী 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের নিকট গিয়ে দেখেন, তিনি মজলিসে উপস্থিত একজনের উপদেশমূলক বক্তব্য শুনে কাঁদছেন। মুহাম্মাদ তখন দুনিয়া, আখিরাত ও খিলাফত পরিচালনা বিষয়ে বেশ দীর্ঘ একটা ভাষণ দেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপ: ৩১৩
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ দুনিয়া হচ্ছে একটি বাজারের মত। এখান থেকে কেউ লোকসান দিয়ে বাড়ী ফেরে, কেউ ফেরে লাভবান হয়ে। এ দুনিয়া দ্বারা বহু জাতি- সম্প্রদায় প্রতারিত হয়েছে যেমন আমরা হচ্ছি। অবশেষে মৃত্যু এসে তাদের সবকিছু ঘিরে ফেলেছে এবং তিরস্কৃত অবস্থায় তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আখিরাতের জীবনে তারা যা চেয়েছে তার জন্য কোন পাথেয় যেমন তারা সংগে নিয়ে যায়নি, তেমনি যা চায়নি তা থেকে রক্ষারও ব্যবস্থা করে যায়নি।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন এবং আপনার অন্তরে দু'টি পথের যে কোন একটিকে স্থান দিন। যখন আপনি আপনার মহান প্রভুর সামনে উপস্থিত হবেন তখন যে জিনিস আপনার সংগে থাকা আপনি পছন্দ করেন তার দিকে দৃষ্টি দেন। তার বিনিময় অন্বেষণ করুন সেই দিনের জন্য যে দিন কোন বিনিময় গ্রহণ করা হবে না। আপনি সেই পণ্য-সামগ্রীর দিকে অবশ্যই যাবেন না যা আপনার পূর্ববর্তীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আপনি চাইবেন, তা যেন আপনার সামনে থেকে দূর হয়ে যায়।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন। সকল দরজা খোলা রাখুন, পর্দা (নিরাপত্তা প্রহরী) সহজ করুন এবং মজলুমকে সাহায্য ও জালেমকে প্রতিহত করুন। যার মধ্যে তিনটি জিনিস থাকে আল্লাহর প্রতি তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করে। কেউ যখন সন্তুষ্ট হয়, তখন তার এই সন্তুষ্টি তাকে মিথ্যার মধ্যে নিয়ে যায় না। রাগান্বিত হলে তার রাগ তাকে সত্য থেকে বের করে দেয় না। আর ক্ষমতাবান হলে তার অধিকার বহির্ভূত কোন কিছু হাতিয়ে নেয় না।"

একবার আবূ হাযিম (রহ) 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে নিম্নের কথাটি লিখে পাঠালেন : ৩১৪
'আপনি মুহাম্মাদ (সা)-এর সাক্ষাতকে ভয় করুন। এমতাবস্থায় যে, আপনি রিসালাতের প্রচার করছেন তাঁর প্রতি বিশ্বাস সহকারে এবং তিনি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন তাঁর উম্মাতের উপর নিকৃষ্টভাবে খিলাফত পরিচালনার ব্যাপারে।'

আরেকবার 'উমার আবূ হাযিমকে বললেন : আবূ হাযিম, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দান করুন। আবূ হাযিম বললেন : ৩১৫
'আপনি শুয়ে পড়ুন। তারপর মৃত্যুকে আপনার মাথার পাশে রেখে দিন। তারপর ভেবে দেখুন, মৃত্যুর সময় আপনি কিসের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন, এখনই তার মধ্যে থাকুন। তেমনিভাবে মৃত্যুর সময় যার মধ্যে থাকতে অপছন্দ করেন তা এখনই ছেড়ে দিন।"

টিকাঃ
৩০৭. তাবাকাত-৫/৩৯৫
৩০৮. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬
৩০৯. তাবাকাত-৫/৩৯৪
৩১০. ইবনুল জাওযী-১৪৭
৩১১. প্রাগুক্ত
৩১২. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-২২১
৩১৩. ইবনুল জাওযী-১৫৭-১৫৯
৩১৪. প্রাগুক্ত
৩১৫. প্রাগুক্ত, হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩১৭

