📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দমন নীতি বন্ধকরণ

📄 আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দমন নীতি বন্ধকরণ


উমাইয়‍্যা শাসন আমলে ভুল ধারণা ও সন্দেহবশতঃ ধরপাকড় ও শাস্তিদান খুব সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। ইসলামের দৃষ্টিতে যা ছিল মারাত্মক জুলুম। ঐতিহাসিক ইয়া'কূবীর বর্ণনা মতে খলীফা ওয়ালীদ এমন অপকর্মের সূচনা করেন এবং শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে বহু অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি দেন। তাবারীর মতে যিয়াদই সর্বপ্রথম এমন অপকর্ম চালু করেন। যাই হোক না কেন, এই জুলুমের সূচনা হয় 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের খিলাফতকালের পূর্বে এবং অসংখ্য মানুষকে কেবল সন্দেহমূলক অপরাধের ভিত্তিতে হত্যা করা হয়। 'উমার খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর এ রকম শাস্তিকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও সুন্নাতের পরিপন্থী বলে সিদ্ধান্ত দান করেন। তিনি এ জাতীয় শাস্তিদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।

মুসেলে চুরি-ছ্যাঁচড়ামির ঘটনা খুব বেশী পরিমাণে ঘটছিল। তাই সেখানকার ওয়ালী ইয়াহইয়া আল-গাসসানী খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে লিখলেন যে, সন্দেহের ভিত্তিতে ধরপাকড় করে শাস্তি দেওয়া না হলে এসব চুরি-ছ্যাঁচড়ামি বন্ধ হবে না। জবাবে 'উমার লিখলেন, কেবল আইনসম্মত সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে ধর-পাকড় ও শাস্তি দিবেন। সত্য যদি তাদের সংশোধন করতে না পারে তাহলে আল্লাহ সংশোধন না করুন।

একবার আঞ্চলিক কর্মকর্তা 'আবদুল হামীদ ইবন 'আবদির রহমান 'উমারকে লিখলেন: এক ব্যক্তি আপনাকে গালি দিয়েছে। আমি তাকে হত্যা করতে চাই। 'উমার লিখলেন: যদি আপনি তাকে হত্যা করেন, আমি আপনাকে গ্রেফতার করবো। কারণ, একমাত্র নবীকে (সা) গালি দেওয়া ছাড়া কাউকে গালির কারণে হত্যা করা যায় না।

আরেকজন কর্মকর্তা 'উমারকে লিখলেন আমরা একজন জাদুকরকে পানিতে ফেলে দিই। কিন্তু সে পানির উপরে ভেসে থাকে। তার ব্যাপারে আপনি সিদ্ধান্ত দিন। 'উমার লিখলেন: পানির সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। তার বিরুদ্ধে সাক্ষী-প্রমাণ থাকে তো পাকড়াও করুন, অন্যথায় ছেড়ে দিন।

একবার খুরাসানের ওয়ালী আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামী লিখলেন: খুরাসানের লোকদের অভ্যাস-আচরণ অত্যন্ত খারাপ। কেবল চাবুক ও অসি ছাড়া আর কোন কিছু তাদেরকে সংশোধন করতে পারবে না। আমীরুল মু’মিনীন সমীচীন মনে করলে অনুমতি দান করবেন। জবাবে 'উমার (রহ) লিখলেন: আপনার চিঠি পেয়েছি। আপনি যে লিখেছেন, খুরাসানবাসীদেরকে চাবুক ও অসি ছাড়া আর কোন কিছু সংশোধন করতে পারবে না, একথা একদম ভুল। তাদেরকে সত্য ও ন্যায়বিচার সংশোধন করতে পারে। আর আপনি তাই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিন। তিনি আঞ্চলিক শাসনকর্তাদের এ নির্দেশও দেন যে, আমার অনুমতি ছাড়া কোন অপরাধীকে হাত কাটার শাস্তি দিবে না।

