📄 অত্যাচারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে বরখাস্তকরণ
অন্যায়ভাবে জোর-জবরদস্তী দখলকৃত সম্পদ ফেরত দান ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে আদল- ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজ করার পর তার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক কাজ ছিল কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জুলুম-অত্যাচারের প্রতিবিধান করা। অবশ্য তাঁর পরামর্শ মত খলীফা সুলায়মানের সময়কালেই বহুলাংশে এর প্রতিবিধান হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও কিছু প্রভাব বিদ্যমান ছিল। উমাইয়্যা শাসনকালে হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ, তার গোটা খান্দান এবং তার অধীনের কর্মকর্তারা ছিল সবচেয়ে বেশী বেপরোয়া ও জঘন্য ধরনের অত্যাচারী-উৎপীড়ক।
খলীফা 'আবদুল মালিক ও তাঁর পুত্র আল-ওয়ালীদের খিলাফতকালের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের মত চরম অত্যাচারীর দীর্ঘ বিশ বছর যাবত গভর্ণর থাকা। কিরাত শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম 'আসিম ইবন আবী আন-নাজুদ (রহ) বলেন : 'আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজসমূহের মধ্যে এমন কোন কাজ ছিল না যা সে করেনি।' 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) বলতেন: 'যদি দুনিয়ার সকল জাতি-গোষ্ঠী পাপাচারের প্রতিযোগিতা করে এবং নিজেদের সকল কপট পাপাচারীকে এনে দাঁড় করায় তাহলে আমরা কেবল হাজ্জাজকে দাঁড় করিয়ে তাদের সকলের উপর জয় লাভ করতে পারবো।' ২৬২ তার সময়ে আদালতের বিচার- ফয়সালা ছাড়া বন্দী অবস্থায় যাদের হত্যা করা হয়েছে, বলা হয়, কেবল তাদের সংখ্যা এক লাখ বিশ হাজার। যখন সে মারা যায় তখন তার কারাগারে আশি হাজার নির্দোষ মানুষ বন্দী ছিল যাদেরকে কখনো আদালতে হাজির করা হয়নি। ২৬৩ হাজ্জাজের মৃত্যুর খবর শুনে 'উমার সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তিনি আল্লাহর নিকট দু'আ করতেন, হাজ্জাজের মৃত্যু যেন তার বিছানায় হয়, যাতে আখিরাতে সে কঠিন শাস্তি লাভ করে।
হাজ্জাজের মৃত্যুর পর মানুষ শোক প্রকাশের জন্য খলীফা ওয়ালীদের নিকট আসে। তারা তাদের শোক প্রকাশ ও হাজ্জাজের প্রশংসায় অনেক কথা বলে। সেখানে 'উমার উপস্থিত ছিলেন। ওয়ালীদ তাঁর দিকে তাকালেন যাতে মানুষে যা বলছে সেও যেন তেমন কিছু বলে। 'উমার বললেন : আমীরুল মু'মিনীন! হাজ্জাজ আমাদের মধ্যকার একজন মানুষই ছিল। ২৬৪
খলীফা আল-ওয়ালীদ ইবন আবদিল মালিকের দরবারে একবার 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের উপস্থিতিতে বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ালী, বিশেষতঃ হাজ্জাজের জুলুম-অত্যাচারের প্রসঙ্গ ওঠে। 'উমার তখন বললেন: ২৬৫
'ইরাকে হাজ্জাজ, শামে ওয়ালীদ, মিসরে কুররা ইবন শারীক, মদীনায় 'উছমান ইবন হায়্যান, মক্কায় খালিদ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-কাসারী- ইয়া আল্লাহ! জুলুম-অত্যাচারে এ দুনিয়া ভরে গেছে, তুমি মানুষকে শান্তি দাও।'
'আল্লাহ 'উমারের দু'আ কবুল করেন। এর এক মাসের মধ্যে হাজ্জাজ ও কুররা মৃত্যুবরণ করে, তার অল্প কিছু দিন পর মারা যায় আল-ওয়ালীদ। অতঃপর 'উছমান ও খালিদকে বরখাস্ত করা হয়।' অপর একটি বর্ণনায় ইয়ামনে মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফের কথাও এসেছে। ২৬৬