তাঁর উচ্চ পর্যায়ের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যবৃন্দ হলেন: মায়মুন ইবন মিত্রান, রাজা' ইবন হায়ওয়া, রিয়াহ ইবন 'উবায়দা আল-কিন্দী। উল্লেখিত ব্যক্তিদের চেয়ে একটু নিম্ন পর্যায়ের আরো কয়েকজন উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরা হলেন: 'আমর ইবন কায়স, 'আওন ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উতবা ও মুহাম্মাদ ইবন আয-যুবায়র আল-হানজালী। ৩০৭ তিনি তাঁর সময়ের জ্ঞানী-গুণী, খোদাভীরু, জনগণের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও রাজনীতি বিষয়ে পরিপক্ক ব্যক্তিবর্গের নিকট পত্র লিখে তাঁদের সাহচর্য ও পরামর্শ চাইতেন। কেউ কোন পরামর্শ দান করলে তিনি সানন্দে তা গ্রহণ করতেন ও বাস্তবায়নের চেষ্টাও করতেন। এ জাতীয় খ্যাতিমান কয়েক ব্যক্তি হলেন: হাসান আল-বসরী, সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার (রা), তাউস, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কারাজী, 'আমর ইবন মুহাজির, যিয়াদ আল-'আবদ, ইয়াযীদ আর-রাক্কাশী (রহ) ও আরো অনেকে। একবার তিনি মুহাম্মাদ আল-কারাজীর একটি উপদেশের পরে বলেন: ৩০৮
'আপনার দানের দ্বারা একজন দরিদ্র ব্যক্তি তার দারিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার চেয়ে আপনার উপদেশ দ্বারা একজন মানুষ ধ্বংস থেকে মুক্তি পাওয়া অধিক ভালো।'

একবার তিনি মায়মূন ইবন মিত্রানকে বললেন: ওহে মায়মূন! খিলাফতের এ দায়িত্ব পালনে আমি কিভাবে সহযোগী নির্বাচন করবো এবং কিভাবে তার উপর আস্থা রাখবো? মায়মূন বললেন: ৩০৯
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আপনি হলেন বাজারতুল্য। বাজারে যা চলে তাই আসে। মানুষ যখন জানবে আপনার নিকট কেবল সঠিক জিনিসই চলে তখন সঠিক জিনিস ছাড়া আর কিছু আপনার নিকট আসবে না।'

মুহাম্মাদ ইবন কা'ব একবার তাঁকে বলেন, যে ব্যক্তির আপনার কাছে কোন প্রয়োজন আছে তাকে আপনার সহচর করবেন না। কারণ, তার প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে তার হৃদ্যতাও শেষ হয়ে যাবে। বরং আপনি সহচর করুন এদেরকে : ৩১০
'কল্যাণমূলক কাজে মহত্তর, সত্যের পথে ধৈর্যশীল ব্যক্তি, সে আপনাকে সাহায্য করবে এবং তাঁর সাহায্যও আপনার জন্য যথেষ্ট হবে।'

একবার 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয ইরাকের ফকীহদেরকে ডেকে পাঠালেন। হাসান আল-বসরী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে আসতে পারলেন না। তবে একথাগুলো লিখে পাঠালেন:
'হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি অটল থাকেন জনগণও অটল থাকবে, যদি আপনি ঝুঁকে যান তারাও ঝুঁকে যাবে। হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি আপনি লাভ করেন নূহের জীবন, সুলায়মানের শাসন কর্তৃত্ব, ইবরাহীমের দৃঢ় প্রত্যয় ও লুকমানের জ্ঞান, তাহলেও আপনাকে বাধা অতিক্রম করা ছাড়া উপায় নেই। সেই বাধার পিছনেই হবে জান্নাত অথবা জাহান্নাম। একটা তাকে ভুল করলে অন্যটায় সে প্রবেশ করবে।'

চিঠিটি 'উমারের হাতে পৌছলে তিনি সেটা তাঁর দু'চোখের উপর রাখেন। কিছুক্ষণ কাঁদলেন, তারপর বললেন : আমাকে নূহের জীবন, ইবরাহীমের বিশ্বাস, সুলায়মানের ক্ষমতা ও লুকমানের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কে দেবে? আমি যদি এসব লাভ করতাম তাহলেও পূর্ববর্তীদের পেয়ালা পান করা ছাড়া আমার কোন উপায় থাকতো না। ৩১১

একবার তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ তাউস ইবন কায়সানের নিকট পাঠানো একটি পত্রে রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ চেয়ে পাঠালেন। জবাবে তাউস দশটি বাক্য লিখে পাঠান। তার কয়েকটি বাক্য নিম্নরূপ: ৩১২
'হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনার প্রতি সালাম। মহাপরাক্রমশালী মহিমান্বিত আল্লাহ একখানি গ্রন্থ নাযিল করেছেন। তাতে কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছেন। তাতে কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে কিছু অংশকে করেছেন সুদৃঢ়, আর কিছু অংশকে করেছেন সাদৃশ্যপূর্ণ। অতঃপর আল্লাহর হালালকে হালাল ও আল্লাহর হারামকে হারাম ঘোষণা করুন। আল্লাহর দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে চিন্তা করুন, তাঁর নির্দেশ মত কাজ করুন এবং তাঁর সাদৃশ্যপূর্ণ অংশে ঈমান আনুন। আস্-সালামু আলাইকুম।'