টিকাঃ
২৬৮. তারীখ আল-ইয়া’কূবী-২/৩৪৮
২৬৯. তারীখ আল-খুলাফা'-২৩৮
২৭০. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৩৬
২৭১. প্রাগুক্ত-৪/৪৩৩, ৪৩৭; ৫/২৬৬
২৭২. তারীখ আল-খুলাফা'-২৪৩; আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/১৫৮, ১৬৩

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 একই ধরনের মাপ চালু ও সরকারী কর্মকর্তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা নিষিদ্ধকরণ

📄 একই ধরনের মাপ চালু ও সরকারী কর্মকর্তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা নিষিদ্ধকরণ


তিনি গোটা খিলাফতের সর্বত্র একই ধরনের মাপ চালু করেন। প্রাদেশিক ওয়ালী ও রাষ্ট্রের আমলাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তিনি লেখেন:
'আমরা মনে করি কোন শাসনকর্তার ব্যবসা-বাণিজ্য করা উচিত নয়। কোন কর্মকর্তার তার শাসনাধীন অঞ্চলে ব্যবসা করা বৈধ নয়। কারণ, একজন শাসক যখন ব্যবসা করবে তখন সে না চাইলেও এমন সব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়বে যা জনগণের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।' 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কয়েক শো বছর পর জন্ম হয় প্রখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী ইবন খালদুনের। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে 'উমারের মত একই কথা বলেন:
'আইনত: 'শাসকের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা জনগণের জন্য যেমন ক্ষতির কারণ, তেমনি ধ্বংসের কারণ ট্যাক্স-কর ব্যবস্থারও।'

টিকাঃ
২৭৩. ইবনুল জাওযী-৯৯; রিজালুল ফিক্স ওয়াদ দা'ওয়া-১/৪৬
২৭৪. ইবন খালদুন, মুকাদ্দিমা-১৯৭

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 বেগার শ্রম নিষিদ্ধকরণ

📄 বেগার শ্রম নিষিদ্ধকরণ


সব ধরনের বেগার শ্রমকে তিনি আইনত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এ রকম বেগার শ্রমিকের ঘামঝরা শ্রমের দ্বারাই প্রাচীন মিসরের পিরামিড এবং রোমান সাম্রাজ্যে বিশাল প্রাসাদ, স্তম্ভ ইত্যাদি নির্মিত হয়েছে। তাই 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন:
'আমরা চাই পৃথিবীর অধিবাসীদের উপর থেকে বেগার শ্রম দূরীভূত হোক। কারণ, এর পরিণতিতে এমন সব বিষয় থাকে যাতে জুলুম-অত্যাচার ঢুকে যায়।'

একবার একজন কর্মকর্তা কোন রকম পারিশ্রমিক প্রদান ছাড়াই জনৈক ব্যক্তির জন্তুর পিঠে সাওয়ার হয়ে তাঁর নিকট আসে। তিনি তা জানতে পেরে বলেন, আমার শাসনামলে তোমরা এমন বেগার খাটাও? তারপর তাকে ৪০টি বেত্রাঘাত করেন।

টিকাঃ
২৭৫. ইবনুল জাওযী-১০০

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 সরকারী চারণক্ষেত্র সকলের জন্য উন্মুক্তকরণ

📄 সরকারী চারণক্ষেত্র সকলের জন্য উন্মুক্তকরণ


রাষ্ট্রীয় ভূ-সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশকে আমীর-উমারা, শাহী খান্দানের লোকেরা এবং শাসনকর্তারা নিজেদের শিকার ক্ষেত্র অথবা চারণভূমিতে পরিণত করে পতিত রেখে দিয়েছিল। তিনি নির্দেশ দেন যে, তার সবকিছুতে জনগণের অধিকার আছে। তিনি বলেন:
'আমরা চাই চারণভূমি সাধারণভাবে মুসলমানদের জন্য বৈধ করা হোক।... তাতে ইমাম ও আমীরের অধিকার একজন সাধারণ মুসলমানের মত সমান। আল্লাহ আকাশ থেকে যে বৃষ্টি বর্ষণ করেন তাতে সবার সমান অধিকার।'