'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) এই জুলুম-অত্যাচার নির্মূল করার দিকে মনোযোগী হওয়ার পর হাজ্জাজের গোটা খান্দানকে ইয়ামনে নির্বাসন দেন। তারপর সেখানের ওয়ালীকে লেখেন যে, তোমাদের নিকট ঐ বংশের খান্দানকে- যেটি আরবের নিকৃষ্ট খান্দান, পাঠালাম। তাদেরকে একস্থানে থাকার সুযোগ না দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাও। তিনি হাজ্জাজের নিজ গোত্রের লোক অথবা যারা তার অধীনে কোন কাজ করেছে তাদেরকে সবরকম রাষ্ট্রীয় অধিকার ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার নির্দেশ দেন। ২৬৭
টিকাঃ
২৬২. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৫/৪৯
২৬৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২, ৮৩, ৯১, ১২৮, ১২৯, ১৩১, ১৩৮; আল-কামিল ফিত তারীখ- ৪/২৯, ১৩৩; খিলাফত ও মুলুকিয়াত-১৮৬
২৬৪. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৫/৫৫, ৫৭
২৬৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/৮৯; খিলাফত ও মুলুকিয়াত-১৮৭
২৬৬. আল-কামিল ফিল লুগা ওয়াল আদাব-১/৮৭, ১২৩
২৬৭. ইবনুল জাওযী-১১৪
📄 আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দমন নীতি বন্ধকরণ
উমাইয়্যা শাসন আমলে ভুল ধারণা ও সন্দেহবশতঃ ধরপাকড় ও শাস্তিদান খুব সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। ইসলামের দৃষ্টিতে যা ছিল মারাত্মক জুলুম। ঐতিহাসিক ইয়া'কূবীর বর্ণনা মতে খলীফা ওয়ালীদ এমন অপকর্মের সূচনা করেন এবং শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে বহু অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি দেন। তাবারীর মতে যিয়াদই সর্বপ্রথম এমন অপকর্ম চালু করেন। যাই হোক না কেন, এই জুলুমের সূচনা হয় 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের খিলাফতকালের পূর্বে এবং অসংখ্য মানুষকে কেবল সন্দেহমূলক অপরাধের ভিত্তিতে হত্যা করা হয়। 'উমার খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর এ রকম শাস্তিকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও সুন্নাতের পরিপন্থী বলে সিদ্ধান্ত দান করেন। তিনি এ জাতীয় শাস্তিদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।
মুসেলে চুরি-ছ্যাঁচড়ামির ঘটনা খুব বেশী পরিমাণে ঘটছিল। তাই সেখানকার ওয়ালী ইয়াহইয়া আল-গাসসানী খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে লিখলেন যে, সন্দেহের ভিত্তিতে ধরপাকড় করে শাস্তি দেওয়া না হলে এসব চুরি-ছ্যাঁচড়ামি বন্ধ হবে না। জবাবে 'উমার লিখলেন, কেবল আইনসম্মত সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে ধর-পাকড় ও শাস্তি দিবেন। সত্য যদি তাদের সংশোধন করতে না পারে তাহলে আল্লাহ সংশোধন না করুন।
একবার আঞ্চলিক কর্মকর্তা 'আবদুল হামীদ ইবন 'আবদির রহমান 'উমারকে লিখলেন: এক ব্যক্তি আপনাকে গালি দিয়েছে। আমি তাকে হত্যা করতে চাই। 'উমার লিখলেন: যদি আপনি তাকে হত্যা করেন, আমি আপনাকে গ্রেফতার করবো। কারণ, একমাত্র নবীকে (সা) গালি দেওয়া ছাড়া কাউকে গালির কারণে হত্যা করা যায় না।