একবার মুহাম্মাদ ইবন আল-কারাজী 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের নিকট গিয়ে দেখেন, তিনি মজলিসে উপস্থিত একজনের উপদেশমূলক বক্তব্য শুনে কাঁদছেন। মুহাম্মাদ তখন দুনিয়া, আখিরাত ও খিলাফত পরিচালনা বিষয়ে বেশ দীর্ঘ একটা ভাষণ দেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপ: ৩১৩
'হে আমীরুল মু'মিনীন! এ দুনিয়া হচ্ছে একটি বাজারের মত। এখান থেকে কেউ লোকসান দিয়ে বাড়ী ফেরে, কেউ ফেরে লাভবান হয়ে। এ দুনিয়া দ্বারা বহু জাতি- সম্প্রদায় প্রতারিত হয়েছে যেমন আমরা হচ্ছি। অবশেষে মৃত্যু এসে তাদের সবকিছু ঘিরে ফেলেছে এবং তিরস্কৃত অবস্থায় তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আখিরাতের জীবনে তারা যা চেয়েছে তার জন্য কোন পাথেয় যেমন তারা সংগে নিয়ে যায়নি, তেমনি যা চায়নি তা থেকে রক্ষারও ব্যবস্থা করে যায়নি।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন এবং আপনার অন্তরে দু'টি পথের যে কোন একটিকে স্থান দিন। যখন আপনি আপনার মহান প্রভুর সামনে উপস্থিত হবেন তখন যে জিনিস আপনার সংগে থাকা আপনি পছন্দ করেন তার দিকে দৃষ্টি দেন। তার বিনিময় অন্বেষণ করুন সেই দিনের জন্য যে দিন কোন বিনিময় গ্রহণ করা হবে না। আপনি সেই পণ্য-সামগ্রীর দিকে অবশ্যই যাবেন না যা আপনার পূর্ববর্তীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আপনি চাইবেন, তা যেন আপনার সামনে থেকে দূর হয়ে যায়।

হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন। সকল দরজা খোলা রাখুন, পর্দা (নিরাপত্তা প্রহরী) সহজ করুন এবং মজলুমকে সাহায্য ও জালেমকে প্রতিহত করুন। যার মধ্যে তিনটি জিনিস থাকে আল্লাহর প্রতি তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করে। কেউ যখন সন্তুষ্ট হয়, তখন তার এই সন্তুষ্টি তাকে মিথ্যার মধ্যে নিয়ে যায় না। রাগান্বিত হলে তার রাগ তাকে সত্য থেকে বের করে দেয় না। আর ক্ষমতাবান হলে তার অধিকার বহির্ভূত কোন কিছু হাতিয়ে নেয় না।"

একবার আবূ হাযিম (রহ) 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযকে নিম্নের কথাটি লিখে পাঠালেন : ৩১৪
'আপনি মুহাম্মাদ (সা)-এর সাক্ষাতকে ভয় করুন। এমতাবস্থায় যে, আপনি রিসালাতের প্রচার করছেন তাঁর প্রতি বিশ্বাস সহকারে এবং তিনি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন তাঁর উম্মাতের উপর নিকৃষ্টভাবে খিলাফত পরিচালনার ব্যাপারে।'

আরেকবার 'উমার আবূ হাযিমকে বললেন : আবূ হাযিম, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দান করুন। আবূ হাযিম বললেন : ৩১৫
'আপনি শুয়ে পড়ুন। তারপর মৃত্যুকে আপনার মাথার পাশে রেখে দিন। তারপর ভেবে দেখুন, মৃত্যুর সময় আপনি কিসের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন, এখনই তার মধ্যে থাকুন। তেমনিভাবে মৃত্যুর সময় যার মধ্যে থাকতে অপছন্দ করেন তা এখনই ছেড়ে দিন।"

টিকাঃ
৩০৭. তাবাকাত-৫/৩৯৫
৩০৮. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, সীরাতু 'উমার-২১৬
৩০৯. তাবাকাত-৫/৩৯৪
৩১০. ইবনুল জাওযী-১৪৭
৩১১. প্রাগুক্ত
৩১২. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ-২২১
৩১৩. ইবনুল জাওযী-১৫৭-১৫৯
৩১৪. প্রাগুক্ত
৩১৫. প্রাগুক্ত, হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩১৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px