অতি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়ও তিনি গভীরভাবে ভেবে দেখেন। যেখানেই তিনি কোন অন্যায় ও অসাধুতার ছিদ্র খুঁজে পেয়েছেন, তা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তেমন একটি বিষয় আমলাদের জনসাধারণের নিকট থেকে হাদিয়া-তোহফা গ্রহণ করা। সরকারী কর্মকর্তারা হাদিয়া-তোহফা গ্রহণ করতো। কারণ, তা গ্রহণ করা সুন্নাত। কিন্তু 'উমার সময়, অবস্থা ও পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিফহাল ছিলেন। তাই তিনি সরকারী কর্মকর্তাদের জনসাধারণের নিকট থেকে হাদিয়া-তোহফা গ্রহণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। একবার তাঁকে কিছু হাদিয়া দেওয়া হলে তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। তখন এক ব্যক্তি বলে, রাসূলুল্লাহ (সা) হাদিয়া গ্রহণ করতেন। জবাবে তিনি বললেন:
'যা ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য হাদিয়া তা হয়েছে আমাদের জন্য রিশওয়াত বা ঘুষ। এর প্রয়োজন আমার নেই।'

খলীফাদের ঘিরে একটি বেষ্টনী তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের যেমন তাঁর কাছে পৌছাার কোন সুযোগ ছিল না, তেমনি মানুষের হাল-হাকীকত এবং খিলাফতের সার্বিক অবস্থা জানার উপায়ও তাঁর ছিল না। পারিষদবর্গ সর্বদাই তাঁকে লোহার বেষ্টনীর মত ঘিরে রাখতো। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ালীদের প্রতি নির্দেশ পাঠান তাঁরা যেন জনসাধারণকে তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ এবং অভাব-অভিযোগ পেশ করার পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। কেউ কোন সঠিক তথ্য খলীফাকে অবহিত করলে অথবা ইসলামী খিলাফত ও মুসলমানদের কল্যাণমূলক কোন প্রস্তাব বা পরামর্শ দান করলে 'উমার তার জন্য পুরস্কার ও আর্থিক ভাতা ঘোষণা করেন।

হজ্জের সময় ঘোষণা দেওয়া হতো: কারো উপর জুলুম করা হয়েছে- এমন কোন তথ্য কেউ প্রদান করলে, অথবা জনকল্যাণ ও দীনের কোন ব্যাপারে সৎ পরামর্শ দিলে তাকে এক শো' থেকে তিন শো' দীনার পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হবে।

প্রাদেশিক শাসনকর্তা 'আবদুল হামীদকে তিনি প্রথমে লিখলেন: 'শয়তানের প্ররোচনা এবং রাষ্ট্রীয় জুলুম-অত্যাচারের পর মানুষের কোন স্থায়িত্ব থাকতে পারে না। এ কারণে আমার এ চিঠি পাওয়ার সংগে সংগে প্রত্যেক পাওনাদারকে তার পাওনা পরিশোধ করবেন।' সকল প্রকার অন্যায় ট্যাক্স তিনি মওকুফ করে দেন। এছাড়া যাবতীয় নিবর্তনমূলক রীতি-পদ্ধতি তিনি রহিত করেন। পূর্ববর্তী খলীফা ও আমলারা বিশ প্রকার ট্যাক্স উদ্ভাবন করেছিল, তিনি তা চিরতরে মাফ করে দেন।

টিকাঃ
২৭৬. প্রাগুক্ত-৯৭; রিজালুল ফিকর ওয়াদ দা'ওয়া-১/৪৬
২৭৭. ইবনুল জাওযী-৩৬; রিজালুল ফিকর ওয়াদ দা'ওয়া-১/৪৬
২৭৮. ইবনুল জাওযী-১৪১
২৭৯. তাবাকাত-৫/৩৭১, ৩৮৩
২৮০. ইবনুল জাওযী-৯৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px