আরেকজন কর্মকর্তা 'উমারকে লিখলেন আমরা একজন জাদুকরকে পানিতে ফেলে দিই। কিন্তু সে পানির উপরে ভেসে থাকে। তার ব্যাপারে আপনি সিদ্ধান্ত দিন। 'উমার লিখলেন: পানির সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। তার বিরুদ্ধে সাক্ষী-প্রমাণ থাকে তো পাকড়াও করুন, অন্যথায় ছেড়ে দিন।
একবার খুরাসানের ওয়ালী আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামী লিখলেন: খুরাসানের লোকদের অভ্যাস-আচরণ অত্যন্ত খারাপ। কেবল চাবুক ও অসি ছাড়া আর কোন কিছু তাদেরকে সংশোধন করতে পারবে না। আমীরুল মু’মিনীন সমীচীন মনে করলে অনুমতি দান করবেন। জবাবে 'উমার (রহ) লিখলেন: আপনার চিঠি পেয়েছি। আপনি যে লিখেছেন, খুরাসানবাসীদেরকে চাবুক ও অসি ছাড়া আর কোন কিছু সংশোধন করতে পারবে না, একথা একদম ভুল। তাদেরকে সত্য ও ন্যায়বিচার সংশোধন করতে পারে। আর আপনি তাই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিন। তিনি আঞ্চলিক শাসনকর্তাদের এ নির্দেশও দেন যে, আমার অনুমতি ছাড়া কোন অপরাধীকে হাত কাটার শাস্তি দিবে না।
টিকাঃ
২৬৮. তারীখ আল-ইয়া’কূবী-২/৩৪৮
২৬৯. তারীখ আল-খুলাফা'-২৩৮
২৭০. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৩৬
২৭১. প্রাগুক্ত-৪/৪৩৩, ৪৩৭; ৫/২৬৬
২৭২. তারীখ আল-খুলাফা'-২৪৩; আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/১৫৮, ১৬৩
📄 একই ধরনের মাপ চালু ও সরকারী কর্মকর্তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা নিষিদ্ধকরণ
তিনি গোটা খিলাফতের সর্বত্র একই ধরনের মাপ চালু করেন। প্রাদেশিক ওয়ালী ও রাষ্ট্রের আমলাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তিনি লেখেন:
'আমরা মনে করি কোন শাসনকর্তার ব্যবসা-বাণিজ্য করা উচিত নয়। কোন কর্মকর্তার তার শাসনাধীন অঞ্চলে ব্যবসা করা বৈধ নয়। কারণ, একজন শাসক যখন ব্যবসা করবে তখন সে না চাইলেও এমন সব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়বে যা জনগণের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।' 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কয়েক শো বছর পর জন্ম হয় প্রখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী ইবন খালদুনের। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে 'উমারের মত একই কথা বলেন:
'আইনত: 'শাসকের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা জনগণের জন্য যেমন ক্ষতির কারণ, তেমনি ধ্বংসের কারণ ট্যাক্স-কর ব্যবস্থারও।'
টিকাঃ
২৭৩. ইবনুল জাওযী-৯৯; রিজালুল ফিক্স ওয়াদ দা'ওয়া-১/৪৬
২৭৪. ইবন খালদুন, মুকাদ্দিমা-১৯৭
📄 বেগার শ্রম নিষিদ্ধকরণ
সব ধরনের বেগার শ্রমকে তিনি আইনত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এ রকম বেগার শ্রমিকের ঘামঝরা শ্রমের দ্বারাই প্রাচীন মিসরের পিরামিড এবং রোমান সাম্রাজ্যে বিশাল প্রাসাদ, স্তম্ভ ইত্যাদি নির্মিত হয়েছে। তাই 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন:
'আমরা চাই পৃথিবীর অধিবাসীদের উপর থেকে বেগার শ্রম দূরীভূত হোক। কারণ, এর পরিণতিতে এমন সব বিষয় থাকে যাতে জুলুম-অত্যাচার ঢুকে যায়।'
একবার একজন কর্মকর্তা কোন রকম পারিশ্রমিক প্রদান ছাড়াই জনৈক ব্যক্তির জন্তুর পিঠে সাওয়ার হয়ে তাঁর নিকট আসে। তিনি তা জানতে পেরে বলেন, আমার শাসনামলে তোমরা এমন বেগার খাটাও? তারপর তাকে ৪০টি বেত্রাঘাত করেন।
টিকাঃ
২৭৫. ইবনুল জাওযী-১০০